আয়নামহল – ১২

বারো

স্টিলের আলমারিটা বন্ধ করে চাবির গোছা ব্যাগে পুরলেন মীরা। আর একবার নেড়ে দেখে নিলেন ইস্পাতের হাতল। সবে মাস দেড়েক কাজে লেগেছে গোবিন্দ, ছেলেটাকে বিশ্বাসী বলেই মনে হয়, দোকানবাজার করে এসে পয়সাকড়ির হিসেবও দেয় ঠিকঠাক, তবু সতর্ক থাকা ভাল। জীবন তাঁকে শিখিয়েছে, মানুষের সামনে লোভের জিনিস ছড়িয়ে রাখতে নেই। লোভলালসায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হওয়াটাই মানুষের ধর্ম।

শাড়ির কুঁচি ভাঁজে ভাঁজে ফেলার জন্য মীরা ঝুঁকলেন সামান্য। চিরকালই শাড়ি পরার ব্যাপারে তাঁর একটু খুঁতখুঁতুনি আছে। অফিস যাওয়ার তাড়ার সময়েও একশো ভাগ মনোমত না হলে বেরোতেন না তিনি। অভ্যেসটা রয়েই গেছে। সোজা হয়ে ঘাড় ঘোরাতেই চোখে পড়ল, গোড়ালির কাছে পাড়টা গুটিয়ে গেছে। নিখুঁত মেয়েলি প্রক্রিয়ায় টেনে টেনে সযুত করলেন সেটাকে। ড্রেসিংটেবিল থেকে ঘড়ি তুলে বাঁধছেন কবজিতে। অল্প গলা তুললেন, গোবিন্দ…?

বার দুয়েক ডাকার পর গোবিন্দর দর্শন মিলেছে, কী বলছ, দিদা? কোথায় ছিলি?

বারান্দায়। ময়নাটাকে ছোলা দিচ্ছিলাম।

দিন কয়েক আগে কোত্থেকে একটা শালিখের বাচ্চা ধরে এনেছে গোবিন্দ। ছেলেটার বদ্ধমূল ধারণা, ওটা ময়না। গোবিন্দর আবদারে একখানা খাঁচাও কেনা হয়েছে। পরিচর্যাও চলছে জোর।

মীরা হেসে বললেন, দিনে ক’বার ছোলা খাওয়াস রে? ও তো এবার পেট ফুলে মরে যাবে।

বা রে, বাটি খালি হয়ে গেছিল যে।

যা খুশি কর। অক্কা পেলে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসিস না। মীরা কবজি ঘুরিয়ে সময় দেখলেন, কাজের কথা শোন। উপমা করা আছে, ঠিক সাড়ে পাঁচটায় মামাকে দিবি। যদি দেখিস ঠান্ডা হয়ে গেছে, মাইক্রোওভেনে গরম করে নিস। মামা কিন্তু ঠান্ডা সুজি মুখে তুলবে না। পাম্প চালাবি ঠিক ছ’টায়। বন্ধ করতে ভুলিস না, সকালে কিন্তু ট্যাঙ্ক উপচে জল পড়েছে।

আর একটা কী যেন বলবেন ভাবছিলেন, মনে পড়ার আগে টেলিফোন বেজে উঠল। চওড়া প্যাসেজে গিয়ে রিসিভার তুললেন মীরা। ওপারে অনুপল। দিব্যর ছাত্র।

অনুপল ছেলেটাকে মীরার বেশ পছন্দ। দায়িত্বশীল। মাথা ঠান্ডা। দিব্যর অসুখের সময়ে ঝটিতি সিদ্ধান্ত নিয়ে কলকাতায় চলে এসেছিল এই অনুপলই।

মীরা স্মিত স্বরে বললেন, কী খবর? তোমার দিব্যদাকে দেখতে আসছ না যে বড়?

একটু বাইরে গিয়েছিলাম, মাসিমা।… দিব্যদা তো এখন মোটামুটি ফিট?

অনেকটাই। আঁকাজোকা নিয়েও বসছে মাঝে মাঝে

বাহ্, বাহ্, খুব তাড়াতাড়ি রিকভারি হল তো!

তা হয়েছে।… ধরো, দিব্যকে দিচ্ছি।

দিব্যর বিছানার পাশে কর্ডলেস ফোনটা থাকে। সমান্তরাল সংযোগ। এদিকের রিসিভার রেখে গোবিন্দকে ছেলের ঘরে পাঠালেন মীরা। ক্ষণ পরেই ফিরে এসেছে গোবিন্দ। কাঁচুমাচু মুখে বলল, মামা জোর ঘুমোচ্ছে। ডাকব?

কপালের ভাঁজ বাড়ল মীরার। ভরা বিকেলে ঘুমোচ্ছে দিব্য? সকালে অনেকক্ষণ স্টুডিয়োয় ছিল, বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ল নাকি?

মাথা নেড়ে মীরা বললেন, থাক। আমি বলে দিচ্ছি।

বলা অবশ্য হল না, লাইন কেটে গেছে। মীরা অপেক্ষা করলেন একটুক্ষণ, যদি আবার রিং বাজে।

বাজলও। ফোন তুলেই মীরা বললেন, সরি অনুপল। লাইনটা কী করে যেন…

কে অনুপল? আমি ধীরা বলছি।… অ্যাই, তুই দিদি তো?

পলকের জন্য চমক, পলকেই ধাতস্থ মীরা। হেসে বললেন, ওমা, তুই! কী খবর বল? আছিস কেমন?

মন্দের ভাল। দিল্লিতে যা গরম চলছে…। তবে বলতে নেই, গরমকাল বলেই হাঁপের টান এখন একটু কম। কিন্তু হাঁটু-কোমরের বেদনাটা কিছুতেই যায় না রে। রুনি একটা তেল আনিয়ে দিয়েছে বাইরে থেকে মাখছি। কাজ তেমন হচ্ছে না।

ধীরাটা বরাবরই একটু দুর্বল ধাঁচের। তবে যত না শরীরে ব্যাধি, তার চেয়ে বেশি বুঝি মনে। রোগ রোগ করে, একটুতেই কাতর হয়ে, শরীরটা বেচারা আরও কমজোরি করে ফেলল। বাইরে থেকে দেখে যেমনই লাগুক, মীরারও তো প্রেশার আছে, গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় ভালই ভোগেন। কিন্তু আধিব্যাধিকে মাথায় তুলতে তিনি রাজি নন। কাউকে কিছু না-বলে নিজেই ডাক্তারের কাছে গেছেন, ওষুধও খান, গোটা কয়েক ছোটখাটো নিয়ম মানেন, ব্যস দিব্যি আছেন। দু’-দু’খানা বড় অপারেশান হয়ে গেছে, তাতেও কি নুয়ে পড়েছেন কখনও? অবশ্য ধীরার মতো আর্থিক টানাটানির ভোগান্তিটা তাঁর যায়নি। নরেন মারা যাওয়ার পর দুই মেয়ে নিয়ে যা দুর্বিপাকে পড়েছিল বেচারি।

মীরা জিজ্ঞেস করলেন, নি ক্যাপটা পরছিস তো?

সবই করছি। সবই করি। কিছুতেই কিছু হয় না।… ছাড়। দিব্য কেমন আছে?

ভাল। বেশ ভাল।

যা একখানা ফাঁড়া গেল… এখন হাঁটাচলা করছে তো…?

হুঁ।… রুনি কী ঠিক করল শেষ পর্যন্ত?

নিমরাজি মতন হয়েছে। সোহম বলছে, বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দিন, আমি পুরো রাজি করিয়ে নেব।

খুব ভাল। শ্রাবণ মাসেই তবে বিয়েটা লাগিয়ে দে।

আমারও তো সেরকমই ইচ্ছে। অবশ্য ঘটা করে কিছু করা যাবে না। রুনি সোহম দু’জনেরই আপত্তি। করলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হবে। দু’বাড়ির লোকজন আসবে শুধু। ওদিক থেকে সোহমের বাবা মা দাদা বউদিরা, আর আমাদের সাইডের ঝুনি বিভাস যদি আসে… আর তুই… দিব্যও নিশ্চয়ই ততদিনে পুরো সুস্থ হয়ে যাবে…

দিব্যর নাম উঠতেই একটু যেন কুঁকড়ে গেলেন মীরা। ইতস্তত স্বরে বললেন,

দিব্য বোধহয় দিল্লি যাওয়ার ধকল নিতে পারবে না রে। দেরি আছে তো। এখনও প্রায় তিন মাস। ধীরার গলায় আবেগ, দিব্য না এলে হয়? সে আমার ছেলে… বিপদে আপদে পাশে পাশে থেকেছে… রুনি তার অত আদরের বোন….

প্রায় এই ধরনের কথা বোনের মুখ থেকে বহুকাল ধরে শুনছেন মীরা। এক সময়ে ভয়ংকর পীড়া বোধ করতেন, এখন অনেক সয়ে এসেছে। তবু খারাপ লাগে। এ এমনই এক অস্বস্তিকর গ্লানি, যা কিছুতেই কারও সঙ্গে ভাগ করা যায় না। ভালবেসে কেউ যেন তাঁর সারা মুখে পাঁক লেপে দিচ্ছে, অথচ মুখ ফুটে তিনি বারণ করতে পারছেন না— এমনই এক অনুভূতি জাগে যেন। এরকম মুহূর্তে এক একদিন দিব্যর বাবার কথা খুব মনে পড়ে মীরার। আপাতউদাসীন, নির্বিরোধী, কিন্তু শক্ত মনের মানুষটা আজ বেঁচে থাকলে চিত্তের ভার খানিকটা কি লাঘব হত?

ফুসফুসে এক খামচা বাতাস ভরে মীরা বললেন, সে দেখা যাবেখন। তবে আমি যাব। কথা দিচ্ছি।

আট বছর ধরেই তো আসব আসব করছিস! এবার যদি পদধূলি পড়ে। তোরই তো মেয়ের বিয়ে।

আবার সেই আবেগজর্জর সংলাপ! কোনওক্রমে হুঁ হ্যাঁ দিয়ে কথা চালিয়ে মীরা ফোন রাখলেন। মেজাজটার ছন্দ কেটে গেছে হঠাৎ। বেরোনোর মুখে ধীরার ফোনটা না-এলেই বুঝি ভাল হত।

বাইরে বিকেলটা ঝকঝক করছে। বাতাসে মেঘের বালাই নেই, রোদ এখনও যথেষ্ট কড়া। হাওয়া-টাওয়াও দিচ্ছে না তেমন। কদিন ধরেই একটা শুকনো গরম চলছে। তাপ ঝিনঝিন করে গায়ে ফোটে। শিগগির শিগগির ঝড়বৃষ্টি না হলে ভাজা ভাজা হয়ে যাবে শহরটা।

ছাতা মাথায়, গলি পেরিয়ে, মীরা ধীর পায়ে বড় রাস্তায় এলেন। ছেলের গাড়ি পাড়ার গ্যারেজেই থাকে, ড্রাইভারও এসে হাজিরা দেয় রোজ, তবে ওই গাড়ি মীরা চড়েন না পারতপক্ষে। ইচ্ছেই করে না। বাসে মিনিবাসে ওঠানামা করতেও কেমন অসুবিধে হয় ইদানীং, ভিড়ভাড়ও অসহ্য লাগে, টুকটাক যাতায়াতের জন্য মিটারের গাড়িই এখন ভরসা।

ট্যাক্সিতে উঠে মীরার হঠাৎই মনে হল, আর একটা নির্দেশ দেওয়া হয়নি গোবিন্দকে। প্রতি সোমবার ফিজিওথেরাপিস্টের পাওনা মেটাতে হয়, দিব্যর খেয়াল না-থাকারই কথা, গোবিন্দকে বলে এলে মামাকে সে স্মরণ করিয়ে দিত। যাক গে, কাল দেখা যাবে।

মীরার দু’হাত কোলের ওপর জড়ো, দৃষ্টি জানলার বাইরে। উলটো দিকে ছুটছে বাড়িঘর। চিন্তাও। শেষ অবধি তবে বিয়েতে রাজি হল রুনি? মতটা টিকে থাকবে তো? তাঁকে এবার বলে গিয়েছিল, মনস্থিরের পর্ব শেষ। তার পরেও তো দেখা যাচ্ছে হ্যাঁ বলতে দেড় মাস লাগিয়ে দিল! এত কীসের দোলাচল? এখনও? বহুদিন তো হল, এবার তো অতীতটাকে মুছে ফেলাই যায়। একটা ভুল, তা সে যত বড়ই হোক না কেন, গোটা জীবনের ধারাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পারা উচিতও নয়।

তবে উচিত-অনুচিত দিয়ে কি সর্বক্ষেত্রে মানুষকে মাপা যায়? রুনির মধ্যে যদি কোনও পাপবোধ বাসা বেঁধে থাকে, তবে তা হঠানো খুবই কঠিন। সবাই তো আর দিব্যর মতো পদ্মপাতা নয়, যে টোকা মেরে জলটা ফেলে দেবে। সোহমকে কি সব খুলে বলেছে রুনি? না-বললে নিজেই পুড়বে। গোপন ক্ষত লুকিয়ে হাসিমুখে সংসার করতে গেলে যতটা মনের জোর দরকার, তা রুনির নেই। ঝুনির মতো তরলও সে নয়, যে বরকে নিয়ে অক্লেশে খেলা করবে। সমস্ত রকম পাপাচার ধুয়ে ফেলে। সারাক্ষণ যদি হৃদয় বলে, সোহমকে সে কোথাও একটা ঠকিয়েছে, বিবাহিত জীবনের সুখশান্তি তখনই তো শেষ।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয়, দিব্যর ওপর রুনির এখনও টানটা রয়ে গেছে। পুরোমাত্রায়। দিব্যকে দেখতে এসে রুনি যতই ভানভণিতা করুক, মীরার চোখকে সে ফাঁকি দিতে পারেনি। দিব্যর কাছে যাচ্ছে না, গেলেও বেশিক্ষণ বসছে না, দুটো-চারটে কথা বলেই বেরিয়ে আসছে, বেশির ভাগ সময় বাইরে বাইরে কাটাচ্ছে… আবার সেই মেয়েই মাঝরাতে ও-ঘরে গিয়ে ঘুমন্ত দিব্যর দিকে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক। বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে সারারাত!

দৃশ্যগুলো স্মরণে এলেই চড়াং করে মাথা গরম হয়ে যায় মীরার। ওই সময়ে যদি ছেলেকে ঘেঁটি ধরে এনে দেখাতে পারতেন কত বড় সর্বনাশ সে করেছে মেয়েটার!

শুধু রুনি কেন, পৃথার কম ক্ষতি করেছে দিব্য? স্বামীঅন্তপ্রাণ ছিল মেয়েটা, তাকে কী দগ্ধান না দগ্ধাল! অন্য নারীতেই যদি আসক্ত থাকবি, তা হলে ঢঙ দেখিয়ে বিয়ে করা কেন? তাও তো পৃথা দশ-দশটা বছর মুখ বুজে সহ্য করেছে দিব্যকে, অন্য কেউ হলে কী ঘটে যেত কে জানে! না, কণাদের সঙ্গে পৃথার সম্পর্ক গড়ে ওঠায় কোনও দোষ দেখেন না মীরা। তিলে তিলে মরার হাত থেকে তো বেঁচেছে মেয়েটা।

পৃথার মুখে প্রথম যেদিন দিব্যর ব্যভিচারের কথা শুনলেন, মীরা বিশ্বাসই করতে পারেননি। ছেলের একটু নারীঘটিত দোষ আছে, এ তিনি জানতেন, বিয়ের আগে গোটা কতক ফস্টিনস্টির খবরও তাঁর কানে এসেছে। তবে সেগুলোকে তেমন ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি। এসব খুচরোখাচরা ভাব-ভালবাসা তো হয়েই থাকে। উঠতি বয়সে শরীরী কৌতূহল সর্বদা শিকলে বাঁধা থাকবে, এমন ধারণা আঁকড়ে থাকার মতো প্রাচীনপন্থীও তিনি নন। মানুষ যে স্বভাবতই বহুগামী, তাও তিনি জানেন। কিন্তু বিয়ের পর তো কিছু নিয়মকানুন মানতে হয়। তার ওপর কিনা রুনিকে নিয়ে…?

সে রাত্রেই ছেলেকে ডেকেছিলেন ঘরে। আশ্চর্য, অভিযোগটা শুনে ও দিব্যর এতটুকু হেলদোল নেই! নির্লজ্জের মতো বলে দিল, ওটা জাস্ট একটা মোমেন্টের ব্যাপার, মা। তুমি ওই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ কেন?

ছি ছি দিব্য, রুনি না তোর বোন?

সো?… শরীর অতশত বোঝে না, মা। খিদে পেলে তাকে খাবার দিতে হয়। এটাই নিয়ম

তার জন্য তোর বউ আছে। প্রেম করে তাকে বিয়ে করেছিস, তার চোখের সামনে তুই বেলেল্লাপনা করবি…

পৃথার ব্যাপারটা আমাকেই বুঝতে দাও, তোমার নাক গলানোর দরকার কী! পৃথাকে আমি যথেষ্ট ভালবাসি। তাকেও বুঝতে হবে আমার শরীর আর মন, দুটো এক নয়।

কী যে আজব যুক্তি! নাকি কুযুক্তি? সেদিনের পর আরও কত অজস্রবার তিনি ভর্ৎসনা করেছেন ছেলেকে। রুনি-ঝুনিকেও যতটা বলার বলেছেন ঠারেঠোরে, নিজের মান বাঁচিয়ে। রুনির গায়ে তাও মানুষের চামড়া, মাসির বাড়ি আসাটাই সে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ঝুনি? বেহায়ার বেহদ্দ। মাসি বাড়িতে আছে জেনেও দিব্যর ঘরে ঢুকে…! শেষের দিকে পৃথা তো মীরার দিকেই আঙুল তুলতে শুরু করেছিল, আপনি দায়ী! ইচ্ছে করে আপনি বোনঝিদের কন্ট্রোল করছেন না! ইনডাইরেক্টলি আপনিই প্রশ্রয় দিচ্ছেন ছেলেকে!

আর কী-ই বা করতে পারতেন মীরা? দিব্যকে ঘাড় ধরে বার করে দিলে কি সমস্যার সমাধান হত? নাকি বোনঝিদের সামনে নো এনটি বোর্ড ঝুলিয়ে দিলে ঢুকে যেত ল্যাটা? কিছুতেই কিছু হত না। কল্পনা যে কল্পনা, নিছক একটা কাজের মেয়ে, তাকেও কি ছেড়ে কথা বলেছে দিব্য? এমনি এমনি তাকে এখান থেকে তুলে সুবর্ণলতার সর্বেসর্বা করে বসিয়ে দিল? মীরা কি ঘাসে মুখ দিয়ে চলেন?

চিন্তার মাঝেই কখন বালিগঞ্জ সারকুলার রোড পৌঁছে গেছেন মীরা। বড় স্কুলবাড়িটা পেরিয়ে নামলেন ট্যাক্সি থেকে। পাশের রাস্তাটায় ঢুকে একটু গেলেই তাঁদের থিয়োলজিকাল ইনস্টিটিউট। একতলায় একটা বড় হল আছে, সেখানেই আসর বসে ধর্মতত্ত্বের। সপ্তাহে পাঁচ দিন।

খান চল্লিশেক চেয়ারের অধিকাংশই ভরে গেছে। মীরা তৃতীয় সারিতে একটা ফাঁকা সিটে বসলেন। চলছে সভা, মীরা মন দিলেন কথকের ভাষণে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা থেকে বিশেষ বিশেষ অংশ পাঠ করে শোনাচ্ছেন এক সৌম্যকান্তি প্রৌঢ়। সংস্কৃতে শ্লোক উচ্চারণ করে বাংলায় তার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

অন্য দিন মীরা নিমগ্ন থাকেন পাঠে। আজ অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলেন বারবার। তার মধ্যেই হঠাৎ কানে এল, হে মহাবাহু অর্জুন, সত্ত্ব রজঃ তমঃ, এই তিনটি গুণ প্রকৃতিতেই আছে, এরাই নিষ্ক্রিয় আত্মাকে দেহাভিমান দিয়ে শরীরে আবদ্ধ করে। তা এর মধ্যে সত্ত্বগুণটা কী? মানুষ যদি নিজেকে সুখী ভাবতে পারে, আর জ্ঞানের আসক্তি দিয়ে হৃদয়কে পরিপূর্ণ করতে পারে, তবেই বুঝতে হবে সেই মানুষের মধ্যে সত্ত্বগুণের বিকাশ ঘটেছে। হৃদয় অবশ্য এখানে আত্মার প্রতিরূপ। আর এই মানুষটিকে আমরা বলব সাত্ত্বিক।

মীরা নড়েচড়ে বসলেন। জ্ঞানের প্রতি আসক্তি তো দিব্যরও আছে। তা হলে কি তাকে সাত্ত্বিক বলা যেতে পারে? কিন্তু নিজেকে কি সুখী ভাবতে পারে দিব্য?

আর একটু এগিয়েছেন কথক, এবার আসছি রজঃ গুণে। রজোগুণ মূলত রাগাত্মক। রাগ মানে এখানে কাম। অর্থাৎ কামনা। অভিলাষ। যা পাইনি, তা পাওয়ার ইচ্ছেটা রজোগুণের একটা প্রধান অংশ। রজোগুণই আমাদের মধ্যে তৃষ্ণা আর আসক্তির জন্ম দেয়। যে-কোনও একটা কাজ যদি আমরা করি, তবে সেই কাজটা করার জন্য আমাদের মধ্যে যে-আত্মতৃপ্তি দেখা দেয়, সেটাও রজোগুণ।

কী আশ্চর্য, এই আসক্তি আর আত্মাভিমান দিব্যর মধ্যে ভীষণভাবে প্রকট! আর তৃষ্ণা তো তার অন্তহীন। তা হলে কি দিব্য রজোগুণের মানুষ? কিন্তু আসক্তি তো সে ঝেড়েও ফেলতে পারে অনায়াসে। কোনও বন্ধনে যে নেই, সে রাজসিক হয় কী করে?

কথক বলে চলেছেন, তমোগুণের কথা ধরা যাক এবার। যে-গুণের ফলে মানুষের হিত-অহিত জ্ঞান লোপ পায়, বিবেক নিষ্ক্রিয় থাকে, প্রধানত সেটাই তমোগুণ। আমরা জীবনে যেসব ভুল করি, কর্মে আলস্য দেখাই, কিংবা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করি, সবই এই তমোগুণের কারণে…

দিব্যকে কি বিবেকবান বলা সঙ্গত? আপনজনের মনে যে সজ্ঞানে দুঃখ দিতে পারে, তার বিবেক সম্পর্কে কি সংশয় জাগে না? ভাল- মন্দের ধারণাগুলোও দিব্যর কেমন গোলমেলে। দিব্য কি তবে তামসিক? তাই বা কী করে হয়? কাজে আলসেমি বা সময়ের অপচয়ের প্রবণতা তো দিব্যর স্বভাবে নেই!

উঁহু, দিব্য এসব কোনওটাই নয়। আবার বোধহয় মিলেমিশে সবগুলোই। ছোটবেলায় ফড়িং ধরে, কাচের বোতলে পুরে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মুগ্ধ নেত্রে তাকিয়ে থাকত দিব্য, কাগজ আর রং পেনসিল নিয়ে নানাভাবে আঁকত ফড়িংটাকে, আবার আঁকা হয়ে গেলে পতঙ্গটাকে হাতের মুঠোয় চেপে একটা একটা করে তার ডানা ছিঁড়ত। সত্ত্ব রজঃ তমঃ গুণের কী বিচিত্র সমন্বয়!

তা মানুষ বোধহয় এরকমই হয়। কোনও শাস্ত্রের সংজ্ঞায় বাঁধা পড়ে না পুরোপুরি। এই তো বিজ্ঞানশাস্ত্র বলে, পূর্বপুরুষদের দোষগুণ নাকি পরের প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। জিনের কেরামতি। কিন্তু দিব্যর সঙ্গে দিব্যর বাবার কতটুকু মিল? চেহারাই অন্য রকম। সুধাময় ছিলেন মেরেকেটে পাঁচ ফুট ছয়, দিব্য ছ’ফুট ছুঁইছুঁই। গায়ের রং আর হাইট তো ছেলে মীরার কাছ থেকে পেয়েছে। আবার সুধাময় ছিলেন নিতান্ত নিরীহ মানুষ। ঘরকুনো। আড্ডা হইচই বন্ধুবান্ধব থেকে শতহস্ত দূরে থাকতেন। অফিস আর বাড়ি, বাড়ি আর অফিস, এই ছিল তাঁর নড়াচড়ার পরিধি। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মেশামিশিও পছন্দ করতেন না, সামাজিক কাজকর্মে জোর করে তাঁকে নিয়ে যেতে হত। নেশা বলতে ছিল রেডিয়ো আর খবরের কাগজ। ঘরের মধ্যে বসে থেকে সারা পৃথিবীর খবর জেনে তাঁর যে কী সুখ হত কে জানে! অথচ দিব্যর গোটা পৃথিবীটাই ঘরবাড়ি। দঙ্গল, হইহল্লা ছাড়া সে হাঁপিয়ে ওঠে। চেনাজানার বৃত্তটা যে দিব্যর কত বিশাল! মানুষের সঙ্গে মেশাটাই যেন দিব্যর প্যাশন। প্রায় অপরিচিত লোকও তিন দিনে দিব্যর গলায় গলায়, এমনটা দেখে দেখে মীরার চোখ পচে গেল। শুধু চেনা নয়, তাদের হাড়হদ্দও দিব্যর জানা চাই। তা সেই মানুষ মোড়ের রিকশাওয়ালাই হোক, কি অতি সম্ভ্রান্ত কেউ। এত সহজভাবে তাদের স্তরে মিশে গিয়ে গপ্পো চালাতে পারে দিব্য!

তবে একটা ব্যাপারে দিব্য প্রায় বাপ কা বেটা। দেখে যতই নরম-সরম মনে হোক, অদ্ভুত এক কেঠো জেদ ছিল সুধাময়ের। দাপুটে বাবার ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে ম্যাট্রিক পাশ মীরাকে কলেজে পড়তে পাঠিয়েছিলেন সুধাময়। এ এক ধরনের দূরদর্শিতাও বটে। মাত্র বিয়াল্লিশ বছরে হৃদরোগে মারা যান তিনি, সঙ্গে সঙ্গে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরির অফিসে তাঁর জায়গায় চাকরিটা পেতে মীরার অসুবিধে হয়নি, বি.এ পাশ করাটা কাজে লেগে গিয়েছিল।

জেদি দিব্যও কম নয়। আর্ট কলেজে তো জোর করে ভরতি হল, মীরা পইপই করে বারণ করা সত্ত্বেও। ক্ষতি অবশ্য হয়নি। ছেলের নামযশ দেখে মীরার তো এখন গর্বই হয়।

বাপ-ছেলের একটা ঘোরতর অমিলও মনে পড়ে গেল মীরার। সুধাময় ছিলেন একটু বউঘেঁষা। আড়ালে অনেকেই তাঁকে স্ত্রৈণ বলত, মীরা জানেন। দিব্যকে কি ভুলেও ওই অপবাদ দেওয়া যাবে?

বাবা নয়, দিব্যর মধ্যে দিব্যর ঠাকুরদাই বুঝি বেশি প্রকট। তিনিও ছিলেন হইহইবাজ, আড্ডাপাগল। শাশুড়িহীন সংসারে এসে মীরা শ্বশুরমশাইকে পাননি বেশি দিন, রেলের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার মুখে মুখে তিনি গত হন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। তবে ছ’-সাত বছরেই মীরা যা দেখেছেন…। তখন রবিবার বা ছুটির দিন মানেই বাড়িতে মোচ্ছব। সকাল থেকে ইয়ারদোস্ত আসছে, তাদের এই বানিয়ে দাও, ওই বানিয়ে দাও… দুপুরে এতজন খাবে, অতজন খাবে …। দেওরের তখনও বিয়ে হয়নি, একা হেঁশেল সামলাতে সামলাতে মীরার প্রাণ যায় যায়। আর সন্ধেবেলা তো বোতলের আসর বসবেই বসবে।

দেবীপ্রসাদ সিংহের নীতিবোধটাও ছিল ভারী আজব। ছিলেন ট্রেনের টিকিটচেকার, পাঁচ হাতে ঘুষ খেতেন। এবং এ ব্যাপারে তাঁর কোনও রাখঢাক গুড়গুড়ও ছিল না। উৎকোচের টাকায় দু’-দু’খানা বাড়ি বানিয়ে ফেলেছিলেন কলকাতায়। আবার সেই দেবীপ্রসাদই বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, দানধ্যানও করতেন দেদার। একটাই প্রত্যাশা, সবাই তাঁর গুণগান করুক।

গুণগান তো দিব্যও চায়। করেও সে লোকের জন্য। কেউ এসে সাহায্য চাইলে দিব্য কখনও তাকে বিমুখ করে না। বাজারের এক ডিমওয়ালির মেয়ের বিয়েতে এক কথায় পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দিল। ছাত্রছাত্রীরা কেউ হয়তো মাইনের টাকা দিতে পারছে না, কিংবা পরীক্ষার ফি কম পড়ে গেছে, দিব্য স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে কিছু না-কিছু বন্দোবস্ত হবেই। তবে শ্বশুরমশাইয়ের মতো অসৎ উপায়ে বোধহয় টাকা রোজগার করে না দিব্য। কাজকর্মেও তার নিষ্ঠা দেখার মতো। দিব্য যখন একাগ্র চিত্তে ছবি আঁকে, দুনিয়া রসাতলে গেলেও সে টের পাবে কি? নিজস্ব উপলব্ধিকে রঙে রঙে ফুটিয়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাটাই বা তাকে কে দিল? এটা কি ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা?

তবে হ্যাঁ, গানের গলা দিব্য পেয়েছে মীরাদের দিক থেকে। মীরার বাবা রীতিমতো নাড়া বেঁধে গুরুর কাছে গান শিখেছিলেন, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পাচর্চা করতেন নিয়মিত, মুঙ্গেরে মীরার বাপের বাড়িতে কত যে বড় বড় গাইয়ের আসাযাওয়া ছিল। মা অবশ্য বাবার এই সংগীতপ্রীতিকে পছন্দ করেননি কোনওদিন। নিষ্কর্মা বর বাপের পয়সায় বসে বসে খাচ্ছে, আর রাতদিন দ্রিমতানাদেরেনা করছে, কোন বউই বা মন থেকে বরদাস্ত করতে পারে? গোদের ওপর বিষফোড়া, বাবা কিনা জড়িয়ে পড়লেন এক অবৈধ সম্পর্কে, মীরারই দূর সম্পর্কের এক মাসির সঙ্গে। মা কাঁদতেন লুকিয়ে লুকিয়ে, বাবাকে সামনে পেলে দুশ্চরিত্র লম্পট বলে গাল পাড়তেন, কিন্তু মণিমাসিকে কেন যেন তাড়াননি বাড়ি থেকে।

হঠাৎই মীরা কেঁপে গেলেন ভেতরে ভেতরে। দিব্য কি তবে তাঁর বাবার কাছ থেকেই …? নাকি বাবা মা, ঠাকুরদা, দাদামশাই, দিদিমা, হয়তো বা অদেখা ঠাকুমা, সবাই একসঙ্গে বয়ে চলেছে দিব্যর শিরা- উপশিরায়?

গীতাপাঠ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। চলছে পঞ্চদশ অধ্যায়। পুরুষোত্তম যোগ। সংসারবৃক্ষ, বৈরাগ্য, শাণিত অস্ত্র, আরও কী কী সব যেন বলছেন কথকমশাই। কিছুতেই স্থিতমনা হতে পারছিলেন না মীরা এমন চিত্তবিক্ষেপ তাঁর কদাচিৎ ঘটে। কী যে আবোলতাবোল চিন্তা আজ ঢুকে পড়েছে মাথায়!

নিঃশব্দে উঠে পড়লেন মীরা। বাইরে এসে খোলা জায়গায় দাঁড়ালেন একটু। তারপর ট্যাক্সি ধরে সোজা বাড়ি।

ঢোকার মুখেই হিমাদ্রি। একতলার ভাড়াটে, বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স, কলমের রিফিল তৈরির ব্যাবসা করে, বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে ভারী নির্ঝঞ্ঝাট সংসার। একগাল হেসে হিমাদ্রি বলল, ভাল আছেন, মাসিমা?

এই তো…। মীরা মৃদু হাসলেন, তোমাদের কলটা সারিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর কোনও সমস্যা হয়নি তো?

ঠিকই আছে।… তবে মাসিমা, ভেতর বারান্দার সিলিংটা একটু ড্যামেজ হয়েছে। একটা জায়গায় চাঙড় খসে ঝুলছে। বেশি কিছু নয়, তবু…

হুম। ভাবছি এবার মিস্ত্রি লাগাব। ওপরেও অল্পস্বল্প কাজ আছে। দিব্য আর একটু সেরে উঠলেই…

না না, তাড়া নেই কিছু। এক-দু’মাস পরেই করুন না। হিমাদ্রি ঘাড় চুলকোচ্ছে। আবদারের সুরে বলল, ওই সময়ে ঘরটরগুলো একবার রং করে নিলে হয় না?

হিমাদ্রির অনুরোধ কিছু অসঙ্গত নয়। সেই কবে বাড়ি রং হয়েছিল, প্রায় এগারো বছর। পৃথা যাওয়ার পর পরই আগের ভাড়াটে ফ্ল্যাট কিনে উঠে গেল, তখনই হাত পড়েছিল গোটা বাড়িতে। দিব্য ঠাট্টা করে বলেছিল, দেখো, পাড়ার লোক যেন না-ভাবে বউ চলে যাওয়ার আনন্দে শাশুড়ি বাড়ির জৌলুশ বাড়াচ্ছে!

স্নিগ্ধ স্বরে মীরা বললেন, সে প্ল্যানও মাথায় আছে। দেখা যাক কদ্দূর কী করে উঠতে পারি।

থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, মাসিমা।… রোববার সকালে গিয়ে দিব্যদার সঙ্গে দেখা করে আসব।

হিমাদ্রি হয়তো কিছু ভেবে বলেনি কথাটা, তবু মীরার হাসি পেয়ে গেল। তিনি রং করাতে রাজি না হলে হিমাদ্রি কি দিব্যকে দেখতে যাবে না?

আলগা হাসিটাকে ঠোঁটে রেখে মীরা সিঁড়ি ভেঙে দোতলায়। দিব্যর দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছেন। নীলু বসে আছে দিব্যর কাছে। হাত নেড়ে কী যেন বোঝাচ্ছে দিব্যকে, ঘাড় দোলাচ্ছে দিব্য।

মীরাকে দেখে দিব্য জিজ্ঞেস করল, আজ এত তাড়াতাড়ি?

চলে এলাম। দেওরের ছেলের দিকে তাকালেন মীরা, কী রে, তুই কতক্ষণ?

নীলু সপ্রতিভভাবে কবজি দেখল, তা ধরো প্রায় চল্লিশ মিনিট।

গোবিন্দ চা-টা দিয়েছে?

ইয়েস। দিব্যদার নোনতা সুজিও অর্ধেক মেরে দিলাম।

বেশ করেছিস। বাড়ির খবর সব ভাল তো?

চলতা হ্যায়, জেঠিমা। নাথিং নিউ। মা আরও ফুলছে, বাবার মর্নিং ওয়াকের স্প্যান বাড়ছে, তোমাদের বউমা শুঁটকো হওয়ার জন্য একের পর এক খাওয়া ছাড়ছে, তোমার নাতির গেছোমি….

হয়েছে। তোর মালগাড়ি থামা। … বস, আমি আসছি।

মীরা সরে এলেন দরজা থেকে। বলতে নেই, তাঁর দেওরের বাড়িতে আধিব্যাধি খুব কম। মনোময় মীরার চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছরের বড়, অর্থাৎ আজকালকার ভাষায় তিয়াত্তর প্লাস, এখনও শরীর বেশ মজবুত লেক গার্ডেন্সের বাড়িটা থেকে রোজ হাঁটতে যায় রবীন্দ্র সরোবরে। বংশের ধারা ভেঙে মনোময়ই যা একটু দীর্ঘায়ু হল।

ঘরে এসে কাপড় বদলালেন মীরা। দিব্য নার্সিংহোম থেকে ফিরতে তাও এ-বাড়িতে বারকয়েক দেখা গেছে মনোময়কে, এমনিতে তো সে এখানে প্রায় আসেই না। ছেলেই বাপের কর্তব্য সারে। মীরার দেওরটি চিরকালই একটু স্বার্থপর। নিজেরটুকু ছাড়া কিছুই বোঝে না। দাদা মারা যাওয়ার পর দুটো বছরও চেতলায় রইল না, লেক গার্ডেন্সের বাড়ির দোতলার ভাড়াটে তুলে বউ-ছেলে নিয়ে চলে গেল সেখানে। মুখে যদিও বলে, বউদির সুবিধে করতেই তার এই প্রস্থান, একতলাটা ভাড়া দিয়ে বউদি আরামসে থাকতে পারে, কিন্তু সত্যি কি তাই? আদতে তো বাপের সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেওয়া। বউদি আর ভাইপোর দায়িত্ব কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলা। অথচ মনোময়রা থাকলে হয়তো ভালই হত। অন্তত দিব্যর জন্য। যৌথ সংসারে মানসিক বিকার সংযত থাকে।

কালো কলকাপাড় সাদা শাড়ি ভাঁজ করে মীরা রাখছেন আলনায়, ঘরে নীলু। খাটে পা ঝুলিয়ে বসে বলল, তোমার গোবিন্দরাম নাকি একটা শালিখ পুষেছে?

আর বলিস না, কী যে খ্যাপামো! বলে, ওটা নাকি ময়না! যা না, বারান্দায় আছে, দেখে আয়।

খাঁচা পর্যবেক্ষণ করে এসে নীলু বলল, না গো, ময়না হলেও হতে পারে। শালিখের সঙ্গে একটু তফাত আছে।

ছাই তফাত।… চা খাবি নাকি আর একবার?

তোমার জন্য করলে বলে দাও। আমার তো চায়ে না নেই।

গোবিন্দকে নির্দেশ দিয়ে খাটের এক ধারে বসলেন মীরা। পলকা কৌতূহলমাখা স্বরে বললেন, দাদাকে অত হাত-পা নেড়ে কী বোঝাচ্ছিলি রে?

সে একটা ব্যাপার আছে। নীলু চোখে রহস্য করল, প্রাইভেট।

ও। আমাকে বলা যায় না বুঝি?

তা ঠিক নয়। নীলু হঠাৎ নিশ্চুপ। তারপর কপাল কুঁচকে বলল, তোমার বোধহয় জেনে রাখাই ভাল। দাদা তোমার মায়ের সম্পত্তি টম্পত্তি বেচে যে-টাকাটা পেয়েছিল… ষোলো লাখ…

কত?

তুমি জানো না?

দিব্য আমায় কিছু বলে নাকি? আমি কিছু জিজ্ঞেস করা মানেই তো ওর কাজে নাক গলানো…

স্ট্রেঞ্জ! তোমার মা’র জমি-বাড়ি…! নীলু আবার একটুক্ষণ স্পিকটি নট। তারপর গলা নামিয়ে বলল, যাক গে, শোনো, দাদা ষোলো লাখ পেয়েছিল। তার অর্ধেক সুবর্ণলতা তৈরিতে খরচ করেছে, বাকিটা ফিক্সড করে রেখেছিল। মাস মাস একটা সুদ পেত। খুব কম। চার হাজার। এই বছরখানেক আগে আমায় এসে বলল, তুই তো শেয়ার টেয়ার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করিস, এই টাকাটা কীভাবে লাগানো যায় বল তো? উইথ মিনিমাম রিস্ক? আমি তখন সব ব্যবস্থা ট্যবস্থা করে দিলাম। এখন দু’-তিন মাস ছাড়া ছাড়া ভাল ডিভিডেন্ড পাচ্ছে, সুবর্ণলতারও অ্যাকাউন্ট মোটা হচ্ছে। দাদাও খুশি, আমারও কমিশন আসছে। … এই তো, সেরিব্রালটার আগেই বলছিল, এভাবে রিটার্ন এলে সামনের বছরের মধ্যে সুবর্ণলতায় আর একটা বিল্ডিং তুলে ফেলবে। গ্রামের বয়স্ক মেয়েদের জন্য একটা ইনফরমাল স্কুল স্টার্ট করার প্ল্যান আছে, সেখানে মাস্টার ফাস্টার লাগবে… গ্র্যান্ট ট্যান্ট জুটছে বটে… কিন্তু মনের মতো করে কিছু গড়তে গেলে সব সময়ে গ্র্যান্টের জন্য হাপিত্যেশ করে থাকলে তো চলে না…। কথাটা তো ভুল নয়, বলো জেঠিমা?

মীরা অস্ফুটে বললেন, হুঁ।

গোবিন্দ চা এনেছে। কাপ হাতে নিয়ে বড় করে একটা চুমুক দিল নীলু। ভুরুতে হালকা ভাঁজ ফেলে বলল, যাক গে, তুমি জেনে গেলে, ভালই হল। আমিও মেন্টালি অনেকটা ফ্রি হলাম। দাদার স্ট্রোকের খবর শুনে তো মাথায় হাত পড়ে গিয়েছিল আমার। সুবর্ণলতার নামে অতগুলো টাকা বাজারে খাটছে…। যদি দাদার হঠাৎ কিছু ঘটে যায়, তো সাড়ে সর্বনাশ। সুবর্ণলতার ওই অ্যাকাউন্ট কে হ্যান্ডেল করবে? ইনফ্যাক্ট, দাদাকে আমি আজ অ্যাডভাইস করে গেলাম তোমার সঙ্গে অ্যাকাউন্টটা জয়েন্ট করে রাখতে।

কী বলল তোর দাদা?

হুঁ হাঁ করল না। তবে মনে হয় রাজি। দ্যাখো না, দু’-একদিনের মধ্যেই বোধহয় তোমায় বলবে। আর একখানা শব্দময় বড় চুমুকে নীলুর কাপ শেষ। নিচু গলায় বলল, তুমি কিন্তু নিজে থেকে কিছু আলোচনা কোরো না। দাদা বহুত সেয়ানা আছে, ঠিক বুঝে ফেলবে, হেভি খচে যাবে আমার ওপর।… আফটার অল, দাদা একটা ভাল কাজ করছে তো, তাই আমি তোমাকেও অ্যালার্ট করে রাখলাম …

বেশ করেছিস।

বেশ কি না জানি না। পরে যেন আমার কোনও বদনাম না হয়। … কেজো কথা বাদ দাও, একদিন এসো আমাদের বাড়ি। টিভি দেখে দেখে তোমার বউমা কত নতুন নতুন রান্না শিখল, টেস্ট করে যাও। এঁচোড়ের পায়েস, লাউয়ের মালাইকারি, চিকেন ভ্যানতাড়া…

অ্যাই, ফাজলামি করিস না তো।

হ্যা হ্যা হাসতে হাসতে চলে গেল নীলু। মীরা উঠে কাপ দুটো রান্নাঘরের সিঙ্কে রেখে এলেন। নীলু আজ তাঁকে অবাক করে দিয়েছে। খানিকটা স্বস্তিও বোধ করছেন যেন। কোথায় যেন একটা কাঁটা খচখচ করত, দিব্য টাকাগুলো সুবর্ণলতায় ঠিক ঠিক খরচ করছে তো? মা অনেক আশা নিয়ে, বিশ্বাস করে, বাপের বাড়ি সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বড় মেয়ের নামে লিখে দিয়েছিলেন। মীরা যেন গরিব মেয়েদের জন্য কিছু একটা করে। দিব্য যখন দায়িত্বটা মাথায় তুলে নিল, খুব খুশি হয়েছিলেন মীরা। তারপর তাঁকে তুড়ি মেরে হঠিয়ে দিয়ে সব কিছু যেভাবে একা একা করছিল…। যাক, দিব্য তাঁকে ঠকায়নি। ওই সম্পত্তি নিয়ে ঝুনি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অনেক প্রশ্ন করে তাঁকে, ঢোঁক গিলে গিলে জবাব দিতে হয়, এবার তো আর সদুত্তর দেওয়ার অসুবিধে রইল না।

গোবিন্দ উঁকি দিয়েছে, দিদা, রুটিগুলো করে ফেলব?

মীরা দেওয়ালঘড়ি দেখলেন, এত তাড়াতাড়ি? সবে তো পৌনে আটটা। মামা ন’টায় খাবে।

তা হলে একটু টিভি দেখি?

চালা। কিন্তু আস্তে।

কী একটা হাসির সিরিয়াল চলছে টিভিতে। দু’-চার মিনিট মীরাও চোখ রাখলেন পরদায়। গল্প আধাখেঁচড়া অবস্থাতেই ঝাং ঝাং বিজ্ঞাপন শুরু হয়ে গেল। সাধে কি মীরার টিভি দেখতে বিরক্ত লাগে!

বিছানা ছেড়ে নামলেন মীরা। দিব্যর কাছে গিয়ে একটু বসলে হয়। দিনমানে ছেলের সঙ্গে আজ তো কথাও হয়নি তেমন। চব্বিশ ঘণ্টা টো- টো করে বেড়ানো দিব্য এখন পরিপূর্ণ গৃহবন্দি, মা হিসেবে তাঁর কি মাঝে মাঝে তাকে সঙ্গ দেওয়া কর্তব্য নয়?

দিব্যর ঘরে ঢুকে মীরার পা আটকে গেল। দিব্য বসে আছে দক্ষিণের জানলায়। গভীর তন্ময় ছেলে কী যে দেখছে অন্ধকারে! মা যে পিছনে দাঁড়িয়ে, দিব্যর হুঁশই নেই।

ছেলের চওড়া কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও সরে গেলেন মীরা। এত কাছাকাছি থেকেও দিব্য যেন আবছা হয়ে এল ক্রমশ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *