মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০)

মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস, কাজী নজরুল ইসলাম।

মৃত্যুক্ষুধা – ০১

মৃত্যুক্ষুধা (উপন্যাস) কাজী নজরুল ইসলাম মৃত্যুক্ষুধা – ০১ পুতুল-খেলার কৃষ্ণনগর। যেন কোন খেয়ালি খেলাশেষের ভাঙা খেলাঘর। খোকার চলে-যাওয়া পথের পানে জননির মতো চেয়ে আছে – খোকার খেলার পুতুল সামনে নিয়ে। এরই একটেরে চাঁদ-সড়ক। একটা গোপন ব্যথার মতো করে গাছ-পালার আড়াল টেনে...

মৃত্যুক্ষুধা – ০২

মৃত্যুক্ষুধা – ০২ গজালের মা-র ছোটোছেলে প্যাঁকালে টাউনের থিয়েটার-দলে নাচে, সখী সাজে, গান করে। কাজও করে –রাজমিস্তিরির কাজ। বাবু-ঘেঁষা হয়ে সেও একটু বাবু-গোছ হয়ে গেছে। তেড়ি কাটে, ‘ছিকরেট’টানে, পান খায়, চা খায়। পাড়ার মেয়েমহলে তার মস্ত নাম। বলে, – “যেমন গলা,...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৩

মৃত্যুক্ষুধা – ০৩ এই সব ব্যাপারে কাজে যেতে সেদিন প্যাঁকালের বেশ একটু দেরি হয়ে গেল। তারই জুড়িদার আরও জন তিন-চার রাজমিস্তিরি এসে তাকে ডাকাডাকি আরম্ভ করে দিলে। প্যাঁকালে না খেয়েই তার যন্ত্রপাতি নিয়ে বেরিয়ে এল। সে জানত কাল থেকে চালের হাঁড়িতে ইঁদুরদের...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৪

মৃত্যুক্ষুধা – ০৪ প্যাঁকালে চলে যাওয়ার পরই তার দ্বাদশটি ক্ষুধার্ত ভাইপো-ভাইঝি মিলে বিচিত্র সুরে ‘ফরিয়াদ’করতে লাগল ক্ষুধার তাড়নায়, তাতে অন্নের মালিক যিনি, তিনি এবং পাষাণ ব্যতীত বুঝি আর সব-কিছুই বিচলিত হয়। সেজোবউ হপ্তাকানিক হল টাইফয়েড থেকে কোনো রকমে বেঁচে উঠেছে।...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৫

মৃত্যুক্ষুধা – ০৫ সন্ধে হব-হব সময় প্যাঁকালে হাতে চাল-ডাল, বগলতলায় ফুটগজ, পকেটে কন্নিকসুত, আর মুখে পান ও বিড়ি নিয়ে ঘরে ঢুকল। ছেলেমেয়ে তাকে যেন ছেঁকে ধরল। চাল-ডালের মধ্যে একটা বোয়াল মাছ দেখে তারা একযোগে চিৎকার করে উঠল। যেন সাপের মাথায় মানিক দেখেছে। প্যাঁকালে তার...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৬

মৃত্যুক্ষুধা – ০৬ হঠাৎ সেদিন সেজোবউয়ের অবস্থা একেবারে যায়-যায় হয়ে উঠল। ‘ছিটেন’পাড়ার নকড়ি ডাক্তার তাঁর বৈঠকখানাটা বিনি পয়সায় চুনকাম করে দেওয়ার চুক্তিতে দেখতে এলেন। বললেন, “গরিব লোক তোরা, ভিজিট আমি নেব না বাপু – আমার বৈঠকখানাটায় একটু গোলা দিয়ে দিবি, তা দিনতিনেক...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৭

মৃত্যুক্ষুধা – ০৭ দিন যায়, দিন আসে, আবার দিন যায়। এরই মধ্যে একদিন গজালের মা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকে একেবারেই মেজোবউয়ের পায়ের ওপর পড়ে মাথামুড়ো খুঁড়তে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে গালি, উপরোধ, অনুরোধ, অনুনয়, বিনয় – তার কতক বুঝা গেল, কতক গেল না। মেজোবউ তাড়াতাড়ি তার...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৮

মৃত্যুক্ষুধা – ০৮ সেদিন ঘিয়াসুদ্দিন শ্বশুরবাড়ি এসেছে। মেজোবউও বোনাইকে দেখলতে এসেছে। ও-ই এসেছে কিংবা ওর বোনাই-ই আনিয়েছে – এই দুটোর একটা-কিছু হবে। আগুন আর সাপ নিয়ে খেলা করতেই যেন ওর সাধ। ঘিয়াসুদ্দিন ওকে বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে না বলেই এত ঘন ঘন আসে। মেজোবউ তা বোঝে, তাই...

মৃত্যুক্ষুধা – ০৯

মৃত্যুক্ষুধা – ০৯ সেদিন বড়োবউ, প্যাঁকালে, তার মা আর পাঁচিতে মিলে একটা গোপন পরামর্শসভা বসেছিল। প্যাঁকালের অতিমাত্রায উত্তেজিত হয়ে বললে, “আমি তা কখনও পারব না। আমি কালই চললাম রানাঘাট। সেখেনে রোজ চোদ্দো আনা করে পয়সা পাব।” তার মা অনুনয়ের স্বরে বললে, “রাগ করিস কেন বাবা? এমন...

মৃত্যুক্ষুধা – ১০

মৃত্যুক্ষুধা – ১০ সেদিন রবিবার। ছুটি। প্যাঁকলের গোটা দুয়েকের সময় স্নান করতে বেরুল। বেরুবার আগে তেলের শূন্য শিশিরটা অনেকক্ষণ ধরে উলটে রাখলে হাতের তালুর উপর। মিনিট পাঁচেকে ফোঁটা পাঁচেক তেল পড়ল। তেল ঠিক নয়, তেলের কাই। শিশিটার পিছন দিকে গোটা দুত্তিন থাপ্পড় মেরেও যখন আর এক...

মৃত্যুক্ষুধা – ১১

মৃত্যুক্ষুধা – ১১  “ঝড় আসে নিমেষের ভুলে।” জীবনের কোন পথ দিয়ে কখন বিপর্যয় আসে, মুহূর্তের জন্যে – নিমেষে সব ওলট-পালট করে দিয়ে যায় –বন্ধনের দড়াদড়ি কখন যায় টুটে, –কেউ জানে না। ‍এক দিঘি ফোটা পদ্মবনের উপর দিয়ে – ঝড় নয় – শুধু একটা ঘূর্ণি হাওয়ার চলে-যাওয়া দেখেছিলাম। সেই অসহায়...

মৃত্যুক্ষুধা – ১২

মৃত্যুক্ষুধা – ১২ একদিকে মৃত্যু, একদিকে ক্ষুধা। সেজোবউ আর তার ছেলেকে বাঁচাতে পারা গেল না। ওর শুশ্রূষা যেটুকু করেছিল সে শুধু ওই মেজোবউ আর ওষুধ দিয়েছিল মেম সায়েব – রোমান ক্যাথলিক মিশনারি। মেজোবউ সেজোর রোগ-শিয়রে সারারাত জেগে বসে থাকে। কেরোসিনের ডিবে ধোঁয়া উদগিরণ করে...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৩

মৃত্যুক্ষুধা – ১৩ সেজোবউয়ের খোকাকেও আর বাঁচানো গেল না। মাতৃহারা নীড়-ত্যক্ত বিহগ-শিশু যেমন করে বিশুষ্ক চঞ্চু হাঁ করে ধুঁকতে থাকে, তেমনই করে ধুঁকে– মাতৃস্তন্যে চিরবঞ্চিত শিশু! মেজোবউয়ের দুচোখে শ্রাবণ রাতের মেঘের মতো বর্ষাধারা নামে। বলে, “সেজোবউ, তুই যেখানেই থাক, নিয়ে যা...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৪

মৃত্যুক্ষুধা – ১৪ পরদিন সকালে কেউ উঠবার আগেই মেজোবউ তার ছেলেমেয়েকে নিয় মিস জোন্সের কাছে চলে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বড়োবউকে চুপি চুপি বলে গেল, “শাশুড়ি বিশেষ পীড়াপীড়ি করলে বাপের বাড়ি গেছি বোলো!” বড়োবউ ক্ষুণ্ণ হয়ে চুপ করে রইল। মেজোবউ এতটা বাড়াবাড়ি তার ভালো লাগছিল না। তবু...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৫

মৃত্যুক্ষুধা – ১৫ চাঁদ-সড়কে সেদিন বেশ একটু চাঞ্চল্যের সাড়া পড়ে গেল। লক্ষীছাড়া-মতো চেহারার লম্বা-চওড়া একজন মুসলমান যুবক কোত্থেকে এসে সোজা নাজির সাহেবের বাসায় উঠল। নাজির সাহেব কৃষ্ণনগরে সবে বদলি হয়ে এসে চাঁদ-সড়কেই বাসা নিয়েছেন। যুবকের গায়ে খেলাফতি ভলান্টিয়ারের পোশাক।...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৬

মৃত্যুক্ষুধা – ১৬ চা খাওয়া হলে পর লতিফা বলে, “দাদু, তুমি তোমার ওই কাবলিওয়ালার পোশাক খুলে ফেল দেখি। কী বিশ্রী দেখাচ্ছে! মাগো! ওই ময়লা গদ্ধর পরে থাক কী করে তাই ভাবছি! আনসার হেসে বললে, “গদ্ধর নয় রে বুঁচি, এর নাম খদ্দর। একটু থাম না তুই, তারপর দেখবি, কীরকম রাজপুত্তুরের মতো...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৭

মৃত্যুক্ষুধা – ১৭ শেষের দিকটায় আনসার যেন কেমন অভিভূত হয়ে পড়ল। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলতে লাগল, “আমি এখানে কেন এসেছি জানিস? জেল থেকে ফিরে এসে অবধি আমার রাজনৈতিক মতও বদলে গেছে। আমি এখন..” বলেই কী বলতে গিয়ে অপ্রতিভ হয়ে বলে উঠল, “বুঁচি, এখনও চরকা কাটিস?” লতিফা হেসে বললে,...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৮

মৃত্যুক্ষুধা – ১৮ এরপর দু তিন দিন কেটে গেছে। এবং এই দু তিন দিন আনসার গোরুর গাড়ির গাড়োয়ান, ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ান, রাজমিস্ত্রি, কুলি-মজুর, মেথর প্রভৃতিদের নিয়ে টাউনে একটা রীতিমতো হুলস্থুল বাধিয়ে তুলেছে। শহরময় গুজব রটে গেছে যে, রাশিয়ার বলশেভিকদের গুপ্তচর এসেছে লোক...

মৃত্যুক্ষুধা – ১৯

মৃত্যুক্ষুধা – ১৯ চাঁদসড়কে সেদিন ভীষণ একটা হইচই পড়ে গেল, মেজোবউ তার ছেলেমেয়ে নিয়ে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। সত্যি-সত্যিই সে খ্রিস্টান হয়ে গেছে। তবে তার একটু ইতিহাসও আছে। মেজোবউ কিছুদিন থেকে খ্রিস্টান মিশনারি মিস জোন্সের কাছে গিয়ে একটু সেলাই ও লেখাপড়া শিখছিল। মিশনারিরা ওদের...

মৃত্যুক্ষুধা – ২০

মৃত্যুক্ষুধা – ২০ পরদিন যখন সন্ধ্যায় অন্ধকার বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে তখন মেজোবউ গায়ে বেশ করে চাদর জড়িয়ে নাজির সাহেবের বাড়ির দিকে চলতে লাগল। কীসের যেন ভয়, কীসের যেন লজ্জা তার পা দুটোকে কিছুতেই ছাড়িয়ে উঠতে দিচ্ছিল না। গাঢ় অন্ধকারের পুরু আবরণও যেন তার লজ্জাকে ঢেকে রাখতে পারছিল...