উপন্যাস
গল্প

২. বিজন শহরতলি

২। বিজন শহরতলি

দুনিয়াটা নাকি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে যতটা পালটেছে, ততটা পালটায়নি বিগত পাঁচশো বছরের মধ্যে। ঊনবিংশ শতাব্দী মানব-ইতিহাসে উষালগ্ন বিশাল নগরীর সূচনা ঘটে সেই শতাব্দী থেকেই–অবসান ঘটে সেকেলে গ্রামীণ জীবনের।

অগণন প্রজন্ম ধরে যেমনটি ঘটে এসেছে, ঠিক সেইভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে মানবজাতির অধিকাংশ বসবাস করত শহরতলিতে-গ্রাম অঞ্চলে। পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ থাকত ছোট ছোট শহর আর গ্রামে। সরাসরি নিযুক্ত ছিল কৃষিকর্মে অথবা কৃষিবিদের সহায়ক কাজকর্মে। পর্যটনের সুযোগ ঘটত কদাচিৎ-নিবাস রচনা করত কর্মস্থানের সন্নিকটে। কারণ দ্রুত ভ্রমণের উপযোগী যানবাহনের আবির্ভাব তখনও ঘটেনি। পর্যটনে বেরত মুষ্টিমেয় যে কজন, পদব্রজ, পালতোলা জাহাজ অথবা ঘোড়ায় টানা গাড়ির শরণ নিত। শেষোক্ত শকটটির গতিবেগ ছিল দিনে বড়জোর ষাট মাইল। ভাবতে পারেন? সারাদিনে মাত্র ষাট মাইল! মন্থরগতি সেই যুগে ক্কচিৎ দু-একটা শহর গজিয়ে উঠত লোকালয়ের ধারেকাছে বন্দর-শহর অথবা সরকারি দপ্তর-শহর হিসেবে। কিন্তু এক লাখ মানুষ থাকার মতো শহর আঙুলে গোনা যেত গোটা পৃথিবীতে! এই চিত্র ছিল ঊনবিংশ শতকের শুরুতে। শতাব্দীর শেষে রেলপথ, টেলিগ্রাফ, বাষ্পীয় পোত এবং জটিল কৃষিযন্ত্র আবিষ্কৃত হওয়ার পর পালটে গেল চিত্র। আগেকার চিত্রে ফিরে যাওয়ার আর কোনও সম্ভাবনাই রইল না। শহরের মজা আর অগণন সুখ-সুবিধে রন্ধ্রে রন্ধ্রে শেকড় গেড়ে বসে গেল মানুষ জাতটার। রাতারাতি গজিয়ে উঠতে লাগল পেল্লায় পেল্লায় নগরী–বিশাল দোকান–শতসহস্র আরাম এবং বিরামের ব্যবস্থা। শুরু হয়ে গেল গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। শহরের দিকেই আকৃষ্ট হল মানবজাতি। দলে দলে মানুষ ধেয়ে গেল শহরের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে সুখের সন্ধানে। চাহিদা পড়ে গেল শ্রমজীবীদের-যন্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটার সঙ্গে সঙ্গে। পল্লিপ্রকৃতিকে জবাই দিয়ে দ্রুত গড়ে উঠতে লাগল বৃহত্তর প্রমোদকেন্দ্র এবং শিল্পকেন্দ্র।

ভিক্টোরীয় যুগের লেখকরা দিবানিশি এই কাহিনিমালাই গেঁথে গেছেন তাঁদের গল্প উপন্যাসে–মানুষ স্রোতের মতো ধেয়ে যাচ্ছে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে। একই উপাখ্যান রচিত হয়েছে গ্রেট ব্রিটেনে, নিউ ইংল্যান্ডে, ইন্ডিয়ায় এবং চায়নায়–পুরাতনকে সরিয়ে দিয়ে নতুনের আবির্ভাব ঘটছে স্ফীতোদর বড় বড় শহরে। অপরিহার্য এই পরিবর্তন যে আসলে দ্রুত পরিবহণব্যবস্থার আবির্ভাবে, এ তথ্য উপলব্ধি করেছেন মাত্র কয়েকজনই– বালসুলভ প্রচেষ্টা চলেছে পৃথিবীজোড়া শহরমুখী চৌম্বক আকর্ষণ ঠেকিয়ে রাখার।

নব-ব্যবস্থার নিছক উষালগ্ন কিন্তু এই ঊনবিংশ শতাব্দী। শুরু তখুনি। নবযুগের বড় বড় শহরে অসুবিধে ছিল বীভৎস মাত্রায়। ধোঁয়ায় ভরপুর, কুয়াশায় অন্ধকার, অস্বাস্থ্যকর এবং কোলাহলময়। ভবন নির্মাণের নতুন পদ্ধতি, ঘর উষ্ণ রাখার নতুন ব্যবস্থা পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্তি দিল শহর সভ্যতাকে। ১৯০০ থেকে ২০০০-এর মধ্যে প্রগতি হল আরও দ্রুত; ২০০০ থেকে ২১০০-র মধ্যে মানবজাতির উন্নয়ন এমনই লাফ মেরে মেরে এগিয়ে গেল, এমনই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারের পর আবিষ্কার ঘটতে লাগল যে, ভিক্টোরীয় যুগের সুব্যবস্থাকেও অবশেষে মনে হল যেন অলস প্রশান্ত জীবনের একটা অবিশ্বাস্য দূরদর্শন।

মানবজীবনটাকে চূড়ান্তভাবে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনের পথে নিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ রেলপথ প্রবর্তন। পরিবহণব্যবস্থার সন্ধিক্ষণ। ২০০০-এ একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গেল রেলপথ আর সড়ক। রেললাইন বঞ্চিত রেলপথগুলো ঝোপে ভরতি নালা হয়ে পড়ে রইল ভূপৃষ্ঠ জুড়ে। সড়কগুলো একদা নির্মিত হয়েছিল হাত দিয়ে দুরমুশ পিটিয়ে, বদখত লোহার রোলার চালিয়ে; চকমকি পাথর আর মাটি দিয়ে পেটাই অদ্ভুত সুপ্রাচীন সেইসব পথে ছড়ানো থাকত হরেকরকম আবর্জনা; লোহার অশ্বক্ষুর আর শকটচক্রে বিচিত্র পথ কেটে ফালাফালা হয়ে যেত কয়েক ইঞ্চি গভীর ক্ষত দগদগ করত রাস্তার সর্বত্র; ক্ষতবিক্ষত হতশ্রী এইসব পথ এখন লোপ পেয়েছে ধরাধাম থেকে–সে জায়গায় এসেছে এন্ডহ্যামাইট নামক একটি উপাদান দিয়ে নির্মিত পেটেন্ট করা পথ। পেটেন্ট যিনি নিয়েছিলেন–তাঁর নামই অমর হয়ে রয়েছে এন্ডহ্যামাইট নামটার মধ্যে। বিশ্ব ইতিহাসে যুগান্তর সৃষ্টি করবার মতো যে কটা আবিষ্কার আজ পর্যন্ত হয়েছে, ছাপাখানা আর স্টিম তার মধ্যে পুরোধা। এন্ডহ্যামাইট পড়ে এই পর্যায়ে।

আবিষ্কারকের নাম এন্ডহ্যাম। প্রথম যখন আবিষ্কার করেন উপাদানটা, গুরুত্বটা বুঝতে পারেননি। ভেবেছিলেন, ইন্ডিয়া-রবারের সস্তা বিকল্প উদ্ভাবিত হল বুঝি। সস্তা তো বটেই– টনপিছু দাম মোটে কয়েক শিলিং। কিন্তু একটা আবিষ্কার যে কত কাজে লাগতে পারে, তার ফিরিস্তি কি কেউ দিতে পারে? কাজেই স্বয়ং আবিষ্কারক এন্ডহ্যামাইটের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারলেও, পেরেছিলেন ওয়ামিং নামে এক ভদ্রলোক। শুধু গাড়ির টায়ারে নয়, রাস্তাঘাট বাঁধানোর কাজে বস্তুটাকে লাগানো গেলে যে পৃথিবীর খোলসটাকে মেজে-ঘষে ঝকঝকে তকতকে করে তোলা যাবে–এ ধারণা মাথায় আনতে পেরেছিলেন। ফলে, তাঁরই প্রচেষ্টা এবং সাংগঠনিক তৎপরতার সুফল হিসেবে ভূগোলকের সর্বত্র আবির্ভূত হল আধুনিক রাস্তার জটাজাল।

এক-একটা সড়ক লম্বালম্বিভাবে অনেক ভাগে ভাগ করা। দুদিকের কিনারা সংরক্ষিত শুধু সাইকেল আর সেইসব গাড়ির জন্যে, যাদের গতিবেগ ঘণ্টায় মাত্র পঁচিশ মাইলের বেশি নয়। তার গা ঘেঁষে ভেতরের দিক দিয়ে ধেয়ে যায় মোটরগাড়ি–গতিবেগ যাদের ঘণ্টায় একশো মাইল তো বটেই। একদম মাঝের অংশটুকু সংরক্ষিত রয়েছে অত্যন্ত বেগবান যন্ত্রযানদের জন্যে–গতিবেগ যাদের ঘণ্টায় দেড়শো মাইল কি তারও বেশি। এই ভবিষ্যদৃষ্টির জন্যে অবশ্য প্রচুর টিটকিরি হজম করতে হয়েছে ওয়ামিং বেচারিকে।

ওয়ামিং কিন্তু টলেননি। প্ল্যান অনুযায়ী সড়ক তো বানালেন। কিন্তু দশ-দশটা বছর বেবাক ফরসা হয়ে যাওয়ার পরেও একদম মাঝের অতিশয় বেগবান যন্ত্রযানদের জন্যে সংরক্ষিত অংশে ধুলোই জমা হয়ে গেল–গাড়ি আর চলল না। ওয়ামিং মারা যাওয়ার আগেই অবশ্য সবচেয়ে ভিড় দেখা গিয়েছিল একদম মাঝের অংশটুকুতেই। ঝড়ের বেগে বিশাল ধাতব কাঠামোর গাড়ি হরবখত ধেয়ে যেত সড়কের মাঝখান দিয়ে–বিরাট চাকাগুলোর ব্যাস বিশ থেকে তিরিশ ফুট তো বটেই। গতিবেগও বেড়ে চলল বছরে বছরে খুঁটিনাটি উন্নতিসাধনের মধ্যে দিয়ে–শেষকালে পৌঁছাল ঘণ্টায় দুশো মাইলে। গতিবেগের এই বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিপ্লব ঘটে গেল ক্রমবর্ধমান শহরগুলোর ক্ষেত্রেও। বিজ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগের ফলে ধুলো, ধোঁয়া, কুয়াশা, আবর্জনা অদৃশ্য হয়ে গেল (ভিক্টোরীয় যুগে যা ছিল শহরের সৌন্দর্য)। আগুনের বদলে এল বৈদ্যুতিক চুল্লি। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আইন প্রণয়ন হয়ে গেল–যে আগুন নিজের ধোঁয়া গিলে খেতে না পারবে, তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে। সদ্য-আবিষ্কৃত কাঁচজাতীয় একটা বস্তু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হল শহরের সমস্ত পথঘাট, পাবলিক পার্ক আর বাজারহাট। লন্ডন শহরটার ওপর এই জাতীয় ছাদ নির্মাণ বলতে গেলে থেমে নেই আজও চলছে তো চলছেই। আকাশচুম্বী ইমারত নির্মাণ করার ব্যাপারে বেশ কিছু অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং মূর্খের মতো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর থেকেই পালটে গেল লন্ডনের সুরতখানা–আগে যা ছিল চ্যাপটা, থ্যাবড়া থ্যাবড়া বাড়ি সমাকীর্ণ আদিম শহর–যে শহরের মধ্যে স্থাপত্যশিল্পের দৈন্যদশা প্রকট ছিল বড় বেশিভাবে–এখন সেই শহরেই মেঘলোককে চুম্বন দেওয়ার প্রয়াসে ধাঁ ধাঁ করে উঠে গেল লম্বা লম্বা সৌধ। দায়িত্ব বাড়ল মিউনিসিপ্যালের। জল, আলো আর পয়ঃপ্রণালীর সুবন্দোবস্ত করলেই শুধু চলবে না–বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থায় যেন ক্রটি না থাকে।

মানুষকে অনেক সুখ-সুবিধে এনে দিয়েছিল এই দুশো বছর। এনেছিল অনেক পরিবর্তন। সব কাহিনি শোনাতে গেলে ডেনটন-এলিজাবেথিটার কাহিনি থেকে সরে যেতে হবে আমাদের। আকাশে ওড়া যে সম্ভবপর তা কি কেউ কল্পনাও করতে পেরেছিল দুশো বছর আগে? উপযুপরি আবিষ্কারের পর আবিষ্কারে সম্ভব হয়েছিল এহেন অসম্ভব কাণ্ডও। হেঁশেল নিয়ে আটকে থাকতে কেউ আর চায়নি, অসংখ্য হোটেল নিয়েছিল রান্নাবান্না এবং উদরপূর্তির দায়িত্ব। চাষবাস নিয়ে যারা চিরকাল মাঠেঘাটে, খেতখামারে কাটিয়েছে, আস্তে আস্তে তারা নিবাস রচনা করেছিল শহরে। গোটা ইংল্যান্ডে শেষ পর্যন্ত থেকে গিয়েছিল চারটে শহর-বিরাট শহর! লক্ষ লক্ষ মানুষ আস্তানা নিয়েছিল এক-একটা শহরে। শহরতলির বাড়িঘরদোরগুলো ভূতুড়ে বাড়ি হয়ে উঠেছিল এই দুশো বছরে–মানুষজন কেউ থাকত না সেসব বাড়িতে।

বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বটে ডেনটন আর এলিজাবেথিটা–পুনর্মিলনও ঘটেছিল। বিয়েটা কিন্তু হয়নি। দোষটা ডেনটনেরই। ওই একটা দোষই কেবল ছিল বেচারির। পকেটে ছিল না। পয়সা। একুশ বছরে পা না-দেওয়া পর্যন্ত এলিজাবেথিটার ভাঁড়েও মা ভবানী, ওর তখন বয়স মোটে আঠারো। ওই যুগের রীতি অনুযায়ী একুশ বছর হলেই পাবে মায়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তি। ফলে, শিকেয় তোলা রয়েছে বিবাহ-পর্ব। দিবারাত্র ঘ্যানর ঘ্যানর করত এলিজাবেথিটা, তার মতো অসুখী আর কেউ নেই, কেউ বোঝে না, কেউ না, একমাত্র ডেনটন ছাড়া। ডেনটন কাছে না থাকলে দুচোখে অন্ধকার দেখে। ডেনটনও ঘ্যানর ঘ্যানর করে যেত একইভাবে, চৌপর দিনরাত কাছে পেতে চাইছে এলিজাবেথিটাকে, কিন্তু পাচ্ছে কই? দুজনের দুঃখ বিনিময় চলত দেখাসাক্ষাৎ হলেই।

উড়ুক্কু যন্ত্রযানের মঞ্চের ওপর রক্ষিত ছোট্ট আসনে বসে একদিন এইসব কথাই হচ্ছিল দুজনের মধ্যে। জায়গাটা লন্ডন শহরের পাঁচশো ফুট ওপরে। অনেক নিচে দেখা যাচ্ছে আধুনিক লন্ডনকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর লন্ডন বাসিন্দাদের কাছে সে চিত্র তুলে ধরা বিলক্ষণ মুশকিলের ব্যাপার। ম্যামথ হোটেলশ্রেণি, স্ফটিক-প্রাসাদ, শহরজোড়া অতিকায় সৌধমালা কল্পনাতে আনাও কঠিন। অগুনতি ছাদের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা বনবন করে ঘুরে চলেছে হাওয়ালের চাকা।

ডেনটন-এলিজাবেথিটার কিন্তু মনে হচ্ছে যেন বিশাল কারাগারে বন্দি রয়েছে দুজনে। আরও তিনটে বছর থাকতে হবে এই খাঁচায়–তারপর পাবে মুক্তি–বহুবার এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে দুজনের মধ্যে, এখনও চলছে একই দুঃখের চর্বিতচর্বণ। এই তিন-তিনটে বছর ঠায় বসে থাকা যে অতীব কষ্টকর, একেবারেই অসম্ভব এবং মনের ওপর চূড়ান্ত অত্যাচার, এ ব্যাপারে একমত হয়েছে দুজনেই। ডেনটন জানিয়েছে, তিন বছর ফুরানোর আগেই অক্কা না পায় দুজনে!

চোখে জল এসে গেল এলিজাবেথিটার। গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।

কিন্তু এহেন শহরে কপর্দকহীন অবস্থায় বিয়ে করাটাও তো একটা ভয়াবহ ব্যাপার। অষ্টাদশ শতাব্দীতে অবশ্য পাতায় ছাওয়া মেটে কুঁড়েঘরে দাম্পত্য জীবনযাপনের মতো সুখাবহ আর কিছুই ছিল না। পাখি নেচে বেড়াত গাছের ডালে ডালে, ফুলের সৌরভে মাতাল হয়ে থাকত বাতাস, অজস্র বর্ণ আচ্ছন্ন করত চিত্ত। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই সে দিন পালটাতে আরম্ভ করেছিল। গরিব মানুষরাও এখন শহরের নিচুতলার নতুন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তবে হ্যাঁ, ঊনবিংশ শতাব্দীতেও শহরের নিচুতলা ছিল আকাশ চন্দ্রাতপের ঠিক তলাতেই; মাটি, কাদা, বন্যার জল, ধোঁয়া, আবর্জনা, এই ছিল নিচুতলার চেহারা। পর্যাপ্ত জল পর্যন্ত পেত না। অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর অঞ্চলেই ইতর প্রাণীর মতো গাদাগাদি অবস্থায় কোনওমতে দিন গুজরান করত নিচুতলার মানুষ। রোগের ডিপো ছিল এদের অঞ্চলটুকুই, সংক্রমণের এমন অনুকূল পরিবেশ পাত্তা পেত না বড়লোকদের পাড়ায়। দ্বাবিংশ শতাব্দীতে পালটে গেছে চিত্র। লন্ডন শহর এখন বহুতল নগরী, চারপাশে না ছড়িয়ে মাথা তুলে গেছে ওপরদিকে। যাদের পয়সা আছে, তারা থাকে ওপরতলায় খানদানি হোটেলকক্ষে; মেহনতি মানুষরা থাকে নিচের তলায় এবং মাটির তলাতেও।

মহারানি ভিক্টোরিয়ার আমলে লন্ডনেই ইস্ট এন্ড পাড়ার মেহনতি মানুষরা যেভাবে জীবনযাপন করে এসেছে, এখনও তার রদবদল ঘটেনি ঠিকই, কিন্তু কথ্য ভাষায় পরিবর্তন এসেছে বেশ বড় রকমের। এই নিচের তলাতেই কেটে যায় তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু, ওপরতলায় ওঠে কদাচিৎকাজের সুযোগ পেলে। কষ্ট? অসুবিধে? দুর্ভোগ? গা সওয়া হয়ে গেছে। কেননা এই পরিবেশেই এদের অধিকাংশই যে মানুষ হয়েছে, কিন্তু ডেনটন আর এলিজাবেথিটার কাছে এই নারকীয় জীবনযাপন যে মৃত্যুর অধিক ভয়ংকর।

এলিজাবেথিটা কি ধারদেনা করতে পারে না? বিষয়সম্পত্তি হাতে এলে শোধ করে দিলেই তো ল্যাটা চুকে যায়। উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু মুখ দিয়ে ডেনটন তা বার করতেও যে পারছে না। এলিজাবেথটা যদি তার অন্য অর্থ করে?

লন্ডন থেকে প্যারিসে যাওয়ার মতো গাড়ি ভাড়া নেই এলিজাবেথিটার হাতে। প্যারিস শহরটাও পৃথিবীর অন্যান্য শহরের মতো বড়লোকদের থাকার জায়গা। বড় খরচ। লন্ডন। শহরের মতোই সেখানে নিবাস রচনা অসম্ভব।

আহা রে! এর চাইতে অতীতের সেই দিনগুলোতেই যে ফিরে যাওয়া ছিল অনেক। ভালো। রোমান্টিক কল্পনারঙিন চোখে ঊনবিংশ শতাব্দীর হোয়াইট চ্যাপেলকে দেখবার প্রয়াস পেয়েছিল ডেনটন।

ডুকরে কেঁদে উঠেছিল এলিজাবেথিটা। তিন-তিনটে বছর–দীর্ঘ ছত্রিশটা মাস এইভাবেই কি কষ্ট করে কাটাতে হবে?

আচম্বিতে একটা বুদ্ধি খেলে গিয়েছিল ডেনটনের মগজে। গ্রামে গেলে কেমন হয়?

দারুণ অ্যাডভেঞ্চার সন্দেহ নেই। কিন্তু সিরিয়াসলি তা-ই কি চায় ডেনটন? ডাগর চোখ তুলে চেয়েছিল এলিজাবেথিটা। থাকা হবে কোথায়?

কেন, ওই পাহাড়ের ওপারে বিস্তর বাড়িঘরদোর তো এখনও আছে। এককালে মানুষ থাকত সেখানে। এখনই বা অসম্ভব হবে কেন? ডেনটন বুঝিয়েছিল এলিজাবেথিটাকে।

বলেছিল, গ্রাম আর শহরের ধংসাবশেষ তো ফ্লায়িং মেশিন থেকেই দেখা যায়। পড়েই আছে–মাটিতে মিশিয়ে দিতে গেলেও তো খরচ হবে–ফুড কোম্পানি সে খরচ করতে রাজি নয়। গোরু, মোষ, ভেড়া চরবার জায়গা এখন। রাখালদের কাউকে পয়সা দিলেই খাবার এনে দেবে। একখানা বাড়ি নিজেরাই মেরামত করে নিয়ে দিব্যি থাকা যাবে।

উঠে দাঁড়িয়েছিল এলিজাবেথিটা। প্রদীপ্ত চোখ। দারুণ প্রস্তাব নিঃসন্দেহে। কিন্তু পলাতক আসামিদের ডিপো যে ওখানে… যত চোর-ডাকাতদের আস্তানা…।

ছেলেমানুষের মতো ডেনটন তখন বলেছিল, তাতে কী! একটা তলোয়ার জুটিয়ে নিলেই হল!

বিষম উৎসাহে চোখ জ্বলে উঠেছিল এলিজাবেথিটার। তলোয়ার জিনিসটা সম্পর্কে আগেই অনেক কথা সে শুনেছে, মিউজিয়ামে দেখেওছে। রোমান্স আর অ্যাডভেঞ্চার সৃষ্টি করেছে ইস্পাতের এই হাতিয়ার অতীতকালে–সব বীরপুরুষই সঙ্গে রাখত। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাই জানতে চায় আরও বৃত্তান্ত। যতই শোনে, ততই উৎসাহ আর উত্তেজনার মাদল বাজনা বাজতে থাকে অণু-পরমাণুতে। খাবারদাবার? দিন দশ-বারোর খাবার সঙ্গে নিলেই হল। ওটা কোনও সমস্যাই নয়। কেননা, এ যুগের খাবারমাত্রই কৃত্রিম পুষ্টিজমিয়ে শক্ত করে এতটুকু সাইজে নিয়ে আসা। দশ-বারো দিনের খাবার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এমন কী ব্যাপার? বাড়ি মেরামত না-হওয়া পর্যন্ত ছাদহীন ঘরগুলোয় আকাশ চন্দ্রাতপের তলায় শুয়ে থাকলেই হল। এখন গরমকাল। লন্ডন বাসিন্দারা শিল্পীর হাতে ছবি আঁকা, বাহারি আলোয় ঝলমলে ছাদওয়ালা ঘরে থাকতে থাকতে ভুলেই গেছে, তার চাইতেও ভালো কড়িকাঠ নিয়ে বসে আছেন স্বয়ং প্রকৃতিদেবী তাঁর লীলানিকেতনে। ওই আকাশে লক্ষ-কোটি নক্ষত্রর ঝিকিমিকি… অমন কড়িকাঠের তলায় ঘুমানোর মতো মজা কি আর হয়?

ডেনটনের আবেগময় ভাষা পাগল করে দিয়েছিল এলিজাবেথিটাকে। প্রথমে একটু দ্বিধা ছিল ঠিকই। এক হপ্তা পরে তা ফিকে হয়ে এল, একেবারেই মিলিয়ে গেল আরও একটা সপ্তাহ পরে। শহরের বন্দিদশা থেকে পরিত্রাণের এমন মতলব আগে কেন মাথায় আসেনি, ভেবে আক্ষেপের অন্ত রইল না দুজনেরই। মুক্তি। মুক্তি! উদার আকাশের তলায় প্রাচীন ও পরিত্যক্ত পল্লি এবং নগরীর মধ্যে অনাবিল স্বাধীনতার আনন্দ-কল্পনায় মশগুল হয়ে রইল দুজনে।

তারপর একদিন গ্রীষ্মের মাঝামাঝি একটি প্রত্যূষে দেখা গেল, উড়ুক্কু যন্ত্রযানের মঞ্চে ডেনটনের জায়গায় কর্তব্যনিরত রয়েছে আর-একজন সামান্য কর্মচারী।

গোপনে বিয়েটা সেরে নিয়েছে ডেনটন আর এলিজাবেথিটা। পূর্বপুরুষদের মতোই মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে রওনা হয়েছে পল্লি প্রকৃতির শ্যামলিমার সন্ধানে। এলিজাবেথিটার পরনে আগেকার আমলের সাদা বিয়ের পোশাক। ডেনটন পরেছে বেগুনি রঙের ঢোলা বেশ–পিঠে চামড়ার ফিতেয় বাঁধা খাবারদাবার–কোমরে আলখাল্লার তলায় স্টিলের তরবারি। শেষোক্ত বস্তুটা বহন করছে লাজরক্তিম মুখে।

কল্পনা করুন তো দেখি ওদের পাড়াগাঁ অভিমুখে যাওয়ার ছবিটা! ভিক্টোরীয় আমলের দিগন্তবিস্তৃত শহরতলি আর জঘন্য পথঘাট কোথায়? পুঁচকে বাড়ি, নির্বোধপ্রতিম খুদে বাগান, গোপনীয়তা রক্ষার নিষ্ফল প্রয়াস তিরোহিত হয়েছে কোনকালে। নবযুগের আকাশচুম্বী সৌধশ্রেণি, যান্ত্রিক পথঘাট, বিদ্যুৎ এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থা–সবই আচম্বিতে শেষ হয়েছে চারশো ফুট উঁচু পর্বত প্রাচীরের মতো খাড়াই দেওয়ালের সামনে। শহর ঘিরে রয়েছে ফুড কোম্পানির গাজর, শালগম, ওলকপির খেত। হাজার রকমের বিচিত্র খাদ্যসম্ভার প্রস্তুত হচ্ছে তো এইসব সবজি থেকেই। ঝোপঝাড়ের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছেন। কোথাও? নির্মূল হয়েছে সামান্য কাঁটাঝোঁপ আর বুনো ফুলের গাছও। প্রাচীনকালে যা ছিল পরম উৎপাত, ফুড কোম্পানি তার অবসান ঘটিয়েছে চিরতরে। বছরের পর বছর বর্বর প্রথায় ঝোঁপঝাড় গজিয়ে যেত খেতখামারে–এখন আর তা হয় না। ফলে, উৎপাদন বেড়েছে, বাজে খরচ কমেছে। মাঝে মাঝে অবিশ্যি দেখতে পাচ্ছেন আপেল এবং অন্যান্য ফলভারে অনবত বৃক্ষ। এ ছাড়াও রয়েছে বিশালকায় কৃষিযন্ত্র, জলনিরোধক ছাউনির তলায়। আয়তাকার খালের মধ্যে বয়ে যাচ্ছে খেতের জল। মাঝে মাঝে উঁচু জায়গাগুলোয় আবর্জনা পচিয়ে নির্গন্ধ সার সরবরাহ করা হচ্ছে আশপাশের খেতে।

প্রকাণ্ড শহর প্রাচীরের বিশাল ধনুকাকৃতি তোরণের সামনে থেকে বেরিয়েছে এন্ডহ্যামাইট সড়ক–গেছে পোর্টসমাউথ পর্যন্ত। ভোরের সোনা-রোদে দেখা যাচ্ছে নীল কোর্তা-পরা ফুড কোম্পানির পরিচারকদের–পিলপিল করে চলেছে পথ বেয়ে সূর্য না ডোবা পর্যন্ত গতর খাটাতে। ধাবমান এই জনতার পাশে বিন্দুবৎ চলেছে ওরা দুজনে, নজরই পড়ে না সেদিকে। সড়কের দুপাশের কিনারা বরাবর গোঁ গোঁ গরগর ঘড়ঘড় শব্দে ধেয়ে যাচ্ছে মান্ধাতার আমলের বাতিল মোটরগাড়ি–শহর সীমানা থেকে বিশ মাইল চৌহদ্দি পর্যন্ত এদের ডিউটি। তার ভেতরদিককার পথ দিয়ে ছুটছে হরেকরকম যন্ত্রযান; দ্রুতগামী মনোসাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অগুনতি আরোহী, পাশে পাশে ধেয়ে যাচ্ছে। হিলহিলে চেহারার মাল্টি-সাইকেল আর বিস্তর বোঝা নিয়ে চার চাকার সাইকেল, চলেছে দানবাকৃতি মাল-বওয়া শকট–এখন শূন্য, কিন্তু সন্ধ্যা সমাগমে ফিরবে খেতের মালবোঝাই হয়ে। ইঞ্জিনের ধুকধুক শব্দ, হর্ন আর ভেঁপুর মিলিত ঐকতানে মুখরিত সড়কের ওপর দিয়ে বনবন করে ঘুরে চলেছে অগুনতি চক্র–নিঃশব্দে।

নিঃশব্দে চলেছে প্রেমিকযুগলও সড়কের কিনারা বরাবর। নতুন বর-বউ তো, তাই লজ্জা ঘিরে রয়েছে দুজনকেই। শকটারোহীরা গগনবিদারী চিৎকার ছেড়ে যাচ্ছে দুই পথচারীকে উদ্দেশ্য করে–কেন-না ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ইংলিশ সড়কে মোটরগাড়ি যেমন একটা বিরল দৃশ্য, ২১০০ খ্রিস্টাব্দে পায়ে হেঁটে যাওয়াটাও সমান বিরল দৃশ্য। ওদের কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই কোনওদিকে। স্থির চাহনি নিবদ্ধ সামনের পল্লি প্রকৃতির দিকে–কানে তুলছে না কোনও চিৎকারই।

সামনেই ঢালু হয়ে উঠে গেছে জমি–প্রথমে নীলাভ, তারপর সবুজে সবুজ। দানবাকার হাওয়াকলের চাকার পর চাকা দেখা যাচ্ছে দূরের বাড়ির ছাদে ছাদে। ভোরের টানা লম্বা ছায়ায় গা মিলিয়ে ছুটে চলেছে ভ্যানগাড়িগুলো। দুপুর নাগাদ দেখা গেল, ধূসর বিন্দুর মতো চরে বেড়াচ্ছে ফুড কোম্পানির মাংস বিভাগের ভেড়ার পাল। আরও ঘণ্টাখানেক হাঁটবার পর পেরিয়ে এল কাদামাটি, ফসল-কাটা শেকড়সর্বস্ব খেতের মাঠ এবং কাঁটাঝোপের একটিমাত্র বেড়া। বাস, বিনা অনুমতিতে প্রবেশের ভয় আর রইল না। রাস্তা ছেড়ে সবুজ মাঠে নেমে এখন নির্বিঘ্নে রওনা হওয়া যাবে পাহাড়তলি অঞ্চলে।

পাণ্ডববর্জিত এহেন অঞ্চলে এই প্রথম ওদের আগমন।

খিদেয় পেট চুঁইছুঁই করছে দুজনেরই। ফোঁসকা পড়েছে পায়ে। হাঁটাটাও তো একটা ব্যায়াম–এ ব্যায়ামের সুযোগ তো ঘটে না যন্ত্রযুগের এই সভ্যতায়। ক্ষণকাল পরেই তাই দুজনে বসে পড়ে ঝোঁপঝাড়হীন ঘোট-করে-কাটা ঘাসজমির ওপর। এবং সেই প্রথম তাকায় পেছনে ফেলে-আসা শহরের দিকে। টেমস নদীর অববাহিকায় নীলাভ কুয়াশার মধ্যে দিয়ে দেখা যায় দূরবিস্তৃত লন্ডন। ভেড়াদের সান্নিধ্যলাভের সুযোগ কখনও ঘটেনি। এলিজাবেথিটার। প্রথমে একটি সন্ত্রস্তই ছিল। ভয় কেটে গেল ডেনটনের আশ্বাস বচনে। মাথার ওপর সুনীল গগনে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে একটা সাদা-ডানা বিহঙ্গ। আহার-পর্ব সমাপ্ত না-হওয়া পর্যন্ত কথা সরল না কারওই মুখে। তারপর অর্গলমুক্ত হল জিহ্বা। কলকল করে কত কথাই না বলে গেল ডেনটন। এখন থেকে সুখের সাগরে নিমজ্জিত থাকবে দুজনায়। আরও আগে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল সোনার খাঁচার সুখাবহ বন্দিদশা থেকে। অতীতের রোমান্স মধুর দিনগুলিতে দুদিন আগে ফিরে এলে খামকা এত দুর্ভোগ তো পোহাতে হত না। বলতে বলতে ঘাসজমির ওপর রাখা তরবারি তুলে নিয়েছিল ডেনটন। শানিত ফলার ওপর কম্পিত আঙুল বুলিয়ে নিয়ে এলিজাবেথিটা জানতে চেয়েছিল–বরবাদ এই হাতিয়ার হেনে শত্রু কুপোকাত করতে পারবে তো ডেনটন? প্রয়োজন হলে তা-ই করতে হবে বইকী–বলেছিল ডেনটন। কিন্তু রক্তপাত তো ঘটবে– শিউরে উঠেছিল এলিজাবেথিটা।

একটু জিরিয়ে নিয়ে দুজনে রওনা হয়েছিল পাহাড় অভিমুখে। পথে পড়ল একপাল ভেড়া। ভেড়া কখনও দেখেনি এলিজাবেথিটা। নিরীহ এই প্রাণীগুলিকে হত্যা করা হয়। উদরপূর্তির জন্যে–ভাবতেই কাঁটা দিয়ে ওঠে গায়ে। দূরে শোনা যায় ভেড়া-সামলানো কুকুরের ডাক। হাওয়াকলের খুঁটির পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে একজন মেষপালক। হেঁকে জানতে চায়, যাওয়া হচ্ছে কোথায়।

আমতা আমতা করে ডেনটন জানায়, যাওয়া হচ্ছে একটা নিরালা বাড়ির খোঁজে দুজনে থাকবে সেখানে। যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মেষপালক কিন্তু চেয়ে থাকে চোখ বড় বড় করে। বিশ্বাস হয়নি কথাটা।

নিশ্চয় কোনও কুকর্ম করে এসেছ?

এক্কেবারেই না। শহরে থাকার আর ইচ্ছে নেই–তাই এসেছি, ঝটিতি জবাব দেয় ডেনটন।

আরও অবিশ্বাস প্রকটিত হয় মেষপালকের দুই চোখে–কিন্তু এখানে তো থাকতে পারবে না।

দেখাই যাক-না চেষ্টা করে।

পর্যায়ক্রমে দুজনের মুখে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলে মেষপালক, কালই ফিরে যেয়ে শহরে। দিব্যি গেলে বল তো বাপু, কী কুকর্মটি করে এসেছ? পুলিশ কিন্তু আমাদের ভালো চোখে দেখে না।

চোখে চোখ রেখে বলে ডেনটন, শহরে থাকতে গেলে পয়সা দরকার–আমাদের তা নেই। নীল ক্যাম্বিস পরে কুলিগিরি করাও আমাদের ধাতে সইবে না। চাই সাদাসিধেভাবে থাকতে–সেকেলে মানুষদের মতো।

মেষপালক যে চিন্তাশীল মানুষ, তা মুখ দেখলেই বোঝা যায়। গাল ভরতি দাড়ি। এলিজাবেথিটার নরম ধাঁচের আকৃতির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে শুধু বললে, তাদের মনেও তো ঘোরপ্যাঁচ ছিল না।

আমাদেরও নেই।

হাসল মেষপালক। বলে দিলে বহু দূরের এক পরিত্যক্ত গ্রামের নিশানা। আগে যে লোকালয়ের নাম ছিল এপসম, এখন সেখানে মাটির টিপি–ইটগুলো পর্যন্ত লোপাট করে নিয়ে গিয়ে ভেড়ার খোঁয়াড় তৈরি হয়েছে। এই টিপির পাশ দিয়ে গেলে পড়বে আর-একটা মাটির ঢিপি–অতীতে সেখানে ছিল লেদারহেড লোকালয়। পাহাড়ের পাশ দিয়ে, উপত্যকা পেরিয়ে, বিচবৃক্ষের জঙ্গলের কিনারা বরাবর গেলে পাওয়া যাবে বুনো ঝোঁপ ভরতি একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এখানকার হাওয়াকলের তলা দিয়ে পাথর দিয়ে বাঁধানো দুহাজার বছরের পুরানো একটা রোমান গলি গেছে নদীর পাড় বরাবর। সেইখানে মিলবে বেশ কিছু বাড়ি। কয়েকটার ছাদ এখনও ভেঙে পড়েনি। মাথা গোঁজার ঠাইটুকু অন্তত পাওয়া যাবে। খুবই শান্ত, খুবই নিরিবিলি জায়গা। কিন্তু রাত ঘনিয়ে এলে জ্বলে না কোনও আলো–ডাকাতরাও নাকি টহল দেয়–অবশ্য শোনা কথা। গল্পকথকদের ফোনোগ্রাফি, প্রমোদ ব্যবসায়ীদের কিনেমাটোগ্রাফ নেই একেবারেই। খিদে পেলে পাওয়া যাবে না খাবার, অসুখ হলে ডাক্তার।

যাওয়ার আগে মেষপালকের ঠিকানা নিয়ে নিল ডেনটন। দরকারমতো খাবারদাবার, জিনিসপত্র কিনে এনে দিতে হবে শহর থেকে।

সন্ধে নাগাদ পরিত্যক্ত গ্রামটায় পৌঁছাল দুজনে। অবাক হল খুদে খুদে অদ্ভুতদর্শন বাড়ি দেখে। সূর্য তখন পাটে বসেছে। সোনা-রোদে নিঝুম হয়ে রয়েছে পুরো তল্লাটটা। খুঁজেপেতে বার করল একটা দেওয়ালহীন বাড়ির এমন একখানা কামরা, যার একধারে ফুটে রয়েছে নীল রঙের একটা বুনো ফুল–চোখ এড়িয়ে গেছে ফুড কোম্পানির ঝোঁপ সাফাই লোকজনদের।

মনের মতো এহেন আস্তানায় কিন্তু বেশিক্ষণ মন টেকেনি দুজনের কারওই। এসেছে প্রকৃতির আলয়ে প্রাকৃতিক শোভা দেখবে বলে। ঘরের মধ্যে বসে থাকা কি যায়? তাই কিছুক্ষণ পরেই রওনা হয়েছিল পাহাড়ের ওপর। অন্ধকার তখন জমিয়ে বসেছে। ঘরে থাকতেও অসুবিধে। পাহাড়ে উঠে দুচোখ ভরে দেখেছিল আকাশের লক্ষ মানিক, হৃদয় ভরে পান করেছিল নিথর নৈঃশব্দ্য। সেকালের কবিরা কত কবিতাই না রচনা করেছে স্বর্গলোকের এই সুষমা নিয়ে। পাহাড় থেকে নামল সারারাত কাটিয়ে ভোরের আলো ফোঁটার সময়ে। ঘুম হল স্বল্পক্ষণ। ছোট্ট একটা পাখির গানে চোখ রগড়ে উঠে বসল দুজনে।

দিন তিনেক এইভাবেই কাটল যেন রোমান্টিক স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। এত সুখ, এত স্বাধীনতা কখনও পায়নি দ্বাবিংশ শতাব্দীর এই দুটি শহরে ছেলেমেয়ে। কিন্তু উত্তেজনা থিতিয়ে এল এক সপ্তাহ পরে–আরও একটা হপ্তা যাওয়ার পরে ঝিমিয়ে পড়ল একেবারেই। প্রথম প্রথম ঘরকন্নায় উঠে-পড়ে লেগেছিল। এ বাড়ি-ও বাড়ি ঘুরে ভাঙা এবং বদখত চেহারার সেকেলে চেয়ার-টেবিল এনে সাজিয়েছিল নিজেদের ভাঙা ঘর। বিছানার গদির জন্যে ভেড়াদের একরাশ ঘাস দুহাত ভরে নিয়ে এসেছিল ডেনটন। অখণ্ড অবসরে হাঁপিয়ে ওঠার পর একদিন কোত্থেকে একটা মরচে-পড়া কোদাল কুড়িয়ে নিয়ে আধ ঘণ্টা ধরে মাটি কুপিয়ে ঘেমে-নেয়ে এসে এলিজাবেথিটাকে বলেছিল–সেকালের লোকগুলো অসুর ছিল নাকি? কিন্তু কাঁহাতক এইভাবে একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন নতুন বৈচিত্র আনা যায় এবং একই সুখের কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা এবং শোনা যায়? চেষ্টার অবশ্য ত্রুটি করেনি ডেনটন। হপ্তা দুয়েক আবহাওয়া ভালো থাকায় তেমন দুর্ভোগও পোহাতে হয়নি। শহর থেকে এতটা পথ হেঁটে আসায় গা-গতরের ব্যথা মরেনি যদিও–বরং বেড়েছে ভাঙা ঘরের খোলা হাওয়ায় রাতের পর রাত কাটিয়ে। শহরের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে মানুষ হয়ে ইস্তক মুক্ত জীবনের এহেন চেহারা তো কখনও তারা দেখেনি। তারপরেই একদিন আকাশ কালো করে ঘনিয়ে এল বৃষ্টির মেঘ। লকলকিয়ে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। শিউরে উঠেছিল দুজনেই। বিদ্যুতের এ ধরনের ভয়ংকর রূপ কখনও তারা দেখেনি। দৌড়াতে দৌড়াতে নেমে এসেছিল ভাঙা আস্তানায়। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে মুষলধারে বৃষ্টি। ফুটোফাটা ছাদ আর ভাঙা দেওয়াল দিয়ে স্রোতের মতো জলের ধারায় সারারাত ধরে ভিজেছে দুজনে, শীতে কেঁপেছে ঠকঠক করে। ভোররাতে মেঘগর্জন যখন মিলিয়ে গেল দূর হতে দূরে, থেমে গেল বৃষ্টি–শোনা গিয়েছিল নতুন একটা শব্দ।

কুকুরের ডাক। একপাল কুকুর ধেয়ে আসছে এদিকেই। মেষপালকদের কুকুর। গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঢুকে পড়েছিল ভাঙা ঘরে। কুকুর কখনও দেখেনি এলিজাবেথিটা। বিশেষ করে এই ধরনের ভয়ংকর সারমেয়। এতক্ষণ কাঁদছিল সারারাত দুর্ভোগ আর ধকলের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতায়। এখন শুরু হল প্রাণ নিয়ে টানাটানি। দাঁত খিঁচিয়ে একটা কুকুর তেড়ে আসতেই তরবারি নিয়ে তাড়া করে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল ডেনটন। ছটা কুকুর ঘিরে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ওপর। টুটিটুকুতে তখনও কামড় বসেনি–কিন্তু আর দেরিও নেই। জানলা থেকে সেই দৃশ্য দেখে আঠারো বছরের মার্জিত শিক্ষাদীক্ষা সমস্ত ভুলে গিয়ে এক লাফে দ্বাবিংশ শতাব্দী থেকে প্রথম শতাব্দীর আদিম মানবী হয়ে গিয়েছিল এলিজাবেথিটা। মরচে-পড়া কোদালটা কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এলোপাথাড়ি হাঁকিয়ে খুলি চুরমার করেছিল কয়েকটা কুকুরের–ডেনটনের ধারালো তলোয়ারের কোপে প্রাণ গিয়েছিল আরও কয়েকটার। বাকি কটা প্রাণ নিয়ে লেজ গুটিয়ে দৌড়েছিল মনিবদের কাছে।

কিন্তু এদের মনিব তো ফুড কোম্পানি। এবার তো তারা আসবে–অনধিকার প্রবেশের সাজাও পেতে হবে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল এলিজাবেথিটা। ঢের হয়েছে–রোমান্স গল্পেই মানায়–ধাতে সয় না। এ জীবন তাদের নয়–শহরের জীবনই ভালো।

ডেনটন নিজে থেকেই বলেছিল, শহরেই ফিরে যাওয়া যাক। ফুড কোম্পানির লোকজন এসে পড়ার আগেই। পয়সা? মুখ ফুটে এতদিন বলতে পারেনি বুদ্ধিটা এলিজাবেথিটার মাথাতেই আসা উচিত ছিল। বিপুল ভূসম্পত্তির মালিক হতে যাচ্ছে যে আর তিনটে বছর পরে, সে তো অনায়াসেই ধার করতে পারে এখন থেকেই।

আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল এলিজাবেথিটা। সত্যিই তো, এ বুদ্ধি তো তার মাথায় আগে আসেনি। শহরে থাকতে গেলে দেদার টাকা দরকার–ধার করলেই তো তা পাওয়া যায়! কে না জানে তার মায়ের কুবের সম্পদের কাহিনি!

ঝটপট কিছু খাবার ব্যাগে ভরে নিয়ে দুজনে পালিয়েছিল রোমান্স-পর্বে ইতি ঘটিয়ে দিয়ে–নীল ফুলটাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অধিকার হারিয়েছিল বলে পাপড়ির গায়ে আলতো চুমু এঁকে দিয়ে গিয়েছিল এলিজাবেথিটা। এস্তে পলায়ন করেছিল বিশাল সেই শহরের দিকে, যে শহর গিলে বসে আছে মানুষ জাতটাকে।