৪৮ ঘণ্টা – ভাষান্তর ঋজু গাঙ্গুলী

৪৮ ঘণ্টা – ভাষান্তর ঋজু গাঙ্গুলী

কাহিনি: আ জার্নাল অফ ফর্টি-এইট আওয়ার্স অফ দ্য ইয়ার ১৯৪৫; লেখক: কৈলাশ চন্দ্র দত্ত (হিন্দু কলেজের ছাত্র)

প্রথম প্রকাশ: ক্যালকাটা লিটার‍্যারি গেজেট, ৬ই জুন ১৮৩৫

“আর আমরা? পঁচিশ বছরের এই অসহনীয় দাসত্বের পর আমরা কি স্রেফ মৃত্যুর ভয়ে নিজেদের মুক্তির কথা ঘোষণা করা থেকে পিছিয়ে যাব? না, রোমান নাগরিকবৃন্দ! বরং এই সময়টার জন্যই তো এতদিন অপেক্ষা করেছি আমরা।”

–জুনিয়াস ব্রুটাস

.

পঞ্চাশ বছর!

এই এতগুলো দিন ধরে এ-দেশের প্রতিটি মানুষ, বিশেষ করে এই মহানগরের বাসিন্দারা সব ধরনের দমনপীড়ন সহ্য করেছে। ধারালো ছুরি আর ঝুলি— দুটোই আমাদের দিকে বাড়িয়ে ধরা হয়েছে একেবারে নির্দয়ভাবে। নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-দরিদ্র— কেউ নিস্তার পায়নি এই ব্রিটিশ বর্বরদের ক্রোধ থেকে। এই নিপীড়ন, আর তার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি— আপাতভাবে শান্ত ও ভীরু ভারতীয়দের মধ্যে ক্রোধ বিস্ফোরিত হয়েছিল তার প্রভাবেই।

 হাউজ অফ লর্ডস বা হাউজ অফ কমন্স— কেউই ভারতীয়দের দুঃখের কথা শুনতে চায়নি। উৎপীড়নের উপশম হওয়ার বদলে সমস্যা আরও গভীর হয়েছিল সময়ের সঙ্গে। অবশেষে ভারতবাসী এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যাকে অচিন্ত্যনীয় বললেও অত্যুক্তি হয় না।

ঠিক হয়েছিল, বড়োলাট লর্ড বুচারকে দূর করে দিয়ে, রাজত্বের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো দেশপ্রেমীদের বেছে নিয়ে, তাদের দিয়েই গড়ে তোলা হবে এ-দেশের সরকার!

ঈশ্বরের বরপুত্র হিসেবে নিজেদের কল্পনা-করা ব্রিটিশদের কাছে ব্যাপারটা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, অসম্মানের বলেও মনে হয়েছিল। অথচ ওই অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ভারতীয়দের কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। আপনারাই বলুন, হিংস্র আচরণ আর হিংসার শিকার হতে-হতে সুকুমার বৃত্তিগুলো একটু-একটু করে মরে যায়, তাই না? ভারতীয়দের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। ধিকিধিকি জ্বলা ক্রোধ আর প্রতিহিংসা এই শান্ত আর নির্বিরোধী মানুষগুলোর মধ্যে দাউদাউ করে ছড়িয়ে পড়েছিল— যেন শুকিয়ে যাওয়া বনে বাজ পড়ে দাবানল ঘটিয়ে দিয়েছে!

কবি আর ঐতিহাসিকেরা এই ঘটনাগুলো অন্য চোখে দেখেন, জানেন! তাই তাঁদের লেখা পড়লে ঘটনাটা রীতিমতো বর্ণাঢ্য ঠেকবে আপনাদের কাছে। কিন্তু যারা স্বজন-পরিচনকে হত্যালীলার শিকার হতে দেখেছে, যারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে যেতে দেখেছে, যারা দেখেছে মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অরণ্যে-কন্দরে আশ্রয় নিতে— তারা ব্যাপারটাকে ঠিক ওভাবে দেখতে পারেনি।

সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল কলকাতা শহরের একেবারে ওপরমহল থেকেই। উচ্চপদস্থ কেরানি, রাজা, এমনকি নবাবেরাও শামিল হয়েছিলেন সেই ষড়যন্ত্রে। গোপনীয়তার অন্ত ছিল না তাতে। পুরোপুরি নিখুঁত হয়ে ওঠার সুযোগ পেলে যে ওই ষড়যন্ত্র গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ত— এ-বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ।

***

সেই সন্ধেটা ভারি সুন্দর ছিল। অস্তগামী সূর্যের আভা, মৃদু হাওয়ার ছোঁয়া, ঘরফেরা পাখিদের কিচিরমিচির— সব মিলিয়ে দৃশ্যটাকে মনোরম করে তুলেছিল। কিন্তু রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর বদলে শহরের মানুষজন একেবারে দৃঢ়সংকল্প হয়ে একটাই দিকে এগোচ্ছিলেন। সন্ধে ছ’টা নাগাদ দেখা গেল, প্রাসাদনগরীর ঈশান কোণে বহু মানুষ জমায়েত হয়েছেন।

জায়গাটা এমনিতে ফাঁকাই থাকে। সেদিনও একদিক দিয়ে একটি ছোট্ট জলের ধারা বয়ে যাচ্ছিল কুলকুল শব্দ তুলে। একপাশে একটি বাঁশঝাড় রক্ষীর মতো জায়গাটাকে ঘিরে রেখেছিল।

খোলা অংশের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল একটি প্যাগোডা। ভুলে যাওয়া কোনো মুসলিম শিল্পীর হাতের ছোঁয়া বুকে ধরে রেখেছিল তার শিখরটি। অস্তায়মান সূর্যের শেষ রশ্মিরা ঝলসে উঠছিল তার গায়ে ধাক্কা খেয়ে। হাওয়ার কানাকানি, বিভ্রান্ত পাখিদের কলকাকলি, আর জলের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল জনতার গুঞ্জন।

উপস্থিত মানুষেরা ঘাসে ছাওয়া সেই সবুজ জমিটুকুতে বসে পড়েছিলেন। এবার বৈঠক শুরু হল। অনূর্ধ্ব ষাট একজন মানুষ উঠে দাঁড়ালেন। বলিরেখা ছাপিয়ে প্রকট হয়ে উঠেছিল তাঁর কুঞ্চিত ভ্রু আর শক্ত চোয়ালের ভাঁজগুলো। বোঝা যাচ্ছিল, মানুষটি রীতিমতো আবেগমথিত হয়ে রয়েছেন।

“ভদ্রমহোদয়গণ,” আবেগের ।ওপর ।বেশ ।কষ্ট করেই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছিলেন মানুষটি, “স্বদেশবাসী আরও একবার নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এখানে জড়ো হয়েছে দেখে ভারি ভালো লাগছে। তবে কথা শুরুর আগে একটা কথা জানতে চাই। গত বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে একটি বন্দুক আর একটি তরবারি রাখবে। সেই সিদ্ধান্তটি কি বাস্তবায়িত করা হয়েছে?”

সমবেত এবং দীর্ঘ করতালির মাধ্যমে সমবেত জনতা সোৎসাহে সম্মতি জানাল।

ভুবন মোহন নামের এক যুবক এবার উঠে দাঁড়াল। তার বয়স পঁচিশ বছরের বেশি হবে না। কিংখাব আর সোনালি জরির পোশাক পরেছিল ভুবন। জরির কাজ করা একটি উত্তরীয় কাঁধে ফেলে তেজোদৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল সে। উপস্থিত জনতার দিকে ঘুরে, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কলেজ থেকে পাওয়া নিজের সবটুকু জ্ঞানবুদ্ধি উজাড় করে বক্তব্য পেশ করল ভুবন। কথার শেষে সে বলল, “আমার বন্ধু ও দেশবাসীগণ, এখানে আমি নিজের বাগ্মীতা— যে ক্ষমতা আমার মধ্যে নেই বললেই চলে— প্রদর্শনের উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। উদ্দাম কল্পনা বা অন্ধ উচ্ছ্বাসের বশেও আমি আপনাদের কিছু বলছি না। আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে যে কথাগুলো গুমরে মরছিল, সেগুলোই আপনাদের সামনে বললাম এতক্ষণ। আমার দৃঢ় ধারণা, এই কথাগুলো আপনাদের বুকের মধ্যেও জমে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে অত্যাচার আপনারা সহ্য করেছেন, তার কথা আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি আমি। ক্লাইভের সর্বনাশা নীতি, ওয়েলেসলির স্বৈরতন্ত্র, হেস্টিংসের যথেচ্ছ নিষ্ঠুরতা, সর্বোপরি বর্তমান সরকারের লুঠতরাজ— এ-সবের মধ্য দিয়ে কী উন্নতি হয়েছে আমাদের অবস্থার? যখন পৃথিবীর অন্য প্রতিটি দেশ সভ্যতার শিখরে আরোহণে সচেষ্ট তখন আমরা, এই ভারতীয়রা ক্রমেই পশুর স্তরে নেমে যাচ্ছি! মুহূর্তের জন্য ভাবুন, হে আমার স্বদেশবাসী, এই লুঠেরাদের অধীনে আমরা ঠিক কেমন আছি!

“এত কিছু ভাবার পরেও, এত কিছু জানার পরেও আপনারা কি যেমনটি আছেন, তেমনই থাকতে চাইবেন? এরপরেও কি আপনারা বর্তমান বড়োলাট লর্ড ফেল বুচারের নিপুণ নিষ্ঠুরতার সামনে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করবেন? যদি এতকিছুর পরেও নিজেদের অধঃপতিত, শাসনের শৃঙ্খলে নিপীড়িত বলে না ভাবেন, তাহলে বুঝব যে আপনাদের মতো নিকৃষ্ট মানুষ আর এই দুনিয়ায় নেই!

“কিন্তু ও-কথা থাক। আসুন, আমরা সংঘবদ্ধ হয়ে এই দেশকে শোষণের হাত থেকে মুক্ত করতে উদ্যত হই। আমরা যদি মিলিতভাবে, এক দেহ ও এক মন হয়ে দেশকে এই অত্যাচারীদের শাসন থেকে মুক্ত করতে পারি, তাহলে গোটা দেশ আমাদের জন্য গর্বিত হবে। ভারতের ইতিহাসে সবথেকে গৌরবের ক্ষণ হবে সেটি!

“বন্ধুরা, নেতারা, দেশবাসীরা! আমরা আর নিজেদের দুর্বল ও অসহায় বলে মানব না। আমরা আর ভীরুর শিরোপা পরব না। আসুন, আমরা স্বাধীনতার পতাকা উন্মুক্ত করি; তারপর তাকে উড়িয়ে দিই ওই ওখানে— যেখানে এখন ব্রিটানিয়ার পতাকা উদ্ধত হয়ে হাওয়ায় উড়ছে।

“যদি সারা পৃথিবীর কাছে সম্মানার্হ হতে না চান, তাহলেও এগিয়ে আসুন। আসুন নিজের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য। আসুন সঙ্গীদের জন্য। আসুন নিজের দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য। সবচেয়ে বড়ো কথা, এগিয়ে আসুন মায়ের জন্য, সেই জন্মভূমির জন্য— যার দেহের রক্তবিন্দু থেকেই জন্মেছি আমরা!”

নিজের কথা শেষ করে, পরিচিত ক’জন সঙ্গীর মাঝখানে বসে পড়ল ভুবন। জনতার বিপুল করতালি আর কথার মধ্যে হঠাৎ অন্য একটা কথা শোনা গেল। ক্রমে শব্দের জোর বাড়তে লাগল। উপস্থিত মানুষদের অধিকাংশের মুখেই ক্রোধ আর বিরক্তি-মেশানো সেই কথাটা ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হল অচিরে।

“লাল কুর্তা! লাল কুর্তা!!”

দেখা গেল, জনা ষোলো অশ্বারূঢ় সৈন্য এবং প্রায় দেড়শো পদাতিক ওই জমায়েতের দিকেই এগিয়ে আসছে।

জনতা দ্রুত উঠে দাঁড়াল। ভুবন মোহন নিজের পকেট থেকে একটি বাঁশি বের করে তাতে সজোরে ফুঁ দিল। তার তীক্ষ্ণ শব্দের প্রতিধ্বনি হিসেবেই ।যেন ।বেশ কিছুটা দূর থেকে।।একটি বন্দুকের গর্জন শোনা গেল।

একটু পরেই ব্রিটিশ বাহিনী ওই খোলা জায়গার কাছে এসে পৌঁছোল। লাল আর সোনালি পোশাকে সুসজ্জিত দু’জন ব্রিটিশ অফিসার প্রায় টানতে-টানতে এক স্থূলকায় দেশি ভদ্রলোককে নিয়ে এসে ওই জনতার সামনে ঠেলে দিল। দেখা গেল, জনতার সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোকের বাকশক্তি লোপ পেয়েছে! পেছন থেকে খোঁচা খেয়ে অবশ্য তিনি গলার জোর কিছুটা হলেও ফিরে পেলেন। হাতে পাকানো কাগজটা খুলে ভদ্রলোক একটি আদেশ পড়ে শোনালেন।

“মাফ করবেন, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব।” জোর গলায় বলে উঠল ভুবন, “অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনার আদেশ মেনে জায়গাটা ফাঁকা করে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমাদের নেই। আপনার পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব, আপনি করতে পারেন। আপনার সামনে আজ যারা দাঁড়িয়ে আছে, তারা অশ্বের হ্রেষা, তরবারির নৃত্য, এমনকি বন্দুকের ঝলসানির সামনেও ভীত হবে না। স্বাধীনতা লাভের অন্য সব উপায় ব্যর্থ হওয়ায় আমরা এবার নিজেদের বাহুবলের ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনাকে যাঁরা পাঠিয়েছেন, তাঁদের বলে আসুন, আমরা ফেল বুচারকে গদিচ্যুত করার সংকল্প নিয়েছি। সাগরপারের ওই মিথ্যেবাদী আর ধান্দাবাজদের শাসন মানতে আমরা আর রাজি নই। এ-দেশের মানুষ নিজস্ব সংসদ আর নিজেদের নিয়মই মেনে চলবে!”

এমন কিছু শোনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট আদৌ তৈরি ছিলেন না। কথাটা শুনে তিনি কয়েক পা পিছিয়ে তো গেলেনই, একজন সৈন্য তাঁকে ধরে না ফেললে ভদ্রলোক মাটিতেই পড়ে যেতেন।

অফিসার দু’জন একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কিছু বললেন। পরক্ষণেই বেয়নেট নিয়ে সৈন্যরা জনতার উদ্দেশে এগিয়ে এল।

ভুবনের বাঁশি আবার আওয়াজ তুলল— পরপর দু’বার। বাঁশবনের আড়াল থেকে এবার প্রায় শ’দুয়েক পাগড়িধারী মানুষ বেরিয়ে এল। তাদের হাতে ছিল বন্দুক। নিরস্ত্র জনতা দ্রুত অন্যদিকে সরে গেল। শুরু হল জনতা ও সৈন্যদের সশস্ত্র সংঘর্ষ। তরবারির ঝনঝনা, বন্দুকের গর্জন, আহতের আর্তনাদ— সব মিশে কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গাটা পুরোদস্তুর যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিল।

এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে ভুবন কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয়নি। নিজের সহায়ককে সে নির্দেশ দিয়েছিল, যাতে তার প্রিয় ঘোড়াটিকে ওখানে নিয়ে আসা হয়। দু’টি পিস্তল কোমরে গুঁজে, পোশাকটিকে সমরসজ্জার উপযুক্ত করে তুলে ঘোড়ার পিঠে বসল ভুবন। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন এক বৃদ্ধ পুরোহিত। তাঁর কাছ থেকে আশীর্বাদ নিল ভুবন। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে মৃদুস্বরে প্রার্থনা করল, যেন তার দু’বাহু যথেষ্ট শক্তি ধরে। তারপর তরবারি উঁচিয়ে অশ্বারোহী ভুবন ধেয়ে গেল যুযুধান ভিড়ের উদ্দেশে।

লেফটেন্যান্ট মার্টিন ততক্ষণে একেবারে ক্রোধোন্মত্ত অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। একেবারে তাঁর সামনেই পড়ে গেল ভুবন। মার্টিনের সাংঘাতিক আঘাত এড়িয়ে তাঁর মাথাতেই আঘাত করল ভুবন। টলে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন মার্টিন। দাঁতে দাঁত ঘষে “জংলিটাকে শিক্ষা যদি না দিয়েছি…” বলে নতুন উদ্যমে ভুবনকে আবার আক্রমণ করলেন তিনি।

লড়াই চলল অনেকক্ষণ ধরে। ব্রিটিশের বল আর ভারতীয়ের ক্ষিপ্রতা একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছিল। চোখ ধাঁধানো পোশাক আর শিরস্ত্রাণ অস্ত্রের আঘাতে হয়ে পড়েছিল শতচ্ছিন্ন। অবশেষে, রক্তক্ষরণের দুর্বলতা আর ক্লান্তি ব্রিটিশ অফিসারটিকে অসহায় করে ফেলল। নিষ্ফলা ক্রোধে কাঁপতে-কাঁপতে ঘোড়ার পিঠ থেকে ধরাশায়ী হলেন মার্টিন। আর সেই মুহূর্তেই এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের ফয়সলা হয়ে গেল।

দেশপ্রেমিকেরাই জিতল এই যুদ্ধে!

ব্রিটিশ বাহিনীর প্রায় পঁচিশজন মৃত্যুবরণ করেছিল; আহতের সংখ্যাও ছিল ওইরকম। ভারতীয়দের মধ্যে ছ’জন নিহত এবং তেরোজন আহত হয়েছিল। সেনাবাহিনীর বাকি অফিসার ক’জন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ট্রাম্পেট বাজিয়ে পশ্চাদপসরণের সংকেত দিলেন। তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পিছিয়ে যেতে শুরু করল ব্রিটিশ বাহিনী— যাতে তাদের একটি অংশ সবসময়ই ভারতীয়দের দিকেই মুখ করে রাখে। ভারতীয় বাহিনীও গুলিবর্ষণ অব্যাহত রেখেছিল এই সময়টুকু।

রাতের বয়স অনেকটাই বেড়ে গেছিল ততক্ষণে। এইবার জমায়েত জনতা সহর্ষে ও সোৎসাহে নিজেদের বাসস্থানের দিকে রওনা হল। সেখানে তারা পেল বিশ্রাম, শুশ্রুষা, সর্বোপরি বিজয়ীর সম্মান। তাদের কীর্তিও লোকমুখে ছড়িয়ে গেল দিকে-দিকে।

***

পরদিন ভোরে ভারতীয়রা নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিল। রাজভবনে, যেখানে পরম মানবদরদী ভাইসরয় লর্ড বুচার বসবাস করেন, সেখানে তখন অন্য কিছু ঘটছিল। আসুন, আপনাদের সেখানেই নিয়ে যাই।

বুচারের শোয়ার ঘরের দরজা খুলে গেল। কাজলনয়না, দীর্ঘকেশী এক চতুর্দশী কন্যা দরজায় দাঁড়িয়ে। পরনের হাঁটু অবধি ঝোলা শ্বেতশুভ্র স্কার্টটি সে ঠিকঠাক গুছিয়ে নিচ্ছিল; তবে তার সুঠাম পদযুগল তাতেও আড়াল হচ্ছিল না। তার গলায় নিতান্ত যেমন-তেমন করে জড়ানো রেশমি রুমালেও খেলে যাচ্ছিল রামধনুকে লজ্জা দেওয়া রঙের বাহার। হিরে আর মুক্তো-বসানো একটা ছোট্ট মূর্তি তার গলায় ঝুলছিল— হয়তো অশুভের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর জন্যই।

লর্ড বুচার বিছানা ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘বিবি সাহেবা’ উঠেছেন কি না। স্ত্রী ওঠেননি জানতে পেরে বুচার কন্যাটিকে নিয়ে শ্বেতপাথরে বাঁধানো পথ ধরে এগোলেন। সাড়ম্বরে তাকে একটি পালকিতে তুলে রওনা করিয়ে দিলেন তিনি। তারপর প্রাতঃকৃত্যাদি সেরে রোজকার গেজেটটি হাতে নিয়ে কাউন্সিল হলে ঢুকলেন।

ঝাড়বাতি, আয়না, ছবি, গালিচা— চোখ-ধাঁধানো এমন নানা বস্তুর বৈভবে উজ্জ্বল হয়ে ছিল ঘরটা। তার ঠিক মাঝখানে রাখা ছিল একটা ছোট্ট টেবিল। স্তূপীকৃত চিঠি, দলিল, আর লেখার সামগ্রী সযত্নে সাজানো ছিল টেবিলের ওপর। তার লাগোয়া চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ ধরে গেজেটটি পড়লেন বুচার। তারপর তিনি হাঁক পেড়ে জানতে চাইলেন, কে তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছে।

বগলের নীচে টুপি চেপে ধরা, কোমরে তরবারি-ঝোলানো এক তরুণ ব্রিটিশ অফিসার ঘরে ঢুকল। সসম্ভ্রমে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।

“কী ব্যাপার? বাইরে যেন কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম!”

বুচারের প্রশ্নের সামনে নিচুগলায় অফিসার বললেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ, স্যারে। এনসিন ভ্যালেনকোর্ট বাইরে অপেক্ষা করছেন।”

“ভেতরে আসতে বলো।”

মিনিটখানেকের মধ্যেই ঘরে ঢুকলেন এনসিন। তাঁর মুখে চার কি পাঁচ জায়গায় গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল। কাপড়ের বাঁধনে তাঁর একটি হাত ঝুলছিল।

“কালকের ঝামেলাটা নিশ্চয় ভালোভাবেই মিটেছে?”

বুচারের প্রশ্নের উত্তরে অধোবদন হলেন ভ্যালেনকোর্ট। তাঁর মুখ ক্রমেই লাল হয়ে উঠল।

“তাহলে এই ব্যাপার! রাজকীয় ফৌজ একদল বাঙালির সামনে পিছু হটে গেছে! এবার তো কড়া ব্যবস্থা নিতেই হচ্ছে। আমাদের তরফে কতজন হতাহত হয়েছে?”

“ আহত আর নিহত মিলিয়ে… পঞ্চাশজন, স্যার।”

“সে কী! এতজন… কীভাবে হল?”

“ওরা সংখ্যায় প্রায় দুশোজন ছিল, স্যার। আমরা বেয়নেট নিয়ে ওদের ওপর হামলা করতেই আড়াল থেকে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়।”

“আর তার ফলে তোমরা পিটটান দাও?”

কোনো উত্তর না দিয়ে আবার মাথা নিচু করলেন ভ্যালেনকোর্ট। তাঁর মুখের লালচে ভাবটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল যেন।

“বুঝেছি। এখনকার। মতো ।যেতে ।পারো, তবে ডাকলে যেন পাই।”

মাথা অনেকখানি ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন ভ্যালেনকোর্ট; তারপর বেরিয়ে গেলেন।

গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন ভাইসরয়। বেশ খানিকক্ষণ ধরে ঘরের মধ্যেই পায়চারি করলেন তিনি। তারপর চেয়ারে বসে কাগজ-কলম টেনে একটা চিঠি লিখতে শুরু করলেন। সেটা ছিল এ-রকম~

“প্রাপক:

কর্নেল জন ব্লাড-থার্স্টি,

বাংলা-তে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ এবং শহরের প্রধান।

প্রিয় কর্নেল,

বেশ কিছু গোপন সূত্র থেকে জানা গেছে যে এ-দেশের লোকেদের মধ্যে সরকারের কাজকর্ম নিয়ে বিপুল অসন্তোষ জমে উঠেছে। এই অবস্থায় অতর্কিত আক্রমণের হাত থেকে দুর্গ তথা শহরকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আপনাকে দেওয়া হল। সেক্রেটারি এবং বোর্ডের সঙ্গে চিঠি চালাচালির ফলে যে-সব খবর রটেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই আদেশ দিতে বাধ্য হচ্ছি আমি।

আপনারই একান্ত,

বুচার,

রাজভবন, এপ্রিল ১৯৪৫”

চিঠিটা লেখা শেষ করে ঘরের মধ্যে আবারও গোটাদুই চক্কর দিলেন বুচার। তারপর প্রেসের উদ্দেশে একটা চিঠি লিখতে বসলেন তিনি। তার বয়ান ছিল এ-রকম~

“ক্যালকাটা কুরিয়ার এক্সট্রাঅর্ডিনারি

এপ্রিল ১৯৪৫

সামরিক সূত্রে জানা গেছে, গত সন্ধ্যায় দু’জন অশ্বারোহী এবং ষোলোজন পদাতিক সৈন্যকে শহরের উপকণ্ঠে শান্তিরক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। প্রায় দু’হাজার মানুষের সেই জমায়েতে উপস্থিত মানুষদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঘরে ফেরত পাঠাতে চেষ্টা করেছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু তাঁর যাবতীয় চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সেই জনতা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে নড়েইনি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *