1 of 3

০২৬. আচমকা একদিন দুপুরে

আচমকা একদিন দুপুরে জয়ন্ত এসে হাজির।

রেমি একটু অবাক হল। জয়ন্ত তার ছোট ভাই। কিন্তু তার বিয়ের পর থেকে এ বাড়িতে বাপের বাড়ির কেউ বড় একটা আসে না। কৃষ্ণকান্ত ঠারেঠোরে এটা জানিয়ে দিয়েছেন; বিয়ের পর মেয়েদের বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক যতটা ক্ষীণ হয় ততই ভাল। পালে-পার্বণে বা পারিবারিক বিয়ে উৎসবে একটু-আধটু দেখা হোক। ব্যস, তার বেশি নয়। মেয়েদের যতক্ষণ বাপের বাড়ির পিছুটান থাকে ততদিন শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক গাঢ় হয় না। আর সেই থেকেই আসে সংসারের অশান্তি। এ ব্যাপারটা রেমি মেনে নিয়েছে। তার বয়স অল্প হলেও বুদ্ধি বিবেচনা অপরিণত নয়। বাপের বাড়ির সঙ্গে এই আলগা সম্পর্কের যৌক্তিকতা সে বোঝে। আপাতনিষ্ঠুর হলেও আখেরে এতে ভালই হয়।

কৃষ্ণকান্তর এইসব অনুশাসনকে তার বাপের বাড়ির লোক ভাল চোখে দেখেনি। অপমান হিসেবেও গায়ে মেখেছে। তাই এমনিতেই কেউ বড় একটা আসে না। তারা গরিব না হলেও টাকা পয়সা বা ক্ষমতায় কৃষ্ণকান্তর ধারেকাছেও নয়। সেই সংকোচ এবং ভয়ও কিছু দূরত্ব রচনা করে থাকবে। রাগ করে যে কয়েকদিন রেমি গিয়ে বাপের বাড়িতে ছিল তাইতেই বাবা মা বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেছিল।

জয়ন্তকে দেখে রেমির বুক কেঁপে উঠল একটু। কোনও দুঃসংবাদ নয়তো!

কী রে? তুই!

জয়ন্ত ঠিক কিশোর ছেলেটি নেই। অল্প কয়দিনেই ধাঁ করে একটু লম্বা হয়ে গেছে। গালে সামান্য দাড়ি। গলার স্বর ভেঙে মোটা হয়ে গেছে। চোখে এসেছে তীক্ষ্ণ ও স্থির দৃষ্টি। পোশাকে আশাকে মেন মনোেযোগী নয়। একরাশ তেলহীন রুক্ষ চুল ঘাড় অবধি নেমেছে।

জয়ন্ত দিদির দিকে চেয়ে বলল, তোর সঙ্গে কথা ছিল।

আয়। বোস এসে। কী খাবি?

তোর বাড়িতে খাব! ও বাবা, তোর শ্বশুর টের পেলে—

যাঃ। আমার শ্বশুর কি হিরণ্যকশিপু নাকি? লোকেরা বড় বাড়িয়ে বলে ওঁর সম্পর্কে।

তুই একেবারে গেছিস।

তার মানে?

ওই বুড়ো তোকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছে। পারসোন্যালিটি বলে তোর আর কিছু নেই।

রেমি লজ্জা পেয়ে বলে, মোটেই নয়। বাইরে থেকে লোকটাকে ওরকম মনে হয়। আদর্শবাদীরা একটু তো কঠোর হবেই। কিন্তু মনটা ভীষণ ভাল।

কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী কেমন লোক তা পাবলিক জানে। তোকে অত ওকালতি করতে হবে না।

পাবলিক ছাই জানে।

জয়ন্ত একটু হেসে বলে, তোর শ্বশুর আদর্শবাদী ছিল আজ থেকে তিন যুগ আগে। এখন ওঁকে আদর্শবাদী বললে কথাটাকেই অপমান করা হয়।

রেমি একটু উষ্মর সঙ্গে বলে, আচ্ছা না হয় তাই হল। এবার কী খবর বল!

কোনও খবর-টবর নেই। আমি বাড়ির রিপ্রেজেনটিভ হয়ে আসিনি।

কোনও খারাপ খবর নেই তো!

আরে না। আমাদের নিয়ে তোকে অত দুশ্চিন্তা করতে হবে না। বরং তুই নিজেকে নিয়ে একটু ভাবলে আমাদের দুশ্চিন্তা যায়।

নিজেকে নিয়ে কী আবার ভাবব?

জয়ন্ত একটু চুপচাপ তার দিদির দিকে চেয়ে থেকে বলে, আমি বুঝতে পারছি না তুই তোর নিজের সিচুয়েশনটা সম্পর্কে কনশাস কি না।

কনশাস না হওয়ার কী?

আর ইউ হ্যাপি ইন দিস সেট আপ?

চলে তো যাচ্ছে।

আর ইউ হ্যাপি উইথ ধ্রুব চৌধুরী?

রেমি এবার রেগে গিয়ে বলে, তোর এত পাকা পাকা কথার দরকার কী বল তো! আমি হ্যাপি কি না সে আমি বুঝব।

দ্যাখ ছোড়দি, তোর যখন বিয়ে হয় তখন আমি মাইনর ছিলাম। মতামতের দাম ছিল না। তাছাড়া আমরা তত খোঁজ খবরও নিইনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোর জন্য আমাদের একটু চিন্তা করা দরকার।

কেন, এতদিন বাদে চিন্তা করার মতো কী হল?

তুই আমাদের কাছে কিছুই বলিস না। কিন্তু আমাদের কানে অনেক কথা আসে।

কী এমন কথা! তোর জামাইবাবু মদ খায়, এই তো!

সেটাও একটা পয়েন্ট।

মদ খাওয়া এই পরিবারের ট্র্যাডিশন নয়। তোর জামাইবাবু খায় বটে, তবে আমার মনে হয় সেটা শুধু নেশা করার জন্য নয়।

তবে কীসের জন্য?

অন্য কারণ আছে। অত কথা তোর মতো পুঁচকের সঙ্গে বলতে পারি না।

আমি এখন আর তত পুঁচকে নই।

আমার কাছে পুঁচকেই। না হয় একটু দাড়ি গোঁফই উঠেছে, তাই বলে কি জ্যাঠামশাই হয়ে গেছিস নাকি?

উই আর অ্যাংশাস অ্যাবাউট য়ুওর ওয়েলফেয়ার।

কেন? হঠাৎ কী হয়েছে?

জামাইবাবুর বন্ধুবান্ধবদের তুই চিনিস?

রেমি একটু ভেবে নিয়ে বলল, না। দু-একজনের সঙ্গে এক-আধবার পরিচয় হয়েছিল। এ বাড়িতে বাইরের পুরুষরা চট করে ভিতরবাড়িতে আসতে পারে না। মেয়েদের স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ কবার নিয়মও নেই।

তার মানে জামাইবাবুর বন্ধুরা এ বাড়িতে আসে না!

না। কেন বল তো!

জয়ন্ত একটু হেসে বলে, জামাইবাবু তার বন্ধুদের এ বাড়িতে আনে না কেন তা জানিস? বন্ধুদের অধিকাংশই ভদ্রলোক নয়।

রেমি একটু থতিয়ে গেল। ধ্রুবর বন্ধুদের সে চেনে না। কাজেই জোর গলায় বলার মতো কিছু নেই। মিনমিন করে বলল, ভদ্রলোক নয় কী করে বুঝলি? তুই চিনিস তাদের?

চিনি। পান্ডা নামে জামাইবাবুর এক বন্ধু আছে। অধীর পান্ডা। নাম শুনেছিস?

বললাম তো, আমি ওর বন্ধুদের চিনি না।

অধীর পান্ডার এক বোন আছে। দুর্গা। খুব খারাপ মেয়ে। স্কুলে থাকতেই দুবার পালিয়ে গিয়েছিল।

রেমির বুক কাঁপতে থাকে। তার একবার ইচ্ছে করে জয়কে থামিয়ে দেয়। সে আর শুনতে চায় না। কিন্তু কৌতূহল এক অদ্ভুত জিনিস। নিজের সর্বনাশের ভয়কেও মানে না। রেমি অস্ফুট গলায় বলল, তার সঙ্গে কী?

সেই দুর্গার সঙ্গে জামাইবাবু ইদানীং ইনভলভড।

যাঃ হতেই পারে না।

সত্যি মিথ্যে জানি না। আমি নিজের চোখে কিছু দেখিনি। কিন্তু খুব রিলায়েবল সোর্চ থেকে খবরটা পেয়েছি।

কে বলেছে তার নাম বল।

নাম বললে তুই গিয়ে তোর শ্বশুরকে লাগাবি। তোর শ্বশুর কুরুক্ষেত্র করে ছাড়বে। পারিবারিক অশান্তি হবে।

আমি ওঁকে বলব না কথা দিচ্ছি।

জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, তোর কথার দাম নেই ছোড়দি। কৃষ্ণকান্তর হিপনোটিজম তোকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। উনি কথাটা যেই শুনবেন সেই কথাটার সোর্স বের করার জন্য উঠে পড়ে লাগবেন।

আমি তোর নাম বলব না।

জয়ন্ত মৃদু হেসে বলে, আমার নাম বলতে পারিস। আমি ওকে ভয় পাই না। কিন্তু ইনফরমেশনটার সোর্স তো আমি নই। অন্য লোক। আর কে, তোদের আত্মীয়।

আমাদের আত্মীয়? কে রে?

বলেছি তো, নাম বলব না।

আমাকে কী করতে বলিস? চোখ কান খোলা রাখ। অত মজে থাকিস না।

ধ্রুব চৌধুরী খুব চরিত্রবান লোক নয়।

রেমি এই দুঃসময়েও রেগে গেল। বলল, সে আমি বুঝবা কে কী বলেছে তা দিয়ে তো আর বিচার হবে না। মিথ্যে করেও তো রটাতে পারে।

জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, তুই ইনকিওরেবল। কিছুতেই তোকে তোর মোহ থেকে বের করে আনা যাবে না। আমি এটা জানতাম। তবু তোর কাছে এসেছি কেন তা জানিস! জামাইবাবুর নামে কিছু রটলে সেটা আমাদেরও গায়ে লাগে। সেটা জামাইবাবুর জন্য নয়, তোর জন্য।

আমার কথা তোদের ভাবতে হবে না।

তুই আমাদের কথা ভাবিস না বলে কি আমরাও তোকে ভুলে যাব?

ভুলতে বলিনি। আমার মাথাটা এখন ঝা ঝা করছে। কী পান্ডা নামটা বললি?

অধীর পান্ডার বোন দুর্গা পান্ডা। অধীর ইজ এ পলিটিক্যাল লিডার। লেফটিস্ট।

তার সঙ্গে তোর জামাইবাবুর সম্পর্ক কী?

জামাইবাবুর কোনও পলিটিক্যাল কালার আছে বলে আমি জানি না। থাকলে লোকটা হয়তো মানুষ হত। অধীরের সঙ্গে জামাইবাবুর বন্ধুত্ব কলেজ থেকে। তবে এখন বন্ধুত্ব নেই। পাবলে অধীর ধ্রুব চৌধুরীর গলা নামিয়ে দেয়। দুর্গাকে নিয়ে জামাইবাবু ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিল, জানিস?

রেমির পায়ে জোর ছিল না। থরথর করে কেঁপে বসে পড়ল বিছানায়। মুখ কেমন সাদা। চোখে বোবা শূন্যতা।

কী বলছিস?

ঠিকই বলছি। খবরটা শুনে তুই আপসেট হয়ে যাবি জানতাম। তবু তোর ভবিষ্যতের কথা ভেবে। বলতে বাধ্য হলাম।

ওর আর যে দোষই থাক, মেয়েমানুষের দোষ তো ছিল না।

ছিল না আবার কী! জমিদারদের রক্তেই ওসব বিষ থাকে। ফিউডালিজম যাবে কোথায়!

চুপ কর। তুই সব জেনে বসে আছিস, না?

আমরা কিছু জানার চেষ্টা করিনি। খবরটা আমাদের কানে অন্য লোকই পৌঁছে দিচ্ছে।

রেমি আনমনে অন্য দিকে চেয়ে বলল, তাই নাকি?

তুই সব ঘটনার একদম মাঝখানে থেকেও কোনও খোঁজ রাখিস না। বড্ড বোকা তুই। নিজের। স্বার্থ সম্পর্কে তোর আর একটু কনশাস হওয়া দরকার।

রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখে অবশ্যম্ভাবী জলটুকু মুছে নিল আঁচলে। জয়ন্তর কথা তার যে খুব বিশ্বাস হচ্ছিল তা নয়। ধ্রুব মেয়েদের তেমন পাত্তা দেয় না কোনওদিনই। তবু যদি এই গুণ তার দেখা দিয়ে থাকে তবে আজ রেমির পায়ের নীচে সত্যিই জায়গা নেই।

জয়ন্ত বলল, সেকেলে মেয়েমানুষের মতো কাঁদছিস কেন? রুখে দাঁড়াতে পারিস না!

রুখে দাঁড়াব! কীভাবে?

লোকটার মুখের ওপর বলে দে, তোমার নামে এই সব রটেছে। সত্যি কি না বলো।

রেমি জবাব দিল না।

জয়ন্ত বলল, ব্যাপারটা শুধু লাম্পট্যেই শেষ হবে না। তোর শ্বশুর পলিটিকস করে, অধীরও পলিটিকস করে। অধীর স্মল ফ্রাই, কিন্তু একটা এলাকায় তার অনেক ফলোয়ার আছে। দু-চারটে মার্ডার ওদের কাছে কিছুই না। তোর শ্বশুর মন্ত্রী এবং পুলিশ তার হাতের মুঠোয় বলে এখনও জামাইবাবুর গায়ে হাত পড়েনি। কিন্তু এবার পড়বে।

ওকে ওরা মারবে?

মারাই তো স্বাভাবিক। দুর্গার মতো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা মানেই তো বিপদ ডেকে আনা।

দুর্গা যদি বাজে মেয়েই হয়ে থাকে তবে তার জামাইবাবুকেই শুধু দায়ি করবে কেন?

দুর্গা বাজে মেয়ে বটে, কিন্তু ওর রিসেন্টলি বিয়ে ঠিক হয়েছে। ঠিক এ সময়ে ওকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর যাওয়ায় সব ব্যাপারটাই গুবলেট হয়ে গেছে।

তোকে এত কথা কে বলল?

বললাম তো, নাম বলব না।

কেন বলবি না?

জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, তোকে জানি ছোড়দি। তুই আর আমাদের লোক নোস, তুই এ বাড়িতে মাথা বিকিয়ে দিয়ে বসে আছিস। তোকে বলা যাবে না। তোর ভিতরে ফিউডাল সিস্টেম ঢুকিয়ে দিয়েছে এরা। এ বাড়ির ইজ্জত বাঁচাতে তুই সবাইকে ফাঁসিয়ে দিতে পারিস।

রেমি অবাক হয়ে বলে, কী সব যা তা বলছিস তখন থেকে?

বলছি তোর দুর্দশা দেখে। শো-কেসের পুতুল হয়ে রইলি। যা বোঝাচ্ছে তাই বুঝছিস। তোর ব্যক্তিত্ব নেই।

রেমি হঠাৎ জ্বলে উঠে বলল, ভাবিস না। যদি ঘটনাটা সত্যি হয় তবে তোর জামাইবাবুকে আমি ছেড়ে দেব না। আর যদি সত্যি না হয় তবে তোকেও ছেড়ে দেব না।

জয়ন্ত ম্লান একটু হাসল, জানি। পারলে আমাকে বোধহয় এখুনি কোতল করতিস। তবে বলছি শোন, কথাটা উড়ো কথা হলে তোকে বলতাম না।

জয়ন্ত চলে যাওয়ার পর অস্থির রেমি কতবার যে ঘর-বার করল তার সংখ্যা নেই। বাথরুমে ঢুকে স্নান করল। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। ছাদে গিয়ে পায়চারি করল। তারপর

অনেক ভেবেচিন্তে টেলিফোন করল ধ্রুবর অফিসে।

আমি রেমি বলছি।

বলো। কী খবর?

তুমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিবে আজ? জরুরি দরকার।

আজ যে পার্টি আছে সিস্টার।

দরকারটা ভীষণ জরুরি।

তা বুঝতে পারছি। একটু ঝেড়ে কাশো না! কী হয়েছে?

ফোনে বলা যায় না।

যায় না? সে কী? আমাকে তো কেউই কিছু বলতে বাকি রাখে না। প্রকাশ্যেই বলে। টেলিফোনে বলতে পারবে না কেন?

বলছি তো, বলা যাবে না। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।

জয়ন্ত তোমাকে কিছু বলে গেছে নাকি? খুব সিরিয়াস কিছু? এবং আমাকে নিয়ে?

রেমি স্তম্ভিত হয়ে গেল। জয়ন্ত দুপুরে এসেছিল, খবরটা ওর জানার কথাই নয়। বিস্ময়টাকে নিজের ভিতরে ছিপি এঁটে রেখে রেমি বলল, সব খবরই বাখো তা হলে!

আরে ভাই, আমি রাখি না। তবে সিস্টেমটা চালু আছে। শালাবাবু কী বলে গেছে বলো তো?

অনেক কিছু। কথাগুলো সত্যি কি না জানতে চাই।

না শুনলে কী করে বলব সত্যি কি না।

অধীর পান্ডা নামে তোমার এক বন্ধু আছে?

আছে। আগে বন্ধু ছিল, এখন ঘোর শত্রু। আর কী জানতে চাও?

সে তোমার শত্রু হল কেন?

তা কি শালাবাবু বলে যায়নি?

বলেছে। তবু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।

জ্বালালে সিস্টার। শুনে তোমার লাভ কী বলল তো!

তুমি কার সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিলে?

কারও সঙ্গে নয়। হিজ হিজ হুজ হুজ।

তার মানে?

তার মানে দুর্গার প্লেনের টিকিট সে নিজেই কেটেছিল। আমারটা কেটেছিল অফিস।

তোমরা একসঙ্গে গিয়েছিলে তো!

হ্যাঁ, তবে এয়ারপোর্ট অবধি।

তার মানে কী?

তার মানে দুর্গাকে এক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। দিয়েছি। শালাবাবু অন্যরকম ব্যাখ্যা দিয়েছে তো!

দিয়েছে। কিন্তু সেটা কি মিথ্যে?

না, না। আমি বরং বলি, ওটার বেসিসে তুমি একটা ডিভভার্সের মামলা আনো। আমি লড়ব না।

রেমি রেগে যেতে পারছিল না। তার উদ্বিগ্ন বুকে ধ্রুবর এইসব ইয়ার্কি এক ধরনের প্রলেপ দিচ্ছিল। সে বলল, ঠিক করে বলো।

আমি তো ঠিক করেই বলছি।

তোমরা একসঙ্গে ছিলে না?

দুর্গাকে তো তুমি চোখেও দেখোনি সিস্টার।

তাতে কী?

দেখলে বুঝতে ওর সঙ্গে থাকার চেয়ে একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে থাকাও ভাল।

তুমি ওকে কার কাছে পৌঁছে দিয়েছ?

ভেল-এর একজন ইঞ্জিনিয়ারের ডেরায়। ভাল ছেলে। ব্রাহ্মণ।

সে ওর কে হয়?

আমি তোমার কে হই?

স্বামী। আবার কে?

স্বামী কথাটা বড্ড ভারী। ফিউডালিজমের গন্ধ আছে। বর বরং বেটার।

ঠিক আছে। বর।

ওই ছেলেটাও দুর্গার তাই।

কী করে হল?

হয়ে গেল। প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।

ইয়ার্কি কোরো না।

তুমি যে আমার গুরুজন তা মাঝে মধ্যে ভুলে যাই।

গুরুজন নই, তবে এখন ব্যাপারটা সিরিয়াস। এ সময়ে ইয়ার্কি ভাল লাগে না।

গোটা জীবনটাই ইয়ার্কি সিস্টার। এ গ্রেট ইয়ার্কি অফ দি ক্রিয়েটার।

আমি ফিলজফি শুনতে চাই না। দুর্গার ব্যাপারটা বলো।

বললাম তো।

ওর বর ব্যাঙ্গালোরে কী করছিল?

বললাম তো চাকরি।

আহা তা জানতে চাইছি না। ওখানে ওর তো বিয়ে ঠিক ছিল না!

বিয়ে ঠিক না থাক, হৃদয়টা ছিল।

কী করে?

তুমি মাইরি একদম মগজ খেলাও না আজকাল। মরচে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেটার সঙ্গে দুর্গার আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল। এখানে বিয়ে ঠিক করেছিল অধীর। জোর করে। ছোঁড়াটাও ভাল নয়। তাই আমাকে ধরেছিল দুর্গা। আমি বেড়াল পার করে দিয়েছি।

দুর্গা তোমার সঙ্গে ফেরেনি তা হলে?

কোন দুঃখে? দিব্যি জমিয়ে বসে গেছে ব্যাঙ্গালোর।

সিঁদুর পরছে?

পরবে না কেন?

ঠিক আছে। ছাড়ছি। পরে কথা হবে।

শোনো সিস্টার।

বলো।

আমার কথা ফেস ভ্যালুতে বিশ্বাস করে নিয়ো না। ভাল করে তদন্ত করো।

করার দরকার আছে কি?

ডিভোর্সের চান্সটা ফসকাবে কেন ভাই?

আমি কি খুব ডিভোর্স চাই নাকি?

তুমি না চাও তোমার ভাই চাইতে পারে।

মোটেই নয়।

বোকা মেয়ে। ভাইটিকে তো চেনো না!

কেন? সে আবার কী করেছে?

কিছু করেনি এখনও। তবে করতে চাইছে।

কী করতে চাইছে?

লঙ্কাপুরী থেকে বন্দিনী সীতাকে উদ্ধার করতে চাইছে বোধহয়।

সীতা কি আমি?

আলবত। কৃষ্ণকান্তবাবু রাবণ।

আর তুমি?

আমি বোধহয় বিভীষণ। রামকে হেলপ করতে চাইছি।

আর দরকার নেই। আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধ্রুব বলে, ভুল করছ সিস্টার।

করলে বেশ করছি। তুমি বার বার সিস্টার বলবে না।

কেন, সম্পর্কটা তো প্রায় তাই।

মোটেই নয়। এসো আগে, তার পর দেখাব সম্পর্কটা কী!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *