দুই তীর

দুই তীর 

প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় ক্যানভাসের ডেকচেয়ারে বসলে পায়ের সামনে আবদুল ঝুঁকে পড়ে তার জুতা-মোজা খোলে। ভৃত্যের এ-সেবায় আফসারউদ্দিন যে আনন্দ বোধ করে, তা নয়। বরঞ্চ জুতা বাড়াতে গিয়ে প্রতিদিন কেমন জড়তা বোধ করে, তার পা-দুটি পাথরের মতো ভারি হয়ে ওঠে। সে আশা করেছিল নিত্যকার এ-সাহেবিয়ানা অনুষ্ঠানে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, কিন্তু এখনো হয় নাই। ভাবে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটাবে। তা-ও হয়ে ওঠে না। 

আজও চাকরটি তার পাথবের এতো ভারি পা-দুটি থেকে প্রথমে জুতা খোলে, তারপর মোজা। অন্য দিনের মতো আজও আফসারউদ্দিনের দৃষ্টি পড়শীর বাড়ির ছাদে নতুন করে চুন-দেয়া সিঁড়িঘরে নিবদ্ধ হলেও তার সমগ্র সত্তা ব্যস্ত-সমস্ত চাকরটি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে থাকে। আবদুলের তেল জবজবে চুলে যত্ন করে কাটা সিঁতি। চট্‌পটে স্বল্পভাষী ছেলেটি নিত্যকার এই অনুষ্ঠানে অসাধারণ কিছু দেখতে পায় বলে মনে হয় না। বরঞ্চ যেমন নিপুণভাবে সে কাজটি সম্পন্ন করে তাতে মনে হয় কাজটি করে সে তৃপ্তি বোধ করে, হয়তো গৌরবও। 

এবার আফসারউদ্দিনের পায়ের পাশে কালো চামড়ার চটি রেখে জুতা-মোজা হাতে আবদুল ক্ষিপ্রগতিতে ভেতরে চলে যায়। আফসারউদ্দিন জানে, জুতাজোড়াটি তুলে রাখার আগে তাতে সে একবার বুরুশ দিবে, মোজাজোড়াটা আলগোছে শুঁকে দেখে পেছনের বারান্দায় ক্লিপ দিয়ে ঝুলিয়ে দেবে। রোজ মোজা বদলাবার মতো আর্থিক অবস্থা আফসারউদ্দিনের এখনো হয় নাই। 

দু-বছর আগে কেউ আফসারউদ্দিনের জুতা খুলত না। বস্তুত একটি মানুষের দিকে পা বাড়িয়ে দেবে এমন কথা তখন সে কল্পনাও করতে পারত না। তখন সে মেসবাড়ির হাওয়াবদ্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে বাস করত। তার ঘরের দেয়ালে আর্দ্রতাজাত মানচিত্রের মতো নকশাটি এখনো সে স্পষ্ট দেখতে পায়। এমন কি মনে হয়, হাত বাড়ালেই সে যেন দেয়ালটা ছুঁতে পারবে। তারপর নড়বড়ে চৌকিটা, ডালে তেলেপোকা, খিতথিতে ঠাণ্ডা ভাত, আনোনা তরকারি, পচা মাছ, ঘোলাটে গ্লাসে পানি—কিছুই তার বর্তমান খোলামেলা উজ্জ্বল জীবনে স্নান হয়ে যায় নাই। আমাশা রোগগ্রস্ত সঙ্গীটি আজ কোথায় সে জানে না। যে-জীবন আফসারউদ্দিন পশ্চাতে ফেলে এসেছে, হয়তো তার দৃঢ় আলিঙ্গনে এখনো সে আবদ্ধ। কিন্তু মেসবাড়ির জীবনের মতো আজ সে অদৃশ্য হয়ে গেলেও আফসারউদ্দিনের মন থেকে সে অদৃশ্য হয়ে যায় নাই। মেসঘরের দেয়ালের আর্দ্রতাজাত নকশাটির মতো তার মুখমণ্ডলের প্রতিটি রেখা, তার প্রতি ভাবভঙ্গি বা মুদ্রাদোষ নিয়ে সে মানুষটি তার মানসপটে প্রখর সুস্পষ্টতায় বিদ্যমান। যে-মানুষের সঙ্গে হয়তো সে আর কখনো একই ঘরে রাত্রিযাপন করবে না, সে মানুষ স্বভাবগত ক্ষুদ্র পদক্ষেপে এখনো তার পদানুসরণ করে চলেছে, আত্মীয়তা বন্ধুত্বের দাবি না করেও তার সঙ্গ সে ছাড়ে নাই। তবু মানুষটির যে একটি নিজস্ব অস্তিত্ব আছে তা নয়। সে মেসবাড়ির জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মাত্র। আসবাবপত্রের তুলনায় তার স্মৃতিটা যদি উজ্জ্বলতর মনে হয়, তার কারণ সে মানুষ, প্রাণহীন বস্তু নয়। 

আফসারউদ্দিন জানে, যে-জীবন সে ছেড়ে এসেছে, সে-জীবনের প্রতি তার কোনো মমতা নাই। থাকার কথা নয়। দারিদ্র্য-জর্জরিত সে-জীবনে লোভনীয় আদরণীয় কিছু নাই। তবু বিগত জীবন এখনো ঘনিষ্ঠ মনে হয়। হয়তো সে-জন্যেই দু-বছরব্যাপী প্রচেষ্টার পরেও সে তার নতুন জীবনকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারে নাই। তার আবরণই কেবল গ্রহণ করেছে, তার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় নাই। তার নকশা অবলম্বন করেছে, আইনকানুনও অম্লানবদনে মেনে চলছে, কিন্তু সে-জীবন তার রক্তে মাংসে এখনো বাসা বাঁধে নাই। সে যখন শান্তিতে ডেকচেয়ারে গা এলিয়ে দেয় তখন সে সত্যি শান্তিবোধ করে না; তখন সে তার বর্তমান জীবনের আচার-ব্যবহারের একটা নির্দেশই কেবল পালন করে 

তবু এ-সব কথা তাকে বিচলিত করে না। সে জানে জীবনের ধারা পরিবর্তন করা সহজসাধ্য নয়। তার বর্তমান জীবন সম্পর্কে সে যে তার সচেতনতা এখনো হারায় নাই, তাও বোধগম্য। কিন্তু একটি ব্যাপার তাকে গভীরভাবে বিচলিত করে। তার মনে হয়, তার যে-সুদিন এসেছে সে-সুদিন তার মনের গভীর কোন অঞ্চলে কেমন একটা ভয়-শঙ্কার সৃষ্টি করে। সে বোঝে না, তার যথার্থতাও দেখে না। এ-বিষয়ে তার সন্দেহ নাই যে, তার দারিদ্র্যের সত্যিই অবসান ঘটেছে। ভাগ্যবশে এবং যোগ্যতা-অধ্যবসায়ের সাহায্যে যে-জীবনে সে প্রবেশ করেছে সে-জীবন সমস্যা-উৎকণ্ঠা-উদ্বেগশূন্য না হলেও তাতে আর্থিক অভাব-অনটন দুঃখ-কষ্টের ছায়া নাই। তবে সে অস্ফুট ভয়-শঙ্কার কারণ কী? 

আফসারউদ্দিন লম্বা-চওড়া লোক। এবার সে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বারান্দায় দাঁড়িয়েই শার্ট—গেঞ্জি খোলে। নিদারুণ গ্রীষ্মের দিনে যেমন রোজ হয়, তার গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে একাকার 

—আবদুল। সে গম্ভীর ভারিক্কি গলায় ডাকে। এ-গলাও যেন তার নতুন জীবনের নকশামাফিক। 

ধূসর রঙের মোজাজোড়া ততক্ষণে বারান্দায় ঝোলানো হয়েছে। তাই আবদুল ছুটে আসে। আসবার সময় নিত্যকার মতো আলনা থেকে মোটা তোয়ালেটা নিয়ে আসে। সেটা দিয়ে এবার সে তার মনিবের দেহের নগ্ন উপরাংশ সজোরে ঘষতে থাকে। দেহের সে-অংশে অশেষ লোমরাশি। তাতে টান পড়লে মাঝে-মাঝে আফসারউদ্দিন নাক দিয়ে আওয়াজ করে। 

দেহ শুকালে সে চাকরের দিকে না তাকিয়ে প্রশ্ন করে, 

বিবি সাহেব উঠেছেন? 

জি না। 

আফসারউদ্দিন গোসলখানার দিকে রওনা হয়। বারান্দা অতিক্রম করবার সময় শূন্য আকাশে অকস্মাৎ মেঘের আবির্ভাবের মতো তার মনে একটা ছায়া জেগে ওঠে। তার মনে হয়, তার স্ত্রী হাসিনাই যেন তার সে অস্ফুট ভয়-শঙ্কা এবং তার বর্তমান জীবন সম্পর্কে সচেতনতার কারণ। দুই জীবনের মধ্যে যে-পুল, সে-পুলের মধ্যখানে হাত বাড়িয়ে পথরুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী। 

এমন কথা কখনো সে ভাবে নাই। তাই সে কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। 

.

আফসারউদ্দিনের শ্বশুর আরশাদ আলী এবং তাঁর মরহুম ওয়ালেদ আরবাব আলী উভয়ই উচ্চপদস্থ চাকুরে ছিলেন। অবশ্য চাকরির কথা তাঁদের জন্যে একটি বড় কথা নয়। তাঁদের বংশ পূর্ববঙ্গে সুপরিচিত খানদানি বংশ। সে খানদানি আবার অর্থসম্পদে পোস্তাবন্দি, যে-অর্থসম্পদ ইদানীং চা-বাগান কলকারখানায় টাকা খাটানোর ফলে বিশেষভাবে বৃদ্ধিলাভই করেছে। 

আরশাদ আলী সাহেবের কখনো আর্থিক দৈন্য না থাকলেও জীবনের বিশেষ ক্ষেত্রে তিনি সুখী হতে পারেন নাই। সে-ক্ষেত্র তাঁর পারিবারিক জীবন। তাঁর স্ত্রী মরিয়ম খানম নিজেরই খালাতো বোন; বঙ্গদেশে খানদানি মুসলমানদের মধ্যে পারিবারিক বিবাহটা অত্যন্ত সাধারণ। তাঁরা ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলেই হোক বা মরিয়ম খানমের মেজাজ অতিশয় রুক্ষ ধরনের বলেই হোক, তাদের মধ্যে কখনো বনিবনা হয় নাই। তাঁদের একমাত্র ছেলেটির মৃত্যু ঘটলে মরিয়ম সাহেবা আলাদা হয়ে গিয়ে তাঁর বাপের বাড়িতে বাস করতে লাগলেন। আরশাদ আলী তখনো চাকরিতে নিযুক্ত বলে তাঁর মফস্বল ভ্রমণ শেষ হয় নাই। তাসবাজি করে, কালোয়াতি গানের আসর বসিয়ে এবং শিকার-পিকনিক করেও যখন তাঁর জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটল না তখন তাঁর মরুভূমির মতো জীবনে একটা মরূদ্যান সৃষ্টির প্রয়াসে তিনি ছয় বছরের মেয়ে হাসিনাকে তাঁর কার্যস্থলে নিয়ে যান। বলাবাহুল্য, এ-বিষয়ে মরিয়ম খানমের মত পাওয়া সহজ হয় নাই; তাঁকে অনেক সাধ্য-সাধনা করতে হয়। 

ফিরতে পথে ট্রেনের নির্জন কামরায় বসে কতক্ষণ তিনি মেয়ের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকেন। তারপর একটা অকস্মাৎ উদ্বেলিত স্নেহে তাঁর চোখ ছলছল করে ওঠে। নিজেকে সংযত করে তিনি বলেন, 

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বসতে নাই। ইঞ্জিনের ছাই চোখে এসে পড়তে পারে। 

মেয়েটি নড়ে না; তাঁর কথা শোনে বলেও মনে হয় না। একটু অপেক্ষা করে সজোরে কেশে তিনি বলেন, 

এখানে আয়। ইঙ্গিতে তাঁর পাশে একটি স্থান তিনি দেখান। 

মেয়েটি জানালায় থুতনি রেখে তেমনি বসে থাকে, নড়ে না, উত্তর দেয় না। তবে তিনি লক্ষ্য করেন, ছয় বছরের মেয়েটির চোখে কেমন একটা ভাব যেন। একটু উদ্ধত ভাব, কিসের ধারও তাতে। 

আরশাদ আলী এবার একটা বই খুলে পড়তে শুরু করেন। হাসিনা জানালাতে মুখ রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে। 

হাসিনা তাঁর সঙ্গে বেশিদিন থাকে নাই। আরশাদ আলী ভেবেছিলেন, পাথুরে পাহাড়ে দণ্ডায়মান বৃক্ষ যেমন পাকে-প্রকারে রসগ্রহণ করে, তেমনি তিনিও তার শূন্য জীবন হতে একটু স্নেহরস আদায় করবেন। তাঁর সে-বাসনা পূর্ণ হয় না। ক-দিন যেতেই তিনি বুঝলেন, মেয়েটির মধ্যে তার মায়ের রক্ত যেন। একটুতে সে রেগে খুন হয়ে যায়, একটা গোঁ ধরলে কারো সাধ্য নাই সে গোঁ ছাড়ায়। চাকরানি-আয়া হদ্দ হয়ে যায়, তিনিও যে তাকে শাসন করতে বিশেষ সক্ষম তা নয়। তারপর একদিন একটি অব্যক্তব্য কারণে হাসিনা সকাল থেকে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে উৎকট কান্না শুরু করে। সন্ত্রস্ত হয়ে আয়া তাঁকে আপিসে খবর দেয়। তিনি ছুটে আসেন, অসুখ-বিসুখ হয়েছে ভয় করে ডাক্তার ডাকেন, রূপকথার বাদশাহের মতো মেয়েকে সমগ্র রাজ্য প্রতিজ্ঞা করেন, কিন্তু কিছুতেই হাসিনার কান্না ধরে না। গভীর রাত পর্যন্ত সে থেকে-থেকে কাঁদতেই থাকে। 

পরদিনই মেয়েকে নিয়ে ট্রেন ধরেন। গন্তব্যস্থলে পৌঁছলে তাঁর স্ত্রী মরিয়ম খানমের মুখে বিজয়িনীর ধারালো হাসি জেগে ওঠে। সে-হাসি উপেক্ষা করে আরশাদ আলী বলেন, 

আমার অনেক কাজ। হাসিনাকে দেখার সময় হয় না। 

মরিয়ম খানম একটা অবিশ্বাসের আওয়াজ করেন। তারপর ক্ষিপ্রগতিতে মাথায় কাপড় তুলে মেয়েকে প্রশ্ন করেন, 

এত রোগা হয়েছিস্ কেন? তোর বাপ তোকে খেতে দেয় নি? 

আরশাদ মেয়ের উত্তরের জন্যে সামান্য উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করেন। আশা করেন, মেয়েটি তাঁর অশেষ আদর-যত্নের কথা বলবে। কিন্তু এ-সময়ে কী একটা কথা তার মনে পড়ায় সে হঠাৎ একটা নাচন দিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। হয়তো প্রশ্নটির উত্তর দিতে চায় না সে। 

একটু নীরব থেকে আরশাদ আলী নিম্ন গলায় বলেন, 

মায়ের মেজাজ পেয়েছে মেয়ে। 

সব মায়েরই দোষ। বলে মরিয়ম খানম আবার ঘোমটা টানেন। দোষ যারই হোক, আশা করি বড় হলে তার স্বভাব বদলাবে। 

মরিয়ম খানম অত্যাশ্চর্য ধৈর্যের পরিচয় দেন। অনুত্তেজিত কণ্ঠে কেবল বলেন, আপনার ট্রেন কটায়? 

স্বামী সহসা উত্তর দেন না। মনে হয় তাঁর মুখে একটা ছায়া নাবে। তারপর ঈষৎ চমকে উঠে বলেন, 

সাড়ে পাঁচটায়। 

তবে চায়ের কথা বলি। 

ফিরতি ট্রেনের সময়-যে বেশি দূর নয়, তা দু-জনের কাছেই নিঃসন্দেহে সুখবর বলে মনে হয়। 

হাসিনা মায়ের কাছে থেকেই বড় হয়। সে দীর্ঘ স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী যুবতীতে রূপান্তরিত হয়। তবে তার স্বভাবের উগ্রতা-রুক্ষতা কমে না, নব-যৌবনের লাবণ্য-কোমলতাও একটি উদ্ধত ভাবে ঢাকা পড়ে থাকে। ততদিনে আরশাদ আলী পেনশন নিয়ে দেশের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেছেন। এ-সময়ে তাঁর স্ত্রী মরিয়ম খানমের মধ্যেও একটা পরিবর্তন দেখা দেয়। সারাজীবন যে-সংগ্রামে তিনি লিপ্ত ছিলেন তা হয়তো অকস্মাৎ অর্থহীন মনে হয় বলেই তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। তবে তাঁদের মধ্যে এবার যে একটা স্বচ্ছন্দ অনাবিল দাম্পত্যজীবন প্রবাহিত হতে থাকে, তা নয়। একত্রে বসবাস করেও তাঁরা কেমন আলাদা হয়ে থাকেন। সংঘর্ষের হেতু যেমন তাঁরা দেখতে পান না, তেমনি মিলনের প্রয়োজনও তাঁরা বোধ করেন না। একই বাড়িতে থেকে কীভাবে পরস্পরকে এড়ানো যায় বা কীভাবে পরস্পরের প্রতি উদাসীন হয়ে থাকা যায় সে-কলাকৌশল ততদিনে তাঁরা দু-জনেই রপ্ত করেছেন। তাঁদের শোবার ঘর যে আলাদা, শুধু তাই নয়। আরশাদ আলী দিনের অধিকাংশ সময় আপন ঘরে বা প্রশস্ত বারান্দায় হুঁকার নল হাতে আপন ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে থাকেন; অভ্যন্তরে মরিয়ম খানমও তাঁর নিজস্ব জীবনে ডুবে থাকেন। 

অবসর জীবনের এই অলস, সময়বহুল দিনে আরশাদ আলীর মনে অর্থশালী খানদানি বংশের প্রতি বিতৃষ্ণা, অবজ্ঞা এবং অনাস্থার সৃষ্টি হয়। তিনি ভাবেন, জীবন থেকে তিনি কোনোই তৃপ্তি লাভ করেন নাই; জীবন তাঁকে শূন্যপাত্রই ফিরিয়ে দিয়েছে। তার জন্যে তিনি তাঁর পরিবারকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করান। তাঁর এই দৃঢ়বিশ্বাস হয় যে, যাদের জীবনসংগ্রামের কোনো অভিজ্ঞতা নাই, প্রভূত অর্থসম্পদ আয়েশ-বিলাসের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা অন্তঃসারশূন্য। যারা মনুষ্যত্ব-বিবর্জিত, জীবনের সুধাপান করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। 

এ-সময়ে নানা খানদান পরিবার থেকে হাসিনার শাদির প্রস্তাব আসতে থাকে। তাঁর পরিবার সম্বন্ধে নতুন ধারণায় বদ্ধমূল হয়ে সে-প্রস্তাবে কান না দিয়ে আরশাদ আলী অন্য কোথাও হাসিনার জন্য দুলা খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে তিনি একদিন আফসারউদ্দিনকে আবিষ্কার করেন। তৎক্ষণাৎ তাঁর মনে হয়, তিনি যেন একটি অমূল্য রত্ন খুঁজে পেয়েছেন। ছেলে দেখতে শুনতে ভালো, ভালো চাকরিও করে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, জীবনযুদ্ধে একাই লড়াই করে সে বড় হয়েছে, শত বাধাবিপত্তি ঠেলে সে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। জীবনের মর্ম যদি কেউ বুঝে থাকে, তা এমন মানুষই বোঝে এবং তাদের সামনেই জীবন তার গুপ্তদ্বার উন্মুক্ত করে। অনতিবিলম্বে তিনি স্থির করেন, আফসারউদ্দিনের হাতেই হাসিনাকে সমর্পণ করবেন। বলাবাহুল্য, মরিয়ম খানম এ-বিয়েতে তাঁর মত দেন নাই। তবে তিনি যতই বিরোধিতা করেন ততই আরশাদ আলীর সংকল্প বজ্রকঠিন হয়। বিরোধিতা বাকবিতণ্ডে হয়রান হয়ে মরিয়ম খানম অবশেষে নীরব হলে তাঁর নীরবতাকে সম্মতি বলে গ্রহণ করে আরশাদ আলী শীঘ্র তার সংকল্পকে কার্যে রূপান্তরিত করেন। 

বিয়ের দু-দিন পরে আরশাদ আলী নতুন জামাইকে ডেকে পাঠান। আতরের সুগন্ধ ছড়িয়ে যুবক তাঁর পাশে একটি চেয়ারে বসলে তিনি অনেকক্ষণ নীরব হয়ে থাকেন। মনে হয়, যে-কথা তিনি বলবার জন্যে তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তার বলার অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সবটা বলা সম্ভব নয়। কী বলবেন তিনি? 

অবশেষে গলা সাফ করে তিনি বললেন, 

হাসিনার সম্বন্ধে একটা কথা তোমাকে বলা কর্তব্য। 

ঔৎসুক্য না দেখিয়ে ধীর-স্থির দৃষ্টিতে নতুন জামাই শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে থাকে। 

আমার মেয়েটি আদরের মধ্যে বড় হয়েছে। স্নেহ-মমতা বা অর্থের কোনোই অভাব সে কখনো বোধ করে নাই। তাই জীবন সম্বন্ধে তার কোনো ধারণা নাই। সে-কথাটা মনে রেখো। 

নতুন জামাই চলে গেলে আরশাদ আলী ভাবেন, তিনি পৈতৃক কর্তব্য সম্পূর্ণ করেছেন। তিনি অসীম তৃপ্তি বোধ করেন। জামাইকে যা তিনি বলেছেন তা অতিশয় সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁর সন্দেহ থাকে না যে, তার মর্ম আফসারউদ্দিন বুঝবে।

.

বাইরে সান্ধ্য হাওয়া জেগেছে। পেছনের বারান্দায় দড়িতে ধূসর রঙের মোজাজোড়া সে হাওয়ায় দোলে। গোসলের পর হাওয়াটি অতি স্নিগ্ধ মধুর মনে হয়। নিমীলিত চোখে ডেকচেয়ারে হেলান দিয়ে, বসে আফসারউদ্দিন ভাবে। 

হাসিনাকে ভালোবাসতে তার সময় লাগে নাই। বরঞ্চ কেমন ঝড়ের মতোই সে-ভালোবাসাটা জাগে। জাগে কিছুটা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে, কিছুটা তার অন্তরের প্রেমক্ষুধাতুর গভীর হাহাকারের মধ্যে দিয়ে। তার মনে হয়, সে যেন অকস্মাৎ একটি বিস্ময়কর সুন্দর জগৎ আবিষ্কার করেছে। তবে প্রথম ভাবোচ্ছ্বাসটা কাটলে আফসারউদ্দিন ক্রমশ একটি বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, যে-ভাবোচ্ছ্বাসটা পৃথিবীগ্রাসী মনে হয়েছিল, আসলে তা তারই মধ্যে সীমাবদ্ধ। শুধু তাই নয়। সে-ভাবোচ্ছ্বাস কেমন একটা শীতল উঠানে সশব্দে আছড়ে পড়ে যেন। কোনো প্রতিধ্বনি জাগে-তো তা তার কণ্ঠেরই প্রতিধ্বনি। হাসিনা উদাসীন, কেমন শক্ত শীতলও। গভীরভাবে লজ্জিত হয়ে আফসারউদ্দিন নিজেকে সংযত করে। তারপর থেকে সে-সংযম তাদের মধ্যে একটি প্রাচীরেই পরিণত হয়। 

বারান্দায় ছায়া অগ্রসর হতে শুরু করেছে। সামনের মাঠে সূর্যের ম্লান আলো; ঘাসের রং গাঢ় হয়ে উঠেছে। আফসারউদ্দিন একটি সিগারেট ধরায়। তারপর ডাকে, 

আবদুল। 

আবদুল যেন দেয়ালের মধ্যে মিলিয়ে ছিল; তাকে কেবল দৃশ্যমান হতে হয়।

বিবি সাহেব ওঠেন নাই? 

চাকরটি উত্তর না দিলে সে বুঝতে পারে, হাসিনার ঘুম এখনো ভাঙে নাই। 

আফসারউদ্দিন ঘন-ঘন কয়েক বার সিগারেট টানে। তারপর অন্তরের কোথাও ক্রোধের উষ্ণতা বোধ করে। 

একটু পরে সে উঠে দাঁড়ায়। সশব্দে বারান্দা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করে। হয়তো আশা করে যে তার পায়ের শব্দেই হাসিনা জেগে উঠবে, তাকে তুলতে হবে না। খাটের সামনে পৌঁছে একটু ইতস্তত করে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। হাসিনার চুল বালিশে-বিছানায় ছড়িয়ে আছে; গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তার মুখের তৃতীয়াংশ বালিশে ডুবে আছে। যে-অংশটি দেখা যায়, সে-অংশে তার স্বাভাবিক উগ্রতাটি চোখে পড়ে না। শুরুতে বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে হাসিনার উগ্রতার বিষয়ে সে কেমন একটা গর্বই বোধ করত। 

হাসিনাকে ডাকতে হয়। 

কত ঘুমাবে? সন্ধ্যা উতরে গেল। চা খাবে না? 

প্রথমে হাসিনার মধ্যে কোনো সাড়া দেখা যায় না। কিন্তু একটু পরে তার চোখে যেন একটু কম্পন জাগে। পরমুহূর্তে হঠাৎ সোজা হয়ে ওপরের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে চোখ খোলে। আফসারউদ্দিন আশা করে, হাসিনা একবার তার দিকে তাকাবে। কিন্তু তার দৃষ্টি তুলে রাখা মশারির ওপরই নিবদ্ধ থাকে। তার চোখে একটু অসন্তুষ্টির ভাব। 

কেবল রাতদিন ঘুমাও। কথাটি বলে বিরক্তির শব্দ করে পূর্ববৎ সশব্দে আফসারউদ্দিন বেরিয়ে যায়। বারান্দায় পৌঁছে হেঁকে বলে, 

চা দাও। 

অদৃশ্য আবদুল চা আনতে যায়। 

চা-পানের সময় আড়চোখে একবার হাসিনার ভাবভঙ্গি দেখে আফসারউদ্দিন সকালের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে মনোনিবেশ করে। চা-পান শেষ হলে ভেতরে গিয়ে মোকাসিন জুতা পরে নেয়। বারান্দায় আবার বেরিয়ে হাসিনার দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করে, 

ক্লাবে যাবে? 

না। শরীরটা কেমন মেজ মেজ করছে। 

অত ঘুমালে করবে না? 

হাসিনা উত্তর দেয় না। আফসারউদ্দিন অবশ্য কোনো উত্তর আশা করে নাই। এবার সে একাকী ক্লাবের দিকে রওনা হয়। 

মফস্বল শহরের ক্লাব; সেখানে তাসের চেয়ে আড্ডাই বেশি জমে। আজ আফসারউদ্দিন কথা বলার কোনো ইচ্ছা বোধ করে না বলে তিন জন তাসবাজি সভ্য পেয়ে খুশিই হয়। বাইরে কেমন মেঘ করে উঠেছে। সে ভাবে, তাসটা আজ জমবে। মাসের শুরু বলে পকেটে টাকার থলেটাও মন্দ ভারি নয়। 

ক্বচিৎ-কখনো আফসারউদ্দিন একাকী তাস খেলে বটে তবে বেশি রাত করে না। আজ তার ব্যতিক্রম হয়। আজ তাসে তার নেশা ধরে। এক সময় উঠবে বলে মনস্থির করলেও শেষ পর্যন্ত ওঠা হয় না, কারণ আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নাবে। যখন বৃষ্টি ধরে, তখন তারা নতুন রাবারে মশগুল। 

অনেক রাতে খেলা শেষ করে অন্ধকারাচ্ছন্ন কর্দমাক্ত পিচ্ছিল পথে টর্চের আলো ফেলে আফসারউদ্দিন অবশেষে যখন ঘরমুখো হয়, তখন সহসা একটি প্রশ্ন তার মনে জাগে। সে কি এত রাত পর্যন্ত খেলার নেশাতেই এমন মত্ত হয়ে ছিল। 

প্রশ্নটি ঘাঁটিয়ে দেখবার সাহস হয় না বলে তার উত্তর সে পায় না। পিচ্ছিল পথে সে মনোনিবেশ করে। 

ক্লাবে দুই দফা চা-কাটলেট হয়েছে। তাই অন্ধকারের মধ্যে থেকে ছায়ার মতো আবদুল দেখা দিলেও সে না খেয়ে কাপড় বদলে সন্তর্পণে মশারি তুলে বিছানায় প্রবেশ করে। ঘরের কোণে মৃদুভাবে একটি লণ্ঠন জ্বলে। তার স্তিমিত আলোয় সে একবার হাসিনার দিকে তাকায়। তার মুখ সে দেখতে পায় না। কিন্তু অন্যদিনের মতো তার চুল আজ বালিশ-বিছানায় ছড়িয়ে নাই। মনে হয় সে যেন ঘুমিয়ে নাই। ঘুমিয়ে থাকলেও সবেমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। সে কি আফসারউদ্দিনের জন্যে অপেক্ষা করছিল? অবশ্য প্রশ্নটি মনে জাগতেই সে বোঝে, তা সত্য হতে পারে না। তবু একটা আশা তার মনের প্রান্তে ভাসা-ভাসাভাবে জেগে থাকে। 

আশাটা ভেঙে চুরমার হতে বেশি দেরি হয় না। শীঘ্র নীরব ঘরে হাসিনার কণ্ঠ শোনা যায়। তার মুখ থেকে যে-শব্দগুলি বের হয়, সে-শব্দগুলি পাথরের মতো ভারি, পাথরের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ। সে বলে, 

আমার ঘুম নিয়ে কথা বলেন তা আমার ভালো লাগে না। 

আফসারউদ্দিন সহসা উত্তর দেয় না। প্রথমে সে মনের নীরবতার মধ্যে অস্পষ্ট আশাটি কাচের পাত্রের মতো ভেঙে পড়তে শোনে, তারপর হয়তো এক খণ্ড কাচের ধারালো অংশে খোঁচা লাগলে সে একটু আহতও হয়। একটু পরে সে বলে, 

কেন বলি, তা তুমি জান 

হাসিনা এবার কোনো উত্তর দেয় না। আফসারউদ্দিন বোঝে, সে যে-উক্তিটা করে তার মর্ম হাসিনা ভালো করে বোঝে বলেই নীরব হয়ে থাকা সে সমীচীন মনে করে। বস্তুত, হাসিনা এসব কথার ফাঁকে কখনো ধরা পড়তে চায় না। কলহের অবকাশ নাই তাদের এই নিরলম্ব দাম্পত্যজীবনে। 

হাসিনা উত্তর দেবে না জেনেও আফসারউদ্দিন অপেক্ষা করে। নীরবতা অখণ্ড থাকলে তার অন্তরে একটা ক্রোধের সঞ্চার হয়। পাশে সামান্য শব্দ হয়, হাসিনার হাতের চুড়িতে ঝঙ্কার ওঠে। তার দিকে না তাকিয়েও আফসারউদ্দিন বুঝতে পারে, হাসিনা একটু নড়েচড়ে একটা আরামদায়ক অবস্থান আবিষ্কার করে নিদ্রার জন্যে তৈরি হচ্ছে। নিঃসন্দেহে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে নিদ্রাভিভূত হয়ে পড়বে। তার মনে ক্রোধ জাগলেও সে-ক্রোধ তার ঘুমের পথে বাধা সৃষ্টি করে না। সে-ক্রোধের পশ্চাতে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা মান অভিমান নাই। তাই তার নিদ্রা সম্পর্কে আফসারউদ্দিনের উক্তিটি তার মনে ক্রোধের সৃষ্টি করলেও সংকোচ আনে না। 

অকস্মাৎ আফসারউদ্দিন মনস্থির করে, হাসিনা ঘুমিয়ে পড়ার আগেই আজ তাকে কিছু কথা মন খুলে বলবে। কতদিন আর তাদের দাম্পত্যজীবনের এই প্রহসন চলবে? 

এক সময়ে আফসারউদ্দিন বিশ্বাস করত, সম্পূর্ণভাবে অপরিচিত নরনারীর মধ্যে বিয়ের পর একটু প্রেমভালোবাসার সঞ্চার না হওয়াটা প্রকৃতির রীতিবিরুদ্ধ। আজ তার সে-বিশ্বাস আর অবিচল নয়। তার প্রতি যে হাসিনার মনে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার উদয় হবে, সে-আশা নেহাতই ক্ষীণ হয়ে উঠেছে। তার ভাবাবেগ হাসিনার মনে কোনো রেখাপাত করে নাই; ভবিষ্যতে যে করবে সে-কথায় আর ভরসা পায় না। আফসারউদ্দিনের মনেও হাসিনার প্রতি ভাবাবেগে ভাটি পড়েছে, তার স্নেহ-মমতার উৎস কেমন শুকিয়ে উঠেছে। হয়তো শীঘ্র এমন একদিন আসবে যখন সে-উৎস সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে যাবে। তখন সে-শুষ্কস্থানে ঘৃণা-বিদ্বেষই কি জন্মাবে না? 

বিয়ের পর আফসারউদ্দিন অনেক কিছু আশা করেছিল। যতটা আশা করেছিল ততটা যুক্তিসঙ্গত নয় তা সে নিজেই বোঝে। সে-আশায় রঙিন কল্পনার বিন্যাস ছিল। বস্তুত সে জানে যে, আসল দাম্পত্যজীবন নাটক-নভেল নয়; সে-জীবন কেবল ভাবপ্রবণতার ওপরে গড়া যায় না। আদর্শ দাম্পত্যপ্রেম অতিশয় গুরুতর ব্যাপার। সেখানে রঙ্গরস বা প্রকাশ্য ভাবোচ্ছ্বাসের স্থান-তো নাই-ই, সে-সব সত্যিকার দাম্পত্যপ্রেমের মর্যাদা হানিও করে। কিন্তু তাদের দাম্পত্যজীবনে না এসেছে একটু রঙ্গরসের ছিটাফোঁটা, না পড়েছে প্রেমের বন্ধনগ্ৰন্থি তাদের এ-দাম্পত্যজীবনের অভ্যন্তরে কিছু নাই। সেখানে ক্ষুদ্রতম বীজও পড়ে নাই যে কেউ এ-আশা পোষণ করতে পারে একদিন সে-বীজ ফুল-ফলে সমৃদ্ধ ছায়াশীতল বৃক্ষে রূপান্তরিত হবে। 

এ-সব কথা আফসারউদ্দিনের মনে ক্রমশ একটি গভীর নিরাশার সৃষ্টি করে। তবে যে-কথা তাকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করে সে কথা এই : কেন তার প্রতি হাসিনার মনে সামান্য স্নেহ-মমতার আভাসও দেখা দেয় নাই? এ প্রশ্নের কোনো বোধগম্য উত্তর সে খুঁজে পায় না। তবে একটা সন্দেহ জাগে কেবল। বিয়ের প্রাক্কালে একটা খবর আকারে-ইঙ্গিতে শুনলেও তা তার কানে পৌঁছেছিল। সে খবরটি এই যে, তাদের বিয়েতে আরশাদ আলী সাহেব ব্যতীত আর কারো মত ছিল না। এ-ব্যাপারে হাসিনার কী মত তা জানবার প্রয়োজন বাকবিতণ্ডা-বুদ্ধিযুদ্ধে লিপ্ত পরিবার বোধ করে নাই। তবু হাসিনার নিশ্চয় একটা মত ছিল। বিরুদ্ধদলের শীর্ষে ছিলেন মরিয়ম খানম। তাঁরই হাতে হাসিনার শিক্ষাদীক্ষা, তাঁরই ঘরে সে প্রতিপালিত। অতএব মেয়ে যদি মায়েরই মত পোষণ করে থাকে তাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। তার মতটি সে যদি গোপন রাখে তার কারণ এই যে, মায়ের অমতে বিয়েটা ঘটতে পারে তা সে ভাবতে পারে নাই। অসম্ভবটাই অপ্রত্যাশিতভাবে সত্যে পরিণত হলে শেষ মুহূর্তে তার বিরোধিতায় কোনো লাভ হবে না বুঝে সে হয়তো নীরব থাকা যুক্তিসঙ্গত মনে করে। তবে সে-মত এখন তার প্রেমশূন্যতায় প্রকাশ পাচ্ছে। মুখ ফুটে কিছু না বললেও আজ সে এ-কথা জানতে চায়, মরিয়ম খানমের মেয়েরও এ-বিয়েতে মত ছিল না। 

আরশাদ আলীর বিপক্ষদলের কেন এ-বিয়েতে মত ছিল না সে-কথাও আফসারউদ্দিন ভাসা-ভাসা শুনতে পেয়েছিল। যা শোনে নাই তা কল্পনা করে নিতে তার অসুবিধা হয় নাই। বিপক্ষদলের আপত্তির কারণ ছিল আফসারউদ্দিনের দারিদ্র্য-জর্জরিত অতি সাধারণ পারিবারিক পটভূমি। সে যে কঠোর জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে সে পটভূমিকে পশ্চাতে ফেলে আসতে সক্ষম হয়েছে, তাতে তাদের আভিজাত্য-সচেতন মন গলে নাই। 

তার পূর্বপরিচয়ই কি হাসিনার প্রেমহীনতার কারণ? 

আরেকটি কথাও অন্যান্য খবরের মতো অস্পষ্টভাবেই আফসারউদ্দিন শুনতে পেয়েছিল। তা আরশাদ আলী মরিয়ম খানের অসুখী দাম্পত্যজীবনের কথা; তাঁদের দাম্পত্য কলহের বা আজীবন মনোমালিন্যের কারণ সে জানে না। তবে কখনো-কখনো তার মনে হয়, যে-দ্বন্দ্ব তাঁদের জীবনকে বিষাক্ত করেছিল, তার ছায়া তাদের জীবনেও যেন প্রতিফলিত হয়েছে। হাসিনা কি তার মায়ের দ্বন্দ্বই বহন করে চলেছে? 

হয়তো এ-সব আফসারউদ্দিনের খেয়াল মাত্র। হয়তো হাসিনার অক্ষমতার কারণ একটি অতি সোজা উত্তরের মধ্যেই পাওয়া যাবে। এমনই তার মানসিক গঠন যে তার পক্ষে কাউকে ভালোবাসা সম্ভব নয়। যে-পরিবারে সে মানুষ হয়েছে সে-পরিবারে কেউ কাউকে ভালোবাসতে শেখায় না, ভালোবাসার প্রয়োজনও কেউ বোধ করে না। হাসিনা হয়তো দাম্পত্যজীবনকে অন্যান্য সামাজিক প্রথার মতোই দেখে; সে-জীবন যে স্নেহ-ভালোবাসা আশা-আকাঙ্ক্ষার সূত্রে বাঁধা দুটি মানুষের যুগ্ম জীবন, তা সে জানে না। ভালোবাসার প্রয়োজন কি সত্যিই আছে? কলহ-বিবাদশূন্য দাম্পত্যজীবনই কি মানুষের পক্ষে যথেষ্ট নয়। আফসারউদ্দিন এ-বিষয়ে কী করে নিশ্চিত হতে পারে যে, স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার জন্যে সে-যে অদম্য তীক্ষ্ণ ক্ষুধা বোধ করে সে-ক্ষুধা স্বাভাবিক নয়? হয়তো অধিকাংশ মানুষ কখনো সে–ক্ষুধা বোধ করে না, দাম্পত্যজীবনে প্রেম-ভালোবাসার প্রয়োজনও কখনো দেখে না। এমন মানুষ সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে, যশ মান অর্থও অর্জন করে। 

আফসারউদ্দিন পিঠে শুয়ে স্থির হয়ে থাকে। সে অনুভব করে, তার পিঠ ঘামে ভিজে সারা। কিন্তু সে নড়ে না। মনে হয়, একটু নড়লে যেন ইট-পাথরের স্তূপের মতো তার ভাবনাচিন্তা সশব্দে ছড়িয়ে পড়বে। গভীর নীরবতার মধ্যে রাত অগ্রসর হয়। কিন্তু তার মনে হয়, রাত্রির কালো মসৃণ মুহূর্তগুলি কেমন তার ভেতরটা কাঁটার মতো বিদ্ধ করে যাচ্ছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রাত্রিও সজারুর মতো সুচ খুলে আছে। একটু পরে খোলা জানালা দিয়ে হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে মশারি দুলিয়ে যায়, তার কিছু সিক্তশীতলতা ভেতরেও প্রবেশ করে। 

এ-ক্ষণিক চঞ্চলতার মধ্যে আফসারউদ্দিন একবার মুখ ফিরিয়ে হাসিনার দিকে তাকায়। তার চুলে এখনো শৃঙ্খলতা আসে নাই বটে কিন্তু কোমরের কাছে ঝুলে থাকা হাতটি কেমন অবশ মনে হয়। সে বুঝতে পারে, যে-সব কথা তাকে বলবে বলে মনস্থির করেছিল, তা আর আজ বলা হবে না। 

তাতে তার কিন্তু দুঃখ হয় না। কারণ সে বুঝতে পারে যে, সে-সব কথা বলা সহজ নয়। বলতে গেলে তার অন্তরটাকে সম্পূর্ণভাবে উলঙ্গ করতে হবে তাকে। তেমনভাবে মনকে উলঙ্গ করার সাহস তার আর নাই যেন। যে-মানুষ এত কাছে শুয়েও এত দূরে, সে মানুষকে সে কী করে তার অন্তর দেখায়? যে-মানুষ তার প্রতি এমন গভীরভাবে উদাসীন, তাকে কী করে তার মনের ক্ষুধার কথা বলে, কী করেই-বা বলে তার ভয়-শঙ্কার কথা। 

তাছাড়া তার ক্ষুধার বা তার ভয়-শঙ্কার অর্থও যেন সে নিজেই আর বোঝে না। বুঝতে হলে স্নেহ-মমতা-সমবেদনার প্রয়োজন আছে। 

তারপর এক সময়ে কালো রাত্রির অন্ধকার তার অন্তরে প্রবেশ করে, জাগ্রতের সচেতনতা স্বপ্নের সঙ্গে মিশে যায়। বিছানার উষ্ণতা, পিঠের তলে ঘাম, ঘরের হাওয়াশূন্যতা সে অনুভব করে, তবু মনে স্বপ্নের বিচরণ শুরু হয়। বাস্তব যখন অবাস্তবে মিলিয়ে যায়, তখন মনের গুপ্ত হাহাকারও নির্বাধায় নিরাবরণে চলাচল শুরু করে। সে-মুহূর্তকে তার বড় ভয়, তবু তাকে এড়াতে সে পারে না। সে কি ঘুমিয়ে? সে-কথা সে জানে না। সারা দেহ অবশ হয়ে থাকে। তবু চিন্তাস্রোতে মনের দুই কূল ভেসে যায়, সমস্ত সংযম ভেঙে পাশে শায়িতা হাসিনাকে আর দেখতে পায় না বটে, তবু হাসিনা তারই চতুর্দিকে ছড়িয়ে যেন। তার কালো চুলরাশি, তার লাবণ্যময় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, দীর্ঘকায়া সৌন্দর্য, তার দুর্লভ ক্ষীণ মাধুর্যময় হাসি—সবই সে একই সময় দেখতে পায়, অনুভব করতে সক্ষম হয়। হাসিনা তার দিকে বিশেষভাবে না তাকালে ও তার দৃষ্টি পাথরের মতো নিষ্প্রাণ নিরাসক্ত নয়। তারপর কালো রাত্রির বন্যা আরো দুর্বার হয়ে ওঠে, তার অশ্রান্ত প্রবাহ মুখর হয়ে ওঠে সহস্র ভাষায়, তারপর সে-বন্যা মাদকতা আনে, ক্ষমাও আনে। বন্যা অবশেষে নিঃশেষ হলে কেবল একটি সজল ক্ষমাই ভেসে থাকে আফসারউদ্দিনের বিহ্বল মনে। ক্ষমা ছাড়া মানুষের পক্ষে কি বাঁচা সম্ভব? 

শীঘ্র আফসারউদ্দিনের একটি হাত নক্ষত্রের মতো ছিটকে পড়ে, তারপর সে হাত অধীরভাবে আরেকটি হাতের সন্ধান করে। কালো রাত্রির বন্যা থেমেছে কিন্তু মনের নির্মুক্ত হাহাকার অদম্যভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। এখনো সে হাসিনাকে দেখতে পায়। হাসিনার চোখে নতুন দৃষ্টি। সে-চোখে আর বিদ্রূপ নাই। আফসারউদ্দিনের মনে যে-ক্ষুধা, সে-ক্ষুধার প্রতি আর বিদ্রূপ পাই। যে-অন্ধকারে কালো রাত্রির জন্ম হয়, যেখানে তার দুর্বার বন্যার সৃষ্টি হয়, —ক্ষুধাটির জন্ম হয় বলে কেউ তাকে বিদ্রূপ করতে পারে না। তাছাড়া, হাসিনার চোখেও ক্ষমা। ক্ষমা ছাড়া মানুষ কী করে বাঁচে? হাসিনার চুলের স্নিগ্ধ-মধুর গন্ধে তার নাসারন্ধ্র ভরে যায়। দুর্দান্ত হাওয়ায় চুলরাশি ওড়ে তার শিশুর মতো মুখের চতুর্দিকে। তার মুখেও নির্মল সৌরভ। দূরে শত সহস্র তারা ঝকঝক করে। আফসারউদ্দিনের কঠোর জীবনযুদ্ধ, তার প্রশংসনীয় অধ্যবসায়, তার দুঃখকষ্ট অকথ্য শ্রম-ক্লান্তি, এবং অবশেষে তার কৃতিত্বময় জয়-সাফল্য—কিছুই অর্থহীন নয়। সে-সব মরীচিকার মতো শুষ্ক মরুভূমিতে অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয় নাই। তার ভয়-শঙ্কার কারণ নেহাতই ভিত্তিহীন। 

কালো রাত্রি আবার বন্যা হয়ে আসে। কিন্তু এবার সে বন্যা ঝরনার মধুর কলতানের মতো শোনায়, অশ্রুর মতো স্নিগ্ধ সজল মনে হয়। হাসিনা জানে, সার্থকতার চেয়েও যা মানুষ প্রাণপণে কামনা করে, তা বাঁচবার পথ। মানুষ বাঁচতে চায় কেবল। সে বড় নিঃসঙ্গ এবং নিঃসঙ্গতায় মানুষ বাঁচতে পারে না। অদম্য আশা নিয়ে মানুষ যে-নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, সে-সংগ্রামে পরাজিত হলে তারপর তার আর কিছু থাকে না। যখন সে ভাবে পার্থিব বিষয়-সম্পত্তি অবস্থান–প্রতিপত্তির জন্যে সে সংগ্রাম করছে, তখন বস্তুত তার উদ্দেশ্য কেবল পথহীন সীমাহীন নিঃসঙ্গতার হাত হতে মুক্তি পাওয়া। হাসিনার সুন্দর মুখ সহস্র তারার মতো ঝকমক করে। সে-মুখের দিকে তাকাতে আর সঙ্কোচ হয় না আফসারউদ্দিনের। 

তারপর গভীর অন্ধকার থেকে একটা কণ্ঠ জাগে। প্রথমে আফসারউদ্দিন কিছু চমকিত হয়। সে চোখ খুলে মশারির ওপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। সেখানে জাল নেই বলে অস্বচ্ছ কাপড়ে তার দৃষ্টি থেমে যায়। ঘরে হাওয়া নাই। গভীর রাত পূর্ববৎ স্তব্ধ হয়ে আছে। কেবল দূরে কোথাও একটা রাতপাখি বিষণ্নকণ্ঠে ডাকে। সে বুঝতে পারে, তার চোখে নিদ্রার লেশমাত্র নাই, তার মনটাও একটা অকস্মাৎ আঘাতে সম্পূর্ণভাবে সজাগ হয়ে উঠেছে। 

ততক্ষণে হাসিনা আবার পাশ ফিরে শুয়েছে। সে-যে বিছানা ত্যাগ করে নাই, সেইটাই আশ্চর্য মনে হয়। গ্রীষ্মরাতের উষ্ণতা সম্পর্কে রুক্ষ কণ্ঠে মন্তব্য করে ঝট্‌কা দিয়ে সে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল। তার রাতের বুকে যে-অদৃশ্য ঢেউ জেগেছিল, সে-ঢেউ এখনো যেন মিলিয়ে যায় নাই। 

বড় গরম বৈকি। আপন মনেই হাসিনার মন্তব্যের পুনরুক্তি করে আফসারউদ্দিন। কিন্তু কথাটা অস্বীকার করতে পারে না। 

এবার প্রগাঢ় নিঃশব্দতার মধ্যে ঘরের কোণে টেবিলের ওপর স্থাপিত ঘড়িটির টিক্-টিক্ আওয়াজটা কানে আসে। দূরে রাতপাখিটি ডেকেই চলে। 

আফসারউদ্দিন বোঝে, সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তবু রাত্রির কালো বন্যার কথা স্মরণ হয় তার। সেটি অসত্য নয়। হয়তো ঘুমটা ছিল মনের এক প্রকারের কৌশল-আচ্ছাদন। হাসিনার কাছে সে ঘুমের দোহাই দেবে কি? না। তা যেন পাপ-স্বীকৃতির মতোই শোনাবে। অবশেষে আফসারউদ্দিন কিছুই বলে না। বরঞ্চ দেহ-প্রাণে সে নিথর হয়ে থাকে। ভেতরে কোথাও লজ্জা, অনুশোচনা এবং ক্রোধের একটি মিশ্রিত অনুভূতি তাকে নিপীড়িত করে। তারপর সে অপ্রীতিকর অনুভূতিও একটি বিচিত্র কাঠিন্যে জমে যায়।

.

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে আফসারউদ্দিন জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে আকাশে স্তরের পর স্তর মেঘ জমে আছে। মশারির জালের মধ্য দিয়ে সে-মেঘসম্ভার বেদনাভরা স্মৃতির মতো মনে হয়। তবু তা যেন অতি দূরে। এত দূরে যে তার দিকে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে তাকানো যায়। আজ ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে জেনেও সে বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। 

ক্রমশ তার চোখে সবকিছু কেমন অবাস্তব হয়ে ওঠে, মনের অতলে যে-কাঠিন্য এখনো সে বোধ করে, সে-কাঠিন্য ভারশূন্য হয়ে পড়ে। মনে হয়, শুধু তার দাম্পত্যজীবনই নয়, সমগ্র জীবনই নিরলম্ব হয়ে উঠেছে। 

হাসিনা আজ সকালেই শয্যা ত্যাগ করেছে। আফসারউদ্দিনকে খুশি করার জন্যেই যে হাসিনা আজ সকালে উঠেছে, সে-কথা সে অন্যদিন ভাবতে পারত, আজ আর পারে না। বস্তুত বিছানার পাশে শূন্যতাটি আজ তাকে স্পর্শই করে না। তাদের মধ্যে শেষসূত্রটি যখন ছিন্ন হয়েছে তখন হাসিনার উপস্থিতি-অনুপস্থিতি তার কার্যকলাপ ভাব-অনুভূতির আর কোনো অৰ্থ নাই। 

বিশেষ কলহ-বিবাদ ছাড়া বাকবিতণ্ডা প্রকাশ্য মনোমালিন্য ছাড়া অতি নিঃশব্দে সে-সূত্রটি ছিন্ন হয়েছে। 

হাসিনা একটু পরে ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে শোবার ঘরে প্রবেশ করে। তার পায়ের আওয়াজ শোনে আফসারউদ্দিন কিন্তু তার দিকে তাকায় না। হাসিনা পুরোনো আমলের একটি ক্ষুদ্র ড্রেসিং-টেবিলের সামনে চুল আঁচড়াতে বসে। মেঘের মতোই তাকে অতি দূর মনে হয়। 

না, ধরতে গেলে কিছুই হয় নাই। তবু নিঃসন্দেহে সর্বশেষ সূত্রটি কাটা পড়েছে। হাসিনার চরম উদাসীনতার কারণ জানবার কোনো কৌতূহলও সে আর বোধ করে না। 

মশারি সরিয়ে উঠে দ্রুতপদে আফসারউদ্দিন পেছনের ছায়াশীতল বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে। আবদুল শীঘ্র এক পেয়ালা চা নিয়ে এসে তার সামনে একটি নড়বড়ে, রঙচটা গোল বেতের টেবিলে রাখে। তাতে এক চুমুক দিয়ে সে নিম্ন গলায় বলে, 

আজ দুপুরে টুওরে যাব। 

সফরে যাবে তা বারান্দায় এসে বসবার পরেই হঠাৎ সে স্থির করে। হঠাৎ কোথাও যাবার তাগিদ বোধ করে সে। বর্ষার পরে নেয়ামতগঞ্জের বাঁধের মেরামতের কাজটা শুরু করতে হবে। ভেবেছিল দু-সপ্তাহের মধ্যে যাবে। আজই গেলে ক্ষতি কী? ওপরওয়ালার কাছে একটা তার পাঠিয়ে দিলেই চলবে। 

মনার মাকে বলে দিও রাতে এসে থাকতে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আবদুলকে আবার বলে। সে যখন সফরে যায়, তখন মনার মা তাদের শোবার ঘরের পাশে ছোট ঘরটিতে রাত্রিবাস করে। 

অনেক বেলা হয়েছে। এবার ক্ষিপ্রগতিতে উঠে আফসারউদ্দিন গোসলখানার দিকে রওনা হয়। 

স্বামী-স্ত্রী একসাথে সকালের নাশতা খায়। আজও চোখাচোখি হয় না, সে-কথা আফসারউদ্দিনের আজ খেয়াল হয় না। 

উঠবার আগে সে নিম্ন গলায় বলে, 

আজ দুপুরে টুওরে যাচ্ছি। আবদুল মনার মাকে খবর দেবে। 

ক-দিনের জন্যে সে যাচ্ছে তা হাসিনা জিজ্ঞাসা করে না। নিজে থেকেই আফসারউদ্দিন বলে,

পরশু ফিরব। 

.

পোস্টম্যান ডাক নিয়ে আসে। দুটি চিঠি হাসিনার জন্যে, তার জন্যে একটি। হাসিনার চিঠি দুটি এগিয়ে দিয়ে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েই সে তার চিঠিটা খোলে। কিন্তু পড়তে শুরু করলে অক্ষরগুলির ওপর দিয়ে দৃষ্টি ভেসে যায়। সে ভাবে, দাম্পত্যজীবনের প্রহসন শেষ হয়েছে কিন্তু এ-কাহিনীর অন্ত কোথায়, কোথায়ই-বা যবনিকা পড়বে? 

সে-প্রশ্নের উত্তর সে পায় না। তবে একটি বিষয়ে সে নিশ্চিত বোধ করে। তার জীবন সে মরুভূমির ওপর সৃষ্টি করবে না। মরুভূমিতে প্রবেশ করবার জন্যেই সে কঠোর অধ্যবসায়ের সঙ্গে এত কষ্ট-শ্রম করে মানুষ হয় নাই। কথাটা ভেবে মনে একটি বিচিত্ৰ শান্তিই সে বোধ করে। আশা-আকাঙ্ক্ষার ঝড় অবশেষে থেমেছে, হেঁয়ালি ভাঙার অদম্য কৌতূহলেরও অবসান ঘটেছে। তাছাড়া তার মনে হয়, তার পরাজয় হয় নাই। 

সে আপন মনে বলে, আমি আরশাদ আলী সাহেব নই। আমরা একই ধাতুতে তৈরি নই। কথাটা নিজেরই কাছে একটু বিচিত্র ঠেকে। তবে তা বিশ্লেষণ করে দেখার কোনো তাগিদ বোধ করে না। আজ সে একটি পরিপূর্ণ নিঃসঙ্গতার মধ্যে আপন অস্তিত্ব ফিরে পেয়েছে। সে-অস্তিত্বটি প্রশ্ন-বিশ্লেষণে ক্ষত-বিক্ষত করতে চায় না সে। 

এবার তার হাতের চিঠির অক্ষরগুলি অর্থগম্য রূপ ধারণ করে। চিঠিটা তার মায়ের। মায়ের মানে তাঁর জবানের কথা যা শব্দের আকার নিয়েছে একজন সামান্য শিক্ষিত আত্মীয়ের হাতে। চিঠিতে সুখবর কিছুই নাই। কোনোদিনই থাকে না। শারীরিক অসুস্থতার কথা, সাংসারিক অভাব-অভিযোগের কথা অন্যদিনের মতো আজও সে-চিঠির বিষয়বস্তু। 

চিঠিতে দ্রুতভাবে একবার চোখ বুলিয়ে তা টেবিলে রাখতে গিয়ে সে ক্ষিপ্রভাবে তুলে নিয়ে পাতলুনের জেব-এ ঢুকিয়ে দেয়। আজ সে-চিঠি হাসিনার চোখের সামনে ফেলে যেতে সংকোচ হয়। তার হাসিনা আজ সত্যিই পরনারীতে রূপান্তরিত হয়েছে। 

দুপুরে টিফিন ক্যারিয়ারে করে অফিসের খাবার আসে; বেডিং-সুটকেস সোজা স্টেশনে যায়। অফিস থেকেই গাড়ি ধরতে যায় আফসারউদ্দিন। 

দু-দিনের জায়গায় তিন দিন পরে প্রত্যাবর্তন করে বাড়িতে পা দেবে, এমন সময় আফসারউদ্দিন হাসিনার উচ্চ হাসির আওয়াজ শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। বারান্দায় উঠলে আবদুল বলে, 

বিবি সাহেবের আম্মা এসেছেন। 

ভেতরে হাসিনার হাসি তখনো থামে নাই। কয়েক মুহূর্ত সে অত্যাশ্চর্য হাসি শুনে আফসারউদ্দিন প্রশ্ন করে, 

।কবে এসেছেন? 

গত রাতে। একটু থেমে চাপরাশির হাত থেকে সুটকেস-বিছানা নিয়ে আবদুল আলগোছে বলে, বিবি সাহেব তার পাঠিয়েছিলেন। 

পরে শাশুড়ি-জামাইতে সাক্ষাৎ হয়। মরিয়ম খানম মাথায় কাপড় তোলেন। সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর মুখে একটি গাম্ভীর্য নাবে। কেবল হাসিনার মুখে একটা তরল, স্বতঃস্ফূর্ত উজ্জ্বলতা জেগে থাকে। মা-মেয়ের মুখভাব ভিন্ন হলেও এবং তাদের বয়সে যথেষ্ট বিভেদ থাকলেও দু-জনের চেহারায় একটি স্পষ্ট সাদৃশ্য আফসারউদ্দিন আজ লক্ষ্য না করে পারে না। তবে তাতে বিচলিত হবার কোনো কারণ থাকলেও আজ সে বিচলিত হয় না। যে-কাঠিন্য নিঃসঙ্গতাবোধ নিয়ে সেদিন সে সফরে বেরিয়েছিল, সে কাঠিন্য নিঃসঙ্গতা নিয়েই সে ফিরেছে। 

ভদ্রতামাফিক দু-একটা কুশল প্রশ্ন-উত্তরের পরেই সে-সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ শেষ হয়। 

রাতে খাবারের সময় মা-মেয়ে দু-জনকে অতিশয় গম্ভীর মনে হয়। মরিয়ম খানমের মাথায় ঘোমটা, হাসিনার মুখে গাম্ভীর্যের আচ্ছাদন। সে-ই যে তাদের গাম্ভীর্যের কারণ সে-কথা বুঝে নত মাথায় সে ক্ষিপ্রভাবে খাওয়ায় মনোনিবেশ করে। তারপর এক সময়ে বিনাড়ম্বরে হাসিনা নিম্নকণ্ঠে হঠাৎ ঘোষণা করে, 

কাল দুপুরের ট্রেনে আম্মার সাথে যাচ্ছি। 

মুহূর্তের জন্যে খোদাভক্তিতে মরিয়ম খানমের চোখ ঊর্ধ্বপানে নিক্ষিপ্ত হয়। গদগদ কণ্ঠে বলে,

ইন্‌শাআল্লাহ। 

সে-রাতে স্বামী-স্ত্রীতে একটি শব্দেরও বিনিময় হয় না। শুধু পরদিন সকালে হাসিনা বিছানা ছেড়ে উঠে যাবে, এমন সময় আফসারউদ্দিন উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেই বলে, একটা কথা বলতে চাই। 

বলে অনুমতি প্রার্থনার ভঙ্গিতেই থামে। হাসিনার পিঠ তার দিকে। একবার মাথায় একটু ঝাঁকানি দিয়ে সে তার চুল সিধা করে, তারপর নিঃশব্দে বসে অপেক্ষা করে। যাবার দিনে হয়তো সে একটু বদান্যতার প্রয়োজন বোধ করে। 

আমার দোষ কী জানি না। তোমাদের কেউ আমাকে সে-কথা বল নাই। 

পিঠ সোজা করে বসে হাসিনা নিশ্চল হয়ে থাকে। আবার একটু অপেক্ষা করে আফসারউদ্দিন বলে, 

আমার কোনো দোষ আমি দেখতেই পাই না। সেটা স্বাভাবিক। তবে শোধরাবার মতো দোষঘাট শোধরাবার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করবার জন্যে তৈরি ছিলাম। অবশ্য এখন সে-কথা নিষ্প্রয়োজন। তবু যাবার আগে কথাটা তোমার জেনে যাওয়া উচিত। 

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর হাসিনা এবার বলে, 

সে-কথা আগেও একবার বলেছেন। 

সামান্য রক্তিমাভা দেখা দেয় আফসারউদ্দিনের মুখে। তবে সংযত কণ্ঠেই সে উত্তর দেয়, প্রথমবার তুমি উত্তর দেও নাই বলে আবার বললাম। 

হাসিনার মন্তব্যে যতটা সে অসন্তুষ্ট না হয় ততটা হয় এই দেখে যে, সে যে অতীত কাল ব্যবহার করেছে তা হাসিনা লক্ষ্য করে নাই। 

হাসিনা পিঠ সোজা রেখেই কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে থাকে। তারপর সহসা বলে, কী বলব জানি না। 

তার কণ্ঠে কেমন একটা নিঃসহায় ভাব। মনে হয়, সত্যিই সে জানে না। কী রহস্যময় আদেশ-নির্দেশে তাদের চিন্তাধারা কার্যকলাপ পরিচালিত হয়, তা সে জানে না। 

এবার আফসারউদ্দিন নীরব হয়ে থাকলে একটু অপেক্ষা করে হাসিনা উঠে চলে যায় অন্য ঘরে। সে-ঘরে মরিয়ম খানম তখন জায়নামাজে বসে ওজিফা পড়ায় মগ্ন। 

দুপুরের ট্রেনে নিত্য ভিড় হয়। গাড়ি-প্লাটফর্ম লোকে-লোকারণ্য, তবে প্রথম শ্রেণীর সামনে একটু ফাঁকা ফাঁকা ভাব। সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া আছে কিন্তু আফসারউদ্দিন ব্যতীত দাঁড়িয়ে নেই কেউ। দরজার পাশে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে কড়া রৌদ্রের জন্যে ভ্রূকুটি করে তাকিয়ে সে মানুষের সন্ত্রস্ত চলাচল দেখে। তার কানটা সজাগ হয়ে থাকে তৃতীয় ঘণ্টার জন্যে। 

প্রথম শ্রেণীতে জানালার দিকে পিঠ দিয়ে মা ও মেয়ে বসে। হাসিনার পরনে উজ্জ্বল লাল শাড়ি। মরিয়ম খানমের দেহ কালো বোরখায় আবৃত। কেবল তাঁর মুখটি উন্মুক্ত। সে-মুখ দিনের আলোয় রক্তহীন, ফ্যাকাসে এবং ভাবশূন্য দেখায়। আড়চোখে আফসারউদ্দিন একবার হাসিনার দিকে তাকায়। তার মুখের পার্শ্বদিকটাই কেবল নজরে পড়ে। মায়ের মুখের মতো তার মুখও ভাবশূন্য। তবে দুপুরবেলার উজ্জ্বল সূর্যালোক তার লাবণ্যময় ত্বকে প্রতিফলিত হয় বলে ভাবশূন্যতা তত চোখে পড়ে না। ট্রেন এখনো ছাড়ে নি, তবু মনে হয় ইতিমধ্যে অতি দূরে কোথাও তারা পৌঁছে গেছে। 

হঠাৎ আফসারউদ্দিনের মন বিস্ময়ে ভরে ওঠে। কোথায় যাচ্ছে মরিয়ম খানম এবং হাসিনা, কীই-বা তাদের জীবনের লক্ষ্যস্থান, কোথায়ই-বা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মণিমুক্তা লুকিয়ে? 

দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আফসারউদ্দিন আবার লোকচলাচল দেখে। 

জনস্রোতের ওপর যখন তার দৃষ্টি নিবদ্ধ তখন সহসা একটি অপ্রত্যাশিত বিষয়ে সে সচেতন হয়ে ওঠে। মরিয়ম খানমের পাশে বসেই হাসিনা হঠাৎ কেমন চঞ্চল হয়ে উঠেছে এবং তার নিরাসক্ত মুখে ভীষণ দ্বন্দ্বের উপস্থিত হয়েছে। ক্রমশ সে-চাঞ্চল্য এবং দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। তার কি মত বদলেছে? সে কি ট্রেন থেকে নেবে আসবে? হাসিনার দিকে তাকাবার একটি প্রবল বাসনা বোধ করে আফসারউদ্দিন, কিন্তু দৃঢ়হস্তে সে-বাসনা সে দমন করে। তাকাবার সময় এখনো আসে নাই। তবে তার বুকে যে-স্পন্দন জাগে সে-স্পন্দন সে থামাতে পারে না। তাদের শেষসূত্রটি কি সত্যিই ছিন্ন হয় নাই? হাসিনা কি সহসা বুঝতে পেরেছে যে, যে-মনোরম দুর্গে সে আবদ্ধ সে-দুর্গে তাদের সযত্নে পালিত জীবনটি পথে—ফেলে-দেওয়া রসশূন্য নারকেলের মতো অন্তঃসারশূন্য, সে-দুর্গে এত আলো থাকলেও আসলে সেখানে ঘন তমিস্রা, যে-বিশ্বাসে একদিন তাদের স্বপ্নসৌধটি নির্মাণ করেছিল সে-বিশ্বাস সামান্য ধোঁয়ার চেয়ে বেশি বাস্তব নয় এবং মানুষের হৃদয়ের চরম ক্ষুধা কেবল চোখের ওপর পর্দা টেনেই জয় করা যায় না? 

মনে হয় হাসিনা নেবেই আসবে। তার পাশে কালো বোরখায় আবৃতা মরিয়ম খানমের চোখে ভীতি জেগেছে, তাঁর নিশ্চয়তার ভাব খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়েছে। কিন্তু হাসিনার চোখ তাঁর দিকে নেই। সে নেবেই আসবে। আফসারউদ্দিনের বুকের স্পন্দন আরো দ্রুত হয়ে ওঠে। হাসিনা নেবে এসে তার সামনে দাঁড়ালে সে কী করবে? যখন দেখবে হাসিনার সে-মুখ আর সে-মুখ নাই, সে-চোখ আর সে-চোখ নাই, তখন তাকে সে কী বলবে? 

সে জানে না। ভাববার সময় কোথায়? হঠাৎ মনে যে ঝড় উঠেছে সে-ঝড় সবকিছু শুকনো পাতার মতো উড়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে সে আসছে আসুক। তিন ধাপ সিঁড়ি, তারপর কালো কঙ্কর ছড়ানো প্লাটফর্ম। সেখানেই নতুন জীবনের সূত্রপাত হবে। 

তারপর তৃতীয় ঘণ্টা পড়ে, গার্ডের সুতীক্ষ্ণ বাঁশিও কাছাকাছি কোথাও শোনা যায়। বিস্মিত হয়ে আফসারউদ্দিন তাকায় ট্রেনের জানালার দিকে। ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে! তারপর কেমন একটা ঘূর্ণিবর্তের মধ্যেই একটি লাল শাড়ি ঝলমল করে ওঠে। একটা মুখও ভেসে ওঠে। সে-মুখ তার দিকে তাকায়, বোধহয় ভাবশূন্যতার মধ্যে নীরস ভদ্রতার একটা ক্ষীণ হাসি জাগে। তারপর হয়তো মরিয়ম খানমের কালো বোরখা ভেসে ওঠে। সেখানেও একটি মুখ ফিরে তাকায়। ঘূর্ণিবর্ত পুচ্ছ নাচায়। 

প্লাটফর্মের শেষে রেলপথ হঠাৎ ডান দিকে মোড় নেয়। সে-বাঁকে ট্রেন শীঘ্র অদৃশ্য হয়ে গেলেও আফসারউদ্দিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে নিস্পন্দভাবে। তার মুখে যেন ঘামের স্রোত বইছে। তার চোখের সামনে লাল ও কালো রঙের ঢেউ তখনো থামে নাই। 

অবশেষে আফসারউদ্দিন সুস্থির হলে এবার শান্ত পরিচ্ছন্নতার মধ্যে সে সুস্পষ্টভাবে একটি মুখ দেখতে পায়। সে-মুখ হাসিনার নয়, মরিয়ম খানমেরও নয়। সে-মুখ আরশাদ আলী সাহেবের। তাঁর বয়স-ক্লান্ত মুখে যেন গভীর পরাজয়ের ছায়া। 

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *