হত্যার অন্তরালে – ৫

সদানন্দবাবু বলেছিলেন, প্যালেসিয়াল বিল্ডিং। ঠিক অতটা না হলেও সাত নম্বর পপলার অ্যাভিনিউয়ের বাড়িটি দেখলুম বেশ সমীহ জাগাবার মতনই বটে। পুরোনো আমলের শক্তপোক্ত দোতলা বাড়ি। ছোটনাগপুর কি সাঁওতাল পরগনায় সেকালের সচ্ছল বাঙালিদের অনেকে যে-রকমের বাড়ি বানাতেন, অনেকটা সেই রকমের। তবে সেসব বাড়ির মতন দেওয়ালে কোথাও ফাটল ধরেনি, পাঁচিলের পলস্তরা খসে পড়েনি, কার্নিশ ফাটিয়ে অশথ গাছের চারাও কোথাও গজিয়ে ওঠেনি দেখলেই বোঝা যায় যে, একটা বাড়িকে ঠিকঠাক চেহারায় ধরে রাখার জন্য নিয়ত যে যত্ন আর পরিচর্যার দরকার হয়, এক্ষেত্রে তার কোনও অভাব ঘটছে না।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাড়ি আর বাগান মিলিয়ে এ তো দেখছি কাঠা দশ-বারোর কম হবে না। “ সদানন্দবাবু বললেন, “এ বাড়িতে শেষ এসেছিলুম রঘুবীর ঘোষ রিজাইন করবার দিন পনেরো বাদে। তা মশাই, তারপরে তো পঁয়তিরিশ বছর কেটে গেল। অথচ পাড়ার চেহারা এর মধ্যে পালটে গেচে ঠিকই, কিন্তু এই বাড়িটা তো দেকচি সেইরকমই রয়েচে

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাকবে না কেন, মেনটেন্যান্সের দিকে নজর রাখলেই থাকে।”

যেমন বাড়ি, গ্রিল-লাগানো গেটের এদিক থেকে তেমনি দেখলুম যে, বাগানটাও যেন ঝকঝক করছে। লনের ঘাস একেবারে পরিচ্ছন্ন করে ছাঁটা। তার ধার বরাবর হরেক রকমের মরসুমি ফুলের চওড়া বর্ডার। মার্চ মাসের বিকেলবেলায় সেই বর্ডার জুড়ে নানান শেডের লাল হলুদ ও বেগুনি বর্ণের এমন বাহার খুলেছে যে, দেখলে আর চোখ ফেরানো যায় না। বাড়ির দরজার দু’পাশ থেকে উপরে উঠে গেছে মেরি পামার গোত্রের দুটি বুগনভিলিয়ার ঝাড়। তার পাতা একেবারে সম্পূর্ণ ঝরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ম্যাজেন্টা ও সাদা ফুল ছাড়া আর কিছুই তাতে চোখে পড়ে না।

দরোয়ানকে আমাদের আসবার কথা বলে রাখা হয়েছিল নিশ্চয়, নইলে ভাদুড়িমশাই তাঁর পরিচয় দেবার সঙ্গে-সঙ্গেই সে অমন সেলাম ঠুকে আমাদের ভিতরে নিয়ে যাবে কেন? ট্যারচা টুপি পরা নেপালি দরোয়ান। ড্রয়িংরুমে আমাদের বসিয়েই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বুঝলুম সে বাড়ির মালিককে খবর দিতে যাচ্ছে।

ঘরটার উপরে একবার চোখ বুলোলেই এদের সাচ্ছল্য ও মানসিকতার একটা স্পষ্ট আন্দাজ পাওয়া যায়। আগাগোড়া কার্পেটে মোড়া বিশাল ড্রয়িংরুম। দু’ধারে দু’প্রস্ত সোফা, সেটি ও সেন্টার টেবিল। মাঝ বরাবর শ্বেতপাথরের একটি তেপায়া গোল টেবিলের উপরে একটি নীলচে মিং ভাস্। তাতে একঝাড় সাদা ফুল। দরজার একপাশে হ্যাট-র্যাক। জানালার পেলমেট থেকে ব্রোকেডের পুরু পর্দা ঝুলছে। উলটো দিকের দেওয়ালে, মেঝে থেকে ফুট-চারেক উঁচু পর্যন্ত, কাচের স্লাইডিং পাল্লা লাগানো টানা বুক-কেস; তাতে অন্যান্য বই ছাড়াও চামড়ার মলাটের উপরে সোনার জলে কাজ করা কয়েক ভলুমের ডিকেন্স-গ্রন্থাবলি চোখে পড়ল। বুক-কেসের খানিক উপরে পাশাপাশি খানকয় বিলিতি ল্যান্ডস্কেপ। সম্ভবত কনস্টেবলের কপি।

সদানন্দবাবু চাপা গলায় বললেন, “আগে ওখেনে ও-সব ছবি ছিল না মশাই।”

“তবে কী ছিল?”

“তিনটে বারশিঙা হরিণের মুণ্ডু।” সদানন্দবাবু বললেন, “জরুরি কাগজপত্তর নিয়ে ঘোষসায়েবের সঙ্গে দু’চারবার এ-বাড়িতে আসতে হয়েচে তো, তখন দেকিচি।”

বুঝতে অসুবিধে হল না যে, ‘ঘোষসাহেব’ বলতে তিনি জানকীনাথ নয়, রঘুবীর ঘোষের কথা বোঝাচ্ছেন। তবে, এই নিয়ে আমাদের কথাবার্তা আর এগোল না, কেননা ঠিক তখনই দরজার পর্দা সরিয়ে অল্পবয়সি একটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এক বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকলেন।

ভদ্রমহিলার পরনে সাদা সিল্কের থান ও সাদা ব্লাউজ, মাথার চুল ধপধপে সাদা, গলা ও হাত দুটি সম্পূর্ণ নিরাভরণ, পায়ে জুতো নেই। দেখে মনে হল, বয়স অন্তত সত্তর-পঁচাত্তর হবে। ছেলেটির বয়স সে-ক্ষেত্রে বছর কুড়ির বেশি হবে না। মুখ থেকে এখনও কৈশোরের লাবণ্য মিলিয়ে যায়নি। মাথা কামানো। তবে পরনে এখনও অশৌচের পাড়ছাড়া ধুতি ও সাদা চাদর, হাতেও একখানা কম্বলের আসন।

আমরা উঠে দাঁড়িয়েছিলুম। ভদ্রমহিলা বললেন, “বসুন।” তারপর নিজেও একটি সোফায় বসে, সরাসরি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনিই মিঃ ভাদুড়ি?”

“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর এঁরা আমার দুই বন্ধু, সদানন্দ বসু আর কিরণ চাটুজ্যে। তদন্তের ব্যাপারে এঁদের কাছে আমি বিস্তর সাহায্য পাই। সেই জন্যেই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। …তো ফোন কি আপনিই করেছিলেন?”

ভদ্রমহিলা বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন, “হ্যাঁ। আমি রঘুবীর ঘোষের স্ত্রী, জানকীনাথের মা। আর… ছেলেটিকে দেখিয়ে, “এ হচ্ছে দাশু। জানকীর ছেলে, আমার একমাত্র নাতি।”

সোফার উপরে কম্বলের আসন বিছিয়ে দাশু তার ঠাকুরমার পাশেই এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবারে মৃদু গলায় বলল, “দাশু আমার ডাকনাম। ভাল নাম দাশরথি।”

ভাদুড়িমশাই স্মিত হাসলেন। “ঠিক আছে, আমি তোমাকে ভাল নামেই ডাকব

মিসেস ঘোষ বললেন, “আমার কাছে যদি কিছু জানার থাকে তো স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞেস করুন।”

“জানার তো অনেক কিছুই রয়েছে।”

“যেমন?”

“যেমন, আমার কাছে আপনি কী চান?”

মিসেস ঘোষ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু দাশু তার আগেই সোফা থেকে তার কম্বলের আসনখানি কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমি উপরে যাচ্ছি। দোসরা থেকে তো কলেজে যাওয়া হয়নি, ক্লাসে এর মধ্যে কী পড়ানো হল, বন্ধুদের ফোন করে জেনে নিতে হবে।”

দাশু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সেইদিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “শ্রাদ্ধশান্তি না হওয়া পর্যন্ত তো কলেজে যেতে পারবেও না।”

“শ্রাদ্ধশান্তি আজ দুপুর দুটোর মধ্যেই হয়ে গেছে।” মিসেস ঘোষ বললেন, “অপঘাতে মৃত্যু, তাই পুরুতঠাকুরের কথায় যা-কিছু করার, সব চারদিনের দিনেই করতে হল। আমার মন অবশ্য মানছে না। তাই আরও কয়েকটা দিন অশৌচ পালন করা হবে। দাশুরও তা-ই ইচ্ছে। কাল থেকে ও অবিশ্যি ফের কলেজ করতে শুরু করবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার প্রশ্নটার জবাব কিন্তু পাইনি। এ-ব্যাপারে ঠিক কী আপনি চান।”

মিসেস ঘোষ তক্ষুনি এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। মুখ নিচু করে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন। তারপর যখন মুখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন, তখন লক্ষ করলুম যে, তাঁর মুখচোখের চেহারা আগের মতো নেই। একজন বৃদ্ধার মুখ যে এতটাই কঠিন দেখাতে পারে, কিংবা দৃষ্টি এতটাই ক্রুদ্ধ, তা আগে কখনও ভাবিনি। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট উচ্চারণ করে বললেন, “জানকী আমার একমাত্র সন্তান। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রথম দিনটা আমার কোনও হুঁশ ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে মাত্র একটা চিন্তাই আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে। সেটা হল : অপরাধীকে এর জন্যে আমি শাস্তি দেব। অথচ কে এ-কাজ করেছে, কেনই-বা করেছে, কিছুই আমি জানি না। সেটা আপনাকে জানতে হবে, অ্যান্ড হি মাস্ট বি ব্রট টু বুক।”

ভাদুড়িমশাই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ব্ললেন, “জানকীবাবুর সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল? অফিসে কিংবা অন্য কোথাও?”

“জানি না।” মিসেস ঘোষ বললেন, “কাজ করত জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিসে। সেখানে খবর নিন। ক্লাবেও খবর নিতে পারেন। ফি শনিবার সন্ধ্যায় ও ব্রিজ খেলার জন্যে রেনবো ক্লাবে যেত। ইদানীং অবশ্য খুব ঘনঘন যাচ্ছিল। …আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন?”

“এখন আর না। তবে পরে নিশ্চয় মাঝে-মাঝেই কিছু-না-কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। আমরাও আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালুম।

ভদ্রমহিলা আমাদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে-দিতে বললেন, “টাকার জন্যে ভাববেন না মিঃ ভাদুড়ি, আমার টাকার অভাব নেই।”

ভাদুড়িমশাই ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনাদের কেসটা আমি নেব। কিন্তু না, টাকার কথা আমি ভাবছি না। হঠাৎ একটা অন্য কথা আমার মনে পড়ল।”

“বলুন।”

“আপনার নাতি দেখলুম আপনাকে ‘মা’ বলে। কেন?”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভদ্রমহিলা। তারপর বললেন, “দাশুর বয়স যখন মাত্র আড়াই বছর, তখন ওর মা মারা যায়। মা’র কথা ওর মনে পড়ে না। ছেলেবেলা থেকে আমাকেই ও ‘মা’ বলে ডাকে।”