আয়নামহল – ১৩

তেরো

দিব্যজ্যোতি একা একা দাবা খেলছিল। চৌষট্টি ঘরের বোর্ডটা তাকে আজ পেয়ে বসেছে যেন। মধ্যাহ্নভোজের পর একটু ঝিমিয়ে নিয়ে খুঁটি সাজিয়ে শুরু করেছিল, এখনও একটা দান পুরো হল না। সম্পূর্ণ পক্ষপাতশূন্য হয়ে খেলা যে কী কঠিন! সাদা এগোতে গেলে কালোর ফাঁকফোকর নজরে পড়ে যায়, কালোকে এগোলে সাদার। কাউকেই তো সহজে জিততে দেওয়া চলে না, তাই দিব্যজ্যোতি খেলছে খুব সতর্ক হয়ে, ঢিমেতালে। এক একটা চাল দিয়ে ভাবছে তো ভাবছে, ভাবছে তো ভাবছে।

ডান দিকে নৌকোর ঘরের কালো বোড়েটাকে ষষ্ঠ ঘরে ঠেলতে গিয়ে দিব্যজ্যোতির হাত থেমে গেল। সাদা গজের রাস্তাটা খুলে যাচ্ছে না? চাল একবার দিয়ে ফেললে ফেরত নেওয়া যাবে না, এ-নিয়ম সে নিজেই স্থির করেছে, সুতরাং বোড়েটা না-ছোঁয়াই ভাল। বরং টিকে থাকা কালো ঘোড়াটাকে নিয়ে একটু ভাবলে হয়। রাজা-মন্ত্রীকে ঘিরে জব্বর দুর্গ গড়ে ফেলেছে সাদা, সরাসরি সেখানেই হানা দেওয়া দরকার।

মাথা চুলকে চুলকে শেষমেশ ঘোড়াটাকেই আড়াই ঘর বাড়াল দিব্যজ্যোতি। হ্যাঁ, এই ভাল। নৌকো মন্ত্রী, দুটোই একসঙ্গে ধরা পড়ছে, আবার ঘোড়ার পিছনে বোড়ের জোরও থাকছে। সাদা এবার সরাক মন্ত্রীকে।

নিজের মগজকে ঘুরিয়ে ফের কালো থেকে সাদায় আনছিল দিব্যজ্যোতি, সামনে মূর্তিমানা বাধা। মীরা আর গোবিন্দর যুগলে

প্রবেশ।

দিব্যজ্যোতি ঘাড় ওঠাল। মীরাকে দেখে নিয়ে বলল, বেরোেচ্ছ নাকি? আজ তো তোমার মিশন নেই!

একটু কসবা যাব রে।

সেখানে আবার কে আছে? তোমার ধর্মপথের কোনও সহযাত্রী?

ফের তোর ওই বাঁকা বাঁকা কথা! কতবার বলেছি, ধর্মকর্ম করতে আমি যাই না। নানান ধরনের তত্ত্বকথা শুনতে আমার ভাল লাগে। নিজে মানা না-মানাটা বড় নয় দিব্য, জানাটাই বড়।

ওয়েল সেড। দিব্যজ্যোতি খুনসুটিটায় মজা পেল। দাঁত বার করে বলল, কসবায় তা হলে কোন মক্কেল?

বললাম যে, মুঙ্গেরের রানিদি এসেছে। পেটে কী একটা অপারেশন হবে।… যাই, একবার দেখা করে আসি। মনটা খুব টানছে।

তোমাদের মনেরও বলিহারি। দিদা মারা যাওয়ার পর তো মুঙ্গেরের ছায়াও মাড়াওনি। বিশ বছর পর সেই মুঙ্গেরের দিদির জন্য হঠাৎ মন উচাটন!

মন থাকলেই উচাটন হয়, দিব্য। শুধু বিশ বছর নয়, যদ্দিন মানুষ বেঁচে থাকে, তদ্দিনই হয়। তুই এসব বুঝবি না।

কিউ? দিব্যজ্যোতি ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল, মুঝমে দিল য্যায়সা গড়বড়িয়া চিজ নেহি হ্যায় কেয়া?

হ্যায়, কি নেই হ্যায়, ভাবো। আমি যাচ্ছি।

যাও। গলা জড়িয়ে একটু কেঁদে এসো। দিব্যজ্যোতি চোখ টেরচা করে গোবিন্দকে দেখল, তা এই পক্ষীপ্রেমিকটিও তোমার সহচর হচ্ছেন নাকি?

তোকে একা ফেলে বেরোই আমি? মাখনলালকে চারটে শাড়ি ইস্ত্রি করতে দিয়েছিলাম, নিয়ে চলে আসবে গোবিন্দ।

দিব্যজ্যোতি চোখ টিপল, তা হলে ওকে দিয়ে কয়েকটা সাদাকাঠিও আনাই…

কী? কী আনাবি?

সিগারেট। আহা, কতকাল সুখটান দিইনি। তিন তিনটে মাস…। খেতে কেমন তাই তো ভুলে গেছি।

ভুলেই থাকো। আবার তোমার ডানা গজাচ্ছে, তাই না?

বা রে, এবার তো ওড়াউড়ি স্টার্ট করতেই হবে। আমি ডিসাইড করে ফেলেছি, নেক্সট শনিবার সুবর্ণলতায় যাব।

খবরদার। একদম বাড়াবাড়ি নয়। এখনও তুমি লাঠি নিয়ে হাঁটছ। ডাক্তার বলে দিয়েছে, আরও মিনিমাম এক মাস রেস্ট।

ওই ডাক্তারের বাড়ি ঢোকা এবার আমি বন্ধ করে দেব। ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে তোমাকে আধমরা করে দিল!

যা খুশি করো।

ছেলের দিকে একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন মীরা। লেজুড় সহ। হা হা হেসে উঠল দিব্যজ্যোতি। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শুনল কান পেতে। আবার মনোনিবেশ করেছে সাদা-কালোর যুদ্ধে।

সাদা মন্ত্রীকে যে কোন ঘরে রাখা যায় ভেবে পাচ্ছিল না দিব্যজ্যোতি। কালো বেশ ভালমতোই চেপে ধরেছে। তিড়িংবিড়িং লাফানো ঘোড়াটাকে কি সাফ করে দেবে বোর্ড থেকে? বড় প্যাঁচোয়া এই ঘোড়া, সোজাসাপটা চলে না, হুশহাশ ঢুকে পড়ে এদিক-ওদিক। সামনে আড়াল রেখেও নিস্তার নেই, টপকে যাবে টুপ করে। তফাতে থেকেও রাজা বিপন্ন হয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। নাহ্, একটা কিছু করতেই হয়।

সাদা গজ দিয়ে দিব্যজ্যোতি কালো ঘোড়াকে সাবাড় করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কালো বোড়ে কাটল গজকে। ঝট করে এগিয়েও গেল এক ঘর। দিব্যজ্যোতির মনে হল যেন অনেকটা। ষষ্ঠ ঘরে পৌঁছেছে, আর দু’ধাপ পেরোলে ওই তুচ্ছ একরত্তি বোড়ে হয়ে যাবে মন্ত্রীর সমান সমান। সাদাকে আরও সাবধানী হতে হবে এবার।

মাথা বোর্ডের আরও কাছে ঝুঁকিয়ে সাদার শক্তি নিরীক্ষণ করল দিব্যজ্যোতি। ঘোড়া গেছে, গজও খতম, একটা নৌকোও বদল করতে হয়েছে একটু আগে, মন্ত্রী ছাড়া আছে মাত্র দুটো ক্ষীণ বল বোড়ে… শালা সাদার আর এ-যাত্রা রক্ষা নেই। কী করা যায়? কী করে বাঁচানো যায়? মরিয়া হয়ে বোড়ের চাল দেবে? সাইডের সাদা পদাতিক যদি এক পা এগোয়, কালো হাতিকে পিছোতে হবে দু’পা। তখন যদি মন্ত্রীকে ঠিকঠাক ব্যবহার করা যায়…! একটাই সমস্যা, কালো বিশেষ ভুল করেনি, বরং সাদাই দুটো-তিনটে গন্ডগোল করে ফেলেছে। অকারণে দু’-দু’খানা আয়ুধ খোওয়াল।

প্যাসেজে কলিংবেলের আওয়াজ। দিব্যজ্যোতির ভুরু কুঞ্চিত হল। গোবিন্দ ব্যাটা কি চাবি নিয়ে যায়নি? গলা চড়িয়ে বলল, আসছি। দাঁড়া।

বিছানা থেকে নেমে লাঠি শক্ত করে ধরল দিব্যজ্যোতি। হাঁটতে গেলে টাল খাচ্ছে না বটে, তবে এখনও যেন কাঁপে ডান পা। এ-সপ্তাহ থেকে ফিজিওথেরাপিস্ট এক বেলা আসছে। আজ সকালেই ছেলেটা বলছিল, হাতের চেয়েও পা নাকি বেশি দিন ভোগাবে। অনেকটা ভার নিতে হয় কিনা।

খুট খুট লাঠি বাজিয়ে দিব্যজ্যোতি দরজায় এল। পাল্লা খুলে অবাক গোবিন্দ নয়, ঝুনি!

দিব্যজ্যোতি ঘাড় উঁচিয়ে ল্যান্ডিংটা দেখছিল। ঝুনি ফিক করে হাসল, কাকে খুঁজছ? মিমলি? সে আজ আসেনি।

দরজা থেকে সরে এল দিব্যজ্যোতি। স্বাভাবিক গলাতেই বলল, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। ভেতরে আয়।

প্যাসেজে ঢুকে চটি ছাড়তে ছাড়তে ঝুনি বলল, মিমলিকে না-দেখে হতাশ হলে নাকি?

সবসময়ে এত সিলি কথা বলিস কেন?… সদর দরজা ভাল করে লাগিয়ে দে।

ফের বিছানায় এসে বসল দিব্যজ্যোতি। লাঠিটা পাশে রেখেছে। ঝুনি বেড়াল পায়ে অন্দরমহল ঘুরে দিব্যজ্যোতির ঘরে এল। চোখ বড় বড় করে বলল, তাই ভাবি, তুমি দরজা খুললে কেন! বাড়ি ফাঁকা! গেল কোথায় সব?

যে যার কাজে গেছে। সময় হলেই আসবে।

কম্পিউটারের সামনে রাখা চেয়ার টেনে এনে বসল ঝুনি। ঠোঁটে চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, এমন কাঠ কাঠ করে বলছ কেন? আমায় দেখে খুশি হওনি মনে হচ্ছে?

তোকে দেখে অখুশি হতে যাব কোন দুঃখে?

এক সময়ে কিন্তু… ঝুনি দুলছে অল্প অল্প। গলার আওয়াজটাকেও দুলিয়ে দিয়ে বলল, এরকম একা বাড়িতে আমায় দেখলে তোমার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত।

পুরনো কথা থাক।

থাক তবে। ঝুনি স্থির হল। চোখ কুঁচকে দেখল দাবার বোর্ডখানা তারপর যেন আপন মনেই বলে উঠেছে, তবে কী জানো দিব্যদা… পাস্ট ভীষণ বিচ্ছিরি ব্যাপার, কিছুতেই পিছু ছাড়ে না। কোনও না কোনওভাবে সে ঘুরে-ফিরে আসবেই লাইফে।

ভাঁজ মারিস না তো। প্যাঁচোয়া ডায়ালগ আমার পছন্দ হয় না। যা বলবি স্ট্রেটকাট বল।

শুনবে? সে ভারী ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।… পৃথাবউদির সঙ্গে কবেই তো তোমার কাট্টি হয়ে গেছে, তারপর থেকে তো তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগই নেই। সে কোথায় আছে, কেমন আছে, কিছুই জানি না। শুধু বড়মাসির কাছে শুনেছি, সে এখন হ্যাপিলি ম্যারেড।

হ্যাঁ। কণাদকে বিয়ে করেছে। কণাদ আমার ছাত্র। তো?

আরে সেই কণাদের গল্পই তো বলতে চাই। হঠাৎ ওই কণাদ একদিন আমাদের ফ্ল্যাটে হাজির! ভাবতে পারো?

কণাদ? তোদের বাড়ি? কেন?

সেও এক কাহিনি। কত কী যে ঘটে গো!… কণাদবাবু নাকি আমার বিভাসবাবুর স্কুলের ক্লাসমেট! বিভাস একদিন অফিস থেকে বেরোচ্ছিল, হঠাৎই পার্ক স্ট্রিটে কণাদের সঙ্গে মোলাকাত। অনেক বছর পর পুরনো বন্ধুর দেখা পেয়ে বিভাসের বুকে পুলক জাগল, টানতে টানতে বন্ধুকে নিয়ে এসেছিল বাড়িতে।

অ। তা এমন তো হতেই পারে।

সে তো বটেই। তবে তোমার এক্স বউয়ের একদা-প্রেমিক-এখন- হাজব্যান্ডটি সেদিন কিন্তু আমায় খুব বোর করেছে। ঝুনি মুখভঙ্গি করল, আমি তো তাকে চিনতেও পারিনি। তুমি ছাড়া কাকেই বা সে যুগে আর চিনতাম, বলো! হয়তো দেখেছি। তোমার কত ছাত্রকেই তো চোখে পড়ত। তোমরা তো তখন কেউ আমায় বলোনি, পার্টিকুলার ওই ছাত্রটির সঙ্গেই তোমার বউ…। বাট দ্যাট কণাদ কিন্তু প্রথম দর্শনেই আমাকে রেকগনাইজ করল।

তুই সুন্দরী তো, তাই বোধহয় মনে রেখে দিয়েছে।

টিজ করো না দিব্যদা। ঝুনি ঠোঁট টিপে হাসল, একদিন এই ঝুনিকেই কিন্তু তোমার কুৎসিত লাগেনি।

বাজে কথা ছাড়। যা বলছিস, বল।

ইস, তোমার দেখি খুব আগ্রহ! ঝুনি মুখময় ছড়িয়ে নিল হাসিটা, হ্যাঁ… হয়েছে কী… মিস্টার কণাদের সঙ্গে বিভাস আমার আলাপ করিয়ে দিতেই সে সটান বলে উঠল, আমি তো আপনাকে চিনি! আপনি তো দিব্যদার বোন! পৃথা, আই মিন আমার মিসেসের কাছে আপনাদের দুই বোনের অনেক গল্প শুনেছি। দিব্যদা আপনাদের কত ভালবাসেন! আপনাদের জন্য কত কী করেছেন!… ভাবো তুমি, কী বজ্জাতি! আমাকে চাপে ফেলার কী চেষ্টা!

দিব্যজ্যোতি আলগা হাসল, তুইও তা হলে চাপে পড়িস?

অত সোজা! আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। হেসেটেসে। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে। তবে চলে যাওয়ার পরে মনে হল, কী জানি ওই কণাদ যদি বিভাসকে গলগল করে সব কথা…। যাক গে যাক, মরুক গে যাক, বললে বলবে। অত ভাবাভাবি আমার পোষায় না।… অ্যাদ্দিন পর জেনে বিভাস করবেটাই বা কী? হয় কোঁত করে গিলে নেবে, নয় আমায় প্রশ্ন করবে। গিলে নিল, তো চুকেই গেল। জিজ্ঞেস করলে সোজা ডিনাই।… কাকে সে বিশ্বাস করবে? বউ? না বন্ধু?

তেরচা চোখে দিব্যজ্যোতি বলল, আরও কিছু করতে পারে। যদি তোকে ছেড়ে চলে যায়?

ঝুনি দু’-এক সেকেন্ড চুপ। তারপর হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়ে আর কী। কোনওক্রমে হাসির দমক সামলে বলল, ওফ, একটা কথা বললে বটে! বিভাস কোন যুক্তি দিয়ে আমায় ছাড়বে, অ্যাঁ? বিশ্বসুদ্ধু লোককে মুখ ফুটে বলতে পারবে কারণটা? নিজের মুখ পুড়বে না? তা ছাড়া বিয়ের আগে আমার কার সঙ্গে কী সম্পর্ক ছিল, সেই গ্রাউন্ডে ডিভোর্স হয় নাকি? জজ ওকে কান ধরে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে দেবে।

দিব্যজ্যোতি আরও একটু উসকোনো গলায় বলল, তবু… তোদের সম্পর্কে একটা ফাটল তো ধরে যাবে।

ধরতে দেবই না। ঠিক জোড়া লাগিয়ে নেব।… শোনো দিব্যদা, অত দূর ভাবার দরকারই নেই। বিভাস বিশ্বাস করবেই না। তোমার কোনও বদনাম শোনার আগে ও কানে আঙুল দেবে। যা রেসপেক্ট করে তোমায়।

সদর দরজায় আওয়াজ। গোবিন্দ ফিরল। দিব্যজ্যোতির ঘর এক ঝলক দেখে নিয়ে সরে যাচ্ছিল, ঝুনি চেঁচিয়ে ডাকল, অ্যাই, অ্যাই, শোন…?

ঘুরে এসেছে গোবিন্দ। মীরার শাড়িগুলো সামলাতে সামলাতে বলল, আজ্ঞে, কাকিমা?

অ্যাই, আবার কাকিমা! মাসি বল। … কফি বানাতে পারিস?

হ্যাঁ।

দিব্যদাও তো খাবে… দু’কাপ করে আন। ঝটপট। আমি তোর মামার মতো তিতকুটে কফি খাই না, আমায় দুধ, চিনি সব দিবি।

মামাকে এখন চিঁড়েভাজা দেব। তুমি খাবে চাট্টি?

নাহ্। শুধু কফি।

গুছিয়ে হুকুম করে বাহারি ভ্যানিটিব্যাগখানা খুলেছে ঝুনি। রুমাল বার করে মুখে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছল সযত্নে। ছোট্ট আয়না সামনে ধরে দেখছে নিজেকে। তাকে স্থির দৃষ্টিতে লক্ষ করছিল দিব্যজ্যোতি। নজরে পড়তেই ঝুনি টেরিয়ে টেরিয়ে তাকাচ্ছে। ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী দেখছ গো?

কিছু না।

লিপস্টিক খুলে ঠোঁটে বোলাল ঝুনি, তোমার পেয়ারের রুনি তা হলে শ্বশুরবাড়ি চলল?

দিব্যজ্যোতি ঠোঁট ছুঁচোলো করল, আমি যে উলটোটাই শুনলাম। মানে? ফট করে হাতআয়না বন্ধ করেছে ঝুনি। বিস্মিত মুখে বলল, দিদির বিয়ে আবার কেঁচে গেল নাকি!

আরে না। শুনলাম সোহমই নাকি রুনির ফ্ল্যাটে এসে থাকবে।

তাই বলো। রুমাল, আয়না, লিপস্টিক ব্যাগে রাখল ঝুনি। চটুল হেসে বলল, দিদি যে কোনও দিন বিয়ে করবে, এ আমি এক্সপেক্টই করিনি। এখন দেখা যাচ্ছে, আলটিমেটলি তোমার ওপর ওর সেই অক্ষয় প্রেমও উবে গেছে।

প্রেম কখনও অক্ষয় হয় না রে ভাই। ভেরি মাচ পেরিশেবল। নশ্বর। কোল্ড স্টোরেজে রেখে দিলে কিছু দিন থাকে বটে, তবে শেষ পর্যন্ত পচেই যায়। তখন তার থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়। তার চেয়ে উবে যাওয়া ঢের ঢের ভাল।

কথার ফুলঝুরি ছুটিও না দিব্যদা। আমি জানি, তুমি মনে মনে দাগা পেয়েছ।… বলতে না, রুনির মধ্যে একটা ডেপথ্ আছে…। কোথায় গেল সেই ডেপ্‌থ, অ্যাঁ? সোহম সব ভাসিয়ে দিল তো?

দিব্যজ্যোতি হো হো হেসে উঠল, ওরে শোন, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দিব্যজ্যোতি সিংহর হিংসে জাগানো যায় না। কোনও ব্যাপারে, কারও ওপর, আমার যদি হিংসে হয়, আমি সেটাকে ফাইট আউট করি। … তবে তুই যে এখনও জ্বলিস, সেটা কিন্তু প্রমাণ করে দিলি।

আমার ভারী বয়ে গেছে। আমি দিদির চেয়ে ঢের ভাল আছি।

গুড। ওরকমটাই থাকার চেষ্টা কর।… এবার ধানাইপানাই ছেড়ে ঝেড়ে কাশ তো। হঠাৎ কেন আবির্ভূত হলি বল?

বা রে, আমি তো প্রায়ই তোমায় দেখতে আসি। আসি না?

সঙ্গে সারাক্ষণ একটা ল্যাংবোট থাকে, আজ তাকে রেখে এসেছিস যে বড়?

ঝুনির মুখে হাসি ফিরে এল, আমি জানি মিমলিকে দেখার জন্য তুমি ছটফট করো। নিজের মেয়ের ওপর টান যাবে কোথায়?

কাজের কথা বল ঝুনি

ঝুনির মুখ ফের গম্ভীর। চোয়াল শক্ত করে বলল, হ্যাঁ, বলতে তো হবেই। তুমি যতই অস্বীকার করো, মিমলির কিন্তু তোমার ওপর একটা অধিকার আছে। তোমার সব কিছুই মিমলির প্রাপ্য।

দিব্যর কপালে হালকা ভাঁজ পড়েই মিলিয়ে গেল। মুচকি হেসে বলল, আমার তো কিছুই থাকবে না রে। কী দেব?

আমাকে বোকা ভেবো না, দিব্যদা। তোমার সুবর্ণলতা আছে, বাড়ি আছে, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সও নেহাত কম নেই…

তুই আমার পাসবই দেখেছিস নাকি?

আন্দাজ তো করতে পারি। দিদার সম্পত্তিটাই তো ষোলো লাখে বেচেছ।

উঁহুঁ। টোটাল একুশ লাখ পেয়েছিলাম। মা সঠিক ইনফরমেশন পায়নি। দিব্যজ্যোতি বাঁকা হাসল, উইল তো আমি মনে মনে বানিয়ে ফেলেছি রে। সুবর্ণলতার জন্য একটা ট্রাস্ট তৈরি হবে। বাড়ি, ব্যাঙ্ক ব্যালান্স, এভরিথিং চলে যাবে ট্রাস্টে। এমনকী আমার মৃত্যুর পরে যদি কোনও ছবি বিক্রি হয়, তার টাকাও। কে সেই ট্রাস্টের প্রধান হবে, তাও আমার ঠিক করা হয়ে গেছে।

ঝুনি পাংশু মুখে জিজ্ঞেস করল, কে?

তুই জেনে কী করবি? আমি মরার পরেই দেখতে পাবি।

বুঝেছি।… দিদি?

দিব্যজ্যোতি আবার হো হো হেসে উঠল। দু’দিকে মাথা নেড়ে বলল, নাহ্, তুই আর বড় হলি না।

গুমগুমে গলায় ঝুনি বলল, কবে উইলটা করছ?

তাড়া কীসের! ধীরেসুস্থে করে ফেলব।

কফি এনেছে গোবিন্দ। সঙ্গে দিব্যজ্যোতির চিঁড়েভাজাও। রেখে চলে যেতে যেতে বলল, গল্প করতে করতে খেয়ে নাও, মামা। অনেকক্ষণ তোমার পেট খালি আছে।

দিব্যজ্যোতি চামচে করে চিঁড়েভাজা ফেলল মুখে। চিবোতে চিবোতে বলল, নে, কফি খা।

ছোট্ট চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখল ঝুনি। শুকনো গলায় বলল, মিমলি সত্যিই কিছু পাবে না?

দিব্যজ্যোতি জবাব দিল না। টুকটুক করে খেয়েই যাচ্ছে চিঁড়েভাজা। মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছে কাপে। হাসিহাসি মুখে ঝুনিকে বলল, কফিটা খা। জুড়িয়ে যাচ্ছে যে।

থাক। আমার তেষ্টা মরে গেছে।… যাচ্ছি।

ঝুনি চলে যাওয়ার পর দিব্যজ্যোতির মনে হল আজ ভারী সুন্দর করে সেজে এসেছিল ঝুনি। ময়ূরপঙ্খী রং শাড়ি, ঘাড়ের কাছে এলোখোঁপা, কপালে ছোট্ট খয়েরি টিপ… বেশ দেখাচ্ছিল মেয়েটাকে। লম্বা একটা শ্বাস টেনে দিব্যজ্যোতি টানটান হল বিছানায়। পাশে দাবার বোর্ডে যুযুধান প্রতিপক্ষ। সাদা আর কালো। মিনিট দশেক চোখ বুজে থেকে আবার উঠে পড়েছে। ঝুঁকল দাবার লড়াইয়ে। সাদা মন্ত্রীটাকে এগিয়ে দিল কোনাকুনি। হাঁক পাড়ল, গোবিন্দ, কাপপ্লেটগুলো এখান থেকে সরা। আর ও-ঘর থেকে দিদার টেলিফোনের ছোট বইটা আমায় দিয়ে যা তো।

মীরার কালো ডায়েরিখানা রেখে চলে যাচ্ছিল গোবিন্দ। দিব্যজ্যোতি ফের বলল, দাঁড়া। আর একটা কাজ আছে। আমার কাঠের আলমারিটা খোল। দ্যাখ মাঝের তাকে একটা কাচের বড়

বোতল আছে, বের কর।

হুইস্কির বোতল হাতে নিয়ে গোবিন্দ শিহরিত, এ মা, এ তো মদ!

দিব্যজ্যোতি হেসে বলল, দুর ব্যাটা। ওটাকে বলে কারণবারি। খেলে মন চাঙা হয়। যা, এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো একটা গ্লাস আর ঠান্ডা জল এনে দে তো।

সাইডটেবিলে পানীয়র আয়োজন। অনেকদিন পর সোনালি তরলের মায়াবী হাতছানি। দিব্যজ্যোতি বোতলটা তুলেও কী ভেবে রেখে দিল। মীরার ডায়েরিটা ঘাঁটছে। খুঁজে খুঁজে পেয়ে গেল প্রার্থিত নম্বর। কর্ডলেস টেলিফোন হাতে থেমে রইল ক্ষণকাল। তারপর বুড়ো আঙুলে বোতাম টিপছে।

রিং বেজে উঠল। বাজছে। বাজছে।

বারদশেক ঘণ্টি বাজার পর সাড়া পাওয়া গেল। বাচ্চার গলা, হ্যালো?

দিব্যজ্যোতি যেন হোঁচট খেল সামান্য।

ওপারে ফের রিনরিনে স্বর, হ্যালো? কে বলছ?

তুমি কে বলছ?

আমি টুকুস। না না, আমি অনিরুদ্ধ।

কেন, টুকুস নামটাই তো বেশ।

কিন্তু মা যে বলেছে অচেনা লোকদের ভাল নাম বলতে!

তাই নাকি? আমার তো বাবা টুকুসটাই বেশি ভাল লাগছে। তোমার মা কোথায়, টুকুস?

বাড়ি নেই। ফিরতে দেরি হবে। দাদুকে দেখতে গেছে।

কোন দাদু? যিনি সুকিয়া স্ট্রিটে থাকেন?

তুমি আমার দাদুকে চেনো?

চেনা তো উচিত। কী হয়েছে তোমার দাদুর?

ফ্র্যাকচার। পা ভেঙে গেছে।

সর্বনাশ! কী করে ভাঙল?

সে এক কাণ্ড! একটা লোক নাকি ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিল না, ঘুরে ঘুরে মরছিল, দাদু তাকে ঠিকানা খুঁজে দিতে একটা অন্ধকার গলিতে ঢুকেছিল। সেই লোকটাকে বাড়ি খুঁজে দিয়ে আসার সময়ে নিজেই একটা গর্তে পড়ে গেছে।

দিব্যজ্যোতি স্থির হয়ে গেল। গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছে না।

আবার টুকুসের স্বর, কী হল? শুনছ?

হুঁ। শুনলাম। তোমার দাদুর কপালটাই খারাপ।

যা বলেছ। বাসে-ট্রামে উঠবে না, শুধু হেঁটে হেঁটে ঘুরবে। দিদা কত বকাবকি করে, দাদু শোনেই না। থাকো এখন পায়ে প্লাস্টার নিয়ে পড়ে। টুকুস একটু দম নিল যেন। বড়দের ভঙ্গিতেই বলল, জানো তো, আমার বাবারও খুব ছোটাছুটি যাচ্ছে। দাদুকে নিয়ে ডাক্তার হসপিটাল, তার ওপর আবার নিজের অফিস…।

এই রকমই হয়, টুকুস। একজনের খেয়ালিপনায় পাঁচজনকে ভুগতে হয়।… তা তুমি কি এখন বাড়িতে একা?

না তো। ময়নামাসি আছে। টিভি দেখছে। ডাকব?

থাক। তোমার সঙ্গেই তো বেশ গল্প করছি। তোমার ডিস্টার্ব হচ্ছে না তো?

একটু একটু হচ্ছে।

সে কী? কেন?

এখনও যে হোমওয়ার্ক ফিনিশ হয়নি। বেঙ্গলি এসেটা না লিখে রাখলে মা এসে ঝাড় দেবে।

সরি। সরি। তা হলে তো এবার ছাড়তে হয়।

কিন্তু তুমি কে, তা তো এখনও বললে না?

আমি? আমি একটা রাক্ষস।

যাহ্, গুল মেরো না। রাক্ষস তো স্টোরিবুকে থাকে।

তার বাইরেও আছে দু’-চারটে। আমার মতো। যে গপ করে সবাইকে গিলে ফেলে।

মাকে তা হলে কী বলব? একটা রাক্ষস তোমায় ফোনে খুঁজছিল? তাই বোলো।

ঠিক আছে। বাই।

বাই।

টেলিফোন অফ করে গ্লাসে হুইস্কি ঢালল দিব্যজ্যোতি। চুমুক দিয়ে

আপনাআপনি বিকৃত হয়ে গেছে মুখ। বেশ কিছুদিন পর শরীরে যাচ্ছে অ্যালকোহল। জানান দিচ্ছে। ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে চোখ ঘোরাল রণক্ষেত্রে। সাদা-কালোর যুদ্ধ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। কালোই জিতবে মনে হচ্ছে। সাদার কি আর কোনও চান্স নেই? মন্ত্রীকে যদি ঠিকঠাক ব্যবহার করা যায়…। কিন্তু বল এত কমে এসেছে…!

গ্লাস শূন্য করে দিব্যজ্যোতি বাথরুমে গেল। ফিরে আর দাবায় বসল না, খেলার উৎসাহ যেন অনেকটা নিবে এসেছে। লাঠি ধরে ধরে এল ঝুলবারান্দায়।

খাঁচায় অল্প অল্প নড়াচড়া করছে গোবিন্দর পাখি। দিব্যজ্যোতি ঝুঁকল খাঁচার সামনে। ওমনি সরু লোহার দাঁড় বেয়ে পায়ে পায়ে সরে যাচ্ছে পাখিটা।

দিব্যজ্যোতি হেসে উঠল, বোকা কোথাকার। ভিতুর ডিম…। ধরা পড়লি কী করে?

পাখি চোখ পিটপিট করল।

দিব্যজ্যোতি আরও জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে গান ধরেছে, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়… ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম তাহার পায়ে…

দু’লাইন গাইতেই গানটা যেন দখল করে নিল দিব্যজ্যোতিকে। গলা চড়ছে ক্রমশ,

আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা,
মধ্যে মধ্যে ঝল্কা কাটা,
তার উপরে আছে সদর কোঠা আয়নামহল তায়…

গোবিন্দ বারান্দায় উঁকি দিয়েছে। জুলজুল চোখে দেখছে মামাকে। দিব্যজ্যোতি গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী রে ব্যাটা, কেমন শুনছিস?

বলেই উত্তরের অপেক্ষায় না-থেকে সামনে হাত মেলে দিয়েছে। ফিরছে ঘরে। হাঁটতে হাঁটতে গাইছে,

মন তুই রইলি খাঁচার আশে,
খাঁচা যে তোর তৈরি কাঁচা বাঁশে রে।
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে,
ও মন
লালন কয় খাঁচা খুলে সে পাখি কুনখানে পালায় …

নিজের ঘরের চৌকাঠ ডিঙোতে গিয়েও দিব্যজ্যোতি দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল ছাদে ওঠার সিঁড়িটাকে। সুরার প্রভাবে মাথা অল্প ঝিমঝিম। বহুকাল খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ানো হয়নি, যাবে একবার? সিঁড়িতে পা রাখতেই পিছনে গোবিন্দ, তুমি ওপরে চললে যে? তোমার না সিঁড়ি চড়া বারণ?

বেশি গার্জেনি ফলাস না তো। ঊর্ধ্বপানে চলি আমি, রোধে কে আমায়!

লালনের সুরে স্বরচিত পঙ্ক্তি গেয়ে উঠল দিব্যজ্যোতি। লাঠিতে ভর দিয়ে, সময় নিয়ে নিয়ে, ভাঙছে সিঁড়ি। একটা করে ধাপ, একটু করে থামা। বাইশটা সিঁড়ি চড়তে যেন বাইশ বছর সময় লেগে গেল। ওপরে ওঠা কী যে কঠিন!

ছাদে পৌঁছে হাঁপাচ্ছে দিব্যজ্যোতি। ঘেমে গেছে রীতিমতো। কাঁপছে থিরথির। মিষ্টি হাওয়ার ঝাপটা এল সহসা। কিছুটা যেন জুড়োল শরীর। চিলেকোঠার দেওয়ালে হেলান দিয়ে তাকাল উপর পানে। মেঘ নেই, সন্ধের আকাশে ঝিকমিক করছে তারা।

চোখ চালিয়ে দিব্যজ্যোতি চেনা তারাদের খুঁজতে শুরু করল। ওই তো সপ্তর্ষিমণ্ডল। পুলহ, ক্রতু… সোজা চলে গেলে ওই তো সিংহ রাশি। ওদিকের উজ্জ্বল তারাটা মঘা না? সিংহরাশির পূর্ব দিকে তো বুয়োটিসের থাকার কথা!

হ্যাঁ, আছে। লালচে রং স্বাতীকেও দেখা যায়। কিন্তু চিত্রা কোথায় গেল? আবার সপ্তর্ষিমণ্ডলে এল দিব্যজ্যোতি। আন্দাজে আন্দাজে বশিষ্ঠ, অঙ্গিরা আর মরীচিকে জুড়ল। বৃত্তচাপের মতো লাইনটাকে ঘুরিয়ে দিল দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে। আছে, আছে, স্বাতীর পরে চিত্রাও আছে। উত্তরফাল্গুনী, চিত্রা আর স্বাতী… মুঙ্গেরের দাদু বলত, ঠিক যেন ত্রিভুজের তিনটে কোণ। আরও কত তারা যে তাকে চিনিয়েছিল দাদু। শ্রবণা, আর্দ্রা, জ্যেষ্ঠা, রোহিণী….

রোহিণীর বিয়ে। শ্রাবণ মাসে দিল্লি যেতেই হবে দিব্যজ্যোতিকে। গাঢ় নীল আকাশে দিব্যজ্যোতি রোহিণী তারাটাকে খুঁজল। নেই। কৃত্তিকাকেও দেখা যায় না। কোথায় যে হারিয়ে যায় তারাগুলো! সোনামাটির আকাশ হলে হয়তো চোখে পড়ত। সুবর্ণলতা ঠিকঠাক চলছে তো এখন? কল্পনার বড্ড রাগ, নিজের সব জ্বালাপোড়া দিব্যজ্যোতির সুবর্ণলতায় উগরে দেয়। পৃথা আর কণাদকে একবার বলবে, টুকুসকে নিয়ে সুবর্ণলতায় যেতে? যাবে কি পৃথা?

দিব্যজ্যোতি আবার দৃষ্টি মেলল আকাশে। কী তিথি কে জানে, চাঁদ আজ ওঠেনি এখনও। অন্ধকার ঘনতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রপুঞ্জের ঔজ্জ্বল্যও যেন বাড়ছে ক্রমশ। বিচ্ছুরিত হচ্ছে অজস্র রং। খাঁচা খুলে দিলে পাখি কি ওই রঙের দেশে উড়ে যেতে পারে?

ফের দিব্যজ্যোতি গেয়ে উঠল,

আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা….
মধ্যে মধ্যে ঝল্কা কাটা…
তার ওপরে আছে সদর কোঠা আয়নামহল তায়…

হঠাৎই ছিঁড়ে গেল গান। সহসা শরীরের সমস্ত রক্ত আলোর গতিতে ধেয়ে এসে আঘাত করল দিব্যজ্যোতির মাথায়। একটা তীক্ষ্ণ, তপ্ত, লৌহশলাকা মস্তিষ্ককে বিদ্ধ করল যেন। মুহূর্তের জন্য, অথবা মুহূর্তের এক অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের জন্য, দিব্যজ্যোতির কণ্ঠনালি ছিঁড়ে এক বিকট গোঙানি ছিটকে এল। পরক্ষণে দীর্ঘ দেহটি আছড়ে পড়েছে মাটিতে। পাশে লাঠিটাও।

শরীর থেকে শেষ বাতাসটুকু বেরিয়ে যাওয়ার আগে ক্ষীণভাবে দিব্যজ্যোতির মনে হল, সাদা আর কালোর যুদ্ধটা অসমাপ্তই রয়ে গেল।

নিষ্প্রাণ দুটো খোলা চোখ অসীম মহাশূন্যে তারাদের দেখছে এখন। নক্ষত্ররাও দিব্যজ্যোতিকে দেখছিল। জ্বলছিল মিটমিট। নিবছিল।

1 Comment
Collapse Comments

অসাধারণ!!!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *