অপঘাত – ২

টেক্সাসের এই এলাকা যখন পুরোপুরি নির্জন আর বুনো ছিল, তখন এসেছি আমরা। সবাই যে পালিয়ে আসা বা ব্যর্থ মানুষ, তা নয়। কেউ কেউ মুক্ত বুনো জীবন পছন্দ করে, ধাতস্থ হয়ে গেছে এতে, সেজন্যেই এখানে আসা। আবার কেউ কেউ স্রেফ অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় পশ্চিমে পাড়ি জমায়। ৩-অপঘাত

জীবন এখানে শত বিপদ ও দুর্ভোগে ভরা, কিন্তু আমরা কেউই বিপদ মনে করি না, এসব বরং দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ দুর্ভোগের মতই, যেগুলোকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকতে হয় বাহবা পাওয়ার জন্যে কিংবা সাহস দেখানোর জন্যে অস্ত্র বহন করে না কেউ, বরং টেক্সাসের বুনো অঞ্চলে নিরস্ত্র অবস্থায় বেঁচে থাকা অসম্ভব বলেই অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে মানুষ। খাবার বা ঘোড়া ছাড়া যেমন বাঁচতে পারে না কেউ, অস্ত্রের গুরুত্বও ঠিক তেমনি।

ইন্ডিয়ানদের মত বেঁচে থাকতে শিখেছি আমরা, ওরাই আমাদের আদর্শ। কারণ রেডস্কিনরাই এই এলাকার আদি অধিবাসী এবং দেশটার নাড়ি-নক্ষত্র জানে। কারও সাহায্য প্রত্যাশা করা যায় না এখানে, নিজের গরজে নিজের খাবার যোগাড় তৈরি করে নিতে হয়। এখানে একজন মানুষের বন্ধু কেবল সে নিজে।

অথচ যথেষ্ট সময় নেই হাতে। পশ্চিমে অবারিত জমি পড়ে আছে-ওখানেই আমাদের স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। এমনকি পুবেও একটা কথা চালু আছে-পশ্চিমে সোনা ফলে। পশ্চিম বিপদগ্রস্ত, ব্যর্থ বা পলাতক মানুষের পৃথিরী। এবং স্বপ্নের পৃথিবী-যারা স্বপ্ন দেখতে জানে এবং স্বপ্নটাকে বাস্তবে রূপান্তর করার পূর্বশর্ত হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করার ইচ্ছে রাখে। অর্ধেক পৃথিবী জানে এ খবর, লোকজন আলোচনা করতে পছন্দ করে। পশ্চিম হচ্ছে বেকার, জালিয়াত, অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয়, একাকী কিংবা ব্যর্থ মানুষের পুনর্বাসন কেন্দ্র। প্রায় সবার স্বপ্নের পৃথিবী।

কাউ-হাউসের তৃণভূমি পেছনে ফেলে পশ্চিমে এগোচ্ছে গরুর পাল। ডোরাকাটা বলদটা নেতৃত্ব দিচ্ছে। জানে না কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু যেখানেই যাক প্রথম হওয়ার ইচ্ছে ষোলোআনাই আছে ওটার। প্রায় তিন হাজার পাঁচশত গরু, বিভিন্ন বয়সী। পালের আগে আগে চলছেন বাবা আর ট্যাপ এলে?

ধুলোর অত্যাচার এড়াতে ওয়াগনগুলো একপাশে দেখেছি আমরা। টিম অটম্যানের এক ছেলে চালাচ্ছে, একটা, মিসেস অটম্যান চালাচেই আরেকটা ওয়্যাগন। তৃতীয় ওয়াগনটা চালাচ্ছে রাস্টি বুচার্ডের স্ত্রী। আর টম জেপসনের বিশাল ওয়াগন চালাচ্ছে ফ্রাঙ্ক কেলসি।

টম এবং রোজিটাও যাচ্ছে আমাদের সঙ্গে। ঠিকই ধারণা করেছে। কার্ল ক্ৰকেট, কারণ বাবার কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়া মাত্র গরু সহ পুরো র্যাঞ্চ বেচে দিয়ে আমাদের সঙ্গী হয়েছে জেপসন। সব ঘোড়া আর তিনশোর মত গরু রেখেছে। গরুগুলো অবশ্য ব্রীডিং স্টকের অংশ।

সঙ্গে দু’জন কাউহ্যান্ডকে নিয়ে এসেছে টম-কেলসি আর স্যাম গার্ট। শীর্ণকায় একটা মিউলে চড়ে প্রথম যখন টেক্সাসে এসেছিল জেপসন, তখন থেকে ওর সঙ্গে আছে কেলসি আর গার্ট?

টিল্টন, হীথ আর মুর পালের এক পাশে রাইড করছে, সঙ্গে বাবার দুই হ্যান্ড রয়েছে। মিলো ডজ এবং ফ্রিম্যান স্কয়ার। পালের ওপাশে আছে অন্যরা।

ট্যাপ এডলে আসার আগে থেকেই গরু জড়ো করছিলাম আমরা, যাত্রা করতে তাই দেরি হয়নি। যাওয়ার সিদ্ধান্ত যখন চূড়ান্ত, অয়থা দেরি করার কিংবা আক্রমণের অপেক্ষায় থেকে লাভ নেই। একমাত্র দ্রুত গতিই নিরাপত্তা দিতে পারে আমাদের।

সূর্য উঠার আগেই যাত্রা করেছি। প্রথম কয়েক মাইল গরুগুলোকে প্রায় ছুটতে বাধ্য করেছি। যতটা সম্ভব ওদের ব্যস্ত রাখতে পারলেই মঙ্গল, তাহলে গন্তব্য নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ পাবে না।

স্কাউটিঙের দায়িত্বে রয়েছে দু’জন। বাম দিকে রেকি করতে গেছে টিম অটম্যান, আর রাস্টি বুচার্ড গেছে ডান দিকে। হর্নার আউটফিটের আগমনের আভাস পাওয়ার ইচ্ছে।

পালের পেছনে আছি কার্ল আর আমি! ধুলোর অত্যাচার আমাদেরই বেশি সইতে হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া বা অনিচ্ছুক গরুকে তাগাদা দেয়া আমাদের কাজ। কোনটা যদি দলছুট হওয়ার ধান্ধা করে, ওটাকে খেদিয়ে পালে ঢোকানোর দায়িত্বও, পড়েছে আমাদের ঘাড়ে। ড্রাইভে এষ্টাই সবচেয়ে কঠিন এবং কষ্টকর কাজ।

প্রথম রাতে পনেরো মাইল দুরে ক্যাম্প করলাম আমরা। ঝর্নার পাড়ে এক চিলতে খোলা জায়গা বেছে নিয়েছি, যথেষ্ট ঘাস রয়েছে। আশা করা যায় দলছুট হবে না গরুগুলো। সঙ্গে কি কয়েক মাইল দূরে লিয়ন নদীতে গিয়ে পড়েছে।

রাতের প্রথম দিকে পাহারায় থাকল বেন টিল্টন আর জিম মুর, পালের ওপর নজর রাখছে সারাক্ষণ। চাক-ওয়্যাগনের কাছে চলে এল অন্যরা, মেয়েরা রান্নার আয়োজন করছে।

এখন থেকে প্রায় রুটিনমাফিক চলবে সবকিছু ব্যতিক্রম হবে খুবই কম। যদি না কোন ঝামেলা হয়। সারাদিনে পনেরো মাইল এগোনো সম্ভব, যদিও গড়ে বারো মাইল হলেও সন্তুষ্ট হব আমরা। ঘোড়া কম আমাদের, মাথা পিছু পাঁচটা করে আছে: কিন্তু এতবড় ড্রাইভের জন্যে জনপ্রতি অন্তত আট-নয়টা ঘোড়া দরকার।

পাল যেহেতু বিশাল, পানি পান করার জন্যে ছড়িয়ে পড়বে গরুগুলো, মাইল খানেক দূরে সরে যাওয়াও বিচিত্র নয়। ঘাসে চরার পর ভরপেট খেয়ে ঘুমাবে ওরা, প্রায় মাঝরাতে জেগে উঠবে, হাত-পা ঝেড়ে খানিক ঘোরাফেরা করবে, তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়বে। কয়েক ঘন্টা পর, জেগে আড়মোড়া ভেঙে ফের ঘুমিয়ে পড়বে। দ্বিতীয়বারের সময় কিছু গরু হয়তো সরে পড়তে পারে। কিন্তু ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াবে সব গরু, চলার জন্যে তৈরি হয়ে যাবে। সাধারণ আবহাওয়ায় ওদের সামলে রাখার জন্যে দুজনই যথেষ্ট, কিন্তু ঝড় হলে প্রতিটি লোককে দরকার হবে।

কাপ আর টিনের থালা হাতে আগুনের কাছে চলে গেলাম, বেন টিল্টনের কণ্ঠ কানে এল-ঘুম তাড়ানোর জন্যে গান গাইছে। গান গাওয়ার বাড়তি একটা সুবিধে রয়েছে-নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয় না; এর আংশিক কারণ: কণ্ঠটা মানুষের-বেশিরভাগ কাউহ্যান্ড যখন গান গায়, কণ্ঠটা ওদের নিজের কাছেই অপরিচিত মনে হয়। গরুগুলোর ওপরও গানের প্রভাব রয়েছে। রাইডারের উপস্থিতিতে শান্ত থাকে ওরা, মানুষের চলন্ত ছায়া দেখে আশ্বস্ত হয়, বুঝে নেয় সবকিছু স্বাভাবিক আছে।

আমার কাপ আর থালা ভরে দিল ইলেন।

রাইড করতে অসুবিধে হয়নি তো? জানতে চাইলাম।

দায়সারা গোছের মাথা নাড়ল ও, আমাকে ছাড়িয়ে চলে গেল। দৃষ্টি-ট্যাপের দিকে।

মানুষটা ও ভালই, শুকনো স্বরে বললাম।

চিবুক উঁচু হয়ে গেল মেয়েটার, গলায় আপসের সুর। ওকে পছন্দ করি আমি। মুহূর্ত খানেক পর যোগ করল: যত যাই হোক, তোমার ভাই।

খাবার নিয়ে ট্যাপের পাশে গিয়ে বসলাম।

কেমন চলছে তোমার, কিড? জানতে চাইল সে।

নীরবে খাওয়া সেরে নিলাম আমরা। সম্ভবত সবাই কম-বেশি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, অতীতটাও চলে আসছে ভাবনায় পেছনে কি ফেলে এসেছি সেটা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয় এখন, বরং ভবিষ্যতে কি আছে সেটাই আসল ব্যাপার। সামনে বিস্তীর্ণ বন্ধুর প্রান্তর; বসন্ত বলে মোটামুটি ঘাস রয়েছে তৃণভূমিতে, তাই যে-কোন সময়ের চেয়ে আমাদের সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি। হর্স হেড ক্রসিং পর্যন্ত ভালই কাটার কথা।

প্যাটার্সনটা পরিষ্কার করে ক্যাম্প থেকে সরে এলাম। সারাদিনে প্রচণ্ড খাটুনির পর একটা বিছানাই হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। অন্যদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে বিছানা করলাম যাতে রাতের শব্দ ঠিকমত শুনতে পাই, ক্যাম্পের সাড়াশব্দ বাইরের, সমস্ত আওয়াজ ঢেকে ফেলবে।

মেঘের দল ছুটছে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, আকাশ পরিষ্কার এখন। চাঁদের ম্লান আলোয় ভাসছে নিসর্গ। তৃণভূমির ঘাসে চরছে গরুর পাল। কোথাও কোন অস্বাভাবিকতা নেই। নিশাচর কয়েকটা পাখি ডেকে উঠছে মাঝে মধ্যে।

ঘুমিয়ে পড়লাম।

কাঁধে কারও ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল আমার। চার্লি হীথ। দ্বিতীয় পালায় সে আর বুচার্ড পাহারা দিয়েছে।

বেডরোল ছেড়ে মাথায় হ্যাট চাপালাম। পায়ে বুট গলিয়ে দেখলাম এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে টিল্টন, তামাক চিবুচ্ছে। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলল সে, শেষ মুহূর্তে মত পাল্টে ঘুরে দাঁড়াল, হেঁটে আগুনের দিকে চলে গেল। আগুনে শিখা নেই এখন, জ্বলন্ত কয়লার কোমল কিন্তু ম্লান উষ্ণতায় ক্যাম্পের কিছু অংশ চোখে পড়ছে।

প্যাটার্সন হাতে আগুনের কাছে চলে গেলাম আমি। গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে বসে আছে ট্যাপ, আমার সঙ্গে ওর পাহারা দেয়ার কথা। দু’হাতের তালুয় গরম কাপ ধরে রেখেছে বাড়তি উষ্ণতার আশায়, কফিতে চুমুক দিচ্ছে মাঝে মধ্যে। মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল ও, তবে কিছু বলল না।

ড্রাইভ চলাকালীন সময়ে হসল্যারের দায়িত্ব নিয়েছে টম জেপসন। যখনই প্রয়োজন হচ্ছে, ঘোড়া তৈরি করে দিচ্ছে। খেয়াল করলাম জেগে গেছে সে, আমার জন্যে একটা গ্রুপ্সাও ধরেছে। সাধারণত যার যার ঘোড়া তার নিজেরই ধরতে বা স্যাডল পরাতে হয়, কিন্তু ইদানীং রাতে তেমন ঘুম হয় না বলে স্বেচ্ছায় কাজটা নিয়েছে টম। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে ওর যে সমস্যা, অযথা উদ্বেগে না ভুগে বরং আরও বেশি বিশ্রাম নেওয়া উচিত ওর।

রাতটা শীতল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে সময় আন্দাজ করলাম, ভোর হতে আরও তিন ঘণ্টার মত বাকি। কড়া কালো আরেক কাপ কফি গিলে ঘোড়ার কাছে চলে এলাম, স্যাড়লে চাপলাম। প্রথমে দু’বার চক্রাকারে ক্যাম্পের চারপাশে চক্কর মারল ঘোড়াটা, হালকা পা ফেলছে। পালের কাছে চলে এলাম।

শান্ত, সংক্ষেপে জানাল টিল্টন। একেবারে শান্ত সবকিছু।

আর কিছু না বলে চলে গেল সে ক্যাম্পের দিকে।

বিভিন্ন বিচারে সে একজন অদ্ভুত মানুষ। প্রায় তিন বছর ধরে আমাদের হয়ে কাজ করছে, অথচ লোকটার ধাত এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। প্রথম পরিচয়ের সময় ওকে যতটা জানতাম, তারচেয়ে বেশি কিছু জানি না। এটা অবশ্য মোটেও অস্বাভাবিক নয়। ব্যক্তিগত বিষয় সয়ত্নে এড়িয়ে চলে সবাই, এটাই রীতি; আর টেক্সাসে আসা বেশিরভাগ মানুষ “ভূতুড়ে” অতীত পেছনে ফেলে এসেছে, যেটা ওরা নিজেরাও ভুলে যেতে পারলে স্বস্তি বোধ করবে।

টেক্সাসে কারও অতীত সম্পর্কে প্রশ্ন করা রীতিবিরুদ্ধ, কারণ জিনিসটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। মানুষের পরিচয় কাজে। যার যা করা উচিত সেটা ঠিকমত করল কিনা, এটাই বিবেচ্য এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কাজটা করছে সে, অতীতে কি ঝামেলায় পড়েছিল তা নিয়ে আমল দেয় না কেউ। আইনের ক্ষেত্রেও তাই। আইন সবাইকে নিজের মত থাকতে দেয়। কোন লোক অন্য কোথাও যতই অবাঞ্ছিত বা ফেরারী হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত স্থানীয় কোন ঝামেলায় না জড়াবে, কেউই এ নিয়ে ভাববে না বা প্রশ্ন করবে না।

এ কারণেই বাবার হয়ে কাজ করছে এমন বেশ কয়েকজনের ঘোলাটে অতীত সম্পর্কে কিছু জানা নেই আমাদের, কিন্তু কাজে খুঁত নেই ওদের, ব্র্যান্ডের প্রতি আন্তরিকতায়ও খাদ নেই। আর এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

রীজের ওপরে ডেকে উঠল একটা কয়োট, আকাশের তারাকে দুনিয়ার অভিযোগ জানাল বোধহয়? আসল কয়োর্ট, ইন্ডিয়ান নয়। ইন্ডিয়ানরা কয়োটের ডাক নকল করে সঙ্কেত দেয়। অনভিজ্ঞ লোকের জন্যে দুটোর মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল বৈকি, কিন্তু দুটোই যখন শোনে কেউ, পার্থক্য ধরতে অসুবিধা হয় না। কেবল মানুষের কণ্ঠেরই জোরাল প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয়, কয়োট বা নেকড়ের ডাকের প্রতিধ্বনি হলেও তীক্ষ্ণতায় সেটা দুর্বল, আর পেঁচা বা কোয়েলের ডাকের সামান্য প্রতিধ্বনিও সৃষ্টি হয় না।

পালের ওপাশে আছে ট্যাপ, নিচু স্বরে গান গাইছে। গলাটা মন্দ নয় ওর। “ব্রেনান অন দ্য মূর” গাইছে-বহু পুরানো আইরিশ গান। পালের চারপাশে চক্কর দেয়ার ফঁক ঘোড়ার রাশ টেনে থামলাম আমি, কান খাড়া করলাম।

কয়োটটা চুপ হয়ে গেছে…ট্যাপের গান শুনছে বোধহয়•••তারাগুলোর উজ্জ্বলতা বেড়ে গেছে। সবকিছু একেবারে শান্ত, আর কোন শব্দ নেই, শুধু ক্রীকে পানি প্রবাহের কুলকুল ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

বিশাল একটা বলদ উঠে দাঁড়িয়ে শরীর টানটান করল। ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে বাতাস বয়ে যেতে ঝট করে মাথা তুলল ওটা। যে-লোক শুধু নিজের শ্রবণশক্তির ওপর আস্থা রাখে সে অাসলে নেহাত বোকা…শুধু দেখতে আর শুনতে সক্ষম হলেই চলে না; বরং পশু-পাখির প্রতিক্রিয়া বা আচরণ দেখেও অনেক কিছু অনুমান করতে হয়। আসন্ন বিপদের আভাস আগে থেকে টের পায় এরা, মানুষের ইন্দ্রিয়ে যা কখনোই ধরা পড়ে না।

         একটা কিছু নড়াচড়া করছে ক্ৰীকের পাড়ের ঝোঁপের আড়ালে। ঘুরে দাঁড়িয়ে সেদিকে ফিরেছে বলদটা, দু’পা এগিয়ে গেছে। প্যাটার্সনটা একটু তুলে সন্তর্পণে হ্যামার টানলাম। ক্লিক শব্দটা নিস্তব্ধ রাতে জোরাল শোনা গেল, আমার দিকে একটা কান খাড়া করল বলদটা, কিন্তু ঝোঁপের ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ ওটার, দৃষ্টি সরায়নি মুহূর্তের জন্যেও।

পালের ওপাশে রয়েছে ট্যাপ, টের পেলাম ঘোড়াকে হটিয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে। শুধু বলদটাই নয়, কাছাকাছি অন্য গরুগুলোও টের পেয়ে গেছে অস্বাভাবিক কিছু একটা আছে ঝোঁপের আড়ালে। অস্বস্তিতে নড়াচড়া করছে ওরা।

খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে এলাম অন্ধকার থেকে, দেখতে চাই ঘটনা কি। নিচু কোমল স্বরে কথা বললাম, আশ্বস্ত করতে চাইলাম গরুগুলোকে। ধীরে ধীরে ঝোঁপের কাছে চলে যাচ্ছে আমার ঘোড়া।

হয়তো বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

মাথা নিচু করে রেখেছে বিশাল বলদটা, এক পা এগোল। আবছা অন্ধকারেও ওটার নাকের পাটা ফুলে উঠতে দেখতে পেলাম। অদ্ভুত কোন কারণে রেগে গেছে ওটা; লড়াই করতে ইচ্ছুক-ব্যাপারটা বিস্মিত করে তুলল আমাকে।

গরু ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি বা গন্ধ পছন্দ করে না। কাছাকাছি কোন ইন্ডিয়ান এলে ছটফট করে ওরা…হয়তো রেডস্কিনদের গায়ের গন্ধের কারণে, কিংবা ওদের চামড়ার পোশাকের গন্ধে। কিন্তু গরুগুলোর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে না আশপাশে কোন ইন্ডিয়ান আছে।

সাদা মানুষকে কাছে আসতে দেখলে মোটেই উত্তেজিত হয় না ওরা। বাঘ বা ভালুকের উপস্থিতি টের পেলে অস্থির বা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তেমনও করছে না গরুগুলো। ট্রেক্সাসের এসব পাহাড়ী অঞ্চল বা এডওয়ার্ডস প্লেটো এলাকায় গ্রিজলি বা সিংহের উপস্থিতি মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

গ্রুলাটা এগোচ্ছে, রাইফেলটা আরও সিধে করলাম, তারপর কান পাতলাম।

আমার আগে আগে এগোচ্ছে বলদটা। ভয় পায়নি, বরং লড়াই করার জন্যে মুখিয়ে আছে ওটা। এদিকে, আমার উপস্থিতিতে স্বস্তিও বোধ করছে।

হঠাৎ শব্দটা কানে এল।

কান খাড়া করতে পরিষ্কার শুনতে পেলাম। ক্ৰীকের পাড়ে ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁচড়ে এগোচ্ছে কেউ, কিংবা ভারী কিছু টেনে নিয়ে আসছে।

থেমে গেল শব্দটা, তারপর আবার শুরু হলো কয়েক মিনিট পর।

আমার পাশে চলে এসেছে ট্যাপ। ব্যাপার কি, ড্যান? ফিসফিস করে জানতে চাইল ও।

কিছু একটা পিছলে বা টেনে নিয়ে আসার শব্দ। কাভার করো আমাকে। দেখা দরকার।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার গ্রুলার লাগাম চেপে ধরল ও।

সাবধান, কিড! ইন্ডিয়ান হতে পারে।

স্যাডল ছেড়ে সন্তর্পণে ঝোঁপের দিকে এগোলাম। নিঃশব্দে ঢুকে পড়লাম। প্রায় পুরোটা জীবন বুনো এলাকায় কেটেছে আমার, প্রকৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। চিতার ক্ষিপ্রতায় চলতে শিখেছি, ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে পাতার ওপর দিয়েও নিঃশব্দে এগোতে পারি।

কয়েক পা এগিয়ে, থেমে কান পাতলাম। গোড়ালির ওপর বসে ঝোঁপের দিকে উঁকি দিলাম। কিন্তু গাঢ় অন্ধকারের কারণে কিছুই চোখে পড়ল না। ক্ষীণ খসখসে, এবং শ্বাস টানার শব্দ কানে এল..বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়েছে কেউ!

শব্দের উৎস বরাবর প্যাটার্সনের মাজল স্থির করলাম, নিচু স্বরে সতর্ক করলাম লোকটাকে: পাঁচ শটের একটা প্যাটার্সনে কাভার করেছি তোমাকে, মিস্টার। যদি বিপদে পড়ে থাকো, নিশ্চিন্তে বলতে পারো। কিন্তু বেতাল কিছু করলে রাইফেল খালি করে ফেলব আমি।

অস্কুট একটা শব্দ হলো, মনে হলো কেউ কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে কোন কারণে। তারপর একেবারে নীরব হয়ে গেল চারপাশ।

ঝোঁপের ভেতরে আলগোছে সেঁধিয়ে গেলাম আমি। উইলোর সারির ফাঁকে সরু একটা পথ ধরে কয়েক গজ এগোতে খোলা জায়গায় পৌঁছলাম। আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আবছা ভাবে ঘাসের ওপর গাঢ় একটা আকৃতি চোখে পড়ল।

কথা বলো! আরেকটু জোরাল স্বরে বললাম।

জবাব এল না। হঠাৎ পাশে ক্ষীণ নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেলাম, ঘেউ করে ডেকে উঠল একটা কুকুর। কার্ল ক্রকেটের কুকুর।

সাবধান, বাছা! কুকুরটার উদ্দেশে ফিসফিস করলাম আমি। গন্ধ শুকে এগিয়ে যাচ্ছে ওটা।

কোন পশু নয়, নিশ্চিত ধারণা আমার। কৌতূহলী হয়ে এগোলাম, অস্পষ্ট একটা কাঠামো চোখে পড়ল। প্রায় মুমূর্ষ একজন মানুষ।

ট্যাপ? নিচু স্বরে উকিলাম। আহত একজন লোক। জখমটা গুরুতর বোধহয়।

আসছি আমি, সঙ্গে সঙ্গে জানাল সে।

তুমি বরং মিলোকে নিয়ে এসো।

আমাদের মধ্যে কেবল মিলো ডজই জখমের চিকিৎসা বা শুশ্রূষা সম্পর্কে মোটামুটি জানে। বুনো নির্জন এলাকায় ডাক্তার পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সত্যি কথা বলতে কি, পঁচিশ বছরের জীবনে এ পর্যন্ত কোন ডাক্তার দেখিনি আমি, যদিও অস্টিনে থাকে একজন; সম্ভবত স্যান এন্টোনিয়াতেও আছে দু’একজন। কেউ অসুস্থ বা জখম হলে, যেহেতু কোথাও ছুটে যাওয়ার মত জায়গা নেই, সাধ্যমত নিজেরাই চিকিৎসা করি আমরা।

মিনিট কয়েকের মধ্যে মিলো ডজকে নিয়ে ওখানে পৌঁছল ট্যাপ। ইতোমধ্যে শুকনো ডালপালা যোগাড় করে ছোটখাট একটা আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে ফেলেছি আমি।

        আহত লোকটা মেক্সিকান। ছিপছিপে দেহ, সুদর্শন মানুষ। কালো গোঁফ। কাউকে এত বিধ্বস্ত অবস্থায় কখনও দেখিনি আমি। শার্ট জ্যাকেট ছাড়িয়ে হাঁটু পর্যন্ত পুরো প্যান্ট রক্তে ভিজে গেছে। হেঁচড়ে, ক্রল করে বহুদূর এসেছে লোকটা, কিন্তু এখনও তার এক হাতে একটা ছোরা রয়েছে, এত শক্ত ভাবে চেপে ধরে রেখেছে যে আমরা কেউই মুঠি থেকে ওটা খসাতে পারলাম না।

ছিড়ে ফালাফালা হয়ে যাওয়া জ্যাকেটের আস্তিনের দিকে ইঙ্গিত করল মিলো। নেকড়ে আক্রমণ করেছিল ওকে! লোকটার কজির চামড়া ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ছুরি দিয়ে নেকড়ের বিরুদ্ধে লড়েছে ও। কঠিন সময় পার করেছে বেচারা!

গরুর কাছে ফিরে যাচ্ছি আমি, বলল ট্যাপ। মিলোর সঙ্গে থাকো, ড্যান ফ্রি স্কয়ার পালের দায়িত্বে থাকবে আমার সঙ্গে।

নড়ে উঠল মেক্সিকান, বিড়বিড় করে বলল কি যেন। এদিকে ছুরি দিয়ে রক্তাক্ত কাপড় কৈটে ফেলেছে মিলো। লোকটাকে পরীক্ষা করতে ঘটনাটা ক্রমে পরিষ্কার হয়ে গেল।

কয়েকদিন আগে, অন্য কোথাও গুলি খেয়ে স্যাডল থেকে পড়ে যায় লোকটা। ঘোড়াটা হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যায় ওকে অসমতল পথে: হেঁচড়ানোর কারণে সমস্ত বুক আর পেটের চামড়া ছিলে গেছে। কোন ভাবে পিস্তল বের করে, গুলি করে উন্মত্ত ঘোড়াটাকে থামায় সে। পশ্চিমে অস্ত্র বহন করার এটাও একটা কারণ, যেহেতু আধ-পোষা বুনো ঘোড়ায় চড়তে হয় আমাদের, যে-কোন সময় পিঠ থেকে সওয়ারীকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে ঘোড়াটা।

তারপর ক্রল করেছে মেক্সিকান। রক্তের গন্ধ পেয়ে ওক আক্রমণ করে নেকড়ের দল। কাজ শেষ হওয়ার পর ছুরি দিয়েই নেকড়ের মোকাবিলা করেছে সে।

বাঁচার জন্যে মরিয়া ছিল ও, শুকনো স্বরে বলল মিলো। লড়েছেও আপ্রাণ!

ভাবছি কে গুলি করেছে ওকে!

আমার দিকে ফিরলো মিলো। আমার ধারণা, পশ্চিম দিক থেকে এসেছে ও।

পানি গরম করে ক্ষতের শুশ্রূষা করলাম আমরা। মেক্সিকানের পুরো শরীর মুছে দিলাম। বুলেট আর হেঁচড়ানোর ক্ষতগুলো কয়েকদিনের পুরানো, কিছু কিছুতে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। কজিতে নেকড়ের দাঁতের দাগ পরের-কালকের বোধহয়।

বুলেটটা ছেদা করে ফেলেছে তাকে, পিঠের চামড়ার বিপরীতে গিয়ে থেমেছে। বাউই ছুরি দিয়ে ছোট একটা ফুটো তৈরি করল মিলো, সীসা বের করে ফেলল মেক্সিকানের শরীর থেকে। তারপর সেজ পাতার পুলটিশ দিয়ে বুলেটের দুটো চেরাই ভরে দিল।

শুশ্রূষা যখন শেষ হলো, ততক্ষণে পুরোপুরি সকাল হয়ে গেছে। একটা ওয়্যাগন নিয়ে এসে মেক্সিকানকে তুলে নিয়েছে কার্ল ক্ৰকেট।

গরুর দল যাত্রা শুরু করেছে। সবার শেষে ছিলাম আমরা। অন্যান্য ওয়্যাগন আগেই চলে গেছে। টিম অটম্যানের দেয়া ম্যাট্রেসের ওপর মেক্সিকান ইয়ে দেয়া হয়েছে ওয়্যাগনের পাটাতনে।

উজ্জ্বল রোদ্দুরে দিন। বেশ দ্রুতই এগোচ্ছে গরুর পাল, গুটিকয়েক বেয়াড়া গরু দলছুট হতে চাইছে। একে একে সবকটা গরু যাত্রা করার পর পিছু পিছু এগোলাম আমি। সবচেয়ে উঁচু ব্লফের চূড়ায় উঠে এসে চারপাশের এলাকা নিরীখ করলাম। যদ্র চোখে পড়ল, বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বাতাসে দুলছে সবুজ ঘাস, অন্য কিছুই নেই। ড্র থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের দিকে এগোল একটা কালো অবয়ব, পিছু নিল আরও একটা…মোষ।

ট্রেইলে নজর রাখার সময় মেক্সিকানের কথা মনে পড়ল। ট্র্যাক ফেলে এসেছে সে-নিচু হয়ে পড়া ঘাস চোখে পড়ল, এখনও সিধে হয়নি। বোধহয় রাতে তৃণভূমি পেরিয়েছে লোকটা।

প্যাটার্সনটা হাতে রেখে ঢালু পথ ধরে নামতে শুরু করলাম। খুঁটিয়ে দেখছি ক্ষীণ ট্র্যাকগুলো। একেবারে কাছ থেকেও ঠিকমত চোখে পড়ছে না, যদিও মোটামুটি এগোতে পারছি।

ঘাসের ওপর রক্ত পড়েছে।

এগোতে এগোতে লোকটার দৃঢ় প্রত্যয় ও সাহসের নমুনা দেখতে পেলাম। মেক্সিকানের অবর্ণনীয় কষ্ট আর দুর্ভোগের জন্যে যারা দায়ী, তাদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করছি। জাতশত্রুও এত কষ্ট দেয় না মানুষ। টেক্সাসের অনেক লোক, এমনকি আমার পরিচিত অনেকেই মনে করে ব্রা বিশ্বাস করে: ইন্ডিয়ান আর মেক্সিকানরা কেবলই করুণার পাত্র। যে-কোন অন্যায়ই এদের বিরুদ্ধে ন্যায্য।

মেক্সিকানের পরিচয় যাই হোক, বহু পথ সরে এসেছে। দারুণ সাহস দেখিয়েছে। মনে মনে লোকটার প্রতি সমীহ বোধ করছি। সাহস আম বীরত্ব প্রায় সমার্থক। কিন্তু খুব কমই খুঁটিয়ে বিবেচনা করে মানুষ। মুখে বলা এক কথা, কাজে প্রমাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শারীরিক দুর্ভোগ, সীমাহীন কষ্ট, যন্ত্রণা বা অত্যাচার সহ্য করা সত্যিই কঠিন। মরা সবসয়ই সহজ, স্রেফ হাল ছেড়ে দিলেই হলো; ব্যস, মৃত্যুর সঙ্গে অবসান হবে সমস্ত যন্ত্রণা বা দুর্ভোগের। কিন্তু লড়াই করার অর্থ আরও দুর্ভোগ, আরও যন্ত্রণা। এমনকি সেটা কয়েকগুণ বেশিও হতে পারে। কষ্ট সহ্য করার এই সাহস করতে পারে না সবাই। যে পারে, সে শুধু সমীহ নয় বরং শ্রদ্ধা এবং প্রশংসার দাবীদার।

শুধু সাহস নয়, রীতিমত বীরত্ব দেখিয়েছে মেক্সিকান।

গুরুতর আহত অবস্থায় প্রবল মনের জোরে ক্রল করে বহু পথ পাড়ি দিয়েছে সে, প্রতি পদে প্রাণের ঝুঁকি ছিল। অন্ধকারে লড়েছে নেকড়ের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল; অথচ প্রাণপণ লড়াই করেছে লোকটা-সামান্য একটা ছুরি দিয়ে নেকড়ের দলকে ঠেকিয়ে দিয়েছে। সুস্থ থাকলে নেকড়ের দল কখনোই আক্রমণ করত না ওকে, অথচ দুর্বল বলেই একজন মানুষকে আক্রমণ করার দুঃসহাস দেখিয়েছে নিষ্ঠুর নেকড়ের দল। এরকম অসমসাহসী লোককে বন্ধু হিসেবে চাই আমি, কারণ এ ধরনের লোক সত্যিই বিরল।

গিরিখাতের কাছে এসে বাঁক নিয়ে দ্রুত ঘোড়া ছোটালাম, আড়াআড়ি পথে গরু পালের কাছে চলে যাওয়ার ইচ্ছে।

লোকটার মধ্যে এমন কি ছিল যে এভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছিল? স্রেফ বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে, সমস্ত প্রতিকূলতা উতরে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প? নাকি অন্য কোন কারণে? যারা ওকে গুলি করে স্যাডল থেকে ফেলে দিয়েছিল, তাদের প্রতি ঘৃণাই শক্তি যুগিয়েছে, ওকে? প্রতিশোধ স্পৃহা, নাকি অন্য কিছু?

পালের কাছে পৌঁছে দেখলাম কার্লের সঙ্গে ড্রাগিঙের দায়িত্বে রয়েছেন বাবা।

মিলো বলছে লোকটার অবস্থা ভাল না, বললেন বাবা। কিছু দেখতে পেলে?

গতরাতে ক্রল করে অনেক পথ এসেছে লোকটা। ব্যস, এই।

দীর্ঘ সারিতে গরু জড়ো করা হচ্ছে, ড্রাগের কেন্দ্র থেকে প্রায় আধ-মাইল লম্বা হয়ে গেছে সারির দৈর্ঘ্য। বাবার সঙ্গে হাত লাগালাম, আরও কিছু গরুকে একত্র করলাম, টানা চলার মধ্যে থাকতে বাধ্য করলাম ওদের। কাউ-হাউসের সঙ্গে যতটা সম্ভব দূরত্ব সৃষ্টি করা দরকার, এবং যত জলদি শুকনো এলাকা পেরিয়ে যেতে পারব ততই মঙ্গল।

তবে দ্রুত এগোনোর ব্যাপারে অনিচ্ছুক গরুগুলো, কাউ-হাউসের তৃণভূমিতে ফিরে যাওয়ার আশা ছাড়েনি এখনও। দলছুট হওয়ার চেষ্টা করছে কোন কোনটা, কিন্তু সুবিধে করতে পারছে না।

এখন পর্যন্ত হর্নার আউটফিট বা রেনিগেডদের কোন নমুনা চোখে পড়েনি। সন্ধে হলো যখন, ততক্ষণে আরও পনেরো মাইল পেছনে ফেলে এসেছি আমরা। কলোরাডো নদীর কাছাকাছি একটা ব্লাফের ছায়ায় ক্যাম্প করলাম।

পরদিন থেকে নদীর কিনারা ধরে এগোলাম। ধুলো বা বৃষ্টি গ্রাহ্য করছি না, এগোতে পারলেই হলো। সারাদিন টানা চলার মধ্যে থাকে গরুগুলো, রাতে সবুজ তৃণভূমিতে চরে বেড়ায়। কলোরাডো নদীর পানি তেষ্টা মেটাচ্ছে ওদের। প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই যাত্রা করছি, সন্ধের আগে থামছি না।

বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে কয়েকবার, তাতে ট্রেইলের ধূলো থিতিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু ওঅটরহোলে পানি জমেনি। নদী ক্রমশ শুকিয়ে আসছে দেখে উদ্বেগ ফুটে উঠল ট্যাপের মুখে। তবে কিছুই বলল না সে। বাবাও এ নিয়ে কথা বললেন না।

পশ্চিম যাত্রায় সর্বস্ব বাজি ধরেছি আমরা, সবকিছু হারানোর ঝুঁকি নিয়েছি। সামনে কি আছে জানি সবাই, এও জানি আশি মাইল দীর্ঘ রুক্ষ খটখটে জমি পেরিয়ে যেতে হবে স্বপ্নের এলাকায়।

দারুণ কষ্টকর যাত্রা। ক্লান্তিকর, একঘেয়ে। ক্ষারের মিহি প্রলেপ পড়েছে আমাদের মুখে, প্রায় সাদা হয়ে গেছে সবার মুখ, ঘোড়া আর পোশাকে ধুলোর পুরু আস্তর জমেছে। ঘামের ধারা পিঠে বা শরীরে জমে থাকা ধুলোর জমিনে আঁকাবাঁকা রেখা তৈরি করেছে। চেহারার আদল বদলে গেছে, যেন কিম্ভুতকিমাকার মুখোশ পরেছে সবাই। চলার পথে ওয়্যাগন থেকে নেমে আসছে বাচ্চারা, বাফেলো চিপস সংগ্রহ করছে, রাতে আগুন জ্বালাতে কাজে লাগবে ওগুলো। চিপস বহন করার জন্যে প্রতিটি ওয়াগনের পেছনে গরুর চামড়ার তৈরি বিশাল থলে ঝুলছে।

নদীর কিনারা ধরে কিছুটা উত্তরে চলে এসেছি আমরা। এতটা উত্তরে আসার কথা নয়, এদিকে একটা ট্রেইল পাওয়ার কথা। যত দূরে আশা করেছি, তারচেয়ে বেশিই চলে এসেছি। কিন্তু ট্রেইলের দেখা নেই। অন্য ট্রেইলেও যেতে পারতাম, সমস্যা সেখানেও আছে, তবে জানা ট্রেইল ধরে এগোলে সমস্যা মোকাবিলা করা সহজ।

ফোট ফ্যান্টম হিলের কাছাকাছি এসে উদ্দিষ্ট ট্রেইল খুঁজে পেলাম আমরা, দক্ষিণে বাঁক নিয়ে পশ্চিমে এগোলাম আবার।

কেউ অনুসরণ করছে আমাদের…দিনের বেলায় পেছনে ধুলোর মেঘ চোখে পড়েছে; আর রাতে গরুর অস্থিরতায় বোঝা গেছে খুব বেশি দূরে নেই তারা। পৃনি চুরি, কিংবা চাদির চামড়া শিকারে আসা কোমাঞ্চি হতে পারে এরা, কিংবা ব্র্যাজোস অঞ্চল বা কাউ-হাউস থেকে আসা রেনিগেড।

একটা মোষ মেরেছে ট্যাপ। মাংস পেয়ে খুশিই হলো সবাই। পরে অবশ্য অ্যান্টিলোপও শিকার করেছে ও; এবং আশপাশে ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতির নমুনা দেখতে পেয়েছে। ক্রমশ বুনো হয়ে আসছে ট্রেইল আর আশপাশের এলাকা। একেবারে জনমানবশূন্য। পেকোসের হর্স হেড ক্রসিঙের দিকে যাচ্ছি আমরা। মেক্সিকোয় রেইড করার সময় ট্রেইলটা ব্যবহার করত কোমাঞ্চিরা। অদ্ভুত নামকরণের সার্থকতা ওই ট্রেইলে গেলে চোখে পড়ে-অসংখ্য ঘোড়ার খুলি আর কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে আশপাশে। মেক্সিকো থেকে রেইড করে ফেরার পথে সর্বোচ্চ গতিতে ঘোড়া ছোটায় নিষ্ঠুর কোমাঞ্চিরা, অনেক ঘোড়াই প্রাণ হারায় পথে।

মাঝে মধ্যে ট্র্যাক চোখে পড়ছে। একসময় ধারণা ছিল ইন্ডিয়ানরা নালহীন আর সাদারা নালঅলা ঘোড়ায় চাপে, কিন্তু ধারণাটার গুরুত্ব নেই এখন; কারণ রেডস্কিনরা অহরহ নালঅলা ঘোড়া চুরি করছে র্যাঞ্চ থেকে, এবং সাদা মানুষও নালহীন ঘোড়ায় চড়ছে ইদানীং।

ওঅটরহোলের তলায় প্রায় শুকনো কাদা উদ্বিগ্ন করে তুলছে আমাদের। নদীতে পানি আছে বটে, কিন্তু একেবারে কম। অথচ কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছে আর বসন্ত চলছে এখন। মাস খানেক পর কি অবস্থা হবে মাটির, সূর্যের তাপে উনুনের মত শুকনো হয়ে উঠবে না?

অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কার দোলায় দুলছে সবাই। ক্যাম্পে গান থেমে গেছে, গলায় জোর পাচ্ছে না কেউ। গরুর পালটাই এখন আমাদের সর্বস্ব। এই যাত্রায় ভবিষ্যৎ-হয়তো জীবনেরও ঝুঁকি নিয়েছি আমরা।

সবার সামনে ট্যাপ, সাধারণত বাবা থাকছেন ওর সঙ্গে বুনো রুক্ষ প্রান্তর ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের। রাতে নেকড়ের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি, দিনের বেলায় দু’একটাকে চোখে পড়ছে; ধান্ধায় আছে ওরা, যদি কোন রকমে একটা গরুকে কজা করা যায়।

সঙ্গে অস্ত্র বাখছি, আমরা। সারাক্ষণই সতর্ক, সজাগ; যে-কোন পরিস্থিতির জন্যে, তৈরি। ত্যক্ত ও মেজাজী হয়ে উঠেছে সবাই, অল্পতে ধৈর্য হারাচ্ছে। তাই পরস্পরকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলছি আমরা। এমন পরিস্থিতিতে উত্তপ্ত দু’একটা বাক্য অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে জানি বলেই জিভ সামলে রাখার চেষ্টা করছি সবাই।

ইলেন এড়িয়ে চলছে আমাকে। ট্যাপ আসার আগে একসঙ্গে ঘুরেছি, রাইড করেছি আমরা। কিন্তু ইদানীং দেখাই হচ্ছে না ওর সঙ্গে যতটা সম্ভব ট্যাপের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে ও।

আজ অটম্যানদের ওয়াগনটা চালাচ্ছে ইলেন। পাল থেকে কিছুটা সরে এসে, ঘোড়া দাবড়ে ওয়্যাগনের কাছে চলে এলাম আমি। আমার উপস্থিতি টের পেলেও ফিরে তাকাল না ইলেন, মনোযোগ আর দৃষ্টি দুটোই ট্রেইলের দিকে।

ইদানীং তোমার সঙ্গে দেখাই হয় না, বললাম।

চিবুক উঁচু হয়ে গেল ওর। ব্যস্ত ছিলাম।

হ্যাঁ, খেয়াল করেছি।

আমি তোমার সম্পত্তি নই। তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতেও বাধ্য নই।

ঠিকই বলেছ তুমি, ম্যাম। তাছাড়া…ট্যাপ খুব ভালমানুষ। হাজার জনের মধ্যেও ওর মত কাউকে পাওয়া যাবে না।

ঘাড় ফিরিয়ে আমার চোখে চোখ রাখল ও। ওকে বিয়ে করব আমি।

ট্যাপকে বিয়ে করবে? ব্যাপারটা অসম্ভব মনে হচ্ছে। ট্যাপ এডলে আগাগোড়া ছন্নছাড়া স্বভাবের মানুষ, থিতু হওয়া দূরে থাক, কোথাও বেশিদিন থাকতে পারে না সে। এটা অবশ্য পুরোপুরি আমার ধারণা। ভুলও হতে পারে। মনস্থির করার জন্যে একটুও দেরি করোনি তুমি, মন্তব্য করলাম শেষে। অথচ সপ্তাহ খানেক আগে পরিচয় হয়েছে তোমাদের।

তাতে কি? আচমকা চটে উঠল মেয়েটা। সবাই তো বলবে ওর মত মানুষই হয় না-হাসি-খুশি, চটপটে। সব কাজেই ওস্তাদ। সত্যিকার পুরুষ! হাজার বছর চেষ্টা করলেও ওর মত হতে পারবে না তুমি!

ইলেন অটম্যানের মন্তব্যে খেপে ওঠার কারণ নেই, শুধু একটা ব্যাপারে খটকা লাগছে-মেয়েটা যেন তর্ক করার জন্যে মুখিয়ে আছে! হয়তো, একমত হলাম আমি। ট্যাপ সত্যিই ভালমানুষ। কোন সন্দেহ নেই এতে। কিন্তু সত্যিকার পুরুষ কিনা, সেটা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। আমি যদি মেয়ে হতাম, তাহলে এ নিয়ে বিস্তর চিন্তা ভাবনা করতাম। আসলে ও বাঁধনহীন পুরুষ মানুষ-নিজের কাজ করে ঠিকমত, সমর্থ, আন্তরিক

তো?

এক জায়গায় বসে থাকার লোক নয় ট্যাপ। আমার মনে হয় না কখনও বদলাবে ও।

বদলায় কিনা দেখবে তুমি! জোরাল, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেও খুব একটা আত্মবিশ্বাসী মনে হলো না ইলেনকে। আমার সন্দেহ হলো আদৌ এ নিয়ে কখনও ভাবেনি ও। মেয়েরা প্রেমে পড়লে শুধু আবেগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, পরিণতিতে কি হতে পারে ভাবার অবকাশই পায় না। উপলব্ধিও করতে পারে না। ঘোর কেটে যাওয়ার পর আচমকা টের পায় যে-মানুষটিকে ভালবাসে, ভালবাসার মানুষ হিসেবে সে অদ্বিতীয়, কিন্তু স্বামী হিসেবে জঘন্য।

তো, ওখান থেকে সরে এলাম আমি, ভেতরে ভেতরে কিছুটা হলেও ক্ষরণ অনুভব করছি। নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। লোকজন অযথাই নিজেদের বোকা বানায়। ইলেন আর আমি ঘুরতে বেরিয়েছি দুতিনদিন, সবাই তাতে মনে করেছে, স্থায়ী একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, বড়জোর বন্ধু বলা যাবে আমাদের। মেয়েটা অন্য কাউকে পছন্দ করলে বা বিয়ে করলে, একজন বন্ধু হারাব আমি, শুধু এটাই ক্ষরণের কারণ; কখনোই দাবি করব না যে ওর ব্যাপারে আমি বা আমার ব্যাপারে সিরিয়াস ছিল ইলেন।

সবকিছুর পরও, ক্ষণিকের আবেগতাড়িত উন্মাদনাই বলা যায় এটাকে। ইলেন আর আমার মধ্যে এমন কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, কিন্তু স্বামী হিসেবে ট্যাপ এডলেকে নির্বাচন করে নিঃসন্দেহে ভুল করেছে ইলেন। মেয়েটাকে কিছুটা হলেও চিনেছি, জানি ওর সম্পর্কে নিজের চারপাশে পুরুষদের দেখেছে ও, তাদের মধ্যে কাউকেই অসাধারণ মনে হয়নি, হঠাৎ উদয় হওয়া সুবেশী চটপটে ট্যাপ এডলে ওর চোখে হয়ে গেছে জবরদস্ত এক দেবদূত। এই দেবদূতকে নিজের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ মনে করেছে।

সত্যি কথা বলতে কি, জোয়ান-বুড়ো সবাই স্বপ্ন দেখে, কাঙ্খিত মানুষটির ছবি নিজের মনে লালন করে, তাকে ভালবেসে সংসারী হতে চায়। স্বপ্নের পরিধি সীমাহীন, অথচ বাস্তবে তার প্রাপ্তির পরিমাণ অনেক কম-তাই অল্পতে তুষ্ট থাকে সবাই। এমনও হয়েছে, স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় পাশাপাশি ঘুমাচ্ছে, স্বপ্ন দেখে দু’জনেই-অথচ দু’জনের স্বপ্নের মধ্যে হাজার মাইল ফারাক। কারও চাওয়ার সঙ্গে কারও মিল নেই।

ট্যাপ এডলে ছন্নছাড়া-ড্রিফটারও বলা যাবে ওকে। হয়তো সত্যিই ইলেনের স্বপ্নের পুরুষ ও, কিংবা ইলেনের উসিলায় থিতুও হয়ে যেতে পারে। ব্যাপারটা যতই অস্বাভাবিক মনে হোক, এটা আমার মাথা ব্যথার বিষয় নয়। মাথা ঘামানোও উচিত নয়।

পালের একেবারে পেছনে এসে দলছুট একটা বলদকে খেদিয়ে পালে ঢুকিয়ে দিলাম। ধুলোর অত্যাচারে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম, দাঁতের ব্যথায় আক্রান্ত গ্রিজলির মত করুণ মনে হচ্ছে নিজের অবস্থা।

আমার পাশে চলে এল মিলো ডজ। মেক্সিকামের সঙ্গে আলাপ হলো। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে ও।

আমার সঙ্গে?

তুমি ওকে খুঁজে পেয়েছ, তুমিই ওর কাছে নিয়ে গেছ আমাদের।

কোত্থেকে এসেছে ও?

নিজের ব্যাপারে কিছুই বলেনি। গালে মাকড়সার মূত ক্ষত আছে, এমন এক লোক সম্পর্কে জানতে চাইছিল বারবার। লোকট বিশালদেহী।

সেদিন অ্যান্টিলোপ কীকের ধারে ক্যাম্প করলাম আমরা। ক্রীকের পানি স্বচ্ছ, টলটলে এবং মিষ্টি। তীরে বিশাল ওক আর পেকানের সারি। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ একরের মত খোলা জায়গা বেছে নিয়েছি গরু রাখার জন্যে। ক্রীকের ধারে ছড়িয়ে পড়ল তৃষ্ণার্ত গরুর দল, তেষ্টা মেটানোর পর তৃণভূমিতে ফিরে এল।

পেকানের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছি আমি, এ সময় এলেন বাবা। দারুণ সুন্দর জায়গা, ড্যান। এখানেই থেকে যেতে লোভ হচ্ছে।

মাথা ঝাঁকালাম। এখানে একটা দিন কাটিয়ে দিলে মন্দ হয় না। ইচ্ছামত পানি আর ঘাস খাওয়ার সুযোগ পাবে গরুগুলো। আমাদেরও বিশ্রাম নেওয়া হবে। ট্যাপের কাছ থেকে যা শুনেছি, শিগগিরই সামনে রুক্ষ এলাকা পড়বে। যত এগোব, ততই পানি বা ঘাস,কমে যাবে।

ট্যাপ আর কার্ল যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। ক্ৰীকের ধারে একটা বৃত্তের আকারে রাখা হয়েছে ওয়্যাগনগুলো। ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। কঞ্চো নদীর ওপাড়ের ব্লাফের দিকে চলে গেল ট্যাপের দৃষ্টি। কাছাকাছি, নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে অ্যান্টিলোপ ক্রীক। পরে পশ্চিমে চলে গেছে নদীটা।

ওই ব্লাফগুলো ঠিক পছন্দ হচ্ছে না আমার, যে-কেউ লুকিয়ে থাকতে পারবে ওখানে, চিন্তিত সুরে মন্তব্য করল ট্যাপ। তবে এরচেয়ে নিরাপদ জায়গা বোধহয় আশপাশে নেই।

এখানে একদিন বিরতি নেয়ার প্রস্তাব করলেন বাবা ট্যাপও সায় জানাল। আশ্রয় হিসেবে জায়গাটা দারুণ, ব্লাফের কারণে উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাস আটকে যাবে, পর্যাপ্ত ঘাস আর পানিও আছে। কচি পাতার লোভে কয়েকটা বাছুর ইতোমধ্যে পেকানের সারিতে ঢুকে পড়েছে, গতবারের শীতে মোটামুটি টিকে গেছে কিছু পাতা।

একটা ডান ঘোড়ায় স্যাড়ল চাপিয়ে ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম আমি। মেক্সিকান লোকটার ওয়্যাগনের সামনে চলে এলাম। ক্যানভাসের দৈয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে সে, কিছুটা হলেও রঙ ফিরে এসেছে মুখে।

আমি ড্যান ট্রেভেন, পরিচয় দিলাম।

বাদামী শীর্ণ একটা হাত বাড়িয়ে দিল সে, স্মিত হাসল। ঝকঝকে সাদা লোকটার দাঁত। ঘেসিয়া, অ্যামিগো। আমার জীবন বাঁচিয়েছ তুমি। মনে হয় না এরচেয়ে বেশি যেতে পারতাম।

অনেক পথ ক্রল করে এসেছ তুমি। বুঝতে পারছি না কিভাবে সম্ভব করেছ কাজটা।

শ্রাগ করল মেক্সিকান। পানি আর আশ্রয় দরকার ছিল আমার, ওগুলোর তাগিদেই এগিয়েছি। এবার গম্ভীর হয়ে গেল সে। সেনর, তোমাকে সূতর্ক করা আমার দায়িত্ব। আমাকে আশ্রয় দিয়ে আসলে শত্রু তৈরি করেছ…একাধিক শত্রু।

শত্রু কার নেই? যে যত ভাল ভাবে বেঁচে থাকে, তার শত্রু তত বেশি। যাকগে, আমার মনে হয় দু’একজন বাড়লে এমন কিছু যাবে আসবে না।

খুব খারাপ মানুষ ওরা…নিষ্ঠুর। কোমাঞ্চেরো।

কোমাঞ্চিদের সঙ্গে ব্যবসা করে যেসব মেক্সিকান, তাদের কথাই বলছ তো? শুনেছি ওদের সম্পর্কে।

         সি…মেক্সিকান, কিন্তু সাধারণ মেক্সরা সমর্থন করে না ওদের। ওদের এলাকায় আমাকে পেয়ে গিয়েছিল, ব্যাটারা। প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিপদে পড়লাম। ভাবিনি তর্কের মধ্যেই গুলি করে বসবে। কোন রকমে পালিয়ে এলাম, কিন্তু ঠিকই পিছু নিল ওরা। এক কোমাঞ্চি আর এক কোমাঞ্চেররাকে খুন করে ফেললাম, তারপরই আমাকে কোণঠাসা করে ফেলল ওরা। স্যাডল থেকে পড়ে গেলাম। দড়িতে বেঁধে আমাকে টেনে নিয়ে চলল ওরা। ভাগ্যিস, ছুরি ছিল সঙ্গে। দড়ি কেটে ঘোড়া কেড়ে নিলাম লোকটার কাছ থেকে..তারপর ছুট লাগিয়েছি। তবে ওদের ফাঁকি দেয়া সত্যিই কঠিন। এবারও আমার পিছু নিল। ঘোড়াটা মরে যাওয়ার পর প্রাণপণে ছুটেছি, কোন্ দিকে গেছি নিজেও জানি না। একসময় দেখলাম আর পিছু নিচ্ছে না ওরা।

           মেক্সিকানের সহজ কথাবার্তায় তার সাহস, দৃঢ় মনোবল বা কষ্টসহিষ্ণুতার পুরো চিত্র ফুটে ওঠে না। সমীহ করার মত একজন মানুষ বটে। হাজার লোকের মধ্যেও এমন একজন খুঁজে পাওয়া যাবে না। মানসচক্ষে লোকটাকে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কল্পনা করলাম। ঘোড়া দখল এবং নিজেকে বাঁচানোর জন্যে একটাই উপায় ছিল-রাইডারকে খুন করতে হত। ঠিক তাই করেছে সে। ঘোড়াটা মারা যাওয়ার পর উড্রান্তের মত ছুটেছে, ক্রল করে এগিয়েছে, হিংস্র নেকড়েকে ঠেকিয়ে দিয়েছে…

নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাও, সেনর, শেষে আশ্বস্ত করলাম ওকে। এখানে যদ্দিন আছ কোমাঞ্চি বা কোমাঞ্চেরো, কেউ বিরক্ত করতে পারবে না তোমাকে।

আমার খোঁজে ঠিকই আসবে ওরা, নড়েচড়ে আরামদায়ক অবস্থানে শুয়ে পড়ল সে। অযথাই বিপদে পড়বে তোমরা। তারচেয়ে একটা ঘোড়া দাও আমাকে, চলে যাই। তাহলে কারোই বিপদের ঝুঁকি থাকে না।

আসুক ওরা, ওয়্যাগনের পাটাতন থেকে মাটিতে নেমে এলাম। বাইবেলে নাকি আছে: মানুষ মাত্রই ঝামেলার সঙ্গে বসবাস করে। জীবনে দুঃখ-কষ্ট বা দুর্ভোগ থাকবেই। কি জানো, বাইবেলের বাণীতে অবিশ্বাস নেই আমার, কিংবা আস্থাও হারাতে চাই না। যত বিপদ বা ঝামেলাই আসুক, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করব আমরা। আহত একজন লোককে কখনও ফিরিয়ে দেইনি আমরা, নিয়মটার ব্যতিক্রম করার ইচ্ছে নেই আমার।

ডানটা দারুণ চালু ঘোড়া। হাতে বেশ কিছু কাজ পড়ে আছে। ক্যাম্পের দিকে এগোলাম আমি। কার্ল ক্ৰকেট যোগ দিল আমার সঙ্গে।

ইন্ডিয়ান এলাকা এটা। যে-কোন মুহূর্তে উদয় হতে পারে রেডস্কিনরা। ওদের জন্যে তৈরি আছি আমরা। নদীর পাড় ধরে কিছুদূর স্কাউট করলাম, কোন ট্র্যাক চোখে পড়ল না। নদী পেরিয়ে ব্লফের কাছাকাছি চলে গেলাম, একটা বুনো ট্রেইল ধরে কিছুক্ষণ পর ব্লাফের ওপর উঠে এলাম দুজনে।

দারুণ বাতাস এখানে। অনেকদূর পর্যন্ত চোখে পড়ছে। সামনের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ওপর নজর চালালাম। বাতাসে উড়ছে কার্লের বাদামী চুল।

নদীর উল্টোদিকে পুরো এলাকাই রুক্ষ ঊষর প্রান্তর, কারও স্বপ্নের জায়গা নয় এটা। অনেকক্ষণ ধরে নজর রাখলাম আমরা, কিন্তু কোন নড়াচড়া বা ট্র্যাক চোখে পড়ল না। শেষে ক্যাম্পে ফিরে এলাম।

শত্রুপক্ষ ধারে-কাছে আছে, নিশ্চিত জানি আমরা। কিন্তু কোথায়?

ক্যাম্পে পৌঁছার আগেই জ্বলন্ত আগুন চোখে পড়ল, বাতাসে কফি আর স্টুর সুঘ্রাণ। ইতোমধ্যে পালের পাহারার দায়িত্বে চলে গেছে বেন টিল্টন এবং ফ্রিম্যান স্কয়ার।

এখনও চরছে গরুগুলো। সতেজ দীর্ঘ ঘাসের লোভ সামলাতে পারছে না। কয়েকটা তেষ্টা মেটাতে ক্রীকের কাছে চলে গেছে আবার। ব্লাফের ওদিকে কোথাও ডেকে উঠল একটা কোয়েল।

বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

ট্যাপ এল একটু পর। পাহারা দ্বিগুণ করাই মঙ্গল, প্রস্তাব করল সে। অবস্থা ভাল ঠেকছে না আমার। মন কু গাইছে কেবল।

এ পর্যন্ত ভালই কাটল। আমার কাছে তো তেমন বিপজ্জনক মনে হচ্ছে না, বললেন বাবা। কি জানি, হয়তো আমাদের প্রতিবেশীরা অতিরিক্ত চালাক, কোমাঞ্চি এলাকার মাঝামাঝি পর্যন্ত এগোতে দেবে আমাদের, তারপর বোধহয় হামলা করবে। যাতে দোষটা ইন্ডিয়ানদের ওপর চাপানো যায়।

আমার দিকে ফিরল ট্যাপ। তোমার মেক্সিকান বন্ধুর পরিচয় জেনেছ?

কোমাঞ্চেররাদের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে ওর। বলল মাকড়সার মত ক্ষত আছে মুখে, এমন এক লোকওর পিছু নিয়েছে।

দীর্ঘক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল ট্যাপ। আমার মনে হয় ওকে একটা ঘোড়া দিয়ে দেওয়াই উচিত, বলেই ঘুরে দাঁড়াল সে, হেঁটে চলে গেল ক্যাম্পের দিকে।

ব্যাপার কি, হয়েছে কি ওর? জানতে চাইলেন বাবা।

ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, ট্যাপের ক্ষেত্রে তো অবশ্যই। ঝামেলাকে ভয় পায় না ও। এভাবে কখনও এড়িয়ে যেতে দেখিনি ওকে, শুনিওনি এমন কিছু। একটা ঘাপলা আছে কোথাও। হয়তো আমরা জানি না এমন কিছু জানে ট্যাপ। ক্ষতঅলা লোকটার ব্যাপারে কৌতূহল বেড়ে যাচ্ছে আমার।

খাওয়া সেরে, পেকানের নিচে বেডরোল বিছালাম। ক্লান্তি লাগছে খুব। ঘুম এল বটে, কিন্তু আধো ঘুম আধো জাগরণে কাটছে সময়, ক্যাম্পের স্বাভাবিক প্রতিটি শব্দ কানে আসছে।

কার্ল ক্রকেটের ডাকে ঘুম ভাঙল। তাকিয়ে দেখলাম পায়ে বুট গলাচ্ছে সে, ঠিক আমার পাশে বসে আছ। একেবারে শান্ত সবকিছু, সন্দিহান সুরে বলল ও। অবস্থা ভাল ঠেকছে না। ভালুকের জন্যে তৈরি থাকাই ভাল।

আগুনের ধারে বসে কফি গিলছে মিলো ডজ আর রাস্টি বুচার্ড। শার্পস রাইফেলটা পাশে রেখেছে বুচার্ড।

পায়ে বুট গলিয়ে আগুনের কাছে চলে এলাম। ঘুমটা শুরুতে হালকা থাকিলেও গভীর হয়ে গিয়েছিল শেষদিকে, নইলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে জাগাতে হত না আমাকে। মনে মনে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলাম নিজের ওপর। সাবধানী মানুষের ঘুম পাতলা হওয়া উচিত। গভীর ঘুম শুধু বিপদই ডেকে আনে।

কফিটা দারুণ গরম, কড়াও। বাবাও উঠে এসেছেন। ঠাণ্ডা একটা বিস্কুট ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। কফির সঙ্গে খেলাম ওটা।

সতর্ক থেকো সবাই। ট্যাগকে এমন অস্থির হতে দেখিনি আমি। রাতটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে ও।

আমার জন্যে ডানে স্যাডল চাপিয়েছে টম জেপসন। স্যাডলে চড়ে ট্যাপ এডলের বেডরোলের দিকে তাকালাম। শূন্য ওটা। ট্যাপকে দেখেছ?

ঘুরে দাঁড়াল জেপসন। না, দেখিনি! প্রায় খেকিয়ে উঠল সে।

আগুনের কাছ থেকে সরে আসতে অন্ধকার গ্রাস করল আমাদের। জায়গাটা ব্লাফের পেছনে হওয়ায় ঠাণ্ডা বাতাসের অত্যাচার সইতে হচ্ছে না। তবে তৃণভূমিতে যেতে শীতল বাতাসের ঝাঁপটা অনুভব করলাম। একসঙ্গে পালের দিকে এগোলাম চারজন, কিছুক্ষণ পর ছড়িয়ে পড়লাম।

গভীর রাতে সামান্য শব্দও তীক্ষ্ণ এবং স্পষ্ট শোনায়। অতি চেনা শব্দও রহস্যময় বা অদ্ভুত মনে হতে পারে। প্রকৃতির সাধারণ শব্দ থেকে বিপজ্জনক শব্দ আলাদা করতে সক্ষম সতর্ক ও অভিজ্ঞ মানুষ, যারা বুনো প্রকৃতি আর রাতের নৈঃশব্দ্য সম্পর্কে অভ্যস্ত।

গাছে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে পাখি। ছোট একটা সরীসৃপ বুকে হেঁটে এগোচ্ছে, ঘাস ঠেলে এগোচ্ছে ছোটখাট কোন পশু, বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি, গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার শব্দ বা নেহাত দুর্ঘটনাক্রমে দুটো গরুর শিঙের সংঘর্ষের আওয়াজ-সবই পরিচিত এবং স্বাভাবিক।

পালের ওপাশে একত্র হলাম আমরা। এবার জোড়ায় জোড়ায় রেকি শুরু করলাম, বরাবরের মতই,কার্ল ক্ৰকেট রয়েছে আমার সঙ্গে।

সবকিছু বড় বেশি শান্ত হয়ে গেছে হঠাৎ। স্বাভাবিক শব্দগুলোও শুনতে পাচ্ছি না এখন। এর তাৎপর্য একটাই: অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার-আশপাশে একটা কিছু আছে কিংবা ঘটতে যাচ্ছে। কারণ ছোট ছোট পশু-পাখি নিজের চারপাশে অস্বাভাবিকতা টের পেলে শঙ্কিত হয়ে ওঠে, নিশ্ৰুপ হয়ে পড়ে ওরা।

কি মনে হয় তোমার, কার্ল?

কাছাকাছি আসার চেষ্টা করবে ওরা। অপঘাত

অন্য পাশ থেকে আসা মিলো ডজ আর রাস্টি বুচার্ডের মুখোমুখি হলাম আমরা। মিলো, ফিসফিস করে বললাম আমি। কার্ল আর আমি গাছপালার ওদিকে যাব। সম্ভবত ওদিক থেকে হামলা করবে শত্রুপক্ষ। ওরা আমাদের ওপর চড়াও হওয়ার আগেই মুখোমুখি হওয়া ভাল।

ঠিক আছে।

জায়গাটা দেখিয়ে দিলাম ওকে। বুচার্ডও দেখে নিল, ব্লাফের ঠিক সোজাসুজি।

কিন্তু সামান্য সুযোগও পেলাম না আমরা। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল অনেক ঘটনা। আচমকা খুরের ভোতা শব্দ হলো, পরপরই ছুটে এল ওরা। ব্লাফের গাঢ় কাঠামোর বিপরীতে বলে স্পষ্ট ঠাহর করা মুশকিল হয়ে পড়ল। নিশানা করব কি, ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে কোন টার্গেটই খুঁজে পেলাম না।

ছুটে এল ওরা, কেবল খুরের শব্দ হচ্ছে। লম্বা, ঘাসের কারণে ভোতা শোনাচ্ছে। তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠল একটা পিস্তল। অন্যদের সতর্ক করে দেয়ার জন্যে অন্ধকার বরাবর ব্লাফের দিকে গুলি করেছি আমি।

সঙ্গে সঙ্গে তুমুল গোলাগুলি শুরু হলো। কাছাকাছি ভারী কিছু মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম, অস্ফুট স্বরে যন্ত্রণা প্রকাশ করল কেউ। আবছা ভাবে সামনে সাদা একটা কাঠামো দেখতে পেলাম-সাদা ঘোড়ায় চেপেছে কেউ। সঙ্গে সঙ্গে গুলি করলাম।

আচমকা হোঁচট খেল যেন ঘোড়াটা, তীক্ষ্ণ মোচড় উঠল পেশীবহুল শরীরে। তুমুল গুলি বৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে, ঘোড়াটার দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ বা ফুরসত হলো না।

প্রতিপক্ষের চমক তেমন কাজে আসেনি। স্থান বা কৌশল নির্বাচনে কোন খুঁত নেই, কিন্তু সময়টা সামান্য এদিক-ওদিক হয়ে গেছে। আক্রমণের সময় নেহাত সৌভাগ্যবশত চারজনই কাছাকাছি ছিলাম আমরা। চারটে অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে উল্টো দৌড় দিতে হলো ওদের। সমানে চেঁচাচ্ছে ওরা এখন, ছোটার মধ্যে গরুর পাল ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে।

মাঝরাতে এমন তীব্র গোলাগুলি আর ছুটন্ত রাইডারদের তুমুল চিৎকারে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল গরুর দল। তুমুল বেগে উপত্যকার দিকে ছুটতে শুরু করল ওরা।

ফ্যাকাসে আকাশের পটভূমিতে এক লোকের কাঠামো দেখে গুলি করলামপরপর দু’বার। দ্রুত হাতে রিলোড করলাম পিস্তলটা, তারপর হামলাকারীদের পিছু পিছু ঘোড়া ছোটালাম।

কিন্তু যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল জমজমাট লড়াই। ফলাফল: হামলাকারীরা পালিয়েছে। সঙ্গে আমাদের গরুর পাল উধাও।

ঘোড়া ছুটিয়ে আমার পাশে চলে এল কার্ল। রাস্টি বোধহয় গুলি খেয়েছে।

দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালালেন বাবা। ম্লান আলোয় রাস্টি বুচার্ডের নিথর দেহ চোখে পড়ল। বুকে বিঁধেছে গুলিটা।

মাশুল দিতে হবে ওদের! তপ্ত স্বরে শপথ করলেন তিনি। খোদার কসম, এজন্যে মাশুল দিতে হবে ওদের!

চারপাশে চক্কর দিলাম আমরা, মনে শঙ্কা হয়তো আরও কাউকে পাব। মৃত দুই হামলাকারীর লাশ খুঁজে পেলাম। একজনের নাম স্ট্রিটার, নসেজে রেঞ্জারদের আধিপত্যে টিকতে না পেরে কাউ-হাউসে চলে এসেছিল লোকটা। অন্যজনকে চেহারায় চিনি বটে, কিন্তু পরিচয় জানি না।

দু’জনের বিপরীতে একজন, গম্ভীর স্বরে বলল ট্যাপ।

দু’জন? ধমকে উঠলেন বাবা। দশজনের বিপরীতে হলেও বুচার্ডের মৃত্যু মেনে নিতে রাজি নই আমি। ওর মত লোকই হয় না!

সকালে ওদের খোঁজে বেরোব আমরা, বললাম আমি। সম্ভবত এটাই একমাত্র এবং সঠিক পদক্ষেপ।

বুচার্ডের লাশ নিয়ে ক্যাম্পে এলাম আমরা। প্রায় সবার প্রতিক্রিয়াই বাবার মত। তবে বাড়তি দায়িত্বের জন্যে ওঁকে একটুও ঈর্ষা হচ্ছে না কারও-মিসেস বুচার্ডকে বাবাই দুঃসংবাদটা দেবেন।

একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল ক্যাম্প। আগুনের ধারে বসে আছি, কিন্তু কেউই কথা বলছি না। কিছু ডালপালা যোগাড় করে আগুন আরও উস্কে দিলাম আমি। অন্যদের খোঁজখবর নিলাম, অক্ষত আছে সবাই।

মাত্র দু’জন! ব্যাপারটা ঠিক মিলছে না, মন্তব্য করল কার্ল। উঁহু, আরও বেশি লোক হতাহত হয়েছে ওদের। সরাসরি আমাদের দিকে চার্জ করেছে ওরা!

আগুনের কাছাকাছি রয়েছে ইলেন আর মিসেস অটম্যান, কফি তৈরি করছে। সযত্নে, প্যাটার্সনটা পরিষ্কার করছি আমি। কার্তুজ পরখ করে রিলোড় করলাম আবার। তারপর ক্যাম্প ছেড়ে ঘোড়ার কাছে চলে এলাম, পরখ করলাম ওটার গায়ে কোন গুলি বিধেছে কিনা। যা গোলাগুলি হয়েছে, সওয়ারীর চেয়ে ঘোড়ার গায়ে গুলি লাগার সম্ভাবনা, বেশি ছিল।

ঘোড়াটা বহাল তবিয়তে আছে। নিশ্চিন্ত মনে ক্যাম্পে ফিরে এলাম।

বাকি রাতটুকু বড় দীর্ঘ মনে হলো আমাদের কাছে। তবে একসময় সকাল হলো। ধূসর আকাশের পটভূমিতে মাথা উঁচিয়ে থাকা গাছপালার দীর্ঘ কাঠামো স্পষ্ট হলো ধীরে ধীরে, নিজস্ব আকার পেল। সূর্য ওঠার আগেই স্যাডলে চাপলাম আমরা।

অনেকক্ষণ তর্ক করেও সুবিধা করতে পারেনি টিম অটম্যান, ওয়্যাগনের দায়িত্বে ওকে রেখে ব্লাফের দিকে এগোলাম আমরা।

তুমি বরং এখানেই থাকো, টম, জেপসনকে নিরস্ত করার জন্যে যুক্তি দেখালেন বাবা। এরই মধ্যে বিবাহিত একজনকে হারিয়েছি আমরা। আমার মনে হয় তাই যথেষ্ট।

মাথা খারাপ! তপ্ত স্বরে অস্বীকৃতি জানাল সে। তারপর খানিকটা দ্বিধার সুরে বলল, আমাদের বোধহয় আরও একজনকে রেখে যাওয়া উচিত। ওরা যদি আবার আসে?

ফ্রি, স্কয়ারের দিকে ফিরলেন বাবা। তুমিই থাকো। রাতেও পাহারা দিয়েছ তুমি।

দেখো, ট্রেভেন, আমি… প্রতিবাদ করল সে, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলেন বাবা।

এটা অনুরোধ-ব্যক্তিগত একটা ফেভার চাইছি তোমার কাছে। থাকবে?

শ্রাগ করে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল ফ্রিম্যান স্কয়ার, ফিরতি পথে এগোল এবার নিশ্চিন্তে এগোলাম আমরা।

ট্রেইল একেবারে স্পষ্ট, কারণ একে তো রাত ছিল, তারওপর গরুর পালের পেছন পেছন গেছে ওরা। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ বুনো অঞ্চলের দিকে এগিয়েছে গরুগুলো। লিপান ইন্ডিয়ানদের এলাকা এটা, যদিও ইদানীং সাদাদের প্রতি কিছুটা উদার মনোভাব দেখাচ্ছে ওরা।

ভোরের অস্পষ্ট আলোয় এগিয়ে চলেছি আমরা-গম্ভীর, ক্ষুব্ধ কয়েকজন মানুষ। গরুর পাল এবং রাস্টি বুচার্ডকে হারিয়ে প্রায় খেপে আছে সবাই, উসিলা পাওয়া মাত্র খুনোখুনি শুরু করবে। এখন আর শান্ত, নির্বিরোধী, নিজের চরকায় তেল দিতে অভ্যস্ত পরিশ্রমী মানুষ নই আমরা। আউটল বা উজ্জ্বল রেনিগেডদের পিছু তাড়া করার মানে শুধু প্রতিশোধ নেওয়া বা সম্পত্তি পুনরুদ্ধার নয়, বরং এরচেয়ে বেশি কিছু, বুনো পশ্চিমের অপরিহার্য একটা দাবি-আইন, নীতি কিংবা সাম্যের প্রতিষ্ঠা। যেখানে আইনের অস্তিত্ব নেই, সেখানে সৎ বিবেচক মানুষের প্রস্তাবনাই আইন।

বসন্তের বাদামী ঘাসে ঝিলিক মারছে সকালের সোনা রোদ, পেছনে ফেলে আসা কঞ্চো নদীর কাঠামো ধীরে ধীরে গাঢ় একটা রেখার আকৃতি পেল। ট্র্যাক খুঁজে পাওয়ার আশায় খানিকটা ছড়িয়ে পড়লাম আমরা। ট্রেইলে বা আশপাশে গরুর অসংখ্য ছাপ রয়েছে, তার মধ্যে রাইডারদের ছাপ খুঁজছি।

ট্রেইল ছেড়ে ডান দিকে সরে এসে হঠাৎ ভিন্ন ধরনের কিছু ট্র্যাক খুঁজে পেলাম। নিঃসঙ্গ একজন রাইডার। দারুণ শক্তিশালী এবং দীর্ঘ একটা ঘোড়ায় চড়েছে লোকটা। লাগাম টেনে ঘোড়া থামালাম, মনোযোগ দিয়ে দেখলাম ছাপগুলো।

দারুণ লম্বা ঘোড়াটা, লাফ দেয়ার ভঙ্গি স্বচ্ছন্দ-আমাদের পনিগুলোর মত নয় মোটেই, বরং এরচেয়ে বড় এবং ঢের ভাল স্বাস্থ্যের। খুরের ছাপের গভীরতা দেখে আন্দাজ করলাম স্যাডলে খুব বেশি ওজন নেই।

বিস্ময়কর ব্যাপার, দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এসেছে লোকটা। তারমানে আমরা যাদের অনুসরণ করছি তাদের কেউ নয়। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না রহস্যময় এই রাইডারের উপস্থিতি। হয়তো স্কাউটিং করার জন্যে কাউকে পাঠিয়েছে ওরা, সে-ই এখন মিলিত হয়েছে দলের সঙ্গে। কিন্তু স্কাউটিঙে যাবে কেন? রেনিগেডদের মধ্যে এমন কে আছে যে এত দুর্দান্ত আর শক্তিশালী ঘোড়ার মালিক? হর্নারদের অনুসরণ করছে কেন সে?

গতরাতের কিংবা বিকেলের ট্র্যাক এগুলো। দারুণ কৌতূহল বোধ করছি, আমি, শক্তিশালী ঘোড়াটাকে অনুসরণ করে এগোলাম, তবে অন্যদের কাছ থেকে বেশি দূরে সরে যাইনি।

হঠাৎ ডানে বাঁক নিয়ে পশ্চিমে চলে গেছে ট্র্যাক, ঘোড়া থামিয়ে সেদিকে তাকালাম।

খোলা প্লেয়ারিতে কালো একটা কাঠামো চোখে পড়ল…মেক্সিটের ছোটখাট বন? সতর্কতার সঙ্গে এগোলাম, হাতে রাইফেল প্রস্তুত। কাঠামোটা ধীরে ধীরে বড় হলো…খোলা জায়গায় বড়সড় খাদে জন্মেছে গাছ আর ঝোঁপ।

ঝোঁপঝাড়ের কিনারা থেকে বোল্ডার আর পাথুরে দেয়ালের শুরু হয়েছে, বেশ উঁচু দেয়ালটা, গাছের মাথা ছাড়িয়ে গেছে প্রায়। দেয়ালের দিকে চলে গেছে ঘোড়াটার ট্র্যাক, ওপাশের খোলা মাঠে হারিয়ে গেছে। খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে এগিয়ে গেলাম।

পানির কুলকুল ধ্বনি ছাড়াও ঝর্নার পানি আছড়ে পড়ার শব্দ কানে এল। বাতাসে নড়ে উঠল গাছের পাতা। তারপর একেবারে নিশ্ৰুপ হয়ে গেল চারদিক।

কান খাড়া হয়ে গেছে আমার ঘোড়ার, সঙ্কীর্ণ ট্রেইল ধরে এগোচ্ছে ওটা। এতই সঙ্কীর্ণ যে দু’পাশে গাছের পাতার সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। স্টিরাপ। প্রায় ত্রিশ গজ এগোনোর পর আচমকা অগভীর একটা খাদ চোখে পড়ল, ওকের শাখা-প্রশাখা ঝুঁকে পড়েছে খাদের ওপর। পাশে পঞ্চাশ ফুট ব্যাসের খোলা জায়গা, ক্ষীণ ঝর্না নেমে এসেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ঝোঁপের কিনারে দারুণ সুন্দর কালো ঘোড়াটা চোখে পড়ল, আমার ঘোড়ার উপস্থিতি টের পেয়ে কান খাড়া করে তাকাল ওটা, নিচু, স্বরে হেষাধ্বনি করল।

ঝর্নার কাছাকাছি মাটিতে ক্যাম্প করেছে কেউ। গর্ত করে আগুন জ্বেলেছে, স্টোভে কফির পানি ফুটছে; আর বাতাসে বেকনের সুবাস।

যেখানে আছ, ওখানেই দাঁড়াও, সেনর! তীক্ষ্ণ একটা কণ্ঠ শুভেচ্ছা জানাল আমাকে। নইলে ঠিক পেট ফুটো করে ফেলব তোমার?

সতকর্তার সঙ্গে কাঁধের ওপর দু’হাত তুললাম। রাইফেলের হ্যামার টানার ক্লিক শব্দ শুনতে ভুল হয়নি, কিন্তু কণ্ঠটা কোন মেয়ের!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *