তিন
রোম।
সম্ভান্ত নাইট ক্লাব গ্যাট্টোপারদোর সামনে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছে ব্রাইট সার্কাসের তারকা মিস সুজানা মনরো, ওরফে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের রূপা। তার স্পোর্টস মডেল জাগুয়ারটা আনতে গেছে অ্যাটেনডেন্ট।
হাত তিনেক দূরেই দুজন সুন্দর স্মার্ট চেহারার গ্রীক যুবক তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের তর্কের বিষয়বস্তু হলো দুজনের মধ্যে কে এই সুন্দরীকে ডিনারের নিমন্ত্রণ করবে।
পার্কিং অ্যাটেনডেন্ট জাগুয়ারটা রূপার সামনে এনে থামাল। ছোট্টখাট্ট মানুষটা—ফিটফাট জামা-কাপড় পরা—গোঁফে আবার মোমও লাগিয়েছে। লাফিয়ে নেমে দরজাটা পুরো খুলে ধরল রূপার জন্যে। গাড়ির সীটে বসে একটা নোট বাড়িয়ে দিল রূপা লোকটার দিকে। ভাল বকশিশ পেয়ে ঝুঁকে নত হয়ে অভিবাদন জানাল। সুন্দরী মহিলার বুকের অনাবৃত অংশ কাছে থেকে একটু দেখে নেয়ার সুযোগ ছাড়ল না সে।
পকেট থেকে একটা লম্বা গোছের প্যাকেট বের করে বাড়িয়ে দিল লোকটা, ‘এক ভদ্রলোক আপনার জন্যে রেখে গেছেন। ‘
‘কে? পরিচয় দিয়েছে?’ জিজ্ঞেস করল রূপা।
‘না।’ ভীষণভাবে কাঁধ নেড়ে সে জানাল এর আগে কোনদিন তাকে দেখেনি। ‘বললেন, মিস সুজানা মনরোর হাতে দেবে এ প্যাকেট।’
‘আচ্ছা, ধন্যবাদ।’ প্যাকেটটা খোলার দিকে মনোযোগ দিল রূপা। পার্ক অ্যাটেনডেন্ট সিদ্ধান্ত নিল আর দাঁড়ানো ভাল দেখায় না।… ধীরে ধীরে পিছনে সরে গেল সে।
প্যাকেট খুলতে খুলতেই আড়চোখে রূপা লক্ষ করল তর্ক করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি, ভদ্রলোকের মত টস্ করেই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করবে বলে ঠিক হয়েছে।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে পার্ক অ্যাটেনডেন্ট বিরাট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল, ‘বেল্লা, বেল্লিসিমা।’ অবশ্য সঙ্গত কারণ আছে ওই মন্তব্যের। এমন শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য সচরাচর চোখে পড়ে না।
প্যাকেট থেকে বেরুল একটা প্লেনের টিকেট, প্যারিসের। সাথে রয়েছে পঞ্চাশটা একশো ডলারের নোট। না—আরও আছে। একটা ছোট্ট চিরকুট। তাতে লেখা, রিপোর্ট টু প্যারিস। নিচে দুটো অক্ষর, কে. সি।
টসে জিতে একজন রূপার দিকে আসছে, অন্যজন প্ৰবল আপত্তি জানাচ্ছে, দান দান তিন দান হওয়া উচিত।
হাসি হাসি মুখ করে অনেক আশা নিয়ে আসছিল ছেলেটা রূপার দিকে। তাকে অপ্রতিভ আর হতবাক করে নাকের সামনে দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল গাড়িটা। রূপার মাথায় এখন অন্য চিন্তা।
.
আপার ম্যাডিসন এভিনিউ। নিউ ইয়র্ক। ফিফথ এভিনিউ-এর মত এখানেও বিচিত্র সব ছোট ছোট দোকানের সমারোহ। বেশির ভাগ দোকানেই খুব দামী আর অদ্ভুত সব জিনিস বিক্রি হয়। ছিটেফোঁটা বিশিষ্ট আর্ট গ্যালারিও আছে ম্যাডিসন এভিনিউ-এ। বিশিষ্ট ঠিক সম্ভান্ত অর্থে নয়—কিম্ভূতকিমাকার অর্থে। অর্থাৎ এরা কিছু এজেন্ট নিয়োগ করেছে আফ্রিকায়, তারা আফ্রিকার গ্রামের গণ্যমান্য লোকেদের কোন না কোন উপায়ে ঘুষ দিয়ে যত সব হাবিজাবি জিনিস সংগ্রহ করে খুব অল্প দামে—পরে সেগুলো ম্যাডিসন এভিনিউ-এ বিক্রি হয় এক একটা ছয়শো ডলার করে! খুঁজলে এইসব দোকানে আফ্রিকায় বিশেষ পদ্ধতিতে সঙ্কুচিত মানুষের মাথাও পাওয়া যাবে।
ইদানীং মাসুদ রানা প্রতিদিন একবার করে এইসব দোকানে চক্কর দেয়। কেনে কমই, শুধু ঘুরে ঘুরে নতুন কি এলো দেখে এইসব দোকানের সব রিসেপশনিস্টই এখন রানাকে চেনে। অবশ্য অন্য নামে।
‘প্রিমিটিভ ইনকরপোরেটেড’ এমনি একটা ছোটখাট আর্ট গ্যালারি। রানা ঢুকতেই রিসেপশনিস্ট মেয়েটি বলে উঠল, ‘গুড মর্নিং, মিস্টার উডকক।’
‘অ্যান্ড সেম টু ইউ, মিস মেরী লু,’ জবাব দিল রানা।
‘বাহ্, কবিতার মত ছন্দটা মিলেছে তো?’ হাসতে হাসতে বলল মেরী।
ওর কথাকে আমল না দিয়ে জিজ্ঞেস করল রানা, ‘খবর কি, সুন্দরী?’
‘হ্যাঁ, খবর আছে। ভাগ্যবান পুরুষ আপনি, আপনার জন্যে একটা প্যাকেট এসেছে। ওই পেছনের ঘরে রেখেছি আমি।’
রিসেপশনিস্টের ডেস্ক পার হয়ে পেছনের কামরায় পৌঁছল রানা। প্রধান গ্যালারির পরে এটা একটা বিশেষ গ্যালারি। সাধারণের জন্যে এই গ্যালারি নয়। কেবলমাত্র অতিমাত্রায় ধনী খদ্দেরদেরই এখানে আনা হয়। বুঝেশুনেই মালিক এই ব্যবস্থা করেছে। এই ঘরের শেলফগুলো পৃথিবীর নানান জায়গা থেকে সংগ্রহ করা দুষ্প্রাপ্য জিনিস দিয়ে ভরা। জিনিসগুলো সবই খাঁটি। বড়লোকেরা আসে—বেশির ভাগই রগচটা, পাগলাটে, খামখেয়ালী বড়লোক। জিনিস পছন্দ করে, মালিক ইচ্ছামত দাম হাঁকে—সে জানে টাকা তাদের কাছে বড় কথা নয়, জিনিসটা মনে ধরেছে, যে কোন মূল্যেই হোক ওটা তার চাই।
ভিতরে ঢুকেই রানার চোখে পড়ল অপূর্ব সুন্দর আর দামী ওক্ টেবিলটার ওপর রাখা ছোট্ট একটা প্যাকেট। উপরে তার নামই লেখা, মানে, বর্তমানে যে নামে পরিচিত সে। টেবিলের ধারে মেহগনি কাঠের চেয়ারটায় বসে প্যাকেট খুলে ফেলল সে। ভিতরে পাঁচটা হাজার ডলারের নোট, একটা প্যারিসের টিকেট আর একটা ছোট্ট নোট। তাতে লেখা, রিপোর্ট টু প্যারিস। কে. সি।
ভুরু কুঁচকে একটু ভাবল রানা। এর অপেক্ষাতেই ছিল সে গত একটি মাস।
হোটেলে ফিরে একটা লং ডিসট্যান্স কল বুক করল সে।
