তৃতীয় পর্ব : সম্রাট কনস্টান্টাইন থেকে ফরাসি বিপ্লব ও নাপোলিয়ন (খ্রিস্টীয় ৩১২-১৮০৪ )

তৃতীয় পর্ব: সম্রাট কনস্টান্টাইন থেকে ফরাসি বিপ্লব ও নাপোলিয়ন (খ্রিস্টীয় ৩১২-১৮০৪ )

ষোলো

সম্রাট কনস্টান্টাইন-রাজধর্ম খ্রিস্টধর্ম

সন্ত পলের মৃত্যুর আগে অবধি প্যালেস্টেনীয় খ্রিস্টানরা নিজেদের যিশুর পুনরাগমন এবং আসন্ন শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাসী আর এক ইহুদি গোষ্ঠী বলেই পরিচয় দিয়েছে। প্রথম পর্বের খ্রিস্টানুরাগীরা ইহুদিদের মতোই যুদ্ধকে ঘৃণা করেছে, বর্জন করেছে পৌত্তলিকতা। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের শেষে নব্য খ্রিস্টানদের উপর রোমের অত্যাচারের মাত্রা কমতে থাকে। পরিশ্রম ও পারস্পরিক সহযোগিতায় বহু রোমান শহরে খ্রিস্টানদের ক্ষমতাবৃদ্ধি হল। বিধর্মীদের খ্রিস্টধর্মে আকর্ষণ বাড়ে। দুঃস্থ, অনাথ, অভুক্তের সেবায় কোনো ভেদাভেদ ছিল না নব্য খ্রিস্টানদের। যিশু অসহায় মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়ালেন। অন্যদিকে আর্থিক প্রভাব ও কূটনৈতিক বুদ্ধি খাটিয়ে রোমানদের সঙ্গে এক ভিন্ন বোঝাপড়া সেরে নেয় ইহুদিরা। রোমান সামরিকবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নাম লেখানো থেকে অব্যাহতি পেল তারা। রোম সম্রাটের মূর্তিপূজাও বাধ্যতামূলক হয় না তাদের জন্য। এই সুবিধাগুলি নব্য খ্রিস্টানদের ছিল না। কনস্টানন্টাইনের রোমে অধিকাংশ চিন্তাশীল মানুষের সমর্থন মেলে খ্রিস্টধর্মের। ইহুদি ও খ্রিস্টান দু’তরফের কাছেই সমান গুরুত্বের রোমান সম্রাট ফ্লাভিয়াস ভ্যালেরিয়াস কনস্টান্টাইনাস (২৭৪-৩৩৭ খ্রিস্টাব্দ)-এর শাসন কাল। ৩০৬ খ্রিস্টাব্দে তার অভিষেক। প্রথম সমর অভিযান প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাক্সেন্টিয়াসের বিরুদ্ধে ৩১২ খ্রিস্টাব্দে। এই যুদ্ধ জয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল খ্রিস্টান সেনার। তারা ক্রুশ, নোঙর, মাছ চিহ্নিত ধ্বজা নিয়ে কনস্টান্টাইনের সেনাদলে যোগ দিল। নব খ্রিস্টানদের উপর যতদিন রোমের অত্যাচার চলেছে ততদিন খ্রিস্টান-ইহুদি পারস্পরিক বিদ্বেষ স্তিমিত ছিল। ধনেপ্রাণে বাঁচতে ইহুদিদের সাহায্য তখন প্রয়োজন খ্রিস্টানদের। খ্রিস্টধর্ম রাজধর্ম হল। চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি বদলে গেল ছবিটা। গোড়ায় খ্রিস্টান নিগ্রহ বন্ধ করে তাদের রাজসভায় ডেকে নেন কনস্টান্টাইন। পশ্চিম রোমান সম্রাট লিসিনাসকে পরাজিত করার পর পূর্ণ সমান অধিকার দিলেন খ্রিস্টানদের। এরপরই খুব কৌশলে শুরু করেন অ-খ্রিস্টানদের রাজনৈতিক দমন। ৩২৫ সালে খ্রিস্টানদের মহাসম্মেলন হল নাইসিয়ায়। এর চার বছর বাদে বেশ কিছু আইনি ব্যবস্থা নেন কনস্টান্টাইন যা থেকে তার ইহুদি বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে যায়। ক্রীতদাস যদি ইহুদি ধর্ম নিতে চায় তবে তাকে সুন্নত করতে পারবে না ইহুদি মালিক। ইহুদিরা খ্রিস্টান দাস রাখতে পারবে না। খ্রিস্টানদের যদিও খ্রিস্টান ও ইহুদি দু’ধরনের দাস রাখার অনুমতি দেওয়া হল। ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় কোনো নাগরিক ইহুদি ধর্মগ্রহণ করতে পারবে না। কেউ তা করলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যেসব ইহুদি ধর্মযাজক বিধর্মীদের ইহুদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ শিক্ষা দেবে তাদেরও মৃত্যুদণ্ড চালু করেন কনস্টান্টাইন। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করা ইহুদিদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও পুরস্কার চালু হল। কোনো ইহুদি ভিন্নধর্মীবলম্বীকে বিবাহ করলে তার মৃত্যুদণ্ড হবে। ইহুদি অ-ইহুদি বিবাহ নিষিদ্ধ হল। রাজার আইনে ইহুদিধর্ম ‘অকথ্য ধর্ম’, ‘পাশবিক ধর্ম’ (secta nefaria / secta feral) ঘোষিত হল। রোম সাম্রাজ্যের রাজধর্মের তকমা পেল খ্রিস্টধর্ম। ইহুদি বিদ্বেষী সম্রাট হাড্রিয়ান বার কখবা বিদ্রোহ দমনের পর যে আইন প্রণয়ন করে ইহুদিদের জেরুজালেম প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন অন্তিমে সেটিকেই ফের লাগু করেন সম্রাট কনস্টান্টাইন।

সতেরো

ইহুদি ডায়াস্পোরা বিশ্বজুড়ে-মোজেস মেইমনিডস

ইহুদি ডায়াস্পোরা বিশ্বজুড়ে-মোজেস মেইমনিডস

ইহুদি সংস্কৃতি পরম্পরা গড়েছে দেশে দেশে ভ্রাম্যমাণ অবস্থায়। তাদের নিজস্ব রাজ্যপাট ছিল না। ব্যাবিলনের জেরুজালেম বিজয়ে শুরু যে ইহুদি ‘ডায়াস্পোরা’ রোমানদের প্যালেস্টাইন ধ্বংসে তার পরিধি ছড়ায় আবিশ্ব। গ্রিক শব্দ ‘ডায়াস্পোরা’। ইংরেজি ‘ডিসপারসাল’। হিব্রু ‘গালুট’। সবেরই অর্থ ছিন্নমূল ছড়িয়ে যাওয়া। আড়াই হাজার বছর যাযাবর জীবনে সর্বত্রগামী ইহুদি। ছড়িয়ে পড়া, ছিন্নমূল মানুষ আশ্রয় খোঁজে। সামাজিক নিরাপত্তার আশ্বাস, আর্থিক স্থিতিশীলতা খোঁজে। একই সঙ্গে তার আপন সত্তার স্বীকৃতি দাবি করে নতুন পৃথিবীর কাছে। গ্রহণ বর্জন টানাপোড়েনের এক দীর্ঘপথ পেরিয়ে তার পুনর্জন্ম। যে কৃষ্টি, সংস্কার, বিশ্বাস লালিত জীবন থেকে সে উৎপাটিত তাকে জিইয়ে রাখবে না মিলিয়ে যেতে দেবে নতুন দেশাচারের স্রোতে এই মৌলিক বোধ পীড়িত করে। জন্ম নেয় তৃতীয় সংস্কৃতি। সমীকরণটা সবক্ষেত্রেই সহজ তা নয়। ইহুদিদের ক্ষেত্রেও তা হয়নি। ধর্মীয় সংস্কৃতির বাঁধনটুকু ছাড়া বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে যাওয়া ছিন্নমূল ভিন্ন ভাষাভাষী ইহুদিদের রক্ষাকবচ আর কিছুই ছিল না। ইহুদি জাতির বৌদ্ধিক বিকাশের সহায়ক হয়েছে তাদের ধর্ম। মধ্যযুগের খ্রিস্টান আমজনতার অশিক্ষা যখন চরম তখনও— দেখা গেছে ইহুদিদের শতকরা নব্বই জন শিক্ষিত। এটা সম্ভব করেছিল ‘সিনাগগ’ নির্দেশে বাধ্যতামূলক ধর্মগ্রন্থ পাঠ। ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়া ইহুদির সঙ্গে তার ঈশ্বরের যোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যদি সে নিরক্ষর থাকে। সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত ইহুদি যাদের কাছে ইহুদি ধর্মশাস্ত্রের নিয়মকানুন দুর্বোধ্য মনে হয়েছে তারা ভিন্নধর্ম গ্রহণ করে মিশ্র সংস্কৃতির স্রোতে হারিয়েছে।

৩৫২ খ্রিস্টাব্দে ফের এক দফা বিদ্রোহ করে প্যালেস্টেনীয় ইহুদিরা। রোমানরা নির্মমভাবে দমন করে বিদ্রোহ। গ্যালিলি সাগর লাগোয়া সেফোরিস, টাইবেরিয়াস শহরগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। নিহত হয় বহু হাজার ইহুদি, আরও বহুসংখ্যক বিক্রি হয়ে যায় দাস বাজারে। ইহুদি জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় প্যালেস্টাইনে। সম্রাট জুলিয়ানের রাজ্যকালে (৩৬১-৬৩) ক্ষণিক স্বস্তি মেলে। ৪২৫ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব রোম সম্রাট দ্বিতীয় থিওডিসিয়াসের নির্দেশে ভেঙে দেওয়া হল গোষ্ঠীপতি নিয়ন্ত্রিত ইহুদি সমাজ ব্যবস্থা। ইহুদি সিনাগগ ও শিক্ষাকেন্দ্রের জায়গা নিল গ্রিক চার্চ। ভিসিগথ আক্রমণে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্যের পতন হলে শুরু ইউরোপের ‘অন্ধকার যুগ’। সমকালীন ইহুদি এবং তার সমাজ সম্পর্কে খুব স্পষ্ট কিছু জানতে পারি না আমরা। এটুকু জানা যাচ্ছে যে প্যালেস্টাইন থেকে উৎখাত হওয়া ইহুদিরা ছড়িয়ে পড়ছে পারস্য, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, সিরিয়া, এশিয়া মাইনর, আরব উপদ্বীপে, তাদের আত্মীয় সেমাইট গোষ্ঠীদের মাঝে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে খাইবার পাস অবধি। লোহিত সাগর পেরিয়ে আবিসিনিয়া (আধুনিক ইথিওপিয়া), ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকা, সিসিলি, সার্ডিনিয়া, স্পেন, ফ্রান্স সর্বত্রগামী তারা’। ভারতে ইহুদি আগমন আরও আগে। আনুমানিক ৫৬২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কোচিন পৌঁছেছিল ইহুদি বণিক। ৩৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ‘শাসনম’ তাম্রলিপিতে কোচিন-ইহুদিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উল্লেখ রয়েছে। জিহোভার দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস হবার পর ৭০ খ্রিস্টাব্দে আরও একদল ইহুদি কোচিনে আসে। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে স্পেন থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের একাংশও দক্ষিণ ভারতীয় উপকূলবর্তী শহরগুলিতে আশ্রয় নেয়। কোঙ্কন, মুম্বাই, পুণে, আমেদাবাদ, করাচিতে বসতকারী বেইনি-ইজরায়েলি গোষ্ঠীর দাবি, ২১০০ বছর আগে এক জাহাজডুবির পর মুম্বাইয়ের দক্ষিণে আলিবাগে আশ্রয় নেওয়া জুডার সাতটি ইহুদি পরিবার তাদের পূর্বপুরুষ[২]। উল্লেখ্য, আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি নিসিম এডিকিয়েল জন্মসূত্রে ইহুদি। খ্রিস্টীয় ৬০-৭০ সালের মধ্যে চিনে প্রথম ইহুদি সিনাগগ স্থাপিত হয়। ঠিক কোন সময়ে কোন পথে ইহুদিরা চিনে পৌঁছেছিল তা জানা যায় না। তবে অনুমান যে আড়াই হাজার বছর আগে রেশম বা চিনাংশুকের ব্যবসায় চিন দেশের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি হয় ইহুদি বণিকদের। ত্রয়োদশ শতকে পর্যটক মার্কোপোলো চিন প্রবাসী ইহুদিদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তির কথা উল্লেখ করেন। যেসব ইহুদি বণিক মধ্যযুগের ইউরোপ ও চিনের সঙ্গে দীর্ঘ শতাব্দী বাণিজ্য লেনদেন বজায় রেখেছিল তারা চিনের পথনির্দেশ ও চিনে তাদের উপস্থিতি গোপন রেখেছে। সপ্তদশ শতকে ক্যাথলিক মিশনারিরা চিনের হোনান প্রদেশে সুন্দর ইহুদি সিনাগগের কথা প্রথম জানতে পারে। হেলেনীয় সভ্যতায় আধা-দীক্ষিত মিশরীয়রা ইহুদি উদ্বাস্তুদের বিশেষ সুনজরে দেখেনি। তারা ওদের সম্পদ ও প্রতিপত্তিকে ঈর্ষা করেছে। মিশরীয়দের বিচারে ইহুদিরা দাম্ভিক। তবুও ৪১৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি মিশরে ইহুদিদের সামজিক গুরুত্ব ছিল। এই সময় বিশপ সিরিল নামে এক ধর্মযাজক প্ররোচিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মিশরে কয়েক হাজার ইহুদি নিধন হয় খ্রিস্টানদের হাতে। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আরব মুসলমানরা মিশর দখল করে। মিশরে তখন ইহুদি সংখ্যা কমে কয়েক হাজারে দাঁড়িয়েছে। আরব শাসনে স্থিতাবস্থা ফেরে। ইহুদিরা ফের ঘুরে দাঁড়ায়। মিশর প্রবাসী ইহুদিদের কাছে দ্বাদশ শতকের শেষ ভাগে দেবদূত হয়ে দেখা দিলেন চিকিৎসক দার্শনিক— মোজেস বেন মেইমন (১১৩৫-১২০৪)। মোজেস মেইমনিডস নামে যিনি অধিক খ্যাত। এঁর বিষয়ে ইহুদিদের মধ্যে একটি চালু প্ৰবচন হল- ‘মোজেস থেকে মোজেসের মধ্যে মোজেসের মতো আর কেউ আবির্ভূত হননি’। এই মোজেসের জন্ম স্পেনের করডোভায়। উত্তর আফ্রিকার মুসলিম উগ্রবাদী বারবার গোষ্ঠী ১১৪৮ কারডোভা দখল করে খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ফতোয়া দেয় মুসলিম ধর্মগ্রহণ করো নয়তো স্পেন ছাড়ো। ১১৫৯ খ্রিস্টাব্দে মেইমন পরিবার বহু পথ ঘুরে অবশেষে আলেকজান্ড্রিয়া চলে আসে। ইতিমধ্যে প্রাণ বাঁচাতে দায়সারা মুসলমান হয়েছেন মেইমনিডস। রাজচিকিৎসক হিসেবে কায়রোর রাজ দরবারে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি হল তাঁর। মিশরের ইহুদিদের রক্ষাকবচ হয়ে উঠলেন তিনি। কায়রোর মুসলিম শাসক সালাদিন প্যালেস্টাইন দখল করলে সেখানে ইহুদিদের পুনর্বাসনে বাদশাকে বুঝিয়ে রাজি করান মেইমনিডস। একবার কাজির বিচারে মৃত্যুদণ্ড হল মেইমনিডসের। তাঁকে বাঁচান এক উজির এই যুক্তি দর্শিয়ে যে জোর করে মুসলমান করা হয়েছে এমন মানুষ সঠিক মুসলমান নয়। কায়রোয় বসে যে মহাকীর্তি মেইমনিডস পরবর্তী সময়ে রেখে যান তা থেকে প্রভূত উপকৃত হয় আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্র। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক যাঁকে বলা হয় সেই গ্রিক চিকিৎসক হিপ্পোক্রেটস, গ্যালেন, মেটিরিয়া মেডিকা প্রণেতা ডিয়োসকরিডস, আভিসেন্না, আলরাজি প্রমুখ নামি চিকিৎসকদের চিকিৎসাবিধি যা আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল সেগুলিকে হিব্রু ও ল্যাটিনে অনুবাদ করেন মেইমনডিস। বিষ, হাঁপানি, অর্শ, স্নায়ুরোগ, যৌন পরিচ্ছন্নতা, যৌন দুর্বলতা বিষয়ে তাঁর নিজের লেখা পুস্তিকাগুলিও খ্যাতি পায়। বিশেষ করে ‘গ্লসারি অফ ড্রাগস’। অতিভোজনের অপকারিতা সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছেন মেইমনিডস। শারিরীক অসুস্থতা প্রশমনে আজকাল যোগ, প্রাণায়ামের উপযোগিতার কথা বলা হচ্ছে। মেইমনিডস নিদান দিলেন দর্শনচর্চার যাতে মানসিক ও নৈতিক ভারসাম্য এবং প্রশান্তি বজায় রাখা যায়। হিব্রু ভাষায় তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘মিশনা টোর‍্যা’ বা ইহুদি ধর্মীয় কানুনের নব সংস্করণ লিখলেন মেইমনিডস। সহজ যুক্তিগ্রাহ্য করে সাজালেন আদি হিব্রু ধর্মগ্রন্থ ‘পেন্টাটুক’, ‘মিশনা’, ‘জেমারা’। ‘ট্যালমুড’-এর অশুভ ভবিষ্যতবাণী, কবচ-তাবিজ, জ্যোতিষশাস্ত্র ছেঁটে ফেললেন। তিনি সেই মুষ্টিমেয় মধ্যযুগীয় চিন্তাবিদদের একজন যিনি জ্যোতিষচর্চাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। ঠিক যে মুক্তচিন্তাশীল ছিলেন মেইমনিডস তা নয়, তিনি চেষ্টা করেছেন ধর্মগ্রন্থ বর্ণিত অলৌকিকের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিতে। একইসঙ্গে দৈব প্রেরণা ও মোজেসের নির্দেশনামায় অবিচল আস্থা রেখেছেন মেইমনিডস। তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল যে এই প্রাচীন নিয়মের বাঁধন ছাড়া প্রবাসী ইহুদি সমাজ টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। মেইমনিডসের যুক্তিবাদ ইহুদি প্রাচীনপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধাচারী হয়ে ওঠে। এক পরম বৌদ্ধিক সত্তা যে বিশ্বপ্রকৃতির নিয়ন্তা, প্রাকৃতিক নিয়মগুলিই তার প্রমাণ বলে মনে করতেন তিনি। কিন্তু বিশ্বপ্রকৃতি শুধুমাত্র মানুষের কথা ভেবে সৃষ্ট এই সংকীর্ণ চিন্তাকে উপহাস করেছেন মেইমনিডস। তাঁর মতে বিশ্বপ্রকৃতির প্রাণবায়ুরূপী ঈশ্বর রয়েছেন তাই সকল প্রাণের অস্তিত্ত্ব রয়েছে। যদি ভাবা যেত যে ঈশ্বর নেই তবে বিশ্বপ্রকৃতির অস্তিত্ত্বও বিলীন হত।

১. A History of the Jews : Revised Edition: Cecil Roth, Schocken Books, New York.

২. History of the Jews in India: en.wikiedia.org/wiki/History_of_the_Jews_in_India

৩. The story of Civilization: Will Durant Vol. IV. The Age of Faith. Simon & Schuster.

আঠারো

ইসলাম, ধর্মযুদ্ধ ও ইহুদি

৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে রোম সম্রাট জাস্টিনিয়ানের মৃত্যু হল। তার পাঁচ বছর বাদে বিশ্বের বৃহত্তম উপদ্বীপ যাযাবর অধ্যুষিত আরব মরুতে এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মালেন মহম্মদ (৫৭০-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ)। মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেল। কেই বা ভেবেছিল যে একশো বছর পেরোতে ওই যাযাবর গোষ্ঠী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত অর্ধেক এশিয়া, পারস্য, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ ভূখণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠবে। মহম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং শ্বশুর, ইসলামের প্রথম খালিফা, আবু বকর (৫৭৩-৬৩৪ খ্রিস্টাব্দ) ৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ উক্ত দৈব আদেশ বা ‘কোরা’, যা সবই নবির জীবিতাবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ভূর্জপত্র, চামড়া, পাথরে লিখিত, সেগুলির সংকলন প্রকাশের আদেশ দেন। এই কাজ শেষ হয় ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে ইসলামের প্রসার এবং প্রতিপত্তি ক্রমে বাড়তে থাকে। ধর্মান্তরিত আরব উপজাতিগুলি ইসলামের বশ্যতা মানতে বাধ্য হলেও কখনোই নিশ্ছিদ্র হয়নি তাদের আনুগত্য। বিদ্রোহ লেগেই থাকত। তাদের পুরোপুরি বাগে আনতে আবু বকরকে আরব সেনাপতিদের মধ্যে নির্মমতম খালিদ ইবন আলওয়ালিদ-এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী পাঠাতে হয়। মহম্মদ পরবর্তী আরব দুনিয়ায় ক্ষমতার লড়াই এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগেই ছিল। এই অন্তর্কলহ উত্তপ্ত পরিবেশ পশ্চিম এশিয়ায় আরব বিজয় অভিযান ত্বরান্বিত করে থাকবে। এছাড়াও মহম্মদ পূর্ববর্তী আরবে প্রশাসনিক শৈথিল্যর কারণে সেচ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। দারিদ্র্য, অনাহার নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। আরব মরুচারী গোষ্ঠীগুলিকে এক ছত্রচ্ছায়ায় নিয়ে এল ইসলাম। মুসলিম শক্তির লোভনীয় সামরিক লক্ষ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্বল বাইজেন্টাইন ও পারস্য। জাতিগত নৈকট্যও আর এক কারণ। মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়াবাসী আরবদের কাছে আক্রমণকারী মুসলিম আরবদের ধর্ম সহজ গ্রহণীয় মনে হয়েছিল। পাশাপাশি ধর্মীয় আবেগও কাজ করে। নেসটরিয়ান খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীদের উপর বাইজেন্টাইন প্রশাসনের অত্যাচার সিরিয়া ও মিশরের এক বিপুল সংখ্যক জনতা এমনকি বাইজেন্টাইন সেনাদলের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ছিল নৈতিকতার প্রশ্নও। খ্রিস্টধর্মের নীতি ও সন্ন্যাসজীবন মধ্যপ্রাচ্যবাসী স্বভাব-যোদ্ধা আরবদের যুদ্ধের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ হ্রাস করে। তারা বর্বর নয়, সুশৃঙ্খল, কষ্টসহিষ্ণু যোদ্ধা। আবু বকর তাদের একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প দিলেন। তিনি তাদের ধর্মযোদ্ধা গড়তে চাইলেন। তাদের বললেন শৌর্যবান, মৃত্যুভয়হীন হতে। দরিদ্র, শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ, সন্ন্যাসব্রতী নিরীহ মানুষকে হত্যা না করতে। বললেন শস্যক্ষেত্র, ফলবান বৃক্ষ, গবাদি পশু যেন তারা ধ্বংস না করে। মুসলমান যোদ্ধাকে বললেন তারা যেন এমনকি শত্রুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করে। বাকিদের হয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা, নয় তো কর দিতে, অন্যথা হত্যা করতে নির্দেশ দেন আবু বকর। এভাবেই মহম্মদের মৃত্যুর একশো বছর বাদে আরব দুনিয়া থেকে সমগ্র এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ জুড়ে ইসলামের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম একটি বিশ্ব সভ্যতা গড়ে ওঠে। ইসলামের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পরবর্তী ছ’শো বছর অর্থাৎ ক্রুসেডের প্রায় অন্তিম লগ্ন অবধি নিরঙ্কুশ। ক্রুসেড শেষ হবার পরও স্প্যানিশ মুর ও অটোমন তুর্কি মুসলমান কৃষ্টির প্রভাব রয়ে যায় ইউরোপের জীবনচর্চায়’।

নবি মহম্মদের সঙ্গে আরবে বাসকারী ইহুদিদের সুসম্পর্ক নষ্ট হয় যখন ইহুদিরা মহম্মদকে তাদের পয়গম্বর মানতে অস্বীকার করে। যা একসময় তাদের ধর্ম বিশ্বাসের সমগোত্রীয় মনে হয়েছিল সেই ইসলামের রণং- দেহি রূপ মদিনাবাসী ইহুদিরা পছন্দ করেনি। ইহুদি নবিদের প্রতিশ্রুত মেসিয়া বা পরিত্রাতা হিসেবেও মহম্মদকে ভাবতে রাজি ছিল না তারা। ইহুদিরা মহম্মদের শাস্ত্র ব্যাখ্যাকে বিদ্রুপ করে। জবাবে মহম্মদ ইহুদিদের শাস্ত্র অপব্যাখ্যাকারী ও পয়গম্বরদের হত্যাকারী বলে চিহ্নিত করেন। ইহুদিরা প্রত্যাঘাত করে মহম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে যে তিনি পৌত্তলিকতার পুনর্জন্ম দিচ্ছেন। দুই ধর্মের সম্পর্কে এভাবেই একটি ফাটল তৈরি হয়। একথা যদিও অনস্বীকার্য যে ছিন্নমূল ইহুদির সামাজিক নিরাপত্তা পরবর্তীকালে ইসলামি দুনিয়ায় যতটা নিশ্চিত হয়েছে খ্রিস্টধর্মাবলম্বী রাষ্ট্রে তা হয়নি। মূলত আর্থিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কারণেই মহম্মদ পরবর্তী ছ’শো বছর মধ্যপ্রাচ্যজাত তিন একেশ্বরবাদী ধর্মের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্ধিতা, সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। দুশো বছরের ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ তারই পরিণতি।

ক্রুসেড

১০৯৫ থেকে ১২৯১ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড। ধর্মযুদ্ধের অনেক কারণের প্রথমটি হল সেলজুক তুর্কিদের জেরুজালেম দখল ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য জেরুজালেমের দরজা বন্ধ করে দেওয়া। কাস্পিয়ান সাগর, আরাল সাগর সংলগ্ন এলাকাবাসী সেলজুক নামের একটি তুর্কি জনগোষ্ঠী মুসলিম ধর্মগ্রহণ করে দশম শতকে। একাদশ শতকে তারা আদি বাসভূমি ছেড়ে পারস্যের খুরসানে চলে আসে এবং পারসি সংস্কৃতি আত্মস্থ করে। এই তুর্কি-পারসি সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় হিন্দুকুশ থেকে এশিয়া মাইনর এবং মধ্য এশিয়া থেকে পারস্য পর্যন্ত। ১০৭০ সালে জেরুজালেম দখল করে সেলজুক তুর্কিরা। এশিয়া, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা ও মূল ইউরোপ ভূখণ্ডের সংযোগবিন্দু জেরুজালেম মধ্যযুগীয় আন্তর্জাতিক স্থলবাণিজ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেটি করায়ত্ত করার অর্থ রেশম, মশলা, সুগন্ধি, মূল্যবান পাথরের বিশ্ব বাজার নিয়ন্ত্রণে একচ্ছত্র অধিকার পাওয়া। অবশ্যই সমকালীন বাজার অর্থনীতি সমান গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি, সুন্নি মুসলমানদের কাছে জেরুজালেম বিশ্বের তৃতীয় পবিত্র ধর্মস্থান। সেলজুক তুর্কিরা সুন্নি মুসলমান এবং জেরুজালেম সেসময় শিয়া মুসলিম ফতিমিদদের দখলে। ক্রুসেডের দ্বিতীয় কারণ বাইজেন্টাইন রাজশক্তির ক্ষমতা হ্রাস। টানা সাতশো বছর ইউরোপ, এশিয়ার মিলনবিন্দুর উপর নজরদারি করে এশিয়ার সামরিক উচ্চাকাঙ্খা এবং মধ্য এশীয় তৃণভূমির হানাদারদের ঠেকিয়ে রেখে অন্তর্কলহে বিধ্বস্ত, দুর্বল বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য। তৃতীয় কারণ পিসা, জেনোয়া, ভেনিসের উঠতি বণিক সঙ্ঘের ক্রমবর্ধমান উচ্চাশা। তাদের বন্দরগুলি তখন ইটালি এবং আল্পসের অপরপ্রান্তের ইউরোপীয় দেশগুলির পণ্যবাহী জলপথ। তাদের আর্থিক প্রতিপত্তি বেড়েছে। ভূমধ্যসাগর এলাকায় বাড়তে থাকা মুসলমান আধিপত্য ঘুচিয়ে নিকট প্রাচ্যে পশ্চিম ইউরোপের পণ্য বাজার উন্মুক্ত করতে চায় তারা। তাদের কথা পোপ আরবান দ্বিতীয়র কানে পৌঁছেছিল কিনা জানা যায় না। তবে ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের সিদ্ধান্ত অন্তিমে তিনিই নেন। খামতি ছিল না অপপ্রচারে। রটে যায় প্যালেস্টাইনে মুসলিমরা খ্রিস্টানদের অকথ্য নির্যাতন করছে, মহম্মদ আসলে মূর্তি উপাসক ইত্যাদি। আর এক ধর্মীয় যুক্তি এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্রুসডের রক্তলোলুপতা বাড়িয়েছিল। ক্রুসেড যদি ধর্মযুদ্ধ হয় তবে শুধু মুসলমান কেন যে কোনো বিধর্মীই খ্রিস্টানের শত্রু। যে পথ দিয়ে ক্রুসেডের শুরু সেই পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স, জার্মানির ধর্মযোদ্ধাদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের জেরুজালেম দখল করে থাকা মুসলমানদের তুলনায় অনেক সহজলভ্য ঘৃণিত শত্রু প্রতিবেশী বিধর্মী ইহুদি যাদেরকে খ্রিস্টান সমাজ একরকম দায়সারা গোছের মেনে নিয়েছিল। খ্রিস্ট হত্যাকারী এই অপবাদ দুষ্ট ইহুদিদের বিরুদ্ধে চোরা বিদ্বেষ সর্বদা কাজ করেছে মধ্যযুগে। ‘ব্ল্যাক ডেথ’-র মতো অজানা মহামারির জন্য দায়ী করা হত ইহুদিকে। হয় সে ‘কুয়োর জলে বিষ ঢেলেছে’ নয় তার মারণ উচাটনে ঘায়েল করেছে, এই ছিল প্রতিবেশী সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্ট সম্প্রদায়ের অন্ধ বিশ্বাস। ইউরোপের কিছু এলাকায় চার্চের আরক্ষণ পেয়েছে ইহুদিরা। সেটাও যেহেতু চার্চের দৃষ্টিতে তারা ছিল ‘অবিশ্বাসের জীবন্ত নমুনা’ ‘খ্রিস্টধর্মের সত্যতার প্রমাণ’। তবে সে সংরক্ষণ যে অনেকটা ফাঁকা বুলি গোত্রের তার নজির প্রথম ক্রুসেড। ইউরোপ জুড়ে দশ হাজারের বেশি ইহুদিকে হত্যা করা হয়[৩]।

প্রথম ক্রুসেড (১০৯৫-৯৯ খ্রিস্টাব্দ) ইউরোপীয় ইহুদির জীবন আমুল পরিবর্তিত করে দেয়। বদলে যায় খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি। ১০৫৪ সালে বাইজেনটিয়ামের চার্চ এবং গ্রিক অর্থডক্স চার্চ রোমান ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে। ইতিমধ্যে তুরস্কে মুসলমান আক্রমণ হয়েছে। বিপন্ন আলবানিয়া, বুলগেরিয়া এবং গ্রিসের চার্চগুলি বাধ্য হয়ে ফের রোমান ক্যাথলিক চার্চের শরণাপন্ন হয়। পোপ দ্বিতীয় আরবান দেখলেন গ্রিক অর্থডক্স চার্চ এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চের সমঝোতার এই সুযোগ। তিনি তার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি খ্রিস্টান সেনাদল তৈরি করলেন। দ্বিতীয় আরবানের সিদ্ধান্ত উসকে দিয়েছিল যাজক পিটার দ্য হারমিটের প্রচার। পিটারের ব্যাখ্যায় পৃথিবীর তাবত সমস্যার কারণ মুসলমানদের জেরুজালেম দখল করে রাখা। জেরুজালেম মুক্ত হলেই মানুষের জীবনে সুখ শান্তি ফিরবে। উত্তর ফ্রান্সের আমিয়েন নিবাসী পিটার একবার স্বয়ং জেরুজালেমে ঢুকতে গিয়ে সেলজুক তুর্কিদের হাতে বাধা পায়। তার পক্ষে মুসলিম বিরোধী হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। ধর্মীয় আবেগ উস্কে দিয়ে খ্রিস্টান উদ্দীপনা পুনর্জাগরণের হোতা হয়ে যায় পিটার’। পোপ দ্বিতীয় আরবান তাঁর বাহিনী পাঠালেন তুর্কি মুসলমানদের যুদ্ধে হারিয়ে জেরুজালেমের খ্রিস্টান তীর্থগুলি মুসলিম কজামুক্ত করে প্যালেস্টাইনকে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্রে পরিণত করতে। মূলত ফরাসি নাইট ও সেনাদল নিয়ে গঠিত প্রথম ক্রুসেড চলেছিল চার বছর। সন্ন্যাসী ও যোদ্ধার মিশ্রণ গডফ্রে অফ বুলিয়ানের নেতৃত্বাধীন ষাট হাজার ক্রুসেডারের অধিকাংশ ছিল কৃষক, ভাগ্যান্বেষী হতদরিদ্র। দলে নাইট বা যোদ্ধার সংখ্যা অঙ্গুলিমেয়। মধ্যযুগের ইউরোপে এক অভিনব চরিত্র নাইট। ইউরোপের সমাজ তখন চার ধাপ বা ‘এস্টেটে বিভক্ত। প্রথম ধাপ নির্দিষ্ট অভিজাত বা নাইটের জন্য। দ্বিতীয় স্থান যাজকের। তৃতীয় স্থানাধিকারী সাধারণ মানুষ। চতুর্থজন কৃষক বা ‘সার্ফরা আবার কোনো ‘এস্টেট’-ভুক্ত নয়। নাইটদের কাজ শুধু যুদ্ধ করা। ফলে যখন যুদ্ধ নেই তখন তারা কার্যত বেকার। এই তথাকথিত ‘অভিজাতদের’ রুজিরোজগার জোগাতে মধ্যযুগের ইউরোপকে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে যেতে হয়েছে অবিশ্রাম। ১০৯৯ সালে বারো হাজার ক্রুসেডারের দল জেরুজালেমে হাজির হল। ইতিহাস বড়ই রসিক। যে সেলজুক তুর্কিদের হটাতে ক্রুসেডের শুরু দেখা গেল একবছর আগেই ১০৯৮ সালে তাদের জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত করেছে ফতিমিদ শিয়া মুসলিমরা। খ্রিস্টানদের দুর্ব্যবহারে অনেক আগে থেকে ক্ষুব্ধ ইহুদিরা জেরুজালেম রক্ষার লড়াইয়ে মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। গডফ্রে অফ বুলিয়ান জেরুজালেম দখলের পর হত্যা করা হয় মসজিদ এবং সিনাগগে আশ্রয় নেওয়া মুসলমান এবং ইহুদিদের। ইউরোপের রাইন ও দানিয়ুব অঞ্চলের বর্ধিষ্ণু ইহুদি সম্প্রদায় নির্মূল হয়ে যায় ফরাসি ধর্মযোদ্ধাদের হাতে। জার্মানির স্পেয়ার, মেইনজ, ওয়ামর্স প্রভৃতি শহরে খ্রিস্টীয় দশম, একাদশ শতক থেকে ইহুদি বণিকের দল বাস করেছে। চার্চের বিরোধীতা উপেক্ষা করে প্রথম ক্রুসেডের ফরাসি বাহিনী ওইসব এলাকায় তাদের ব্যাপক নিধনে মাতে। অবশিষ্টদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়। ইউরোপের ইতিহাসে বলপ্রয়োগ করে ইহুদিদের ধর্মান্তকরণের এটাই প্রথম বড় নজির। প্রথম ক্রুসেডের ফলে পরবর্তী একশো বছর ফ্রান্সে ইহুদিদের বিরুদ্ধে প্রবল বিদ্বেষ তৈরি হয়। ইহুদিদের বিরুদ্ধে ভুয়ো অভিযোগ ছিল তারা খ্রিস্টান শিশুদের হত্যা করে তাদের রক্তে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে। দ্বিতীয় ক্রুসেডের (১১৪৬-৮ খ্রিস্টাব্দে) চার দশক বাদে ১১৮১ সালে ফিলিপ অগস্টাস ফ্রান্সের রাজা হবার একবছরের মধ্যেই ফ্রান্স থেকে নির্বাসিত হয় ইহুদিরা। আশ্রয়ের খোঁজে যে দেশে সব শেষে পৌঁছেছিল ইহুদিরা (আনুমানিক ১০৭০ খ্রিস্টাব্দ) সেই ইংল্যান্ড থেকে ক্রুসেডের প্রায় অন্তিম লগ্নে ১২৯০ সালে প্রথম এডওয়ার্ডের আদেশে নির্বাসিত হল তারা। রোমান ক্যাথলিক চার্চের নাগাল ছাড়িয়ে খ্রিস্টধর্মের একেবারে প্রান্তিক বিন্দুতে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, রাশিয়ায় ছড়াতে থাকে ইহুদিরা। এইসব দেশের সমকালীন সমাজে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি আনুপাতিক হারে নগণ্য থাকায় ইহুদি বিদ্বেষ এবং নির্যাতন তুলনায় অনেক কম ছিল। তাছাড়া বাণিজ্যের সম্ভাবনাও বেশি ছিল। ত্রয়োদশ, চতুর্দশ শতকের পোলিশ সমাজে ইহুদিদের অবস্থান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে ওই আমলের বহু পোলিশ মুদ্রায় হিব্রু ও পোলিশ দুটি ভাষারই হরফ খোদিত দেখতে পাওয়া যায়।

ক্রুসেডের আসল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছিল। দু’শো বছরের লড়াই শেষে জেরুজালেম এবার এক দুর্ধর্ষ মুসলিম রাজশক্তির করায়ত্ত হল। এই মিশরি দাসবংশীয় মামলুকরা দিল্লির কুতুবউদ্দিন আইবক (১২০৬-১২৯০)-এর স্বগোত্রীয়। জেরুজালেম খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীর সংখ্যা আরও হ্রাস পায় এবং সীমিত সংখ্যক তীর্থযাত্রীরা প্রাণভয়ে সন্ত্রস্ত ছিল। জেরুজালেমের পূর্ববর্তী ফতিমিদ এবং আয়ুবিদ প্রশাসকরা নানা ধর্মসমন্বয় মেনে নিলেও ক্রুসেডারের অতীত আক্রমণের দুঃস্মৃতি জেরুজালেমের নতুন মামলুক প্রশাসকদের স্বাভাবিকভাবেই আরও কঠোর মনোভাবাপন্ন করে তোলে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের যে প্রতিপত্তি ও সম্মান প্রথম ক্রুসেডের সাফল্যে বৃদ্ধি পেয়েছিল পরবর্তী ক্রুসেডগুলি তা ধাপে ধাপে নষ্ট করে। ক্রুসেডের ব্যর্থতা চার্চের সম্মান ও খ্রিস্টীয় বিশ্বাসকে দুর্বল করে। মুসলিম বাণিজ্য এবং শিল্পের সঙ্গে পরিচয় ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার উন্মেষ ঘটায়।

১. The Story of Civillization Vol. IV, The age of Faith: Will Durant: Simon & Schuster.

২. en.wikipedia.org/wiki/seljuq_dynasty (Wikipedia org/wiki/seljuq_dynasty.

৩. www.jewishhistory, org/ the First crusdae

৪. ওই

৫. aitzhayim.com/jewish-life-in medievaleurope.

৬. The Jews: Story of A People : Howard Fast: A Laurel Book.

উনিশ

স্পেনের স্বর্ণযুগ-সেফারডিক ইহুদি-স্পেন ও পর্তুগাল থেকে বহিষ্কার

আব্রাহামের মেসোপটেমিয়া থেকে মোজেসের মিশর, ডেভিড, সলোমনের রাজ্যপাট থেকে ব্যাবিলন নির্বাসন, পরে আইবেরীয় উপদ্বীপে স্পেন, পর্তুগাল এবং ভূমধ্যসাগর অঞ্চল- এই বৃত্তে আবর্তিত হতে থাকা ইহুদি ইতিহাস বিগত কয়েক শতাব্দী বাদে পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতির ইতিহাস যাকে আজকের সেফারডিক সংস্কৃতি বলা হচ্ছে। সপ্তদশ শতকের আগে অবধি ইহুদি জনসংখ্যার বেশিরভাগ সেফারডিক এবং ইহুদি কৃষ্টির মূলকেন্দ্রগুলিও সেফারডিক ছিল। গত তিন চার শতকে ইউরোপীয় ইহুদিদের সংখ্যা এবং তাদের সাংস্কৃতিক প্রাধান্য বাড়ে যার কারণে অনেকটা ম্রিয়মান দেখিয়েছে সেফারডিক সংস্কৃতিকে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের ধারণা আইবেরিয় উপদ্বীপে ইহুদিদের প্রথম আসা রোমান সৈন্যদের অনুগামী বণিক হয়ে। দ্বিতীয় দলটা এসেছিল ৭০ খ্রিস্টাব্দে জিহোভার দ্বিতীয় মন্দির রোমানদের হাতে ধ্বংস হলে। তৃতীয় খ্রিস্টীয় শতকের সালমনুল্লা (Salomonulla) নামে এক অল্পবয়সী ইহুদি মেয়ের কবর আবিষ্কৃত হয়েছে স্পেনের আডরায় (Adra)। যেটা স্পেনে হিব্রু উপস্থিতির প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য দেয়। স্প্যানিশ সেফারডিক ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠশতকে ব্যাবিলনের রাজা নেবুকাডনেজারের হাতে প্রথম জিহোভা মন্দির ধ্বংস হবার সময়ই আইবেরীয় উপদ্বীপে হাজির হয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষ। আর এক দলের মত, খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে রাজা সলোমনের আমলে ফিনিশীয় সমুদ্র বণিকদের সঙ্গে স্পেনে পৌঁছয় হিব্রুরা। কিছু স্প্যানিশ পরিবারের দাবি তারা রাজা ডেভিডের বংশধর। এ দাবির সমর্থনে তারা ওবাড়িয়া-র (Obadiah/আরবি আবদুললা অথবা ওবাইদুললা ) ভবিষ্যতবাণী উল্লেখ করে। ট্যালমুডে নবি ওবাডিয়ার ভবিষ্যতবাণীতে ‘সেফারাড’ ভূখণ্ডের উল্লেখ আছে যেখানে জেরুজালেম থেকে নির্বাসিত ইহুদিরা আশ্রয় নেবে বলে পূর্বাভাস দেন নবি’। পরবর্তী সময় স্পেনীয় ও পর্তুগিজ ইহুদিরা সেফারডিক ইহুদি হিসাবে পরিচিত হল। ইউরোপের অন্য ইহুদিদের বলা হয় আস্কেনাজিম (হিব্রু আস্কেনাজ অর্থ জার্মানি, রাইন নদীর উপত্যকায় ক্রুসেডের কাল অবধি বাসকারী ইহুদি)।

ভূমধ্যসাগরীয় স্পেনের সংস্কৃতি বহুমাত্রিক। কার্থেজীয়, রোমান ও ভিসিগথ শাসন এবং অষ্টম শতকে আরব মুসলমানদের স্পেন বিজয় প্রভাবিত করে স্পেনের সমাজ ও সংস্কৃতিকে। কার্থেজীয় সাম্রাজ্যে দক্ষিণ স্পেনের শহরগুলিতে ইহুদি প্রভাব ছিল কার্থেজ ধ্বংস হতে যা নষ্ট হয়। পরবর্তী শাসক রোমানদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল ইহুদিদের। কৃষিকাজ ও বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ছিল রোমান স্পেনের ইহুদি। খ্রিস্টধর্ম রোমের সরকারি ধর্মের স্বীকৃতি পাবার আগে পর্যন্ত স্পেনের অর্থনীতি এবং সমাজ জীবনে ইহুদি প্রভাব বজায় থাকে। অ-ইহুদি জনসমষ্টির সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল তাদের। ক্যাথলিক রোমান শাসনে ইহুদিদের উপর নির্যাতন শুরু হল। রোমান ক্যাথলিক শাসকের চোখে অন্য বিধর্মীদের তুলনায় স্পেনের ইহুদিরা অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ইহুদি ও অন্যান্য বিধর্মীদের সঙ্গে খ্রিস্টান বিবাহ, একত্র ভোজন নিষিদ্ধ কর রোমান ক্যাথলিক চার্চ। পঞ্চম শতকে ভিসিগথরা আইবেরিয় উপদ্বীপের দখল করে। ভিসিগথরা ছিল আরিয়ন খ্রিস্টান। আলেকজান্ড্রিয়ার খ্রিস্টান পুরোহিত আরিয়াসের (২৫০-৩৩৬ খ্রিস্টাব্দ) প্রবর্তিত আরিয়ান খ্রিস্টধর্ম ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে নিকাসিয়ায় অনুষ্ঠিত খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের প্রথম সভায় অগ্রাহ্য হয় এবং আরিয়াসকে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে বহিষ্কার করে রোমান ক্যাথলিক চার্চ। পশ্চিম ইউরোপে আরিয়নিজম ছড়ায় আরিয়ান মিশনারি উলফিলাদের (Ulfilas) মাধ্যমে। গথ, ভ্যান্ডালরা আরিয়ান খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। পরে এরা ক্যাথলিক হয়ে যায়। ভ্যান্ডাল, ভিসিগথদের প্রতাপে ইউরোপের পশ্চিমে প্রথমদিকে ঠিক জাঁকিয়ে বসতে পারেনি রোমান ক্যাথলিক চার্চ। এরা রোমের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাবকে একরকম ধসিয়ে দেয়। এর ফলে বেশ কিছু শতাব্দী এই এলাকার ইহুদিরা নিরাপদে ছিল। ভিসিগথরা উত্তর আফ্রিকা, স্পেন দখল করলে ইহুদিদের সামাজিক সম্মান উভয় অঞ্চলেই বাড়ে। রোমান ক্যাথলিকদের রোম সাম্রাজ্যের প্রতিভূ মনে করত ভিসিগথরা। ফলে রোমান ক্যাথলিকদের উপর খড়্গহস্ত হলেও অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসীদের সম্পর্কে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। ভিসিগথদের কাছে ইহুদিরা ছিল সভ্যতার অপরিহার্য অংশ। তারা ইহুদিদের কাছে পেল চিকিৎসক, ল্যাটিন শেখার শিক্ষক, রেশম, সুগন্ধি, হিরে-জহরত, মশলার বণিক, প্রাসাদ তৈরির স্থপতি, বাণিজ্যপোত। ৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে ভিসিগথ শাসক আরিয়ান খ্রিস্টধর্ম পরিত্যাগ করে ক্যাথলিক খ্রিস্টান হবার পর থেকে অবস্থা বদলে গেল’। রাজ্যের ভিত মজবুত করতে সদ্য ক্যাথলিক ভিসিগথ শাসক ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে ওঠে। ইহুদি ধর্মাচার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়। ইহুদি ও অ-ইহুদি মিশ্র বিবাহজাতদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হল ৬২০ খ্রিস্টাব্দে। ভিসিগথ রাজা ইহুদিদের উদ্দেশে নির্দেশ জারি করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ অথবা স্পেন পরিত্যাগ যে কোনো একটা তাদের বেছে নিতে হবে। কিছু ইহুদি গল এবং উত্তর আফ্রিকায় পালায়। প্রায় নব্বই হাজার ইহুদি ধর্মান্তরিত হয়। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি ভিসিগথ শাসিত স্পেনে ইহুদিদের চরম দুর্দশা ভোগ করতে হয়। সমস্ত ধরনের ইহুদি ধর্মাচার নিষিদ্ধ হল। ধর্মান্তরিত ইহুদিদের মুচলেকা দিতে হয় যে তাদের পরিবার বা গোষ্ঠীর কোনো সদস্য গোপনে ফের ইহুদি হবার চেষ্টা করলে তাকে পাথর ছুঁড়ে অথবা পুড়িয়ে মেরে ফেলতে বাধ্য থাকবে তারা। কোনো রাজকর্মচারী, রাজ অমাত্য ইহুদিদের ধর্মাচরণে সাহায্য করলে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে বলেও আদেশ জারি হল। জারি হল বাড়তি কর, খ্রিস্টানদের কাছে কেনা সম্পত্তি অল্প দামে বাধ্যতামূলক বিক্রি ইত্যাদি অর্থনৈতিক শাস্তি। ৭১১ সালে আরব মুসলিম সেনার দক্ষিণ ও মধ্য স্পেন বিজয়ের পিছনে ইহুদি মদত কতটা ছিল তা স্পষ্ট না হলেও একথা সত্যি যে ক্যাথলিক চার্চের পীড়ন ও অত্যাচার স্পেনের অবশিষ্ট ইহুদিদের ভিসিগথ শাসন সম্পর্কে সম্পূর্ণ বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। মরক্কোর উত্তর উপকূল থেকে স্পেন অভিযানে আসা মুর সেনা নায়ক তারিক ইবন জিয়া ইহুদিদের চোখে খুব স্বাভাবিক কারণেই পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন। যে শহরে মুর সৈন্যবাহিনী গেছে ইহুদিরা তাদের সোল্লাসে স্বাগত জানিয়েছে, সাহায্য করেছে। টলেডো, গ্রানাডা, মালাগা শহরগুলি একে একে দখল করে মুর সেনা। ইহুদি এবং মুর সৈন্য যৌথভাবে পাহারা দেয় সেগুলি। এভাবেই শুরু স্পেনীয় ইহুদিদের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। স্পেন বিজয়ের পর মুররা ইহুদিদের আলাদা থাকার জায়গা বা ‘ধিম্মি’নির্দিষ্ট করে দেয়। মুসলিম স্পেনে ইহুদিরা অনেক সুবিধা পেয়েছে। সমকালীন দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের মুর শাসিত স্পেনে চলে আসাই তার প্রমাণ। খ্রিস্টীয় অথবা মুসলিম যে কোনো দেশে বসোবাসকারী ইহুদিদের কাছেই মুর স্পেন তখন স্বর্গরাজ্য। ৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আবদ আর রহমান শাসক হবার পর ইউরোপ, মরক্কো, ব্যাবিলন, আরব দুনিয়া থেকে দলে দলে স্পেনে আসতে থাকে ইহুদিরা। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা ইহুদি কৃষ্টি সমন্বয় সেফারডিক ইহুদির সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক মানোন্নয়নে সহায়ক হয়। সুবর্ণযুগ বস্তুত ভালো মন্দর মিশ্রণ। দশম শতাব্দী ও তার পরবর্তী সময়ের ইউরোপে ইহুদির জীবনকে হাওয়ার্ড ফাস্ট মজা করে তুলনা করেছেন বারোমেসে দাঁত ব্যাথার সঙ্গে। যখন থাকে না তখন জীবন বড়ই সুন্দর। যখন চাগাড় দেয় তখন সে মৃত্যুযন্ত্রণাতূল্য। তিনশো বছরের মুর শাসনে স্পেনের ইহুদি পেয়েছে নির্বিচারে খুন না হবার ভরসা, সামান্য হলেও আইনি সুবিধা, ভ্রমণের অধিকার, ভিসিগথদের ভেঙে দেওয়া সিনাগগ তৈরির অনুমোদন। বিনিময়ে মুর স্পেনকে ইহুদির দান সমকালীন দুনিয়ার সেরা বিজ্ঞানসম্মত ভেষজ ও চিকিৎসা পদ্ধতি। ইহুদি চিকিৎসাবিদদের যাবতীয় জ্ঞান আরবি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ইহুদি বাস্তুবিদ তৈরি করেছে জল সরবরাহ ও নিকাশি ব্যবস্থা। ইহুদি বণিক ছকে দিয়েছে বাণিজ্য পথ স্পেনের সামনে যা গোটা দুনিয়ার পথ উন্মুক্ত করে দেয়। ইউরোপে চিনা রেশম বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে স্পেন। হিব্রু ও আরবি ভাষায় লেখা হয় সমৃদ্ধ ইহুদি সাহিত্য। কবিতা, নাটক, ভ্রমণ কাহিনি। বেশ কিছু সংখ্যক ইহুদি মুর রাজদরবারে রাজা, রাজপুত্রদের পরামর্শদাতা হিসেবে নিযুক্ত হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য হাসাদাই ইবন-শাপ্রুট এবং স্যামুয়েল ইবন-নাগ্রেলার নাম। সমকালীন বিশ্বে খ্যাতনামা শাপ্ৰুট করডোভা খালিফের উজির ছিলেন। গ্রানাডার রাজার উজির ছিলেন স্যামুয়েল ইবননাগ্রেলা।

১১৪৮ সালে স্পেন আল মোহাদ মুসলিমদের দখলে আসার পর ইহুদি ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের উদ্দেশে ফরমান জারি হল, হয় মুসলিম ধর্মগ্রহণ কর নয়তো স্পেন ছাড়। আগে উল্লেখ করেছি এই সময় মোজেস মেইমনডিসের মতো বিখ্যাত চিকিৎসক এবং দার্শনিককে স্পেন ছেড়ে যেতে হয়। উত্তর স্পেনের খ্রিস্টান রাজারা এতদিন মুসলিম স্পেনে ইহুদিদের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবদান চাক্ষুষ করে হাত কামড়েছে। কিছু ইহুদি চিকিৎসককে আমন্ত্রণও জানান কাস্টিলের রাজা সেখানে বসবাস করার জন্য। আলমোহাদিদের ইহুদি নিগ্রহ খ্রিস্টান শাসকদের সামনে বড় সুযোগ এনে দেয়। ইহুদিদের জন্য উন্মুক্ত করা হল খ্রিস্টান স্পেন ও খ্রিস্টান পর্তুগালের দরজা। কাস্টিলের রাজা যথাক্রমে ষষ্ঠ ও সপ্তম আলফানসোর আইন খ্রিস্টান ও ইহুদিকে সমমর্যাদা দিল। ১১০৭ সালে টোলেডোর ইহুদি বিরোধী দাঙ্গা কঠোর হাতে দমন করা হল। উত্তর স্পেনের অপর রাজ্য আরাগনের রাজা প্রথম জেমস ইহুদিদের আহ্বান করলেন মাজরোকা, কাটালোনিয়া, ভ্যালেন্সিয়ায় এসে থাকতে। বহুক্ষেত্রে ইহুদিদের জমি ও বাসস্থান দেওয়া হল। খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের মধ্যে পরবর্তী একশো বছর শান্তি বজায় রইল। দ্বাদশ শতকে বার্সিলোনার বাণিজ্যে ইহুদি অধিপত্য একচ্ছত্র এবং বার্সিলোনার এক তৃতীয়াংশ জমি ইহুদিরা ভোগ করছে। স্পেনের ইহুদিদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপান হলেও, তাদের আর্থিক বিকাশ এবং অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন অক্ষুন্ন থেকেছে। খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুরের ত্রিপাক্ষিক বাণিজ্য অবান ছিল। তারা উৎসবে, অনুষ্ঠানে পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়, সৌজন্য, উপহার বিনিময় চলে। কোনো কোনো খ্রিস্টান রাজা সিনাগগ তৈরির জন্য অর্থ সাহায্য করেন। ১০৮৫ থেকে ১৪৯২ অবধি খ্রিস্টান স্পেনে আর্থিক প্রতিনিধি, কূটনীতিক, মন্ত্রী ইত্যাদি পদে বহাল ইহুদিরা। ইহুদিদের অন্তর্কলহ নতুন বিপর্যয় ডেকে আনে। ১১৪৯-এ লিওন এবং কাস্টিলের রাজা ষষ্ঠ আলফানসোর প্রাসাদের তত্ত্বাবধায়ক জেহুদা বেন এজরা টোলেডোর ইহুদিদের উপর অত্যাচার চালাতে রাজাকে প্ররোচিত করে। এর ফলে টোলেডোর কোয়ারাইট ইহুদি গোষ্ঠী নির্মূল হয়ে যায়। ১২১২ সালে ক্রুসেড বাহিনী স্পেনে ঢোকে মুরদের তাড়াতে। এদের একাংশ ইহুদি নিধনে মাতলে বাধা দেয় প্রতিবেশী খ্রিস্টানরা। দশম আলফানসো আইন ব্যবস্থায় ইহুদি বিরোধী কানুন প্রবর্তন করলেও তা চালু হয় প্রায় একশো বছর বাদে। আলফানসোর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, কোষাধ্যক্ষ দুজনই ছিল ইহুদি। সেভিলে মুসলমানদের বিতাড়িত করে পাওয়া তিনটি মসজিদ সিনাগগ তৈরি করতে ইহুদিদের হাতে তুলে দেন দশম আলফানসো। আলফানসো স্বয়ং মুসলিম ও ইহুদি পাণ্ডিত্যের কদর করতেন। তাঁর আস্থা ছিল যে ব্যবসায়িক কারণে বিশ্ব পরিভ্রমণকারী ইহুদিরাই একমাত্র গোটা দুনিয়ার মানচিত্র আঁকতে সক্ষম, যে মানচিত্রে থাকবে চিন, রাশিয়া, ভারত, মধ্য এশিয়া, স্ক্যান্ডিনেভিয়া বিষয়ে যাবতীয় তথ্য। তারা মণিমাণিক্য থেকে সুগন্ধির মতো দুষ্প্রাপ্য জিনিসের ব্যবসা করে। অধিকাংশ ভাষা তারা জানে এবং অনুবাদের কাজে তাদের দক্ষতা আছে। তারা নক্ষত্র পর্যবেক্ষণে প্রয়োজনীয় যন্ত্র বানাতে সক্ষম। মধ্যযুগের সদ্য সভ্য ইউরোপীয় রাজদরবারে তখন খুব কদর জ্যোতির্বিদ্যার। সব মিলিয়ে কাস্টিলের রাজসভায় ইহুদিদের তখন রমরমা। ১৩১৩ সালে জামোরার খ্রিস্ট ধর্মসম্মেলন রায় দেয় ইহুদিদের আলাদা ব্যাজ ধারণ করতে হবে। খ্রিস্টান ইহুদি অবাধ মেলামেশা বন্ধ করে দুই সম্প্রদায়কে আলাদা করা হবে। খ্রিস্টানরা ইহুদি চিকিৎসক রাখতে পারবে না অথবা কোনো ইহুদি খ্রিস্টান ভৃত্য রাখতে পারবে না। তাত্ত্বিকভাবে ইহুদিদের সরাসরি আক্রমণের অধিকার স্পেনের ডমিনিকান খ্রিস্টানদের ছিল না। তাদের নিয়ন্ত্রণের আওতাভুক্ত ছিল কেবলমাত্র খ্রিস্টানরা। এবার তারা ইহুদি বিরোধী প্রচার শুরু করল। তাদের ধর্মোপদেশগুলি পরিকল্পিতভাবে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ঘৃণা উসকে দিতে থাকে। ধীরে ধীরে তারা খ্রিস্টান স্পেনকে স্পেনীয় ইহুদিদের গণনিধন শুরু করতে রাজি করায়। ধর্মান্তরিত হবার বিকল্পটুকু ইহুদিদের দেওয়া হল। সেটা ১৩৯১ সাল। একই নির্দেশ জারি হল পর্তুগালের ইহুদিদের জন্য। ধর্মান্তর অথবা মৃত্যু এ দুইয়ের মাঝে বেছে নিতে গিয়ে অধিকাংশ স্পেনীয় ইহুদি ধর্মান্তরিত হয়। স্পেন ও পর্তুগালে এদের বলা হত ‘মাররানো’। স্প্যানিশ ভাষায় তর্জমা করলে শুয়োর। ইহুদি ইতিহাসে গণধর্মান্তকরণের এমন দ্বিতীয় নজির নেই। সংখ্যাটা তিন থেকে দেড় লক্ষের আশেপাশে ছিল বলে অনুমান। খ্রিস্টধর্মের রীতি অনুযায়ী তাদের ব্যাপটিজম হলেও বস্তুত বেশিরভাগ ধর্মান্তরিত ইহুদি ইহুদিই থেকে যায়। নিভৃত গৃহকোণ, আত্মীয় পরিজনের মধ্যে সংগোপনে তারা তাদের পুরনো ইহুদি প্রার্থনাই করত, সাবাথ উৎসবের আগের রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে উপাসনা করত। তাদের ঘরের কুলুঙ্গিতে লুকনো থাকত পবিত্র টোরার পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে ‘মাররানো’দের উপর ডমিনিকান খ্রিস্টানদের অত্যাচারের মাত্রা বাড়ে। ষড়যন্ত্রকারী অপবাদে তাদের বেঁধে পুড়িয়ে মারা, সম্পত্তি ক্রোক করা চলতে থাকে। একসময় যে দেশ নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল ছিল সেই স্পেন ইহুদির দুঃস্বপ্নের রাজ্য হয়ে দাঁড়ায়। বহু ইহুদি প্রাণভয়ে দক্ষিণের মুসলিম দেশ, উত্তর আফ্রিকায় পাড়ি দেয়। ১৪৭৮ কাস্টিলের রানি ইজাবেলা এবং আরাগনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ট্রাইবুনাল অফ দি হোলি অফিস অফ ইনক্যুইজিশন চালু করলেন স্পেনে। এই ইনক্যুইজিশন পোপের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না। এর মূল লক্ষ ছিল স্পেনের ধর্মান্তরিত ইহুদি ও মুসলমানদের খ্রিস্টধর্মে নিষ্ঠা ও আনুগত্য পরীক্ষা। তথাকথিত এই পরীক্ষায় ধর্মদ্রোহীতার সাজানো অভিযোগে তিন থেকে পাঁচ হাজার ইহুদিকে পুড়িয়ে মারা হয়। ১৪৯২ সালে রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইজাবেলা স্পেনের ইহুদিদের বহিষ্কারের হুকুম দিলেন। স্পেনে তখন দেড়লক্ষ ইহুদির বাস। এই সেফারডিক ইহুদিরা তাদের প্রাচীন স্প্যানিশ-হিব্রু ভাষা ল্যাডিনো ভাষা ও সংস্কৃতি বয়ে নিয়ে চলে ভূমধ্যসাগরীয় জগতের সর্বত্র এবং দক্ষিণ আমেরিকায়। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের পরবর্তী প্রজন্ম ১৬৯২-তে উত্তর আমেরিকার ম্যানহাটন দ্বীপে পৌঁছয়। সেখানে প্রথম সিনাগগ স্থাপিত হয়। স্পেন, পর্তুগাল এবং ফ্রান্সের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমের আইবেরিয় উপদ্বীপ অবশেষে ইহুদি শূন্য হয়ে যায়। আইবেরিয়ায় ইহুদিদের দু’হাজার বছরের উপস্থিতিতে পূর্ণচ্ছেদ টানে স্প্যানিশ ইনক্যুইজিশন।

***

১ . দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্বে ভূমধ্যসাগর, উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিমে আটলান্টিক বেষ্টিত তিন প্রধান ইউরোপীয় উপদ্বীপের (আইবেরীয়, ইটালিয়ানস বন্ধান) পশ্চিমভাগ আইবেরীয় উপদ্বীপ। উত্তর-পূর্ব থেকে উঠে আসা পিরানিজ পর্বতমালা ইউরোপের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে আইবেরীয় উপদ্বীপকে। এর দক্ষিণ চূড়া আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম উপকূল ঘেঁষা। ছেদবিন্দু জিব্রাল্টার প্রণালী। বর্তমানে স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, জিব্রাল্টারের রাজনৈতিক সীমানা রয়েছে আইবেরীয় উপদ্বীপে। মাদ্রিদ, বার্সিলোনা (স্পেন), লিসবন, পোর্টো (পর্তুগাল), ভ্যালেন্সিয়া (স্পেন) প্রভৃতি শহর অবস্থিত।

২. ওবাডিয়া (জিহোভার ভৃত্য অর্থে) কে ছিলেন সঠিক জানা যায় না। তার সময় কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি। ধর্মান্তরিত ইহুদি ওবাড়িয়াকে ওল্ড টেস্টামেন্ট বর্ণিত জোব-এর বন্ধু বলা হচ্ছে। পশ্চিমী চার্চগুলি ওবাডিয়াকে সম্ভের মর্যাদা দেয়।

3. http://www.jewishgen.org/sefardsig/seph_who.htm

৪. ৩২৬ খ্রিস্টাব্দে নিকসিয়ায় (সাইপ্রাসের রাজধানী শহর) রাজা প্রথম কনস্টানটাইন আয়োজিত প্রথম খ্রিস্টধর্ম সম্মেলন আরিয়াসকে বিধর্মী ঘোষণা করে। সূত্র: http://en.wikipedia.org/wiki/First_Council_of_Nicaa

৫. মরক্কো, আলজেরিয়া, পশ্চিম সাহারার মধ্যযুগীয় মুসলিমদের মুর বলা হত।

৬. The Jews: Story of A People : Howard Fast: A Laurel Book p.211

কুড়ি

সেফারডিক ও আস্কেনাজি ইহুদি

বিশ্বের বিভিন্ন কোণে ছড়িয়ে যাওয়া ইহুদিদের মধ্যে ভাষা ও কৃষ্টির ফারাক স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে। ধর্মের বাঁধন সত্ত্বেও তা কখনোই মোছেনি বরং ইহুদি সংস্কৃতিকে বৈচিত্রময় করেছে। এশীয় ইহুদি ও ইউরোপীয় ইহুদিদের মধ্যে ফারাক যেমন হয়েছে তেমনই ফারাক ইউরোপের পূর্ব ও পশ্চিমের ইহুদির মধ্যে। ইহুদি ‘ডায়াস্পোরা’র দীর্ঘ ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য এমনই দুই গোষ্ঠী সেফারডিক এবং আস্কেনাজি। এছাড়াও রয়েছে ইয়েমেনি, ইথিওপিয়, উত্তর আফ্রিকার মিজরাহি, বেইট আভ্রাহাম ইহুদি ও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। সামগ্রিকভাবে ইহুদি সংস্কৃতিতে এদের প্রভাব তেমন উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ইহুদি ধর্মে সেফারডিক ও আস্কেনাজির ফারাকের উৎস ধরা হয় খ্রিস্টীয় হাজার শতকে র‍্যাবাই গারশম বেন জুডার বহুবিবাহ বিরোধী নির্দেশকে যা আস্কেনাজি ইহুদিরা মেনে নিলেও সেফারডিক ইহুদিরা মানেনি। সেফারডিক ইহুদি সনাতনপন্থী। ইহুদি ধর্মীয় আইনের সেফারডিক ব্যাখ্যা আস্কেনাজিদের থেকে আলাদা। সেফারডিক ইহুদিরা হিব্রু ভাষার কিছু স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ পৃথকভাবে উচ্চারণ করে। সেফারডিক প্রার্থনায় বিভিন্ন সুর ব্যবহার হয় এবং ওদের প্রার্থনার ধরন আস্কেনাজিদের থেকে ভিন্ন। সেফারডিকদের উৎসব পালন রীতি আলাদা। উৎসবের দিন ওদের মধ্যে সনাতন খাবারের চল রয়েছে। ‘পাসওভার’ উৎসবে সেফারডিক ইহুদির ভোজ্য ভাত, ভুট্টা, বাদাম, বিনস। আস্কেনাজি ইহুদি এগুলি ছোঁবে না। সেফারডিক ইহুদির ভাষা স্প্যানিশ ও হিব্রুর মিশেল ল্যাডিনো। আস্কেনাজির ভাষা জার্মান ও হিব্রুর মিশ্রণে তৈরি ইডিশ। আস্কেনাজি ইহুদির তুলনায় সেফারডিক ইহুদি স্থানীয় অ-ইহুদি সংস্কৃতি বেশি আত্মস্থ করে। তার কারণও খুব স্পষ্ট। দুটি গোষ্ঠীর সামাজিক প্রেক্ষিত ভিন্ন। আস্কেনাজি ইহুদি সংস্কৃতি বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে ইউরোপের সেইসব দেশে যেখানকার সমাজে খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল ও সঙ্কটময় ছিল। ইচ্ছায় হোক অথবা বাধ্য হয়ে আস্কেনাজি ইহুদিকে খ্রিস্টান প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে হত। অপরপক্ষে সেফারডিক ইহুদিরা স্পেন, পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় দেশগুলির তুলনামূলকভাবে উদারপন্থী ইসলামিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণে মুসলিম দুনিয়ার সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন অপ্রতিরোধ্য ছিল। সেফারডিক ইহুদি ভাবধারায় আরব ও গ্রিক দর্শন এবং বিজ্ঞানের প্রভাব অনেকখানি’। আস্কেনাজি বলতে মধ্যযুগের ফ্রান্স, জার্মানি, পূর্ব ইউরোপের ইহুদি ও তাদের আধুনিক প্রজন্ম বোঝায়। হিব্রু ‘আস্কেনাজ’-র অর্থ জার্মানি। জার্মানিতে প্রথম ইহুদি বসতির নিদর্শন আনুমানিক চতুর্থ শতাব্দীর। এরা পেশায় বণিক ছিল। রাইন উপত্যকায় অস্ট্রোগথ ভিসিগথ, ভ্যান্ডাল, ফ্রাঙ্ক, টিউটন যাযাবর গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে রোমান সেনা অভিযানে ইহুদি বণিকদলও ছিল। তারা যেমন রোমান সৈন্যদের সোনা, রূপো, সুগন্ধি বেচত, তেমনই তাদের খদ্দের ছিল ওই যাযাবরেরা। হাজার বছরের বেশি সময় জার্মানি ও ফ্রান্সের সমাজে অপরিহার্য অঙ্গ ছিল আস্কেনাজি ইহুদি। রাইন উপত্যকার যাযাবর গোষ্ঠীপতিরা তখন সবেমাত্র অলোকপ্রাপ্ত এবং ধনী। বাইজেন্টিয়াম, পারস্য, ভারতীয়, চিনা, গ্রিক সভ্যতার মিশ্রণ ইহুদি বণিক দুনিয়ার সেরা ঐশ্বর্য ও সংস্কৃতির বার্তাবাহক হয়ে আসে তাদের কাছে। গথিক যাযাবররা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পরও তাদের সমাজ ইহুদিদের জন্য মুক্ত থেকেছে। ক্রুসেডের পর এই অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।

*

১. www.jewishvirtuallibrary.org/jsource/Judaism/Ashkenazim.html

২. Judaism 101 www.jewfaq.org/ashkseph

একুশ

মধ্যযুগের ইহুদি বৈদ্য

ধর্মীয় মতপার্থক্য পারস্পরিক সম্পর্ককে যতই তিক্ত করে থাক, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মধ্যযুগের খ্রিস্টান ও মুসলমান সমাজ ইহুদি নির্ভরশীলতা কাটাতে পারেনি। ইহুদিদের চিকিৎসাচর্চা দীর্ঘদিনের। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধিকাংশ তথ্য ইহুদি ধর্মগ্রন্থ টোরায় সংকলিত হয়েছিল। তার চর্চা পুরুষানুক্রমে বজায় থেকেছে। লাশকাটা খ্রিস্টানধর্মে নিষিদ্ধ হলেও ইহুদিধর্মে ছিল না। ব্যাপারটা অবশ্য খুব সুনজরেও দেখা হয়নি। শিশুপুত্রের সুন্নত প্রথায় ইহুদি শল্য চিকিৎসার সূত্রপাত। খ্রিস্টপূর্ব নবম শতক থেকে ইহুদি বৈদ্য অনেক রকমের কাটা ছেঁড়ায় হাত পাকিয়েছে, বিশেষ করে যুদ্ধে আহত সেনাদের উপর। জীবাণু নিরোধক হিসেবে মদের ব্যবহার, শল্যচিকিৎসায় রোগীকে অজ্ঞান করার ওষুধ তারা জানত। খ্রিস্টীয় শতকে সিজারিয়ান ও অ্যাপেন্ডিসাইটিস অস্ত্রোপচারের দক্ষতাও অর্জন করে ইহুদি শল্য চিকিৎসক। শল্যচিকিৎসা পদ্ধতির পুস্তক লেখে, শল্য চিকিৎসার চমৎকার যন্ত্রপাতি তৈরি করে। হার্টের অসুখ সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল এবং হৃৎপিণ্ডের ফুটো মেরামতি করার অসফল শল্যচিকিৎসাও ইতিমধ্যে করেছে। ঈশ্বরের উদ্দেশে যে পশুবলি হত তার অর্ধেক ভোজ্য ছিল। এই পশুবলি সম্পূর্ণ ধর্মীয় আচার মেনে করা হত ফলে নির্দেশ ছিল যে একমাত্র সুস্থ সবল পশুই বলি দেওয়া যাবে। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলিদাতা থাকত। কসাইদের অবগতির জন্য বিস্তারিত বর্ণনাসহ পশুদের বিভিন্ন রোগ নথিভুক্ত হয়। পশুরোগ নির্ণয়ে কাঁটাছেঁড়ায় হাত পাকানো ইহুদি বৈদ্য বোঝে রোগের বাহ্যিক লক্ষণগুলি আসলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোষকলার পরিবর্তন অথবা ক্ষয়ের ফল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই অভিনব তত্ত্বের প্রথম বিকাশ ইহুদি র‍্যাবাইদের হাতে। ইহুদি বৈদ্যরা যাকে নিবিড় অধ্যয়ন করেছে, চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপ্পোক্রেটসও এমন বৈপ্লবিক তত্ত্ব লিখে যাননি। প্রাচীন ইহুদিরা কাটাছেঁড়া সেলাইয়ে অত্যন্ত পটু ছিল। তারা ছিন্ন ধমনী ও শিরা জোড়া দেবার দক্ষতাও অর্জন করে। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ট্যালমুডে ফুসফুসে ছত্রাক গজানো নিয়ে র‍্যাবাইদের আলোচনা আছে। দু’হাজার বছর আগে র‍্যাবি জেকব আলোচনা করছেন মেরুদণ্ডের আঘাত সম্পর্কে। আলোচনা রয়েছে পুঁজ তার রং ও তার অর্থ বিষয়ে। যকৃতের কাজ, অসুখ, মস্তিষ্কের অসুখ, বিকলাঙ্গতা ইত্যাদি নানাবিধ রোগের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা ট্যোরা ও ট্যালমুডে পাওয়া যায়। জোঁক দিয়ে রক্তমোক্ষণ, রক্তমোক্ষণ কাচের ব্যবহার, প্লীহা, রুগ্ন অন্ডকোষ বাদ দেওয়া, ক্ষত সেলাইয়ের সময় শরীরের নষ্ট মাংস বাদ দেওয়া, আঘাতের ফলে পেট চিরে বেরিয়ে আসা পাকস্থলী পুনস্থাপন, নাকের ভিতরের মাংসপিণ্ড বাদ দেওয়া এসবই জানত ইহুদি বৈদ্য। এছাড়া তলোয়ার ও বর্শার আঘাতের চিকিৎসা যিশুর আমল থেকেই ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। খ্রিস্টান ও মুসলমানের চিকিৎসক ইহুদি তার পেশাকে সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। চিকিৎসক সর্বদা নিরপেক্ষ বিবেচিত হয়েছে এবং সে কারণে দূতেরই মতো অবধ্য। চিকিৎসক হত্যা প্রকারান্তরে আত্মহত্যা। মধ্যযুগের চিকিৎসক দেবতূল্য। যৌনতা বিষয়ে খ্রিস্টধর্মের মাত্রাছাড়া স্পর্শকাতরতা মানবদেহের উপর যে-কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা অসম্ভব করে তুলেছিল। ফলে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। মধ্যযুগের অশিক্ষিত খ্রিস্টান চিকিৎসক বা হাতুড়ে বস্তুত নাপিত ছাড়া অন্য কিছু নয়। অপরপক্ষে ইহুদি বৈদ্যের হাতেখড়ি হিপ্পোক্রেটসের চিকিৎসাশাস্ত্র দিয়ে। হিপ্পোক্রেটসের লেখা বই আরবি ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। ইহুদিদের অধিকাংশ গ্রিক, ল্যাটিন, আর্মায়িক, আরবি ভাষা জানত। গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেনের রচনার সঙ্গেও তারা পরিচিত ছিল। বিখ্যাত চিকিৎসাগ্রন্থ ‘মেডিকেল ক্যানন’-এর রচয়িতা একাদশ শতকের আরবি চিকিৎসক আভিসেন্না-র বিষয়েও অবগত ছিল ইহুদি বৈদ্য। দ্বাদশ শতকে চার্চের ভাষা ল্যাটিন হবার কারণে ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিক ভাষা অজানা ছিল ইউরোপে। ইহুদি ছাড়া হিপ্পোক্রেটস, গ্যালেনের নাম অন্য কেউ শোনেনি। অষ্টাদশ থেকে দ্বাদশ শতক অবধি বাগদাদ ও অন্যান্য মুসলিম শহরে আরব চিকিৎসকদের সমমর্যাদা পেয়েছে ইহুদি চিকিৎসক। হারুন আল রশিদ (৭৬৩-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) বাগদাদে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে আরবি ও ইহুদি চিকিৎসকরা একসঙ্গে চিকিৎসা করেছে। মুসলমান শাসিত স্পেনে অন্তত একশো নামি ইহুদি চিকিৎসকের কথা জানা যায়। এদের একজন আবু মেরওয়ান চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থও লেখেন। ১৪৯২-তে রানি ইসাবেলা মুসলিমদের হাত থেকে স্পেনের ক্ষমতা দখল করে ইহুদিদের বিতাড়িত করেন। ইহুদি চিকিৎসকরা চলে যায় ইটালি, আফ্রিকা, তুরস্ক, পর্তুগাল, জার্মানি, হল্যান্ড এবং আমেরিকায়। সম্ভবত কলম্বাসের ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রায় সঙ্গী ছিল ইহুদি বৈদ্য। পর্তুগিজ রাজপরিবারের লোকজন ইহুদি বৈদ্য ছাড়া হাঁচি কাশি সর্দি জ্বরের চিকিৎসাও করাত না। নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ইটালির প্রতি শহরে ইহুদি চিকিৎসক পাওয়া যেত। ফ্রান্সে ইহুদি চিকিৎসকদের উপর চার্চের বিবিধ আইনি নিষেধ চাপানো হয়। নিজেদের মধ্যে ডুয়েল ও নানারকমের মারদাঙ্গায় হরহামেশা ক্ষতবিক্ষত ফরাসি অভিজাতকূল সেসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইহুদি চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হত অস্ত্রোপচার, সেলাই ফোঁড়াইয়ের জন্য। জাল ধর্মান্তকরণ, মিথ্যাভাষণ, লুকিয়ে রাখা, ছদ্মবেশ দেওয়া এমন নানাবিধ কৌশলে ইহুদি চিকিৎসকদের গণনির্বাসন থেকে রক্ষা করত ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানির অভিজাতরা। সবক্ষেত্রেই যে নিস্তার মিলত তা নয়। মধ্যযুগের ইউরোপে বিউবনিক প্লেগের মতো কালন্তক মহামারি প্রায়ই ছড়াত। আর যখনই তা হত ইহুদি চিকিৎসকদের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠত যে তারা কুয়োর জলে বিষ মিশিয়েছে। জার্মানিতে বহু ইহুদি চিকিৎসক ছিল। বেলজিয়াম, হল্যান্ডে তাদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত। পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়ার অ-খ্রিস্টানদের চোখে ইহুদি চিকিৎসক ছিল জাদু ক্ষমতাসম্পন্ন সন্ত। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত পূর্বের দেশগুলির সঙ্গে একচেটিয়া ঔষধ ব্যবস ছিল ইহুদিদের। তারা ছিল ওষুধ তৈরির যাবতীয় কলাকৌশল জানা ইউরোপের একমাত্র ফার্মাসিস্ট।

বাইশ

ইহুদি ব্যবসায়ী, সুদের কারবারি

মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চ ইহুদি ব্যক্তিমালিকানায় জমি রাখা, শিল্প তৈরির অধিকার বাতিল করলে ইহুদি হয়ে ওঠে পেশাজীবি এবং বণিক। কারিগরি দক্ষতা যেমন সে লগ্নি করে পাশাপাশি গড়ে দেশি ও বিদেশি বাণিজ্য এবং সুদের বিনিময়ে টাকা খাটায়। গেটো বা রাষ্ট্রনির্দিষ্ট ইহুদি বসতিগুলিতে ইহুদি, কসাই, মৃৎশিল্পী, চর্মকার, সোনা ও তামার কারিগর, তাঁতি, ছুতার, দরজি, চিকিৎসক সব পেশার মানুষ পাওয়া যেত। তবে এদের মধ্যে স্বর্ণকার, রত্নব্যবসায়ী ও চিকিৎসকই কেবল সকলের জন্য কাজ করতে পারত। বাকিদের পেশা সীমিত ছিল ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে। নিকট ও দূর প্রাচ্যের বাণিজ্যিক যোগসূত্র ইহুদি ব্যবসায়ী ইউরোপের কাছে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। মুসলিম আরবের দুর্বার অগ্রগতি সমকালীন বিশ্বকে খ্রিস্টান পাশ্চাত্য এবং মুসলিম, বৌদ্ধ, হিন্দু, জোরস্ট্রিয় প্রাচ্য এই দুভাগে ভাগ করে প্রায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দাঁড় করায় ইহুদিকে। মুসলমান ইহুদি সম্পর্ক মোটামুটি স্থিতিশীল থাকা এবং মুসলমানদের প্রবল খ্রিস্টান বিদ্বেষ এ দুই কারণে প্রাচ্য পাশ্চাত্য ব্যবসা বাণিজ্যের সূত্রধরের কাজ করেছে ইহুদি বণিক। স্থল এবং নৌবাণিজ্য সর্বত্র ছড়ানো ছিল ইহুদির। পারস্যের তেহেরান শহর তখন বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্র। আর্মেনিয়া, খোরসান বণিক ক্যারাভানের সংযোগকারী স্টেশন। ইহুদিরা সেখান থেকে পশম, ফার সংগ্রহ করে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করত। স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলিতে পশম ও ফারের ব্যাপক চাহিদা ছিল। দ্বাদশ শতকে বালটিক সাগরের উপকূলে অস্থায়ী বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে ইহুদিরা। সেখানে ভাইকিং জলদস্যু জাহাজ ভিড়িয়ে পশম ও ফার কিনত। বিনিময়ে উৎকৃষ্ট সামুদ্রিক সুগন্ধি অ্যাম্বারগ্রেস, নোনা মাছ এবং লুঠ করা সোনাদানা বিক্রি করত ইহুদিদের। অ্যাম্বারগ্রেস ব্যবসা ইহুদি বণিকের একচেটিয়া ছিল। এতটাই প্রসার লাভ করে এ ব্যবসা যে স্ক্যান্ডিনেভিয় দেশগুলোয় দ্বাদশ ত্রয়োদশ শতকে স্বদেশি মুদ্রার তুলনায় আরবি মুদ্রার ব্যবহার বেশি হত। ক্রুসেডাররা দক্ষিণ ইউরোপে ইহুদিদের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করলে ভাইকিংদের সঙ্গে ইহুদি বাণিজ্যের গুরুত্ব বাড়ে। পূর্ব-পশ্চিমের মশলার ব্যবসাও ক্রুসেডের সময় অবধি ইহুদিদের দখলে ছিল। ক্রুসেড শুরু হলে ভেনিসীয় ব্যবসায়ীরা ইহুদিদের হটিয়ে দেয়। ইংল্যান্ড, ইটালি, ফ্রান্সে একের পর এক বন্দরে ইহুদি পণ্যবাহী জাহাজ লুঠ করে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কিছু দেশ তাদের বন্দরে ইহুদি পণ্যবাহী জাহাজ ঢোকা নিষিদ্ধ করে। পঞ্চাদশ শতক পর্যন্ত মার্সেলিস বন্দরে কিছু বড় ইহুদি ব্যবসায়ী এরপরও টিকে ছিল। কিন্তু ইহুদি সমুদ্র বাণিজ্যের বৃহৎ অংশ বিনষ্ট হয়। নিজের পক্ষে বহনযোগ্য পণ্যটুকু শেষ সম্বল করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিঁকে থাকে ইহুদি বণিক বা ফেরিওয়ালা। রেশম ব্যবসার ক্ষেত্রে ছবিটা একটু আলাদা ছিল। রেশম উৎপাদক চিনের সঙ্গে ইহুদি বণিকের দীর্ঘ যোগসূত্র। ইহুদি বণিকের জাহাজ যৌথভাবে ব্যবহারের চুক্তি করে খ্রিস্টান বণিক। মুসলিম বন্দরে পৌঁছানোর মুখে জাহাজগুলির পতাকা বদলে ফেলা হত। আঠারো শতকের আগে পর্যন্ত এভাবে চলেছে। মণিমুক্তা এবং সুগন্ধি পণ্য সহজে বহনযোগ্য এবং একজনই তা করতে পারে। ফলে ‘ওয়ান্ডারিং জ’ বা ইহুদি ফেরিওয়ালা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রগামী হয়ে গেল। মধ্যযুগের ইউরোপ অপরিচ্ছন্নতার নিরিখে সর্বকালের সেরা। স্নানের জল ও বাথরুম দুর্লভ। ফলে প্রাচ্যের সুগন্ধির চাহিদা ছিল আকাশ ছোঁয়া। এক আউন্স সুগন্ধি যে দামে বিক্রি হত তা একটি পরিবারের সারা বছরের আহার্য জোগানোর পক্ষে যথেষ্ট। এছাড়া ছিল মুক্তার চাহিদা।

তেজারতি কারবার অবশ্য উল্লেখ্য। সুদখোর, অমানবিক ইহুদির বহু কাহিনি প্রচলিত। ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ নাটকের ইহুদি শাইলক ঘৃণিত চরিত্র। ইহুদি যদি এতই নির্মম সুদখোর তবে খ্রিস্টান খাতক তার কাছে যায় কেন? খ্রিস্টান মহাজন দশ থেকে বিশ গুণ বেশি সুদ নিত তাই। এ ব্যাপারে মধ্যযুগের চার্চের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা দুমুখো। সুদের ব্যবসা বেঠিক বললেও তাকে মারাত্মক অপরাধ বলেনি চার্চ। তেজারতি কারবার নিয়ে মধ্যযুগের চার্চের যত না উদ্বেগ তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ খ্রিস্টান মহাজনের দু’শো, তিনশো, চারশো, পাঁচশো শতাংশ হারে সুদ আদায় করা নিয়ে। বিশেষ করে ইটালিতে এভাবে অস্বাভাবিক চড়া হারে সুদ নিয়ে ঋণগ্রহীতাকে সর্বস্বান্ত করা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়ায়। ক্যাথলিক চার্চ তাই অল্প সুদের কারবারকে তেমন আমল না দিয়ে চড়া সুদের কারবার বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়। চতুর্থ থেকে উনবিংশ শতক পর্যন্ত খ্রিস্টান খাতক ইহুদি মহাজনের কাছে হাত পেতেছে। যেহেতু ইহুদি মহাজন খ্রিস্টান মহাজনের তুলনায় অনেক নীতিনিষ্ঠ ছিল। রাষ্ট্রনির্ধারিত সুদের হার দেশভেদে সত্তর থেকে তিরিশ শতাংশ হলেও যদি কোনো জার্মান জমিদার তার সমগোত্রের কোনো জমিদারের কাছে অর্থ ঋণ করতেন তবে তাকে তিনশো থেকে চারশো শতাংশ হারে সুদ দিতে হত। সেক্ষেত্রে ইহুদি মহাজনের সুদের হার ছিল দশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ।

‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ লেখা হয় আনুমানিক ১৫৯৪-৯৮-এর মধ্যে। ১২৯০ সালে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড ইহুদিদের ব্রিটেন থেকে বহিষ্কার করেন। ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে আর এক দফা বহিষ্কার করা হল ছদ্মবেশী মাররানো ইহুদিদের। খুব সম্ভব ইংল্যান্ডে ইহুদিদের চাক্ষুষই করেননি শেক্সপিয়র। দ্বিতীয়ত ভেনিসে ইহুদি ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন শুরু ১৫৯৮ নাগাদ। উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ভারতে আসার সরাসরি জলপথ আবিষ্কার পূর্ব ভূমধ্যসাগরে রিপাবলিক অফ ভেনিসের বাণিজ্যিক প্রাধান্য খর্ব করে। ফলে তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় ড্যানিয়েল রড্রিগা নামে এর প্রভাবশালী ইহুদি ব্যবসায়ী ভেনিসের কর্তৃপক্ষকে বোঝায় শহরের আর্থিক উন্নয়নের স্বার্থে ভেনিসে ইহুদি ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন জরুরি। ১৫৯৮ সালে দশ বছর মেয়াদী প্রথম দফার অনুমোদন দেওয়া হল। তাতে সুফল মেলায় ভেনিসের প্রশাসক দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দফার অনুমোদন দেয়। শেষোক্তটি চালু ছিল ১৭৯৭ অবধি। এরকম প্রেক্ষিতে এটা ভাবা অযৌক্তিক হয় না যে ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ নাটক রচনাকালে ‘সুদখোর ইহুদি’ ভেনিসে পসার জমিয়ে উঠতে পারেনি।

1. jepa.org/wp-content/uploads/2012/11/jewish_merchants_of_venice.pdf The Third Charter of The Jewish Merchant of Venice, 1611 A Casestudy… Benjamin Ravid

তেইশ

রেনেসাঁ রিফরমেশন এবং ইহুদি

পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে অতীত রোম সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। অটোমান তুর্কিরা গ্রিসের সব ভূখণ্ড দখল করে। কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর গ্রিক পণ্ডিতরা চলে এলেন সমকালীন ইউরোপের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু শহর ইটালির ফ্লোরেন্সে। সঙ্গে আনলেন ক্লাসিক্যাল গ্রিক সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানের মহামূল্যবান প্রাচীন পুঁথির সংগ্রহ এতকাল যা পশ্চিম ইউরোপের অজ্ঞাত থেকেছে। গ্রিক ও রোমান যুক্তিবাদী শিক্ষার আলোয় ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্বের নতুন অন্বেষা কেন্দ্রীভূত হল মানুষকে ঘিরে। গুরুত্ব পায় পার্থিব অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে ব্যক্তি মানুষের অনুভূতি। মুক্তচিন্তার প্রকাশ পেত্রার্কের সাহিত্যে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির শিল্পে, বিজ্ঞানচর্চায়, মাইকেলেঞ্জেলোর শিল্পসৃষ্টিতে। মানবতাবাদীদের পীঠস্থান ফ্লোরেন্স, ভেনিস, নেপলস, রোম, জেনোয়া। ছাপাখানা আবিষ্কার ও কাগজের ব্যবহার রেনেসাঁর প্রভাব ছড়ালেও ইউরোপে তা সর্বত্রগামী হয়নি। ১৪০০ থেকে ১৭০০ শতক অবধি স্থায়ী হয় রেনেসাঁর প্রভাব। নব্য প্লেটোবাদী রেনেসাঁ হিউম্যানিস্টরা চার্চকে অস্বীকার করেননি। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের মূলানুসন্ধান ইউরোপের পণ্ডিতমহলে গ্রিক ও হিব্রু ভাষাচর্চার প্রসার ইহুদি দার্শনিক ও র‍্যাবাইদের চাহিদা বৃদ্ধি করছিল। সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিফলিত মানবধর্মের অনুসন্ধানও হিউম্যানিস্টরা করেছেন। উদার ভাবনার অভ্যুদয়ে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে ১৬১৮ থেকে ১৬৪৮ ইউরোপে তিরিশ বছরের রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধ শুরু করে প্রোটেস্টান্ট রিফরমেশন। পঞ্চদশ শতকের ইটালির রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা, আর্থিক বিকাশ, বিশ্বের অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ, উন্নত নগরসভ্যতা, মিলিতভাবে নবজাগরণের ধাত্রী হয়েছে। রেনেসাঁ ইটালির ইহুদিদের সামাজিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। তারা নাটক লিখছে, পরিচালনা করছে। বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে ধর্মশাস্ত্রের নিদান ও ব্যাখ্যার যুক্তিবাদী সমালোচনা করছে। ধ্রুপদি সংগীত, নৃত্যের স্কুল খুলেছে, যেখানে খ্রিস্টান ছাত্রছাত্রীরা আসে সংগীত শিক্ষালাভে। এ বাবদ খুবই অখুশি খ্রিস্টান সমাজপতিরা। ইহুদি নিপীড়নের রাষ্ট্রীয় হুকুমনামা নেই। গণহিংসার ঘটনা বিক্ষিপ্ত। অঞ্চল বিশেষে সীমাবদ্ধ। ইউরোপের অন্যত্র ইহুদিদের বিরুদ্ধে ‘Blood Libel’ আনা হচ্ছে, মিথ্যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তারা অল্পবয়সী বালক খুন করে তার রক্ত ধর্মীয় উপচারে ব্যবহার করে। ইটালিতে এই আজগুবি প্রচার সরকারি মদত না পেয়ে ঝিমিয়ে যায়। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা অন্তত কিছুসময় ইটালির বিভিন্ন শহরে নিশ্চিন্ত আশ্রয় পায়। পেশাগত বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও ইটালির ইহুদি তার নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা নির্বিঘ্নে করেছে। উল্লেখযোগ্য হল, রেনেসাঁ ইটালির পরিমণ্ডলে সনাতন ইহুদি ধর্মসংস্কৃতি বনাম সদ্য উন্মেষিত ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনার অবিরাম টানাপোড়েন। ত্রয়োদশ শতক থেকেই ইটালির ইহুদি সে দেশের ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছে। রেনেসাঁ বুদ্ধিজীবি ক্রিয়াকলাপে প্রত্যাশিতভাবে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ফ্লোরেন্স শহরের ছাত্ররা যে-কোনো বৌদ্ধিক প্রশ্নে ইহুদি পণ্ডিতদের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করত না। দাড়িওয়ালা র‍্যাবাইয়ের সংখ্যাধিক্য ছিল ফ্লোরেন্সের মানবতাবাদী সংগঠনগুলিতে। তাঁরা প্রত্যেকেই সুনাম অর্জন করেন। এদের একজন ক্রিটের এলিজা দেল মেডিগো (১৪৬১-৯৭) একাধারে সুচিকিৎসক, দার্শনিক এবং অনুবাদক। রেনেসাঁ হিউম্যানিজমের পুরোধা পুরুষ পিকো দেলা মিরান্দোলা-র শিক্ষক ছিলেন এলিজা। তাকে অ্যারিস্টটল থেকে ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ‘কাবালা’-র অতীন্দ্রিয়বাদ সবই শেখান এলিজা। ইটালির অন্য শহরেও ক্যাথলিক চার্চের বহু যাজক বিশপ, ধর্মনিরপেক্ষ আঞ্চলিক শাসকের নিজস্ব ইহুদি চিকিৎসক ছিল। ইহুদি বিজ্ঞানীরা খ্রিস্টান পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা করে সেগুলি প্রকাশ করতেন। রেনেসাঁ ইহুদির আর এক উদাহরণ ডন জুডা আব্রাবানেল, যার ‘ডায়লগস অন লাভ’ ষোড়শ শতকের অতি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক রচনা হিসেবে খ্যাত হয়। ডন জুডার মেলামেশা ছিল সমকালীন ইটালির পরিশীলিত, সংস্কৃতিমনস্ক সমাজের সঙ্গে। সমকালীন হিব্রু সাহিত্যেও রেনেসাঁর প্রভাব পড়ে। আজারিয়া রোসি’র(১৫১৪-১৫৭৮) ‘দ্য এনলাইটেনমেন্ট অফ দ্য আইজ’ওই সময়ের একটি আকর গ্রন্থ যা ইহুদি তত্ত্বচর্চার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নির্মাণের প্রথম প্রয়াস বলে বিবেচিত হয়। জোসেফ হাকোহেন, জেডালিয়া ইবন জাহিয়ার মতো ইহুদি ঐতিহাসিকদের রচনা সমকালীন হিব্রু সমাজে ইতিহাস চর্চার উৎসাহ বাড়িয়ে তোলে। দশম লিও (১৫১৩-২১) এবং সপ্তম ক্লেমেন্ট (১৫২৩-৩৩)-এর মতো রেনেসাঁ পোপেরা ইহুদি প্রতিভার বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। ইহুদি জ্ঞানচর্চাকে তারা বৌদ্ধিক অনুসন্ধানে অপরিহার্য মনে করেছেন। ছাপাখানা আবিষ্কারের গুরুত্ব ইহুদিরা খুব সহজেই অনুধাবন করে। ১৪৭৫ সালে ইটালির উত্তর দক্ষিণে দুটি মাত্র ছাপাখানা। তার প্রথমটি থেকে হিব্রু ধর্মপুস্তক ‘পেন্টাটুক’ প্রকাশিত হল। কিছুদিনের মধ্যেই চালু হয় হিব্রু ছাপাখানা। পরিচালনায় জার্মানি পলাতক দক্ষ ইহুদি উদ্বাস্তু কারিগর। বিদ্যাভ্যাস ইহুদি সমাজে আগাগোড়া সবচেয়ে পবিত্র কাজ বলে গণ্য হয়েছে। ছাপাখানা আবিষ্কার তাতে নতুন উদ্দীপনা জোগায় এরপর থেকেই দরিদ্রতম ইহুদিও একটি ছোটখাটো গ্রন্থাগারের মালিক হয়ে ওঠে। আসিরীয় লিপির ব্যবহার যেমন ব্যাবিলন নির্বাসনে হিব্রু ধর্মপুস্তকের সর্বজনীন ব্যবহার সহজ করেছিল তেমনই ধর্মগ্রন্থের প্রচার বৃদ্ধি এবং সেইসঙ্গে ধর্মীয় বিধান ও অনুশাসনের নির্দিষ্ট মান তৈরি করতে সহায়ক হল ছাপখানা আবিষ্কার।

গ্রিক ভাষায় রচিত বাইবেল কথ্য জার্মানে অনুবাদ করে রোমান ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে ভাঙনের রাস্তা উন্মুক্ত করলেন মার্টিন লুথার। দীর্ঘদিন এটা তাঁর দাবি ছিল। যা ছিল প্রথম পর্বে হিব্রু রচনা সেই বাইবেলের গ্রিক অনুবাদ প্রয়োজন হয়ে পড়ে ডায়াস্পোরা বা পরবাসী ছিন্নমূল ইহুদিদের। মিশরের আলেকজান্ড্রা অথবা ইজিয়ন সাগরের গ্রিক দ্বীপমালায় বহু প্রজন্ম প্রবাসে তারা ভুলেছে হিব্রু ভাষা। এরপর যখন রোম পশ্চিম ইউরোপের দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা এবং ল্যাটিন আমজনতার বুলি সেসময় ৩৮২ খ্রিস্টাব্দে পোপ ডামাসাস (Damasus) সন্ত জেরোমকে আদেশ করেন ল্যাটিনে বাইবেল অনুবাদ করতে। রোম সাম্রাজ্যও একদিন ইতিহাস হল। ল্যাটিন আর সাধারণের বুলি থাকে না। খ্রিস্টান যাজক ও চার্চের বিদ্বজ্জনের সীমিত পরিসরে যখের ধনের মতো সংরক্ষিত হয় ল্যাটিনে অনুদিত বাইবেল। সেটা সর্বসাধারণ পাঠ্য হলে পাদ্রিদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব নষ্ট হয়। হোলি স্ক্রিপচারস, পবিত্র ধর্মগ্রন্থে রোমান ক্যাথলিক চার্চের একচেটিয়া খবরদারি ভেঙে তার সর্বময় ক্ষমতা খর্ব করতে চাইলেন লুথার[১]। প্রোটেস্টান্ট রিফরমেশনে ইউরোপের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং চার্চের আধিপত্য দুটোই একসঙ্গে ধাক্কা খেল।

মার্টিন লুথারের রিফরমেশন বা নয়া প্রোটেস্ট্যান্ট তত্ত্ব গোড়ায় আশান্বিত করে ইউরোপের ইহুদিদের। রোমান ক্যাথলিক চার্চকে আক্রমণ করে মার্টিন লুথার বললেন, ইহুদিদের সঙ্গে চার্চের অমানবিক ব্যবহারের প্রতিবাদে বহু ভালো খ্রিস্টান নিজ ধর্মত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণের চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছে। লুথারের মতে যে ধর্ম তাদের উপর অপরিসীম অত্যাচার করেছে সে ধর্মে স্বাভাবিক কারণেই ইহুদিদের কোনো আকর্ষণ জন্মায়নি। লুথার ভেবেছিলেন, প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম যিশুর জীবন কাহিনি মার্জিত, আদিরূপে প্রকাশ করায়, ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হবে। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনিই পারবেন ইহুদিদের ধর্মান্তরিত করতে। যখন দেখলেন বস্তুত তা অসম্ভব, লুথারের ইহুদি প্রীতি রাতারাতি ঘৃণায় পরিণত হল। তাঁর কলম শানিত হল ইহুদি বিদ্বেষী প্রচারে। ১৫৪৩ সালে লেখা লুথারের পুস্তিকা “On The Jews And Their Lies”। চারশো বছর বাদেও এই বই নাৎসি জার্মানির ইহুদি হত্যায় ইন্ধন জুগিয়েছে। ভীষণ হতাশ লুথার তাঁর অনুগামীদের প্ররোচিত করলেন ইহুদিদের সঙ্গে নির্মম ব্যবহার করতে, সিনাগগ পুড়িয়ে দিতে। মৃত্যুর কিছু আগে সব খ্রিস্টান রাজাকে তাদের দেশ থেকে ইহুদি বিতাড়নের নির্দেশ দিয়ে গেলেন লুথার।

প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ তৈরির পিছনেও ইহুদি চক্রান্ত দেখেছে রোমান ক্যাথলিক চার্চ। ইহুদি ধর্মতত্ত্বই যে খ্রিস্টান চার্চে ভাঙন ধরাবার মূলে এই রায় দিয়ে ইহুদিদের ইউরোপের জনজীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার ডাক দেয় ক্যাথলিক চার্চ। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার বিরোধী কাউন্টার রিফরমেশন শুরু হওয়া মাত্র ক্যাথলিক দুনিয়ায় ইহুদিদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। রেনেসাঁ পোপদের দায়সারা সহনশীলতাও আর রইল না। ফিরে আসে মধ্যযুগের অন্ধকারের দুর্বিষহ দিন। কাউন্টার রিফরমেশনের ধর্মান্ধতার সূত্রপাত যার হাতে পোপের সভায় সেই প্রতাপশালী কার্ডিনাল কারাফফা ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ‘ট্যালমুড’কে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিলেন। নামমাত্র অভিযোগের একটা তদন্ত করল চার্চ। অভিযুক্ত হল ‘ট্যালমুড’। পোপ দশম লিও’র বদান্যতায় যে ‘ট্যালমুড’ কিছুকাল আগেই প্রকাশিত হয়েছিল, সেই গ্রন্থ আগুনে পুড়ল। ১৫৫৩-র হেমন্তে ইহুদি নববর্ষের সূচনায় খুঁজে পেতে ‘ট্যালমুড’-এর সমস্ত কপি প্রকাশ্যে পুড়িয়ে দেওয়া হল রোমে। ইটালিতে ছাড় দেওয়া হয়নি হিব্রু বাইবেলকেও। ১৫৫৫ সালে পোপ চতুর্থ পল হলেন কার্ডিনাল কারাফফা। পূর্বসূরি পোপেরা ইহুদি প্রশ্নে নরমসরম নীতি নিয়ে পর্তুগালের ‘মাররানো’ উদ্বাস্তুদের রোমে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এবার তাদের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হলেন নতুন পোপ। নিজেদের ধর্মবিশ্বাসে অনড় চব্বিশজন ইহুদি পুরুষ এবং একজন মহিলাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হল। ১৫৫৫-র জুলাই মাসে নতুন পোপ ভেনিসের ‘গেটো’র অনুকরণে ইহুদিদের জন্য পৃথক বস্তি ‘গেটো’ নির্মাণের আদেশ দিলেন। বস্তিগুলি উঁচু দেয়াল ঘেরা থাকত। প্রবেশ দরজা রাতে এবং খ্রিস্টান উৎসবের দিন বন্ধ রাখা হত। সব ধরনের পেশা ইহুদিদের জন্য নিষিদ্ধ হল। বন্ধ হল ব্যবসা বাণিজ্য। সবচেয়ে নীচু পেশা ছাড়া অন্য কিছুতেই নিযুক্ত হবার অনুমতি ছিল না ইহুদিদের। সামাজিক পৃথকীকরণের জন্য বাধ্যতামূলক হল তাদের হলুদ টুপি পরা। কোনো স্থাবর সম্পত্তির মালিক হতে পারত না ইহুদিরা। ১৫৫৯ মারা যান পোপ চতুর্থ পল। উৎসবে মাতে রোমান ইহুদিরা। প্রাক্তন পোপের মূর্তিতে হলুদ টুপি চাপিয়ে শোধ নেয়।

চতুর্থ পলের মৃত্যু ইহুদিদের সামাজিক দুর্দশা লাঘব করেনি। বরং কাউন্টার রিফরমেশনের প্রতিবিপ্লবী অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসে। পরবর্তী ক্যাথালিক ধর্মগুরু অষ্টম ক্রেমেন্ট ইহুদিদের বিরুদ্ধে ১৫৯২ সালে একগুচ্ছ বিধিনিষেধ জারি করেন যেটি উনিশ শতক অবধি জারি থাকে। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে এভাবেই ইহুদির পুরনো স্বর্গরাজ্য ইটালির অবলুপ্তি ঘটে যায়’।

১. www.historyworld.net/wrldhis/plaintexthistories.asp

২. A History Of The Jews From Earliest Times Through The Six Day War: Revised Edition: Cecil Roth: Shocken Books, New York

চব্বিশ

ষোড়শ শতকের ভবঘুরে ইহুদি-গেটোর জীবন-মালটার ইহুদি ক্রীতদাস

১৪৯২ স্পেন, ১৪৯৭ পর্তুগাল থেকে বহিষ্কার ইহুদি দুনিয়ার কেন্দ্র বদল করে। পশ্চিম ইউরোপের শেষ আশ্রয়টুকু খুইয়ে এবার তাদের নয়া ঠিকানা ভূমধ্যসাগর সংলগ্ন ওই কাস্তে চাঁদের নীচে। আইবেরীয় সংস্কৃতি নামে খ্যাত, পতুর্গাল, স্পেন, জিব্রালটারের কৃষ্টি ভূমধ্যসাগরের ছোট দ্বীপগুলিতে উদ্বাস্তু ইহুদি বংশ- পরম্পরায় রয়ে যায়। শতাব্দী পেরিয়ে স্পেনের ভ্রামণিক পূর্ব ভূমধ্যসাগর উপকূলের ইহুদি শিশুদে মুখে খাঁটি কাস্টিলিয়ন (স্পেনের ভাষা) শুনে অবাক। পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে উত্তর আফ্রিকার ভৌগোলিক নৈকট্য প্রায় এ বাড়ি ও বাড়ির। মাঝের উঠোন বলতে ভূমধ্যসাগর। মরক্কোর টাঞ্জিয়ারস থেকে মিশরের কায়রো অবধি ছড়ায় হাজার গৃহহীন ইহুদি। তাদের অনেকে সমুদ্রে ডোবে, কেউ মরে উপকূলের উপজাতীয়দের হাতে, অথবা দাস বাজারে পৌঁছে যায়। দুর্ভিক্ষ, মহামারি, অগ্নিকাণ্ড পিছু ছাড়ে না। নতুন দেশে তাদের থাকার অনুমতি মেলে অনেক কঠিন মূল্যে। আফ্রিকার মুসলমান শাসকরা ইউরোপীয় রাজা রানিদের মতোই কড়ায় গণ্ডায় মাশুল গুণে নিতে তৎপর। দফায় দফায় আশ্রিত ইহুদিদের শেষ কপর্দক নিয়ে নেওয়া হয়। গোদের উপর বিষফোড়া হয়ে লেগে থেকেছে মুসলিমদের ইহুদি বিদ্বেষ। মুসলমানদের কিছু বিশেষ পবিত্র নগরে ইহুদির প্রবেশাধিকার ছিল না। পরিবর্তে তাদের থাকার জন্য তৈরি হল ‘মেল্লা’।ইউরোপের’গেটো’-র অনুকরণে। সংখ্যাগুরুর মর্জিমাফিক যখন খুশি সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া চলত। সাদা অথবা রঙিন পোশাক পরা বারণ হল ইহুদিদের। সেই যে কালো জোব্বা, গোল ফেজ তার অঙ্গে উঠল সেটাই হয়ে গেল ইহুদির বাহ্যিক পরিচয়। কিছু মুসলিম শাসক কয়েকজন রোমান পোপের মতো সহিষ্ণুতা দেখিয়েছে। ইহুদিকে চাঙ্গা করতে এটুকু দাক্ষিণ্য যথেষ্ট। রাতারাতি সে দক্ষ কারিগর, সচ্ছল বণিক বনে যায়। এমনকি হল্যান্ড, ইংল্যান্ডে উত্তর আফ্রিকার কোনো সুলতানের রাজদূতের পদ, মন্ত্রী, আমলার লোভনীয় পদও মেলে।

১৪৫৩ সালে অটোমন তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপল দখল করলে ইহুদিরা তাকে মেসিয়ার আগমনী সংকেত ভেবে উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। স্পেন, পর্তুগালের উদ্বাস্তু ইহুদিদের জন্য দরজা খোলা রাখে তুরস্ক। শুধু বাড়তি বাণিজ্যের সম্ভাবনা নয়, তুরস্কের এশিয়া-ইউরোপ মিশ্র কৃষ্টির পরিমণ্ডলে স্প্যানিশ ইহুদি উদ্বাস্তুদের মূল্যবান ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা, ভাষাজ্ঞান সমাদর পেল। তুরস্কের জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান নেয় তারা। সুলতানের দরবারে জোসেফ হ্যামন অথবা তার ছেলে মোজেসের মতো চিকিৎসক, রাজনৈতিক উপদেষ্টার কদর বাড়ে। সুলতানের হারেমের দেখভাল করেন ইহুদি মহিলা এসথার চিয়েরা। কালেদিনে তার রাজনৈতিক প্রতিপত্তি অসীম হয়। আরব্য রজনীর গল্পের মতো আকর্ষণীয় জোসেফ নাসির জীবন। পর্তুগালের সম্পন্ন ‘মাররানো” পরিবারে জন্ম নাসির। তার পরিবারের পর্তুগাল থেকে ইটালি হয়ে তুরস্কে পালিয়ে আসার বৃত্তান্ত রোমাঞ্চকর। তুরস্কে পৌঁছেই ক্যাথলিক ভেক ছেড়ে ফের ইহুদি বনে যান তারা। তুরস্ক রাজসভায় নাসির উত্থান অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, গোটা ইউরোপে নাসির প্রতিপত্তি বাড়ে। পোল্যান্ডে নতুন রাজা নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত হয় নাসির নির্দেশে। নেদারল্যান্ডে বিদ্রোহ উস্কে দিয়ে স্পেনের উপর প্রতিশোধ নিলেন নাসি’। ভেনিসে তার পরিবারের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল তারও শোধ তোলেন ১৫৭০ অটোমান তুরস্ককে ভেনিসের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে। এই যুদ্ধে সাইপ্রাস দখল করে নেয় তুরস্ক। সুপণ্ডিত নাসি’র নিজের ছাপাখানায় বহু হিব্রু পুস্তক ছাপা হত। ইউরোপের যে-কোনো অঞ্চলে সহধর্মীদের বিপদ থেকে বাঁচাতে সদা প্রস্তুত ছিলেন নাসি।

১৫৭৪ সুলতান দ্বিতীয় সেলিমের মৃত্যুর পর অটোমন সাম্রাজ্য দুর্বল হল। তুরস্কের ইহুদিদের অবস্থা বদল হলেও ইহুদি নিপীড়ন বা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেনি। উল্লেখনীয়, ষোড়শ শতকের তুরস্ক রাজসভার ইহুদি রাজনীতিকদের চেষ্টায় নতুন করে শুরু হয় প্যালেস্টাইনের হৃত গৌরব ফেরানোর চেষ্টা।

পূর্ব ইউরোপের স্লাভ ভূমিতে’ ইহুদিদের বাস খ্রিস্টীয় শতকের গোড়া থেকে খ্রিস্টধর্মের প্রসার এই এলাকায় তুলনায় ধীর গতিতে হয়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ইহুদি জনবসতি। এলাকার আধা-বর্বর জনগোষ্ঠী ও তাদের রাজ্যপাটে ইহুদিধর্মের প্রভাব পড়েছিল। যাদের অন্যতম মোঙ্গল রক্তের মিশ্র জনজাতি খাজার। ককেশাস পর্বতমালা, ভোলগা এবং ডন নদীর মধ্যস্থ এলাকা অধুনা ইউক্রেনের বাসিন্দা খাজাররা অষ্টম শতকে ইহুদিধর্ম গ্রহণ করে। ১২৪১-র বিধ্বংসী তাতার আক্রমণ পূর্ব ইউরোপের ইতিহাসের মোড় ঘুড়িয়ে দিল। বিধ্বস্ত হয় গোটা পূর্ব ইউরোপ। একের পর এক নগর জ্বালিয়ে দেয় তাতার বাহিনী। মধ্যবিত্ত শ্রেণি অবলুপ্ত হয়। এই বিপর্যয়ের পর শিল্প বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে প্রতিবেশি জার্মানি থেকে ব্যবসায়ী, কারিগরদের আমন্ত্রণ জানান পোলিশ রাজারা। জার্মানদের সঙ্গে এল ইহুদিরাও। জার্মানরা হস্তশিল্প, ভারী শিল্প চালু করে। পাশাপাশি ইহুদিরা অর্থলগ্নী এবং বাণিজ্য প্রসারে উদ্যোগী হয়। পোল্যান্ডের ইহুদি জার্মান অভিবাসীদের উন্নত সংস্কৃতি বেশভূষা, কৃষ্টি মায় ভাষা আত্মস্থ করে। রাশিয়া, পোল্যান্ডের বিপুল সংখ্যক ইহুদি এমনকি ভিনদেশবাসী তাদের উত্তরপুরুষ আজও মিডল হাই জার্মান ভাষা ব্যবহার করে। পোলিশ শাসকরা বন্ধুভাবাপন্ন হলেও পোলিশ বণিকদের ঈর্ষা এবং চার্চের ধর্মোন্মাদনা ইহুদিদের স্বস্তি দেয়নি। জার্মান খ্রিস্টান অভিবাসীরা অতীতে নিজের দেশে ইহুদিবিদ্বেষী ছিল। পোল্যান্ডের ইহুদিদের বিষয়েও একইরকম খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে তারা। তাদেরই একজন জন অফ ক্যাপিস্ট্রানো পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি পোল্যান্ডে ইহুদি বিদ্বেষ উসকে দেয়। পোল্যান্ড ইহুদিদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল আর্থিক সুযোগ সুবিধার কারণে। ফলে পশ্চিম ইউরোপ থেকে ইহুদিদের পোল্যান্ডে চলে আসা বজায় থাকে। সমস্ত ধরনের ব্যবসায়িক সুবিধা ইহুদিরা পেত। সম্ভ্রান্ত পোলিশ পরিবার অথবা যাজকের সম্পত্তি ভাড়া অথবা লিজ নেবার অনুমোদনও তাদের দেওয়া হয়। ইহুদি ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ হস্তশিল্প নির্মাতা ছিল। ব্যবসায়িক কারবারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল পোল্যান্ডের মেলাগুলি। এসব মেলায় ইহুদিদের একচেটিয়া প্রাধান্য গড়ে ওঠে। ১৫৫১ খ্রিস্টাব্দে পোল্যান্ডের রাজা সিগিসমান্ড অগস্টাস ইহুদিদের স্বশাসনের পূর্ণ অধিকার দেন। তারা তাদের প্রধান র‍্যাবাই ও অন্যান্য ধর্মীয় বিচারক নির্বাচন করতে পারত। এই মূখ্য র‍্যাবাই ও বিচারপতিদের হাতে ইহুদি ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া হয়। এদের কাজের জবাবদিহি করতে হত কেবল মাত্র রাজার কাছে। কাউন্সিল কোনো ইহুদিকে অশিষ্টাচারের জন্য সমাজচ্যুত করলে রাজার আইন তা অনুমোদন করেছে। এই কাউন্সিল প্রায় ইহুদি পার্লামেন্টের সমগোত্রীয় হয়ে দাঁড়ায়। জার্মান ইহুদি বুদ্ধিজীবিদের ক্রমান্বয় পোল্যান্ড পাড়ি দেবার কারণে সাহিত্য, শিল্পকলা, দর্শন প্রতিটি বিভাগে পোল্যান্ডের ইহুদি সংস্কৃতি সম্পদবান হয়ে ওঠে। ক্র্যাকাও, লুবলিন, পোসেন ইত্যাদি বড় শহরে প্রাচীর ঘেরা ইহুদি আবাসন, ইহুদি শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হয়। ষোড়শ, সপ্তদশ শতকের পোলিশ ইহুদির কাছে শিক্ষা কেবল বাধ্যতামূলক নয়, গভীর গর্বের বস্তু। পঞ্চদশ শতকে পোলিশ ইহুদির সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার। স্পেন থেকে বিতাড়িত সেফারডিক ইহুদিরা যেমন দলে দলে তুরস্ক, পোল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিল, ঠিক তেমন ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি থেকে আস্কেনাজি ইহুদিরা পোল্যান্ড পাড়ি দিতে থাকে। দেড়শো বছর বাদে পোল্যান্ডের ইহুদি জনসংখ্যা প্রায় দেড় লাখ হয়ে যায়। আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ ইহুদি পোল্যান্ড ও সংলগ্ন স্লাভিক দেশগুলি থেকে উদ্ভুত।

ইউরোপের অনেক শহরে ছিন্নমূল, আর্থিক বিধ্বস্ত ইহুদিদের প্রবেশ অধিকার ছিল না। তাদের বৃহৎ অংশ ভাত কাপড়ের সংস্থানে ফেরিওয়ালা বনে যায়। জন্ম নিল ‘ওয়ান্ডারিং জু’, দাড়িওয়ালা, অতিবৃদ্ধ, জীর্ণ পোশাক, বিষণ্ন ভবঘুরে ইহুদির মিথ। অভিশপ্ত ‘ওয়ান্ডারিং জু’ দুর্ভাগ্যের প্রতীক। কাহিনিটির উৎস গ্রিক বাইবেল। যিশু তাঁর ক্রুশ বহন করে বধ্যভূমির দিকে হেঁটে গিয়েছিলেন যে পথে, পুরনো জেরুজালেম শহরের সে পথই খ্রিস্টানুরাগীদের দুঃখের সরণী ‘ভায়া ডোলোরোসা’ (Viadolorosa)। কথিত, পথে তিনবার মাটিতে পড়ে যান যিশু। দম নেবার জন্য শ্রান্ত যিশু এক ইহুদি চর্মকারের বাড়ির উঠোনে বসেন। গ্রিক বাইবেল অনুযায়ী, ওই চর্মকার যিশুকে আঘাত করে এবং গালি দেয়। যিশু তাকে শাপ দেন যে তার মৃত্যু হবে না। হতদরিদ্র, জরাগ্রস্ত সে যুগযুগান্ত এক দেশ থেকে অন্যদেশ ঘুরে ফিরবে। কোথাও তার বিশ্রাম মিলবে না, মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে না। ইহুদি বিরোধী এ কাহিনির সত্যতা স্বীকার করে না যিশুর জীবনপঞ্জী ‘গসপেল’। ঘটনাটি মধ্যযুগের প্রক্ষেপণ বলে মত গবেষকদের। যখন ফেরিওয়ালা বৃত্তি গ্রহণ করা নিরুপায় ইহুদিরা এক রাষ্ট্রীয় সীমান্তহীন ভবঘুরে জনগোষ্ঠী হয়ে যায়। এমনই এক ভবঘুরে সলমন ইবন ভারগা (১৪২৫-১৫২৫)। স্পেনের মালাগা শহরের বাসিন্দা ইহুদি ভারগা রেনেসাঁর এক ব্যতিক্রমী জ্যোতিষ্ক। তিনি ছিলেন আদ্যন্ত সংশয়বাদী, স্বকীয় ভাবনায় উদ্দীপিত। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ ‘ট্যালমুড’-এর কঠোর সমালোচক ভারগা এমনকি মোজেস মেইমনিডস-এর মতো পণ্ডিতকেও ব্যঙ্গ করেছেন। অস্বীকার করেছেন তাবত ইহুদি পাণ্ডিত্য। প্রথমে স্পেন পরে পর্তুগাল থেকে বিতাড়িত ভারগা ইটালি পৌঁছন ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে। কিছুকাল রোমে কাটান। তার শেষ জীবন কোথায় কেটেছিল সে বিষয়ে কিছুই জানা যায় না। ‘রড অফ জুডা’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন ভারগা যাতে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন- কেন মানুষ ইহুদিবিদ্বেষী। বইটিকে প্রথম খ্রিস্টীয় শতকের রোমান-ইহুদি ঐতিহাসিক ফ্লাভিয়াস জোসেফাসের ‘অ্যান্টিকুইটিস’-এর চোদ্দশো বছর পরে লেখা প্রথম ইহুদি ইতিহাস বলা হয়। চৌষট্টিজন নির্যাতিত ইহুদির বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন ভারগা। তার জীবদ্দশায় বইটি প্রকাশ হয়নি। ১৫৫৪-য় তুরস্কে প্রথম মুদ্রিত হল ‘রড অফ জুডা’। সমকালীন ইউরোপীয় সমাজে ইহুদির দুর্দশার কারণ বিশ্লেষণে আশ্চর্য নৈব্যক্তিক ভারগা উলটে ইহুদিদেরই দায়ী করেন। তাদের স্বাজাত্যবোধ যতই প্রখর হোক, ভারগার মতে, তারা অতি নিষ্ক্রিয় এবং ঈশ্বর বিশ্বাসী থেকেছে। আশাবাদী ও অতি অনুগত হবার জন্য ইহুদিরা সমকালীন রাজনীতি এবং সমর বিজ্ঞান দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই উপেক্ষা করে নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছে। ভারগা দেখিয়েছেন, খ্রিস্টান যদি অসহিষ্ণু ইহুদি তবে মানিয়ে নিতে অক্ষম। তিনি আরও বলেন, স্পেন বা ফ্রান্সের অভিজাতরা কখনোই ইহুদিবিদ্বেষী ছিল না। খ্রিস্টানদের ইহুদি বিদ্বেষ নিম্নবিত্ত, অশিক্ষিত, অনগ্রসর শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ভারগার মতে ইহুদি ঔদ্ধত্য সাধারণ মানুষের মনে ইহুদিদের সম্পর্কে ঘৃণা বাড়িয়েছে। ইহুদি কখনো নিজেকে আশ্রিত ভাবেনি। বরং প্রবাসে পররাজ্যে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়েও নিজেকে শাসক মনে করেছে। ইহুদির উদ্দেশে ভারগার প্রশ্ন, কেন তারা অন্ধবিশ্বাস ভুলে বিনীত হয় না, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা চর্চা করে না। ভারগার বিশ্লেষণের সততা বিস্ময়কর হলেও ইহুদিদের অসহিষ্ণু ঔদ্ধত্যই তাদের দুর্ভাগ্যর একমাত্র কারণ ছিল না[৪]। বস্তুত ছিন্নমূল ইহুদির বর্ধিত সংখ্যা যখনই দেশীয় জনতার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইহুদি বিদ্বেষ এবং নির্যাতন তখনই বেড়েছে। ভেনিসের কথাই ধরা যাক। দশম শতক থেকে বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য কেন্দ্র ভেনিসে ইহুদি বণিকদের বড় সংখ্যক উপস্থিতি এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা ইটালির বণিকদের ঈর্ষার কারণ হয়েছে। যদিও তাদের সামাজিকভাবে পৃথক করেনি প্রশাসন। ত্রয়োদশ শতকে স্পিনালুঙ্গা দ্বীপে স্থানান্তরিত করা হল ইহুদিদের। আলাদা করার জন্য তাদের প্রথমে হলুদ ব্যাজ, পরে হলুদ এবং লাল টুপি পড়া বাধ্যতামূলক হয়। তবু ইহুদিদের সামাজিক অবস্থার তেমন হেরফের হয়নি। করের মোটা আর্থিক অঙ্ক ছাড়াও ভেনিসের অর্থনীতি পুষ্ট হয়েছে তাদের অবদানে। ১৫০৯ সালে ফ্রান্স, ইটালি উপদ্বীপে পোপের অধীনস্থ রাজ্যগুলি এবং ভেনিস রিপাবলিকের মিলিত শক্তি ভেনিস দখল করলে ইটালির মূল ভূখণ্ড থেকে সংলগ্ন দ্বীপগুলিতে পালিয়ে আসে মূলত স্পেন ও পর্তুগাল ছেড়ে ইটালিতে আশ্রয় নেওয়া হাজার পাঁচেক আতঙ্কিত ইহুদি। দু’বছর বাদে তাদের বহিষ্কারের দাবি ওঠে। ১৫১৫-১৬ সালে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় সমস্ত ইহুদি সম্প্রদায়কে শহরের একটি কোণে রাখা হবে। ‘Gheto nuovo’ (নতুন কারখানা) নামে একটি কামান কারখানার জমিতে চারদিকে উঁচু পাঁচিল ঘেরা দুটি গেটযুক্ত ইহুদি বসতি নির্মিত হল। ইটালির ‘গেটো’ নামটাই পরবর্তী সময় ইহুদি বসতির সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। দুই ফটকের দুই খ্রিস্টান পাহারাদার তৎসহ দ্বীপের সুরক্ষায় নিযুক্ত দুটি নজরদারি নৌকার ছয় মাঝির মাস মাইনে ইহুদিদেরই দিতে হত। অন্ধকার যুগের ইউরোপে অনেক ক্ষেত্রে কোনো শহরে বসতি করার শর্ত হিসেবে পাঁচিল দেওয়া পৃথক এলাকা দাবি করেছে ইহুদিরা। কিন্তু ভেনিসে গেটোর তীব্র বিরোধিতা করে ইহুদিরা। তারা বুঝতে পারে সমাজের মূলস্রোত থেকে সরিয়ে রেখে তাদের আর্থিক স্বাচ্ছল্যকে দেশের অর্থভাণ্ডারের পুষ্টির জন্য ব্যবহার করতে চায় ভেনিস। ইহুদিদের শুধু দিনমানে শহরের কেন্দ্ৰস্থল থেকে বাণিজ্য করতে দেওয়া হত। রাতে তাদের গেটোর প্রাচীরের বাইরে থাকার অনুমতি ছিল না। ইহুদিদের আপত্তি গ্রাহ্য করেনি ভেনিস। শাপে বর হয়ে এই ব্যবস্থা ইহুদিদের আর এক দফা নির্বাসনের হাত থেকে বাঁচায়। এই চার দেয়ালের নিরাপত্তার জন্য আড়াই লক্ষ ভেনিসীয় স্বর্ণমুদ্রা ড্যুকাট দিতে হত গেটোর ইহুদিদের। কেন ইহুদিরা এই বৈষম্যমূলক আচরণ নির্বিবাদে মেনে নিতে বাধ্য হয় তার ব্যাখ্যা করেছেন সিমহা লুজ্জাত্তো (১৫৮৩-১৬৬৩) ভেনিসের ইহুদিদের নিয়ে লেখা তার একটি বইতে। লুজ্জাত্তো দীর্ঘ অর্ধশতক ভেনিসে ইহুদি র‍্যাবাই ছিলেন। তিনি বলেন, ইহুদিদের নিষ্ক্রিয়তা, ইবন ভারগাকে যা একইভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল, বস্তুত এক পরম বিশ্বাসের প্রতিফলন। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছে যে তাদের সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঐশ্বরিক কারণ জাত, মানুষের তৈরি করা নয়।

ভেনিসের গেটোতে আনন্দ উৎসবের অভাব হয়নি। সিনগগগুলি সামাজিক মিলন কেন্দ্রের কাজ করেছে। বিভিন্ন উৎসবে আত্মপরিচয় আড়াল করতে মুখোশ পরিহিতা ইহুদি মহিলারা সিনাগগে আসতেন। তাদের দেখতে উৎসাহী খ্রিস্টান দর্শকদের ভিড় হত। স্পেনীয়, পর্তুগিজ, ইটালিয়ান, গ্রিক, জার্মান দর্শকদের বহুজাতিক উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠত উৎসব প্রাঙ্গণ। নাচগান হত। গানে অনুষঙ্গ হিসেবে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ছিল র‍্যাবাইদের। পরিবর্তে করতালি ‘পার্কাসান’-এর কাজ করত। যন্ত্রানুষঙ্গ বিরোধী র‍্যাবাইদের যুক্তি ছিল প্রার্থনা গীতিতে যন্ত্রের ব্যবহারে প্রার্থনার পবিত্র শব্দগুলি বহু উচ্চারিত হতে থাকে, বিশেষ করে ঈশ্বরের নাম। তাদের বক্তব্য এর ফলে সরলমতি প্রার্থনাকারীর মনে হতে পারে ঈশ্বর এক নন একাধিক। সিসিল রথ রেনেসাঁ ভেনিসের ইহুদি বিষয়ে তাঁর আলোচনায় দেখিয়েছেন যে ইহুদি সংরক্ষণপন্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই গেটো জীবনের পার্থিব বিলাসব্যসন এবং হিব্রুর পরিবর্তে ইটালিয়ান ভাষায় গেটোবাসী ইহুদির অনুরাগ নিয়ে অভিযোগ করছেন। প্রার্থনা গীতও স্থানীয় কথ্য ভাষায় চালু করার দাবি উঠেছে। ইহুদিরা নাটক, অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, অর্থনীতির বই লিখছেন ইটালিয়ান ভাষায়। সাবাথ হিব্রু মতে পূর্ণবিশ্রামের দিন। এ দিনেও নৌকা (গন্ডোলা) বিহারের পক্ষে সওয়াল করেছে গেটোর ইহুদি। গেটোর নিজস্ব বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও, পাড়ুয়ার মেডিকেল স্কুলে পড়ে ডিগ্রিধারী হবার ইচ্ছে গোপন রাখেনি। স্বাভাবিকভাবেই অনেক র‍্যাবাই চাইতেন গেটোর দেয়ালের উচ্চতা আরও বাড়ানো হোক। গেটোর বৃত্তে ইহুদি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি মণ্ডল গড়ে ওঠে। খ্রিস্টান-ইহুদি দুই ধর্মবিশ্বাসের পারস্পরিক আদান প্রদান বন্ধ হয় না। গেটো তৈরি হওয়ার সময়েই খ্রিস্টান মুদ্রক ড্যানিয়েল বুম্বার্গ ভেনিসে একটি হিব্রু ছাপাখানা তৈরি করেন, সেখানে খ্রিস্টান, ইহুদি এবং ধর্মান্তরিত ইহুদি কর্মীরা মিলে ‘ট্যালমুড’-এর দুটি সংস্করণ প্রকাশ করে (১৫২০-২৩)। ইহুদি টাইপ-সেটার এবং প্রুফরিডারদের সেখানে হলুদ টুপি পড়া বাধ্যতামূলক ছিল না। দেখাদেখি আরও হিব্রু ছাপাখানা চালু হল। শুধু ধর্মগ্রন্থ নয়, ছাপা হতে থাকে সমকালীন ইহুদি সাহিত্যও। সরকারি নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও স্পেন, তুরস্ক, জার্মানির ইহুদি মিলে ভেনিসে ইহুদি সম্প্রদায়ের অগ্রগতি অব্যাহত থাকে। একমাত্র এদেরই তেজারতি কারবার করতে দেওয়া হত। এরা ইটালিয়ান ভাষাও জানত। তবে ভেনিসের নাগরিকত্ব এদের দেওয়া হয়নি। অষ্টাদশ শতক অবধি চালু থেকেছে এই নিয়ম। সফল ইহুদি তেজারতি ব্যবসায়ীরা বাজেয়াপ্ত বন্ধকি মণিমাণিক্যর বিশাল ভাণ্ডারের মালিক হয়ে ওঠে। ইহুদি সম্প্রদায়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী এসব রত্ন কোনো ব্যবসায়ী ব্যবহার করতে পারত না। পোপ শাসিত রাজ্যগুলিতে আঠারো শতক অবধি গেটোবাসী ইহুদিদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ ছিল না। থাকার অনুমতি দেওয়া হত স্বল্প সময়ের জন্য। মেয়াদ ফুরোলে তা পুনর্নবীকরণ করতে হত। অনেক সময় নতুন অনুমতি মিলত না। গাড়ি চড়ার অনুমতি ছিল না ইহুদির। অনুমতি ছিল না খ্রিস্টান ভৃত্য রাখার। ১২১৫ সালে ইহুদিদের ব্যাজ পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। সেই পুরনো প্রথা নতুন করে চালু হয় গেটোয় ইটালিতে ছিল হলুদ বা লাল টুপি। জার্মানিতে হলুদ গোলাকার ব্যাজ পোশাকের উপর পরতে হত। এই ব্যাজ না পরে গেটোর বাইরে চলাচল করলে আইন অমান্যকারীকে কঠিন সাজা পেতে হত। একই ধরনের ব্যাজ পরা আবশ্যিক ছিল মধ্যযুগের বারবনিতাদের। গোড়ায় ইহুদিরা এই নিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। পরবর্তীকালে এই অসম্মানের ভূষণ তাদের আত্মাভিমানের প্রতীক হয়ে দাঁড়াল। এই কুপ্রথা উঠে যাবার বহু পরেও অতি রক্ষণশীল ইহুদি এই ব্যাজ তার অপরিহার্য আভরণ করে নেয়। ইহুদিদের পৃথক জনবসতি ‘গেটো’ চালু হয় জার্মানি, ফ্রান্স, বোহেমিয়ায়। স্থানভেদে কেবল নাম বদলায়, ব্যবস্থা একইরকম থেকে যায়। আধুনিক দুনিয়ায় এই সামাজিক পৃথকীকরণ যতটা নির্মম মনে হয়, গেটোবাসীদের কাছে ততটা ছিল না। ইহুদিরা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে গেটোর চার দেয়াল ইহুদিকে তার প্রতিবেশী শত্রুর হাত থেকে রক্ষাকারী। আরও বোঝা যায় যে অমানবিক হলেও এই পৃথকীকরণ ইহুদি সংহতি ও সংস্কৃতি অনেকটাই অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করেছে। ক্ষেত্র বিশেষে ইহুদি গেটোগুলি অত্যন্ত সংকীর্ণ, আলো বাতাসহীন পরিবেশে তৈরি হলেও রোম, ভেনিস, লুবলিন অথবা প্রাগে বহু রাস্তা, সুসজ্জিত বাড়িসহ গেটো শহরের মধ্যে পৃথক শহরের চেহারা পায়। গেটোর আয়তন নির্দিষ্ট মাপের হবার জন্য প্রস্থে তা বাড়ানো যেত না। ফলে ক্রমে বেড়ে ওঠা ইহুদি জনসংখ্যাকে ঠাঁই দিতে বাড়িগুলি আজকের বহুতল আবাসনের আকার নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ মজবুত না হওয়ায় বাড়তি উচ্চতা সামাল দিতে না পারা বাড়িগুলি ভেঙে হতাহত হত বহু লোক। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও হরহামেশাই লেগে থাকত। ফ্রাঙ্কফোর্ট, নিকলসবার্গ, ভেরোনার ইহুদি গেটোর বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে বহু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জার্মানির গেটোতে থাকার অনুমতি মিলত সীমিত সংখ্যক ইহুদি পরিবারের। ইহুদি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব হবার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল বিবাহে। সরকারি অনুমোদন ছাড়া জার্মান গেটোর কোনো ইহুদি বিবাহ হতে পারত না। অনুমতি মিলত কেবল পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রের বা জ্যেষ্ঠা কন্যার। ফলে এমন দেখা গেছে যে একটি বৃহৎ ইহুদি পরিবারের সদস্যদের অধিকাংশ আজীবন অবিবাহিত থেকে গেছে। ইহুদি ব্যবসায়ীদের নতুন পণ্য বিক্রয়ের অধিকার ছিল না। অনুমোদন ছিল না বস্ত্র ব্যবসার। ছাড় ছিল শুধু দরজির কাজ, মুচির কাজে। রত্ন ব্যবসায় তাদের সমকক্ষ হয়ে ওঠেনি খ্রিস্টান বণিক। এক্ষেত্রে তারা টেক্কা দিয়েছে প্রতিপক্ষকে। এছাড়াও তেজারতি ও বন্ধকির কারবার করতে পারত ইহুদিরা। সর্বত্রগামী ছিল মধ্যযুগের ইউরোপীয় ইহুদি চিকিৎসক। রাজা, মহারাজা, মন্ত্রী, আমলা, যাজক যে যখন কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে তার বাড়িতে হলুদ ব্যাজ, অথবা হলুদ কিংবা লাল টুপি পরিহিত ইহুদি বৈদ্যর প্রবেশ অবারিত ছিল। সামাজিক নিরাপত্তা কিনতে ইহুদিরা নির্যাতন ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকত্ত্বও মেনে নিয়েছে। অনিশ্চয়তাকে ভয় পেত তারা। তুলনায় গেটোর নিরাপদ বেষ্টনীতে সংঘবদ্ধ ইহুদি তাদের নিজস্ব আচার আচরণ অনেক সহজে পালন করতে পেরেছে। চার্চের কাছে গেটো ছিল ইহুদি ছোঁয়া থেকে বাঁচার রক্ষা কবচ। ইহুদি রক্ষণশীলরা গেটোকে ধর্মনিরপেক্ষতার ছোঁয়াচে রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ভেবেছে।

ভূমধ্যসাগরে অটোমান তুর্কি বনাম খ্রিস্টান নৌবহরের হরহামেশা যুদ্ধে বন্দী ইহুদি বণিকরা ক্রীতদাস বাজারে বিক্রি হয়ে যেত। ইহুদি নীতি ছিল তুর্কি মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। স্পেন, পর্তুগাল থেকে বিতাড়িত ইহুদিরা কনস্টানটিনোপলে আশ্রয় পায়। বিনিময়ে তারা অটোমন তুর্কিদের যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে সাহায্য করে। এ্যাড্রিয়াটিক ও ইজিয়ান সমুদ্রে বহু ইহুদি বণিক ছিল। ভেনিসের ইহুদিদের সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক ভেনিসের বাণিজ্যে তাদের গুরুত্ব বাড়ায়। নেপলস, জেনোয়া, লেগহর্ন প্রভৃতি বন্দর থেকে বাণিজ্য করেছে ইটালির ইহুদিরা। এমন বাণিজ্যতরী খুব কম ছিল যাতে ইহুদি বণিক থাকত না। মাঝ দরিয়ায় এইসব বণিক বিপন্ন হত তুর্কি এবং খ্রিস্টান নৌবহরের যুদ্ধে। উভয়পক্ষের কাছেই যুদ্ধবন্দী হিসেবে ইহুদির দাম বেশি ছিল। তারা জানত বন্দী ইহুদি বণিকের আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক, তাকে ছাড়িয়ে নিতে ইহুদি সম্প্রদায় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দিতে প্রস্তুত। খ্রিস্টান জাহাজ থেকে বন্দী করা ইহুদি বণিকের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি হত কনস্টান্টিনোপলে। তুর্কি জাহাজ থেকে বন্দী ইহুদির মুক্তিপণ দিত ভেনিসে ইটালি ও পর্তুগালের ইহুদিদের যুগ্ম সংস্থা যাদের কাজই ছিল পণবন্দী ইহুদিকে মুক্ত করা। এই ইহুদি কেনাবেচায় মুখ্য ভূমিকায় ছিল সেন্ট জনের নাইটরা। তাদের দাস বাজার ছিল মালটা। ওরা বেছে বেছে ইহুদি বণিক তুলে নিত। এমনকি খ্রিস্টান জাহাজ থেকেও। যুক্তি ছিল, ওই ইহুদিরা অটোমন তুরস্কের প্রজা। নাইটরা বন্দী ইহুদিদের ব্যারাকে আটকে রাখত যতদিন না ভালো খদ্দের পাওয়া যায়। ভেনিসের ইহুদি সংগঠনের একজন এজেন্ট সর্বদা মজুত থাকত যার কাজ ছিল মালটায় নিয়ে আসা ইহুদি যুদ্ধবন্দীদের হিসেব রাখা এবং পর্যাপ্ত অর্থ মজুত থাকলে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়া। এই দাসদের খ্রিস্টান মালিকরা ইহুদি মুক্তি সংগঠনগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করে চড়া অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করত। পঁচাত্তর বছরের জুডা সারনাগোকে একটি ছোট সেলে মাসাধিক কাল আটকে রাখে তার মালিক। বৃদ্ধ অন্ধ হয়ে যায়। উঠে দাঁড়াবার শক্তি ছিল না তার। তার খ্রিস্টান মালিক হুমকি দেয় দু’শো ডুকাট যদি ইহুদি এজেন্ট না দেয় তবে লোকটির দাড়ি এবং চোখের পাতা উপড়ে নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত দু’শো ডুকাট দিতে হয় ইহুদি এজেন্টকে। দর বাড়াবার অন্য এক কৌশল ছিল এজেন্টের সামনে বন্দী ইহুদিকে চাবুক মারা। এভাবে মৃত্যু হত অনেক বন্দীর। তিনশো বছর মালটার এই নিষ্ঠুর ইহুদি দাস বাজার টিঁকে ছিল। পুরনো নথি থেকে জানা যায় ১৭৬৮ সালে ইংল্যান্ডের ইহুদিরা মালটায় ইহুদি ক্রীতদাসের একটি দলকে মুক্ত করতে আশি পাউন্ড পাঠাচ্ছে। তিরিশ বছর বাদে নাপোলিয়ান এই অমানবিক ব্যবসা বন্ধ করেন।

***

১. ষোড়শ শতকের স্পেন ও পর্তুগালে নির্বাসন এড়াতে যেসব ইহুদি ধর্মান্তরিত হয় তারা মাররানো। এদের বিষয়ে আগে বলা হয়েছে।

২. স্পেনের রোমান ক্যাথলিক রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের অধীনস্থ উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ‘Low Countries’ বেলজিয়াম, লুক্সেনবুর্গ, নেদারল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত প্রোটস্ট্যান্ট ডাচ রিপাবলিকে ১৫৬৮-১৬৪৮ সালে স্পেনের ক্যাথলিক শাসনের বিরুদ্ধে সফল বিদ্রোহ হয়।

৩. মধ্য ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য এশিয়ার ইন্দ-ইউরোপীয় স্লাভিক ভাষাভাষী প্রাচীন জনগোষ্ঠী স্লাভ।

৪. Paul Johnson : A History of the Jews.

৫. ৫০০ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইটালির কিছু অঞ্চলে পোপের রাজ্যপাট বজায় ছিল।

৬. A History Of The Jews From Earliest Times Through The Sixty Day War. Revised Edition: Cecil Roth: Shocken Books, New York.

পঁচিশ

স্প্যানিশ ইনক্যুইজিশন-মাররানো ইহুদি-মেকি ‘মেসিয়া’-পোলিশ হাসিডিজম-ফরাসি বিপ্লব

ভিনধর্মীদের বিরুদ্ধে ক্যাথলিক চার্চের জিহাদ কুখ্যাত ইনক্যুইজিশনে পরিণত হল যথাক্রমে ১৪৭৮ সালে স্পেনে রাজা ফার্দিনান্দ ও রানি ইজাবেলার রাজত্বে এবং পর্তুগালে ১৫৩৬ নাগাদ। ইনক্যুইজিশন রোমান ক্যাথলিক চার্চের আইনি আওতাভুক্ত স্থানীয় প্রশাসকদের কিছু সংগঠন যেগুলির হাতে তথাকথিত ধর্মদ্রোহীদের বিচারভার ন্যস্ত হয়েছিল। দ্বাদশ শতকে ফরাসি দেশে ধর্মীয় বিদ্রোহ দমনে প্রথম চালু হয় ইনক্যুইজিশন। মধ্যযুগের শেষ ধাপে প্রোটেস্টান্ট সংশোধনবাদ ও তার প্রতিক্রিয়ায় ক্যাথলিকদের পালটা সংশোধনবাদ ইনক্যুইজিশেনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। রেনেসাঁ মানবতাবাদী থেকে ভিনধর্মী ইহুদি অথবা মুসলমান কেউ এই নারকীয় বিচারের হাত থেকে অব্যহতি পায়নি। স্পেন এবং পর্তুগাল এমনকি আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকায় তাদের সাম্রাজ্যগুলিতেও ইনক্যুইজিশন চালু করেছিল। ধর্মদ্রোহিতা, ডাইনি উপাসনার অভিযোগে হাজার নিরাপরাধের মৃত্যুদণ্ড দেয় ইনক্যুইজিশন। আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষীণ সুযোগ থাকলেও তারা জানতে পারত না তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি সঠিক কি। তারা এও জানত না কে বা কারা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে। বিচার চলাকালীন দৈহিক অত্যাচারও করা হত। একমাস পরে ‘অটো ডা ফে’-তে` রায় ঘোষণা হত। একমাস ধরে নরমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি চলত সাড়ম্বরে। যেন এক জাতীয় উৎসব পালনের তোড়জোড় চলেছে। নির্দিষ্ট দিনে শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রশাসনিক কর্তারা, চার্চের যাজক, বিশপ অভিজাত মানুষজন হাজির হতেন। সারারাত প্রার্থনা গীত গাওয়া হত, সকালে প্রার্থনা সভার পর প্রাতরাশের ব্যবস্থা থাকত। এরপর বন্দীদের সারিবদ্ধভাবে নিয়ে আসা হত। প্রত্যেকের শরীরে তার অপরাধ অনুপাতে হলুদ কাপড়ের ব্যাজ পরানো থাকত। হতভাগ্য বন্দীরা তখনও জানে না কোন চরম দণ্ড তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এরপর শহরের বাইরে এক দহন ভূমিতে তাদের নিয়ে যাওয়া হত। সেখানেই ঘোষিত হত বিচারের রায়। যে ভাগ্যবানরা নির্দোষ সাব্যস্ত হত নতজানু হয়ে চার্চের ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানান তাদের বাধ্যতামূলক ছিল। বেঁধে পোড়ানো হত দোষীদের। স্প্যানিশ ইনক্যুইজিশনে সঠিক কত সংখ্যক ইহুদি ও অন্য ধর্মের মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল তার হিসাব নিয়ে বিতর্ক আছে। সংখ্যাটা তিরিশ থেকে পঁচিশ হাজারের মধে ওঠানামা করেছে। যদিও আধুনিক গবেষকদের ধারণা হাজার তিনেক মানুষকে এভাবে খুন করা হয়। বাঁচার একমাত্র খোলা রাস্তা ছিল ধর্মান্তরিত হওয়া। স্পেন ও পর্তুগালবাসী বহু ইহুদি সেটাই করে। এরাই ‘মাররানো’। ‘মাররানো’দের পরবর্তী প্রজন্ম দুই দেশেই সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও প্রতিপত্তি পেয়েছিল। অনেকে ক্যাথলিক চার্চের গুরুত্বপূর্ণ পদও পায়। অধিকাংশ মাররানোই মনেপ্রাণে তাদের পুরনো ধর্মীয় বিশ্বাস আঁকড়ে ছিল। ফলে একটা সময় আসে যখন এই নব্য খ্রিস্টানরা ভূমধ্যসাগরীয় ক্যাথলিক দেশগুলি থেকে উত্তর আফ্রিকা, তুরস্ক, উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ‘লো কান্ট্রিজ, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে পালানো শুরু করে। খুব সহজ ছিল না এই পলায়ন। কারণ তা ছিল আইনত দণ্ডনীয়। তা সত্ত্বেও পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে নব্য খ্রিস্টানদের আইবেরীয় উপদ্বীপ অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের স্পেন, পর্তুগাল ইত্যাদি দেশত্যাগ অব্যাহত থাকে। ওরা খুঁজছিল সেই দেশ যেখানে ওদের বংশানুক্রমিক ধর্মাচরণ প্রকাশ্যে করা যায়। ইতিমধ্যে আমেরিকা আবিষ্কার হয়েছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক অগ্রগতি ক্রমে স্তিমিত হয়ে আসছে। বাণিজ্য, নৌপরিবহণ, সম্পদ এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের জোয়ার লেগেছে উত্তর আটলান্টিক মহাসমুদ্রে। নব্য খ্রিস্টান ওরফে ছদ্মবেশী ইহুদিদের মধ্যে যারা উচ্চাকাঙ্খী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তারা বেছে নেয় নতুন দুনিয়া। পশ্চিম ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র লন্ডন শহরেও গড়ে ওঠে ছদ্মবেশী ইহুদিদের কলোনি। ১৬০৯ সালে রানি হেনরিয়েটা মারিয়ার রাজত্বে গোপনে ইহুদি ধর্মাচার করার অপরাধে ছদ্মবেশী ইহুদি মাররানোদের ইংল্যান্ড থেকে বহিষ্কার করা হল। কমনওয়েলথের প্রবর্তক অলিভার ক্রমওয়েল (১৫৯৯-১৬৫৮) উপলব্ধি করেন মাররানো ইহুদি বণিকদের বাণিজ্যিক গুরুত্ব। কথিত, ক্রমওয়েল রাজনৈতিক শলা পরামর্শ করতেন মাররানো বণিকদের সঙ্গে। ফলে মাররানো ইহুদিরা আবার ইংল্যান্ডে ফিরতে থাকে। ফরাসি সমুদ্র বন্দরগুলিতেও মাররানো ইহুদি উপনিবেশ গড়ে ওঠে। ক্যাথলিক দেশ ফ্রান্সের ইহুদি-নীতি স্পেন ও পর্তুগালের মতোই কঠিন হওয়াতে সেদেশে খাঁটি ইহুদিদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। ১৭৩০ সালে পঞ্চদশ লুইয়ের আমলে দু’শো বছরের ক্যাথলিক নিয়মের কড়াকড়ি তুলে নেওয়া হলে দক্ষিণ ফ্রান্সের নব্য-খ্রিস্টানরা অবশেষে সরকারিভাবে ইহুদি স্বীকৃতি পায়। দূর-প্রাচ্যে ভারত এবং সদ্য আবিষ্কৃত আমেরিকা অবধি ছড়ানো এই মাররানো বসতিগুলি সপ্তদশ শতকে এক নয়া বিশ্ববাণিজ্য যোগসূত্র তৈরি করে। প্রবাল, চিনি, তামাক ব্যবসায় একচেটিয়া দখল নেয় মাররানো ইহুদি।

প্রাচীনকাল থেকেই ইহুদি র‍্যাবাইদের বদ্ধমূল বিশ্বাস উষার আগে যেমন নিশ্ছিদ্র আঁধার, তেমনই ইতিহাসের চরম সঙ্কট মুহূর্তে ইহুদি জাতির ত্রাণকর্তা ‘মেসিয়া’ আবির্ভূত হবেন। ইহুদি ইতিহাসে একের পর এক দুঃসময় ঘনিয়েছে এবং প্রতিবারই মেসিয়ার আগমন বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে মেকি ত্রাণকর্তারা। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ ইহুদি ইতিহাসে চূড়ান্ত দুঃসময়। গোটা বিশ্বে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলেছে। ইনক্যুইজিশনের আগুন তখনও নেভেনি ক্যাথলিক স্পেন ও পর্তুগালে। পূর্ব ইউরোপে পোল্যান্ড, ইউক্রেনে বোহডান খেমলনিটস্কির (১৫৯৫-১৬৫৭) কসাকদের হাতে প্রায় নির্মূল হয় ইহুদিরা। সারা ইউরোপ সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুতে ভরে ওঠে। অতীন্দ্রিয়বাদী গুপ্তসাধক কাবালিস্ট ইহুদিরা তখন রাত্রিদিন তপস্যামগ্ন মেসিয়ার আগমনের দিনক্ষণ নির্ধারণে। বিপর্যস্ত ইহুদি জনতাও তাদের উপর আস্থাশীল। এই সময় এশিয়া মাইনরের স্মিরনায় সাব্বাটাই জেভি (১৬২৬) নামে কাবালিস্ট সাধনায় গভীর প্রভাবিত এক দিব্যকান্তি যুবক জেরুজালেম থেকে তীর্থ করে ফিরে ১৬৬৫ সালে জনসমক্ষে নিজেকে মেসিয়া বলে ঘোষণা করে। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকায় সে আনন্দবার্তা রটে যায়। জনগণের উন্মাদনা বাড়ে। সিনাগগগুলিতে ‘পূণ্যাত্মা প্ৰভু সাব্বাটাই জেভি’র নামে প্রার্থনার হিড়িক পড়ে। শেষের সে দিন আগত ধরে নিয়ে সাধারণ মানুষ কৃত পাপের জন্য সিনাগগে অনুতাপ প্রকাশ করে। শিশুদের বিয়ে দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। ধনী বণিক, বিশিষ্ট অভিজাতরা সাব্বাটাই জেভিকে সমর্থন জানিয়ে আবেদনপত্র পাঠায়। উৎসাহিত জেভি কনস্টান্টিনোপল যাত্রা করে সেখানকার মুসলমান শাসকের জন্য দৈববার্তা নিয়ে। কনস্টান্টিনোপলে পা রাখা মাত্র উজিরের আদেশে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কারাবাস অবশ্য রাজকীয় ছিল, এতটাই যে কারাগারে বসেই সনাতন ইহুদি ধর্মীয় আচার নসাৎ করে নতুন আমোদ প্রমোদের ফতোয়া জারি করতে থাকে সাব্বাটাই জেভি। উপবাসের দিনকে পানভোজনের দিন বলে জাতভাইদের উদ্দেশে নয়া নির্দেশ জারি করে সে। অবস্থা চরমে পৌঁছলে সুলতানের দরবারে ডাক পড়ল মেকি মেসিয়ার। তাকে স্পষ্ট বলা হল ধর্মান্তর অথবা মৃত্যু যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। সাব্বাটাই জেভি মুসলিম ধর্মগ্রহণ করে। সুলতানের ভাতাভোগী হিসেবে বাকি জীবন সুখে কাটিয়েছিল জেভি। মজার বিষয় এরপরও সারা পৃথিবী জুড়ে সাব্বাটাই জেভির অনুগামীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানুষ তখনও তাকে পরিত্রাতা হিসেবে দেখে। সেও ভক্তবৃন্দের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, নানাবিধ অতীন্দ্রিয় চর্চা করে। ১৬৭৬ সালে জেভির মৃত্যু হলে তার অধিকাংশ অনুগামী যারা গুরুর দেখাদেখি মুসলমান ধর্মগ্রহণ করছিল তারা ফের ইহুদি হয়ে যায়। তবে প্রকাশ্যে নয়, গোপনে নিজের ঘরে। এদের নাম হল ডমনে। বহু বিশিষ্ট র‍্যাবাই গোপনে সাব্বাটাই জেভির অনুগামী হয়েছিল। পূর্ব ইউরোপের ইহুদিদের মধ্যে সাব্বাটাই জেভির অতীন্দ্রিয় সাধনা বিশেষ জনপ্রিয় হয়।[২]

মেসিয়া উন্মাদনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে আঠারো শতকের পোল্যান্ডে জন্ম নিল হাসিডিজম। বাল শেম টভ নামে অধিক পরিচিত ইজরায়েল বেন এলিজার (১৬৯৮-১৭৬০) ইহুদি ধর্মের মাত্রাতিরিক্ত অনুশাসনের বিকল্প হিসেবে প্রেম, দয়ালুতা ও ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদের মিশ্রণ হাসিডিজম প্রবর্তন করেন। এককথায়, অক্ষরজ্ঞানহীন সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা এবং সুপ্ত ঐশীত্বকে শাস্ত্রজ্ঞদের জ্ঞানের সমমর্যাদা দিল হাসিডিজম। দয়ালু অতীন্দ্রিয়বাদী নতুন শিক্ষক বাল শেম টভ শেখালেন, দয়াবান মানুষ যিনি সকলকে ভালোবাসেন তার মূল্য একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতের তুলনায় বেশি। মানুষ যত দরিদ্র যত অজ্ঞই হোক ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগের জন্মগত অধিকার তার আছে। শরীরকে যন্ত্রণা দিয়ে মোক্ষলাভ হয় না, আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং অহং নিবৃত্তি পৃথিবী ও স্বর্গের ফারাক মুছে দেয়। ধীরে ধীরে বাড়ে বাল শেম টভ (Master of the Good Name) অনুগামী ভক্ত দল। পূর্ব ইউরোপের ইহুদিদের আধ্যাত্মিক নবজাগরণ ঘটাল হাসিডিজম। অপরদিকে পশ্চিম ইউরোপীয় ইহুদিদের চূড়ান্ত মোহভঙ্গ হয়েছে। মেকি মেসিয়া সাব্বাটাই জেভি কাণ্ডে সবচেয়ে আহত হয়েছে তাদের আত্মাভিমান। পরবর্তী সময় ভুয়া মেসিয়ার খপ্পরে পড়ার বাসনা তাদের আর রইল না। ইহুদি মধ্যযুগের অবসান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে গেটোর দেয়ালে ফাটল ধরে। পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলিতে আবার যখন ফিরছে ইহুদিরা তখন আর গেটো প্রয়োজনীয় নয়। পোপের অধীনস্থ রাজ্যগুলি ছাড়া ইটালির অন্যত্র শিথিল হয়েছে ইহুদিদের সামাজিক পৃথকীকরণ। মধ্য ইটালির টাস্কানির মতো আলোকপ্রাপ্ত শহরে কিছু ইহুদি গেটোর বাইরে বসবাস করলে কেউ আপত্তি তোলে না। গেটোর সিংহদরজা রাতে বন্ধ থাকল কি না তা নিয়েও তেমন মাথা ব্যাথা নেই কারও। জার্মানিতে ইহুদি বসতি জুডেনগাস গুরুত্ব হারিয়েছে। বিশেষ সুবিধাভোগী ইহুদিরা জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, সমাজের উঁচুতলার জার্মানদের সঙ্গে একসারিতে ওঠা বসার সুযোগ পাচ্ছে। বার্লিনের সংরক্ষিত ইহুদিদের সামাজিক প্রভাব ফ্রাঙ্কফোর্টের মতো প্রাচীনপন্থী জার্মান শহরগুলির তুলনায় অনেক ভালো। জার্মান ইহুদির নব্য সামাজিক গুরুত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন খ্যাতনামা জার্মান ইহুদি দার্শনিক মোজেস মেন্ডেলসন (১৭২৯-১৭৮৬)। মেন্ডেলসনের মেধা ও পাণ্ডিত্যর স্বীকৃতি হিসেবে প্রুসিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স ১৭৬১ সালে তাঁকে পুরস্কৃত করে। উল্লেখ্য, এই পুরস্কারের অপর দাবিদার বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের ওই নিবন্ধ প্রতিযোগিতায় মেন্ডেলসনের কাছে হেরে যান। জার্মান গেটো ‘জুডেনগাস’-এর আধ্যাত্মিক এবং সাহিত্য জগতে নতুন দিশা হয়ে এল হিব্রু ভাষ্যসহ চমৎকার জার্মানে অনুদিত মেন্ডলসনের ‘পেন্টাটুক’। জার্মান ইহুদির মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনার সম্ভাবনা উন্মোচিত হল। রাজনৈতিক ভাবনাতেও মোজেস মেন্ডেলসনের উত্থান প্রভাব ফেলে। আঠারো শতকের জার্মান রাজা দ্বিতীয় ফ্রেড্ররিক (১৭১২-১৭৮৬), রাশিয়ার পিটার দি গ্রেট (১৬৭২-১৭২৫), রুশ সাম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথারিন (১৭২৯-১৭৯৬), অস্ট্রিয়ার রাজা দ্বিতীয় জোসেফদের (১৭৪১-১৭৯০) মতো মুক্তচিন্তার আলোকপ্রাপ্ত একনায়করা যে নতুন ধরনের শাসন চালু করেন সেখানে আইন, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কার প্রাধান্য পেল। এরা উপলব্ধি করলেন ইহুদি এবং খ্রিস্টানে ফারাকটা দুরতিক্রম্য নয়। মোজেস মেন্ডেলসনের দর্শনে প্রভাবিত দ্বিতীয় জোসেফ খ্রিস্টান ও ইহুদিকে রাতারাতি একই আসনে না বসিয়েও ক্যাথলিক রাষ্ট্রে ইহুদিদের নাগরিক বাঁধনমুক্তির পক্ষে তাঁর বিখ্যাত লেখা ‘টলারাঞ্জপ্যাটেন্ট’-এ (Toleranzpatent) জোর সওয়াল করেন। ছ’বছর বাদে সরকারি নির্দেশ হল বাইবেলের পূর্বপুরুষের গোত্রনামের বদলে শনাক্ত করা যায় এমন পদবি ব্যবহার করুক ইহুদিরা। ফ্রান্সে এক শহর থেকে অন্য শহরে চলাচলের জন্য গরু ছাগলের সঙ্গে ইহুদিকেও টোল ট্যাক্স দিতে হত। ১৭৮৪ এই কর দেবার অবমাননা থেকে মুক্তি পায় ইহুদিরা।

এতসব পরীক্ষা নিরীক্ষার মাঝে ফরাসি বিপ্লবের দামামা বাজে। ফরাসি বিপ্লবের সদর্প ঘোষণা মানবাধিকারের দাবির সমার্থক হয়ে ওঠে ইহুদি সামাজিক সমানাধিকারের জটিল প্রশ্ন। ইউরোপের অন্য ক্যাথলিক দেশগুলির মতোই এযাবৎ টানাপোড়েনের কেটেছে ফরাসি ইহুদিদের। সতেরো বার তারা বিতাড়িত হয়েছে। সতেরো বার তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর্থিক লোভের অভিযোগে অভিযুক্ত ইহুদিদের এক সময় ফ্রান্স ছাড়ার হুকুম দেওয়া হয়েছিল। ফরাসি শাসকরা বারবার ঠেকে শেখে যে ইহুদি বণিক বিনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে অর্থাগম অসম্ভব। আর্থিক উন্নয়নই ফ্রান্সে ইহুদিদের ফিরিয়ে নেবার স্বপক্ষে অন্যতম যুক্তি হয়ে ওঠে। ফরাসি পার্লামেন্টে ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৭৮৯ ইহুদিদের নাগরিকত্ব প্রদান নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। বিতর্কের বিষয় ব্যক্তি বনাম জাতি। চরমপন্থী থেকে মধ্যমপন্থী সকলের দাবি জাতি একটাই হবে। এক জাতির মধ্যে আর এক জাতির অস্তিত্ব অসম্ভব। তাদের যুক্তি ইহুদি জাতিসত্তার পৃথক অস্তিত্ব অস্বীকার করে ব্যক্তি ইহুদিকে সব ধরনের নাগরিক অধিকার দেওয়া কৰ্ত্তব্য। অ-ক্যাথলিক প্রোটেস্টান্ট হোক অথবা ইহুদি সকলেই আদতে ফরাসি। সুতরাং সমানাধিকারের যোগ্য দাবিদার। এবার প্রশ্ন, ইহুদি স্বয়ং যদি ফরাসি নাগরিকত্ব নিতে আগ্রহী না হয়? জবাবে ফরাসি পার্লামেন্ট সদস্য Clermont-Tonnerre-র স্পষ্ট বলেন সেক্ষেত্রে তাদের ফ্রান্স থেকে নির্বাসিত করা উচিত। তাকে সমর্থন জানালেন রবস্পিয়ার’। ১৭৯০ জানুয়ারি ২৮, সংখ্যা গরিষ্ঠের সমর্থনে পাশ হল ইহুদি নাগরিকত্ব বিল। যদিও সেটা ফরাসি দেশের সব ইহুদিদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না, কেবল পর্তুগিজ ও আভিগননিজ ইহুদিরা এর আওতাভুক্ত হল। ফরাসি পার্লামেন্ট ভেঙে যাবার কিছুদিন আগে ১৭৯১ সেপ্টেম্বরে সব ইহুদির নাগরিকত্ব আইনগত স্বীকৃতি পায়। ফরাসি দেশে ইহুদিধর্ম একটি পৃথক ধর্মের নাম হিসেবে পরিচিত হল। প্রতিদানে দেশপ্রেমের প্রমাণ হিসেবে রিপাবলিক সেনা ফরাসি ইহুদি ইউরোপের রণাঙ্গনে প্রাণ দিল। যুদ্ধ তহবিলে অর্থ জোগাতে বিক্রি করা হল সিনাগগের অনেক মুল্যবান সম্পদ। ইহুদির মুক্তিবার্তা বয়ে আনে ফরাসি বিপ্লব। নাপোলিয়ন তাঁর বিজয় অভিযানে সেটিকে ছড়িয়ে দিলেন ইউরোপময়। ১৮০৬ থেকে তাঁর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যে ইহুদিদের সামাজিক অবস্থার মান উন্নয়নে সহায়ক বেশকিছু নতুন ব্যবস্থা নিলেন নাপোলিয়ন। এটা অবশ্য স্পষ্ট নয়, নাপোলিয়ন স্বয়ং ইহুদিদের পছন্দ করতেন অথবা ফরাসি সাম্রাজ্যের আর্থিক উন্নয়নে তাদের ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। কারণ দেখা গেল স্রোতের বিপরীতে হেঁটেই ১৮০৮ সালে তিনি আদেশ দিচ্ছেন ইহুদিদের থেকে নেওয়া যাবতীয় ঋণের ফেরতযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে দেবার, ক্ষেত্র বিশেষে গোটা ঋণ বাতিল করার। এই নির্দেশ ইহুদি সম্প্রদায়কে আর্থিকভাবে ধসিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। নাপোলিয়ানের পতন ও নির্বাসনের পর ইহুদি বিরোধীদের আশা ছিল ফরাসি সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত বরব নৃপতি (BOURBON) অষ্টাদশ লুই নিশ্চয়ই ফরাসি বিপ্লবে ইহুদিদের দেওয়া নয়া অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন। বস্তুত তা ঘটে না। কারণ ইতিমধ্যে স্বাধীন ফরাসি নাগরিক ইহুদিদের দৃষ্টিভঙ্গির এতটাই ফারাক ঘটে গেছে যে কোনো চার্চপন্থী রাজার পক্ষেও তাদের নাগরিকত্ব হরণের অজুহাত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

ফরাসি বিপ্লবে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়া ইউরোপীয় রাজনীতি পরিকাঠামো জোড়াতালি দিয়ে খাড়া করার চেষ্টা হল ১৮১৪ এবং ১৮১৫ পরপর দু’বছর ভিয়েনাতে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রতিনিধিদের মাসাধিককালের সম্মেলনে। এই মহাসম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠায় ইহুদিরাও। তারা সঠিকই অনুমান করে যে সম্মেলনের আলোচনা- প্রসূত সিদ্ধান্ত তাদের ভবিষ্যত নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ফরাসি বিপ্লব ইহুদিদের যে নাগরিক সমানাধিকারের স্বীকৃতি দেয় তারই অনুসরণে সন্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলি স্থির করে তাদের দেশেও একইরকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মধ্য ইউরোপের ঊনচল্লিশটি জার্মান রাজ্য নিয়ে নবগঠিত জার্মান কনফেডারেশন ইহুদিদের সবধরনের নাগরিক সুবিধা দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও এ সিদ্ধান্ত কার্যকারী করায় সমান আগ্রহী ছিল না কনফেডারেশনভুক্ত সব সদস্য দেশ। মন্দের ভালো যাও বা কিছু মিলল সম্মেলন থেকে ইটালি ও জার্মানিতে ফের জাগে ইহুদি বিদ্বেষ। ফরাসি বিপ্লব চলাকালীন ১৭৯৭ সালে ইটালির গেটোর দেয়ালগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো আবার তৈরি হয়। জার্মানিতে দাঙ্গা বাধে। আত্মরক্ষার্থে ধর্মান্তরিত হলেন জন্মসূত্রে ইহুদি হাইনরিখ হাইনের মতো বিখ্যাত জার্মান কবি। এসব বিক্ষিপ্তির মধ্যেও দৃষ্টিভঙ্গির কিছু মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছিল। এখন আর পোশাকে, ভাষায়, পেশায়, আগের মতো ঘৃণ্যজীব নয় ইহুদি। অন্তত তাকে মানুষ বলে মেনেছে ইউরোপ। বাকি থাকে নাগরিকত্ব অর্জন। ইউরোপে সামাজিক বৈষম্য দূর করার একমাত্র দাওয়াই হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে নয়া সংসদীয় ব্যবস্থা, সাংবিধানিক সরকার। সংবিধানদত্ত সে অধিকার আদায় না করা অবধি ইহুদির আত্মবিকাশ অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। মধ্য ইউরোপে উনিশ শতকের বিপ্লবী আন্দোলনগুলোতে তাই ঝাঁপিয়ে পড়ে ইহুদি। বালটিক সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর, রাইন নদীতট থেকে দানিয়ুব, সংসদীয় শাসন ও সংবিধানের বিজয়যাত্রা চলতে থাকে। ইহুদির পূর্ণ সামাজিক মুক্তির সূচনা এভাবেই। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইউরোপের অর্থনৈতিক ও বৌদ্ধিক বৃত্তে ব্যক্তি ইহুদির প্রভাব। আমরা শুনি জার্মানির ধনকুবের রথসচাইল্ড-এর কথা। ইউরোপের মূলধন বাজারে যার পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় ছিল। শিল্প বাণিজ্যের সব বিভাগেই ইহুদিরা প্রবেশ করে। পেশার ক্ষেত্রেও তাই। রাজনীতিক, লেখক, অভিনেতা, সংগীতজ্ঞ, পণ্ডিত, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, দার্শনিক, নাট্যকার, যোদ্ধা—সব পেশায় যুক্ত হল ইহুদিরা। গেটো জীবন থেকে ছাড় পাওয়া তাদের জানার ক্ষুধা অসীম। জানার বিষয়ও অফুরান জগৎ সভায়। প্রত্যাশিতভাবেই ইহুদি বুদ্ধিজীবি তার দীর্ঘ একাকীত্ব কাটিয়ে উঠছে। পশ্চিম ইউরোপের আলোকপ্রাপ্তরা চেষ্টা করছে আধুনিক ইহুদি অভিজ্ঞা কথ্য ভাষায় সবার পাঠের উপযোগী করে হাজির করতে। অপরদিকে পূর্ব ইউরোপে হিব্রুতে রচিত ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যের অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে। এই নতুন প্রয়াসকে বলা হল ‘হাসকালা’ (Haskalah) বা আলোকপ্রাপ্তি। আধুনিক কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাসের বিপুল সম্ভার নিয়ে পূর্ব ইউরোপে জন্ম নিচ্ছে সম্ভাবনাময় ‘ইডিশ’ (Yiddish) সাহিত্য’। ছোট ছোট পরিবর্তন ঘটে যায় আলোকপ্রাপ্ত ইহুদির সনাতন ধর্মাচরণে। সংস্কার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ১৮০১ সালে জনৈক জার্মান ধনী ইহুদি ইজরায়েল জ্যাকবসন একটি আবাসিক স্কুল খুললেন যেখানে খ্রিস্টান ও ইহুদি ছাত্ররা পারস্পরিক সহনশীলতা এবং সৌহার্দ্যর পরিবেশে শিক্ষিত হবে। ১৮১০ সালে যে সিনাগগ চালু করলে জ্যাকবসন সেখানে প্রথম প্রার্থনা গীতের সঙ্গে অর্গ্যানের ব্যবহার এবং জার্মান ও হিব্রু দ্বিভাষী প্রার্থনার সুযোগ থাকল। স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল। জ্যাকবসন যেটি বাহ্যিক পরিবর্তন ‘কসমেটিক চেঞ্জ’ হিসেবে চালু করলেন ইউরোপের অন্যত্র ছড়িয়ে যেতে যেতে তার উত্তাপ এসে লাগে ট্যালমুড সর্বস্ব ইহুদি ধর্মবিশ্বাস, প্রথা ও আচরণে। বিদ্রোহ এবার সনাতনপন্থার বিরুদ্ধে। পুরনো ধর্মীয় উৎসব বাতিল হতে থাকে। র‍্যাবাইদের অধিপত্য নিন্দিত হয়। মেসিয়া ভাবনা ছুঁড়ে ফেলে বিকল্প ‘মিশন ইজরায়েল’ হয়ে ওঠে ইহুদির নতুন স্বপ্ন।

***

১. ‘অটো ডা ফে’বা’অ্যাক্ট অফ ফেথ ষোড়শ শতকের স্পেন ও পর্তুগালে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত তথাকথিত ‘ধর্মদ্রোহীদের’ প্রকাশ্য ক্ষমাপ্রার্থনা ও অনুতাপ প্রকাশ যা উন্মুক্ত জনস্থানে করা হত।

২. A History Of The Jews From Ealiest Times Through The Sixty Day War: Revised Edition: Cecil Roth: Shocken Books. New York.

৩. THE JEWS, THE MASONS AND THE FRENCH REVOLUTION: Vladimir Moss: http://www.orthodoxchristianbooks.com/articles/336/jews, masons-french-revolution/

৪. ‘ইডিশ’ আস্কানেজি ইহুদিদের ব্যবহৃত ‘হাই জার্মান’ ভাষা। পনেরশো শতকের আগেই যা জার্মান ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হিব্রু এবং আর্মায়িকের মিশ্র ভাষায় রূপান্তরিত হয়। পরে পূর্ব ইউরোপে বিশেষ করে পোল্যান্ডে ইডিশ ভাষা এক সমৃদ্ধশালী ইহুদি সাহিত্যের জন্ম দেয়।

৫. A History Of The Jews From Ealiest Times Through The Sixty Day War: Revised Edition: Cecil Roth: Shocken Books. New York.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *