সহায়

সহায়

এটা বলিস না যে এক লাখ হিন্দু আর এক লাখ মুসলমান মরেছে… বরং বল দু’লাখ মানুষ মরেছে। দু’লাখ মানুষের মৃত্যুর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হল এই যে, এতে কারোর কোনো লাভ হচ্ছে না। এক লাখ হিন্দুকে মেরে মুসলমান ভাবছে হিন্দু ধর্মই শেষ করে দিয়েছে, এদিকে হিন্দু ধর্ম দিব্যি বেঁচে আছে। আর থাকবেও। তেমনিভাবে এক লাখ মুসলমানকে মেরে হিন্দুরা ঢাক পেটাচ্ছে যে ইসলামের মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু দেখ, ইসলামের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগেনি।…শুধু বোকারাই ভাবতে পারে যে বন্দুকের গুলিতে ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়।…ধর্ম, বিশ্বাস, নিষ্ঠা, বিবেক, বুদ্ধি এসব আমাদের শরীর নয়, আত্মার সঙ্গে জুড়ে আছে… ছুরি, চাকু আর গুলি চালিয়ে কি আর এদের শেষ করা যায়!’—মুমতাজ অদম্য উৎসাহের সঙ্গে বলল।

আমরা তিনজন তাকে জাহাজ অবধি ছাড়তে এসেছিলাম। সে পাকিস্তান চলে যাচ্ছিল! ততদিনে পাকিস্তানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমাদের সব সংশয়ের অবসান হয়েছে।

আমরা তিনজনেই হিন্দু। দেশভাগে সবাই কিছু না কিছু হারিয়েছিল। যেমন পশ্চিম পাঞ্জাবে আমাদের আত্মীয়রা। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল! জানেরও, মালেরও। হয়তো এটাও মুমতাজের আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়ার একটা কারণ!

লাহোর থেকে চিঠিতে যুগল জেনেছিল যে তার কাকা দাঙ্গায় খুন হয়েছে। সেই ধাক্কাটা সামলাতে তার কিছুদিন কেটে গেল! কী প্রসঙ্গে যেন কথায় কথায় একদিন সে মুমতাজকে বলল, ‘ভাবছি যদি এই পাড়ায় দাঙ্গা শুরু হয় তো আমি কী করব?’

মুমতাজ জিগ্যেস করল, ‘কী করবি?’

যুগল গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, ‘ভাবছি…খুব সম্ভবত আমি তোকে মেরে ফেলব…।’

মুমতাজ অবাক হয়ে তাকিয়ে তারপর একেবারে চুপ করে গেল।

তার সেই নিস্তব্ধতা আটদিন পরে ভাঙল যখন সে আমাদের জানাল যে, সে জাহাজে করে করাচি চলে যাচ্ছে।

আমরা কেউই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার সঙ্গে কোনো কথা বললাম না।

যুগল ভালোভাবেই জানত মুমতাজের যাওয়ার কারণ। ‘ভাবছি…খুব সম্ভবত আমি তোকে মেরে ফেলব…।’ বোধ হয় সেইজন্যই সে আমাদের চেয়েও বেশি চুপচাপ ছিল। বোধহয় সে তখনো ভাবছিল সত্যি সত্যি সে তার প্রাণের বন্ধুকে মেরে ফেলতে পারে কিনা!

অদ্ভুতভাবে, যাওয়ার দিন মুমতাজ হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিমাণে কথা বলতে শুরু করল।

সকালে উঠেই সে গেলাস নিয়ে বসে গেছিল। তার আসবাবপত্র বাঁধাছাঁদা দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে। নিজেই বকছিল, নিজেই হাসছিল। অন্য কেউ দেখলে নিশ্চিত ভাবত যে বোম্বাই ছাড়ার আনন্দে মুমতাজ দিশেহারা। কিন্তু আমরা জানতাম নিজের আবেগ ঢাকার জন্য সে আমাদের তো বটেই, নিজেকেও কী মিথ্যেটাই না বলছে!

আমি সত্যিই চেয়েছিলাম মুমতাজের সঙ্গে তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া নিয়ে কথা বলি। যুগলকে ইশারায় কথাটা পাড়তেও বলেছিলাম। কিন্তু মুমতাজ আমাদের সে সুযোগ দিল না। তার অনর্গল কথার মাঝে কোনো ফাঁক পেলাম না যে নিজেদের কথা বলব।

যুগলও তিন-চার পেগ খেয়ে আরো খানিকটা চুপচাপ হয়ে অন্য ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

আমি আর বৃজমোহন মুমতাজকে সঙ্গ দেওয়া স্থির করলাম। তার বেশ কিছু কাজ বাকি ছিল—বিল চোকানো, ডাক্তারের ফি দেওয়া, লন্ড্রি থেকে জামাকাপড় নেওয়া…। সব কাজই সে হাসিমুখে করল। কিন্তু শেষে কোণার হোটেলের পাশের পানের দোকানটাতে যেতেই তার চোখ ছলছল করে উঠল। পান হাতে বৃজমোহনের কাঁধে আরেকটা হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে সে মৃদুস্বরে বলল, ‘মনে আছে, সেই দশ বছর আগের কথা, যখন আমাদের অবস্থা ভীষণ খারাপ ছিল? তখন গোবিন্দদা এক টাকা ধার দিয়েছিল…মনে আছে?’

বাকি পথ মুমতাজ আর কোনো কথা বলল না।

বাড়ি ঢুকেই সে আবার বকবক করতে শুরু করল। কথার কোনো মাথামুন্ডু ছিল না। কিন্তু এত প্রাণ খুলে সে কথা বলছিল যে আমি আর বৃজমোহন তাতে যোগ না দিয়ে পারলাম না। যাওয়ার সময় আরো এগিয়ে আসতে যুগলও এতে সামিল হল।

ট্যাক্সি বন্দরের দিকে রওনা দিল। ভেতরে অখণ্ড নিস্তব্ধতা। মুমতাজের চোখ দুটো যেন বোম্বাইয়ের রাস্তা, বাজার, বাড়িঘর, পথচারীদের বিদায় জানাতে জানাতে চলল।

বন্দরে পৌঁছে দেখি বড্ড ভিড়! হাজারো রিফিউজি জমা হয়েছে। বেশিরভাগেরই মুখ শুকনো, চোখে জল। এত ভিড়, তবু আমার মনে হল যেন মুমতাজ একাই যাচ্ছে। আমাদের ছেড়ে এমন এক জায়গায় যাচ্ছে যেটা সে কোনোদিন দেখেনি! সেই জায়গা হয়তো তার শত চেষ্টাতেও তাকে আপন করে নেবে না! অবশ্য এসব একান্ত আমার মনের কথা! মুমতাজ কী ভাবছিল তা জানি না।

সব জিনিসপত্র কেবিনে ঢুকিয়ে আমরা চারজন ডেকে গিয়ে দাঁড়ালাম। দূরে আকাশ আর সমুদ্র একে অন্যের কোলে লুটোপুটি খাচ্ছে! মুমতাজ অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে শেষে যুগলের দিকে তাকাল, ‘আকাশ আর সমুদ্রের মিশে যাওয়া দৃষ্টিভ্রম ছাড়া আর কিছুই না…কিন্তু কী অপূর্ব দেখ এই ভ্রম!’

যুগল কিছু বলল না। বোধহয় ওর মাথায় শুধু ঘুরছিল, ‘ভাবছি…খুব সম্ভবত আমি তোকে মেরে ফেলব…।’

মুমতাজ জাহাজের বার থেকে ব্র্যান্ডি আনাল। সকাল থেকে সে ব্র্যান্ডিই খাচ্ছিল। আমরা চারজন গেলাস হাতে ডেকের রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। একদিকে জাহাজের উপর শ’য়ে শ’য়ে রিফিউজি, আরেকদিকে জলের উপর উড়ে বেড়াচ্ছে পাখির দল! আকাশে, মাটিতে যেন আর একচুল জায়গা নেই!

যুগল এক নিঃশ্বাসে নিজের গেলাস শেষ করে উদাসীনভাবে বলল, ‘মুমতাজ, আমায় ক্ষমা কর! বোধ হয় সেদিন তোকে একটু বেশিই দুঃখ দিয়ে ফেলেছিলাম।’

মুমতাজ একটু সময় থেমে প্রশ্ন করল, ‘একটা কথা বল…সেদিন যখন বলেছিলি—ভাবছি…খুব সম্ভবত আমি তোকে মেরে ফেলব…, তখন সত্যিই একথা ভেবেছিলি?’

যুগল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, ‘ভেবেছিলাম। এখন ভেবে অনুশোচনা হচ্ছে।’

‘আমায় মেরে ফেললে আরো অনুশোচনা হত রে’। মুমতাজ দার্শনিকের মতো বলল, ‘যদি এটা মাথায় আসত যে তুই মুমতাজ বা তোর বন্ধু বা কোনো মুসলমানকে না, একজন মানুষকে মেরেছিস! তুই একটা মানুষের জীবন শেষ করেছিস, ইসলামকে শেষ করিসনি! তার লাশ মুসলমানদের হাতে পড়লে একটা কবরের সংখ্যা বাড়ত ঠিকই, কিন্তু পৃথিবী থেকে একটা জীবন শেষ হয়ে যেত!’ মুমতাজ বলতে থাকল, ‘হতে পারে আমার ধর্মের লোকজন আমায় শহীদ আখ্যা দিত; কিন্তু আল্লাহর কসম, পারলে কবর থেকে উঠে বলতাম, চাই না এই নাম! যে পরীক্ষা দিইনি, তার ডিগ্রি আমার চাই না! লাহোরে তোর কাকাকে কোনো মুসলমান মেরেছে শুনে ধর বোম্বাইতে তুই আমায় মেরে দিলি। একটু ভেবে বল, তোর কাকা বা আমি এতে কোন মেডেলটা পেলাম? আর তোর কাকার খুনি বা তুইই বা কোন খেতাবটা পেলি?…দুটো নির্দোষ লোককে মেরে কার কী লাভ!’

বলতে বলতে মুমতাজ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সেই অকপট আবেগের উচ্ছ্বাস শুনতে শুনতে আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ক্রমাগত ঘুরতে লাগল, ‘ধর্ম, বিশ্বাস, নিষ্ঠা, বিবেক, বুদ্ধি এসব আমাদের শরীর নয়, আত্মার সঙ্গে জুড়ে আছে…ছুরি, চাকু, গোলাগুলি চালিয়ে কি আর এদের শেষ করা যায়?’

আমি অস্ফুটে বললাম, ‘ঠিক বলছিস।’

শুনে মুমতাজ চিন্তায় ডুবে গেল। একটু বাদে কিছুটা অস্থিরভাবে উত্তর দিল, ‘না…মানে আমি ঠিক কী বলতে চাইছি বোধহয় ঠিকমতো বোঝাতে পারছি না। ধর্ম বলতে আমি সেটার কথা বলছি না যেটা নিরানব্বই শতাংশ লোক না বুঝেই মেনে চলে! যা প্রত্যেকটা মানুষকে স্বাতন্ত্র্য দেয়, মনুষ্যত্ব দেয়, আমি তার কথা বলছি।…সেটা কী তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারব না, এই যা।’ বলতে বলতে তার চোখ হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠল। সে স্বগতোক্তির ঢঙে বলেই চলল, ‘ওর মধ্যে এমন কী ব্যাপার ছিল?…ও তো ছিল কট্টর হিন্দু…আর…আর নেহাতই একটা জঘন্য কাজ করত…কিন্তু ওর ভেতরটা এরকম অমলিন কী করে ছিল?’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কার কথা বলছিস?’

‘একটা দালালের।’

আমরা তিনজন চমকে উঠলাম।

মুমতাজের কথায় কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। আমি আবার জিগ্যেস করলাম, ‘দালাল?’

মুমতাজ মাথা নাড়ল, ‘হুঁ। সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে লোকটা মেয়েদের দালালি করত। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে ওর মন কী করে এতটা পরিষ্কার ছিল!’

এই বলে সে থামল যেন ঘটনাগুলো মনে করছে! কয়েক মুহূর্ত পর আবার শুরু করল, ‘ওর পুরো নাম আমার মনে নেই। বোধহয় সহায়…। বেনারসে বাড়ি। ভীষণ পরিষ্কার লোক। যেখানে থাকত সেটা খুবই ছোট ছিল। সেটাকেও সে এত সুন্দর সাজিয়ে রেখেছিল যে দেখার মতো! ঘরের মধ্যে বিভিন্ন জায়গা নিপুণভাবে ভাগ করা! পর্দা দিয়ে চারদিক দিব্যি ঢাকা! খাট ছিল না, কিন্তু মেঝেতে পরিষ্কার গদি পাতা। তার উপরে বেশ কিছু বালিশ। তার উপর ধবধবে চাদর।…চাকর ছিল, কিন্তু সব সাফসাফাইয়ের কাজ নিজে হাতে করত। শুধু সাফাই নয়, সব কাজই। কোনো কাজ কাটিয়ে দিত না…জোচ্চুরি করত না…ধোঁকা দিত না…। অনেক রাতে কোনো কাস্টমারের মদ খাওয়ার শখ হলে পরিষ্কার বলত, ”সাহেব, এই সময় সবাই মদে একগাদা জল মিশিয়ে বিক্রি করবে, অকারণ নিজের পয়সা নষ্ট করবেন না।…কোনো মেয়েকে ভালো লাগলে ভণ্ডামি করত না, পরিষ্কার বলত। আরো কী জানিস, আমায় বলেছিল যে ও নাকি প্রত্যেক দশটাকায় আড়াই টাকা কমিশন নিয়ে নিয়ে কুড়ি হাজার টাকা জমিয়ে ফেলেছে। আর দশ হাজার হলেই দেশে চলে যাবে আর কাপড়ের দোকান দেবে।…আরো দশ হাজারই কেন, আরো বেশি কেন না, তা কোনোদিন বলেনি। এও জানি না শুধু কাপড়ের দোকানই বা কেন দিতে চাইত!’

এইটুকু শুনে আমার মুখ থেকে বেরোল, ‘কী আজব লোক!’

মুমতাজ আবার বলতে লাগল, ‘তখন আমি ভেবেছিলাম সহায় লোকটা মিথ্যেবাদী। বানিয়ে বানিয়ে বলে। নিশ্চয়ই ফ্রড। কে বিশ্বাস করবে যে ওর ধান্দার মেয়েদেরকে ও নাকি নিজের মেয়ে বলে মানত! আমার মাথায় আসত না ও কেন ওই মেয়েগুলোর জন্য পোস্ট-অফিসে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল! ওদের রোজগারের পয়সা মাসে মাসে ওদের অ্যাকাউন্টে জমা করে দিত! দশ-বারোটা এমন মেয়েও ছিল যাদের খাওয়া-পরার খরচা ও নিজের পকেট থেকে দিত!…ওর এই সবকিছুই আমার ভন্ডামি মনে হত!…একদিন আমায় বলল,—”আমীনা আর সকীনাকে ছুটি দিয়েছি। প্রত্যেক সপ্তাহে একদিন করে দিই যাতে বাইরে গিয়ে মাছ-মাংস খেয়ে আসতে পারে। জানেনই তো এখানে সব বৈষ্ণব।” আমি হেসেছিলাম, আমার বিশ্বাস হয়নি। আরেকদিন বলল লাহোর থেকে ওর কোন এক পুরোনো মেয়ে চিঠি দিয়েছে। মেয়েটা ছিল আমেদাবাদের হিন্দু; তার বিয়ে সে কোন এক মুসলমান গ্রাহকের সঙ্গে করিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটা নাকি দাতা সাহেবের দরবারে ওর জন্য প্রার্থনা করে এসেছে যাতে ওর দশ হাজার তাড়াতাড়ি জোগাড় হয় আর ও ফিরে কাপড়ের দোকান খুলতে পারে।…আমি তখনো হেসেছিলাম, মুসলমান বলে আমায় খুশি করতে এসব বলছে নিশ্চয়ই!…’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘তুই ভুল ভেবেছিলি?’

‘একেবারে! ওর কথা আর কাজের মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না…হতে পারে ওর অনেক দোষ ছিল, হতে পারে ও জীবনে অনেক ভুল করেছে…কিন্তু মানুষ হিসেবে একদম খাঁটি ছিল। কোনো খাদ ছিল না।’

যুগল প্রশ্ন করল, ‘সেটা কী করে জানলি?’

‘ওর মৃত্যু থেকে।’ মুমতাজ কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকল। সেদিকে তাকিয়ে থাকল যেখানে আকাশ আর সমুদ্র একে অন্যের উপর লুটোপুটি খাচ্ছে।

‘দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছিল। আমি সকাল সকাল উঠে বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। কার্ফুর জন্য তখন বাজারে লোকের সংখ্যা খুবই কম। ট্রামও চলছিল না। ট্যাক্সি খুঁজতে খুঁজতে জে. জে. হাসপাতালের সামনে পৌঁছতে ফুটপাথের উপর দেখলাম একটা লোক যেন পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে শুয়ে। ভাবলাম বোধহয় ঘুমোচ্ছে। তখনই চোখ গেল আশেপাশের নুড়ি পাথরের উপর। তাতে রক্ত লেগে! আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম।…খুন!…একবার ভাবলাম চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যাই। হঠাৎ পুঁটলির মধ্যে যেন লোকটা নড়েচড়ে উঠল। ধারেকাছে কেউ ছিল না। আমি নীচু হয়ে লোকটার দিকে ভালো করে তাকালাম। দেখলাম, সহায়!! সারা শরীরে, মুখে রক্তের দাগ! আমি ওর পাশে বসে পড়লাম। তার সাদা টুইলের কামিজ, যাতে কোনোদিন একটা দাগও দেখিনি, তখন রক্তে ভাসছে! বোধহয় পাঁজরের কাছে চোট লেগেছিল।…অল্প অল্প নিঃশ্বাসের আওয়াজ পেয়ে আমি সাবধানে ওর কাঁধ দু’হাতে ধরে একটু নাড়া দিলাম। যেভাবে ঘুম থেকে তোলে। এক-দু’বার তার অসম্পূর্ণ নামে তাকে ডাকলামও।

উঠে যাব ভাবছি এমন সময় সে চোখ খুলল…কিছুক্ষণ আধখোলা চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল। হঠাৎ চিনতে পেরে বলল, ‘আপনি?… আপনি?’ আমি প্রশ্নের ঝুড়ি খুলে বসলাম—ও কীভাবে এখানে এল, যে মেরেছে তাকে চেনে কিনা, কখন থেকে ফুটপাথে পড়ে আছে, সামনের হাসপাতালে ওকে নিয়ে যাব কিনা…ইত্যাদি।

ওর কথা বলার শক্তি ছিল না। আমার প্রশ্নবাণ শেষ হতে সে অস্ফুটে উত্তর দিল, ‘আমার সময় শেষ হয়ে গেছে…এটাই ভগবানের ইচ্ছা!…’ ভগবানের কী ইচ্ছা ছিল তা জানি না কিন্তু মুসলমান এলাকায় হিন্দুর খুনে ফেঁসে যাওয়ার আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না।…আমি আগে কখনো নিজেকে ভীতু বলে ভাবিনি, কিন্তু বিশ্বাস কর, তখন ভেতরে ভেতরে ভয়ে কেঁপে উঠেছিলাম!…ভয় লাগছিল যে আমায় ধরে নিয়ে যাবে কারণ সামনে তখন শুধু আমিই…শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করতেও যদি থানায় নিয়ে যায়, বিশেষ সম্মান নিশ্চয়ই দেবে না!…কিম্বা যদি এরকম হয় যে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম আর ও-ই যদি প্রতিশোধ নিতে দুম করে বলে দেয় যে আমিই মেরেছি!!!

ভাবনার কোনো মাথামুন্ডু ছিল না শুধু ভেবে এটুকুই ঠিক করলাম যে ওখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোনো দরকার!…পালাতে যাব হঠাৎ সহায় আমায় ডাক দিয়ে উঠল! আমি থেমে গেলাম। থামার কোনো ইচ্ছা ছিল না…ভেতরে একটা অদ্ভুত যুক্তিহীন ভয়! তবু, আমি ওর দিকে এমন ভাবে তাকালাম যেন ওকে বলছি, ‘যা বলার তাড়াতাড়ি বলো ভাই, আমায় যেতে হবে।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুমতাজ আবার শুরু করল, ‘খুব কষ্টে চোখ-মুখ কুঁচকে ও নিজের কামিজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করল। পারল না। ব্যথায় ওর শরীর আরো কুঁকড়ে গেল। আমায় ক্ষীণ গলায় বলল, ”সাহেব, ভেতরের দিকে…বুকপকেটে…গয়না আর বারোশো টাকা…সুলতানার…সুলতানাকে দেবেন…বন্ধুর কাছে রাখা ছিল…ওকে দিতাম…ওকে দিয়ে দেবেন…চলে যেতে বলবেন…এখান থেকে চলে যেতে বলবেন… আপনিও…আপনিও সাবধানে থাকবেন, সাহেব…।” ‘

মুমতাজ চুপ করে গেল।

মনে হল দূরে যেখানে আকাশ আর সমুদ্র এক হয়ে মিশে গেছে, মুমতাজ সেখানেই সেদিনের সেই ব্যথার উপশম খুঁজছে!

জাহাজের হুইসেল বেজে উঠল। মুমতাজ বলল, ‘সুলতানাকে দিতে গেছিলাম…হাতে নিয়ে সে কেঁদে ফেলেছিল।’

আমরা মুমতাজকে বিদায় জানিয়ে নেমে এলাম। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে তখনো ডেকের রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডান হাত নাড়াচ্ছে।

যুগলকে বললাম, ‘কেমন মনে হচ্ছে না মুমতাজ যেন সহায়কেই ডাকছে এই নির্বান্ধব সফরে সঙ্গী হতে?’

যুগল চোখ বুজে বলল, ‘আমি যদি সহায় হতে পারতাম!’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *