অবগুণ্ঠিতা – পরিচ্ছেদ ২৬

২৬.

কিরীটী এবারে সকলকে ধীর গম্ভীর স্বরে সম্বোধন করে বললে, এবার আমি আপনাদের সকলকে বলবো, কেমন করে আমি খুনের কিনারা করলাম! এই খুনের ব্যাপারে একটা কুশ্রী চক্রান্ত জট পাকিয়ে আছে। এবং সেই চক্রান্তের জের টেনে আমাকে অতীত ইতিহাসের মধ্যে যেতে হবে। কিন্তু তারও আগে আমি বিশ্লেষণ করে বলব, প্রথম দিনই কেমন করে আমার চোখে ধরা পড়েছিল খুন করা কার পক্ষে বেশী সম্ভব! এক্ষেত্রে আপনারা প্রত্যেকেই মিঃ সরকারের খুনের ব্যাপারে সন্দেহের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন, কেননা মিঃ সরকারের মৃত্যুতে আপনারা প্রত্যেকেই টাকার দিক থেকে লাভবান হন!

প্রথমেই ধরা যাক, সেরাত্রে এই বাড়িতে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন—সৌরীন্দ্রবাবু, অশোকবাবু, রামচরণ—সর্বপ্রথমেই ধরা যাক অশোকবাবুর কথা। অশোকবাবু একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট। তার পক্ষে বিষপ্রয়োগ করে মিঃ সরকারকে খুন করা এতটুকু অসম্ভব ছিল না। উইল অনুসারে তিনি মিঃ সরকারের মৃত্যুতে লাভবান। অশোকবাবু অনায়াসেই নিজের ঘরের ব্যালকনি দিয়ে সৌরীন্দ্রবাবুর ব্যালকনিতে এসে, তারপর সেখান দিয়ে মিঃ সরকারের ব্যালকনিতে এসে মিঃ সরকারকে খুন করতে পারতেন। কিন্তু তার জীবনী আলোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, চিরকাল তিনি মামার অনুগ্রহেই লালিত-পালিত। তাই মামার মৃত্যুতে তিনি লাভবান হলেও তাঁর পক্ষে এ ধরনের কাজ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কেন?

অশোকবাবু তার মামাকে যথেষ্ট ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি জানতেন মামার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তিনি পাবেন। এক্ষেত্রে তিনি মামাকে খুন করতে যাবেনই বা কেন? অন্তত কোন বিবেচক বুদ্ধিমান ব্যক্তি তা করে না এবং মানুষের সাধারণ সাইকোলজিও তা বলে না। তার উপর প্রত্যেকেরই জবানবন্দীতে প্রকাশ পেয়েছে, অশোকবাবুর স্বভাব ধীর স্থির ও শান্ত। কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ হচ্ছে, রাত্রে গোপাল এসে তার ঘর থেকে যে সময় থালা নিয়ে যায়, ঠিক সেই সময়েরই কিছু পরে মিঃ সরকার খুন হন। যে লোক একটু পরে খুন করতে যাবে, সে ঐভাবে নিশ্চিন্তে খেতে পারে না। কিন্তু তবু তার প্রতি সন্দেহ একটু থেকে যায়। এখানে আমি বেনিফিট্‌ অব্ ডাউট-এর পক্ষ নিয়েছি। যা হোক, অশোকবাবুকে বাদ দিলে এরপর যাঁর কথা মনে পড়ে–তিনি হচ্ছেন সৌরীন্দ্রবাবু।

সৌরীন্দ্রবাবুর নিজস্ব জবানবন্দীতে ও অন্যান্য সকলের জবানবন্দী থেকে যতটুকু আমরা জেনেছি, তা থেকে কী প্রমাণ হয়? সৌরীন্দ্রবাবুর পক্ষে তার পিতাকে খুন করা এতটুকুও সম্ভব ছিল না। তার কারণ অনেকগুলো। এবারে সেগুলোই একটার পর একটা আলোচনা করব। প্রথমত, সৌরীন্দ্রবাবু ছিলেন অত্যন্ত খেয়ালী ও উদ্ধৃঙ্খল প্রকৃতির। যে টাকা মাসোহারা হিসাবে তার বাপের কাছ থেকে তিনি পেতেন, তা দিয়ে তার হাতখরচ কুলাতো না। উচ্চুঙ্খল জীবনের অভিশাপ ঐখানেই। কোন উপায়েই কোথাও শান্তি নেই। টাকার জন্য তিনি জুয়া খেলতেন, রেসে যেতেন পর্যন্ত। দিনের পর দিন অধঃপতনের পথে নেমেই চলেছিলেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ এগারো বৎসর আগে একবার তিনি শিমুলতলায় বেড়াতে গিয়ে এক বন্ধুর বোনকে বাড়ির সকলের অজান্তে রেজেস্ট্রি করে বিবাহ করেন। বিবাহ করবার ২০২২ দিন বাদেই তিনি অকস্মাৎ গা-ঢাকা দিয়ে সরে পড়েন। শিমুলতলায় উনি ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। কিছু দিন পরে উনি ওঁর স্ত্রীর এক চিঠিতে জানতে পারেন যে ওঁর স্ত্রীর সন্তান হবে, তখন উনি স্ত্রীকে নিয়মিত যে মাসোহারা দিতেন, তাও বন্ধ করে দেন। ওঁর একটি কন্যাসন্তান জন্মায়।

সহসা এমন সময় গণেনবাবু বলে উঠলেন, সে কি সৌরীন্দ্র, তুই বিয়ে করেছিস, এ কথা তো কাউকে বলিস্ নি! আর বিয়ে যখন করেছিলি, তখন বৌমাকে ঘরে আনিস নি কেন?

সৌরীন্দ্রবাবু একেবারে নিশূপ। একটি কথাও মুখে নেই।

কিরীটী এবারে সোজাসুজি সৌরীন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলে, কী সৌরীন্দ্রবাবু, আমার কথা ঠিক না?

হ্যাঁ।

এ কথা এতদিন গোপন করে রেখেছিলেন কেন?

বাবার বকুনির ভয়ে। তাছাড়া আমি নাম ও জাত দুটোই গোপন করে বিবাহ করেছিলাম।

সে যা হোক, আপনি জানেন আপনার স্ত্রী ও কন্যা কোথায়?

স্ত্রী কোথায় আছে তা জানি, কিন্তু ছয় বৎসর হল কন্যার কোন সংবাদ জানি না।

কন্যার সংবাদ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন?

করেছি, কিন্তু কোন সন্ধানই পাইনি। শুনেছি ছয় বৎসর আগে কে বা কারা তাকে চুরি করে নিয়ে গেছে।

আপনার এ বিবাহের কথা আর কেউ জানত?

না।

না সৌরীন্দ্রবাবু, আপনি ঠিক জানেন না, আরো একজন এ সংবাদ জানত।

কে সে?

আপনার কাকা বিনয়েন্দ্রবাবু! কী বিনয়েন্দ্রবাবু, আপনি জানতেন না?

বিনয়েন্দ্রবাবু কোন জবাব দিলেন না। নিঃশব্দে বসে রইলেন।

আপনার বাবার মৃত্যুর দিন রাত্রে কী ব্যাপার নিয়ে আপনার সঙ্গে আপনার বাবার ঝগড়া। হয়েছিল সৌরীন্দ্রবাবু?

বাবাকে আমি আমার বিবাহের কথা বলেছিলাম বলে সেই কথারই জের টেনে তার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়। বাবাকে ঐ কথা বলায় বাবা একটা নতুন উইল করেন এবং সে উইলের লেখাপড়া ঐদিনই শেষ হয়। বিকালে বাবা বলেন, সে উইলে আমার ভাগের সমস্ত সম্পত্তির চার ভাগের তিন ভাগ কাকার নামে ও বাকি এক ভাগ আমার স্ত্রীর নামে লিখে দিয়েছেন।

এতদিন সেকথা গোপন করে রেখেছিলেন, হঠাৎ আবার সে কথা বলতে গেলেন কেন?

নেকড়ের থাবা আমাকে ব্ল্যাকমেল করে আমার জীবন্ত করে তুলেছিল। তার খাই মেটাতে গিয়ে আমাকে রেস খেলতে হত, জুয়া খেলতে হত। অবশেষে আর না পেরে বাবার কাছে সব কথা স্বীকার করেছিলাম।

হুঁ, ব্যাপারটা এতক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গেল। তাই বলছিলাম, সৌরীন্দ্রবাবুর পক্ষে তাঁর পিতাকে খুন করা খুবই সম্ভব ছিল। তিনি থাকতেন পাশের ঘরে। অনায়াসেই যে কোন সময়ে। এসে তার বাবাকে খুন করে আবার তিনি চলে যেতে পারতেন। কিন্তু খুন করবার পদ্ধতি দেখে বোঝা যায়, যে খুন করেছে সে বিজ্ঞানে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। কিন্তু সৌরীন্দ্রবাবুর পক্ষে ওভাবে খুন করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া সৌরীন্দ্রবাবু ও অশোকবাবুর মধ্যে কেউ একজন যদি ঐ ব্যালকনি-পথে এসে খুন করতেন, তবে দুজনের একজন জানতে পারতেনই। কথাটা চাপা থাকত না। সৌরীন্দ্রবাবু তার বাবাকে খুন করলে ক্ষতিগ্রস্তই হতেন, মিঃ সরকার থাকলে হয়তো কোনও একদিন তার মত বদলাত—ব্যাপারটা সহজ হয়ে আসত। সেক্ষেত্রে উনি তার বাবাকে খুন করে সব দিক নষ্ট করতে যাবেন কেন?

এরপর আসা যাক্ রামচরণের কথায়। রামচরণকে এক কথায় আমি বিশ্বাস করেছিলাম। সে বলেছিল, রাত্রি দেড়টার সময় শব্দ শুনে সে ঘরে এসে উঁকি দেয়। সত্যিই যদি সে খুনী হতো, তবে সে অত সহজে ও কথাটা বলতে পারতো না। তাছাড়া মিঃ সরকারের মৃত্যুতে তার যা লাভ, বেঁচে থাকলেও তাই। তবে সে পুরাতন মনিবের প্রাণ নিতে যাবে কেন?

এরপর যাঁরা বাইরে ছিলেন, তাদের মধ্যে সুবিমলবাবু, গগনবাবু ও বিনয়েন্দ্রবাবু। সুবিমলবাবুর মুভমেন্ট সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, রাত্রি দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত তিনি Rainbow Cub থেকে বের হয়ে পার্ক সার্কাসে এক বিখ্যাত জুয়ার আড্ডায় ছিলেন। গণেনবাবু সিনেমা থেকে ফিরে তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তার কারণ তিনি জেনেছিলেন, তার বাবা আর একটা নতুন উইল করেছেন। সেই সম্পর্কে জানতে, অন্য কোন কারণে নয়। আর রাত্রি সাড়ে বারোটায় তিনি বাড়ি ফিরে যান।—খুন হয়েছে তার পরে সেকথা ময়নাতদন্তেই প্রকাশ হয়েছে। বাকি থাকলেন আমাদের বিনয়েবাবু। বিনয়েন্দ্রবাবুই খুনী—সেকথা প্রমাণিত হয়েছে। গোড়া থেকেই আমি বিনয়েন্দ্রবাবুকে সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু কেন?

বিনয়েবাবুর একটা চমৎকার অ্যালিবাই ছিল। সেটা হচ্ছে ঐ রাত্রে তিনি বরাহনগরে বন্ধুর বাসায় বিবাহ-উৎসবে মেতেছিলেন। রাত্রি বারোটা পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। আগে থেকেই তার প্ল্যান ঠিক করা ছিল। প্ল্যান অনুযায়ী তিনি ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এসে বাথরুমের বাইরে অপেক্ষা করেন। রাত্রি সাড়ে বারোটার পর তিনি বাথরুম দিয়ে এসে দাদার লাইব্রেরি ঘরে প্রবেশ করেন। তার দাদা তখন লাইব্রেরি ঘরে বসে পড়ছেন। তিনি পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করে থাকেন। গজেনবাবু শয্যায় শুয়ে ঘুমোবার পর বিনয়েন্দ্রবাবু তার দাদাকে বিষপ্রয়োগ করেন। তিনি কিছুদিন ডাক্তারি পড়েছিলেন, ও বি.এস-সি পাস ছিলেন। কোন্ বিষের কেমন ক্রিয়া তার পক্ষে জানা খুবই সম্ভব। তাই খুন হবার পর মিঃ সরকার যখন শয্যা থেকে মাটিতে পড়ে যান, তাড়াতাড়ি তখন তিনি মৃতদেহ তুলে নিয়ে লাইব্রেরি ঘরে চেয়ারের উপরে বসিয়ে দেন। রামচরণের আসতে একটু দেরি হয়েছিল, তার মধ্যেই বিনয়েন্দ্রবাবু কাজ হাসিল করে আত্মগোপন করেন। রামচরণ ঘরের মধ্যে খুঁজলেই বিনয়েন্দ্রবাবুকে দেখতে পেত।

যা হোক, তারপর বিনয়েন্দ্রবাবু সোজা বারান্দা দিয়েই নিজের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করেন। অশোকবাবু ঘুমিয়ে পড়লে তার সিরিঞ্জটা চুরি করে নিয়ে আবার দাদার ঘরে এসে প্রবেশ করেন এবং মৃতদেহের হার্টে পাংচার করে আবার নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে দুই ঘরের মধ্যবর্তী দরজা দিয়ে অশোকবাবুর ঘরে যান এবং সিরিঞ্জটা রেখে আসেন। সকলকে একটা ধোঁকা দেবার জন্য। সমস্ত ঘড়িগুলো রাত্রি দুটোর সময় বন্ধ করে নীচের সিঁড়ি দিয়ে যখন পালাতে যান, তখন গোপালের চোখে পড়ে যান। তাড়াতাড়ি আবার উপরে চলে আসেন। বাধ্য হয়েই তাকে তখন। যে পথে তিনি এসেছিলেন, সেই পথেই আবার পালাতে হয়। যদিও এতখানি দায়িত্ব নেওয়া তার পক্ষে খুবই দুঃসাহসের কাজ হয়েছিল তার উচিত ছিল লাইব্রেরি ঘরের দরজা দিয়েই বের হয়ে যাওয়া। তাই আমার মনে হয়েছিল, দরজা কেন বন্ধ? ওটা বন্ধ থাকা তো উচিত ছিল না?

আবার তিনি ট্যাক্সিতে করে বরাহনগরে বিবাহ-বাড়িতে ফিরে যান ও সকালে ফিরে আসেন। দুটো কারণে তাকে আমি সন্দেহ করি। এক নম্বর, খুনের পদ্ধতি ও দুনম্বর, তিনি নিজে একজন আর্টিস্ট। তার পক্ষে সুবিমলবাবুর হাতের লেখাটা নকল করে একটা চিঠি লেখা অসম্ভব কিছুই ছিল না। এবং করেও ছিলেন তাই। যাতে সুবিমলের ওপর সন্দেহটা পড়ে। কিন্তু কেন তিনি খুন করলেন? টাকার লোভে! সৌরীনের বিবাহের সংবাদে নিজে আত্মগোপন করে নেকড়ের থাবাকে দিয়ে তার সাহায্যে নিজের ভাইপোকে তিনি শোষণ করছিলেন এবং তিনিই ষড়যন্ত্র করে সৌরীন্দ্রবাবুর মেয়েকে চুরি করেন। ইচ্ছা ছিল সময়মত সৌরীনের কাছ থেকে ঐ মেয়েকে দিয়ে আরও কিছু শোষণ করবেন। কিন্তু ভাগ্যচক্র ঘুরে গেল—সব ভেস্তে গেল। অতি লোভে তাঁতী নষ্ট হল। তাই আমি সেদিন বলেছিলাম, খাচ্ছিল তাঁতী তাঁত বুনে, কাল হল তার এঁড়ে গরু কিনে!

আমার কাজ শেষ হয়েছে। বিনয়েন্দ্রবাবুকে সুব্রতর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সুব্রত ওঁকে দেবে ধর্মাকিরণের হাতে তুলে। সেখানে হবে ওঁর বিচার। আর সৌরীনবাবু, আপনার মেয়েটিকে সুব্রত নেকড়ের থাবার কবল থেকে উদ্ধার করেছে। সে এখন তার মার কাছে। কালই সকালে তাঁদের সঙ্গে দেখা করবেন। আচ্ছা আসি, নমস্কার। চল রে, সুব্রত, তালুকদার রইলেন, উনি ওঁর অতিথির সংবর্ধনা করবেন! বন্ধু, বড় চাল চেলেছিলে কিন্তু একটা কথা তুমি ভুলে গিয়েছিলে যে আমি কিরীটী রায়!