৫৭ থেকে ৪৭ (স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পিত বিকল্প ইতিহাস)
স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষে, ছয়টি ঔপন্যাসিকা ও একটি অনূদিত কাহিনি নিয়ে এক বিকল্প ইতিহাসভিত্তিক শ্রদ্ধার্ঘ্য
57 theke 47
A collection of speculative fictions onalternate history of Indian freedom struggle
First Edition: Nov 2022
Published by: Arindam Debnath on behalf of JOYDHAK PRAKASHAN
এ গ্রন্থের কাহিনিরা ইতিহাসের বাস্তব পটভূমি থেকে উঠে এলেও আদতে কাল্পনিক।
তবে, যে কল্পনারা মাতৃভূমির গৌরবের বিকল্প ভাষ্য নির্মাণ করে তারা সত্যের মতই মহৎ
.
ভূমিকা
বিকল্প ইতিহাস একটি আকর্ষণীয় সাহিত্যধারা। বিদেশে বহু জায়গাতেই এর ব্যাপক চর্চা ও প্রসার হয়ে
থাকলেও বাংলাভাষায় সাহিত্যের এই ধারাটি ততটা সুপরিস্ফুট নয় এখনও। স্বাধীনতার পঁচাত্তরতম বর্ষে জয়ঢাক প্রকাশনের তরফে তাই এই উদ্যোগটি নেবার মুখ্য উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত বিকল্প ইতিহাসের চর্চাকে খানিক জনপ্রিয় করে তোলা এবং দ্বিতীয়ত, এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের এক-একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়বিন্দুতে এসে যদি ঘটনাস্রোত চেনা পথ ছেড়ে অন্যখাতে বইত তবে ইতিহাস কোনদিকে এগোতে পারত তাই নিয়ে কিছু বুদ্ধিদীপ্ত স্পেকুলেশনের একটা সংগ্রহ গড়ে তোলা।
সংগ্রহের প্রথম কাহিনিটি, বলা যায় এদেশের আধুনিক সাহিত্যে বিকল্প ইতিহাস নিয়ে প্রথম স্পেকুলেটিভ ফিকশন। ১৮৩৫ সনে হিন্দু কলেজের ছাত্র কৈলাশচন্দ্র দত্তের কলমে ইংরিজি ভাষায় লেখা এ-কাহিনি একশ দশ বছর পরের ভবিষ্যতে, অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে বাংলার বুকে ইংরেজবিরোধী সফল অভ্যুত্থানের গল্প শুনিয়েছিল।
না, কৈলাশচন্দ্র দত্ত ভবিষ্যতের ছবি গড়তে গিয়ে প্রযুক্তি, সামাজিক কাঠামো ইত্যাদিতে কী বদল আসতে পারে সে নিয়ে কোনো রোমাঞ্চকর পূর্বাভাস দেননি। কিন্তু, মহাবিদ্রোহেরও বাইশ বছর আগের বাংলার বুকে বসে দেশকে স্বাধীন করবার একটা হার-না-মানা যুদ্ধের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন তিনি তাঁর গল্পটার মধ্যে দিয়ে। আমরা তাঁকে ভুলে গেলেও ইতিহাস, যে কিছুই ভোলে না, সে কিন্তু তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটা দিয়েছিল। কারণ, যে-সময়টায় তিনি এই সফল বিদ্রোহকে কল্পনা করেছিলেন সেই ১৯৪৫-এর একেবারে আশপাশেই এদেশ সত্যিই স্বাধীনতা অর্জন করে তাঁর ভবিষ্যৎ-দর্শনকে সফল করে তোলে।
সংগ্রহের দ্বিতীয় কাহিনিটি আবর্তিত হয়েছে লক্ষ্মীবাঈ, নানাসাহেব ও বাহাদুর শাহ জাফরকে ঘিরে। লক্ষ্মীবাঈ-এর ঝাঁসি ছেড়ে কল্পি-র পথে রওনা দেবার মুহূর্তটায় ইতিহাসকে সামান্য আলাদা খাতে বইয়ে দিয়ে তার পরিণতিতে দেশের ভবিষ্যৎ কোন খাতে বইতে পারত তার সম্ভাব্য ইতিহাস এ-কাহিনির উপজীব্য। এ-গল্পে, নানাসাহেব ও লক্ষ্মীবাইয়ের যৌথ নেতৃত্বে স্বাধীন ভারতীয় গণরাজ্যের জন্ম হয় উনিশ শতকের ষষ্ঠ দশকে।
তৃতীয় কাহিনিটি বিচিত্র। হিটলারের চরিত্রের একটা অজানা দিককে ঘিরে আবর্তিত এই গল্পে নেতাজির সুগভীর প্রভাব হিটলারের চরিত্রকে নতুন করে ভেঙে গড়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চলাকালিন। হিংস্র দানবিক একটা চরিত্রকে তার নিজের ভেতরে লুকোনো দেবতাটির সন্ধান দিয়ে কেমন করে বদলে দিচ্ছেন সুভাষচন্দ্র তারই কাল্পনিক একটা বিবরণ এখানে মিলেমিশে গিয়েছে বাস্তব ইতিহাসের ক্যানভাসে। আর, এরই ফলস্বরূপ সুদৃঢ় আন্তর্জাতিক সমর-সহায়তায় আজাদ হিন্দ বাহিনীর ‘দিল্লি চলো’র স্বপ্নকে সফল করে তুলেছেন লেখক। সেই বিকল্প ভারতবর্ষের বুকে সগর্বে ফিরে আসেন নেতাজি, স্বাধীন ভারতের অবিসম্বাদি নেতা হয়ে।
এই সংগ্রহের চতুর্থ কাহিনিটিতে, রাসবিহারী কিংবা নেতাজির মত নেতাদের যে স্বপ্ন সফল হয়নি, সেই দেশব্যাপী সুসংগঠিত বিদ্রোহের স্বপ্নকে সফল করে তুলেছেন লেখক, তবে তা এসেছে অন্য একজন অপ্রত্যাশিত মানুষের হাত ধরে। সেইখানেই এ-কাহিনির মূল আকর্ষণ। এইখানে তার স্পয়লার দেব না। পাঠক তার রসাস্বাদন করবেন সরাসরি গল্পে চোখ ডুবিয়ে এই আশা।
পঞ্চম কাহিনিটিতে এসেছেন রাসবিহারী বসু। ব্রিটিশ বিতারণের জন্য তাঁর ভারতব্যপী সশস্ত্র অভ্যুত্থানকে সফল করে তুলেছে লেখকের কল্পনা। বিকল্প ইতিহাসের এই ধারায় একজন বিশ্বাসঘাতকের তুচ্ছ বিশ্বাসঘাতকতা হেন পথের কাঁটাটিকে নিপুণ হাতে উপড়ে ফেলে লেখক সে-আন্দোলনকে মহান সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
ষষ্ঠ কাহিনিটি
প্রায় সবটুকুই সত্য, শুধু একেবারে শেষে গিয়ে
একটি সুক্ষ স্পেকুলেশনের মোচড়ে ইতিহাসকে বইয়ে দেয়া হয়েছে
নতুন পথে।
সপ্তম কাহিনিটি আবার সময়ভ্রমণকে মিশিয়ে দিয়েছে বিকল্প ইতিহাসের কাহিনির সঙ্গে। সেখানে আজাদ হিন্দ ফৌজ ও তার অভিযানের পটভূমিকে একটা পরিবর্তিত, চূড়ান্ত সফল রূপ দেয়া হয়েছে।
হ্যাঁ, প্রকাশনের রীতিমাফিক বই তৈরির সময় লিখিয়েদের গ্রুপে লেখাদের নিয়ে আলোচনা, তর্কবিতর্ক হয়েছে বিস্তর, কিন্তু তাঁরা কেউ কারো সঙ্গে পরামর্শ করে এই কাহিনিদের লেখেননি। অথচ তবু, সবগুলো লেখার মধ্যেই একটা সাধারণ যোগসূত্র মনোযোগী পাঠকের চোখ এড়াবে না। পরাধীনতার শেকল ঘোচাবার জন্য বয়স, অভিজ্ঞতা ও পেশা নির্বিশেষে প্রত্যেক লেখকই কিন্তু কল্পনা করেছেন দেশব্যাপী একটা সফল ও সশস্ত্র অভ্যুত্থানের, এবং প্রায় প্রতিটি লেখাতেই সে-প্রচেষ্টাকে এগোতে সাহায্য করেছে নানা চেহারার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। হয়তো এ-কাহিনিরা কাল্পনিক, কিন্তু এর লেখকদের স্বপ্ন আর অনুভূতিগুলোকেও কি কাল্পনিক বলা যায়? ইচ্ছেসুখে লেখবার স্বাধীনতা পেয়ে তাঁরা নিজেদের বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেগুলোকেই যে থ্রিলারহেন গল্পগুলোতে বের করে এনেছেন, সে-কথা অনস্বীকার্য। আর, সেখানেই এই এক্সপেরিমেন্টটার গুরুত্ব। বিশ্ব রাজনীতিতে কখন কীভাবে পটবদল হয় তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে, এদেশের সুশিক্ষিত লেখকসমাজের কলমে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র দেশব্যাপী আন্দোলনের পক্ষে ভোটগুলো খানিক ভরসা দেয়। আশা দেয়, ফের তেমন কোনো বিপদ এলে আমাদের মানসিকতাটা আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে, যখন দেশের একাধিক সীমান্তে আগ্রাসনের কালো মেঘ জমে উঠছে সেসময় এই ভরসাটুকুই বা কম কী?





Please upload ক্রসফায়ার written by রনদীপ নন্দী