গ্রীকদের চোখে ভারতবর্ষ – নির্বেদ রায়
.
দি এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতায়
বত্রিশ বছর প্রকাশনা বিভাগের প্রধান
হিসাবে কাজ করার সূত্রে যুক্ত
সমস্ত সহকর্মীদের প্রতি
.
হেরোডটাস, টিসিয়াস, মেগাস্থিনিস, আরিয়ান আর ষ্ট্র্যাবো—এই পাঁচজন ঐতিহাসিক বা লেখকের বিবরণ এই গ্রন্থে নথিভুক্ত করা হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক অজানা লেখকের দেওয়া বিবরণ—এক অসামান্য বর্ণনা ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী রাজ্যসমূহের বাণিজ্য, ব্যবসা, পণ্যের উৎস, যাতায়াতের পথঘাট সব কিছুর—’পেরিপ্লাস মারিস ইরিথ্রাই’ বা ‘পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সী’।
‘এই অনুবাদ ও সংকলন কোনো ভারতীয় ভাষায় আজ পর্যন্ত হয়নি এবং এটা করা খুবই প্রয়োজনীয়’—অধ্যাপক এ.এল. ব্যাশামের মত ছিল তাই।
তখন আমার বয়স ঊনত্রিশ বছর। এশিয়াটিক সোসাইটির দুশো বছর বয়স হয়েছে ১৯৮৪ সালে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ‘সোসাইটিকে’ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সম্মান জানিয়ে তার সমস্ত দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ওই সালের জানুয়ারি মাসে। শুধু মেধা-চর্চার ব্যাপারে তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন, ওখানে সরকারি আমলা বা মন্ত্রীরা হাত দেবেন না, এ ক্ষেত্রে এশিয়াটিকের সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে। আমি সেই বছর ইন্টারভিউ দিয়ে প্রকাশনা বিভাগের প্রধান হিসাবে চাকরিতে ঢুকি।
এশিয়াটিক তখন নবরত্ন সভা। দেশ আর বিদেশের সব বিখ্যাত অধ্যাপক তখন এশিয়াটিক সোসাইটিতে কর্মরত। তাঁদের মধ্যে ভারতচর্চার আন্তর্জাতিক পণ্ডিত অধ্যাপক আর্থার লেউইলিন ব্যাশাম তখন সোসাইটির স্বামী বিবেকানন্দ প্রোফেসর।
ঘটনাটা ঘটেছিল এইরকম। এশিয়াটিক সোসাইটিতে চাকরি পাওয়ার আগে বউবাজারের প্রকাশনা সংস্থা ফার্মা কে এল মুখোপাধ্যায় প্রাঃ লিমিটেডে আমি কাজ করতাম। সেখানে আমি কানাইলাল মুখোপাধ্যায়ের একটি স্মরণিকায় ‘হেরোডটাসের ভারত’ বিবরণ লিখি। ছোট লেখা, আর সে লেখাটাই আমি পরে এশিয়াটিকের একটি অনুষ্ঠানে পাঠ করি—সেখানে সব অধ্যাপকরা ছিলেন, আর তার মধ্যে ছিলেন প্রোফেসর ব্যাশাম।
অধ্যাপকদের মধ্যে অনেকে, বিশেষ করে ইতিহাসের মাস্টারমশাইরা লেখাটার প্রশংসা করেন, কিন্তু ব্যাশামসাহেব আমাকে তাঁর ঘরে ডেকে পাঠান। বলেন, ‘তুমি কি এ কাজ করতে চাও? না কি, এই একটাই করলে—ভবিষ্যতে এই কাজ নিয়ে আর ভাববে না? যদি আর না ভাবো তাহলে একরকম—আর যদি ভাবো তাহলে মনে রেখো কঠিন কাজে হাত দিয়ে ফেলেছ, তবে তোমার আগে এ ব্যাপারে কোনো বাংলা অনুবাদ আর সংকলনের কাজ হয়নি বলে জানি, শুধু মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরণ ছাড়া—কিন্তু মেগাস্থিনিসের মূল লেখা হারিয়ে গেছে, জর্মন পণ্ডিত ফেলিক্স জেকোবি, আর ই.এ. সোয়ানবেক মেগাস্থিনিসের একটা সংকলন করেন ঊনিশ শতকে, এই সংকলনে তাঁরা আশ্রয় করেন ডাইডোরাস সাইকালাস, ষ্ট্র্যাবো, প্লিনি আর আরিয়ানের লেখা। কিন্তু এ কাজ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে—কারণ মেগাস্থিনিসের মূল লেখা পাওয়া যায়নি। ম্যাকক্রিনডল এই দুটো সংকলনকে ভিত্তি করে একটা ইংরেজি অনুবাদ বের করেন ঊনিশ শতকের শেষভাগে।
তোমাকেও মেগাস্থিনিস লিখতে হতে পারে, আপত্তি নেই—কারণ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ওই লেখার মধ্যে আছে; কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হল যে সব লেখকরা নিজেরা তাঁদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রাচীন ভারতকে বর্ণনা করেছেন, সেই সব লেখাপত্র। দেখো, চেষ্টা করে, পারো কি না!’
সেই সূত্রপাত। তারপর এশিয়াটিকের সমস্ত কাজের মাঝখানে এই কাজে ধীরে ধীরে এগিয়েছি, বিশেষ করে গ্রীকভাষার পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে—এটাও ব্যাশাম সাহেবের উপদেশকে আশ্রয় করে।
ভারততত্ত্ব আলোচনার শুরু থেকেই এই প্রাচীন বিবরণগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের সূত্র হিসাবে স্বীকৃত। তার মূল কারণ দুটি—প্রথম কারণ প্রাচীন যুগ থেকে প্রাক-মুসলমান যুগ পর্যন্ত ভারতীয়রা তাদের কোনো ইতিহাস লেখেনি; আর দ্বিতীয় কারণ হল যে, অন্য সে সমস্ত সাহিত্য বিপুল পরিমাণে এই সময়ের মধ্যে ভারতীয়রা লিখেছে তার বড় অংশ ধর্মগ্রন্থ বা নাটক ইত্যাদি—সেখানে ‘সময়’ খুব নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকে না আর সামাজিক মানুষের যে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় যেমন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস প্রসঙ্গ, সে সমস্তও থাকে উপেক্ষিত। অন্যদিকে গ্রীক বিবরণে এ সবকিছু প্রায় নির্ভুল সময় ধরে পাওয়া যায়। এমনকি প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যে পাওয়া বিষয়বস্তু ও তার নির্ধারিত সময়ও এই বিবরণগুলির গুরুত্ব হ্রাস করে না, বরং আরও বাড়িয়ে দেয়।
আমরা আলেকজাণ্ডারের ভারত অভিযানকে সামনে রেখে এগোলে প্রথম দুটি লেখা অর্থাৎ হেরোডটাস আর টিসিয়াসের বিবরণ এই অভিযানের আগে লেখা হয়েছে বলে বুঝি, কিন্তু মেগাস্থিনিসের মতো সংকলিত না-হলেও, ‘ডাক্তারবাবু’ টিসিয়াসের লেখাও পরবর্তী লেখকদের দ্বারা লিখিত হয়েছে। টেসিয়াস বা টিসিয়াস-এর লেখা ফোটিয়াস লিখেছেন, কিন্তু তার পুরোটা টিসিয়াস বা টেসিয়াসের লেখা বলে বোধ হয় না।
আর এই দুটি বিবরণ অর্থাৎ হেরোডটাস আর টিসিয়াস বাদ দিলে বাকি তিনটি বর্ণনা আলেকজাণ্ডারের ভারত অভিযানের পরবর্তী সময়ে লেখা—মেগাস্থিনিস, আরিয়ান আর ষ্ট্র্যাবো।
একমাত্র ‘পেরিপ্লাস’ লেখাটির সঙ্গে আলেকজাণ্ডারের অভিযানের কোনো সম্পর্ক নেই। এই বিবরণে আছে পূর্ণাঙ্গ ভৌগোলিক বর্ণনা, প্রতিটি বন্দর, জাহাজ, পণ্যের চলাচল—সেই পণ্যের উৎস থেকে শেষপর্যন্ত তার ব্যবহার—তার বিস্তারিত, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বর্ণনা রয়েছে এই বিবরণে। সময়—প্রথম শতাব্দী। অর্থনীতির কথা বলতে গিয়ে খনিজসম্পদ, কৃষিকাজ, অন্যান্য ধন ও সম্পদের উৎস, যা কিছু ভারতবর্ষ থেকে অন্য দেশে যায় অথবা অন্য দেশ থেকে ভারতে আসে, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে এই লেখাপত্রে।
অন্য লেখাপত্রগুলোয় বিবরণ আছে মানুষের, আছে জন্তুজানোয়ারের, আর আছে রূপকথার—সে সব রূপকথা বণিক আর ব্যবসায়ীর দল রাতে আগুনের কুণ্ড জ্বেলে, সেই কুণ্ড ঘিরে বসে মুখে মুখে বলে গেছে—কখনো রাজপুরুষের দল আড্ডায় বসে এইসব অপরূপ আর রোমাঞ্চকর কাহিনী শুনেছে। এই সমস্ত কথা আর কাহিনী মিলেমিশে তৈরি হয়েছে ইতিহাস, ইতিবৃত্তকথা। গ্রীকদের লেখা ভারতবৃত্তান্ত।
এই লেখাপত্রে যে জনজীবন, রাজনীতি, কাজের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাত আর ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় স্থান পেয়েছে, তার জন্য যে মেধা ও শিক্ষার প্রয়োজন সেটা গ্রীক সমাজ প্রাচীনকাল থেকেই গ্রহণ করেছে, আর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষার যোগাযোগ সেখানে ঘটেছে। আবার কল্পনাপ্রসূত রূপকথাও সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে।
প্রকাশক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ। যে তিনি এই গ্রন্থের গুরুত্ব অনুধাবন করে বইটি প্রকাশের জন্য রাজি হয়েছেন। বাংলা ভাষায় এই বইটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি বলেই তাঁর মনে হয়েছে। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
কাজের দোষত্রুটির দায়িত্ব আমার।
গ্রন্থটি পাঠকের ভালো বোধ হলে এবং সংগ্রহযোগ্য মনে হলে কৃতজ্ঞ বোধ করব।
নির্বেদ রায়
১ ডিসেম্বর, ২০২১
.
Arrian, Flavis (2nd Century AD), Analasis of Alexander, Loeb Classical Library, Harvard Universi ty Press, 1976
Arrian, Indica, Loeb classical librarg, H.U.P. 1958 ctesias of cnidus (4th Century B.C), R. Itenry’s
Ctesias,1947
Herodotus of Halicarnassus, Histories, Loeb
Classical library, Harvard University Press, 1960. Megasthenes (350-290 BC.), Indica. fragments
Collected by Jacoby, pp. 603-639
Nearchus of Crete (4th Century B.C), An article on Gold-digging ants, to be found in Strabo.
Strabo (64 B.C-21A.D), Geography, the geography of strbo, loeb Classicul library, Cambridge Mss,
Harvard uiniversity Press, 1960.
Thucydides (5th Century B.C), Histories, loeb Classical library, Harvard University Press, 1962 Schiern, trederick, ‘The tradition of the Gold-Digging Ants’, ‘translated by Anna M.H. Childerss in the indian Antiquary (Aug 4, 1875) pp 225-232
Wilson, Horace Hayman, The Hindu History of Kashmir,
Asiatick Researches, pp 1-119
Woodcock, george, The Greeks in India, Faber and Faber, London, 1966
Nichols (A.), tranol. Ctesias . On India and fragmels of this minor works, London, Bristol Classical press, 2011.
de, Jong (1973), ‘The Discovery of India by the Greeks’,
Asialische Studien,27
The Commerce and Navigaiton of the Erythrean Sea, by J.W. Mcerindle, Calcutta 1879
The Voyage of Nearchus and the Periplus of the Erythrean Sea, translated by W. Vincent, Oxford, 1809.
Schoff, Wilfred Harvey ed. (1912) . The Periplus of the Erythean sea, Travel and Trade in the Indian Ocean by a Merchant of the First Century, New York, Longmans Geen & Co.
Arrian, The Indica, Translated by E. Iliff Robinson, 1933




Leave a Reply