বাউল গানের পাখি মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান – এস এম মাসুদ রানা
মুক্তদেশ, মুক্তচিন্তার সৃজনশীল প্রকাশন
বাউল গানের পাখি মাহতাব উদ্দিন
এস এম মাসুদ রানা
(জীবন ও গান)
প্ৰথম প্ৰকাশ – একুশে বইমেলা ২০১৭
প্রকাশক জাবেদ ইমন
মুক্তদেশ প্রকাশন
Bawul Ganer Pakhi Mahtab Uddin by S M Masud Rana. Muktodesh Prokashon, Islami Tower (2nd Floor), 11 / 1 Banglabazar, Dhaka- 1100, Bangladesh. Date of Publication: February 2017
.
উৎসর্গ
সাখাওয়াত হোসেন মিঠু
.
দুটি কথা
বহুদিন ধরে আমার ইচ্ছে ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার বাউল গানের পাখি মাহতাব উদ্দিনের জীবনী লেখার। কারণ আমি নিজেই বাউল গানের একজন ভক্ত। বাউল গান একটি লোক সম্প্রদায়। তাদের তত্ত্ব ও দর্শন আছে, সাধনার পদ্ধতি আছে, সাধক জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এ সমস্তই ব্যক্ত হয়েছে তাদের গানে। এই সম্প্রদায়ের সাধকগণের তত্ত্ব দর্শন ও সাধনা সংবলিত গানই বাউল গান। তাই আমি বারবার ছুটে গিয়েছিলাম বাউল মাহতাব উদ্দিনের কাছে। তার জীবন দর্শন ও সামগ্রিক সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে। সব মিলিয়ে এই গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা পেলে পরবর্তীতে আরও অসংখ্য বাউলদের জীবনী তুলে ধরার ইচ্ছে রয়েছে।
এস এম মাসুদ রানা
.
বাউল মাহতাব উদ্দিন জীবন কথা
যুগে যুগে কিছু কৃৰ্ত্তিমান মানুষের জন্ম হয়। তারা যুগ-যুগান্তর মানব হৃদয়ের মনিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে বিরাজ করেন। তাদের কোনো মৃত্যু নেই। কেন না যুগ যুগান্তর মানব মনে তারা স্বরনের সরনি অতিক্রম করে উপস্থিত হন। যদিও এ উপস্থিতি তাদের শারিরিক উপস্থিতি নয়। বলা হয় মরিয়াও মরা নয়। যদি লোকে ঘোষে। মৃত্যু একদিন মানুষের জীবনকে অস্থিত্ব বিলীন করে দেয়। কিন্তু মানুষের কর্মফল পৃথিবীতে স্বরণীয় থেকে যায়। কর্ম যদি সরণযোগ্য হয়। তবে তাকে কৃত্তি বলে, বিবেচ্য। আর কৃত্তিযস্য জীবিত থাকবে। এবং যুগে যুগে মানুষের কর্মফল জীবিত থাকে। আমাদের বাংলাদেশে ময়মনসিংহ জেলার তেমনি একজন গণমানুষের লোকশিল্পী বাউল মাহতাব উদ্দিন। তিনি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার তারুন্দিয়া ইউনিয়নে মামদিপুর গ্রামে ১৯৩৩ সালে ২৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার, বাংলা ১৪ই বৈশাখ ১৩৪০ খ্রিঃ জন্মগ্রহণ করেন। সে সময়ে ময়মনসিংহ জেলাকে লোক সঙ্গীতের জেলা বলা হত। মানবিক আবেদন, সত্য ভাষণে প্রণয়ের অমর মহিমা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, অপূর্ব সৌন্দয্য ও কাব্যগাথুনি প্রভৃতি দিক থেকে ময়মনসিংহের লোক সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল সংযোজন। কৃষি ও কৃষকজীবনের সঙ্গে নিভিরভাবে ঘনিষ্ঠ সহজ সরল প্রকৃতির গ্রামীণ মানুষের হৃদয়ান্তর্গত ভাবগুলো ঐতিহসুত্রে মিশে আছে ময়মনসিংহের লোক সঙ্গীত শিল্পী বাউল মাহতাব উদ্দিনের গানে। মাহতাব উদ্দিনের পিতার নাম মোঃ মনির উদ্দিন মন্ডল, ও মাতার নাম মুলুকজান বিবি। দাদার নাম মোঃ করিম মন্ডল। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে মাহতাব উদ্দিন ছিলেন বাবা মায়ের শেষ সন্তান। মাহতাব উদ্দিন শিক্ষা জীবন শুরু শাকুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তখন ছিলো ব্রিটিশ শাসনকাল, কাগজ কলমে প্রচলন ছিল না। কলাগাছের পাতায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে লেখাপড়া করা হতো। মাঝে মধ্যে স্কুল পালিয়ে মাহতাব উদ্দিন ছুটে যেত বাউল গানের আসরে। তবে সে ছেলেবেলা থেকে ভাবুক মননের ছিলো।
মাত্র ১০ বছর বয়সে তার বাবা মা দুজনেই মারা যান। ফলে এখানেই তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের আর্থিক দৈন্যের জন্য তার লেখাপড়া আর হয়নি। তার এক বড় ভাই ও এক বোন তখন তাকে ফেলে ভারতের আসাম প্রদেশে চলে যান এবং দুই বোনের বিয়ে হয় আসাম প্রদেশে, তার আর এক বড় ভাই তাকে একা ফেলে সেও চলে যায় আসাম প্রদেশে। তখন মাহতাব উদ্দিন ভিষণ অসহায় হয়ে চলে যান খালার বাড়িতে। ছোট্ট মাহতাব গান বাজনাকে এতই ভালোবাসতেন তিনি খালার বাড়ি গিয়েও বায়াম জহুরা নামক একটি গানের দলে যোগ দিলেন। সেখানে তিনি গানের ওস্তাদ হিসেবে পেলেন কেরামত আলি নামে এক বাউল গায়ক কে। তার সঙ্গে দিন রাত থেকে তিনি বাউল গান শিক্ষা লাভ করেন। ওস্তাদ কেরামত আলি ছিলেন মাহতাব উদ্দিনের বাবার বন্ধু। ফলে তিনি ওস্তাদ কেরামত আলির হাত ধরে ১৪ বয়সে চলে গেলেন রংপুর শহরে। সেখানে তিনি আনাচে কানাচে পাল্টাপাল্টি বাউল গান করেন। রংপুরে মানুষের মুখে মুখে মুড়ির মত ফুটে ওঠে ছোট মাহতাব উদ্দিনের নাম। ওস্তাদ কেরামত আলীর স্ত্রী মাহতাবকে নিজ সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি মাতৃভূমির টানে রংপুর শহর ছেড়ে চলে আসেই নিজ জন্মস্থানে। বাউল গানের পাখি মাহতাব নিজ জন্ম স্থানে এসে ধরা পড়লেন ভুলার চড়ের বাউল উমেল আলি ফকিরের হাতে। তিনি ছিলেন মাহতাব উদ্দিনের পিতার দোস্ত। তখন মাহতাব উদ্দিন ভিবিন্ন গায়কের সাথে পালা গান করতেন। নিজেই বাউল গান রচনা করতেন। নিজেই সেই গানের সুর করতেন। দর্শক শ্রোতাদের মনোরঞ্জন দিতে পেরেছেন তার গান। কারণ তার ছন্দের গাঁথায় রচিত গান গ্রাম্য শ্রোতাদের ভালো মন্দের বিচারের পথ দেখাতেন ধর্ম অনুশাগণ মুক্ত। ব্যাক্তি জীবন অভিস্পায় উজ্জীবিত স্বাধীনমনস্ক নারী প্রাধান্য বিশিষ্ট আদিবাসী সংস্কৃতি প্রভাবিত ফুটে উঠেছে তার রচিয়ত গানে।
দেশের দূর দূরান্ত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাহতাব উদ্দিনের গানের বায়নাপত্র আসতে থেকে। রাতারাতি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাউল গানের পাখি মাহতাব উদ্দিনের ডাক ছড়িয়ে পড়ে। মা বাবা ভাই বোনকে হারিয়ে অসহায় মাহতাব উদ্দিন আপন করে পেলেন এদেশের জনগণকে। বাংলাদেশে প্রায় সবকটি জেলা উপজেলায় বাউল গান করে দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। ভারতের আসাম প্রদেশেও তিনি বিভিন্ন স্থানে দুই শতাদিক বাউল শিল্পিদের সাথে পাল্টাপাল্টি গান করেছেন।
তাছাড়া তিনি জনস্বার্থে গণসংযোগ বিভাগে গণসচেতনমূলকগান শুরু করেছেন প্রায় পাঁচ বছর। যক্ষা, কলেরা, কালাজ্বর, বিষয়ে তিনি অসংখ্য গান করেছেন এবং তিনি বিভিন্ন জেলায় বাউল গানের প্রতিযোগিতা দিয়ে বারবার প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। ব্রহ্মপুত্র নদ খননের উদ্ভোধনি অনুষ্ঠানে তৎকালীন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে গান করেছেন। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তখন মাহতাব উদ্দিনের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, ছোট্ট মাহতাব একদিন বাংলাদেশের বাউল গানের সম্রাট হবে। আমি তোমার গানে মনোমগ্ধকর হলাম। ব্রহ্মপুত্র নদ খননের সময় জিয়াউর রহমান বাউল মাহতাব উদ্দিনের একে একে চারটি গান শুনেছিলেন।
গান পাগল মাহতাব উদ্দিন কে তার চাচা আলহাজ্ব তনু মন্ডল তার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং তিনি মাহতাব কে বাষাটি গ্রামে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন। বাউল মাহতাব উদ্দিনের স্ত্রীর নাম নুরজাহান বিবি। অসহায় মাহতাব তার স্ত্রীকে নিয়ে সংসার সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চাচার বাড়িতে থেকে তিনি গান বাজনা চালিয়ে যান। পা ফেলার জায়গা জমি ছিলো না তখন মাত্তাবের। আপন বলতে স্ত্রী নুরজাহান বিবি। বিয়ের তিন বছর পর মাহতাব উদ্দিনের ঘরে নতুন অতিথির জন্ম হয়। ছেলের নাম রাখলেন ফজলুল হক। প্রথম পুত্র জন্মের পর মাহতাব উদ্দিনের ডাক নাম যেন আরও বেড়ে গেল। চতুর্দিক বায়নাপত্র যেভাবে আসতে লাগল তার কোনো সঠিক হিসেব তিনি রাখতে পারেনি। বায়না পত্রের সেই টাকা দিয়ে তিনি নিজ গ্রামে জায়গা জমি ক্রয় করলেন, তিনি বিটে বাড়ি নিয়ে প্রায় পাঁচ একরের বেশি সম্পদ উপার্জন করলেন।
বর্তমানে তিনি ছেলে ও চার মেয়ের পিতা হয়েছেন। মাহতাব উদ্দিনের বড় ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত আছেন।
মেঝো ছেলে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত, ছোট ছেলে শহিদুল ইসলাম লেখাপড়ায় নিয়োজিত। বাউল গানের পাখি মাহতাব উদ্দিনের বর্তমান ঠিকানা—গ্রাম বাঁষাটি, ডৌহাখালা ইউনিয়ন, গৌরিপুর উপজেলা, ময়মনসিংহ জেলা। এখন তিনি এখানেই অবস্থান করছেন। নারে গ্রীষ্ম
মাহতাব উদ্দিন অসংখ্য বাউল শিল্পী তিনি নিজ হাতে তৈরি করেছেন। তার শিষ্যদের সঠিক কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বয়সের ভারে তিনি তা মনে রাখতে পারিনি। তবে এখনো কিছু শিষ্য তার সাথে যোগাযোগ করেন। তারা সকলেই জাতীয় পর্যায়ের বাউল শিল্পী।
কিছু শিষ্যের তালিকা :
১। হালিমা খাতুন
২। বাউল মতিউর রহমান Rober
৩। বাউল মিয়া হোসেই
৪। বাউল আলাল উদ্দিন
৫। বাউল আব্দুল জব্বার
৬। বাউল আলামিন ভান্ডারী
৭। বাউল শহিদুল্লাহ
৮। বাউল রাব্বানি
৯। বাউল আব্দুল খালেক
১০। বাউল মাজাহারুল
১১। বাউল মফিজ
১২। বাউল আলাআমিন
১৩। বাউল তোফায়েল চৌধুরী
বাউল মাহতাব উদ্দিন একজন শিল্পী, একজন গিতিকার, একজন সুরকার, একজন সদা আলাপি, মোট কথায় তিনি একজন মাটির মানুষ। দেশের লোক সঙ্গীত মধ্যে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার সদা সহাস্য ব্যবহারে এলাকার সকলেই তাকে মাহতাব গানের পাখি বলে, আপন করে নিয়েছেন। তার রচিত ও সুরাচিত গান গ্রামের কৃষকদের কাজ করার প্রেরনা, যুবককে দেয় দেশ প্রেমের উজ্জিবিত শক্তি বৃদ্ধকে চির যৌবনের শক্তি।
মাহতাব উদ্দিনের রচিত গানগুলোতে দেখা যায় স্বদেশ প্রেমের ছাপ। প্রেম বিরহের স্মৃতি, আদ্ধ্যাত্নিকতার সুর। মাহতাব উদ্দিনের বেশ কটি গান জনপ্রিয় দেশের অসংখ্য বাউল শ্রোতার ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে। এ মাটির মানুষকে আমি প্ৰথম যেদিন দেখি সেদিন আমি বিশ্বাস করতে পারিনি তিনিই যে বাউল মাহতাব উদ্দিন। পরনে সাদা গেঞ্জি, সাদা লুঙ্গি পরিহিত দির্ঘকার্য ব্যাক্তিটি তার নিজ ঘরের বারিন্দায় বসে আছেন। বর্তমানে তিনি প্রচার বিমুখ। একসময়ে এই জনপ্রিয় বাউল শিল্পীটি এখনকার যুবকের অজানা নাম। আমি তার একটি সাক্ষাৎকার নেবার জন্য কথা দিয়েছিলাম। রঙের বাউল ফেরদৌস ভাইকে। একদিন সকালে আমি রংয়ের বাউল ফেরদৌস ভাইয়ের সাথে চলে গেলাম মাহতাব উদ্দিনের বাড়ি। বাউল গানের পাখি মাহতাব উদ্দিন তিনি দূর থেকে আমাকে দেখেই চিনতে পারলেন। চা আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে মাহতাব উদ্দিন আমাকে চুটকিও শুনিয়ে ছিলেন। সত্যিই তিনি একজন স্বার্থক রসস্রষ্টাও বটে।





অভিক দত্তের বিশ্বাসঘাতকের সন্ধানে, নীপাদের বাড়ি বইগুলো দিন