ছয়
ডাক্তারের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে রূপার অসাড় দেহটা দেখছে ব্যারি। ঝুঁকে পড়ে ডাক্তার তার চোখের পাপড়ি ধরে টেনে চোখ খুলল। ডাগর কালো চোখের মণি দেখা গেল। এখন অস্বাভাবিক রকম স্ফীত।
‘মেয়েটা সুস্থ তো?’ উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল ব্যারি।
‘অবশ্যই।’ খেঁকিয়ে উঠল ডাক্তার, ‘ভাল না থাকার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কি?’
‘মানে…’ আরম্ভ করেছিল ব্যারি কিন্তু অ্যানেসথেশিয়ার ওপর ডাক্তারের ছোটখাট একটা লেকচার শুনে দু’হাত তুলে অসমৰ্পণ করল।
‘না, আমি আপনার খুঁত ধরতে যাচ্ছি না—তবে, কবির চৌধুরীর নির্দেশ—মানে…আপনি তো জানেনই।’
‘খুব জানি।’ গর্বের সাথে বলল ডাক্তার। ‘তোমার মনে রাখা উচিত যে আমি এখানকার মেডিক্যাল ইনচার্জ। এরা সবাই আমার তত্ত্বাবধানে আছে। আমি চাই না কোন নির্বোধ অবুঝ এখানে নাক গলাক। তুমি যদি চাও আমি কবির চৌধুরীর কাছে রিপোর্ট করি তুমি আমার কাজে সাহায্য করার চেয়ে বাধারই সৃষ্টি করেছ বেশি, অন্তরায়ই হয়েছ, তাহলে…’ কথা শেষ করতে পারল না ডাক্তার।
‘না, না।’ আঁতকে উঠল ব্যারি। ‘আপনিই এখানে সর্বেসর্বা—আমি শুধু নিশ্চিত হতে চাইছিলাম সবকিছু ঠিক আছে, কোন গোলমাল বাধেনি।
‘গোলযোগ?’ খেপে উঠল ডাক্তার, ‘এই মেয়ের নাড়ি, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস সবই চমৎকার ভাবে কাজ করছে। আমার ধারণা তোমার চেয়েও সক্ষম আর বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী এই মেয়ে—আর তুমি বলছ কিনা গোলযোগ? পথ ছাড়ো, অযথা সময় নষ্ট কোরো না আমার। অন্যান্য সবাইকে এখনও পরীক্ষা করা বাকি রয়েছে।
সরে দাঁড়াল ব্যারি। ডাক্তারকে ছেড়ে পাইলটের কেবিনের দিকে এগুলো। জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু হেমন্তে র এই সুন্দর সকালও ব্যারির মনে কোন আনন্দের সঞ্চার করতে পারল না। সূর্যটা পিছন দিকে। সবুজ মাঠে সামনের দিকে হেলিকপ্টারের ছায়াটা পড়েছে। মনে হচ্ছে যেন নিজের ছায়াকেই দাবড়ে নিয়ে চলেছে হেলিকপ্টারটা। এক ঘণ্টা হলো ওরা প্যারিস ছেড়েছে। পাক্কা শহুরে মানুষ ব্যারি—ওর মনটা এরই মধ্যে ছটফটিয়ে উঠছে শহুরে জীবনের জন্যে। গ্রাম, খালি মাঠ আর এখানকার বাসিন্দাদের কাউকেই কেন জানি ও বিশ্বাস করতে পারে না।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দিগন্তের দিকে চেয়ে রয়েছে ব্যারি। দেখল, দূরে স্যাতোটা ধীরে ধীরে আকারে বড় হচ্ছে।
পাইলট দেখতে পারে না ব্যারিকে। মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘এখানে কি চাও? নিজের কাজ করো ওদিকে গিয়ে।’
মুখ ব্যাজার করে ফিরে এল ব্যারি প্রধান কেবিনে।
চারজনই সম্পূর্ণ অচেতন—কারও গায়ে এক চিলতে কাপড় নেই। একবার দেহ পরীক্ষা করছে আবার ফাইল নিয়ে কি যেন সব মিলিয়ে দেখছে ডাক্তার নিবিষ্ট মনে।
‘ওরা সবাই পরিষ্কার তো, ডাক্তার?’ বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করল সে।
হাসল ডাক্তার ওর বলার ভঙ্গিতে। ‘আপাতদৃষ্টিতে ওদের কারও কোন রোগ আমার পরীক্ষায় ধরা পড়েনি। ওরা কেউ ড্রাগ অ্যাডিক্ট না এবং সবাই আজ স্থান করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় তুমি জানতে চাইছ ওদের কারও কাছে লুকানো কোন অস্ত্র আছে কি নেই—তাই না?’
‘ঠিক ধরেছেন। আকর্ণ বিস্তৃত হাসি উপহার দিল সে ডাক্তারকে।
‘না, নেই।’ উত্তর দিয়ে বাধিত করল ডাক্তার।
হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে স্যাতো দেখা যাচ্ছে—এখন আরও কাছে, আরও বড় দেখাচ্ছে। এটা লয়ার উপত্যকার তিরিশটা স্যাতোর মধ্যে একটা। পাঁচশো বছরেরও বেশি বয়স। হয়তো এখানে শ্যামবোর্ডের ব্লোয়িস ট্রায়োর মত ইন্দ্রজাল নেই, কিন্তু কবির চৌধুরীর এই স্যাতোটা নিরিবিলি। অদ্ভুত একটা নিশ্চিন্ত স্বস্তি আছে এখানে। আর আছে বিভিন্ন আর্ট কালেকশন। সম্ভবত বাকি সব কয়টা স্যাতোর আর্ট কালেকশন একত্র করলেও এই স্যাতোর সমান হবে না। শান্তিতে জীবন কাটানোর জন্যে সত্যিই এটা একটা চমৎকার জায়গা।
ছাতের উপরে একটা ব্রোঞ্জের ঈগল শোভা পাচ্ছে অনেকগুলো চূড়ার ছুঁচাল মাথা ছাড়িয়ে। লম্বা লম্বা চিমনিও রয়েছে বেশ কয়েকটা। আইভি লতা উপরে উঠে গেছে বিশাল চওড়া রাজকীয় জানালাগুলোর পাশ দিয়ে। ঠিক মাঝামাঝি চওড়া পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে বারান্দার দিকে। সিঁড়ির দুই ধারে অপূর্ব সুন্দর সব মূর্তি সাজানো রয়েছে সার বেঁধে, সামনের বিরাট খোলা জায়গা থেকে আরম্ভ করে সদর দরজা পর্যন্ত। প্রত্যেকটা ধাপেও দুধারে দুটো করে মূর্তি।
সামনেই চমৎকার সাজানো বাগান—প্রথমে ফুলের বাগান। তার পরে ইটালিয়ান বাগান, সব্জি বাগান, ভেষজ লতাপাতার বাগান। কয়েকটা ঝরণা ছড়িয়ে আছে এদিক সেদিক। প্রত্যেক ঝরণাতেই সাদা মার্বেলের মূর্তি।
‘ওদের জাগাবার ব্যবস্থা করুন, ডাক্তার—আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি।’ মন্তব্য করল ব্যারি। ডাক্তার ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ নিয়ে।
দশ মিনিট পরে সুন্দর পার্কটায় নামল হেলিকপ্টার। কবির চৌধুরীর প্রাসাদের ঠিক সামনেই।
ইতোমধ্যেই ডাক্তারের পরিচর্যায় কবির চৌধুরীর এখানে নবাগতদের সবারই জ্ঞান ফিরেছে। রোটর ব্লেড থামার অপেক্ষা করছে অভ্যর্থনাকারী। ওটা থামতেই দরজা খুলে উপরে উঠে এল সে। ‘স্যাতো ক্লরিনটের পক্ষ থেকে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমার নাম রবার্ট গোমেস—আমি মশিয়ে কবির চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী। আশা করি ট্রিপে কোন অসুবিধে হয়নি আপনাদের। কারও কোন প্রশ্ন আছে?’
‘হ্যাঁ, আমার একটা প্রশ্ন আছে,’ বলে উঠল ডেভিড ফ্রস্ট। হাতের আঙুলটা ঘষল সে জানালার কাঁচে। একটা তেলতেলে দাগ পড়ল সেখানে। ‘আমার অজ্ঞাতসারে কেন আমার হাতের ছাপ নেয়া হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘শুধু আপনার নয়, সবারই হাতের ছাপ নেয়া হয়েছে। আমাদের চেক করে দেখতে হয় ফাইলের সঙ্গে। তবেই না আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারব? জানব যে হ্যাঁ, আমরা বন্ধু-বান্ধবের মাঝেই আছি—কি বলেন?’ বক্তব্য শেষ করল রবার্ট।
ব্যাখ্যা পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলো যেন ডেভিড। রূপার দিকে চেয়ে একটু হাসল সে। রূপাও প্রতিউত্তরে হাসল—কিন্তু ভিতরটা তার কুঁকড়ে রয়েছে এক অজানা আশঙ্কায়—যদি চিনে ফেলে তবেই সর্বনাশ।
ডেভিডের ভাবে ভঙ্গিতে বা তার কথায় এমন কোন ইঙ্গিত প্রকাশ পায়নি যে রূপা তার পূর্ব-পরিচিতা। সে কি উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় আছে? মানে সরাসরি ধরিয়ে দেবে কবির চৌধুরীর কাছে? নাকি সত্যি সত্যিই সে চিনতে পারেনি রূপাকে? কিন্তু ও তো দেখা মাত্র ডেভিডকে চিনেছে? নিজের রূপ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন সে—কোন মিথ্যা বিভ্রান্তিও নেই। রূপা বেশ ভালভাবেই জানে ডেভিডের মত লোকের পক্ষে তাকে লক্ষ না করা বা ভুলে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
কিন্তু হাসি দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। সহজ সরল স্বাভাবিক হাসি। অপরিচিতা সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে ভাব জমাতে চাইলে পুরুষ মানুষ যে রকম হাসে—ডেভিডের চোখেমুখে ঠিক সেই রকমই হাসি।
‘এসো ভিতরে যাওয়া যাক।’ নিচে নামল রবার্ট গোমেস।
রানা ছিল দরজার সবচেয়ে কাছে। সে-ই প্রথম লাফিয়ে নেমে হাত বাড়িয়ে রূপাকে নামতে সাহায্য করল।
‘বাহ্, ভদ্রতাও জানে দেখছি!’ অবজ্ঞাভরে টিপপনি কাটল ডেভিড।
ঘুরে দাঁড়াল রানা। দুজনেই ঠাণ্ডা চোখে দুজনকে মেপে নিল কিছুক্ষণ। দেঁতো হাসি হেসে ডেভিড বলল, ‘তুমি কি ওখান থেকে সরবে? নাকি আমাকেও নামাতে চাও অমন কোলে করে?’
একটু রুষ্ট হয়েই সরে গেল রানা। ডেভিডকে ধমক দিল রবার্ট, ‘আরও সংযত হয়ে কথা বলবেন ভবিষ্যতে—কবির চৌধুরী নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ঝাঁটি পছন্দ করেন না। এতে কাজের ক্ষতি হয়। এখানে কদর কাজের লোকের। একবার কাজ আরম্ভ হলে তা শেষ না করে কবির চৌধুরীর প্রজেক্ট ছেড়ে কেউ যেতে পারে না।’
‘তাই নাকি? ভারি ইন্টারেস্টিং তো! সে যাক, সাবধান করে দেয়ার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ।’
সবাইকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল রবার্ট। কিন্তু স্যাতোর সদর দরজার দিকে না গিয়ে প্রাসাদের পিছনে নিয়ে গেল সে। কিচেন গার্ডেনের পাশের স্টেবল ইয়ার্ডে পৌঁছল ওরা। ডজন খানেক লোক বসে আছে একজন ইনস্ট্রাক্টরকে ঘিরে। মাঠের অন্য প্রান্তের দেয়ালে দেখা গেল চারটে ছুটন্ত আকৃতি আঁকা। হাত তুলে সবাইকে দাঁড়াতে বলল রবার্ট। ইনস্ট্রাক্টর তেপায়ার ওপর বসানো ভারী মেশিনগানটা ঘুরিয়ে টারগেটের দিকে ফেরাল। রবার্ট চেঁচিয়ে কি নির্দেশ দিতেই আকৃতিগুলো সচল হলো—প্রথমে নামতে নামতে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল, হঠাৎ করে লাফিয়ে বেরিয়ে এল আবার, বাউলী কেটে ডাইনে বাঁয়ে সরে যাচ্ছে সবাই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।
যেন কিছুই না এমন একটা ভাব। বেশি গুলিও খরচ করল না। মাত্র কয়েকটা ছোট ছোট বার্স্টে মেশিনগানধারী আকৃতিগুলোকে একটা একটা করে কচু কাটা করে ফেলল। দেখেই বুঝল সবাই, একটা গুলিও বৃথা যায়নি। এবার সে একটা ডামির ওপর গুলি ছুঁড়বে। কাঠের ডামি, মাটিতে শোয়ানো কম্যানডো ক্রল করছে যেন। গুলির শুরুতে মাথাটা গেল সবার আগে। তারপর একটা হাত। এবার পরিষ্কার মাঝামাঝি থেকে দুই ভাগে বিভক্ত হলো ডামিটা। হাঁটুর কাছ থেকে পা দুটোকে আলাদা করা হলো সব শেষে।
‘মিস্টার চৌধুরীর সাথে কি আমাদের এখনই দেখা হবে?’ জিজ্ঞেস করল রূপা।
‘না, আসলে আজকে দেখাই হবে না তাঁর সাথে,’ রবার্ট জানাল, ‘তবে আগামীকাল সকালে তিনি সবার সাথে কথা বলবেন।’
আস্তাবলের পাশ দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো ওদের অস্ত্র-শস্ত্র গোলাবারুদ রাখার মস্ত লম্বা একটা ঘরে। সবার লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে এখানেই।
‘লাঞ্চের পরে সবাইকে যার যার কামরা দেখিয়ে দেব। একটু বিশ্রাম নেয়া হলে স্যাতোটা একটু ঘুরে দেখে আমরা যাব ট্রেনিং গ্রাউন্ডে। হ্যাঁ, একটা কথা জানিয়ে রাখছি কোন অবস্থাতেই কেউ বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। এখানকার টেলিফোন তোমাদের ব্যবহারের জন্যে নয়। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টাকেই বিশ্বাসঘাতকতা বলে গণ্য করা হবে—আর বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি তা তোমাদের আশা করি জানিয়ে দিতে হবে না।’
লাঞ্চের পরে যার যার রূমে পৌঁছে দেয়া হলো ওদের।
স্যাতোর রূমগুলো সব আলাদা আলাদা স্বয়ংসম্পূর্ণ স্যুইট। প্রত্যেকটার একটা করে নাম আছে। নামকরণ করা হয়েছে বিখ্যাত লোক বা জায়গা কিংবা ফ্রান্সের ইতিহাসের পাতা থেকে। রূপা পেয়েছে ‘লি-রয় সোলেইল’। রানার স্যুইটের নাম ‘লুই সিজ’। ডেভিডের ‘নেপোলিয়ান স্টার্ক’।
প্রথম সুযোগেই ‘লুই সিজে’ এসে হাজির হলো রূপা।
‘রাধা কি অভিসারে বের হয়েছেন?’ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল রানা। ‘আমাকে না দেখে দু’দণ্ডও টেকা যাচ্ছে না?’
‘ফাজলামি রাখো তো? ব্যাপার খুব সিরিয়াস।’ গম্ভীর ভাবে বলল রূপা।
‘সিরিয়াস? আবার কি ঘটল?’
রূপা উঠে গিয়ে ট্র্যানজিস্টারের ভল্যুম বাড়িয়ে দিয়ে রানার কাছ ঘেঁষে বসল। ‘ডেভিড ফ্রস্ট!’ প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল রূপা।
‘কি করেছে ব্যাটা?’
‘এক সময়ে সি আই এর অস্ত্র-শস্ত্রের ইনস্ট্রাক্টর ছিল। কয়েক বছর আগে ওর কাছে আমি অস্ত্রের ওপর একটা কোর্স করেছি। যদি চিনে ফেলে? যদি ফাঁস করে দেয়?’
‘হুঁ!’
‘কি করব এখন?’
‘ডেভিড যে তোমাকে চেনে তার কোন ইঙ্গিত দিয়েছে?’
আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে রূপা বলল, ‘না, তবে তার আমাকে না চেনার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
‘তোমার ধারণাই হয়তো ঠিক—তবে এখন আর কিছু করারও নেই। ঝুঁকিটা নিতেই হবে আমাদের। যদি কথাটা কবির চৌধুরীর কানে যায়, সাথে সাথেই জানতে পারব আমরা। ওই আস্তাবলের পাশের মাঠে আমাদের নিয়ে লাইভ টারগেট প্র্যাকটিস করবে ওরা। এতক্ষণেও যখন বলেনি তাহলে হয় তোমার ধারণা ভুল, ও তোমাকে চিনতে পারেনি কিংবা তার নিজস্ব কোন গোপন অভিসন্ধি আছে।’
‘টারগেট প্র্যাকটিসে যদি যেতেই হয় তাহলে কয়েকটাকে নিয়ে যাব।’
‘হ্যাঁ, তবে তার আগে মাথা ঠাণ্ডা আর চোখ কান খোলা রাখাটাই হবে আসল কাজ।’
.
প্রাসাদের লাইব্রেরী ঘরটা সত্যিই খুব দামী দামী জিনিস দিয়ে সাজানো। গোলাপ কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা জানালার প্যানেল। সূক্ষ্ম সব কারুকাজ করা হয়েছে কাঠের ওপর। একটা বিশাল কাশ্মীরী কার্পেট দিয়ে মাঝখানটা ঢাকা। প্রত্যেক শেলফের কাছেই মই রাখা আছে বই নামাবার জন্যে। আর সবচেয়ে উঁচু শেলফ থেকে বই পাড়ার জন্যে রয়েছে ট্রলির উপর সিঁড়ি। পড়ার টেবিলগুলো উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত—আর বসার জন্যে রয়েছে মোটা গদিওয়ালা সোফা। সেগুলোও গোলাপ কাঠের। প্রচুর ড্রিঙ্কস আর সুস্বাদু খাবার সাজানো রয়েছে টেবিলের ওপরে।
রবার্ট গোমেস আর ব্যারি হোমসের সাথে সবাই অপেক্ষা করছে বহু প্রতীক্ষিত সাক্ষাৎকারের জন্যে। আজ সকালেই কবির চৌধুরী প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে সবার।
বাঁধা ধরা রুটিনেই রবার্ট সারা ঘর ভাল মত চেক করেছে। সে যে কাউকে বিশ্বাস করে না, এটা স্পষ্টই বোঝা যায়।
আরাম করে হেলান দিয়ে বসে একটা চেস্টারফিল্ড ধরাল ডেভিড। সামনেই হোয়াইট পোর্টের গ্লাস। মাঝে মধ্যে একটা দুটো পনিরের তৈরি নোনতা বিস্কুট মুখে দিচ্ছে।
রূপা বসেছে একটা চেয়ারে—কারও সন্দেহের উদ্রেক না করে ডেভিডের চেয়ে যতটা দূরে বসা সম্ভব। মেয়েলী চেহারার বিরাটকায় দৈত্য বিশেষ, ইন্দোনেশিয়ান লেপং, সারাটা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছে অবাক বিস্ময়ে—ও ভেবেই পাচ্ছে না এত বই একটা লোকের কি কাজে আসতে পারে? দিনরাত পড়েও তো কেউ শেষ করতে পারবে না এত বই।
রানা খুব গভীর মনোযোগের সাথে একটা কাগজ দেখছে, কাগজটার হেডিং হচ্ছে টপ সিক্রেট ইউ এস আর্মি অর্ডন্যান্স BAT গাইডেন্স সিস্টেম’। ভাল করে পরীক্ষা করে রানা বুঝল কাগজটা মেকী নয়। এটা এখানে কেন, কিভাবে!
কবির চৌধুরী ঢুকল খোলা দরজা দিয়ে। ছদ্মবেশ ধারণে জুড়ি নেই তার। এমন কি রবার্ট পর্যন্ত অবাক হলো। গতকালও যেমন দেখেছিল তেমন আর নেই আজ। এখন তার চুল খয়েরী রঙের, লম্বায়ও যেন একটু বেশি মনে হচ্ছে গতকালের চেয়ে। আগের তুলনায় মুখটাও অনেকটা ভরা। বয়সও দশ বছর কমে গেছে তার। পরনে ঘোড়সওয়ারের পোশাক। বুট জোড়া অস্বাভাবিক রকম চকচক করছে। এক হাতে তার রাইডিং স্টিক। চামড়ার ঝালর কাটা বেতের শেষ প্রান্ত আনমনে মৃদু মৃদু ঠুকছে সে টেবিলের সাথে।
অভিজাত ইংরেজী উচ্চারণে সে আরম্ভ করল, ‘সুপ্রভাত। যাদের সাথে আগে থেকে পরিচিত নই তাদের জানাচ্ছি সাদর আমন্ত্রণ। শত শত নামে আমি বিশ্বের দরবারে পরিচিত, কিন্তু কবির চৌধুরী নামটাই আমার পিতৃ প্রদত্ত। এই নামটাই আপাতত ব্যবহার করছি আমি।’ এইটুকু বলে একে একে সকলের মুখের দিকে অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। কি দেখল তা সে নিজেই জানে।
রানা এতক্ষণ বেশ টেনশনে ছিল। কবির চৌধুরীর দৃষ্টিটা সরে যেতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কবির চৌধুরী চিনতে পারেনি তাকে। অবশ্য এজন্যে কবির চৌধুরীকে দোষ দেয়া যায় না, তার চোখের জ্যোতি কমে এসেছে। তবে একটা জিনিসের ওপর বাজি ধরেছিল রানা, একজন বাঙালী কোনদিনই একজন প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড চুলের লোককে বাঙালী বলে চিনতে পারবে না। রানার চুল এখন ব্লীচ করার ফলে প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড।
আশা করি তোমরা সবাই শুনে খুশি হবে যে আমার কমপিউটরে তোমাদের সবার পরিচয় যাচাই করে জানা গেছে যে তোমরা সবাই সঠিক পরিচয়ই দিয়েছ। রবার্টের রিপোর্টে জানলাম তোমাদের যে সব জায়গায় জন্ম দাগ বা অন্য আইডেন্টিফিকেশন মার্ক আছে বলে আমাদের ফাইলে রিপোর্ট আছে, সেগুলো হুবহু মিলে গেছে।’ ছ্যাঁৎ করে উঠল রানার বুকটা, ভাগ্যিস পিটার উডককের জন্ম দাগ দুটো ট্যাটু করিয়ে নিয়েছিল—নইলে আর ওই অ্যানেসথেশিয়া থেকে জাগতে হত না তার। একটু থেমে আবার শুরু করল কবির চৌধুরী, ‘তবু নিরাপত্তার খাতিরে আমি এখন ও বলব, যদি কারও সম্পর্কে তোমাদের কারও বিশেষ কিছু তথ্য জানা থাকে যা এই প্রজেক্টের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে, তবে সেটা প্রকাশ করার এটাই যথার্থ সময়।’ চুপ করল কবির চৌধুরী।
নীরবতা নেমে এল ঘরের মাঝে। জমে একেবারে পাথর হয়ে গেছে রূপা। ভয়ে সে ডেভিডের দিকে তাকাতেও পারছে না।
রানা একটু ডানে সরে গিয়ে রবার্টের আরও কাছাকাছি দাঁড়াল। দরকার মত ব্যবস্থা নিতে হবে। রানা লক্ষ করল রূপার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ডেভিড। আরও এক পা সরল রবার্টের দিকে। ও জানে এই রূমে একমাত্র রবার্টই অস্ত্রধারী, ব্যারি অনুপস্থিত এই মুহূর্তে, কি একটা কাজে গেছে কবির চৌধুরীর আদেশে। চট করে দরজার বাইরেটা একবার দেখে নিল সে। সেই আস্তাবলের মাঠে গুলির খেলা দেখানো ইন্সট্রাক্টর দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার কাছেই, ঘরে। হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করে ওদের দিকে পিছন ফিরে রয়েছে সে। সাব মেশিনগানটা ঝুলছে ওর কাঁধে।
ঘরটার দিকে মনোযোগ দিল রানা। অনেক কিছুই তার চোখে পড়ছে এখন যেগুলো আগে চোখে পড়েনি। ঘরের ডান কোণে উপরে সিলিঙের কাছে টেলিভিশন ক্যামেরা লুকানো রয়েছে। রানার দৃঢ় ধারণা হলো ছাতের একটা খাঁজের পিছনে ফিট করা আছে মেশিনগান। নাকি রূপার বিপদের সম্ভাবনায় মিছেই সে এখন সবকিছুরই মধ্যে বিপদের গন্ধ পাচ্ছে?
ডেভিডের দৃষ্টি এখনও রূপার উপরেই নিবদ্ধ। রূপার নজর মেঝের দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকে হুলের মত বিধছে যেন। আর পারল না সে, মুখ তুলে সরাসরি চাইল ডেভিডের চোখের দিকে। চোখাচোখি হতেই মুচকি হেসে নিজের আঙুল নিয়ে খেলতে খেলতে আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে বসল ডেভিড।
রূপার বুকের ভিতরটা উত্তেজনায় ঢিপ ঢিপ করছে। রানা একটু নড়েচড়ে উঠল অস্বস্তিতে। প্রতিটি পেশী তার টানটান হয়ে রয়েছে। ডেভিড মুখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে রবার্টের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে সে প্রস্তুত। রবার্টের পিস্তলটা ছিনিয়ে নিতে পারলে পালাবার একটা সুযোগ মিলতে পারে। কিন্তু কেউই মুখ খুলল না। না ডেভিড, না ঘরের অন্য কেউ
‘চমৎকার,’ বলে উঠল কবীর চৌধুরী। ‘দেখা যাচ্ছে আমরা সবাই পরস্পরকে বিশ্বাস করি। হয়তো পছন্দও করব। আমি দেখেছি তাতে কাজের অনেক সুবিধা হয়। বন্ধুত্ব—ঠিক আছে—কিন্তু গলায় গলায় ভাব হয়ে যাওয়াটা আমি ভাল মনে করি না।’
ঘরের ভিতর থেকে থমথমে ভাবটা কেটে গেল ধীরে ধীরে। রূপা মনে মনে চিন্তিত ডেভিডের দৃষ্টির সামনে তার অপ্রস্তুত আর অপ্রতিভ হয়ে পড়াটা কারও চোখে পড়ে যায়নি তো? ডেভিড কি চিনতে পারেনি ওকে? দ্বিধায় আছে? নাকি ওর পরিচয় প্রকাশ করে দেয়ার জন্যে আরও উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষায় রইল সে?
‘ভাল কথা,’ কবির চৌধুরী আবার আরম্ভ করল, ‘এখানে কারও কি উচ্চতা ভীতি আছে?’
নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে সবাই একযোগে পুতুল নাচের পুতুলের মত মাথা নেড়ে জানাল, নেই।
‘পিটার উক, তুমি একজন ফরাসী সেজে একজন সত্যিকারের ফরাসী লোকের চোখে ধুলো দিতে পারবে?’
‘উন মসিউ দ্য গ্যাতু।’ ফরাসী ভাষাতেই জবাব দিল রানা। ‘অবশ্যই পারব।’
খুশি হয়ে উঠল কবির চৌধুরী। বলল, ‘গুড।’ এবার রূপার দিকে ফিরল সে, ‘ওয়েল্ডিঙে বিশেষ দক্ষতা আছে এমন দুজন মানুষ আমার দরকার। সুজানা, তোমাকে টিচের সাথে কাজ করতে হবে।
রূপা টিচের দিকে চেয়ে নড় করল—জবাবে শুধু দুবার চোখের পাতা পড়ল টিচের।
‘প্রাথমিক নির্দেশ আপাতত এখানেই শেষ,’ ঘোড়া চালানোর ছড়িটা দিয়ে নিজের গ্লাভস পরা হাতে শব্দ তুলে দুবার আঘাত করল সে, ‘অবশ্যই পরে আরও নির্দেশ দেয়া হবে তোমাদের। টারগেট কি, কোন্ দিন, কোন্ সময়ে আমরা আঘাত হানছি, এইসব খুঁটিনাটি সব কিছু সময় মত জানানো হবে। এবার কিছু আলোচনা হোক। একটা জরুরী তথ্য আমাদের সবারই জানা দরকার। ল্যাপ লেজার জিনিসটা কি তা ব্যাখ্যা করে শোনাবে তোমাদের প্রাক্তন সি.আই.এ ইন্সট্রাক্টর মিস্টার ডেভিড ফ্রস্ট।’ হাত তুলে ডেভিডকে বলতে ইঙ্গিত দিল সে।
সোজা হয়ে বসে আরম্ভ করল ডেভিড, ‘ল্যাপ লেজার একটা দুর্দান্ত স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র। লেজার সজ্জিত, অটো রিচার্জিং—বেশি টেকনিক্যাল হয়ে যাচ্ছে না তো? কঠিন লাগলে থামিয়ে দিয়ো—লাগছে না—বেশ। এটা এক হাজার গজ পর্যন্ত যে কোন জিনিস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ল্যাপ লেজার যে গাইডেন্স পদ্ধতি ব্যবহার করে সেটা বি.এ.টি. নামে পরিচিত।
‘রাশিয়া ও আমেরিকা এই দুটি দেশই অনেকদিন ধরে এই অস্ত্রটাকে উন্নত আর অব্যর্থ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কেউই বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। আমেরিকানরা গাইডেন্স সিস্টেমে একটা নতুন জিনিস ব্যবহার করে বিশেষ ফল পেয়েছে। আদি রাডার বাতিল করে এখন দুই ক্ষেত্রেই লেজার ব্যবহার হচ্ছে। এটা যদিও এখন পর্যন্ত তেমন স্থিতিশীল নয়, বরং একটু বিশৃ^লই বলা যেতে পারে—তবু মোটামুটি কাজ করছে এটা এখন।
‘মাসখানেক আগে বাফেলোর জেনারেল ইলেকট্রিক করপোরেশন বারোটা নমুনা তৈরি করে দেয়, তার কয়েকটা ইউ এস আর্মি বিভিন্ন টেস্ট সাইটে পাঠায়। ইউরোপেও পাঠানো হয় চারটে। স্টুটগার্টের কাছে একটা গোপন পরীক্ষা কেন্দ্রে এগুলোর ব্যবহার ও শক্তি পরীক্ষা করা হচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেখান থেকে সব কটাই চুরি হয়ে যায়। ইউ এস আর্মি ব্যাপারটাকে ধামা চাপা দিয়ে রেখেছে। তাদের অনুসন্ধানের কাজও চলেছে খুব সতর্কভাবে, গোপনে।
‘আমাদের জন্যে একটা সুসংবাদ, ওগুলো মশিয়ে চৌধুরীর নির্দেশে আমিই চুরি করি। সম্ভবত ওগুলো এখন স্যাতোতেই আছে।’ এই পর্যন্ত বলে কবির চৌধুরীর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ডেভিড। একটু মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল কবির চৌধুরী।
‘খুব ভাল কথা। আমাদের টারগেট যত কঠিনই হোক না কেন, সন্দেহ নেই, ল্যাপ লেজার সেটাকে সহজ-সাধ্য করে তুলবে। এগুলো সত্যিই আশ্চর্য ক্ষমতা রাখে। অনেক শক্তি প্রয়োজন হয় ল্যাপ লেজারের, ওগুলো চালাতে একটা ছোটখাট শহর চলার জন্যে যত শক্তি দরকার হয় প্রায় ততখানিই শক্তি লাগে, কিন্তু এর ধ্বংস ক্ষমতা এতখানি যে মাঝারি রকেট গানকেও এর কাছে মনে হবে খেলনা পিস্তল। চার-চারটে ল্যাপ লেজার নিয়ে আমরা ইচ্ছে করলে একটা ছোটখাট দেশের গোটা আর্মিকে ঘোলাপানি খাইয়ে দিতে পারি।’ বক্তব্য শেষ করল ডেভিড।
কবির চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসির রেখা দেখা দিল। মজার ব্যাপার এই যে আমাদের হয়তো ঠিক সেটাই করতে হতে পারে।’
বিস্ময়ে চমকে গেছে রানা আর রূপা দুজনেই। বিরাট দেহধারী টিচ্, হাতের আঙুল মটকাতে মটকাতে খিক খিক করে হাসতে লাগল অকারণেই।
.
জানাবে বললেও কাউকে কিছুই জানাল না কবির চৌধুরী। বোঝা গেল একেবারে শেষ মুহূর্তে তার প্ল্যান জানাবে সে সবাইকে। ট্রেনিং চলছে সবার। ল্যাপ লেজারের সাথে অন্যান্য আরও সব ট্রেনিং, একোয়ালাঙ ডাইভিং, খালি হাতে কমব্যাট, রাইফেল, মেশিনগান ইত্যাদির টারগেট প্র্যাকটিস, জিমনাস্টিক্স (দড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা আবার নামা) কোনটাই বাদ নেই। রানা আর রূপা পড়েছে ফাঁপরে। প্ল্যান না জানা পর্যন্ত বাধা দেয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। এখান থেকে বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করারও কোন উপায় নেই। আরও দুর্ভাবনার কারণ হচ্ছে রাহাত খান তাদের অবস্থান জানেন না। সুতরাং বাইরে থেকে যে কোন সাহায্যের আশা নেই এ-ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা চলে। কিছুই করার নেই ওদের।
কিন্তু, ওদের এই ধারণাটা ভুল। রাহাত খান ভাল করেই জানেন রানা আর রূপা কোথায় আছে। এয়ারফোর্সের একটা ব্ল্যাকবার্ড মাখ্ থ্রী ব্যবহার করে কবির চৌধুরীর স্যাতোয় তিনি ঠিকই খুঁজে বার করেছেন হেলিকপ্টারটাকে। প্লেন থেকে দূরবীন দিয়ে অস্ত্রশস্ত্রের অনেক মহড়াও দেখা গেছে—ভাল ঠেকছে না ব্যাপারটা রাহাত খানের কাছে। এত কিছু দেখেও কোন লাভ নেই। কারণ, আসল প্ল্যানটা কি, আর তা কিভাবে বাস্তবায়িত করা হবে কিছুই জানা নেই তাঁর। সোহানার সাথে গল্প করে রিজে সময়টা মন্দ কাটছে না। যদিও উদ্বেগ আছে কিছুটা। তিনি কবির চৌধুরীর প্রথম পদক্ষেপের জন্যে অপেক্ষা করছেন। ফরাসী বা আমেরিকান ট্রুপ নিয়ে স্যাতো আক্রমণের ঝুঁকি নিতে রাজি নন রাহাত খান। ওই লেজার গানের সামনে কচুকাটা হয়ে যাবে আর্মি। কাজেই চুপচাপ কবির চৌধুরীর ওপর নজর রেখে অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।
ওদিকে স্যাতোয় সময়টা ট্রেনিঙের মধ্যে দিয়ে বেশ দ্রুতই কাটছে বলতে হবে। এস্টেটটা ঘুরিয়ে দেখানোর পরে কবির চৌধুরী সহ সবাই একদিন আস্তাবলের সামনের মাঠে জড়ো হলো।
সুন্দর নিরিবিলি একটা মনোরম সন্ধ্যা। কিন্তু কবির চৌধুরীর হাতের ইশারায় হঠাৎ সুন্দর পরিবেশটাকে চমকে দিয়ে কান ভোঁ ভোঁ করা গর্জন উঠল। আর প্রায় সাথে সাথে পুরো জায়গাটা তীব্র আলোর বন্যায় যেন ভেসে গেল। অনেক আর্ক ল্যাম্প জ্বলে উঠেছে ছাতের ওপর, কয়েকটা আবার খুঁটির সাথে ঝোলানো। হাতের ইশারায় সবাইকে আস্তাবলে ঢুকতে বলল কবির চৌধুরী। নিজেও ঢুকল ওদের সাথে।
তিনটে বিরাটকায় জেনারেটর মাউন্ট করা ট্রাক দাঁড় করানো রয়েছে পাশাপাশি। গ্রাউন্ড বা এরিয়াল কোন সারভেতেই ধরা পড়বে না এদের অস্তিত্ব। মোটা মোটা ইলেকট্রিকাল তার দিয়ে তিনটে গাড়ি পরস্পর সংযুক্ত। কয়েকটা টারবাইন জেনারেটর শব্দ তুলে শক্তি উৎপাদন করে চলেছে। এক একটা টারবাইন অদম্য শক্তির ভারে যেন থরথর করে কাঁপছে আর গজরাচ্ছে। শেষ ট্রাকটা থেকে কয়েকটা তার মাঠে কাঠের মঞ্চ পর্যন্ত গেছে। প্রত্যেকটা ট্রাকের গায়েই লেখা ‘রেস্তোরাঁ লারোজ’।
প্রায় তিরিশ চল্লিশ জন লোকের সমাবেশ। বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। একটা আশ্চর্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার জন্যে ডাকা হয়েছে সবাইকে। ল্যাপ লেজারের শক্তির চমকপ্রদ প্রদর্শনী দেখার জন্যে সবাই উদ্গ্রীব
কবির চৌধুরী হাত তুলতেই জেনারেটরের ইঞ্জিনগুলো বন্ধ হয়ে গেল। ‘একটা চমক লাগানো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে আজ তোমাদের। ল্যাপ লেজার সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করবে না—কারণ তা করলে আমার সাধের প্রাসাদ মাটির সাথে মিশে যাবে, এমন সম্ভাবনা আছে।
‘আমি তোমাদের দেখাব ল্যাপ লেজার কিভাবে ক্ষিপ্র আর নির্ভুল পদ্ধতিতে কাজ করে যেতে পারে। অন।’ আদেশ দিল সে।
সাথে সাথেই জেনারেটরগুলো দ্বিতীয়বারের মত বিকট আওয়াজ তুলল। কাঠের প্ল্যাটফর্মটার ওপর বসেছে ডেভিড, নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ওর। অনেকগুলো লাইট তার উপর ফোকাস করা হয়েছে। তার সামনেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লিভার। মাত্র তিন ফুট দূরে লেজার গান। নাকটা তার লম্বা। আর ইঁদুরের কানের মত তার দুটো ডিটেক্টর। যেন সজীব এক বিভীষিকা ডেভিড, রানা আর লেপং কমপিউটর নিয়ে ব্যস্ত। রূপা আর টিচ একটু দূরেই দাঁড়িয়ে।
উঠে দাঁড়াল ডেভিড, ল্যাপ লেজার গানটাকে দুটো মৃদু চাপড় দিয়ে আদর জানাল—তারপর কবির চৌধুরীকে বুড়ো আঙুল দেখাল। অর্থাৎ সব রেডি—ল্যাপ লেজার এখন যে কোন কিছু মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত।
ব্যারি হোমসের দিকে চেয়ে নড় করল কবির চৌধুরী। ব্যারি একটা রিমোট কন্ট্রোল সুইচ টিপে দিল। মাঠের এই প্রান্তেই পঞ্চাশ গজ দূরে একটা সিগন্যাল গেল। সেখানে মোটা সীসার পাতের আড়াল থেকে চারজন লোক রাশান কালাসনিকভ এ, কে ৪৭ রাইফেল দিয়ে গুলি ছুঁড়তে আরম্ভ করল মাঠের অপর প্রান্তের টারগেটের দিকে।
ডেভিডের হাত দ্রুত খেলে গেল কয়েকটা সুইচের ওপর ল্যাপ লেজার থেকে রশ্মি বেরিয়ে গেল। প্রত্যেকটা বুলেট ধ্বংস হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। কোন গতিশীল বস্তুরই প্রবেশ ক্ষমতা নেই লেজার গানের আওতায়। একটা গুঞ্জন উঠল বিস্ময়ের।
ল্যাপ লেজারের ক্ষমতা দেখে সবাই স্তম্ভিত। সবাইকে চুপ করতে বলে কবির চৌধুরী টারগেটের দিকে এগোল। হাতে একটা মাইক্রোফোন। ‘একটা গুলিও টারগেটে লাগেনি,’ মাইক্রোফোনে ঘোষণা করল কবির চৌধুরী। সব কয়টা বুলেটই ধ্বংস করেছে ল্যাপ লেজার। এই রকম চারটে ল্যাপ লেজারের অধিকারী এখন কবির চৌধুরী।
ধীর পায়ে ফিরে এল সে। ডেভিডকে অভিনন্দন জানাল। একটু বাঁকা হাসি ফুটল ডেভিডের ঠোঁটের কোণে।
হঠাৎ রানার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল কবির চৌধুরী, ‘উডকক, নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়েছে?’
‘সম্ভবত,’ বলে কবির চৌধুরীর দিকে চাইল রানা। বলল, ‘আমার ধারণা, ল্যাপ লেজারটাকে এখন ওই চাকতির সঙ্গে টিউন করা হয়েছে।’ ডেভিডের হাতে ধরা চাকতিটার দিকে নির্দেশ করল রানা। ‘এটা সাথে থাকলে আক্রমণ করবে না লেজার।’ সন্দিগ্ধ চোখে চাইল সবাই ওটার দিকে। কেউ ভাবতেই পারছে না, এরকম দুর্ধর্ষ ল্যাপ লেজারকে ওই ছোট্ট একটা ধাতব চাকতি কিভাবে ঠেকাতে পারে।
‘যে কোন ধাতুর বেলাতেই এটা সম্ভব,’ বলল রানা। ‘টারগেট চিনে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে ল্যাপ লেজার। কোন কিছু ধ্বংস করতে না চাইলে এই কমপিউটরে সেটা আগে থেকে সেট করে রাখলে সেটাকে চিনে ফায়ারিং বন্ধ রাখবে ল্যাপ লেজার।’
‘তুমি এই ব্যাপারে শিওর?’ রানার দিকে ভুরু কুঁচকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল কবির চৌধুরী।
মাথা ঝাঁকিয়ে রানা জানাল, হ্যাঁ, সে নিশ্চিত। মুখে বলল, স্পরীক্ষা করা হয়নি, তবে যা বলেছি তা ঠিক।’
‘তাহলে তুমিই ওটা নিয়ে মাঠের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াও—পরীক্ষা হয়ে যাক। আমরা দেখতে চাই ল্যাপ লেজার তোমার দিকে ফায়ার করে কিনা।’ সবাইকে স্তম্ভিত করে প্রস্তাব দিল কবির চৌধুরী।
রানার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু প্রায় সাথে সাথেই গম্ভীর হয়ে গেল সে, ‘আপনি কি চান আমি নিজের জীবন বিপন্ন করে ওই চাকতি নিয়ে ল্যাপ লেজারের সামনে দাঁড়াই?’ চড়া গলায় প্রশ্ন করল রানা, ‘আমার কথাটা প্রমাণ করার জন্যে?’
‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ তুমি—আমি প্রমাণটাই চাই।’ ঠাণ্ডা গলায় কথাগুলো উচ্চারণ করল কবির চৌধুরী।
শ্বাসরুদ্ধকর একটা পরিবেশ নেমে এল সহসা। সবাই উৎকণ্ঠিত। ল্যাপ লেজারের ক্ষমতা একটু আগেই নিজের চোখে দেখেছে সবাই।
‘ঠিক আছে, তাই হবে।’ ডেভিডের হাত থেকে নিয়ে চাকতিটা টস্ করার ভঙ্গিতে শূন্যে ঘুরিয়ে আবার ধরল রানা।
কবির চৌধুরী ইশারা করতেই জেনারেটরগুলো গর্জে উঠল আবার। ডেভিড কন্ট্রোল প্যানেলে, আর টিচ বসেছে কমপিউটরে। চাকতিটা বুক পকেটে ঝুলিয়ে এগিয়ে গেল রানা মাঠের প্রান্ত পর্যন্ত। এবার এগিয়ে আসছে রানা ল্যাপ লেজার গানের দিকে। তার পদক্ষেপে কোন তারতম্য হলো না, দৃঢ় পদক্ষেপেই সে এগিয়ে আসছে বটে, কিন্তু রক্ত তার জমে বরফ হয়ে গেছে। ক্ষিপ্ৰ হাতে ল্যাপ লেজারের সুইচ আর লিভারগুলো নাড়াচাড়া করছে ডেভিড লেজার গানের মুখ এখন সোজা রানার দিকে তাক করা। সারা শরীরের রোমগুলো কেমন শিরশির করে উঠল। রানার সাথে সাথে ল্যাপ লেজারের নলটাও নড়ছে—সব সময়েই তাকে কাভার করে রাখছে ওটা।
ল্যাপ লেজার ফায়ারিং-এর ভোঁতা শব্দটা কানে এল রূপার। ফায়ার করেছে লেজার! কিন্তু ফায়ারিং মেকানিজমটাই কেবল কাজ করল—টিউবের মাথায় কোন রশ্মি দেখা গেল না। ফুঁপিয়ে শ্বাস নিল রূপা। এতক্ষণ দম বন্ধ করে ছিল সে।
‘কিছু নষ্ট হয়নি—ঠিক কাজ করছে ওটা?’ প্রশ্ন করল কবির চৌধুরী।
কাষ্ঠ হাসি হাসল ডেভিড। আর একটা লীভার টানতেই নতুন একটা টারগেট ইলেকট্রনিক পুলির ওপর দেখা গেল। ধীরে ধীরে ওটা ল্যাপ লেজারের রেঞ্জে প্রবেশ করল। হাঁটতে হাঁটতে থেমে দাঁড়িয়েছে রানা—দেখছে কি ঘটে।
সাঁই করে ফিরল লেজার গান টারগেটের দিকে। চোখের পলক না পড়তেই ফায়ার করল—নিমেষে মিলিয়ে গেল ওটা। দৃঢ় পদক্ষেপে ফিরে এল রানা ল্যাপ লেজারের কাছে। বুক পকেট থেকে ট্যাগটা খুলে নিয়ে কবির চৌধুরীর পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলল। ‘এই নিন আপনার নিরাপত্তার চাকতি।’ একটু রোষের সাথেই বলল রানা।
অপমানটা গায়েই মাখল না কবির চৌধুরী। সে এখন টাকার স্বপ্ন দেখছে—অনেক টাকা! বড় দুশ্চিন্তা ছিল তার—প্ল্যানে এক জায়গাতেই একটু ফাঁক ছিল—সেই ফাঁকটাও আর থাকল না। এখন তাকে ঠেকায় এমন সাধ্য কার?
খুশিতে ঝলমল করছে কবির চৌধুরীর চোখ-মুখ। ‘তোমরা সবাই নিজের চোখেই দেখেছ এবং প্রমাণ পেয়েছ ল্যাপ লেজার কমপিউটরে প্রোগ্রাম করা থাকলে এটা শুধু নির্বাচিত টারগেটকে আক্রমণ করবে—অর্থাৎ শত্রু বন্ধু চেনার ক্ষমতা এর আছে। মাটি থেকে চাকতিটা তুলে নিয়ে পকেটে ভরল কবির চৌধুরী। ‘এই রকম ট্যাগ আমার কাছে আরও আছে—তালাচাবি দেয়া। সময় মত বের করা হবে সেগুলো। প্রাসাদের ছাতের ওপর একটা ল্যাপ লেজার ফিট করা রয়েছে, অর্থাৎ বাইরের অবাঞ্চিত কেউ আর স্যাতোর ভিতর ঢুকতে পারবে না। আমি আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে ব্যাপারটা উল্টোভাবেও সত্য—মানে, স্যাতো থেকেও কেউ আর বাইরে বেরোতে পারবে না। গুড় নাইট।’ কথা শেষ করেই প্রাসাদের দিকে হাঁটতে শুরু করল কবির চৌধুরী, পাশে ব্যারি হোমস।
পরদিন সকালে ট্রাকে করে আবার ওদের পুরো দলটাকে নিয়ে যাওয়া হলো পার্কের মধ্যে একটা নির্জন জায়গায়। সবাই শাপলা পুকুরটার ধারে মিলিটারি কায়দায় লাইন করে দাঁড়াল। পুকুর পাড়েই দাঁড়িয়ে আছে খুঁটি আর তক্তা দিয়ে তৈরি একটা ষাট ফুট উঁচু কাঠামো। ব্যারি হুইসেল বাজাতেই সবাই কাঠামোটা বেয়ে ওপরের দিকে ওঠা আরম্ভ করল। নিরিবিলি পার্কের মধ্যে ওটাকে একটা অ্যাক্রোব্যাটদের জিমনাশিয়ামের মতই দেখাচ্ছে—আসলেও ওটা তাই।
কবির চৌধুরী হাজির হলো। প্রতি দিনের মত আজও তার হাতে একটা স্টপ ওয়াচ। নিচে থেকে উপর পর্যন্ত বেয়ে উঠতে কার কত সময় লাগছে সেটা চেক করছে সে। বুরুজের মাথায় কয়েকটা লোহার মোটা পাত বসানো হয়েছে। রূপা আর টিচ্ দুজনে দুদিকে দুটো তক্তার ওপর বসে ওয়েল্ডিং-এর কাজে ব্যস্ত।
রানার পায়ের কাছে এসে পড়ল উপর থেকে ঝুলানো একটা দড়ি। তরতর করে দড়ি বেয়ে উপরে উঠে রূপার সাথে যোগ দিল সে। ডেভিড দড়ির মাথায় ল্যাপ লেজার বেঁধে দিতেই টিচ অনায়াসে টেনে তুলে ফেলল ওটাকে উপরে। দ্বিতীয় ল্যাপ লেজারটাও একই ভাবে দড়ির সাহায্যে উপরে তুলল রানা আর টিচ দুজনে মিলে। ক্রসবীমে বসানোর সঙ্গে-সঙ্গে স্টপ ওয়াচে সময় দেখল কবির চৌধুরী। ওদের ক্ষিপ্রতায় বেশ সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে তাকে।
লেপং আর তার সঙ্গী, দুজনের হাতেই ইলেকট্রিকাল কাজের হেভি ডিউটি গ্লাভস পরা, অত্যন্ত সাবধানতার সাথে কাজ করছে। প্রায় প্রত্যেকটা জিনিসের গায়েই বজ্রের আঁকাবাঁকা চিহ্ন আঁকা। পাশেই লেখা, ‘সাবধান ২০০০ ভোল্ট’।
লেপং এর সঙ্গী খুব সাবধানতার সাথে তারের উপরকার আবরণ লম্বা করে কাটল। ইনসুলেটেড-সাঁড়াশি দিয়ে মুচড়ে কাটা ইনসুলেটার ছিঁড়ে ফেলল তারের উপর থেকে। চকচকে মোটা তামার তার অনাবৃত হলো। গ্লাভস খুলে সে ঝুঁকে পড়ে একটা ক্ল্যাম্প তুলে নিল হাতে। এটারও হ্যান্ডেল আর নাটে ইনসুলেশন রয়েছে। তারের উপর ক্ল্যাম্প বসিয়ে ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওটাকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। কপালে ঘাম দেখা দিয়েছে, থরথর করে কাঁপছে ওর হাত। প্রায় অনিবার্য ভাবেই তার হাতটা ফস্কে গিয়ে ক্ল্যাম্পের ধাতব অংশে লাগল। প্রচণ্ড একটা নীল আর্ক দেখা গেল। মুহূর্ত খানেক শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ঢলে পড়ল দেহটা।
জেনারেটর বন্ধ করে মৃতদেহটাকে সরানো হলো। পোড়া মাংসের কড়া গন্ধটা মিলিয়ে যাওয়ার পর নিজেই কাজটা নির্ভুল ভাবে সম্পন্ন করল লেপং।
কঠোর ট্রেনিং নিয়ে কাটল ওদের আরও একটা সপ্তাহ। দড়ি বেয়ে নামা ওঠা, বিভিন্ন অস্ত্রের ব্যবহার, এইসব চলেছে সারা সপ্তাহ। তারই ফাঁকে ফাঁকে চলেছে ছাঁটাই-বাছাই।
আজও ওরা সবাই পুকুর পাড়ে জড়ো হয়েছে। স্টপ ওয়াচ নিয়ে দাঁড়িয়ে কবির চৌধুরী। ডেভিড একাই আজ উপরে উঠেছে। অত্যন্ত দ্রুত সে চারটে খুঁটিতেই প্লাস্টিক বিস্ফোরক বসিয়ে ডেটোনেট করে নেমে এল। দৌড়ে গিয়ে কবির চৌধুরীর ঘাড়ের উপর দিয়ে স্টপ ওয়াচ দেখছে। দেখল কাঁটাটা ঘুরে শূন্যে ফিরে গেল। চারটে মাঝারি রকম বিস্ফোরণ হলো। হুড়মুড় করে কাঠামোটা ভেঙে নিচে পড়ল ওদের চোখের সামনে। খুব খুশি দেখাচ্ছে আজ কবির চৌধুরীকে। অবশ্য খুশির কোন কারণ ব্যাখ্যা করল না সে।
সেই রাতে ডিনারে বসেছে সবাই—উজ্জ্বল ঝালর বাতির আলোয় ঝকঝকে রূপার থালায় খাচ্ছে ওরা। কবির চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে মৃদু গুঞ্জন থামিয়ে আরম্ভ করল, ‘গত দশ দিনে তোমরা সবাই আমার সন্তুষ্টি অনুযায়ী কাজ দেখিয়েছ। প্ল্যান মত কাজ উদ্ধার করার জন্যে যে সব শারীরিক ও মানসিক কসরত দরকার হবে, সবগুলোই তোমরা অত্যন্ত ভাল ভাবে রপ্ত করে নিয়েছ। তোমাদের জন্যে আমি গর্বিত। এখনও যদি তোমাদের না জানাই আমার প্ল্যানটা কি তবে সেটা খুবই নিষ্ঠুরতা হয়ে যায়।’
ধীরে ধীরে পুরো প্ল্যানটা খুলে বলল কবির চৌধুরী। প্রত্যেকটা বিষয়ের খুঁটিনাটি পরিষ্কার ভাবে বর্ণনা করল। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনল সবটা নীরবে।
ফিসফিস করে রূপা বলল রানাকে, ‘লোকটা পাগল, বদ্ধ উন্মাদ।’
