৩. বিজলীবাবুর বাড়ি

১১.

বিজলীবাবুর বাড়ির সামনে এসে হর্ন দিল অবনী। আজ হাটবার, বিজলীবাবুর বাড়ির পেছন দিকে মস্ত মাঠ, ওই মাঠে হাট বসে; মাঠের পশ্চিম দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। দশারা গেছে পরশু, তবু হাটের কাছাকাছি বলে দশারার মেলাটা হাটের ওপর এখনও ছড়ানো-ছিটোনো রয়েছে, পেট্রম্যাক্স আর কার্বাইডের আলো চোখে পড়ে, নাকে ভেসে আসে শুকনো শালপাতার আর রেড়ি কিংবা তিল তেলের গন্ধ, কলরব এখনও কানে আসে।

অবনী আরও একবার হর্ন দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। বিজলীবাবুর বাড়ির কুয়ালার কাছে বাগান দিয়ে একটা বউ অন্দরে চলে গেল। অবনী তাকে দেখতে পেল, চিনতেও পারল; বিজলীবাবুর দ্বিতীয় স্ত্রী, ছোট বউ।

বিজলীবাবুর প্রথম স্ত্রী অন্তঃপুরবাসিনী, কদাচিৎ তাঁকে বাইরে দেখা যায়; দ্বিতীয় অতটা নয়, অবনী তাঁকে অনেকবার দেখেছে। বড় থাকেন সংসার আর ধর্মকর্ম নিয়ে, ছোট থাকেন সংসার আর স্বামী নিয়ে। বাইরে থেকে মনে হয় বিজলীবাবুর সংসার ছোট–তিনজন মাত্র লোক, আসলে সংসার আরও বড়; বাস-অফিসের জনা দুই এই সংসারেরই অন্ন খায়, একটি ছেলেকে বিজলীবাবু নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, বাঙালির ছেলে, স্কুলে পড়ে; এর ওপরেও প্রায়ই শহর থেকে বিজলীবাবুর চেনাজানা কেউ না কেউ কাজেকর্মে এসে তাঁর বাড়িতে ওঠে। বাস-অফিসের ম্যানেজারিতে এত বড় সংসার চলে না, বাবা বেঁচে থাকতেই কিছু জমি জায়গা করেছিলেন, সেই জমি জায়গা বিজলীবাবু বেশ কিছু বাড়িয়েছেন, বাজারের দিকে গোটা দুই ভাড়া বাড়ি আছে, সব মিলিয়ে মিশিয়ে সচ্ছল ভাবেই চলে যায়।

কাঠের ফটক, সামান্য কটা গাছপালা, সিঁড়ি কয়েক ধাপ-তারপরই ঢাকা বারান্দা। খোলা দরজা দিয়ে বিজলীবাবু বাইরে এলেন,হাত তুলে বললেন, আসছিদুমিনিট। বিজলীবাবুআবার ভেতরে ঢুকে গেলেন।

অবনী সামনেটায় পায়চারি করতে করতে সিগারেট ধরাল। সন্ধে হয়ে এল, হাটের দিক থেকে গুঞ্জন ভেসে আসছে, কোথাও কে যেন ঢোল পিটছে, বোধহয় ধোপপট্টিতে। রেল লাইনের দিক থেকে গুরুগুরু শব্দ উঠেছে, মালগাড়ি আসছে হয়তো। অবনী বারান্দার দিকে তাকাল, পুবের ঘরে বাতি জ্বালল, শাঁখ বাজছে, জানলায় বিজলীবাবুর ছোট বউ।

বিজলীবাবুর মুখেই অবনী শুনেছে, তাঁর দুই স্ত্রী সহোদরা ভগিনী। বড় এবং ঘোটর মধ্যে বয়সের তফাত বছর পাঁচেকের। দুজনেরই মুখের আদল গড়ন-টড়ন একই রকমের প্রায়, তবে ছোট যেন বড়োর চেয়ে সুশ্রী, গায়ের রংও মাজা। অবনী নিজে যেটুকু দেখেছে তাতে তার মনে হয়েছে, হোটর সমস্ত মুখের মধ্যে চমৎকার একটি প্রসন্ন ভাব আছে, বেশ হাসিখুশি, বিজলীবাবুর যোগ্য স্ত্রী। বড় একেবারে বর্ষীয়সী গৃহিণী শান্ত, গম্ভীর। বিজলীবাবু, অবনীর ধারণা, বড়কে খাতির করেন বেশি, ভালবাসেন ছোটকে বেশি। বড়র জীবনে স্বামী এখন সঙ্গী নয়, গৃহকর্তা বা অভিভাবক। বিজলীবাবুর কাছে শোনা, বড় আলাদা ঘরে থাকেন, পুজোআচা করেন, সংসারের দায় বয়ে বেড়ান। ছোটও সংসার নিয়ে থাকেন, তবু তাঁর সঙ্গে স্বামীর শোয়াবসা হাসিঠাট্টার সম্পর্কটা আছে। বিজলীবাবু বলেন, মিত্তিরসাহেব, আমার দুদিকে দুই কলাগাছ আমি শালা মহারাজ। আমার বড়টি হল গিয়ে নারায়ণের লক্ষ্মী, আর ছোটটি হল আমার মেনকা-টেনকা। …আমি ভাগ্যবান পুরুষ।

অবনী সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিয়ে মনে মনে হাসল। ততক্ষণে বিজলীবাবু বেরিয়ে এসেছেন।

 বিজলীবাবুর হাতে একটা টিফিন কেরিয়ার, কাঁধে বড় সাইজের ফ্লাস্ক।

অবনী অবাক হয়ে বলল, এসব কী?

টিফিন কেরিয়ারটা হাতে করে তুলে দেখিয়ে বিজলীবাবু বললেন, এটা সুরেশ মহারাজের। বাড়ি থেকে দিয়ে দিল। বলে হাতটা নামালেন বিজলীবাবু, মিষ্টি-ফিষ্টি পায়েস আছে। …আর এইটে– বিজলীবাবু ফ্লাস্ক দেখিয়ে এক চোখ টিপে হাসলেন, আমাদের। পথে তেষ্টা-টেষ্ঠা পাবে তো৷

অবনী জোরে হেসে উঠল। ওটাও কি বাড়ি থেকে দিয়েছে?

তাই কি দেয়, মিত্তিরসাহেব। …এর জন্যেই দেরি হয়ে গেল। কত হাইড অ্যান্ড সিক করে তবে মিশিয়ে-ফিশিয়ে আনলুম।

আপনার হাইড অ্যান্ড সিক আছে নাকি? অবনী হাসছিল।

না, তা নেই। তবে দেবতা বুঝে প্রণামী। যাচ্ছি সুরেশ-মহারাজার কাছে–এ-জিনিস তো নিয়ে যাওয়া যায় না, তার ওপর গাড়ি করে রাত্তির বেলায় আসা-যাওয়া–মদ্য নিয়ে যাচ্ছি জানলে বউ কি আর আস্ত রাখত।

গাড়িতে এসে বসল দুজনে। বিজলীবাবু পিছনের সিটে টিফিন কেরিয়ারটা ঠিক করে রাখলেন, সাবধানে; ফ্লাস্কটা তাঁর পাশেই থাকল।

জিপগাড়িতে স্টার্ট দিল অবনী। ঠাট্টা করে বলল, একজনকে না হয় লুকোলেন, অন্যজন? তিনি কী বললেন?

তিনিও খুশি নন। বললাম, এক পোয়া জিনিসের সঙ্গে পাঁচ পো জল মিশিয়েছি গো, এই খেয়ে নেশা হবে না; কোনও ভয় নেই–অপঘাতে মরব না।

অবনী হাসতে লাগল। গাড়ি চলতে শুরু করেছিল।

বিজলীবাবু পান চিবোচ্ছিলেন। অবনীর আজ অন্য পোশাক। ধুতি পাঞ্জাবি। দশমীর দিন ভেঙেছিল। পাঞ্জাবি পাজামা অবশ্য বাড়িতে পরে, ধুতি আর পরা হয়ে ওঠে না। কলকাতায় থাকতে তবু মাঝে মাঝে পরা হত, এখানে এসে একেবারেই হয় না। নিতান্ত বিজয়ার দিন লোকজন আসে বাড়িতে, দু-এক জায়গায় তাকেও যেতে হয় তাই এই ধুতি।

ম্যালেরিয়া কনট্রোলের অফিস পেরিয়ে গাড়ি টাউনের রাস্তা ধরল। বিজলীবাবু সিগারেট বের করলেন, আসুন, মিত্তিরসাহেব।

পরে; আপনি নিন।

 বিজলীবাবু সিগারেট ধরিয়ে নিলেন।

বাড়ি প্রায় শেষ হয়ে এল, মাঠের কোলে সন্ধের আবছা ভাবটা গাঢ় হয়ে এসেছে। তারই গায়ে গায়ে জ্যোৎস্না ধরছে। শুকনো ঠাণ্ডা বাতাস, দুপাশে গাছের মাথায় এখনও পাখির ঝাঁক উড়ে উড়ে বসছিল, কলরব ভাসছে। বিজলীবাবু পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে টিফিন কেরিয়ারটা ঠিক করতে লাগলেন। গাড়ির ঝাঁকুনিতে নড়ছিল, উলটে যেতে পারে।

অবনী বলল, আপনার স্ত্রী সুরেশমহারাজের খুব ভক্ত, না বিজলীবাবু?

তা খাতির-টাতির করে বই কি! মেয়েদের দুটো রোগ আকচার থাকে, মিত্তির সাহেব; এক, হিস্টিরিয়া আর দুই হল গিয়ে ওই আইবুড়ো সাধু-সন্নেসী মহারাজ-টহারাজের ওপর ভক্তি।

অবনী হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, টিফিন কেরিয়ার দেখে তাই মনে হচ্ছে।

 বিজলীবাবু জবাব দিলেন, এ যা দেখছেন সমস্তই আমার বড় গিন্নির। ছোটও দলে আছে, তবে অতটা নয়। …বুঝলেন মিত্তিরসাহেব, সুরেশ-মহারাজ যখন এদিকে থাকতেন তখন মাঝে মধ্যে আমার বাড়িতে আসতেন, এক-আধদিন তুলসী রামায়ণও গেয়ে শুনিয়েছেন অল্পস্বল্প। বড় গিন্নির তখন থেকেই সুরেশ-মহারাজের ওপর একটু টান।

আপনার নিজেরও বেশ টান…।

আমার! ..আমার কী টান থাকবে। উনি হলেন নিরামিষ মানুষ, আমরা হলুম আমিষ ব্যক্তি। চরিত্তই আলাদা। বিজলীবাবু হেসে হেসে বললেন।

অবনী গাড়ি চালাতে চালাতে ঘাড় বেঁকিয়ে বিজলীবাবুকে একবার দেখল। তারপর বলল, আপনি সুরেশ-মহারাজকে পাঁচশো টাকা দিয়েছিলেন?

বিজলীবাবু যেন হঠাৎ কেমন হয়ে গেলেন, চোখের পাতা পড়ল না, মুখ ফিরিয়ে অবনীকে বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখছিলেন।

শেষে বললেন, কে বলল?

আপনার সুরেশ-মহারাজ।

 বিজলীবাবু যেন সামান্য বিব্রত এবং অপ্রস্তুত বোধ করছিলেন। কথাটা স্বীকার করতে তাঁর অদ্ভুত কুণ্ঠা জাগছিল। সরাসরি কোনও জবাব না দিয়ে ঘুরিয়ে বললেন, কবে বললেন?

বলছিলেন একদিন কথায় কথায়।

কথাটা ঠিক নয়– বিজলীবাবু জবাব দিলেন, তারপর সামান্য চুপচাপ থেকে যেন অবনীকে বোঝাচ্ছেন এইভাবে বললেন, টাকাটা আমি ঠিক দিইনি, আর পাঁচশো টাকা আমি পাবই বা কোথায়, গরিব মানুষ। উনি ভুল বলেছেন।

ভুল অবনী কৌতুক করে বলল।

বিজলীবাবু যেন রীতিমতো অকুলে পড়ে গেছেন। বললেন, ব্যাপারটা কী জানেন মিত্তিরসাহেব, একবার সুরেশ-মহারাজ যখন আশ্রমের কাজে হাত দিয়েছেন তখন তাঁর হঠাৎ একদিন টাকার খুব দরকার হয়ে পড়ে। দেশের দিকে বোধহয় ওঁর কিছু সম্পত্তিটম্পত্তি বেচা-কেনার কথা চলছিল, টাকাটা সময় মতন পাননি। এখানে এসেছিলেন টাকা হাওলাত করতে। আমার সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল, আমাকে বলেছিলেন কোনও মাড়োয়াড়ি মহাজনের কাছে নিয়ে যেতে। তা আমি দেখলাম, মাড়োয়ারি মহাজনের কাছে টাকা হাওলাত করাটা ওঁর পক্ষে ভাল দেখায় না। তা ছাড়া আমি থাকব সঙ্গে, মাড়োয়ারিগুলোই বা বলবে কী। ভাববে আমি বাঙালি হয়েও নিজের মুলুকের আদমি-কে পাঁচশোটা টাকা জোগাড় করে দিতে পারলাম না। ইজ্জতে লাগল…। তা ছাড়া এখানকার মাড়োয়ারিদের সঙ্গে আমার এমনি যে খুব দহরম-মহরম, সে মুখে, ভেতরে ভেতরে রেষারেষি। সে অনেক পুরনো ব্যাপার মিত্তিরসাহেব, বাস-টাস, বাজারের বাড়ি-নানারকম ব্যাপার আছে। …তা আমি পড়ে গেলাম প্যাঁচে। কী করি! তখন আমি সুরেশ-মহারাজকে তিনশো টাকা ধার দি৷ আর বাকি দুশো টাকা দিয়েছিল আমার বড় পরিবার। আমার মুখে শুনেছিল, শুনে দিয়েছিল। ওটা তার ব্যাপার।

অবনী কোনও কথা বলল না। উলটো দিক থেকে একটা লরি আসছে বোধহয়, এত জোরালো আলো যে অবনীর চোখে লাগছিল, নিজের গাড়িটাকে রাস্তার একপাশে সরিয়ে নিল।

বিজলীবাবু নিজের থেকেই বললেন,  সুরেশ-মহারাজ কিন্তু তার পরই টাকাটা শোধ করে দিতে চেয়েছিলেন, হাতে টাকা এসে গিয়েছিল। তা আমি তখন টাকাটা নিইনি। বলেছিলাম, এখন থাক; পরে দরকার পড়লে নেব। …তারপরও উনি অনেকবার বলেছেন, আমি নিইনি। এক সময় নিলেই হবে।

লরিটা একেবারে সামনাসামনি, অবনী সাবধানে পাশ কাটিয়ে নিল। সামনে ফাঁকা রাস্তা, দুপাশে ক্ষেতি, দ্বাদশীর চাঁদের আলো বেশ ফুটতে শুরু করেছে।

অবনী এবার একটা সিগারেট ধরাল। বলল, আপনি যতই বলুন, সুরেশ-মহারাজের ওপর আপনার বেশ টান আছে। হেসে হেসেই বলল।

বিজলীবাবুও হেসে বললেন, টান বলবেন না, বলুন খাতির। তা মহারাজ মানুষ, একটু খাতির যত্ন করলে চলে! ..আমার সঙ্গে ওঁর দেখাসাক্ষাতই বা আজকাল কতটুকু হয় যে মেলামেশা থাকবে।

লোকটিকে আপনি পছন্দ করেন।

পছন্দ! ..তা করি। …ব্যাপারটা কী জানেন মিত্তিরসাহেব, আমি তত বেশি কিছু বুঝি না, মুখ মানুষ, কিন্তু একটা জিনিস বেশ বুঝি। সংসারে আমরা আমাদের মতন মানুষ যারা–তারা যে যার নিজের তল্পি নিয়ে আছি। নিজের ভাবনা ভাবতে ভাবতেই আমাদের চোখ বুজতে হয়। সুরেশ মহারাজার-টহারাজের মতন লোক তবু দুটো কাজ করেন। আমরা কিছুই করি না।

অবনী শুনল। সামনে একটা ঢাল, গিয়ার বদলে নিল গাড়ির। হেসে বলল, এ-সব লোক সম্পর্কে আপনার ওমর খৈয়াম কী বলেন?

বিজলীবাবু সঙ্গে সঙ্গে কোনও জবাব দিলেন না, পরে বললেন, জানি না মিত্তিরসাহেব, তবে আমার মনে হয় ওঁরা হলেন অন্য ধরনের মানুষ–কেউ তো তারা ছোঁয় না সুরা, যেমন তেমন লোকের সাথে; সুযোগ পেলেই সব আসরে, পাত্র তাঁরা নেন না হাতে।

সামান্য চুপ থেকে অবনী পরিহাস করে বলল, তা আমাদের সঙ্গে পাত্র না নিন, পাত্র তো হাতে তুলে ধরেন। কোন আসরে ধরেন?

সে ওঁদের আলাদা আসর– বিজলীবাবুও হেসে বললেন, তবে পাত্র ওঁরা ধরেন। নেশায় না ডুবলে কেউ কাজ করতে পারে না, মিত্তিরসাহেব। মাতাল হতে হয়, সাধারণ জ্ঞানগম্যি নয়তো হারানো যায় না।

অবনী চুপ। আর অল্প মাত্র পথ, লাইটার মোড় এসে গেছে।

 লাঠটার মোড় পৌঁছে গাড়ি ঘুরিয়ে গুরুডিয়ার কাঁচা পথ ধরল অবনী।

বিজলীবাবু বললেন, মিত্তিরসাহেব, আমার তেমন কোনও সিকরেট নেই। যা বুঝি বলে ফেললাম।

অবনী জবাব দিল না। কোথায় যেন তার সামান্য ঈর্ষার মতন লাগছিল, অধম মনে হচ্ছিল নিজেকে। বিজলীবাবুর সঙ্গে তার পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা কম নয়, দিনে দিনে সেটা বাড়ছিল, বিজলীবাবু হয়তো এই ঘনিষ্ঠতাকে সাধারণ পর্যায়ের মনে করেন। অবনী সম্পর্কে তাঁর কোনও শ্রদ্ধা নেই, অনুরাগও হয়তো নেই। অবনীর মনে হল, তার চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে বিজলীবাবুর যে ধারণা তা সম্ভবত মদ্যপানের সঙ্গী হিসেবেই যতটুকু হতে পারে ততটা তার বেশি কিছু নয়।

সুরেশ্বরের সঙ্গে নিজেকে এভাবে তুলনা করেও তার বিরক্তি লাগছিল। বিজলীবাবু তাকে উত্তম অথবা অধম যাই ভাবুন না কেন কী আসে যায়! চিন্তাটা মন থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করল অবনী, এবং ঈষৎ অপ্রসন্নতা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করল না। বরং যথাসম্ভব হালকা গলায় বলল, আপনার সিকরেট নেই বলছেন, কিন্তু একে একে এই সব সিকরেট যে বেরিয়ে পড়ছে, বিজলীবাবু!

বিজলীবাবু বোধহয় লজ্জিত হলেন, মাথা নেড়ে বললেন, না না, এ আর এমনকী সিকরেট।

গুরুডিয়ার কাঁচা রাস্তায় গাড়িটা মাঝে মাঝে লাফিয়ে উঠছিল। বিজলীবাবু পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে টিফিন কেরিয়ারটা দেখলেন, কাত হয়ে পড়ে গেছে, জিবের একটা শব্দ করে হাত বাড়িয়ে টিফিন কেরিয়ারটা সামনে নিজের কাছে নিয়ে নিলেন। সুরেশ-মহারাজা পুজোর মধ্যে আসব বলেও আসেননি। কী হল কে জানে। হয়তো পায়ের ব্যথা বেড়েছে। পুজোমণ্ডপে মালিনীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল বিজলীবাবুর, সে সপ্তমীর দিন সকালে বাড়ি এসেছে, সুরেশ-মহারাজের কথা বলতে পারল না। অপেক্ষায় থেকে থেকে আজ তাঁরা যাচ্ছেন, বিজয়ার দেখা সাক্ষাৎ সেরে আসবেন। বড় বউ কিছু মিষ্টি-টিষ্টি দিয়ে দিয়েছে।

গুরুডিয়ার এই কাঁচা রাস্তায় নেমে দ্বাদশীর জ্যোৎস্না আরও পরিচ্ছন্ন করে দেখা যাচ্ছিল। আদিগন্ত মাঠে নিঃসাড়ে যেন জ্যোৎস্নার স্রোত ভাসছে, হেমন্তের খুব হালকা একটু হিমের অস্পষ্টতা আছে কোথাও, শীতের সামান্য আমেজ লাগছে, চারদিক নিস্তব্ধ; মাঠে পলাশ আর আমলকি ঝোপে জোনাকি জ্বলছে।

বিজলীবাবু বললেন, মিত্তিরসাহেব, একটা কথা তা হলে বলি। আমার সিকরেট আর জানলার পরদা একই জিনিস; বাতাস দিলেই উড়ে যায়, দেখতে কষ্ট হয় না। কিন্তু আপনি হলেন মিস্টিরিয়াস ম্যান। …কদিন ধরেই আপনাকে জিজ্ঞেস করব ভাবছি, কেমন লজ্জা লজ্জা করছে। ..সেদিন আপনাকে জিজ্ঞেস করছিলাম না, একটা চিঠি পেয়েছেন কি না–ঠিকানা পড়া যায় না। আপনি বললেন পেয়েছি।

অবনী মুখ ফিরিয়ে বিজলীবাবুকে দেখল।

বিজলীবাবু হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ললিতা মিত্র কে?

অবনী অসতর্ক হয়ে ব্রেক টিপতে যাচ্ছিল, গাড়িটা কেমন ঝাঁকুনি খেল সামান্য, আবার চলতে লাগল।

চুপচাপ। অবনী কোনও জবাব দিচ্ছে না, বিজলীবাবু অপেক্ষা করে আছেন। আড়ষ্ট সময় পলে পলে বয়ে যাচ্ছে।

কিছু সময় পরে অবনী বলল, আপনি জানলেন কী করে?

মানি অর্ডারের রসিদ দেখলাম।

ও।

পোস্ট অফিসে গিয়েছিলাম সুরেশ-মহারাজের সঙ্গে; রামেশ্বর আমায় চিঠিটা দেখাচ্ছিল, তখনই রসিদটা দেখলাম।

অবনী গাড়ি থামিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ। তারপর হাসবার চেষ্টা করে বলল, আপনার সুরেশ-মহারাজও কি জানেন নাকি?

না, তিনি পোস্ট অফিসের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন।

গাড়িটা আবার চলতে শুরু করল। সামান্য এগিয়ে অবনী বলল, ললিতা এক সময়ে আমার স্ত্রী ছিল।

এক সময়ে?

বছর কয়েক।

 বিজলীবাবু বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বোধহয় বুঝতে পারছিলেন না, এক সময়ে যে স্ত্রী থাকে পরে সে কী হয়। বিব্রত গলায় শুধোলেন, এখন তিনি আপনার স্ত্রী নন?

না।

কী রকম? তাঁকে টাকা পাঠাচ্ছেন…

ওটা একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট। খোরপোষ দিচ্ছি।

ও! আপনি স্ত্রী ত্যাগ করেছেন?

দুজনেই দুজনকে করেছি; পরে একটা ডিভোর্স নিয়ে নেব।

বিজলীবাবু যেন নিশ্বাস বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকলেন। অবনীর চরিত্রটি যেন তিনি দেখবার বা বোঝবার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ঈষৎ আলে পর অন্ধকার যেমন দৃষ্টিকে দিশেহারা করে তেমনি তিনি দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলেন।

ব্যাপারটা পুরনো, আমার আর কোনও ইন্টারেস্ট নেই, অবনী গলা পরিষ্কার করতে করতে বলল। টাকাটা পাঠাতে হয় পাঠাই।

চিঠিটা কার? বিজলীবাবু শুধোলেন।

অবনী নীরব। তার সামনে, পাশে হেমন্তের সাদাটে জ্যোৎস্না; গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ছাড়া শব্দ নেই, মাঠ-ঘাট জুড়ে বুঝি ঝিঁঝি ডাকছে, কানে হঠাৎ এই শব্দটা লাগল। অল্প দূরে আশ্রম, ছায়ার মতন দেখাচ্ছে।

অবনী মৃদু গলায় বলল, আমার মেয়ের।

বিজলীবাবু চমকে উঠলেন, স্ত্রীর কথা শুনে এতটা চমকাননি। আপনার মেয়ে?

অবনী আর কোনও কথা বলল না।

.

বিজলীবাবুর হাঁকডাকের আগেই সুরেশ্বর বেরিয়ে এসেছিল। আরে, আসুন–আসুন! কী সৌভাগ্য।

সৌভাগ্য তো আমাদের মশাই, আপনারা হলেন মহম্মদ, আমরা হলাম পর্বত। আপনি নড়লেন না, তাই আমরা এলাম। বিজলীবাবু সরল রসিকতা করে বললেন, আসুন কোলাকুলিটা সেরে নিই আগে।

কোলাকুলি সারা হল। অবনী হঠাৎ কেমন নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে, অন্যমনস্ক, তেমন কোনও কথাবার্তাও বলল না। বিজলীবাবু টিফিন কেরিয়ারটা সুরেশ্বরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে আরও পাঁচটা হাসিঠাট্টা করলেন।

সুরেশ্বরের বাড়ির ছোট বারান্দাটুকুতেই বসল ওরা। সুরেশ্বর ভরতুকে ডাকতে চলে গিয়েছিল, ফিরে এসে বসল।

পায়ের ব্যথার জন্যে নয়, অন্য কারণে সুরেশ্বর যেতে পারেনি। গোড়ালির ব্যথাটা দু-একদিনের মধ্যেই সেরে গিয়েছিল, কিন্তু অষ্টমীর দিন শেষ রাতে অন্ধকুটিরের এক-পাশের অনেকখানি চাল হঠাৎ কেমন করে যেন ধসে গেল। না, জখম-টখম হয়নি কেউ। পরের দিন ওপাশের সমস্ত খাপরা সরিয়ে, নতুন করে চাল বেঁধে খাপরা-টাপরা বসিয়ে তবে স্বস্তি। দুটো দিন এই সব করতেই কাটল। বোধহয় বর্ষার মধ্যে, এবং সেদিন ওই রকম ঝড় বৃষ্টিতে চালের কাঠকুটোয় কিছু হয়েছিল, ঘুণ ধরেছিল আগেই, ভেঙে পড়ল আচমকা। তা ছাড়া আশ্রমে দেখাশোনা করার লোকজনও কেউ ছিল না তেমন। পুজোয় মালিনী বাড়ি গিয়েছিল কাল সকালে ফিরেছে, হৈমন্তী কলকাতায়, এখনও ফেরেনি, চিঠি দিয়েছে। পূর্ণিমার পরের দিন ফিরবে, যুগলবাবু গিয়েছিলেন গয়া, ফিরেছেন কাল, শিবনন্দজি নিয়মিত আসতেন, তাঁর চেষ্টাতেই লোকজন মালপত্র জোগাড় করে রাতারাতি সব মেরামত করানো গেল। গতকাল সুরেশ্বর অন্ধ আশ্রমের অন্ধজনদের নিয়ে গিয়েছিল বিশাইয়া, দশারার মেলায়।

অবনী মনোযোগ দিয়ে কিছু শুনছিল না; কানে আসছিল, কিছু খেয়াল করছিল কিছু করছিল না। ভরতু চা দিয়ে গেল, বিজলীবাবুর আনা মিষ্টি থেকে কিছু মিষ্টি, কয়েকটা পেঁড়া। বিজলীবাবু প্রতিবাদ করছিলেন–করছেন কী, আপনার ভাগ আমরা লুটেপুটে খাচ্ছি জানলে বড় বউ খেপে যাবে, মশাই…; সুরেশ্বর শুনেও শুনল না যেন।

কিছুক্ষণ বসে থাকল অবনী। সুরেশ্বর আর বিজলীবাবুর মধ্যেই গল্পগুজব হচ্ছে, দু-একটা কথা কখনও বলছিল অবনী, পর পর কয়েকটা সিগারেট খেয়ে মুখ বিস্বাদ লাগছে। ভাল লাগছিল না বসে থাকতে। এক সময় সে উঠে পড়ল, বলল, আপনারা গল্পগুজব করুন, আমি মাঠে একটু পায়চারি করি, মাথাটা ধরা ধরা লাগছে।

উঠে এসে মাঠে দাঁড়াল অবনী। আকাশের দিকে মুখ তুলে হাঁ করে নিশ্বাস নিল বার কয়েক। দ্বাদশীর চাঁদ অনেকখানি ভরে এসেছে, একপাশে এক টুকরো মেঘ, ঘেঁড়াখোঁড়া, নিচু দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। অবনী আকাশ থেকে মুখ নামিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল।

বিজলীবাবু ধূর্ত নন, তার পেছনে গোয়েন্দাগিরিও করেননি, তবু তিনি ললিতা আর কুমকুমের কথা জেনেছেন। ললিতার কথা লুকোবার চেষ্টা অবনী কি সত্যি সত্যিই তেমন কিছু করেছিল? না, করেনি। প্রতি মাসে ললিতার নামে মানিঅর্ডারের টাকা যায়, রসিদ ফিরে আসে। অফিসের চাকর, পোস্ট অফিসের কেরানি, রামেশ্বর পিয়ন এদের কাছে অন্তত মানিঅর্ডারের কথাটা জানা, উৎসাহ প্রকাশ করলে যে-কোনও লোকই এটা জানতে পারত। কিন্তু লুকোবার চেষ্টা না করেও অবনী ললিতার প্রসঙ্গটা কখনও কারও কাছে উল্লেখ করেনি। করার ইচ্ছে হত না, কারণও ছিল না। বিজলীবাবু হয়তো ভাবছেন, অবনী চালাকি করে নিজের স্ত্রীর কথা গোপন করেছে। তা কিন্তু নয়, অবনী ভাবছিল, সে ঠিক গোপন করার মন নিয়ে কিছু করেনি, যার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই, থাকবে না, যার প্রসঙ্গ বলা অথবা না বলায় কিছু আসে যায় না–অবনী সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করবে কেন! কোনও কারণ ছিল না করার। কথাটা আগে জানলেই বা কী লাভ হত বিজলীবাবুর! কৌতূহল নিবৃত্ত হত মাত্র, কিংবা আরও বাড়ত, তার বেশি কিছুনয়। ব্যক্তিগত ব্যাপার, বিশেষ করে যা তিক্ত স্মৃতি, যার সঙ্গে অবনীর জীবনের কোথাও কোনও সম্পর্ক নেই আর, তা বলার উৎসাহ তার হয়নি।

অবনী হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে চলে এসেছিল। দাঁড়াল।

ললিতার জন্যে নয়, কুমকুমের জন্যেই অবনীর ভাল লাগছিল না। কুমকুম আগে কখনও চিঠি লেখেনি, এই প্রথম। সে, খুব সম্ভব, লুকিয়ে অবনীর ঠিকানা কোথাও দেখেছে। ঠিকানা দেখে চিঠি লিখেছে। ছেলেমানুষ বলেই, টাইফয়েডের পর, দুর্বল অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে তার বাবার কথা মনে পড়েছে। বোধহয় ললিতা মেয়ের ওপর তেমন যত্ন নেয় না এবং পুরো টাকাটা নিজের সুখ-সুবিধের জন্যে ব্যয় করছে। কুমকুমের চিঠি থেকে মনে হয়, মার ওপর ভীষণ অভিমান করে এবং নিজের চার পাশে একান্তভাবে তার নিজের কাউকে না দেখে মেয়েটার মনে খুব লেগেছে। নয়তো কুমকুম চিঠি লিখত না। ললিতা মেয়েকে কখনওই এমন কিছু শেখায়নি যাতে বাবার ওপর তার মন টানে। আগাগোড়া ললিতা মেয়েকে বাবার ওপর অশ্রদ্ধা প্রকাশ করতে শিখিয়েছিল, ঘৃণার শিক্ষাটা মেয়েকে সে দিয়েছিল, যেন অবনী পাশের বাড়ির বা পাড়ার কোনও একটা শয়তান গোছর মানুষ। কুমকুমের স্বভাব নোংরা, ইতর হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সেই মেয়ে আজ বাবাকে ওভাবে চিঠি লিখল কেন?

অবনী অন্যমনস্কভাবে একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে কী মনে পড়ায় সিগারেট ধরাল না। হাত বাড়িয়ে গাড়ির সিট থেকে বিজলীবাবুর ফ্লাস্কটা নিল।

কুমকুম সাদা খাতার পাতার আড়াই তিন পাতা চিঠি লিখেছে। বড় বড় হাতের লেখা, পেনসিলে লিখেছে, হাতের লেখা কাঁচা, অপরিষ্কার। তাড়াতাড়িতে লেখার জন্যেই হোক, কিংবা লুকিয়ে লুকিয়ে ভয়ে ভয়ে লেখার জন্যই হোক, লেখা খুব খারাপ হয়েছে, ভুলও হয়েছে অনেক। হয়তো মেয়েটা শরীরেও খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বাবা, আমার টাইফয়েড হয়েছিল। একশো পাঁচ জ্বর হয়েছিল। …বাবা, আমার খুব খিদে পায়, মা দুটো কমলালেবু দেয়। খুব টক। ..পুজোর জামাটা বিচ্ছিরি হয়েছে। আমার ভাল ফ্রক নেই, জুতো নেই। …বাবা, মাসি আমায় বলেছে, আমি মরে যাব। …আমার ভাল ফ্রক, জুতো কিনে পাঠিয়ে দিয়ো। ক্যাডবেরি দিয়ো। বাবা, আমি দুটো ক্লিপ পেয়েছি, জগুদা দিয়েছে। তুমি আমায় দেখতে আসবো…

অবনী অন্যমনস্কভাবে হাঁটছিল। জ্বর আসার মতন তার শরীরে কেমন শীত ধরছিল, চোখ জ্বালা করছে, কোনও কিছু দেখছিল না। ক্রমশ তার চোয়ালে চাপ লাগছিল। দাঁত যেন কিছু কামড়ে ধরতে চাইছিল। হিংস্রভাবে অবনী কী যেন একটা বলল।

তারপর হঠাৎ সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েক পলক তার শূন্য দৃষ্টির মধ্যে কোনও কিছুই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল না, পরে চোখ সামান্য পরিষ্কার হলে দেখতে পেল সামনে মালিনী। মালিনী কেমন সকুণ্ঠ এবং বিমূঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অবনী হৈমন্তীর ঘরের বারান্দার সামনে।

মালিনী আস্তে করে বলল, হেমদি কলকাতায় গেছেন, এখনও ফেরেননি।

অবনী কথা বলল না, মালিনীকে দেখতে লাগল। বারান্দার নীচে মালিনী দাঁড়িয়ে, নির্মল জ্যোৎস্নায় তার মিলের সাদা শাড়ি, গায়ের ময়লা রং, গোলগাল সাধারণ চেহারা, টলটলে মুখ কেমন নতুন দেখাচ্ছিল।

অবনী অস্পষ্টভাবে কিছু বলতে গেল, গলায় স্বর ফুটল না।

.

১২.

কুমকুমের চিঠি পাবার পর অবনী বিরক্ত, ক্ষুব্ধ ও অপ্রসন্ন হয়েছিল। মেয়ের ওপর যতটুকু বিরক্ত হয়েছিল তার শতগুণ বেশি ললিতার ওপর। অবনী যা ফেলে এসেছে, যার সঙ্গে ওর আর কোনও সম্পর্ক নেই, যার সবটাই তিক্ত, কুমকুমের চিঠি আবার তা জোর করে মনে করিয়ে দিচ্ছে। কুমকুম তাকে পুরনো তিক্ততার মধ্যে টেনে নিয়ে যাক অবনীর তা পছন্দ হয়নি। মেয়ের ওপর এক চাপা অভিমানও তার ছিল। মার দেখাদেখি এবং মার শিক্ষায় সে বাবাকে অনাত্মীয় ভাবতে শিখেছিল, ললিতার মুখে শুনে শুনে চার বছরের মেয়েও এক সময়ে তাকে পাজি বজ্জাত বলেছে। তার মুখের অর্ধেক কথা তখনও স্পষ্ট হয়নি। আরও কত কী বলত। আজ সেই মেয়ের হঠাৎ বাবার ওপর টান উথলে উঠল কেন?

কুমকুমের ওপর এই বিরক্তিটা অবশ্য সাময়িক, অবনী যথাসময়ে ভুলে যেতে পারল। ভুলতে পারল না ললিতাকে। চিঠিটা অহরহ তাকে খোঁচা দিচ্ছিল, এবং ললিতার ওপর ঘৃণা ও আক্রোশ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ললিতার সুখ-সুবিধে ফুর্তির জন্যে সে মাসে মাসে অতগুলো করে টাকা পাঠায় না। মেয়েকে ললিতা উপযুক্তভাবে প্রতিপালন করবে এটা তাদের শর্ত ছিল। ললিতা মেয়েকে অবনীর কাছে দিতে পারত, দেয়নি স্বার্থের জন্যে। তার ভয় ছিল, অবনী মেয়ে পেয়ে গেলে, যে-কোনও সময়ে ললিতাকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিতে পারে; বা সে ভেবেছিল, অবনী যা পাঠাবে তা এত সামান্য যে ললিতার নামমাত্র ভরণ-পোষণ হতে পারে। মেয়েকে নিজের অধিকারে রেখে ললিতা আর্থিক উদ্বেগের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল মাত্র, যেন কুমকুমকে সে জামিন হিসেবে রেখে নিয়েছিল।

অবনী প্রাথমিক উত্তেজনায় ললিতাকেই চিঠি লিখতে গিয়েছিল। পরে মনে হল, ললিতাকে চিঠি লেখাটা বোকামি হবে, কুমকুম লুকিয়ে বাবাকে চিঠি লিখেছে এটা জেনে ললিতা মেয়ের ওপর প্রসন্ন হবে না। কুমকুমকে সরাসরি চিঠি লেখা বা কিছু টাকা পাঠানোও উচিত নয়, ললিতা জানতে পারবে, কুমকুম ধরা পড়ে যাবে। ললিতা এখন তার বাবার কাছে থাকে, সেখানে তার বাবা, ভাই বোন এদের দৃষ্টি এড়িয়ে কুমকুমকে কিছু করা যাবে না–একটা চিঠি লেখাও অসম্ভব। ললিতা মেয়ের ওপর আক্রোশবশে যে-কোনও রকম নির্যাতন করতে পারে, তার পক্ষে সবই সম্ভব।

অনেক ভেবে অবনীর মনে হয়েছিল, কমলেশকে একটা চিঠি লেখাই সবচেয়ে ভাল। কিংবা ধ্রুবকে। ধ্রুব কোনওদিনই ললিতাকে পছন্দ করেনি। তার স্বভাবটাও গোঁয়ারের মতন। ললিতাদের বাড়ি গিয়ে একটা গণ্ডগোল বাধাতে পারে, তাতে লাভ হবে না। তার চেয়ে কমলেশকে লেখাই ভাল। কমলেশের সঙ্গে ললিতার পরিচয় পুরনো, অবনীর সঙ্গে ললিতার পরিচয় করিয়ে দেবার আগেও ললিতাদের বাড়িতে তার আসা-যাওয়া ছিল। কমলেশের স্বভাব ঠাণ্ডা, ভেবেচিন্তে গুছিয়ে কাজ করতেও পারে। তা ছাড়া কলকাতার বন্ধুদের সঙ্গে অবশিষ্ট যেটুকু সম্পর্ক তা এখনও কমলেশের সঙ্গেই আছে। মাঝে মাঝে কমলেশের চিঠি পাওয়া যায়। ধ্রুবর সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগও আর নেই।

কমলেশকেই চিঠি লিখেছিল অবনী। লিখেছিল, কমলেশ যেন একবার ললিতাদের বাড়ি যায়, ললিতা এবং কুমকুমের সঙ্গে দেখা করে; দেখা করে আড়ালে কুমকুমকে বলতে বলেছিল যে, অবনী তার চিঠি পেয়েছে, কিন্তু চিঠি লিখলে পাছে তার মা-মাসিমা জানতে পারে তাই লিখল না। কুমকুম যেন তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে, মন খারাপ না করে। কমলেশকে কুমকুমের জন্যে দু-চারটে ভাল জামা কিনে নিয়ে যেতেও লিখেছিল অবনী, জামা, টফি, জুতো। অবনী বিশেষ করে সাবধান করে দিয়েছিল, ললিতা যেন কুমকুমের চিঠি লেখার কথা জানতে না পারে। কমলেশকে একথাও অবনী খোলাখুলি লিখেছিল যে, ললিতা যদি মেয়ের প্রতি যত্ন না নেয়, তবে সে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়ে ললিতাকে শিক্ষা দেবে। আর কুমকুম? দরকার হলে কুমকুমকে কোনও হোস্টেলে রেখে দেবে অবনী।

চিঠিটা পুজোর মধ্যেই পাঠিয়ে দিয়েছিল অবনী, টাকাও পাঠিয়েছিল। অবশ্য কমলেশকে টাকা না পাঠালেও চলত, বলা যায় না সে হয়তো একটু অসন্তুষ্টই হবে। ললিতার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির সময় কমলেশ অনেক করে বলেছিল, মেয়ে ছাড়িস না–মেয়েটাকে একেবারে নষ্ট করে দেবে। তোরই মেয়ে

কমলেশের কাছ থেকে চিঠির জবাব আসবার আগেই বিজলীবাবুর কাছে অবনীকে স্বীকার করে নিতে হল কলকাতায় তার মেয়ে আছে, স্ত্রীও আছে-যদিও তাদের সঙ্গে তার আর কোনও সম্পর্ক নেই।

বিজলীবাবু যে কী বুঝেছিলেন কে জানে, স্ত্রী অথবা মেয়ের সম্পর্কে আর কোনও প্রশ্ন করেননি। অথচ অবনী বেশ বুঝতে পারছিল, বিজলীবাবু যেন কোথায় একটা অপ্রত্যাশিত বিস্ময়-বোধ নিয়ে রয়েছেন, হয়তো নিজে সন্তানহীন বলে অবনীর সন্তানের প্রতি এই উপেক্ষা তাঁর কাছে নির্মম মনে হচ্ছিল। অবনীর একসময়ে মনে হয়েছিল, বিজলীবাবু হয়তো অনুমান করছেন, স্ত্রীর চরিত্র এবং সন্তানের জন্ম রহস্য সম্পর্কে অবনীর কোনও সন্দেহ আছে, সেই সন্দেহবশে অবনী স্ত্রী কন্যা ত্যাগ করেছে। বিজলীবাবু অন্য আর কী ভাবছেন, ভাবতে পারেন অবনী জানে না। খুবই আশ্চর্যের বিষয়, বিজলীবাবুর কাছে অবনী ইদানীং কেমন অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছিল। যেন তিনি অবনীর অত্যন্ত গোপন কিছু জেনে ফেলেছেন যা সে জানাতে চায়নি। ভদ্রলোক তার ভেতরে কোন অবনীকে দেখছে, মাঝে মাঝে এই বিরক্তিকর চিন্তা এসে অবনীকে অন্যমনস্ক ও কুণ্ঠিত করছিল। অন্তত, বিজলীবাবু যদি ভাবেন, কুমকুম জারজ–এই ভয় ও আশংকা অবনীকে কেমন পীড়িত ও লজ্জিত করছিল। আত্মসম্মান ও কুমকুমের মর্যাদার জন্যে অবনীর কী করণীয় সে বুঝে উঠতে পারছিল না।

নিজের শৈশবের দিকে তাকালে অবনী যাদের দেখতে পায় তাদের কেউই তার কাছে সম্মানীয় নয়। বাবা এবং মার মধ্যে যথার্থ সম্পর্ক কী ছিল অবনী অনেক দিন তা বুঝতে পারেনি। পরে বুঝেছিল। বুঝে তার ঘৃণা হয়েছিল, মার ওপর, বাবার ওপর, নিজের ওপর। বাবার মতন অপদার্থ মানুষ হয়তো সংসারে কিছু কিছু থাকে, কিন্তু তার বাবা ছিল সমস্ত রকমে অপদার্থ। নিজের মেরুদণ্ডকে কখনও সোজা করেনি, করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল; কখনও সখনও হয়তো অসহ্য হলে বাবা ভেবেছে একটু নড়েচড়ে উঠবে, কিন্তু এরকম কিছু হবার উপক্রম হলেই যেন মা জানতে পারত, এবং খুব সহজেই মা বাবার সেই অসাড় রুগণ মেরুদণ্ডকে আবার বেঁকিয়ে দিত। মার কাছে বাবার কোনও অস্তিত্ব ছিল না; কখনও সখনও মনে হত, সার্কাসের তাঁবুর মধ্যে বাবাকে নেশাখোর নির্জীব বাঘের মতন এনে দাঁড় করিয়ে মা চাবুক হাতে খেলা দেখাচ্ছে। মা কখনও সেই চাবুক ছুড়ত না, এমনকী তার শব্দও শোনা যেত না, অথচ বাবা মার খেলার কৌতূহলটুকু জোগান দিত, প্রয়োজনে মার ইঙ্গিতে বাবা হুঙ্কারও করত। দর্শকের কাছে যেন মার কৃতিত্বের জন্যে এই হুঙ্কার প্রয়োজন ছিল। মাকে এসব দিক থেকে অসামান্য মনে হত, মনে হত মার অসাধ্য কিছু নেই। মার স্বভাব যে কত প্রখর ছিল এবং ব্যক্তিত্ব কী উগ্র তা বাবার পাশে মাকে দেখলে বোঝা যেত। অবনী ছেলেবেলায় মাকে ভাল বুঝত না, পরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখেছে মা সমস্ত কিছু গ্রাস করে আছে। মার ব্যক্তিত্বের কাছে বাবা নিষ্প্রভ। সংসারে যে কোনও জিনিস মা নিজের ব্যক্তিত্বের জোরে দাবিয়ে রেখে দিতে পারত। অবনীও ঘাড় তুলতে সাহস করেনি, কোনও সংশয় প্রকাশ করতে ভরসা পায়নি। বাবার নির্জীবতা সম্পর্কে তার ঘৃণা ধরে গিয়েছিল, এবং কখনও নিজের ভাল মন্দে বাবাকে ডাকেনি, সে অভ্যাস তার হয়নি, মা করতে দেয়নি।

বাবার বিকৃত যৌনাচারে আসক্তি ছিল, এবং অবলম্বন ছিল নেশা। বাবা নানারকম নেশা করত। নেশা এবং নোংরামির জন্যে মা বাবাকে পয়সা দিত। বাবা হাত পেতে নিত। বাবার নিজস্ব কোনও উপার্জন ছিল না। একদা পৈতৃক ধনে বাবা যত না ধনী ছিল, তত অভিজাত ছিল। মা বাবার এই ধন এবং আভিজাত্য নিজের কুক্ষিগত করে। বাবা থিয়েটারের মেয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করার পর মা নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎকে বোকামি করে পায়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়নি, বুদ্ধিমতীর মতো গ্রহণ করেছিল। পরে অবশ্য মা থিয়েটার ছেড়ে দেয়, কিন্তু মা পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ নষ্ট করেনি। তাদের পরামর্শ যে সব সময় মা নিত তা নয়, তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মা অর্থের ও আভিজাত্যের সদ্ব্যবহার করত। এই অর্থে তারা প্রতিপালিত হয়েছে। মা চরিত্র-বিলাসী ছিল, জনৈক যুবকের প্রতি মার অনুরাগের বাহুল্যও ছিল। মৃত্যুর আগে বাবা মার ওপর অবিশ্বাস ও আক্রোশবশে একবার মাত্র হঠাৎ নিজের সমস্ত নির্জীবত্ব ভুলে মাথা তুলে দাঁড়াতে গিয়েছিল, পারেনি, বরং এমন আঘাত পেয়েছিল যে বাবা সেই আঘাত সামলাতে পারেনি। বাবা মারা গেল। মা তারপরও আপন জ্যোতিতে জ্বলেছে। শেষ পর্যন্ত মার এই জ্যোতির অকস্মাৎ অবসান ঘটল। মামলায় মকদ্দমায় জড়িয়ে, ব্যর্থতায়, দুশ্চিন্তায় মা মারা যায়; মার তখন নিঃস্ব অবস্থা। অবনী ততদিনে বড় হয়ে গেছে, যুবক; ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াও শেষ করে এনেছে। মার মৃত্যুতে সে দুঃখিত হয়নি, বাবার মৃত্যুর সময় কয়েক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছিল, কারণ তখন সে ছেলেমানুষ ছিল, এবং মা সমারোহ করে বাবার সৎকার করিয়েছিল। সমারোহের প্রভাবে বাবার মৃত্যু এত বড় দেখিয়েছিল যে অবনী চোখের জল না ফেলে পারেনি। বাবার শেষ অবস্থায় অবনী প্রায় নিঃসন্দেহে জানতে পারে, মার সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক থাকলেও বাবার সঙ্গে নেই। অবশ্য মা সেই সাজানোবাবার শ্রাদ্ধশান্তি অবনীকে দিয়েই পুরোপুরি করিয়েছিল। ওই বয়সে, কথাটা জানা অথবা সন্দেহ করার পরও অবনীর কিছু করার ছিল না। মার চোখের সামনে সে এত তুচ্ছ ছিল যে তার সাধ্য ছিল না চোখ তুলে মার দিকে তাকায়। কাজেই ইতর-বিশেষ কিছু হয়নি, যেভাবে সে বেড়ে উঠেছিল, মাকে যে অবস্থায় দেখত তাতে সব কিছুই তার গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল।

মার স্বভাব, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধি, অহংকার–এসব যেমনই হোক, একটা বিষয়ে মার কোনও কার্পণ্য ছিল না। শেষ দিন পর্যন্ত মা অবনীকে কোনও রকম আর্থিক অভাব বা দুঃখ কষ্ট সাধ্যমতো বুঝতে দেয়নি, ছেলেকে মা সচ্ছলতার মধ্যে মানুষ করেছে, লেখাপড়া শেখানোতেও ত্রুটি রাখেনি।

মার মৃত্যুর পর অবনী এক অদ্ভুত রকমের মুক্তি পেল। পায়ে শেকল পরানো পাখি দীর্ঘকাল বন্দী থাকলে তার পা যেমন অসাড় হয়ে আসে, অবনীও সেই রকম প্রথম দিকটায় তার মুক্তিকে ভয়ে ভয়ে দেখেছে, সে সাহস পায়নি পা বাড়াবার। তারপর সংশয় দুর হলে সে পা বাড়িয়েছে, কিন্তু বেশি দূর নয়। কেমন করে যেন মার প্রভাব তার রক্তে মিশে গিয়েছিল, মনের কিছু যেন কুঁকড়ে রেখেছিল, অবনী তা অগ্রাহ্য করতে পারত না। শেষ পর্যন্ত সে বেপরোয়া মরিয়া হয়ে নিজের স্বাধীনতার জন্যে লাফিয়ে পড়ল, কিন্তু সে যেখানে পা রাখল সেটা খানিকটা তার সাজানোবাবার জায়গা, খানিকটা মার। একদিকে সে একা, নিঃসঙ্গ, নিগৃহীত, ক্লান্ত, বিরক্ত; অন্য দিকে সে তীব্র, নির্দয়, সুখান্বেষী, ভোগবিলাসী। নিজের মেরুদণ্ডকে সোজা করতে গিয়ে সম্ভবত সে সামঞ্জস্য ভুলে গিয়েছিল, এবং এমনভাবে তার মেরুদণ্ড সোজা করল যেটা স্বাভাবিক নয়, ফলে সেই কৃত্রিম অনভ্যাস-দৃঢ় মেরুদণ্ড হল তার ঔদ্ধত্য।

নিজের শৈশবের এই স্মৃতি সুখের নয়, কাম্যও নয়। অবনী চায়নি, কুমকুমের শৈশবও তার বাবার মতন সিসের চৌবাচ্চার মধ্যে কাটে। নিশ্বাস-প্রশ্বাস নেবার জন্যে খানিকটা বাতাস সেখানে আসার মতন ব্যবস্থা থাকবে হয়তো, কিন্তু আর কিছু না। নোংরামি, কদর্যতা, গ্লানি, ইতরতা ছাড়া কুমকুম আর কিছু পাবে না। স্নেহ, ভালবাসা, কোমলতা–এসব কিছু নয়। অথচ ললিতা কুমকুমকে ছাড়ল না। অবনীর ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল। যে-কোনও মূল্যে সে বুঝি তখন মুক্তি চায়। ললিতাই শেষ পর্যন্ত জিতে গেলে।

.

কমলেশের জবাব আসতে সামান্য দেরি হল।

কমলেশ লিখেছে, সে কলকাতায় ছিল না, দিন তিনেকের জন্যে পুরী গিয়েছিল, ফিরে এসে অবনীর চিঠি পেয়েছে। পেয়ে ললিতাদের বাড়ি গিয়েছিল। প্রথম দিন ললিতার দেখা পায়নি, পরে আবার গিয়ে দেখা করেছে।

অনেক দিন পর ললিতাকে দেখলাম,কমলেশ লিখেছে, পাঁচ ছ মাস পরে। আগে পথে ঘাটে মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষাৎ হত, আজকাল হয় না, আমি যে বাড়ি বদলেছি তা তো তুই জানিস। কুমকুমের কথা আগে বলি। এখন সে ভাল আছে, তবু শরীর খুব রুণ। তাকে আড়ালে যতটুকু বলার বলেছি, বেশি বলা উচিত হত না। জামা-টামা কিনে দিয়েছি, কিন্তু ললিতার কাছে একথা শুকোনো যায়নি যে, তোর কথা মতন আমি কিনে নিয়ে গিয়েছি। কুমকুমের ওপর ললিতা সন্দেহ করেনি, ভেবেছে তোর খেয়াল হওয়ায় তুই কিনে দিতে বলেছিস। ব্যাপারটা এর বেশি কিছু গড়ায়নি। ..ললিতার বিষয়ে কয়েকটা কথা জানাচ্ছি, তোর ইন্টারেস্ট থাক না থাক কথাটা জেনে রাখা উচিত। ললিতা আজকাল অবাঙালি এক সেলস ম্যানেজারের সঙ্গে বেশির ভাগ সময় থাকে, সেখানে একটা চাকরিও করে শুনলাম। আমার খুবই সন্দেহ; ললিতা রীতিমতো মদটদ খেতে শুরু করেছে। তার চোখ মুখ দেখলে সেরকম মনে হয়, কথাবার্তা শুনলেও। শরীর ভেতরে ভেতরে নষ্ট হয়ে গেছে, ওপরে তা ঢাকা দিয়ে এ-সমস্ত ক্ষেত্রে মেয়েরা যা করে বেড়ায় তাই করে বেড়াচ্ছে। মেয়ের সম্পর্কে তার তেমন কোনও উৎসাহ নেই, দায়-দায়িত্বও দেখলাম না। মেয়ের ওপর যত্ন নিতে বলায় বলল, এর বেশি যত্ন নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেবার কথা আমি বলিনি–আমার পক্ষে সেটা বলা ভাল দেখাত না। …আমার মনে হয়, এ-বিষয়ে তোর নিজের কিছু লেখাই ভাল। তবে, ললিতার কাছে মেয়ে রাখা যে একেবারেই উচিত নয় তা আমি বলতে পারি। …এ ব্যাপারে যা ভাল হয় করিস।

কমলেশের চিঠি পড়ে অবনী বুঝতে পারল না, সে কী করবে, কী তার করা উচিত।

ললিতাকে চিঠি লিখতে তার আগ্রহ হল না। কমলেশের কাছে খবর পেয়েই যেন সে লিখছে এভাবে লেখা যেত, (কুমকুম আড়ালেই থাকত) কিন্তু অবনীর তেমন কোনও ইচ্ছাই হল না। ললিতার ওপর তার ঘৃণা আর নতুন করে বাড়ার কিছু নেই, সে মদ খাক, আর পাঁচটা লোকের সঙ্গে শোয়া বসা করুক তাকে অবনীর কিছু আসে যায় না। এটা সে আগে করত, পরে করবে। ললিতার স্বভাব বদলাবে এমন প্রত্যাশা সে কখনও করবে না। ললিতার জন্যে তার মাথাব্যথা অনাবশ্যক। কিন্তু কুমকুম? কুমকুমের কী হবে?

হয় কুমকুমকে তার মার হাতে ছেড়ে দিতে হয়, যেভাবে ললিতা তাকে মানুষ করবে সেইভাবেই সে মানুষ হবে, (অবনী যেমন হয়েছিল। তবে, অবনীর মার সঙ্গে ললিতার তুলনা চলে না, অন্তত সন্তান পালন সম্পর্কে নয়) আর না হয়, কুমকুমকে ললিতার কাছ থেকে নিয়ে আসতে হয়। কিন্তু কোথায় আনবে? এখানে? এখানে আনা কি সম্ভব? কে দেখবে তাকে? হঠাৎ তার মেয়ে এল কোথা থেকে এই রহস্য এখানের মানুষগুলোকে চঞ্চল ও উত্তেজিত করবে। কুমকুমকে পাঁচ রকম প্রশ্ন করবে লোকে। তা ছাড়া কুমকুম যে তার কাছে আসতে চাইবে এরই বা স্থিরতা কী! ললিতা নিশ্চয় সহজে মেয়েকে ছাড়তে চাইবে না।

অনেক ভেবে অবনী স্থির করল, এখন যেমন আছে কুমকুম তেমনই থাক। কমলেশ ললিতার সঙ্গে দেখা করার পর হয়তো ললিতা কিছু আঁচ করতে পারছে। সে যথেষ্ট চালাক। মেয়ে হারানোর অর্থ ললিতার মাসে মাসে বাঁধা রোজগার হারান। হয়তো সেটা সে অনুমান করে কুমকুমের ওপর কিছুটা নজর দেবে।

আরও কয়েক মাস দেখা যাক। যদি ললিতা না শুধরোয় তবে কুমকুমকে কোনও ভাল মিশনারি মেয়েদের হোস্টেলে রেখে দিতে হবে।

পরের চিঠিতে, অবনী স্থির করে নিল, কমলেশকে লিখতে হবে কলকাতার কোনও উকিলের কাছে গিয়ে ডিভোর্স সম্পর্কে পরামর্শ নিতে।

.

১৩.

সেদিন, রবিবারের বিকেলের দিকে অপ্রত্যাশিতভাবে সুরেশ্বর ও হৈমন্তী এসে হাজির। সঙ্গে বিজলীবাবু। অবনী বারান্দায় বসে অফিসের কাগজ দেখছিল। ফটক খোলার শব্দে সামনে তাকিয়ে ওদের দেখল। উঠে গিয়ে অভ্যর্থনা করল, আসুন।

বিজলীবাবুই কথা বললেন প্রথম, মিত্তিরসাহেব কি অফিস নিয়ে বসেছিলেন নাকি?

 না, না, একটা কাগজ দেখছিলাম।

সিঁড়িতে সুরেশ্বর আর বিজলীবাবু, সামান্য পেছনে হৈমন্তী। হৈমন্তী আশপাশ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, গাছপালা, বাগান, বাড়ি। এর আগে সে কখনও এই বাড়িতে আসেনি।

বসার ঘরে এনে বসাতে চাইছিল অবনী, সুরেশ্বর বলল, এখন আর বেশিক্ষণ বসব না, আমার একটা কাজ সারার আছে; উমেশবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করতে যাব; উনি কাল পাটনায় ফিরে যাচ্ছেন।

উমেশবাবুর পরিচয়টা এখানকার সকলে জানে, অবনীও জানে। ভদ্রলোক পাটনা হাইকোর্টে জজিয়তি করেছেন এক সময়, এখন অবসর-জীবন যাপন করেন। পাটনা শহরের দু পুরুষের বাস, ভাইবোন ছেলে সবাই কৃতিপুরুষ, সকলেই প্রায় পাটনায় থাকে। অভিজাত পরিবার, পাটনার গণ্যমান্য ব্যক্তি। শোনা যায়, দেবতুল্য মানুষ উমেশবাবু। পুজোর সময় এখানে আসেন, বাড়ি আছে, সপ্তাহ দুই থাকেন, তারপর আবার ফিরে যান। এই সময়টুকুর মধ্যে উচ্চনীচ ভেদে সকলের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় রক্ষা করেন, পাঁচজনের অনুরোধ-উপরোধ শোনেন, সাধ্যমতো উপকারও করেন। প্রবাসী বাঙালি বলেই বোধহয় বাঙালিপ্রীতি কিছুটা বেশি।

অবনীর সঙ্গে উমেশবাবুর পরিচয় নেই, সে কখনও পরিচিত হতে যায়নি, তার তেমন কোনও ইচ্ছেও হয়নি। সুরেশ্বর কেন উমেশবাবুর কাছে যাবে অবনী তা অনুমান করতে পারল। উমেশবাবু সুরেশ্বরের বিশেষ অনুরাগী বলে সে শুনেছে, তা ছাড়া উমেশবাবু পাটনার সরকারি মহলে বলে কয়ে সুরেশ্বরের অন্ধ আশ্রমের জন্যে কোনও কোনও বিষয়ে সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

মহিন্দরকে ডেকে অবনী বাইরে আরও চেয়ার দিতে বলল।

বিজলীবাবু বললেন, আমি বলি কি, উঠব উঠব মন নিয়ে বসার চেয়ে কাজটা সেরে এসে হাত পা ছড়িয়ে বসাই ভাল। বিকেলও তো যাই-যাই করছে। বলে তিনি সুরেশ্বরের মুখের দিকে তাকালেন।

মনে হল সুরেশ্বরেরও সেই রকম ইচ্ছে। অবনীর দিকে তাকিয়ে বলল, বিকেলের বাসে এসেছি, বিজলীবাবুর বাড়িতে না বসে এলে উনি আমাদের দিকের বাস বন্ধ করে দেবেন বলে শাসিয়েছিলেন–

সুরেশ্বর হাসল। হাতে খুব একটা সময়ও নেই, সন্ধের বাসে ফিরব। আমরা বরং দেখা করেই আসি। হেম বসুক।

অবনী বলল, বসুন, ফেরার জন্যে ব্যস্ত হতে হবে না।

 সুরেশ্বর অনুমান করতে পারল অবনী কী বলতে চায়।

 না, আমাদের পৌঁছে দিতে আবার আপনি গাড়ি নিয়ে যাবেন, তা হয় না; অকারণ কষ্ট…

কষ্টর কিছুনা। আমিও হয়তো যেতাম আজ। বলে অসতর্কভাবে হৈমন্তীর দিকে তাকাল পলকের জন্যে।

বিজলীবাবু বললেন, আপনি এমন করেন মহারাজ, যেন জলে পড়েছেন। আমরা তো রয়েছি, সন্ধের বাস ধরার জন্যে অত উতলা হচ্ছেন কেন!

সুরেশ্বর একটু ভাবল, বলল, তা হলে কাজটা সেরে এসে বসি। উমেশবাবু কাল চলে যাবেন, বাড়িতে লোকজনের ভিড় থাকতে পারে।

সামান্য বসে সুরেশ্বর ও বিজলীবাবু চলে গেলেন।

হৈমন্তীর সঙ্গে বিশেষ কোনও কথাবার্তা এতক্ষণ হয়নি, এবার অবনী বেতের চেয়ারটা একটু পিছন দিকে সরিয়ে হৈমন্তীর মুখোমুখি হয়ে হেসে বলল, বলুন, তারপর আপনার খবর কী? কেমন বেড়ানো হল?

বেড়ানো কোথায়, বাড়ি ঘুরে এলাম, হৈমন্তীও হাসিমুখে জবাব দিল।

আপনি ফিরেছেন শুনেছি, কিন্তু গত সপ্তাহটা অফিসের কাজে নিশ্বাস ফেলার সময় পাইনি। গাধার মতন খাঁটিয়ে নিয়েছে। নতুন একটা কনস্ট্রাকশানের কথা চলছে, দুবেলা বিশ বাইশ মাইল ছুটোছুটি। …চাকরি জিনিসটা বড় হিউমেলেটিং। ..যাকগে, আপনার খবরাখবর বলুন। একদিন আপনাদের ওখানে গিয়েছিলাম।

শুনেছি, মালিনী বলেছে।

কিছুই নয়, তবু মালিনীর নামে অবনী কেমন অপ্রস্তুত বোধ করল। সেদিন ঠিক কী মানসিক অবস্থায়, কতটা হুঁশ হারিয়ে হৈমন্তীর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মালিনী জানে না। সে অবনীকে কী ভাবে দেখেছে, কী মনে করেছে কে জানে! অবনী বুঝতে পারল না, মালিনী হৈমন্তীকে আরও কিছু বলেছে কিনা।

অবনী সামান্য চুপ করে থেকে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলল, কেমন লাগল কলকাতা?

কেমন আর লাগবে, যেমন লাগে হৈমন্তী ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল।

এই জঙ্গল থেকে হঠাৎ কলকাতায় গিয়ে খানিকটা অন্য রকম লাগার কথা।

তা লেগেছে; ভালই লেগেছে।

এখানে ফিরে এসে এখন কেমন লাগছে? অবনী ঠাট্টা করেই বলল।

আগের মতনই।

আপনাকে কিন্তু এবারে একটু অন্য রকম দেখাচ্ছে।

তাই নাকি? কী রকম? হৈমন্তী চোখের পাতা তুলে বলল।

 কী রকম…! মানে…বেশ খানিকটা রিফ্রেশড দেখাচ্ছে।

ও। হৈমন্তী অল্প একটু হেসে থেমে গেল।

চাকরে চায়ের ট্রে দিয়ে গেল, বিস্কিট, ডিম, মিষ্টি। হৈমন্তী তাড়াতাড়ি হাত নেড়ে না না করল। খাবার না, বিজলীবাবুর বাড়িতে ওঁর স্ত্রী এমন করে পেড়াপেড়ি করলেন…সত্যি, আমি কিছু আর খেতে পারব না।

বিজয়ার পর মিষ্টিমুখ করতে হয়, করাতেও হয়। হয় না? অবনী সরলভাবে হেসে হেসে বলল, ছেলেমানুষের মতন অনেকটা।

এখন আর বিজয়া নেই; পূর্ণিমা পর্যন্ত থাকে– হৈমন্তীও সরল মধুর স্বরে বলল। কালীপুজো এসে পড়ল, তা জানেন?

কিছু একটা হাতে নিন, আতিথ্যে বদনাম হবে।

তবে একটা বিস্কিট নিলাম—

তাই নিন অবনী সম্মতি দিল। সে চা ঢালতে যাচ্ছিল, হৈমন্তী হাত বাড়িয়ে দিল।

আমায় দিন, আমি ঢালছি। হৈমন্তী চেয়ারটা সামান্য এগিয়ে নিল।

চায়ে দুধ চিনি মেশাতে মেশাতে হৈমন্তী বলল, আপনার বাড়িটা বেশ, আমার খুব ভাল লাগছে।

আমার বাড়ি কোথায়? ভাড়া বাড়ি। অবনী কৌতুক করে বলল।

কলকাতায় আমাদের বাড়িতে এখানের নানান রকম গল্প হত– হৈমন্তী যেন অবনীর কথাটা কানেই তুলল না, বলল, আমার ছোট ভাই বলেছে সে দেওয়ালির সময় সপ্তাহ খানেকের ছুটি নিয়ে বেড়াতে আসবে। তার ধারণা, আপনার সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললে বনে জঙ্গলে বেড়িয়ে শিকারটিকার করা যাবে। আপনি কি শিকার-টিকার করেন নাকি?

শিকার! না।

আমি কিন্তু বলিনি আপনি শিকারি… হৈমন্তী চায়ের পেয়ালায় অল্প করে চুমুক দিয়ে হেসে বলল।

ছেলেবেলায় এয়ারগান ছাড়া আমি জীবনে বন্দুক ধরিনি, অবনী চায়ের পেয়ালা নেবার আগে সিগারেট ধরাল।

হৈমন্তী হাসছিল। অবনীর চোখে চোখ রেখে কেমন যেন স্বচ্ছ অথচ ঈষৎ চাপা হাসি। এই হাসির অর্থ কী? অবনী কেমন অস্বস্তি বোধ করল।

আমাকে কি শিকারির মতন দেখায়? অবনী হৈমন্তীর দৃষ্টি এবং হাসি লক্ষ করতে করতে বলল।

হৈমন্তী চোখের পাতা নামাল, মুখ নিচু করে পেয়ালার ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে মাথা নাড়ল, এত আস্তে যেন হ্যাঁ বা না বোঝা গেল না। তারপর যখন মুখ তুলল তখন তার সারা মুখে পরিষ্কার ঝকঝকে হাসি, নম্র, সুন্দর, শালীন, ও আন্তরিক সহাস্য দৃষ্টি।

অবনী এই দৃষ্টি থেকে অনুভব করতে পারল, হৈমন্তীর মধ্যে কোনও চাতুরি ছিল না। সে বাস্তবিকই কিছু মনে করে কথাটা বলেনি। অবনীর সঙ্গে যেন সহজ প্রীতিপূর্ণ আলাপেই তার আকাঙ্ক্ষা ছিল, এখনও রয়েছে।

চায়ের পেয়ালা তুলে নিয়ে চা খেতে খেতে অনী হেসে বলল, আপনার ভাই এলে আমি পাখি শিকারের ব্যবস্থা করে দিতে পারি; সেরকম লোক পাওয়া যাবে।

হৈমন্তী আর ও-প্রসঙ্গে গেল না। বলল, ভাল কথা, আপনার কাছে বই-টই আছে? গল্পটল্পের বই?

দুচারখানা থাকতে পারে। …তবে একরাশ ক্রাইম ফিকশান আছে।

ক্রাইম…আপনি বুঝি ক্রাইমের খুব ভক্ত? হৈমন্তী দাঁত ঠোঁট টিপে রহস্য করে বলল।

 অবনী দেখল, কী ভাবল, হেসে বলল, আমাকে কি ক্রিমিন্যাল মনে হচ্ছে?

হৈমন্তী তাড়াতাড়িতে ছেলেমানুষের মতন জিব কেটে ফেলল, ছি! সে কী! তারপর হাসিমুখে বলল, আমি ক্রাইম বেশি পড়িনি। একটু আধটু। তবে এবার পড়তে হবে। সময় কাটানোর একটা কিছু চাই তো। ..জানেন, আমি একটা রেডিয়ো এনেছি, ব্যাটারি সেট… বলে বুঝি হৈমন্তীর মনে পড়ল শেষ কথাটা বলা বাহুল্য হল; হেসে ফেলল।

অবনী কিছুটা বিস্ময়ে কিছুটা প্রসন্ন মনে হৈমন্তীকে দেখছিল। কলকাতা থেকে ফিরে হৈমন্তী যেন কোনও এক আড়ষ্টতা বা বাধা ঘুচিয়ে ফেলেছে। সেই গাম্ভীর্য দূর-দূর ভাবটা তেমন নজরে পড়ছে না। সম্ভবত, হৈমন্তী এতদিন স্পষ্ট করে কোনও সাহচর্যের প্রয়োজন অনুভব করেনি, এখন সময় কাটাবার জন্যে, কথা বলার জন্যে, কারও সামনে দু দণ্ড বসে থাকার জন্যে তার কিছু চাই। রেডিয়ো, বই ইত্যাদির মতন বা এর অতিরিক্ত কিছু, কোনও সঙ্গী, বন্ধু।

অবনী হেসে বলল, আপনাকে আগে দেখলে আমার সব সময় ডাক্তার ডাক্তার মনে হত। এখন

হৈমন্তী চোখের তারায় ঈষৎ গাম্ভীর্য মিশিয়ে শুধোল, এখন কী মনে হয়?

কী বলবে না বলবে ভাবতে ভাবতে অবনী বলল, ঠিক ডাক্তার মনে হয় না। তারপর কেমন যেন বিব্রত হল, শেষে বলল, এখন চেনাজানা বন্ধুর মতন লাগে।

হৈমন্তী সরল শান্ত হাসিমুখে অবনীর মুখ দেখছিল।

হৈমন্তীরা যখন এসেছিল, তখন কদমগাছের মাথায় ফিকে রোদ ছিল, সেই রোদ এখন অদৃশ্য। আকাশতলায় নদীর জলের মতন মলিন আলোর একটি স্রোত বইছে, কার্তিকের প্রায় শেষ, হেমন্তের কেমন গন্ধ ফুটেছে বৃক্ষলতায়, শূন্যে ক্রমশ ধূসরতা জমে আসছিল। দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে যাবে।

চা খাওয়া কখন শেষ হয়েছে হৈমন্তীর। বাগানের দিকে মুখ করে বসে ছিল। কদমগাছের ডালে পাখির ঝাঁক এসে বসেছিল, উড়ে গেল কিছু কিছু থেকে গেল।

অবনী চুপচাপ হয়ে গেছে। হৈমন্তীকে দেখছিল মাঝে মাঝে। হৈমন্তী আজ হালকা রঙের শাড়ি পরে এসেছে, ফিকে কমলা; গায়ের জামাটিও কমলা রঙের, একটু গাঢ়। মাথায় এলো খোঁপা। তার গলা, ঘাড়ের সামান্য দেখা যাচ্ছিল, গলায় সরু হার, কানে দুটি নীল পাথর। হৈমন্তীর সমস্ত সজ্জা পরিচ্ছন্ন, পরিমিত।

বাগানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাবার সময় অবনীর সঙ্গে চোখাচুখি হল হৈমন্তীর, একটু থেমে বলল, এখানে এসে বোঝা যাচ্ছে, শীত আসছে।

কালীপুজোর সময় থেকেই শীত পড়ে যায়– অবনী বলল, নভেম্বরের শেষে বেশ শীত।

শীত আমার ভালই লাগে।

 কলকাতার শীত-বাবু-শীত। অবনী হেসে বলল।

কলকাতার শীত কেন, আমি শীতের সময় বাইরেও থেকেছি। হৈমন্তী কথাটা বলে ফেলে বুঝল, সে একথাটি না বললেও পারত; সতর্ক হল।

কোথায়?

 সামান্য ইতস্তত করল হৈমন্তী, তারপর বলল, ছিলাম। …কলকাতার কাছাকাছি।

 অবনী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

হৈমন্তী হাতঘড়ি দেখল। ছটা বাজতে চলল, ওঁরা তো আসছেন না।

 উমেশবাবুর বাড়ি খানিকটা দুর। দেখা করতে গিয়ে হয়তো কথাবার্তা বলছেন।

আপনি ভদ্রলোককে চেনেন?

দেখেছি, আলাপ নেই।

হৈমন্তী কয়েক মুহূর্ত কী যেন দেখল অবনীর, তারপর কৌতূহল প্রকাশ করল, আপনার সঙ্গে এখানকার লোকজনদের তেমন মেলামেশা নেই, না?

অবনী কোনও জবাব দিতে পারল না, পরে বলল, কিছু কিছু আছে।

আপনি বোধহয় তেমন আলাপি নন হৈমন্তী হেসেই বলল, আপনার খুব বদনাম।

অবনী চমকে উঠল না, কিন্তু বিস্ময় বোধ করল।

হৈমন্তী বলল, লোকে আপনাকে ভয় পায়। অহঙ্কারি মনে করে। করে না?

মালিনী বলেছে?

শুনি তো সে রকম, হৈমন্তী সরল গলায় বলল। কী মনে পড়ায় আবার বলল, মালিনী আপনার কাছে খুব কৃতজ্ঞ। তার ভাইকে আপনি কী যেন করে দিয়েছেন, মাইনে বেশ কিছু বেড়ে গেছে।

ছেলেটি বোকা, কিন্তু ভাল।

ভাল কথা, শুনলুম, আপনি বদলি হয়ে যাচ্ছেন নাকি?

এ-খবরও নিশ্চয় মালিনীর?

একা সে-বেচারিকে দোষ দিচ্ছেন কেন?

অবনী অনুমান করে নিল, বিজলীবাবু মারফত কথাটা সুরেশ্বরের কানে উঠেছে। হয়তো সুরেশ্বরও বলেছে হৈমন্তীকে। সুরেশ্বরের আশ্রমে সে কী আজকাল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে? বিজলীবাবু কী অবনী সম্পর্কে আরও কোনও সংবাদ দিয়েছেন। বিজলীবাবুর ওপর অবনী অসীম বিরক্তি অনুভব করল।

বদলির কথা ঠিক নয়–অবনী বলল, অন্য একটা কথা হচ্ছিল; সেটা হলে আমায় অন্য জায়গায় যেতে হবে।

শুনেছি। হায়ার পোস্ট।

 তবে তো সবই শুনেছেন। …আমায় নিয়ে এত আলোচনা হয় নাকি?

 না, কথা উঠলে ওঠে।

অবনী আর কিছু বলল না। তার ভাল লাগছিল না।

উভয়ে আবার নীরব হল। দেখতে দেখতে ধূসরতা গাঢ় হয়ে সিস-পেনসিলের দাগের মতন অন্ধকার জমছে। আলো মুছে এল। রাস্তা দিয়ে কারা যেন বকবক করতে করতে চলে গেছে। বারান্দা অন্ধকার হয়ে এল।

আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর অবনী বলল, বাতিটা জ্বেলে দিই।

অবনী উঠে গিয়ে বাতি জ্বালল বারান্দার।

হৈমন্তী আলোর মধ্যে দুদণ্ড বসে থাকল। যেন সহসা এই ধূসরতা ও অস্পষ্টতা ঘুচে যাবার পর সে নিজেকে আলোর মধ্যে সইয়ে নিচ্ছে। আশ্রমের মিটমিটে আলোর তুলনায় এই আলো যেন অনেক সুন্দর, পরিষ্কার করে সব চোখে পড়ে। কলকাতার বাড়ির আলোও আবার এরকম নয়, সেখানে পথঘাট পাশের বাড়ি সর্বত্র থেকে আলো এসে নিজের বাড়ির আলোকে ভাসিয়ে দেয়, মনে হয় না নিভৃতে নিজের মতন করে একটু আলো জ্বালোম। এখানে, এই মুহূর্তে হৈমন্তীর এই আলোটুকু ভাল লাগল; ক্ষীণ নয়, অতি উজ্জ্বলও নয়; অতি অস্পষ্ট নয় আবার প্রকাশ্য নয়, নিভৃত অথচ আপন।

.

১৪.

দেখতে দেখতে দেওয়ালি পেরিয়ে শীত পড়ে গেল। শীতের এই শুরু এখানে অত্যন্ত মনোরম। আর্দ্রতার লেশমাত্র কোথাও নেই; আকাশ জুড়ে নীলের আভা, বাতাস শুকনো, সারারাত হিম আর শিশির ঝরে তৃণলতা বৃক্ষ যেটুকু সিক্ত হয় সকালের উজ্জ্বল রোদে তা শুকিয়ে গেলে সতেজ পরিচ্ছন্ন এক সবুজের দীপ্তি ফুটে ওঠে। এখনও উত্তরের বাতাস তেমন করে হানা দেয়নি, তবু শীতের দমকা এলোমেলো বাতাস বনের দিক থেকে মাঝে মাঝে ছুটে আসে, এনে শনশন শব্দ তুলে গাছ লতাপাতা বিশৃঙ্খল ও শিহরিত করে চলে যায়। গুরুডিয়ার শালবন এতদিন যেন ঘুমিয়ে ছিল, সাড়াশব্দ পাওয়া যেত না। এখন প্রায় রোজই সকালে দু-চারটে বয়েলগাড়ি কাঁচা পথ উঁচু-নিচু মাঠ দিয়ে শালের জঙ্গলে চলে যায়, চাকার নিরবচ্ছিন্ন চিকন শব্দের সঙ্গে বয়েলের গলার ঘণ্টা বাজে ঠুং ঠুং তারপর সারা দুপুর বাতাসে কাঠুরেদের কাঠ কাটার শব্দ; কখনও কখনও সেই শব্দ স্তব্ধ দুপুরে অন্ধ আশ্রমেও ভেসে আসে। বিকেল পড়ে আসার আগে আগেই গাড়িগুলো ফিরে যায়। দু-তিন দিন ধরে ওরা শুধু গাছ কাটে, তারপর একদিন গাড়ি বোঝাই করে ফেরে। লুটোনো শালের শাখা-প্রশাখার পাতায় পথের ধুলো ওড়ে অল্প, মাটিতে আঁচড় লেগে থাকে।

বিকেল যেন দেখতে দেখতে ফুরিয়ে যায়, গাঢ় রোদ ফিকে হয়ে আসার আগেই কেমন এক অবসন্ন ভাব। নরম আলো গায়ে মেখে পাখিরা বনের দিক থেকে ফিরতে শুরু করে, ছায়া জমতে থাকে আড়ালে; আমলকীর চারা, আতাগাছের ঝোপ দিয়ে জঙ্গলা ফড়িং, দু-চারটি প্রজাপতি তখনও বুঝি নাচানাচি করে; তারপর শীতের দমকা বাতাস এসে গাছ লতাপাতা সরসর শব্দ তুলে বয়ে গেলে মাঠ থেকে, গাছগাছালি থেকে শেষ আলোটুকু পালিয়ে যায়, অন্ধ-আশ্রমের সবজিবাগানের গন্ধ ভেসে আসে, সারের গন্ধ, মাটির গন্ধ এবং শীতের গন্ধ। গোধূলিটুকুও ফুটতে পারে না, ছায়া এবং অন্ধকার এসে সমস্ত কিছু ঢেকে ফেলে।

শীতের শুরুতেই অন্ধ আশ্রমের নতুন কয়েকটা কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। একটা নতুন কুয়ো খোঁড়ানো হচ্ছিল, কুয়ো খোঁড়ানো শেষ হলে সেটা বাঁধানো হল। নতুন একটা চালা তৈরি হচ্ছে একপাশে, আর-একটা তাঁত ঘর বসবে। রাঁচি থেকে তাঁত আসছে। সুরেশ্বর আর শিবনন্দনজি মিস্ত্রি মজুর, ইট কাঠ নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত।

হৈমন্তীর এ-সব বিষয়ে কোনও আগ্রহ বা উৎসাহ ছিল না। তার ঘরের বারান্দায় দাঁড়ালে অনেকটা তফাতে আশ্রমের এই নতুন কাজগুলি দেখা যায়; হৈমন্তী দেখেছে অবশ্য, কিন্তু কোনও রকম উৎসাহ অনুভব করেনি। বরং কৌতুক অনুভব করেছে কেমন, মালিনীকে বলেছে, তাঁতের কাজটা তুমিও শিখে নিও, মালিনী।

মালিনী বুঝতে পারত হেমদি তাকে ঠাট্টা করছে। তার মনে হত, হেমদি আজকাল অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে।

অবনী চোখে খুব একটা ভুল দেখেনি। কলকাতা যাবার আগে হৈমন্তী যা ছিল কলকাতা থেকে ফিরে ঠিক সেরকম ছিল না। তার কোথাও যেন কিছু হয়েছিল। সেটা কী–তা স্পষ্ট করে বোঝা যেত না। তবে হৈমন্তীর ব্যবহারের মধ্যে এই পরিবর্তনটা লক্ষ করা যেত। স্বভাবে সে প্রগলভা ছিল না, এখনও তার আচরণে বা কথাবার্তায় আতিশয্য ও চটুলতা নেই, তার সেই গাম্ভীর্য অটুট ছিল, নিজের কর্তব্য সম্পর্কে তার অবহেলা বা উদাসীনতাও দেখা যায়নি। তবু হৈমন্তী কোথাও যেন একটু বদলে গিয়েছিল। মালিনী যেন স্পষ্ট দেখত, হেমদি একটু অন্য রকম হয়ে গেছে। এতে তার সুবিধে বই অসুবিধে হয়নি। দুজনের মধ্যে সম্পর্কের একটা আড়াল আগে ছিল, মালিনী কখনও সেই বেড়া টপকাতে সাহস করেনি। এখন তার মনে হয়, সে সাহস তার হয়ে যাচ্ছে, চেষ্টা করলে সে বেড়া টপকাতে পারে। হয়তো হেমদি পছন্দ করবে না, কিন্তু কিছু বলবেও না।

আগের চেয়ে হেমদিকে এখন ভালই লাগছিল মালিনীর। আগে যেসব কথাবার্তা না বুঝে বলতে গিয়ে সে হেমদির কাছে চোখের ধমক খেয়েছে বা যেসব তুচ্ছ কথা ভাল লাগে বলে বলতে এসে হেমদির তরফ থেকে কোনও সাড়া পায়নি–এখন ভুল করে সেসব কথা বলে ফেললেও হেমদি দু-চারটে কথা বলে বা হাসে। মালিনী কোথাও যেন খানিকটা প্রশ্রয় পাচ্ছিল।

সেদিন হৈমন্তীর ঘরে বসে মালিনী নাটক শুনছিল। বাইরে দেখতে দেখতে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। বিছানায় আধ-শোওয়া হয়ে হৈমন্তী ইংরাজি গল্পের বই পড়ছিল, মাথার কাছে সুন্দর একটা শেড দেওয়া বাতি জ্বলছে। হৈমন্তী এবার কলকাতা থেকে এটা এনেছে, লণ্ঠনের সেই মেটেমেটে আলোতে ঘরটা এ-রকম দেখাত না, কাচের সাদা শেড পরানো এই নতুন বাতিতে অনেক সুন্দর পরিষ্কার দেখাচ্ছে।

মালিনী রেডিয়োর সামনে ছোট একটি টুলে বসে। কোলে পশম, হাতে কাঁটা। নাটক শুনতে শুনতে তার পশম বোনা থেমে গিয়েছিল। হৈমন্তী তাকে কলকাতা থেকে উল এনে দিয়েছে, মালিনী বলেনি, নিজেই এনেছে হৈমন্তী, এনে নিজের হাতে নতুন একটা বোনা শিখিয়ে দিয়ে বলেছে, শীতের আগে শেষ করে ফেলল। গায়ে দেবে।

বোনা প্রায় শেষ, এতদিনে শেষ হয়েও যেত, কোথায় একটা গোলমাল হয়ে যাওয়ায় অনেকটা খুলে ফেলতে হয়েছিল, আবার বুনতে হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

নাটক যখন হচ্ছিল হৈমন্তী মাঝে মাঝে বই বন্ধ করে শুনছিল, আবার পড়ছিল। নাটক শেষ হয়ে যাবার মুখে বইটা বন্ধ করে বালিশের পাশে রেখে হৈমন্তী সোজা হয়ে বসল। তার পা ছড়ানো, হাঁটু গুটোনো, পিঠ সামান্য নোয়ানো, দুটি হাত দুপাশ থেকে হাঁটুর কাছে এসে আঙুলে আঙুলে জড়ানো। রেডিয়োর দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে শেষটা শুনছিল। মালিনীও শুনছে।

সামান্য পরেই নাটক শেষ হল। মালিনী এতক্ষণ যে নিশ্বাস চেপে রেখেছিল এবার শব্দ করে সেই নিশ্বাস ফেলল, মুখটি কয়েক মুহূর্ত কেমন অন্যমনস্ক দেখাল।

নাটকের পর কী যেন একটা শুরু হয়েছিল, হৈমন্তী রেডিয়ো বন্ধ করে দিতে বলল। মালিনী বন্ধ  করে দিল। তাকে রেডিয়ো খুলতে বা বন্ধ করতে বললে মালিনী ছেলেমানুষের মতন এক সুখ পায়। হৈমন্তীর কাছে দেখে দেখে এ দুটো জিনিস সে শিখেছে।

হৈমন্তা ছোট করে হাই তুলল, তুলে আলস্য ভেঙে বিছানা থেকে নামল। তার গায়ে মেয়েলি, সাধারণ একটা শাল জড়ানো, শালের রংটি ঘন কালো। গায়ের সাদা শাড়ির ওপর কালোটি আরও প্রখর হয়ে ফুটছিল। হৈমন্তী আজ চুল বাঁধেনি, এলো করে ঘাড়ের কাছে জড়িয়ে রেখেছিল।

মালিনী কী যেন বলব বলব করছিল, কিন্তু চটিটা পায়ে গলিয়ে টর্চটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে হেমদি কলঘরে যাচ্ছে বলে এখন কিছু বলল না।

একটু পরেই হৈমন্তী ফিরে এল। ফিরে এসে বলল, বাইরে বেশ শীত পড়েছে।

মালিনী মাথা নাড়ল, যেন সে জানে বাইরে বেশ শীত

পড়েছে। হৈমন্তী আবার বিছানায় উঠে বসল।

মালিনী বলল, শেষটায় যে কী ছাই হল বুঝলাম না।

হৈমন্তী কথার জবাব না দিয়ে বালিশের ওপর থেকে বইটা আবার তুলে নিল।

মালিনী হৈমন্তীর জবাবের প্রত্যাশায় থেকে শেষে বলল, লোকটা কি পালিয়ে গেল?

পালিয়ে যাবে কেন, মরে গেল, গাড়ি চাপা পড়ে…

 ও! ..কী জানি, আমি ভাবলাম পালিয়ে গেল।

তুমি ওই রকমই ভাব।

মালিনী অপ্রস্তুত হল না, লজ্জাও পেল না। বরং হেসে বলল, অত গাড়ির শব্দ চেঁচামেচিতে কি কিছু বোঝা যায়। তার ওপর খালি ইংরাজি বলছে।

হৈমন্তী বইয়ের পাতা হারিয়ে ফেলেছিল, খুঁজতে লাগল।

কথা বলার লোক সামনে থাকলে মালিনী বেশিক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। বলল, হেমদি, আমি এই রকম একজনের কথা জানি৷

হৈমন্তী তার হারানো পাতা খুঁজে পেল। রহস্যটা এখনও মাঝামাঝি অবস্থায়।

শ্রোতার মনোযোগর ওপর মালিনীর লক্ষ ছিল না, সে ঘটনাটা বলতে লাগল। অনেক দিন আগে, বুঝলেন হেমদি, আমরা তখন ছোট, এদিকে এত বাড়ি-টাড়িও হয়নি; তখনও লোকে পুজোর পর শীতের দিকে এখানে শরীর সারাতে আসত। একবার একজনরা এল–স্বামী স্ত্রী। দুজনেই দেখতে বেশ সুন্দর। খুব ঘুরত বেড়াত, হাটবাজার করত, কলের গান বাজাত; বউটা কত রকম করে যে সাজত! ওরা বলত শরীর সারাতে এসেছে। বেশ ছিল দুটিতে। হঠাৎ একদিন হই হই, ওদের বাড়ির সামনে কী ভিড়, পুলিশ-টুলিশ পর্যন্ত এসে পড়ল। ওমা, শেষে শুনলাম, ওই বউটা অন্য লোকের বউ, এর সঙ্গে চলে এসেছে; যার বউ সে খোঁজ পেয়ে হঠাৎ এসে হাজির। বাব্বা, সে কী কাণ্ড!

হৈমন্তী বইয়ের পাতা থেকে চোখ ওঠাল, মালিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, তার সঙ্গে এর কী?

একই তো, মালিনী অবাক হয়ে বলল, এও তো অন্য লোকের বউকে ভুলিয়ে নিয়ে যাবার ফন্দি আঁটছিল।

হৈমন্তী বিরক্ত বোধ করলেও না হেসে পারল না। বলল, তুমি কিছু বুঝতে পারোনি। ভুলিয়ে নিয়ে যাবার ফন্দি কেউ আঁটেনি।

বারে, অতবার করে বলছিল।

বলেনি, লোকটা ভাবছিল। মনে মনে কী ভাবছে তা আমরা জানব কী করে, তাই মুখে বলছিল, ওটা ওর মনের ভাবনা।

মালিনী এবার যেন বুঝতে পারল, যদিও তাতে তার লাভ কিছু হল না। বলল, মনেই ভাবুক আর যাই করুক লোকটা খারাপ।

হৈমন্তী কৌতুক অনুভব করল। খারাপ তো সে কিছু করেনি।

খারাপ নয়! মালিনী চোখ বড় বড় করে তাকাল, তারপর বলল সব জেনেশুনে একজনের বউকে ঠকাচ্ছে, খারাপ নয়?

হৈমন্তী বুঝতে পারল মালিনীকে এই বিষয়টা তার পক্ষে বোঝানো মুশকিল। অনেক বকবক করতে হবে। বললেও মালিনী যে বুঝবে তা নয়। কতক সাদামাটা সরল ধারণা ও সংস্কার নিয়ে সে মানুষ হয়েছে, তাকে এত সহজে ভাল-মন্দের জটিলতা বোঝানো যাবে না। হৈমন্তী সে-চেষ্টা করল না, শুধু হেসে বলল, তুমি এসব বুঝবে না। নাও, চুপ করো। বইটা শেষ করি।

মালিনী চুপ করল। হৈমন্তী আবার বইয়ের পাতায় চোখ নামাল।

কয়েকটা লাইন পড়ল হৈমন্তী, কিন্তু মনের মধ্যে কোথাও অস্বস্তি বোধ করছিল; যেন তার কিছু বলা উচিত ছিল মালিনীকে, সে বলেনি। বার বার এই উচিত বোধটা তাকে পীড়ন করছিল। হৈমন্তী অন্যমনস্ক হল, কী ভাবল সামান্য, আবার বইয়ের পাতায় মন বসাবার চেষ্টা করল। পারল না। কোথায় যেন খুঁত খুঁত করছিল। বইয়ের পাতায় আঙুল রেখে মুখ তুলে হৈমন্তী প্রথমে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মুখ ফিরিয়ে মালিনীকে দেখল। সে যা বলতে চায় তা মালিনীর কাছে বলতে বা আলোচনা করতে তার মর্যাদায় বাধছিল। মুখে আটকাচ্ছিল। আসলে নাটকের দ্বন্দ্বটা ভালবাসার। লোভ দুর্বলতা সত্ত্বেও যা ভালবাসাই।

মালিনী পশম-বোনা থেকে মুখ ওঠাতেই হৈমন্তীর সঙ্গে চোখাচুখি হল। হেমদি তার দিকে তাকিয়ে কী দেখছে বুঝতে না পেরে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।

হৈমন্তী কেমন বিব্রত হল। চোখ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হল না; বরং নিজের বিব্রত ভাবটা যাতে মালিনী ধরতে না পারে, জোর করে মুখে সামান্য হাসি টেনে হৈমন্তী কিছু চাপা দেবার জন্যে তাড়াতাড়ি বলল, তুমি আর কদিন লাগাবে ওটা শেষ করতে?

মালিনী পশমের বোনাটা তুলে দেখাল। হয়ে গেছে, গলার কাছটায় একটু বাকি। হাতও সেরে ফেলেছি।

শীতে পরতে পারলে হয়।

মালিনী এমন মুখ করে হাসল যেন মনে হল, হেমদি যে কী বলে! কতটুকু আর বাকি, দু-তিন দিনের মধ্যেই সব হয়ে যাবে। মালিনী কী ভেবে বলল, একটা কথা বলব, হেমদি?

না করলে কী তুমি বলবে না? হৈমন্তী কৌতুক করে হাসল।

এটা শেষ হয়ে গেলে প্রথমে আপনি পরবেন।

 আমি?

পরবেন এক বেলা! …আমার খুব ভাল লাগবে।

তুমি পরলে যে আমার আরও ভাল লাগবে।

তা তো লাগবেই। আপনি আমার জন্যে এনেছেন। …আপনি একটু গায়ে দিলে আমার খুব আনন্দ হবে, হেমদি। আমি তো আপনাকে কখনও কিছু দিতে পারব না।

হৈমন্তী দুর্বলতা অনুভব করছিল। অস্বস্তি হচ্ছিল। তুমি আজকাল বড় কথা বলতে শিখেছ।

মালিনীর চোখ দুটি স্নিগ্ধ সরল অথচ কত যেন কৃতজ্ঞের মতন দেখাল। মালিনী বলল, আমি কিছুই বলি না, হেমদি। আপনি রাগ করবেন ভেবে কিছু বলি না। কত কথা বলতে ইচ্ছে করে। …একটা কথা বলব?

বলো।

 এবারে কলকাতা থেকে এসে আপনি কেমন একটু হয়ে গেছেন। কেমন? হৈমন্তী মুখ টিপে হাসল।

আগে আমার মনে হত আপনি আমাদের এখানে বেশি দিন থাকবেন না, চলে যাবেন। এখন মনে হয় আপনি থাকবেন।

হৈমন্তী বুঝতে পারল না মালিনীর এ ধারণা কী করে হল। এমনকী সে স্পষ্ট বুঝতে পারল না, মালিনীর আগের কথার সঙ্গে পরের কথার সম্পর্ক কী!

হৈমন্তী বলল, কলকাতা থেকে এসে আমি কী হয়েছি তাই বলো।

 মালিনী যেন কী বলবে বুঝতে পারল না। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একমুখ হাসি নিয়ে বলল, আপনি আরও ভাল হয়েছেন। …আগে আপনাকে আমার ভয় ভয় করত, এখন তেমন করে না।

হৈমন্তী অন্যমনস্কভাবে বলল, কেন?

 বা রে, আপনি যে আমাদের–আমাকে ভালবাসেন।

 হৈমন্তী মালিনীর চোখের দিকে তাকাল।

.

রাত্রে বিছানায় শুয়ে হৈমন্তী ভাবছিল; ভাবছিল কলকাতা থেকে ফিরে আসার পর সকলেই তার পরিবর্তন দেখছে। এই পরিবর্তন যে স্পষ্ট কী তা তারা জানে না, হৈমন্তী জানে। এই পরিবর্তনের অনেকটা তার ইচ্ছাকৃত, কখনও কখনও জোর করে সে কিছু প্রমাণ করতে চায়। হয়তো দেওয়ালির সময় গগন এলে হৈমন্তীকে আরও কিছু করতে হত, তাতে ইতরবিশেষ তারতম্য কী ঘটত সে জানে না। দেওয়ালির সময় গগন আসতে পারল না। মার শরীর খারাপ হয়েছিল, জ্বরজ্বালা; মামার শরীরও ইদানীং তেমন ভাল যায় না। দুজনেরই বয়স হয়ে গেছে, দুশ্চিন্তা উদ্বেগ এমনিতেই থাকে, অসুখ-বিসুখ করলে ভাবনা বাড়ে। গগন আসতে পারেনি। লিখেছে ক্রিসমাসের সময় আসবে। সেই সময়টা আরও ভাল হবে বেড়াবার পক্ষে।

গগন এখানে ঠিক যে বেড়াতেই আসছে তা নয়। মার তরফ থেকে সে কিছু বোঝাপড়া সারতে আসছে সুরেশ্বরের সঙ্গে। এই বোঝাপড়া যে কী হতে পারে হৈমন্তী তা অনুমান করতে পারে। কিন্তু মাকে সে এসব কথা বলতে চায়নি, বলেনি। বলে লাভ হত না। মা ভাবত, হেম বরাবর যা করেছে এখনও তাই করতে চাইছে, নিজের ভালমন্দ, সংসারের উদ্বেগ দুশ্চিন্তার কথা না ভেবে নিজের জেদ আর ঝোঁক নিয়ে পড়ে আছে।

তা কিন্তু নয়। হৈমন্তী বরাবর জেদ ধরে কিছু করেনি। আজ সাত আট কী তারও বেশি–এতগুলো বছর জেদ ধরে বসে থাকা যায় না। জেদের কথা এটা নয়; সুরেশ্বরকে সুখী করার সব রকম চেষ্টা বরং। সুরেশ্বরের সাধ পূরণ করতে, তাকে তৃপ্ত করতে, তার প্রতি হেমের ভালবাসার জন্যে যা করার সে করেছে। তার অপেক্ষা যদি অকারণ হত অর্থহীন হত তবে সে এই অপেক্ষা করতে পারত না।

গুরুডিয়ায় এসে হৈমন্তী বুঝতে পেরেছে সুরেশ্বর তাকে অকারণে অপেক্ষা করিয়েছে। সুরেশ্বর এখন পূর্বের দুর্বলতা থেকে মুক্ত। কিন্তু সে দুর্বলতা না থাকলে সুরেশ্বর কোন অধিকারে তাকে এখানে টেনে আনল?

কলকাতায় গিয়ে হৈমন্তী তার মন স্থির করে ফেলেছিল। সুরেশ্বরের আশ্রম সে এখনই ছেড়ে আসবে না। মা বা মামার কাছে সে দেখাতে চায় না, হৈমন্তীর এতদিনের বিশ্বাস ও প্রেম ব্যর্থ হয়েছে। তা ছাড়া সুরেশ্বরের সঙ্গে তার মর্যাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সে হেরে যেতে চায় না। সে উপকৃত এবং কৃতজ্ঞ শুধুমাত্র এই বোধেই সে সুরেশ্বরকে কিছু প্রাপ্য দিচ্ছে এ যেন সুরেশ্বর অনুভব করতে পারে।

হৈমন্তী মনে মনে ভেবে নিয়েছিল; তার এই দীর্ঘ অপেক্ষা, বিশ্বাস ও ভালবাসার মূল্য যেমন সুরেশ্বরের কাছে নেই, তেমনই সুরেশ্বরের অন্ধসেবার কোনও মূল্য তার কাছে থাকতে পারে না। এই সেবা, দয়া, ধর্ম, পুণ্য–যাই হোক, তার জন্যে সুরেশ্বরের যত দুর্বলতাই থাক হৈমন্তীর থাকবে না। সুরেশ্বরের এই অতীব দুর্বলস্থানে হৈমন্তীর পরম অবহেলা ও উপেক্ষা থাকবে।

গুরুডিয়ায় ফিরে এসে হৈমন্তী তার বিমর্ষ ভাব আর প্রকাশ করছে না। যেন তার বিমর্ষতার কোনও কারণ থাকতে পারে না। সে নিস্পৃহ, আশ্রম তার কিছু নয়, তার বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই আশ্রমে, রোগী এলে দেখবে, তার কাজ হাসপাতালেই শেষ, তার বাইরে নয়–এই মনোভাবে তার ভাল লাগছিল। নিজের নিঃসঙ্গতার মধ্যে সে ডুবে থাকবে না। হয়তো হৈমন্তী তাও স্থির করে নিয়েছিল। একটি-দুটি নিজস্ব সঙ্গীও তার প্রয়োজন।

.

১৫.

অন্ধ হাসপাতালের কাজের বাঁধাধরা সময় বলে এতদিন কিছু ছিল না। থাকা সম্ভবও নয়। তবু ওরই মধ্যে মোটামুটি যে সময়টা ছিল সেটা সকালের দিকে, বেলা পর্যন্ত। দেহাত, গাঁ গ্রাম, আশেপাশের পঁচিশ-ত্রিশ মাইল এলাকা থেকে একে একে রোগী এসে জুটতে জুটতে বেলা হয়ে যেত। সকালের প্রথম বাসটা গুরুডিয়ায় আসে সাতটা নাগাদ, তারপর যেটা আসে সেটা এসে পৌঁছতে সাড়ে দশ, কোনও কোনওদিন এগারোটা। যেমন করেই আসুক, যাতেই আসুক, যারা চোখ দেখাতে আসত তারা নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে এসে পৌঁছতে পারত না, হেরফের হত। হাটের দিন ইদানীং যে রকম অবস্থা দাঁড়িয়েছিল তাতে দুপুরেও রুগি আসত, দুপুরের পরও, হাটের পথেই যেন কাজটা সেরে যেত।

শীত পড়ে যাওয়ায় নানা রকম অসুবিধে হচ্ছিল। সকালের বাসে বড় কেউ এসে পৌঁছতে পারত, বাসের ভরসায় যারা বসে থাকত তাদের আসতে বড় বেলা হয়ে যেত। অন্য যারা-গোরুর গাড়িতে কিংবা লাঠটা থেকে হেঁটে আসত তারাও সব একে একে আসছে, যার যেমন সুবিধে। শীতের বেলা, দেখতে দেখতে দুপুর হয়ে আসত। তার ওপর মোটামুটি কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন রোগী হলেও একটা কথা ছিল; এক একটি রোগীর পিছনে হৈমন্তীকে যে সময় ব্যয় করতে হত তাতে কলকাতার হাসপাতালে তিনটে রোগীর চোখ দেখা হয়ে যায়। দেহাতের মানুষ, যত সরল তত বোকা, আর অসম্ভব ভিতু। চোখের ওপর আলো ফেলার আগেই তাদের কী আতঙ্ক!

সাধারণত হাসপাতালের কাজ সেরে ফিরতে হৈমন্তীর দুপুর হয়ে যেতে লাগল। হাটের দিন দুপুরটাও তার হাসপাতালে কাটাতে হত। এক আধ দিন এমন হয়েছে–দুপুরের পর হৈমন্তী ফিরেছে, হঠাৎ হাটফেরত গরুর গাড়ি করে কেউ এল, ঠিক যেমন করে হাটের পর তারা বেচা-কেনার পয়সা নিয়ে স্টেশনের দোকানে সওদা করতে যায়।

স্বভাবতই, এই সব কারণে, হৈমন্তীর নানা রকম অসুবিধে হতে লাগল। স্নান খাওয়া, বিশ্রামের মোটামুটি একটা নিয়ম সে মানতে পারছিল না। অথচ দীর্ঘদিন সে এই অভ্যাস পালন করে আসছে। অসুখের পর থেকে এই ধরনের কোনও কোনও নিয়মে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, এবং এ বিষয়ে তার কিছু মানসিক দুর্বলতাও জন্মে গিয়েছিল।

একদিন দুপুরের পর, আর-একদিন হাটবারে বিকেল করে দুই রোগী আসায় সে ফিরিয়ে দিল, দেখল না। তারপর যুগলবাবুকে বলে দিল, সকাল আটটা থেকে বারোটার মধ্যে, আর হাটবারের দিন একটা পর্যন্ত যেসব রোগী আসবে শুধু তাদেরই দেখবে হৈমন্তী। এটাই হাসপাতালের নির্দিষ্ট সময়। সকলকেই এই নিয়ম মানতে হবে, যুগলবাবু যেন সকলকেই তা বুঝিয়ে দেন।

কথাটা সুরেশ্বরের কানে গেল। এর আগে রোগী ফিরিয়ে দেবার সংবাদও তার কানে গিয়েছিল। সুরেশ্বর হয়তো বিরক্ত হয়নি, কিন্তু কেন যেন ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, বিষয়টা নিয়ে হৈমন্তীর সঙ্গে তার কয়েকটা কথা হওয়া দরকার। আগে সন্ধের দিকে হৈমন্তী প্রায় রোজই তার ওখানে আসত, গল্প-টল্প করত; আস্তে আস্তে আসা-যাওয়া হৈমন্তী কমিয়ে দিয়েছিল। কিছুকাল ধরে সে বড় একটা আর আসছিল না। পুজোর পর কলকাতা থেকে ফিরে সে দু-চার বার এসেছে, কিন্তু ইদানীং একেবারেই নয়। সকালে কোনওদিন হাসপাতাল ঘরে, কোনওদিন রোগীদের ঘরের দিকে সুরেশ্বরের সঙ্গে হৈমন্তীর দেখা হয়েছে। অন্ধ আশ্রমের নতুন কাজকর্ম নিয়ে সুরেশ্বর নিজেও খুব ব্যস্ত। আশ্রমের মধ্যে মাঠে ঘাটে দেখা হয়ে গেলেও তেমন কোনও কথাবার্তা দুজনের মধ্যে হয়নি। হৈমন্তীর সুবিধে-অসুবিধের কথা কিছু বলেনি হৈমন্তী।

সুরেশ্বর কথাটা বলার জন্যে হৈমন্তীকে ডেকে পাঠাতে পারত। কিন্তু সুরেশ্বরের যে ধরনের স্বভাব তাতে এধরনের কথাবার্তা বলার জন্যে হৈমন্তীকে ডেকে পাঠানো তার উচিত মনে হল না। তা ছাড়া, হৈমন্তীর ঘরের দিকে সে বড় একটা যায়নি কখনও। মাঝে মাঝে তারও যাওয়া উচিত।

সেদিন সন্ধেবেলা সুরেশ্বর হৈমন্তীর ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল।

হৈমন্তীর ঘরের দরজায় পরদা ঝুলছে, আলো জ্বলছে ভেতরে, রেডিয়োতে গান হচ্ছিল, মৃদু সুরে পুরুষালি গলায় কেউ গান গাইছে। কৃষ্ণপক্ষ, অগ্রহায়ণের শেয, বাইরে বেশ শীত।

সুরেশ্বর সামান্য সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গানটি শুনছিল। এই গান তার বহুশ্রুত, কথাগুলি, এখনও মনে আছে, সুরও হয়তো ভুলে যায়নি সুরেশ্বর। শুনতে বড় ভাল লাগছিল সুরেশ্বরের।

গান শেষ হলে সুরেশ্বর ডাকল, হেম।

ঘরের মধ্যে মালিনী ছিল, সুরেশ্বরের গলা পেয়ে তাড়াতাড়ি দরজায় এসে পরদা সরাল। মালিনী যেন অবাক, সামান্য অপ্রস্তুত। সুরেশ্বরকে ভেতরে আসতে বলতে পারল না মালিনী, শুধু পরদাটা আরও তুলে ধরল।

সুরেশ্বর ঘরে ঢুকল।

 হৈমন্তী বিছানার ওপর উঠে বসেছে, পায়ের দিকে একটা হালকা কম্বল ছিল, পাট ভাঙা; বোঝাই যায় পায়ের ওপর টেনে নিয়ে শুয়ে বা বসে ছিল।

বিছানা থেকে নেমে পড়ল হৈমন্তী। মালিনী বিব্রতভাবে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল।

জানলার দিকে চেয়ারের কাছে এগিয়ে যেতে যেতে সুরেশ্বর বলল, বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গানের শেষটুকু শুনছিলাম।

হৈমন্তীর বেশবাসে সামান্য অবিন্যস্তভাব ছিল; গায়ের আঁচলটা ঢিলেঢালা, তার ওপর ছোট হালকা শাল জড়ানো। কোমরের কাছে আঁচলের কাপড় অনেকটা ঝুলে আছে, কুঁচি দিয়ে শাড়ি না পরার জন্যে সামনে কোনও কোঁচ ছিল না। একেবারে সাধারণভাবে ঘরোয়া করে শাড়ি পরা। মাথায় উঁচু করে খোঁপা বাঁধা। হৈমন্তীর চোখ মুখ, মাথার চুল শুকনো ও লালচে দেখাচ্ছিল।

নিজের অবিন্যস্ত ভাবটা শুধরে নিয়ে হৈমন্তী রেডিয়ো বন্ধ করে দিতে গেল। সুরেশ্বর বাধা দিল, বলল, থাক না; গানটা শুনি।

হৈমন্তী রেডিয়োর সামনে দাঁড়িয়ে, সুরেশ্বর জানলার কাছে চেয়ারটিতে বসেছে। বসে অল্প অস্বস্তিবোধ করে হাত বাড়িয়ে জানলার বন্ধ পাট খানিকটা খুলে দিল। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ও শীত এল দমকা।

রেডিয়োতে গান হচ্ছিল; আমার মাঝে তোমার লীলা হবে..

সুরেশ্বর এভাবে আসবে, আচমকা, হৈমন্তী ভাবেনি। খুব কম, আঙুলে গুণেই বলা যায় হয়ত, সুরেশ্বর কদিন তার ঘরের বারান্দায় বা ঘরে পা দিয়েছে। এভাবে হুট করে এসে পড়ে হৈমন্তীকে যে খানিকটা বিব্রত করেছে সন্দেহ নেই। হৈমন্তীর শরীর ভাল নেই, বিছানায় পায়ের ওপর কম্বল দিয়ে শুয়ে ছিল, বইও পড়ছিল না আজ, মালিনী বসে ছিল, তার সঙ্গে গল্প করছিল।

হঠাৎ সুরেশ্বর এখানে কেন? কতক্ষণ বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছে? এত মন দিয়ে গান শোনারই বা কী হল তার? …হৈমন্তী সুরেশ্বরকে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করল। সুরেশ্বর একমনে গান শুনছে। শীত এমন কিছু কমনয়, তবুসুরেশ্বরের গায়ে হাতকাটা ছোট একটা ফতুয়া ধরনের গরম জামা ছাড়া পশমের কিছু নেই। পায়ের চটিটাও দরজার কাছে খুলে এসে খালি পায়ে বসে আছে।

হৈমন্তী আরও কয়েক মূহুর্ত রেডিয়োর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে পাশের টুলটার ওপর বসল, মালিনী সেখানে নিত্য বসে। তার ঠাণ্ডা লাগছিল, বিছানা ছেড়ে নীচে নেমে আসায় পায়ের পাতা কনকন করছিল।

গান শেষ হল। …কী একটা অন্য জিনিস শুরু হতেই রেডিয়োটা বন্ধ করে দিল হৈমন্তী।

সুরেশ্বর যেন খুবই পরিতৃপ্ত হয়েছে, মুখ জুড়ে স্মিত হাসি, গানের থেকেই একটা কলি আবৃত্তি করল; আনন্দময় তোমার এ সংসার, আমার কিছু আর বাকি না রবে।

হৈমন্তী সুরেশ্বরের মুখের দিকে তাকাল, চোখ লক্ষ করল।

সুরেশ্বর বলল, এ একটা ভাল ব্যবস্থা করেছ। মাঝে মাঝে তোমার এখানে এসে গান শুনে যাব।

একসময়ে সুরেশ্বরের সঙ্গীতপ্রীতি ছিল। নিজেও সে একটু আধটু চর্চা যে না করেছে এমন নয়। হৈমন্তীর এসব অজানা ছিল না। কিন্তু এখনও যে সুরেশ্বরের সঙ্গীতপ্রীতি আছে হৈমন্তীর তা জানা ছিল না। মালিনীর কাছে অবশ্য শুনেছে, সুরেশ্বরকে নাকি আপনমনে অনুচ্চ কণ্ঠে গান গাইতে কখনও কখনও শোনা যায়; তেমন ভাগ্য, সে গান শোনার ভাগ্য, হৈমন্তীর এখানে এসে পর্যন্ত যদিও হয়নি৷ হৈমন্তী মনে মনে কেমন উপহাস বোধ করল; অন্ধ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা সুরেশ-মহারাজ (বিজলীবাবু বেশ বলেন, হৈমন্তীর হাসি পায়) সাধারণ গানের ভক্ত এ যেন কেমন কথা!

সুরেশ্বর এবার বলল, বাইরে দাঁড়িয়ে আগের গানটা শোনার সময় আমার মনে হল, এখনও যেন সুরটা মোটামুটি মনে আছে। .. বলে সুরেশ্বর দু মুহূর্ত থেমে যেন অত্যন্ত সারল্যে এবং খুশিতে মৃদু সুরে গাইল; সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে। গেয়ে থেমে গেল।

হৈমন্তী অতিমাত্রায় বিস্মিত হল। অপলকে তাকিয়ে থাকল মানুষটির দিকে। গলা যেমনই হোক, সুরের ভুলচুক যাই ঘটুক তবু ওই মানুষ এখনও গান গাইতে পারল। লোকমুখে শুনলে বিশ্বাস হত না, কানে শুনেও যেন হৈমন্তীর বিশ্বাস হচ্ছিল না। সুরেশ্বর এক সময় এসব গান যে গাইত, হৈমন্তী জানে।

স্মৃতির মধ্যে ক্ষণিকের জন্যে সুরেশ্বরের সেই পুরনো চেহারাটি ফুটে উঠে আবার মিলিয়ে গেল।

সুরেশ্বর বলল, এই গানটা আমার মারও খুব পছন্দ ছিল। …তবু মার অহঙ্কার কোনওদিন ঘঘাচেনি।

হৈমন্তী গায়ের শাল আরও একটু ঘন করে নিল।

সুরেশ্বর হৈমন্তীর ঘর দেখতে লাগল। ইদানীং আসা হয়নি ঘরে। বিছানার ওপর মোটা কভার, ছোট টেবিলে লেসের কাজকরা ঢাকনা, নতুন বাতি, জানলায় পরদা, একপাশে আলনা, বইপত্র সাজানো রয়েছে অন্য পাশে, কিছু বা একধারে পড়ে আছে।

দেখতে দেখতে সুরেশ্বর বলল, তোমার এই ঘরটায় কুলোচ্ছে না, না হেম?

হৈমন্তী প্রথমে কোনও জবাব দিল না; পরে বলল, হয়ে যাচ্ছে.. বলে কাশল। তার কাশির শব্দ কানে লাগে।

অসুবিধে হচ্ছে। হচ্ছে না?

তেমন কিছু না।

হৈমন্তীর চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সুরেশ্বর এবার বলল, তোমার শরীর খারাপ! গলা ভার ভার লাগছে।

নতুন শীত; ঠাণ্ডা লেগেছিল।

জ্বর হয়েছিল?

অল্প; ছেড়ে গেছে। হৈমন্তীর বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল সে খুব নির্লিপ্ত, নিরুত্তাপ।

হৈমন্তীর চোখ মুখ লক্ষ করতে করতে সুরেশ্বর বলল, তোমার মুখটাও এখনও ফুলে রয়েছে। …ওভাবে জড়সড় হয়ে আছ কেন? শীত করছে?

হৈমন্তীর শীত করছিল। পায়ের পাতা দুটো কনকনে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়ে গা সিরসির করছে।

ওষুধপত্র কিছু খেয়েছ? সুরেশ্বর জিজ্ঞেস করল।

মাথা নোয়াল হৈমন্তী; খেয়েছে। তার শরীর অসুস্থ এটা যেন সুরেশ্বরের অনেক দেরিতে চোখে পড়েছে। মনে মনে হৈমন্তী বিরক্তি বোধ করল কেমন।

বিছানায় ছিলে, বিছানাতেই গিয়ে বোসো না। সুরেশ্বর বলল।

 থাক।

তোমার শরীর খারাপ আমায় তত কেউ বলেনি।

বলার মতন কিছু না।

সুরেশ্বর যেন অন্যমনস্ক হল সামান্য। পরে বলল, এখানকার শীত সওয়া নেই তোমার; গোড়ায় ঠাণ্ডা-ফাণ্ডা লাগবে, সইয়ে নিতে হবে ধীরে ধীরে।

এমন সময় মালিনী এল। দুকাপ চা নিয়ে এসেছে। এটা তার নিজের বুদ্ধিতে ঠিক নয়, খানিকটা আগে হৈমন্তী তাকে চায়ের কথা বলেছিল, সুরেশ্বর আসার আগেই। সাধারণত এসময় একবার ওরা চা খায়। তা ছাড়া হৈমন্তীর গলা অল্প ব্যথা ব্যথা করছিল, মাথাও সামান্য ধরে আছে।

সুরেশ্বর চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেসে মালিনীকে বলল, খাতির নাকি?

মালিনী সঙ্কুচিত হল। বলল, হেমদি আগেই চা খেতে চেয়েছিলেন।

 ও! …তা রোজ বুঝি গানবাজনা শোনা হচ্ছে?

মালিনী নিচু মুখে সামান্য মাথা হেলাল।

হেমের শরীর খারাপ আমায় বলোনি তো?

মালিনী চুপ। হেমদি সম্পর্কে দু-একটা কথা আগে সে সুরেশ্বরকে বলত। হেমদি জানতে পেরে খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিল। হেমদির সর্দিজ্বরের কথাটা অবশ্য সে একবার ভেবেছিল সুরেশ্বরকে বলবে, তারপর আর বলা হয়ে ওঠেনি, জ্বর ছেড়ে গিয়েছিল বলেই বোধ হয়।

হৈমন্তীর হাতে চায়ের কাপ দিয়ে মালিনী চলে গেল আস্তে আস্তে।

চা খেতে খেতে সুরেশ্বর আবার হৈমন্তীকে বিছানায় গিয়ে বসতে বলল। হৈমন্তী উঠল না, এক সময়ে, দিনের পর দিন সুরেশ্বরের চোখের সামনে সে বিছানায় শুয়ে বসে থেকেছে, সুরেশ্বর তার মাথার কাছে কখনও, কখনও বালিশের পাশে বিছানায় বসে থেকেছে। আজ হৈমন্তীর সে বয়েস নেই, সেই অবস্থাও না।

সুরেশ্বর এবার কথাটা তুলল, হেম, তোমার সঙ্গে একটা কথা আলোচনা করতে এলাম। কিন্তু তুমি ওভাবে বসে থাকলে বলি কী করে! …তোমায় ওই কম্বলটা এনে দেব?

সমস্ত ব্যাপারে সুরেশ্বরের এই নম্র, মধুর, শিষ্ট কথাবার্তা ও আচরণ একসময়ে হৈমন্তীর পছন্দ হত। এখন হয় না। এখন মনে হয় এ এক ধরনের কৃত্রিমতা, মানুষকে মোহিত করার, বশ করার কৌশল। হৈমন্তী সন্দিগ্ধ হল। হঠাৎ সুরেশ্বরের এখানে আসা, এসে খুশি মনে গান শোনা, গান শুনে নিজেও কৌতুক করে একটু গান গাওয়া, তারপর ক্রমে ক্রমে অবস্থাটা সইয়ে নিয়ে বলা–হেম তোমার সঙ্গে একটা ব্যাপারে আলোচনা করতে এলাম–এর অর্থটা কী? কীসের আলোচনা?

হৈমন্তী নিতান্ত বাধ্য হয়ে বিছানার ধারে গিয়ে বসল, বসে কোলের ওপর দিয়ে কম্বলটা পায়ে চাপা দিল।

সুরেশ্বর বলল, শুনলাম তুমি হাসপাতালে চোখ দেখানোর একটা বাঁধাবাঁধি সময় করে দিয়েছ?

 হৈমন্তী তাকাল, স্থির চোখ রেখে সুরেশ্বরের মুখভাব দেখল। তা হলে এই? হাসপাতালের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে এসেছে? …জানতাম তুমি আসবে, মনে মনে ভাবল হৈমন্তী, কৈফিয়ত চাইতে আসবে।

হ্যাঁ, সময় বেঁধে দিয়েছি, হৈমন্তী বলল।

সুরেশ্বর শান্তভাবেই বলল, তোমার যে খুব অসুবিধে হচ্ছিলতা বুঝতেই পারছি। কিন্তু, আমি বলছিলাম, ওদের কথা ভেবে অন্য কিছু করা যায় না? সুরেশ্বর এমনভাবে বলল যেন মতামত চাইছে। কিন্তু হৈমন্তী জানে মতামত নিতে সুরেশ্বর আসেনি, তার মতামত ব্যক্ত করতে এসেছে।

না, আর কিছু করা যায় না, হৈমন্তী শক্তভাবে বলল। মনে মনে যেন সে ঠিক করে নিয়েছে সে যা স্থির করেছে তার জন্যে শেষ পর্যন্ত শক্ত থাকবে।

সুরেশ্বর জোর গলায় কিছু বলল না, শান্ত গলায়, হৈমন্তীকে যেন বোঝাচ্ছে, নরম গলায়, প্রায় অনুরোধ করার মতন বলল, আমি জানি হেম, ওদের সময়জ্ঞানটা কম। কিন্তু তুমি তো জানোই কীভাবে সব আসে, কত দূর দূর থেকে। নানা,ঝঞ্জাট করে আসা, গাড়ি-টাড়ি পায় না ঠিক মতন।

হৈমন্তী বিরক্ত হল, কী বলতে চায় সুরেশ্বর? সারাটা দিন ওই রোগীদের নিয়ে তাকে থাকতে হবে নাকি? হৈমন্তী বলল, হাসপাতালের একটা নিয়ম থাকে।

থাকে, তবে সেসব হল শহরের হাসপাতাল। এটাকে তুমি সেভাবে ধরছ কেন?

কীভাবে ধরব?

 তর্কের কথা নয়, হেম। আমি ওদের অসুবিধের কথা তোমায় জানাচ্ছি শুধু। তুমি যদি নিয়ম ঠিক করে দেবার আগে আমায় একবার জানাতে…

না জানিয়ে অন্যায় হয়েছে, হৈমন্তী বিরক্ত গলায় বলল, কিন্তু আমার পক্ষে হাসপাতালটাকে মেঠাইমণ্ডার দোকান করে রাখা সম্ভব না।

সুরেশ্বরের কপালে কয়েকটা রেখা ফুটে উঠল। তুমি কি আমাদের হাসপাতালটাকে শহরের হাসপাতাল করে তুলতে চাও?

আমি কিছুই চাই না। সব জিনিসের একটা নিয়ম থাকা দরকার। আমি তোমার রোগীদের চাকর নই যে যখন তারা ডাকবে আমায় ছুটতে হবে। আমার স্নান, খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রামের একটা সময় রাখা দরকার। হৈমন্তী উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল।

সুরেশ্বর এবার কেমন ক্ষুব্ধ হল। বলল, কত দূর থেকে সেদিন দুজন এসেছিল তুমি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছ। নিজের সামান্য অসুবিধে করেও কী তুমি তাদের দেখতে পারতে না?

হৈমন্তীর আর সহ্য হল না। প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঙ্গে বলল, না, পারতাম না। শীতের বেলা, আমি দেড়টা দুটোর সময় স্নান করে ভাত খেতে বসি। তার পরও তোমার রোগীরা যদি আসে, আমার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। তোমার রোগীরাই শুধু মানুষ নয়, আমিও মানুষ।

সুরেশ্বর কেমন যেন বিস্মিত হল। এমন রূঢ়, নির্মম, নির্দয় প্রত্যুত্তর যেন সে আশা করেনি। বলল, হেম, আমি কী তোমায় তোমার যা অসাধ্য তা করতে বলেছি? আমি শুধু বলতে এসেছিলাম, তোমার অসুবিধের কথা আমায় যদি জানাতে…

তোমায় জানাবার হলে জানাতাম।

সুরেশ্বর অবাক হল। হাসপাতালের ব্যাপারে আমায় তুমি জানাবে না…

না। হাসপাতালের রোগীদের আমি কখন দেখি, কী করে দেখি, কেন দেখি না–এসব তোমাকে জানানোর কোনও দরকার আমি মনে করি না। আমি ডাক্তার, আমার অধিকার যদি তুমি না মানো, তবে রোগী দেখা বন্ধ করে দেব।

সুরেশ্বর স্তব্ধ, নির্বাক বয়ে বসে থাকল।

1 Comment
Collapse Comments

ললিতার স্বপ্ন – এর আগে কি কোনো পর্ব আছে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *