দ্বিতীয় পর্ব
‘কী মশায়, গতবার তো পুজোর ছুটি পড়বার দিনই পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে কলকাতায় ছুটলেন। সে নাহয় বুঝলাম প্রথমবার বাড়ির ছেলে বাইরে এসেছেন, বাড়ির জন্য মন টানবে। তা, এবারে কী মতলব? দিব্যি তো মা’কে নিয়ে এসে গুছিয়ে বসেছেন। এবারেও কি ফের কলকাতায়, নাকি?’
‘সে এখন থেকে ভেবে কী হবে? সবে তো উচ্চমাধ্যমিক গেল। এখনই পুজোর খোঁজ কেন?’
‘না মানে, গরমের ছুটিতে কলকাতায় যাচ্ছেন না সে তো দেখতেই পাচ্ছি! গাদাগুচ্ছের পরীক্ষার খাতা দেখা, রেজাল্ট তৈরি করা! যাবেনই বা কেমন করে। তাই ভাবলাম, পুজোর সময়টা কলকাতা যাবার প্ল্যান আছে কিনা!’
দেবু হাসল, ‘সত্যি বলতে স্যার, পুজো-টুজো আমায় ঠিক ততটা টানে না। তবে পুজোর সময়টাতে সব বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। বাইরে যে আত্মীয়স্বজনরা থাকেন তাঁরাও সব বাড়ি ফেরেন। ওইজন্যেই কলকাতায় ফেরা আর কি! পুরোনো পাড়া তো! মায়া কাটানো মুশকিল।’
রাজেনবাবু হতাশভাবে ঘাড় নাড়লেন, ‘আমার তো আর কোনো চুলোয় যাবার জায়গা নেই! রাণাঘাটে পৈতৃক বাড়ি একটা আছে বটে, তবে পাঁচ শরিকের বাড়িতে ভাগে পড়েছিল একখানা ঘর আর একফালি বারান্দা। সেটাও ছেড়ে দিয়েছি তা আজ বছর দশেক হবে। বড় জ্যাঠার ছেলের থেকে থোক কিছু টাকা নিয়ে তার নামেই লেখাপড়া করে দিয়ে এসেছি।’
‘রাণাঘাটে আর যান না তাহলে?’
‘যাই। সে আপনার ধরুন গিয়ে কচিৎ-কদাচিৎ বিয়েটিয়ে লাগলে বা তেরাত্রি কি এগারোদিনের কোনো জ্ঞাতি মরলে। তখন গিয়ে যে জ্ঞাতির বাড়ি কাজ, লটবহর নিয়ে তার ঘাড়েই পড়ি। আদরযত্নটা এখনো পাই মশায়, অস্বীকার করব না। যার যেমন সাধ্য খাওয়ায়-দাওয়ায়, ভালো ঘরটা ছেড়ে দেয়। পুজোতেও ওখানে গিয়ে যে-কোনো জ্ঞাতির বাড়িতেই উঠে পড়তে পারি বটে, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এখানে আসবার পর থেকে এতগুলো বছর ওই সময়টা আমার ঈশ্বরপুর ছেড়ে মন টেকে না।
‘সে কী? এখানে আসবার পর কোনোদিন আর অন্য কোথাও পুজো দেখেননি?’
‘হ্যাঁ দেখেছি। তবে সে পঁচিশ বছর আগে। ওই রাণাঘাটেই। তারপর গত পঁচিশ বছরের মধ্যে একবার মাত্র পুজোতে ঈশ্বরপুরের বাইরে ছিলাম। বিয়ের বছরটা। পুজোটা সেবার বালুরঘাটে শ্বশুরবাড়িতে কাটাতে হয়েছিল। ব্যাস! আর কোনোদিন অ্যাই অ্যাই! ফুলগাছে হাত দিচ্ছিস কে রে? বিনোদ না তুই? ক্লাস নাইন বি! দাঁড়া দেখাচ্ছি। দৌড়বি না বলে দিচ্ছি শয়তান! চুপ করে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবি। দৌড়োলে কিন্তু ডবল মার!’
বেতটা হাতে নিয়ে রাজেনবাবু ছুটে বেরিয়ে গেলেন অবাধ্য ছাত্রটিকে সাজা দিতে। টিচার্স রুম এবারে একেবারে ফাঁকা। দেবু জানালার কাছে চেয়ারটা টেনে নিয়ে গিয়ে বসে পকেট থেকে চিঠিটা বার করল। বিবির চিঠি। গত ছ’মাসে এটা দশ কি এগারো নম্বর।
মেয়েটা কোনো বাধাই মানল না। দেবুর সব ছক, সমস্ত সাবধানতাকে ভেঙেচুরে দিয়ে সটান ঢুকে এল ওর জীবনে। গতবার পুজোর সময় ব্যাপারটা ঘটেছিল। অষ্টমীর দিন সন্ধেবেলা তরুণ সংঘের মণ্ডপে বসে আড্ডা মারছে এমন সময় বিবি ফোন করল। বলে, ‘ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হাতিবাগানের মোড়ে স্টারের সামনে এসো একবার। আমি অপেক্ষা করছি।’
ভারি সুন্দর সেজেছিল সেদিন বিবি। দুজনে মিলে হাঁটতে-হাঁটতে শোভাবাজার মণ্ডপ। সেখানে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের ভিড়ের প্রাইভেসিতে, উজ্জ্বল আলোর রোশনাইকে নিজের চোখের তারায় ভরে নিয়ে তাকে বলেছিল, ‘তোমাকে ভালোবাসি। এবারে যা ঠিক করবে করো।’
এ কথার কাটান দেবুর জানা ছিল না। ক্যাবলার মতো শুধু তাকিয়ে ছিল বিবির মুখের দিকে। এটা কি সেই বিবি? সেই নাক দিয়ে শিকনি গড়ানো কাঠির মতো মেয়েটা? বি বলে ডাকলে রেগে যেত। বলত বাটারফ্লাই বলো! অনেক ছোটবেলায়, ওকে দেবু একবার মাছ লজেন্স দিয়েছিল একটা। তারপর কেড়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল। ভীষণ কেঁদেছিল সেদিন বিবি। সেই মেয়েটা আজ এতবড় হয়ে গিয়ে ওর হাত ধরে এমন একটা কথা সরাসরি বলে দিল!
বিবি অবশ্য উত্তরের অপেক্ষা করেনি। দেবুর মনটাকে ও দেবুর চেয়েও ভালো করে জানত অনেকদিন থেকেই। একটু পরে হেসে ফেলে বলেছিল, ‘এবার পাবলিক গালাগাল দেবে দেবুদা। ওরকম হাঁ করে দাঁড়িয়ে না থেকে চলো সেলিব্রেট করবে। আজকের দিনটা স্পেশাল! ভেরি ভেরি স্পেশাল! কী খাওয়াবে বলো। এখন তো তুমি যাকে বলে রোজগেরে পুরুষ!’
জানালা দিয়ে বয়ে আসা হাওয়ায় চিঠিটা ফরফর করে উড়ছিল ওর আঙুলের ফাঁকে। দেবু আবার সেদিকে চোখ ফেরাল। এখানে ইন্টারনেটটা একেবারেই চলে না। শিবতলা ছাড়িয়ে আরো খানিক এগিয়ে গেলে বড় রাস্তার ওপর থেকে সামান্য পাওয়া যায়। তবে কলকাতা থেকে চিঠিপত্র এসে দু-তিনদিনেই পৌঁছে যায়। বিবির কিবোর্ডে অভ্যস্ত আঙুল একরকম বাধ্য হয়েই কলম ধরেছে। অনভ্যেসটা ফুটে বেরোচ্ছে প্রতিটা আঁচড়েই।
বক্তব্যে অবশ্য নতুনত্ব বিশেষ কিছু নেই। সেদিন পুজোবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে মিত্র কাফেতে বসে প্রথমবার যা বলেছিল বিবি, সবই সেই পুরোনো কথার পুনরাবৃত্তি। এই চাকরিটা একটা টেমপোরারি মেজার হতেই পারে, কিন্তু দেবুর মতো ছেলের এখানেই চিরকাল আটকে থাকবার জন্য নয়। শহর থেকে বহুদূরের ওই গভীর গ্রাম বিবির জন্য নয়। এভাবে চলতে পারে না। এভাবে দেবুকে নিজের জীবনটা নষ্ট করতে সে দেবে না। বাংলার বাইরে, দেশের বাইরে যেখানে হোক…।
অলসভাবে সেই সুপরিচিত কথাগুলোর ওপর চোখ বোলাতে-বোলাতেই হঠাৎ একটা জায়গায় এসে সামান্য থমকে দাঁড়াল দেবু।
‘…তোমার ছাত্র তো এদিকে রেকর্ড করে ফেলল দেবুদা। তোমার কাছে ছ’মাস পড়ে বিটস পিলানিতে একবারে চান্স পেল। তারপর প্লেসমেন্টের দেড় বছরের মধ্যে ব্যাঙ্গালোর থেকে স্ট্রেট সিঙ্গাপুর! গেল মাসে ব্যাঙ্গালোর থেকে ভায়া মুম্বই বেরিয়ে গেল। ওখানে কোম্পানির নিউরাল নেটওয়ার্ক ডিভিশন একটা বড় প্রজেক্ট পেয়েছে। তার প্রজেক্ট লিড। ভাবো একবার…’
মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের মনেই একটু হাসল দেবু। ছেলেটা বিটস পিলানিতে এমসিএ-র এন্ট্রান্স দেবার সময় অঙ্কের ট্রেনিংটা দেবুর কাছেই নিয়েছিল। মোটের ওপর খারাপ ছেলে নয়। দেবুর ঘষামাজায় এক চান্সেই উতরে গিয়েছিল।
‘সুমিত খুব এক্সাইটেড দেবুদা। সেটাই স্বাভাবিক। জয়েন করবার দেড় বছরের মধ্যে এতবড় লিফট! ভাবা যায়? এখন প্রজেক্টের জন্য রিক্রুটমেন্ট চলছে ওখানে। শুনে আমি একটা কাজ করে ফেলেছি, জানো? মানে সুমিতই বলল, তাই…তোমার তো স্টোকাস্টিক প্রসেস-এ স্পেশালাইজেশন ছিল! সুমিতকে কিউইং থিওরি, র্যান্ডম ওয়াক এইসব পড়িয়েও ছিলে…’
হঠাৎ হালকা চালে এগোতে থাকা চিঠিটা একেবারে অন্যরকম একটা রূপ নিচ্ছিল। বিবি তার জন্য…কাগজটা হাতে ধরে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ফের সেটার দিকে চোখ ফেরাল সে।
‘সেদিন এই নিয়ে ফোনে কথা হতে হতে সুমিত বলছিল, দেবুদার যা অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার আর যা স্পেশালাইজেশান, তাতে এখানে এলে ওকে কোম্পানি এই প্রজেক্টে লুফে নিত। পুরোপুরি রিসার্চ ওরিয়েন্টেড কাজ। দেবুদার স্যুটও করবে। শুনে আমি দেরি না করে তোমার একটা সিভি ওকে মেল করে দিয়েছিলাম। এই, না বলে করেছি বলে তুমি আবার তাতে রাগ কোরো না যেন। ও সেটা হাইলি রেকমেন্ড করে কোম্পানিকে ফরওয়ার্ড করে দিয়েছিল। সব দেখেশুনে কোম্পানি থেকে বলে পাঠিয়েছে তোমায় মার্কশিটের কপিগুলো দিয়ে একটা প্লেন পেপার অ্যাপ্লিকেশন পাঠাতে হবে শুধু। তারপর হয়তো টেলিফোনে জাস্ট একটা ফর্ম্যালিটি টাইপের ইন্টারভিউ…সেটা হতেও পারে, না-ও হতে পারে।
‘দেবুদা প্লিজ, আমি জানি তুমি নিজের ব্যাপারে অন্যের নাক গলানো পছন্দ করো না। কিন্তু এই একটিবার তুমি এ নিয়ে আমার ওপর রাগ করতে পারবে না। নিজে থেকে তো তুমি কোনো ইনিশিয়েটিভ নেবে না। তাই দুজনের কথা ভেবে আমাকেই যা করবার করতে হল। অফারটা তুমি অ্যাকসেপ্ট করে নাও। বাইরে একবার চলে যেতে পারলে আমাদের আর পিছু ফিরে দেখতে হবে না দেখো!
‘আর, আমি নিজেও একটা সুযোগ পেয়েছি, বুঝলে! প্রেসিতে সুগতবাবু আমার এমফিল-এর গাইড সে তো জানো। ভদ্রলোক ইদানীং আমাদের সোশিওলজির ডিপার্টমেন্টাল হেডও হয়েছেন। আমাকে খুব ভালোবাসেন। সেদিন পিএইচডি-র জন্য এনরোলমেন্ট করতে বললেন ওঁর কাছে। তখন সুমিতের আর তোমার ব্যাপারটা ওঁকে বলে, বলেছিলাম, তেমন হলে আমাকেও হয়তো সিঙ্গাপুর বেরিয়ে যেতে হবে তোমার সঙ্গে।
‘শুনে উনি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের কথা বললেন। এনইউএস-এ উনি গেস্ট লেকচারার হয়ে মাঝেমাঝেই যান। বললেন, ভেবো না। আমি রেকমেন্ড করে দেব। ডেভেলপমেন্টাল সোশিওলজি নিয়ে কাজ করছ যখন, তখন ওখানে পিএইচডির জন্য গ্র্যান্টের বন্দোবস্ত একটা হয়ে যাবে। ওরা এই এরিয়াটায় খুব ইমপরট্যান্স দিচ্ছে আজকাল। দুজন মিলে চলে যাও। বলে খুব কনগ্রাটস-টাটস করলেন।
‘আমি পরদিনই অ্যাপ্লাই করে দিয়েছি বুঝলে? কী নিয়ে কাজ করব শুনবে? তোমার ইন্টারেস্টিং লাগবে হয়তো। তুমি যে ঈশ্বরপুর গিয়ে ইস্তক রুরাল এরিয়ায় পশ্চিমী মডেলের প্রথাগত শিক্ষা মডেলের নামে গালাগাল দাও, স্থানীয় বৃত্তিশিক্ষাগুলো হারিয়ে যাওয়া নিয়ে দুঃখ করো, সেই থেকেই আইডিয়াটা নিয়েছি। বিষয়টা হল কম্পোনেন্টস অব ট্র্যাডিশনাল এডুকেশন ইন থার্ড ওয়ার্ল্ড ভিলেজেস। স্যার দুর্দান্ত একটা রেকমেন্ডেশান দিয়ে দিয়েছেন। অতএব, মোটেই তোমার গলগ্রহ হয়ে থাকব না ওখানে। রীতিমতো রোজগার করব মশাই!
‘অ্যাপ্লিকেশানটা তুমি মনে করে পাঠিয়ে দিও প্লিজ দেবুদা। আজকালকের মধ্যে। এই, ভেবো না এর জন্য সুমিতের কাছে তোমার কোনো অবলিগেশন থাকবে। অফারটা তো তোমায় দিয়েছে তোমার মার্কশিট। আমি বা সুমিত যোগাযোগটা করিয়ে দিয়েছি কেবল। নিজের বিষয় নিয়ে গবেষণা করতেই তো চেয়েছিলে তুমি। সুযোগটা এদেশে ঠিকমতো জুটল না বলে রাগ করে বনবাসে গিয়ে বসেছ সে কি আমি বুঝি না?’
কাগজটা হাতে ধরে নিঃশব্দে বসে ছিল দেবু। এই মুহূর্তে একটা মিশ্রিত অনুভূতি কাজ করছে ওর মধ্যে। গত ছ’মাসে চেষ্টা একেবারে যে করেনি সে তা নয়। ব্যাঙ্গালোরে স্ট্যাটিসটিকস ডিপার্টমেন্টের অমল আছে। ম্যাথস-এর সুমন আছে সেক্টর ফাইভে। ওদের বলতে ওরা বেশ ক’টা জব ওপেনিং-এর খবরটবরও দিয়েছিল। একটা, ব্যাঙ্কের ফাইনানশিয়াল অ্যানালিস্ট, অন্যটা একটা পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির রিস্ক ম্যানেজমেন্টের কাজ। সেইসঙ্গে আফশোসও করেছিল খানিক। ঝকমকে তকমাগুলোর আড়ালে ওরা দুজনই আসলে সফটওয়ার প্রোগ্রাম লেখা কেরানি। বলেছিল, ইউনিভার্সিটির বিদ্যেগুলোর কিছুই আর মনে নেই ওদের। সব ভুলে গেছে, সব।
বলেছিল এদেশের কর্পোরেট পরিবেশ কেরানি আর সেলসম্যান ছাড়া আর কিছু চায় না। বিশুদ্ধ গবেষণাকে পেশা বানাবার সুযোগ এদেশে বড় কম।
অথচ বিবির এই অফারটা।
দস্তানাটা এইবার ছুড়েই দিয়েছে বিবি সরাসরি। মেসেজটা পরিষ্কার। তোমার পছন্দের কাজ আমি তোমায় খুঁজে দিয়েছি। ভালোবেসেই দিয়েছি। আমায় পেতে হলে তাকে অ্যাকসেপ্ট করো। নয়ত বিদায় দাও আমাকে। নেগোসিয়েশানের জায়গা নেই কোনো এখানে।
খুব হালকা একটা তেতো অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছিল যুবকটির মনে। কিন্তু তারপর হঠাৎ ওরই পাশাপাশি আরো একটা ছবি ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। ঝকমকে ঝলমলে একটা শহর। একফোঁটা ময়লা নেই কোথাও। সেইখানে কোনো একটি ল্যাবে মনের মতো একটা কাজ। কাজের শেষে বিবির হাত ধরে সেই শহরের পেভমেন্টে হেঁটে যাওয়া। উইকএন্ডে সমুদ্রতট! তেল চকচকে রাস্তা ধরে ঝাঁকুনিবিহীন সফেদ গাড়ির উদ্দাম সফর। বিবির অবাধ্য চুলেরা তার চোখেমুখে—
.
২
.
‘মানিকবাবু আছেন? মানিকবাবু? ও মাস্টারমশায়—’
বন্ধ জানালাটার সামনে দাঁড়িয়ে ধাপে ধাপে গলা চড়ায় দেবু। প্রখর সূর্যের নীচে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে আছে পোস্ট অফিস বাড়িটা। প্রাণের কোনো লক্ষণ নেই। আরো বারকয়েক চিৎকার করবার পর ভেতর থেকে সদ্য ভারী হতে শুরু করা একটি কিশোরকণ্ঠ জবাব দিল, ‘শনিবার দুপুরের পরে পোস্ট অফিস বন্ধ। পরশু আসেন।’
বাড়িটা পোস্টমাস্টার মানিক দাসের অফিস কাম রেসিডেন্স। দেবু একবার ফোনের ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল। ছোকরা কথাটা ভুল বলেনি। আড়াইটে বাজে। অতএব ঘুরপথ নিতে হবে।
পোস্ট অফিসের জানালাটার পাশ দিয়ে দেওয়াল বরাবর হেঁটে গিয়ে ডানদিকে বাঁক নিলে বাড়ির লোকের যাতায়াতের দরজা। এদিকটা উঠোন আছে খানিক। মেহেন্দির বেড়া দিয়ে ঘেরা। এইবার সেদিকে ঘুরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বেড়ার বাইরে থেকে দেবু ফের হাঁক দিল, ‘লগা, আমি নতুন মাস্টার। একবার এদিকে আসবি?’
‘আসছি, দাঁড়াও।’
লগা খাচ্ছিল বোধ হয়। খানিক বাদে হাতটা চাটতে-চাটতে এসে দাঁড়িয়ে বলে, ‘বলো কী হল?’
‘মানিকবাবু নেই?’
‘না। অপিস বন্ধ করে সদরে গেছে। আজ দেশে যাবে। ফিরতে-ফিরতে সোমবার দুপুর।’
‘সে তো ফি-শনিবারেই যায়। তা এ-হপ্তায় একটু আগে আগে বেরোলো মনে হচ্ছে?’
‘আগে আর গেল কই? দুটোর পরে সব বন্ধটন্ধ করে এই একটু আগে বাস ধরতে বেরিয়েছে। লাও, এখন কী বলবে বলো।’
‘পঞ্চাশ টাকার স্ট্যাম্প লাগবে যে বাবা। আর, একখানা ইনল্যান্ড।’
লগা হাত উল্টে দিল। বলে, ‘ওসব অপিসঘরের জিনিস। আমি ঘরের চাকর, ওসব কোথায় পাব?’
‘পাবি, পাবি, সব পাবি। পকেট থেকে আমার হাতটা বের হলেই ঠিক সবকিছু খুঁজে পেয়ে যাবি।’ দেবু হাসছিল।
‘কই কী এনেছ আগে পকেট থেকে বার করো দেখি!’
‘আগে আমার স্ট্যাম্প আর ইনল্যান্ড আন।’
‘দাঁড়াও। এনে দিচ্ছি। লোকজনকে আবার বলে বেড়িও না যেন ছুটির দিনেও লগার কাছে পোস্টাপিসের জিনিস পাওয়া যায়। তোমায় বলেই দিচ্ছি।’
বলতে-বলতে একছুটে ভেতরে গিয়ে তার প্রার্থিত বস্তু দুটি নিয়ে এসে হাতে তুলে দিয়ে বলে, ‘এবারে দাও।’
দামের সঙ্গে-সঙ্গে একটি মনোহারি উৎকোচও হস্তান্তরিত হয়ে যায়। একটা প্লাস্টিকের লাট্টু। ঘোরালে ভেতরে আলো জ্বলে। আজকাল কলকাতায় গেলে ক্যানিং স্ট্রিট থেকে ডজন রেট-এ এইসব ছোটখাটো খেলনা কিনে এনে পকেটে কিছু কিছু রেখে দেয় দেবু। এক দু’টাকার জিনিসের বিনিময়ে বড় উজ্জ্বল সব হাসি কিনতে পাওয়া যায় এই গ্রামটিতে এবং তার স্কুলে।
পুব আকাশে মেঘ। সাদা রং ঝলসাচ্ছে। চোখ তুলে তাকানো যায় না ওদিকে। ঘাস আর দাঁতনকাঠির জঙ্গল থেকে কটু অথচ সুস্বাদু একটা ঘ্রাণ উঠে আসছিল। বাড়ির পথে চলতে-চলতে অন্যমনে সেই সুঘ্রাণ বুকে টেনে নেয় যুবকটি। তার পঞ্চেন্দ্রিয়ে ক্রমাগতই আছড়ে পড়ে এক স্নিগ্ধ অথচ অনাবিল গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ, বর্ণের ঢেউ। বাংলার গভীর নির্জনে, নামহীন দেশকালের গহ্বরে জেগে থাকা সেই গ্রামটির প্রকৃতি তার চেতনার ওপর ধীরে ধীরে এক মায়াজাল ছড়িয়ে দেয়। তার অজ্ঞাতেই। কারণ, সেই মুহূর্তে সে, ঈশ্বরপুর থেকে বহুদূরের কোনো এক ভিনদেশি শহরে একটি নাগরিক জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আনমনে পথ হাঁটছিল।
.
‘মা ঠাকরুন ফিরে এসেছেন মনে হচ্ছে?’
বিকেল পড়ে আসছিল। স্কুল থেকে শিবতলার এই মঙ্গল বারের হাট রাস্তাটা কম নয়। পা লেগে এসেছিল তার হাঁটতে-হাঁটতে। কালীর দোকানের সামনে বাঁশের মাচানটার ওপরে বসে আরামের একটা শ্বাস ছেড়ে দেবু বলল, ‘হাঁ কালীদা। কলকাতায় গিয়ে এবারে দিনদশেকের বেশি টিকতে পারল না। বলছিল ওখান প্যাচপেচে গরমে কষ্ট বেশি হয়। আজ সকালের বাসে ফিরে এসেছে। তা তোমায় সে খবর দিল কে?’
‘দেবে আবার কে হে মাস্টার!’ কালীর যাত্রাদলের রাবণ টাইপের মুখটা বেশ হাসি-হাসি হয়ে উঠেছে, ‘সে আপনার চেহারাতেই মালুম। চুলে ফের দেখি ক’দিন বাদে চিরুনি পড়েছে, পকেটে রুমাল, পায়ে হাওয়াই চপ্পলের বদলে কাবলে চটি। তার অত্থ মা ঠাকরুন আবার—’
‘ছাড়ো তো! যত বাজে কথা খালি!’ দেবু হাসল একটু। কথাগুলো অবশ্য কালী মিথ্যে বলেনি।
‘এখন এই ফর্দটা নাও। মালগুলো দিয়ে সারো দেখি! তাড়া আছে।’
কালী মাছি তাড়াবার মতো হাত নাড়ল একবার, ‘আপনাদের শহরবাজারের লোকেদের এক বদ দোষ মাস্টারভাই। সব ব্যাপারে অত তাড়া কীসের? বিয়ের লগ্ন বয়ে যাচ্ছে নাকি?’
‘না, তা যাচ্ছে না। কিন্তু মালগুলো নেবার পর ছাতাটা সারিয়ে নিয়ে ফিরতে হবে। সন্ধে হয়ে আসছে।’
‘অ। এই ব্যাপার? তার জন্য ঘোড়ায় জিন দিয়ে আসবার দরকার কী? বসেন বসেন। আরাম করেন। সব ব্যবস্থা হচ্ছে। আগে বিড়ি জ্বালান দেখি একটা!’
বিড়ির বান্ডিলটা দেবুর দিকে এগিয়ে ধরে কালী হাঁক দেয়, ‘মিত্যুন, ওরে ওই ছোঁড়া!’
চালের ওপর মট মট আওয়াজ হচ্ছিল খানিকক্ষণ ধরেই। সেখান থেকে জবাব এল, ‘আমি চালে উঠেছি। দু’খান টালি ভেঙেছে এই দ্যাখো। গত হাটে এট্টা বদমাশ ছোকরা চালে ঢেলা মেরেছিল মনে আছে? আজ এসে দেখি দু’বস্তা চাল ভিজে চুপ্পুর হয়ে আছে পরশু রাতের বিষ্টিতে। টালি দু’খান পাল্টাতে হবে কাকা।’
‘এই দ্যাখো। উটকো খরচের ধাক্কা আবার। আচ্ছা তুই নেমে আয় দেখি। সুধীর পালের থেকে দুটো টালি নিয়ে আয়, পয়সা দিয়ে দিচ্ছি।’
ছেলেটা চাল থেকে নেমে এলে তার হাতে পয়সা দিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে দেবুর ছাতাটাও ধরিয়ে দিল কালী। বলল, ‘ফেরবার পথে এটাকেও একটুক সারিয়ে নিয়ে আসিস বাবা। দেখিস, পচা সুতো আবার না দিয়ে দেয়। আট আনার বেশি দিবি না। আর ওমনি যাবার পথে দুটো চা পাঠিয়ে দিয়ে যাস বাদলের থেকে। কাচের গ্লাসে যেন দেয়। বেশি করে দুধ দিতে বলবি। সর ভাসে যেন ওপরে।’
একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠছে মাঠ জুড়ে। হাট এখানে খানিকটা রাত অবধি চলে। ইতিউতি কুপির হলদেটে আলোয় লেনদেন চলে আধো অন্ধকারে। একটা ধূপকাঠি জ্বেলে দাড়িপাল্লায় ধূপ দেখিয়ে সেটাকে ক্যাশবাক্সের কাঠের পাটার ফাঁকে গেঁথে দিল কালী। তারপর একখণ্ড পুরোনো খবরের কাগজ জ্বালিয়ে দোকানের সামনে গিয়ে রেখে এল। হাটুরের চালায় সন্ধে দেখাবার এই রীতি এখানে।
সন্ধে দেখিয়ে ভেতরে ফিরে পা ধুয়ে গদিতে উঠতে-উঠতে কালী বলে, ‘বুকপকেটের পুরুষ্টু খামখানা কার জন্য মাষ্টারভাই?’
‘ও এটা? এটা একটা কাজের চিঠি।’
কালী চালাক-চালাক চোখে তার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলল, আর খামটার পেছনে যে নীল রঙের চিঠিটা? সেটা কার জন্যে?
‘ওটা বাড়ির চিঠি।’
‘এই দ্যাখো। ভর সন্ধেবেলা ডাহা মিথ্যেকথাটা বললেন তো!’
‘মানে?’
‘বলছি বলছি। চা এসে গেছে। আগে চায়ে চুমুক দেন দেখি!’
‘কালীদা, আমার মালগুলো?’
কালী মাথা নেড়ে হাসল একটুখানি, ‘সে আপনার চিন্তা নেই। ও আমার মিত্যুন এসে দু’মিনিটে সব দুরুস্ত করে দেবে’খন। বেশি দেরি হলে আপনি চলে যেয়েন, ওকে দিয়েই বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। আগে চা খান দেখি আরাম করে!’
খানিক বাদে গ্লাসে শেষ চুমুকটা দিয়ে গোঁফ থেকে সরের একটা টুকরো মুছতে মুছতে কালী বলল, ‘দেখি, আপনার নীল খামের চিঠির রহস্য ভেদ করা যায় না কি! হাতখান বাড়ান দেখি মাস্টারভাই! উঁহু, উঁহু বাঁহাত নয়। ও তো মালক্ষ্মীদের দেখে। ডানহাত দেন, ডানহাত।’
ডাঁটিভাঙা একটা চশমা কোত্থেকে বের করে এনে চোখে পরে নিয়েছে কালী ইতিমধ্যে। দেবুর হাতটা দু’হাতের মধ্যে ধরে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে আর মিটমিট করে হাসে। বলে, ‘দেখতে পাচ্ছি, দেখতে পাচ্ছি। একেবারে দিনের আলোর মতন পরিষ্কার। নীল শাড়ি, দুধে আলতা গায়ের রং। নাকের পশে একটা তিল। কে গো মাস্টারভাই? কপালে সিঁদুর দেখি না! আপনার কেউ হয়?’
দেবু হতভম্ব হয়ে যাচ্ছিল। কালী কেমন করে বিবির এত নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে দিচ্ছে? ম্যাজিক নাকি? তার মুখচোখ দেখে কালী ঠা-ঠা করে হাসে। বলে, ‘জাদুবিদ্যে কাকে বলে দেখলেন মাস্টারভাই?’
‘তা বটে। কিন্তু তুমি—’
‘মাদারি তার হাতের কায়দা কি কখনো কাউকে বলে দেয়?’
‘বলবে না তো?’
‘বলতে পারি। তবে ঠাকরনের নামটি বলতে হবে যে আগে!’
‘কালীদা, ভালো হচ্ছে না বলে দিচ্ছি!’
‘আহা হা, রাগ করেন কেন? ওই আপনার রোগ দেবুভাই। কথায়-কথায় রাগ, গোসা। আর ক’দিন বাদে তো আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে আসবে। এখানেই ঘরসংসার পাতবে, কোলজোড়া খোকাখুকু আসবে, তারপর দিন গেলে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়ে পাকাচুলে সিঁদুর পরবে এই ঠেঁয়েতেই তো! তার নামটা না হয় দু’দিন আগেই জেনে গেলাম! ক্ষতি কী?’
হক কথা বটে। এ তো তোমাদের শহর বাজার নয় বাপু! গোটা গ্রামটাই আদতে একখানা পরিবার যে! শরিকালি আছে, কাজিয়া ঝগড়া আছে, আবার ভালোবাসারও তো অভাব নেই! কথাতেই তাই বলে গাঁ-ঘর। তোমার ঘরের মা ছেলে বউ আমারও আত্মার আত্মীয় হয় যে! এ কৌতূহলে স্বজনের আদর আছে। প্রাকৃতজনোচিত রসাভাস নেই। দেবু কালীর চোখে চোখ রেখে বলল, ‘বিবি।’
‘সাত্থক নাম! এইবার রহস্যটা বলি। জাদুবিদ্যে-টিদ্যে কিছু নয়। গেল হাটে সেই যে মাছ কিনতে গিয়ে আপনার মানিব্যাগ পড়ে গিয়ে সব কাগজপত্তর, নোট রেজগি ছড়িয়ে পড়ল, তখন পিছু পিছু কুড়িয়ে এনে দিয়েছিল কে? এই শর্মাই তো! তখন কাগজের ফাঁকে ছবিটা দেখে নিয়েছিলাম। আহা, সাক্ষাৎ লক্ষ্মীপিতিমের মতো মুখচোখ গো! পটের বিবিই বটে। তা এবার দুর্গা দুর্গা বলে লাগিয়ে দিলেই তো হয়! ঘরে লক্ষ্মী আসুক, আর আমরাও একদিন পাত পেড়ে খেয়ে আসি।’
‘সে তো বাড়িতে একদিন খেয়ে আসতেই পারো গিয়ে। মা’র হাতের রান্নাই খেয়ে যাও না যেদিন খুশি। তার জন্য বউ আসবার কী দরকার?’
‘সে খাব। বললেন যখন, নিশ্চয় করে যাব একদিন। মায়ের পেসাদ খেয়ে আসব। কিন্তু বলি মায়ের সুপুত্তর, বউ যে কী বস্তু, সে যেদিন হাতেকলমে ঠিকঠিকটি জানবে সেদিন দেখব ওকথা ফের বলো কী করে? সাধুদা কী বলে জানো? বলে দ্যাখবা আমাদের মাস্টারবাবা কেমন বউপাগলা হয় বিয়ের পর…’
‘সাধুদা…’ দেবু বিব্রতমুখে বলে উঠল, ‘তুমি তাকেও এসব কথা…’
কালী মুখ মুচকে হাসল, ‘আহা রসের খবর কি একলা একলা ভোগ করতে ভালো লাগে? আপনিই বলেন দেবুভাই। সকলে মিলে ভাগযোগ করে না নিলে চলে নাকি?’ বলতে-বলতে গুনগুনিয়ে গান ধরে কালী,
.
‘হীরা মাণিক্য ধন
শতমুখে বরণন,
তাহারো অধিক ধন
বিধাতা করিলেন সৃজন
ধরামাঝে অমূল্য রমণী রত-অ-অ-অ-ন!
তাহার অঙ্গমাঝে
স্বয়ং অনঙ্গ বিরাজে
মৃদু ভাষে, মিষ্ট হাসে
মরাল গম-অ-অ-অ-ন!’
.
কান চেপে ধরে গমক ঝাড়ছে ঘন ঘন। যাত্রাপালার শখ আছে কালীর। আশেপাশের দু-পাঁচটা গ্রামে নামও আছে বেশ গানের গলার।
স্থানীয় কোনো আনামা কবির মোটা দাগের সৃষ্টি। আদিরসের দিকেই তার মৃদু ঝোঁক। তবু তার দরাজ গলায় প্রাকৃত উচ্চারণে, সুরে, কথায় সব মিলিয়ে এক অকপট, সহজিয়া ও আনন্দময় জীবনের গল্প বলে যায়। সে জীবনে আপাদমস্তক অবগাহন করে বুঁদ হয়ে আছে কালী। অকপট সারল্যে দেবুর হাতটি ধরে তাকেও সে তার মধ্যে ডুব দিতে আহ্বান করে। অন্নবস্ত্রের সংস্থানটুকু করো, উপভোগ করো প্রিয় নারীর সঙ্গকে, তারপর স্ত্রী-সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সংসারধর্ম পালন করে তৃপ্ত হও। আর, এমনি করেই কেটে যাক না জীবন! বাধা দিও না প্রকৃতিকে। নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে গা ভাসিয়ে দাও তার কোলে।
কেন যেন, নিমন্ত্রণবাড়ির বাইরে দাঁড়ানো ভিখিরির মতো লাগছিল নিজেকে দেবুর। সামনে তার বর্ণে, গন্ধে স্বাদে ভরা ভোজসভাটি খোলা রয়েছে। কিন্তু ঢোকা বারণ। মনের দরজায় সঙ্গিন উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার শিক্ষা, সংস্কার, সংস্কৃতি, তার প্রেসিডেন্সির পাঠ, বিদেশের হাতছানি…। আর বিবি?
নামটা মনে আসবার সঙ্গে-সঙ্গেই হঠাৎ, এই গ্রাম্য চালাটির নীচে, ওই হাসিমুখ মেঠো মানুষটার সামনে বসে একটা অবুঝ আবদার উঠে এল তার মনে। যেতে কি হবেই? আচ্ছা, বিবি তার সঙ্গে এখানে, এই জীবনটাতে আসতে পারে না? একবার জিগ্যেস করে দেখলে হয় না ওকে? হোপ এগেইনস্ট হোপ? যদি রাজি হয়ে যায়? যদি—
ভাবনাটা মনে আসতে খানিকটা অবিশ্বাস নিয়েই সেটাকে একবার মনের ভেতর নেড়েচেড়ে দেখে নিল সে। মুহূর্তের ভাবাবেগ? তাই হবে নিশ্চয়। নইলে এইখানে পাকাপাকি থেকে যাওয়া…বিবিকে নিয়ে… রিডিকিউলাস!
‘হে হে মজা পাইলেন নাকি মাস্টারভাই? মুখে হাসি-হাসি ভাব দেখি যে বড়! তা এরপর গার্হস্থরসে যখন মজবেন তখন দেখবেন সে মজার কূলকিনারা নাই হে।’
তার মুখে ফুটে ওঠা বাঁকা হাসির রেখাটুকুর দিকে তাকিয়ে গান থামিয়ে হঠাৎ বলে উঠল কালী।
পকেটের চিঠিটার গায়ে একবার হাত চলে গেল দেবুর। মোটা খামটায় ওর আবেদনপত্রটা রয়েছে। সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতার কিছু উজ্জ্বল কাগজ। দেবুর সাফল্যের সোপান। তাতে লেখা অক্ষরগুলোর অর্থ এই মানুষটার বোধের অতীত। অথচ ও সেসবের সন্ধান না পেয়েও কত সহজেই সুখকে খুঁজে নিয়ে বুঁদ হয়ে আছে তাতে!
আচ্ছা, চিঠিটা এখানে, এই আলের ধারে কোথাও গুঁজে রেখে দিয়ে চলে গেলে হয় না? কেউ তো দেখবে না! জানতেও পারবে না! বিবির ইনল্যান্ডটাকে আবার নতুন করে লিখতে হবে তবে। আশাহত বিবি, ফোনের ওপাশ থেকে ক্রন্দরত বিবি না না, আর তা হয় না।
বড়-বড় পায়ে হাটের এলাকাটা ছেড়ে হেঁটে যাচ্ছিল দেবু। চাঁদ উঠেছে। একফালি চাঁদ। ক্রেজেন্ট মুন। বিবির প্রিয়। গত মাসের দু’নম্বর রবিবারে কলকাতায় গিয়ে, এইরকম চাঁদের নীচে হাত ধরাধরি করে হেঁটে গিয়েছিল ওরা দুজন। লেক-এর পাশে। জলে চাঁদের ছায়া পড়েছিল। দেবুর মুখের ছায়া পড়েছিল বিবির মুখে। ঠোঁটদুটি একে অন্যকে বুঝে নিতে চেয়েছিল। সেই প্রথম।
পোস্ট অফিসের সামনে ডাকের বাক্সটা একলা একলা দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল একবার দেবু। তারপর জামার পকেট থেকে চিঠিদুটো বের করে এনে ঢুকিয়ে দিল বাক্সের ভেতর। আর দ্বিধা নয়। দা ডাই ইজ কাস্ট!
.
৩
.
রাতে বৃষ্টি হয়েছে। যতবারই ঘুম ভেঙেছে, টালির চালে টুপটাপ জল ঝরবার শব্দ। কখনো আস্তে, কখনো জোরে। ভোর ভোর বৃষ্টিটা চেপে এল। দেবু সারারাত একটা টেনশনে ভুগেছে। পেছনদিকের পুকুরটার গলা অব্দি জল উঠে রয়েছে। সেটা গতকাল সন্ধেবেলাই দেখে এসেছিল। আকাশ তখন বিলকুল পরিষ্কার। এ-যাত্রা বর্ষা যে শেষ, সে-কথা রেডিওর খবরেও বলছে গত দু’তিনদিন ধরে। কাজেই তখন আর কোনো সাবধানতা নেবার কথা মাথাতেই আসেনি তার। কিন্তু রাতে খেতে বসবার সময় থেকেই আবার বলা নেই কওয়া নেই, আকাশভাঙা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল! দেবু নিজেকেই দুষছিল। রেডিওর খবরে কেউ বিশ্বাস করে?
আকাশ হালকা ফরসা হয়ে আসতেই ও উঠে পড়ল। বাড়ি শুনশান। মা ও ঘরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। দেবু ডাকল না আর। আকাশে কোদালে মেঘ। সাঁই সাঁই করে ছুটছে হাওয়ার ধাক্কায়। হুমহুমে হাওয়া সামনের আমবাগানে ঝমঝম শব্দ তুলছিল।
বারান্দার কোণ থেকে লম্বা ছাতাটা তুলে নিয়ে মাথায় দিয়ে দেবু বাইরে এল। গোড়ালি ছাপিয়ে জল উঠে গেছে উঠোনে। তার মানে সারারাত যে ভয়টা করছিল তাই হয়েছে। পুকুরটা ভেসেছে। কিছুদিন আগে শিবু দপ্তরিকে ধরে বেশ কিছু মাছের চারা আনিয়ে পুকুরে ছেড়েছিল। রুই, বাটা, লাইলন টিকা; সেগুলো একটু চেহারায় বেড়েছেও। সেই সব মাছ ভেসে যাবে! চালের বাতায় ছাতাটাকে ঝুলিয়ে রেখে দেবু আবার বারান্দায় এসে উঠল। রান্নাঘরের একপাশে একটা মাচায় ঝুড়ি কোদাল রাখা আছে। পেড়ে নিতে হবে।
ঘোষপুকুরের জল বেরোবার একটা বড় নালা আছে ওই পুকুরের পশ্চিম পারের খানিক দূর দিয়ে। ঝপাঝপ কোদাল মেরে একটা ফুটবিশেক লম্বা নালা বানিয়ে ওর পুকুরটাকে বড় নালার সঙ্গে জুড়ে দিতে বিশেষ সময় লাগবার কথা নয়।
কিন্তু আধফোটা ভোরের আলোয়, জলে ভেসে যাওয়া গোটা এলাকাটাতে কোনোখানটাতে যে পুকুর শেষ আর কোনোখানটাতেই যে জমির শুরু তা হিসেব করে-করে পা ফেলতে হচ্ছিল। নালাটা তৈরি করতে ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেল প্রায়।
কাজ হয়েছে! পুকুরের অতিরিক্ত জল হুড়হুড় করে বার হয়ে যাচ্ছে নালা দিয়ে। ঘোষপুকরের বড়নালায় মিশে ও জল একেবারে মহানন্দায় গিয়ে পড়বে। দেবু বেশ তারিফভরা চোখে নিজের হাতের কাজটাকে দেখল একটুক্ষণ। আর তার পরেই খেয়াল হল, নালার মুখে দেবার জন্য জোগাড় করে রাখা নাইলনের নেটের টুকরোটা ঘরে মাচার ওপরেই রয়ে গেছে। আনা হয়নি! ছাতা, ঝুড়ি কোদাল সব ফেলে রেখে ছুট লাগাল দেবু।
নরম কাদামাটির ওপর গোড়ালিডোবা জল ছিটোতে-ছিটোতে সে ছুটে যায় তার লাল টালি আর সবুজ জানালার বাড়িটার দিকে। তার মাথায় পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে শেষ বর্ষার জলধারা। সপ্তসমুদ্র থেকে জলের সঞ্চয় নিয়ে দশ দিগন্ত অতিক্রম করে আসা মেঘেরা আজ তাকে তার নতুন রাজ্যপাটে অভিষিক্ত করে।
বাড়ির সামনে এসে দেখা গেল সাধু বসে আছে বারান্দায়। মা’র ঘরে কেউ দেখা করতে এসেছেন। ভেতর থেকে মৃদু গলায় কথাবার্তার আওয়াজ আসছিল। সাধুর দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাতে সে দেবুর ঘরের দিকে দেখিয়ে দিয়ে বলে, ‘একেই বলে প্রাণের টান মাস্টারভাই। নইলে ঠাকরুন ফোনে ডাকল ঘরের ভেতর, আর এই হাওয়া জলের মধ্যে মনের মানুষটি সে-ই পুকুরপাড় থেকে ডাকটি ঠিক শুনতে পেয়ে হড়মড়িয়ে ছুটতে-ছুটতে আসছে!’
‘ফোন? কোথায়?’
ঠিক তখনই কানে গেল, তার ঘরে পড়বার টেবিলের ওপর ফোনটা বেজে যাচ্ছে একনাগাড়ে, ‘দেবুদা, আমি গো, ফোনটা ধরো’, ‘দেবুদা, আমি গো।’
রিংটোনটা বিবির। নিজেই রেকর্ডিং করে দিয়ে দিয়েছিল ওকে। বলেছিল, ‘আমার নাম্বারের সঙ্গে জুড়ে রাখবে।’
দু’কথায় সাধুকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতে সাধু লাফ দিয়ে উঠে রান্নাঘরের মাচার ওপর থেকে নাইলনের নেটের টুকরোটা নিয়ে ছুটল পুকুরধারে। দেবু তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ফোনটার সবুজ বোতামে চাপ দিল।
‘কী ব্যাপার? তিন-তিনটে কল পুরো মিনিটভর বেজে গেল। চার নম্বর কলটাও যখন প্রায় নো-রিপ্লাই হতে যাচ্ছে, তখন এসে ফোন ধরলে। বৃষ্টির মধ্যে খুব ঘুম লাগিয়েছিলে মনে হচ্ছে!’
‘কলকাতাতেও বৃষ্টি হচ্ছে নাকি?’
‘হচ্ছেই তো। রাতে কিচ্ছু টের পাইনি। সকালে উঠে দেখি বৃষ্টিতে ধুইয়ে নিচ্ছে একেবারে। ছুটির দিনটাতেই যত বিপত্তি! ভেবেছিলাম আইনক্স ফোরামে যাব একবার। সিনেমা দেখবার প্ল্যান করছিলাম আজ দুপুরের শো-তে।’
‘সব পণ্ড হল তো? কী আর করবে? এখন বারান্দায় বসে চা খেতে-খেতে বৃষ্টি দেখো। বাড়ির সামনেটা জ্যামে ভিড়াক্কার হয়ে আছে না?’
‘তুমি তাই করছ বুঝি? ওঃ! তোমার ওখানটা এখন দারুণ দেখাচ্ছে নিশ্চয়! চারপাশে সবুজ ধূসর আকাশ থেকে নেমে আসছে বৃষ্টির ধারা! ঝড়ের মতো হাওয়া বইছে! আর তুমি বারান্দায় বসে এককাপ চা হাতে নিয়ে—’
‘বলে যাও ডিয়ার! আরো যতদূর কল্পনার চোখ চলে দেখো, আরও বলে যাও।’
‘না দেবুদা। মজা নয়। সত্যি সত্যি বলছি। ভাবো দেখি! অনেকবছর পরে, অনেক জায়গায় ঘুরেটুরে এসে আমরা আবার হয়তো ফাইনালি ইন্ডিয়াতেই সেট করেছি। বাইপাস, নিউ টাউন বা ওইরকম কোথাও, কোনো একটা হাইরাইজ ফ্ল্যাটে। ছেলেপিলে বিদেশে। তুমি আমি বুড়োবুড়ি। তখন এই বৃষ্টি দেখলে তোমার হয়তো রুরাল বেঙ্গলের আজকের দেখা এই বর্ষাটার কথা মনে পড়বে।’
দেবু হাসল, ‘ব্যাপারটা ঠিক অতটা কাব্যিক নয় বিবি। সত্যি বলতে কি, এই বৃষ্টিটা এখন আমার কাছে খলনায়ক। আমার এখন মোটেই কোনো আনন্দ হচ্ছে না। কারণ আমার পুকুর উপচে মাছ ভেসে যাচ্ছে এই মুহূর্তে। ভোর থেকে উঠে একগোড়ালি জলে ঘুরে-ঘুরে, কাদায় দু’তিনবার আছাড় খেয়ে পুকুর থেকে জল বেরোবার নালা কেটেছি। এখনো আমার গায়ে কাদা লেগে আছে। এ কাদাকে এই অঞ্চলে প্রেমকর্দম বলে। একবার গায়ে লাগলে সহজে উঠতে চায় না। মাছ পালানো আটকাতে নালার মুখে লাগাব বলে জাল নিতে ঘরে আসছি, তখন তোমার ফোন এল। লাকিলি সাধুদা বসেছিল এখানে। আমি তোমার ফোনটা অ্যাটেন্ড করছি যতক্ষণ, ততক্ষণে সাধুদা নেট নিয়ে ছুটেছে নালার মুখে লাগাতে।’
‘গড! তুমি লাইক আ লেবারার আর তারপর কাদামাখা শরীরে সোজা ঘরে উঠে এসেছ, কাদা হাতে ফোনটা ধরে আমার সঙ্গে কথা অবধি বলছ? উঃ! দেবুদা, প্লিজ ফোনটা ছাড়ো। আগে কাদা ধুয়ে সাফসুতরো হয়ে তারপর আমাকে রিংব্যাক করবে। অনেক দরকারি কথা—’
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও ফোনটা এখনি রেখো না। যতটা খারাপ ভাবছ বিবি, ব্যাপারটা কিন্তু আসলে ততটা খারাপ নয়! এখানে এসে একবার দেখে যাও কেবল। ইটস ফান!’
‘ফান! ভগবান! এ কার সঙ্গে আমায় এনে জুড়লে! বর্ষার সকালে একটা পচা পুকুরের ধারে বৃষ্টির মধ্যে কাদা মেখে গড়াগড়ি খেয়ে ফান হচ্ছে! আমায় কেউ লাখটাকা দিলেও আমি বাবা ওসব নোংরামোর ধারেকাছে নেই! ও তুমি একাই এনজয় করোগে যাও। আমার দ্বারা ওসব পোষাবে না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু দরকারি কথা কী বলবে বলছিলে?’
‘সেটা এখন নয়। আগে গিয়ে পরিষ্কার হয়ে এসো, তারপর ওসব হবেখন।’
খুট করে লাইনটা কেটে গেল। ফোনের স্ক্রিনে কল সামারি দেখাচ্ছে চোদ্দ মিনিট তিন সেকেন্ড। অনেকটা সময়। ওদিকে এতক্ষণে কী হচ্ছে কে জানে! ছাতাটা টেনে নিয়ে দেবু পুকুরের দিকে হাঁটা লাগাল।
সাধুর মাথাটা জলের ওপর দেখা যাচ্ছিল। নালার মুখটাতে পুকুরের ভেতর নেমে পড়েছে। এক হাতে নেটের ওপরের দিকটা ধরে রেখে অন্যহাতে জলের নীচে হাতড়াচ্ছিল। দেবু তাড়াতাড়ি এসে নেটের ওপর দিকটা সাধুর হাত থেকে ধরে নিয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার সাধুদা? জলে নামলে যে?’
‘নইলে স্রোত আটকানো যাচ্ছিল না যে! জলের যে টান! আপনার ফোনাফুনি শেষ হওয়া পর্যন্ত তাই জলে নেমে হাত দিয়ে জাল ধরে রেখেছি। এবারে আপনি ওপরের দিকটা বেশ টানটান করে ধরে রাখেন মাস্টারভাই। আমি নীচের দিকটা ঠিক করি। ক’টা কাঠি দেন দেখি। ওই যে ভেঙে রেখেছি।’
পাড়ে বেশ কয়েকটা সরু সরু শক্ত গাছের ডাল ভেঙে রাখা ছিল। তার থেকে শক্তপোক্ত কয়েকটা টুকরো বেছে নিয়ে সাধুর হাতে দিয়ে নেটটার ওপরের দিকটা টানটান করে ধরল দেবু। টুকরোগুলো একহাতে ধরে নিয়ে সাধু জলে ডুব দিল। ঘোলা জলের ভেতর পরিষ্কার করে কিছু দেখা যায় না। শুধু ক্রমাগত ভেসে উঠতে থাকা বুজকুড়িগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছিল, ওখানটাতে সাধু রয়েছে।
মিনিটখানেক ডুব দিয়ে থেকে ফের মাথা ভাসালো সাধু। তারপর জল থেকে উঠে বলল, ‘এবারে ওপরের দিকটাও কাঠের টুকরা দিয়ে মাটিতে ভালো করে গেঁথে দেন মাস্টারভাই। তলার আর পাশের দিকগুলো আমি করে দিয়ে এসেছি।’
মেঘের আড়ালে বেলা একটু বেড়েছে। বৃষ্টি এখনো পড়ছে টিপটিপ করে, তবে তেজ কম। ছপছপ করে জল ভেঙে ঘরের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে সাধু বলে, ‘তা সক্কাল-সক্কাল কী আদেশ হল দিদিঠাকরুনের?’
‘সে আর বোলো না সাধুদা। শহরের মেয়ে! ভাবে বুঝি গ্রামদেশে সবই শুধু সুন্দর আর মজা। তারপর পুকুরের ধারে জলে-কাদায় কাজ করছি শুনে বলে কাদা মেখে ফোন ধরেছ কেন? হাত-পা ধুয়ে এসো আগে।’
সাধু হাসছিল। প্রশ্রয়ের হাসি। তারপর বলল, ‘তাতে ভয় নেই ভায়া। বিয়ে হয়ে এলে দেখবে ক’দিনের মধ্যে সব শিখেপড়ে নিয়েছে। মেয়েজাত হল জলের মতো। যে পাত্রে থাকবে তার আকার নেবে। এখন কলকাতা শহরে আছে, এখন শহুরে। আবার এই ঈশ্বরপুরে যখন এসে থাকবে, দেখে নিও, এখানেই ঠিক মানিয়ে গুছিয়ে নেবে।’
‘কিন্তু সাধুদা, বিবি তো—’ বাকি কথাগুলো বলতে গিয়েও থেমে গেল দেবু। কী হবে এখন সাধুদাকে বলে? মে থেকে আগস্ট এই চারমাসে অনেকদূর এগিয়ে গেছে কাজটা। আর মাত্র দু’তিনটে মাস, তারপর একবার স্কুলে নোটিশ দিলে তো সবাই সব জানতেই পারবে। তাছাড়া, যদি তাদের দেশ ছেড়ে যাবার ব্যাপারটা না-ও থাকত, তবু, বিবির আজকের কথা থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার বোঝা গেছে। ঈশ্বরপুর আর বিবি, এরা মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ। যে-কোনো একটিকেই তুমি পেতে পারো অন্যটিকে ত্যাগ করবার মূল্যে। দা চয়েস ইজ ইওরস। একটা হাহাকার গড়ে উঠছিল দেবুর মধ্যে। কেন এমন হয়? কেন মেলে না অঙ্কগুলো?
দেবুর হঠাৎ এই চুপ করে যাওয়া থেকে সাধু হয়তো টের পাচ্ছিল, কোথাও কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। বারবার ফিরে-ফিরে চায় সে দেবুর দিকে। অস্বস্তিটা এড়াবার জন্য প্রসঙ্গ বদলালো দেবু, ‘তা সক্কাল-সক্কাল এ বাড়িতে কী মনে করে সাধুদা?’
‘আজ্ঞা, আমি নিজে আসি নাই। আমি এলাম চলনদার হয়ে। ক’দিন ধরেই আমার উনি গো ধরেচেন, মা ঠাকরুনকে একবার প্রণাম করে যাবেন। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এলাম।’
ঘরে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় উঠতে মা ডাকল। বলে, ‘দেখে যা এদিকে কে এসেছে তোকে দেখতে!’
সাধুর স্ত্রী মা’র খাটের ওপর, মায়ের পাশেই বসেছিলেন। এতদিন সাধুর বাড়িতে যাওয়া আসা করেছে দেবু, কিন্তু কোনোদিন সামনাসামনি তাঁকে দেখেনি। সামনে এসে দাঁড়ানইনি কখনো। কিন্তু ও-বাড়িতে গেলে প্রতি মুহূর্তেই খেয়াল করেছে, আড়াল থেকে একজোড়া চোখ বারংবার তাকে দেখেছে। সামনে না এসেও, কখনো তার যত্নের কোনো ত্রুটি রাখেননি তিনি। মা আসবার আগে, ও-বাড়ি থেকে যখন খাবার আসত, তার খাবারের প্রতিটি পদ নিজে হাতে রেঁধে, থালাবাটি সাজিয়ে পাঠাতেন। সাধুর মুখেই শুনেছে দেবু। তার পছন্দ-অপছন্দগুলো বুঝে নিয়েছিলেন খুব দ্রুত। মা আসবার পরও মাঝেমাঝেই তার প্রিয় পদগুলো রেঁধে পাঠিয়ে দেন এ-বাড়িতে।
দেবু এবারে ভালো করে চেয়ে দেখল তার দিকে। বয়স পঞ্চাশের আশপাশে। মোটাসোটা শ্যামবর্ণ মানুষটি। তীব্র বিষাদ চোখদুটিতে এসে সংহত হয়ে একটা আশ্চর্য শোভা তৈরি হয়েছে। কান্নাকাটি করেছেন খানিক আগে। সদ্য মোছা অশ্রুর চিহ্ন এখনো স্পষ্ট বোঝা যায়। দেবুর দিকে তাকিয়ে আবার নতুন করে কান্না ঝেঁপে এল তাতে। গোপন করবার কোনো চেষ্টা করলেন না মানুষটি। ফোঁটা-ফোঁটা জল চোখের সীমানা পার করে গাল বেয়ে নেমে আসছিল। ইশারায় কাছে ডাকলেন দেবুকে। সে এগিয়ে যেতে একটা মুখ খোলা প্যাকেট এগিয়ে দিলেন তার দিকে। প্যাকেটের ভেতর কিছু নতুন পোশাক ছিল। ফুলপ্যান্ট, শার্ট, গেঞ্জি। মা’র দিকে একবার চাইল দেবু। সুনন্দা ইশারায় বললেন, নিয়ে নে। তারপর মুখে বললেন, ‘তোর পুজোর উপহার। তোর এই নতুন মা দিল।’
সাধুরা চলে যাবার পর মা’র কাছে ওদের ট্র্যাজেডির গল্পটা জানতে পেল দেবু। ওর বয়েসি একটা ছেলে ছিল সাধুর। তার বিয়ের সব ঠিকঠাক, এমন সময় কী একটা অসুখ হয়ে ছেলেটা মারা যায়। অজস্র টাকাপয়সা খরচ করেও কোনো লাভ হয়নি। কলকাতার নীলরতন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানেই সে মারা যায়।
এসব বছর তিনেক আগের কথা। দেবুর ওপর বড় মায়া পড়ে গেছে সাধুর স্ত্রীর। নাকি তাকে দেখলেই তাঁর সেই মরা ছেলের কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, নিজের পেটের ছেলে, পরের ঘরের ছেলে হয়ে আবার তাঁর কাছে ফিরে এসেছে। মা হাসতে-হাসতে বলল, ‘জানিস, বলছিল, মায়া বাড়াবে না বলে গত একটা বছর নাকি তোর সামনে আসেনি কখনো! সত্যি নাকি রে? তুই কখনো দেখিসনি ওকে আগে?’
দেবু মাথা নাড়ল। সত্যিই সে দেখেনি। শুধু সাধুর স্ত্রীকে দেখেনি তাই নয়, স্নেহের এই বিচিত্র চেহারাটার সঙ্গেই তার কোনো পরিচিতি ঘটেনি কোনোদিন!
অদৃশ্য হাতগুলি এই গ্রামটির মানুষ ও প্রকৃতির অন্তঃস্থল থেকে একে একে বের হয়ে এসে আঁকড়ে ধরছিল তার সর্বাঙ্গে। এই বন্ধনে কোনো জ্বালা নেই। বরং একটা নিরাপত্তার আশ্বাস আছে! যে আশ্বাস তার জন্মভূমি ওই অতিকায় শহর তাকে কখনো দিতে পারেনি। জীবনের করাঙ্গুলিতে শর্তহীন স্নেহের এই স্পর্শ তার জীবনে এই প্রথম, ফলে অপ্রত্যাশিতও বটে। জীবনটাকে বাঘের মতো কামড়ে ধরে চেটেপুটে ভোগ করবার যে সুতীব্র কামনাটি তাকে সর্বদাই দগ্ধ করে চলেছে এতকাল, এই স্পর্শটি সেই কামনাকে ক্রমাগতই শান্ত করে আনে। আকাঙ্ক্ষাতাড়িত জীবটি এখন শান্ত হয়ে উপভোগ করে চলে সেই স্নেহময় আলিঙ্গনের নিপীড়ণকে।
প্রিয় নারীকে আলিঙ্গনের সুখানুভূতির সঙ্গে এখনো তার পরিচিতি হয়নি। হলে পরে, পরিবেশ ও মানুষের ঠাসবুনোটে গড়ে ওঠা প্রকৃতির এই নিবিড় আলিঙ্গনের সঙ্গে সে সেই অনুভূতিটির তুলনা টানতে পারত হয়তো। বুঝতে পারত, অমোঘ এই বাঁধনের হাত থেকে ছাড়া পাবার কোনো পথ নেই। ছাড়া পাবার ইচ্ছেটাই যে তার মায়ায় পড়ে ঘুমিয়ে পড়ে সুখনিদ্রায়!
‘হ্যাঁ রে দেবু, সোম মঙ্গলবার তো তোর ছুটি বললি সেদিন! শনিবার বিকেলে তাহলে তুই একবার কলকাতায় ঘুরে আসবি নাকি?’
মায়ের উদগ্রীব চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল দেবু, ‘এ-হপ্তায় হবে না মা। ছেলেদের নিয়ে এক্সকারশানে যাব প্ল্যান করেছি। গৌড়, মালদা, আদিনা আর একলাখি মিলিয়ে একটা চক্কর মেরে আসা যাবে।’
‘ওটা একটু পিছিয়ে দে না! কলকাতায় তোর একবার যাওয়া দরকার।’
চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে দেবু সুনন্দার চেয়ারের পেছনটা ধরে দাঁড়াল গিয়ে, ‘কিন্তু মা, এরপর তো পুজোর ছুটি শুরু হয়ে যাবে। তখন আর ওদের নিয়ে বের হওয়া হবে না যে! ছুটিতে এবার বাড়ি যাব তো?’
সুনন্দা সামান্য বিরক্ত চোখে তাকালেন তার দিকে, ‘তাহলে পুজোর ছুটির পরেই নয় ওদের নিয়ে গেলি! কী এমন ক্ষতিবৃদ্ধি হবে তাতে?’
দেবু মাথা নাড়ল, ‘তা আর বোধ হয় হবে না মা। সুমিতদের কোম্পানিতে আমার কাজটা হয়ে গেছে জানিয়ে ওর চিঠি এল না গত মাসে! সে তো তুমি জানো! ওরা বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জয়েন করতে। বিবি বলছিল, ওর কোন পিসতুতো দাদার ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে, তাকে লাগিয়েছে আমাদের ভিসাগুলো তাড়াতাড়ি বের করে আনবার জন্য। এর মধ্যেই হাতে পেয়েও যাব হয়তো। সেক্ষেত্রে পুজোর পরপরই, অ্যাট মোস্ট নভেম্বরের ফার্স্ট উইকেই সিঙ্গাপুরে বেরিয়ে যেতে হবে আমাদের। পুজোর পর এখানে ফেরা বোধ হয় আর হবে না। ছুটি পড়বার আগেই স্কুলে নোটিশটা দিয়ে দেব।’
‘এত তাড়াতাড়ি!’ একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন সুনন্দা। তারপর একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আচ্ছা দেবু, তোরা চলে যাবার পর আমি এই ঈশ্বরপুরেই যদি…মানে অসুবিধে তো বিশেষ কিছু হবে না! সাধুরা রয়েছে…’
দেবু হাসল, ‘তা কী করে হয় মা? আমি ছিলাম, একরকম ছিল। কিন্তু কলকাতায় দাদা-বউদি, নাতি ফেলে এখানে একা একা তুমি থাকবে, ওরা কী মনে করবে বলো তো!’
‘সে ঠিক,’ সুনন্দা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তাহলে একটা কাজ করবি দেবু? এবারের পুজোটা নাহয় এখানেই… মানে, আবার কবে আসি না আসি…’
দেবুর মনের কথাটাই কেমন করে যে সুনন্দার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল! এবার পুজোয় কলকাতা যাবার ইচ্ছে হচ্ছিল না ওর। শুধু মা’র মুখ চেয়েই তো।
‘ঠিক আছে,’ হাসিমুখে মাথা নাড়ল সে, ‘তবে সেইমতোই প্ল্যান করা যাক এসো।’
‘বিবি আবার কিছু মনে করবে না তো?’
দেবু মাথা নাড়ল, ‘এরপর তো সারাটা জীবনই পড়ে রইল ওর সঙ্গে মা! ও ঠিক আছে। আমি তবে এক্সকারশানটাও পুজোর ছুটিটার ভেতরেই সেট করে দিচ্ছি। কাছাকাছিই তো থাকে সব। শনিবার বিকেলে তবে কলকাতা চলেই যাব। এবারে বলো, কেন যেতে বলছিলে?’
‘বলছি। পুজোর বাজার কিছু করে আনতে হবে। সাধু আর তার পরিবারকে পুজোয় কিছু না দেওয়াটা খারাপ দেখাবে। আমি লিস্ট করে নিচ্ছি।’
‘ঠিক আছে। আর কিছু?’
‘না, মানে, ভেবেছিলাম, আমার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টটা ট্রানসফার করিয়ে আনব এখানে। হরিশ্চন্দ্রপুরে ব্রাঞ্চ আছে খোঁজ নিয়েছিলাম। সেটার আর তবে কোনো প্রয়োজন হবে না এখন।’
দেবুর বুকের ভেতরটা একটা মোচড় দিয়ে উঠল। আর সত্যিই তার প্রয়োজন হবে না কোনো মায়ের। আবার সেই দাদার বাড়ির ওপরতলার ঘরে ফিরে যাবে মা। হাতে আবার সেই টিভির রিমোট। সকাল-বিকেল জানালার নীচে দিয়ে ট্রাফিকের অন্তহীন চলাফেরা! শুধু, একটা কাজ বাড়বে মা’র। পিওনের জন্য রোজ দুপুরে জানালা দিয়ে চেয়ে থাকবে পথের দিকে। দেবু, বিবির চিঠি। সাগরপার থেকে উড়ে আসা ছোটছেলের স্পর্শ।
.
৪
.
শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশনের টিকিটঘরের সামনে বিবি দাঁড়িয়েছিল। ভারি সুন্দর সেজেছে আজ। আকাশি রঙের সালোয়ার কুর্তা। সঙ্গে ম্যাচিং পার্স, বিন্দি, চুড়ি, ইয়ারিং। দেবুর প্রিয় রং। লোকজন এদিক-ওদিক থেকে বেশ চেয়ে-চেয়ে দেখছিল। এমনকী টিকিট পাঞ্চিং মেশিনের পাশে চেয়ার পেতে বসে থাকা শুঁটকো মতোন পাহারাদার দুটো অবধি ঘুরে-ঘুরে দেখছিল বারবার। তাকে হাতটা ধরে সবার চোখের সামনে দিয়ে বের হয়ে আসতে বেশ মজা লাগছিল দেবুর। এত মানুষের দৃষ্টিধনটিকে তাদের চোখের সামনে দিয়ে একান্ত নিজের করে নিয়ে যাওয়া—মজা তো লাগবেই!
শ্যামবাজার মার্কেটের এই গলিটার মধ্যে এই মুহূর্তে দুটো লোকের পাশাপাশি হাঁটবার জো নেই। পুজোর কেনাকাটা চলেছে পুরোদমে। ক্রেতা, বিক্রেতা ও পণ্যের উপচে পড়া ভিড়ে তিলধারণের জায়গা নেই এখন এখানে।
একেবারে গলির মুখে এসে বিবির হাতটা ছেড়ে দিচ্ছিল দেবু। বিবি হাতটা ছাড়তে দিল না। দুহাত দিয়ে ওর ডানহাতটা ধরে দেখছিল সে। আঙুল বোলাচ্ছিল হাতটার তেলোর ওপরে। তারপর হঠাৎই প্রশ্ন করল, ‘তোমার হাতে কী হয়েছে বলো তো দেবুদা?’
‘কোথায়? কিছু হয়নি তো! হাত তো ঠিকই আছে।’
‘না, তা নয়। মানে, তুলতুলে নরম একটা টাচ ছিল তোমার হাতে। সেই সফিসটিকেটেড টাচটা মিসিং। একটা স্যান্ডপেপার টাইপের ছোঁয়া এসেছে তোমার গ্রিপে। ঈশ্বরপুরে লাঙল-টাঙলও চালাচ্ছ নাকি আজকাল?’
‘সে দুয়েকবার চালিয়ে দেখেছি। তবে ওতে যে লেভেলের স্কিল দরকার হয় সেটা আমার আর এ-জন্মে হবে না।’
‘অ্যাঁ! আর ইউ সিরিয়াস? তুমি লাঙল! জাস্ট ভাবো! হি-হি, শ্যামবাজারের দেবব্রত চৌধুরি, আলের ওপর ট্রাউজার খুলে রেখে গামছা পরে বলদের লেজ ধরে টানছে আর লাঙল ঠেলছে!’
দেবু একটু হাসল। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সাধু আর তার কৃষাণদের তাকে দেখিয়ে সেই অট্টহাসির শব্দটা তার কানে বারবার ফিরে আসছিল। লাঙলের মাথাটাকে প্রাণপণে মাটিতে গেঁথে ধরে রাখা আর সেই সঙ্গে গরুটিকে সঠিক লাইনে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া; আপাত সরল এই দুটি কাজকে বাস্তবে একসঙ্গে করে দেখাতে গিয়ে মাঠের মধ্যে তখন হিমসিম খেয়ে চলেছে দেবু।
অবশ্য বেশিক্ষণ তার হাতে লাঙল ছেড়ে রাখবার সাহস দেখায়নি বিচক্ষণ কৃষাণ। শখের চাষীর অপটু হাতে ধরা লাঙলের ফলার আঘাতে বলদের খোঁড়া হয়ে যাবার সম্ভাবনা। লাঙলধারীরও চোট পাবার ভয় আছে।
লাঙলের মুঠ কৃষাণের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে আসতে-আসতে দেবু শুনতে পেয়েছিল, তার পেছনে নীচু গলায় দুই কৃষাণের ভাববিনিময়, ‘ছাগল দিয়ে যদি হালচাষ করা যেত তবে গরুর আর কী দরকার হত বাপু? যার কাজ তার সাজে, পরের হাতে লাঠি বাজে।’
‘কিন্তু হাতটা তবে এত রাফ হয়ে গেল কী করে?’
‘লাঙল চালানো বিশেষ না হলেও আরো অনেক কাজ তো থাকে বিবি! বাগান আছে। একটা ছোট পুকুর আছে। মাটি কোপানো, আগাছা বাছা, মাচা বাঁধা, সে-সব মেনটেন করতে হয় তো!’
‘মেনটেন করবে তো একটা মালি টালি…’
দেবুর ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠছিল, ‘আঙুল নেড়ে বাগান করা তোমাদের এখানকার আইভরি টাওয়ার সোসাইটির পিটুনিয়া চন্দ্রমল্লিকা ফোটানোয় চলে বিবি। কিন্তু আমি যেখানটায় থাকি সেখানে সব কাজ লেবার লাগিয়ে ঠিকঠাক হয় না! ইভেন সকাল-বিকেল জল টেনে এনে চৌবাচ্চা ভরে রাখতে হয়। ওখানে তো আর ট্যাপওয়াটার নেই!’
‘উফ! জিভ তো নয়, যেন ছুরি চালাচ্ছে। তুমি আজকাল এত কস্টিক হয়ে যাচ্ছ কেন বলো তো দেবুদা!’ হালকা গলায় বলতে-বলতে ওর কর্কশ তালুর ওপর বিবির মাখন-কোমল আঙুলগুলি সোহাগভরা স্পর্শ দিয়ে যায়। বেশ শক্তপোক্ত চেহারা হয়ে গেছে দেবুর। শরীরের ভাষা বদলে গেছে। আগেকার সেই উদাসীন সফিস্টিকেশানটাই উধাও। বেশ একটা কাঠখোট্টা পুরুষমানুষ এখন। গাঁইয়াদের মতো ছোটছোট করে ছাঁটা চুল। জিন্সের নীচের দিকে দুটো ফোল্ড দিয়ে পরেছে। কী দ্রুত বদলে যাচ্ছে মানুষটা! তীক্ষ্ন, কড়া, মেঠো একজন পুরুষ। প্রাকৃত ভারত শেকড় ছড়াচ্ছে ওর শরীরে!
একটা অনিশ্চয়তাবোধ কাজ করতে শুরু করছিল বিবির ভেতরে। তার বাহ্যিক চেতনার অন্তরালে বসে থাকা আদিম মানবীটি ক্রমশ সতর্ক হয়ে উঠছিল। যে পুরুষটিকে ঘিরে তার বংশবিস্তারের আয়োজন, সে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়ে অন্য পুরুষে পরিণত হচ্ছে। পুরুষটির এই পরিবর্তনকে বন্ধ করা দরকার। আর তা করবার জন্য, কেন সে বদলে যাচ্ছে সেটা জানা প্রয়োজন সবার আগ।
হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে দেবুর হাতটাকে আবার সে টেনে নিল নিজের হাতের মধ্যে। পাশের স্টলে বিকিকিনি-মগ্ন এক মাঝবয়েসি মহিলার গায়ে ওর কনুইয়ের খোঁচা লেগেছে। ভুরু কুঁচকে হাত ধরাধরি করা যুগলটিকে একবার দেখে নিলেন তিনি। সেদিকে চোখ পড়ে একটু অস্বস্তি হচ্ছিল বিবির। তা সত্ত্বেও পুরুষটির হাত ধরে তার ঘনিষ্ট হয় সে। আদুরে গলায় বলে, ‘আমায় একবার ঈশ্বরপুরে নিয়ে চলো না গো দেবুদা! তোমার বনবাসের জায়গাটা একবার দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে খুব। মাসের পর মাস ছুটিছাটাতেও ওইখানেই পড়ে থাকো কাজের ছুতো করে! কী রস পেয়েছ তুমি ওখানে সেটা আমিও একবার টেস্ট করে আসি!’
দেবু খুশি হল। এটা ও আশা করেনি। বরং প্রত্যাখ্যানের ভয়ে কখনো এ প্রস্তাবটা তুলেও দেখেনি সে বিবির কাছে।
বলল, ‘কবে যাবে বলো! বেশি সময় তো আর নেই হাতে।’
‘তা ঠিক অবশ্য,’ বিবি মাথা নাড়ল, ‘তুমি বলো।’
‘পরশু আমি ফিরছি। আমার সঙ্গে চলে যাবে?’
‘উঁহু। হবে না। সুগত স্যার বুধবার দেশে ফিরছেন। আবার রোববার বেরিয়ে যাবেন। তবু ওরই মধ্যে বৃহস্পতিবার আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন। কিছু টিপস দিয়ে দেবেন ওখানকার ইউনিভার্সিটির ব্যাপারে। ওঁর জন্যেই পিএইচডি প্রোগ্রামটায় ঢুকতে পেরেছি। দেখা না করে চলে যাওয়াটা অভদ্রতা হয়ে যাবে।’ বলতে-বলতে হঠাৎ তার কাছে ঘন হয়ে এল বিবি, ‘তুমি বৃহস্পতিবার অবধি থেকে যাও না দেবুদা। একসঙ্গেই স্যারের বাড়ি গিয়ে দেখা করে আসব। তোমার সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দেব। দেখতে চেয়েছেন তোমাকে। তারপর ওদিনই রাতের বাস বা গৌড় ধরে…’
দেবু মাথা নাড়ল, ‘হবে না গো। এই ক’মাসেই অনেকটা শেকড় ছড়িয়ে গিয়েছিল ঈশ্বরপুরে। একে একে ওদিককার দায়দায়িত্বগুলোও মেটাতে হবে তো নাকি? আর তো সময় নেই বেশি হাতে!’
মুখটা শক্ত করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল বিবি। তারপর বলল, ‘কর্তব্যবোধ যত কেবল তোমার ওই ঈশ্বরপুরের বিষয়েই, তাই না? পুজোটাও এবারে কলকাতায় আসবে না। মায়ের নাম করে বলেছ, তাতে আমার কিছু বলবার নেই। কিন্তু এই দুটো দিন বেশি থেকে গেলে, আমায় আরেকটু কোম্পানি দিলে ঠিক কতটা অসুবিধে হত তোমার? কিন্তু আমার জন্য তোমার এই ঈশ্বরপুর প্রেমকে একবিন্দুও স্যাক্রিফাইস তুমি করবে না। অথচ এরপর গোটা জীবনটা তোমার সঙ্গে থাকতে হবে আমায়! তোমার প্রায়োরিটি লিস্টে ঠিক কত নম্বরে রেখেছ আমায় দেবুদা বলো তো! তোমায় আমি ঠিক বুঝি না। মাঝে মাঝে মনে হয় কিছু ভুল করছি না তো? এভাবে তোমাকে জোর করে—’
সংলাপটা একটু অস্বস্তিকর দিকে মোড় নিচ্ছিল। দেবু কথা ঘোরাল, ‘আর জাস্ট ক’টা দিন বিবি। তারপর, দেখে নিও… কিন্তু এখন এসব কথা ছেড়ে কেনাকাটার কাজগুলো শুরু করা যাক? দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
‘দেরি কোথায়? চারটে বাজে তো সবে! নাকি কোনোমতে দায় চুকিয়ে ফেলতে চাইছ?’ বিবির গলায় অভিমানের মেঘ তখনো কাটেনি, ‘তারপর পারলে আজকেই মালদার বাসে চাপবে গিয়ে, তাই তো?’
তার হাতে একটু চাপ দিয়ে দেবু হাসিমুখে বলল, ‘পাগলি! তা কেন হবে? কালকে মেনল্যান্ড চায়না যাব প্ল্যান করলাম না?’ আসলে আজকেও মার্কেটিংটা কোনোমতে সেরে ফেলে দুজন মিলে কোথাও গিয়ে সন্ধেটা কাটাবার ধান্দা করছিলাম।’
‘সিরিয়াসলি?’ বিবির মুখের মেঘ কেটে গিয়ে হাসি ফুটেছে ফের। তার মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা গভীর ভালো লাগা ছড়িয়ে যাচ্ছিল দেবুর মনে। বড় সরল মেয়েটা। বড় অল্পে খুশি।
‘কোথায় যাবে বলো?’
‘মিলেনিয়াম পার্কের দিকে একবার গেলে হয়।’
‘ধুস! পার্কে-ফার্কে ঘুরতে আমার একদম ভালো লাগে না দেবুদা। তার চেয়ে ভালো কোথাও ডিনার করতে যাবে?’
‘মন্দ নয়। চলো, আজ ফুড পয়েন্টে যাই। দারুণ ইটালিয়ান কুইজিন আমদানি করেছে নাকি। কাগজে অ্যাড দেখছিলাম। তোমায় আজ ‘সেপি রিপিয়েন’ খাওয়াব। স্টাফড কাটলফিশ!’
বিবি হাসছিল। ‘ওদিকে গ্রামে বসে মাটিও কোপাচ্ছে, আবার এদিকে ইটালিয়ান ফুড জয়েন্টেরও খবর রাখছ। তুমি ঠিক কোন নৌকোটাতে পা দিয়ে আছ বলো তো দেবুদা?’
‘দুটোতেই,’ দেবু হাসল, ‘তবে আগে মার্কেটিং। দশ মিনিট সময় দিচ্ছি। তার মধ্যে কেনাকাটা শেষ করবে।’
‘দশ মিনিট! বলে কী এ ছেলে? ওতে কী হবে?’
‘আহা, কিনবে তো একটা ধুতি-পাঞ্জাবির সেট, আর মা, সাধুর বউ আর তোমার জন্য তিনটে শাড়ি। তাতে আর ওর বেশি কত সময় লাগবে?’
‘হরি হরি! তুমি বুঝি তাই ভেবেছ? এই দ্যাখো।’ বিবি ব্যাগ থেকে একটা লম্বা লিস্ট টেনে বের করল, ‘তুমি আমায় নিয়ে মার্কেটিংয়ে বেরোবে বলে ফোন করবার পর থেকে বসে বসে লিস্টটা বানিয়েছি। ভাবলাম, পরের বছর থেকে তো আর এই ঘুরে-ঘুরে পুজোর মার্কেটিং করা হবে না, এই শেষবার। তাই একটু আশ মিটিয়ে বাজার করে নি।’
‘বিবি, আমার মানিব্যাগটা কিন্তু এখনো—’
‘অত ভারী নয়। জানি তো! আমার নিজের জন্য তোমার কাছ থেকে চাইতে পারি। তুমি দেবেও। তোমার প্রয়োজন হলে আমিও দেব। কিন্তু আমার বাড়ির লোকজনের জন্য তুমি টাকা দেবেই বা কেন? আর টাকা দিতে চাইলেও আমিই বা নেব কেন? তুমি এখনো ও-বাড়ির জামাই নও দেবুদা। শুধু তোমার বরাতের জিনিসগুলো আর আমার একটা শাড়ির দাম দেবে তুমি। বাকিটা আমি বাবার কাছ থেকে নিয়েই এসেছি। এখন চলো, শুরু করি।’
শ্যামবাজার মার্কেটে শুরু করে কেনাকাটা শেষ হল হাতিবাগান মার্কেটে এসে। দেবু বিবিকে একটা উজ্জ্বল ময়ূরকণ্ঠী রঙের শাড়ি কিনে দিয়েছে। শাড়িটা বিবির পছন্দ হয়নি। তবে সে কথাটা মুখ ফুটে বলতে গিয়েও কী ভেবে সেটাকে ফের গিলে নিল বিবি। তারপর হাসিমুখেই বলল, ‘রংটা তোমার খুব পছন্দ, তাই না দেবুদা?’
‘হ্যাঁ। আমার চোখে তোমায় শাড়িটা দারুণ মানাবে বিবি।’ এইটুক বলে দেবু একবার থামল। তারপর, একরকম হঠাৎ করেই বলে ফেলল, ‘শাড়িটা তোমার ভালো লাগেনি, তাই না?’
‘না না, তা কেন হবে? আমার তো—’
‘তুমি ঠিক বলছ না। অনেক ছোটবেলা থেকে তোমায় দেখছি বিবি। তোমার মুখটা আমার কাছে একটা খোলা বইয়ের মতো। আমি জানি, শাড়িটা তোমার রুচির সঙ্গে মেলেনি।’
পুকুরের মতো শান্ত, গভীর দুটো টলটলে চোখ চেয়ে ছিল বিবির চোখদুটির দিকে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বিবি নিজেকেই বলতে শুনল, ‘না। আমার পছন্দ হয়নি। ঠিকই ধরেছ তুমি দেবুদা।’
‘কেন পছন্দ হয়নি সেটাও আমার জানা। বলব?’
বিবি কৌতূহলী চোখে তাকাল একবার দেবুর দিকে। এই মানুষটা যে এত গভীরভাবে তাকে চেনে, তার পরিচয় সে আগে কখনো এভাবে পায়নি।
‘রংটা বড় বেশি শার্প। ডিজাইনগুলো মোটা দাগের। একটু গ্রাম্য ধরনের নকশা। তাই না বিবি?’
হঠাৎ একটা ব্যাখ্যাহীন, অর্থহীন রাগ গড়ে উঠল বিবির মধ্যে, ‘এতটাই যদি জানো, তবে কিনলে কেন শাড়িটা আমার জন্য? তোমার দেওয়া প্রথম পুজোর উপহার। অথচ—’
কেমন একটু অসহায় শোনাচ্ছিল বিবির গলা। মানুষটাকে সে ক্রমশই আর চিনতে পারছে না। এটা তার দেবুই তো?
দেবু নিজেও একটু অপ্রস্তুতই হয়ে পড়েছিল। বলল, ‘ঠিক বলতে পারব না বিবি। শাড়িটা দেখে আমার কেমন যেন মনে হল, ওতে তোমায় চমৎকার মানাবে। ঈশ্বরপুরের শিবতলা মোড় থেকে বেরিয়ে আদকপাড়ায় আমাদের বাড়ির দিকে যেতে যে পথটা, তার ডানপাশে বুনো ফুলের একটা প্যাচ আছে লম্বা। এই সময়টায় তাতে ফুল ফোটে। ঠিক এইরকম ময়ূরকণ্ঠী রং। শাড়িটা দেখে আমার সেই প্যাচটার কথা মনে পড়ে গেল বিবি। টুকটুকে নীল ফুলের স্তূপ, এলোমেলো ছড়িয়ে থাকে, লম্বাটে একটুকরো শাড়ির মতোই। তোমায় আমি আমার ঈশ্বরপুরের একটা টুকরো উপহার দিলাম বিবি। জানি তোমার রুচির সঙ্গে মিলবে না, তবু ভালোবেসে দুয়েকবার শাড়িটা পোরো।’
‘আচ্ছা বাবা, পরব। ভালোবেসেই পরব। তুমি হাতে করে দিলে, আমি না পরে পারি?’ বিবি হাসছিল। পুরুষটির ছেলেমানুষীকে প্রশ্রয় দিয়ে ভারি আনন্দ পেয়েছে সে। মনের মেঘটা কেটে গেছে তার একেবারে।
‘থ্যাংকস।’
‘ওসব থ্যাংকস-ট্যাংকস পরে দিও। আগে বলো ঈশ্বরপুরে কবে নিয়ে যাচ্ছ?’
দেবু মাথা নাড়ল, ‘এখন তো আমার সঙ্গে গেলে না। এবারে ফের একবার এর মধ্যে তোমায় নিতে আসতে মুশকিল হবে যে। আচ্ছা বিবি, তুমি নিজে নিজে চলে আসতে পারবে না? অন্তত মালদা টাউন অব্দি বাসে বা ট্রেনে করে চলে এলে আমি ওখান থেকে তোমায় নিয়ে চলে যেতে পারি। পারবে?’
বিবি মাথা নেড়ে হাসল, ‘ভালো আইডিয়া! একা একা একটা ছোটখাটো অ্যাডভেঞ্চারও হয়ে যাবে। কিন্তু মশাই আসব কবে সেটা তো বলবে?’
‘উমম…নেকস্ট উইকেই চলে এসো না! আমি বলি কি, পুজোর সময়টা ওখানেই কাটিয়ে যাও! পঞ্চমীর দিন চলে এলে, বেরিয়ে গেলে একাদশীর দিন।’
‘সে কী? গোটা পুজোটা ওখানে!’
‘গিয়ে দেখো বিবি, জাস্ট ওয়ান্স।’ দেবু আস্তে-আস্তে বলল, ‘ঈশ্বরপুর পঞ্চবটিতলায় ঠাকুর গড়া চলছে দেখে এসেছি। কী যে সুন্দর! আস্তে-আস্তে মানুষ, মূর্তি, প্রকৃতি মিলে পুজোর একটা চমৎকার আমেজ গড়ে তুলছে। কলকাতার পুজোতে ওই আমেজটা আমি কখনো পাইনি।’
বিবি একটু হতাশ মুখেই মাথা নাড়ল, ‘আমি ভেবেছিলাম, এবারে অষ্টমীর দিন সন্ধেবেলা তোমার সঙ্গে শোভাবাজারের মণ্ডপের সেই ঝাড়বাতিটার তলায় গিয়ে আর একবার দাঁড়িয়ে আসব।’
ফুড পয়েন্টের কেবিনের মৃদু আলোয় টেবিলে সাজানো খাবারের ওপারে বিবি বসে ছিল তার মুখোমুখি। ছোট্ট টেবিল। বিপরীতে বসেও নৈকট্য ঠিকই থাকে। হাত বাড়িয়ে তার কাঁধে মৃদু চাপ দিল দেবু। তারপর বলল, ‘এক জায়গায় দু’বার নয় বিবি। যে সম্পর্কটার শুরু হয়েছিল ইলেকট্রিক ঝাড়বাতির তলায় এক নাগরিক দুর্গাকে সাক্ষী রেখে, তার বর্ষপূর্তি করব আমরা কোনো এক গ্রাম্য দুর্গার মণ্ডপে, পেট্রোম্যাক্সের মৃদু আলোয়। ভালো লাগবে, দেখো বিবি! আই প্রমিস।’
হঠাৎ তার এতক্ষণের সব উত্তেজনা, ভালোবাসার পুরুষটির প্রতি সমস্ত অভিমান যেন উধাও হয়ে গেল তার বুক থেকে। যুবকটির চোখে চোখ রেখে হাসল যুবতীটি, ‘হ্যাঁ দেবুদা। ভালো লাগবে বৈ কি! তুমি সঙ্গে থাকবে যে! সারাটা জীবন তুমি এইরকমই রোম্যান্টিক থেকে যেও দেবুদা। এইরকমই খ্যাপা। তা সে আমি যতই রাগ অভিমান করি না কেন!’
.
৫
.
ঈশ্বরপুরে একটাই পুজো। পঞ্চবটিতলার মন্দিরের গায়েই একটা বড় মাঠ আছে। তার উত্তর প্রান্তে একটা পুরোনো বটগাছের গা বেয়ে গজিয়ে উঠেছে আরো কয়েকটা গাছ। বট, অশ্বথ, বেল, নিম ও একটা শ্যাওড়া গাছ মিলেমিশে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে দিব্যি এক হয়ে আছে।
এই পঞ্চবটিটির গুঁড়িতে স্মরণাতীত কাল থেকে একটা সিঁদুরের দাগ লাগা কালো পাথরের বেদি রয়েছে। কোনোকালে কোনো সাধক হয়তো পঞ্চবটিটির নীচে নিজের সাধনা করবার জন্য এই বেদিটি বসিয়েছিলেন। গ্রামের মধ্যে সাধনস্থল তৈরি হয় না। ফলে, অনুমান করে নেওয়া যেতেই পারে যে, যে সময় এই বেদিটি তৈরি হয়েছিল সে-সময় ঈশ্বরপুর গ্রাম তৈরি হয়নি।
তারপর দিন বদলেছে। নির্জন সাধনোপযোগী অরণ্যপ্রদেশ ক্রমশ বদলে গেছে গ্রামীণ জনপদে। অরণ্যকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মানুষ তার সাম্রাজ্যের দখল নিয়েছে একটু একটু করে। কেবল কালো পাথরের বেদি আর তার ওপরের পঞ্চবটিটি আগেরই মতো রয়ে গেছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র হয়ে।
ঈশ্বরপুরের বাসিন্দারা ইতিহাসের করণিক নয়। ইতিহাসকে খুঁড়ে দেখে নথিভুক্ত করবার বদলে তাই পঞ্চবটিটিকে তারা অতি সহজেই ঈশ্বরের লীলা বলে ধরে নিয়েছে। বেদিটির ঠিকুজি-কুলজি নিয়েও পণ্ডিতসুলভ উদগ্র কৌতূহল না দেখিয়ে তার নাম রেখে দিয়েছে দেবীর পাট। এ গ্রামের একমাত্র দুর্গোৎসবটি হয় এই পঞ্চবটির নীচে, ওই ‘দেবীর পাট’ নামের পাথরের বেদিটির ওপর।
অতীতে এখানে কেবল ঘটপুজো হত। সে-সময় ছোট্ট গ্রামটার পরিচয়ও ছিল ওই দেবীর পাটের নামেই। প্রায় এক শতাব্দী আগে এই দেবীর পাট তালুকটি কিনে নেবার পর জমিদার ঈশ্বর রায় এই বেদির ওপর দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি পুজো করা শুরু করেন। লোকে বলে তারই পুণ্যে নাকি ধনেপুত্রে লক্ষ্মীলাভ হয়েছিল ঈশ্বর রায়ের। কীর্তিমান পুরুষ ছিলেন তিনি। ছোট তালুকটি খরিদ করে নিয়ে, দূর দূর থেকে মানুষ এনে জঙ্গল হাসিল করে গ্রামটার পরিধি বাড়িয়েছিলেন বহুগুণ। প্রজারা পিতৃজ্ঞানে দেখত তাঁকে। গ্রামের পরিবর্তিত নামের মধ্যে দিয়ে আধুনিক ঈশ্বরপুর আজও সেই পিতৃপরিচয় বহন করে চলেছে।’
তারপর, প্রয় সত্তর বছর ধরে রায় পরিবারই এই পুজোর যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে এসেছে। স্বাধীনতার পর জমিদারি প্রথা অবসান হবার পরেও পুজোর জৌলুস কমতে দেননি ঈশ্বর রায়ের পৌত্র অহীন্দ্র। তবে উনিশশো আশি সাল নাগাদ রায় পরিবারের শেষতম বংশধর, ঈশ্বর রায়ের প্রপৌত্র যতীন্দ্রনাথ রায় পাকাপাকিভাবে এ-গ্রামের বাস তুলে নিয়ে কলকাতায় চলে যাবার পর, এই প্রাচীন পুজোটি বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলেও শেষপর্যন্ত তা টিকে যায়।
এটি যদি কেবলমাত্র কোনো প্রাক্তন জমিদার পরিবারের ব্যাক্তিগত পুজো হত, তবে হয়তো তা বন্ধ হয়ে গেলেও কারো বিশেষ আক্ষেপ হত না। কিন্তু তার বহুবর্ষব্যাপী জীবনে ঈশ্বরপুরের দুর্গোৎসব শুধু আর জমিদারবাড়ির নিজস্ব পুজো হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুজোমণ্ডপে একত্রিত গ্রামবাসীদের পংক্তিভোজন, সন্ধ্যাবেলায় যাত্রা, নাটক ও গানের আসর এই সমস্ত মিলে তা গোটা গ্রামেরই এক বার্ষিক উৎসবের রূপ নিয়েছে ততদিনে।
অতএব গ্রামবাসীরা একত্র হয়ে সিদ্ধান্ত নিল, পুজোটা বন্ধ হতে দেওয়া হবে না। ঘরে ঘরে চাল ডাল টাকাপয়সার মুষ্টিভিক্ষা সংগ্রহ করে চালু করা হল ঈশ্বরপুর সার্বজনীন দুর্গোৎসব। অনুষ্ঠানাদি যা যা হত সব সেই একই রইল, শুধু রাতে এখন দশটির বদলে দুটি মাত্র পেট্রোম্যাক্স বাতি জ্বলে এবং তা-ও জ্বালানো হয় মাত্র তিনটি ঘণ্টার জন্য। সরকারের কুটিরজ্যোতি প্রকল্পের কল্যাণে এ-গ্রামে সবে বিদ্যুৎ এসেছে। তবে সে-ও ওই নামেমাত্র। দিনে এক দু’ঘণ্টার বেশি তার জোগান থাকে না। পুজোমণ্ডপে বিজলিবাতির কথা এখনো এ গ্রামে কারো মাথায় আসেনি। তাছাড়াও, পংক্তিভোজনের খাদ্যতালিকায় মোটা চালের খিচুড়ি, ঘ্যাঁট ও চাটনি ভিন্ন আর কোনো সুস্বাদু নামের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।
এটুকু তফাত বাদ দিলে ঈশ্বরপুরের দুর্গোৎসবটি ঠিকঠাকই চলছে এখনও। পুজোর সংকল্প এখনও সেই রায়বংশের নামেই করা হয়; আর তাছাড়া পুজোর সময় অবরে-সবরে রায়পরিবারের কোনো মহিলা যদি উপস্থিত থাকেন তবে দশমীর দিনে ঠাকুর নামানোর সময়ে দেবীকে সিঁদুরদানেও তাঁর অগ্রাধিকার থাকে। কিন্তু এছাড়া এই পুজোয় রায়পরিবারের আর কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই।
এমনিভাবে ঈশ্বর রায়ের বহু আগে থেকে শুরু হয়ে, তার বংশকে অতিক্রম করেও দেবীর পাটের দুর্গোৎসব বহাল রয়েছে এই জনপদটিতে, আর, ‘যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ বজায় থাকবেও’ বলেই বিশ্বাস ঈশ্বরপুরবাসীদের।
তবে এইসব তত্ত্বকথায় ও ইতিহাসে সুবলের বিশেষ আগ্রহ নেই। এই মুহূর্তে তার কাছে একমাত্র শ্রেয় ও প্রেয় বস্তুটি হচ্ছে কিছু শুকনো ঘুঁটে। দেবীর পাট ঘিরে ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া বাঁশের মণ্ডপটির কাদায় ভরা মাটিতে কিছু শুকনো খড় পেতে একটা গদিমতো তৈরি করে তার ওপর বসে বসে সে আকাশপাতাল চিন্তায় ব্যস্ত। বারেবারেই বাইরের মেঘবিষণ্ণ আকাশটির দিকে সে উঁকি মেরে দেখে ও উত্তেজনায় বিড়িতে ঘন ঘন টান মারে। অসময়ের এই পচা ভাদুরে বৃষ্টি তার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।
গোটা পুজোর মাঠটিতে পায়ের গোছডোবা জল। একটি দিনের মাত্র বর্ষা! তবে প্রথম বর্ষায় যে জলটুকুকে তৃষ্ণার্ত মাটি একচুমুকে নিঃশেষে শুষে নেয়, শেষ বর্ষার বর্ষণতৃপ্ত ধরিত্রীর আর সেইটকু জলকেও শুষে নেবার ক্ষমতা থাকে না। বৃষ্টি শুরু হয়েছে ভোররাতে। শেষ ভাদ্রের সেই বর্ষণে তাই বেলা দশটা অবধি বৃষ্টি চলতেই মাঠ জুড়ে পায়ের গোছডোবা জল।
ঠাকুর গড়বার সরঞ্জামের অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি। হাতদুয়েক উঁচু একটা ভারা মতোন বেঁধে তার ওপরে সবকিছু জমানো আছে। কিন্তু আসল মুশকিলটা হল, সবে দোমেটে চাপানো ঠাকুর এখন সে শুকোয় কেমন করে! বারে বারে হাতের কর গোণে সুবল। আজ হল গিয়ে মহালয়া। দেবীপক্ষ শুরু হয়ে যাবে কাল থেকে। আজকের দিন তো গেল বৃষ্টিতে। ষষ্ঠীর আগে বাকি রইল তবে একুনে পাঁচটা দিন। তার মধ্যে আরেক পোঁচ মাটি, হাতপায়ের আঙুল, তারপর চুনখড়ি, তারপর রং!
অতএব অসহায়ের শেষ সম্বল প্রার্থনার পথই নিয়েছে সে গত কিছুক্ষণ ধরে। বিড়িতে টান দেবার ফাঁকে-ফাঁকে বারেবারেই সে মন্ত্রের মতো একঘেয়ে সুরে বলে চলে, ‘হেই মা দুর্গা, আমি যে পথ দেখি না মা গো! সন্তানকে রক্ষা করো মা! কালও যদি বৃষ্টি চলে তবে আর যে উপায় নাই! হেই মা, মা গো!’
সুবলের প্রার্থনার যে জোর আছে সেটার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হিসেবেই যেন, একটা বড় মানকচুর পাতা মাথায় দিয়ে জল ছপছপ করতে-করতে শংকর এসে ঢুকল। একহাতে মানকচুপাতার ডাঁটি ধরে আছে। অন্য হাতে পিঠের ওপর ফেলা বস্তাটার ঝুঁটি আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
বস্তাটার দিকে তাকিয়ে সুবলের চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। বলে, ‘পেলি শেষতক?’
‘হ্যাঁ গো কাকা। এই শংকর পাল যখন বেরিয়েছে তখন জোগাড় না করে ফিরবে না। গয়লাবাড়িতে তো ঘুঁটে অমিল। শেষমেশ কী করেছি জানো?’
‘কী?’
‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে বস্তা খুলে ধরে ভিখ মেঙেছি। বলেছি, ‘মায়ের গায়ের মাটি শুকোবার ঘুঁটে চাই। তোমরা দুটি করে ঘুঁটে ভিক্ষে দাও মা!’
হাসির ধমকে বিড়ির ধোঁয়া গলায় আটকে দমফাটা কাশি ছাড়ে সুবল। কাশে আর হাসে। শেষমেশ ভাইপোর পিঠে ভাদ্রের তাল হেন একটি কিল বসিয়ে দিয়ে বলে, ‘শেষমেশ ঘুটে ভিক্ষে! পারিস তুই শংকর! তোর হবে।’
‘হবে বলছ কাকা?’
‘হ্যাঁ রে, হ্যাঁ। হবে, হবে। এমন ফিকিরি বুদ্ধি যার মাথায়!’
শংকরের মুখ আঁধার হয়ে আসে। বলে, ‘তিন বচ্ছর ধরে শাগরেদি করছি তোমার কাছে। তবু এখনো তুলি ধরতে দিলে না। নিজের কাকা হয়ে ভাইপোরে দিয়ে শুধু মজুরবৃত্তি করাও, আবার বলছ হবে? দূর দূর, তোমার ওসব বানানো বুলিতে আমি ভুলি না।’
মাথাটা চিড়িক করে ওঠে সুবলের। যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! হাতের বিড়িটা দাঁতের ফাঁকে কামড়ে নিয়ে খপ করে শংকরের কাঁধের কাছটা চেপে ধরেছে সে। বলে, ‘লায়েক হয়েছ! তুলি ধরবা, না? এখনো হাতে ধরে ঠাকুরের আঙুল গড়তে শিখলি না ঠিকমতো, সে ধরবে আবার তুলি! কুঁজোরও শখ হয় চিৎ হয়ে শোবার, আর বামনেরও শখ হয় চাঁদে হাত দেবার! ছোঃ! পেছনে একটা লাথ মেরে দেব সোজা ঘাড়ধাক্কা, তখন গিয়ে বুঝবি।’
কিন্তু পরক্ষণেই ভাইপেটির আঁধার মুখ দেখে বুঝি দয়া হল প্রাণে। কানটা তার ছেড়ে দিয়ে একটু নরম গলায় বলে, ‘আমি ছিলাম আমার বাপের শাগরেদ। বাপের বড় ছেলে, বংশের বাতি। সেই আমাকে, তোর ঠাকুর্দা তুলি ধরিয়েছিল সাত বচ্ছর শাগরেদি করবার পর। তা-ও মোটা কাজের জন্য। চোখমুখ আঁকা সে তো আরো পরের ব্যাপার। দেবতা নিয়ে কারবার বাপ! ভালো করে না শিখে হাত লাগালে, যদি ট্যারা বোঁচা হয়ে যায় একবার তবে আগেপিছে সাতপুরুষ নরকবাস, সে কথাটা মনে রাখবা। এখন যা। ভারা বেয়ে উঠে ঘুঁটে সাজা মায়ের গায়। সাবধানে লাগাস, গায়ে পা না লাগে। আগুন দেব আমি। যা, ওঠ!’
ঝোড়ো বায়ুস্রোত বৃষ্টি মুখে করে বারবার ধেয়ে যায় গ্রামটার ওপর দিয়ে। পাঁচটি বৃক্ষের বিবিধ গড়নের পাতার মিশেলে তৈরি পঞ্চবটির সুবিশাল পত্রমুকুট সেই হাওয়া ও জলের স্পর্শে সহর্ষে এবং সশব্দে আনন্দ জানায়। আর তার নীচে, চটের পর্দায় ঢাকা মণ্ডপটির ভেতরে, দেবীমূর্তির দেহ জুড়ে ঘুঁটের আগুন জ্বেলে দিয়ে দেহটি শুকোবার জন্য অপেক্ষা করে থাকে গুরু ও শিষ্য।
.
.
রাতের বাসেই রওনা হয়েছিল দেবু। মালদা টাউনে বাস বদলে শিবতলা মোড়ে এসে পৌঁছোল যখন ততক্ষণে বেলা প্রায় দশটা বেজেছে। তবে আকাশের অবস্থা থেকে সে-কথা বোঝবার উপায় নেই। প্রায় ভোরবেলার মতোই আলো হয়ে রয়েছে। বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল সেই ফরাক্কা থেকে। এখনো তার থামবার কোনো নাম নেই।
দেবু আসতে আসতে ভাবছিল, জিনিসপত্রগুলোর কী গতি করা যায়! সঙ্গে তো একটা ছাতা অবধি নেই। কিন্তু শিবতলার মোড়ে নেমে আচমকাই একটা সুবিধে হয়ে গেল। মধু হাট থেকে ফিরছিল গাড়ি নিয়ে। এত তাড়াতাড়ি ওর ফেরবার কথা নয় অবশ্য। সারাদিন হাটে মাল টানার কাজ করে। ফেরে একেবারে সেই রাতে। তাড়াতাড়ি কেন জিগ্যেস করতে বলল, হাটের মাঠ বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। আজ আর কাজকর্ম জোটবার আশা নেই কোনো ওধারে। মধু তাই গাড়ি নিয়ে ফিরে আসছে।
তা, ওর গাড়িতে সুটকেশটা তুলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে দেবু। মধু ওকেও চেপে বসতে বলেছিল। খালি গাড়ি। এক লহমায় বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফেলত। দেবুর ইচ্ছে হল না। বৃষ্টির দিনটা ওকে ভারি টানছিল আজ।
বাস চলে গেছে অনেকক্ষণ। মধুর গাড়িটাও আর দেখা যায় না। নীচু হয়ে ঝুলে থাকা মেঘের বুক থেকে অঝোরে নেমে আসা জলধারা ওর চোখেমুখে এসে ধাক্কা মারছিল। সেই বৃষ্টির মধ্যে বড়-বড় পা ফেলে সে হেঁটে যায়। তার সারা শরীরে সন্ধানী আঙুল চালায় অবিরল বৃষ্টির ধারা।
প্রথমে একটু বাধো বাধো ঠেকছিল তার। কিন্তু সামান্য সময় পর, যে-মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভিজে গেল সে, অমনি সমস্ত জড়তা তার এক লহমায় উধাও।
এলোমেলো শক্তিমান সাইক্লোনি হাওয়া আর ফিরে চলা মৌসুমির শেষ বারিধারা, এই দুয়ে মিলে শরতের সেই পূর্বাহ্নে যে উদ্দাম উৎসবটি উদযাপন করছিল, তার একক দর্শক হয়ে নিরুদ্দেশ হেঁটে চলে যুবকটি। অন্তত সামান্য সময়ের জন্য হলেও, নিজেকে সে মুক্তি দিয়েছে তার সমস্ত বন্ধন থেকে।
আদকপাড়ার রাস্তায় পড়ে খানিকটা এগোতেই হাতের ডাইনে সেই ফুলের বিছানাটা। নীল ফুলগুলি উন্মুখ হয়ে মুখ খুলে বৃষ্টির জল খাচ্ছে। রাস্তার উল্টোদিকে একটা মজা পুকুর। তার ওপারে একটা বিশাল আমবাগান; অন্ধকার হয়ে আছে।
ফুলের প্যাচটার কাছে, কাদাজলের ওপরেই হঠাৎ গিয়ে বসে পড়ল দেবু। কেউ নেই এখন ত্রিসীমানায়। কেউ দেখতে পাবে না! আর তারপর একসময়, নিজেরই অজান্তে আস্তে-আস্তে শরীরটা এলিয়ে দিল সে সেই নীল ফুলগুলির নির্জন শয্যায়।
তার দেহের সর্বত্র ছুঁয়ে যাচ্ছে বিবির শাড়িটির মতো ময়ূরকণ্ঠী রঙের ফুল। তার দেহের অন্ধিসন্ধিতে আশ্লিষ্ট হয়ে থাকে আকাশ থেকে নেমে আসা মেঘকন্যার শীতল স্পর্শটি। প্রিয় নারী ও প্রিয় প্রকৃতি এই দুজনেরই স্পর্শকে এইভাবে একই সঙ্গে নিজের শরীরে মেখে নিয়ে পুষ্পশয্যায় রাজসুখে শুয়ে থাকে পরাক্রান্ত পুরুষটি। এর বাইরে পৃথিবীতে মানুষের আর কী-ই বা কামনা থাকতে পারে!
.
.
‘মণ্ডপ থেকে অত ধোঁয়া কীসের? ও সুবল দা!’
চেনা গলার আওয়াজ! সুবল তড়িঘড়ি উঠে চটের আবরণ সরিয়ে বাইরে মুখ বাড়ালো। তারপর খানিক অবাক গলায় বলে, ‘একি মাস্টারদাদা যে! কী হয়েছে? সারা গায়ে জলকাদা মেখে ভিজে চুপ্পুর হয়ে এইভাবে এলে কোত্থেকে?’
দেবু হাসল, ‘কলকাতা থেকে। এই ফিরছি।’
‘সে নয় বুঝলাম। কিন্তু গায়ে অত কাদা যে! কোথাও আছাড়-টাছাড় খেলে নাকি গো? দ্যাখো দেখি কাণ্ড!’ সুবল তাড়াতাড়ি উঠে এসে তার শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
দেবু হাসল, ‘ছাড়ো দেখি ওসব। কিছু হয়নি। এখন দাও দেখি, বিড়ি দাও একটা। একটু মৌজ করে নিই বাড়ি যাবার আগে।’
প্রিয়সঙ্গের প্রথম উত্তেজনাটি প্রশমিত হয়ে এসেছে তার। ঠান্ডা জলের স্পর্শে ভেতর থেকে মৃদু কাঁপুনি উঠে আসে একেকবার। সারা গায়ে তখনও লেপটে আছে বিস্রস্ত ফুলদলের নীল টুকরো। তবে সে-কথা এই মানুষটিকে খুলে বলা যাবে না। জীবনকে সে অন্য চোখে দেখে।
সুবলের এগিয় দেওয়া বিড়িটা ধরিয়ে একটুকরো কাঠ দেখে নিয়ে তার ওপরে চেপে বসল দেবু। কড়া ধোঁয়া বুকের ভেতরে একটা কোমল উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে তার। তাদের ঘিরে বয়ে চলা উদ্দাম হাওয়ায় ত্রিপলের চালকে বারংবার আঘাত করে মাঝেমাঝেই বিচিত্র সব শব্দ তুলছে। গোটা মণ্ডপটি মৃদু মৃদু দোলে সেই ধাক্কায়। আর, তার চোখের সামনে, ছাউনির নীচে অসমাপ্ত দেবীমূর্তিটি নীরবে দগ্ধ হয়ে চলে। রণরঙ্গিণী, বর্ণহীনা, বিবস্ত্রা দেবী নিজেকে আগুন ও ধোঁয়ায় আবৃতা রেখেছেন। তীব্র উত্তাপে তাঁর মৃন্ময়ী দেহের সমস্ত ক্লেদকে শুষে নেবার পর একসময় আগুন নিভবে। সরে যাবে ধোঁয়ার আবরণ। দেবীর দেহ বর্ণময় হবে। দেহে উঠবে পট্টবস্ত্র। ভীষণা ধূমাবতী নিজেকে রূপান্তরিত করবেন মা শারদায়। জনাকীর্ণ পূজাস্থলে সহস্র ভক্তের প্রণাম পাবেন যে দেবী দুর্গা, আজ এই বর্ষণসিক্ত নির্জন প্রান্তরে, কুদর্শনা খড়মাটির অবয়বটি নিজের চারপাশে পঞ্চতপা হোমের আগুন জ্বালিয়ে সেই দুর্গা হয়ে ওঠবার সাধনায় বসেছে। দেবু তাই চেয়ে চেয়ে দেখছিল।
.
৬
.
বাসটা ঢুকছে। আজকাল কলকাতা শিলিগুড়ি রুটে বেশ আধুনিক সব বাস চালু হয়েছে। ঝকঝকে লাল বর্ডার দেওয়া ইস্পাত রঙের বাস নির্দিষ্ট জায়গাটিতে এসে দাঁড়িয়ে ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ তুলে থেমে গেল। হুড়মুড় করে লোক নামছে। আধঘণ্টার স্টপেজ। সেই সময়টুকুতে খাদ্য, জল কিংবা মালদার বিখ্যাত আমসত্ব কিংবা কানসাট সন্দেশের খোঁজে লোভাতুর যাত্রীদের ইতিউতি যাতায়াত। বাসের মাথার ত্রিপল সরিয়ে মালপত্রের ওঠানামা চলছে। এখানেই যাদের যাত্রা শেষ, নেমে আসছে তাদের সুটকেশ, হোল্ড-অলের সার। সে-জায়গা ফের দ্রুত ভরে উঠছে নতুন মালপত্রের বোঝায়।
বিবি নামল একেবারে সকলের শেষে। হলদে সালোয়ার কুর্তা আর সবুজ ওড়নায় চমৎকার মানিয়েছে ওকে। কপালে তুলে রাখা রোদচশমার বিরাট দুটি কাচে বাসস্ট্যান্ডের কর্মব্যস্ততার মিনিয়েচার চলচ্ছবি।
নীচে নামিয়ে রাখা মালপত্রগুলোর মধ্যে থেকে বিবির সুটকেশটা বেছে তুলে নিল দেবু। ওজন হয়েছে বেশ।
‘কী এত ভরেছ বলো তো? ইটকাঠ নাকি?’
বিবি খানিক বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ল, ‘ইটকাঠ কেন হবে! কোন অজ পাড়াগাঁয়ে চলেছি কে জানে! ব্যবস্থা সব নিয়ে আসতে হবে না! জিওলিন ট্যাবলেট থেকে শুরু করে মশারি অব্দি সব আছে ওতে।’
‘আর তাঁবু? সেটা কি বাদ দিয়েছ, নাকি তাও একখানা নিয়ে এসেছ সঙ্গে করে?’
বিবি হাসল, ‘আহা অত সাঙ্ঘাতিক কিছু না! আসলে দু’জোড়া করে ভারি জিন্স আর স্নিকার আছে। ওতেই ওজন বেড়ে গেছে অনেকটা।’
হঠাৎ দেবু একটু চমকে ঘুরে দেখল বিবির দিকে, ‘সর্বনাশ! ঈশ্বরপুরে জিন্স আর স্নিকার? কুকুরে তাড়া করবে যে!’
হালকা হাসির প্রলেপটা মিলিয়ে গিয়ে হঠাৎ একটা অচেনা কাঠিন্য এসে ভর করল বিবির মুখে, ‘এখনো সম্পর্কটাই পাকা হল না, তাতেই পোশাকের ব্যাপারে রেস্ট্রিকশান চাপাচ্ছ দেবুদা? বিয়ের পরে তাহলে কী করবে?’
কথাটা বলে ফেলেই নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিল দেবু। একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলল, ‘না না, ঠিক তা নয় বিবি! জিন্স আর টপ-এ তোমায় দিব্যি মানায়। শাড়ির চেয়েও বেশি। সে আমি জানি। আমি শুধু বলছিলাম, স্থানমাহাত্ম্য বলে একটা ব্যাপার আছে সেটা তো মানবে?’
যেতে-যেতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে তার দিকে ঘুরল বিবি। মুখের ভাঁজগুলো কঠিন হয়েই রয়েছে তার, ‘বাজে কথা বোলো না দেবুদা। তাহলে কী পরব? কী পরলে তোমার পছন্দ হবে? হাঁটু অব্দি তোলা গাছকোমর করা জামাছাড়া অর্ধেক গা দেখানো শাড়ি? তাহলে বোধ হয় তোমার ঈশ্বরপুরিয়াদের কালচারাল শক হবে না, তাই না? জিন্স আর টপ ওর চেয়ে অনেক ভদ্র আর লেস প্রোভোকিং পোশাক দেবুদা, সেটা তুমিও জানো, আমিও জানি। আসল কথাটা তা নয়। গেঁয়ো ইস্কুলমাস্টারের হবু বউয়ের অঙ্গে জিন্স-টিন্স পাবলিক মেনে নেবে না, তাই না?’
‘বিবি শোনো—’
‘কী শুনব? আর কী বলার থাকতে পারে তোমার?’ ঝাঁজিয়ে উঠল বিবি, ‘তোমার কী ভালো লাগবে, তোমার সোশাল ইন্ডিকেটার কোনোদিকে ইঙ্গিত করছে সে-সমস্ত আমায় সবসময় মেনে চলতে হবে এমন কোনো প্রতিজ্ঞা তো আমি করিনি দেবুদা! আমার প্রোপোজাল তো তুমি কোনো শর্ত ছাড়াই অ্যাকসেপ্ট করেছিলে। তবে আজ হঠাৎ এরকম ভ্যালু জাজমেন্ট শুরু করলে কেন? নাকি পুরুষেরা এমন গিরগিটিমার্কাই হয়? সুবিধেবাদী ঢংয়ে রং বদলে ফেলে মুহূর্তে মুহূর্তে? তোমায় কিন্তু এমনটা ভাবিনি আমি।’
মুখের ভেতরটা বিস্বাদ হয়ে উঠছিল দেবুর। দোষটা তারই। তবু, কোনো প্রয়োজন ছিল কি শুরুতেই এই কটু কথাগুলি বর্ষণের! তবু সেটাই ঘটল।
হরিশ্চন্দ্রপুরের বাস ছাড়ল আরো আধঘণ্টা বাদে। এই বাসটা ঈশ্বরপুর হয়েই যায়। থ্রু বাস। স্টপেজ অনেক কম। একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছোবে। ঝগড়াটার পর থেকে বিবি সেই যে চুপ করেছে, বাসে উঠেও তার নৈঃশব্দ্য ভাঙেনি। জানালা ঘেঁষা সিটে বসে রোদচশমার ভেতর থেকে তাকিয়ে রয়েছে বাইরে ক্রমাগত সরে যেতে থাকা শরতের ল্যান্ডস্কেপের দিকে। তাকিয়ে থাকতে-থাকতে মাথাটা একটু একটু দুলছিল তার। একটু পরেই তার মাথাটা নেমে এল দেবুর ডান কাঁধের ওপর।
তার দিকে সামান্য হেলে কাঁধটাকে ওর মাথার নীচে ভালো করে রাখল দেবু। ক্লান্ত ছিল খুব মেয়েটা। কোনো ভোরে উঠে বের হয়েছে! আর এখন বেলা তিনটে। খাওয়া-দাওয়াও হয়নি বোধ হয় কিছু পথে। আর বাস-স্টেশনে নামতে না-নামতে এমন ঝগড়া করল যে দেবু যে একটু জিগ্যেস করবে কিংবা কিছু খাইয়ে নেবে সে ফুরসতও দিল না।
ছোট ছোট উষ্ণ সুগন্ধী নিঃশ্বাস ঝরে পড়ছিল তার বাহুতে। আহা ঘুমোক। একটু পরেই জেগে উঠবে একটা নতুন জগতে, যে জগতের সঙ্গে শুধু বইয়ের পাতার বাইরে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না তার কোনোদিন।
.
‘বাপ রে! এ কোথায় নিয়ে চলেছ বলো তো?’
বিবি অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখছিল। বাগান পরিষ্কার রাখবার ব্যাপারে সাধু আজকাল একটু ঢিলে দিয়েছে। ফলে বর্ষার জল পেয়ে গোটা আমবাগান জুড়ে আগাছার ভিড়। সন্ধের মুখমুখ এসে আকাশ ফের একটু মেঘলা হয়েছে। বাগানের মধ্যে দিয়ে লাল খোয়া ছড়ানো শুঁড়িপথটার দুধারে, সামনে, পেছনে গাছে-গাছে অন্ধকার।
‘এই তো এসে গেলাম। আর একটু।’
‘সেই কখন থেকেই তো শুধু একটু একটু বলে যাচ্ছ। ঠিকঠাক কথাটা বলো তো এবার! আরো কতটা যেতে হবে?’
হঠাৎ একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এদিকে ঘুরে তাকিয়েছে বিবি। তার উজ্জ্বল চোখদুটো এখন খানিক নির্জীব। মুখে, গলায় গর্জনতেলের মতো ঘাম চিকচিক করছিল সেই আধো আলোতে।
দেবু হাসল, ‘আচ্ছা প্রমিস! এবারে সত্যিই রাস্তা শেষ। সামনের বাঁকটা পেরোও। এসো, হাতটা ধরো। এখানটা খানিক পিছল হয়ে আছে। সাধুদাটা যে কী করে! বাগানটা বর্ষায় একেবারে’ বলতে-বলতে দেবু এগিয়ে গিয়ে বিবির হাতটা ধরল।
বাঁক পেরোতে তাদের বাড়িটা নজরে এল। মেঘ থমথমে আকাশে ব্যাকড্রপে লাল, হলুদ, সবুজে বড় অপরূপ শোভা ধরেছে এখন।
সেদিকে তাকিয়ে বিবির ক্লান্ত গলাটায় হঠাৎ একটু ঝিলমিলে সুর উঠল, ‘আরিব্বাস! এ যে দেখছি ফরেস্টের ভেতর একেবারে ফরেস্ট বাংলো!’
‘ধীরে ডিয়ার! ফরেস্ট বাংলোর বারান্দায় ঈশ্বরপুর ফরেস্টের বাঘিনী বসে আছে দেখতে পাচ্ছ? তোমার জন্যেই তাক করে আছে।’
বিবি একটু হেসে দেবুর থুতনিটা ধরে নেড়ে দিল একবার। সামনের ওই লাল সবুজের বাড়ি আর পাশে দাঁড়ানো মানুষটির স্পর্শ এই দুই মিলে হঠাৎ তার মুখ থেকে এতক্ষণ ধরে জমে থাকা ছায়াগুলোকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে। তারপরে বলল, ‘আমিও তাহলে বনে এসে বনবিবি হয়েছি, বুঝলে?’
‘সর্বনাশ! বাঘিনী ভার্সাস বনবিবি! আমার তাহলে কী হবে!’
‘মা ভৈঃ! আমাদের মধ্যে আগেই শান্তি স্থাপিত হয়েছে। ছোটবেলায় তো চিনতেনই, তারপর গত শীতে মাসিমা যখন কলকাতা গেছিলেন, তখন আমায় একদিন ফোন করে ডেকে এনে আলাপও করে নিয়েছেন।
‘সে কী! তোমরা আগেই!’
‘আহা, আরো আছে! আজকাল ফোনালাপে মাঝে মাঝে আমায় তিনি বউমা বলে ডাকেনও।’
‘এত দূর! ফোন বলতে তো আমার মোবাইলটা। এতকিছু ঘটে গেল, অথচ আমি কখনো ঘুণাক্ষরেও তো এসব কথা—’
‘আমাদের প্রাইভেট ব্যাপার,’ বিবি মাথা নাড়ল, ‘তোমায় বলবে কেন? তাছাড়া আমরা মেয়েরা চাইলে তোমাদের থেকে সবকিছু লুকিয়ে রাখতে পারি, বুঝলে বীরপুরুষ!’
উঠোনের সামনের জমিটা শুকনো। বিবির হাতটা ছেড়ে দিল দেবু। তারপর বলল, ‘তা ঠিক! এবারে বাঘিনী বনবিবিতে মিলন ঘটে আমায় তাড়াতাড়ি ছুটি দাও দেখি! বেরোতে হবে আবার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। বিস্তর কাজ পড়ে আছে।’
‘কাজ মানে আবার সেই ঝুড়ি কোদাল?’
‘উঁহু। এবারে অষ্টমীর রাতে স্কুলের ছেলেদের দিয়ে নাটক করাব একটা। তার রিহার্সাল আছে। সব অপেক্ষা করে থাকবে।’
‘উফ পারো বটে তুমি দেবুদা! সারাদিন দৌড়ে এসে, এবার গেঁয়ো নাটকের রিহার্সালে চললে।’ বলতে-বলতে হঠাৎ কৌতুক-তরল চোখে বিবি তার মুখের দিকে তাকাল একবার, ‘আচ্ছা, ”রিহার্সাল” শব্দটা এরা ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে শিখেছে?’
দেবু কথা বাড়াল না। বাড়িয়ে লাভ কী? জীবনবোধের দুটি বিপরীত মেরুর দিকে চলেছে দুজনে। এই বিপরীতধর্মীতার জন্যেই কি এত তীব্র আকর্ষণ? এইজন্যেই কি দলে, পিষে, নিংড়ে মানবীটিকে নিজের সঙ্গে এক করে নেবার দুর্দম একটা আকাঙ্ক্ষা তার রক্তে ছুটে বেড়ায় ঘনীভূত সুরাসারের মতো! আবার, সেই একই কারণেই কি বিবিও তাকে তার নিজের ডেফিনিশানের বৃত্তে ছিনিয়ে নিয়ে যাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে? হবে হয়তো! তার পঁচিশ বছরের অনভিজ্ঞ জীবনটি এই সমস্যাকে গভীরভাবে অনুধাবন করে একটি সমাধানসূত্র বের করবার ক্ষমতা রাখে না। এখনও আবেগের সিধে পথেই তার যাতায়াত। বিবিকে সে বড় ভালোবাসে। আবার তার পাশাপাশি, ভালোবেসে ফেলেছে সে এই ঈশ্বরপুরকেও। অথচ তার উচ্চশিক্ষিত আপাদমস্তক নাগরিক অস্তিত্বের বিধিনিয়মের নীরিখে এই দ্বিতীয় ভালোবাসাটি অবৈধ বটে।
মাত্র কিছুদিন আগেও বড় সহজেই ঈশ্বরপুর ছেড়ে তার বিবিকে নিয়ে নিজের মূল বৃত্তে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল সে। কিন্তু তারপর, তার অজান্তে এই প্রত্যন্ত ভূমিটি একটা আশ্চর্য মায়াজালে পাকে-পাকে জড়িয়ে ফেলেছে তাকে। ক্রমেই আরো জোরালো হয়ে উঠছে সেই বন্ধন। একে ছেড়ে যাবার বিষয়ে এখন আর ততটা নিশ্চিত নয় সে। ভেতর থেকে একটা বাধা আসছে তার। বিবি ও ঈশ্বরপুর, সংস্কৃতির দুই মেরুতে দাঁড়ানো এই দুটি প্রিয় বস্তুকে একইসঙ্গে কামনা করে চলেছে সে এই মুহূর্তে। তার কল্পনার রঙিন দুনিয়ায় এ-দুটি বুদবুদ অতি সহজেই মিলে গেলেও, যুবকটির অবচেতন সেই মুহূর্তে কোনো ভাষাহীন ইশারায় বারংবার সতর্ক করে দিচ্ছিল তাকে, এই দুই কামনার বস্তুর মধ্যে যে-কোনো একটিকে বেছে নেবার সময় এগিয়ে আসছে এবার।
.
বারান্দায় উঠে সুনন্দাকে প্রণাম করল বিবি। তার চিবুকে হাত দিয়ে ছোট্ট একটি চুমু খেয়ে সুনন্দা বললেন, ‘আয় আয়। সৌভাগ্যবতী হ মা!’
‘আর সৌভাগ্য! যে ছেলে আপনার মাসিমা! বিয়ের পরে না পুকুরে বাসন মাজতে পাঠায়!’
‘কী? এতবড় কথা!’ ছদ্মকোপে ভুরু কোঁচকালেন সুনন্দা, ‘কার এতবড় সাহস হবে যে আমার বউকে ও কাজ করতে বলে? বাড়ি থেকে সিধে বের করে দেবো না!’
বিবি চোখ ঘুরিয়ে দেবুর দিকে দেখল একবার। নিরাপদ আশ্রয়ে থাকব। সাধ্য কী তোমার!
সুনন্দা ততক্ষণে ছেঁড়া কথার সুতোটা আবার তুলে নিয়েছেন, ‘দেশের বাইরে শুনেছি গেরস্থালির কাজে বউদের সঙ্গে বাড়ির ছেলেরাও হাত লাগায়। যাবার আগে একে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিও বিবি। কোনোদিন তো নিজে হাতে এক গেলাস জলও গড়িয়ে খেল না।’
‘শুনলে তো দেবুদা?’ বিবি এইবার ঘুরে তাকাল তার পুরুষটির দিকে। দুষ্টুমির একটা হাসি ফুটেছে সেখানে এবার, ‘আজ থেকে তবে তোমার ফার্স্ট লেসান শুরু হোক। আজ তুমি আমাদের জন্য চা বানাবে।’
‘শিওর। যে আজ্ঞা ম্যাডাম।’ দেবু ছদ্মবিনয়ে ঘাড় নাড়ল, ‘শুধু প্রবলেমটা হল, হাউ টু!’
বিবি হাসল, ‘দৌড় বোঝা গেছে। চলো সব দেখিয়ে দিচ্ছি। তবে বানাতে হবে কিন্তু তোমাকেই।’
দুজনের চলে যাবার দিকে চেয়ে ছিলেন সুনন্দা। ঈশ্বরপুর ছেড়ে ফের শহরের সেই অপ্রিয় বাড়িটাতে ফিরে যেতে হবে তাঁকে। খুব শিগগিরই। কিন্তু সে তো ওদের জন্যই। আহা! জোড়ের পায়রা! একসঙ্গে সুখী হোক দুটিতে।
.
৭
.
‘ছেলে কাল কখন এল দিদি?
একটা ডালায় করে স্থলপদ্ম তুলছিলেন সুনন্দা। অজস্র ফুল হয়েছে এবারে উঠোনের এই গাছটাতে। ভোর ভোর উঠে তুলে না ফেললে ছেলেপুলেগুলো এসে সব লুটেপুটে নিয়ে যাবে। যাবে অবশ্য সেই পঞ্চবটিতলাতেই। তবু নিজের বাড়ির ফুল। নিজের হাতে তুলে বচ্ছরকার দিনটা মাকে দিতে পারা।
বোঁটা থেকে দক্ষ হাতে ফুল ছিঁড়তে-ছিঁড়তে তিনি জবাব দিলেন, ‘কাল সন্ধেবেলাই ফিরেছে।’
‘তোমার বউকেও এনেছে তো?’
‘হ্যাঁ। আমার ঘরে ঘুমিয়ে আছে। শহরের মেয়ে তো! এত সকালে ওঠবার অভ্যেস নেই। ফুল নেবে সীতা?’
‘সে তো নেবই! তবে চলো তার আগে তোমার বউ দেখে আসি।’
সুনন্দা একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘যাও, তবে দেখো, শব্দ কোরো না।’
নিঃশব্দ পদক্ষেপে সুনন্দার ঘরের দিকে চলে গেল সাধুর স্ত্রী। একটু পরে ফিরে এসে বলে, ‘ভাগ্যি করে এসেছিলেন বটে দিদি! মরি মরি! কী রূপ! যেন দুর্গাপ্রতিমার মুখটা অবিকল বসানো রয়েছে।’
বেলা হয়ে যাচ্ছিল। দ্রুতহাতে ক’টি ফুল তুলে নিয়ে ফিরে গেলেন সীতা। সুনন্দা ফুলে ভরা ডালাটা বারান্দায় রেখে দেবুর ঘরে গিয়ে তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকলেন একবার, ‘দেবু, একবার ওঠ তো! পঞ্চবটিতলায় গিয়ে ফুলক’টা দিয়ে আয় বাবা!’
অলস ছেলেটি তাঁর! কোনো সাড়াই দিল না। সাতটা পাঁচে পুজো শুরু। এখন ফুলগুলো পৌঁছে দিয়ে না এলে সেগুলো আর কোনো কাজে লাগবে? অতএব এবারে গলা একপর্দা চড়াতেই হল সুনন্দাকে।
বারকয়েক ডাকবার পর বিবি ঘুমচোখে উঠে এসে এ-ঘরে উঁকি দিল। বলে, ‘কী হল মাসিমা? সাতসকালে এত হই চই কীসের?’
তারপর দৃশ্যটার দিকে চোখ পড়তে বলে, ‘এই সামান্য শব্দে কি কুম্ভকর্ণ জাগে? এর জন্য কড়া দাওয়াই দরকার। এই দেখুন। বলতে-বলতে দেবুর কানের কাছে মুখটা নিয়ে তীক্ষ্নস্বরে একটা কু দিয়ে উঠল বিবি। এবারে কাজ হল। ধড়মড় করে উঠে বসেছে দেবু। চারদিকে উদভ্রান্তের মতো তাকায় আর বলে ‘কী কী হল?’
‘ফুলক’টা একটু মণ্ডপে দিয়ে আয় না বাবা!’
‘তার জন্যে এইভাবে?’
‘হ্যাঁ। এইভাবে।’ এইবারে বিবি কথা বলেছে, ‘এই না হলে তোমার ঘুম ভাঙত? মাসিমা কখন থেকে তোমায় ডাকছেন বলো তো! ডাকের চোটে আমি ওঘর থেকে ঘুম ভেঙে চলে এলাম। কিন্তু তোমার ঘুম আর ভাঙে না।’ তারপর সে সুনন্দার দিকে ফিরে বলে, ‘আমি বাথরুম গিয়ে পোশাকটা বদলে আসি মাসিমা। আমিও সঙ্গে যাব। নইলে রাস্তায় আবার কোথাও বসে পড়ে বাকি ঘুমটা পুষিয়ে নিতে পারে। একে বিশ্বাস নেই।’
দেবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গামছাটা কাঁধে ফেলে পুকুরের দিকে চলে গেল। সুনন্দা রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকলেন। আঁচ ধরে গেছে প্রায়। এখন লুচির ময়দাটা মেখে রেখে আলুর তরকারি চাপিয়ে দেওয়া দরকার। ওরা মণ্ডপ থেকে ফিরলে লুচিগুলো গরম গরম ভেজে দিলেই হবে।
ময়দায় সবে জলটা ঢেলেছেন, তখন সীতা এসে ঢুকল। হাতে একটা পুঁটুলি। বারান্দায় এসে সুনন্দা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওতে আবার কী আনলে সীতা?’
বাইরে গরম আছে। সীতা একটু হাঁফাচ্ছিলেন। ভারী শরীর। ঘেমেও গিয়েছেন ও-বাড়ি থেকে এ-বাড়ি অবধি এইটুকু রাস্তা হেঁটে এসে।
পুঁটুলিটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে একটা পিঁড়ি নিয়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে বসলেন সীতা। সুনন্দা হাতের কাজটা সারতে সারতে একটুক্ষণ অপেক্ষা করে নিয়ে প্রশ্নটা আবার করলেন।
এইবার একটু ইতস্তত করলেন সীতা। তারপর হঠাৎ তাঁর দিকে ঝুঁকে সামান্য উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দিদি, আগে বলেন, সেদিন যে আপনি বললেন, দেবু আমারও ধম্মছেলে, সে কি মন থেকে বলেছিলেন, নাকি শুধু মুখের কথা?’
সুনন্দা ময়দা ডলতে-ডলতে মুখ না তুলেই নীচুগলায় জবাব দিলেন, ‘না সীতা, মনের কথাই বলেছি আমি। দেবু আমার পেটের ছেলে। সে তো আমার ছেলে থাকবেই। তার সঙ্গে-সঙ্গে সে তোমার ধম্মছেলে হলে তাতে তোমার কোলের জ্বালা যদি জুড়োয়, আমি তাতে বাধা দেবার কে বোন? দেবু আমারও ছেলে, তোমারও ছেলে।’
‘তাহলে আমার ধম্মছেলের বউয়ের জন্য এই জিনিস ক’টা আপনাকে নিতে হবে দিদি। আমার অজয়ের বউয়ের আশীর্বাদের জন্য কিনেছিলাম। বিয়ের তারিখও সব পাকা হয়ে গিয়েছিল। তারপর কী যে হয়ে গেল।’
পুঁটুলিতে দুটো মকরমুখী বালা, একটা বেশ মোটা লকেট চেন আর একটা বেনারসি ছিল। জিনিসগুলো একঝলক দেখে পুঁটলিটা আবার জড়িয়ে দিলেন সুনন্দা। বিবি ততক্ষণে বাথরুম থেকে বের হয়ে এসে সুনন্দার ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালের টিপ ঠিক করছিল। সাদা খোলের বুটিদার ধনেখালির তাঁত আর সাদা জামায় ভারি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল তাকে। সুনন্দা ঠোঁট টিপে হেসে সেইদিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘ওই যে! যার জন্য জিনিস, তার হাতেই দিয়ে দাও বরং। নিজের জিনিস নিজে বুঝে নিক।’
বিবি একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিল। মোটাসোটা শ্যামবর্ণ মহিলাটিকে সে আগে কখনো দেখেনি। অথচ ভদ্রমহিলা কেমন অসঙ্কোচে থপথপ করে এগিয়ে এলেন তার কাছে। তারপর তার চিবুকটি ধরে শব্দ করে একটি চুমু খেয়ে পুঁটুলিটি হাতে দিয়ে বললেন, ‘তুমি আমায় চিনবে না মা। আমি তোমাদের বাড়িউলি হই। দেবু আমার ধম্মছেলে হয় মা! আজ পুজোগণ্ডার দিনে তোমার মতো রূপবতী ভাগ্যবতী মেয়ে, সে কেন গয়নাগাঁটি ছাড়া সাদা খোলের সুতির শাড়ি পরে ঠাকুরতলায় যাবে? তেমন দিন দেখবার আগে যেন আমার মরণ হয় মা! এখন এই বেনারসি আর গয়নাগুলো পরে নাও দেখি লক্ষ্মী মেয়ের মতো! তারপর জরির ঝিলিক দিয়ে, গয়না ঝমঝমিয়ে ভাগ্যবতী মা আমার ফুলের ডালাটি হাতে নিয়ে আরেক ভাগ্যবতীর থানে প্রণাম করতে যাবে, আর দেখে আমার চক্ষু জুড়োবে।’
গয়নাগুলো পুরোনো ডিজাইনের। ভারী। বেনারসিটাও বেশ ওজনদার। বেশ কয়েক পো জরি লেগেছে ওই অতসব জবরজং কারুকর্ম করতে। বিবি একটু থতমত খেয়ে সুনন্দার দিকে তাকাতে তিনি চোখের ইশারায় জানালেন, ‘পরে নাও।’
‘কিন্তু মাসিমা, আমি আজকের জন্য আমার এই সেরা শাড়িটা—’
সুনন্দার দৃষ্টিতে এবার মৃদু ভর্ৎসনা মিশল। সীতা একটু আহত চোখে একবার তার দিকে আরেকবার সুনন্দার দিকে তাকাচ্ছেন। বিবি আর প্রতিবাদ না করে পুঁটুলিটা হাতে করে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল ফের।
‘অসম্ভব! এখানে তুমি আছ কেমন করে দেবুদা? ওই উদ্ভট দেখতে মহিলা এসে বিশ্রি শব্দ করে একটা চুমু খেলেন আমার গালে। তারপর জানালেন, উনি নাকি তোমার আরেকজন মা। আর তার তালে তাল দিয়ে তোমার গর্ভধারিণী আমায় বাধ্য করলেন ওনার আনা এই ইমপসিবলি ক্লামজি জরির পোঁটলাটাকে গায়ে চাপাতে। আমার কষ্ট হচ্ছে দেবুদা। গরম লাগছে। এই শাড়িটা পরে আমার সারা গা চুলকোচ্ছে। এই রোদের মধ্যে এই বস্তুটা গায়ে জড়িয়ে আর কিছুক্ষণ থাকলে আমি মরে যাব।’
বিবি কাঁদছিল। শারীরিক কষ্টের সঙ্গে তীব্র একটা অবুঝ রাগ মিশে উত্তপ্ত জলের ধারা ফোঁটা ফোঁটা হয়ে নেমে আসছিল বেনারসিটির বুকে।
দেবুর বড় অস্বস্তি হচ্ছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিবি ঠিকঠাকই ছিল প্রথমে। মণ্ডপে গিয়ে ফুলের ডালাটা নামিয়ে প্রণাম করে ফেরার সময় দেবু বলেছিল, ‘সুপার্ব! লোকজনের মাথা একেবারে ঘুরিয়ে ছেড়ে দিয়েছ বিবি। মৃন্ময়ীকে ছেড়ে সবাই আমার চিন্ময়ীটিকেই দেখছিল বেশি। এমনকী বুড়ো পুরুতটা অবধি।’
সেই শুনে থেকেই বিবির মেজাজ বিগড়েছে। বলে, ‘ভালো পুতুল পেয়েছ আমায় তোমরা। যে যার নিজের নিজের ইচ্ছে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, তাতে আমার ভালো লাগছে কি লাগছে না তার খোঁজ কেউ নিল না। এমন কি তুমিও।’
গোটা ফেরার পথটা এই ঝড় চলবার পর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দেবু বলল, ‘বিবি, এবারে একটু থামো। বাড়ি এসে গেছে। এবারে শাড়িটা পাল্টে নাও গিয়ে। কিন্তু মা’র সামনে গিয়ে এরকম কোরো না। প্লিজ। চারটে তো মোটে দিন আর! একটু সহ্য করে যাও। নইলে মহিলা শুধুশুধু কষ্ট পাবেন।’
হিতে বিপরীত হল কথাটা বলে। দ্বিগুণ রেগে গিয়ে একেবারে ঠান্ডা মেরে গেল বিবি। বিষাক্ত, ঠান্ডা গলায় মন্তব্য করল, ‘তুমি বরং চিরটাকাল মা’কে নিয়েই কাটিও দেবুদা। স্ত্রীতে তোমার কোনো প্রয়োজন হবে না। আমার কষ্ট হচ্ছে, আমার অপমান হচ্ছে, তাতে তোমার আপত্তি নেই, উল্টে হাততালি দিচ্ছ। ওদিকে তোমার মায়ের মনে লাগতে পারে বলে আমাকে, আমার সমস্ত কষ্ট গিলে ফেলে হাসিমুখ দেখাতে বলছ? তোমার এই মুখটা আমি কখনো দেখতে পাব বলে ভাবিনি দেবুদা!’
‘বিবি, একটা তুচ্ছ ঘটনা—’
‘ঘটনাটা তুচ্ছ মানছি। ওই গ্রাম্য আধবুড়িটির ইনটেনশানটাও মন্দ ছিল না। কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে তোমার আর তোমার মায়ের যে রূপ বের হয়ে এল আজকে, তাতে আয়াম ডাউটফুল অ্যাবাউট দ্য সেফটি অব মাই বডি অ্যান্ড মাইন্ড ইন আওয়ার কনজুগাল লাইফ!’
সুনন্দা বুদ্ধিমতী মহিলা। বড়ছেলে আর তার স্ত্রীর নিয়মিত যুদ্ধের নীরব দর্শক থেকেছেন বহুকাল। আজ বাড়ি ফেরবার পর বিবি আর দেবুর থমথমে মুখ দেখে সহজেই আন্দাজ করে নিতে পেরেছিলেন, কিছু একটা ঘটেছে। ভারী শাড়ি আর গয়নায় বিবির অস্বস্তিটুকু দেখে গন্ডগোলের কারণটাও আন্দাজ করে নিতে অসুবিধে হচ্ছিল না। অতএব সুনন্দা এইবারে হাল ধরলেন। বিবিকে তাড়াতাড়ি হাত ধরে ঘরে এনে আঁচল দিয়ে কপালটা মুছিয়ে দিতে দিতে সীতার উদ্দেশে গাল পাড়েন, জেদ করে তাদের মেয়েটাকে গরমের মধ্যে কষ্ট দেবার জন্য।
বিবির ছেড়ে যাওয়া ধনেখালি শাড়িটা বাথরুম থেকে এনে ভাঁজ করে আলনায় রেখে দিয়েছিলেন। সেটা এবারে তার হাতে দিয়ে একটা পাউডারের কৌটো সঙ্গে দিয়ে বললেন, ‘শাড়ি পাল্টে গায়ে ভালো করে পাউডার ছড়িয়ে এসো বিবি। ওই বেনারসী আর গয়না আমি এক্ষুনি তুলে রেখে দিচ্ছি। আর তোকেও বলি দেবু, দেখছিস মেয়েটা গরমে কষ্ট পাচ্ছে; কোথায় ওকে একটা গাছতলায় দাঁড় করিয়ে রেখে বড়বড় পায়ে গিয়ে ফুলগুলো দিয়ে চলে আসবি, তা নয়, মেয়েটাকে টেনে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিয়ে একশা করলি। এই বুদ্ধি নিয়ে সংসার করবি তুই হতচ্ছাড়া ছেলে? একটা মেয়ে নিজের ঘরবাড়ি, আত্মীয়পরিজন ছেড়ে তোর সংসার তৈরি করতে আসবে, আর তাকে তুই তার বদলে এই সামান্য কেয়ারটুক যদি না দিতে পারিস তবে বিয়ে না করাটাই তোর পক্ষে ঠিক সিদ্ধান্ত হবে।’
সুনন্দার কথায় কাজ হল কিছুটা। দ্বিতীয়বার স্নান সেরে বিবি যখন বাথরুম থেকে তার ধনেখালি শাড়িটি পরে বের হল, তখন সে একেবারে অন্য মানুষ। খানিক আগের সেই মেঘলা মুখটার কোনো চিহ্নমাত্র নেই।
মেয়েরা বুঝি এমনিভাবেই রূপ বদলায়! কোথায় যেন একটা অনিশ্চয়তার বোধ কাজ করছিল দেবুর মধ্যে। বিবি, তার মধ্যে একটা দ্বিতীয় রূপ খুঁজে পেয়েছে। সেই সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও বিবির একটা দ্বিতীয় রূপ দেখতে পেয়েছে আজ। ভয় পাবার মতো চেহারা! ওই শান্ত, মিষ্টি মেয়েটার ভেতরে এত আগুন কোথায় লুকিয়ে ছিল? ঘৃণা করবার ও তাকে প্রকাশ করবার এত বিপুল শক্তি কোথায় পেল ও? বিবির নাগরিক জীবনবোধের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনবোধের একটা সরাসরি সংঘাত হয়ে গেছে আজ। দুটি জীবনবোধের কেউ কারো কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। অথচ বিবিকে বাধ্য করা হয়েছে মেনে নিতে। ফলত এই অগ্নি উৎগীরণ। সেটা স্বাভাবিক বটে, কিন্তু বিবির কাছ থেকে তার এতটা তীব্র বহিঃপ্রকাশ সে আশঙ্কা করেনি কখনো।
এর পরের তিনটি দিন তারা বারে বারে ফিরে গিয়েছিল পঞ্চবটিতলার সেই গ্রামীণ পূজামণ্ডপে। সেখানে প্রথম সকালের আলোয় দেবীমূর্তির সামনে পাক খেয়ে উঠে যাওয়া ধূপের ধোঁয়া, ঢাক, কাঁসরের যুগলবন্দি, অঞ্জলি দেবার সমবেত মন্ত্রধ্বনি, সব দেখেছে ও শুনেছে তারা দুজনে। দেখেছে সন্ধ্যার নির্জন অন্ধকারে হ্যাজাকের আলোয় চামর দুলিয়ে দেবীকে শীতল দান, আর তারপর, তারাভরা আকাশের নীচে, একটিমাত্র ঘিয়ের প্রদীপের আলোয় পরবর্তী দিনের জন্য একাকিনী দেবীর প্রতীক্ষা।
ময়ূরকণ্ঠী রঙের শাড়িটি পরে সেই ময়ূরকণ্ঠী ফুলের পুষ্পশয্যায় বসা বিবিকে বন্দি করেছে দেবুর ক্যামেরার নৈর্ব্যক্তিক লেন্স। শরতের স্ফটিক নীল আকাশের নীচে স্বচ্ছতোয়া মহানন্দার বুকে নৌকায় ভেসেছে তারা কতবার! পেশীবহুল বাহুর জোরে অক্লেশে দাঁড় টেনেছে দেবু, আর মহানন্দার জলধ্বনিতে মিশে গেছে বিবির গলার গানের মৃদু আওয়াজ। নদীর ধারের নির্জন বৃদ্ধ বটটি কতবারই সাক্ষী হয়েছে তাদের মধুর একান্ত মুহূর্তগুলির!
তবু, এই সমস্ত কিছুর মধ্যেও একটি মুহূর্তের জন্যও বিবি তার আসল উদ্দেশ্যটিকে ভোলেনি। নিতান্তই নারীসুলভ অনুভূতির জোরে সে ঠিকই টের পাচ্ছিল দেবুর মধ্যে ঘটে চলা একমুখি ভাঙাগড়ার স্রোতটিকে। অন্তরে-অন্তরে অনুভব করতে পেরেছিল, কী আমূল বদলে যাচ্ছে তার প্রিয় পুরুষটি! এই ঈশ্বরপুর গ্রামটি, এক মায়াবী আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলেছে তার দেবুকে। বিবির প্রতি দেবুর ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। কিন্তু, যে ভালোবাসার তটভূমিতে দাঁড়িয়ে সে তার ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্নকে তৈরি করছে, তার আপাত সুস্থির মাটির নীচে, দ্বিতীয় একটি ভালোবাসার ক্রমাগত আঘাতে একটা অদৃশ্য কিন্তু গভীর ভাঙন চলেছে। যে কোনো মুহূর্তে মাটি খসে পড়তে পারে তার পায়ের নীচ থেকে!
অথচ দেবুকে তার চাই। একান্ত নিজের করে। কোনো অংশীদার থাকতে পারবে না সেই অধিকারে। সেই নিরঙ্কুশ অধিকারের ভিত্তির ওপর, তাকে ঘিরেই গড়ে উঠবে তার জীবন। কিন্তু ভবিষ্যতহীন এই অজ গ্রামের মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ানো পাড়াগেঁয়ে মাস্টারের স্ত্রী হয়ে থাকা তার ভবিতব্য নয়। এরা তার উপযুক্ত নয়। অর্ধ আদিম এই গ্রামটি, দুদিনের আতিথ্য নিয়ে জিরোবার জন্য ভালো পল্লিনিবাস হতে পারে, কিন্তু চিরকালের বসতবাড়ি হবার যোগ্যতা তার নেই।
আজন্ম শহরে লালিত ছেলেটিরও বৈধ কর্মক্ষেত্র এই গ্রাম নয়। শহরের পথেঘাটে, ট্রামে, বাসে, সুতীব্র প্রিডেটরি জীবনসংগ্রামে তার জন্মসিদ্ধ অধিকার। সেই অধিকারেরই অংশভূতা হয়ে নাগরিকা বিবি এসেছে তার জীবনে। এ তাদের বৈধ প্রেম। আর তাই কি গ্রামজীবনের প্রতি অনধিকারী অ-বৈধ প্রেমে পুরুষটি পেয়েছে পরকীয়ার তীব্রতর আস্বাদ? তাই কি বিবিকে ছেড়ে ক্রমাগতই এই গ্রামটির অচঞ্চল, পরিবর্তনহীন, নিশ্চল জীবনের দিকে তার ভেসে যাওয়া?
সেই আভাস পেয়ে নারীজীবটি আর বিলম্ব করে না। তার প্রকৃতিদত্ত সমস্ত আকর্ষণের জাল বিছিয়ে ধরে পুরুষপ্রাণীটিকে ঘিরে। আর আনন্দময় নৈকট্যের সেই জাদুমুহূর্তগুলিতেই পুরুষটির কানে ক্রমাগত ঢেলে দেয় মেহেরদির কথাগুলি, ‘আর মাত্র ক’দিন! বলো! তারপর তোমার বনবাসের ছুটি। এই গ্রাম, এই দেশ ছেড়ে অনেক, অনেক দূরে। শুধু আমরা দুজন! আর কেউ নয়! কোনো বাধা নেই, কোনো আড়াল নেই।
‘ভাবো একবার! হয়তো মাটি থেকে অনেক উঁচুতে, প্রায় আকাশের গায়ে আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাট! সি-ফেসিং। কোম্পানির দেওয়া। সন্ধেবেলা কাজ সেরে ফিরব দুজন! তারপর কোনো ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁয় রাতের খাওয়াটা সেরে নেওয়া! একটু উইন্ডো শপিং! তারপর ঘরে ফেরা। আমাদের নিজেদের ঘর!
‘উইকএন্ডে সমুদ্রতীর। নীল জল, স্বর্ণাভ বালি, উদ্দাম স্নানরঙ্গ খোলা আকাশের নীচে।
‘তুমি গ্রেট দেবুদা। নইলে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে এখানকার এই অবটিউস লোকগুলোকে দিনের পর দিন সহ্য করে চলা সম্ভবই হত না। কী করে পারো তুমি দেবুদা! জানি বেকার ছিলে, তাই এই চাকরিটা নেবার মতো একটা ড্রাস্টিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল তোমায়। কিন্তু তারপর, পুরো দেড় বছর ধরে তুমি এই পরিবর্তনহীন প্রিমিটিভ জায়গাটাকে হাসিমুখে স্ট্যান্ড করে চলেছ, এটা যে কতবড় কঠিন কাজ।’
প্রথমদিনের সংঘাতটির পরই দেবু ঠিক করে নিয়েছিল, বিবির কোনো কথার প্রতিবাদ সে করবে না এই ক’টা দিন। পুজোর আনন্দটা নষ্ট হয়ে যাক তা সে চায়নি। কিন্তু বুকের ভেতর ভাঙনটা চলছিলই। বিবির প্রতিটি কথা, হাতুড়ির একেকটা ঘায়ের মতো তাকে ত্বরান্বিত করছিল মাত্র।
বিবি ভুল বলে না একটা কথাও। তার দেখানো এই স্বপ্নগুলো তো সে-ও জেনে, বুঝে ও শিখে এসেছে তার কৈশোর উন্মেষের পর থেকেই। বেকারত্বের প্রথম দিনগুলোতে কোনো উপযুক্ত কাজের সন্ধান না পেয়ে যখন ভেতরে ভেতরে একটা অবসন্নতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল, তখন, এই চাকরিটাকে তো সে নিয়েছিল তার মাতৃনগরীর প্রতি একবুক অভিমান নিয়েই! গ্রামের প্রতি নগরবাসীর দৃঢ়মূল অবজ্ঞা ও অবিশ্বাসের ভিত্তিটি বুকে নিয়েই তো তার ঈশ্বরপুরে আসা!
কিন্তু এই ঈশ্বরপুর যে তার কী করল! নিঃশর্তে, বিনাপ্রশ্নে দু’হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিল তাকে। আশ্রয় দিল, নিরাপত্তা দিল, সম্মান দিল। আর তারপর, গত দেড় বছর ধরে এখানকার পরিবর্তনহীন, পুকুরের জলের মতো শান্ত, স্থির জীবন আর তার মধ্যে ডুবে থাকা আর্যসংস্কৃতির সংস্পর্শহীন মোটা দাগের মানুষগুলো তাকে যে কী কঠিন বাঁধনে বেঁধেছে, তা সে নিজেও টের পায়নি। টের পেল তখন, যখন সেই বাঁধন ছেঁড়বার জন্য টান মারল বিবি এসে।
বিবির সে টানে ভালোবাসার অমোঘ শক্তি ছিল। তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে, ঝোঁকের মাথায় চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়েছিল সে বিবির নির্বাচিত বহুজাতিক সংস্থাটির অফিসে।
কিন্তু তার পর থেকে যত দিন কেটেছে ততই তাকে ঘিরে দ্বিতীয় ভালোবাসার বাঁধনটিকে আরো শক্ত করে তুলেছে ঈশ্বরপুর। তার জল, মাটি, আকাশ, বাতাস, তার মানুষজন… এই সবকিছু মিলে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরেছে তার গোটা অস্তিত্বটাকে। নিজের অজান্তে, প্রতিদিনই একটু একটু করে এই বন্ধনের অমোঘ শক্তিকে মনে মনে স্বীকার করে নিচ্ছিল দেবু। একটা আত্মসমর্পণের পালা চলছিল তার চেতনার গভীরে।
সেই আত্মসমর্পণের স্বীকারোক্তিটা অবশেষে তার মুখ ফুটে বের হয়ে এল ভাসানের দিন সন্ধ্যায়। সেদিন, প্রতিমা নামাবার সময় সিঁদুর খেলার আসরে বিবিকেও টেনে নিয়ে গিয়েছিল অন্য মেয়েরা। প্রথমে একটু সঙ্কোচ হলেও খানিক পরে বিবি নিজেও মেতে গিয়েছিল যৌবনের সেই উদ্দাম খেলায়। ফিরে যখন এল, গায়ে, মুখে, নাকে সিঁদুর মেখে চেনা যাচ্ছে না আর তাকে।
পঞ্চবটিতলা থেকে ভাসানের দলের সঙ্গে-সঙ্গে ওরা চলে গিয়েছিল মহানন্দার পাড়ে। শেষ সূর্যের গাঢ় লাল আলোয় মাখামাখি নদীটির জলে প্রতিমা ভাসিয়ে নৌকোদুটো অনেকক্ষণ ফিরে এসেছে পাড়ে। উৎসবক্লান্ত মানুষেরাও ঘরে ফিরে গেছে। অন্ধকার নেমে আসা ফাঁকা ঘাটে তখন শুধু ওরা দুজন।
জলের দিকে চোখ রেখে বিবি আনমনে বলল, ‘এই তো শেষবার ভাসান দেখা আমাদের। আবার কবে পুজোর সময় দেশে থাকব কে জানে!’
খানিকক্ষণ কোনো জবাব দিল না দেবু। তারপর হঠাৎ মহানন্দার ছুটন্ত জলের দিকে স্থির হয়ে থাকা চোখদুটো বিবির দিকে ঘুরিয়ে ধরে, তার হাতদুটিকে নিজের কর্কশ মুঠিতে বড় আদরে জড়িয়ে নিয়ে সে প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘বিবি, শুধু তুমি একটিবার চাইলেই এমনি করে হাত ধরাধরি করে বছরের পর বছর এইখানে বসে আমরা এই ছবিটা দেখে যেতে তো পারি! চাইবে বিবি? আমার ঈশ্বরপুরে, আমার সঙ্গে থাকবে তুমি?’
শিউরে উঠে তার দিকে ফিরে তাকাল বিবি। যে মুহূর্তটার ভয় সে শ্যামবাজারের সেই সন্ধেবেলায় তার পুরুষের হাতের কর্কশ স্পর্শ পাবার পর থেকে নিজের অজান্তেই পেয়ে এসেছে, এই মাটিতে পা দেবার পর থেকে যে মুহূর্তটিকে নির্বাসন দেবার জন্য তার এত চেষ্টা, অবশেষে এ-ভ্রমণের সবচেয়ে মধুর সময়টিতেই তা এসে তাদের সামনে দাঁড়িয়েছে। চেতনার গভীরে সে টের পাচ্ছিল, একটা সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে এবার। একদিকে তার নিজের জীবন, স্বপ্নের ভবিষ্যৎ, আর অন্যদিকে…
একটুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল বিবি। তারপর মাথা নেড়ে নীচুগলায় বলল, ‘তা হয় না দেবুদা। তা সম্ভব নয়। সেটা তুমি ভালোই জানো।’
খানিকক্ষণ তার হাতটা ধরে থেকে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল দেবু। তারপর আনমনে, যেন স্বীকরোক্তি করছে এইভাবে বলল, ‘এই ঈশ্বরপুর ছেড়ে আমার আর যাওয়া হবে না বিবি।’
যে সত্যিটাকে তার চেতনা অনেক দিন ধরেই একটু একটু করে অনুভব করতে পারছিল, কিন্তু যেটাকে সে সত্যি বলে স্বীকার করতে চায়নি একবারও, হঠাৎ করে তা এইভাবে সামনে এসে দাঁড়াবে তা বিবির কল্পনায় ছিল না। আঘাতটার আকস্মিকতা একটা উত্তপ্ত ছুরির মতোই তার বুকে এসে বিঁধছিল যেন। কোথাও একটা তীব্র অপমানের ধাক্কা লাগছিল বুকের ভেতর। তাকে উপেক্ষা করে এই যুবকটি…
‘তাহলে, কেন তুমি আমায়…’
কথাটা অর্ধেক বলে মাঝপথেই থেমে গেল বিবি। কথার সাধ্যের সীমানার বাইরে রয়ে গেছে দেবুর যে অধরা জবাবটি সেটিকে অন্তরে অন্তরে ঠিকই অনুভব করে নিয়েছে সে। হেরে গেছে বিবি। মৌখিক জবাবের ফর্মালিটিতে আর তার কোনো প্রয়োজন নেই। গত প্রায় দেড় বছর ধরেই নিঃশব্দে যে টানাপোড়েন চলেছে তার ও তার নির্বাচিত এই পুরুষের মধ্যে, এইমুহূর্তের সংক্ষিপ্ত সংলাপটি তার অন্তিম রায়। এর ওপর আপিল চলে না কোনো।
অন্ধকার হয়ে আসছিল। বিবি উঠে দেবুর পাশে এসে দাঁড়াল ‘চলো দেবুদা, ফিরি। কালকে আমায় মালদা টাউনে বাসে তুলে দিয়ে আসবে তো?’
‘বিবি আমি—’
বিবি, দেবুর ঠোঁটে দুটো আঙুল ছোঁয়াল, ‘থাক, বোলো না। কী হবে শুনে? ভালো থেকো। সুখী থেকো তুমি।’
.
বাসের নাম ‘যাত্রা’। প্রাইভেট বাস। বেশ গদিটদি আঁটা। হরিশ্চন্দ্রপুর-মালদা টাউন রুটে নতুন নেমেছে। এ সময়টায় ভিড় বিশেষ নেই। লক্ষ্মীপুজো অবধি এরকম ফাঁকা ফাঁকাই যাবে। ফলে মাঝরাস্তায় ঈশ্বরপুর থেকে উঠলেও সিট পেতে অসুবিধে হয়নি। জানালার পাশে পাশাপাসি দুটো সিটে বসে মানুষদুটো ফিরে চলে। জানালা দিয়ে হু হু করে বয়ে আসা হওয়ায় গরম ভাব থাকলেও কোথায় যেন আসন্ন হেমন্তের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। শৈত্যের ঘ্রাণ, শূন্যতার ঘ্রাণ।
এ-পথে মাত্র ক’দিন আগে যখন তারা এসেছিল, তখন ক্ষণে ক্ষণে রাগ ও অনুরাগের লেনদেন চলেছিল বারংবার। বিপরীতমুখী দুটি রসের টানাপোড়েনে ক্রমেই গাঢ়তর হয়ে উঠেছিল সম্পর্কের রসায়ন। আজ ফিরে যাবার পথে, তাদের ভাববিনিময়ে সেই ওঠাপড়ার চিহ্নমাত্র নেই। নিরবচ্ছিন্ন বিষাদ তার শান্ত শ্যামল ছায়া ফেলেছে দুজনেরই মুখে। কোনো কথা না বলে, একে অন্যের হাতটি জড়িয়ে ধরে বসে ছিল তারা দুজন।
মালদা টাউন বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি গিয়ে যখন পৌঁছল, কলকাতাগামী স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাসটি তখন রওনা দেবার জন্য তৈরি। একবারও আর পিছু ফিরে চাইল না বিবি। দেবু যখন ক্লিনারদের দিয়ে তার বাক্সটি বাসের ছাদে তোলাচ্ছে, তখন ভেতরে গিয়ে, উল্টোদিকের একটা জানালা বেছে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল। এই মেঘলা বিকেলেও চোখ থেকে রোদচশমাটা সে একবারও খোলেনি গোটা পথটাতে। এখনো, বাসের মধ্যেকার আধো অন্ধকারে তার চোখে সেই কপাল ছাপানো অন্ধকার চশমার রাজত্ব।
.
.
ঈশ্বরপুর এসে পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত ন’টা বাজল দেবুর। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গিয়ে ঝকঝকে তারা উঠেছে। দুকূলবিসারী ছায়াপথের নীচ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ তার চোখ গেল সেদিকে। বিবি ছায়াপথ দেখতে বড় ভালোবাসে। এই ক’দিন প্রতি রাতেই খানিকটা সময় ওইদিকে চোখ তুলে বসে থেকেছে। বলত পথটা কী বিশাল লম্বা জানো দেবুদা? এপার ওপার তিরিশ হাজার আলোকবর্ষ। আমার জীবনে তো হবে না, হয়তো আমাদের নাতিনাতনিরা বা তাদের পরের কেউ কোনোদিন এই পথটা ধরে।
আদকপাড়ায় ঢোকবার মুখে মজা পুকুরটার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল দেবু। প্রায় শুকিয়ে আসা কাদামাটির ওপর দিয়ে এখনো কিছু দূর দূর ইট পাতা। অন্ধকারে সে-সব বুঝে নিতে এখন আর অসুবিধে হয় না তার। মজা পুকুরের বুকে হিঞ্চে কলমির দাম। তাদের মাথায় মাথায় অজস্র জোনাকি ফুটে আছে। উড়ছে, দুলছে, নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে আলোগুলো। বারেবারে গড়ে, ভেঙে আবার নতুন করে গড়ে তুলছে আলোর প্যাটার্ন। ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙেদের মিহি ও মোটা শব্দে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ভেঙে চৌচির। এই সবই ওদের মিটিং কল। তলপেটে ফসফরাসের আলো জ্বেলেই হোক কিংবা ডানায় পা ঘষে কি ভোকাল কর্ডে কম্পন তুলে শব্দ তৈরি করেই হোক, সঙ্গিনীদের কাছে মিলনের ডাক পাঠাচ্ছে তারা। অমোঘ সে আহ্বানের কাটান নেই। সাড়া আসবেই তার জবাবে।
দেবুর ভারি বিষণ্ণ ঠেকছিল এইখানটাতে দাঁড়িয়ে। বিদায় দেবার আগে, একটা বারের জন্যও বিবিকে জোর করে চেপে ধরে তো সে বলেনি, তোমাকে আমার চাই! তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না! তুমি চলে যেও না! তোমার সমস্ত কিছুর ওপর আমার অধিকার রয়েছে! হয়তো সে জোর করে বললে…হয়তো এখনো সময় আছে…।
বিবি এখন কোথায়? কৃষ্ণনগরের কাছাকাছি কি? ওখানে টাওয়ার পাওয়া যাবে। ফোনটা বের করে তার ব্যাকলাইটের আলোয় বোতামগুলির ওপর দ্রুতসঞ্চারে আঙুলগুলি নড়ে চলে তার। নাইন, ফোর…।
রিং হচ্ছে। এক একটি মুহূর্ত যেন এক একটি যুগ! তবু, যুগেরও অন্ত হয়। এক সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে তার কানে ধরা মোবাইলে শোনা গেল সেই বার্তাটি দ্য রেসিপিয়েন্ট ইজ কারেন্টলি নট রেস্পন্ডিং, প্লিজ ট্রাই এগেইন লেটার।
সুইচ বন্ধ করে দেওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল দেবুর মুখে। বিভাজন সম্পূর্ণ হয়েছে। শুধু বিবি নামের মেয়েটির সঙ্গেই নয়, তার গোটা জগতটির সঙ্গেই এই মুহূর্তে অ্যালিয়েনেশান সম্পূর্ণ হল তার।
ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবার এই মাধ্যমটারই বা তবে আর কী প্রয়োজন? একটুক্ষণ থেমে দাঁড়িয়ে থেকে ফোনটাকে এক ঢিলে পুকুরের মাঝখানটাতে ছুড়ে দিল দেবু। ওখানে খোলা জল আছে বুঝি একটুকরো! টুপুস করে শব্দ হল একটা।
এখান থেকে কিছুটা দূরে, আমবাগান পেরিয়ে তার ছোট্ট, আলোজ্বলা বাড়িটা, তার ঈশ্বরপুরের মাঠ ঘাট আকাশ পুকুর, তার ধর্মপিতা ও ধর্মমাতা সকলেই তাকে দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছিল নিজেদের কাছে। এই তার আসল জায়গা!
দেবু আর পিছু ফিরে চাইল না।
বহুদূরে, ঈশ্বরপুর থেকে ক্রমাগত কলকাতার দিকে সরে যাওয়া যন্ত্রযানের একটি অন্ধকার আসনে বসা ক্লান্ত, বিষণ্ণ এবং ঘুমন্ত একটি মেয়ে জানতেও পেল না, অবশেষে সেই ডাকটি এসে পৌঁছেছিল তার দূরভাষে, পুরুষের যে আহ্বানে সাড়া দিতে বাধ্য থাকে প্রকৃতি।
এখন থেকে মাত্রই কয়েকঘণ্টা পরে, গন্তব্য শহরটিতে পৌঁছে যখন সে চোখ মেলবে, হয়তো চোখে পড়বে তার দূরভাষের পর্দায় ভেসে ওঠা বহু পরিচিত দশ অঙ্কের সংখ্যাটা। কিন্তু ততক্ষণে বড় দেরি হয়ে গেছে। যে গ্রহের যুগ্মগ্রহ হয়ে সে একদা নিজের জীবনকে সাজাতে চেয়েছিল, তার বড় প্রিয় সেই গ্রহ ততক্ষণে কক্ষচ্যুত হয়ে চলে গেছে কোনো এক দ্বিতীয় সূর্যের কক্ষপথে।
