জিম্মি – ৪

চার

ওয়াশিংটন।

বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পিছনে একটা ফাইলে ডুবে আছেন বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের চীফ রাহাত খান। তাঁর সামনে টেবিলের উপর পাশাপাশি সাজানো রয়েছে তিন রঙের তিনটে টেলিফোন।

একটা ট্রেতে করে দুই কাপ কফি নিয়ে কামরায় ঢুকল সোহানা। রাহাত খানের ডান দিকে এক কাপ কফি নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে একটা চেয়ার টেনে ডেস্কের সামনে বসল সে। ফাইল থেকে মুখ না তুলেই কফিতে একটা চুমুক দিলেন রাহাত খান।

কফিতে চুমুক দিয়েও তাঁর ভুরু কুঁচকাল না দেখে আশ্বস্ত হলো সোহানা। কফিটা ভালই হয়েছে বোঝা যাচ্ছে।

সত্যি ভাল কফি তৈরি করে সোহানা। অনেক যত্ন নিয়ে করে। পানি ফুটবার ঠিক আগে আগেই কেতলি নামিয়ে নিয়েছে আজও—ওর এক সায়েন্স পড়া বান্ধবী ওকে শিখিয়েছে এটা—এতে নাকি পানির কারবোনেট আর বাই কারবোনেটগুলো প্রেসিপিটেট করার সুযোগ পায় না, তাই স্বাদ ভাল হয়। ডিমেরারা চিনি এক চামচ দিয়ে নেড়ে ফাইনাল টাচ্ দিয়েছে সে মেপে কয়েক ফোঁটা রেমি মারটিন দিয়ে।

এতক্ষণে মুখ তুলে চাইলেন রাহাত খান। সামনে সোহানাকে দেখেই জানতে চাইলেন, ‘লিস্ট কই?’

‘দেখছি।’

ইন্টারকমের সুইচ টিপতেই সাথে সাথে জবাব এল, ‘ইয়েস, বস্?’

‘লিস্ট কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল সোহানা।

‘টাইপ প্ৰায় শেষ, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই নিয়ে আসছি,’ বিনীত কণ্ঠে জবাব এল।

ইন্টারকমের সুইচ অফ করে দিল সোহানা।

বেশ বড়সড় একটা কামরা। বিভিন্ন দেশের তিনজন টেকনিশিয়ান বসে আছে গদিওয়ালা ঘূর্ণি-চেয়ারে। পাইলটের মত প্রত্যেকের মাথায়ই হেড-সেট লাগানো। মাউথ পীসটা মুখ থেকে ইঞ্চি দেড়েক দূরে শূন্যে ঝুলছে। নানান দেশ থেকে রুটিন রেডিও কলের খবরদারি করছে ওরা। দরকার মত জবাব আর নির্দেশ দিচ্ছে বিভিন্ন ভাষায়। বসের সাথে কনসাল্ট করে নিচ্ছে জটিল বিষয় হলে। কম করে হলেও তিরিশটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে তিনজনই। মাঝে মাঝে সামনে রাখা কার্ট্রিজ পেপারে লিখে নিচ্ছে—খবরের সারাংশ। ওদের সামনের সারা দেয়াল জুড়ে রয়েছে নিয়ন লাইটের একটা ওয়ার্ল্ডম্যাপ। কোন কল এলেই যতক্ষণ কথা চলতে থাকে ততক্ষণ ম্যাপের ওপর ওই শহরটা ফ্ল্যাশ করে।

ঠিক একই জিনিস, তবে অনেক ছোট—ছয় ইঞ্চি উঁচু আর নয় ইঞ্চি চওড়া, রয়েছে মেজর জেনারেলের ঘরে। নতুন কোন কল এলেই মধুর একটা ঘণ্টা বেজে উঠে জানিয়ে দেয় নতুন আর একটা রেডিও কল্ এল।

ব্যক্তিগত অনুরোধ করে কয়েকটা দেশের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেলকে রাজি করিয়েছেন ইউনাকোর ভার নিতে। UNACO মানে ইউনাইটেড নেশনস্ অ্যানটি ক্রাইম অরগ্যানাইজেশন। ‘অ্যানটি ক্রাইম’ কনফারেন্সে বক্তৃতা কালে তিনি নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে পৃথিবীর সেরা আর দুর্ধর্ষ ক্রিমিনাল—যাদের ক্রাইম করাটা শুধু পেশা নয়, নেশা হয়ে গেছে; তাদের গতিবিধির উপর নজর রেখে তাদের দমন করার জন্যে একটা সক্রিয় ইউনিট থাকা দরকার। এর পরেই সৃষ্টি ইউনাকোর। ছয়-সাতটা দেশের প্রেসিডেন্টের অনুরোধে বাধ্য হয়েছেন রাহাত খান ইউনাকোর ভার নিতে। অরগ্যানাইজেশন গুছিয়ে দেয়ার পর প্রতি দুই মাস অন্তর রাহাত খান দিন সাতেকের জন্যে আসেন, দেখা-শোনা করে যান। ইমার্জেন্সী হলে তাঁকে রেডিওতে খবর দিয়ে মাঝে মধ্যে নিয়ে আসা হয়।

দুবার নক করে কামরায় ঢুকল ছেলেটা। ওর হাতে টাইপ করা আজ দুপুর পর্যন্ত রেডিও কলের সারাংশ। সোহানার দিকে এগিয়ে দিল সে কাগজটা। এটাই নিয়ম। পড়ে দেখে শুধু গুরুত্বপূর্ণগুলো নিয়ে আলাপ করবে সে মেজর জেনারেল রাহাত খানের সাথে। কাগজটায় আর একবার চোখ বুলিয়ে মুখ খুলল সোহানা। ‘রিপোর্ট করা হয়েছে বেশ কিছু হীরে হাত বদল হয়েছে। কেপ টাউন থেকে গতকাল প্রায় দুই মিলিয়ন পাউন্ড দামের আকাটা হীরে খোয়া গেছে। বাহকের পরিচয় জানা যায়নি।’

‘ট্র্যাক করছে কে?’ প্রশ্ন করলেন রাহাত খান।

‘আমরাই।’ জবাব দিল সোহানা।

‘ঠিক আছে। কোড ব্লু। ইন্টারপোল অ্যামস্টার্ডামকে টেকওভার করতে বলো।’

মার্জিনে গোটা গোটা অক্ষরে নির্দেশ লিখে দিল সোহানা।

‘জরুরী খবরের মধ্যে শেষ খবর হচ্ছে, কবির চৌধুরী পশ্চিম জার্মানী থেকে ফ্রান্সে ফিরে গেছে।’

‘হুঁ,’ গম্ভীর হয়ে গেলেন রাহাত খান। এটাই আন্দাজ করেছিলেন তিনি। রূপা আর রানা রওনা হওয়ার জন্যে তৈরি হয়েই আছে। আলবার্তো ভেরিনোর কাছ থেকে সব রিপোর্ট পেয়েছেন মেজর জেনারেল। ‘এবার কি খেলা দেখাবে কবির চৌধুরী? স্টুটগার্ট থেকে ইউ এস আর্মির চারটে অত্যাধুনিক ল্যাপ লেজার গান চুরি গেছে।’ স্বগতোক্তি করে আবার কবির চৌধুরীর ফাইলে ডুবে গেলেন রাহাত খান।

ইউনাকোর কাজে রাহাত খান কেবল প্রথম শ্রেণীর এজেন্টদেরই ব্যবহার করেন। প্রত্যেকটা দেশের সেরা বাছাই করা কয়েকজন এজেন্ট কাজ করে ইউনাকোর জন্যে। এতে খুব ভাল ফলও পেয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটা প্রোজেক্ট-এর কাজ অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেছেন।

ড্রয়ার থেকে একটা হাভানা চুরুট বের করে টেবিলে অন্যমনস্ক ভাবে ঠুকতে ঠুকতে ভাবছেন রাহাত খান। ল্যাপ লেজারগুলো কে নিল, কেন নিল, আর কার জন্যে নিল সেটাই হচ্ছে এখন সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা। কাঁচা পাকা ভ্রূ জোড়া কুঁচকে ভাবছেন রাহাত খান সোহানা কথা বলে তাঁর চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাল না। বুড়োর বিশ্বাস কবির চৌধুরী আছে এর পিছনে। বড় একটা কিছু ঘটাতে যাচ্ছে সে। আলবার্তো ভেরিনোর রিপোর্টে জানা গেছে কমপিউটর প্রসেসিং আর ইলেকট্রিক ওয়েলডিঙের জন্যে দু’জন খুব দক্ষ লোক চায় সে—অ্যাথলেট টাইপের লোক, মাটি থেকে অনেক উপরে নির্ভয়ে কাজ করার ক্ষমতা থাকতে হবে তাদের। দুজন ভাল লোককেই পাঠাচ্ছেন তিনি। রানা আর রূপা।

রিপোর্টে জানা গেছে কী এক দুর্ঘটনার ফলে কবির চৌধুরী এখন চোখে প্রায় দেখে না বললেই চলে।

পুরু লেন্সের চশমা ব্যবহার করে সে। অবশ্য এটাও শোনা যায়, যে দৃষ্টি শক্তির এই অভাব পূরণ করার জন্যে ইতোমধ্যেই একটা উপায় আবিষ্কার করে ফেলেছে সে। মাস ছয়েক আগে বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে কাজ করার সময়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বিষাক্ত গ্যাস লেগে চোখে ছানির মত একটা পর্দা পড়েছে। অপারেশন করলে ভাল হবে তার চোখ—কিন্তু চোখের বিশেষজ্ঞ জানিয়েছে দু’বছরের আগে ওটা পরিপক্ক হবে না। কিন্তু দু’বছর বসে থাকার লোক কবির চৌধুরী নয়। ইতোমধ্যেই সে রাডার আর ফিশ-আই লেন্স-এর সংমিশ্রণে একটা যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছে। এর সাহায্যে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক ভাল দেখতে পাবে সে। রাডার থাকাতে ডাইনে বাঁয়ে সামনে পিছনে চতুর্দিকে যে কোন বস্তুর অবস্থান তার জানা থাকবে। অর্ডার দিয়েছে জাপানে—এখন কেবল ‘জাপান অপটিকস’ থেকে লেন্সটা আসার অপেক্ষা।

.

মিউনিখ ব্রিয়ার কেলার থেকে বিখ্যাত ক্যাথিড্রালের সামনে ব্যস্ত স্কোয়ারটাতে এসে দাঁড়াল ডেভিড ফ্রস্ট। ফোর সিজন্‌ট্স্ হোটেল মিউনিখ শহরের প্রায় মাঝামাঝি। ডেভিড আপাতত এই হোটেলেই থাকছে। মিউনিখের কোন জায়গাই ফোর সিজনস্ হোটেল থেকে খুব একটা দূরে পড়ে না।

স্কোয়ারটা পার হয়ে একটা শর্টকাট রাস্তা ধরে সব্জি আর ফলের বাজারে পৌঁছল ডেভিড। সুন্দর করে সাজানো দুটো বড় দোকানের মাঝে চাকাওয়ালা একটা ঠেলা গাড়ির ওপর বাদাম সাজিয়ে বসে আছে এক বুড়ি।

ডেভিডের পরনে চামড়ার জ্যাকেট, অনেকদিনের ব্যবহারে মলিন। গলায় একটা সাদা রুমাল জড়ানো। জ্যাকেটের বাম দিকের পকেটে একটা আমেরিকান লিজিয়নের ব্যাজ ঝুলছে।

‘গুটেন মরগেন,’ বলল বুড়ি ডেভিডের উদ্দেশে। তীক্ষ্ণ চোখে খেয়াল করছে সে তার গলার রুমাল, ব্যাজ আর মুখ।

‘গুড মর্নিং,’ ইংরেজীতে জবাব দিল ডেভিড।

‘এই ঠাণ্ডার দিনে কিছু গরম চেস্টনাট দেব?’ জিজ্ঞেস করল বুড়ি।

‘ইয়া বিতে,’ জার্মান ভাষাতেই এবার ধন্যবাদ দিয়ে সম্মতি জানাল ডেভিড।

চিমটে দিয়ে কাঠ কয়লার আগুন থেকে বেছে বেছে চেস্টনাট বের করে একটা কাগজের ঠোঙায় ভরল সে, ‘খুব গরম কিন্তু আঙুল পুড়িয়ো না যেন,’ সাবধান করল বুড়ি।

একটা বাদামের খোসা ছাড়াতে গিয়ে আঙুলে ছ্যাঁকা খেল ডেভিড। বুড়ি মিছে সাবধান করেনি। তবে চেহারায় টের পেতে দিল না যে সে ছ্যাঁকা খেয়েছে।

‘অউফ ভিতেশান,’ বিদায় জানাল ডেভিড। চেস্টনাট মুখে পুরল সে—অপূর্ব স্বাদ।

‘গুড বাই,’ বুড়ি জবাব দিল।

ফিরতি পথে ধীর পায়ে হেঁটে এসে একটা পেভমেন্ট ক্যাফেতে থামল সে। একটা কফির অর্ডার দিয়ে চেস্টনাটগুলো সব ঢালল টেবিলের ওপর ঠাণ্ডা হওয়ার জন্যে। লক্ষ করল প্যাকেটটা রয়েছে একদম নিচে।

এক হাত দিয়ে আড়াল করে প্যাকেটটা খুলল সে। ফার্স্টক্লাসে প্যারিসে যাওয়ার একটা বিমান টিকেট আর পাঁচ হাজার ইউ এস ডলার পেল সে প্যাকেটে। কোন ব্যাখ্যা নেই—একটা পিপে লেখা, রিপোর্ট টু প্যারিস। নিচে রয়েছে দুটো অক্ষর, কে.সি.। এক কাপ কফি শেষ করে আর এক কাপের অর্ডার দিল ডেভিড।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *