ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – ৩

তৃতীয় পর্ব

ঠান্ডা-ঠান্ডা ঠেকতে ঘুম ভেঙে গেল দেবুর। অক্টোবর গেল সবে। কিন্তু এখনই ভোররাতের দিকে বেশ গা শিরশির করে। জানালা-টানালাগুলো সব বন্ধই থাকে। ঘরে আলো আসছে না বটে, তবে, নীলমাধবের বাড়িতে ঘণ্টা বাজছে টং টং টং টং, সেই শব্দ ঠিক পাওয়া যাচ্ছে। গোটা কার্তিক মাস ধরেই নীলমাধব সূর্য ওঠবার আগে ঠাকুর জাগরণ দেয় আখড়ায়। ফলে ভোর হয়েছে সেটা বুঝতে অসুবিধে নেই।

মশারি থেকে হাত বাড়িয়ে জানালার একটা কপাট খুলে দিল সে। এ-বছর, অনেকদিন বাদে পুজোর আগে বাড়িটা রং করিয়েছিল। এখনো কাঠের গায়ে রঙের নতুন নতুন গন্ধ রয়েছে।

বাইরে কুয়াশা। ছাঁচতলার কোণে মানকচুর একটা মুথা লাগিয়ে দিয়েছিল গতবার। ছাইটাই দিয়ে মাটি তৈরি করে দিতে, সেটা ফনফনিয়ে বেড়ে বেশ বড় একটা ঝাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই এক বছরে। জানালায় তার পাতা ঠেকে আছে। ওপরের পাতা থেকে নীচের পাতায় ঘনীভূত শিকরকণা খসে পড়বার টপটপ শব্দ হয়।

দেবু কাঁথা ছেড়ে উঠে বসল। মা ওঠেনি এখনো। ঠান্ডার দিনে উঠতে চিরকাল একটু দেরি হয় মা’র। বড় শীতকাতুরে। প্রথম প্রথম তো কলকাতাতে গিয়ে কাটিয়ে আসত সবচেয়ে ঠান্ডার সময়টা। তারপর আস্তে-আস্তে সয়ে গেছে গত ছ’টা বছরে।

নিঃশব্দে দরজাটা টেনে দিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল দেবু। শিশির পড়ে ঘাস ভিজে রয়েছে। খালি পায়ের নীচে তার শিরশিরে স্পর্শ। গাছপালার পাতাতেও শিশির জমে আছে। হাত বাড়িয়ে একটা নিমের ডাল ভাঙতে গিয়ে গায়ে মুখে একরাশ জলকণা ঝরে পড়ল তার। কঠিন অথচ সরস ডালটির মাথায় মৃদু জিভ বুলিয়ে নিয়ে তাকে দাঁতে চেপে ধরল সে। তিক্ত, সুগন্ধ রস ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মুখ জুড়ে।

পুকুরে আজ জাল দেবার কথা। এ-কাজটা ভোরেই করতে হয়। সবাইকে কাল ভোর-ভোর আসতে বলেও পাঠিয়েছিল সাধুকে দিয়ে। এসে পৌঁছবে এক্ষুনি হয়তো! নিমডালের থেঁতো মাথাটা দাঁতে ঘষতে-ঘষতে দেবু বাড়িটাকে বেড় দিয়ে পেছনের পুকুরের দিকে এগোল।

 ঘাটে পৌঁছে দেখা গেল অনিল দলবল নিয়ে আগেই এসে বসে আছে। দেখে দেবু বলে, ‘কী গো অনিলদা? রাত থাকতে এসে বসে আছ নাকি এইখানে?’

‘তা সেইরকমই ধরেন। আমাদের তো তিন পো’রের শিয়াল ডাকলেই রাত্রের পাট শেষ। উঠে ডাকডোক দিয়ে দলবল জুটায়ে এনে বসে আছি, কখন আপনার ঘুম ভাঙে!’

‘তা বসে না থেকে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুললেই তো পারতে!’

‘ছি ছি! কী যে বলেন দেবুভাই! আপনারা হলেন গিয়া মাস্টার মানুষ! লেখাপড়া জানা লোক। সমাজের মাথা। রাত্র জেগে কেতাব পুস্তক পড়েন! হয়তো সারারাত পড়াশুনা করে ভোরের দিকে ঘুমায়েছেন। ডেকে তুলি গিয়া কোনো আক্কেলে? তার ওপর হাঁকাহাঁকি জুড়লে, মা ঠাকরুনের ঘুমটাও যে ভাঙত সে খেয়াল আছে? যে পাতলা ঘুম তেনার! বাব্বা!’ বলেই পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘উহু হু জলের দিকে চাইলেই শীত লাগে রে। ও মানকে, তাড়াতাড়ি হাত চালা বাবা।’

‘সবুর, সবুর। মশলা পেকে এল বলে; আরেকটুখান দলাইমলাই হলেই’ বলতে-বলতেই মানিক ছোট একটা কলকের মাথায় আঙুল দিয়ে প্রাণপণে তার মশলা ঠুসে যায়। থেবড়ে বসেছে মাটির ওপরে। হাবভাব দেখে মনে হয় আরো খানিক সময় তার যাবে ওতে।

দেবু হাসছিল। বলে, ‘সাধে বলে কলিকাল! নইলে জল দেখে জেলের ঠান্ডা লাগে এমন কথা কে কবে শুনেছে বলো দেখি? নাও, বিড়ি খাও একটা। ঠান্ডা যাবে।’ বলেই নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে অনিলের দিকে আরেকটা বিড়ি এগিয়ে দিল দেবু।

অনিল মুখটা বেঁকিয়ে মাছি তাড়াবার মতো হাত নাড়ল একবার, ‘ধুস ঠান্ডার মধ্যে জলে ডুবকি দিয়ে দিয়ে কাজ। ও আপনার বিড়ির কম্ম নয়। আপনার বিড়ি আপনি রাখেন। দেবুভাই, সবুর করেন খানিক। বড়তামাক পাক হয়ে যাক। পেসাদ করে দেবেন নাকি একবার? সাক্ষাৎ ভোলানাথের জটা। আর মানকের হাতে ও জিনিস যা পাকে! আ হা হা!’

কথাটা বলেই যেন কত না সঙ্কোচে জিভ কাটে অনিল, ‘আরে এই দ্যাখো। কোন মানুষরে কী বলতে কী বলে ফেললাম। আপনি হলেন গিয়া দেবতুল্য মানুষ, কোনো নেশাভাং নাই, কুচরিত্র নাই, সদগুণের আধার। এহেন মানুষের কাছে আমি গেছি বড়তামাকের গুণপনা ব্যাখ্যান করতে! ছ্যা!’

 এই বলে চালাকিভরা চোখে দেবুর দিকে একবার তাকিয়ে দেখল অনিল, ‘তবে কিনা, কথাটা কী জানেন মাস্টারভাই, চান্দের যেমন কলঙ্কেই শোভা, পুরুষমানুষেরও তেমন নেশা একখান লাগে। সে বড়তামুকই হোক, লাল পানিই হোক কি মেয়েমানুষই হোক। সব্বত্যাগী সন্নিসি যে হয় তারও নেশা লাগে! সে হল গে আবার সব নেশার বাড়া ঈশ্বরের নেশা। দুনিয়াটাই তো নেশার ওপর চলে গো দেবুভাই।’

দেবু মিটিমিটি হাসল, ‘আহা হা, বড় ভাবের কথা বললে যে অনিলদা! তা তুমি কী বলো? গাঁজাটাই ধরি প্রথমে? নাকি?’

‘ছি ছি! আমি কি তাই বলেছি? ধম্মভয় নাই আমার? বরং যে বয়সের যা কর্তব্য সেটাই করেন না কেন দেবুভাই? এ বয়সের সেরা নেশা হল সংসারধম্মের নেশা। আপনি ঘরে একখান বউ আনেন এইবারে।’

বিড়িটাতে একটা লম্বা টান দিয়ে সেটাকে পুকুরের জলে ছুড়ে ফেলে দিল দেবু। মুহূর্তে তার আগুন নিভে গিয়ে ভেজা স্যাঁতসেঁতে টুকরোটা জলের ওপর ভাসছে। সেইদিকে চোখ ধরে রেখেই সে বলল, ‘ঘটকালির পেশা ছেড়ে এবারে নিজের কাজটা বরং শুরু করে দাও দেখি। সূর্য উঠতে যাচ্ছে।’

পুবের দিকে চোখ ফেলে ধড়মড় করে উঠে পড়ল অনিল। জ্বলন্ত কলকে ততক্ষণে তার দলটার হাতে হাতে ঘুরে চলেছে দ্রুতবেগে। টানে টানে একেকবার ফট ফট করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লাফিয়ে ওঠে তার মাথায়। তাদের একজনের হাত থেকে কলকেটা নিয়ে তাতে প্রাণপণ একখানা টান দিল অনিল। তারপর গলগল করে নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে-ছাড়তে বলল, ‘নেন। বান্দা তৈয়ার। এইবারে একবাটি সর্ষের তেল এনে দেন দেবুভাই। গায়েপায়ে ডলে নিই। যে ঠান্ডা জল!’

কুয়াশার ফাঁক দিয়ে প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছে জলের বুকে। ঊরু অবধি উঁচিয়ে কাছা দিয়ে গামছা পরা ছ’জন মানুষ পুকুরের দূরের পাড়ে প্রস্থ বরাবর জাল হাতে জলে নেমেছে। ওপরদিকে মোটা মোটা থার্মোকলের টুকরো আর তলায় বাঁধা ভারী আধলা ইটের বিপরীতমুখী টান জালটাকে সোজা করে ধরে রেখেছে জলের মধ্যে।

খাড়াই মৃত্যুর সেই দেওয়ালটাকে হাতে ধরে ছ’জন শিকারী পুকুরের জল বেয়ে ধীরে ধীরে অর্ধবৃত্তাকারে এগিয়ে আসে এ-পাড়ের দিকে। খানিক দূর এগোবার পর তাদের চলনের ঢঙে বদল এল। পদক্ষেপের ঝাঁকুনি দেওয়া অমসৃণ অগ্রগতির বদলে জলের ওপর ভেসে থাকা মাথাগুলির গতি এবারে মসৃণ। তার মানে গভীর জলের এলাকায় এসে পড়েছে শিকারিরা। পায়ের তলায় মাটি নেই আর। এইবারে জাল হাতে এগোনোর সময় সামনের দিকে।

জলচারী জীবেরা আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। বারে বারে মৃদুমন্দ খলবল করে উঠতে থাকে জালে ঘেরা জল। মাঝপুকুর পার হয়ে এপাড়ের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে এবারে শিকারীরা অর্ধবৃত্তটিকে ক্রমশই একটা ছোট পূর্ণবৃত্তের চেহারা দিতে শুরু করল। আর, ততই বেড়ে চলল, জালঘেরা জলের ভেতর ঘাইয়ের দাপট। অবশেষে এপাড়ের কাছাকাছি এসে একেবারে ছোট হয়ে গিয়ে জালের বৃত্তটা সম্পূর্ণ হল। মানুষ ছ’জন একে অন্যের চেয়ে বড়জোর দু’তিনহাত দূরে দূরে এখন। তাদের হাতে জালবাঁধা জল যেন ফুটছে টগবগ করে। মাঝে মাঝে ব্যর্থ প্রতিবাদে জল ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে একখণ্ড রুপোলি বিদ্যুৎ, আর তারপর ফের আছাড় খেয়ে পড়ে জালঘেরা জলেরই মধ্যে।

‘শোনো অনিলদা। মাছ কিন্তু বুঝেশুঝে তুলবে। দু’সেরের নীচে মাছ আমি বেচব না। ওতে লাভ নাই।’

হাতে ধরা লাফাতে থাকা রুইয়ের পোনাটা জালের বাইরের জলে ছুড়ে ফেলে দিল অনিল। এটা আরো বাড়বে। অনিল মনে মনে ভাবল, দেবুভাইয়ের কথাটা ঠিকই। চারা মাছ বেচে লাভ নাই। অবশ্য দেবুভাইকে তো আর মাছ-বেচা টাকায় সংসার চালাতে হয় না, যে ছোটবড় যা মাছ পেলাম তাই তুলে নিয়ে বেচে দিতে হবে! ইস্কুলে মোটা মাইনে পাচ্ছে, ওদিকে খাওয়ার মুখ তো কুল্লে দুটি!

অপেক্ষাকৃত ছোট রুইকাতলার পোনাগুলো তুলে বাইরের জলে ছুড়ে দিতে দিতে সে জিগ্যেস করে, ‘বাটা আর তেলাপিয়াও পড়েছে কিছু। সের কয়েক হবে। সেগুলো কী করব?’

‘তুলে নাও। ও আর বেচব না। এবাড়ি-ওবাড়ি বিলোতেও হবে। তোমরাও নিয়ে যেও খানিক।’

বেলা চড়ছে। কুয়াশার শেষ সুতোগুলো এখনো ওপারের আমবাগানের মাথায় লটকে আছে ইতিউতি। জাল-বাঁধা মাছের দল পাড়ে তুলে এনে মাটিতে ফেলা হয়েছে। আলাদা আলাদা ভাগ করে রাখা হচ্ছে নানা জাতের মাছ। গন্ধ পেয়ে কাক এসে জুটেছে অনেক। বেড়ালও এসেছে গুটিকয়। জেলেরা তাদের গালও দেয় যেমন, তেমনি মাঝে মাঝে ছুড়ে দেয় গুগলি কিংবা ছোট ছোট মাছ। ওরাও ভাগ পাক কিছু! সব মিলিয়ে যেন উৎসব জমেছে আজ দেবুর পুকুরধারে।

দেবু এবার উঠে পড়ল। বেলা বাড়ছে। এইবারে গিয়ে কাজ নিয়ে বসতে হবে। কিছু চিঠিপত্রও লেখবার আছে। এ-বেলার মধ্যে সেগুলো সেরে রাখা দরকার। পোস্টমাস্টারবাবুর আজ বাড়ি যাবার কথা। দুপুরের বাসে মালদা টাউন বেরিয়ে যাবে। শনি রবি বাড়িতে কাটিয়ে একেবারে সোমবারে ফেরে। চিঠিগুলো তার হাতে করে জেলা পোস্ট অফিসে ফেলিয়ে দিতে পারলে ভালো হয়। তাড়াতাড়ি পৌঁছোবে।

‘আরে আরে মাস্টারভাই, যাও কোথায়?’ অনিল চিৎকার করছিল পেছন থেকে, ‘দাঁড়িয়ে থেকে মাছের বিলিবন্দোবস্তটা করে দিয়ে যাবে তো, না কি?’

‘ঘরে যাচ্ছি। বেচবার মাছ যা হয় মেপেজুপে নিয়ে যাও। যা পাওনা হয়, দুপুরে মিটিয়ে দিয়ে যেও মা’র কাছে। আর বিলোবার মাছের হিসেব-টিসেবও মার সঙ্গেই করে নিও। ও আমি তত বুঝব না।’ বলতে-বলতে নারকেলগাছের গুঁড়ির তৈরি পিছল সিঁড়িতে সাবধানে পা ফেলে জলের একেবারে কাছে নেমে গেল দেবু। মুখটা এবারে ধুয়ে নিতে হবে।

ঘুলিয়ে ওঠা জল এখনো থিতু হয়নি। অবশ্য তাতে অসুবিধে নেই কিছু। জলে মাটির গন্ধ তার ভালোই লাগে। মৃদু কম্পমান জল থেকে তার মুখের আঁকাবাঁকা ভাঙা প্রতিচ্ছবিটি তার দিকে চেয়ে থাকে। সেইদিকে চেয়ে মজা লাগছিল দেবুর। দাড়িগোঁফের জঙ্গলে ভরা হনু উঁচু হয়ে থাকা তীক্ষ্ন চোখের ওই মুখটা কি সত্যিই তার!

বহিরঙ্গ বদলে যায়। অন্তরে মানুষটা সেই একই থাকে। একই সুখ-দুঃখ, একই ভালোলাগা, ভালোবাসা, একই আনন্দবেদনার স্মৃতি সব। অথবা, সত্যিই কি একই থাকে?

হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে আঁজলা করে জল তুলে নিয়ে চোখমুখ ধুয়ে নিল সে। মুখের ভেতর পুকরের মাটিমেশা সোঁদা জল আর নিমের তিক্ত, সুগন্ধি রসের মিশ্রিত স্পর্শ। আর একটা নতুন দিন! আর একটা নতুন চ্যাপ্টার!

.

মা উঠে পড়েছিল। ঘরটর পরিষ্কার করে রান্নাঘরে গিয়ে চা বানিয়ে ফেলেছে। সসপ্যানের ডাঁটিটা আঁচলে জড়িয়ে ধরে চা ছাঁকছে কাপে। দেবুকে দেখে বলল, ‘চলে এলি যে? অনিলরা এসে গেছে?’

‘এসে গেছে মানে? জালের কাজ শেষও হয়ে গেল! মাছ গোছানো শুরু করিয়ে দিয়ে এসেছি একেবারে। একটু কাজ আছে।’

‘কাজ পরে হবে,’ সুনন্দা মাথা নাড়লেন, ‘চায়ের কাপগুলো একটা থালায় বসিয়ে দিচ্ছি। মুড়ি বের করে রেখেছি। বাতাসাও আছে। দিয়ে আয় গিয়ে। খেয়ে নিক। কোন শেষরাত থেকে কাজে এসেছে!’

দেবু কোনো উত্তর না দিয়ে একটা চায়ের কাপ তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।

‘ও কী রে? কথা নেই বার্তা নেই, নিজের কাপটা তুলে নিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলি যে বড়? মাছের মতো মাছ পড়ে রইল পুকুরধারে, সব কিছু পরের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজে গিয়ে কলম নাড়তে বসলি। এখন লোকগুলোকে চা-মুড়ি দিতে এই বুড়ি যাবে নাকি? এখন এই বুড়ো বয়সে এসে কী যে এক লেখাপড়ার রোগ হয়েছে তোমার! যে-বয়সের যেটা সাজে সেটা করে কোথায় বুড়ি মাকে একটু রেহাই দিবি তা নয়।’

‘বলেন, বলেন, ঠাকরোন, ভালো করে বলেন দেখি!’ অনিল গজগজ করতে-করতে এদিকে আসছিল, ‘মাছগুলো কোথায় সামনে দাঁড়ায়ে বুঝে-সুঝে নিয়ে বিলিব্যবস্থা করবে, তা নয়, হঠাৎ এক লাফে সবকিছু ফেলে ছড়িয়ে রেখে চলে এল। এখন যা পারো তা এই অনিল সামলাও। তারপর হিসেব বুঝিয়ে দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস। ‘অনিল এটা এমন কী করে, অনিল ওটা তেমন কী করে,’ হ্যানা ত্যানা দশ ঝামেলা! গেলবারেও ঠিক ওমনি করেছিল দেবুভাই।

‘না মা, এবারে আর সেটি হবে না। ছেলে না করল, বয়েই গেল। মা’ই সই। আসেন দেখি আমার সাঙ্গে, বড় মাছক’টা পাল্লায় মেপেজুপে দেখিয়ে দিই একবার! তারপর ছোটমাছগুলো ক’ভাগায় কোন কোন বাড়ি বিলি হবে সেসব একটু বলে দিয়ে যাবেন।’

সুনন্দা মাথার ঘোমটাটা একটুখানি টেনে দিয়ে বললেন, ‘কপালের ভোগ। কী আর করব বাবা, সেই আমাকেই যা করার করতে হবে। তিনি তো গিয়ে ঘরের ভেতর চেপে বসেছেন। তা ও অনিল, অতদূর আর যেতে-টেতে পারব না বাবা এখন। রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। ছেলে বেরোবে তার রান্না চাপেনি এখনো। মুড়িবাতাসা বের করে রেখেছি ওই দেখো। তুমি বরং এই চায়ের কাপ ক’খানা আর মুড়িগুলো নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে পেটভরে খেয়ে নাও আগে, তারপর মাছটাছ যা আছে এই উঠনে এনে নামাও, আমি দেখে দিচ্ছি।’

‘সে আমি ওদের বলেই এসেছি। বয়ে আনছে সব এদিকে। তবে, কপালের ভোগ কথাটা আপনি ঠাকরুন বলেছেন ঠিকই। সক্কাল-সক্কাল উঠে কোথায় ভগবানের নাম নেবেন, তা না, মাছের ব্যাবসা করতে বসা। বলি কি, ওই তো আধা-সন্নিসি ছেলে আপনার। নিজে আর কত ভূতের ব্যাগার দেবেন? এইবারে দেখেশুনে একটা ছেলের বউ আনেন দেখি ঘরে! যার জিনিস সে এসে সবকিছু বুঝে নিক!’

সুনন্দা মাথা নাড়লেন, ‘সে তোমরাই পারলে সবাই মিলে বুঝিও বাবা। আমার কথা কান পেতে মোটে শুনলে তো!’

 ঝুড়িতে করে মাছগুলো ততক্ষণে এনে স্তূপ করে রাখা হয়েছে সামনের উঠোনে। সুনন্দা তাড়াতাড়ি চায়ের থালা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আগে খেয়ে নাও বাবারা। একটু হাত চালিয়ে নিয়ে নাও সব। আমি ততক্ষণে মাছটাছগুলো একটু দেখে নি।’

 চা খাওয়া শেষ হতে মাছ ওজন করে দেখিয়ে দিয়ে অনিল বলল, ‘ছোট মাছ ক’ভাগায় কোন কোন বাড়ি যাবে বলেন তো ভাগযোগ করে রেখে যাই একেবারে। আপনাকে আর আঁশ ঘাঁটতে হবে না। কাউকে দিয়ে ধরে পাঠিয়ে দিলেই হল।’

সুনন্দা একটু বিরক্ত মুখে বললেন, ‘না বাবা। অত বাড়ি-বাড়ি বয়ে মাছ বিলিয়ে আসব, বাড়িতে কি আমার দশটা দাসদাসী আছে? বাড়ির পুকুরে জাল দিচ্ছি সে-কথা তো অজানা কারো নেই। যার নেবার সে পায়ে হেঁটে এসে নিয়ে যাবে। শুধু সেরখানেক বাটা, আর উ-ই উ-ই বড় মিরগেলটা সাধুর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যেও যাবার পথে।’

অনিল লোভী লোভী চোখে বাটা তেলাপিয়ার স্তূপদুটোর দিকে দেখতে-দেখতে বলে, ‘সবটা মাছ যদি বিলিয়ে শেষ না হয় মা?’

‘ভালো বলেছ বাবা। কে কতটুকু আসে আর নেয় তার তো ঠিক নেই। তুমি বরং পাইকারের কাছে বড় মাছগুলো পৌঁছে ফেরার পথে আরেকবার এ-বাড়ি হয়ে যেও। টাকাও মিটিয়ে দিয়ে গেলে, আর সেইসঙ্গে, বিলিয়ে টিলিয়ে ছোটমাছ যদি বাকি কিছু পড়ে থাকে তো ওমনি হাটে নিয়ে বেচেও দিয়ে এসো। আজ তো মঙ্গলবার! হাট আছে। টাকায় চল্লিশ পয়সা তোমার থাকবে, বাকিটা আমার।

রুই কাতলার ঝুড়িগুলি ধরাধরি করে ভ্যানরিকশায় তুলে রওনা হয়ে গেল অনিলরা। বেরোবার মুখে সুনন্দা আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন, ‘দাঁড়ি নিয়ে আসতে ভুলো না যেন বাবা। ছোট মাছ যদি কিছু নিয়ে যেতে হয়, মেপে নিয়ে যেতে হবে তো!’

‘ভুলব না ঠাকরুন। দাঁড়ি নিয়েই আসব।’ ভ্যানের পেছন দিকে লাফ মেরে উঠতে-উঠতে অনিল হাঁক ছাড়ল। তারপর গলা নীচু করে তার সঙ্গীটিকে বলল, ‘বুড়ির হিসেব দেখেছিস বটা? পাইপয়সাটি অব্দি ছাড়বে না।’

‘তা সে ভালোই করে গো দাদা। নইলে ওই ব্যোমভোলা ছেলের পরনের কাপড়টা অব্দি বারোভূতে লুটে খেত যে!’

‘সে তো এখনো খাচ্ছে। ইশকুলে পড়িয়ে যা উপায় করে তার বেশিটাই তো চলে যায় গৌরীহরের আশ্রমে। ইশকুলে পড়িয়ে আশ মিটছে না এখন আশ্রম খুলেছে আবার।’

‘খারাপ করেছে নাকি?’

‘দূর তাই বলেছি নাকি? কাজটা তো ভালোই। কিন্তু বলি, ওসব করে হবেটা কী?’

‘সে অতশত জানি না। পড়ালেখা জানা ভদ্দরলোকের খেয়াল। সে-সব তোমার আমার মতো মানুষের বোঝার সাধ্যিই বা কী, আর দরকারই বা কী? তার চে বিড়ি ধরাও দেখি একটা! গা হাত-পা কালিয়ে উঠেছে একেবারে!’

.

.

বাইরে থেকে কথাবার্তার শব্দ কমে এসেছে এতক্ষণে। রান্নাঘর থেকে আওয়াজ উঠছে। মাঝেমাঝে পরিচিত গলার শব্দ। মাছ নিতে এসেছে পাড়ার কেউ। মৃদু গলায় কিছু কথাবার্তা, তারপর ফের চুপচাপ। বারবার কান চলে যাচ্ছিল সেইদিকে। একটু জোর করেই প্রায় উল্টোপাল্টা চিন্তার সুতোগুলোকে সরিয়ে দিল দেবু। চিঠিপত্রগুলো হয়ে গেছে। এবারে লেখাটার দিকে মন দেওয়া প্রয়োজন।

আসলে এই লেখাটা তৈরি হচ্ছে তার বিশেষ একটা তাগিদ থেকেই। এই গ্রামে তার মাস্টারির বয়স বছর ছয়েকের বেশি হয়ে গেল। ছ’টা মাধ্যমিকের ব্যাচ। কম নয়! ক্লাসরুমের সারি-সারি বোধহীন, কৌতূহলহীন চোখের দিকে চোখ রেখে মাসের পর মাস জীবনের সঙ্গে যোগসূত্রহীন কিছু শিক্ষা দিতে দিতে বড় ক্লান্ত ঠেকে তার। ঈশ্বরপুর বাদেও সুকান্তনগর, ভরগ্রাম, গৌরীহর, জামাতপুর ও এইরকম আরো কয়েকটি গ্রাম থেকে ছাত্র আসে এই নিবেদিতা বিদ্যাপীঠে। ট্রাইবাল ছেলেও আসে অনেক। তারা কিছু স্টাইপেন্ডও পায় সরকারের তরফ থেকে। সেই টাকাটা তাদের স্কুলে আসবার প্রধান কারণ। তাছাড়া সম্পন্ন কৃষক পরিবারের ছেলেও কিছু আছে। স্কুলপাঠের ছাপটুকু নিতেই কেবল তাদের আসা। সেটাই ফ্যাশান। প্রকৃত জীবনধারণের শিক্ষা তাদের চলে চাষের মাঠে, হাটের দোকানঘরে, জেলের নৌকায়, অথবা সেইরকমই বহুতর কর্মক্ষেত্রে। তার বিস্তারিত জ্ঞান দেবুর নেই।

বৃত্তিমূলক সেই প্রকৃত শিক্ষার ক্ষেত্রে দেবুমাস্টার অথবা তার মতো কোনো শহুরে শিক্ষায় শিক্ষিত মাস্টারমশাইয়েরই কোনো ভূমিকা নেই। তারা শুধু দিনের পর দিন ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে অক্ষরপাত করে চলে চেঞ্জ ইনটু প্যাসিভ ভয়েস, ‘রাম কিলড রাবণ।’ অথবা ভ্যানিশিং মেথডে ফ্যাকটরাইজেশান। সারি-সারি মুখগুলো ঠান্ডা চোখে চেয়ে থাকে শুধু। কোনো এক অজ্ঞাত নগরের ততধিক অজ্ঞাত সরকারের ইচ্ছায় এই স্কুলবাড়িতে এসে প্রতিদিন কয়েকঘণ্টা কাটালে মিলে যেতে পারে একখণ্ড কাগজে ছাপা ‘মাধ্যমিক পাশ’-এর তকমা, সেইসঙ্গে বৎসরান্তে নগদ স্টাইপেন্ড, দুপুরবেলায় খানিক গরম খাবার। যে দু’তিনটি ছেলেমেয়ের মধ্যে বিন্দুমাত্র আলো আছে তারা এই শৈশব থেকেই ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছে, প্রথম সুযোগেই উড়ে যাবে এখনও অজ্ঞাত নগরজীবনের বহুবর্ণ প্রেয় আশ্রয়ে।

কাগজের ওপর দ্রুত কলম চলে তার। ‘শিক্ষা হবে চলমান ও জীবন অনুসারী। ছাত্রের পরিচিত পরিমণ্ডলে, তার দৈনন্দিন জীবনচক্রের অংশ হয়ে চলতে হবে শিক্ষাকে। তবেই ছাত্রের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আসবে, নচেৎ নয়। যে-কোনো বয়সের মানুষই ছাত্র হতে পারেন, কারণ ছাত্রত্বের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। রিসেপটিভিটি বা গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করে বিষয়টি ছাত্রের কাছে কতটা প্রয়োজনীয় তার ওপরে, ছাত্রের বয়সের ওপর নয়।’

‘হ্যাঁ রে দেবু, আজ সকালে বেরিয়ে যাবি বললি যে কাল রাতে, তা যাবি কখন?’

সুনন্দা রান্নাঘর থেকেই ডাকছিলেন। দেবু পাশে পড়ে থাকা হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে একটু নড়ে চড়ে বসল। কখন যে সাড়ে ন’টা বেজে গেছে খেয়ালই করেনি সে। দশটা নাগাদ বিশ্বনাথ নিতে আসবে। অনেকটা পথ যেতে হবে।

‘তুমি ভাত বাড়ো মা, আমি একটা ডুব দিয়ে আসছি,’ খাতাপত্র বন্ধ করে লাফ দিয়ে উঠে আলনার থেকে গামছাটা টেনে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এল সে। তারপর তেলের বাটি থেকে এক খাবলা তেল নিয়ে গায়ে পিঠে মেখে নিয়ে ডলতে-ডলতেই ছুটল পেছনবাড়ির ডোবাটার দিকে।

তার ছুটন্ত শরীরটার দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন সুনন্দা। রোগাটে কিন্তু দৃঢ়বদ্ধ চেহারা। রোদে পুড়ে তামাটে কিন্তু মসৃণ ত্বক। লম্বা একহারা চেহারার ছেলেটা তাঁর ছুটছে। একা একাই এগিয়ে যাচ্ছে সামনে।

থালায় ভাত বেড়ে একটা ঝুড়ি দিয়ে সেটা ঢেকে রেখে রান্নাঘরের দরজায় শেকল তুলে দিয়ে এ ঘরে এলেন সুনন্দা। আজ বিছানা তোলা হয়নি দেবুর ঘরের। মশারিটা খুলে ভাঁজ করে রেখে এলোমেলো বিছানাটাকে হাত দিয়ে থাবড়ে ঠিক করছিলেন তিনি। ভারি অগোছালোভাবে থাকে দেবু। বই ছড়িয়ে আছে চারদিকে। সিগারেটের পোড়া টুকরো, খালি দেশলাইয়ের খোল, তাল করে রাখা বাসি পাঞ্জাবি পাজামায়, চাদরে ঘরটা ছন্নছাড়া হয়ে আছে। দ্রুত হাতে সেগুলো পরিষ্কার করে নিয়ে তোশকটাকে গুটিয়ে তুলে নিলেন তিনি। একটু ঝেড়ে দেওয়া দরকার। তোশকের নীচেও সেই রাজ্যের টুকরো কাগজ আর পলিথিনের প্যাকেটের ভিড়।

ঝেড়েঝুড়ে সেসব ফেলতে গিয়ে হঠাৎ হাতে একখণ্ড রঙিন কাগজ উঠে আসতে একটু থমকে গেলেন সুনন্দা। বিবির ছবি একটা! বিবি! শত আবর্জনার অবজ্ঞা ও বিস্মরণের অন্তরালেও বুকের ঠিক নীচে মেয়েটার ছবিটা এখনও ধরে রেখেছে ছেলেটা!

বুকের ভেতর একটা মোচড় দিয়ে উঠল সুনন্দার। কী যে হল দুজনের মধ্যে হঠাৎ করে! বলে না তো মুখে কিছু কোনোদিন! দুজনের বিদেশ চলে যাবার সব ঠিকঠাক। দু’বাড়িতে কথাবার্তা সব পাকা। দেবুর ইস্কুলে নোটিশ দেওয়া, নতুন জায়গায় কাজে জয়েন করবার তারিখ, পাশপোর্ট, ভিসা সব তৈরি; রেজিস্ট্রির জন্য দিনও দেখা হয়ে গিয়েছিল। যাবার তারিখের ক’দিন আগে পুজোর সময় মেয়েটা ঈশ্বরপুরে এসে থেকেও গেল ক’দিন। আর তারপরেই কোথায় যে কী হল, মেয়েটা কলকাতা ফিরে যাবার পরদিন দেবু হঠাৎ দুম করে বলে বসল, সিঙ্গাপুরের চাকরিটা ও নেবে না। সুনন্দা শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এখানকার চাকরিটাতেও নোটিশ দিয়ে দিয়েছিস যে!’

‘সে আমি সামলে নেব ঠিক। নোটিশ উইথড্র করে নিলেই হবে। তুমি ভেবো না। ঈশ্বরপুর ছেড়ে আমি যাব না মা।’

‘আর বিবি? সে-ও যাবে না নাকি?’

দেবু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলেছিল, ‘ঠিক জানি না মা। যেতেও পারে।’

‘একা?’

‘সে-সব কথা আমি কোত্থেকে জানব?’ ঝাঁঝিয়ে উঠে জবাব দিয়েছিল দেবু।

ছেলের গলায় আসন্ন ঝড়ের সংকেত পেয়ে তখনকার মতো থেমে গিয়েছিলেন সুনন্দা। কথা বাড়াননি। আন্দাজ করেছিলেন, মান অভিমান কিছু একটা ঘটেছে। তারপর সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ফের একবার চেষ্টা করেছিলেন এসে, ‘মেয়েটা যে গেল, পৌঁছে সংবাদ দিয়েছে?’

দেবু উত্তর না দিতে বলেছিলেন, ‘ফোনটা দে। আমি একবার খোঁজ নিই।’

জবাবে একটু অপ্রস্তুত মুখ করে দেবু বলেছিল, ‘ফোনটা কোথায় যে দেব?’

আর কিছু বলেননি সুনন্দা। তবে দেবুর থমথমে মুখটা, তার এই হঠাৎ সিদ্ধান্তবদল, এই সবকিছু মিলেই তাঁকে একটা সাবধানবাণী দিয়েছিল, বিষয়টা সম্ভবত জটিল। এ দিগরে ফোনটোনের চল নেই বিশেষ। সাধুর বাড়িতেও ওসব পাট নেই। খুঁজলে পাওয়া যায় অবশ্য, মেয়েমানুষ কোথায় গিয়ে সে-সব খুঁজবেন? ফলে সে-মুহূর্তে ব্যাপারটা নিয়ে আর না ঘাঁটিয়ে, ভেবেছিলেন দু’পক্ষ একটু থিতিয়ে গেলে তারপর শীতের সময় কলকাতায় গিয়ে একটা মিটমাট করিয়ে দেওয়া যাবে।

কিন্তু দেবু গিয়ে কলকাতায় থাকলে তবে তো! বড়দিনের ছুটিতে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে তাঁকে রেখে দিয়ে ফের সেদিনই ফিরে এল ঈশ্বরপুরে। সকালের বাসে গিয়েছিল। বিকেলের দিকে বাড়ি পৌঁছে ফের রাত্রের গৌড় ধরল শেয়ালদা থেকে। সুনন্দা চেয়েছিলেন অন্তত দিনচারেক থেকে যাক দেবু। কিন্তু তাঁর কথায় তো থোড়াই কেয়ার! ইন্দ্র আর রমা এত করে বলল, বাপ্পাকে দিয়েও বলালো, যদি ভাইপোর কথায় রাজি হয়, কিন্তু কে শোনে কার কথা! একটা রাতও রইল না।

অবশ্য থাকলেও যে বিশেষ লাভ বিশেষ কিছু হত, তা নয়। সেদিন সন্ধেবেলাই বিবিদের হাতিবাগানের বাড়িতে ওর বাবাকে ফোন করেছিলেন সুনন্দা। সুধীর চাটুজ্জে জানালেন, বিবি নভেম্বরের মাঝামাঝি সুমিতের কাছে সিঙ্গাপুরে চলে গিয়েছে। ওখানে ইউনিভার্সিটির পিএইচডি প্রোগ্রামে জয়েনও করে গিয়েছে। ওর মা গিয়েছেন সঙ্গে। সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে-গাছিয়ে দিয়ে ফিরে আসবেন। সুমিত নাকি বলেই দিয়েছে, এখন থেকে বোনের সব দায়দায়িত্ব তার।

ভদ্রলোক নিজেই তখনো বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কী করে কী হল তার খোঁজ দেবার জায়গায় উল্টে সুনন্দাকেই বার বার জিজ্ঞাসা করেছিলেন অসহায়ভাবে, ‘কী হয়েছিল দুজনের ভেতর বলুন তো দিদি?’

তাঁর কাছেই জানা গিয়েছিল, ঈশ্বরপুর থেকে ফিরে দু’একদিন একেবারে চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল বিবি। ও-সময়টা সে বারবার নাকি ফোনও করেছে দেবুকে। লাইন পায়নি। তারপর সুমিতের সঙ্গে ক’দিন চিঠিপত্তর লেনাদেনা করে সিঙ্গাপুরে চলে যায়।

তারপর খানিকক্ষণ একথা সেকথা করে ফের পুরোন কথায় ফিরে এসেছিলেন সুধীরবাবু, ‘আপনি তো দিদি ওদের সঙ্গেই ছিলেন পুজোর ক’টা দিন। আপনি কিছু জানেন না? কিছু বলেনি আপনাকে?’

একটু লজ্জাই লেগেছিল সুনন্দার। সত্যিই তো! একেবারে সামনা-সামনি থেকেও কিছুই বুঝতে পারেননি তিনি। তার সঙ্গে-সঙ্গে অবুঝ একটা অভিমানও গড়ে উঠেছিল দেবুর ওপরে। কী এমন ঘটেছিল যে নিজের মাকেও একবার মুখ ফুটে বলতে পারলি না? জানতে পারলে চেষ্টা তো একটা করতে পারতাম অন্তত।

তার পর থেকে, এই পাঁচটা বছর ধরে এই একটা ব্যাপারে একেবারে নীরব থেকেছে দেবু। এমনিতে কথার ঝুড়ি। ইশকুল নিয়ে, তারপর গৌরীহরে কী এক শিক্ষাশ্রম বানিয়ে কাজকর্ম শুরু করেছে সেইসব নিয়ে মুখে হাজারটা কথা লেগেই আছে। শুধু ওই একটা ব্যাপারে কিছু জিগ্যেস করলে ঠোঁটে সেলাই। সুনন্দাও দু’একবার জানবার চেষ্টা করে শেষমেশ থেমে গিয়েছেন। কী হবে? নিজের মতো করে ভালো থাকে যদি, থাক!

দেবুর গলা পাওয়া যাচ্ছিল। ভেজা গায়ে গুনগুন করে গান গাইতে-গাইতে ফিরছে। সুনন্দা তাড়াতাড়ি ছবিটা ফের যথাস্থানে রেখে তোশকটা ঝেড়েঝুড়ে তার ওপর পরিষ্কার চাদর পেতে দিলেন একটা।

‘মা, ভাত দিয়েছ?’ বারান্দায় উঠেই হাঁক দিল দেবু।

‘বারান্দায় প্যান্টশার্ট রাখা আছে। পরে নিয়ে খেতে বোস গে। ভাত ঢাকা দেওয়া আছে। আমি তোর ঘরটা গুছিয়ে রেখে আসছি।’

.

‘ঝিঙেপোস্ত আর একটু দেবো?’

‘দাও। ডালও দিও আর একটু।’

‘ডাল আবার নিবি কেন? মাছ হয়েছে তো আজ।’

‘তুমি আবার মাছটাছ রাঁধতে বসলে কেন? খেতে-খেতেই মুখ তুলে চাইল দেবু, ‘আঁশ ঘেঁটে এই ঠান্ডার মধ্যে এখনই তো আবার গিয়ে স্নান করবে। ঠান্ডা বুকে বসলে তখন সামলাবে কে?’

‘কেন তুই! তুই আছিস কী করতে?’

দেবু একটু অস্বস্তিভরা গলায় বলল, ‘না মানে, দিন দুই থাকব না তো! তাই।’

‘তাই মায়ের শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে খোঁজ পড়েছে। এই বাউণ্ডুলেপনা করে তুই নিজের সব শেষ করবি একদিন। তা, এবারে কোন রাজকার্যে যাওয়া হচ্ছে, তা জানতে পারি কি?’

দেবু হাসল, ‘যাবার জায়গা তো সেই একটাই মা। গৌরীহর আশ্রম। আর রাজকার্যটাও তুমি বেশ জানো। আমার রিসার্চটা নিয়ে তো তোমায়…’

‘রক্ষে করো বাবা। ও নিয়ে আর কিছু শুনতে চাই না এখন। তোমাদের মতো অত দিগগজ পণ্ডিত যদি হতাম তাহলে কি আর এই ঘরসংসার হত, না তোমরা পৃথিবীর আলো দেখতে? হাটে ঘাটে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে রিসার্চ হচ্ছে। লোকে তো দেখি ওই কম্ম করতে দেশ ছেড়ে বিদেশ যায়। আর তুমি!’

‘উফ মা, তুমি থামবে? ভালো মনে বলতে গেলাম মাছ রাঁধলে তোমার ঝামেলা বাড়ে তো রাঁধতে গেলে কেন, তার জন্য একঝুড়ি কথা শুনিয়ে দিলে। যে কাজটা আমি এইখানে শুরু করেছি সেটা এদেশের মাটি ছাড়া…’

‘থাক। অত ব্যাখ্যান দিতে হবে না, আর আমার ঝামেলা নিয়ে মাথাও ঘামাতে হবে না তোমার,’ বলতে-বলতে সুনন্দা পাশের তাকে ঢাকা দিয়ে রাখা বাটিদুটোর দিকে দেখিয়ে দিলেন, ‘সাধুর বাড়ি মাছ পাঠিয়ে দিয়েছিলাম সকালে। তাই থেকে সীতা দু’পদের রান্না করে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওই বটিতে আছে। খেয়ে আমায় উদ্ধার করো। যে চুলোয় যাচ্ছো সেখানে খাবারদাবারের যে কী ছিরি সে তো আর জানতে বাকি নেই—’

বিশ্বনাথ এসে সিঁড়ির নীচে সাইকেল দাঁড় করাচ্ছিল। সেখান থেকেই জবাব দিল, ‘গতমাসের কথা মনে করিয়ে আর লজ্জা দেবেন না মাসিমা। কিন্তু এই যাত্রা আর কিছুতেই গৌরীহরের বদনাম হতে দেব না। এ যাত্রা স্যার পাঁচ কেজি ওজন বাড়িয়ে না ফিরলে আমায় বলবেন। আমি জামিন রইলাম।’

‘হ্যাঁ সে তো রইলেই বাবা। শুঁড়ির জামিন মাতাল! এখন গুরু-শিষ্য মিলে রোদে-রোদে ঘোরো গে যাও। হ্যাঁ রে বিশু, অত ভালো রেজাল্ট করলি মাধ্যমিকে, তার পর পড়াশোনাটা ছেড়ে দিলি কেন?’

বিশু দাওয়ায় উঠে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একগাল হাসল, ‘ছাড়িনি তো মাসিমা! সবসময়ই পড়ি তো! এই দেখেন সঙ্গে বই রয়েছে।’ বলেই বিশ্বনাথ একখণ্ড বই তার ঝোলার ভেতর থেকে বের করে এনেছে। কালী ভট্টাচার্যের চিরঞ্জীব বনৌষধি।

‘কবিরাজি শিখছিস?’

‘না না মাসিমা, তত বুদ্ধি আমার নেই। তবে কি না গাঁ-গঞ্জে বাস, হুট বলতে তো আর বড় হাসপাতালে যাবার উপায় নেই! হেলথ সেন্টারগুলোর হাল তো জানেনই। তাই একটু গাছপালা চিনে রাখা আর কি! কখন কী কাজে লেগে যায়!’

দেবুর খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। থালাতেই হাত ধুয়ে উঠে বারান্দার দেওয়ালের হুক থেকে তার ঝোলাটা তুলে নিল কাঁধে।

‘যাবি কীসে তোরা?’ সুনন্দা এঁটো থালাবাসন গোছাতে-গোছাতেই জিজ্ঞাসা করলেন।

‘নৌকোয়। ভাটায় ভাটায় যাব। বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।’ উঠোনে নেমে এসে বিশ্বনাথের কাঁধে হাত দিয়ে দেবু বলল, ‘চল রে।’

‘নিজের দিকে একটু খেয়াল রাখিস। আর পারলে গৌরীমন্দিরে একটা পুজো দিয়ে প্রসাদ নিয়ে আসিস।’

‘দেবো, দেবো। এখন বেরোই তো আগে! ওদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

বিশ্বনাথের পেছনে সাইকেলের কেরিয়ারে চেপে বসেছে দেবু। তারপর সদর দিয়ে বেরিয়ে বেড়ার ওপর দিয়ে ফের হাঁক মেরে বলে, টেবিলের ওপর চারটে চিঠি আছে। কাউকে দিয়ে পোস্টমাস্টারবাবুর কাছে পাঠিয়ে দিও মনে করে। ভুলো না।’

‘না, ভুলব না। তোমার দাসীবৃত্তি করেই বাকি জীবনটা কাটবে আমার এ আমি বেশ বুঝতে পারছি।’ নীচু গলায় গজগজ করছিলেন সুনন্দা। দিন দিন এ ছেলে হিসেবের বার হয়ে যাচ্ছে তাঁর।

.

‘আসুন স্যার। পৌঁছে গেছি। নামতে হবে।’ বিশ্বনাথ নীচে নেমে হাত বাড়িয়ে রেখেছিল। বাঁধানো ঘাট। ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের দিকে। রোদের তেজ আছে বেশ। শার্টের ওপর থেকে চাদরটা খুলে ফেলতে হয়েছে এবারে।

নৌকা থেকেই গৌরীমন্দিরের প্রাচীন ভাঙাচোরা চূড়া দেখা যাচ্ছিল। গৌরীহর গ্রামে বসতিকে অনুসরণ করে মন্দির গড়ে ওঠেনি। মন্দিরকে ঘিরে একদা নির্জন বনাঞ্চল পরিষ্কার করে গড়ে উঠেছে গ্রাম।

 সুরেন বিশ্বাস ঘাটে অপেক্ষা করছিলেন। দেবুকে দেখে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন নীচে। প্রৌঢ় মানুষ। তবে এখনও ঋজু। এখনও কর্মক্ষম।

‘আসেন দেবুভাই। সব কুশল তো? মা জননীর সংবাদ কুশল?’

‘হ্যাঁ বিশ্বাসমসশাই।’ বিশ্বনাথের হাতটা ধরে টলমলে নৌকার গলুই থেকে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে দেবু জবাব দিল, ‘ভালোই আছে সব। এ দিককার খবরটবর কী?’

‘চলেন। নিজের চোখেই দেখবেন সব। আমাদের কাছে খবর তো ভালো। এখন আপনার চোখ কী বলে দেখি!’

‘চলেন তবে। বিশু সাইকেল নামাও।’

‘আরে বলেন কী?’ শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন সুরেন বিশ্বাস, ‘যাবেন, তাই বলে এক্ষুনি? তেতেপুড়ে এলেন, বাড়ি চলেন আগে। একটু বিশ্রাম করে নেন। হাতেমুখে জল দিয়ে দুটি সেবা করেন। তারপর রোদ পড়লে না হয় যাবেন। খেত, পুকুর, ইস্কুল তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না কোথাও!’

দেবু মাথা নাড়ল, ‘না না, খেয়েই বেরিয়েছি তো বাড়ি থেকে।’

‘আহা সে বললে কি হবে? বাড়িতে সব তৈরি হয়েই আছে। শুধু আপনাকে নিয়ে গিয়ে পড়বার অপেক্ষা। এখন চলেন দেখি!’

জমিদার বংশ সুরেন বিশ্বাসের। এককালে গৌরীহরের একচ্ছত্র শাসক ছিলেন তাঁদের পূর্বপুরুষেরা। আজ জমিদারি গিয়েছে। গণতন্ত্রের আড়ালে তার ক্ষমতা তবু অটুট রয়ে গেছে পঞ্চায়েত প্রধানের ছদ্মবেশে। অনুরোধটির মধ্যে শত চেষ্টাতেও কোথায় যেন সেই আদেশ দেবার বংশানুক্রমিক অভ্যাসটির স্পর্শ পাওয়া যায়। এই স্পর্শটুকুই দেবুর অস্বস্তির কারণ। সে মাথা নেড়ে বলল, ‘না বিশ্বাসমশাই। এই অবেলায় আর দ্বিতীয়বার খাব না। খাব একেবারে সেই রাতে। আগে আশ্রমের দিকেই যাওয়া যাক।’

 বিশ্বাসের কপালে দু’তিনটি মৃদু ভাঁজ পড়েই মিলিয়ে গেল। ঝানু ব্যক্তি। কখন থামতে হয় সে কথা ভালোই জানেন। থেমে গিয়ে বললেন, ‘চলেন, তবে তাই যাওয়া যাক। বিশু, তুমি বরং ততক্ষণ আরো একটা সাইকেলের বন্দোবস্ত দেখো। আর আপনাতে আমাতে দেবুভাই ততক্ষণে চলেন গৌরীমায়ের চাতালে একটু বসি গিয়ে।’

.

.

ঘাট সংলগ্ন মন্দিরের প্রাঙ্গণ। ইটবাঁধানো সুপ্রাচীন চত্বরের মাঝখানে দাঁড়ানো এই মন্দিরটির ইতিহাস নিয়ে কেউ অনুসন্ধান করেননি কখনো। তা না করুন। এদেশে হাজারো লাখো মন্দির। ক’টার ইতিহাস লিখবে মানুষ!

ক’বছর আগে, প্রজেক্টের কাজ শুরু করতে এসে গৌরীমন্দিরের পুরোহিত বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গেই প্রথম আলাপ হয়েছিল দেবুর। তাঁর কাছে বংশানুক্রমে রক্ষিত গৌরীমায়ের পাঁচালি রয়েছে। তালপাতার গায়ে চালপোড়া কালির উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা সেই বইটি থেকে গৌরীমায়ের অতীতের কিছু খবর পেয়েছিল সে।

কোনো এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে এক রাজা শিকারে এসে পথ হারিয়েছিলেন এই এলাকার গভীর অরণ্যে। তখন একটি হরিণীকে দেখতে পেয়ে তার পেছনে ধাওয়া করেন তিনি। তাঁর ছোড়া তির হরিণীকে স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু হরিণীও পালিয়ে না গিয়ে তাঁর আগে আগে ছুটতে থাকে ও একসময় তৃষ্ণার্ত রাজাকে এই নদীর ধারে পৌঁছে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। জলপানে তৃপ্ত রাজা নদীর ধারে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লে গৌরী মা তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, এই ভূমি তাঁর পীঠস্থান। তিনিই রাজাকে হরিণীবেশে পথ দেখিয়ে এনে নদীর ধারে পৌঁছে দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন তাঁর। এর বিনিময়ে তিনি রাজার পুজো চান। তবে হরিণীবেশে অরণ্যে ভ্রমণ করতে আনন্দ পান তিনি। অতএব রাজা যেন অরণ্যটিকে ধ্বংস করে নগর প্রতিষ্ঠা না করেন এই ভূমিতে।

 এরপর রাজাদেশে গভীর অরণ্যে গড়ে উঠল গৌরীমন্দির। মন্দির-চত্বরে একঘর ব্রাহ্মণকে প্রতিষ্ঠা করে রাজা ফিরে গেলেন। ব্রাহ্মণের ওপরে দায়িত্ব রইল দেবীর নিত্যসেবার। সে-সময় বৎসরান্তে একবার করে রাজা আসতেন মন্দিরে পুজো দিতে। তখন অজস্র নৌকায় ঢেকে যেত মহানন্দার বুক। নিস্তব্ধ অরণ্য কেঁপে উঠত মানুষের পদপাতে, অস্ত্রের ঝনঝনায় ও মন্ত্রের গম্ভীর ধ্বনিতে। মন্দিরপ্রাঙ্গণে ত্রিরাত্র যাপন করে রাজা ফিরে যেতেন, মন্দিরের সম্বৎসরের খরচ পুরোহিতের হাতে তুলে দিয়ে।

কিন্তু অরণ্যমন্দিরকে ঘিরে গ্রাম গড়ে উঠল কীভাবে? উত্তরে বৈদ্যনাথ জানিয়েছিলেন, সে-ও মায়েরই লীলা। পাঁচালির আরেক অংশ থেকে পড়েও শুনিয়েছিলেন সেই কাহিনি—

.

সৈন্য লয়ে আলিজান ভীমবেগে ধায়।

রোষচক্ষে গৌরীমাতা সেইদিকে চায়।।

রাজার পুরীতে গিয়া স্বপ্ন দিলা তারে।

রক্ষ পুত্র মুসলমানে ঘেরিল আমারে।।

রাজার আদেশে তবে সপ্তলক্ষ সেনা।

গৌরীমন্দিরে ঘিরি গিয়া দিল থানা।।

বৃক্ষকাষ্ঠে মহাদুর্গ গড়িলা ভীষণ।

তাহাতে বসিয়া রাজা দিলা মহারণ।।

রণশেষে দৈবাদেশে পত্তনিলা গ্রাম।

গৌরীমা চরণাশ্রিত গৌরীহর নাম।।

জয়জয় চন্দ্রচূড় গৌরীহরত্রাতা।

তার ভূজবলে রক্ষা পাইলা গৌরীমাতা।।

.

বিগত অরণ্যের বংশধর হিসাবে একটি দুটি মহীরূহ এখনও দেখা যায় মন্দির চত্বরে। তারই একটির তলায় বসে ছিল তারা দুজন। প্রৌঢ়টি আলস্যে দেহ এলিয়ে দিয়েছেন। ফুরফুর করে নাক ডাকছে তাঁর।

নদী থেকে হাওয়া উঠে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরঝর করে বয়ে যাচ্ছিল। মন্দিরের সামনে একটি দুটি মানুষের আনাগোনা। নদী থেকে স্নান করে উঠে ভেজা কাপড়েই মন্দির চত্বরে ঢুকে গর্ভগৃহের বাইরে রাখা লিঙ্গটির মাথায় জল দিয়ে প্রণাম করে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

হাতঘড়ির কাঁটা ত্রিশ মিনিটের ঘর পার করে দেবুর যখন বিরক্ত হবার জোগাড় হয়েছে তখন দূরে বিশ্বনাথকে দেখা গেল। সঙ্গে আর একটি ছেলে।

কাছে এসে একগাল হেসে বিশু বলে, ‘এই সুকুর জন্য দেরি হয়ে গেল স্যার। আপনি এসেছেন শুনে জেদ ধরল সঙ্গে আসবেই। ওর বাড়িতে একটু বসতে হল তাই। তাড়াহুড়ো করে মাথায় জল ঢেলে দুটি খেয়ে নিয়ে চলে এল। এখন চলেন। দুজনে দুই সাইকেলের কেরিয়ারে বসেন দেখি! বাঁই বাঁই করে চালিয়ে দেখতে-দেখতে পৌঁছে দেব’খন।’

সরু পথটা এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। হেমন্তের অপরাহ্নে উত্তরের হাওয়া এসে মুখে বেঁধে। পিঠের দিকে রোদ বেশ তীক্ষ্ন। কেরিয়ারের একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে দেবব্রত।

বেশ কয়েক বছর আগে, প্রথম কলকাতা থেকে বেরিয়ে মালদা টাউন থেকে ঈশ্বরপুরের বাসে যখন উঠে বসেছিল, সেই মুহূর্তের হরিষে-বিষাদে মেশা রোমাঞ্চ আজ আর অবশিষ্ট নেই। অচেনার উত্তেজনা কখন যেন মিলিয়ে গিয়েছে। নতুন পরিচিতিও পুরোন হয়ে গিয়েছে। মহানন্দার তীরে তীরে ব্যাপ্ত এই ভূখণ্ডের জীবন কোলাহলহীন। তার গভীর তলদেশে ডুব দিয়ে শান্তিতে শুয়ে থাকে এখন তার মন। প্রেমিক এখন গৃহস্থ হয়েছে। আপন তৃপ্তির দিক থেকে এখন তার চোখ তাই সরে গেছে যেন তার সঙ্গে একত্রে সুচারু একটি সংসার গঠনের দিকে। সেখানে সকলের সুখেই তার সুখ।

 পথের ওপর এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকে সোনালি ধানের রাশি। গোলাজাত করবার আগে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাকে। ধানের লোভে চড়াই আর বুলবুলির দল ভিড় করে এসেছে। ধানের মালকিনরা রান্নাখাওয়ার পাট চুকিয়ে এখন পথে বসে পাখি তাড়াবার ছলে সকলে মিলে রোদ পোহায়। তাদের লাবণ্যহীন শরীরে কঠোর জীবনসংগ্রামের ছাপ। নগর সভ্যতা থেকে বহু গভীরে ছড়িয়ে থকা এই গ্রাম এদেশের বিপুল উত্থানের প্রসাদ এখনো পায়নি।

সাইকেলে বসেই দেবু প্রশ্ন করল, ‘এই ধান শুকোবার র‌্যাক তৈরির গতবার যে প্ল্যান করছিলাম আমরা সে ব্যাপারে কাজ কিছু এগিয়েছে?’

‘হ্যাঁ স্যার।’ সাইকেল চালাতে-চালাতেই বিশ্বনাথ জবাব দিল, ‘কাঠের স্ট্যান্ড আর তালপাতার ট্রে ইউজ করেছি। আপনি যে লাইব্রেরি র‌্যাকের মতো করে একের ওপর একটা করে ট্রে আটকাবার কথা ভেবেছিলেন সেটা পাল্টাতে হয়েছে। ওতে ফ্রেম বানাতে হয় বলে কাঠ অনেক বেশি লাগছিল। তাছাড়া ট্রেগুলো সব একমুখী হওয়ায় রেজাল্টও ভালো আসছিল না।’

‘তাহলে?’

‘ওই জামাতের বুদ্ধি। নারকেল গাছের গায়ে ওপর থেকে নীচে আলাদা আলাদা ডিরেকশানে ছ’টা করে তালপাতার ট্রে আটকে দেওয়া হয়েছে। গোল ট্রে তে রেজাল্ট বেশি ভালো হচ্ছে। ট্রেগুলো বানিয়েছি তলায় কঞ্চির পুরু নেটিং করে তার ওপরে পাতা বিছিয়ে। ছ’টা ট্রে মিলিয়ে এক মন করে ধান ধরছে একেকবারে। চড়া রোদ পেলে শুকোবার সময় লাগছে দু’ঘণ্টার একটু কম।’

দেবু মাথা নাড়ল। ভালো বুদ্ধি। কায়দাটা তার মাথায় আসেনি। বিভিন্ন দিকে ট্রেগুলো ছড়িয়ে বাঁধলে একটার ছায়া অন্যটায় পড়বে না।

‘তার মানে ছ’ঘণ্টা রোদ পেলে একেকটা র‌্যাকে তিন মন ধান শুকোবে একদিনে। নট ব্যাড। গতমাস অবধি অ্যাকাউন্ট বুকে কিন্তু কোনো খরচ দেখাসনি তোরা এ বাবদে।’

‘পুরো অর্থ-হীন ব্যাপার যে! মালপত্তর বলতে শুকনো কঞ্চি আর তালপাতা। গাঁ-ঘরে ও-জিনিসের অভাব নেই। কুড়িয়ে নিয়ে এলে লোকে আবর্জনা বিদেয় করে খুশিই হয়। ট্র্যাডিশনাল দড়ি বা তারের বদলে কলাগাছের ফেঁসো ইউজ করেছি বাঁধন দেবার জন্য। খরচ হবে কীসে?’

‘আরে ট্রেগুলো তো বানাতে হচ্ছে? একেকটা ট্রে-তে প্রায় ছ’কেজি করে ওজন চাপছে। শক্তপোক্ত করে বানাতে লেবার চার্জ লাগবে না? বিনিপয়সায় কাজ করালে আবার দেখবি ক’দিন বাদে—’

বিশ্বনাথ ফের একটু হাসল, ‘শুরুতে আমি, জামাত আর সুকুমার মিলে আশ্রমে বসে বসে বানিয়েছিলাম দাদা। তারপর নানান পাড়ায় গোটা দশেক গাছ বেছে ট্রায়ালের জন্য ট্রে বিলি করতে এখন গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো চলছে।’

‘মানে?’

‘মানে আর কী? ডিমান্ড বাড়ছে দেখে প্রতি বুধবার সকালবেলা আশ্রমে দু’ঘণ্টার একটা ওয়ার্কশপ রেখেছি আটটা থেকে। যার দরকার সে নিজের কাঠকুটো জুটিয়ে নিয়ে আসে। একেবারে বানিয়ে নিয়ে চলে যায়। সুকুমার থাকে। দেখিয়ে-টেখিয়ে দেয়। আমাদের কোনো হাঙ্গাম নেই।’

চারপাশে পথের ওপর ছড়ানো সোনালি ধানের স্তূপগুলো দেখে দেবু বলল, ‘এই দিকটায় এখনো ইউজ শুরু হয়নি, না রে?’

‘না স্যার। সময় লাগবে। গ্রামের লোক তো! সহজে বিশ্বাস করে না। গায়ে পড়ে বলতে গেলেও উল্টো সন্দেহ করে বসবে। তার চেয়ে বরং আস্তে-আস্তেই চলুক। লোকের মুখে মুখে কথা ছড়াক।’

‘ঠিক। আর একটা কথা। অ্যাডপশান কিছু ঘটছে?’

‘মানে?’

‘মানে তোদের ওয়ার্কশপে না এসে নিজে নিজেই কোথাও কি কেউ অন্যের দেখে দেখে র‌্যাক বানাচ্ছে?’

‘সীতেশ মণ্ডল আছে না? পূর্বপাড়ার ছেলে। অবস্থা খানিক ভালো। একলপ্তে প্রায় বিঘেদশেক জমির মালিক। সে নাকি গোটাবিশেক র‌্যাক বানিয়েছে নিজের কিষাণ লাগিয়ে। আরো বানাবে নাকি। তবে কথা হল, লোকটা বিশেষ সুবিধের নয় স্যার।’

‘কেন? তোমাদের কাছে না এসে নিজে নিজে র‌্যাক বানিয়েছে বলে?’ দেবু হাসছিল।

সুকুমার মাথা নাড়ল, ‘না সেজন্য নয়। লোকটা র‌্যাক বেচছে। একটা বড় চালা বানিয়ে সেখানে র‌্যাক জমাচ্ছে। বিশ টাকা পিস। কাউকে কষ্ট করে বানাতে হবে না। নগদ টাকা ফেলে কিনে নিয়ে যাও। প্ল্যানটা বানালাম আমরা আর লাভের কড়ি গুনছে ওই সীতু মণ্ডল। কোনো কৃতজ্ঞতা তো নেই-ই, উল্টে লোককে বলে বেড়াচ্ছে, বিনিপয়সায় আশ্রমের ভূষিমাল না নিয়ে পয়সা দিয়ে ভালো জিনিস কেনো।’

‘কিনছে কেউ?’ দেবুর গলায় কৌতূহলের স্পর্শ ছিল। খবরটার গুরুত্ব তার কাছে অনেকটাই বেশি। এই ছেলেদের তা বোঝবার কথা নয়। থ্রি-সি বৃত্ত—কনসিভ-ক্রিয়েট-কমার্শিয়ালাইজ এর তৃতীয় ধাপটাতে এসে বেশির ভাগ নতুন আইডিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে এদেশে। সীতু মণ্ডলের হাত ধরে কি তবে এই র‌্যাকের আইডিয়াটা…

‘হ্যাঁ। অনেকেই।’

সুকুমারের জবাবটা এইবার একটা আশা জাগাচ্ছিল তার বুকে, ‘তোমাদের ওয়ার্কশপে যত লোক এসে বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে কম না বেশি?’

একটু ইতস্তত করল সুকুমার। তারপর বলল, ‘আগে তো কমই ছিল। তবে ইদানীং ওয়ার্কশপে লোকের টান পড়েছে। মণ্ডলের কাছেই ভিড় বেশি। লোকে কষ্ট না করে টাকা ফেলে জিনিস কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এই যে, এসে গেছি স্যার।’

.

পশ্চিমে মহানন্দা বহে যায়। দুপুর ঢলে এসেছে। নিস্তব্ধ, ঠান্ডা উঠোন জুড়ে গাছের পাতার ফাঁকে আলোছায়ার কাটাকুটি। খোড়ো চালের সারি সারি ঘর নিস্তব্ধ হয়ে আছে। দাওয়ায় বসে হিসেবের খাতা দেখছিল দেবু। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ সুরেন বিশ্বাস বললেন, ‘বলছিলাম দেবুভাই, আশ্রমে ছেলেপিলেদের পড়াবার ক্লাশ যে চালাচ্ছেন, তা এদের ক্লাশ ফোরের ছাত্রবৃত্তির পরীক্ষা দেওয়ালে হয় না?’

‘কেন?’ দেবু মুখ তুলে চাইল।

সুরেন বিশ্বাস দেখা গেল একটু অবাক হয়েছেন প্রশ্নটা শুনে, ‘একথা মাস্টার হয়ে আপনি জিগ্যেস করছেন? পড়বে, শিক্ষিত হবে, ডাক্তার, প্রফেসার হবে।’

‘সে তো হবে বাইরে শহরে গিয়ে। তাতে গৌরীহরের লাভ কী?’

‘না, মানে দেশের উপকার! ছেলেপিলেগুলোরও মঙ্গল।’

দেবু চেয়ারটা ঘুরিয়ে সুরেন বিশ্বাসের মুখোমুখি হল এবার, ‘বিশ্বাসমশাই, দেশের উপকার ছেড়ে একটু নিজের গ্রামের উপকারের কথাটা ভাবুন। এই যে সুকুমার আর বিশ্বনাথ। মাধ্যমিকে দুটোরই ভালো রেজাল্ট আমার নিবেদিতা বিদ্যাপীঠ থেকে। বাইরে আরো পড়তে পাঠালে আর ফিরত? শহরে গিয়ে চাকরি বাগিয়ে বসত, আর বছর, দু’বছরে বউবাচ্চা নিয়ে এসে ক্যামেরা বাগিয়ে গ্রামের ভিডিও তুলে নিয়ে যেত। বাস! কিন্তু তাতে গৌরীহরের কী উপকারটা হত?’

‘কিন্তু না পাঠিয়েও লাভটা কী হল ওদের? ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ছাড়া আর তো কিছু করছে না!’ সুরেন বিশ্বাস মাথা নাড়লেন।

‘কিছু করছে না? আপনি দেখতে পাচ্ছেন না কিছু?’

দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে সুরেন বিশ্বাস কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন সামনের দিকে। অন্ধকার নেমে আসছে দ্রুত। শীতের বেলা। বেশিক্ষণ থাকে না।

খানিক বাদে র‌্যাপারটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে নীচে নেমে তিনি কেটে কেটে বললেন, ‘হ্যাঁ। তা পাচ্ছি। বেকার কাজে বেগার খাটছে। জীবনটা নষ্ট করছে। বিশ বছর পরে, নিজেদেরই দুষবে। আপনিও তাই করবেন দেখে নেবেন। নিজেকে দুষবেন কেবল। আর লাভ কিছু হবে না।’

একটুক্ষণ চুপ করে রইল দেবু। বছরদুয়েক ধরে সুরেনবাবুকে চেনে সে। আশ্রমটা বানাবার জায়গা খুঁজছে শুনে ওই সুকুমারই আলাপ করিয়ে দিয়েছিল এখানে ডেকে এনে। প্রবীণ মানুষ। দুনিয়াদারির জ্ঞান তাঁর কম নয়। কাছাকাছি কোনো গ্রামে খানিক জায়গা পেলে আশ্রম বানিয়ে কীসব করতে চাইছে শুনে সাদরেই ডাক দিয়েছিলেন তাকে। ব্যবস্থাপনাও করে দিয়েছিলেন সব। বলেছিলেন, ‘আদ্ধেক জমি তো এ গাঁয়ে বঞ্জর হয়েই পড়ে আছে। চাষ দেবার খ্যামতা নেই। নেন না বেছে কতটা লাগবে। কেউ তো আমাদের দেখল না মাস্টারমশাই। দেখেন যদি কিছু উপকার করতে পারেন।’ অথচ আজ হঠাৎ!

‘কী হল? কিছু বললন না যে!’

দেবু সামান্য আহত গলায় বলল, ‘কিন্তু বিশ্বাসমশাই, সেদিন আপনি নিজেই তো জায়গা দিয়েছিলেন আমায় সবকিছু শুনে। গৌরীহরের কোনো উপকারেই কি—’

ঘুরে দাঁড়ালেন সুরেন বিশ্বাস। গলাটা একটু নরম হয়েছে তাঁর, ‘অ্যাদ্দিন ধরে আপনাকে দেখছি দেবুভাই। আপনার এই চ্যালাচামুণ্ডাদেরও দেখছি। তাই আজ এই কথাটা বললাম। আপনি মানুষটা খাঁটি। তাই ভালোবেসেই বলেছি। নইলে আমরা পলিটিকসের লোক, আমাদের কী যায় আসে? এখানে এসে আপনি যা করছেন তাতে আমাদের তো লাভই হচ্ছে। গ্রামের ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে একটু-আধটু লিখতে পড়তে শিখছে, বুড়োরা ছেলেছোকরাদের হাতেকলমে মাঠের কাজ শেখাচ্ছে, গোবরের হাওয়া দিয়ে রান্নার কায়দা করা হচ্ছে। লোকজন খুশি। আপনাদের আশ্রম দেখিয়ে আমার ভোটব্যাঙ্কও নিশ্চিন্ত।

‘কিন্তু দেবুভাই, আপনার নিজের বা এই ছেলেদুটোর এতে লাভটা কী হচ্ছে বলুন তো! লোক চরিয়ে চুল পাকিয়ে ফেললাম আমি। তাই না চাইতেই উপদেশ দিচ্ছি, কেবল বনের মোষ তাড়িয়ে গেলে ফয়দা লুটবে অন্যে আর খেসারত শেষমেশ নিজেকেই দিতে হবে। এই ভিকিরির দলের উন্নতি আপনি শত চেষ্টাতেও করতে পারবেন না, মধ্যে থেকে নিজের জীবনটা বরবাদ।’

‘তা আপনি কী করতে বলেন?’

সুরেন বিশ্বাস ততক্ষণে সাইকেলে পা উঠিয়ে বসেছেন। হ্যান্ডেলটা দাওয়ার কাছে বেঁকিয়ে ধরে মাথাটা এগিয়ে এনে বললেন, ‘আমি বলি কি, যা যা কাজকম্ম চলছে সে-সব চলতে দেন। দোষ কী? ভালোই তো। সমাজসেবা চলতে থাক না যদ্দিন চলে! তবে তার পাশাপাশি, এই বছর ছেলেগুলোকে পরীক্ষাটা দেওয়ান। কয়েকটা ছেলে ছাত্রবৃত্তি পেয়ে গেলে খানিক নাম ফাটলে তারপর আর বছর থেকে একটা নিম্নবুনিয়াদি স্কুল চালু করে দিই না কেন আশ্রমে?’

আস্তে-আস্তে তাঁর পরিকল্পনাটা খুলে বলছিলেন সুরেন বিশ্বাস, ‘এই কয় বছরে এলাকায় আপনার সুনাম যথেষ্ট হয়েছে দেবুভাই। ইশকুল চালু হলে আশপাশের পাঁচটা গ্রামের লোকজন খানিক মাইনে দিয়ে হলেও স্টুডেন্ট পাঠাবে দেখবেন আপনার স্কুলে। পার্টি ফান্ডে তার খানিক দিয়েও আপনার অনেকটাই থাকবে। এই ছেলেপিলেগুলোর হাতেও মাস্টারি করে দুটো পয়সা আসবে। আর, শুরু যদি করতে পারেন, তাহলে কথা দিচ্ছি, দু’বছরের মধ্যে সরকারি অ্যাফিলিয়েশান আনিয়ে দেব আমি। তখন তো টাকাই টাকা।

‘তারপর বছর-পাঁচেকের মধ্যে অন্য সব কাজকর্ম গুটিয়ে ফেলে স্কুলটাকে হায়ার সেকেন্ডারি করে ফেলেন। আমি তো রইলাম পেছনে! ঘটনা হল, নিবেদিতা বিদ্যাপীঠে বিশ বছর ঘষটালেও অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের ওপরে আপনি উঠতে পারবেন না। ওই রাজীব বোস তার পেটোয়া লোক ছাড়া কাউকে হেডমাস্টার করবেই না ওখানে। আমার কথাগুলো ভেবে দেখবেন দেবুভাই। আপনার ভালোর জন্যই বলছি।’ বলেই সাইকেলের পেডালে চাপ দিলেন বিশ্বাস। তারপর বললেন, ‘অবশ্য তাড়া নাই। পরশু ফেরার দিনে দেখা করে নেব’খন। জবাবটা তখন পেলেই হবে।’

সন্ধে হয়ে আসছিল। আশ্রমের সার সার ঘরগুলোতে একটা একটা করে আলো জ্বলে উঠছে। বায়ো গ্যাসের আলো। খরচ নেই কোনো। এলাকা ঝেঁটিয়ে লোক এসেছে। একেকটা ঘরে একেক বয়সের মানুষের ভিড়।

দেবুর নিজের একটা ঘর আছে এখানে। অর্ধবৃত্তে সাজানো ঘরগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে বসা ঘরটা ধানের গোলার ঢংয়ে তৈরি। তার গোল বারান্দা থেকে সবক’টা ঘরের দিকেই চোখ ফেলা যায়।

 সুরেন বিশ্বাসের কথাগুলো সেই তখন থেকেই একগুচ্ছ পাথরের কুঁচির মতো মাথার ভেতরে ঝমঝম করে বাজছিল তার। ভুল হচ্ছে কি কোথাও তাহলে? সন্ধের আসরগুলো শুরু হতে মনের ভেতরকার শান্তিটা ফিরে আসছিল আবার। ভুল হতে পারে না তার। ওই যে আলোগুলো জ্বলছে ঘরে ঘরে। তার নীচে অর্ধেক আঁধারে ক্লান্ত অথচ উৎসুক মুখগুলো বসে আছে। মেয়েদের ঘরে ইন্দু দাই ক্লাস নিচ্ছে। ধাত্রীবিদ্যার প্রথম পাঠ। তার তীক্ষ্ন খনখনে গলা শোনা যাচ্ছিল, ‘দুটি ঠ্যাংয়ে ঝুলায়ে ধরে পিঠে চাপড় দেবা এই এমনভাবে আর, জল মোটে দেবা না প্রথম ছয় মাস। দুদ দেবা, দুদ ভগবান বুক ভরি অমৃত দেয়। সেই খেয়ে থাকবে বাচ্চা।

এই জল খেতে বারণ করাটাই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের থেকে ধার নেওয়া। তা ছাড়া, নাড়ি কাটা থেকে শুরু করে তেলমালিশ, খাওয়াবার পদ্ধতি, বেসিক হাইজিন, ধাত্রীবিদ্যার যাবতীয় জ্ঞানই প্রচলিত গ্রামীণ জ্ঞানভাণ্ডার থেকে এসেছে। দেবু শুধু ঘটকালির কাজটুকু করে দিয়েছে মাত্র। দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে মিল করে দিয়েই তার ছুটি। বাকি কাজ নিজে নিজে হবে।

আলোকিত কুটির থেকে কুটিরান্তরে হেঁটে যায় যুবকটি। হেমন্তশেষের সন্ধ্যায় প্রায় পূর্ণ চাঁদ উঠেছে পুবে। আস্তে-আস্তে আকাশের গায়ে তারা ফুটছে একটা দুটো করে। মৃদু হাওয়ায় তার গায়ের চাদরটা উড়ে যায় এক-একবার। কোনো ঘরে অক্ষরজ্ঞানের প্রথম পাঠ নিতে থাকা কোনো কিশোর অথবা আরেক ঘরে একই সময়ে সদ্যোজাত সন্তানকে যত্ন করবার পদ্ধতি শিখতে থাকা কোনো নতুন মা তার কাজ ভুলে হয়তো বা মুহূর্তের জন্য চেয়ে দেখে এই অদ্ভুত মানুষটার দিকে। তার ঝাঁকড়া চুল হাওয়ায় ওড়ে। তার মুখে অগোছালো দাড়ি। লালচে হলুদাভ চামড়ার লম্বা মানুষটি আকাশের দিকে চোখ রেখে হেঁটে যায় তাদের পাশ দিয়ে। মাঝে মাঝে আসে। দু’চারদিন থাকে। সমস্ত বিলিবন্দোবস্ত বুঝে, বুঝিয়ে ফের ফিরে যায়। এই আশ্রমে কোনোদিন তাকে কেউ ক্লাশ নিতে দেখেনি। তবু সবার কাছে তার ওই একটাই পরিচয় ‘দেবুমাস্টার।’

বাঁদিক থেকে পঞ্চম ঘরটা বেশ বড়। এখানে শ্রোতার সংখ্যাও বেশি। তার দরজার কাছে গিয়ে দেবু মৃদু গলায় একবার ডাক দিল, ‘রামকাকা!’

মাঝবয়েসি মানুষটি তখন আলের ওপরে কী করে সবজির চাষ করা যায় তাই নিয়ে বলছিলেন। বয়স্ক মানুষ। সরকারি কৃষিবিভাগে ছোটখাটো একটা কাজ করতেন। রিটায়ার করে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসেছেন কিছুকাল হল। দেবুর আশ্রমের খবর পেয়ে নিজে থেকেই এসে জুটেছিলেন একদিন। এদেরও লাভ। তাঁরও সময়টা কাটে। দেবুর গলা পেয়ে কথা থামিয়ে বেরিয়ে এসে রামকৃষ্ণ বললেন, ‘কিছু বলবে দেবব্রত?’

‘বলছিলাম, নিমপীঠ থেকে কলার চারা আনিয়েছেন?’

‘এক প্রস্থ এসে গেছে। বিলোনোও শেষ। প্রথম লটটা ঘটকপাড়ায় দিলাম। ওরা প্রথমে চেয়েছিল। তবে শীতে আর আসবে না। ফের সেই মার্চ মাসে।’

‘ঠিকই করেছেন। বাড়ি বাড়ি লাগানো হয়ে গেছে তো? বেঁচেছে সব?’

‘হ্যাঁ, সবই বেঁচে গেছে। ক্লোন করা হাইব্রিডের চারা তো! জান শক্ত আছে। তবে ঠিক বাড়ি বাড়ি লাগানো হয়নি।’

‘মানে?’

‘ও পাড়ার একচল্লিশ ঘর লোক মিলে ভালো এক বুদ্ধি বার করেছে। সানপুকুরের ধারের ঝোপঝাড় কাটিয়ে পরিষ্কার করে সেইখানে সব চারা একসঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেক বাড়ি থেকে পালা করে একজন লোক প্রতিদিন জলটল দিয়ে যায়। পুকুরের সঙ্গে ডোঙা বেঁধে নালা কেটে দিয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দড়ি টানলেই পুকুরের জল উঠে নালা বেয়ে কলাবাগানে গিয়ে পড়ে।’

‘বুদ্ধিটা নিশ্চয় আপনার!’ দেবু হাসছিল।

রাম ঘাড় চুলকোলেন একবার, ‘মানে, আমারও ঠিক নয়; চারা আনতে যখন গেলাম সে-সময় মহারাজই বুদ্ধিটা দিলেন। ওতে যত্ন করতে লোক কম লাগে, আবার জমিরও খরচা নেই। তাই ভাবলাম বলে দেখি, যদি রাজি হয় লোকে। রাজি হয়ে গেল সবাই। এখন গোড়া থেকে এত কোঁড় বেরোচ্ছে যে তুলে তুলে লাগিয়ে পুকুরের গোটা পার জুড়ে বন হয়ে গেছে।’

‘বেশ। আপনি বাকি পড়ানোটা শেষ করেন গিয়ে। আমি এগোই।’

চলে যেতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গিয়ে একটু ইতস্তত করে রাম হঠাৎ বললেন, ‘একটা ব্যাপার হয়েছে দেবব্রত।

ঘটকপাড়ার সুবল ঘোষ বলছিল, হাতে ভালো পাইকের পেয়েছে, কলাবাগানটা জমা দিয়ে নগদ টাকা তুলে নেবে।’

‘একা তার হিস্যার, নাকি সবার জন্যই?’

‘না না, একার না। একার হবেও বা কেমন করে? এজমালি বাগান তো! সবার জন্যেই বলেছে।’

‘বাকি ঘরেদেরও একই মতো? খোঁজ করেছিলেন?’

‘হ্যাঁ বাবা। বাকিরাও তাতে রাজি। কাঁচা পয়সার বড় আকাল কি না!’

দেবু ভ্রূ কুঁচকে একটুক্ষণ চিন্তা করল, ‘টাকাটা ভাগ হবে কীভাবে?’

রামকৃষ্ণ মাথা নাড়লেন, ‘সে ওরা নিজেরাই ঠিকঠাক করে নিয়েছে। মোট টাকাটা একচল্লিশ ভাগে ভাগ করে নেবে।’

‘জমা হয়েছে?’

রাম চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘পাগল নাকি? এখনো গাছ বাড়ল না ভালো করে, এখনই বেচবে কী? আমি বারণ করে দিয়েছি।’

‘ঠিক করেননি কাকা। যাদের জিনিস, দায়িত্বটাও তাদের দেওয়া উচিত। ঠকলে একবার ঠকবে। তারপর শিখে যাবে।’

‘না মানে আমি ভেবেছিলাম, তোমার মত না নিয়ে—’

দেবু হাসল, ‘এইবারে তো আমার মতটা জেনে গেলেন। সুবলকে বলবেন, পাইকারকে খবর দেয় যেন। আর একটা কথা, পাড়ায় একটা কথা পেড়ে দেখবেন। সবাই রাজি থাকলে টাকাটার একটা অংশ সরিয়ে নিয়ে গ্রামীণ ব্যাঙ্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে জমা করবার বন্দোবস্ত করবেন। অংশীদাররা তার থেকে প্রয়োজনে বার্ষিক পাঁচ পার্সেন্ট সুদে টাকা ধার নিতে পারবে। বাইরের কেউ ধার নিতে চাইলে তাও দেওয়া যাবে, তবে দশ পার্সেন্ট সুদে।’

‘বুদ্ধিটা দিয়েছ ভালো। কো-অপারেটিভ ব্যাপারটা ভালোই, তবে এতো কম ক্যাপিটাল নিয়ে—’

‘শুরুটা তো করা যাক কাকা। তারপর রাস্তা আরো বেরোবেই।’

এইবার রামের মুখে হাসি ফুটল, ‘তুমি ভেবো না দেবব্রত। লোকজনের অরাজি হবার প্রশ্নই উঠছে না। সময় অসময় কার ঘরে নেই? মহাজন সুদ নেয় দিনে দশ পার্সেন্ট, তাও চক্রবৃদ্ধি হারে। এ বন্দোবস্ত হলে তো হাতে স্বর্গ পাবে সব!’

‘ভালো। আপনি ক্লাশটা শেষ করুন গিয়ে। আমি একটু আমার কাজ নিয়ে বসি গে,’ দেবু মাথা নেড়ে উঠোনে নেমে এসে তার ঘরটার দিকে চলল।

‘ওহো, আরেকটা কথা,’ পেছন থেকে রামকৃষ্ণর ডাক ভেসে এল হঠাৎ।

দেবু ঘুরে দাঁড়াল, ‘বলুন।’

‘বলছিলাম, এ-যাত্রা যে ক’দিন আছ, আমার বাড়িতে দু’বেলা করে দুটি খেতে হবে যে! ঘরের উনি বলে পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

দেবু হাসল, ‘সুকুমার আশ্রমেই রান্নাবান্না করে রেখেছে তো। নষ্ট হবে যে!’

রামকৃষ্ণ হাত নাড়লেন, ‘চিন্তা নেই। সুকুমার রাঁধবে না আজ। আমি তাকে আগেই বলে দিয়েছি। তারও নিমন্ত্রণ। ও-ই নিয়ে আসবে’খন আপনাকে।’

.

‘স্যার, খাবেন চলুন।’

দেবু চমক ভেঙে লেখা থেকে মুখ তুলে তাকাল। বিশ্বনাথ ডাকছে। হাতঘড়িতে সাড়ে ন’টা বাজছে প্রায়।

‘এ হেঃ! অনেকটা রাত হয়ে গেল আজ!’ দেবু মাথা নাড়ল, ‘আগে ডাকলেই পারতে।’

‘না মানে, আপনি লিখছিলেন, তাছাড়া রামকৃষ্ণকাকার বাড়ি তো কাছেই। হেঁটে মিনিট দুয়েকের বেশি লাগে না। চলুন।’

খাতাটা বন্ধ করে দেবু হঠাৎ বলল, ‘তা আজকে হঠাৎ এই বন্দোবস্ত যে! এখানে রান্নাবান্নার কী হল?’

‘না, মানে গতবার সেই আশ্রমে ভাত পুড়ে গিয়েছিল না? সেই কথা শুনে রামকাকা খুব রাগ করছিল। বলে, ‘কোন কেতার মানুষ দেবুবাবু সে খবর আমি কলকাতায় নিমপীঠ মিশনে গিয়ে পেয়ে এসেছি। খবরের কাগজে ইংরিজিতে রচনা লেখে। নিজের চোখে ছাপার অক্ষরে নাম দেখে এসেছি। মহারাজ নাম শুনে কাগজ এনে দেখালো। প্রথমে তো বিশ্বাসই যায় না। শেষে লেখার সঙ্গে ছাপা ছোট্ট ছবিটা দেখে চিনতে পারি। তা সেই ওজনের মানুষ সন্নিসি হয়ে তোদের পোড়া দেশে এসে বুক দিয়ে পড়ে বিদ্যাদান করছে বলে তাকে আলুপোড়া বেগুনপোড়া আর পোড়া ভাত খাইয়ে রাখলি, তোদের লজ্জা হল না?’

‘এবারে তাই আপনার আসার খবর পেয়ে আগেভাগেই বলে রেখেছে, খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত সব ওনার বাড়িতে।’

বড় ভালো লাগছিল দেবুর। আগ বাড়িয়ে সহানুভূতি দেখাননি কখনো, অথচ আড়াল থেকে তার স্বাচ্ছন্দের ব্যাপারটির দিকে নীরবে নজর রেখেছেন মানুষটি। হঠাৎ করে পেয়ে যাওয়া অযাচিত স্নেহের এই স্পর্শটি তার বড় আরামের ঠেকে।

‘কোন লেখাটার কথা বলছিল রামকাকা বলুন তো স্যার?’ হাঁটতে-হাঁটতে সুকুমার প্রশ্ন করল।

‘এই আমাদের গৌরীহর আশ্রম নিয়েই একটা লেখা—’

নাবাল জমির মধ্যে দিয়ে উঁচু হয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি সরু জমির খণ্ডের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সে। তার সঙ্গীটি একটু পিছিয়ে পড়েছে। দূর থেকে মাঝে মাঝে তার নীচু গলায় প্রাকৃত কোনো সঙ্গীতের দু-একটি কলি শোনা যায়।

যুবকটি এইবারে তার আগে আগে একা একা হেঁটে যায়। পথের দু-পাশের ঢালে দাঁড়ানো তরুণ শিরীষ গাছের দল মাথা ঝুঁকিয়ে থাকে তার ওপরে। তাদের পাতার ফাঁকে ফাঁকে অজস্র তারা উজ্জ্বল ফুল হয়ে ফুটে আছে। কাণ্ডগুলি ঘিরে কুয়াশা নেমেছে। মায়াবি আলো-আঁধারি পথটি গা এলিয়ে থাকে তার পায়ের নীচে। মাথার ওপরে ঝরে পড়ে কুয়াশার বাষ্প মেশা চন্দ্রচূর্ণ।

সময় থেমে থাকে। আর নিশ্চল সময়ের সেই ক্যানভাসে তাকে চারদিক থেকে গাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে জেগে থাকে এই গ্রামটি। তার নাসারন্ধ্রে তার মৃত্তিকাসুবাস; মাথায় মুখে লতাপাতার ছোঁয়ায় তার আলুলায়িত কেশস্পর্শ যেন—

‘স্যার! কী হল? থেমে গেলেন যে? আসুন, এসে গেছি। ওই যে রামকাকার বাড়ি দেখা যাচ্ছে।’

উঁচু দাওয়ার ওপর কাঠের পিঁড়ি পেতে খাবারের আয়োজন। কাঁসার থালায় ভাত, দু’তিনটি তরকারি, একটু মাছ। আয়োজনে অসম্পূর্ণতা নেই। বাহুল্যও নেই কোনো। কুপির দপদপে হলদেটে আলোয় নীরবে আহার চলে। নতমুখী দুটি মেয়ে পরিবেশন করছিল। একজনের হাতে শাঁখা, পলা, আর অন্যটির হাতে কাচের চুড়ির মৃদু রিনিঠিনি। রামের পুত্রবধূ ও মেয়ে।

বাইরে চাঁদের আলোয় ধোয়া উঠোনের একপাশে দোচালা ঘরের আকারে গাদা করে রাখা খড়। অন্যপাশে একচালা গোহাল থেকে বিশ্রামরত পোষ্যগুলির মশা তাড়াবার শব্দ ভেসে আসে। তা বাদে দু’একটি রাতচরা পাখির ডাক ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো শব্দ নেই এই রাতে!

.

.

‘কতক্ষণ এলেন দেবুভাই?’

কানের কাছে হঠাৎ শব্দটা পেয়ে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল দেবু। তারপর মাথা ঘুরিয়ে সিঁড়ির দিকে চেয়ে দেখে সুরেন বিশ্বাস অমৃতকুণ্ডে ডুব দিয়ে উঠে আসছেন। চোখাচোখি হতে হাসলেন একগাল। তারপর বললেন, ‘দেখেন যোগাযোগ! বলেছিলাম যাবার দিন দেখা করে নেব, তা গৌরী মা আমার একেবারে তেনার খোদ দপ্তরেই দেখা করিয়ে দিলেন। পুজো দেবেন নাকি?’

‘হ্যাঁ। মা বলে দিয়েছিল প্রসাদ নিয়ে আসতে।’

‘তবে আর দেরি কেন? যান, অমৃতকুণ্ডে ডুবটা দিয়ে আসেন চট করে।’

দেবু অমৃতকুণ্ডটির দিকে চেয়ে দেখল একবার। শ্যাওলায় সবুজ জল ঘুলিয়ে উঠেছে পূণ্যার্থীদের পায়ের চাপে। চারদিকে ধাপে ধাপে বাঁধানো ইটের দেওয়ালের গায়ে থিকথিক করছে মলিন চেহারার স্নানার্থীর দল। আজ কী একটা তিথি আছে। পুজোর তাই বেশ জাঁকজমক। ভিড় হয়েছে বেশ।

সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে মাথা নাড়ল সে, ‘না, মানে স্নান করবার ইচ্ছে ঠিক হচ্ছে না।’

‘অ। নাইবেন না। আপনারা আজকালকার ছেলেপুলেরা তো মানেন না কিছুই। রাজা গণপতিচন্দ্র এই জলে চান করে ব্রহ্মহত্যাপাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন তা জানেন?’

দেবু হেসে ফেলল, ‘আমি ব্রহ্মহত্যা-টত্যা কিছু করিনি বিশ্বাসমশাই। করলে পরে নিশ্চয় ডুব দিয়ে আসতাম একটা। তা আপনার ডুব দেওয়া হয়ে গেল?’

সূক্ষ্ম খোঁচাটা বেশ মোলায়েমভাবেই হজম করে নিলেন সুরেন বিশ্বাস। তারপর বললেন, ‘চান না করেন না করলেন, মাথায় জলের ছিটা তো একটু নিয়ে নেন! এই যে আসেন, আমিই ছিটিয়ে দিচ্ছি।’

বলতে-বলতে ভেজা আঙুলের টুসকি মেরে কিছু জলকণা দেবুর মাথায় ছিটিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘প্রসাদ যে নিয়ে যাবেন বললেন মা জননীর জন্য, তার ব্যবস্থা কই? যান, ওইদিকে দোকান থেকে একটা পাঁচটাকার ডালা কিনে আনেন দেখি। আমি লাইনে জায়গা রাখছি।

 ‘পুজোর উপকরণ হাতে নিয়ে মানুষের লম্বা সারি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় গর্ভগৃহের দিকে। দেবুর ঠিক পেছনে ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে জপ করে যাচ্ছিলেন সুরেন বিশ্বাস। হঠাৎ জপ থামিয়ে বললেন, ‘তা সেই কথাটার কিছু ঠিক করলেন দেবুভাই?’

‘কোন কথা?’

‘সেই যে, সেই প্রস্তাবটা!’

দেবু ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল, ‘ইস্কুল আপনি করতেই পারেন বিশ্বাসমশাই, কিন্তু আশ্রমটাকে ওর থেকে বাদ দেওয়াটাই ভালো হবে।’

সুরেন বিশ্বাস একটুক্ষণ সময় নিলেন সিদ্ধান্তটা হজম করতে। তারপর বললেন, ‘তার মানে গৌরীহর আশ্রমে ইস্কুল করতে আপনি দেবেন না, তাই তো?’

এই মুহূর্তটির জন্য গত এক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুত হয়ে চলেছে দেবু। যে কোনো মূল্যেই গৌরীহর এক্সপেরিমেন্টটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তাকে। ক্লাসিকাল স্কুলে বদলে গেলে সমূলে মৃত্যু হবে আসল কাজটার। আরো একটা স্কুল, আরো কিছু অর্থহীন বিদ্যাবিনিময় ও বিদ্যাহীন পাঠাভ্যাসের ট্র্যাডিশান। লাভ কী তাতে? অথচ রাজি না হলে সুরেন বিশ্বাসের শত্রুতা অর্জন করতে হবে। বলা বাহুল্য, নিঃস্বার্থভাবে এ-প্রস্তাব সে দেয়নি। সেই স্বার্থে ঘা লাগলে শত্রুতা একটা তৈরি হবেই। আর পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে শত্রুতা করে গৌরীহর কেন, বাংলার কোনো গ্রামেই কাজ করা যে আজকের সময়ে সম্ভব নয় সে-কথা দেবু এ-অঞ্চলে তার গত পাঁচবছরের অভিজ্ঞতায় দেখে ও শিখে এসেছে। একে সঙ্গে নিয়ে চলা দরকার।

একটুক্ষণ নির্বাক থেকে সে বলল, ‘আমার সবটা কথা আগে ঠান্ডা মাথায় শোনেন বিশ্বাস মশাই। তারপর শুনেটুনে যা সিদ্ধান্ত নেবেন, আমি মেনে নেব।’

‘বলেন কী বলবেন।’ বিশ্বাসের গলায় তিক্ততার স্পর্শটা লুকোনো থাকছিল না।

‘বলছিলাম, দেশের আইন যা-ই বলুক না কেন, গৌরীমা সাক্ষী, এই গৌরীহরের প্রকৃত মালিক যদি কেউ থেকে থাকেন তবে সে আপনার পরিবার। আপনার মালিকানায় বসে আপনারই সম্পত্তিতে ইস্কুল করতে দেবার না দেবার আমি কেউ নই। ও কথা বলে আমায় লজ্জা দেবেন না। আমি অন্য দিকে ভেবে কথাটা আপনাকে বলেছি। ভেঙে বলি।’

‘না দেবুভাই। থামেন এখন। মায়ের সামনে বিষয়ভাবনা ভালো নয়। পুজোটা বরং দিয়ে নি আগে, তারপর বাইরে গিয়ে ও-সব কথা হবে’খন।’ সুরেন বিশ্বাস হঠাৎ বাধা দিলেন তাঁকে। এই ভক্তির জায়গাটা তাঁর একেবারে খাঁটি। আর তাই খোদ পঞ্চায়েত প্রধান হয়েও দেবীর থানে এসে আর পাঁচটা সাধারণ ভক্তের মতোই ভেজা কাপড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পুজোটা দেন ভক্তিভরে। মায়ের সামনে পদাধিকারের সুবিধেটা দাবি করেন না। দেবু আর কথা বাড়াল না। মন্দিরের গর্ভগৃহ এগিয়ে আসছিল সামনে। স্বয়ং পঞ্চায়েত প্রধান তথা জমিদারবংশের উত্তরাধিকারীকে দেখে পুরোহিত নিজেই উঠে এদিকে এগিয়ে আসছিলেন তাঁকে নিয়ে যেতে।

ঘণ্টাখানেক বাদে গর্ভগৃহ ছেড়ে বের হয়ে এল তারা। সুরেন বিশ্বাসের সঙ্গে আসবার দৌলতে দেবুর ডালাটার ভাগ্যেও বেশ লম্বা একটা পুজো জুটেছে। দেবু কোনো আপত্তি করেনি তাতে। পুজোর পরের সাক্ষাৎকারটার জন্য যুক্তিগুলোকে শেষবারের মতো ঝালিয়ে নিতে ও-সময়টা কাজে লেগে গেছে তার।

মন্দির চত্বর ছেড়ে বের হতেই পুজোর ডালা আর খাবারের দোকানের সার। সকাল থেকে উপবাসী পুণ্যার্থীর দল পুজো সেরে বার হয়ে খাবারের দোকানে ভিড় করেছে। বেরিয়ে এসে সুরেন বিশ্বাস দেবুকে নিয়ে গৌরীমাতা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে গিয়ে ঢুকলেন। এলাকার নামকরা লোক। সকলেই চেনে। দোকানদার খাতির করে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বলল, ‘বিশ্বাসমশাই যা খান তাই দেবো তো?’

‘হ্যাঁ। দু’জায়গায় দেবেন।’ বলে দেবুর দিকে ঘুরে বলেন, ‘খেয়ে দেখেন মশায়, হতে পারে গৌরীহর এখন গরিবের ঠাঁই। কিন্তু এককালে এ জায়গার ইজ্জত ছিল। এই কারিগররা সেই সময়ের রাজার কারিগরদের বংশ। এমন সুতারের ছানাপোড়া আর ল্যাংচা আগে কখনো খাননি তা আমি হলপ করে বলতে পারি।’

খানিক বাদে ছানপোড়ার একটা দলা মুখে পুরে সুরেন বিশ্বাস বললেন, ‘হ্যাঁ দেবুভাই, কী যেন বলছিলেন তখন? বলেন শুনি আপনার কথা এইবারে।’

দেবু মাথা নাড়ল, ‘বলছিলাম, ইস্কুল আপনি করেন ভালো কথা। কিন্তু আশ্রম তার থেকে আলাদা থাকলে আপনারই সুবিধা। একে তো দেখেন সব বয়সের ভোটার আসছে। বাচ্চা, বুড়ো, স্ত্রীলোক সবাই উপকার পাচ্ছে। আশ্রমের জায়গায় ইস্কুল হয়ে গেলে সে-সব বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে খানিক লোকসানই হবে, তাই না? তারপর ধরেন গিয়ে এলাকার লোকে জানে আশ্রমটা আমার বানানো। এখানে ইস্কুল করলে, যতই আপনি মদত করেন আর ইস্কুলের প্রেসিডেন্ট হন, লোকে বলবে ওটা আমার ইস্কুল। পাবলিকের মন! বোঝেনই তো!’

‘তা বটে।’ তার চেয়ে বরং আলাদা করে নিজের ফ্যামিলির নামে একটা ইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন গৌরীহরে। পেছন থেকে সব সাহায্য আমি দেব। ক্রেডিটটা থাকবে পুরো আপনার। সেই সঙ্গে গৌরীহর আশ্রমেও অনারারি প্রেসিডেন্টের একটা পদ বানিয়ে নেন। দুনো সুবিধে। কী বলেন! ভোট আসছে সামনে। এখন যতরকমভাবে পাবলিকের মনে ছাপ ফেলা যায় ততই ভালো। কী বলেন বিশ্বাসমশাই?’

মুখে মিষ্টির দলাটা নিয়েই একটু হাসলেন সুরেন বিশ্বাস। স্বার্থ বিনা এ-দুনিয়ায় কেউ কোনো কাজ করে সে তিনি বিশ্বাস করেন না। কিন্তু দূর শহর থেকে এসে উদয় হওয়া এই ছোকরা ঠিক কোনো স্বার্থে এহেন কাজটা করছে সেটা তিনি ঠিক ধরতে পারছিলেন না। এক হতে পারে এই এলাকায় পলিটিকসে নামবে ভবিষ্যতে। তাঁকে ধরে জমিটা বানিয়ে নিচ্ছে। তবে সে হলে পরে দেখা যাবে। উপস্থিত বুদ্ধিটা এ খারাপ দেয়নি একেবারেই। খাসা মাথা। একটু মাথা নেড়ে তিনি বললেন, ‘তাহলে ফিরে এসে আশ্রমে একটা সভাটভা করে প্রেসিডেন্ট ব্যাপারটা।’

দেবু হাসল। উপস্থিত সমস্যা কেটে গেছে। ‘ও আপনি ভাববেন না। নেক্সট মাসেই ফের আসছি তো! আগে থেকে খবর দিয়ে রাখব। সব হয়ে যাবে।’

খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। পকেটে হাত দিতে যাচ্ছিল দেবু, তা হাঁ হাঁ করে উঠলেন সুরেন বিশ্বাস, ‘আরে আরে করেন কী? আপনি হলেন গিয়ে গৌরীহরের অতিথ। লোকে কী বলবে?’ বলতে-বলতেই কুড়ি টাকার একটা নোট বের করে দোকানদারের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘এবারটা ফাঁকি দিলেন। তবে পরের বার এসে ছাড়ান ছোড়ান নাই। আমার বাড়িতে অন্নভোগের বন্দোবস্তটি কিন্তু স্বীকার করতে হবে দেবুভাই।’

দেবু হাসল, ‘ভালো রুই খাব কিন্তু।’

‘সে আপনি যত পারেন খাওয়াব। পুকুরে জাল দিয়ে ধরে নোলক পরিয়ে খুঁটোয় বেঁধে ছেড়ে রাখব গুটি দুত্তিন। আপনি নিজে বেছে দেবেন’খন।’

.

.

ডাউন গৌড় এক্সপ্রেস দমদমে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ওখানে নেমে সঙ্গে-সঙ্গে একটা অটো পেয়ে যেতে সাতটার মধ্যে বাড়ি। বউদি ঘর ঝাঁট দিচ্ছিল। ঝাঁটা হাতেই দরজা খুলে দিল এসে। তাকে দেখে একটু অবাক হয়ে বলে, ‘আরে আরে, কী ভাগ্যি! সক্কাল-সক্কাল সন্নিসি ঠাকুরপোর মুখ দেখলাম আজ।’

‘সন্ন্যাসী নয়, বলো গেঁয়ো যোগী।’ দেবু হাসল। বাড়ি ছেড়ে ইস্তক বউদির তার প্রতি হাবেভাবে বেশ একটু উন্নতি ঘটেছে আজকাল।

‘সে নাহয় তা-ই বললাম। তা গেঁয়ো যোগীমশাই খবরটবর না দিয়ে একেবারে হঠাৎ আশ্রম ত্যাগ করে এসে উদয় হলে যে? গ্রামে ভিখ টিখ আর মিলছে না বুঝি?’

‘ভিখ আর মেলে কোথায় বলো বউদি? গ্রাম ছেড়ে শহরে এলাম, তো বাড়ির গিন্নি যে মূর্তি ধরে দরজা খুললেন!’

দেবু রমার ফুলঝাড়ু উঁচনো হাতটার দিকে দেখাল একবার। রমা তাড়াতাড়ি ঝাটাটা নামিয়ে রেখে বলে, ‘মরণ! ঝাঁটা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, খেয়ালই পড়েনি। আর আমারই বা দোষ কোথায় বলো ঠাকুরপো? কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে দরজায় তোমায় দেখে অবাকটাই কি কম হয়েছি? এসো এসো, ভেতরে এসো। চা দিই আগে। দাও, ব্যাগটা দাও।’

দেবু হাসতে-হাসতে বলল, ‘টানতে পারবে না। চলো আমিই রান্নাঘরে রেখে দিচ্ছি একেবারে।’

‘কেন পারব না? কী অত রাজ্যি এনেছ তোমার জঙ্গল থেকে?’ বলে ব্যাগের মুখটা খুলে রমা বলে, ‘অ্যাঁ! করেছ কী? ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, মুলো, পালং! এ তো এ-বাড়ির দু’হপ্তার বাজার গো! হঠাৎ বাজার করে আনতে গেলে কেন?’

‘ধুস বাজার করতে যাব কোন দুঃখে? আমার খেতের জিনিস। নিজে হাতে করা। আসবার সময় মা পাঠিয়ে দিল তোমাদের জন্য। তবে ওসব ছেড়ে আগে চটে জড়ানো মাছটা বার করে নিয়ে ফ্রিজে ঢোকাও। গতকাল দুপুরে ধরানো। নুন দিয়ে এনেছি, কিন্তু তবু নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’

‘ওটাও?’

‘বাড়ির পুকুরের।’

ছেলেমানুষের মতো উত্তেজিত হয়ে উঠছিল বউদি। বারে বারে সবজিগুলো নেড়েচেড়ে দেখে আর বলে, ‘কী সুন্দর গন্ধ! একদম গার্ডেন ফ্রেশ। হ্যাঁ দেবু, সব তোমার নিজে হাতে করা?’

ফাটা ফাটা কড়া পড়া হাতদুটো সামনে মেলে ধরে দেবু বলল, ‘বিশ্বাস না হলে এই দেখো!’

হাতদুটোতে আঙুল বুলিয়ে দিল একবার বউদি। মানুষটা বদলাচ্ছে। চুলে দুটো একটা রুপোলি ঝিলিক। বেঁচে থাকবার যে তীব্র উত্তেজনা মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে রাখে, দীর্ঘদিন বাঁচবার একঘেঁয়েমিতে তাতে একটু ভাটা পড়ে বোধ হয়। রমার আঙুলের ছোঁয়াতে এবারে আন্তরিকতার সুবাস ছিল। অপরিচিত সেই সুগন্ধটুকু উপভোগ করছিল দেবু। হলুদের দাগ লাগা সূক্ষ্ম কাটাকুটিলাঞ্ছিত হাতদুটিতে নিজের আঙুল জড়িয়ে নিয়ে সে বলল, ‘তোমায় একটু উইক দেখাচ্ছে বউদি। শরীর ভালো নেই নাকি?’

রমা হাসল, ‘না না, তেমন কিছু নয়। জ্বরে ভুগলাম দিনদুয়েক। সিজন চেঞ্জের সময়। সংসার, অফিস দু’দিকে তাল দিয়ে সামলে উঠতে পারছি না দেবু। বাপ্পাটাও চোখের সামনে বড় হয়ে যাচ্ছে। ওকেও আর ঠিক এই অবধি—’

বলতে-বলতেই হঠাৎ থেমে গিয়ে সে বলে, ‘ওই দেখো। অ্যাদ্দিন পরে এলে, তা বাড়িতে পা দিতে না দিতেই নিজের কাঁদুনি গাইতে বসেছি। নাও, ব্যাগটা নিয়ে রান্নাঘরে এসো। তোমার দাদার উঠতে দেরি আছে। বাপ্পার স্কুলও আজ ছুটি। বাপব্যাটায় মিলে আটটা অবধি ঘুমুবে। রান্নাঘরেই বসে তুমি চা খাও। আমিও হাতের কাজগুলো সেরে ফেলি কথা বলতে-বলতে।’

‘চলো,’ দেবু ব্যাগটা উঠিয়ে নিল হাতে।

‘তা এবারেও কি ঘোড়ায় জিন দিয়ে এসেছ?’

‘উঁহু।’

‘মানে? থাকবে ক’দিন? সন্নিসিঠাকুরের হঠাৎ মতিচ্ছন্ন হল যে বড়?’

‘দিন তিন-চার থাকব।’

‘আমার ভাগ্যি!’ বলতে-বলতে বউদি কান খাড়া করে কিছু একটা শুনে নিয়ে বলে, তোমার দাদা উঠে পড়েছে। রোসো। চা’টা দিয়ে আসি।

একহাতে নিজের কাপটা ধরে অন্যহাতে কোস্টার চাপা দেওয়া দ্বিতীয় কাপপ্লেটটা তুলে নিয়ে দেবু বলল, তুমি কাজ সারো বউদি, আমি নিয়ে যাচ্ছি। দাদা যা অবাক হবে না!

ইন্দ্র দেবুকে নিরাশ করল না। উঠে বসে তার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে বলে, স্বপ্ন দেখছি না তো? সাতসক্কালে তুই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে! ব্যাপারটা কী?’

‘আচ্ছা, তোমাদের কী হয়েছে বলো তো! কত্তাগিন্নি মিলে এমন অবাক অবাক ভাব করছ আমায় দেখে যেন…’ দেবু হাসছিল।

চায়ে একটা চুমুক দিয়ে ইন্দ্র বলল, ‘না মানে, লোকজনের মুখে যা খবর শুনি তাতে…’

‘কী শোনো?’

‘মালদার সুনীলদাকে মনে আছে তো তোর? ওই যে চাকরি পাবার পর যার কাছে খবরটবর নিতে গিয়েছিলি! সে তো এখন রিটায়ার করে ফের মালদাতেই গিয়ে বসেছে। পেনশনের খোঁজখবর করতে সেদিন এসেছিল অফিসে। তখনই বলল, নাকি কার কাছে শুনেছে তুই আশ্রমটাশ্রম কীসব বানিয়ে সাধু হয়ে বসেছিস ওদিকের কোনো একটা গ্রামে। লম্বা লম্বা চুলদাড়ি রেখেছিস সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু সত্যি কথা বল তো, তুই কি…’

‘সাধু হয়ে গেছি? দূর! কী যে বাজে বকো তোমরা! দিব্যি চাকরিবাকরি করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি। অল্টারনেটিভ এডুকেশানের ওপরে একটা রিসার্চ প্রজেক্ট চালাচ্ছি গৌরীহরে। সেই কথাই ফুলে ফেঁপে তোমার কাছে এই চেহারায় পৌঁছেছে।’ ‘অল্টারনেটিভ এডুকেশান… মানে… আচ্ছা! স্টেটসম্যানের ওই লেখাটা তোরই ছিল তাহলে? ধুস! যতসব বাজে গুজব ছড়ায় সুনীলদা। দাঁড়া! দেখা হোক একবার! তা হঠাৎ কলকাতায় এলি যে! থাকবি তো এবারে ক’দিন?’

‘হ্যাঁ থাকব। প্রজেক্টের ব্যাপারেই কয়েকটা কাজকর্ম আছে। একেবারে সেরে নিয়ে ফিরব।’

ইন্দ্র কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তারপরে বলল, ‘দেবু, একটা কথা বলব, কিছু মনে করবি না?’

দেবু তার মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে তারপর কেটে কেটে বলল, ‘আমার পার্মানেন্টলি কলকাতায় ফিরে আসা আর বিয়েটিয়ের ব্যাপার ছাড়া তৃতীয় কোনো বিষয় হলে বলতে পারো।’

একটা সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরল ইন্দ্র, ‘নে। সিগারেট নে একটা। আরে, লজ্জা করিস না। তুই সত্যিই বড় হয়ে গেছিস দেবু।’

দুটি সিগারেটের মুখ একে অন্যকে স্পর্শ করে অগ্নিবিন্দু বিনিময় করে। ক্ষীণ একটা ধোঁয়ার সুতো ওপরের দিকে সাপের মতো এঁকেবেঁকে উঠতে উঠতে একসময় ছুঁয়ে দেয় জানালা দিয়ে ঢুকে আসা রৌদ্রের প্রথম রশ্মিকে। সময় স্থির হয়ে থাকে, তবে সে কেবল একটি মুহূর্তের জন্যই।

শীতকাল ব্যাপারটা কলকাতা শহরে ঠিক টের পাওয়া যায় না। এগারোটা নাগাদ চান-খাওয়া সেরে বেরিয়ে একটা এল ফোরটিন সি ধরল দেবু। চিড়বিড়ে গরম। ঘামের একটা ক্ষীণ ধারা বয়ে চলছিল ঘাড় থেকে পিঠ হয়ে কোমরের দিকে। লোকজনের চিৎকার, কন্ডাকটর, যাত্রীদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, সব মিলিয়ে একটা আশৈশব পরিচিত অস্বস্তি ছড়াচ্ছিল তার শরীরে। বহুকাল ছেড়ে দেওয়া পুরোনো নেশার পুনরাবৃত্তির মতো। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই সুপরিচিত, শুধু পুরোনো ভালো লাগাটার বদলে জেগে উঠছে একরাশ বিরক্তি। এক অনিচ্ছুক জাতিস্মর ঠায় বসে থাকে বাসের জানালার ধারে। তার পূর্বজন্মের স্বভূমির প্রতিটি পরিচিত দৃশ্য বহে যায় তার চোখের সামনে দিয়ে। কিন্তু মনখানি পড়ে থাকে সুদূর একটি গ্রামে তার এই জন্মের ঘরদ্বার ও কর্মক্ষেত্রের দিকে।

এই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলতে-চলতে পথ ফুরিয়ে এল কখন টের পায়নি দেবু। সল্টলেকে বাস ঢুকেছে। পি এন বি, বি ডি, কোয়ালিটি…পরিচিত স্থানগুলি পেরিয়ে গন্তব্য এগিয়ে আসে দ্রুত।

বৈশাখীর মোড়ে নেমে এ জি ব্লকে ঢুকল দেবু। হাতঘড়িতে পৌনে বারোটা বাজছে। মেহেরদির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখা আছে বারোটায়। একটা সিগরেট খেয়ে নেবার মতো সময় আছে হাতে।

প্রজেক্টের ব্যাপারে যে তিনজনকে চিঠি দিয়েছিল দেবু তাদের মধ্যে একমাত্র মেহেরদিই জবাব দিয়েছিল। শুধু জবাবই দেয়নি, ডেকে পাঠিয়েছে সোজা কলকাতায়। মেহেরদির ছিল সোশিওলজি। ওদের চেয়ে বেশ অনেকটাই সিনিয়র। দেবুদের ডিপার্টমেন্টের লেকচারার রমেনদার সঙ্গে অ্যাফেয়ার ছিল। সেই সূত্রেই আলাপ। এখন কর্তাগিন্নিতে মিলে পড়ায় ম্যাথস আর সোশিওলজি দুই ডিপার্টমেন্টে। ইতিমধ্যেই শিক্ষক হিসেবে বেশ নাম হয়েছে। পণ্ডিত হিসেবেও।

 সিগারেটটা শেষ করে বাড়ির দরজায় গিয়ে বেল টিপল দেবু। রমেনদা বেরিয়েছে। ক্লাস আছে আজ। মেহেরদি দরজা খুলে দিল এসে। উত্তর চল্লিশে দেখতে আরো সুন্দর হয়েছে। ওকে দেখে বলল, ‘আয়, ভেতরে আয়। বাপ রে! কী দুর্দান্ত চেহারা বাগিয়েছিস একখানা! টল, ব্রোঞ্জড, হ্যান্ডসাম। পেটানো চেহারা। কাঁধছাপা চুলদাড়ি! পুরুষসিংহ যাকে বলে। এরকম একখানা চেহারা বাগালি কী করে?’

দেবু হাসল, ‘রোদেজলে ছুটোছুটি করতে হয়। খেতের কাজকর্ম করি নিজে হাতে। বডিটা পুরো ফিট হয়ে গেছে।’

‘ধুস!’ মাথা নেড়ে হাসল মেহেরদি, ‘এরকম চেহারার একটা ছেলে ঠিক টাইমে পেলে কে তোর রমেনদার সঙ্গে প্রেম করত!’

‘মেহেরদি, ভালো হচ্ছে না বলছি। রমেনদাকে একটা ফোন করে বলব? নির্জন দুপুরে স্বামীর অনুপস্থিতিতে…’

‘অ্যাঁ? বদমাশ ছেলে! মুখের লাগাম নেই কোনো! মারব এক চড়, বুঝবি। বয়সে বড় দিদি, তায় গুরুপত্নী। তার সঙ্গে এমন কথাবার্তা?’

‘হুম। ঠিক বলেছ। হে একচল্লিশ বছরের বুড়ি দিদি… না, মাসিমা, অন্যায় হয়েছে। মাপ করেন। নাকি দিদা বলব?’

‘আবার! এবারে কিন্তু সত্যি সত্যি মেহেরদির হাতের চড় খাবি।’

দেবু হেসে ফেলল, ‘উঁহু, চড় খাব না। লস্যি খাব। সত্যি বলছি মেহেরদি, তুমি কিন্তু আমাদের ইউ জি-র সব ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের হার্টথ্রব ছিলে। মধ্যে থেকে বুড়ো রমেনদা এসে ট্রফি জিতে নিয়ে চলে গেল।’

‘কারণটা সিম্পল। তোদের রমেনদার মধ্যে তোদের অল্পবয়েসিদের মতো কোনো ইমোশনাল ন্যাকামি ছিল না। আমি কোনোদিনই ওর হার্টথ্রব ছিলাম না। কিন্তু ও আমার হার্টথ্রব ছিল। সেটা ও বুঝেছিল ঠিক, আর তাতে সাড়াও দিয়েছিলও খুব ম্যাচিওরভাবে। মেয়েরা পুরুষের কাছে আসলে আদর্শ, ফ্ল্যামবয়েন্স এইসবের বদলে নিরাপত্তা চায়। অধিকাংশ পুরুষই সেটা অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারে না। তোদের রমেনদা সেটা পেরেছিল, আর আমার সেই চাহিদাটা মিটিয়েছেও খুব ভালোভাবে। যাক গে, সেসব কথা। আগে তোর লস্যি বানিয়ে আনি, বোস।’ বলতে-বলতে কিচেনের দিকে চলে গেল মেহের।

কোথাও একটা সূক্ষ খোঁচা ছিল কি কথাগুলোর মধ্যে? কাঁটার মতোন গিয়ে বিঁধছিল সেগুলো দেবুর বুকে। বিবির সঙ্গে ওর সম্পর্কের ব্যাপারটা মেহেরদি জানত। বিবিদের প্রেসিতে পড়িয়েছে ও। তাছাড়া ওদের পাড়ায় মেহেরদির বাপের বাড়ি। পারিবারিক পরিচিতিও ছিল। ঠিক কতটা জানে মেহেরদি? ওদের ছাড়াছাড়িটা নিয়েই কোনো ইঙ্গিত করল কি?

সেক্ষেত্রে বিবি এখন কোথায় কেমন আছে তা-ও হয়তো জানবে কিছু! এখান থেকে কিচেনের খোলা দরজা দিয়ে মেহেরদিকে দেখা যাচ্ছে। মিক্সির মাথাটা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে জিভের আগায় উঠে আসা প্রশ্নটাকে একদম শেষ মুহূর্তে ফের গিলে নিল দেবু।

 মিক্সিতে লস্যি ঘুঁটতে ঘুঁটতে দেবুর মুখটা বারবার মনে আসছিল মেহেরের। কথাগুলো শুনে ছেলেটার মুখের ওপর বিভিন্ন অনুভূতির আনাগোনা তার নজর এড়ায়নি। ওর ভাবনার গতিটা আন্দাজ করে নিতে টেলিপ্যাথি জানবার দরকার হয় না। বিবিকে এখনও ভালোবাসে ছেলেটা। নিজের অজান্তেই সেই একনিষ্ঠতায় কোনো ঘাটতি রাখেনি সে।

ছেলেটা ভালো। ব্রিলিয়ান্টও। শুধু নিজের জীবনটার ব্যাপারে একটু বোকা। বিয়ে এবং মাতৃত্ব এই দুটি মাইলস্টোন পেরিয়ে এসে পুরুষের প্রতি মেহেরের অনুভূতিতে অনেকগুলি অভিজ্ঞতাসঞ্জাত মাত্রা যোগ হয়েছে। তারই মিশেলে, একগুঁয়ে, প্রতিভাধর অথচ জীবনের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ এই তরুণটির প্রতি তার একটা মিশ্র অনুভূতি তৈরি হচ্ছিল। তার পূষণও বড় হয়ে এইরকম হবে কি? আনন্দ বেদনার মিশ্রবর্ণে তার মুখটিও এইরকম উদ্ভাসিত হয়ে থাকবে কি?

দুটো বড় গ্লাসে লস্যি ঢেলে নিয়ে এ-ঘরে এসে একটু অবাক হয়ে গেল মেহের। ঘরের এককোণে টাঙানো হোয়াইট বোর্ডটার কাছে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়েছে দেবু। লাল, নীল মার্কার কলমের দাগ বোর্ড জুড়ে তৈরি করেছে বক্স, চার্ট ও টেকসটের বিচিত্র সমাহার।

সাধারণের চোখে অর্থহীন সেই শব্দ ও রেখাচিত্রের ভিড় মেহেরকে অনেক কথা বলে দিচ্ছিল। তার অভিজ্ঞ চোখ এক ঝলকেই বুঝে নিতে পারছিল, শিক্ষাতত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানে অনভিজ্ঞ এই প্রতিভাশালী ছেলেটি শুধু নিজের মেধার ওপর নির্ভর করে পুনরাবিষ্কার করে চলেছে জীবনমুখী শিক্ষাপদ্ধতির চিরায়ত সত্যগুলিকে। হয়তো ত্রুটি আছে অনেক। সেটা সংক্ষেপে লেখা গোড়ার কথাগুলো থেকেই মালুম। অজ্ঞতা তার চেয়েও বেশি। কিন্তু মডেলটা নতুন। আনকোরা ও নতুন দিশার।

তার চিন্তাপদ্ধতিতে সরাসরি ঢুকে আসতে অসুবিধে হচ্ছিল না মেহেরের। হঠাৎ মাথা থেকে আর সব কিছু দূরে সরে গেছে তখন তার। লস্যির গ্লাস দুটো অবহেলায় পড়ে রইল এককোণে। লাল মার্কার তুলে নিয়ে বোর্ডের আঁকা একটি রেখাচিত্রকে ঘিরে গোল একটা দাগ দিল সে। তারপর বলল, ‘শিক্ষার পরিমাপ করছিস সংখ্যামান দিয়ে; তোর মডেলে একশোর স্কেলে কারো শিক্ষার মাপ তিন, কারো সাড়ে পাঁচ, কারো সতের। সেটা অলরাইট। যদিও তোর পুরো মডেলটা এখনো দেখিনি তবু নীতিগতভাবে মেনে নিচ্ছি এটা করা যায়। তোদের গণিতবিদ্যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় টুলস রয়েছে।

‘কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখছি পরিমাপ শূন্যের নীচে। এটা বোধ হয় ভুল হিসেব রে দেবু। সাধারণভাবে আমরা ধরে নিই শিক্ষা শুরু হয় শূন্য থেকে। তারপর তার মান ক্রমশই বাড়ে। শূন্যের নীচে যায় না।

 দেবু বোর্ড ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসল, ‘ঠিক বললে না মেহেরদি। তোমাদের সমাজবিজ্ঞানের বইতে কী বলে আমি জানি না। কিন্তু হাতেকলমে পরীক্ষাগুলো যতটুকু করেছি তার থেকে আমার বিশ্বাস, নেগেটিভ এডুকেশন হয়। যে শিক্ষা মানুষের জীবনটাকে উল্টোপথে চালায় তাকে আমি ডিফাইন করেছি নেগেটিভ এডুকেশান হিসেবে।’

‘ইন্টারেস্টিং। উদাহরণ দিয়ে বোঝা।’

‘বলছি। যেমন ধরো যে ছেলেটা মাছ ধরে এবং উপযুক্ত মেধাহীন, তাকে বীজগণিত শেখানোটা তার পেশা শিক্ষার সময়টাকে নষ্ট করবে। তার পক্ষে এটা নেগেটিভ এডুকেশান।’

‘আবার অন্যদিকে, জাল বুনতে ও ছুড়তে শেখা কিংবা ইস্কুলে যোগবিয়োগ গুণ ভাগের অঙ্ক, নিজের ভাষায় খানিক লিখতে পড়তে শেখা তার রোজগার বাড়াবে। স্বাস্থ্যবিধির খানিক খানিক বিদ্যে তার চিকিৎসাখাতে খরচ কমাবে। এগুলো তার জন্য পজিটিভ এডুকেশান। এখন, প্রত্যেকটা মানুষেরই তো কিছু নেগেটিভ আর কিছু পজিটিভ শিক্ষা জোটে জীবনে। এবারে ধরো একটা গ্রাম। তার প্রত্যেক বাসিন্দার ক্ষেত্রে সেই শিক্ষাগুলোর সংখ্যা মান যদি বের করা যায়, তাহলে কী হবে বুঝতে পারছ?’

মেহের স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল দেবুর দিকে। খানিক বাদে আস্তে-আস্তে বলল, ‘সেগুলোর যোগবিয়োগ করে গোটা গ্রামটার লোকের কার্যকরী শিক্ষার হিসেব মিলবে।’

‘গ্রেট! এই তো বোঝানো গেছে!’ ছেলেমানুষের মতো হাততালি দিয়ে উঠল দেবু একবার, ‘এবার আর এক ধাপ এগোও মেহেরদি। একবার হিসেবগুলো পেয়ে গেলে, লোকগুলোর শিক্ষাক্রমে তার ক্ষতিকর আর উপকারী শিক্ষার পরিমাণ বাড়িয়ে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব…’

‘ইউ মিন, সেক্ষেত্রে একটা গাণিতিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে…’

‘ইয়েস। একটা এলাকার মানুষজনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট করলে কমপিউটার সেখানকার ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রত্যেক বাসিন্দার একটা সিলেবাস গড়ে দিতে পারবে। এটাই আমর গাণিতিক মডেলের মূলতত্ত্ব মেহেরদি। এর ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে সম্পূর্ণ গৌরীহর এক্সপেরিমেন্ট।’

একেবারে চুপ করে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল মেহের। ধারণাটা একেবারে আনকোরা। আউট অব দ্য বক্স। কিন্তু…

‘সাপোর্টিং স্যাম্পল ডেটা দেখা। শুধু তত্ত্বে হবে না।’

‘দেখাচ্ছি। সঙ্গে আছে কিছু কিছু। দাঁড়াও বের করি।’ বলতে-বলতে দেবু তার ঝোলা থেকে একটা ফোল্ডার বের করে তার ফিতেতে হাত লাগাল।

ঘড়ির কাঁটা ক্রমাগত ঘুরে চলে বাঁধা পথে। তত্ত্বের গাণিতিক কেন্দ্রবিন্দুটিকে ঘিরে আলোচনায়, বিতর্কে, যুক্তি ও প্রতিযুক্তিতে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে তার স্বপ্নের শিক্ষাপদ্ধতির রূপরেখাটি। সেই করতে-করতে কখন যে দিনের আলো পড়ে এসেছে তারা কেউই তা খেয়াল করেনি। খেয়াল হল রমেনদার ডাকে।

‘বলি, অন্ধকারের মধ্যে পড়ার ঘরে দুজন মিলে যা চিৎকার জুড়েছ, রাস্তা থেকে লোক ছুটে আসবে যে এবারে! বৈশাখীর বাজার থেকে গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে তোমাদের। এদিকে সন্ধে হয়ে গেছে যে সেদিকে খেয়াল আছে কারো?’

গলাটা পেয়ে চমকে উঠে দরজার দিকে ঘুরে তাকাল ওরা। রমেনদা ঢুকছে এসে। এসে সুইচে চাপ দিতে ঘর ধুয়ে গেল উজ্জ্বল আলোয়।

মেহেরদির চোখদুটো চকচক করছিল। কিশোরী মেয়েটির মতোই হঠাৎ ছুটে গেল সে রমেনের দিকে। হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল হোয়াইট বোর্ডটার কাছে। বোর্ডের কাছে মার্কার হাতে দাঁড়ানো দেবুর দিকে আঙুল দেখিয়ে গর্বিত গলায় সে বলছিল, ‘এই দেখো, তোমার ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের ছাত্র আমার সোশিওলজি ডিপার্টমেন্টে শিফট করেছে। দুর্দান্ত কাজ করছে গো দেবু! ফ্যানটাসটিক! দেখো, দেখো…’

‘আরে ছাড়ো ছাড়ো…’ রমেনদা হাসতে-হাসতে মেহেরের উৎসুক হাতটাকে ছাড়িয়ে নিল, ‘দেখো দেখি দুই পাগলের কাণ্ড! খেটেখুটে এলাম, আগে হাত মুখ ধুয়ে ঠান্ডা হয়ে বসি, একটু চা-টা দাও, তারপর না হয় দেখা যাবে। বোর্ডটা তো আর পালিয়ে যাবে না কোথাও!’

‘হ্যাঁ মেহেরদি,’ দেবুও রমেনের সঙ্গে সুর মেলাল, ‘আমারও গলা শুকিয়ে গেছে। একটা ছোট্ট ব্রেক দিলে হয় না? একটা সিগারেট খেয়ে নিতাম বাইরে গিয়ে!’

মেহের অধীর ভাবে মাথা নাড়ল, ‘না হয় না। পূষণ টিউশন সেরে সাড়ে আটটা নাগাদ ফিরবে। তারপর ওর বাপ পড়বে ছেলেকে নিয়ে। আর সময় পাবে না। কাজেই ওর আগে তুই তোর কাজের ম্যাথমেটিকাল অ্যাসপেক্টগুলোর একটা ওভারভিউ দিবি তোর রমেনদাকে। আর তুমিও শোন, প্রথমে আমি একটা দশ মিনিটের সিনপসিস দিচ্ছি গোটা ব্যাপারটার, তারপরে দেবুর কাজের অঙ্কের দিকটায় একটা প্রাথমিক চোখ বুলিয়ে নেওয়া না পর্যন্ত নো চা, নো ঠান্ডা হয়ে বসা। যতক্ষণ তুমি কাজটা দেখতে থাকবে ততক্ষণে আমি তোমাদের চা জলখাবার বানাব। দুর্দান্ত কবিরাজি কাটলেট বানিয়ে খাওয়াব যদি কথা শোন তবে। আর দেবু, সিগারেট তুই এখানেই বসে খা। বাইরে যেতে হবে না। না না, তোর রমেনদার দিকে চাইতে হবে না। আমার বাড়ি, আমি পারমিশান দিচ্ছি।’

‘অর্থাৎ তুমি আজ খেপেছ!’ রমেনদা মাথা নাড়ল, ‘অগত্যা! তবে ওই প্রমিসড মজুরিটা যেন পাওয়া যায়। কী বলিস দেবু? তোর মেহেরদি ভাতটাত যেমনি রাঁধুক এই কবিরাজিটা জব্বর বানায়।’

‘ভাত নিয়ে কী বললে? আরেকবার বলো?’

‘আরেকবার বলব কেন প্রিয়ে? আমার ঘাড়ে কি দু’খানা মাথা আছে? নে, শুরু কর।’ রমেন একটা চেয়ার টেনে হাত পা ছড়িয়ে বসল।

রাত সাড়ে দশটার নির্জন সল্টলেকের পথে একলা অটোয় বসে হঠাৎ, সেই মুহূর্তে ফের ঈশ্বরপুরে ফিরে যাবার একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠছিল দেবুর মনে। কলকাতা শহরটাকে যতটা ভুলে যেতে পেরেছে বলে তার ধারণা ছিল, ততটা ভোলা যায়নি। আজ সকাল থেকে স্মৃতি ও বর্তমান মিলে হাজারো অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে টান লাগিয়েছে তার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। আলোজ্বলা হোর্ডিংগুলো থেকে শুরু করে পথের পাশের ছোট ছোট পান গুমটিগুলি অবধি কী যে মায়ায় বাঁধতে চাইছে তাকে ফের!

জোব চার্নকের সমাধির সেই বৃষ্টির দুপুরগুলো, জ্যামাক্রান্ত ট্রামে বাসে ঘর্মাক্ত কালক্ষেপ, সব স্মৃতি জেগে উঠে আক্রমণ চালিয়েছে ফের তার হৃদয়ের দখল নিতে। বড় নিরাপত্তাহীন বোধ করছিল দেবু। অস্তিত্বের স্থানাঙ্কটি তার, একই সময়বিন্দুতে জড়িয়ে পড়েছে দুটি আলাদা সামাজিক প্রেক্ষাপটে…দুটি আলাদা জীবনে।

.

.

দিনচারেক থেকে ফিরে গেল দেবু। বাইরে থেকে সেই একইরকম হাসিখুশি ছেলেটার ভেতরে ভেতরে বিরাট বদল এসেছে একটা। এই চারদিন কাছে থেকে দেখে সে ব্যাপারে একটা ভালো আন্দাজ পেয়ে গিয়েছিল রমা। সেই হুল্লড়ে ইরেসপনসিবল ছেলেটার জায়গায় একটা দায়িত্ববান শক্তপোক্ত পুরুষমানুষ। কথা কম বলে খুব। শুধু হাসিটা আগের মতো প্রাণখোলা রয়ে গেছে।

নিজের ছেলেমানুষীতে এক এক সময় নিজেরই ওপরে রাগ হয় তার। বড় খারাপ ব্যবহার করেছে এই ছেলেটার সঙ্গে সে একসময়। তারপর চাকরি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে মালদায় চলে গেল যখন, হাঁফ ছেড়ে ভেবেছিল, অন্তত কিছুদিনের জন্য বাঁচা গেল। দেবু যে কলকাতা ছেড়ে ওখানে দু’তিনমাসের বেশি টিকতে পারবে না সে বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ ছিল একরকম। তবে ওই, যদ্দিন দূরে থাকে, একটা বেকার ছেলের বোঝা টানতে হবে না। কিছু পয়সার সাশ্রয় হবে। চাকরি ছেড়ে পালিয়ে আসবে যখন, তারপর দুই ভাইকেই যেসব চোখা চোখা কথা শোনাবে, নিজের মনেই তারও মহড়া দিত সে মাঝে মাঝে।

কিন্তু ছেলেটা আর ফিরল না। ক’দিন পরে মা’কেও নিয়ে গেল সঙ্গে করে। তারপর একসময় বাড়িতে আসা বন্ধই করে দিল একেবারে। ফাঁকা বাড়িতে স্বামী-পুত্র নিয়ে একেশ্বরী হয়ে থাকতে থাকতে একটা সময় ইন্দ্র আর বাপ্পা দু’জনের চোখেই সে নিরুক্ত অভিযোগের দৃষ্টি দেখেছে। যেন তারই দোষে ছেলেটা, তার মা দেশছাড়া হল।

আস্তে-আস্তে রমার মনেও একটা অভিমান জমে উঠতে শুরু করেছিল দেবুর ওপরে। বউদি নয় তোমার পরের বাড়ির মেয়ে। সে খারাপ হতে পারে। কিন্তু নিজের দাদা আর ফুটফুটে ভাইপোটাকেও এমন ছাড়াই ছাড়লে যে এতগুলো বছরের মধ্যে একটা রাতও এসে কাটাতে পারলে না এই বাড়ির ছাদের তলায়?

এবারে ছেলেটা হঠাৎ ক’দিনের জন্য উল্কার মতো ফের তার পরিবারের কক্ষপথটিতে ছিটকে এসে, সব অভিমানের আগাছা উড়িয়ে পুড়িয়ে দিয়ে ফের নির্মল করে দিয়ে গেছে তাকে। আর একটা ব্যাপারও পরিষ্কার হয়ে গেছে দেবুর আচরণে। তার ওপর রাগ করে বাড়ি ছাড়েনি সে। আসলে সে ছেড়েছে এই কলকাতা শহরটাকেই। তবে অন্য কারণে। জিগ্যেস করতে শুধু হেসে বলেছিল, ‘মন বসে গেল বউদি। জায়গাটা ভারি সুন্দর। লোকগুলোও ভালো। ছেড়ে আসতে ইচ্ছে হল না।’

ওর বিয়েটা ভেঙে যাবার কারণটা এবারে একটু একটু আন্দাজ করতে পেরেছিল রমা। বলেছিল, ‘বিবি বোধ হয় ওখানে থাকতে রাজি হয়নি, না গো?’

উত্তরে শুধু একবার মাথা নেড়ে কথা ঘুরিয়ে নিয়েছিল দেবু। রমাও আর খোঁচায়নি বিশেষ। প্রশ্ন করেনি, তারপর থেকে কেন একবারও একরাত্রের জন্যও এই শহরটার কাছে এসে থাকেনি সে। তবে ক্ষতমুখটা যে এতদিন পরে একটু জুড়ে আসছে সেটা সে আন্দাজ করতে পারছিল। কিন্তু আঘাতটা একেবারে বদলে দিয়ে গেছে ছেলেটাকে।

কলকাতায় থাকবার জন্য দেবু যে আর ফিরবে না সেইটুকু অন্তত বুঝেছে রমা। তবে সেজন্য তার কোনো দুঃখ নেই আর। দেবুর মনে তার প্রতি কোনো অভিমান যে নেই সেটা বুঝতে পেরেই মনের ওপর থেকে একটা বিরাট বোঝা নেমে গেছে। এর আগে অনেকবার ইন্দ্র ঈশ্বরপুরে যাবার কথা বলেছে, কিন্তু রমা কেবল এড়িয়ে যেত। সঙ্কোচটা যে কোথায় সেটা ইন্দ্র বোঝবার চেষ্টা করেনি কখনো। উল্টে অসন্তুষ্ট হয়েছে, ঝগড়া করেছে, তার জন্যেই এই সংসারটা এভাবে ভেঙে গেল বলে গালাগালও করেছে বহুবার। এইবারে সেই সঙ্কোচটা আর নেই রমার। দেবুকে বলেও দিয়েছে, বাপ্পার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে পরে তিনজনে ঈশ্বরপুরে গিয়ে থেকে আসবে ক’দিন। গৌড়টৌড়ও ঘুরে আসবে একেবারে। সবাই মিলে।

অফিসের ফাইলের স্তূপে মাথা ডুবিয়ে এইসব এলোমেলো কথা ভাবছিল সে, এমন সময় মোবাইল ফোনটা বাজল। চড়া রিংটোন। ব্যাগের ভেতরে রাখা থাকলেও দিব্যি শোনা যায়। ফোনটা বের করে নম্বরটা দেখল একবার রমা। অচেনা নাম্বার। টাটা ইন্ডিকমের। আজকাল অনেক রকম বোগাস কলটলও আসে। নম্বর নোট করে নিয়ে কলটা রিজেক্ট করে দিল সে। তারপর ল্যান্ডলাইন থেকে নম্বরটা মেলাল একবার।

দু’বার বেজেই রিসিভ হয়ে গেল কলটা। এক মহিলার গলা। রমা বলল, ‘খানিক আগে এই নাম্বার থেকে আমার সেলে একটা…’

‘আপনি কি দেবব্রতর বউদি?’

‘হ্যাঁ। কে বলছেন?’

‘নমস্কার বউদি। আমার নাম মেহের। দেবু আমার হাজবেন্ডের ছাত্র।’

এইবার চিনতে পারল রমা, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি। আপনাদের সল্টলেকের বাড়িতেই তো দৌড়োদৌড়ি করল এই ক’দিন! কীসব পড়াশোনার ব্যাপার-স্যাপার।’

‘হ্যাঁ। দেবুর থেকেই আপনার নাম্বার নিয়ে রেখেছিলাম। ওর ব্যাপারেই একটা কথা আছে আপনার সঙ্গে। একটু সময় হবে?’

‘দেবুর ব্যাপারে… আমার সঙ্গে? মানে?’

ঝরঝর করে একটা হাসির শব্দ পাওয়া গেল ফোনের ওপার থেকে। ভারি সুন্দর হাসতে পারে এই মেয়েটা, ‘হ্যাঁ বউদি। আপনার সঙ্গেই দরকার। দেবুর কাছে বাড়ির যা খবরটবর পেয়েছি তাতে আপনি ছাড়া অ্যাপ্রোচ করবার মতো আর কেউ তো নেই। আসলে ওর ব্যাপারে দু’একটা জরুরি প্রশ্ন আছে আমার।’

‘ঠিক বুঝলাম না। কোনো সমস্যা-টমস্যা…’

আবার হাসল মেহের, ‘না না, বউদি। সমস্যা কী বলছেন? ব্রিলিয়ান্ট ছেলে আপনার দেওর। অসাধারণ কাজ করছে একটা। ওরকম ছেলে লাখে একটা মেলে।’

‘অসাধারণ কাজ… মানে? ও তো মালদার ওদিকে একটা স্কুলে কাজ করে! মাইনেও এমন একটা কিছু আহামরি নয়।’

‘না না সেসব ব্যাপার নয়। ও অত কথা ফোনে বলা যাবে না। আসুন না কাল বিকেলে একটু আড্ডা মারি। দেবুর কাছ থেকে সব খবরই পেয়ে গেছি। আপনার অফিস তো এসপ্ল্যানেডে! ছুটির পরে ফেরবার পথে কলেজ স্ট্রিটে নেমে প্রেসিডেন্সির সামনে যদি চলে আসেন একবার…’

রমার কৌতূহল হচ্ছিল। বিয়ের সম্বন্ধ-টম্বন্ধের ব্যাপার হবে হয়তো। গিয়ে একবার দেখা যেতে পারে। একটু ইতস্তত করে সে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। কাল তবে…’

‘সাড়ে পাঁচটা থেকে ছ’টা। প্রেসিডেন্সির সামনে। আমি ওয়েট করব। সাদা খোলের শাড়ি পরে থাকব। কাঁধে জুটব্যাগ। কপালে সবুজ টিপ। দিলখোশে গিয়ে বসা যাবে দুজনে মিলে।’

মেয়েটার গলায় ম্যাজিক আছে। মনের আগলগুলো খসে পড়ছিল রমার। বিদ্যাসাগরের ছাত্রী সে। ওই কলেজ স্ট্রিট এলাকায় তারও যৌবনের প্রথম পাঠ। কতদিন ওই পাড়ায়…।

‘না মেহের। দিলখোশ চলবে না। বড় ছোট ছোট বেঞ্চ। বসে সুখ নেই। কফি হাউসে যাব। কতদিন যাইনি!’

ফের ঝরঝর করে হাসল মেহের, ‘বেশ। তাই হবে। চলে আসুন তবে।’

প্রেসিডেন্সির দরজার মুখটাতেই দাঁড়িয়েছিল মেহের। পোশাক দেখে চিনে নিতে কোনো অসুবিধে হল না রমার। অবশ্য কোনো চিহ্ন না দিয়ে দিলেও হাজারো মানুষের মধ্যে থেকে তাকে চিনে নিতে কোনো অসুবিধে হত না। গলা শুনে একটা মানুষের যেমন ছবিটা ভেসে উঠেছিল চোখের সামনে, মেহেরকে ঠিক তেমনি দেখতে।

মেহের অবশ্য তাকে খেয়াল করেনি। মাটির দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল। রমা এসে তার কাঁধে মৃদু ছুঁয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি মেহের? চলুন। এসে গেছি।’

‘কে বউদি? এসে গেছেন? চলুন।’ বলতে-বলতে মেহের তার মুখের দিকে চাইল একবার। তারপর হেসে বলল, ‘দেবুর মুখে বউদি বউদি শুনে ভেবেছিলাম বয়স্ক কেউ হবেন হয়তো। কিন্তু আপনি তো… মানে… কোন ইয়ারের গ্র্যাজুয়েট বলুন তো আপনি?’

‘৯৯। বিদ্যাসাগর।’

‘হুম। তাহলে তো আর বউদি বলা যাবে না। মাত্র দু’বছরের সিনিয়ার। আমি ২০০১। প্রেসি। তোমায় আমি রমাদি বলে ডাকব কিন্তু।’

‘তা ডাকো না! মাসিপিসি না বলে কেউ দিদিটিদি বললে আজকাল নিজেকে একটু ইয়াং ঠেকে। এমনিতেই তো অফিসের ফাইল আর রান্নাঘরের হাঁড়ি দুই ঠেলতে ঠেলতে বুড়িয়ে গেছি প্রায়।’

‘বাঃ, বেশ বেশ। আমারও সেই একই দশা। আমার কত্তা শুধু কলেজে পড়ান, আমি পড়াই, হাঁড়িও ঠেলি। এবারে তবে দুই বুড়ি মিলে চলো একটু আড্ডা মেরে বাড়ি যাই।’

‘চলো।’

কফি হাউসের দোতলার এই কোণটা বেশ নির্জন। নীচের বিরাট হলঘরে একরাশ মৌমাছির মতো গুঞ্জন তুলেছে অজস্র মানুষ। সেই দিকে তাকিয়ে রমার অবাক লাগছিল। জনপিণ্ডটির বয়স, হাবভাব সব সেই একইরকম রয়ে গেছে এতগুলো বছরে। নদীর স্রোতের মতো। শুধু জলকণাগুলি বদলে গেছে, এই যা।

মুখোমুখি বসে মেহের বলল, ‘বলো কী খাবে। অর্ডার দিয়ে আসি।’

‘উঁহু। চলবে না। তুমি বলবে। আমি অর্ডার দেব। আজকের দিনটা অন মি।’

‘রমাদি, আজ কিন্তু আমি তোমায় ডেকেছি এখানে।’

‘ঠিক। সেইসঙ্গে দিদিও ডেকেছ যে! এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসে বলো দেখি কী খাবে?’

মেহের হাসল, ‘ঠিক আছে। বলছি। ঠান্ডা কফি আর চিকেন পকোড়া। এইখানে আমার স্টেপল ডায়েট।’

‘বেশ। আমি কিন্তু একটা ভেজ পকোড়া নেব। বৃহস্পতিবারে আমার আবার চিকেন টিকেন চলে না।’

‘আমার সব চলে। তবে এক যাত্রায় পৃথক ফল করে লাভ নেই। ওই দুপ্লেট ভেজ পকোড়াই বলে দাও তবে। সঙ্গে কোল্ড কফি।’

‘এবার বলো দেখি ডেকেছিলে কী জন্য?’ খানিক বাদে কফির গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে রমা জিজ্ঞাসা করল।

‘তুমি তো দেবুর বউদি হও। দেবু বিবির বিয়েটা ভেঙে গেল কেন সে ব্যাপারে কী জানো বল তো? ওরকম হ্যান্ডসাম একটা ছেলে, ওরকম ট্যালেন্টেড! বিবিও তো খুবই ভালো মেয়ে। হঠাৎ কী এমন ঘটল যে…’

‘কিন্তু তুমি এত কথা জানলে কী করে? দেবু তো পড়াশোনার ব্যাপারে মাত্র দিনচারেক তোমার বাড়িতে যাতায়াত করেছে। অ্যান্ড হোয়াট ইজ ইওর পয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট?’

‘বলছি। ইন্টারেস্ট আমার নানারকম। প্রথমত, ওর ছাত্রাবস্থা থেকে দেবুকে একটু একটু চিনতাম আমি। আমার কর্তা ওদের ডিপার্টমেন্টে পড়াতেন। সেই সূত্রে ডিপার্টমেন্টে যাতায়াত করবার সময় মুখ চেনা। দু’নম্বর কথা, বিবি আমার বাপের বাড়ির পাড়ার মেয়ে। এতটুকু বয়স থেকে দেখেছি ওকে। পড়াশোনাও করেছে আমারই ডিপার্টমেন্টে। আমার কাছে সবই বলত এসে। দেবুর সঙ্গে ওর অ্যাফেয়ারটার শুরুর থেকে সব কথাই আমি জানি। ড্যাশিং মেয়ে। দেবুর ওই গ্রামের ইশকুলে গিয়ে পড়ে থাকাটা ওর একেবারে পছন্দ ছিল না। কতবার আমায় বলেছে, নিজেকে ওখানে পড়ে থেকে নষ্ট করে ফেলছে দেবু। তারপর শেষমেশ নিজেই উদ্যোগ নিয়ে দেবুর জন্য একটা ওপেনিং খুঁজে বের করে, পেছনে লেগে থেকে ওকে দিয়ে অ্যাপ্লাই করিয়ে ছাড়ল।

‘ওর সঙ্গে সিঙ্গাপুরে যাবে বলে এখানে সুগতদার কাছে পিএইচডি করবার অফারটাও ছেড়ে দিয়েছিল বিবি। তার বদলে এনইউএস-তে যে পিএইচডি প্রোপোজালটা পাঠাল সেটা সুগতদা আমাকে দিয়ে এডিট করিয়ে নিয়েছিলেন।

‘কিন্তু সেবার ঈশ্বরপুর থেকে পুজোর পর ফিরে এসে সেই যে মুখে কুলুপ আঁটল মেয়েটা, আর একটা কথাও বলল না দেবুর ব্যাপারে। তারপর কিছুদিনের মধ্যে সুমিতের কাছে সিঙ্গাপুরে চলে গেল।

‘আমার সঙ্গে ওই কাজের ব্যাপারেই রেগুলার যোগাযোগটা রেখে চলেছে ও এখনো। সিঙ্গাপুরে ও আর নেই অবশ্য। স্টেটসে চলে গেছে। কিন্তু সেখানে গিয়েও ব্রিলিয়ান্ট কাজ করে চলেছে মেয়েটা, জানো! আর এইটাই আমার তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবার একটা প্রধান কারণ। ওর রিসার্চের বিষয়টা। কম্পোনেন্টস অব ট্র্যাডিশনাল এডুকেশন ইন থার্ড ওয়ার্ল্ড ভিলেজেস।’

‘দেখো ভাই, ফাইল আর হাঁড়ি ঠেলে এখন মাথায় কিঞ্চিৎ মরচে ধরে গেছে,’ হঠাৎ রমা মেহেরকে থামিয়ে দিয়ে হাসল, ‘অত কঠিন কঠিন কথা বললে…’

‘সরি রমাদি। ছাত্র চরিয়ে চরিয়ে অভ্যেস এমন খারাপ হয়ে গেছে বলার নয়,’ মাথা নাড়ল মেহের, ‘সহজ করে বললে, আমাদের মতো দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের আসল শিক্ষাটা স্কুলে হয় না। হয় তার পেশাক্ষেত্রে। শিশু বয়েস থেকে রান্নাঘরে, পুজোর মণ্ডপে, চাষের খেতে, হস্তশিল্পের কারখানায়, কামারশালে, কুমোরের চাকে শিক্ষার হাতেখড়ি হয় ছোটদের। মা দিদিমার মুখের গল্প তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রার কৌশল শেখায়। আর সেইসব থেকেই তারা বড় হয়ে জীবনধারণের রসদ জোগাড় করে। এই যে গ্রামদেশের নানান শিক্ষার ধারা, তাদের ভালোমন্দ প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে মেয়েটা।’

‘বুঝলাম। তো? এর সঙ্গে…’

‘একটু ধৈর্য ধরে শোনো। সব বুঝতে পারবে। মেয়েটা আমার সঙ্গে যোগাযোগটা রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ওদের বিয়ের ব্যাপারটা ভেঙে যাবার বিষয়ে একেবারে নীরব। সঙ্কোচের মাথা খেয়ে জিগ্যেসও করে দেখেছি দু-একবার। প্রশ্নটা জাস্ট এড়িয়ে গেছে।

‘আমার সন্দেহ ছিল, ঈশ্বরপুর গিয়ে দেবুর কাছে কোনো সাংঘাতিক খারাপ ট্রিটমেন্ট পেয়ে হয়তো শক পেয়েছে মেয়েটা। ছেলেটার সম্বন্ধে কাজেই খুব বাজে একটা ধারণা নিয়েই বসে ছিলাম।

‘সন্দেহটা আমার প্রথম কাটল মাসখানেক আগে দেবুর একটা চিঠি পেয়ে। ওতেই প্রথম ওর গবেষণার বিষয়টা ও আমায় জানায়। জানায় যে বছর চার-পাঁচ হল ঈশ্বরপুরের কাছে গৌরীহর বলে একটা গ্রামে ও একটা গবেষণার কাজ শুরু করেছে। চিঠিতে যেটুকু লিখেছিল তাতে কাজের বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছিল। তাই ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম আমি।

‘একটু ইনটারাপ্ট করব?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয় রমাদি। বলো না!’

‘বিবির ব্যাপারটা নাহয় বুঝলাম। একটা বড় জায়গায় ঠিকঠাক পরিবেশে ভালো একটা কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু ওই অজ গ্রামে বসে ঠিক কী কাজ করছে দেবু যে তোমাদের মতো পণ্ডিত মানুষও তাতে এত আগ্রহ দেখাচ্ছ? স্টেটসম্যানেও তো মধ্যে কী একটা আর্টিকেল বেরোল ওর। পড়িনি অবশ্য। ওর দাদার মুখে শুনেছি।’

‘বলছি। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় একটা আমূল বদল আনবার চেষ্টা করছে ও। গ্রামাঞ্চলে যে অজস্র জাতের প্রথাগত শিক্ষা চালু রয়েছে, সেগুলোকে একসঙ্গে করে, কোনটা কতটা কাজের তার হিসেব করে একটা গাণিতিক মডেল বানাচ্ছে ও। সেটা কমপিউটারাইজ করা সম্ভব হবে। তাতে একটা অঞ্চলের এই প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থাগুলোকেই সামান্য এদিক-ওদিক করে সে এলাকার ডেভেলপমেন্টকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ব্যাপারটা সফল হলে তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষার এখনকার মডেলটা আমূল বদলে যেতে পারে রমাদি। শিক্ষাক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়েসের কনসেপ্টও ঘুচে যাবে।

‘ওই অজ গ্রামে বসে এই কাজ করছে দেবু? কিন্তু কেমন করে?’

‘একটা আশ্রম বানিয়েছে গৌরীহরে। সেখানে, বিভিন্ন ট্র্যাডিশনাল জ্ঞান আর আধুনিক জ্ঞানকে মিশিয়ে নানাজাতের সিলেবাস বানিয়ে সেগুলো ব্যবহার করে হাতেকলমে তার ফল দেখছে। ফলের ওপর ভিত্তি করে সিলেবাসের কম্পোনেন্টগুলোকে অদল বদল করে কোনটায় ওদের সবচেয়ে বেশি লাভ হয় সেইটে খুঁজে বের করতে চাইছে।

‘রমাদি, এবারে ওকে ডেকে পাঠিয়ে এই চারদিন ধরে আমি আর ওর রমেনদা দুজনে মিলে শুধু বুঝবার চেষ্টা করেছি ওর কাজের দর্শনটাকে। আমি সোশিওলজিস্ট। তোমাদের রমেনদা ম্যাথমেটিশিয়ান। কিন্তু এই দুটো বিজ্ঞানকে মিলিয়ে শিক্ষার এরকম একটা কনসেপ্ট যে তৈরি করা যায় সেটা আমাদের ওয়াইডেস্ট ইম্যাজিনেশানেও…’

‘দাঁড়াও মেহের। দুজনেরই কাজের ফোকাসটা হল গ্রামাঞ্চলে নানান ট্র্যাডিশনাল শিক্ষাধারার যৌথ প্রভাব… তার মানে তুমি কি বলতে চাইছ ওরা হাজার-হাজার মাইল দূরে বসে একটাই বিষয়কে নিয়ে…’

হঠাৎ থেমে গিয়ে হাসিমুখে রমার দিকে তাকিয়ে রইল মেহের। তারপর বলল, ‘এইবার বুঝেছ, কেন আমি খেপে উঠে তোমার সঙ্গে কনট্যাক্ট করেছি? বিষয়টা নিয়ে কেতাবি কাজ করছে আমাদের মেয়েটা বিলেতে বসে, আর বাবু বাংলা পাড়াগাঁয়ে বসে সেই একই জিনিসকে হাতে কলমে করে যাচ্ছে। বোঝো একবার!

‘বুঝলে রমাদি, কাটলে পরে আর সব জিনিস নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু হিরের দ্যুতি বাড়ে। এদুটো ছেলেমেয়ে হিরের দুটো টুকরো গো। ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে দুটোতে মিলেই কাজটাকে আঁকড়ে ধরেছে। আর সেইখানটাতে, সম্ভবত নিজেদের অজান্তেই একটাই বিষয় নিয়ে লড়ে যাচ্ছে দুজনে।’

 ‘বুঝলাম। মিঞাবিবি রাগ করে ছাড়াছাড়ি হয়ে দুই দেশে গিয়ে বসেও অ্যাকাডেমিক দাম্পত্য পালন করে চলেছেন। পাগল…পাগল…অবশ্য ব্যাপারটা খানিক কাকতালীয় বটে। স্টিল…’

‘না রমাদি,’ মেহের ঠোঁট কামড়ে কিছু ভাবছিল। খানিক পরে চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘এটা অ্যাক্সিডেন্টাল নয় বোধ হয়। বিবি ওর গবেষণার বিষয়টা দেবুর কথা থেকেই পেয়েছিল। আবার ওর কাজের ব্যাপারটা নিয়ে দেবুকে ডিটেইলে বলেওছিল, সে কথাও আমি নিজে বিবির কাছে জেনেছি। ও চলে যাবার বেশ কয়েক মাস বাদে দেবু তার প্রজেক্টটা শুরু করে, সেটা দেবুই বলে গেল আমাকে। হয়তো এইভাবেই নিজেদের কাজটার ভেতর দিয়ে ওরা একে অন্যকে ছুঁয়ে থাকতে চায়।

‘…আমি আর তোমার রমেনদা মিলে এ নিয়ে কথা বলছিলাম। এদের একত্রে জুড়ে দিতে পারলে, গবেষণাটার দুটো অ্যাসপেক্টকে একত্র করে দিতে পারলে…’

‘কাজটা একটা সম্পূর্ণতা পাবে। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা কী জানো মেহের?’ রমা হঠাৎ তার কথার স্রোতে বাধা দিল এসে, ‘তোমার অ্যানালিসিসটা সত্যি হলে, ওদের ভালোবাসাটা মরেনি। ওরা একে অন্যকে ছুঁয়ে থাকতে চাইছে এভাবে। কাজটার মধ্যে দিয়ে। আমি…’

‘গ্রেট। আসল কথাটায় এসো তবে। ওদের ছাড়াছাড়ি হল কেন? সেটা জানতে পারলে যদি কিছু একটা করা যায় ব্যাপারটায়।’

‘খোলাখুলি এ নিয়ে বিশেষ আলোচনা কখনো হয়নি ওর আমার সঙ্গে, তবে এবারে কথা বলে যা বুঝলাম, দেবু ওই গ্রামটা ছেড়ে আসতে চায়নি, কিন্তু বিবিও ওই অজ গ্রামে ওর সঙ্গে থাকতে রাজি হয়নি বলেই সম্ভবত ছাড়াছাড়ি।’

‘আমারও তাই অনুমান হয়েছিল। তোমার থেকে কনফার্ম করে নিলাম কেবল। উঁহু, বিবিকে দোষ দেওয়া যায় না। যে কোনো সাধারণ মেয়ের পক্ষে এটা একটা মেজর শক। না না, আমাদের মেয়ের কোনো দোষ নেই। দোষ যদি কিছু থাকে তবে সে তোমাদের ছেলেরই।’ বলতে-বলতে হেসে উঠল মেহের।

তার হাসিটি সংক্রামিত হচ্ছিল রমার মধ্যেও। তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে মেহের বলল, ‘ব্যস। বোঝা গেছে। এবারে ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দাও দেখি।’

‘কিন্তু মেহের, বিবি কি ফিরতে চাইবে আর?’

মেহের হাসল, ‘চাইবে। এনইউএস থেকে পিএইচ ডির কাজ শেষ হয়ে গেছে ওর। ওখান থেকে ইউএসএ-তে কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে শিফট করে গেছে। পড়াচ্ছে, পেপারও পাবলিশ করছে কিছু কিছু, কিন্তু থাকতে চাইছে না আর ওদিকে। যে বিষয়টা নিয়ে ওর কাজ তাতে একটা স্তরের পর ওদেশে বসে খুব একটা বেশি এগোনো যাবে না। হাতেকলমে ফিল্ডে এসে কাজ করতে হবে। এখন তাই এদেশে ভালো ওপেনিং খুঁজছে একটা। আমাকে বায়োডেটা পাঠিয়ে রেখেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। দেখা যাক।

‘এনিহাউ। তোমার থেকে মোটামুটি যা যা জানবার ছিল সেগুলো জেনে আর কনফার্ম করে নেওয়া গেল। এবার দেখছি কী করা যায়। একজন বিদেশে একলা পড়ে থাকবে আর অন্যজন বাউন্ডুলে হয়ে টই টই করে গাঁ-গঞ্জে ঘুরে বেড়াবে এ আমি হতে দিচ্ছি না।’

‘দেখো। যদি পারো তো তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব মেহের। আমরা সবাই। শুধু, আমায় একটু ফিডব্যাক দিও মাঝে মাঝে। ফোন নম্বর তো রয়েছেই।’

‘ফোন মানে? এই শনিবার ছেলে আর কত্তাকে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে আসছি। তোমায় আমার ভীষণ ভালো লেগে গেছে রমাদি, বুঝলে!’

রমা হাসছিল। ফুরফুরে ঠেকছে বেশ। এই মেয়েটার সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালে বুকের দমচাপা ভাবটা কেটে যায়। খানিক বাদে জিজ্ঞাসা করল, ‘কত বড় হল তোমার ছেলে?’

‘এই আগস্টে আট পেরিয়ে ন’য়ে পড়ল সবে।’

‘আমার হনুমানটি তবে ওর চাইতে অল্পই বড় হবে।’

‘সে নয় হল, কিন্তু এতবড় একটা কমপ্লিমেন্ট দিলাম, রেসিপ্রোকেট করলে না তো? অ্যাই, শিগগির বলো আমায় ভালো লেগেছে কিনা?’

রমা হেসে বলল, ‘তোমার মতো মেয়েকে কমপ্লিমেন্ট দেব আমি? ধুস!’

‘অ্যাই শোনো, ওসব কমপ্লেক্স ছাড়ো তো দেখি! শনিবার কী খাওয়াচ্ছ বলো। আমরা কিন্তু আউট অ্যান্ড আউট নন ভেজ, আর দুজনেই মদনা।’

‘মদনা মানে?’

‘মানে মদ না, টি টোটেলার। ম্যাক্সিমাম ফ্রুট জুস চলে।’

খিলখিল করে হেসে ফেলল রমা। বলে, ‘বাব্বা! পারোও তুমি মেহের! না না, আমাদের বাড়িতেও ওসব পাট টাট নেই। ওদিন কোরমানি পোলাও খাওয়াব। একবার খেলে আর ভুলবে না দেখো।’

‘শুধু খাব না, রেসিপিটাও নিয়ে আসব লিখে।’

হাঁটতে-হাঁটতে ওরা তখন মহাত্মা গান্ধী-বিধান সরণী জাংশানে চলে এসেছে। একটা সল্টলেকগামী একাত্তর দাঁড়িয়ে প্যাসেঞ্জার ডাকছিল। কথাটা বলে হাসতে-হাসতে মেহের তার পেছনের গেট দিয়ে উঠে গেল ভেতরে। বাসটাকে বেশ খানিকক্ষণ চোখ দিয়ে অনুসরণ করল রমা। বেশ মেয়েটা।

.

.

‘যাঃ। আবার গেল। কলকাতায় বাপু বহুদিন এরকম ঘন ঘন লোডশেডিং দেখিনি। আচ্ছা তোর কি গরম-টরমও লাগে না, হ্যাঁ রে!’

গজগজ করতে-করতে একটা হাতপাখা নিয়ে সুনন্দা এসে দেবুর পেছনটায় বসলেন। শ্রাবণের মাঝামাঝি। বৃষ্টির চিহ্নও নেই। ভ্যাপসা গরমে কারেন্ট যাওয়া মানে যমযন্ত্রণা একেবারে।

মনিটরের পর্দা থেকে বেরিয়ে আসা নীলচে আভায় ঘরে আবছা আলো হয়েছে। ইউপিএস পিঁক পিঁক করে শব্দ তুলছিল। পর্দার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই দেবু মাথা নাড়ল একটু, ‘সবে নতুন ট্রান্সফর্মারটা বসল তো এলাকায়! কিছুদিন একটু এরকম গন্ডগোল চলবেই। ওইজন্যেই তো কমপিউটার আনবার সময় ইউপিএসও নিয়ে এসেছি একটা।’

‘এই ছেলে, তুই এদিকে ঘুরে কথা বলবি?’ সুনন্দার গলায় একটু বিরক্তির ছোঁয়া ছিল, ‘কী শুরু করেছিস তুই! গত দেড় বছর ধরে কী যে শুরু করেছিস! একটা ছুটির দিনে বাড়ি থাকিস না। ইশকুল খোলা থাকলেও ছুটি নিয়ে গিয়ে মাসের অর্ধেক সময় হয় কলকাতা, নয় ওই পোড়ার আশ্রমে গিয়ে পড়ে থাকিস। আর বাড়িতে যখন থাকিস তখনও ইশকুলের সময়টা বাদ দিয়ে ওই এক কমপিউটার মুখে বসে আছিস। নাওয়া নেই খাওয়া নেই। সীতাও সেদিন বলছিল, ‘ছেলের হলটা কী দিদি?’

‘বলছি মা। জাস্ট একটু আর। ব্যাটারি ব্যাক আপ শেষ হয়ে এল বলে। পেপারটার আর দুটো পাতা পড়া বাকি…’

বলতে-বলতেই হঠাৎ লম্বা একটা বাঁশির সুরের মতো শব্দ তুলে দেবুর সামনের পর্দাটা অন্ধকার হয়ে গেল।

‘বেশ হয়েছে। বাঁচা গেছে।’ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সুনন্দা, ‘নে। এবারে ঘুরে বোস তো আমার দিকে। একটু কথা বলি। চেহারাটার কী হাল করেছিস নিজে তো দেখতে পাস না! দেখে চাষাভুষো ছাড়া আর কিছু মনে হয় না, মাথায় চুলদাড়ির জঙ্গল। এই সব শুরু হয়েছে তোমার গতবছর কলকাতায় গিয়ে ওই মেহের না কোন দিদি তার সঙ্গে কথা বলে ফেরবার পর থেকে। কী যে মন্তর দিল তোর কানে!’

এইবার হেসে ফেলল দেবু, ‘এইটা যা দিয়েছ না মা! মন্তর। মেহেরদি শুনলে…’

‘থাক, আর রসিকতা করতে হবে না আমায় নিয়ে। এমনকী রমাকেও তো দলে টেনেছেন তিনি। সেদিন ফোনে রমার কাছে দুঃখু করে বলতে গিয়েছি, তা তিনিও দেখি এক সুর তুলেছেন, ‘মেহের দারুণ মেয়ে মা। ভীষণ পণ্ডিত। ওর কাছে গিয়ে আপনার ছেলের যে কী উন্নতি হয়েছে গত এক বছরে…’ উন্নতি! এই যদি তোমাদের উন্নতির লক্ষণ হয় বাপু…’

দেবু একটু অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ল। মেহেরদির কাছে সেই তার খাতাপত্র নিয়ে দেখা করতে যাওয়া! এখন, সে-সময়কার ম্যাথমেটিক্যাল মডেলগুলোর কথা মনে পড়লে হাসি পায় তার। গত প্রায় ক’টা মাস ধরে মেহেরদি আর রমেনদা মিলে তার সঙ্গে কাজটায় হাত লাগিয়ে গোটা প্রজেক্টটাকে যে উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে সেটা দেখলে দেবুর নিজেরই অবাক লাগে আজকাল।

ধীরে ধীরে সেটা এবারে একটা সাজানো গোছানো চেহারা পাচ্ছে। পরপর দুটো ন্যাশনাল ও একটা ইন্টারন্যাশনাল পাবলিকেশান হয়ে গেল এই এরই মধ্যে। গৌরীহর মডেল এর মধ্যেই বেশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়ে গিয়েছে।

‘ওসব বোলো না মা। আজ মেহেরদি আর রমেনদা না থাকলে যে কাজটা আমি গৌরীহরে করছি সেটা…’

বলতে-বলতেই হঠাৎ ঝপ করে আলোটা জ্বলে উঠল। বাইরে অন্ধকারের ভেতর থেকে সাধুর বাড়িতে টিভির শব্দ ফিরে এসেছে। অন্যমনস্কভাবে সেদিকে একটু শুনে নিয়ে ফের কমপিউটারের বোতামটা টিপে দিল দেবু। বছরদুয়েক হল, ফরাক্কা থেকে সরাসরি ইলেকট্রিক সাপ্লাই এই অবধি এসে পৌঁছোবার পর থেকে খুব তাড়াতাড়ি বদলে যাচ্ছে ঈশ্বরপুর।

‘যাই সীতার কাছে গিয়ে একটু বসি। সাড়ে আটটা বাজছে। এসে তোকে খেতে দিচ্ছি..’ বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালেন সুনন্দা।

দেবু জবাব দিল না। পর্দায় পেপারটা ফিরে এসেছে। মেহেরদিই পেপারটার একটা পিডিএফ অ্যাটাচ করে পাঠিয়ে দিয়েছিল গতকাল। ইনটারেস্টিং কাজ। বাংলার কাঁথা স্টিচ শাড়ির ইতিহাস নিয়ে। আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটি আর হায়দরাবাদের ইনস্টিটিউট অব সোশিওপলিটিক্যাল স্টাডিজ থেকে যথাক্রমে কোনো এক চ্যাটার্জি ও রাজনাথন-এর জয়েন্ট পেপার।

ভালো কাজ! কিন্তু…

পড়া শেষ করে পেপারটার কয়েকটা জায়গা থেকে একটু নোট নিয়ে দেবু মোডেমটা অন করে দিল। মিনিট পাঁচেক চেষ্টার পর লাইনটা আসতে মেহেরদির মেইলটা খুলে দেবু তার একটা জবাব লিখতে বসল।

.

‘কাজটা পড়লাম মেহেরদি। ইন্টারেস্টিং। কলকাতায় বসে সুভাষিনী কোহলি-র তাঁতি কো-অপারেটিভ ‘সাশা’র সৃষ্টির ব্যাপারটা আমরা ভালো করেই জানি। ওঁদের ওই কাঁথা স্টিচ শাড়ি বাজারে আনার ব্যাপারটাও নতুন কিছু নয়। শুরুতে তাই একটু বোরই লাগছিল।

কিন্তু তারপর দেখলাম, একদম অন্যভাবে এগিয়ে গেল পেপারটা। তাঁত বোনার মতো ট্র্যাডিশনাল বাণিজ্যিক বিদ্যের সঙ্গে কাঁথা সেলাইকে মিশিয়ে ‘সাশা’ তাঁতির আয় বাড়িয়েছে, এইটেকে ফোকাসে নিয়ে আসা হল। ট্র্যাডিশনাল শিক্ষার বিভিন্ন শ্রেণিকে নানা পথে মিশিয়ে শিক্ষাকে আরো ফলপ্রসূ করা যে সম্ভব তার প্রমাণ হিসেবে দেখাল কেস স্টাডিটাকে। এইটে আমার খুব ভালো লেগেছে। আসলে, একদিক থেকে দেখলে, এটা তো আমার গৌরীহর এক্সপেরিমেন্টেরও মূল কথা। সেইজন্যেই বোধ হয় ইউরোপিয়ান সোশিওলজিক্যাল রিভিউতে আমার গৌরীহর এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে পেপারটার রেফারেন্সও দিয়েছে এরা ওখানে, বুঝলে?

‘এবারে সমস্যাগুলোর কথায় আসি। দুটো পয়েন্ট। এক, পরিসংখ্যান। কিছু তথ্য শুধু একত্র করে টেবিল বানিয়ে ছেড়ে দিয়ে দায় সেরেছে। তাদের কোনো গাণিতিক বিশ্লেষণ করেনি। ফলে সিদ্ধান্তগুলো ভাসা ভাসা। আর আর দ্বিতীয় সমস্যাটা আরো সিরিয়াস। এরা সরকারি তথ্যের ওপর নির্ভর করে গোটা কাজটা করেছে। ফিল্ডে এলেও তো সব ওই দু-একদিন গ্রামে ঘোরে তারপর ডিএম অফিস আর এসডিও অফিসে গিয়ে খাতা থেকে ফিগার-টিগার টুকে নিয়ে যায়।

‘গভমেন্ট ডেটায় প্রায়শই প্রচুর ভুল থাকে। মিথ্যেকথাও থাকে। কাঁথাস্টিচের শাড়ি তৈরি করা বিভিন্ন সংস্থার যে তথ্য এরা কাজে লাগিয়েছে, ইংলিশবাজার এলাকার গৌড়ভূমি স্বনির্ভর গোষ্ঠী তাদের একটা। ওর ফাউন্ডার মালতিদিকে আমি চিনি। সাধুদার কেমন যেন বোন হয়। ঈশ্বরপুরে ওর বাপের বাড়ি। ফলে, গৌড়ভূমি যে তিন বছর ধরে বন্ধ সেটা আমি জানি। কিন্তু সরকারি খাতায় ওটা দিব্যি চালু দেখাচ্ছে। পেপারে তার আয়ব্যয়ের হিসেবও দেখিয়েছে।

‘এই আইভরি টাওয়ার রিসার্চগুলোর মুশকিলটা এইখানেই। আইডিয়া ভালো, বিশ্লেষণ দুর্দান্ত, শুধু মাঠে নেমে হাত নোংরা করে তথ্য জোগাড় করবে না। মাউসে আঙুল নেড়ে ডেটা কালেকশান করে সব। ফলে যে পরামর্শগুলো এরা দেয় বিভিন্ন গভমেন্টকে সেগুলো ঠিকঠাক কাজ করে না, মধ্যে থেকে সরকারের দোষ হয়।

‘তবে হ্যাঁ, দোষত্রুটিগুলো বাদ দিলে, আমি বলব সমাজতত্ত্বের দিক থেকে অসামান্য একটা কাজ। আরেকটা কথা। দুজনের মধ্যে একজনই দেখলাম কোর সোশিওলজির লোক। রাজনাথন তো পলিটিক্যাল জিওগ্রাফির প্রফেসর। তার মানে পেপারটার আসল থিওরিটিক্যাল কাজ ওই কর্নেল ইউনিভার্সিটির বি চ্যাটার্জির। চেনো নাকি? আলাপ করবার ইচ্ছে রইল। যোগাযোগ করিয়ে দেবে? এঁর নিজস্ব পেপারগুলো আরো পড়বার আগ্রহ রইল।’

দেবু

.

‘অ্যাঁ। চিনতে পারেনি?’ রমা হাতে দেবুর মেইলের প্রিন্ট আউটটা নিয়ে মিটিমিটি হাসছিল, ‘এইজন্য আজকে ডিনারে ডেকেছিলে আমায়?’

‘আজ্ঞে। তবে চিনতে না পারলেও, বাবু যে আলাপ করতে চেয়েছেন সেটাই যথেষ্ট কজ ফর সেলিব্রেশান। এই রমাদি, রেশমী কাবাব নেবে নাকি আরেকটা? নাও নাও…’ মেহের কাবাবের বাটিটা রমার দিকে এগিয়ে দিল।

‘উঁহু। এখন আর স্ন্যাক ট্যাক নয়। ন’টা বাজে প্রায়। এখুনি খেয়ে নেব তো!’ বলতে-বলতে প্রিন্ট আউটটার দিকে ফের একবার খুঁটিয়ে চেয়ে দেখে নিল রমা, ‘এটা তো প্রায় সপ্তাহতিনেক আগের কথা। তারপর আর কোনো ডেভেলপমেন্ট…’

‘ধীরে রজনী। ওইজন্যই তো বললাম কাবাব নাও একটা। আজ সময় লাগবে। লম্বা গল্প।’

‘মেহের, রাতে এতটা রাস্তা আমি একা ট্যাক্সিতে…’

মেহের এইবার হেসে ফেলল, ‘রমেন তোমায় বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসবে। ইন্দ্রদাকে ফোনে বলেও দিয়েছে। এখন বিবির মেলটা দেখো। আমাদের মেয়ে কিন্তু অনেক চোখা।’

.

‘মেহেরদি,

তোমার মেলটা বেশ কয়েকবার পড়লাম। টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে পরে বলছি। আগে অন্য একটা কথা। আমাদের লেটেস্ট পেপারটার যে ছোট ফিডব্যাকটা তুমি ওখানে পেস্ট করে পাঠিয়েছ তার লিখিয়ের নাম দাওনি। কিন্তু ওখানে তার দুটো ছাপ আছে। এক, ঈশ্বরপুর, আর দুই, ওই চূড়ান্ত কস্টিক কমেন্ট—আইভরি টাওয়ার আর আঙুল নেড়ে রিসার্চ! এই ডেরোগেটরি শব্দগুলো আর একজন মানুষের মুখেই আমি শুনেছি। তারপর তোমার পাঠানো ইউরোপিয়ান সোশিওলজিক্যাল রিভিউয়ের পেপারটা ফের একবার খুলে দেখলাম। ডি চৌধুরী নামটা আগে কোনো ডাউট তৈরি না করলেও, এবারে খেয়াল করলাম, এর কোনো ইউনিভার্সিটি অ্যাফিলিয়েশান নেই। পিএইচডিও নেই। এটা দেবুদা, তাই না?

‘এনিহাউ। এ মানুষ আর কখনো বদলাবে না। কিন্তু…কাজটা তো অসাধারণ করছে গো! বিশেষ করে অঙ্কের দিকটা। এই অ্যানালিটিকাল টুলটাই তো খুঁজছি আমি। তার পর খুঁজে খুঁজে আরো দুটো পেপার পড়লাম ওর। ওই গ্রামে পড়ে থেকে…

তবে, পেপারটার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিকটা নিয়ে আমার অনেক কিছু বলবার আছে। ক্রেডিট লিস্টে তোমার নাম দেখলাম। যদি পেপারটা তুমি মডারেট করে থাকো তাহলে তোমাকেও বলব, সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে একেবারে লেটেস্ট চিন্তাভাবনাগুলোকে তুমি নিজেও এখানে সাজেস্ট করোনি বা দেবুদাকে পড়তে বলোনি। বললে গ্রেগরি হান-এর থিওরির উল্লেখ…

.

প্রিন্ট আউটটা ফের মেহেরের হাতে ফিরিয়ে দিল রমা, ‘যথেষ্ট। এরপর তো দেখছি রেফারেন্স আর তত্ত্বকথার বন্যা। যা দেখবার দেখে নিয়েছি। কিন্তু কথা হল, দুটোতেই দেখছি সাপে-নেউলে হয়ে আছে একে অন্যের ওপর। একজন জেনে। অন্যজন না জেনে। মেলাবে কী করে?’

‘ধীরে রজনী,’ মেহের হাসল। ওই শব্দটা ওর মুদ্রাদোষ। ‘বন্দোবস্ত হচ্ছে। আসলে কথা কি জানো রমাদি, দুটোই সমান অহঙ্কারী আর মুখফোঁড়। এক এক সময় এমন রাগ হয় জানো! দেবুকে তো অনেকদিন ধরেই দেখছি। বলে লাভ নেই কিছু কারণ, তোমার দেওর তুমি এমনিতেও জানবে। আর বিবিটাও, দেখো শুধু একবার! মানছি ভুলটা আমারই হয়েছিল। হান-এর থিওরিতে দেবুর মডেলটার একটা চিহ্ন আছে সেটা আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে আমায় তুই সটান ওরকম একটা কথা বলে দিলি! মাস্টার বলে একটু রেয়াতও করবি না?’

রমা মেহেরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। রাগের চাইতে একটু গর্বই যেন ছেয়ে আছে মেহেরের চোখে, ওর শরীরের ভাষায়।

‘বুঝলে, একদিকে বিবি দেশে ফিরতে চাইছে। আরেক দিকে, দেবুরও প্রজেক্টটা এখন ট্রায়াল স্টেজ শেষ করে দ্বিতীয় পর্যায়ে ঢুকতে চলেছে। বড় একটা এলাকা ধরে বেশ কিছু গ্রামে পরীক্ষাটাকে বিভিন্নভাবে চালানো দরকার। যেখানটায় কাজ করছে এখন, সেখানকার অন্যান্য গ্রামেও বেশ কৌতূহল জাগতে শুরু করে দিয়েছে এর মধ্যে। কিন্তু কাজটাকে ছড়াতে হলে এইবার ওর ফান্ডিং দরকার পড়বে। ইশকুলমাস্টারির টাকা বাঁচিয়ে কাজ হবে না আর। দুজনের এই দুটো রিকোয়ারমেন্টকে মিলিয়ে…একটা চেষ্টা করছি। দেখা যাক, হয়তো এর মধ্যে ওই নিয়ে একবার যেতেও হতে পারে ঈশ্বরপুরে…এই রমাদি, যদি যাবার দরকার পড়ে, তুমিও চলো না! যাবে?’

রমা হাসল, ‘তোমার দাদার চাকরি তো জানো! হুট বলতে ছুটি পায় না। আগে থেকে ঠিকঠাক না থাকলে এভাবে…’

‘ইন্দ্রদাকে যেতে হবে কে বলল? আমরা মেয়েরা মেয়েরা ক’জন মিলেই চলে যাব।’

‘ক’জন মানে?’

‘ওসব ডিটেল পরে বলব’খন। রেডি থেকো। দরকার হলে শর্ট নোটিসে খবর দেব। সব ঠিকঠাক চললে একটা দুর্দান্ত সারপ্রাইজও দিতে পারি হয়তো।’

.

.

‘আর তো দেড় হপ্তা। তারপর পুজোর ছুটি। তা এ-বছরও কি…’

দেবু মাথা নাড়ল, ‘না স্যার। এ-বছরটা বোধ হয় কলকাতা চলে যাব। অনেকদিন ওধারের পুজোটুজো দেখি না। মা-ও বলছিল…’

‘সে কী মশাই?’ হেডমাস্টার রাজেনবাবু একটু অবাকই হলেন প্রথমে, তারপর সেটা সামলে নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, ‘উঁহু, সেটাই ভালো। ঘুরে আসুন গে যান। নিজের লোকজন ছেড়ে এই বয়েসে এইভাবে বনবাসে পড়ে থাকা বছরের পর বছর! উঁহু, ভালো কথা নয়।’

দেবু একবার ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। ঈশ্বরপুরে কারো কথা কারো কাছে গোপন থাকে না। বিবির ব্যাপারটা রাজেনবাবু জানেন।

‘তা, পুরো ছুটিটাই ওদিকে থাকবেন? নাকি…’ বলেই কী মনে পড়তে ভদ্রলোক হঠাৎ তাড়াতাড়ি নিজের ড্রয়ারটা হাঁটকে একটা খাম বের করে আনলেন, ‘আপনার নামে রেজিস্ট্রি চিঠি আছে একটা। তিনটের ডাকে এল। আপনি ক্লাশে ছিলেন তাই আমিই সই করে রেখে নিয়েছি। এই যে…’

মোটা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিল দেবু। মেহেরদির চিঠি। এটা আসবে তা দেবু জানত। মেহেরদিরা কলকাতার বাইরে। দিন চারেকের সান্দাকফু ট্রেক-এ গেছে কর্তাগিন্নি মিলে। যাবার আগেই মেইল করে জানিয়েছিল একটা স্পিডপোস্ট পাঠিয়েছে দেবুকে। আর বিশেষ কিছু ভাঙেনি সেখানে। বলেছে সঙ্গে চিঠিতে যা লেখবার লিখে দিয়েছে।

খামটা ছিঁড়তে তার ভেতর থেকে ফর্ম বের হল একটা। আটপাতার ফর্ম। আইসোরেফ, মানে ইন্টারন্যাশনাল সোশিওলজিকাল রিসার্চ ফাউন্ডেশানকে উদ্দেশ্য করে একটা অ্যাপ্লিকেশান।

ফর্মের সঙ্গে মেহেরদির চিঠি ছিল একটা।

.

‘দেবু,

দু’তিনটে দরকারি কথা। আইসোরেফ-এর ব্যাপারে তুই জানিস নিশ্চয়। আগেও দু’একবার ওর কথা আমার কাছেই শুনেছিস। সমাজবিজ্ঞান নিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বীকৃতিও আছে। ফলে ফান্ডিং-এর অভাব নেই এদের।

সঙ্গের ফর্মটার পিডিএফ ওদের সাইটেই পাওয়া যায়। কিন্তু তোর ওই ধ্যাদ্ধেরে গোবিন্দপুরে ইন্টারনেট, প্রিন্টার এসবের কী অবস্থা জানি না, তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে, একটা প্রিন্ট-আউট সটান স্পিড পোস্টে পাঠিয়ে দিলাম। ভালো করে দেখে, ওতে পার্সোনাল তথ্যটথ্যগুলো আগে থেকে ভরে রাখবি। যা যা ডকুমেন্ট চাইছে সেগুলোও কপি বানিয়ে একটা ফোল্ডার বানিয়ে রাখবি। শেষ মুহূর্তে কোনো তাড়াহুড়ো যেন না পড়ে।

খুব জরুরি বলেই এমন তাড়াহুড়ো করছি। পুজোতে কলকাতা আসবার প্ল্যানটা তোকে বাতিল করতে হবে এ-যাত্রা। আমি সান্দাকফু ট্রিপ থেকে কলকাতা ফিরে নিজেই তোর ওখানে চলে আসব। পঞ্চমীর দিন পৌঁছোচ্ছি।

এখন ব্যাপারটা শোন। খুব ইন্টারেস্টিং। তোর তৈরি গৌরীহর প্রজেক্ট ওভারভিউয়ের প্রেজেন্টেশানটা আর সেইসঙ্গে পাবলিকেশনগুলোর সফট কপি আইসোরেফকে মেইল করেছিলাম। জবাব যে দিল সে আবার আমার চেনা বেরিয়ে গেল। হেমাম্বিকা আর্য। আমার থেকে বছর তিনেকের সিনিয়ার। কেমব্রিজে পোস্ট ডক করবার সময় আলাপ। ঝকঝকে মেয়ে। বাইগাদের সামাজিক শিক্ষাপদ্ধতির ওপর দুর্ধর্ষ গবেষণা আছে। এছাড়া কম্বোডিয়া আর মায়ানমারে রুরাল এডুকেশন নিয়ে ভালো প্রজেক্ট করিয়েছে।

হেমাম্বিকা ওদের এশিয়ান চ্যাপ্টারের ডিরেক্টর হয়ে এসেছে উপস্থিত। অতএব মেইলটা ওর কাছে ফরোয়ার্ড করেছিল আইসোরেফ। কাজটা দেখে হেমাম্বিকা বেশ উত্তেজিত। মেইল পাবার এক সপ্তাহের ভেতর নিজে থেকেই যোগাযোগ করেছে আমার সঙ্গে। গৌরীহর প্রজেক্টটা নিয়ে ও আগ্রহী। ওই নিয়ে তোকে কিছু অফার দেবে। তবে একটা শর্ত দিয়েছে হেমাম্বিকা। ও নিজে একবার স্পট ভিজিট করে কাজটা হাতেকলমে দেখে নিতে চায়। সব ঠিকঠাক থাকলে ওখান থেকেই তোর সঙ্গে কথা বলে সেইমতো ফর্মের প্রোপোজাল অংশটা ভরিয়ে সাইন করিয়ে নিয়ে চলে আসবে। তোর রিসার্চের তাত্ত্বিক দিকটা নিয়ে হেমাম্বিকা কনভিনসড। এবার স্পট ভিজিটটায় ওকে কনভিনস করাটা পুরোপুরি তোর ওপর থাকবে দেবু।

তবে মুশকিল আছে একটা। ঠিক মুশকিল নয়, তারিখের সমস্যা। হেমাম্বিকা এখন তাইওয়ানে আছে। মহালয়ার পরদিন ভারতে ফিরে ক’দিন ব্যাঙ্গালোরে কাজকর্ম সেরে আইসোরেফের কুয়ালালামপুর হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাবে। অনেক চেষ্টাচরিত্র করে শেষমেশ পুজোর মধ্যে তিনটে দিন বন্দোবস্ত করেছে। পঞ্চমীর দিন সকালে কলকাতা ঢুকছে। ওকে নিয়ে ওদিনই মালদা চলে যাব তোর ওখানে। অষ্টমীর দিন অবধি ওদিকে কাটিয়ে, নবমীর দিন সকালে ফিরে কলকাতা থেকেই কুয়ালালামপুরের ফ্লাইট ধরে নেবে। রমাদিকেও বলছি চলে আসবার জন্য। মাসিমা বাড়ির দিকটা একলা সামলাতে পারবে না হয়তো, তাই। আরো একজন হয়তো সঙ্গে আসবেন। ওই যে সেই চ্যাটার্জি। কর্নেল ইউনিভার্সিটির। যার পেপার তোকে পড়ালাম। বলেছি। দেখা যাক। জনাতিনেক লোকের অ্যাকোমোডেশানের বন্দোবস্ত করে রাখিস একটু।

মেহেরদি।

.

‘ফর্মটা কীসের বলুন তো!’

রাজেনবাবু বেশ কৌতূহলভরে কাগজগুলোর দিকে দেখছিলেন। দেবু মাথা নেড়ে হাসল একটু, ‘সম্ভবত একটা ভালো খবর স্যার। আমার গৌরীহর আশ্রম আর সেই সঙ্গে-সঙ্গে এই এলাকার আরো কয়েকটা জায়গার জন্য ভালো কিছু একটা করতে পারব বলে মনে হচ্ছে এবারে। অ্যাদ্দিন তো পকেটের টাকা দিয়ে চলল। এবারে সেই সঙ্গে-সঙ্গে কিছু ফান্ড পাব বলে মনে হচ্ছে।’

‘গ্র্যান্ট? কত? কে দিল? স্টেট গভমেন্ট না সেন্ট্রাল গভমেন্ট? দেখি দেখি…’ রাজেনবাবুর চোখদুটো একটু উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। দেবু হাসল, ‘উঁহু। এখনো পাইনি কিছু। গভমেন্টের ব্যাপারও নয়। বাড়ি যাওয়াটা খানিক পিছিয়ে দিতে হবে। দুটো দিন এঁরা এখানে এসে থাকবেন, কাজকর্ম দেখবেন, তাতে খুশি হলে তখন হয়তো…’

‘অ।’ ফের গম্ভীর হয়ে বসে পড়লেন বয়স্ক মানুষটা, ‘ইনসপেকশান? পুজোর মধ্যে? দূর মশায়! এখনো ছেলেমানুষ তাই অত আশায় আশায় নাচছেন। ওসব ইনসপেকশান ফিনসপেকশান দেখে দেখে হাড় পেকে গেছে, বুঝলেন! সব লোক দেখানো ব্যাপার।’

‘না না স্যার,’ দেবু প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। কিন্তু রাজেনবাবু তাকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন, ‘নইলে, দুনিয়াসুদ্ধ যখন ছুটি, তখন আসবার প্ল্যান করেছে কেন? শুনুন মশাই, সত্যিকথাটা বলি। আসলে আসছে পরের পয়সায় গ্রামের পুজো এনজয় করতে। আপনার ঘাড় ভেঙে খাবে, কদ্দিন ঘুরবে। ফটো তুলবে। পিঠফিঠ চাপড়াবে, তারপর টাকাপয়সার বেলায় দেখবেন ঢুঁঢু। মনে নেই, গতবার স্কুলে ল্যাব ডোনেট করবে বলে বড়দিনের সময় ইনসপেকশান করতে এল ‘স্কলার ইন্ডিয়া’ থেকে? কত লাখ কোটির গপ্পো শুনিয়ে খেয়েদেয়ে চলে গেল। একটা পয়সা ঠেকিয়েছে আজও? আমি হলে এক্ষুনি মানা করে বলে দিতাম। আসতে যদি হয় তাহলে পুজোর পরে আসুক।’

দেবু মাথা নেড়ে হাসল। রাজেনবাবুর দোষ নেই। একবার হাত পুড়িয়ে সাবধান হয়ে গেছেন। এঁকে বোঝানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। একটু বাদে সে বলল, ‘নাঃ রাজেনবাবু। আমার বউদি আর এক দিদিও ও-সময়টা আসছে। কাজেই থাকতে এমনিতেও হবে ওমনিতেও হবে। আমি চলি। আশ্রমে বেশ খানিক কাজ চাপল তার মানে। মাঝে দু’একটা দিন সি এল নিতে হবে মনে হচ্ছে।’

‘সে আপনার সি এল আপনি পোড়াবেন আমি কিছু বলবার কে।’ রাজেনবাবু মুখ বাঁকালেন একবার, ‘গত কয়েক বছর ধরেই তো দেখছি, ওই গৌরীহরের পাগলামো নিয়ে ছুটি, রোজগারের টাকা সব উড়িয়ে পুড়িয়ে শেষ করছেন। কী যে লাভ হয় এসব করে কে জানে! যাক গে, স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টের কাগজপত্তরগুলো জমা দিয়ে দেবেন পুজোর ছুটি পড়বার আগে। কী যে সব আইন হয়েছে আজকাল।’

‘ওসব হয়ে যাবে। ভাববেন না,’ বের হয়ে যেতে যেতে হাসল একটু দেবু।

.

দু-চোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকা যুবকটির অগোচরে পৃথিবীর আরেক গোলার্ধে এক যুবতী তখন তার কমপিউটারটির সামনে জেগে বসেছিল। সেখানে তখন তার নির্জন একাকী অ্যাপার্টমেন্টে রাত ফুরিয়ে আসছিল দ্রুত। তার সামনে পর্দার বুকে মেহেরের মেইলটা ভাসছিল। দশটা নাগাদ মেইলটা এসেছিল। তারপর থেকে বহুবার পড়ে প্রায় মুখস্ত হয়ে যাওয়া চিঠিটায় ফের একবার চোখ বোলাচ্ছিল সে।

.

‘…শিক্ষক হিসেবে যেটুকু এক্সপেরিয়েন্স আমার হয়েছে তার থেকে এটুকু বুঝেছি, যার যেটা প্রকৃত কর্মক্ষেত্র সেটা যখন সে খুঁজে পায় তখন তার সেরাটা বার হয়ে আসে। কলকাতায় দীর্ঘদিন ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াবার পর ওই গ্রামদেশে গিয়ে দেবু তার সেই প্রকৃত কাজের ক্ষেত্রটা খুঁজে পেয়েছে। আমি জানি তুই ওর ডিসিশানটাকে মেনে নিতে পারিসনি সেদিন। তোর দোষ ছিল না। তোর জায়গায় আমি হলেও তাই করতাম। সামনে এগিয়ে দেওয়া অপরচুনিটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমার প্রিয় মানুষটা যদি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসত তাহলে আমিও নিজের সর্বস্ব ছেড়েছুড়ে তার পাশে গিয়ে কিছুতেই দাঁড়াতাম না।

‘কিন্তু তারপর ছেলেটা ওর কবজির জোর দেখিয়ে দিয়েছে। বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে কাজটা ওইখানে বসে করে দেখিয়েছে ও, সেটার গুরুত্ব তোর মতো পণ্ডিত মেয়ের কাছে আর নতুন করে বুঝিয়ে বলবার কিছু নেই আমার। ওকে বিদেশ যেতে হয়নি রে। আইসোরেফের মতো প্রতিষ্ঠান এবারে নিজেই ওর খোঁজ করছে। ওর পেপার দেখে আইসোরেফের এশিয়ান চ্যাপ্টারের ডিরেক্টর নিজে উদ্যোগ নিয়ে চলে আসছেন কাজটা খতিয়ে দেখতে। আমরা মুগ্ধ ও উত্তেজিত হয়ে একটা প্রতিভার আকাশগামী দৌড় দেখছি শুধু।

‘যাক সে কথা। দেশে কাজ খুঁজছিলি, তাই হেমাম্বিকার সঙ্গে যোগাযোগটা হতে আমি তোর কিছু গবেষণাপত্র আর বায়োডেটাও ওকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। ও ইমপ্রেসড। পাশাপাশি, একটা দারুণ অবজার্ভেশানও করেছে ও তোর আর দেবুর কাজদুটো নিয়ে। বলে, এ তো একটাই কয়েনের দুটো পিঠ! একটাই ইস্যুকে দুটো দৃষ্টিকোণ থেকে ধরে পৃথিবীর দু’পাশে দুজনের কাজ!

‘দেবুকে এখনো ভেঙে কিছু বলিনি, কিন্তু যদ্দূর মনে হচ্ছে, আইসোরেফ থেকে গৌরীহর এক্সপেরিমেন্টটাকে হেমাম্বিকা হাতে নিতে চাইছে। আর, তোর ব্যাপারে বলি, ব্যাঙ্গালোরে আইসোরেফ-এর নতুন ক্যাম্পাস তৈরি হচ্ছে। রিক্রুটমেন্ট চলছে এখন। ক্যাম্পাসে তোর জন্য একটা চেয়ার অফার করছে ও। শুরুতে দুই থেকে পাঁচ বছরের কন্ট্রাক্ট দেয় ওরা। পরে অবস্থা বুঝে চুক্তি বাড়াবে। আর, এর পাশাপাশি, দেবুর প্রজেক্টটাতেও তোর এক্সপার্টাইজটা ব্যবহার করতে চাইছে ও।

ব্যাঙ্গালোরের অফারটা তুই নিতে চাইবি কি? ওখানকার প্রজেক্টটার কাজেই হেমাম্বিকা কয়েক দিনের জন্য ভারতে আসছে এর মধ্যে। ব্যাঙ্গালোর ক্যাম্পাসের কাজ নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকবে, তবু ওর মধ্যে সময় বের করে ঈশ্বরপুরে এসে গৌরীহর প্রজেক্টটা দেখে যাবে ও। বলল, পারলে তুই ওখানে তখন চলে আসিস যদি তবে দেশে থাকতে থাকতেই একটা ইন্টারভিউ করে নিয়ে ব্যাপারটা একেবারে কনক্লুড করে দিয়ে বেরিয়ে যাবে। পঞ্চমীর দিন কলকাতা ঢুকছে। ওদিন রাতে গৌড় ধরব ওকে নিয়ে। ঈশ্বরপুর হয়ে গৌরীহর গিয়ে সব দেখেশুনে ফিরব একেবারে নবমীর দিন সকালে।

এবারে একটা অন্য কথা বলি। গত অনেকদিন ধরেই দেবুর কাজটার ব্যাপারে ওকে খুব কাছ থেকে দেখছি। একটা জিনিস এখন পরিষ্কার আমার কাছে, দেবু তোকে এখনো মিস করে ভীষণ। তুইও করিস ওকে, সেটুকু বোঝবার মতো ক্ষমতা আমার আছে। নইলে দুজনের একজনও সংসার করলি না কেন এখন অবধি? পুরুষমানুষের যা একগুঁয়ে স্বভাব, তাতে দেবু মুখে কখনো সোজাসুজি স্বীকার করবে না। কিন্তু মেয়েদের চোখে ওর এই সেন্স অব লসটা বুঝে নিতে ভুল করিনি আমি। আর তুই?

যাক গে। সেসব তোর পার্সোনাল ব্যাপার। দিদি বলিস তাই বলে ফেললাম। বাদ দে। তবে দেবুর বিষয়ে স্ট্যান্ড বা ফিলিং যা-ই হোক না কেন, তার জন্য ঈশ্বরপুর আসাটা অ্যাভয়েড করিস না। যে কাজটা তুই ফিল্ডে নেমে হাতেকলমে করতে চাইছিস, সেটার জন্য আইসোরেফ-এর এই অফারটার মতো সুযোগ বেশি আসবে না। কাজেই হেমাম্বিকার সঙ্গে এখানে এসে তোর দেখা করাটা ইমপারেটিভ।

মেহেরদি

.

পি এসঃ শেষমেশ একটাই কথা। কাউকে আবার বলিস না যেন। একদম অ্যান্টি উইমেনস-লিব স্টেটমেন্ট, বুঝলি? সেটা হল, আর সবকিছু বাদ দিলেও ওরকম অ্যাট্রাকটিভ একটা পুরুষমানুষের ভালোবাসার স্বাদ পেয়েও এককথায় তাকে ছেড়ে চলে গেলি, কেমন মেয়ে রে তুই? আর দেবুটাও বোকা। চেপে ধরে জোর করল না কেন একবার! ‘তুমি যেতে পারবে না’ বলে দাবি করল না কেন? উদাসী সন্নিসিবাবা। দুটোই দু’রকমের পাগল। ধুত!

কেন দেবুদা? কেন সেদিন আমায় বাসে তুলে দিয়ে আসতে রাজি হয়ে গিয়েছিলে তুমি এক কথায়? সেদিন ফিরে আসবার পর, আগের রাতে ঘুমের মধ্যে আসা মিসড কলটা দেখে যখন আমি বারবার তোমাকে ফোন করেছিলাম, কেন ধরোনি ফোনটা? কেন আমায় বলোনি…

নিজের অজান্তেই কথাগুলো একটু জোরে বলে ফেলেছিল বোধ হয় বিবি। আজকাল একলা থাকতে থাকতে এই অভ্যেসটা গড়ে উঠছে তার। নিজের কানে শব্দগুলো যেতে নিজেই একটু লজ্জিত হল সে। হয়তো জোর করলে সে-মুহূর্তে দেবুর ওপরে ঘৃণাটাই আর একটু দৃঢ় হত তার। হয়তো…।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিবোর্ডে হাত লাগাল বিবি। নাঃ। এতগুলো বছর! খুঁজে বের করে যোগাযোগ করাটা কি খুব কঠিন হত? ওই উদাসীন পুরুষ তো তার চেষ্টাও করেনি কখনো! তার পেপারটা সে দেখেছে। বি চ্যাটার্জি নামটা দেখেও… উঁহু, বুঝতে পারেনি এ হতে পারে না। ইগনোর করেছে তাকে। নিশ্চয় তাই। এর পরেও ওর সামনে গিয়ে ফের একবার দাঁড়ানো…

চিন্তাটাকে হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সরিয়ে দিল বিবি। একটা শক্ত প্রতিজ্ঞা চেপে বসছিল তার মাথায়। না। পালিয়ে যাবার প্রশ্নই নেই ওই উদাসীন পুরুষের সামনে থেকে। তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে এই উপেক্ষার জবাব আর একটা উপেক্ষা দিয়েই দিতে হবে তাকে।

আইসোরেফের অফারটা সে কারো দয়ায় পায়নি। পেয়েছে নিজের বায়োডেটার জোরে।

দ্বিতীয় একটা উইন্ডোতে ভেসে থাকা মেক মাই ট্রিপ-এর অফারগুলো থেকে একটাকে বেছে নিয়ে ক্রেডিট কার্ডের নম্বরটা সেখানে টাইপ করে দিল সে। টিকিটটা নামছে। সেটা দেখতে দেখতেই এই উইন্ডোটায় সে লিখতে শুরু করল, ‘আসব মেহেরদি। টিকিটের কপিটা পাঠাচ্ছি। পঞ্চমীর দিন সকালে নামব। ওখান থেকে গৌড়-এর জন্য আমারও একটা টিকিট তুমি করে নেবে?’

.

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। ফিরে দেবু দেখে সুনন্দা ভারি উত্তেজিত হয়ে অপেক্ষা করছেন। সে ঢুকতেই বিরক্ত মুখে বললেন, ‘রমা ফোন করেছিল। তোর মেহেরদিকে নিয়ে নাকি পঞ্চমীর দিন ঈশ্বরপুর আসছে। সঙ্গে আরো কে কে সব আসবে।’

‘আর কে কে আসবে কিছু বলল?’

‘ওই হেমাম্বিকা না কী একটা নাম বলল। বুঝি না বাপু। মেহের নয় পরের মেয়ে। কিন্তু রমা তো বাড়ির বউ। পুজোয় কদ্দিন পরে বাড়ি যাব ঠিক করে বসে আছি, আর সে কিনা বন্ধুবান্ধব নিয়ে সেই সময়টাই নাচতে নাচতে…’

দেবু হেসে ফেলল, ‘বউদির কোনো দোষ নেই মা। আসলে ওই যে হেমাম্বিকা বললে, ওর জন্যই আসছে ওরা। বিরাট পণ্ডিত মহিলা মা। বছরের বেশির ভাগ সময় বিদেশে থাকে। বিরাট চাকরি করে। কোনোমতে ওই সময়টুকু বের করেছে।’

‘তা এখানে তার কী?’

‘এখানে কিছু না মা। আমার কাজকর্ম দেখতে আসছেন।’

‘তোর কাজকর্ম দেখতে? মানে? তুই আবার কোনো…’

দেবু নিঃশব্দে মেহেরের চিঠিটা বের করে মা’র হাতে দিয়ে দড়ি থেকে ঝোলানো গামছাটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল। একটু পরে দূর থেকে ঝপ করে শব্দ ভেসে এল একটা। দেবু জলে নেমেছে। সুনন্দা কান খাড়া করে শুনলেন একটু। জল তোলপাড় করে সাঁতরাচ্ছে দেবু। রাতবেরাতে এই জলে নেমে যাওয়াটা সুনন্দার কোনোকালেই পছন্দ হয় না। কিন্তু ও ছেলে কথা শুনলে তো! দিন নেই রাত নেই যখন সুযোগ পাচ্ছে, পুকুরের জলে গিয়ে হামড়ে পড়ছে। একটা নিঃশ্বাস ফেলে তিনি চিঠিটার দিকে চোখ ফেরালেন।

স্নান সেরে ফিরে ভেজা গামছাটা বদলে একটা শুকনো লুঙ্গি পরে বারান্দায় এসে বসল দেবু। অন্ধকার নেমে গেছে পুরোপুরি। এখান থেকে খোলা দরজার ভেতর দিয়ে পেছনের জানালার ফ্রেমে আটকানো জ্বলজ্বলে সন্ধেতারাটা দেখা যায়। সুনন্দা চা নিয়ে এলেন। সঙ্গে একটা বাটিতে তেলমাখা মুড়ি আর শশা কুঁচোন। মুড়ি চিবোতে চিবোতে দেবু বলল, ‘শশা পেলে কই? আমাদের মাচায় তো সবে জালি পড়ছে দেখলাম কয়েকটা।’

‘বিকেলে আদকপাড়া থেকে নিতাই এসেছিল। ও-ই হাতে করে নিয়ে এসেছিল ক’খানা। তোর জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করে থেকে শেষমেশ একটু আগে গেল।’

‘নিতাই ঘোষ? আমার বাড়িতে! কী মনে করে হঠাৎ…’

‘বাদ দে তো!’ হাত নাড়ালেন সুনন্দা, ‘ঘ্যানঘেনে লোক একটা। বলে, দেবুভাই ঈশ্বরপুরের ছেলে হয়ে আশ্রম বানাল গৌরীহরে গিয়ে। সেখানকার লোকের উপকার হচ্ছে ভালো কথা। তা আমরা এ গ্রামের লোকেরা পর হলাম কোন দোষে? এখানেও কেন একটা…এই সব কাঁদুনি আর কি।’

‘হ্যাঁ! এখন তো এসব বলবেই।’ দেবু মুচকি মুচকি হাসছিল, ‘আমাকেও ক’দিন ধরে পথেঘাটে এসে ধরেছে। পাত্তা পায়নি বলে এখন বাড়ি বয়ে তোমাকে শশা খাইয়ে কাঁদুনি গেয়ে যাচ্ছে। জানো মা, এই নিতাই কাকাই প্রথম ঈশ্বরপুরে আমার কাজ আটকেছিল। পঞ্চায়েতের মিটিংয়ে আশ্রমের জন্য জমি দেওয়া নিয়ে ও-ই তো আপত্তি তুলল। বলেছিল, শহুরে মাস্টারের পাগলামি। গ্রামের মুখ্যু লোকজনই যদি একে অন্যকে পড়াবে তাহলে এত টাকাপয়সা খরচ করে মাস্টার, ইস্কুল এইসব পোষা কেন? ওর জ্বালাতেই তো শেষে গৌরীহরে যাওয়া। ওখানে সুরেন বিশ্বাস হেল্প না করলে কাজটা তো শুরুই হত না আমার। আর এখন ওদিকে ভালো রেজাল্ট আসছে, সুরেন বিশ্বাস ওর প্রেসিডেন্টের চেয়ার দেখিয়ে পলিটিক্যাল লাভ ওঠাচ্ছে এলাকায় দেখে তিনি এসেছেন কাঁদুনি গাইতে।’

বলতে-বলতে উঠে দাঁড়ালো দেবু। দালানে হেলান দেওয়া সাইকেলটা সোজা করে নিয়ে বলে, ‘বাড়ি অবধি যখন ধাওয়া করে এসেছে তখন ঘুরেই আসি গিয়ে একবার।

‘সাইকেলটা রেখে এখানে এসে বোস তুই।’ সুনন্দা ধমক দিলেন, ‘চিঠিতে মেহের যা লিখেছে, তাতে এটাও বুঝতে পারছিস না, কতবড় সুযোগ এসেছে তোর সামনে! না দেবু, এখন ক’দিন আর কোনো পাগলামী নয়। বনের মোষ তাড়ানো বন্ধ করে কাজটা মন দিয়ে কর। কাগজপত্র গোছা ঠিকঠাক করে। সুবুদ্ধি ঘোষের দু’দুটো মারুতি গাড়ি খাটে মালদা টাউনে। ওর কাছে গিয়ে আগে একটা গাড়ি বুক করে রাখ চারদিনের জন্য। আমি সাধুর বাড়ি যাচ্ছি। সীতাকে খবরটা দিয়ে আসি একটু।’

‘কেন? সীতামাসিকে আবার এর মধ্যে কেন?’

‘কেন মানে? হতে পারে পড়াশোনা জানে না তোর মতো। কিন্তু এখানে যখন প্রথম এলি তখন আদর করে ঠাঁই দিয়েছিল কে? আর সীতা তোর নিজের মায়ের চেয়ে কম ভালোবাসে তোকে? আজ তোর এতবড় সৌভাগ্যের দিনে তাকে সেটা বলব না তো কাকে বলব? অকৃতজ্ঞ ছেলে কোথাকার!’

‘আহা মা, আমি কি তাই বলেছি? কথায়-কথায় এত মাথা গরম করো কেন বল তো?’ দেবু হাসছিল।

‘না। মাথা গরম করব না। উনি নিজে মুখের কোনো আগল রাখবেন না, আর মাথায় হিমালয় পাহাড়ের বরফ চাপিয়ে মুখে ঠুলি বেঁধে বসে থাকতে হবে আমাদের।’

উত্তেজনায় তড়বড় করে ঘুরে বেড়ান সুনন্দা। একবার তো বলেই ফেললেন, ‘বড়বউমাকে বলে দি দু’দিন আগেই চলে আসুক বরং। আজকালকার মেয়ে, ওদের রুচি টুচি ও-ই আমার থেকে বুঝবে ভালো।’

দেবু শেষে বাধ্য হয়ে বলল, ‘এখানে থাকতে ওরা আসছে না মা। আসল কাজটা তো গৌরীহরে। তুমি এত ব্যস্ত হয়ো না তো!’

শুনে সুনন্দা চিন্তিত হয়ে বললেন, ‘ওই বুনো আশ্রমে? বাঁশ, খড়ের ঘরদোর, সাপখোপ… ওখানে নিয়ে গিয়ে এত বড় একটা লোককে তুলবি কিরে! তোর আক্কেলটা কীরকম? তার চাইতে যা কথাবার্তা বলার সেসব নাহয় এইখানে বসেই…’

 দেবু কিছুক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল। বুড়ো মানুষটার চোখে এখন স্বপ্নের ঘোর লেগেছে। নাঃ। তার কাজটার ব্যাপারে কিছু জানতে চাইছেন না তিনি। কিছু একটা করছে তাঁর ছেলে, যাতে তার সঙ্গে দেখা করতে দেশবিদেশ থেকে লোকজন আসছে, যার ফলে আরো বড় কিছু একটা সুযোগ পেতে চলেছে সে, এইটুকু খবরই সুনন্দার কাছে যথেষ্ট। ছেলের নামডাক হবে ওইটুকুই স্বপ্ন তাঁর। ওর চাইতে বেশি কিছু জানবার প্রয়োজন কি!

একটা অদ্ভুত হতাশা চেপে ধরছিল দেবুকে। কেন এমন হয়? সবাই চায় শুধু তাকে অবলম্বন করে নিজের নিজের স্বপ্নগুলোকে পূরণ করতে। মন্দ মানুষ ওরা কেউ নয়। মা, বিবি, সুরেন বিশ্বাস, নিতাই ঘোষ এরা সকলেই ভালো। কিন্তু ওদের সকলেরই এক-একটা আলাদা-আলাদা স্বপ্ন আছে। দেবু, ওদের সেই সব স্বপ্নকে সত্যি বানাবার একটা উপকরণ মাত্র। একটা টুল। আর দেবু যে স্বপ্নগুলো দেখে, তার কথা তো কেউ ভাবল না!

কিন্তু, কথাটা মনে হতেই হঠাৎ একটা মুখ তার সামনে ফুটে উঠতে মুখে একটু হাসি ফুটল তার। মেহেরদি। হ্যাঁ। শুধু ওই একজন মানুষ…কেবল ওই একজনই…।

মা বেরিয়ে গেছে সীতামাসীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে। দেবু উঠোনে নেমে সাইকেলটার স্ট্যান্ড তুলে নিল। নিতাই ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে যাবার ইচ্ছে হচ্ছিল না তার আজ। যদি সত্যি সত্যিই ফান্ডটা আসে তাহলে তখন দেখা যাবে’খন।

বসন্তের রাত। কোথাও হাসনুহানার ঝাড়ে ফুল ফুটেছে। বাতাসে তার সুগন্ধ। চাঁদ আছে আকাশে আজ। সাইকেলের আলো বন্ধ করে দিয়ে আনমনে প্যাডেল করে চলে সে। আজ, সাফল্যের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই একটা প্রায় ভুলে যাওয়া তীব্র অভিমানের ঝলক উঠে এসে এলোমেলো করে দিয়ে গেছে তার সব চিন্তাভাবনাকে।

বিবি! সবার কথা ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু তুই? তুই তো আমার চোখে চোখ রেখে বলেছিলিস ভালোবাসি। তার পরেও তুইও কেন আমায় ব্যবহার করে কেবল নিজের স্বপ্নগুলোকেই ধরতে চাইলি? কেন তুই ভাবলি না আমারও কোনো স্বপ্ন থাকতে পারে? কেন তুই আমার হাত ধরে বললি না, গো অ্যাহেড উইথ ইওর ড্রিম দেবু, আই অ্যাম দেওয়ার ফর ইউ…আই ট্রাস্ট ইউ।

তার চেতনা, তার ইগো, বুকের ভেতরকার গভীরতম দুঃখটির উৎসমুখে যা একখণ্ড পাথরের মতো চেপে বসে থাকে প্রতিমুহূর্তে, আজ এই নির্জনতার সুযোগে তা কিছু সময়ের জন্য হঠাৎ করেই সরে গেছে।

সেখান থেকে বের হয়ে আসা তীব্র অভিমানের ধারা আবার মুহূর্তে বদলে যায় একটা অসহনীয় কামনায়…আচ্ছা অলটারনেটিভ রিয়েলিটি যদি সত্যিই থাকে? সেখানে তুই আছিস, আমি আছি এক সঙ্গে…সবাই ভারি খুশি…সবাই ভালো আছে… হয় না রে? হয় না?’

.

.

বউদি সেই আগেই এসে গেল। সাধুকে দিয়ে পোস্ট অফিস থেকে ফোন করিয়ে দিয়েছিলেন সুনন্দা। দেবুকে না জানিয়েই। সাধুই গিয়ে নিয়েও এলো মালদা টাউন স্টেশন থেকে। চতুর্থীর দিন স্কুল থেকে ফিরে দেবু দেখে বেশ উৎসবের ভাব লেগেছে বাড়িতে। বউদি কলকাতা থেকে একরাশ নতুন পর্দা, বেডশিট এইসব নিয়ে এসেছে। দেবুর ঘরটার তোলপাড় অবস্থা। বইপত্র সব তুলে তাকে সাজিয়ে তার ওপর পর্দা ঝোলানো হয়েছে। টেবিলটা তকতক করছে একেবারে। তার ওপরের কাগজপত্র উধাও। সুন্দর একটা কলমদানীতে কলমদুটো রাখা।

ঘরে ঢুকে হা হা করে উঠতে দেবু রমার কাছে ধমক খেল একটা। বলে, ‘কী ভেবেছ? আমরা সবাই গোমুখ্যু? তোমার কাগজপত্র পুড়িয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে ফেলেছি? ওই তাকের ওপর দেখো, চারটে ফোলডারে যত্ন করে সব গাঁথা আছে। লোকজনের সামনে গোছানো একটা ইমেজও তো তৈরি করা দরকার?’

দেবু বিরক্ত মুখে বলল, ‘কী সার্কাস শুরু করেছ বলো তো? এঁরা আসছে একটা কাজে, কাজ সারবে, তারপর চলে যাবে। তার জন্য এতসব আয়োজন কেন?’

‘আয়োজন? ঘরটরগুলো একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করলেই বিরাট আয়োজন হয়ে গেল?’

‘হয়নি? সীতামাসি আর মা মিলে যা খাবারদাবার বানাবার প্ল্যান ভাঁজছে সে তো বিয়েবাড়ির ভোজ। ওদিকে তুমি আবার রাজ্যের পর্দাটর্দা এনে ঘরটাকে হোটেলরুম বানাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছ। হলটা কী তোমাদের?

বউদির মুখটা ভারী হয়ে উঠল। বলে, ‘ছেলেদের জাতটাই বোধ হয় এমন অকৃতজ্ঞ হয়। কার ভালোর জন্য করছি এসব? এরা খুশি হলে নামডাক কার হবে? আমাদের? তুমি দেবু খুব আনফিলিং ছেলে। বিবি যে কেন ওরকম একটা ডিসিশান নিল তা এখন একটু একটু বুঝতে পারছি। আসলে, দোষটা তোমাদের গুষ্টির। একজনকে নিয়ে এতগুলো বছর জ্বলছি, আর অন্যজনও এমন রূপ দেখাচ্ছে যে…’

রাগ হচ্ছিল না দেবুর। এই ছ’টা বছরে চোখ অনেক বদলেছে তার। রুষ্ট কণ্ঠের আড়ালে স্নেহটিকে চিনে নিতে আর ভুল হয় না এখন। বউদির মাথায় মৃদু একটা চাপড় দিল সে। বড় ভালো মেয়ে। একটু মাথা গরম, এই যা। কিন্তু ভালো তো বাসে! তারপর বলল, ‘ছাড়ো ওসব কথা। গাল যা দেবে দাও, কিন্তু সেইসঙ্গে কিছু খেতেও তো দেবে, নাকি মহান অতিথিদের আগমনের সম্মানার্থে উপোস করিয়ে রাখবে?’

‘তুমি একটা পাগল, বুঝলে ঠাকুরপো?’

বউদি হাসছিল। চোখে জল এসে গিয়েছিল খানিক আগে। এখন সামলে নিয়েছে। চিকচিকে ভাবটুকু কেবল লেগে আছে চোখের কোণে। বলল, ‘চান সেরে এসো। ওঘরে খাবার দিয়ে দিচ্ছি। খেয়ে কাজে বোসো গে। যা কাগজপত্তর গোছাবার গুছিয়ে নাও। তারপর আজ একটু তাড়াতাড়ি শুয়ে পোড়ো। তিনটেয় গাড়ি আসবে। নইলে মালদা পৌঁছে গৌড় অ্যাটেন্ড করতে পারবে না।’

.

গৌড় এক্সপ্রেস ঘণ্টাদুয়েক লেট ছিল। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ পৌঁছোল এসে। গৌড়ে এসি ফার্স্ট ক্লাশ একটাই। অতএব খুঁজে বের করবার সমস্যা ছিল না।

মেহেরদি দরজার কাছেই এসে দাঁড়িয়েছিল। দেবুকে দেখে হাত নাড়ল। তারপর ভেতরে উঁকি মেরে কাউকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে অন্য একজন ভদ্রমহিলা বের হয়ে এলেন। মেহের ততক্ষণে নিজের বাক্সটা দেবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে নেমে এসেছে।

দরজায় এসে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলা বেশ লম্বা। জিনস টি-শার্ট স্নিকারে চমৎকার মানিয়েছে। পিঠের স্যাকটা নিয়ে অবলীলায় নীচে নেমে এসে আলাপ করিয়ে দেবার অপেক্ষা না করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হেসে বললেন, ‘দেবব্রত আই প্রিজিউম। আমি হেমাম্বিকা আরিয়া।’

 হাতটা একটু নাড়িয়ে ছেড়ে দিল দেবু। হেমাম্বিকা তার মুখের দিকে তীক্ষ্ন চোখে দেখছিলেন। খানিক বাদে বললেন, ‘বাট য়ু আর কোয়াইট ইয়াং!’

দেবু হাসল, ‘সো?’

মহিলা সপ্রতিভাবে জবাব দিলেন, ‘মানে, এই টাইপের কাজকর্মের লোকজনের ব্যাপারে একটা ভিস্যুয়াল এক্সপেকটেশান তৈরি হয়ে থাকে আমাদের! ধরেই নিই বয়স্ক কেউ। আর এই মেয়েটা তোমার কাজের ব্যাপারে যাবতীয় তথ্য দিলেও তোমার পার্সোনাল ইনফরমেশান কিছুই দেয়নি আমাকে।’

‘আপনাকে অবশ্য আমি কিছুটা চিনি ম্যাডাম।’ দেবু আস্তে-আস্তে বলল। মেহেরের চিঠিটা পাবার পর থেকে ভদ্রমহিলার কাজকর্মের বিষয়ে কিছু খোঁজখবর সে-ও নিয়েছে গত কয়েকদিনে।

‘ও ডিয়ার! বাট হাউ?’

‘বাইগাদের ওপর আপনার এক্সসেপশনাল কাজটা পড়েছি। এছাড়া আইসোরেফ থেকে প্রোফাইলটাও দেখলাম।’

‘এক্সসেপশনাল! হা হা হা, ইউ ফ্লার্ট!’ হঠাৎ দেবুর কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে খোলা গলায় হেসে উঠলেন মানুষটা। আর তারপরেই ছদ্ম গাম্ভীর্যে মুখটা ঢেকে নিয়ে বললেন, ‘অ্যান্ড ডু আই ম্যাচ ইয়োর ভিস্যুয়াল এক্সপেকটেশানস?’

মেহের দেবুর দিকে কটমট করে তাকাচ্ছিল। দেবু সেদিকে একনজর দেখে নিয়ে মুখটা হেমাম্বিকার দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘মোর দ্যান মিয়ার ম্যাচ। ইউ আর বিউটিফুল। কিন্তু, এবার কি আমরা রওনা হব?’

‘আরে দাঁড়াও,’ বলতে-বলতে হেমাম্বিকা মেহেরের দিকে ঘুরে তাকিয়েছেন, ‘প্রফেসর চ্যাটার্জি কোথায় গেলেন? একসঙ্গে টিকিট না হলে এই মুশকিল…’

‘আসছে।’ মেহের মাথা নাড়ল, ‘আসলে ওর টিকিটটা পরে কাটতে হল তো! এসি ফার্স্ট ফুল হয়ে গিয়েছিল।’ বলতে-বলতে সে দেবুর দিকে ঘুরে বলল, ‘বি-ফাইভে আছে। একটু এগিয়ে দেখবি?’

‘যাচ্ছি, কিন্তু চিনব কী করে?’

‘আরে গেলেই চিনে যাবি ঠিক,’ মেহের হাসল, তারপর বলল, ‘গ্রিন টপ আর ব্লু জিনস। একটা স্টিল কালারের ট্রলিব্যাগ থাকবে সঙ্গে। গিয়ে নিয়ে চলে আয়। আমরা গাড়িতে গিয়ে বসছি। এসো হেমাম্বিকা।’

‘বেরিয়ে গিয়ে গাড়ি খুঁজে পাবে তো?’ হেমাম্বিকা একটু ইতস্তত করছিলেন, ‘তার চেয়ে একসঙ্গেই…’

‘সমস্যা হবে না,’ মেহের হাসল, ‘রমাদি গাড়ি আর ড্রাইভার দুটোরই ডিটেল কাল রাতেই আমায় এসএমএস করে দিয়েছে। লোকটার নাম সুবুদ্ধি, তাই তো?’

‘ভালো।’ দেবু মাথা নাড়ল, ‘স্ট্যান্ডেই দাঁড়িয়ে আছে। বেরিয়ে হাতের বাঁয়ে।’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমরা খুঁজে নিচ্ছি, তুই এখন যা। চলো তো হেমাম্বিকা,’ বলে হেমাম্বিকার হাত ধরে একরকম টানতে টানতেই মেহের ভিড়ে মিশে এগিয়ে গেল।

বি-ফাইভ কোচটা বেশ অনেকটা দূরে। লোকজনের ভিড় ঠেলে সতর্ক নজর রেখেই সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল দেবু। কিন্তু সবটা পথ আর পার হতে হল না তাকে। বি-থ্রির দরজার কাছাকাছি এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। ভিড়ের ভেতর দিয়ে, স্টিল গ্রে রঙের একটা ভারী ট্রলিব্যাগ টানতে-টানতে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকা মানুষটা…

বুকের ভেতর গড়ে উঠতে থাকা কাঁপুনিটাকে অনেক কষ্টে সংযত করল দেবু। বিবি…কিন্তু এখানে…

আস্তে-আস্তে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল দেবু। থেমে দাঁড়িয়েছে বিবিও। নীরব চোখদুটোর গভীরে সামান্য একটা ঝিলিক দিয়েই ফের নিভে এল তা। খানিক বাদে একেবারে স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘কেমন আছ দেবুদা?’

‘বিবি তুমি…’

বিবি একটু অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চাইল, ‘আমি আসছি মেহেরদি সে নিয়ে বলেনি কিছু তোমাকে?’

‘না। তুমি…মানে হেমাম্বিকা বলছিলেন প্রফেসর চ্যাটার্জি…’

একটু হাসল বিবি, ‘আমি। সেটা তুমিও জানো দেবুদা। আমার একটা রিসেন্ট পেপারের রিভিউও করেছ তুমি। চ্যাটার্জি-রামনাথন…’

‘তুমি…তার মানে প্রফেসর বি চ্যাটার্জি…’

‘রাইট। ছোটবেলা তুমি বি বলে ডাকলে রেগে যেতাম মনে পড়ে? বলতাম বাটারফ্লাই বলো। তাই ধরেই নিয়েছিলাম বি চ্যাটার্জি দেখেই তুমি ঠিক বুঝবে।’

‘না মানে আমি ঠিক…’

‘ধারণা করতে পারোনি। স্বাভাবিক।’ বিবির গলাটা হঠাৎ আশ্চর্য সমতল। কোনো উঁচুনীচু নেই তাতে। কোনো অনুভূতির ছোঁয়া নেই। খানিক বাদে তার পাশে হাঁটতে-হাঁটতেই ফের বলল, ‘বিদেশে আর ভালো লাগছে না, বুঝলে? দেশেই সেটল করতে চাইছি এবার। মেহেরদিকে বলতে ও-ই আইসোরেফের ব্যাঙ্গালোর অফিসে একটা ওপেনিং-এর খবর দিল। ওই ব্যাপারেই একটা ইন্টারভিউ চাইছিলেন হেমাম্বিকা। বললেন এখানে ভিজিটে আসছেন। চলে আসতে বললেন। তাই…’

তার হাত থেকে ট্রলিব্যাগের হাতলটা নিজের হাতে তুলে নিল দেবু। বিবিকে প্রথম দেখতে পাবার মুহূর্তের উত্তেজনাটা এইবার খানিকটা কমে এসেছে তার। কোথাও একটু ফাঁকাই ঠেকছিল তার বদলে। বিবি তার নিজের কাজে এসেছে। ঈশ্বরপুরে সে আসেনি। তার কাছেও নয়।

আগে আগে এগিয়ে যেতে থাকা মানুষটার দিকে তার তীক্ষ্ন চোখদুটো ধরে রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল বিবি। দেবুর শরীরী ভাষায় শুরুর মুহূর্তের চমক আর আনন্দটা এখন উধাও। মাথাটা নীচু করে একজন পরাজিত মানুষের মতোই এগিয়ে চলেছে।

.

‘এইবার বুঝলে তো, কেন তখন তোমায় ওখান থেকে টেনে নিয়ে চলে এসেছি! প্রথমবার দেখা হবার সময়টা…’

খুব তাড়াতাড়ি দেবু আর বিবির ব্যাপারটার একটা ধারণা হেমাম্বিকাকে দিয়ে মেহের থামল। হেমাম্বিকা মজা পাচ্ছিলেন। চোখদুটোয় কৌতুক ঝিলিক দিয়ে উঠেছে তাঁর।

‘ইউ ক্র্যাফটি গার্ল!’

মেহের গালে টোল ফেলে হাসল। বেশ খানিকটা দূরে স্টেশন থেকে বের হবার মূল দরজাটার কাছে বিবিকে দেখা যাচ্ছিল। দেবু বেরিয়ে আসছে ওর পেছন পেছন। সুবুদ্ধি দেবুর হাত থেকে সুটকেসটা ঘাড়ে তুলে নিয়ে এদিকে রওনা হয়েছে। সেদিকে একনজর দেখে মেহের বলল, ‘কিন্তু পার্সোনাল ব্যাপারটা যা-ই হোক, ওদের কাজগুলো যতটুকু দেখেছ…’

‘সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই,’ হেমাম্বিকা হাসলেন, ‘দুটোই অত্যন্ত প্রমিসিং কাজ। তা না হলে এই শিডিউলের মধ্যে এতটা সময় বের করে ছুটে আসি? এই ছেলেটার কাজটাজগুলো দেখে নিই। মেয়েটাকেও একটু বাজিয়ে দেখে নেওয়া যাক। যদি যেমনটা আশা করছি তার সঙ্গে মিলে যায় সবকিছু, তাহলে তুমি যেটা চাইছ সেটাকে হয়তো আরো একটু ভালোভাবে ফেসিলিটেট করে দিতে পারব। ইউ নটি নটি ম্যাচমেকার…’

.

 ১০

.

‘কেমন আছিস রে?’

দুপুর ঘন হয়ে এসেছে এখন। বৃষ্টি হয়নি আজ। আকাশটা টুকটুকে নীল। বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসেছিলেন সুনন্দা। তাঁর ঠিক সামনে দাওয়ার ধারটায় উঠোনে পা ঝুলিয়ে হাতে একটা ফাইল নিয়ে বসেছিল বিবি। মন বসছে না অবশ্য। খাওয়াদাওয়ার পর ওরা সবাই গ্রামটা ঘুরে দেখতে বের হয়ে গেল। আজ ঈশ্বরপুরেই রেস্ট। কাল ভোরবেলা উঠে গৌরীহর যাওয়া হবে দল বেঁধে। ওদের নামিয়ে দিয়ে দেবু গৌরীহর বেরিয়ে গেছে খানিক আগে। সব বন্দোবস্ত দেখাশোনা করে তৈরি করে রাখবে।

বিবি আর গ্রাম দেখতে বের হয়নি। লম্বা প্লেনজার্নি করে আসা। তারপর গতকালই আবার ট্রেন ধরেছে। ওর মুখ দেখে মাসিমাই শেষমেশ বললেন, ‘তুই আর গিয়ে কী করবি? এ জায়গা তো তোর আগেই দেখা। বরং তুই একটু গড়িয়ে নে এই ফাঁকে।’

হেমাম্বিকা অবশ্য ওসব ক্লান্তিটান্তির কথায় গুরুত্ব দেন না বিশেষ। বিবি থেকে যাবে শুনে একটা ফোল্ডার বের করে ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ছত্তিসগড়ে ওঁর করা একটা গ্রামীণ শিক্ষা প্রজেক্টের ফাইল। আইসোরেফের টকায় হয়েছিল কাজটা। একই প্রজেক্টের আরেকটা ফাইল উনি দেবুকেও ধরিয়ে দিয়েছেন ওর বেরোবার আগে। গৌরীহর প্রজেক্ট ইনসপেকশানের পর ওই নিয়ে দেবু আর বিবির সঙ্গে বসবেন নাকি খানিকক্ষণ।

মাসিমার ঘরটাতেই গিয়ে শোবার ইচ্ছে ছিল বিবির। কিন্তু ও ঘরটা মেহের আর হেমাম্বিকার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দেবুর ঘরটা খানিক বড় বলে রাতে ওখানে মাসিমা, রমাবউদি আর বিবি শোবে। কাজেই সে-ঘরের বিছানাতেই গিয়ে শুয়ে পড়েছিল বিবি। ঘুমও এসে গিয়েছিল, কিন্তু কারেন্ট চলে গেল।

বড় ভ্যাপসা গরম এখানে। পিঠটা ভিজে উঠছিল তার। প্রশ্নটা করেই নীচু হয়ে আঁচল দিয়ে তার ঘাড়ের কাছটা একবার মুছিয়ে দিলেন সুনন্দা। তাঁর গলায় স্নেহের ছোঁয়া ছিল, ‘গরম লাগছে খুব, না রে? ওইসব পড়াশোনা এখন রাখ তো! আয়, একটু গল্প কর আমার সঙ্গে। দাঁড়া, তোকে হাওয়া করি একটু। এই পুজো এল মানে লোডশেডিং শুরু হয়ে গেল। পঞ্চবটিতলায় আজকাল আলোর যা বাহার হয়েছে। পঞ্চমী থেকেই শুরু হয়ে গেছে। হুক করে লাইন নেবে আর আমাদের দুর্গতি। আজকের জন্য জেনারেটার লাইন একটা নেওয়া আছে বটে, কিন্তু সে তো আবার সন্ধের আগে চালাবেও না।’

‘পঞ্চবটিতলার পুজোয় এখন ইলেকট্রিক লাইট জ্বলে বুঝি মাসিমা?’

‘হ্যাঁ রে। বেশ কয়েক বছর হল তো! তুই চলে যাবার পরপরই…’

কথাটা বলেই একটু চুপ করে গিয়ে মাসিমা ফের বললেন, ‘আরেকবার স্নান করবি?’

ঠিক এইজন্যই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করছিল বিবির মনে। মাসিমা সম্ভবত জানতেন সে আসছে। কারণ, তাকে আসতে দেখে একটুও অবাক হননি তিনি। ব্যাপারটা একটু বিস্ময়কর, কারণ দেবুর নিঃসন্দেহে ব্যাপারটা জানা ছিল না। তবে সে নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি বিশেষ। যে বিষয়টা তাকে এখানে আসবার পর স্বস্তি দিয়েছে তা হল মাসিমার আচরণ। একবারের জন্যও তার আগের বারের আসা, তার চলে যাওয়া এইসব নিয়ে কোনো কথা, কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলেননি মাসিমা। মন্তব্যও করেননি কিছু। যেমনভাবে সে এসেছে, তেমনভাবেই ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছেন। অতীতকে মনে করিয়ে দেননি একবারের জন্যও।

‘নাঃ মাসিমা। খুব অসুবিধে হচ্ছে না,’ বিবি জড়ানো গলায় হাসল একটু, ‘শুধু ঘুম পাচ্ছে বড্ড। গরমে…’

‘আহা রে। মেয়েটা এতদূর থেকে এল…’ হঠাৎ কী মনে করে উঠে দাঁড়ালেন সুনন্দা, ‘এই মেয়ে, চল দেখি ঘরে। গিয়ে শো, আমি তোকে হাওয়া করছি।’

‘না না। মাসিমা সেকী!’

‘ওঠ বলছি তুই! কাল তো আবার সারাটাদিন টই টই করে ঘুরতে বেরোবি। শেষে একটা কিছু বাঁধিয়ে বসলে…’

এ-ডাকের কাটান তার কাছে ছিল না। হঠাৎ বিবির বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। সুমিত বিয়ে করে বাবা-মা’কে সিঙ্গাপুরে শিফট করিয়ে নিয়ে যাবার পর এদেশে প্রায় তিন বছর হল আর পা পড়েনি তার। পড়বার কারণও ছিল না কোনো। সুমিতের ওখানেও যাবার সুযোগ হয় না বিশেষ। সাগরপাড়ের প্রবাসের নির্জন, ছোট ফ্ল্যাটটায় একলার সংসার যাপন করতে-করতে এই আদরগুলোর কথা সে ভুলেই গিয়েছিল প্রায়। আজ এতদিন বাদে তাই ফের একবার এই ডাকটুকুকে ফিরিয়ে দেবার সাধ্য তার ছিল না।

বিছানায় তাকে শুইয়ে দিয়ে মাথার কাছের জানালাটা খুলে দিলেন সুনন্দা। তারপর তার পাশে হাতের বইটা খুলে বসে বললেন, ‘নে। ঘুমো তুই। আমি পড়তে-পড়তে হাওয়া করছি।’

মৃদু কিঁচকিঁচ শব্দটা আর তার সঙ্গে শরীর জুড়ে নেমে আসা হালকা ওড়নার স্পর্শের মতো একটা হাওয়ার ঢেউ কখন যে তার চোখদুটোকে জুড়ে দিয়েছিল বিবি জানে না।

হঠাৎ বিশ্রি গুমোট একটা গরমের অনুভূতি নিয়ে ঘুমটা ভেঙে গেল তার। বাইরে বিকেল নেমেছে। ঘরে সে একা। ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে উঠোনের সরু একটা ফালি দেখা যাচ্ছিল। চোখ খুলে মাথার ওপর তাকিয়ে তার নজরে এল, ফ্যানটা আস্তে-আস্তে থেমে আসছে।

মাসিমা বলে ডাকটা দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল বিবি। কারেন্ট আসতে বোধ হয় বাইরে চলে গিয়েছেন। বিশ্রাম নিচ্ছেন হয়তো একটু। কী হবে ওঁকে ফের বিব্রত করে।

বিছানার পুরু তোশকটা গায়ে ফুটছিল যেন। ঘামে ভিজে উঠেছে। আস্তে-আস্তে উঠে বসল বিবি। তোশকটার নীচে একটা সুন্দর খেজুরচাটাই পাতা আছে। পাশগুলো বেরিয়ে আছে ওর। তোশকটা গুটিয়ে রেখে পাটিটার ওপর শুলে যদি একটু আরাম হয়।

উঠে দাঁড়িয়ে বেডশিটসুদ্ধ তোশকটাকে গুটিয়ে ফেলতে গিয়ে মাঝপথে হঠাৎ থমকে গেল বিবি। ওর নীচে জমে ওঠা রাজ্যের বাজে কাগজ, সিগারেটের খালি প্যাকেটের ভেতর থেকে পোস্টকার্ড সাইজের ছবিটা তার দিকে ডাগর দুটি চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল।

বুকের ভেতর একটা মোচড় দিচ্ছিল বিবির। মোটাদাগের নকশা করা, ময়ূরকণ্ঠী রঙের শাড়ি জড়ানো মেয়েটা…সেই নীল রঙের ফুলের বিছানাটার ওপরে।

বুদ্ধুটা সবার চোখের আড়ালে, নিজের গভীর উদাসীনতার পাঁচিলটার আড়ালে এখনো…

ভারি লজ্জা করছিল বিবির। একদম ইচ্ছের বিরুদ্ধে, সব শাসনকে অস্বীকার করে চোখদুটো জ্বালা করে উঠেছে তার হঠাৎ। আজ অনেকদিন পরে।

‘বিবি, এই দেখো দেখি। কারেন্ট এল দেখে একটু সীতার কাছে গিয়ে বসেছি কি বসিনি…’

দরজার কাছ থেকে হঠাৎ সুনন্দার গলার শব্দটা পেয়ে থেমে গেল বিবি। ছবিটা হাতে ধরে দাঁড়ানো বিবির দিকে তাকিয়ে একটু থমকে গেছেন সুনন্দাও।

তাড়াতাড়ি করে গোটানো তোশকটাকে ফের মেলে দিয়ে নিজের এই দুর্বল মুহূর্তটার সমস্ত চিহ্নকে ফের ঢেকে দিতে চাইছিল সে প্রাণপণে। ঝাপসা চোখে তার কাঁপা কাঁপা হাতগুলো সে কাজের থই পায় না। আর তারপর হঠাৎ পেছন থেকে দুটো কোমল হাত এসে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। একটা শান্ত গলা বারংবার তার কানের কাছে বলে যায়, ‘কাঁদ। কেঁদে হালকা হয়ে নে মা। আমার কাছে লজ্জা কি তোর?’

‘মাসিমা?’

বাইরে থেকে মেহের-এর ঝলমলে গলাটা ভেসে আসতে হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল বিবি। তাড়াতাড়ি চোখদুটো ভালো করে মুছে নিতে বিবি বলল, ‘মেহেরদি, এসে গেছ তোমরা?’

.

 সপ্তমীর দিন দুপুর দুপুর আশ্রমে পৌঁছে দেখা গেল সেখানেও আয়োজন নিতান্ত মন্দ হয়নি। আশ্রমের মাঝখানে ছোট মঞ্চ তৈরি হয়েছে একটা। তার সামনে একজন বয়স্ক মানুষ দামি ধুতিপাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়েছিলেন। গাড়িটা এসে থামতে তিনি শশব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে দরজাটা খুলে ধরলেন গাড়ির।

ভদ্রলোকের পেছনে খানিক দূরে দেবু দাঁড়িয়েছিল। মেহের বেরিয়ে এসে কপালে টিপ পরাতে এগিয়ে আসা ছেলেমেয়েদের দলটাকে এড়িয়ে তার কাছে গিয়ে একটু বিরক্ত মুখে বলল, ‘এসব কী?’

দেবু ঠোঁট উলটে দিল, ‘উপায় নেই মেহেরদি। এই ভদ্রলোক এখানকার পঞ্চায়েত প্রধান। আশ্রমের অনারারি প্রেসিডেন্টের পোস্টটা দিতে হয়েছে শান্তি বজায় রাখবার জন্য। কাল আমি আসতে আমার মুখে আজকের ইনসপেকশানটার ব্যাপারে শুনে এই সমস্ত শুরু করে দিয়েছেন। নাকি তা নইলে গৌরীহরের প্রেস্টিজ থাকবে না।’

‘বারণ করতে পারলি না তুই? হেমাম্বিকার সামনে একটা এমব্যারাসিং, উদ্ভট…’

‘আরে না না। কীসের এমব্যারাসিং?’ বলতে-বলতেই হেমাম্বিকা লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছিলেন তাদের দিকে। গলায় একটা রজনীগন্ধার মালা দুলছে তাঁর। কপালে ধেবড়ে যাওয়া চন্দনের টিপ।

‘তোমরা থিওরেটিশিয়ানরা এসব বোঝো না মেহের। আমরা যারা ফিল্ডে যাই, গোটা এশিয়াতেই এই এক ঝামেলা তাদের নিয়মিত সামলাতে হয়। গ্রাম অঞ্চলে প্রজেক্টের কাজে যাওয়া মানেই বাধ্যতামূলক খাতিরদারি চলবে। পুওর থিংস… আমরা যে এসেছি এইতেই একেবারে ধন্য হয়ে যায় সব। মালা, পাগড়ি, চাদর, প্রদীপ…ও আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে। কিন্তু ওরা দুজন ব্যাপারটা বেশ এনজয় করছে। দেখো দেখো…’

বলতে-বলতে পেছনে দাঁড়ানো রমা ও বিবির দিকে দেখিয়ে দিলেন তিনি। সম্ভবত শাড়িজামার পরিচিত পোশাকে থাকায় ভালোবাসার চাপটা তাদের ওপর একটু বেশিই চলছে। আশ্রমের মহিলাদের একটা বড় দল ঘিরে রয়েছেন তাদের। মাথায় ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে কপালে চন্দনের টিপ পরিয়ে বরণ করার পালা চলছে।

 হঠাৎ সেদিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেল দেবুর। নীল আর জামরঙে মেশা তাঁতের শাড়িতে যেন ঝলমল করছে বিবি। শাড়িটা তার চেনা।

‘চমৎকার মানিয়েছে, না?’ হঠাৎ মেহের তার পেছন থেকে বলে উঠল, ‘সকালে তৈরি হচ্ছি সবাই তখন রমাদি শাড়িটা বের করতে দেখি বারবার ঘুরে ঘুরে দেখছে। দেখে রমাদি অফার করতে এক কথায় রাজি। আসলে লোভ হচ্ছিল বিবির, বুঝলি? নিজে তো গুচ্ছের জিনস ছাড়া আর কিচ্ছু আনেনি সঙ্গে। হ্যাঁ রে, রমাদি বিবিকে তখন বলছিল বলে শুনলাম, এটা রমাদিকে তুই কিনে দিয়েছিস? নিজে চয়েস করে?’

দেবু মাথা নাড়ল, ‘গৌড় রোডে একটা তাঁতের শাড়ির দোকান হয়েছে নতুন। মঙ্গলবাড়ির একটা হ্যান্ডলুম কো-অপারেটিভ আছে, ওদের শো-রুম। ওখান থেকেই নিয়ে গিয়ে দিয়েছিলাম এবার পুজোয়। বউদির কমপ্লেকশনটার সঙ্গে…’

‘ওরে ছেলে! এদিকে সাধুবাবা হয়ে ঘুরে বেড়াও, ওদিকে মেয়েদের কমপ্লেকশান-টানের ব্যাপারেও টনটনে জ্ঞান, অ্যাঁ।’ বলতে-বলতে মেহের হেসে ফেলল, ‘এসব মিটে গেলে আমায় কিন্তু তুই একখানা ওই…’

সুরেন বিশ্বাস ততক্ষণে স্টেজে উঠে পড়েছেন। সেখান থেকে হাত নেড়ে ডাকছিলেন ওদের। সেদিকে তাকিয়ে দেবু বলল, ‘চলো ফালতু ব্যাপারগুলো মিটিয়ে কাজে বসতে হবে। দরকারি কথা আছে অনেক। আর, তোমার আদেশ নোটেড। পরের বার যখন কলকাতা যাব, তোমার জন্য একটা ফার্স্ট ক্লাশ মালদা-র শাড়ি…’

‘মনে থাকে যেন।’

ওরা মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।

.

সুরেন বিশ্বাস সভাটভা বানিয়ে আধঘণ্টার জায়গায় পুরো দু’ঘণ্টা নষ্ট করে ছাড়লেন শেষমেশ। মঞ্চ থেকে হেমাম্বিকা ইউ এন-এর তরফে দেবুর গবেষণার কাজে টাকা দেবার আশ্বাস দেবার পর এই মুহূর্তে তিনি আরও উত্তেজিত। এক ফাঁকে এসে দেবুর কানে কানে বলেও গেছেন, ‘রিসার্চ মানে তো গৌরীহরের আশ্রম! পেটে পেটে আপনার এত দেবুভাই? ওই জন্যেই তবে আমার স্কুলের প্ল্যানটায় রাজি হননি সেদিন! এখন এই মেমসাহেবদের ভুলায়ে-ভালায়ে টাকাটা একবার গৌরীহরে এনে ফেলেন, তারপর দ্যাখেন কী করি! পার্টির বেশ ক’টা ছেলের চাকরি হবে, এ কি কম কথা? আশ্রমের হেডমাস্টারি তো আপনার হাতেই থাকবে, না কি? তা ভালো। গাড়িটাড়ি পাবেন, মায়নাও ভালো হবে নিশ্চয়, তাছাড়া উপরি, কমিশন এসব তো আছেই। সে হোক। আপনার খাটুনি, আপনি লাভ তুলবেন না তো কে তুলবে? আমার গৌরীহরের ক’টা ছেলের যদি চাকরি হয় সেটাই আমার লাভ।’

তারপর খাওয়া-দাওয়ার পালা। সুকুমাররা আশ্রমে আজ চাঁদা তুলে ঢালাও খিচুরির বন্দোবস্ত করেছে। সঙ্গে পাঁপড়, চাটনি, বেগুনভাজা।

বিশ্বাসমশাইয়ের ইচ্ছে ছিল অতিথিদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একটু ভালোমন্দ খাওয়াবেন। মাছমাংসের ঢালাও বন্দোবস্ত করেছেন নাকি। ওতে আবার একটা লম্বা সময় নষ্ট হবে বলে দেবু একটু রেগে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। হেমাম্বিকা তাকে হাত দিয়ে আটকে চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘আমি সামলাচ্ছি। বিবি তুমি চলো তো আমার সঙ্গে। শোনো…’

বলে, বিবির সঙ্গে নীচুগলায় কয়েকটা কথা বলে দুজন গিয়ে সুরেন বিশ্বাসের কাছে দাঁড়িয়ে পড়লেন। একটু বাদেই দেখা গেল বিশ্বাসের উৎসাহে ভাটা পড়েছে। খানিক বাদে পার্টির দলবল নিয়ে তিনি বেরিয়ে যেতে বিবি ফিরে এসে চোখদুটো বড়-বড় করে বলে, ‘ম্যাম, এরকম একটা ডাহা মিথ্যেকথা…’

হেমাম্বিকা ঠোঁট চেপে মুচকি হাসলেন, ‘এদেশে ফিল্ডে কাজ করতে চাইছ বিবি, তায় মেয়ে। কতরকমভাবে যে পরিস্থিতি সামলাতে হয় এখানে!’

.

১১

.

‘এসো দেবু। এসো বিবি। বোসো।’ ল্যাপটপটা মেহেরের দিকে ঠেলে দিয়ে চশমাটা কপালে সরিয়ে নিলেন হেমাম্বিকা।

আশ্রমের উঠোনের মাঝখানে দেবুর অফিস ঘরটায় হেমাম্বিকার থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল আগের দিন। একটা টেবিল ফ্যানেরও বন্দোবস্ত করা হয়েছে সেখানে। বাকিরা আশ্রমের অন্যান্য ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে গিয়েছেন। এখানে রাতের দিকে ততটা গরম থাকে না।

আজ অষ্টমী। আগের দিন সকাল থেকে শুরু হয়ে আশ্রমের প্রতিটি প্রজেক্টের খুঁটিনাটি দেখা ও সে নিয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে আজ দুপুরে। আগের দিন রাতে হেমাম্বিকার ঘরে দীর্ঘক্ষণ আলো জ্বলেছিল। অনেকবারই ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেবু দেখেছে সেখানে তাঁর যন্ত্রটার পর্দার সামনে, চারপাশে কাগজপত্র ছড়িয়ে ধ্যানস্থ হয়ে আছেন ক্লান্তিহীন মানুষটি। সারাদিনের জোগাড় করা তথ্য যন্ত্রে ভরে গড়ে তুলছেন তাঁর রিপোর্ট।

‘গৌরীহর এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে দেবুর গবেষণাপত্রগুলো আমরা প্রত্যেকেই ইতিমধ্যে দেখেছি। এরপর গত দু’দিন ধরে বাস্তবে কাজকর্মগুলোর একটা ধারণাও পাওয়া গেছে। এ-বিষয়ে কারো কোনো প্রশ্ন?’

টেবিলের একদিকে মেহের আর হেমাম্বিকা বসেছেন। উলটোদিকে দেবু আর বিবি পাশাপাশি সামনে দুটো ফোল্ডার নিয়ে বসে ছিল।

‘প্রশ্ন নয়,’ বিবি মাথা নাড়ল, ‘তবে কিছু বক্তব্য আছে আমার।’

‘উঁহু, প্রত্যেকে তাঁর বক্তব্য বলবার সুযোগ পাবেন। এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনার পর এই এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে আইসোরেফের তরফে আমার প্রোপোজালগুলো আমি দেব। তবে তার আগে, আমার ছত্তিসগড়ের যে প্রজেক্ট রিপোর্ট ফাইলটা তোমাদের পড়তে দিয়েছিলাম, তার সঙ্গে দেবুর গৌরীহর এক্সপেরিমেন্টের তফাতগুলো কোথায় এ নিয়ে তোমরা যদি কিছু বলো। প্রথমে বিবি।’

সামনের ফাইলটা খুলে একটু দেখে নিল বিবি। তারপর বলল, ‘প্রাথমিক ভাষা, অঙ্ক, স্বাস্থ্য নিয়ে দুটো মডিউল একইরকম। কিন্তু তারপর আপনার মডেলটায় পেশাগত শিক্ষার জন্য স্থানীয় শহরের চাহিদা বুঝে সেই মোতাবেক সেলাই করা কাপড় আর সফট টয় এই দুটোর ট্রেনিং দিয়ে, সরাসরি উৎপাদন শুরু করা হয়েছে। এর রোজগারের একটা অংশ পুঁজি হিসেবে জমিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে লাভের মুখ দেখেছে প্রজেক্ট। জিনিসটা একেবারে স্ট্যান্ডার্ড মডেল ম্যাম। সারা তৃতীয় বিশ্বেই গ্রামোন্নয়নে এই মডেলটা বহু জায়গায় কাজে লাগানো হয়।’

‘গ্রেট! আর গৌরীহর মডেল?’

বিবি পাশে বসা দেবুর দিকে একঝলক চাইল। তারপর হেমাম্বিকার দিকে ঘুরে শান্তভাবে বলল, ‘গৌরীহর মডেলে আশ্রম কোনো পুঁজি তৈরিই করছে না।’

‘রাইট। তারপর?’

‘এখানে মডেলের গোড়ার দর্শনটাই আলাদা। ছত্তিসগড় মডেলটা একেবারে লিনিয়ার। একের পর এক সম্পর্কিত ধাপে সেটা এগোতে থাকে। কিন্তু দেবুদার মডেলটাকে আপাতদৃষ্টিতে কেমন এলোমেলো, পরস্পর সম্পর্কহীন কয়েকটা জনদরদি কাজের সমষ্টি বলেই মনে হবে। মেয়েদের ধাত্রীবিদ্যা শেখানো, পোড়ো জমিতে উন্নতশ্রেণির কলার চাষ, সামান্য পুঁজির একটা কো-অপারেটিভ, বেসিক ভাষা আর অঙ্কের ক্লাশ, পাবলিক হাইজিন…কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই, গন্তব্য নেই।

‘কিন্তু দেবুদা ওর পেপারে যে অঙ্কের মডেলটা দিয়েছে সেটা দেখলে এদের পারস্পরিক সম্পর্কটার আন্দাজ পাওয়া যাবে। গোটা গ্রামজীবনটার প্রত্যেকটা কর্মকাণ্ডকে একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক হিসেবে ধরে নিচ্ছে দেবুদা। আর তারপর তাদের মধ্যে সম্পর্কগুলোর একটা অ্যালগরিদম খুঁজছে। আপাত সম্পর্কহীন বিভিন্ন কাজ, বিভিন্ন গ্রামীণ জ্ঞান একে অন্যকে কীভাবে প্রভাবিত করে সেটার অঙ্কটাকে ধরতে চাইছে…’

বলতে-বলতে নিজেরই অজান্তে কখন যেন সে তার উজ্জ্বল চোখদুটো ঘুরিয়ে ধরেছে দেবুর দিকে, ‘আমার ডক্টোরাল থিসিসেরও মূলতত্ত্ব এটাই। গ্রামজীবনের প্রত্যেকটা দিক, তার অন্ধবিশ্বাস থেকে শুরু করে তার পেশা, প্রতিটাই একে অন্যের ওপর নির্ভর করে, সেটার প্রমাণ দেখিয়েছিলাম আমি তাতে।’

 নিঃশব্দ একটুকরো হাসি ফুটে উঠছিল হেমাম্বিকার মুখে। মেহেরের দিকে তাকিয়ে একবার মাথা নাড়লেন তিনি। তারপর দেবুর দিকে ঘুরে বললেন, ‘এ বিষয়ে তুমি আর কিছু যোগ করবে কি?’

দেবু মাথা নাড়ল, ‘একটাই কথা। সেটা হল, আমার মডেলটা এখনো একেবারেই অসম্পূর্ণ। এখনো ও থেকে যে উত্তরগুলো আসছে তাতে ভুলের পরিমাণ শতকরা…’

‘আমি তোমার লেখাপত্রগুলো পড়েছি। কাজেই ফিগারগুলো আমায় নতুন করে জানাবার কিছু নেই দেবু,’ বলে মেহেরের দিকে একবার ঘুরলেন হেমাম্বিকা, ‘দেবুর পেপারটা তুমি গাইড করেছ। ভুলটা কেন থেকে যাচ্ছে বলে তোমার মনে হয়?’

মেহের একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘এর একটা বড় কারণ হল, দেবুর সোশিওলজিতে কোনো পুঁথিগত শিক্ষা নেই। ফলে বেশ কিছু ফ্যাক্টরকে ও ওর শিক্ষার মডেলে আনেনি। যেমন…’ বলে বিবির পেপারটা বের করে এনে তাতে দাগ দিয়ে রাখা একটা জায়গা খুলে ধরল মেহের।

‘বিবির ডক্টোরাল থিসিস থেকে একটা উদাহরণ দিচ্ছি। আবহাওয়া নিয়ে যে গ্রাম্য বিশ্বাসগুলো আছে, কৃষিব্যবস্থায় তার প্রভাব থাইল্যান্ড আর ভিয়েতনাম দু’জায়গার উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছে বিবি। বাংলার সংস্কৃতিতেও তেমন অনেক বিশ্বাস আছে। ধরুন খনার বচন। চাষী কোনো ফসল বুনবে, কত পরিমাণে বুনবে তাকে সামান্য হলেও প্রভাবিত করে এই বচনগুলো। আজকের দিনেও। আরো আছে। আমি অন্তত সাতটা এমন ফ্যাক্টর এই মুহূর্তেই পয়েন্ট আউট করতে পারি। এইগুলোকে মডেলে না আনার জন্যই…’

‘দেবু কি মেহেরের সঙ্গে এ-বিষয়ে একমত?’

‘হ্যাঁ।’ ঈষৎ সঙ্কুচিতভাবে মাথা নাড়ল দেবু, ‘আসলে সংস্কার, কাস্ট বেরিয়ার, এধরনের বিষয়গুলোকে ঠিক কীভাবে ফ্যাক্টর ইন করব সেটা এখনো ধরতে পারছি না হেমাম্বিকা। আমি অঙ্কের লোক। সোশিওলজি আমার স্ট্রং পয়েন্ট নয়।’

‘কোয়াইট ন্যাচরাল।’ হেমাম্বিকা মাথা নাড়লেন, ‘তার মানে মডেলটাকে ঠিক জায়গায় আনতে গেলে তোমার ফিল্ডওয়ার্ক আর বিবির অ্যাকাডেমিক দক্ষতা এই দুটোকে একটা জায়গায় আনা প্রয়োজন।’ উঠে দাঁড়ালেন তিনি, ‘বলা বাহুল্য দেবুর এই গবেষণাটায় আইসোরেফ টাকা লগ্নী করতে ইচ্ছুক। আমি এ-নিয়ে এখানে আসবার আগেই আমাদের প্রধান দফতরে আলোচনা করেছি। তাঁরাও বিশ্বাস করেন, যে ট্র্যাডিশনাল গ্রামোন্নয়নের মডেল নিয়ে আমরা কাজ করছি, তাকে বদলাবার সময় আসছে। এই অসামান্য এক্সপেরিমেন্টটা সফল হলে তা থেকে যে মডেলটা পাবার আশা তাঁরা করছেন তাতে যে-কোনো গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নমুখী শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা কমপিউটার নিয়ন্ত্রিত প্রোগ্রাম দিয়ে গাইড করা সম্ভব হবে।

‘আমার সাজেশানটা সংক্ষেপে এই,’ একমুহূর্ত থেমে পাশে বসা মেহেরের দিকে একবার চোখ ফেললেন হেমাম্বিকা। তারপর ফের পেশাদারি গলায় বললেন, ‘কাজটাকে দুটো ভাগে ভাগ করে দেওয়া হবে। হাতে কলমে ফিল্ডওয়ার্ক। আর তার ডেটা নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণা। দ্বিতীয় কাজটা বলা বাহুল্য, এখানে সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যাঙ্গালোর আইসোরেফ-এ তোমাদের দুজনকে দুটো চেয়ার আমি অফার করতে চাই। সামান্য কিছু টিচিং অ্যাসাইনমেন্ট থাকবে, কিন্তু মূল কাজটা হবে এই এক্সপেরিমেন্টের গাণিতিক মডেলিং। আর প্রথম কাজটা, অর্থাৎ ফিল্ডওয়ার্ক অংশটায় কিছু বড় বদল সাজেস্ট করছে আইসোরেফ।

হঠাৎ দেবু চোখ তুলে চাইল হেমাম্বিকার দিকে। মেহেরও খানিকটা অবাক হয়ে সেদিকেই দেখছিল।

‘যেমন?’

‘বলছি।’

একটুক্ষণ থেমে ল্যাপটপের পর্দায় চোখ বুলিয়ে নিলেন হেমাম্বিকা। তারপর বললেন, ‘বিবি সংক্ষেপে এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটাকে দেখিয়ে দিয়েছে। তা হল, দেবুর এই কাজটা তার সংস্থার জন্য কোনো আর্থিক পুঁজি তৈরি করে না। যা করে তা হল স্থানীয় মানুষের নিজস্ব আয় বাড়াবার শক্তিকে বাড়িয়ে তোলা। বাজারে বিক্রি করবার মতো কোনো প্রোডাক্ট এখানে তৈরি হয় না। এক কথায়, ব্যাবসার ভাষায় বললে, এখানে বিনিয়োগ থেকে প্রজেক্টের ভাঁড়ারে কোনো রিটার্ন আসে না।’

‘কিন্তু, এখানে সেটার প্রয়োজন কোথায়?’ দেবু হঠাৎ বাধা দিল তাঁর কথায়, ‘আমার উদ্দেশ্যটাই তো ওদের দিয়ে ওদের গ্রামকে সমৃদ্ধ করে তোলা। প্রজেক্ট তো শুধু একটা অনুঘটকের…’

‘ইমপ্র্যাকটিক্যাল,’ সামান্য উত্তপ্ত গলায় তাকে থামিয়ে দিলেন হেমাম্বিকা, ‘তোমার সঙ্গে যারা এখানে কাজ করে তারা কোনো স্যালারি পায় না। আমি যতটুকু দেখেছি তাতে তোমার স্কুলের চাকরির মাইনের একটা অংশ আর এখানকার কিছু মানুষজনের যা সামান্য দান মেলে তাই দিয়ে প্রজেক্টটা চলছে। তুমি বা আইসোরেফ যে-ই একে আর্থিক সাহায্য দিক, সেটা বন্ধ হলেই প্রজেক্ট মুখ থুবড়ে পড়বে। এটা কোনো সংস্থার জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়।’

যুক্তিটা অকাট্য। খানিক বাদে দেবু মাথা নেড়ে বলল, ‘এখানে সেটা সম্ভব নয় হেমাম্বিকা। আমি গোড়ার দিকে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ফল হয়নি। তার একটা বড় কারণ, এখানে জমি ছাড়া আর কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। ফরেস্ট কভার শূন্য। কোনো মিনারেল রিজার্ভ নেই। এমনকী এখানে যতটা জমি আছে, সবটা চষবার মতো পুঁজিও এদের নেই। এদের নিজস্ব কোনো হস্তশিল্প নেই। এদের কৃষিতে উদ্বৃত্ত নেই। বাইরে থেকে উপকরণ এনে কোনো লাভজনক কুটিরশিল্প গড়বারও পথ নেই। কারণ এখান থেকে নিকটতম বাজার মালদা টাউন গাড়িতে আট ঘণ্টার বেশি দূর। আমি তাই এদের বেঁচে থাকাটাকেই একটু উন্নত…’

‘একদম সঠিক কথা বলেছ তুমি। কিন্তু এর ফলটা কী দাঁড়িয়েছে সেটা খেয়াল করো। যে মডেলটা তুমি এখানে তৈরি করছ তাতেও রেভেন্যু আয় করবার কোনো অপশনও থাকছে না। ফলে মডেলটা যেখানেই ব্যবহার করা যাক, কোথাও তা ডোনেশান ছাড়া নিজের পায়ে দাঁড়াবে না। অ্যাজ আ রেজাল্ট…’

‘মডেলটা খুব বেশি জায়গায় প্রয়োগ করা যাবে না।’ হঠাৎ তার পাশ থেকে বাক্যটাকে সম্পূর্ণ করে দিল বিবি।

‘এনি সলিউশান?’

একটুক্ষণ চুপ করে থাকল বিবি। তারপর মাথা নীচু রেখেই বলল, ‘রেভেন্যু আয় করবার মডিউল জুড়ে একটু রিস্ট্রাকচার করতে হবে মডেলটাকে, কিন্তু দেবুর অভিজ্ঞতা যা বলছে তাতে এখানে সেটা একেবারেই সম্ভব নয়। এইটাই মূল ফ্যালাসি।’

‘রাইট এগেইন। আর তাই, আমি প্রস্তাব দেব, ফিল্ড প্রজেক্টটাকে এখান থেকে সরিয়ে দেশের অন্য কোথাও রিলোকেট করা হোক। এমন কোনো জায়গা, যেখানে তোমার প্রশিক্ষণগুলোর পাশাপাশি একটা লাভজনক উদ্যোগও গড়ে তোলা যায় প্রজেক্টে। তোমাদের সুপারভিশনের সুবিধের জন্য আমি বলব, ব্যাঙ্গালোরের কাছাকাছি কোনো ফরেস্ট ভিলেজ-এ তা শুরু করাটা উচিত হবে। সেক্ষেত্রে আমি এই গ্রামটার কথা…।

হেমাম্বিকার মাউসের ইশারায় পর্দায় ভেসে থাকা ভারতবর্ষের ম্যাপটা মুহূর্তে বড় হয়ে উঠে তার দক্ষিণের একটা এলাকাকে সামনে নিয়ে এল। সেখানে মাউস পয়েন্টারের চিহ্নিত জায়গাটার পাশে ভেসে উঠছিল কিছু লেখাঃ গ্রাম চিলান্দাভাদি। পাশে পাশে তার জনসংখ্যা, শিক্ষার হার, প্রাকৃতিক সম্পদ এই সবকিছুরই সংখ্যাপাত করছিল হেমাম্বিকার যন্ত্র।

‘সংক্ষেপে, এই আমার প্রোপোজাল।’ বলে ল্যাপটপটা বন্ধ করছিলেন হেমাম্বিকা। সেই করতে-করতেই হঠাৎ দেবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জায়গাটা ব্যাঙ্গালোর থেকে আড়াই ঘণ্টার ড্রাইভ। অসামান্য উইকএন্ড স্পট। প্রজেক্ট সুপারভিশানগুলো উইকএন্ড পিকনিক হয়ে উঠবে দেখো তোমাদের। ভালো লাগবে। আর, বিশ্বাস করো, অ্যাসাইনমেন্টটা এনজয় করলে কাজটা সব সময় বেটার হয়। আমার নিজের এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলছি।’

.

আজ অষ্টমী। গৌরীহরে দুর্গোৎসব হয় না। শুধু অষ্টমীর দিন গৌরীমন্দিরে দরিদ্র জনপদের দরিদ্র দেবীর সামান্য খিচুড়িভোগের বন্দোবস্ত করা হয়। বহুজনের মুখে তুলে দেবার জন্য তাতে চালডালের চাইতে জলের ভাগই বেশি। দেবুদের আলোচনা শেষ হবার পর দেখা গিয়েছিল সুরেন বিশ্বাস বড়-বড় দুটো পাত্রে সেই ভোগের খানিক নিয়ে এসে বাইরে অপেক্ষা করছেন।

হাজির ছিলেন আশ্রমের সদস্য প্রায় সমস্ত নারীপুরুষও। সসম্ভ্রমে অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন তাঁদের প্রিয় দেবুমাস্টারের সঙ্গে অন্য দুনিয়া থেকে আসা দেবীপ্রতিমা হেন রূপবতী, শক্তিশালী মহিলাটির বৈঠকের ফলাফলের। ছোটরা কেউ নেই। তারা গিয়েছে গৌরীমায়ের অষ্টমীর ভোগ খেতে। বড়রাও যাবেন, তবে অতিথিদের বিদায় নেবার পরে।

আশ্রমের অন্য একটা ঘরে খাবার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। মেঝে মুছে তার ওপর পদ্মপাতার থালা বিছিয়ে সামান্য আয়োজনের আহার। তবে খিদের মুখে অতিথিদের কাছে তা বড় সুস্বাদ লাগছিল। শুধু ব্যতিক্রম দেবু। দেবীর এই অন্নভোগ মুখে তোলবার কোনো ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। বারংবার বাইরে অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলির দিকে ফিরে ফিরে তাকায় সে কেবল।

খানিক পরে অন্যদের রেখে সে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বাইরে বের হয়ে আসতে সুরেন বিশ্বাস কৌতূহলী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কথাবার্তা তবে হয়ে গেল সব মাস্টার?’

সুরেন মাথা নাড়ল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ বিশ্বেসমশাই। তবে এখন নয়। এঁদের ফেরবার তাড়া আছে। আমি বরং কালপরশু ঘুরে এসে…’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। সে তো বটেই। তা আপনারা কি…’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। এখনই রওনা হয়ে যাব। নইলে সন্ধের আগে ঈশ্বরপুর ধরতে পারব না। হেমাম্বিকা আবার কাল ভোরে কলকাতা ফিরে এরোপ্লেন ধরবেন কি না!’

.

১২

.

‘কখন ফিরলা দেবুভাই?’

পেছন থেকে কালীর ডাকে চমক ভাঙল দেবুর। ঈশ্বরপুর পঞ্চবটিতলা আজ মহাষ্টমীর রাতে জমজমাট। মণ্ডপে উজ্জ্বল আলোয় ঝকমকে দেবীমূর্তির সামনে মায়ের সন্ধ্যারতি চলছে। দাঁতে ধুনুচি কামড়ে ধরা কিশোর দুজনের উদ্দাম নাচের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে তিনজন ঢাকি। পা দুলে উঠেছে দর্শনার্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনেরও।

সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে দেবু বলল, ‘এই খানিক আগে।’

‘বাড়ি যাও নাই?’

‘উঁহু। আসবার পথে এইখানে নেমে গেছি। সুবুদ্ধিদা ওদের বাড়িতে ছেড়ে দেবে একেবারে। খানিক বাদে একটু রেস্ট নিয়ে তারপর হয়তো এখানে আসবে সব।’

‘হ্যাঁ। দেখলাম। সাধুদার কাছে গেছলাম সন্ধেবেলা। আজ তো ওনার বাড়ি খাওয়া-দাওয়া সব। সীতা বউঠাকরুন রান্না বসায়েছেন। ঘণ্টাভর আগে দেখি সুবুদ্ধির গাড়ি করে সব নামলেন এসে। দলে তুমি নাই দেখে ভাবলাম কী জানি বাবা গৌরীহরেই রয়ে গেলা নাকি। তা খানিক বাদে মাঠান খুশি খুশি মুখে এসে ঢুকতে তেনার কাছেই শুনলাম তুমি এই ঠেঁয়ে নেবে গেছ। তা হ্যাঁ গো দেবুভাই, মাঠান সীতা বউঠানকে বলতেছিল তাই শুনলাম, এবার নাকি তুমি ঈশ্বরপুরের পাট উঠায়ে সেই ব্যাঙ্গালোর না কোনখানে…’

হঠাৎ একটু চমকে উঠে তার দিকে ফিরে তাকাল দেবু। এতক্ষণ ধরে ওই দেবীমূর্তি, ঢাকের শব্দ, ধুনোর ধোঁয়া আর দুলন্ত মানুষজনের আনন্দের ঢেউয়ের মধ্যে, বুকের ভেতর চলতে থাকা উথালপাথালটাকে খানিক ভুলে ছিল সে। এইবার কালীর কথায় সেই ঢেউগুলো ফিরে এসেছে আবার।

‘কী হইল দেবুভাই? মাঠান বলতেছিল নাকি জোড়ে একেবারে…এমন সুখের কথা আর তুমি মুখখান এমন…’

দেবু উত্তর দিল না কোনো।

কিছু একটা আন্দাজ করছিল কালী। খানিক বাদে হঠাৎ সে তার পিঠে হাত দিয়ে বলল, ‘হুল্লোড় ভালো লাগে না আর। চলো দেখি, মহানন্দার ধারে ভাসানঘাটে বসে বিড়ি খেয়ে আসি দুটা। যাবা নাকি?’ বলেই তার জবাবের অপেক্ষা না রেখে কালী মণ্ডপ ছেড়ে এগিয়ে গেছে।

পুজোমণ্ডপের উজ্জ্বল আলো, সশব্দ আনন্দের ঢেউ দেবুরও ভালো লাগছিল না এই মুহূর্তে। মণ্ডপ থেকে বের হয়ে এসে একবার বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছিল সে। কিন্তু তারপর হঠাৎ থেমে গিয়ে আস্তে-আস্তে কালীর পেছন পেছন এগিয়ে গেল। এই মুহূর্তে বাড়িতে উপস্থিত মানুষগুলোর মুখোমুখি হতে চায় না সে। তাদের আগ্রাসী ভালোবাসা, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বৃত্তের বাইরে, কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে থাকা বড় প্রয়োজন তার।

.

নদী থেকে রাত্রের ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছিল। চাদরটা মাথায় মুড়ি দিয়ে সিঁড়ির ধাপে বসল কালী।

‘আসো দেবুভাই, বসো।’ বলে একটা বিড়ি ধরাল সে।

নিঃশব্দে নেমে এসে তার পাশে বসে কালীর বাড়িয়ে ধরা বিড়িটা নিয়ে ঠোঁটে লাগাল দেবু। ফস করে জ্বলে ওঠা দেশলাইয়ের হলদেটে আলোয় দুটো মুখ কাছাকাছি হয়ে এল এক মুহূর্তের জন্য।

বিড়িতে লম্বা একটা টান দিয়ে খানিক চুপ করে বসে রইল কালী। তারপর আস্তে-আস্তে বলল, ‘মাঠানের কাছে শুনলাম সব কথা। কিন্তু তোমার ব্যাপারখানা কী দেবুভাই? বাড়ি যাও নাই। একলা একলা মুখখান কালো করে মণ্ডপে এসে বসে আছ! মন খারাপ নাকি? কেন?’

কোনো উত্তর দিল না দেবু। কী উত্তর দেবে সে? তার সমস্ত স্বপ্ন… তার গবেষণার স্বপ্ন, জীবনটাকে একটা সুন্দর, সিধে পথে চালিয়ে নেবার স্বপ্ন, সেই সমস্ত কিছুকেই তো সফল করবার পথ গড়ে দিয়েছে আজ তার প্রিয়জনরা মিলে। আসবার পথে সুবুদ্ধির মারুতি ভ্যানে ড্রাইভারের পাশে বসেছিল সে। রিয়ার ভিউ মিররে বউদি আর মেহেরদির একে অন্যের সঙ্গে হাসি-হাসি বাক্যবিনিময়ের মুহূর্তগুলো চোখ এড়ায়নি তার। বড় খুশি তারা আজ। সবাই খুশি।

তবু, তার বুকটায় বারবার কেন মোচড় দিয়ে উঠছে এভাবে? এই ঈশ্বরপুর, গৌরীহরের আশ্রমের উঠোনে আজ বিকেলে জমায়েত হওয়া ওই আশায় ভরা মুখগুলো কেন তাকে বারবার এভাবে আঁকড়ে ধরে টেনে রাখতে চায়? তার সমস্ত যুক্তি, তার মস্তিষ্ক বারংবার তাকে শতমুখে বলে চলেছে, হেমাম্বিকা, মেহের, বিবি… একেবারে সঠিক বিশ্লেষণ করেছে ওরা। তার কাজটার দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে সঠিক পথটা দেখিয়ে দিয়েছে তাকে। কিন্তু তবু, এই ঈশ্বরপুর, গৌরীহর…এখানকার আকাশ বাতাস মানুষজন কেন এইভাবে তার বুকটায় টান দিয়ে ধরে রাখতে চায়? কেন তারা…

‘বুঝি দেবুভাই,’ কালী অনেকটা আপনমনেই যেন বলছিল, ‘তোমার দুঃখুটা আমি বুঝি। ছ’সাত বছর আগে যখন এখানে এলা, তখন তুমি কলকাতার লোক। ভিনদেশি। আজ তুমি আমাদের ঘরের ছেলে যে। নিজের ঘর ছেড়ে যেতে বুকে টান তো পড়বেই। কিন্তু, নিজের দিকে না দেখ, তোমার মা, বউদিদি, বিদেশ থেকে এতদূর যে মেয়েটা সব ফেলে ছুটে এল, তোমার ওই দুই দিদিমণি, তাদের আশাভরসার দিকটা তো দেখবা!

‘তাপ্পর ধরো সাধুদা। বলতে বাধা নাই, কত্তাগিন্নি মিলে তোমায় হারানো ছেলের মতোই তো দ্যাখে! জানো সীতাবউদি মাঠানরে কী বলতেছিল আজ? বলে, ছেলে দূরদেশে কি কারো যায় না দিদি? নাহয় সেই ভেবে নেন। ছেলে তো আমাদের থাকলই। সে যদি সুখী হয় তবে আমি-আপনি তাতে চোখের জল ফেলবার কে?

‘না দেবুভাই, আজ পুজাগণ্ডার দিনে মা যখন সুদিন তোমায় দিলই তখন আর ঈশ্বরপুর, গৌরীহরের কথা ভেবে মন কালো নাই বা করলা? চলো। মুখে হাসি আনো। হাসিমুখে মায়েরে গিয়ে প্রণাম করো দেখি। আজ তেনার দয়ায়…’

খানিক চুপ করে বসে রইল দেবু। তারপর অনেকটা নিজের মনেই বলল, ‘গৌরীহরে ওরা বড় আশা করে আছে কালীদা…যখন শুনল, বিদেশ থেকে লোকজন আসছে আমার কাজ দেখতে, তুমি জান না…’

‘তুমি বড় বোকা দেবুভাই,’ হঠাৎ একটু হাসল কালী, ‘যখন আশ্রম চালু করলা গৌরীহরে, সাধুদার সঙ্গে কত ভাবের কথা বলতা। সাধুদা আবার আমাদের এসে সেসব শোনাত আর হাসত মিটিমিটি। বলত, পাগল ছেলে। স্বপোন দেখে দেখো। এ জাগার দুঃখু ঘোচানো সে বাবা শিবের অসাধ্যি হে। বুঝবে…কদ্দিন বাদে নিজেই বুঝবে। তখন আপনি ঘরের ছেলে ঘর ফিরবে দেখে নিও। ও আমার সগগোছেঁড়া দেবদূত। শাপমোচন হলেই বনবাস শেষ। সাধুদা ভুল বলে নাই। আমরাও তো কতদিন সেই একই কথা…’

দু-হাতে মুখটা ঢেকে ফেলল দেবু হঠাৎ। অন্ধকারের গভীর আড়ালও এই মুহূর্তে তার ভেতর থেকে উঠে আসা লজ্জাটাকে ঢাকতে পারছিল না। ওরা সবাই নিশ্চিত ছিল! অনেকদিন আগে যখন সে মাঠে নেমে কৃষকের লাঙলের মুঠ ধরতে চেয়েছিল, সেদিন সস্নেহ প্রশ্রয়ে, সব বুঝেও তারা তাকে সে সুযোগ দিয়েছিল। দেবু পারেনি। এবারেও ফের একবার…।

‘গা তোলো দেবুভাই। চলো চলো…’

কালী উঠে দাঁড়িয়ে টান দিয়েছে তার হাত ধরে। আস্তে-আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিল দেবু। তারপর অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘তুমি এগোও কালীদা, আমি আর একটুক্ষণ এইখেনে বসে থেকে তারপর আসছি। একটু একলা থাকতে ইচ্ছে করছে আমার…’

রাত বহে যায়। ধীরে ধীরে নদীর জলের বুকে কুয়াশার চাদর নেমে আসে। দূরে মণ্ডপ থেকে ঢাকের শব্দও থেমে এসেছে এখন। একটা আশ্চর্য নিস্তব্ধতা তাকে ঘিরে ধীরে ধীরে জাল বুনে তুলছিল যেন। সান্দ্র তরলের মতো কুয়াশা ও অন্ধকার মেশা সেই শব্দহীনতা যুবকটির শরীরকে একটা চিন্তাহীন, স্মৃতিহীন আবরণে মুড়ে দিচ্ছিল।

তারপর একসময় সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা গলার মৃদু আওয়াজ ভেসে এল হঠাৎ। তাকে আলাদা করে চিনে নেবার জন্য কোনো চেষ্টার প্রয়োজন ছিল না তার। তার চেতনা জানত, ডাকটা আসবে। মাথা না ঘুরিয়েই দেবু বলল, ‘এসো বিবি। এখানে বোসো। আমি এখানে আছি কে বলল? কালীদা?’

‘হ্যাঁ। সবাই মিলে মণ্ডপে এসে দেখি তুমি নেই। কেউ দেখেনি। কোথায় গেলে তাই ভাবছি। তখন কালীদা এসে কী বলে জানো?’ একটু হাসি ফুটেছে বিবির গলায়, ‘বলে, সাধুবাবার প্রাণে দুঃখু হয়েছে। একলাটি ভাসানঘাটে বসে আছে দেখ গা। গিয়ে ভুলায়ে-ভালায়ে ঘরে আনো দেখি!’ নাও চলো…’

দেবু উঠল না। বসে থেকেই হাতটা বাড়িয়ে দিল বিবির দিকে, ‘এইখানে বোসো দেখি একটুখানি এসে! মনে আছে, সাত বছর আগে এইখানে, দশমীর দিন…’

ধীরে ধীরে তার শরীরটি ঘেঁষে বসে পড়ল বিবি। একটি হাতে বেড় দিয়ে ধরেছে সে তার প্রিয় মানুষটিকে। কয়েক মুহূর্ত সেইভাবে বসে থাকবার পর সে বলল, ‘চলো। এইখানে নয়। আজ দশমী নয় দেবুদা। আজ অষ্টমী। আজ মণ্ডপে, দেবীর সামনে… তোমার মনে নেই?’

হাতে হাত রেখে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল পুজোর মণ্ডপের দিকে। রাত গভীর হয়েছে। মণ্ডপ থেকে ঘরে ফিরে গেছে উৎসবক্লান্ত মানুষ। দেবীমূর্তির মুখ লক্ষ্য করে জ্বলে থাকা একটা ছোট ল্যাম্প আবছায়া, বর্ণিল আলো ছড়াচ্ছিল বেদির বুকে। মূর্তির একপাশে একলা জ্বলে ছিল ঘিয়ের প্রদীপটি। যতক্ষণ বেদিতে দেবী থাকবেন, তার জ্বলবার বিরাম থাকবে না কোনো।

‘এইখানে এসো দেবুদা। ওঁর সামনে। আমার পাশে।’ বলতে-বলতেই আবারো তার কাছে ঘন হয়ে এল সুগন্ধী যুবতী, ‘আর কোনোদিন আমাকে চলে যেতে বলবে না তুমি। কোনোদিন আর…’

ম্লান একটা হাসি ছড়িয়ে গেল দেবুর মুখে, ‘সত্যি বলছ বিবি? নিজের মনটাকে ঠিকমতো জেনে বলছ?’

‘কোথায় যাব দেবুদা? কেনই বা যাব? সেবার যখন ঈশ্বরপুর ছেড়ে গেলাম, ভেবেছিলাম, সবকিছু শেষ করে দিয়ে গিয়েছি। বড় অভিমান হয়েছিল তোমার ওপরে দেবুদা। বারবার কেবল মনে হত, আমি চাইলাম বলে তুমি যেতে দিলে? একবারও জোর করলে না আমায়? একবারও বললে না…’

তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল একবার দেবু। তারপর বলল, ‘আমার জীবনে তুমি তো স্বয়মাগতা হয়ে এসেছিলে বিবি। জোর করে আমি তোমায় কখনো ধরে রাখতে চাইনি। ভালোবাসাটাকে জেলখানা বানাবার কোনো…’

‘খ্যাপা কোথাকার! আমি যে ওই জেলখানাটাই চাই সেটুকুও বুঝলে না তুমি? যখন চলে গেলাম সেবার, ভেবেছিলাম, জীবনটাকে নতুন করে ডিফাইন করে নেব। করেও নিয়েছিলাম। অনেক পেয়েছি আমি। সাফল্য, সম্মান…কিন্তু সেই যে একটা ফাঁকা জায়গা তুমি বানিয়ে দিয়েছিলে বুকের ভেতর, কোনোকিছুতেই সেটা ভরাট হল না। এবার আমি তোমার সঙ্গে থাকতে চাই দেবুদা, একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ দিয়ে আমাদের কাজটা করতে চাই দুজনে মিলে। আর আমি কখনো…’

হঠাৎ থমকে গিয়ে যুবতীটির দিকে ঘুরে দেখল যুবকটি। তার অবাধ্য এলোমেলো চুলগুলিকে ঘিরে মণ্ডপের ম্লান আলো যেন একটা আলোকিত ছটা তৈরি করছিল। তীক্ষ্ন, গভীর চোখদুটি তার দিকে তুলে ধরে সে তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি সবদিক ভেবে এ কথা বলছ বিবি? আমার শিক্ষা, আমার কাজ, আমার ভবিষ্যৎ সেই সবকিছুর বাইরে শুধু আমাকে তুমি…’

‘হ্যাঁ গো।’ বলতে-বলতে সামনে দাঁড়ানো দেবীমূর্তির দিকে ইশারায় দেখাল সে, ‘এই অষ্টমীর রাতে একবার শোভাবাজারের দুর্গার সামনে, দ্বিতীয়বার এই ঈশ্বরপুরে, দু’দুবার তো আমি তোমায় সে কথা বলেছি। এইবার আর এক অষ্টমীতে তৃতীয়বার বলছি, শুধু তোমাকে ভালোবাসি আমি দেবুদা। তোমার মেধা, তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার ইডিওসিনক্র্যাসি, এই সবকিছুকে বাদ দিয়ে কেবল তোমাকে…আর আমি কখনো…’

তখন দুটো শ্রমকঠোর কর্কশ হাত যুবতীটির দুই কাঁধে চেপে বসে এসে। নির্জন মণ্ডপে, মৃদু আলোয়, দেবীমূর্তিকে সাক্ষী রেখে ঘন হয়ে আসা ঠোঁটদুটি যুবতীটির ঠোঁটে আশ্রয় নেবার আগে ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘আর তবে আমার কোনো দ্বিধা নেই বিবি…’

.

১৩

.

রাতে ঠান্ডা পড়ে গিয়েছিল হঠাৎ করে। মা বিবিকে নিয়ে আজ সীতামাসির বাড়ি গিয়ে শুয়েছে। সীতামাসি বারবার করে বলেছিলেন, একটা দিনের জন্য যেন বিবি তাঁর ছাদের নীচে কাটায়। শেষে মা তাকে নিয়ে ওবাড়ি গিয়েছে। মায়ের ঘরে বউদি মেহেরদি আর হেমাম্বিকার গলা অনেকক্ষণ পাওয়া গিয়েছে। গভীর রাতে বারান্দা ছেড়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল দেবু।

বাইরে নির্জন রাত সকালের দিকে এগিয়ে চলে। কমপিউটারের খোলা পর্দার সামনে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে থাকা যুবকটির অস্থির হাত সেখানে বারংবার অক্ষরপাত করে, তারপর বারংবার তা মুছে দেয় সে।

অবশেষে, চিঠিটি লেখা যখন শেষ হল তার, ততক্ষণে বাইরে আলো ফুটে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে দেখে একটু দ্বিধা করল সে। তারপর তার হাতে ধরা মাউসটা পর্দায় রাখা সেন্ড বোতামটিতে চাপ দিল গিয়ে।

.

‘তাহলে এই মুহূর্তে আইসোরেফের ফর্ম্যাটে অ্যাপ্লাই করবার দরকার নেই তাই তো? আমি তো প্রজেক্ট সাবমিশান প্রোপোজাল আগেভাগে ডাউনলোড করে প্রিন্টআউট নিয়ে ছেলেটাকে পাঠিয়ে রেখেছি। কী জানি বাবা, যদি তুমি অন স্পট চেয়ে বস!’ নবমীর সকালে গাড়িতে উঠে হেমাম্বিকার পাশে বসতে-বসতে মেহের হাসিমুখে বলছিল।

‘আরে না না,’ হেমাম্বিকা বলছিলেন, ‘এবারে ব্যাপারটা যা শেপ নিল তাতে আইসোরেফের তরফ থেকেই সরাসরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দেওয়া হবে দুজনকে। ফর দ্য চেয়ার অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ফর দ্য চিলান্দাভাদি প্রজেক্ট। ওদের তরফে গ্র্যান্টের জন্য অ্যাপ্লাই করবার কোনো প্রশ্নই থাকছে না আর।’

সেই ভোরবেলাতেই একবার গৌরীহর যাবার জন্য তৈরি হয়েছিল দেবু। মেহেরদের বিদায় দিতে এসে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে শুনে গিয়েছিল সে। একেবারে কলকাতা পৌঁছেই না-হয় মেহেরদি ওর মেইলটার কথা জানতে পারবে।

.

রমা ঈশ্বরপুরেই রয়ে গেছে আজ। নবমীর দিন বাড়ির বউ বাড়ি ছেড়ে যাবে তা সুনন্দা একদমই চাননি। বিবিকেও পুজোটা এইখানে কাটিয়ে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু বিবি মানা করল। কলকাতা ফিরে গিয়ে তার একরাশ কাজ এখন। মেহেরের বাড়িতেই উঠবে উপস্থিত। সেখান থেকে মাসখানেকের জন্য আমেরিকা ফিরে গিয়ে ওদিককার পাট চুকিয়ে সোজা ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে আইসোরেফ-এ রিপোর্ট করবে দেবুকে নিয়ে। তারপর একসঙ্গে কলকাতা ফিরে আসবে ক’দিনের জন্য।

উপস্থিত দেবুও ঈশ্বরপুরে নেই। মেহেররা বের হয়ে যাবার পর সে-ও একটা ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে গেছে। নাকি গৌরীহর তাকে আজ যেতেই হবে একবার। কাল দুপুর নাগাদ ফিরে আসবে। সুনন্দা একটু বিরক্ত হয়েছেন কিন্তু কিছু বলেননি শেষমেশ। ঘুরে আসুক ইচ্ছে হলে। আর তো ক’টা দিন।

সন্ধেবেলা সাধু আর সীতামাসি এসেছিল এবাড়িতে। রাতে খেয়ে যাবে একেবারে। রমা রান্নাঘরে ঢুকেছে সবে, তখন কলটা এল। তার ফোনে। চা বসিয়েছিল রমা। সসপ্যানের হ্যান্ডেলটা আঁচল দিয়ে ধরে রেখেই অন্য হাতে ফোনটা তুলে নিল সে।

‘হ্যালো মেহের! পৌঁছে গেছ তোমরা? এখন বাড়িতে তো? হেমাম্বিকার ফ্লাইট তো রাতে…’

হঠাৎ কথাটা অর্ধপথেই থামিয়ে দিল রমা। তার হাতটা ফোনটাকে সজোরে চেপে ধরেছে কানে। অন্যহাতে ধরা সসপ্যানটার জল ফুটে ফুটে শেষ হয়ে যাচ্ছিল তার। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে দৃশ্যটা চোখে পড়তে তাড়াতাড়ি এসে স্টোভটার চাবি কমিয়ে দিলেন সুনন্দা। ঝাঁকুনি লেগে জল উপচে পড়ছিল এদিক ওদিক। ‘ছাড়ো ছাড়ো, কী সর্বনাশ’, বলতে-বলতে রমার হাত থেকে সসপ্যানের ডাঁটিটা নিজের হাতে নিয়ে সাবধানে সেটা সরিয়ে রেখে তিনি খানিক উদগ্রীব মুখে রমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে বড়বউমা। ওরা সব…’

একটু বাদে ফোনটা নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ একেবারে চুপ করে রইল রমা। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ‘পাগলের গুষ্টি মা। কী আর হবে? এত চেষ্টা, এত কিছু, তার সবকিছুতে জল ঢেলে দিল তোমার ছোটছেলে। সব শেষ করে দিল।’

সেখান থেকে বহুদূরে মেট্রোপলিসের উপকণ্ঠের বর্ধিষু উপনগরীর সাজানো বাড়িটিতে মেহের তখন তার কমপিউটারের মনিটরটা ঘুরিয়ে দিয়েছে পাশে বসা বিবির দিকে। দেবুর মেইলটা এসে পড়েছিল সেই সকালবেলাই। বাড়ি ফিরে মেইল চেক করতে বসে প্রথমেই এই মেইলটা চোখে পড়ে তার।

খানিক আগে সেটার সারমর্ম অনুবাদ করে হেমাম্বিকাকে শুনিয়েছে মেহের। সব শুনে মুখটা কঠিন উঠেছিল হেমাম্বিকার। সফল, সুন্দরী ও অপ্রতিরোধ্য হিসেবে একটা গভীর অহঙ্কার আছে তাঁর। তাঁকে কেউ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারে এ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে সম্ভবত এই প্রথম। সেখান থেকে উঠে ভেতরের ঘরের দিকে চলে গিয়েছেন তিনি। এবার তৈরি হতে হবে তাঁকে। তাঁর ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে।

মনিটারটার বুকে ফুটে থাকা, ইংরিজি হরফে লেখা বাংলা চিঠিটার দিকে স্থির হয়েছিল বিবির দৃষ্টি। তার পাশে বসে মেহের অনেকটা নিজের মনেই বিড়বিড় করছিলেন, ‘কেন তুই দেবুকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলি সেদিন সেই কথাটা আজ খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি। আদর্শবাদ ব্যাপারটাকে ছেলেটা এমন একটা এক্সট্রিমে টেনে নিয়ে গেছে যে বাস্তবের সঙ্গে তার যোগসূত্রটা ছিঁড়ে গেছে। তবে সেজন্য দোষ আমি ওকে দিই না। ওর চরিত্রের বেসিক ফাইবারটাই আলাদা। কম্প্রমাইজ ব্যাপারটার অর্থ সম্ভবত ও বোঝে না। যা ঠিক করবে সেটা করবেই। তার জন্য দুনিয়া রসাতলে গেলেও কিছু যায় আসে না। এই ধরনের পুরুষমানুষ রোমান্টিসাইজ করবার পক্ষে আদর্শ। প্রেমে পড়বার পক্ষে এমন ভালো চরিত্র আর হয় না। কিন্তু সংসারজীবনের উপযুক্ত এরা নয়, সেটা তোর উওম্যানস ইন্সটিংক্ট দিয়ে তুই ঠিকই বুঝেছিলি। আমিই বোকার মতো…

‘বড় অহংকার ছেলেটার। এত অহংকারী মানুষের যে সাজাটা হয় সেটা ও এর মধ্যেই পেতেও শুরু করেছে। সেটা হল একাকিত্ব। ছাড় তুই ওর কথা। দেশে ফিরতে চেয়েছিলি একটা সম্মানজনক কাজ নিয়ে সেটার বন্দোবস্ত হয়েছে। জয়েন করে যা তুই। কিংবা যদি মনে করিস কর্নেলে ফিরে যা।’

কানের কাছে ক্রমাগত ঝরে পড়া কথাগুলো তার ভেতরে কোনো সাড়া জাগাচ্ছিল না। বিবির চোখদুটিকে তখন টেনে নিয়েছে তার সামনে পর্দায় ভেসে থাকা শব্দগুলো…।

.

মেহেরদি,

কাল সারারাত ঘুমোইনি। ঘুম আসেনি চোখে। শেষরাতে উঠে বসে এই চিঠিটা লিখছি তোমাকে। অনেক চিন্তা করেছি আমি। অনেক ভেবেছি। কিন্তু হেমাম্বিকার অফারটা আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। তুমি তাঁকে বোলো, আমি তাঁর অফারটাকে হেয় করছি না। এখানে এসে, সব দেখেশুনে, মূল্যায়ন করে যে পরিকল্পনাটা তিনি করেছেন তা একেবারেই বাস্তব। এবং অসামান্য। ওঁকে যতটুকু দেখেছি, তাতে এটুকু বুঝেছি যে আমি থাকি বা না থাকি, চিলান্দাভাদি প্রজেক্টটা উনি করবেনই। সেখানে, প্রয়োজনবোধ করলে আমায় যদি তিনি ডাকেন কখনো, তাহলে আমি আমার সমস্ত দক্ষতা, সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করব। তবে সেটা তাঁর এমপ্লয়ি হিসেবে নয়, এবং তার জন্য কোনো মাইনে দাবি করব না আমি।

কিন্তু সে কাজটার জন্য গৌরীহর আশ্রমকে বন্ধ করে দিতে আমি পারব না। কারণ এদেশে এখনো এমন বহু জায়গাই আছে যারা আইসোরেফের মতো সংস্থার সহায়তার বদলে তাকে আর্থিক রিটার্ন দিতে অক্ষম। সেই জায়গাগুলোর মানুষজনের হাত ধরবার জন্য আমার গৌরীহর মডেলটাকে খাড়া করা দরকার। কারণ আর্থিক প্রতিদান না পেলে আইসোরেফ বা তার মতো কোনো সংস্থাই তাদের হাত যে ধরবে না তা হেমাম্বিকা সেদিন দুপুরে পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

চিঠিটা পেয়ে তোমার রিঅ্যাকশানটা কেমন হবে আমি জানি। তোমাদের রওনা করিয়ে দিয়ে সোজা গৌরীহর আশ্রমে যাব আমি। কাল থেকে বড় উদ্বেগে রয়েছেন ওঁরা। গাঁ-গঞ্জে কোনো কথা চাপা থাকে না। হয়তো কাল রাতেই ঈশ্বরপুর থেকে ওদিকে খবর চলেও গেছে যে আশ্রম উঠে যাচ্ছে গৌরীহর থেকে। যত তাড়াতাড়ি পারি ওখানে গিয়ে ওঁদের সে ভুল ভাঙিয়ে দিতে হবে।

তোমার এতদিনের চেষ্টায় জল ঢেলে দিলাম আমি মেহেরদি। খারাপ লাগছে খুব। কিন্তু বিশ্বাস করো, তুমি, মা, তোমরা যারা আমায় ভালোবাসো, এই ডিসিশানটার জন্য যদি তারা আমায় ত্যাগও করো, তবু, এখানে আমার ওপর ভরসা করে থাকা গৌরীহর, ভরগ্রাম, সুকান্তনগরের মতো দশটা গ্রামের হাজারো মানুষের আশায় জল ঢেলে দিয়ে আমি চলে যেতে পারব না।

বিবিকে বোলো, আগেও করিনি, আজকেও আমি তার স্বাধীন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করব না। সে নিজে যা ঠিক বুঝবে, সেই সিদ্ধান্তই নেবে। আমার তরফে, আমার কাছে যে-কোনো অবলিগেশান থেকে সে মুক্ত। তবে হ্যাঁ, শেষমেশ চয়েসটা যদি তার কর্নেল ইউনিভার্সিটি আর ব্যাঙ্গালোরের মধ্যে হয়, তাহলে হেমাম্বিকার অফারটাই তার নেওয়া উচিত। যতটুকু তাঁকে দেখেছি, তাতে বিবিকে তার ট্যালেন্টের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে উন্নতির চূড়ায় যদি কেউ নিয়ে যেতে পারে তবে সে তিনি।

‘হাউ ডেয়ার হি?’

হঠাৎ মনিটার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিবি।

‘এই মেয়ে, ঠান্ডা হয়ে বোস তুই আগে,’ মেহের নিজেও উঠে দাঁড়াচ্ছিল। তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল বিবি। তারপর নিজের মনেই বলল, ‘আমি কী সিদ্ধান্ত নেব সেটা দেবুদা ঠিক করে দেবে? কেন? আই অ্যাম নট আ চাইল্ড। আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত আমি নিজে নিতে পারি।’

ঘড়িতে ন’টা বাজছিল। একঝলক সেদিকে তাকিয়ে নিয়ে সে বলল, ‘একটা ট্যাক্সি নিলে গৌড়টা পেয়ে যাব না?’

‘গৌড়? বিবি তুই…’

‘হ্যাঁ মেহেরদি। আমার অবলিগেশন থেকে আমাকে মুক্তি দেবার ও কে? কীসের এত অহঙ্কার ওর? আমি কি ওর হাতের পুতুল, যে যখন ইচ্ছে হবে কাছে টানবে আবার ইচ্ছে হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে? কী ভেবেছে ও? তুমি আমাকে সুবুদ্ধির নম্বরটা দেবে একটু? কাল সকালে গাড়িটা নিয়ে গৌড় অ্যাটেন্ড করতে বলে দেব…’

তার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সূক্ষ্ম একটা হাসির দাগ ফুটেই মিলিয়ে গেল মেহেরের মুখ থেকে। হেমাম্বিকা তৈরি হয়ে ভেতরের ঘর থেকে বের হয়ে এসেছেন ততক্ষণে। তাঁর দিকে ঘুরে সে বলল, ‘আমার হাজবেন্ড যদি তোমায় এয়ারপোর্টে ড্রপ করে আসে, তুমি কিছু মনে করবে?’

‘নো ইস্যু। কিন্তু তুমি…’

মেহের হাসল, ‘এই মেয়েটাকে একটু শেয়ালদা স্টেশনে ড্রপ করে আসতাম তাহলে। একটু আর্জেন্ট।’

হেমাম্বিকা বিবির দিকে ফিরে দেখলেন একবার। কী বুঝলেন কে জানে, হঠাৎ এগিয়ে এসে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তার মানে, তুমি দেবুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওই ফিউচারলেস গৌরীহর মডেলের ওপরেই বাজি ধরছ?’

 একটুক্ষণ চুপ করে রইল বিবি। তারপর মাথা নেড়ে বলল, ‘চ্যালেঞ্জটা আমি আর দেবুদা মিলে নিচ্ছি হেমাম্বিকা। কয়েক বছর বাদে, হয়তো মত বদলাতে বাধ্য হবেন আপনি। গৌরীহর মডেল ফিউচারলেস নয়। এদেশের মাটিতে ওটাই ফিউচার।’

একজোড়া উজ্জ্বল, তরুণ চোখের তীক্ষ্ন চাউনির সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল অন্য একজোড়া অভিজ্ঞ ও প্রবীণ চোখ। খানিক বাদে একটুকরো হাসি ফুটল হেমাম্বিকার মুখে ‘দেখা যাবে। আর হ্যাঁ, কখনো যদি তোমরা মত বদলাও, তবে আমি যতদিন আছি তোমাদের মতো রিসার্চারদের জন্য আইসোরেফের দরজা সবসময় খোলা থাকবে। অ্যান্ড টেল দ্যাট প্রাউড জেন্টলম্যান অব ইয়োর্স, আমি ওর কাজের দিকে নজর রাখব। অফারটা রিফিউজ করল বটে, কিন্তু হিজ ওয়ার্ক ইজ টু ইমপর্ট্যান্ট টু বি ইগনোর্ড। অ্যান্ড ফাইনালি, তোমাদের যৌথ জীবনের জন্য একরাশ শুভেচ্ছা।’

.

বারোটা নাগাদ দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে একটা বই নিয়ে গিয়ে শুয়েছিলেন সুনন্দা। দেবু ফেরেনি এখনো। সন্ধের আগে ফিরবে বলে মনেও হয় না। খাওয়াদাওয়া করে রমাও একটু শুয়েছিল গিয়ে। ক’দিন ধরে যে ধকলটা গেল! খানিক আগে সীতা এসেছিলেন একবার। চারটের সময় ঠাকুর নামাবে মণ্ডপে। সিঁদুর খেলায় রমা যাবে নাকি সেই খোঁজ করছিলেন। রমা মানা করে দিয়েছে। মনটা ভালো নেই তার। ছেলেটা কী যে বাঁধালো একটা! এত আশা করে…মেহেরটার জন্য দুঃখ হচ্ছিল। এত খাটল মেয়েটা দেবুর জন্য।

বইটা পড়তে-পড়তে চোখ জুড়ে এসেছিল সুনন্দার। ঘুম ভাঙল রমার ডাকে। ‘বৃষ্টি আসছে মা…’

বাইরের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল অসময়ের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে আকাশটাকে। উঠোনে নেমে রমা আধাশুকনো কাপড়জামাগুলোকে নামাচ্ছিল ঝোলানো তারের গা থেকে। ভারী শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে বাইরে বেরিয়ে এলেন সুনন্দা। বৃষ্টি নেমে গেছে ততক্ষণে। কাপড়ের বোঝাটা কাঁধে নিয়ে রমা কোনোমতে বারান্দায় এসে উঠছিল।

‘মা এগুলো ধরুন একটু, ওদিকের চালে কয়েকটা মেলে দিয়ে রাখা আছে, দেখি যদি…’ বলতে-বলতেই সুনন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল সে। শব্দটা ততক্ষণে তার কানেও গিয়েছে। মেঘবৃষ্টির শব্দের থেকে আস্তে-আস্তে আলাদা হয়ে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠে বাড়ির দরজাটার কাছে এসে থেমে গিয়েছে তা।

দরজার মুখে এসে থেমে যাওয়া গাড়িটার সামনের সিট থেকে সুবুদ্ধি নেমে ভিজতে-ভিজতে ভেতরে ঢুকে এসেছে ততক্ষণে। সুনন্দার সামনে এসে সে বলে, ‘ছাতা আছে মাসিমা?’

সুনন্দা তার কথার জবাব দিলেন না। গাড়িটার দরজা খুলে নেমে আসা অন্য মানুষটা বৃষ্টিতে ভিজছে। ওখানে দাঁড়িয়েই তাকিয়ে আছে সে এদিকে।

‘আমি যাচ্ছি। তুমি বারান্দায় উঠে দাঁড়াও সুবুদ্ধি। রমা, সুবুদ্ধিকে একটা গামছা দাও। মাথাটা মুছে নিক। আর তোমার একসেট শুকনো শাড়িজামা বের করে রাখো।’

বারান্দার কোণে ঠেস দেওয়া ছাতাটা খুলে নিয়ে উঠোনে নেমে এলেন সুনন্দা। বৃষ্টি মাথায় বিবি ততক্ষণে বাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আসছে।

‘বৃষ্টির মধ্যে আপনি নেমে এলেন কেন মাসিমা? আমি তো…’

ছাতার নীচে একটা হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে সুনন্দা বললেন, ‘অতিথ কুটুম তো নও মা তুমি। এগিয়ে এসে তোমায় ঘরে নিয়ে যাব না তো কাকে নিয়ে যাব?’

‘মাসিমা…আমি…’

‘চুপ চুপ। কিচ্ছু বলতে হবে না তোকে। মেহের যখন ফোন করল, আমি তখনই জানতাম তুই চলে আসবি। শুধু এত তাড়াতাড়ি আসবি সেইটে বুঝতে পারিনি রে।’

.

সন্ধে নেমেছে খানিক্ষণ আগে। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আড়ালে চাঁদের উঁকিঝুঁকি। বৃষ্টির পরে গরম কমে গেছে একেবারে। হাটে আজ বেশি ভিড় হয়নি এবেলা। দশমীর বিকেল। একেবারে হাভাতে দু-একটা হাটুরে এসে পসরা নিয়ে বসেছিল শুধু। ওরই মধ্যে একজনের কাছে একটা বড়সড় শোল মাছ পেয়ে সেটা কিনে নিয়েছিল দেবু। ওর পুকুরে সচরাচর এই মাছটা ওঠে না।

বাড়ির কাছাকাছি এসে মনটা হঠাৎ ভালো হয়ে গেল তার। সারা দুনিয়ায় এই একটা আশ্রয় এখনো আছে। আর যে-ই তাকে ছেড়ে যাক মা তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। যতদিন বাঁচবে, প্রকৃতির নিয়মেই তার প্রাপ্য স্নেহটুকু তাকে দিয়ে যেতেই হবে। সেটুকু সে ভালো করে জানে। তারপর…

দেবু আর ভাবে না। লিভ ফর টুডে। কালকের কথা নয় কালই ভাবা যাবে! আজ সে কথা নয়। আজ শুধু বিশ্রাম। পৃথিবীর এক অজ্ঞাত কোণে শান্ত একটি বাড়ির নির্জন ঘরে নিজের মুখোমুখি হয়ে শুধু শুয়ে থাকা।

বারান্দায় সাইকেলটা তোলবার শব্দ পেয়ে মা বেরিয়ে এল। ভারি খুশি খুশি মুখ। দেবুকে দেখে এগিয়ে এসে মাথার চুলে হাত ছুঁইয়ে বলল, ‘ভিজেছিলি নাকি? এখনো তো চুলে জল লেগে আছে? ঠান্ডা লাগিয়ে ঘরের লোককে না জ্বালালে তোর আর চলছে না, নারে? গামছা দিয়ে মাথাটাথা ভালো করে মোছ আগে। তারপর ভেজা জামাপ্যান্ট পালটা শিগগির…’

‘বউদি কোথায় মা?’

‘আর কোথায়? বৃষ্টি হয়ে সিঁদুর খেলা হল না দুপুরে। তারপর বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মেয়েটা এল, তা অমনি তাকে নিয়ে বৃষ্টি থামতেই চলল মণ্ডপে। এখনো খেলা হচ্ছে বোধহয়। গিয়ে ডেকে আসবি নাকি একবার?’

কথাটা শুনে হঠাৎ একটু থেমে গেল দেবু। তারপর একটু ইতস্তত করে ডাকল, ‘মা?’

‘বল।’

‘বিবি…’

‘নয়ত আর কে! মেহের যখন রমাকে ফোন করল তুই কী কীর্তি বাধিয়েছিস সেই খবর দিয়ে, আমি তখনই জানতাম। শুধু ও মেয়ে যে একেবারে ঘোড়ায় জিন দিয়ে আজকেই এসে হাজির হবে সেইটে ভাবিনি। এখন যা। ডেকে নিয়ে আয় দুটোকে।’

দেবু হাসল, ‘আরেক সেট জামাপ্যান্ট আর একটা গামছা দিয়ে দাও দেখি। প্যান্ডেলে গেলে ভাসানে না নামিয়ে ছাড়বে ওরা?’

.

ভাসান হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ঠাকুর নিয়ে ঘাটে আসতে-আসতে অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। রমা আর আসেনি তাই। বিবিকে রেখে দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।

ভাসানের দলটার সঙ্গে দিব্যি মিলেমিশে গিয়েছিল বিবি। ওদের সঙ্গে নেচেকুঁদে দেবীর পুনরাগমনের জিগির তুলে গ্রাম পরিক্রমা সেরে দেবীমূর্তির পেছন পেছন সে-ও এসে পৌঁছেছিল ভাসানঘাটে।

ঘাটে এসে দেবু জলে নেমেছিল ঠাকুর নিয়ে। বিবি আর নামেনি। অন্য মেয়েদের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল ওপরেই। অন্ধকারে নদীতে নামতে তার ভয়।

ঘাট খালি হয়ে গেছে এখন। কেবল তারা দুজন বসে আছে এখনো। রাত বাড়ছিল। চাঁদটা আস্তে-আস্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল আকাশে। সে-আলোয় তার কপাল ও দুই গালে লেগে থাকা সিঁদুর, তার গ্রীবায়, মুখে, চূর্ণ কুন্তলে লেপটে থাকা আবীরের অভ্রকণারা ঝিকমিক করে উঠছে বারংবার। ভাসানের আগে দেবীমূর্তির সামনে যুবতীদের বিদায় উৎসবের সাক্ষ্য।

দেবু একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছিল সেদিকে। চাঁদের আলোর নীচে বসে থাকা যুবতীটিকে কেমন স্বপ্নের মতো দেখায় যেন।

হঠাৎ একটুকরো হাসি ফুটল বিবির মুখে। নিজের গাল থেকে একটু আবির তুলে নিয়ে দেবুর কপালে মাখিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘কী ভাবছ? সেই দশমীর সন্ধের মতো আবার একবার বিদেয় হব? চেষ্টা করে দেখ শুধু একবার!’

জবাবে দুটো সবল হাত তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিল এসে। তখন তাদের ঘিরে দশমীর চাঁদ আলো হয়ে ঝরে পড়ছিল।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *