কাঙাল মালসাট – ৫

বলে যে লেখার এক একটি পক্কড় শেষ হয় তার সঙ্গে তুলনীয় হল অতীব ভয়াবহ ঘাপটি মারা সাবমেরিন। ‘কাঙাল মালসাট’ নামক সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজটি মাসে একবার সুনীল ও ঘোলাটে জলরাশি, জেলিফিশ, টাইটানিকের দীর্ঘশ্বাস ও মরণোপম চৌম্বক মাইনের মধ্যে পিঠ দেখায় এবং তারপরই ক্যাপটেন নিমো-র নির্দেশে পুনরায় তলিয়ে যায়। শুশুকেরাও এরকমই করে যদিও তাদের কোনো পেরিস্কোপ, টর্পেডো ও আক্রমণাত্মক বাসনা থাকে না। এত খোলসা করে বলার টার্গেট একটাই। ডুবোজাহাজ ফুটো হয়ে জল ঢুকে যে কোনো সময় কেলো ও ট্রাজেডি ঘটে যেতে পারে। এই বিপদ এখন আসন্নপ্রায় কারণ পূর্ববর্তী ‘(চলবে)’-র শেষে যে ফটিংটিং- এর ভয় দেখানো হয়েছে তা মোটেই আজগুবি মাল নয়। স্রেফ লেখা বা লেখক নয়, এক একটা গোটা সমাজব্যবস্থা ও সাম্রাজ্য যখনই ফটিংটিং-দের এলাকায় মাজাকি মারতে গেছে তখনই যা ঘটেছে তাকে গন-ফট বলা যায়। অতএব সে বিপদ যে থেকে গেল শুধু তাই নয় উত্তরোত্তর বৃদ্ধিরও সম্ভাবনা। অনেকেই আশা করেছিল যে ছড়া, প্রবাদ, পুরাণকল্প ইত্যাদি মিলিয়ে কিছু একটা হয়তো বা বলা হবে। কেন নায়করা নির্ভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে অজানা বিপদের পথে যাবেই? প্রথমে ঝাড় খাবে, তারপর জ্ঞানী কোনো শুডঢা গান্ডুর পাঠশালায় কয়েকটা কোচিং নিয়ে ড্রাগন বা রাক্ষসের ব্যবসায় লালবাতি জ্বালাবে এবং মরচে ধরা, ঢপ কোম্পানির ডবল ডানা এরোপ্লেনে করে চাম্পি একটি মাল নিয়ে ব্যাক করবে। এই ঢ্যামনামির গল্পের রকমফের নানা দেশে চালু আছে। এবং আশু বিলুপ্তির কোনো আভাসও নেই। তবে এ বিষয়ে আমরা কিন্তু ঝেড়ে কাশার দলে নেই। পেরিস্কোপে দেখা যায়,

দিকে দিকে জ্বলছে ধুনি,

ভিড় করেছে জ্ঞানী-গুণী

(পুরন্দরের একটা অনবদ্য কাপলেট)

যা বলার ঐ শালারাই বলবে। চিরদিনই বলে আসছে। আমাদের কাজ হল ওদের খচানো, ভুলিয়ে ভালিয়ে এদিক সেদিক নিয়ে যাওয়া এবং তারপর তেরপল চাপা দিয়ে প্যাঁদানো। খেঁটো বাঁশ দিয়ে বেধড়ক ক্যালাও।

কী নির্জীব, কী নির্জীব,

নির্ঘাৎ ওটি বুদ্ধিজীব।

(পুরন্দরের আর একটি)

২৭ অক্টোবর ১৯৯৯ সকাল সাড়ে নটার সময় ভদির উঠোনের কোণে ঝুলন্ত, তলাখোলা বালতির মধ্যে কাকের ঠোঁটে এসে পড়া একটি মান্ধাতার আমলের কাঁটাচামচ নাচানাচি শুরু করাতে ধাতব সংঘাতের আধা সুরেলা শব্দ হতে থাকে এবং বেচামণি ঠাস করে একটি ভাঙা থালা উঠোনে আছড়াতেই ভদি দুড়দাড় করে ছাদ থেকে নেমে এসে ফোন ধরে। বস্তুত পাঠকের পক্ষে এটা হজম করা বেশ কষ্টকরই হবে যে ইন্টারনেট ও সাইবারসেক্সের যুগেও এই টেকনোলজি বেশ বহাল তবিয়তে চালু আছে। এ হল সেই টেলিফোন যা একযুগে বাঙালি শিশুরা বানিয়ে খেলা করত। ভদি প্রাচীন ও জংধরা বেঙ্গল শটি ফুডের টিনটি কানে লাগায় যা একাধারে মাউথপিস ও রিসিভার।

ফোনটির অপরপ্রান্ত গেছে পাশের ফালি, এঁদো জমিটুকু পার হয়ে তেরচাভাবে অবস্থিত বাড়ির দোতলায়। মধ্যবর্তী ফালি জমিটুকুতে বুনোকচু গিজগিজ করছে এবং তার তলায় চার পাঁচ পুরুষের জঞ্জাল। চোর ছাড়া আর কেউ সেখানে ঢুকতে সাহস পাবে না এবং ঢোকার পরে চোরও ঘাবড়ে যাবে কারণ গিরগিটি, ব্যাঙ, বিছে ও সব জাতি ও প্রজাতির মশা সেখানে দুর্ভেদ্য জুরাসিক পার্ক তৈরি করে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। এরই ওপর দিয়ে ডবল তার চলে গেছে। একটি একটু আলগা, অন্যটি টান টান। আলগাটিতে ঠনকালে ফোন বাজে। ও বাড়িতে ঘন্টা দোলে, এখানে বালতির মধ্যে কাঁটাচামচ। কোনো ঝামেলা নেই। এ বললে ও শুনবে। ও বললে এ। একইসঙ্গে দুটো চলবে না।

যে শব্দটি বা কথা আসে তা খুব স্বাভাবিক নয়, একটু খোনা ধাঁচের, একটু ভূত ভূত ভাব। ভদি বলে,

-‘কী হঁল আঁবাঁর?’

-‘কিঁছু নাঁ। অঁল ক্লিঁয়ার।’

-‘কাঁল কঁটা গেঁল?’

-‘অ্যাঁঃ’

-‘বঁলচি কাঁল কঁটা গেঁল?’

উল্টোদিকের থেকে চারটে টোকার শব্দ। ভদি ঠিক শুনল কিনা যাচাই করার জন্যে চারটে টোকা দেয়। উল্টোদিক থেকে,

-‘ছেঁড়ে দিঁলুম।’

-‘আঁচ্চা!’

রোজই সকালে ভদির কাছে ক’ বালতি মাটি সরল সেই খবরটা এসে যায়। সরখেলের সঙ্গে এরকমই ব্যবস্থা চালু আছে। এই মহতী প্রকল্পটিকে ঘিরে ভদি ও সরখেলের উচ্চাশার অন্ত নেই। কিন্তু ভদির থেকে থেকেই প্রামাণিকের সেই সাবধানবাণী মনে পড়ে যায়। ও. এন. জি. সি থেকে অনেকদিনই রিটায়ার্ড। কিন্তু একাধারে ভদির ভলান্টিয়ার ও ক্রিটিক। দেড় বছর আগে সাধনোচিত ধামে গমন করলেও প্ল্যানমাফিক স্বপ্নে সাক্ষাৎকার বহাল আছে। মরার পরে ভাষাও বেশ সাবলীল হয়ে উঠেছে। আগে প্রতিটি বাক্যেই কয়েক কিলো করে ভক্তি থাকত। এখন বড় তিরিক্ষে ও সিনিক।

– সরখেল বানচোৎ কী করছে?

– যা করার। মাটি সরাচ্ছে।

– বাল সরাচ্চে। টপ সয়েলে আঁচড়াচ্চে। বগল চুলকানোর মতো। তখন কত করে বললাম। যে মাল হবার নয় তাই তুমি সরখেল হইয়ে ছাড়বে।

– ছাড়বইতো! আমার নাম ভদি।

– যদি হয় নিজের নাম পাল্টে ফেলব। অনাদি প্রামাণিক হয়ে যাবে চুদির ভাই পরামাণিক। দু কান কেটে ফেলব। চশমা পরতে পারব না। মরে গেছি তো কী হয়েচে — এখনো জার্নাল টার্নাল পড়ি। আপ-টু-ডেট থাকার চেষ্টা করি। সব ছেড়ে দিয়ে, বলা যায় না, হয়তো একটা বিয়েথাই করে বসব। পাগলে কী না করে!

-আজকাল প্রামাণিক বড় অল্পে খচে যাও। মরলে তোমার মত জ্ঞানী গুণী লোক কেমন থুম্বো মেরে যায়। দেখলেই মনে হয় গুলি খেয়ে ঝিমোচ্চে। কেবল তোমারই দেখচি সব সময় ছটফট ছটফট কেমন কুকুরক্ষ্যাপা ভাব! এ তো ভালো নয়।

-তোমার হিসেব তোমার কাছে। এখানে সব ভেন্ন। আর তোমাদের ওখানে কী হল না হল তাতে আমাদের ভারি বয়েই গেল। স্রেফ ছাগলামি দেখলে টেম্পার চড়ে যায়।

– তার মানে তুমি বলতে চাও আমি আর সরখেল ছাগলামি করছি? বলি যে ঐ সন্ধান কে দিয়েছিল? আমরা কি জানতাম।

– আমি বললাম একটা কথার কথা, একটা জ্ঞানের কথা। আর ওমনি ওনারা নেচে উঠলেন।

– চোপ! মরে গিয়ে ভেবেচে মাতা কিনে নিয়েচে!

– ঐ মাথা কেনার থেকে একটা ডাবের খোলা কুড়িয়ে নিলেও লাভ আছে।

এই ধরনের বাদানুবাদের মধ্যেই ভদির গোঁ গোঁ শব্দ ও ভাবভঙ্গি দেখে বেচামণি ধাক্কে ওর ঘুম ভাঙায়।

– অ্যাঁ

– অ্যাঁ আবার কী? পেট গরম হয়েচে। বুঝেচ? পেট গরম।

– অ।

– কী যে কতার ধারা কিচু বুজি না বাবা।

ভদি উত্তর দেয় না। ঘটি থেকে জল গলায় ঢালে। কিছুটা জল হাতে নিয়ে ভুঁড়িতে মাখে। ঘাড়ে, গলায় দেয়। বেচামণি শুয়ে পড়ে।

– কত বলি যে অত মাল খেওনি।

– থামো তো। কী হচ্চে না হচ্চে তা ঐ ঘটে ঢুকবে? প্যাঁকর প্যাঁকর করছে। মাগ মাগের মতো থাকবে।

– ও…ও…কী একেবারে পাটরানি করে রেখেচে আর দুবেলা মাগ, মাগ …

– তা মাগকে মাগ বলবে না তো কী বলবে?

ঘোর কলির এই অন্ধকারে বেচামণির ফুঁপ ফুঁপ শোনা যায়। অনুতপ্ত ভদি অন্ধকারে ওপর দিকে হাত বাড়ায়। সেই হাত বেচামণির শ্যাম্পু করা চুলরাশির ওপরে বিলি কাটার ধান্দা করে। বেচামণি নিজের হাতে ভদির হাতটি ধরে সরিয়ে দেয়। হাতের বালা-চুড়ির শব্দ হয়। ভদি কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে। ফুঁপ ফুঁপ। নাক টানার শব্দ করে বেচামণি। ফের ভদির হাত ওপর দিকে বাড়তে থাকে।

অক্টোবর,’৯৯-এর শেষ হপ্তায় — কলকাতায় একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু পাবলিক, বিশেষত বাঙালি পাবলিক আজকাল এত আমোদ-গেঁড়ে হয়ে পড়েছে যে কোনো কিছুই টিভিতে না হলে তাদের নজরে পড়ে না। অতীতে যে মনস্বী বাঙালীরা ছিলেন তাঁদের এক জায়গায় জড়ো করা সহজ নয়। কিন্তু নেতাজী ইনডোর বা সল্টলেক স্টেডিয়ামে তাঁদের একটি জমায়েৎ বানিয়ে ‘ব্রজাঙ্গনা’-র দুটি লাইন (পুরন্দরের নয়, মাইকেলের) প্রশ্ন হিসাবে রাখাই যায়

কেন এত ফুল তুলিলি সজনি, ভরিয়া ডালা?

মেঘাবৃত হলে পরে কি রজনী তারার মালা?

যাই হোক, যা হবার তা হবেই। এতে ভগবানের থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু আমাদের কোনো হাত নেই। একটা আস্ত জাত যখন ভোগে যাবার জন্যে বদ্ধপরিকর হয় তখন তার জন্যে ইনিয়ে বিনিয়ে কোনো ফয়দা নেই। যাচ্ছে নিমতলায়। হাতে সেলফোন। এমন আঁট করে ধরে আছে যে শেষ অবধি ছাড়ানো গেল না। শেষে বাধ্য হয়ে সেলফোনসমেতই।

এই চিত্তাকর্ষক ঘটনাটি হল টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের পেছনের ফাঁকা জায়গা থেকে যখন ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসে ঢোকে তখন একটি বিশাল দাঁড়কাক চার নম্বর কামরার ছাদে গুটি হয়ে বসেছিল। একাধিক দিনই এরকম ঘটে। বোঝাই যাচ্ছে যে দাঁড়কাকটি ডানার পরিশ্রম বাঁচাচ্ছে। এবং সে এসপ্ল্যানেড, চাঁদনি ও সেন্ট্রাল স্টেশনে নেমে প্ল্যাটফর্মে নাচানাচিও করেছিল। এই দাঁড়কাকের পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি। শুধু মেট্রোরেল নয়, তাকে ট্রামের ছাদে বসেও এদিক ওদিক ট্রিপ মারতে দেখা গিয়েছিল যদিও কারোরই নজরে পড়েনি। আগে ভদির বাবাকে কালীঘাট চত্বরেই হিঁয়া হুঁয়া ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। কখনো খানকিদের ঘরের চালের ওপরে বসে ঠুকরে ঠুকরে পাঁউরুটি খাচ্ছে বা মায়ের মন্দিরের পেছনদিকে ভিড়ভাট্টার ওপরে বসে পাঁঠাবলি দেখছে। একই ট্রেনে চাঁদনি থেকে জালি বার্বি পুতুল নিয়ে বড়িলাল কালীঘাটে এসে নেমেছে। কিন্তু তার কামরার ওপরেই যে দণ্ডকাক আসীন তা সে টেরই পায়নি। নানা আড়াল এইভাবে বিভিন্ন চরিত্রকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দিকপাল হয়ে উঠতে সাহায্য করে। এরকম আড়ালই বিবিধ প্রস্রাবাগারে আমরা দেখেছি। অবশ্য এখানেও উঁকি মারামারি চলে। যারা উঁকি মারে তারা যে সকলেই হোমো এমনটিও নয়। এ নিয়ে বরং পরে কিছু ফাঁদা যেতে পারে। তখন কিন্তু ভাই কোনো রাখঢাক থাকবে না।

২৭ অক্টোবর, ১৯৯৯, বিকেল যখন চলছে, তখনই ভয়ানক এক দুর্ঘটনার করাল গ্রাস থেকে কমরেড আচার্য যেভাবে বেঁচে যান তা আর কেউ না জানলেও কমরেড আচার্য জানেন। সেদিন পার্টি অফিসের দোতলায় কোনো ঘরে কেউ ছিল না। এমনটি কমই হয়। টেবিলের ওপর ভলাদিমির ইলিচ লেনিনের কালো পাথরের মুন্ডুটি একদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে কমরেড আচার্যের ঝিমুনি ধরেছিল। একে ঠিক ঘুম বলা যায় না। এমনিতেই নানবিধ ধকল ও পার্টির মধ্যে কট্টরপন্থী ও উদারপন্থীদের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধের জেরে সব নেতাই অল্পবিস্তর নাজেহাল। তার মধ্যে আবার কমরেড আচার্যের অবস্থাটা একটু করুণ সুরে যেন বাঁধা। তার কারণ এই আভ্যন্তরিক খিঁট-এ ঠিক কোন সাইড নিলে ঠিক হবে এটা তিনি কিছুতেই হদিশ করতে পারছেন না। ঝিমুনির ঘোর ঘিরে এল। এর পরের ধাপটাই হল ঘুমের সেই ভাগ যেখানে চোখের তারা বড় বেশি নড়াচড়া করে। স্মৃতি সততই সুখের। কমরেড আচার্য দেখলেন যে তাঁর মার্কা মারা সাদা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি নয়, গরম প্যান্ট, ঝোলা ওভারকোট ও মাথায় রুশ বনবেড়ালের চামড়ার টুপি পরে তিনি উত্তর কোরিয়ার পিয়ংগিয়ং বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছেন। গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ পড়ছে। সামনেই কমরেড কিম ইল সুং-এর এক মূর্তি। মিলিটারি টিউনিক পরা। কিন্তু জীবন এতই জটিল দ্বান্দ্বিকতায় পরিপূর্ণ যে কমরেড আচার্য এই অনুপম দৃশ্যটি অর্থাৎ কমরেড কিম ইল সুং-এর নিথর, নির্বাক স্ট্যাচুটির দিকে মনোনিবেশ করে ধ্যানস্থ হতে পারছেন না অথচ সেটাই দরকার ছিল। এটাতে বাদ সাধছে একটি গান যার রচয়িতা ইন্দরজিৎ সিং তুলসি এবং সুর রবীন্দ্র জৈন-এর। ‘চোর মচায়ে শোর’ ছবিতে কিশোর কুমারের সেই সুপারডুপার হিট,

ঘুঙ্গুরু কি তরহ বজতা হী রহা হুঁ ম্যায়ঁ

কভি ইস পাগমে কভি উস পাগমে…

চটকাটি টুটে যেতে বিস্মিত কমরেড আচার্য দেখলেন যে কমরেড কিম ইল সুং হাওয়া কিন্তু জানলা দিয়ে কিশোরের কন্ঠস্বরটি আসছে। হায়, ঘুঙুরের কী নিদারুণ যন্ত্রণা। দিল্লিতে বসে কম্পিউটার ঘাঁটাঘাটি করলে যদি সব কিছু বোঝা যেত তাহলে তো চিন্তাই ছিল না। ফোন বেজে উঠল। বাজুক। না ধরলেই হবে। কিন্তু এই ঝিমুনি! সেটার কী হবে? উপায়ান্তর না দেখে কমরেড আচার্য একটি কিংসাইজ সিগারেট ধরালেন এবং এই সিনথেসিসে উপনীত হলেন যে ভেতরের বারান্দায় একটু লং মার্চ করে নিলে কেমন হয়? এই সিনথেসিস যে আলেয়ার আলোর ভৌতিক আয় আয় ডাক তা দ্বান্দ্বিক জড়বাদী প্রজ্ঞা কি কখনো মানতে পারে? কখনোই না। এবং যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সবে হাঁটতে শুরু করেছেন, এমন সময়,

– পড়বি! পড়বি!

সতর্কবাণী যখন কানে ঢুকেছে তখন কিন্তু কোলাপুরি চটিতে ধুতি জড়িয়ে কমরেড আচার্য পতন ও মূর্ছার ঠিক আগের সিঁড়িতে। ভাগ্যে সামনের রেলিংটা ছিল। বিপদ কেটে গেছে। বাঁ হাতই বাঁচিয়েছে তাঁকে। সাবাস। কিন্তু কে বলে উঠেছিল,

– পড়বি! পড়বি!

কেউ তো নেই। তবে রা কাড়ল কে? পরিশুদ্ধ বাংলা। যাকে যোগ্য মর্যাদা দেবার জন্য আজ বাংলা মা-এর কতিপয় দামাল ছেলে উঠেপড়ে লেগেছে। একেবারেই সেই বাংলাতেই, হুবহু, কোনো জর্জিয়ান টান নেই,

– ভেবেছিস ফটো বানিয়ে রেখে দিয়ে পার পেয়ে যাবি?

এই উক্তির সঙ্গে সঙ্গে কমরেড আচার্যের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে পাইপের ধোঁয়ায়।

– কমরেড স্তালিন!

– থাক। ওসব ন্যাকামি আমি অনেক দেখেছি। ভেবেছ মালটা কিছু বোঝে না। আমি বুঝি না। অ্যাঁঃ আমি বুঝি না, তুই বুঝিস। কালকা যোগী। ঠিক টাইমে হাতে পড়লে তোর এই দোনামোনা ন্যাকড়াপনা ঘুচিয়ে দিতাম।

– সে তো জানি কমরেড।

– ঘেঁচু জানো। আর ফের যদি আমাকে কমরেড বলবি তো এক থাবড়া মারব। বিপ্লব করেছিস? কাকে বলে জানিস?

কমরেড আচার্য মাথা চুলকোন।

– করিস তো শালা ভোট। আর কিছু করতে পারবি বলেও তো মনে হয় না। যেগুলো আলটুফালটু গাঁইগুঁই করছে সেগুলোকে এত তোয়াজ করছিস কেন?

– ঠিক তোয়াজ নয় স্যার। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমরা আত্মপক্ষ …

– থামলি কেন, বলে যা —

– মানে স্যার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমরা ওদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যেখানে দু মাস বরাদ্দ সেখানে তিন মাস …

– কেন? সময় কি মাগনা না ফাউ? আর তুই, ওদের কথা বাদ দে, তোর মনটা কোন দিকে? সেটা ঠিক করেছিস?

– আজ্ঞে, আপনিই বলে দিন। কিছু তো ভেবে উঠতে পারছি না।

– আর পেরে দরকার নেই। তোরও ভাগ্যে দেখছি … যাক শোন, যা বলি মন দিয়ে। আমার মতে এটা কোনো প্রবলেমই না। কুকুর যেভাবে বমির কাছে ফিরে যায় সেভাবেই ওরা বুর্জোয়া গলতায় গিয়ে ঢুকবে … তুইও কি ওদের দলে ভিড়ে …

– না স্যার যা ভাবছেন তা না…আমি শুধু চাই যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে …

— আমার কাছে ওসব প্যানপেনে ওজর শুনিয়ে কোনো লাভ নেই। গণতন্ত্র! হাতি ঘোড়া তল পেল না, কালকা যোগী উনি এসেছেন গণতন্ত্র মারাতে, গণতন্ত্র, তবে শুনবি? শুনবি কীভাবে ব্যাটাদের ঢিট করতে হয়? বুকের পাটা আছে?

— আজ্ঞে ইদানিং হার্টটাই থেকে থেকে ধড়ফড় করে।

— তাই তো করে। করতে করতে এক সময় আর করবে না। খুবই যুক্তিপূর্ণ ও সহজ সমাধান … হাঃ হাঃ হাঃ কীরকম লাগছে? লৌহ মানবের হাসি? একনাগাড়ে ক বোতল ভদকা খেতে পারবি?

— ক বোতল কী বলছেন? একটু খেলেই তো …

— তোদের দৌড় আমার জানা আছে। সাধে কি আর দুনিয়া জুড়ে এই হাল? ভুলটার জন্যে এখনো হাত কামড়াই।

— ভুল, মানে আপনার?

— আমার না তো কার? অতগুলোকে মারলুম, নামের লিস্ট আসত। নামের পাশে লিখতাম — নীল পেন্সিলে ‘For Execution.J.St.’ আর্মিতে যখন পার্জ চলছে তখন একটা নামের পাশে শুধু ‘The camps’ লিখেছিলাম। বুঝলি? অন্য কাজ ঘাড়ে এসে পড়লে লিস্টগুলো যেত মলোটভ, কাগানোভিচ, ভরোশিলভ, শ্চাদেনকো বা মেখলিস-এর কাছে। ওরা ঝুটঝামেলায় না জড়াবার জন্যে ‘For Execution’-ই লিখত। বুঝলি, সে একটা সময় ছিল। সেই তালে ইউক্রেনের মোটকাটাকেও ঝেড়ে দিলে হত।

-মানে, নিকিতা খ্রুশ্চভ?

— লেখাপড়া করেছিস দেখছি। যতটা ছাগল ভেবেছিলাম ততটা নয়। অবশ্য বেশি লেখাপড়া করা ভালো নয়। ট্রটস্কি বা বুখারিন তো কত পড়েছিল। কোনো লাভ হল? বেশি পড়লে মাথা গুলিয়ে যায়। কিছু একটা কড়া সিদ্ধান্ত নিতে গেলে মনে হয় অ্যা-ও হয় অ-ও হয়। এর ফলে সময় হাতছাড়া হয়। এবং ঐ হাতছাড়া সময়টাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবিপ্লবী ঘোঁট আরো মুঠো শক্ত করে ফেলতে পারে। তাই এখন মনে হয় আমার আরো নির্মম হওয়া উচিত ছিল। আরো। আরো! অথচ আমি ভেবেছিলাম আমার শত্রুর শেষ না রাখার নীতিটা সফল হবে।

— হয়নি?

— হলে এই দশা হত? ১৯৩৫-এর ২৪ আগস্ট কী হয়েছিল জানিস?

পাইপের ধোঁয়া ঘুরপাক খায়। স্লাভ ভাষায় কিছু চিৎকার। গুলির শব্দ।

— আজ্ঞে না।

— জিনোভিয়েভ, কামেনেভ আর স্মিরনভকে গুলি করে মারা হয়। তখনই স্মিরনভের বৌ আর মেয়ে ওলিয়া-কে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩৭-এ দুজনকেই গুলি করা হয়। ঐ বছরেই জিনোভিয়েভের ছেলে স্তেপান রাদোমিসলস্কি-কে গুলি করা হয়। কামেনেভ-কে মারার কয়েকদিনের মধ্যেই তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে গুলি করা হয়। ১৯৩৯ সালে কামেনেভের বড় ছেলে আলেকজান্দারকে গুলি করা হয়েছিল। অবশ্য এর আগেই, ১৯৩৮-এর ৩০ জানুয়ারি কামেনেভের আর এক ছেলে ইউরিকে গুলি করা হয়েছিল। ছেলেটার বয়স তখন ১৬ বছর ১১ মাস। কামেনেভের নাতি ভিতালিকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৯৫১ সালে। ওর বয়স তখন ১৯। ২৫ বছরের কারাদন্ড হয় তার। ছেলেটা ১৯৬৬-তে মারা যায়। এত মেরেও এত ধরেও পারলাম না। কোথাও একটা নরম হয়ে পড়েছিলাম। কোথাও একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। যা বললাম এবার বসে বসে ভাব। আলগা দিবি কি মরবি। বুঝলি?

— আজ্ঞে বুঝেছি।

— যাই হোক, আমি আবার আসব। সামনের ইতিহাসে অনেক স্তালিন আসবে। স্তালিন যেমন আসবে তেমন জানবি হিটলার, তোজো, চার্চিল, রুজভেল্ট, ট্রুম্যান, টিটো সব ফের আসবে। তবে সবই ডামি। আসলি মাল আর হবে না।

— কী হবে তাহলে?

— তোর মতো উটকো কতগুলো ভোঁদড় জল ঘোলা করবে। আবার কী হবে?

পাইপের ধোঁয়া কমরেড জে. ভি. স্তালিনের ফটোর কাচের মধ্যে গিয়ে ঢুকতে শুরু করে। সব চুপচাপ। হাতের কিং সাইজ সিগারেট কখন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। মাথা তো নয়, চাকতি।

কমরেড আচার্য ধীর পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে বসলেন। মাথা ধরেছে। মাথাটাই বোধ হয় একবার ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া ভালো। ডিপ্রেশন না অ্যাংসাইটি — কী কারণে এমন হচ্ছে?

২৭ অক্টোবর, সন্ধেবেলায় কালীঘাট ট্রাম ডিপোতে একটি প্রাচীন ৩০ নম্বর ট্রাম ঢুকছিল। তার মাথায় সেই দাঁড়কাক বসেছিল। এরপরে সে পার্কের দিকে উড়ে যায়।

গোড়ার থেকে যাঁরা সস্নেহ মেহনত সহযোগে ‘কাঙাল মালসাট’ নামক ডুবোজাহাজ-টি (এখনই ডুবন্ত বা জাহাজডুবি জাতীয় অমাঙ্গলিক শব্দ ব্যবহার ঠিক হবে না) ফলো করছেন তাঁরা কেন, ভূভারতে সকলেই জানে যে, ২৮ অক্টোবর সেই খুলি নাচ হয়েছিল (প্রথম পর্ব দ্রষ্টব্য)। এরপর সাবমেরিনটি আবার ভুস করে ২১ কার্তিক অর্থাৎ ৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ভেসে উঠবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন। যাঁরা অভব্য বাগাড়ম্বর পছন্দ করেন না, খিস্তি শুনলে যাঁদের কানে তালা লাগে তাঁরা স্বচ্ছন্দে এই ঘোরালো ঘটনার জন্যে অপেক্ষা না করে একের পর এক মুহ্যমান ও নেয়াপাতি গাধাবোট দেখে যেতে পারেন। তবে ছোট করে দুটো কথা। বেশি রাত অবধি গঙ্গার ঘাটে বসে না থাকাই ভালো। এবং ২১ কার্তিক অর্থাৎ ৭ নভেম্বর কালীপুজো।

২২ ৬ ৬

১৮ ৪ ৩

১৬ ৪ ৪

২৫ ১০ ৪ ৩ ১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *