ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – ১

প্রথম পর্ব

আজকের দিনটা ভারি মেঘলা। কলকাতায় বৃষ্টি চলছে। গত তিনদিনে নাকি ছ’শো মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে দেবব্রত ওরফে দেবুর বেশ আনন্দ হয়। পকেটে পয়সা থাকলে যে-কোনো একটা ট্রামে উঠে জানালার পাশে একটা সিট বেছে নিয়ে বসে পড়লেই হল। ট্রামরাস্তাগুলো কংক্রিটের হবার পর থেকে আজকাল তো ট্রামে চড়লে মনে হয় ফরেন গাড়িতে উঠেছে। এত স্মুদ! অথবা, অঝোরে বৃষ্টির মধ্যে জোব চার্নকের মসোলিয়ামের ভেতরের চাতালে বসে বসে সিগারেট খাওয়া! ইচ্ছে হলে ঘুমিয়েও নেওয়া যায় হাত-পা ছড়িয়ে। তবে জায়গাটাতে প্রেমিক-প্রেমিকার ভয় আছে। হঠাৎ জেগে উঠলে বিপজ্জনক কোনো দৃশ্য দেখে ফেলবার চান্স থেকে যায়।

তবে বর্ষার দুপুরে নিতান্তই যদি ঘুমুতে ইচ্ছে যায় তবে হাইকোর্টের চেয়ে উত্তম স্থান আর নেই। বৃষ্টির দুপুরে এই তিন নম্বর কাজটা করতেই দেবুর সবচেয়ে ভালো লাগে। হাইকোর্টের দোতলায় উঠে, এদিক-ওদিক যে-কোনো একটা হিয়ারিং রুম বেছে নিয়ে তার সবার পেছনের বেঞ্চে বসে চোখদুটো বুজে ফেললেই হল। এজলাস একেবারে শেষ হওয়া অবধি কেউ কিছু বলবে না। শুধু দুটো রেস্ট্রিকশান আছে। মোবাইল সঙ্গে থাকলে সেটা ভাইব্রেশান মোড-এ রাখতে হবে। সুইচ অফ করে দিতে পারলে আরো ভালো। আর, দুই, নাক ডাকা চলবে না। দেবু দেখেছে, হিয়ারিংয়ের সময় মোবাইল বা নাক এদের যে-কোনো একটার শব্দ কানে গেলে কোর্টরুমে সবাই কেমন যেন খেপে ওঠে। অনেকটা, ষাঁড়ের লাল কাপড় দেখবার মতো। সেক্ষেত্রে সটান ঘাড়ধাক্কা, কিংবা তার চেয়েও বাজে কিছু হয়ে যেতে পারে।

 বৃষ্টির দুপুর ঠিক কী কী ভাবে কাটানো যেতে পারে সে ব্যাপারে নিজের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা থেকে দেবু একটা বই লিখবে ঠিক করেছে। বই না হলেও অন্তত একটা বড় প্রবন্ধ। তাতে কলকাতার প্রত্যেকটা বিখ্যাত আর কুখ্যাত জায়গায় বৃষ্টির দুপুর উপভোগ করবার প্র্যাকটিক্যাল অভিজ্ঞতার বিবরণ এবং ডু’জ অ্যান্ড ডোন্ট’স থাকবে। হাইকোর্ট, বাবুঘাট, ভিক্টোরিয়া, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, চিড়িয়াখানা, মায় নিক্কো পার্ক, নলবনে ইস্তক কীভাবে কম খরচে অথচ বেশি আনন্দে সময় কাটানো যেতে পারে বৃষ্টির দিনে, তার জন্য প্রয়োজনীয় টিপসও থাকবে তাতে।

যেমন, নিক্কো পার্ক। ওখানে গেটের ঠিক সামনের স্টলগুলো থেকে সিগারেট কেনা একদম উচিত নয়। গোটা প্যাকেট ছাড়া বেচবে না। তাতে আবার ছোট গোল্ডফ্লেক পঞ্চান্ন টাকা। বৃষ্টির দিনে তেমন খদ্দের বুঝলে ষাট-পঁয়ষট্টিও চেয়ে ফেলে। অথচ সামান্য একটু এগিয়ে, রাস্তায় উঠে ডিভাইডারের পাশের দোকানগুলোয় গেলেই কিন্তু সেই সাড়ে পাঁচ টাকা পিস ছোট গোল্ডফ্লেক!

 আবার কালীঘাট বা দক্ষিণেশ্বরের কাছে এইরকম দিনে কোনো ফরেনার পাকড়াতে পারলে মোটা আয় করা যায়। বৃষ্টির দিন হলে, জলকাদার বহর দেখে এদের অনেকেই ভয়ের চোটে কলকাতার রাস্তায় বেশি ঘুরতে চায় না। যে স্পটে আছে সেটাই ভালো করে দেখে। দেবু দেখেছে, সাহেবরা বেশ কালীভক্ত হয়। মন্দির দেখাতে দেখাতে মা কালী নিয়ে গণ্ডা-গণ্ডা লোম খাড়া করা গল্প বলে যেতে পারলেই হল। যাদবপুর থানার কাছে বগলামুখীর একটা ছোট্ট মন্দির আছে। সেটা দেখিয়ে ও তার গল্প শুনিয়ে এক মেমসাহেবের কাছ থেকে দেবু ক’দিন আগে দুটো পাঁচশো টাকার নোট আর একবেলার লাঞ্চ ম্যানেজ করেছিল। গল্পগুলো অবশ্য একেবারেই নিজে নিজে বানিয়ে বলেছে। তবে তাতে দোষ নেই। অরিজিন্যালগুলোও তো বানানোই। ক’দিন আগে আর ক’দিন পরে বানানো এই যা তফাত।

মেমসাহেবের দেওয়া হাজার টাকাটার কথা মনে পড়তেই দেবুর হাত চলে গেল ট্রাউজারের পকেটে। এখনো ওর থেকে কড়কড়ে চারটে পাত্তি বাকি রয়ে গেছে। জয়া-তে আমির খানের একটা নতুন ফিল্ম নেমেছে। দেখা যেতে পারে।

খানিক ভেবেচিন্তে দেওয়ালের কোণে রাখা ছাতাটা নিয়ে দেবু নিজের ঘর থেকে বের হল। ওঘরে মা ঘুমুচ্ছে। দাদা, বউদি দুজনেই অফিসে। ফিরতে ফিরতে আজ দুজনেরই রাত আটটা বাজবে। বউদি জেনারেলি বিকেলের মধ্যে বাড়ি ঢুকে যায়, কিন্তু আজ দাদার অফিসে গিয়ে সেখান থেকে কোথায় যেন যাবে দুজনে মিলে। একটা লিস্ট রেখে গিয়েছিল অফিসে বেরোবার আগে। ফ্রিজের ওপর, লিস্টের কাগজটা দিয়ে মুড়িয়ে টাকাও রেখে গেছে চাবির গোছা চাপা দিয়ে। জিনিসগুলো দেবুর এনে রাখবার কথা।

মোড়ক খুলে ভেতরের টাকাটা একবার দেখে নিল দেবু। পাঁচশো দিয়েছে বউদি। লিস্টে চোখ বুলিয়ে বোঝা গেল, যা মালপত্র আছে তাতে ম্যাক্সিমাম চল্লিশ টাকা মতো প্রফিট থাকতে পারে। জয়াতে টিকিট কত করে করেছে তার ওপর ডিপেন্ড করবে, পকেটের পাত্তিতে কতটা হাত পড়বে! বুক মাই শো-তে গিয়ে দামটা দেখে নেওয়া যায় অবশ্য, কিন্তু বৃষ্টি পড়লেই এখানে নেট কানেকশানের যা দশা হয় তাতে সাইটটা পর্দায় নামবার আগে ও হলে পৌঁছে যাবে নির্ঘাত। অতএব, লিস্টসহ টাকাটা পকেটস্থ করে দরজা খুলে বের হল দেবু।

.

সিনেমাটা বেশ জমজমাট ছিল। তিনটে ঘণ্টা যেন হাওয়ায় উড়ে গেল একেবারে। বেরিয়ে দেখা গেল বৃষ্টি-টিষ্টি হাওয়া। অতএব ফালতু বাসভাড়া আর কে গোনে। সটান হাঁটা লাগিয়েছিল দেবু বাড়ির দিকে। অতএব বাড়ি ঢুকতে-ঢুকতে সাড়ে দশটা।

ঢুকেই দেখা গেল, আবহাওয়া কিঞ্চিৎ গরম। বাইরে থেকে বিশেষ কিছু বোঝা যাচ্ছিল না যদিও, কিন্তু একটা হিন্ট দেবু পাচ্ছিল। বেকারদের মাথার মধ্যে একটা স্বয়ংক্রিয় মেজাজ মিটার লাগানো থাকে। গলিতে ঢুকে দরজার দিকে হাঁটতে-হাঁটতেই সেটা পিঁক পিঁক করে অ্যালার্ম বাজিয়ে যাচ্ছিল, সামনে বিপদ, সাবধান।

দরজা খুলে ঢুকতেই বউদির আওয়াজ পাওয়া গেল। সাধা গলা। ক্ল্যাসিক্যাল শেখে। সুর নিয়ে কুস্তি করে। ঝগড়ার সময়েও তার ছাপটা চলে আসে। দাদার সঙ্গে জোর লেগেছে! বলছে, ‘বাড়ির বউ হয়ে আমি গলায় রক্ত তুলে টাকা রোজগার করে আনব, আর একটা হুদো জোয়ান বাড়ি বসে-বসে সেই টাকায় ভাত গিলবে দু’বেলা। এই তো তোমার ভাই! আর তুমি নিজে? অফিস থেকে তুমিও ফেরো, আমিও ফিরি। ফিরেই তো নিজে একেবারে চান সেরে ঘাড়ে পাউডার মেখে লুঙ্গি পরে খাটে উঠে বসলে। ছেলেকে খাওয়ানো, রান্নাঘরের দায়, সব এখন আমার ঘাড়ে। আলসের গুষ্টি কোথাকার!’

‘দ্যাখো, গুষ্টি তুলবে না বলে দিচ্ছি,’ দাদার জবাবি সরগম বেজে উঠল এবারে, ‘তোমার নিজের দাদার কথা ভেবে দ্যাখো আগে, তারপর অন্যের গুষ্টির কথা তুলো।’

‘কী, তুমি আমার দাদার কথা তুললে? তার সঙ্গে এই মুখপোড়ার তুলনা করলে?’

‘হ্যাঁ তুলেছি। বেশ করেছি। বাপের হোটেলে খেয়ে আর পাকপাড়ার মোড়ে রকবাজি করে চল্লিশ বচ্ছর কাটিয়ে দিল। কাজকর্মের খোঁজ নেই! বুড়ো বয়েস অব্দি বউছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের ঘাড়ে চেপে আছে। তার বোন হয়ে তুমি এত বড়-বড় কথা বলো কোনো মুখে? আসলে, হিংসে হয়েছে সেটা সোজাসুজি না বলে বাঁকা পথে ঝাল ঝাড়ছ। তাইতো? মাস্টার্স করবার দু’বছরের মাথায় চাকরির একটা চিঠি এসেছে ছেলেটার। যেমন চাকরিই হোক, নিজের ক্যালিবারে, পরীক্ষা দিয়েই তো পেয়েছে! হিংসে তো হবেই! খাওয়াপরায় বিনিমাইনের ছোকরা চাকর পেয়েছিলে একটা! চাকুরে বউদির ফাইফরমাশ খাটত, গালিগালাজ খেত। সে যেমনই হোক একটা বাঁধা মাইনের চাকরির চিঠি পেলে তোমার সহ্য হবে কেন? মিন মাইন্ডেড মহিলা কোথাকার!’

‘কী? কী বললে? যতবড় মুখ নয়, ততবড় কথা? শোনো। তোমাকে পরিষ্কার করে একটা কথা বলে দিচ্ছি। মুখে একটু লাগাম দাও। বস্তিবাসী কালচার এ বাড়িতে ঢুকিও না। আমার জীবনটা তো তোমায় বিয়ে করবার দিনই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ছেলেটা বড় হচ্ছে। ওর কথা তো আমায় ভাবতে হবে! এরপর যদি কোনোদিন তোমার বা তোমার ফ্যামিলির কারো মুখে এ ধরনের কথাবার্তা শুনি তাহলে গুষ্টিসুদ্ধ ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে…’

দেবু দোতলার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। সপ্তাহে অন্তত বারতিনেক ঝগড়া লাগে এ-বাড়িতে। একে অন্যের গায়ে কাদা ছুড়ে কী যে মজা পায়! আজকাল নাকি মুখের সঙ্গে-সঙ্গে হাতও চলছে। বাপ্পা সেদিন দেবুর সঙ্গে স্কুলে যেতে যেতে বলল, ঘুমের ভান করে চোখ পিটপিট করে দেখেছে, মা বাবার মুখে খিমচে দিচ্ছে আর বাবা মা’র চুল টেনে ধরে আছে।

আজকাল আর ওতে বিশেষ নাড়া লাগে না দেবুর মনে। ঝগড়ার ডায়লগগুলো কানে এলেও এপাশ দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মনে আটকে থাকে না। তবে আজ অবশ্য একটু ব্যাতিক্রম হল। ওই চিঠির কথাটা কান দিয়ে ঢুকে একদম গেঁথে বসে গেছে মাথার ভেতর। মনে মনে একটু হিসেব করছিল সে, ‘জগদানন্দ কলেজ, ময়ূরভঞ্জের সেন্ট পল মিশন, এসএসসি…’ আসলে পড়াবার চাকরি ছাড়া অন্যকিছুর জন্য অ্যাপ্লাই করতে একটু বাধো বাধো ঠেকে তার। এদের কোনো একটা থেকেই বোধ হয়…

চাকরি ব্যাপারটা বেশ রোমাঞ্চকর ঠেকে দেবুর। ধরো, সকালবেলা খেয়েদেয়ে অফিস। দুপুরে টিফিন খাওয়া। ঘণ্টা বাজালেই সারাদিন বারে বারে চা। মাস গেলে খাতায় সই করে একমুঠো টাকা!

পা টিপে-টিপে দোতলায় উঠে এসে কোণের ঘরের পর্দাটা সরিয়ে ভেতরে মাথা গলিয়ে দেবু বলল, ‘মা, আমার কোনো চিঠি এসেছে?’

‘কে দেবু? আয়, বোস।’ টিভিটা মিউট করে দিলেন সুনন্দা। বিজ্ঞাপন বিরতি চলছে এখন। দু’মিনিট হয়েছে। আরো মিনিট তিনেক চলবে। রিমোটটা রেখে, বালিশের তলা থেকে সরকারি ছাপছোপ লাগানো বাদামি রঙের একটা খাম বার করে তার হাতে দিয়ে বললেন, ‘দুপুরে এসেছিল। খানিক আগে ইন্দ্র এসে আমার হাতে দিয়ে গেল। বললো নাকি চাকরির চিঠি এসেছে তোর। আর তার পর থেকে বউমার সঙ্গে সেই যে ঝগড়া লেগেছে, থামার কোনো লক্ষণ নেই। একবার যে জিগ্যেস করব কীসের চাকরি, কী বৃত্তান্ত, তার কোনো রাস্তা পাচ্ছিলাম না। তুই এলি। ভালোই হল। এবারে পড়ে-টড়ে বল দেখি।’

 চিঠিটা এসেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে। নিজের চোখদুটোকে একবার কচলে নিল দেবু। ও চাকরি পেয়েছে। সত্যি সত্যি! একটা গোটা, নিটোল, রসালো চাকরি! অঙ্কের টিচার। ঈশ্বরপুর বলে কোনো একটা জায়গায়। ওখানে নিবেদিতা বিদ্যাপীঠ বলে স্কুল আছে একটা। তার কর্তাদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করতে হবে দশ দিনের মধ্যে।

সব শুনেটুনে সুনন্দা বললেন, ‘কামাখ্যার কাপড়ের তবে জোর আছে বল? পরীক্ষাটা দিতে যাবার সময় ওর একটুকরো সুতো দিয়ে দিয়েছিলাম পকেটের ভেতর, মনে আছে? চাকরিতে আগে জয়েন কর, তারপর একবার কামাখ্যায় নিয়ে যাবি আমাকে। তোর একটা গতি হলে সুবর্ণপুরুষ গড়িয়ে বুক চিরে রক্ত দেবো বলে মানত করা আছে।’

‘হুঁ। সে তো নিয়ে যাব। কিন্তু বর্তমানে আমায় ঈশ্বরপুরে কে পাঠায় বলো তো মা? পকেটে তো সেই মেমসাহেবের টাকার থেকে তিনশো আটষট্টি টাকা পড়ে আছে। বউদির কাছে চাইব?’

‘না, চাইবে না,’ সুনন্দা শক্ত মুখে বললেন। তারপর বালিশের নীচে থেকে বটুয়াটা বের করে উপুড় করে ঢাললেন খাটের ওপর। গুনেগেঁথে চারশো আশি টাকা হল। সুনন্দা একট সামান্য পেনশন পান। দেবুদের বাবার দরুণ। ওই থেকে টুকটাক হাতখরচ, কেবল টিভির ভাড়া, এইসব মেটে। এটা গতমাসের পেনশনের অবশিষ্টাংশ। আশিটা টাকা তার থেকে রেখে দিয়ে চারশো টাকা দেবুর হাতে তুলে দিয়ে সুনন্দা বললেন, ‘প্রায় আটশোর কাছাকাছি হয়ে গেল তাহলে তোর। ওই দিয়ে প্রথম মাসমাইনেটা পাওয়া অবধি চালিয়ে নিতে পারবি না?’

‘কিন্তু তোমার তো কিছুই রইল না?’

‘চাকরি পেলে আগামী মাসেই তো মাইনে পাবি। আমার আর তবে চিন্তা কী?…এইএই বদমাশ ছেলে ছাড়, ছাড়! বুড়ি মানুষ শেষে দমবন্ধ হয়ে মরব নকি? উফ!’

মা কত হালকা হয়ে গেছে! কত সহজেই জাপটে ধরে কোলে তুলে নিল দেবু! ঠিক যেন একটা শিশু! অথচ, এখনও তো মায়ের কোলে চেপে ঘোরবার মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে! কত বড় ছিল মা! তার চাইতে কত লম্বা! কত শক্তিশালী!

.

.

‘বাবু কি টাউনেই থাকেন?’

দেবু হাতে ধরা বইটা থেকে চোখ না তুলেই বলল, ‘হুঁ।’

‘মালদা টাউন?’

‘উহু।’

‘তবে?’

‘কলকাতা।’

‘বাপ রে! সে তো অনেক দূরের ব্যাপার!’

খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর ফের ইন্টারোগেশনের দ্বিতীয় দফা শুরু হল।

‘বাবু বুঝি বই পড়েন?’

‘হুঁ।’

‘কী বই? ইংরাজি বই? কেমন সুন্দর দেখতে! বিলাত থেকে আনা নাকি? আপনি বিলাত গেছিলেন?’

পড়াটা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ-লোকটা তাকে ছাড়বে না। পাতার কোনা মুড়ে বইটা বন্ধ করে দেবু এবারে ঘুরে তাকাল। মালদা টাউন থেকে রওনা হয়ে ইস্তক লোকটা তার পাশে বসে বসে ক্রমাগত উশখুশ করে চলেছে। প্রথমে চোরা চাহনি, তার পরে সাহস সঞ্চয় করে ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে মেরে বইটা দেখেছে খানিকক্ষণ। আর তার পরেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রশ্নবাণ। বইটা লোকটির দিকে বাড়িয়ে ধরে দেবু বলল, ‘দেখবেন?’

 লোকটা এবারে একগাল হাসল, ‘আজ্ঞে চাষাভূষা মানুষ। কেতাব-টেতাবের বুঝিই বা কী! ও দেখে আর কী করব? তা বাবুর কলকাতার কোন পাড়ায় বাড়ি?’

‘কলকাতায় গেছেন কখনো?’

‘হ্যাঁ। একবার গেছিলাম। ছিলামও তিনদিন। শহর তো নয়, যেন অকূল পাথার! কত যে মানুষ! শুকনো ড্যাঙার ওপর বিরিজ বাঁধা, তাই দিয়ে হাজারে-হাজারে গাড়ি দৌড়ায়! ধোঁয়ায়-ধোঁয়ায় অন্ধকার! বাপ রে বাপ! দম বন্ধ হয়ে যায়।’

দেবুর মনে মনে একটু রাগই হচ্ছিল। কোথাকার কে, গায়ে পড়ে এসে কলকাতার নিন্দে গাইছে। বলল, ‘কেন, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, নিক্কো পার্ক এসব দেখেননি?’

একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকটা। তারপর তার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ‘সে-সব আর সে-যাত্রায় হয়ে ওঠে নাই বাবু। ওই তিনদিনের মাথায় সেখানে আমার সর্বস্ব খোয়ায়ে এলাম যে!’

পরবর্তী অধ্যায়টা সম্ভবত কলকাতার পকেটমারদের বিষয়ে। ফের খানিক শহরের শ্রাদ্ধ। প্রসঙ্গটা দেবুর পক্ষে খুব আনন্দদায়ক নয়। অথচ এ-লোক শুরু যখন করেছে তখন নিস্তার যে দেবে না সে তো বোঝাই যাচ্ছে।

তবে বিষয়টা আর সেদিকে বেশিদূর গড়াল না, কারণ কন্ডাকটার এসে হাত পেতে দাঁড়িয়েছে। দেবু একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে বাড়িয়ে ধরে খানিক স্বস্তির গলায় বলল, ‘ঈশ্বরপুর, শিবতলা মোড়। একটু বলে দেবেন।’

‘উনিশ টাকা খুচরো দেবেন।’

‘এই রে! খুচরো তো হবে না দাদা!’

‘এই তো মুশকিলে ফেলেন আপনারা! সবাই শুধু কথায়-কথায় পঞ্চাশ একশোর নোট দেখায়! আরে, বাস কোম্পানির কি খুচরো পয়সার কারখানা আছে? হাতে রাখুন, খুচরো হলে দিচ্ছি। প্যাসেঞ্জারে না দিলে আমরাই বা রোজ-রোজ অত—’

গজগজ করতে-করতে পেছন দিকে এগিয়ে গেল কন্ডাকটার। লোকটা এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। এইবার ফের পাশ থেকে গুটি-গুটি মুখ বাড়াচ্ছে দেখে দেবু জানালার দিকে চোখ ফিরিয়ে আত্মরক্ষার একটা চেষ্টা করল। তবে ফল হল না। হাসি-হাসি মুখে ইন্টারভিউয়ের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে।

‘বাবু, একটা কথা শুধাই, কিছু মনে করিয়েন না।’

‘উফ, না, কিছু মনে করব না। বলেন।’

‘মানে বলছিলাম কি ইয়ে আপনি কি আমাদের নিবেদিতা ইস্কুলের নতুন মাস্টারবাবু?’

এইবার দেবু একটু চমকালো। ছদ্মবেশী গোয়েন্দা-টোয়েন্দা নাকি?

‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি কী করে—’

লোকটার মুখে এইবার একটা চওড়া হাসি ফুটেছে। মাথা নেড়ে বেশ মাইডিয়ার একটা গলায় বলে, ‘ঠিক ধরেছি তবে! আমিও ঈশ্বরপুরের লোক যে! মালদা টাউনে যখন বাসে এসে উঠলেন, আমার মন তখনই বলছিল, এই সেই লোক হবে। চোখেমুখে বিদ্যেবুদ্ধি গজগজ করছে, মাথার চুল উলোঝুলো, কথায়-কথায় ফস করে সাদাকাঠি জ্বালায়, এ মানুষ জাতে মাস্টার না হয়ে যায় না। তায় যখন আবার ঈশ্বরপুরের টিকিট চাইলেন, তখনি বুঝলাম।’

দেবু একটু সন্দেহের চোখে লোকটাকে জরিপ করে নিল একবার। খরখরে খড়ি ওঠা হাত-পায়ের সঙ্গে গায়ের ধবধবে পাঞ্জাবিটা একদম বেমানান ঠেকছে। অবাধ্য কাঁচাপাকা চুলের ওপর তেলের পুরু আস্তরণ।

‘আপনিও কি ওই স্কুলে কাজ করেন?’

লোকটা হেসে মাথা নাড়ল। বলে, ‘আজ্ঞে না। সাতপুরুষের চাষা। লাঙল দিয়ে জমির গায়ে আঁচড় কাটি। ওই আমার লেখাপড়া। কাগজে আঁকড়া কাটা আমার ধম্মে নাই।’

‘তাহলে ইস্কুলের এত খবর রাখেন কী করে?’

‘ওই তো বাবু, শহরের লোকের মুশকিল! বাঁ-হাত কী করে ডান হাত জানতে পারে না। গাঁ-ঘরের চাল আলাদা। সবাই সবার হেঁশেলের খবর রাখে। এই দেখেন, একদম হিসেব করে দেখাচ্ছি।’

বলতে-বলতেই সে তার আঙুলের কড়গুলি গুনতে শুরু করে দিয়েছে, ‘গেল সোমবারের আগের সোমবার সরকারের ঘর থেকে চিঠি এল ইস্কুলে। নাকি নতুন মাস্টার আসছে। চিঠিটা খুলে হেডমাস্টারের হাতে দিয়েছিল শিবু দপ্তরি। শিবু আমার গ্রাম সম্পোক্কে ভাগ্না হয়। কথায়-কথায় এসে বলল।

‘তারপর ধরেন, গত পরশু সর্দারের হাটে কালী সা’র দোকানে তেল নিতে গেছি, তখন সদাই নিতে এসে হেডমাস্টার বলছিল, নতুন মাস্টার কলকাতার ছেলে। মঙ্গলবারে দেখা করতে আসবে বলে ইস্কুলে চিঠি দিয়েছে। আজ হল গে সোমবার। আজকের দিনে বিকেলবেলা এখন একজন বিদ্যেদিগ্গজ বাবু-মানুষ কলকাতা থেকে এসে বাসে চেপে হটর-হটর করে ঈশ্বরপুরে চলল! তাহলে সে আমাদের নতুন মাস্টার হবে না তো কি হারু গোয়ালার জামাই হবে?’

অকাট্য যুক্তি। নিখুঁত ব্যোমকেশীয় ডিডাকশান। আসবার আগে সুনীলদার কাছে গিয়েছিল দেবু একবার। ভদ্রলোকের ছোটবেলাটা মালদাতেই কেটেছে। এখনো যাতায়াত আছে একটু-আধটু। সুনীলদা সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘খাস কলকাতার ছেলে, গিয়ে ঢুকছে যাকে বলে একেবারে শরৎবাবুর পল্লীসমাজে। ওখানে প্রাইভেসি শব্দটার কোনো মানে নেই। সবাই সবার হাঁড়ির খবর রাখে। তোমার বাড়ি ঝগড়া হলে তার রানিং কমেন্টারি শুনতে পাবে বাজারের জটলায়।

 কথাটার সত্যতা গন্তব্যে পৌঁছোবার আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। দেবু হেসে বলল, ‘আরে দূর! আগের থেকেই নতুন মাস্টার বানিয়ে দিলেন? আগে যাই, গিয়ে কর্তাদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ সারি, তারপর তো চাকরিতে জয়েন-টয়েন করার কথা হবে!’

‘কী যে ইংরাজি বলেন বাবু, তার মানে বুঝি না। তবে একটা কথা বলি, এ চাকরি আপনার কপালের লেখন। খণ্ডাবেন কেমন করে?’

‘ওরে বাবা! আপনি কি জ্যোতিষ-ট্যোতিষ…’

‘আজ্ঞা না। আমার মন বলল। আমার…’

হঠাৎ কেমন যেন চুপ মেরে গেল লোকটা। নিঝুম হয়ে দেবুর দিকে চোখদুটি তুলে ধরে বসে থাকল চুপচাপ। লোকটা কি মন পড়তে পারে? চাকরিটা যে তার কতটা দরকার সেটা কি বুঝতে পেরে গেছে? তাই কি অমন গায়ে পড়ে এসে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে? নইলে তার চোখের দিকে ওই দুটো বয়োজীর্ণ চোখ এত মায়াময়, এত স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেই বা কেন? দেবু জানালার দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। একটা অদ্ভুত সঙ্কোচবোধ তৈরি হচ্ছে ভেতরে-ভেতরে।

জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের একফালি রোদ এসে পড়েছে তার গায়ে মুখে। গাড়ির সঙ্গে-সঙ্গে সূর্যও ছুটছে পাল্লা দিয়ে। দু’ধারে বিচ্ছিন্ন সবুজের মধ্যে মাঝেমাঝেই একটা-দুটো বাড়ি উঁকি দিয়ে যায়। টালির চাল দেওয়া ছাঁচিবেড়ার ঘর। আসন্ন রাত্রির জন্য প্রস্তুতিপর্ব চলছে এখন সেখানে। উঠোনে বিকেলের ঝাঁট পড়ছে। বৈকালিক গা ধোয়া সেরে কলসি ভরে নিয়ে ফিরতে-ফিরতে ছুটন্ত বাসটির জানালার দিকে অ-সঙ্কোচ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে গেল একদল কিশোরী। কোনো না-শোনা রসিকতায় হেসেও উঠল বুঝি একবার। তাকে দেখেই নয় তো!

‘দাদা, টাকাটা দিন। টিকিট করে দিই। খুচরো হয়ে গেছে।’

চমক ভেঙে দেবু পকেট থেকে টাকাটা বার করতে যেতেই তার সঙ্গীটি হাঁ-হাঁ করে উঠল, ‘টাকা রাখেন, টাকা রাখেন! আপনার টিকিট আমি কাটব মাস্টারমশাই।’ বলতে-বলতে, দেবু কিছু বোঝবার আগেই কুড়ি টাকার একটা নোট বের করে সে গুঁজে দিয়েছে কন্ডাকটরের হাতে।

‘না না, সে কী? আমার ভাড়া আপনি দেবেন কেন?’

‘আহা, তাতে কী? প্রথমবার আসছেন, অতিথ মানুষ, তাই একটু খাতিরদারি করলাম আর কি! এরপর যখন ঘরের লোক হবেন, তখন কি আর করব? উল্টে, হাটে-বাজারে দেখা হলে বরং বলব, ‘মাস্টারভাই, দ্যাও দেখি সাদাকাঠি একখান!’

দেবু হেসে ফেলল। লোকটার সঙ্গে তর্ক করা যায় না। পকেট থেকে গোল্ড ফ্লেক-এর প্যাকেটটা বার করে খুলে ধরে বলল, ‘আসুন।’

‘আরে, আরে তাই বলে কি এক্ষুনি চাইলাম নাকি? দ্যাখো দেখি’ বলতে-বলতে একটার জায়গায় দুটো সিগারেট তুলে নিয়েছে সে। একটিকে অসঙ্কোচে কানের পেছনে গুঁজে রেখে অন্যটিকে ফাটা-ফাটা রুক্ষ ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে নিয়ে বলে, ‘শলাই?’

দেবু চারদিকে একঝলক তাকিয়ে নিল। নগরের সীমা ছাড়িয়ে গ্রামের গভীর থেকে গভীরতর অঞ্চলে ডুব দিয়ে চলা এই যন্ত্রযানে নাগরিক বিধিনিষেধের বাঁধন খানিক শিথিল। সদ্য নেমে আসা ঈষৎ অন্ধকারে ইতিউতি দু-একটা ধুম্রকুণ্ডলী দেখা দিচ্ছে তার ভেতরে। অতএব এইবার সে নিজেও একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে লাগিয়ে দেশলাই জ্বালাল। লোকটা তার সিগারেট ধরে রাখা ঠোঁটদুটো এগিয়ে এনেছে কাছে। বলে, ‘নেন, মুখাগ্নি করেন দেখি!’

তার সিগারেটের আগায় আগুন ছুঁইয়ে নিজেরটাও ধরিয়ে নিল দেবু। তারপর কাঠিটা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলল বাইরে। বেশ ঘন অন্ধকার হয়ে এসেছে এতক্ষণে। একটা হলুদ আলোর রেখা তৈরি করে কাঠিটা হারিয়ে গেল পেছনদিকে।

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে একবার সামনের দিকে দেখল দেবু। গাড়ির হেডলাইটের হলদে আলোর ধারায় সামনের গাছে ঘেরা পথখণ্ডটুকু ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না।

.

.

‘বাবু, এবারে গা তোলেন দেখি আস্তে-আস্তে। ব্যাগ বাক্স আর কিছু আছে? এসে গেলাম প্রায়।’

‘পৌঁছে গেছি? ছাদের ওপর একটা হোল্ড-অল আছে। আর কিছু নেই। কোথায়? বাসস্টপ কই?’

‘সবুর সবুর! ওই সামনে বটগাছ দেখছেন? ওই ছাড়িয়ে মোড় বেঁকলেই শিবতলা।’

দেবু একবার বাইরের দিকে তাকিয়ে নিল। অন্ধকারটা বেশ খাঁটি এখানে। জানালার বাইরে বটগাছ বা অন্য কোনোকিছুই ধরা পড়ছিল না তার চোখে।

ব্যাপারটা খানিক অপ্রত্যাশিতই ছিল তার কাছে। সুনীলদা অবশ্য একবার বলেছিল বটে, যাবার আগে, থাকবার জায়গা-টায়গার ব্যাপারে ইশকুলের সঙ্গে কথা বলে নিতে। দেবু ততটা কান দেয়নি। সস্তায় দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার অনেক আছে। আনরিজার্ভডে একটা টিকিট, আর খাওয়া, সিগারেট মিলে ম্যাক্সিমাম পঞ্চাশ টাকা পার ডে। থাকবার জায়গার অভাব হয় না ভারতবর্ষে। সুলভ শৌচালয়ে দু-পাঁচ টাকায় স্নান, টয়লেট। রাতে শোয়ার জন্য প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চ, চায়ের দোকান, পার্ক-ফার্ক অনেক কিছু আছে। মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেই হল।

এক্ষেত্রেও রাতটার জন্য তেমন একটা কিছু জুটে যাবে সে-ব্যাপারে দেবু নিশ্চিত ছিল। আর সকালে উঠে তো স্কুলে গিয়ে ঢোকা। তারপর চাকরি। ব্যস। প্রবলেম সলভ।

কিন্তু এইবার, সামনে ছুঁচ ফোটানোর যোগ্য অন্ধকারটা দেখে একটু নার্ভাস ঠেকছিল তার। এখানে এই রাতে।

একটু ইতস্তত করে দেবু মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছ দাদা, এখানে কোনো হোটেল টোটেল কিছু—’

লোকটা তার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ঈশ্বরপুরে হোটেল? সে হতে-হতে এই সাধু মোড়ল মরে ভূত হয়ে আরো তিন-চার জম্ম কাটিয়ে দেবে।’ সাধু মাথা নেড়ে নেড়ে হ-হ করে হাসে নিজের রসিকতায়।

দেবুর অবশ্য হাসি পাচ্ছিল না। আটটা বাজে প্রায়। এই সন্ধেবেলা কোনো জায়গা যে এমন শুনশান আর অন্ধকার হয়ে যেতে পারে তা ভাবা যায় না। তার মধ্যে আলোর একটা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে-খুঁড়ে বাস এগোচ্ছে সামনে। এইখানে, এই অজানা তেপান্তরে প্রথম রাতটাই নিরাশ্রয় হয়ে।

হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল দেবুর। গোটা জীবনটাই হয়তো তাকে এখানে, এই আদিম জনপদটিতে থেকে যেতে হবে। আর যদি ফেরা না হয়? যদি অন্য কোনো চাকরি আর কোনোদিন।

মিনিট পাঁচেক পরে অন্ধকারের মধ্যেই বাসটা এসে রাস্তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেল। জানালার আলোয় রাস্তার একধারে একজটা ঝুপসি বটগাছের নীচে হাতচারেক উঁচু একটা ইটের তৈরি মন্দির দেখা যায়। ওটাই শিবমন্দির তবে!

কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে নীচে দাঁড়াতে কন্ডাকটর ছাদে উঠে ওপর থেকে হোল্ড-অলটা বাড়িয়ে ধরল। দু-হাতে সেটাকে ধরতে না ধরতেই ফের নড়ে উঠল বাস। তারপর গতি বাড়িয়ে ফের সামনের অন্ধকারে ডুবে গেল।

দেবু এবারে চারদিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখল। ভালো ফ্যাসাদ হয়েছে। চাকরি মাথায় থাক, এখন এই অন্ধকারের মধ্যে খানাখন্দে না পড়ে কোনো বাড়িটাড়ির বারান্দা অবধি পৌঁছতে পারলে হয়!

সামনে অল্প দূরে ফস করে একটুকরো আলো জ্বলে উঠল হঠাৎ। দেশলাইকাঠির মৃদু দপদপে হলদেটে আলোয় সাধুর মুখের আদলটুকু শুধু দেখা যায়। ও-ও যে এখানে নামবে সেটা দেবুর খেয়াল ছিল না। নেমে আসাটাও নজর করেনি। সম্ভবত হোল্ড-অল নামাতে ব্যস্ত ছিল যখন সেই ফাঁকে নেমে এসেছে। তবে সে যখনই নামুক না কেন, ওকে দেখে একটু ভরসা এল মনে।

‘বিড়ি খাবেন মাস্টারমশাই?’

দেবু হাত বাড়াল।

‘নেন, আমার বিড়ি থেকেই ধরায়ে নেন। শুধুমুদু আরেকটা কাঠি খরচা করা কেন?’

বিড়িটাকে মুঠোয় ধরে প্রবল এক টানে আগুনটাকে তার মাঝ বরাবর এনে দিয়ে নাকমুখ দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া ছাড়ে সাধু। খকখক করে কাশতে-কাশতেই হাসে হ-হ করে। বলে, ‘কলকে টানা কলজে, বিড়ি টেনে সুখ নাই। কী যে মজা পান বাবু আপনারা ফুক ফুক করে বিড়ি সিগ্রেট টেনে!’

‘না, ভাবছিলাম, এখন—’

‘হক কথা! এখন আর হুকা কলকি পাবেন কোথা? এ চত্বরে তো কাছাকাছি কোনো ঘরবাড়ি নাই! তবে, আমার আর চিন্তা কী? গটগটিয়ে হাঁটন লাগালে আধাঘণ্টায় বাড়ি। তারপরে চানটান সেরে ভাত খেয়ে তামুকটি নিয়ে বসব।’

দেবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে বিড়িতে ঘনঘন টান লাগায়। সাধু ওকে লেজে খেলাচ্ছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে সেটা। এমন বিপদেও মানুষে পড়ে! দপ করে একেকবার জ্বলে ওঠা বিড়ির আগুনে বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে, টেরিয়ে-টেরিয়ে দেখছে দেবুর দিকে। ওর দশা দেখে বিলক্ষণ মজা পাচ্ছে নিশ্চয়! এবারে মরিয়া হয়ে দেবু আর একবার কথাটা পাড়বার চেষ্টা করল, ‘না মানে, সাধুবাবু বলছিলাম কি…’

‘আরে আরে, আমারে আবার বাবুটাবু বলেন কেন? চাষাভূষা মানুষ…’

এই অবধি বলে এবারে বোধ হয় সাধুর একটু দয়া হল। বিড়িটায় একটা সুখটান দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে, ‘এখনো মাথা থেকে ওই হোটেলের ভূত ছাড়ে নাই বুঝি মাস্টারমশাই?’

‘না মানে, এখন এই এত রাতে কী করি বলো তো সাধু?’

সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে হাত বাড়াল সাধু, ‘দেন দেখি! হল্টলটা দেন এদিকে। বলতে-বলতেই হোল্ড অলটা এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটা লাগিয়েছে ডানদিকের একটা সরু রাস্তা ধরে। থেকে থেকে আওয়াজ ছাড়ে, ‘সামলে মাস্টারভাই! অন্ধকারে আছাড় খেয়েন না যেন আবার!’

তার পেছনে হোঁচট খেয়ে ছুটতে-ছুটতে দেবু চিৎকার করছিল, ‘ও সাধু! অ্যাই! কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমার হোল্ড-অল-সাধু কোথায় যাচ্ছ?’

 খানিকক্ষণ পরে সাধু একবার দাঁড়িয়ে ঘুরে দেখল পেছন দিকে। রাস্তাটার শেষে, একটা বড় মাঠের মাঝ বরাবর ঈশান কোণের দিকে চলেছে ওরা এখন। চাঁদ নেই আকাশে। তবে অন্ধকারটা এখানে তত গাঢ় নয়। আবছা আলোর একটা আভাস যেন আছে। সাধুর অবয়বটা বোঝা যায় দূর থেকে। দেবু একবার আকাশের দিকে চেয়ে দেখল। তারা উপচে পড়ছে। আকাশে এত তারা হয়! বিশ্বাস হয় না। তারার আলোতেই কি অন্ধকারকে তরল করেছে খানিকটা? হবে হয়তো।

সাধু হাসছিল মিটিমিটি। ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো বোঝা যাচ্ছে একটু একটু। বলে, ‘যাব আর কোনো চুলোয়! গেরস্তের ওই এক গোয়ালঘর ছাড়া যাবার আর কোনো ঠাঁইটা আছে বলেন দেখি! তা অসময়ে এসেই যখন পড়েছেন, তখন যাবেন আর কই? চলেন, আপনাকেও সঙ্গে নিয়ে যাই। গরিবের ঘরে রুখুসুখু দুটি মুখে দিয়ে দেহরক্ষা করেন। আজকের রাতটা।’

‘অ্যাঁ? কী বললে? কী করব?’

‘ওই দ্যাখো! কী বলতে কী বলে ফেলেছি! মুখ্যুসুখ্যু মানুষ! ভাবের কথা বলতে গেলে ভুলচুক একটু হয়েই যায়। ষাট ষাট! এই কাঁচা বয়েসে দেহরক্ষা করুক আপনার শত্তুর! একশো বচ্ছর পেরমাই হোক! নাতির বউভাতে কবজি ডুবিয়ে মাংস খান।’

তার মুখ দিয়ে ক্রমাগত বার হয়ে আসা আশীর্বচনের খণ্ড খণ্ড শব্দ ভিড় করে ঘুরে বেড়ায় দেবুর চারপাশে। বড় আরাম লাগছিল তার। অনেক দিনের মধ্যে এই প্রথম। ছোটবেলায় রাত্রে মা’র কাছে যখন গিয়ে শুতো সেরকম আরাম। ক্লাস এইটের পর আর শোয়নি। তারপর থেকেই ওর নিজের ঘর, নিজের দুনিয়া।

.

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল দেবুর। চোখে আলো পড়ছিল। তাকিয়ে দেখে, গাছের ফাঁকে চাঁদ। এলোমেলো শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছিল। গাছের পাতার নড়াচড়ার তালে-তালে চোখের পাতায় চাঁদের আনাগোনা। বাড়ির বাইরের দিকের একটা ঘরের দাওয়ায় গদি বালিশ বিছিয়ে তার শোবার জায়গা হয়েছে। এ-বাড়ির দাওয়া অনেক উঁচুতে। মাঠ পেরিয়ে বেশ অনেকটা দূরে মহানন্দার আবছা রেখাটা চোখে পড়ে। খুব খাইয়েছে সাধু। দু’রকমের মাছ, ডাল, ভাজা, তরকারি; শেষপাতে দুধ, কলা, গুড়। একেবারে ভোজের খাবার! এত রাতে হঠাৎ এসে পড়া অতিথের জন্য এত কিছু জোগাড় করে এনে রান্নাবান্না করাল কী করে কে জানে? নাকি এরা রোজই এমন খায়?

খেতে-খেতেই বিবির ফোন এসেছিল। নাকি সোমেনের কাছে দেবুর খবরটা শুনেছে। উইশ করল, আগামীকালের ইন্টারভিউটা যাতে ভালো হয়। কথায়-কথায় খাবার মেনুটা শুনে চমকে উঠে বলে, ‘তুমি দুধভাত! হি-হি।’

মজা দেবুরও লাগছিল বটে। ছোটবেলাতেই কখনো দুধ দিয়ে মেখে ভাত খায়নি। সত্যি বলতে, এভাবে খাওয়ার কনসেপ্টটাই কখনো তৈরি হয়নি ওর।

বিবির মুখটা চোখের ওপর ভাসছিল। এখনো ঠিক অ্যাফেয়ার নয়, তবে ওই একটু সেন্টি টাইপের ভাব দেখাচ্ছে মেয়েটা কয়েকমাস ধরে। ছোটবেলা থেকেই চেনে দেবু মেয়েটাকে। ওদের পাড়ায় ভাড়া থাকত। পরে দেবুরা ফ্ল্যাট কিনে বেলগাছিয়ার দিকে উঠে গেলেও আলাপটা থেকেই গেছে। বছর কয়েক আগে ওর ভাই সুমিতকে দেবু একবার পড়িয়েওছিল বেশ কয়েক মাস। সেই সময় থেকেই মেয়েটার বিহেভিয়ারটা একটু সন্দেহজনক হতে আরম্ভ করেছে।

অবশ্য ইনফ্যাচুয়েশানটা দেবুর ভালোই লাগে। বেকারশাস্ত্রের প্রথম সূত্রই বলেছে, প্রেমদান না বিষপান। প্রথম-প্রথম মিষ্টি কথা বলবে। সিনেমায় নিয়ে গিয়ে হাতের আঙুলের ফাঁকে আঙুল জড়িয়ে বসে থাকবে। তারপর ফাঁদটা আঁটো হয়ে গলায় একবার বসলেই কেরিয়ার বানাবার জন্য পাগল করে ছেড়ে দেবে পেছনে লেগে। বারীনের মতো ট্যালেন্টেড পেইন্টারকে গ্র্যান্ট-ওয়াদিয়া ইনসিওরেন্স কোম্পানির দালাল বানিয়ে ছেড়ে দিল সর্বাণী। ওদের চোখের সামনে। আলাপ হবার ঠিক আটমাসের মাথায়! তার ঠিক ছ’মাস পরে বিয়ে।

সর্বাণীর কড়া অনুরোধ ছিল, বিয়েতে বন্ধুরা যেন ওসব আর্ট-টার্ট না ফলিয়ে কাজের কিছু জিনিস গিফট দেয়। দেবুরা চাঁদা তুলে একটা পোর্টেবল ভ্যাকুয়াম ক্লিনার কিনে দিয়ে এসেছিল বউভাতের রাত্রে। আর কিছু না হোক, বারীন ওর পুরোন পেইন্টিংগুলোর ধুলো তো ঝাড়তে পারবে মাঝেমধ্যে! অবশ্য সে আবর্জনাগুলো সর্বাণী যদি ঘরে রাখবার পারমিশন দেয় তবে।

 চাকরি প্রায় পাকা, এই খবরে বিবির এহেন উৎসাহ অতএব বিশেষ ভালো ব্যাপার নয়। বিশেষত এত ভালো-ভালো উইশ করছিল যে কহতব্য নয়। প্রচুর গ্যাসও দিয়ে দিয়েছে। বলে, তোমার মতো ট্যালেন্টেড ছেলে।

কথাটা মনে করে একটু হাসিই পেল দেবুর। মাস্টার্স করে দু’বছর বেকার বসে থাকবার পর একটা পাতি পরীক্ষায় পাশ করতেই একেবারে ‘ট্যালেন্টেড’ শিরোপা জুটে গেল তার! বড় শখ করে অঙ্ক নিয়ে পড়েছিল। কিউইং থিওরির ওপর রিসার্চ করবার ইচ্ছেটাও ছিল। কিন্তু পাশ করবার পর যার কাছেই গেছে, সবার মুখেই ওই একই কথা। ও জিনিসের মার্কেট নেই এদেশে। একটা স্কলারশিপটিপ ম্যানেজ করে ইউ.এস চলে যেতে পারো তো দ্যাখো। নইলে।

 নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছিল দেবু সেই সময়টা। দেশ ছাড়ার ব্যাপারে ওর মন সায় দেয়নি কোনোদিন। তারপর এ দেশের অঙ্কের চাকরির খাঁ-খাঁ বাজারে চোখ ফেলে দেখেছিল, বড় ভুল হয়ে গেছে প্রিয় বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করে। এর থেকে ইন্টিরিয়র ডেকরেশান নিয়ে পড়লে, কিংবা পলিটেকনিকে কিছু একটা ডিপ্লোমা কোর্স করলেও প্রসপেক্ট অনেক ভালো হতে পারত। কই, সেই স্ট্রাগলের সময়টাতে কেউ তো তাকে তার ট্যালেন্টের কথাটা এসে বলেনি! বিবিও না।

আচ্ছা, কালকে যদি গিয়ে দেখা যায়, কোনো ফ্যাঁকড়া বেধেছে? চাকরিটা হচ্ছে না? তখন আবার তো সেই ফ্যা ফ্যা করে চরকিপাক! আচ্ছা বিবি, তুই কি তখনও আমায় ট্যালেন্টেড বলবি? বলতে পারবি? কিংবা, ধর চাকরিটা পেয়েই গেলাম! প্রথম মাইনে পাবার পর মেনল্যান্ড চায়নায় তোকে নিয়ে গিয়ে ঠেসে খাইয়ে কফির কাপে চুমুক দিতে-দিতে সোজা বিয়ের প্রোপোজাল দিয়ে ফেললাম। তুই রাজি হবি? আমার সঙ্গে থাকবার জন্য তুই কলকাতা ছেড়ে এখানে এসে থাকতে পারবি? অথবা ধর, তুই কলকাতায়, আমি এখানে। শুক্কুরবার শুক্কুরবার আসা যাওয়া। উইকএন্ড সংসার। কেমন হবে?

 ঠান্ডা-ঠান্ডা হাওয়ায় চোখদুটি তার বুজে এল ফের। তারপর, তার স্বপ্নভূমির চন্দ্রোজ্জ্বল উঠোনটিতে দাঁড়িয়ে মেয়েটা কেমন নিঃশব্দে হাসিমুখে মাথা দুলিয়ে সায় দিয়ে দিল তার সব প্রস্তাবে! তার মুখে, শরীরে, পিঠ ঢাকা খোলা চুলে শিশিরবিন্দুর মতো চাঁদগুঁড়ো চিকচিক করে। আর বারান্দার বিছানায় ঘুমন্ত চোখদুটিতে একটুকরো খুশিয়াল হাসি খেলা করে যায়।

.

.

‘তা কলকাতা শহর থেকে এই গ্রামদেশে এসে পোষাবে তো মশাই? নাকি দু’দিন যেতে না যেতেই মন উড়ু-উড়ু, বারবার বাড়ি যাবার জন্য বায়না! আমার ইস্কুলে কিন্তু ওসব চলবে না সেটা শুরুতেই পরিষ্কার বলে দিচ্ছি।’

তাঁর ইস্কুলের নিয়মটি ব্যাখ্যা করে দম নেবার জন্য সেক্রেটারিবাবু একটু থামলেন। মোটাসোটা ঘাড়ে-গর্দানে মানুষ। অল্পেই হাঁফ ধরে। পঞ্চাশের ওপরে বয়স। সরস্বতীর সঙ্গে ওঠাবসা যে বিশেষ নেই, সেটা কথা বলবার ভঙ্গিতেই মালুম। সাধু বলেছিল, ধানচালের কী সব পাইকারি কারবার আছে ভদ্রলোকের। দুটো ইটভাটার মালিক। কন্ট্রাকটরির ব্যবসাতেও বেশ দু’পয়সা আয় হচ্ছে ইদানীং। সম্প্রতি পার্টির টিকিট নিয়ে ভোটে দাঁড়াবার প্রস্তুতি চলেছে। তারই প্রথম ধাপ হিসেবে ইস্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেশানে এসে জুটেছেন। ঈশ্বরপুরে আদি বাড়ি। তবে গ্রামে থাকা হয় না বিশেষ। হরিশচন্দ্রপুর টাউনে তিনতলা বাড়ি হাঁকিয়েছেন দশ কাঠা জমির ওপর। নিজের ঠাকুরদার নামে স্কুলফান্ডে এক লাখ টাকা ডোনেশান দিয়ে সেক্রেটারির পোস্টটা বাগিয়েছেন। অবশ্য শুধু টাকায় হয়নি, পার্টির সাপোর্টও ছিল পেছনে। তার জন্য পার্টিফান্ডে আরও কিছু গেছে।

 সাধু মুচকি হেসে বলেছিল, ‘শুধুমুদু ডোনেশন দেবার পাত্র রাজীব বোস নয় মাস্টারভাই। টাকাটা ও লগ্নি করেছে। ইস্কুল থেকেই ও টাকা তুলে নেবে। বেশ দু’পয়সা লাভও করবে দেখে নেবেন।’ তারপর ব্যাখ্যা দিয়েছিল, ‘ইস্কুলের নতুন বিল্ডিং উঠছে। সেই খাতেই ডোনেশান দিয়েছে রাজীববাবু। গবমেন্ট থেকে ও-খাতে টাকা আসছে আরো আট লাখ। এবারে সেক্রেটারি হয়ে বসে বাড়ি বানাবার গোটা অর্ডারটাই ধরে নিয়েছে বেনামে। লাভটা তবে একবার ভাবেন!’

তা সাধুর সে-সব কথাবার্তা কতটা সত্যি তা না জানলেও, লাখটাকা দানের একটা প্রত্যক্ষ ফল দেবু চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিল। ইস্কুলটা উপস্থিত রাজীব বোসের ‘আমার’ ইস্কুল। মালিকের উদ্দেশে অতএব চাকরিপ্রার্থীকে একটু বিনয় দেখাতেই হয়! সে গলা নরম করে বলল, ‘আজ্ঞে না স্যার। দিব্যি পোষাবে। বাঙালির ছেলে। হাতে-সাধা চাকরি প্রাণ থাকতে পায়ে ঠেলতে পারব না।’

‘হুঁ। তা অবশ্য ঠিক কথা। চাকরি হল গিয়ে বাঙালি যুবকের হাতের নোয়া, সিঁথার সিন্দুর। এয়োতির চিহ্ন। আর চাকরিস্থল হল গিয়ে যাকে বলে শ্বশুরবাড়ি। ছেড়ে আর যাবে কোথায়? একবার জোয়ালে ঢুকলে সারাটা জীবন ঘষটাতেই হবে। তবে কিনা আজকালকার ছেলে তো! ঠিক ভরসা হয় না। তারপর ধরেন গিয়ে, এই তো মোটে চব্বিশ বচ্ছর বয়েস! বছরদুয়েক যদি সার্টিফিকেটে কমও দেখিয়ে থাকেন, তাহলেও মেরেকেটে ছাব্বিশের বেশি হয় না। এই কাঁচা বয়েসে—’

‘না, মানে স্যার, আমার ওরিজিন্যাল বার্থ সার্টিফিকেট—’

‘আহা থাক, থাক। ও-কাগজের দাম তো শহর-বাজারে একশোটি মাত্র টাকা। আর, আপনার বয়স আপনি ভাঁড়াবেন, তাতে দোষ কী মশায়? সবাই করে। কিন্তু কথাটা তা নয়। ঘটনা কী জানেন, আমাদের ইস্কুলে কেলাশ টেন-এ কয়েকটা মদ্দ আছে যেগুলো বয়সে আপনার কাছাছি বা সমানই হবে। চেহারাতেও বেশ ষণ্ডা। আপনার বয়সটাও কম! চেহারাও ফুরফুরে পলকা। মাস্টার হবার যুগ্যি নয়।’ গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়েন একবার রাজীব বোস। তারপর হেডমাস্টারমশায়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলেন, ‘আপনার ছেলেপিলেরা একে মাস্টার বলে মানবে তো রমেনবাবু?’

রমেনবাবু মানুষটির লম্বা একহারা চেহারা। নিরীহ, গোবেচারা টাইপ পার্সোনালিটি। অসহায় মুখ করে জবাব দিলেন, ‘কী করি বলেন সার? সরকার গ্র্যান্ট দেয় যে! কমিশনের অফিস থেকে যে লোকের নাম করে চিঠি পাঠাবে, তাকে তো আমাদের নিতেই হবে। আপন ইচ্ছেতে কিছু করতে পারি না!’

রাজীব বোস ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর দেবুর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে বললেন, ‘ওই তো হয়েছে কাল! কলিকালে রাজাপ্রজায় ভেদ নাই। সবকিছুতেই খালি আইন আর নিয়ম। নইলে ইস্কুল ফান্ডে লাখটাকা ডোনেশান দিয়েও এমন হাত-পা বাঁধা হাল হয়? সরকার যেমন খুশি একটা ছোকরা রাস্তা থেকে ধরে পাঠিয়ে দিলেও তাকে সোনামুখ করে মাস্টার বানিয়ে রাখতে হবে। কড়কড়ে হাজার-হাজার টাকা গুনে দিতে হবে মাসান্তে। নিজে দেখেশুনে বাজার বেছে ডাঁটো মাস্টার ধরে আনব যে তার জো নাই। কেঁদে কঁকিয়ে যদিওবা দু-একটাকে নেওয়া গেল, তো তাকে কেজুয়েল বানিয়ে রাখতে হবে, মাসে দু’হাজারের বেশি ঠেকানো চলবে না, হেন তেন হাজারগণ্ডা নিয়ম! দূর মশাই, এমন জানলে কে মাথা গলাতো এই বিজনেসে?’ মুখটা ভার করে একটা বিড়ি ধরালেন সেক্রেটারিবাবু। আর বিশেষ কথাবার্তা বলবেন না বলেই মনে হচ্ছিল।

ইন্টারভিউয়ের দায়িত্বে এবারে হেডমাস্টারমশাই। বাড়িতে কে কে আছেন, খেলাধুলো করা হয় কি না, গানবাজনার শখ আছে কি না, এ জাতীয় মামুলি কিছু সওয়াল-জবাব চলছিল, তা মিনিটপাঁচেক যেতে সেক্রেটারিবাবু আবার স্বমূর্তি ধরলেন। বলেন, ‘ফালতু কথাবার্তায় আমার সময় বরবাদ করেন কেন বলেন দেখি রাজেনবাবু? নিতে যখন একে হবেই তখন অন্ধ না অনাথ সেসব এত বাজিয়ে দেখার দরকারটাই বা কী? ওহে ছোকরা, কবে থেকে কাজে লাগবে তাই বলো।’

‘আজকেই জয়েন করব স্যার?’

দুই প্রৌঢ়ই এবারে একটু চমকালেন বলে মনে হল। তারপর রাজেনবাবু আগ বাড়িয়ে বলেন, ‘না না, এত তাড়া কীসের? বাড়ি যান, জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিয়ে ওপাশের সব বন্দোবস্ত সেরে তারপর এসে জয়েন করবেন’খন। চাকরি তো আপনার আর পালিয়ে যাচ্ছে না মশাই!’

দেবু হাসল, ‘না স্যার। বেকার মানুষ! দু’জোড়া জামাপ্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা, এক সেট তোশক বালিশ, এ বাদে বাড়িতে তো আর নিজের বলে কোনো বস্তু নেই! সেসব সঙ্গে করে নিয়েই এসেছি। থাকবার মধ্যে কিছু বই আছে। সে-ও এমন কিছু দামি নয়। সেকেন্ডহ্যান্ড। ফুটপাথ থেকে কেনা। সে নয় পরে একসময় গিয়ে নিয়ে আসা যাবে।’

রাজীব বোস দেখা গেল তার এহেন ব্যগ্রতায় বেশ খুশিই হয়েছেন। বলেন, ‘এই একটা বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছ ছোকরা এতক্ষণে। হাতের পাখি গরম-গরমই ধরতে হয়। সাত-দশদিন পরে এসে কাজে লেগে খামোখা সেই ক’দিনের মাইনেটা লস করবে কেন? ভালো ভালো! তবে আজকের দিনটা বরং বাদই দাও, বুঝলে? দুটোর পর থেকে অশ্লেষা লেগে গেছে। ছাড়তে-ছাড়তে কাল দুটো। তুমি বরং এক কাজ করো। কাল দুটোর পর এসে লেগে পড়ো। খাতায় অবশ্য সকালই দেখিয়ে দেবে। আধবেলার মাইনে মুফতে বেশি পাবে। তা হোক গে। আমার পকেট থেকে তো আর যাচ্ছে না! সরকার কা মাল! কী বলেন রাজেনবাবু, অ্যাঁ?’

নিজের রসিকতায় দেহ দুলিয়ে হো হো করে হাসেন রাজীব বোস। তারপর রাজেনবাবুর দিকে ঘুরে বলেন, ‘কাল দুটোর পর থেকেই লাগিয়ে দেন তবে। আজ বরং ইস্কুলটা একটু ঘুরে ফিরে দেখুক। ক্লাসগুলো চিনিয়ে দিন। নাইন টেন দুটো ক্লাসেরই পাটিগণিত আর বীজগণিত, সেভেনের এ-সেকশানের পুরো অঙ্ক, আর ক্লাস ফাইভের ভূগোলটাও যেন অমনি দেখিয়ে দেয়।’

‘না মানে স্যার, আমি বলছিলাম কি, শুরুতেই নাইন টেনের ক্লাস দিয়ে দেব? মানে, আনকোরা নতুন বাচ্চা ছেলে তো! অন্তত দুটো মাস কেটে গেলে একটু ধাতস্থ হলে তখন নয় দিতাম! অধীশবাবু তো নাইন টেনের ওই ক্লাসগুলো ভালোই চালিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি বলি তার চেয়ে বরং—’

কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সেক্রেটারিবাবুর গলাটা খানিক উচ্চগ্রামে বেজে উঠল এবার, ‘রাজেনবাবু, এই ইস্কুলের সেক্রেটারি কে? আপনি না আমি? মাস্টার, মাস্টারের মতো থাকবেন। পড়াবেন, শোনাবেন, ছাত্র ঠ্যাঙাবেন, কিন্তু এক্তিয়ারের বাইরে যাবেন না। যা বলছি সেইমতো করুন।’

 হেডমাস্টারমশাই একটু আহত হলেন মনে হয়। মুখটা একটু কালো করে চুপ করে রইলেন। ব্যাপারটা রাজীব বোসের নজর এড়ায়নি দেখা গেল। খানিক নরম গলায় বললেন, ‘ইলেকশান আসছে। অধীশবাবু লোকটা একটু বলিয়ে কইয়ে আছেন। এলাকায় ভালো জানাশোনাও আছে। ওকে আমার অনেক কাজে লাগবে। পড়ানোর কাজটা তো মশাই যে কেউ একটা চালিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এ কাজ তো আর যার তার পক্ষে সম্ভব হবে না! আমার দিকটাও তো একটু দেখতে হবে রাজেনবাবু!’

‘না না, সে তো ঠিকই, সে তো ঠিকই। আপনি বলছেন, তাই যথেষ্ট স্যার।’ বলতে-বলতেই সামনের ফাইলটা বন্ধ করছিলেন রাজেনবাবু, ‘আমি আজকেই অর্ডার-টর্ডার যা করবার সব করে রাখছি। এই, সুষেণ, এসটাব্লিশমেন্টের ফাইলটা নিয়ে একবার এদিকে একটু আসবে—’

‘ঠিক আছে। আমি তবে আজ উঠি। এনার ব্যাপারে ফাইল-টাইল, চিঠিপত্তর কিছু যদি আমার সই করার থাকে, বিকেলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন দারোয়ান দিয়ে। করে দেব।’

রাজীব বোস দরজার দিকে পা বাড়ালেন। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে ফের বললেন, ‘বলি কি রাজেনবাবু, ব্যস্ত মানুষ, পাঁচ ঝামেলায় থাকি, কাগজপত্তর যা পাঠাবেন, অত তো আর পড়ে দেখবার সময় পাব না! আপনি বরং যেখানে যেখানে সই করতে হবে সেখানে পেনসিল দিয়ে একটা করে দাগ দিয়ে দেবেন। আমি সইগুলো মেরে দেব।’

 তাঁর অপস্রিয়মান চেহারাটার দিকে তাকিয়ে রাজেনবাবু ঘাড় কাত করে জানালেন, বুঝেছেন। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে তাঁর। এবারে খানিক স্বস্তিভরে নস্যির ডিবেটা বের করতে-করতে দেবুর দিকে ঘুরে বললেন, ‘বড় বদমেজাজি লোক মশাই! তবে দিলটা দরাজ আছে। পালাপার্বণে খাওয়ায়-দাওয়ায় ভালো। এই তো ধরুন না, এবারে রথের দিনে তো যাকে বলে—’

মানুষটির চোখদুটি ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে উধাও হয়েছে। তাঁর নাকের নীচে নস্যির ঘন খয়েরি ছোপ। তামাকের তীব্র ঝাঁঝে সজল চোখদুটিকে বারংবার মুছতে-মুছতে তিনি রথযাত্রার দিনের ভোজের সেই অবিস্মরণীয় উদরতৃপ্তির বিবরণ দিয়ে যান। বড় অল্পে খুশি হন মানুষটি। পাঁচমিনিট আগে পাওয়া সরাসরি অপমানের দুঃখকে কত সহজেই মন থেকে মুছে ফেললেন অন্য একটা সুখস্মৃতির ইরেজার দিয়ে!

সুখী হতে পারবার কোনো একটা গ্ল্যান্ড থাকে বোধহয় কারো কারো শরীরে। সবার শরীরে থাকে না। নইলে, সবকিছু পেয়েও দাদা-বউদি কেন সুখী থাকে না?

‘ওই দেখুন, খালি খাবারের গল্পই শুনিয়ে যাচ্ছি তখন থেকে। আপনার দুপুরের খাওয়া-দাওয়া কিছু হয়েছে?’

দেবু চমক ভেঙে বলল, ‘হ্যাঁ সার। এখানে সাধু মণ্ডলের বাড়িতে এসে উঠেছি কাল রাতে। দুপুরে ওখান থেকেই খেয়েদেয়ে বেরিয়েছি একেবারে।’

‘সাধু?’ রাজেনবাবু একটু অবাক হয়েছেন দেখা গেল, ‘তাকে আবার চিনলেন কোথা থেকে? আগে থেকে জানাশোনা ছিল?’

‘না না। পথে আলাপ। এক বাসে এলাম মালদা টাউন থেকে। রাতে শিবতলার মোড়ে বাস থেকে নেমে কোথায় যাই তাই ভাবছি, তা টেনে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে তুলল।’

‘অ। সাধুর বাড়িতে উঠেছেন, তাহলে নিশ্চিন্দি। যে ক’দিন থাকবেন, খাতির-যত্ন ভালোই হবে। আমাদের ঈশ্বরপুরের মজাই এই মশায়। অতিথকুটুম এলে আহ্লাদে রাখে। আগুপিছু ভাবে না। থাকুন ক’দিন এ মুলুকে! আপসে বুঝে যাবেন।’

.

.

‘হ্যালো, কে বাপ্পা? হ্যান্ডসেটটা মা’কে দে তো একবার! না না, তোর মাকে না। আমার মা, ঠাম্মাকে দে।’

‘মা? এখানে কাজটা হয়ে গেল। কাল জয়েন করছি।’

‘না, এখন না। আসব একেবারে পুজোর ছুটিতে।’

‘আরে, মাস দুয়েকের তো মামলা।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, টাকা পাঠাব। প্রথম মাসের মাইনে পেয়েই এম ও করে দেব।’

‘সে যত খুশি পুজো দাও না তুমি, কে মানা করছে? শুধু হিসেব করে আমায় অ্যামাউন্টটা বলে দিও, তাহলেই হবে।’

মা’র বিড়বিড় করে বলা জবাবগুলোর ফাঁকে ‘খুট’ করে একটা শব্দ হল। তার মানে প্যারালাল লাইনে বউদি ছিল। থাকতে বাধ্য। এইবারে ফোনটা ছেড়েছে। এই শব্দটুকুর জন্য দেবু অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ। এইবার বলল, ‘পুজোর ছুটির পরে তুমি আমার কাছে এসে থাকবে মা? ওখানে তো—’

টেলিফোনের কথাবার্তা শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। তবু, বাকি কথাগুলো টেলিফোনের সাহায্য ছাড়াই স্বচ্ছন্দে প্রবাহিত হয়ে চলে মা ও ছেলেটির মধ্যে। মনে মনে দেবু তার মা’কে সাহস দেয়, এখানে আর তোমায় কোনো ঝগড়া শুনতে হবে না মা! ওরা বরং খুশিই হবে তুমি চলে এলে। ও-বাড়িতে তোমার ঘরটা বাপ্পার ঘর হয়ে যাবে। ছেলেটা বড় হচ্ছে। আলাদা ঘর তো তার একটা লাগবেই! বাপ্পা খুশি হবে, নিজের একটা ঘর পেয়ে। আমি খুশি হব, তুমি আসবে বলে। আর তুমি? তুমিও কি খুশি হবে না মা? তবে দেখো, তুমি ঈশ্বরপুরে চলে এলে সবাই কেমন খুশি থাকবে! তোমায় আমি ঈশ্বরপুরেই নিয়ে আসব মা!

ফিরতে-ফিরতে বেলা একেবারেই পড়ে এল। ছোট একটা জলচৌকি নিয়ে সামনের দিকে উঠোনে বসে সাধু বাখারি চাঁচছিল। দেবুকে ঢুকতে দেখে হাতের দা’টা নামিয়ে রেখে বলে, ‘খবর কী মাস্টারভাই? কাজ তো শুনলাম হয়ে গেছে!’

‘সে কী? এর মধ্যেই খবর হয়ে গেল?’

সাধু চোখ বুজে হাতের আঙুলগুলো নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে, ‘হুঁ-হুঁ, ঈশ্বরপুরে সব খবর চলে টরেটক্কায়। এ আপনাদের শহর বাজার নয়, যে পাশের ঘরে বাসি মড়া পরে থাকবে দশদিন ধরে অথচ কেউ টেরটি পাবে না!’

‘তবে তো সব জানোই! আমায় আর জিগ্যেস করো কেন?’

‘আহা, পাঁচমুখ ঘুরে খবর শোনা আর একেবারে ঘোড়ার মুখে থেকে খবর শোনা, তফাত হবে না? এই যেমন ধরেন, জোর গুজব রটেছে, রাজীব বোস নাকি আর একটু হলেই আপনাকে ভাগিয়ে দেওয়ার মতলব করেছিল, বয়স কম-এর দোহাই দিয়ে!’

‘হুম। আর কী শুনেছ?’

‘শুনলাম, রাজেনবাবু মাঝে পড়ে সেটা আটকেছেন। তাই নিয়ে বিস্তর ঝগড়াও হয়েছে নাকি দু’জনে!’

‘তা আমার আর বলার বাকি কী রইল?’

‘না মানে, রাজেনবাবু, রাজীব বোসের সঙ্গে গলা তুলে ঝগড়া করবে, এটা বিশ্বাস হয়? তাই বলছিলাম, আপনি তো একেবারে সামনেই ছিলেন, কথাটা কতটা সত্যি সে আপনিই সবচে ভালো বলতে পারবেন।’

দেবু কাঁধ ঝাঁকালো একবার, ‘ও শুনে আর কী করবে? আসল কথা হল, চাকরিটা পেয়েছি। কাল থেকে জয়েন।’

রসালো ঘটনাটার একটা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ না পেয়ে সাধু একটু ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে হল। বড় আশা করে বসে ছিল মনে হয় দুপুর থেকে! তবে পরমুহূর্তেই সেটা ঝেড়ে ফেলে, পাশে রাখা হুঁকোটাতে দুটো টান মেরে নিভন্ত কলকেটাকে একটু জাগিয়ে দিয়ে বলে, ‘তবে তো এখন থেকে আপনি ঈশ্বরপুরের ঘরের লোক হয়ে গেলেন মাস্টারভাই! তা, এবারে আমার একটি প্রস্তাব আছে। আপনি থির হয়ে বসেন এখানে। প্রস্তাবটা বলি।’

পাশে পড়ে থাকা একটা জলচৌকি টেনে নিয়ে তার ওপর বসে দেবু একটা সিগারেট ধরাল।

‘বলি কি, এইবারে তো তবে একটা বাসার জোগাড় দেখতে হয়! তা বাড়িটাড়ি কেনবার মতোন টাকাপয়সা তো এখন নাই। তাহলে? বাসা ভাড়া নেবেন তো?’

‘হ্যাঁ, তা তো নিতেই হবে!’

‘তা প্রস্তাবটা হল, কাল রাতে পুবের ভিটায় যে ঘরখানার বারান্দায় ছিলেন ওই ঘরটাই ভাড়া নেন না কেন? পরিবারের উৎপাত তো নাই! ঝাড়া হাত-পা একলা একলা থাকবেন। রান্নাবাড়ার ঝামেলাও করতে হবে না। আমার ঘরেই নয় দু’বেলা দুটি খেলেন। ভাড়া ওই যা হয় একটা—’

দেবু হেসে মাথা নাড়ল, ‘না সাধু। সে হবে না। আমার একটা আলাদা ছোট বাড়ি চাই। একেবারে আলাদা। তাতে দুটো শোয়ার ঘর থাকবে, রান্নাঘর থাকবে, বারান্দা থাকবে একফালি। বাগান করবার জমিও চাই খানিকটা। মাসদুয়েক বাদে মা’কে নিয়ে আসব এখানে।’

স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল সাধু। দেবু একটু অপ্রস্তুত হচ্ছিল। কিছু ভুল বলে ফেলল নাকি? একটু বাদে গলা খাঁকারি দিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল সাধু?’

‘নাঃ! কিছু না মাস্টারভাই। আমার ঘরে আর এক অতিথ এসে এমন একটা বাড়িই চেয়েছিল একবার। তা-ই মনে পড়ে গেল আর কি! বানিয়েও দিয়েছিলাম, কিন্তু—’

বলতে-বলতেই ঝাড়া দিয়ে উঠল সাধু। বলে, ‘সে কথা যাক। আপনার ইচ্ছেটা আমি বুঝেছি। সে ব্যবস্থাও আছে। আসেন দেখি আমার সঙ্গে!’

মূল বাড়িটার পেছন দিয়ে একটা সরু পায়েচলা পথ একটা আমবাগানের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে। শেষ বিকেলে মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠেছে বেশ। আলোর রেখাগুলো আমপাতার ফাঁক-ফোকর গলে ইতিউতি ছড়িয়ে যাচ্ছে ভেজা, ভাপ ওঠা মাটির ওপর। গোলাপখাসের বাগান। শেষ শ্রাবণে এসে গাছগুলোতে ফল নেই একটাও। ঘন কালচে সবুজের অরণ্য অবগুণ্ঠনে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে না কোনো স্বর্ণাভ হলুদ ব্যতিক্রম।

তার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে, আচমকাই বাগান শেষ হয়ে গিয়ে একটা ফাঁকা জমির ওপরে ছোট্ট বাড়িটা দেখা গেল। গোধুলি লগ্নের মায়াবী কনে দেখা আলো এসে পড়েছে তার ওপর।

স্বপ্ন কি সত্যি হয়? দেবু অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছিল বাড়িটাকে। হলদে দেওয়াল, লাল টালি, সবুজ দরজা জানালা! এই বাড়িটাই তো বারে বারে স্বপ্নে দেখেছে সে! কোনো লোডশেডিংয়ের রাতে বেলগাছিয়ার ওই ঘিঞ্জি গলিতে তাদের পুরোনো হয়ে আসা বাড়িটার চিলেকোঠার ঘরে শুয়ে গরমে হাঁসফাস করতে-করতে চোখ যখন অবশেষে জুড়ে আসত, তখন মাঝেমাঝেই এই বাড়িটাকেই তো স্বপ্নে দেখেছে বারবার! লাল টালির চাল, হলদে দেওয়াল, সবুজ জানালা।

‘হুঁ-হুঁ, মনে ধরেছে দেখছি! বড় শখ করে বানিয়েছিলাম মাস্টারভাই! পেছন দিকে একটা ছোট পুকুরও আছে। তা, যার জন্য এতসব করা, সব শখে সে নিজেই জল ঢেলে দিয়ে চলে গেল।’

সাধুর মুখের সুখী ভাবটার ওপর দিয়ে মুহূর্তের জন্য একটা কালো ছায়া ভেসে গেল। তবে, পরমুহূর্তেই আবার যে কে সেই। দেবুর দিকে চেয়ে একগাল হেসে বলে, ‘তবে এখানেই এসে ওঠেন মাস্টারভাই। কিন্তু একটা কথা। খাওয়া-দাওয়াটা আমার কাছেই করেন। অন্তত মাঠাকরুন যদ্দিন না এসে পড়েন! দু’বেলা আমার ভিটেয় গিয়ে পাত পাড়তে আপত্তি হলে খাবার না হয় এ-বাড়িতে আমিই পৌঁছে দিয়ে যাব। এটি আমার ওনার কথা। আমার নয়। তার বড় মনে ধরেছে আপনাকে।’

সাধুর পরিবারে কোনো একটা ট্র্যাজেডি আছে বোঝা গেল। সবটা ভেঙে বলেনি। দেবুও খোঁচালো না বিশেষ। তবে, সেন্টিমেন্টের সুযোগ নিয়ে সাধুকে ঠকাতে চাইছিল না সে। শেষে সাধুর প্ল্যানটাই মেনে নেওয়া হল একটা শর্তে—সাধুকে ঠিকঠাক পরিমাণে একটা ভাড়া নিতে হবে। তবে বাজারে ঘরভাড়ার রেটের খোঁজ নিয়ে যদি দেবু দেখে সাধু কম ভাড়া নিচ্ছে, তবে দেবু সেই বেশি রেটেই ভাড়া দেবে। সাধুর আপত্তি করা চলবে না।

এই শেষ শর্তটা শুনে সাধু হো হো করে হেসে উঠে বলে, ‘আপনি মাস্টারভাই একটা সংসার করেন শিগগির করে। যে ভাড়াটে এমন শর্ত দেয়, তার একটা শক্তপোক্ত গার্জেন দরকার। নইলে পাঁচভূতে মিলে সব লুটেপুটে খেয়ে যাবে, টেরটিও পাবেন না। যতই আয়-রোজগার করেন না কেন, ভাঁড়ে রইবেন মা ভবানী।’

দেবু হাসল, ‘পাঁচভূত কীরকম সাধুদা? তোমার মতো? অমন পাঁচটা ভূত যদি পাই তবে আমার জ্যান্ত মানুষের আর দরকার নেই দুনিয়ায়।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *