নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – সৌভিক চক্রবর্তী
নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ৩ (তৃতীয় খণ্ড) – সৌভিক চক্রবর্তী
NIREN BHADURI SAMAGRA – PART – III by Souvik Chakraborty
প্রথম প্রকাশ – অক্টোবর ২০২৫
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – সোহম সিনহা
.
উৎসর্গ
এই বই লিখতে বসে যে চরিত্রের প্রতি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ আর কৌতূহল অনুভব করেছি, দেবী ইনান্নাকে।
.
কথামুখ
প্রিয় পাঠক, একটু দাঁড়ান।
এই কথামুখ আপনি পড়ছেন মানে কয়েক মুহূর্ত আগেই আপনি হাতে তুলে নিয়েছেন ‘নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র’ ৩। অর্থাৎ ধরে নিতে পারি এর আগের দু’টি খণ্ড আপনি পড়েছেন। অর্থাৎ শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়িকে আপনি চেনেন। আপনি জানেন যে বৃদ্ধ ভাদুড়িমশায় সংস্কৃতের প্রাক্তন অধ্যাপক, শ্রী রামদাস ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিষ্য এবং নিছক তান্ত্রিক নন— তন্ত্রবেত্তা। আপনার সঙ্গে সম্যক পরিচয় আছে অমিয়, মিতুল, পল্লব, তিতাস, সঞ্জয়, অপালা, দীপক পাল, লোকনাথ চক্রবর্তীর। রোশনি, সরিৎ, তড়িৎ, গেনু; এদেরকেও আপনি চেনেন। আপনি হয়তো বইয়ের পাতা ছাড়াও জনপ্রিয় অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের পর্দায় ভাদুড়িমশায়ের কীর্তিকলাপ দেখেছেন কিংবা জনপ্রিয় অডিও স্টোরির চ্যানেলে সেই সব রোমহর্ষক গল্প শুনেছেন। মোট কথা ‘ভাদুড়িভার্স’-এর আনাচকানাচ আপনার ঘোরা। নীরেন ভাদুড়ির গল্প মানেই যে ভয়, তন্ত্র, চেনা-অচেনা দেবতা-উপদেবতা নিয়ে এক রোমহর্ষক ব্যাপার তাও আপনার অজানা নয়। এও অজানা নয় যে সমস্যা যত বিপুলই হোক না কেন, ভাদুড়িমশায়ের তন্ত্রশক্তির সামনে দাঁড়াতে পারে এমন ক্ষমতা বিশ্বপ্রপঞ্চে কোথাও নেই। আর এ কথাও আপনি জানেন, যে এহেন ভাদুড়িমশায়েরই মতে মানুষের বুদ্ধিমত্তার চেয়ে বড় অলৌকিক আর কিছু নেই।
তবে এই বইতে আপনি নতুন কী আশা করছেন? ভয়? তন্ত্রমন্ত্র? হিংসা? প্রেম? রগরগে ভায়োলেন্স? অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ? সে সবই তো আপনি পেয়েছেন ভাদুড়িমশায়ের গল্পে এর আগেও। তা হলে এই তৃতীয় খণ্ডে নতুন কী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য?
এর উত্তর অল্প কথায় হয় না। কিন্তু যদি সে চেষ্টা করতেই হয় তো বলব, এই তৃতীয় খণ্ডের দু’টি রচনা—একটি উপন্যাসিকা আর অন্যটি এক প্ৰকাণ্ড উপন্যাসের মধ্যখণ্ড; আপনাকে নিয়ে যাবে আক্ষরিক অর্থেই দেশ ও কালের গণ্ডী ছাড়িয়ে বহু দূরে, যেখানে মানুষের বোধগম্য যুক্তি আর অঙ্কের কোনো হিসেবই মেলে না। ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ আর ‘মহাসিন্ধুর ও’পার থেকে: মধ্যপর্ব;লাপিস লাজুলি’ –এই দুটি রচনার মধ্যে দিয়ে সৌভিক চক্রবর্তী নীরেন ভাদুড়িকে তন্ত্র ও ভয়-সাহিত্যের জগৎ থেকে বার করে পৌঁছে দিলেন ফ্যান্টাসির জগতে। আর শুধু ফ্যান্টাসি নয়, এই কাহিনিগুলিতে সৌভিকের কলম স্পর্শ করে গিয়েছে একাধিক জঁরের ঘাট। স্পাই অ্যাডভেঞ্চার, ক্রাইম থ্রিলার, রহস্য কাহিনি, ভ্রমণ সাহিত্য, ঐতিহাসিক উপন্যাস। আপনি কলকাতায় বসে থেকে দার্জিলিংয়ের পাহাড়তলির হিমেল হাওয়ায় সরসরিয়ে ওঠা পাইনবনের মেজাজ অনুভব করতে পারবেন, সঙ্গে এও জানবেন যে সেই কালচে-সবুজ অন্ধকারের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা অতিলৌকিক রহস্যের মূল আসলে লুকিয়ে আছে মধ্য-ইয়োরোপের লোককথায় আর ইয়োরোপীয় শয়তান উপাসনার মধ্যে। দেবী ইনান্নার দণ্ড উদ্ধার করতে না পারলে যে নরকের দ্বার খুলবে না, তিতাসকে বাঁচানোর পথ যে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে তা আপনি এত দিনে জেনে গিয়েছেন। কিন্তু সেই দণ্ডকে উদ্ধার করার জন্য আপনার-আমার মতোই বন্ধুত্ব আর প্রেমে পাগল বাঙালি ছেলেমেয়েগুলি যে কী ভাবে শতসহস্র বিপদের মহাসিন্ধু পেরিয়ে সুদূর ইরাকে পৌঁছে গেল সেই কাহিনি সত্যিই মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে সৌভিকের কল্পনা আর কলমে। সেখানে তাদের যুদ্ধ করতে হয় শুধুমাত্র প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার পুরাণকথার সঙ্গে নয়, ঘোরতর ভাবে আজকের পৃথিবীর অন্যতম বড় বিভীষিকার সঙ্গেও;যার নাম ইসলামী আতঙ্কবাদ। এই ভয়ঙ্করকে এক অভূতপূর্ব, অন্যতর চরিত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন লেখক। আর সেখানে আবার তিনি রচনা করে ফেলেছেন এক আশ্চর্য ঐতিহাসিক ডার্ক ফ্যান্টাসি; এই ‘লাপিস লাজুলি’ খণ্ডের যাকে এক রকম ভিত্তিপ্রস্তর বললেই চলে। পাঠক, সেখানে আপনাকে লেখক নিয়ে গিয়ে ফেলবেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর বাগদাদে, রক্তপিপাসু মোঙ্গোল আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় যে শহর দিন গুনছে। মোঙ্গোল বাহিনীর সেই রক্তপিপাসার সঙ্গে তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন আজকের পৃথিবীর ধর্মান্ধ, রক্তপাগল সন্ত্রাসবাদকে, যার মূল ঘাঁটিও সেই মধ্য এশিয়ার মরুভূমিই।
পাঠক, আপনি কি অবাক হচ্ছেন? দাঁড়ান, এখানেই শেষ নয়। মধ্য এশিয়ার মরুভূমি যে আরও প্রাচীন সভ্যতার লীলাক্ষেত্র, দেবী ইনান্না বা ইশতারের মিথের জন্মক্ষেত্র, ভুলে যাবেন না। লেখক গল্পের পাত্রপাত্রীদের সঙ্গে আপনাকে নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন মধ্য এশিয়ার বর্তমান নিষ্ঠুর ক্রাইম থ্রিলারের জগতে, অতীত ইতিহাসের যুদ্ধ আর রাজনীতিময় রোমান্সের জগতে। এ বার আরও পিছনে গিয়ে তিনি আপনাকে নিয়ে যাবেন সেই সুমেরীয় সভ্যতার পুরাণের জগতে, শোনাবেন সুমেরীয় ‘গিলগামেশ’ মহাকাব্যের গাথা। আপনাকে ঘুমিয়ে না পড়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতেই হবে, নইলে গল্পের চরিত্ররা যে ওই পৌরাণিক নরক থেকে, মরুভূমির নরক থেকে, আইসিসের নরক থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। তবে না পল্লব-রোশনি-অপালা-সঞ্জয় মাথা খাটিয়ে উদ্ধার করবে প্রাচীন সূত্রের অর্থ! তবে না ভাদুড়িমশায় নিজের অলৌকিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দুর্ধর্ষ এক দুশমনের হাত থেকে ছিনিয়ে আনবেন দেবী ইনান্নার দণ্ড! পাঠক, এই উপন্যাসখণ্ডের পাঠ সমাপ্ত করে আপনার মনে হতেই পারে যে আপনি যে জলাধারে অবগাহন করে এলেন এইমাত্র তার গায়ে লেখা থাকতে পারে সৌভিক চক্রবর্তীর নাম, কিন্তু আসলে তার সঞ্চিত জলে মিশে গেছে ড্যান ব্রাউন নামের তীর্থবারি। ‘লাপিস লাজুলি’ উপন্যাসখণ্ড ধারে-ভারে কোনো স্বকীয় উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।
এতগুলি জঁরকে একসঙ্গে হাতে নিয়ে কলমের জাগলিং করা সহজ কথা নয়। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, সৌভিক ঠিক সেটাই করেছেন শুধু নয়, অত্যন্ত সফল ভাবে করেছেন। তাঁর ভাষা ঝরঝরে, আটপৌরে বাংলা। যে ভাষায় আমরা কথা বলি, আমাদের তুলসীতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে, আমাদের কাশফুল ফোটে, আমাদের শালবন আর আমবাগানে হাওয়া বয়। সৌভিক তাই সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়েও ফিরে আসেন বাংলায়। ইরাকের মরুভূমিতে যে রহস্যের শুরু তার শেষ হয় বাংলার মাটিতে। সিংহবাহিনী দেবী ইনান্নার সঙ্গে যোগ তৈরি হয় আমাদের ঘরের মা, ঘরের মেয়ে সিংহবাহিনী দেবী মহামায়ার। ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ উপন্যাসিকায় মধ্য ইয়োরোপের লোককথার ভয়ঙ্করকে সামাল দেওয়ার জন্য এসে হাজির হতে হয় তাই আমাদের প্রাচীন দেবতাকেই, আর সেখানে সৌভিক প্লটের অছিলায় বাংলার তন্ত্র-ফিকশন জগতের মহাচার্য তারানাথ তান্ত্রিকের উদ্দেশ্যে প্রণামটুকুও সেরে নেন। সৌভিকের সার্থকতা এখানেই। তিনি বাংলার পাঠকের নাড়ির হদিশ রাখেন। তিনি জানেন যে যতই অলৌকিকের গল্প ফেঁদে বসা হোক না কেন, অলৌকিককেও জগতের এবং সাহিত্যরচনার যুক্তি মেনে চলতে হয়। তার কারণ, পাঠক, আপনি অলৌকিক গল্পের পাঠক হয়েও দিনের শেষে যুক্তি দিয়ে চিন্তাভাবনা করা একজন মানুষ, যিনি গল্পের গরুকে গাছে উঠতে দেখলে প্রথমে হেসে ফেলবেন এবং পরে লেখকের উদ্দেশ্যে কটূক্তিই করবেন। লেখক তাই অলৌকিকের আমদানি করেন নিতান্ত লৌকিক পথে, যুক্তি মেনে। নীরেন ভাদুড়ির গল্পে তাই অলৌকিক সমস্যার সমাধানের পথে হাত ধরাধরি করে চলে অতিলৌকিক আর লৌকিক। মানুষের বুদ্ধি, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, স্নেহ, আবেগ;এই সবই যে আসল অলৌকিক, আসল আলো, তা সৌভিকের কলম বারবার মনে করিয়ে দিয়ে যায়।
পাঠক, আপনি জানেন যে একটি কাল্পনিক চরিত্রকে নিয়ে একাধিক গল্প লিখতে গেলে তাঁকে নিয়ে একটা জগৎ তৈরি করতে হয় এবং সেই চরিত্রকে একটা কাল্পনিক জীবন দিতে হয়। নানান গল্পে ছড়িয়েছিটিয়ে টুকরো-টুকরো ভাবে আদ্যন্ত রক্তমাংসের মানুষের মতো সেই জীবনের ইতিহাস গড়ে উঠতে থাকে। এই কথাটা সৌভিক খুব ভালো করে মনে রেখেছেন বলেই নীরেন ভাদুড়ির জীবনের নানান টুকরোটাকরা আমরা আগেই বিভিন্ন গল্পে জানতে পেরেছি। আমরা জানি তাঁর গুরু রামদাস ঠাকুরের কথা, তাঁর যৌবনের বিশেষ কাছের বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হাজরা কিংবা স্ত্রী নিবেদিতার কথাও। স্বভাবতই পাঠকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল নীরেন ভাদুড়ির গুরু রামদাস ঠাকুরকে নিয়ে। এ বার সেই কৌতুহলেরও নিরসন হতে চলেছে এই বইতে। পাঠক, তরুণ নীরেন ভাদুড়ির সঙ্গে প্রবীণ শিশু ভোলানাথ রামদাস ঠাকুরের প্রথম দেখা হওয়ার সাক্ষীও আপনি হতে চলেছেন। আপনাকে এটুকুই বলব যে, যে কালে তান্ত্রিক বলতেই এক-একজন শ্মশ্রুগুম্ফসম্বলিত, রুদ্রাক্ষমণ্ডিত, ভস্মবিভূষিত, রক্তাম্বরপরিহিত ঘোরতর প্রবল-পুরুষকে দেখতে দেখতে আপনাদের চোখে চড়া পড়ে গিয়েছে, সে কালে এমন এক জন সদানন্দ, সারল্যময়, আধ্যাত্মিক চরিত্র সৃষ্টি করতে পারা মানে বাংলার ‘তন্ত্রভিত্তিক হরর থ্রিলার’-এর জগতে এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া বইয়ে দেওয়া। সৌভিক সেটাই করেছেন। রামদাস ঠাকুরের পিছনে আপনি যদি বাঙালির অত্যন্ত কাছের আর এক আধ্যাত্মিক পুরুষের ছায়া খুঁজে পান তবে তার কৃতিত্ব পুরোপুরি সৌভিকের।
আর বেশি কিছু বলা বাড়াবাড়ি হবে। পাঠক, আপনি বরং চটপট পরের পাতাগুলো উল্টে সোজা গল্পে ঢুকে পড়ুন। রোলার কোস্টার রাইড শুরু হওয়ার সময়ে যে রকম দম বন্ধ করে দু’হাতে দু’পাশের হাতল চেপে ধরে বসেন, ঠিক সেই ভাবে বসুন। না, ‘অন্ধকারের রাজত্বে’ কিংবা ‘ভয়ের দুনিয়ায়’ আপনাকে স্বাগত জানাব না। এই দুই মলাটের জগৎ আরও জটিল, আরও কঠিন, আরও বহুবর্ণময়। আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে একটু। প্রথমে অতলে তলিয়ে যাবেন, ভয় পাবেন, গা শিরশির করবে, রোমকূপগুলি হাহাকার করবে। তার পর ধীরে ধীরে, ক্রমে ক্রমে ক্রমে, পদ্মের পাপড়ির মতো আলোর কুঁড়িও খুলে যেতে দেখবেন। তন্ত্র মানুষকে আলো দেখায়, ভয় নয়।
ততক্ষণ লেগেপড়ে থাকুন। দেখবেন, সেই আসল অলৌকিক হবেই।
রাজর্ষি গুপ্ত
ইংরেজি বিভাগ, গুরুদাস কলেজ, কলকাতা
মহালয়া, ১৪৩২
.
ভূমিকা
ভূমিকা কেউ পড়তে ভালবাসে না। গুটিকতক মানুষ ছাড়া কেউ পড়েও না। কিন্তু এই একটিমাত্র জায়গা যেখানে লেখক তার কৈফিয়ৎ দেওয়ার সুযোগ পায়। তাই পাঠক ভূমিকা না পড়লেও লেখকের ভূমিকা লেখার দায় থেকে যায়।
গত বছর বইমেলায় যখন নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ৩য় খণ্ড আসবে না জানা গেল, পাঠকেরা খুব হতাশ হয়েছিলেন। তখনই আমি ঠিক করেছিলাম, যত কাজই থাকুক এ বছর বইমেলার আগেই বইটা শেষ করব। কিন্তু গোল বাধল লিখতে বসে। প্রথম খণ্ডের শেষে এ বার তো দেবী ইনান্নার দণ্ড উদ্ধারের পালা, আর সেই দণ্ড থাকার কথা মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস আর পুরাণ না জেনে তো এ উপন্যাস লেখা যাবে না। অতএব পড়তে বসা গেল।
গত বছর পুজোয় আমি লেবংয়ে বেড়াতে গেলাম। সেখান থেকেই শুরু হল পড়াশোনা। নানা বইপত্র, জার্নাল, ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি তলিয়ে যেতে শুরু করলাম মধ্যপ্রাচ্যের ম্যাজিকে। এই করতে করতে কখন যে জানুয়ারি মাস পেরিয়ে গেল টেরই পাইনি। এসে পড়ল বইমেলা। আবার এক দফা পাঠকদের অসন্তোষ কানে এল। বুঝলাম, আর দেরি করা ঠিক হবে না। কারণ পড়তে পড়তে মনে মনে এমন ভাবে উপন্যাসটা ফেঁদে ফেলেছি, এর শেষ কোথায় কিচ্ছু জানা নেই। এ উপন্যাস শেষ করতে সময় লাগবে। অতএব ফেব্রুয়ারি মাসের একদম গোড়ার দিকে এক ফ্লাস্ক কফি নিয়ে সকাল ছ’টায় ঢুকে পড়লাম ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে এবং লিখতে শুরু করলাম, মহাসিন্ধুর ও’পার থেকে-র দ্বিতীয় বা মধ্যপর্ব ‘লাপিস লাজুলি’। কুয়াশা মাখা শীতের সকালে আমি চলে গেলাম বিকেল বেলার বাগদাদে। টাইগ্রিসের পাড়ে। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে।
কাহিনি চলতে লাগল আর আমি নিজেই বিস্মিত হয়ে দেখলাম, বর্তমানের পাশাপাশি এ কাহিনির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে ইতিহাস। ইতিহাসের প্রতি আমি দায়বদ্ধ। তাই প্রধান চরিত্রগুলির মধ্যে একটিমাত্র নাম পরিবর্তন আর কল্পনার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আমি কোথাও ইতিহাস বিকৃতি ঘটাইনি। দেবী ইনান্নার পৌরাণিক কাহিনির ক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব মূলানুগ থাকার চেষ্টা করেছি। সে কথা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস এবং পুরাণ জানা পাঠক অবশ্যই বুঝবেন। যাঁদের এই ইতিহাস বা পুরাণ জানা নেই তাঁদেরও বিন্দুমাত্র অসুবিধে হবে না এই কাহিনির রস আস্বাদনে। এ আমার বিশ্বাস। আর যাঁদের ইতিহাস অতটাও পছন্দ নয় তাঁদের জন্য রইল মধ্যপ্রাচ্যে আইসিসের উত্থান পতনের কাহিনি। যা জড়িয়ে গেছে এ কাহিনির চরিত্রদের সঙ্গে।
এই উপন্যাস লিখতে গিয়ে আমাকে প্রচুর বইপত্র পড়তে হয়েছে সে আমি আগেই বলেছি। তবু তার মধ্যে কয়েকটি বইয়ের ঋণ স্বীকার না করলেই নয়।
১) প্রাচীন ইরাক, শচীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, এম সি সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড।
২) গডস, ডেমনস অ্যান্ড সিম্বলস অব অ্যানসিয়েন্ট মেসোপটেমিয়া, জেরেমি ব্ল্যাক এবং অ্যান্টনি গ্রিন, ব্রিটিশ মিউজিয়ম প্রেস।
৩) সুমেরিয়ান মাইথোলজি, স্যামুয়েল নোয়া ক্রেমার, গ্রেপভাইন ইন্ডিয়া।
৪) দ্য এপিক অব গিলগামেশ, এন স্যান্ডার্স, পেঙ্গুইন।
৫) গিলগামেশের দেশের কথা, রজত পাল, বইচই।
৬) ব্ল্যাক করিডর ১, সমৃদ্ধ দত্ত, দে’জ পাবলিশিং।
৭) অপারেশন বাগদাদি, মৃণালকান্তি দাস, দীপ প্রকাশন।
আইসিস প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছি ব্ল্যাক করিডর বইটি থেকে। কিছু জায়গায় তো আমি প্রায় হুবহু অনুসরণ করেছি। আশা করি বইটির লেখক আমার এই অনুসরণকে পাঠকের মুগ্ধতা হিসেবেই দেখবেন প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এই খণ্ডেই মহাসিন্ধুর ও’পার থেকে শেষ হয়ে যাবে কিন্তু আমার ধারণা যে ভুল সেটা বুঝলাম যখন মধ্য পর্বই শেষ হল ৮৮ হাজার শব্দে। শেষ করতে সময় লাগল ছ’ মাস। এটি হয়ে উঠল নীরেন ভাদুড়ি সিরিজের এখনও অবধি সবচেয়ে বড় উপন্যাস। আমি প্ৰকাশক দীপ্তাংশু মণ্ডলের শরণ নিলাম। বই লেখার ক্ষেত্রে তিনিই আমার অভিভাবক। তাঁকে বললাম, ‘মধ্যপর্ব যা দাঁড়াল, অন্ত্যপর্ব তো আরও জটিল হবে। কী করব দাদা? এই খণ্ডেই দিয়ে দেব? তা হলে কিন্তু আমার আরও ছ’ মাস লাগবে।’
দীপ দা’ বললেন, ‘না, তাতে বইয়ের কলেবর বেড়ে যাবে। বইয়ের দাম বাড়বে। অন্ত্যপর্ব পরের খণ্ডে নিয়ে এসো।’
আমিও ভাবলাম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেবীর দণ্ড উদ্ধার করে ভাদুড়ি মশায়ও ক্লান্ত। তাঁকেও একটু বিশ্রাম দেওয়া দরকার। তাই এই খণ্ডে রইল মধ্যপর্ব ‘লাপিস লাজুলি’। অন্ত্যপর্ব ‘নরক গমন’ থাকবে পরের খণ্ডে। তবে এটুকু বলতে পারি, মধ্যপর্ব একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। এই উপন্যাস পড়ার পরে, কেন এখানেই শেষ হয়ে গেল, পাঠকের মনে এই খেদ থাকবে না।
দীপ দা’ বলেছিলেন, এই খণ্ডে এই একটা উপন্যাসই থাক। কিন্তু আমার মন খুঁতখুঁত করছিল। মনে হচ্ছিল, আর একটা গল্প থাকা দরকার। তখনই মনে হল, ভাদুড়ি মশায়ের গল্পে বারবার রামদাস ঠাকুরের কথা উঠে আসে। কিন্তু এই দু’ জনের কী ভাবে দেখা হয়েছিল সেটা আজ অবধি আমি বলিনি। ঠিক করে ফেললাম, এই গল্পটা হবে দু’ জনের প্রথম সাক্ষাৎ নিয়ে। গল্পের নাম ঠিক হল। ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’। লিখতে লিখতে আমি নিজেই জড়িয়ে গেলাম গল্পটার সঙ্গে। ভেবেছিলাম ছোটগল্প লিখব কিন্তু হয়ে উঠল বেশ বড়সড় একটা গল্প। ঠাকুর আর ভাদুড়িমশায়ের প্রথম সাক্ষাৎ যে ছোটগল্পে ধরাতে চেয়েছিলাম, এ আমারই ধৃষ্টতা।
যাই হোক, শেষমেশ লেখা শেষ হল। পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলাম দীপ দা’কে। দীপ দা’র শাসন আর গৌরব দা’র তাগাদা না থাকলে এ লেখাও আমি শেষ করতে পারতাম না। আর এ লেখা শেষ হতো না যদি না জ্যোতি আর শ্রীজয়ী থাকত। আমার কাজের বেশির ভাগটাই নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে দিনের পর দিন আমাকে লেখার সুযোগ করে দিয়েছে এই দু’ জন। প্রত্যেকটা পরিচ্ছেদ লেখা হয়েছে আর পড়ে সুচিন্তিত মতামত দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে একটা গোটা রিসার্চ করে দিয়েছে শ্রীজয়ী। ওদের কৃতজ্ঞতা জানাব না। ওরা আমার আপনজন। আমার ভালবাসার মানুষ। আমার পরিবার।
আর যে না থাকলে আমি কোনও দিন লেখালিখিই করতে পারতাম না সে আমার স্ত্রী, প্রজ্ঞা। এই উপন্যাসের সবচেয়ে জটিল জায়গাটা আমি তার কথাতেই অন্তত চার বার কাটাকুটি করেছি।
আমার ছোটবেলার বন্ধু সোহম নিজের ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যে থেকে সময় বার করে এই বইয়ের প্রচ্ছদ আর অলংকরণ করেছে। ওকে ধন্যবাদ দেব না। রেঁধে খাওয়াব।
আমার মাস্টারমশাইরাও আমাকে পদে পদে সাহায্য করেছেন এই বই লিখতে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ডিপিবি স্যার বইয়ের একটা অংশ নিজে হাতে কেটেকুটে ঠিক করে দিয়েছেন। অর্জুনদেব সেনশর্মা, অর্জুন দা’কে বারবার ফোন করে বিরক্ত করেছি দুর্গামূর্তির বিবর্তনের বিষয়ে। অশিক্ষিত, মূর্খ বলে গালাগালি না দিয়ে তিনি আমায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যেও গোটা উপন্যাসটা পড়ে মূল্যবান মতামত দিয়েছেন দেবশ্রুতি রায়চৌধুরী, আমার ডিন ম্যাডাম। তাঁর কথা মতো আমি উপন্যাসের কয়েকটা জায়গা বদল করেছি। এমন শিক্ষকদের পেয়েছিলাম বলে আমার ছাত্রজন্ম ধন্য। তাঁরা যে আজও আমার মতো অভাজনকে স্নেহ করেন এ আমার প্রাপ্যের অধিক।
একদম শেষে আসি দু’ জনের কথায়। লেখা শেষ হলেই যাঁদের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠানো আমার রিচুয়াল তাঁরা হলেন রাজর্ষি গুপ্ত এবং অভিষেক ঘোষাল। দু’ জনের মতামতই উপন্যাসটাকে আরও সাবালক করেছে বলে আমার বিশ্বাস। এই বই নিয়ে রাজর্ষি দা’র একটা লেখাও রইল এই খণ্ডে। রাজর্ষি দা’র মতো বিদগ্ধ মানুষ যে আমার এই বই নিয়ে আলোচনা করেছেন এ আমার কাছে বিরাট পাওয়া।
যাই হোক, ভূমিকাটা বড় হল কিন্তু কিছু করার ছিল না। আমার কাজ শেষ। এর পরে বাকিটা পাঠকের হাতে। আশা করি, তাঁদের নিরাশ করব না। বই প্রকাশিত হবে দীপাবলির ঠিক আগে আগে। সকলকে দীপাবলির শুভেচ্ছা।
সৌভিক চক্রবর্তী
শরৎ, ২০২৫
.
ফ্ল্যাপের লেখা
এই দুটি রচনার মধ্যে দিয়ে সৌভিক চক্রবর্তী নীরেন ভাদুড়িকে তন্ত্র ও ভয়-সাহিত্যের জগৎ থেকে বার করে পৌঁছে দিলেন ফ্যান্টাসির জগতে। আর শুধু ফ্যান্টাসি নয়, এই কাহিনিগুলিতে সৌভিকের কলম স্পর্শ করে গিয়েছে একাধিক জঁরের ঘাট। স্পাই অ্যাডভেঞ্চার, ক্রাইম থ্রিলার, রহস্য কাহিনি, ভ্রমণ সাহিত্য, ঐতিহাসিক উপন্যাস। আপনি কলকাতায় বসে থেকে দার্জিলিংয়ের পাহাড়তলির হিমেল হাওয়ায় সরসরিয়ে ওঠা পাইনবনের মেজাজ অনুভব করতে পারবেন, সঙ্গে এও জানবেন যে সেই কালচে-সবুজ অন্ধকারের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা অতিলৌকিক রহস্যের মূল আসলে লুকিয়ে আছে মধ্য-ইয়োরোপের লোককথায় আর ইয়োরোপীয় শয়তান উপাসনার মধ্যে। দেবী ইনান্নার দণ্ড উদ্ধার করতে না পারলে যে নরকের দ্বার খুলবে না, তিতাসকে বাঁচানোর পথ যে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে তা আপনি এত দিনে জেনে গিয়েছেন। কিন্তু সেই দণ্ডকে উদ্ধার করার জন্য আপনার-আমার মতোই বন্ধুত্ব আর প্রেমে পাগল বাঙালি ছেলেমেয়েগুলি যে কী ভাবে শতসহস্র বিপদের মহাসিন্ধু পেরিয়ে সুদূর ইরাকে পৌঁছে গেল সেই কাহিনি সত্যিই মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে সৌভিকের কল্পনা আর কলমে। (গুডরিডস)





Eagerly waiting…..
Waiting for long
দয়া করে তারাতারি বই টি আনুন। আর প্রতীক্ষা করে রাখতে পারছি না
Please give free access
Please, please,upload “ ১.৬১৮ ” written by Samiran Samanta
Please upload “ বিভাষিকা ১৪৩২” থ্রিলার পত্রিকা
আমাদের সিস্টেমে পত্রিকা কীভাবে, মানে কোন ফরম্যাটে আপলোড করা যায় – বুঝতে পারছি না। তবে চেষ্টা করে দেখব যদি হয়।
Why am I getting “you don’t have access to this content “error?
রেজিস্ট্রেশন করে লগইন করে দেখতে পারেন।
এটা খবরের কাগজ নয়, গল্প উপন্যাস এসব নিয়ে পূজা বার্ষিকী সংখ্যা
প্লাটফর্ম বুকের বামদিকে- অয়ন মুখার্জি নীল এর লিখা এটা আনুন প্লীজ
সম্পূর্ণ uoload হলেই পড়া শুরু হবে। আগাম ধন্যবাদ রইলো।
Kobe asbe ??
এলিচার্ড e book ta dewa jb??
অমৃতা কোনার এর লেখা বই গুলো নিয়ে আসুন।
প্লাটফর্ম বুকের বামদিকে- অয়ন মুখার্জি নীল এর লিখা এটা আনুন প্লীজ
মহাসিন্ধুর ওপার থেকেঃ অন্তিম পর্ব- টি প্লিস আপলোড করুন