• Skip to main content
  • Skip to header right navigation
  • Skip to site footer

Bangla Library

Read Bengali Books Online (বাংলা বই পড়ুন)

  • Login/Register
  • Account

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – বদরুদ্দীন উমর

লাইব্রেরি » বদরুদ্দীন উমর » ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – বদরুদ্দীন উমর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ
লেখক: বদরুদ্দীন উমরবইয়ের ধরন: প্রবন্ধ ও গবেষণা

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – বদরুদ্দীন উমর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ
বদরুদ্দীন উমর
(প্রথম প্রকাশ জুলাই, ১৯৭৪)

.

উৎসর্গ
সুরাইয়াকে

.

প্রথম প্রকাশের মুখবন্ধ

১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে একটি সংকলন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। এই সংকলনের জন্যে প্রবন্ধ পাঠাতে অনুরুদ্ধ হয়ে আমি ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ নামে একটি ছোট প্রবন্ধ তাঁদেরকে পাঠাই এবং সেটি তাঁদের ‘বিদ্যাসাগর’ নামক সংকলনে প্রকাশিত হয়। যে শিক্ষকরা এই উদ্যোগ নেন তাঁরা সকলেই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর কলকাতায় চলে যান এবং কলকাতাতে অবস্থানকালে তাঁরা সেখানে সংকলনটি আবার প্রকাশ করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আমার উপরোক্ত প্রবন্ধটির একটি সমালোচনা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) পশ্চিম বাঙলা শাখা কর্তৃক পরিচালিত মাসিকপত্র পরিচয়-এর ১৯৭২ সালের শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। আমি উক্ত সমালোচনাটির প্রতিবাদ করে ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে’ নামে একটি প্রবন্ধ পরিচয়-এ পাঠাই এবং পরিচয় কর্তৃপক্ষ সেটি তাঁদের জানুয়ারী, ১৯৭৩ সংখ্যায় (বর্ষ ৪২। সংখ্যা ৫-৬। পৌষ-মাঘ ১৩৭৯) প্রকাশ করেন। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সংকলনে এবং পরিচয়-এ প্রকাশিত প্রবন্ধ দুটি এ বইয়ের পরিশিষ্টে আবার প্রকাশিত হলো।

এরপর বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লেখার জন্য পশ্চিম বাঙলা থেকে প্রকাশিত মাসিক অনীক সম্পাদক আমাকে অনুরোধ করেন। ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ’ শীর্ষক এই রচনাটি অনীক পত্রিকায় ১৯৭৩ সালের শারদীয়া সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে ১৯৭৪ সালের মার্চ সংখ্যায় শেষ হয়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন সম্পর্কে ১৯৭০ সালে পশ্চিম বাঙলায় এক তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। শুধু বিদ্যাসাগরই নয়, রবীন্দ্রনাথ, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং অন্যান্য আরও অনেক প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিকদের মূল্যায়ন নিয়ে এই বিতর্ক একটা ব্যাপক আন্দোলনের আকার ধারণ করে। এই আন্দোলনের এক প্রান্তে থাকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিকে অবতার হিসেবে খাড়া করার স্থূল ও হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা এবং অন্য প্রান্তে থাকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের প্রস্তরমূর্তি চূর্ণ করে জনগণের অন্তরে এবং সাংস্কৃতিক চেতনায় তাঁদের ভাবমূর্তি চূর্ণ করার এক স্থূল এবং বিভ্রান্তিকর প্রচেষ্টা।

পশ্চিম বাঙলায় নক্সালবাড়ী আন্দোলনের মুখপত্র দেশব্রতীতে সরোজ দত্ত তাঁদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মসূচী হিসেবে যখন সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এক সন্ত্রাসবাদী ও নৈরাজ্যিক আন্দোলনের তত্ত্বকথা শোনাচ্ছেন, আমি তখন ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গণশক্তি সম্পাদনা করছি। নক্সালবাড়ী আন্দোলনের ঢেউ তখন পূর্ব বাঙলায় এসে গেছে। শুধু এসে গেছে নয়। একের পর এক ঢেউ এসে পূর্ব বাঙলার রাজনীতিক্ষেত্রে তখন আছাড় খাচ্ছে এবং পূর্ব বাঙলার মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী পার্টি চারু মজুমদারের লাইনকেই সঠিক মনে করে রাজনীতিকে সেই অনুযায়ী সংগঠিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে।

চারু মজুমদার ও সরোজ দত্তের নেতৃত্বে তথাকথিত এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কোনই তাৎপর্য অথবা প্রাসঙ্গিকতা আমাদের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ছিলো না। কিন্তু তবু এখানে যান্ত্রিক চিন্তার বশবর্তী হয়ে কিছু ব্যক্তি সেই আন্দোলনকে এখানেও জারী করার চেষ্টা করেন। সেই চেষ্টাকে আমরা অবশ্য প্রতিহত করি।

রবীন্দ্রনাথের বইপত্র, সঙ্গীত ইত্যাদির বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার এবং তাদের মুসলিম লীগ ও জামাতপন্থী সমর্থকরা যে সাম্প্রদায়িক জিগীর তুলেছিলো তার বিরুদ্ধে এখানকার গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ ১৯৫৭ সালে জোর প্রতিবাদ এবং আন্দোলন করেছিলো। সেই আন্দোলনের চাপে সরকার তাদের নীতি অনেকখানি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলো এবং ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে কতকগুলি পুস্তক বাজেয়াপ্তকরণের নোটিশ জারী ব্যতীত আর কোন বড় রকমের নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিতে তারা সাহস করেনি। চারু মজুমদার ও সরোজ দত্তের ‘সাংস্কৃতিক’ আন্দোলন পূর্ব বাঙলায় সে সময় জারী হলে তা যে সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহ এবং পাকিস্তান সরকারের হাতিয়ারে পরিণত হতো সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, সেই আন্দোলন বাস্তবতঃ পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অঙ্গীভূত হয়ে যেতো।

এ জন্যে গণশক্তিকে আমরা সেই ধরনের কোন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মুখপত্র হতে দিইনি। কিন্তু শুধু যে সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির শক্তিবৃদ্ধির আশঙ্কাতেই আমরা তা করিনি, তাই নয়। আমরা পশ্চিম বাঙলার সেই তথাকথিত বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে মার্ক্সবাদ বিরোধী, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর পরিপন্থী, সন্ত্রাসবাদী এবং সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বলেই বিবেচনা করেছিলাম।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বর্তমান আলোচনার দুটি উদ্দেশ্য। প্রথমতঃ মার্ক্সবাদী তত্ত্বের ভিত্তিতে ও মার্ক্সবাদী পদ্ধতিতে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটা সংক্ষিপ্ত সামগ্রিক মূল্যায়ন করা এবং তার মাধ্যমে এই ধরনের কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, সমাজ সংস্কারকদের মূল্যায়ন কিভাবে করা দরকার সেটা বোঝার চেষ্টা করা।

দ্বিতীয়ত, ঊনিশ শতকের সামাজিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত নানান সামাজিক চিন্তা ও সংস্কার আন্দোলন এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন কিভাবে মধ্যশ্রেণীর চিন্তাকে গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করে পরিশেষে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে নিজের প্রভাবকে ছড়িয়ে দিয়েছিলো সেই প্রক্রিয়াটিকেও বোঝার চেষ্টা করা। অর্থাৎ ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক মূল কোথায় নিহিত তার অনুসন্ধান করা।

এ কাজ অতিশয় দুরূহ এবং যথেষ্ট সতর্কতা ও পরিশ্রম সাপেক্ষ। বর্তমান রচনায় খুব বিস্তৃতভাবে কোন আলোচনা করা হয়নি। এ বিষয়ে চিন্তার সূত্রকে সংক্ষিপ্তভাবে নির্দেশ করা হয়েছে মাত্র।

সুবিধাবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, বামপন্থী তত্ত্ববাগীশতা, সন্ত্রাসবাদ ও পেটি বুর্জোয়া বিপ্লববাদের প্রভাবকে নির্মূল ও দূরীভূত করে এদেশে এখনো পর্যন্ত একটি সঠিক কমিউনিস্ট পার্টি এতদিনেও কেন গড়ে উঠতে পারলো না, তার সঠিক কারণ নির্ণয় ও নির্ধারণ সমগ্র ভারত ও বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহাসিক মূল উদ্ঘাটন করে তার সাথে সম্যকভাবে পরিচিত না হলে সম্ভব নয়। এদিক দিয়ে বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম! আশা করি এই গুরুত্ব অনুধাবন করে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের সাথে উপযুক্তভাবে পরিচিত এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সঠিকভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্য প্রণোদিত পণ্ডিত ব্যক্তিরা এ সম্পর্কে আরও বিশদ ও তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা করবেন।

বদরুদ্দীন উমর
ঢাকা
২৬. ৬. ১৯৭8

.

দ্বিতীয় ভারতীয় সংস্করণের মুখবন্ধ

১৯৮০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ-এর প্রথম ভারতীয় সংস্করণ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিম বাঙলার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেসব সমালোচনা হয়েছে তার কয়েকটি আমি দেখেছি। এইসব সমালোচনার মধ্যে কয়েকটি হলো রীতিমতো দক্ষিণপন্থী। ঠিক এ কারণেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ঊনিশ শতকের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির শ্রেণীচরিত্র এবং তাঁদের শ্রেণী সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যে কোন উল্লেখ এই সমালোচকদের নিতান্তই অপছন্দ। অথচ উপরোক্ত ব্যক্তিদের শ্রেণীচরিত্র ও তাঁদের শ্রেণী সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন বাদ দিয়ে ঊনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দেলনের কোন সঠিক অধ্যয়ন ও মূল্যায়ন সম্ভব নয় সে কথা বলাই বাহুল্য।

গোর্কী বলেছিলেন, ‘অতীত সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা অর্থহীন। অতীতকে অধ্যয়ন করতে হবে।’ এই অধ্যয়ন করার ব্যাপারটি সঠিকভাবে করতে হলে ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের শ্রেণীচরিত্রের ও তাঁদের শ্রেণী সীমাবদ্ধতার আন্দোলন ব্যতীত তা সম্ভব নয়। ঊনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঠিক অধ্যয়ন ও মূল্যায়ন সম্পর্কেও এ কথা সত্য।

কিন্তু মুশকিল হলো এই যে, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রভৃতি ঊনিশ শতকীয় ব্যক্তিদের শ্রেণীচরিত্র নির্দিষ্ট করে তাঁদের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করতে গেলেই এক ধরনের সমালোচকরা মনে করেন যে, উপরোক্ত ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘অভিযোগ’ উত্থাপন করা হচ্ছে। সমালোচকদের এই ‘অভিযোগ সচেতনতা’ সমালোচনার ক্ষেত্রে, যে কোন সঠিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক দূরতিক্রম্য মানসিক প্রতিবন্ধক। ভারতীয় একটি সাম্যবাদী দলের বাঙলা মুখপত্র থেকে শুরু করে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত বইটির সমালোচনা আপাতদৃষ্টিতে যতই পৃথক মনে হোক আসলে সেগুলি সবই হলো দক্ষিণপন্থী সমালোচনা, যে সমালোচনার মূল লক্ষ্য ঊনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের নেতাদের শ্রেণীচরিত্র আড়াল করা, তাঁদের এমনভাবে উপস্থিত করা যেন তাঁরা শ্রেণী সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং নিজেদের যুগে তাঁরা যা করে গেছেন সেটাই সেই যুগের সীমাবদ্ধতার সর্বোচ্চ শিখর।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রত্যেক যুগেরই নিজস্ব অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে যা কারও পক্ষে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, প্রত্যেক যুগে শ্রেণী সীমাবদ্ধতা বলেও একটা জিনিস আছে এবং নিজের শ্রেণী অবস্থান বজায় রেখে কেউই সীমাবদ্ধতা উত্তীর্ণ হতে পারেন না। ওপরে যে সমালোচকদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাঁদের সমালোচনার একটি কৌশল হলো, যুগের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি এমনভাবে উপস্থিত করা যাতে শ্রেণী সীমাবদ্ধতা বলতে আর কোন কিছু থাকে না। শুধু তাই নয়, যুগের সীমাবদ্ধতার প্রশ্নটি তোলার অর্থই হয় সেই যুগ এবং যুগের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা! প্রথম সংস্করণের পরিশিষ্টে পরিচয়-এ প্রকাশিত একটি সমালোচনার জবাবে এই ধরনের ‘অভিযোগ’ সম্পর্কে উল্লেখ করেছি। সম্প্রতি যে কয়টি সমালোচনা আমি দেখেছি তার সবগুলি সম্পর্কে এই মুখবন্ধে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবে আনন্দবাজার পত্রিকায় অশোক রুদ্র ‘শতাব্দীর বিচার’ নামে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ-এর যে সমালোচনা করেছেন, সে বিষয়ে দুই একটি কথা এখানে বলা দরকার।

নিজেকে একজন প্রগতিশীল ও নিরপেক্ষ সমালোচক হিসেবে উপস্থিত করার চেষ্টা করলেও অশোক রুদ্র যে সমালোচনা বস্তুতঃপক্ষে করেছেন তার দক্ষিণপন্থী চরিত্র খুব স্পষ্ট। কিছু কিছু ঐতিহাসিক পাণ্ডিত্য পরিবেশন করতে গিয়ে তাঁর পাণ্ডিত্যের যে পদঙ্খলন ঘটেছে তার দুই একটি উদাহরণ আমি আমার জবাবে উল্লেখ করেছি এবং এখানে তার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে উল্লেখ না করে পারছি না, কারণ এর মধ্যে তাঁর নিজের শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণী অবস্থান খুব স্পষ্টভাবেই ব্যক্ত হয়েছে।

আমার আলোচ্য বইটি আসলে বাঙলাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উপরিকাঠামো সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা। তাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উল্লেখ আমাকে বারবার প্রসঙ্গত করতে হয়েছে। আমি তাই একটু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিষয়টি ঊনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের নেতাদের কীর্তি আলোচনার সময় উল্লেখ করাতে অশোক রুদ্র রীতিমতো রুষ্ঠ হয়েছেন। এমনভাবে রুষ্ঠ হয়েছেন যেন সেই যুগে বা তৎকালে অর্থাৎ ঊনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এক নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক এবং অযোগ্য ব্যাপার! তাই তিনি বলেছেন, “মুশকিল হচ্ছে এই যে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিচারে যাঁরা বসেন তাঁদের প্রাক্ বৃটিশ ভারতীয় সমাজ-ব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তার ঘরে রয়েছে এক বিরাট শূন্য। এঁদের অনেকের সমালোচনা থেকে মনে হয় যেন ইতিহাস শুরুই হয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে, তার আগে কিছুই ছিল না।” নিজের পাণ্ডিত্য এবং অন্যের মূর্খতা সম্পর্কে এই মন্তব্যের পর তিনি আরও বলছেন, “ফলে যে কোন জিনিসের ব্যাখ্যাই চাওয়া হোক, তাঁদের উত্তর সর্বদাই এক ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত”। বাঙালী মধ্যবিত্ত কেন ছিল বৃটিশ শাসন বিরোধিতায় বিমুখ? চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। কেন সেই জাতীয়তাবাদ ছিল ‘সাম্প্রদায়িক হলাহল পরিপূর্ণ?’ আবারও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। ঐ সময়ে জাতীয়তাবাদ পরবর্তীকালে যে সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয় তার মূলে কি ছিল? অবশ্যই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।”

অশোক রুদ্রের এইসব উক্তি সম্পর্কে আমি আমার জবাবে সংক্ষিপ্তভাবে আমার মত প্ৰকাশ করেছি। এখানে শুধু এটুকুই উল্লেখ করা দরকার যে, যে কোন যুগের বা কালের সম্পর্কে আলোচনার জন্য সেই যুগ বা কালের পূর্ব ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, একটি যুগ বা কালের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমির অপেক্ষা তার অতীতের গুরুত্ব তুলনায় অধিক এবং সেই অতীতের ব্যাখ্যা ব্যতীত নির্দিষ্ট কোন যুগ বা কালের উপর আলোচনা সঠিক ও গ্রাহ্য হওয়া অসম্ভব। যে কোন বিষয়ের ওপর আলোচনা করতে হলে তার অতীত সম্পর্কে জ্ঞান সেই বিষয় অধ্যয়ন ও বোঝার পক্ষে প্রয়োজনীয় । কিন্তু তার অর্থ আবার এই নয় যে, ঊনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনাকে ভারতে পৌরাণিক যুগের সমাজ-ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তভাবে আলোচনা করা ব্যতীত এই ধরনের কোন আলোচনা অর্থবহ নয়। তাই কোন নির্দিষ্ট যুগ বা কালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পর্কিত আলোচনাকে তৎকালীন অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর ‘অপরোধে’ আমরা যতই অপরাধী হই তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পূর্বেও যে এ দেশের একটা ইতিহাস ছিলো যে কথা আমাদের সকলেরই অজানা!

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পর্কে এই স্পর্শকাতরতা যে দক্ষিণপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতারই একটি প্রতিফলন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সমালোচনার ক্ষেত্রে শ্রেণী প্ৰশ্নকে উহ্য রাখাই এর মূল লক্ষ্য।

যে কোন মানব সমাজে যুগের সীমাবদ্ধতা যেমন সত্য, তেমনই সত্য শ্ৰেণী সীমাবদ্ধতা। এ দুই-ই অধ্যয়ন ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। তাই একটিকে বাদ দিয়ে অপরটি করতে যাওয়ার অর্থ সত্য থেকে সরে যাওয়া। যুগের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে শুধু শ্রেণী সীমাবদ্ধতার ওপর গুরুত্ব আরোপ হলো বামপন্থী বিচ্যুতি যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ সরোজ দত্ত ও চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন সাংস্কৃতিক আন্দোলন। অন্যদিকে যুগের সীমাবদ্ধতার কথা বলে শ্রেণী সীমাবদ্ধতার বিষয়টিকে অস্বীকার করার অর্থ হলো দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ধুরন্ধরপনা, যা কিনা আনন্দবাজার মার্কা সমালোচনার চিহ্নিত বৈশিষ্ট্য।

এ ক্ষেত্রে আনন্দবাজার পত্রিকায় আমার যে জবাব ২২.৭.১৯৮১ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিলো সে বিষয়ে কিছু বলা দরকার। আমার জবাবটির নাম আমি দিয়েছিলাম ‘শতাব্দীর বিচার প্রসঙ্গে’। আনন্দবাজার তা পরিবর্তিত করে ছেপেছিল ‘শতাব্দীর বিচার না অবিচার?”–এই নামে। তাছাড়া আমার জবাবটি পুরো প্রকাশ করেননি। মধ্যে মধ্যে কিছু অংশ তাঁরা বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু এইভাবে বাদ পড়া অংশের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অংশ আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক বাদ দেওয়ার মধ্যে চিন্তাধারার অন্তনির্হিত ঐক্য নিশ্চয়ই একটি লক্ষণীয় ব্যাপার।

‘শতাব্দীর বিচার প্রসঙ্গে’ শীর্ষক যে জবাবটি আমি আনন্দবাজার পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম সেটি এই দ্বিতীয় সংস্করণের পরিশিষ্ট অংশে সংযোজিত হলো।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ-এর প্রথম ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিম বাঙলার প্রগতিশীল পাঠক সমাজ যে আগ্রহের সঙ্গে বইটি পড়েছেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁদের যে সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে তার মাধ্যমে আসলে আমাদের অতীতকে বোঝার আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে। এই আগ্রহ নিঃসন্দেহে বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই উদ্ভূত। এ দিক দিয়ে বাঙলাদেশের ও পশ্চিম বাঙলার প্রগতিশীল পাঠকদের চিন্তাধারার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

বইটির প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হওয়ার পর এখন দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। এ জন্য আমি চিরায়ত প্রকাশন প্রাইভেট লিমিটেড এবং বিশেষভাবে ভাস্কর মুখোপাধ্যায় ও শিব্রত গঙ্গোপাধ্যায়-এর কাছে কৃতজ্ঞ।

বদরুদ্দীন উমর
ঢাকা
৩০ শে ডিসেম্বর, ১৯৮১

Book Content

ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – ১
ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – ৫
ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – ১০
ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – ১৫
ঊনিশ শতকের বাঙালী সমাজ – ২০
পরিশিষ্ট ১ – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
পরিশিষ্ট ২ – ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে
পরিশিষ্ট ৩ – ‘শতাব্দীর বিচার’ প্রসঙ্গে
সংস্কৃতির সংকট - বদরুদ্দীন উমর

সংস্কৃতির সংকট – বদরুদ্দীন উমর

যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ

যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ – বদরুদ্দীন উমর

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক - বদরুদ্দীন উমর

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক – বদরুদ্দীন উমর

পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (দ্বিতীয় খণ্ড) - বদরুদ্দীন উমর

পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি ২ – বদরুদ্দীন উমর

Reader Interactions

Comments

  1. Mehabub hossain Robin

    September 9, 2025 at 5:16 am

    Good

    Reply

Leave a Reply Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লেখক

সিরিজ

বইয়ের ধরণ

বাংলা ডিকশনারি

বাংলা জোক্স

বাংলা লিরিক্স

বাংলা রেসিপি

বিবিধ রচনা

বাংলা হেলথ টিপস

Download PDF


My Account

Facebook

top↑

Login
Accessing this book requires a login. Please enter your credentials below!

Continue with Google
Lost Your Password?
এভারগ্রিন বাংলা লোগো
Register
Don't have an account? Register one!
Register an Account

Continue with Google

Registration confirmation will be emailed to you.