কাঙাল মালসাট – ৩

আজকাল কোনো শিশুই ‘লাল-কালো’ পড়ে না। অতএব কে অন্ধকারে হাঁ করতে পারে, এই ভয় কেন বিকট-দর্শন ডেয়ে জল্লাদকে ঘর্মাক্ত করে তোলে প্রভৃতি প্রশ্নাবলী ওঠে না। গিরীন্দ্রশেখর স্বপ্নের জগৎ থেকে সুষুপ্তির জগতে নির্বাসিত। যেমন নির্বাসিত দক্ষিণারঞ্জন, ধনগোপাল, হেমেন্দ্রকুমার, সুনির্মল, খগেন্দ্রনাথ, সুখলতা ও খ্যাত-অখ্যাত শত শত সাহিত্যিক যাঁরা শিশুদের জন্য লিখতেন। এখন সাহিত্যিক শিশুদের যুগ। ছোটরা কেবলই ফেলুদা বা টিনটিন পড়ে। বাপ-মা’গুলোও অগা। ছোটবেলা থেকে হাই প্রোটিন, ব্রেনোলিয়া, সুলভ ব্রয়লার, কেলগ ইত্যাদি গিলে অকালেই কেঁদো কেঁদো হয়ে ওঠে। তারপরই দেখা যায় হয় কমপিউটার শিখছে বা লুচ্চামি। বিগ বং-এর বাচ্চারা হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে, বাঁটুল দি গ্রেট এমনকি চেঙা-বেঙা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনবহিত। ছোটবেলা থেকেই এত স্বার্থপর ও খচ্চর অন্য কোনো দেশের শিশুরা হয় না। যেমন পাশেই বিহার দেশের কথা ধরা যায়। অথবা নেপাল। সেখানে সরলমতি শিশুদের দেখা পাওয়া যায়। হামেশাই। আপাতত বড়িলাল।

ফলের বাক্সের কাঠের গায়ে বিস্কুট টিন কেটে পেরেক মারা বেঁকাতেড়া দরজাটায় ফুটো ছিল বলে বড়িলাল দেখতে পাচ্ছিল ভেতরে অর্থাৎ ভদির উঠোনে কী হচ্ছে। ভদি ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বেরিয়ে এল।

-এই তিনটে বানচোৎকে আবার নিয়ে এলি কেন?

– খুব দেখি বোলচাল দিচ্ছে। ভাবলুম ধরে নিয়ে যাই। পরে সাইজ করা যাবেখনি।

– দাঁড়া, দাঁড়া। অত সোজা কেস নয়। ভাবচি, এই দিনে হঠাৎ ফাঁদে পা দিল কেন?

-জলছিটে দিয়ে দিন। মাথাগুলো কেটে ফেলি। বলিও হল, ধড়, মুণ্ডু সব সাধনার কাজেও লেগে গেল। কিছুই ফেলা গেল না।

-মন্দ বলিসনি। কী গো, মালে ঝালে একেবারে কন্দর্পকান্তি। খুঁড়ছিল কেঁচো …

-বেরিয়ে পড়ল ঘুরঘুরে। এবারে রা কাড়ছে না যে! ওফ, সে খিস্তির একেবারে খই ফুটোচ্চে।

প্রথম ডি. এস. এবং তার দেখাদেখি পুরন্দর ও মদনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। বড়িলাল শুনতে পেল আশপাশে কেউ মন্তর পড়ছে। ন্যাকড়াপোড়া গন্ধ। নলেন এর মধ্যেই গিয়ে ল্যাগব্যাগে একটা টিনের খাঁড়া নিয়ে এসেছে যা দিয়ে কিছুই কাটা সম্ভব নয়। এটা দেখেও ওদের কান্না থামছে না। ভদি তিনজনের সামনে পায়চারি করছে আর থেকে থেকে চেঁচাচ্ছে,

– এসপার ওসপার হবে যখন হয়েই যাক। নিন্দে যখন শালা একবার রটেচে তখন বিয়েই করব। মুণ্ডু নেচেচে। মুণ্ডু নাচবে। উফ, ইয়া বড় চাকতি মাপের মুণ্ডু গাঁথা মালা। এসপার ওসপার। মুণ্ডু নির্বিকার। ধড় শুধু ধড়ফড় করছে। হাত খিঁচোচ্ছে। পায় টান মারছে।

ফ্যাতাড়ুরা এবার সমস্বরে একেবারে রোলারুলি কান্না জুড়ে দিল। এতক্ষণ বড়িলাল ভাবছিল বাজারে মুরগির মুণ্ডুকাটা দেখলেই তার গলায় কেমন শিরশির করে আর তিন-তিনটে জলজ্যান্ত মানুষের মুণ্ডু … এরা কি কাপালিক-টাপালিক… নরবলির দু-একটা খবর তো এখনো কাগজে বেরোয়… নাকি এখনই গিয়ে থানায় খবর দেবে…

বেচামণি একেই বেজায় মোটা তায় পাটভাঙা লাল-সোনালি বেনারসি পরেছে বলে খোলতাই আরো বেড়েছে, স্যাম্পু করা চুল,

-ফের … ফের সেই অশৈল?

ভদির গর্জন।

-ব্যাটাছেলের ব্যাপারে নাক গলাবে না কতবার বলেছি!

নলেনের আবেদন।

-গিন্নি মা, খাঁড়া চুলকোচ্ছে, রক্ত ছেটাছেটি হবে, আপনি থাকবেন না …

বেচামণির মুখে সেই মহামায়াসুলভ হাসি

-পুজোগণ্ডার দিন। ফেতুড়ে অতিথি এয়েচে। তা সে ভয়ডর দেখিয়েচ ভালো করেচ। শান্ত হয়ে বসো তো বাছা তোমরা। কেউ মুণ্ডু কাটবে না। ওসব হল গদির বটকেরা। নলেন, ওদের জলবাতাসা দিয়ে বসা।

-তাহলে বলি দেব না বলচ?

-ফের সেই অলুক্ষুণে কতা। দেখচ ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপ ধরেচে।

-বারণ যখন করচ এত করে, তখন … যাঃ, এ যাত্রা ছেড়ে দিলুম। তবে যেখানে সেখানে অজানা অচেনা লোক দেখলে পোঁদে লাগা মোটেও ভালো কতা নয়। এই বলে দিলুম।

ডি. এস. ফুঁপোতে ফুঁপোতে বলে,

-আজ্ঞেঁ গদির বটকেরা কী? ঐটে বুঝলুম না।

বেচামণি ঘোমটা দেয়। ভদির প্রসন্ন ব্যাখ্যা

-আমার নাম হল গে ভদি। তা বউ হয়ে তো সোয়ামির নাম মুখে নিতে পারে না। তাই বলে গদি। এবারে বুঝলে গদির বটকেরা।

পুরন্দর ও মদন বসে। ওদের দেখাদেখি ডি. এস.-ও। তিনটে ভাঁড় আর এক বোতল বাংলা নিয়ে নলেন সামনে রাখে।

-গদির বটকেরা তো দেখলে, এবার একটু নলেনের গুড় চেখে দেখ।

-তখন উল্টোপাল্টা অনেক বলে ফেলেছি। কিছু মনে রেখ না ভাই।

– দ্যাখো ভায়া, তোমরা হলে ফ্যাতাড়ু। ফ্যাতাড়ুর কাজ ফ্যাতাড়ু করেছে … আর …

ভদি নলেনকে হাত নেড়ে থামায়।

– এবারে আমাকে বলতে দে। আজ এক মহাযোগের দিন বুঝলি। লাস্ট এই দিনটা এসেছিল কমবেশি দেড়শো বছর আগে। চাকতির খেলা যখন শুরু হয় তখন চোক্তারের সঙ্গে ফ্যাতাড়ুরা এক পার্টি হয়ে যায়।

– আজ্ঞে, চোক্তার কী? মোক্তার, ডাক্তার হয় বলে জানি …

– আরে উকিল, ডাক্তার, মোক্তার, পেশকার ঐসবের যেমন ফ্যাতাড়ু মেলে না তেমন চোক্তারও মেলে না। আমরা ঠিক বলিয়ে কইয়েদের দলে পড়ি না। তাই কেউ টেরও পায় না যে আমরা আছি। এই যেমন ধর তোরা-তোরা যে ফ্যাতাড়ু সেটা কটা লোক জানে? খবরের কাগজে নেই, খাসখবরে নেই, কোথাও নেই। সেইরকম চোক্তারদের বেলায়। কোথাও নেই। লোকে জানেই না। নে মাল ঢাল। ও নলেন ছিপি খুলেই দিয়েচে। চেতলার মাল। রসা ডিস্টিলারির বলে একটু গন্দ লাগবে। এদিকে আবার ফারিনি-র ছাপটা দেয় না। সব হল গওরমেন্টের হারামিপনা। তা বাবা মদন, মুখের কুলুপটা এবারে একটু খোল।

– আমি অবাক হয়ে ভাবচি আপনাকে কোথায় যেন দেখেচি দেখেচি।

– ওরে চোক্তারের ওপরে ফ্যাতাড়ুর জন্মের টান। এতে অবাক হওয়ার কি আচে। একি এক-দুদিনের সম্পক্ক। নাও, ভাটকবি, এক্ষুণি যে পদ্যটি ভাবলে বলে ফেল তো-

-বলব?

-বলবি না তো কি গিলে বসে থাকবি! বল,

পুরন্দর গলা খাঁকারি দেয়।

– আমার এই কবিতাটির নাম ‘যার যা কাজ’।

ডি. এস. অমনি বলে ওঠে,

-ওরকম নাম কবিতায় চলে না। ‘যার যা কাজ’। দেখলেই লোকে পাতা উল্টে চলে যাবে।

-কেন?

-এই কারণে যে নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এটা জ্ঞানের কবিতা। লোকে কবিতা পড়বে আনন্দ পেতে, ওসব জ্ঞানমারানি ঢপ লোকে শুনতে চায় না।

মদন বলে

-ডি. এস. তুমি থামবে? না শুনেই আগে ঝগড়া!

-বাগড়া দিও না ভাই। আনন্দ তো অনেক পেয়েছ। এবারে ভাবার আগে শুনে নাও, আমার কবিতা হল, ‘যার যা কাজ’

শশধর ধরেছে শশক

মহীতোষ মেরেছে মশক

উভয়েই স্ব স্ব কাজে পটু

পেট থেকে পড়া ইস্তক।

বনমালী করে বন খালি

ডালে বসে গোড়া কাটে কালি

ডাকে তারা যাহা থাকে ঝাড়ে

যমদূত দেয় করতালি।

ভদির মুখে হাসির ময়ান।

-বাঃ বাঃ বেড়ে হয়েচে। এই, এই হল কবিতা। রস আচে, অলঙ্কার আচে, গভীর অর্থ আচে, চনমনে ছন্দ আচে। এই না হলে পদ্য। আজকাল কী যে সব বালের ছাল লেখে। কোনো কাক-কাঁকুড় বালাই নেই। কেমন লাগল, ডি. এস.!

-ভাবতে হবে। জ্ঞানমারানি পদ্য তো, ঝপ করে কিছু বলব না। তবে, মনে হচ্ছে পুরন্দর এর মানেটা বুঝে লেখেনি। পেয়ে গেছে, ছেড়ে দিয়েছে। কী, ঠিক বলিনি!

-নেহাৎ ভদিদা, বৌদি, মদনদা সব সামনে বলে কিছু বললাম না। অবশ্য পুরন্দর ভাটের জীবনে এটা নতুন কিছুই নয়। যুদ্ধ যারা করে তারা মশার কামড় নিয়ে মাথা ঘামায় না।

-তার মানে আমি মশা?

– হ্যাঁ, অ্যানোফিলিস।

-আঃ, তোরা থামবি? বেকার ঝগড়া করে কোনো লাভ নেই। পরে আমি ওকে পদ্যটা না হয় বুঝিয়ে দেব।

টিনের দরজার ফুটোর সঙ্গে চোখ সাঁটানো বড়িলাল হঠাৎ বোধ করল তার পা বেয়ে কী একটা উঠছে। চোখ সরিয়ে দেখল একটা ডেঁও পিঁপড়ে। তাকে সরাতে গিয়ে টিনের দরজায় হাঁটু ঠুকে ডুম করে একটা আওয়াজ হল। অন্য কেউ না খেয়াল করলেও শব্দটা নলেনের কান এড়ায়নি। সে উঠতে যাবে কিন্তু ভদি তাকে থামাল।

-ও কিছু নয়। সাক্ষী। সবকিছুর সাক্ষী থাকে। থাকতে হয়। পাত্তা দেবার দরকার নেই। এবারে তোরা কী জানতে চাস কম কথায় বল।

– আঁজ্ঞে, চোক্তার তাহলে ঠিক কী?

-এ কথার কোনো মানে নেই। ফ্যাতাড়ু কী? তেমনই চোক্তার কী? চোক্তার হল চোক্তার। তবে এটুকু বলতে পারি হুজ্জত লাগাতে চোক্তারের কোনো জুড়ি নেই। তবে ঠিক টাইম না হলে কিচ্ছুটি হবার উপায় নেই।

-খোলসা হল না।

-হবে কী করে! আজকে তো সিরিয়ালের পয়লা এপিসোড। তিনশো পেরিয়ে গেল, ‘জন্মভূমি’-তে ঠিক কি হচ্চে লোকে শালা বুঝতে পারছে না। আর এক নম্বরেই তোরা এত বড় কাণ্ডটা সাইজ করবি সে কী করে হয়? আর আমিই বা গান্ডুর মতো অত বড় ঘোমটা দিতে যাব কেন যাতে পোঁদ বেরিয়ে পড়ে!

বেচামণি লজ্জা পায়।

-গদির মুখটাই ওরকম। খুব অশৈল।

-থামো তো। অশৈল! ভেতরে ভেতরে রাবড়ির জাল দেবার থেকে পেট খুলে দুটো খিস্তি করা সাধুসন্তের লক্ষণ। ঝটপট বলে যা আর কি বলবি।

এবারে পুরন্দর ভাট।

– আচ্ছা ভদিদা, তোমার দরজায় সাইনবোর্ড লেখা ‘অশুভ অনুষ্ঠানে ঘর ভাড়া দেওয়া হয়’। এর মানে?

-দ্যাখ, রোজ, নিত্য, অন্তহীন অশুভ অনুষ্ঠান চলচে! আজকের জীবনে পার হেড দশ-বিশটা করে শত্তুর। লোক চেনা দায়। মামলা, জালি কারবার, বৌ ভাঙানো, ভোট মারানো, অর্ডার ধরা, খুচরো দুষমনি, চিটিং কেস, টাকা গাপ, চোরকাঁটা দিয়ে ডাকাতকাঁটা তোলা, মাগি চালান, পলিটিক্যাল চুদুড়বুদুড়, নমিনেশন — এই সব কন্মোকাণ্ড নিয়ে মারণ, উচাটন, বশীকরণ, ব্ল্যাক ম্যাজিক নিত্য চলছে। সেই কারণে, স্রেফ এইসব যারা করে তাদের আমি ঘর ভাড়া দিই। বিয়ে, অন্নপ্রাশন তারপর গিয়ে শ্রাদ্ধফাদ্দ-তে আমি নেই। এখনই তো একটা ঘরে চলচে তাকিয়þাচালান, অন্যটায় কী কেস রে নলেন?

-আঁজ্ঞে কিছু বলেনি। দাড়িওলা একটা লোক মাঝবয়সী একটা মেয়েমানুষ নিয়ে দরজা বন্ধ করে রেখেছে। ঠিক কী করছে জানি না। তবে ন্যাকড়া পুড়িয়েচে।

-গাঁড় মেরেচে। দরজা ধাক্কে বের কর। টাকা বুঝে নিয়ে লাথ মেরে পেছনের দরজা দিয়ে তাড়া।

নলেন উঠে গেল। তারপর ধুপধাপ, কাঁইমাঁই।

-ও নিত্যকার ব্যাপার। ধাওয়া খেয়ে চলে যাবে। এই শালাদের জন্যেই তো পুলিশ খচড়ামির চান্স পেয়ে যায়।

-তাকিয়াচালানটা কী কেস ভদিদা?

-ভেরি ইন্টারেস্টিং। কংগ্রেস, তারপর গিয়ে কংগ্রেস ভেঙে অনেক দল যেসব হয়েছে ওরা তো ফরাস আর তাকিয়া নিয়ে বসে। ভালো তাকিয়াচালান হলে পিঠ হেলাতে গেল কি তাকিয়াও গড়িয়ে সরে যাবে। ঠেসই দিতে পারবে না। চিৎ হয়ে পড়বে। মানেই হ্যাটা। মানেই কেরিয়ারের পুঁটকিজাম। এরকমই কত কী — শ্মশানবন্দ, ভূত লাগানো, পেটপোড়া, ক্ষুর চালা, চুরির তুক, কলেরা বা প্লেগের তদবির, নিশির ডাক কাটানো, হাগা বাণ, রাঁড়-ঢ্যামনা কাটার মন্তর — এইজন্যে ঘর ভাড়া। দিচ্ছে কে? চোক্তার ভদি। মাথায় কিছু ঢুকছে?

-না ঢুকে পারে? একেবারে চাম্পি বিজনেস!

-তবে হ্যাঁ। সব বড় বড় খদ্দের। মিনিস্টার, সিনেমা স্টার, ক্রিকেট প্লেয়ার, ডাক্তার, ব্যারিস্টার — কেউ বাদ নেই। খুব আবডাল রাখতে হয়। লোক জানাজানি হলে রক্ষে নেই।

-কিন্তু সাইনবোর্ড দেখেই তো জানবে।

-ঐখানেই তো চোক্তারের ফন্দি। হেঁজি-পেঁজি এল তো এল। পেছনে অন্য দরজা আছে। দরকার হলে বোরখা, ছাতার কাপড়ের আলখাল্লা, ফলস দাড়ি, পরচুলা — সব ব্যবস্থা আছে।

-পুলিশ ঝামেলা করে না?

-করবে না কেন? নতুন ও.সি. ফোসি হলে গোড়ার দিকে একটু লপচপানি মারে তারপর সাইজ হয়ে যায় — যেখানকার যা নিয়ম। হাত মে মাল্লু, ঘর যা কাল্লু। ব্যাস, কোনো ঝুটঝামালা নেই। গ্যাঁট হয়ে বসে থাকো। আর মোলায়েম করে মেরে যাও। চোক্তারের কারবারের এই হল ধম্মো। তবে সি.পি.এম.-এর গওরমেন্ট তো, যে কোনো টাইমে খচড়ামি করতে পারে। করলেই লাইন উপড়ে সাইনবোর্ড পাল্টে দেব।

-কী করবে অমন হলে?

-নার্সিং হোম খুলে দেব। নামও ঠিক করা আছে। ‘মৃত্যুদূত নার্সিং হোম’।

-উরিঃ সাঁটি। ঐ নাম শুনলে কেউ আসবে!

-আসবে মানে? পিলপিল করে আসবে। সকলেই জানে যে রোগী কোথাও বাঁচে না। অতএব মরুঞ্চে মাল হলেই এখানে চালান করে দেবে। নার্সিং হোমেও দেওয়া হল, দাঁত কেলিয়ে পটলেও গেল। নো প্রবলেম। দুটো ডাক্তারও আমি ফিট করে রেখেচি। ওদের হাতে আজ অবদি একটা রোগীও বাঁচেনি। ঐ দুটোকে রাখব। তারপর বেচামণি আচে, নলেন আচে…

-আমরাও আছি, ভদিদা।

-সে তো বটেই। এই রে! বাবা এসে গেচে। এবারে ঝটপট কাজ না এগোলে খচে যাবে।

-বাবা মানে? কোথাও কেউ তো নেই!

নলেন ফিক ও বেচামণি খিলখিল করে হাসি জুড়ে দেওয়ার ফলে আতঙ্কময় মুহূর্তটি অচিরেই প্রার্থিত মাত্রা পেয়ে যায়। বড়িলালও খটকায় দুলছে। ভদিরই কোনো বিশিষ্টার্থক হেলদোল নেই। ন্যাড়া ছাদের আলশের দিকে হাতজোড় করতে ফ্যাতাড়ুর ছটি ও বড়িলালের দুটি চোখ সেইদিকে ধায় — আলশের ধারে একটি সুবৃহৎ, প্রাচীন ও প্রাজ্ঞ দাঁড়কাক বসে চোখ পাকিয়ে সব দেখছে।

-চাকতির ঘর খুলবে। মন্তরে মন্তর, যন্তরে যন্তর — সব মিলে গেল। জানতুম বাবা না এসে পারবে না।

যে বাংলা ভাষা আর কখনোই হাসিল হবে না সেই বাংলায় এই পাখিটিরই নাম দণ্ডকাক। দণ্ডকারণ্যে হয়তো এই ধরনের কাক দেদারে দেখা দেয় এমন হতে পারে। না হলেও কোনো খিঁট নেই। এই টাইপের কাক কলকাতায় বেশি দেখা যায় না। তবে বেগম জনসনের আমলে কলকাতায় দাঁড়কাকের ছড়াছড়ি ছিল বলেই শোনা যায়। বেগম জনসন (১৭২৮-১৮১২) প্রসঙ্গে আমাদের পরে যখন না এসে উপায় নেই তাই একটু আগেই গাওনা গেয়ে রাখা ভালো। এই কলকাতাতেই তিনি সেন্ট জনস চার্চ গোরস্থানে জব চারনক ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের কাছেই কবরস্থ অবস্থায় আছেন। ভূমিকম্প জাতীয় কিছু না হলে ওভাবেই থাকবেন এ আশা দুরাশা নয়। আপাতত ভদির পিতৃরূপী গাঢ় একটি কর্কশ আরাব নিক্ষেপ করল যা আর যাই হোক ‘কা … আ …’ কখনোই নয়।

— কী চাইছ বাবা? আনন্দলাড়ু খাবে?

এইবার দাঁড়কাক নির্ভেজাল মনুষ্যকন্ঠে বলল বা বলিল,

— অতীব আনন্দঘন কাল। মন্তর ও যন্তর সব মিলে গেছে, আনন্দবাজারে আনন্দ, চোক্তারের ঘরে ফ্যাতাড়ু , চারদিন পরে কাটা মুণ্ডুর ভোজবাজি, সবই যখন ডগোমগো তখন আর কালক্ষয় কেন?

-এঁজ্ঞে, আপনি না এলে …

-চোপরাও। ফের কতা বললে মুকে আঁশবঁটি ভরে দেব। খোল, শালা চাকতির ঘর।

ভদি আর কালবিলম্ব না করে বেচামণির কাছ থেকে চাবির গোছাটি নেয়। চাকতির ঘরের তালাটি কোম্পানির গোড়ার দিকের দাসলক। চাবিটিও তেমনই আখাম্বা। দরজার ওপারে বোঁ-বোঁ শব্দ যেন হাজার খানেক ভিমরুল পাখসাট মারছে। ঘর খুলতেই ছোট সাইজের কয়েকটি চাকতি বা উড়ন্ত চাকি সাইরেনের মতো শব্দ করে তেড়ে বেরিয়ে ঘোলাটে আকাশে উধাও হয়ে গেল। বড় চাকতিগুলো বনবন করে ঘুরছে কিন্তু বেরোচ্ছে না।

-দরোয়াজা খোলাই থাক। ওরা ইচ্ছেমতো বেরোবে, ঢুকবে। তোরা তোদের কাজ করে চল। ঠিক টাইমে আমি ফের এসে পড়ব।

দণ্ডকাক হুস করিয়া উড়িয়া গেল।

বড়িলাল দেখল এবারে কেটে পড়াই ভালো কারণ খিদে পেয়ে গেছে। পরে না হয় এসে দেখা যাবে জল কতটা গড়াল। ঠাণ্ডার দাঁত না থাকলেও মাড়ি রয়েছে। আবার গরমও লাগছে। ফেরার রাস্তায় বড়িলালের চোখ পড়ল দেওয়ালের গায় বিরাট এক দাড়িওয়ালা মুণ্ডু এবং তারই পাশে কামান দাগার মতো জাঁদরেল লেখা ‘মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান কারণ ইহা বিজ্ঞান’। এই লিখন যে নোনাধরা দেওয়ালের গায় সরব তার নীচে নর্দমা। তাতে জমা জলে কালচে তন্বী শ্যাওলা কোমর দোলায় ও হাজার হাজার মশার লার্ভা নাচানাচি করে।

‘সকলি ধ্বংসের পথে! সকলি ধ্বংসের পথে!
কেহ অশ্বে কেহ গজে,
কেহ যায় পদব্রজে,
কেহ স্বর্ণ-চতুর্দোলে, কেহ যায় পুষ্পরথে ;
সকলি ধ্বংসের পথে! সকলি ধ্বংসের পথে!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *