ডেভিড কপারফিল্ড : চার্লস ডিকেন্স

ডেভিড কপারফিল্ড : চার্লস ডিকেন্স মূল: চার্লস ডিকেন্স; রূপান্তর: এ.টি.এম. শামসুদ্দীন; প্রথম প্রকাশ:১৯৯৩

০১. শৈশব স্মৃতি

শৈশব স্মৃতি আমার জন্ম হয় এক শুক্রবার রাত বারোটায়। ঘড়ির ঢং ঢং আর আমার প্রথম কান্নার আওয়াজ মিলে যায় একসাথে। এর আগে, সেদিন বিকেলে এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। ভীত মনে বিষণ্ণ মুখে আমার মা বসেছিলেন আগুনের পাশে। তিনি দেখলেন যে এক অপরিচিত মহিলা এগিয়ে আসছেন আমাদের বাগানের পথে। দরজার...

০২. পরিবর্তন এল আমার জীবনে

পরিবর্তন এল আমার জীবনে আমার বয়স তখন আট বছর। এক রাতে পেগোটি আর আমি বসে ছিলাম। আগুনের পাশে। আর কেউ ছিল না বসার ঘরে। আমি ওকে কুমিরের গল্প পড়ে শোনাচ্ছিলাম। পড়াটা বোধহয় খুব ভাল হচ্ছিল না। কারণ, পড়া শেষ হতে দেখা গেল, পেয়গাটির ধারণা হয়েছে যে ক্রকডাইল (ওর ভাষায় ক্রর্কিনডিল)...

০৩. সালেম হাউসের দিনগুলো

সালেম হাউসের দিনগুলো একমাস পড়লাম মি. মেল-এর কাছে। ভালই চলছিল পড়াশোনা। হঠাৎ একদিন তলব করলেন হেডমাস্টার মি. ক্রীক্‌ল। মি. ক্রী্ক্‌ল-এর মুখটা দেখতে ভয়ঙ্কর। চোখদুটো ছোট, কুতকুঁতে। নাকও ছোট। বিশাল চিবুক। মাথায় মস্ত টাক। এটাই তাহলে সেই তরুণ ভদ্রলোকটি-যাকে শেখাতে হবে বাধ্যতা...

০৪. মা আমার মারা গেলেন

মা আমার মারা গেলেন গাড়ি চালক মি. বার্কিস কোচ স্টেশনে আমাকে সম্ভাষণ জানালেন এমনভাবে, যেন আমাদের শেষ দেখার পরে পাঁচ মিনিটও যায়নি। পেগোটির কথা জিজ্ঞেস করলেন তিনি। বললাম, তার বার্কিস ইচ্ছুক বার্তাটি আমি পাঠিয়েছি। বাগানের গেট-এ তিনি আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। প্রতি পদক্ষেপে...

০৫. জীবনের পথে একা

জীবনের পথে একা মার্ডস্টোন অ্যাণ্ড গ্রিনবির মালগুদামটি নদীর কিনারে। একটা সরু গলির একেবারে শেষ প্রান্তে। গুদামের পরেই গলিটা খাড়া নিচে নেমে শেষ হয়েছে। নদী পর্যন্ত গিয়ে। গুদামঘরটা জরাজীর্ণ। ইঁদুরে ভরা। শত বছরের ময়লা আর আবর্জনায় ভরা। প্রথম দিন সকালে কয়েকটি ছেলের সঙ্গে দেখা...

০৬. নতুন জীবন

নতুন জীবন মিস বেটসি অপেক্ষা করলেন কয়েক সপ্তাহ আমার শরীর-মন সবই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার জন্যে। তারপর এক সন্ধ্যায় মি. ডিকের সাথে পাশা খেলতে খেলতে আমার দিকে ফিরে বললেন, ট্রট, তোমার শিক্ষার কথা ভুললে আমাদের চলবে না। তুমি ক্যান্টারবেরিতে যাবে? স্কুলে পড়তে? আমার খুবই ইচ্ছে...

০৭. পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে

পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে শৈশব থেকে আমি যাত্রা করলাম যৌবনের পথে। মন আমার আনন্দে ভরপুর। আমার বয়স এখন সতেরো। আমি স্কুলের হেড-বয়। উক্টর স্ট্রং আমাকে প্রতিশ্রুতিবান তরুণ পণ্ডিত বলে উল্লেখ করেন। অ্যাগনেস উইকফিল্ডও এখন আর ছোট্ট মেয়েটি নয়! সে এখন আমার পরামর্শদাতা ও বন্ধু।...

০৮. একটা পেশা বেছে নিলাম

একটা পেশা বেছে নিলাম পরদিন আমি আর স্টিয়ারফোর্থ বিদায় নিলাম ইয়ারমাউথ থেকে। পেগোটি ও তাদের পরিবার, সাগরের অনেক মাঝি মাল্লা-যারা বন্ধু হয়ে গিয়েছিল স্টিয়ারফোর্থের—সবাই মিলে বিদায় জানাল আমাদেরকে। কিছুক্ষণ কোন আলাপ হলো না স্টিয়ারফোর্থ আর আমার মধ্যে। তারপর স্টিয়ারফোর্থ বলল,...

০৯. এক বিরাট ক্ষতি

এক বিরাট ক্ষতি সন্ধ্যায় পৌঁছলাম ইয়ারমাউথে পেগোটির বাড়িতে। দরজায় মৃদু টোকা দিতেই খুলে দিলেন মি. পেগোটি। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন রান্নাঘরে। সেখানে আগুনের পাশে বসে আছে এমিলি। বিষণ্ণ, চুপচাপ। হ্যাম দাঁড়িয়ে আছে ওর পাশে। ওর কাঁধে হাত রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ও যেন পছন্দ করছে...

১০. ফতুর হয়ে গেলাম

ফতুর হয়ে গেলাম মি. স্পেনলো ডোরার জন্মদিন উপলক্ষে এক পিকনিকে দাওয়াত করলেন আমাকে। আমি ফুল নিয়ে গেলাম ভোরার জন্য। ফুলগুলো ও সারাক্ষণ নিজের কাছে রাখল। ওর ছোট্ট কুকুর জিকে দিয়ে শোঁকাতে চেষ্টা করল। কিন্তু কুকুরটি গোঁ গোঁ করে শুকতে অনিচ্ছা জানাল। ডোরার সঙ্গ আনন্দে ভরিয়ে দিল...

১১. আমার প্রিয় ডোরা

আমার প্রিয় ডোরা পেগোটির ইয়ারমাউথে ফিরে যাবার সময় হলো। এমিলির খোঁজে চলে যাবার পর থেকে ভাইয়ের কোন খবর সে পায়নি। এখন বাড়ি যেতে চায় হ্যামের। দেখাশোনার জন্য। কোচে ওঠার আগে সে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করল যে আমার যদি কখনও টাকার দরকার হয় আমি যেন তার কাছে যাই। বললাম, যাব।...

১২. মি. পেগোটির খবর

মি. পেগোটির খবর ড, স্ট্রং-এর বাড়িতে কাজ শেষে এক তুষার-ঝরা রাতে ঘরে ফিরছিলাম পায়ে হেঁটে। তুষারে ঢাকা পড়েছে রাস্তা। গাড়ির চাকা আর লোকের চলার শব্দ শোনা যাচ্ছে কম। পথ সংক্ষেপ করার জন্য সেন্ট মার্টিন লেন দিয়ে চলেছি। গলির মোড়ে একটি মেয়ের মুখ দেখলাম। মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়েই...

১৩. উরিয়া হীপের শয়তানী

উরিয়া হীপের শয়তানী অ্যাগনেস আর মি. উইকফিল্ড কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে এসেছেন ড. স্ট্রিংএর বাড়িতে। স্বাভাবিকভাবে হীপও এসেছে সঙ্গে। এক রাতে আমি আমার কাজকর্ম শেষ করছি, এমন সময় ডক্টর স্ট্রং-এর স্টাডিতে আলো জ্বলতে দেখলাম। আমি ওখানে গেলাম তাকে শুভরাত্রি বলতে এবং অত রাত জেগে...

১৪. আমার বাচ্চা-বৌ

আমার বাচ্চা–বৌ সপ্তা, মাস, বছর গড়িয়ে গেল। আইনগতভাবে আমি সাবালক হলাম, অর্থাৎ আমার একুশ বছর পূর্ণ হলো। আমার আর ভোরার বিয়ে হয়ে গেল। ঘর-সংসার সম্পর্কে একজোড়া পাখির বাচ্চাও বোধহয় আমাদের দুজনের চাইতে কম জানে না। একজন পরিচারিকা রেখেছিলাম। কিন্তু তাকে সামলাতে গিয়ে আমরা...

১৫. ধন্যবাদ, মি. ডিক

ধন্যবাদ, মি. ডিক ডক্টর স্ট্রং-এর কাজ ছেড়ে দিয়েছি অনেক দিন হলো। কিন্তু কাছাকাছি থাকি বলে প্রায়ই দেখা হয় তার সঙ্গে। উরিয়া হীপের নির্মম কথাগুলো তার হৃদয়ে আসন গেড়ে বসেছে এবং তাঁকে পীড়া দিচ্ছে অবিরাম। ক্রমেই তিনি মনমরা ও নীরব হয়ে যাচ্ছেন। এক রাতে মি, ডিক এসে আমাকে বললেন,...

১৬. দুই রহস্যের জালে

দুই রহস্যের জালে একদিন সন্ধ্যায় বেড়িয়ে ঘরে ফিরছিলাম মিসেস স্টিয়ারফোর্থের বাড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় একজন চাকরানী ছুটে এসে আমাকে ডাকল। বলল, মিসেস স্টিয়ারফোর্থ এখন লণ্ডনের ওই বাড়িতে আছেন। তিনি আমাকে ডাকছেন। গেলাম। এমিলিকে পাওয়া গেছে? জিজ্ঞেস করলেন তিনি ক্রুদ্ধভাবে। না,...

১৭. মি. পেগোটির স্বপ্ন সফল হলো

মি. পেগোটির স্বপ্ন সফল হলো মি. পেগোটি আর আমি যেদিন মার্থাকে পেয়েছিলাম নদীতীরে তার পরে অনেক মাস চলে গেছে। এমিলিকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাবার আশা আমি এক রকম ছেড়েই দিতে যাচ্ছি। কিন্তু মি. পেগোটির আশা ও ধৈর্য অটল রয়ে গেল। একদিন সন্ধ্যায় বাগানে হাঁটছি—এমন সময় মার্থা এসে...

১৮. উরিয়া হীপের পতন

উরিয়া হীপের পতন আমি ফিরে এলাম ইয়ারমাউথ থেকে। ক্যান্টারবেরিতে মি, মিকবারের সঙ্গে রহস্যজনক সাক্ষাৎকারের সময় হল। তাঁর আমন্ত্রণে আমরা চারজন—আমি, দাদী বেটসি, মি. ডিক আর ট্র্যাডলস। পৈৗছলাম হোটেলে। সঙ্গে সঙ্গে মি. মিকবার এসে হাজির হলেন আমাদের সামনে। আমরা এখন ভিসুভিয়াসের...

১৯. মৃত্যু আর নীরবতা

মৃত্যু আর নীরবতা বহুদিন ধরে অসুস্থ ডোরা। আমার বাচ্চা-বৌ যে এত সহসা ছেড়ে যাবে আমাকে তা কি আমি জানতাম? ডাক্তাররা বলেছিলেন আমাকে, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারিনি। এক রাতে ও আমাকে বলল যে এটাই হয়তো ভাল। আমি ছিলাম ছোট্ট বাচ্চা। বয়সের দিক থেকে নয়, মনের দিক থেকে। অভিজ্ঞতার দিক...

২০. অ্যাগনেসের কাছে প্রত্যাবর্তন

অ্যাগনেসের কাছে প্রত্যাবর্তন পেগোটি আর আমি বন্ধুদেরকে বিদায় দিতে গেলাম। মি. পেগোটি মার্থাকেও অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাচ্ছেন দেখে দারুণ খুশি হলাম আমি। দুই দুটি মৃত্যুর বিষয়ে কিছুই জানালাম না ওদেরকে। কারণ ওদের বিদায়ের আনন্দকে আমরা মাটি করে দিতে চাইনি। কয়েক দিন পরে আমিও...