আয়নামহল – ৬

ছয়

সবজিখেতের দিকে তাকিয়ে থাকলে পেট ভরবে, ম্যাডাম? স্যুপ যে জুড়িয়ে গেল।

রোহিণী শার্সি থেকে চোখ ফেরাল। কাগজের গ্লাসটা নিল সোহমের হাত থেকে। ঠোঁট ছুঁইয়েই নাক কুঁচকেছে, টেস্টলেস।

সোহম কৌতুকস্বরে বলল, আমার তো দারুণ লাগছে। গুড সাবস্টিটিউট অফ টি।

চায়ের বিকল্প এই সিন্থেটিক টোম্যাটোর জল? ছি।… দ্যাখো না, আর একবার চা পাও কিনা।

এত ঘনঘন চা খেয়ো না, ম্যাডাম। সোনার অঙ্গে কালি পড়ে যাবে।

রসিকতাটা রোহিণীর গা-সওয়া। হসপিটালে সারাক্ষণই এরকম মন্তব্য করে সোহম। যদিও সে নিজে রোহিণীর চেয়ে বেশি চা খায়। অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরোলে তো বড় একখানা মগ নিয়ে বসে পড়ে। এবং তার গায়ের রং রোহিণীর মতো টকটকে না হলেও কম ফরসা নয়। আগে আগে রোহিণী ফরফর করে বলত, ডাক্তার হয়ে এসব উদ্ভট কথা বলতে তোমার জিভে আটকায় না? আজকাল হাসে, বুঝি-বা সূক্ষ্ম স্তুতিটুকু উপভোগ করে।

ভ্রূকুটি হেনে রোহিণী বলল, ফাজলামি রাখো। যাও, একটা চা-ওয়ালা খুঁজে বের করো।

রাজধানী এক্সপ্রেস ভালই গতি নিয়েছে। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সোহম টলে গেল সামান্য। টু টায়ারের ওপরের বার্থ খামচে সামলাল নিজেকে। এগোচ্ছে প্যাসেজ ধরে।

রোহিণী দু’-তিনটে চুমুক দিয়ে সিটের নীচে নামিয়ে রাখল গ্লাসখানা। দৃষ্টি ফের ট্রেনের বাইরে। শ্যাওলা সবুজ কাচের ওপারে সন্ধে এখনও পুরোপুরি নামেনি, দিনশেষের আলোয় ওপারের পৃথিবীটাকে কেমন বিষণ্ণ বিষণ্ন দেখায়। যেন দ্রুত অপস্রিয়মাণ গাছপালা মাঠঘাট বাড়িঘরে দুঃখের একটা পাতলা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কেউ।

বিষাদটা রোহিণীর মধ্যেও চারিয়ে যাচ্ছিল। কেন যে সে চলেছে কলকাতায়? দিব্যদার মতো এক প্রবল পুরুষ পড়ে আছে বিছানায়, প্রায় পঙ্গু হয়ে, এ দৃশ্য দেখাও তো যেচে কষ্ট পাওয়া। তবে কি কষ্টের দিকে ধেয়ে যাওয়াটাই তার নিয়তি?

সোহম ফিরেছে। ধপাস করে বসে পড়ল পাশে। বুড়ো আঙুল নেড়ে বলল, সরি ম্যাডাম। এখন চা কফি কিচ্ছু নেই, সোজা ডিনার।

সে কী? রাজধানীতে চা পাওয়া যাবে না?

তোমার ইচ্ছেমতো সময়ে পাবে না। প্যান্ট্রিকার যখন বানাবে, তখনই…

কোনও মানে হয়!

এই জন্যই তো বলেছিলাম, ট্রেন ফের্ন ছাড়ো, চলো ফ্লাইট পাকড়াই। আকাশে ইটস ওনলি আ ম্যাটার অফ টু আওয়ারস্।

আমার অত পয়সা নেই।

আজকাল তো প্লেনে সস্তার টিকিটও মেলে। চাইলে আমার ট্রাভেল এজেন্টকে লেলিয়ে দিতাম। সোহম চোখ নাচাল, এত কিপটেমি করো কেন, অ্যাঁ? হসপিটাল তো মাইনে তোমায় কম দেয় না!

আমার মাইনেটুকুই সম্বল, স্যার। ফ্ল্যাটের লোন শোধ করতে হচ্ছে, মা’র ট্রিটমেন্টের জন্য একটা স্টেডি খরচা আছে…। আমি তো তোমার মতো প্রাইভেট প্র্যাকটিস করি না, দিনে তিনটে-চারটে করে পেটও কাটি না।

কামাচ্ছি বলে জেলাস? সোহম কামরা কাঁপিয়ে হেসে উঠল। পরক্ষণে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করছে, ওপেন অফার তো দেওয়াই আছে, ম্যাডাম। চলো, জয়েন্ট ভেনচার হো যায়ে। আমি গাইনি, তুমি পেডিয়াট্রিশিয়ান, মোস্ট আইডিয়াল কম্বিনেশন। মাগুলো আমার, বাচ্চারা তোমার। ইটস আ ফিফটি ফিফটি ডিল, আই প্রমিস।

দিব্যি কেমন হাসিঠাট্টার ছলে মনের গভীর বাসনাটা প্রকাশ করতে পারে সোহম! কে বলবে এই মানুষটার একটা মর্মান্তিক অতীত আছে? এবং সেই ক্ষত এখনও সম্পূর্ণ শুকোয়নি?

রোহিণী শুকনো হাসল। অন্যমনস্ক চোখ সামনের বার্থে বসে থাকা বয়স্ক অবাঙালি দম্পতির দিকে। সোহম আবার নতুন করে রোহিণীর সঙ্গে জীবনটা শুরু করতে চায়। বছর খানেক ধরেই বলছে। তার ময়ূরবিহারের ফ্ল্যাটে গিয়ে মা’র কাছেও ঠারেঠোরে পেড়ে এসেছে কথাটা। ইঙ্গিত বুঝে মা-ও খোঁচাতে শুরু করেছে, আর কতদিন রুনি, বয়স তো গড়িয়ে গেল, এবার বিয়েটা সেরে ফ্যাল। মা’র ধারণা, রোহিণীও সোহমকে পছন্দ করে বসে আছে। স্রেফ গড়িমসি করে নষ্ট করছে সময়।

মা’র ধারণা কি একেবারেই ভুল? সোহমকে কি রোহিণী অপছন্দ করে? উঁহুঁ, তা তো নয়। বরং বলা যায় তার তেরো বছরের দিল্লি প্রবাসে সোহমই একমাত্র মানুষ যার সঙ্গে একটু প্রাণ খুলে কথা বলতে পারে সে। ভিড়ের মাঝেও। একাও। সোহমকে ভাল না-লাগার তো কোনও কারণও নেই। ভদ্র, মার্জিত, রসবোধ আছে… সবচেয়ে বড় কথা, রোহিণী সামান্যতম অসুবিধেয় পড়লেও সোহম ছায়ার মতো পাশে। এই শীতের আগের শীতে, মা’র বুকে কফটফ বসে প্রায় যাই যাই দশা, ফোন পেয়ে রাতদুপুরে সেই কালকাজি থেকে দৌড়ে এল, মাকে গাড়িতে তুলে সোজা হাসপাতাল। যে ক’দিন মা সেখানে, নিজের কর্মব্যস্ততার মধ্যেও বারবার ফোন করছে, দেখে যাচ্ছে…। রোহিণীর মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল সেই সময়ে। ভালবাসে রোহিণীকে, কিন্তু কখনও উচ্চকিত নয়। এই যে প্র্যাকটিস শিকেয় তুলে রোহিণীর সঙ্গে কলকাতা চলেছে, মুখে বলছে বটে বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে, কিন্তু আদতে তো তা নয়। বাবা-মা’র কাছে যাওয়াটা নিছকই ছদ্ম আবরণ, রোহিণীর সঙ্গ পেতেই….

কেয়া হুয়া? অচানক খামোশ কেন, ম্যাডাম?

রোহিণী আনমনে গ্রীবা হেলাল।

পার্টনারশিপ ডিডের ক্লজ তৈরি করছ নাকি মনে মনে?

আমাকে কি অত হিসেবি মনে হয়?

বুঝি না।… তবে থটফুল মুড়ে তোমায় কিন্তু খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। কী ভাবছিলেটা কী?

তেমন কিছু নয়।

উঁহু, কিছু একটা ভাবছিলে।… তোমার দাদার কথা?

ওই আর কী। অন্য প্রসঙ্গ পেয়ে গিয়ে রোহিণী স্বস্তি বোধ করল। সোহমের এও এক বড় গুণ, বিব্রত হতে দেয় না। ঠোঁট চেপে বলল, গিয়ে কী অবস্থায় দেখব না-দেখব…

নাথিং টু ওরি। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার মাসির মুখে তো শুনেছ, হেমারেজ হয়নি।

কিন্তু রাইট সাইডটা তো গেছে।

ওটা নিউরোজেনিক শক থেকে। ব্রেনের ব্লাড সারকুলেশন চোক করে গেলে কিছু সেল তো ড্যামেজড হবেই। মুভমেন্ট পেয়ে যাবেন আস্তে আস্তে।

হুঁ, ফিজিওথেরাপিতে ভালই রেসপন্স করছে। বড়মাসি তো বলল, স্পিচ এখন অলমোস্ট নরমাল।

তা হলে টেনশন করছ কেন? তোমার দাদাকে তো আমি দেখেছি, ভেরি স্ট্রংলি বিল্ট। খুব তাড়াতাড়িই রিকভার করে যাবেন। অবশ্য হাত পা হানড্রেড পারসেন্ট সচল হতে একটু সময় তো লাগবেই। অ্যান্ড দ্যাট মে ক্রিয়েট সাম প্রবলেম। আর্টিস্ট মানুষ তো, ছবি আঁকতে না-পারলে নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে ছটফট করবেন। তার থেকে ডিপ্রেশন এসে যাওয়াও অসম্ভব নয়।

রোহিণী একটু যেন কেঁপে গেল। দিব্যদা মানসিক অবসাদে ভুগছে, ভাবতেই গা-টা কেমন শিউরে ওঠে। মানুষটা যে শয্যাশায়ী, এটাই তো কল্পনার অতীত। এই তো, মাস চারেক আগে দিল্লি এল… মুখে সেই মনোহরণ হাসি, গলায় সেই হৃদয় কাঁপানো ডাক! কী রে রুনি, তোর রূপ যে আরও খুলছে দিন দিন! বয়স বাড়ছে, না কমছে? তোকে গড়ার জন্য বিধাতাকে নির্ঘাত ওভারটাইম খাটতে হয়েছিল! কী করে ফিগারটা এখনও একই রকম রেখেছিস রে? শুনেই বুকের ভেতরটা আবার উথালপাথাল। কত কষ্টে যে নিজেকে সংযত করেছিল রোহিণী! করেও বারবার। তবু কথাগুলো যেন কানে বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে। মনে হয় পদ্মফুলে ছাওয়া সরোবরের অতল থেকে উঠে আসছে এক ঘণ্টাধ্বনি। তবে সেই সরোবরের জলের রং নীল। বিষের মতো নীল।

রোহিণীর ঠোঁট নড়ল, দিব্যদার কি কখনও ডিপ্রেশন আসতে পারে?

সোহম খেয়াল করেনি রোহিণীর দূরমনস্কতা। বোতলের সিল খুলে জল ঢালছে গলায়। ছিপি আটকাতে আটকাতে বলল, আই হোপ, উনি ঠিকঠাকই থাকবেন। তবে সেদিন একটা জার্নালে পড়ছিলাম, বেটার দ্যান অ্যাভারেজ হেলথের মানুষরা, কিংবা যারা ভীষণভাবে কাজকর্মে মেতে থাকে… সাময়িকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার হলে তাদের ব্রেনে ফাংশনাল ডিজঅর্ডারের চান্সটা বেড়ে যায়। অবশ্য কনক্লুসিভলি কিছু প্রমাণ হয়নি। যদিও আমার পারসোনাল এক্সপিরিয়েন্স বলে…

ঝুপ করে থেমে গেল সোহম!

রোহিণী চোখ তুলল, তোমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা…?

হ্যাঁ। তবে তুমি কিন্তু এর থেকে কোনও সিদ্ধান্তে এসো না। সোহমের গলা অল্প উঠেও নেমে গেল, আমার মিসহ্যাপটার কথা তো তুমি জানো। সেই ভয়ংকর কার অ্যাক্সিডেন্টে শর্মিষ্ঠা আর বাবলি…। আমিও কিন্তু সেদিন বিশ্রী রকম ইনজিওরড্ হয়েছিলাম।

জানি তো।

চোটের এক্সটেন্টটা জানো না। টানা ছ’মাস আমি বিছানায় ছিলাম। প্রথম দু’মাস নার্সিংহোমে, তারপর আমাদের সল্টলেকের বাড়িতে। প্রায় চলচ্ছক্তিহীন হয়ে। পেলভিক ফ্র্যাকচার। হিপ স্পাইকা পরে শুয়ে আছি তো শুয়েই আছি। প্রথম প্রথম বউ-বাচ্চার শোকে ভেতরটা পাথর হয়ে থাকত। কিন্তু নার্সিংহোম থেকে ফেরার পরে অদ্ভুত একটা ফেজ এল। শর্মিষ্ঠা-বাবলি উবে যেতে লাগল মন থেকে। তখন সারাক্ষণ শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা। কবে ভাল হব? কবে উঠে দাঁড়াব? আদৌ কোনওদিন দাঁড়াতে পারব তো? ক্রমশ মাথাটা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছিল। চব্বিশ ঘণ্টা জেগে আছি, কড়া কড়া সিডেটিভও আমাকে ঘুম পাড়াতে পারছে না। কী যে সব পিকিউলিয়ার হ্যালুসিনেশন দেখতাম তখন! আমাকে হুইলচেয়ারে করে ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিছানায় শোওয়া অবস্থায় প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছি…! তোমাকে মিথ্যে বলব না রোহিণী, যারা আমার একদম কাছের ছিল, তাদের মৃত্যুর চেয়েও সেই সময়কার ট্রমাটা এখনও আমায় অনেক বেশি হন্ট করে। আর যদি দু’-এক মাস ওইভাবে পড়ে থাকতাম, আমি বোধহয় পাগল হয়ে যেতাম।

সোহমের হাসিখুশি মুখটা কেমন অন্য রকম হয়ে গেছে। মাথা নামিয়ে জলের বোতল নাড়াচাড়া করছে আলগাভাবে। সোহমকে এরকম কদাচিৎ দেখা যায়। রোহিণীর ভাল লাগে না।

সোহমকে সমে ফেরানোর জন্যে রোহিণী লঘু গলায় বলল, ভাগ্যিস পাগল হওনি। তা হলে তো দিল্লিতে আমায় তং করার জন্য কেউ থাকত না।

আমি তোমায় খুব জ্বালাই, তাই না?

উত্তরে আবার একটু রসিকতা জুড়তে যাচ্ছিল রোহিণী, ব্যাগে মোবাইল বেজে উঠেছে। তাড়াতাড়ি বের করে নাম্বারটা দেখল রোহিণী। দিল্লি। মা।

কী হল?

তুই বড়দির শাড়িটা নিয়ে গেলি না! দিব্যও সেবার ফেলে গেল…!

শাড়ির জন্য ফোন? আমি কি লৌকিকতা করতে যাচ্ছি?

তবু… কেনা ছিল…

সে আমি ওখান থেকে একটা কিনে দেব। তোমার খাওয়া হয়েছে?

এখনই কী? সবে তো পৌনে আটটা। ওমবতীর আগে সিরিয়াল গেলা শেষ হোক, তবে তো আটা মাখবে।

এই ক’টা দিন একটু বাবা বাছা করে রাখো, নইলে তো রাতে থাকবে না। সন্ধের ওষুধটা খেয়েছ?

হ্যাঁ।

প্রত্যেক দিনের সকাল বিকেল সন্ধে আর রাতের ওষুধ আলাদা আলাদা করা আছে। দেখে দেখে খাবে। ভুল যেন না হয়।

হ্যাঁ রে বাবা, হ্যাঁ। পাখিপড়া করে দিয়ে গেছিস তো।… তোরা কদ্দূর পৌঁছোলি?

এখনও কানপুর আসেনি। … সকালবেলা হাঁটুর এক্সারসাইজগুলো করবে মনে করে। দিনে তিনবার পাফ নেবে।… ঘাড়-মাথা দপদপ করলেই ডক্টর শ্রীবাস্তবকে ফোন কোরো। আমার বলা আছে, উনি এসে দেখে যাবেন।

আমাকে নিয়ে অত ভাবিস না তো। এক্ষুনি এক্ষুনি আমি মরছি না।

লেকচার দিয়ো না মা। এখন ছাড়ো, সকালে কলকাতা পৌঁছে আমি তোমায় ফোন করব।

পারলে ঝুনির বাড়িতেও এক-দু’ দিন থেকে আসিস। ওরা খুব খুশি হবে।

হুঁ।

মিমলির জন্য তো কিছু পাঠানো হল না। আমার হয়ে মিমলিকে একটা জামা কিনে দিস। কিংবা খেলনা। আর বিভাসকে বলিস, ঝুনি-মিমলি যখন দিল্লি আসবে, বিভাসও যেন আসে একবার।

এক কথা আর কতবার বলবে, মা? তোমার হয়ে আমি সব কর্তব্য‍ই পালন করে আসব। হয়েছে? এবার রাখছি।

ফোনটা ব্যাগে পুরতে পুরতে আপনাআপনি চোয়াল শক্ত হয়ে গেল রোহিণীর। কলকাতায় গিয়ে ঝুনির সঙ্গে দেখা হবে ভাবতেই শরীরটা কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায়। মা না-থাকলে কবে যে ওই শয়তানির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে ফেলত সে। দিল্লিতে চলে আসার পর একবারই মাত্র কলকাতায় গিয়েছিল রোহিণী। ঝুনি যে বিয়ের ঢঙটা করল, শুধু সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নয়, মাকে পাকাপাকিভাবে নিজের কাছে নিয়ে আসার জন্য। গাইঘাটার বাড়িটাও বেচে দিয়ে সমস্ত পিছুটান ছেঁটে ফেলেছিল সেই সময়েই। তবে ঝুনির তো লজ্জাশরমের বালাই নেই, দিদি তাকে পছন্দ করে না জেনেও বেশ কয়েকবার হানা দিয়ে গেছে দিল্লিতে। দিনগুলো তখন যে কী বিচ্ছিরি কাটে! অনবরত ঝুনির আহ্লাদিপনা, হ্যা হ্যা, হি হি… অসহ্য! সেই ঝুনির বাড়ি গিয়ে থাকবে রোহিণী! প্রাণ থাকতেও নয়। কাউকে তো বলা যায় না, ঝুনি কীভাবে তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। মাকেও না।

সোহম কখন পাশ থেকে উঠে গিয়েছিল। ফিরল। তার মুখের সহজ হাসিটাও ফিরেছে আবার। বসতে বসতে বলল, ওফ, ট্রেনে সিগারেট খাওয়াটা যে কী ঝকমারি! শেষে কিনা বাথরুমে ঢুকে ফুডুক ফুডুক! মনে হচ্ছিল স্কুলের ছেলে হয়ে গেছি… এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম!

রোহিণীও হাসি টানল ঠোঁটে, তুমি স্কুল থেকে সিগারেট খাও?

ক্লাস নাইন। এ বছর আমার সিগারেট স্মোকিংয়ের সিলভার জুবিলি হল।

ডাক্তার হয়ে বুক ফুলিয়ে বলছ! লজ্জা করে না?

করে তো। কত কমিয়ে দিয়েছি। এখন তো দুটো সিগারেট খাওয়ার মাঝের সময়টায় কোনও সিগারেট ধরাই না। বিলিভ মি।

কথার মারপ্যাচও জানে বটে সোহম। ছদ্মকোপে তাকে চড় দেখাল রোহিণী। সোহম হাসছে হা হা।

নৈশাহার বিতরণ শুরু হয়ে গেছে। খাবার নিয়ে মুখোমুখি বসল দু’জনে। কথা চলছে টুকটাক। সোহমই বলছে বেশি, রোহিণী শ্রোতা। সোহম বলছে তার বাড়ির কথা, বাবা মা দাদা বউদি ভাইপো ভাইঝির গল্প। সোহমের পরিবারের সবাই নাকি চায়, সে আবার ফিরে আসুক, কিন্তু কলকাতা তার আর ভালই লাগে না। বছরে এক-দু’বার সপ্তাহ খানেকের জন্য শহরটায় সে পা রাখবে, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ, জমিয়ে ক’টা দিন আড্ডা ফাড্ডা, ব্যস ওইটুকুই যথেষ্ট। এবার কলকাতা যাত্রার সমাচারটা অবশ্য বাড়িতে জানায়নি সোহম, হঠাৎ আবির্ভূত হয়ে সে একটা চমক দিতে চায়।

বলেই সোহম হাসছে, আমি কিন্তু চমকটা আরও বাড়িয়ে দিতে পারি।

রোহিণীর মুখ দিয়ে প্রশ্ন বেরিয়ে গেল, কীভাবে?

সে তো তুমি বলবে। চমকটা তো তোমার হাতে

সামান্য সপ্রতিভ স্বরে রোহিণী বলল, তাড়া কীসের সোহম। আর ক’টা দিন যাক।

যাক। দিন যাক। মাস যাক। বছর যাক। গ্রীষ্ম বর্ষা শীত বসন্ত সবই যাক। আমার চল্লিশটা গড়াতে গড়াতে পঞ্চাশে পৌঁছোক। পঞ্চাশ থেকে ষাট। থানইটখানা কিন্তু আমার পাতাই থাকবে।

একটা কথা বলি সোহম? বুড়ো বয়সে আর ওসব হ্যাঙ্গাম ট্যাঙ্গামের কী দরকার! বেশ তো আমরা বন্ধু হয়ে আছি।

তোমার কী ধারণা, আমাদের শত্রু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে?

কী জানি। ভয় লাগে। ভুল হয়ে যাবে কিনা ভেবে পাই না।

কীসের ভুল? কেন ভয়? সোহমের চোখ চিকচিক, আমার একটা পাস্ট আছে বলে কি দ্বিধা? সেকেন্ডহ্যান্ড বলে দ্বিধা?

ছি ছি, ওভাবে বোলো না। বলতে নেই।

তবে?

রোহিণী একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। কী উত্তর দেবে সে? বলবে, সেও সেকেন্ডহ্যান্ড? তারও একটা অতীত আছে? বলা যায়? সোহম তবু উগরে দিয়ে নির্ভার হতে পারে খানিকটা, কিন্তু রোহিণীকে তো একটা পাথর আজীবন বয়ে বেড়াতেই হবে। সঙ্গোপনে। তা ছাড়া অতীতটা যে সত্যিই এখন অতীত, তাও কি জোরগলায় বলতে পারে রোহিণী? সে তো নিজেই নিজেকে বোঝাতে পারে না, অন্যকে সে কী বোঝাবে? সব কিছু না-জানিয়ে সংসার গড়ে তোলা, সেও তো এক ধরনের প্রতারণা। মিথ্যের ওপর বাড়ি বানাবে সে? বালির প্রাসাদ?

রোহিণীর নীরবতার কী অর্থ করল সোহম কে জানে, আর তুলল না প্রসঙ্গটা। মুখ ধুয়ে এসে রোহিণীকে বিছানা পেতে দিল। ধূমপানের অছিলায় কামরার বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর এসে কুপের পরদা টেনে দিয়ে উঠে গেল ওপরের বার্থে।

রোহিণীও শুয়ে পড়ল। শোওয়াই সার, চোখ বুঝতে পারে কই! বুজেই বা কী লাভ, মনের মুকুরে ফুটে ওঠা ছবি কি চোখ বন্ধ করলেই সরে যায়!

….রোহিণীর বাবা মারা গেছে সেদিন। দীর্ঘ আট মাস কোলোন ক্যান্সারে ভুগে, সংসারকে দেনায় ডুবিয়ে, জনশিক্ষা মন্দিরের গ্রন্থাগারিক নরেন সোমের জীবনদীপ নিভল। তাকে যমুনাপারের শ্মশানে পুড়িয়ে ফিরেছে লোকজন। রোহিণীর মা শোকস্তব্ধ, তারা দুই বোন তখনও ফোঁপাচ্ছে থেকে থেকে। হঠাৎই দিব্যদা সামনে এসে দাঁড়াল। হাত রেখেছে রোহিণীর মাথায়। ভরাট স্বরে বলল, কান্না একটু বাঁচিয়ে রাখ, রুনি। মানুষকে তো সারা জীবনই কাঁদতে হয়, একবারে চোখের জল সব ফুরিয়ে ফেললে চলবে কেন!

এমন কিছু গভীর সান্ত্বনাবাক্য নয়, তবু কী যে জাদু ছিল ওই কণ্ঠস্বরে, পনেরো বছরের রুনি সম্মোহিত, থেমে গেছে কান্না। তারপর দিব্যদা তাকে হাত ধরে নিয়ে এল বাইরে। সন্ধের আকাশে একটা একটা করে তারা ফুটছে তখন। আকাশটাকে দেখিয়ে দিব্যদা বলল, ওদিকে তাকা। এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমাদের অস্তিত্ব কতটুকু সেটা একবার ভাব। কিচ্ছু না। তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ। নিজেদের সুখদুঃখ এখানে বড় নগণ্য রে, একদম মূল্যহীন।

দিব্যদার ভারী ভারী কথাগুলো সেদিন ঠিকঠাক বুঝতে পারেনি রোহিণী। বোঝার কথাও নয়। বোঝার বয়সও হয়নি। তবে সেই মুহূর্ত থেকে বারো বছরের বড় মাসতুতো দাদাটি একটা অন্য ধরনের আবেশ তৈরি করেছিল মনে। সেদিনের পরও আরও দু’দিন গাইঘাটায় ছিল দিব্যদা, শ্রাদ্ধশান্তির দিনও এসেছিল। রোহিণী সারাক্ষণ বিমোহিত চোখে দেখে গেছে তাকে। কী চমৎকার বলিষ্ঠ চেহারা, যাকে বলে সত্যিকারের পুরুষ। দেশ-বিদেশ ঘুরে এসে সদ্য আর্ট কলেজে আঁকা শেখাতে ঢুকেছে, মাত্র কয়েকটা রেখার আঁচড়ে বাবার একটা স্কেচ বানিয়ে দিল, বিপুল দাপটে সব কিছু দেখাশোনা করছে, মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভাবছ কেন মাসি, আমরা তো আছি … এমন একটা মানুষের দিকে মুগ্ধ চোখে না-তাকিয়ে পনেরো বছরের মেয়েটার উপায় আছে! দিব্যদা দুটো কথা বললেই হৃৎপিণ্ড কেমন ধকধক করতে থাকে। গায়ে গায়ে একটু ছোঁয়া লাগলেই শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।

রোহিণীর মনে আছে, দিব্যদার বিয়ের খবরে ভীষণ ভীষণ মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল তার। বিয়েতে, বউভাতে, বউ আসার দিন, সারাক্ষণই রয়েছে দিব্যদাদের চেতলার বাড়িতে, আবার যেন নেইও। হু হু করছিল ভেতরটা। দিব্যদা কেন যে পৃথাবউদির হয়ে গেল!

হায়ার সেকেন্ডারির পর মেডিকেলে চান্স পেল রোহিণী। মা চিন্তায় চিন্তায় মরছে, কোনওক্রমে দু’বেলা দুটো ভাতের জোগাড় হয়, বড় মেয়েকে ডাক্তারি পড়ানোর হাতির খরচ জুটবে কোথথেকে! বড়মাসি আবার বলল, আমি তো আছি। দিব্যদাও বলল, আমি আছি। ব্যস, রোহিণী সোজা নাচতে নাচতে কলকাতায়।

দিব্যদাকে কবে যেন একদম নিজের করে পেল রোহিণী? ফার্স্ট ইয়ারেই কি? না, না, বুঝি সেকেন্ড ইয়ার। দিনটা ছিল রবিবার। শীতের দুপুর। আর পাঁচটা ছুটির দিনের মতোই বড়মাসির বাড়ি গেছে রোহিণী, কিন্তু সেদিন পৃথাবউদি, বড়মাসি কেউ বাড়িতে নেই। পৃথাবউদি গেছে বাপের বাড়ি, বড়মাসিও বেরিয়েছে কোথায় যেন। বাড়িতে সেদিন শুধু দিব্যদা।

দিব্যদা দরজা খুলে বলল, খুব ভাল হয়েছে তুই এসে গেছিস। আমায় একটু কফি সাপ্লাই কর তো।

দিব্যদার সেবা করার বরাত পেয়ে রোহিণী হুড়মুড়িয়ে ঢুকেছে রান্নাঘরে। কফি নিয়ে দিব্যদার স্টুডিয়োটায় গিয়ে দেখল, দিব্যদা ফের মগ্ন রং-তুলিতে। ইজেলে রাখা ক্যানভাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে রং আর রং। কী আঁকছে ওটা? একটা মানুষের আদল যেন ফুটছে, আবার ফুটছেও না।

কফি নামিয়ে রোহিণী বলল, তু, কী যে আঁকো, আমি কিছু বুঝতে পারি না।

ক্যানভাস থেকে চোখ না সরিয়ে দিব্যদা বলল, ছবি বুঝতে গেলে চোখ লাগে। ইনার আই।… শিক্ষাও দরকার।

শেখাও আমায়।

এভাবে শেখানো যায় নাকি? ছবিকে উপলব্ধি করতে হয়। পেন্টিং ইজ অ্যান এক্সপ্রেশন অফ মাইন্ড। আমার মন কোনও একটা জিনিসকে, সেটা লিভিং হতে পারে, নন লিভিং হতে পারে, কীভাবে দেখছে, কতটা দেখছে এবং এই দেখায় কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে… সবই কিন্তু ছবির মধ্যেই থাকে।

কিন্তু যেটা আঁকছ, সেটা কী?

একটা মেয়ে। যে তার পাস্ট প্রেজেন্ট আর ফিউচারকে ডিস্টিংগুইশ করতে পারছে না।

কিন্তু কোথায় মেয়েটা? নাক কোথায়? চোখ কোথায়? কান কোথায়?

দ্যাখ ভাল করে। খুঁজে বার কর।

রোহিণী ক্যানভাসের একদম সামনেটায় চলে গেল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। উঁহু, কিছু বুঝছে না। শুধু রং দেখছে। সবুজ, কালচে সবুজ, কচি কলাপাতা, বাদামি, হালকা বাদামি আর মরচে রং। হঠাৎই পেট গুলিয়ে হাসি উঠে এল, তুমি খালি এমন অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ছবি কেন আঁকো গো দিব্যদা?

উত্তর না-পেয়ে দিব্যদার দিকে ফিরেছে রোহিণী। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয় ছলাত। কেমন যেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকে দেখছে দিব্যদা!

রোহিণী নার্ভাস গলায় বলল, কী দেখছ? আআআমার দিকে তাকিয়ে কেন?

তুই কী সুন্দর হয়েছিস রে, রুনি! কেন তুই এত সুন্দর হলি?

রোহিণীর মুখে কোনও শব্দ এল না।

দিব্যদা আবার বলল, তোকে আমার আরও ভাল করে দেখতে ইচ্ছে করছে রে রুনি।

দেখছ তো!

এরকম নয়।… তোকে… তোকে…। বলতে বলতে দিব্যদা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে সামনে। রোহিণীর হাত দুটো চেপে ধরল, রুনি, প্লিজ… একবার… একবার…

কী যে ঘটে গেল ওই মুহূর্তে! প্রিয়তম পুরুষের প্রার্থনা তখন কি আর রোহিণী উপেক্ষা করতে পারে!

তার নিরাবরণ দেহটাকে কিন্তু নিজে থেকে স্পর্শ করেনি দিব্যদা। শুধু দৃষ্টির পালক বোলাচ্ছিল সর্বাঙ্গে। আর অস্ফুটে বলছিল, বিউটি ইজ ডেথ। বিউটি ইজ হেভেন। বিউটি ইজ লাইট। বিউটি ইজ ডার্কনেস।

নিজের শরীরটা তখন জ্বরো রোগীর মতো কাঁপতে শুরু করেছে রোহিণীর। একটা অচেনা কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। উন্মাদিনীর মতো ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল দিব্যদাকে। চুমু খাচ্ছে। বুকে মুখ ঘসছে। অস্থিরভাবে বলে চলেছে, আমি আর পারছি না দিব্যদা। পারছি না, পারছি না, পারছি না।

সেই শুরু। তারপর তো প্রায় নিয়মিতই চলতে থাকল খেলাটা। সপ্তাহে এক দিন, সপ্তাহে দু’দিন…। কী তীব্র আবেগে যে মিলিত হত তারা! তাকে আদর করার সময়ে দিব্যদা যেন মাতাল হয়ে যেত। ভালবাসা যেন শরীর ছাপিয়ে অন্য কোথাও পৌঁছে দিত দু’জনকে।

এক দুপুরে তো ধরাই পড়ে গেল হাতেনাতে। সেদিন পৃথাবউদির জন্য কী খারাপ যে লেগেছিল। কিন্তু দিব্যদাকে সে ছাড়ে কী করে! এক দিকে চোরা পাপবোধ, অন্য দিকে নেশার টান, সে যে কী তীব্র দোলাচল!

তবু দিব্যদাকে রোহিণী বলেছিল, আর নয়, এবার আমাদের থামতে হবে দিব্যদা।

অনুনয়ের সুরে দিব্যদা বলেছিল, আমার রোহিণী নক্ষত্রকে ছেড়ে আমি বাঁচব কী করে, রুনি?

একই কথা কি ঝুনিকেও বলত দিব্যদা? আমার কৃত্তিকা নক্ষত্রকে ছেড়ে কী করে বাঁচব, ঝুনি!

ঝুনির সঙ্গে দিব্যদাকে মনে পড়ামাত্র এক তীব্র শীতের অনুভূতি। কামরার এসিটা কি বেড়ে গেল সহসা? পায়ের কাছে পড়ে থাকা কম্বলটা টানল রোহিণী, গলা পর্যন্ত। গুটিয়ে মুটিয়ে শুয়েছে। ভয়ংকর গতিতে ছুটছে ট্রেন, শব্দ বাজিয়ে, শব্দ ছড়িয়ে। চাকায় লেগে পাথরকুচি ছিটকে যাওয়ার আওয়াজগুলোও রোহিণীর বুকে এসে তিরের মতো বিঁধছিল।

ঝুনির লীলাখেলার খবরটা রোহিণীকে শুনতে হয়েছিল পৃথাবউদির মুখ থেকে। তখন ডাক্তারি পাশ করে গেছে রোহিণী, সবে জয়েন করেছে একটা নার্সিংহোমে। বড়মাসির বাড়ি তখন আর যায় না বড় একটা, পৃথাবউদিকে সাধ্যমতো এড়িয়ে চলে। দিব্যদার সঙ্গে দেখা হয় বাইরে, ছোটখাটো আউটিংয়ে চলে যায় দু’জনে।

ওই সময়ে যাদবপুরে একটা ছোট্ট টু রুম ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল রোহিণী। ঝুনিও তখন চলে এসেছে কলকাতায়। গ্র্যাজুয়েশনের পর কীভাবে যেন চাকরি জুটিয়ে ফেলেছে এক বিজ্ঞাপনের ফার্মে। মাকে ও সঙ্গে এনে রেখেছে দুই বোন।

পৃথাবউদি অবশ্য সেই ফ্ল্যাটে যায়নি, এসেছিল রোহিণীর নার্সিংহোমে। তাকে একান্তে ডেকে নিয়ে কর্কশভাবে বলেছিল, তোমরা দুই বোন কী আরম্ভ করেছ, অ্যাঁ? দাদাটাকে শরীরের লোভ দেখিয়ে জোঁকের মতো চুষছ? বাজারের মেয়েছেলেদেরও কিছু এথিক্স থাকে, তোমাদের কি তাও নেই?

রোহিণী হাঁ, আমি তো… বিশ্বাস করো বউদি… দিব্যদার সঙ্গে আর…! দিব্যদা! দাদা শব্দের মানে বোঝো? তোমার বোনটি তো তোমার চেয়েও সরেস। শুধু আশনাই করে আশ মিটছে না, সে তো লোকটার মানিব্যাগও সাফ করছে।

রোহিণীর দু’কান ঝাঁঝাঁ। চোখে ঘোর অবিশ্বাস। বাড়ি ফিরেই ধরল ঝুনিকে। আশ্চর্য, ঝুনির কোনও বিকার নেই! তেত্রিশ মাসের ছোট বোন মুখের ওপর বলে দিল, দিব্যদা তোর একার নাকি? তোর যতটা রাইট আছে দিব্যদার ওপর, আমারও ততটাই আছে।

বোনের মাত্র দুটো বাক্যেই রোহিণী বুঝে গেল, ঝুনি তার ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। পদে পদে সে দিদির থেকে পিছিয়ে। সৌন্দর্যে, লেখাপড়ায়… এমনকী বাবার ভালবাসাও রোহিণীই বেশি পেয়েছিল। কোথাও না কোথাও দিদিকে তো তাকে হারাতেই হবে।

দিব্যদাও তার স্বরূপটা চেনাল সেই সময়েই। অবলীলায় বলে দিল, আমি কাউকে আমার কাজের কৈফিয়ত দিই না, রুনি। তুই আমার চোখে যা ছিলি, তাই আছিস। বিশ্বাস যদি করতে পারিস তো কর, নইলে আমার কিছুই বলার নেই।

এর পর কি আর রোহিণী থাকতে পারে কলকাতায়? চলে এসেছে সে, দূরে চাকরি নিয়ে পালিয়ে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। মাঝে বহুবার দিল্লি গেছে দিব্যদা, তার ফ্ল্যাটেও থেকেছে, কিন্তু দিব্যদাকে আর এক চুলও কাছে এগোতে দেয়নি রোহিণী। বুঝে গেছে, মানুষটার মনে প্রেম বলে কোনও বস্তু নেই, অন্যের মনোকষ্টে ওই মানুষ পীড়িত হয় না, এর সান্নিধ্যে দুঃখ ছাড়া কিছু জুটবে না কখনও।

তবু তাকে দেখে রক্তের গতি চঞ্চল হয়। তবু তার অসুখের সংবাদে চোখ ভরে আসে জলে। তবু তাকে নিয়ে ভাবলে এক অলৌকিক পুলক সঞ্চারিত হয় শিরায় শিরায়। হায় রে রোহিণী!

ঘটাং ঘটাং শব্দে কোনও সেতু পার হল ট্রেন। রোহিণী উঠে বসল। চোখ রাখল কাচে। ওপারে গাঢ় তমিস্রা। হঠাৎ হঠাৎ দূরে কোথাও আলোর ফুটকি দেখা যায়, মিলিয়েও যায় তৎক্ষণাৎ। কুপের পরদা সরে গেছে অল্প, নীলচে আলো এসে পড়ছে ভেতরে। আলোর সরু রেখাটাকে একটুক্ষণ দেখল রোহিণী, আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল আবার। পাশ ফিরেছে। বড় জোর দু’-তিন মিনিট, ফের উঠে বসল। দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। কোনও একটা কুপে বীভৎস সুরে নাক ডাকছে কারও। হঠাৎ একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল। মা থামাচ্ছে বাচ্চাটাকে, ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। দিব্যদা কী করছে এখন? ঘুমোচ্ছে নিশ্চয়ই? দিল্লির ফ্ল্যাটেও আচমকাই মনে হয় এরকম। নিশুত রাতে জেগে উঠে মনে হয়, এই মুহূর্তে কী করছে দিব্যদা? কেমন আছে?

রোহিণী মাথা ঝাঁকিয়ে সিট ছেড়ে নামল। টলমল পায়ে প্যাসেজ ধরে হাঁটছে। ট্রেনের এক কর্মচারী দুপদাপিয়ে আসছিল, সরে তাকে জায়গা করে দিল। কাচ ঠেলে বাইরে এসেছে।

বড্ড তাপ, বড় বেশি তাপ বাইরে। তবে দিব্যি হাওয়াও আছে। বাথরুম ঘুরে এসে একটুক্ষণ হাওয়াটাকে মাখল রোহিণী। আবার চলেছে স্বস্থানে।

কুপে ঢুকেই সোহমের দিকে চোখ গেল। তাকিয়ে আছে সোহম। দেখছে তাকে।

রোহিণী জিজ্ঞেস করল, এ কী, তুমি ঘুমোওনি?

সোহম হাসল, তুমি কি একাই জেগে থাকতে পারো, রোহিণী? আমি পারি না?

সোহমের হাতটাকে ছুঁতে ইচ্ছে করল রোহিণীর। সাহস হল না।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *