৪. গোরস্থানে আজও সাবধান

গোরস্থানে আজও সাবধান

ভোকাট্টা!

খেল খতম ঘুড়িটার। কাটা পড়েছে প্রতিপক্ষ ঘুড়ির মাঞ্জার ধারে। হাওয়ায় পাক খেতে খেতে এলোমেলো নেমে আসছে নীচে। দেখেই লাটাই হাতে ছুট লাগিয়েছিল বারো বছরের অশোক। অনেকক্ষণ জ্বালিয়েছে এই পেটকাটি চাঁদিয়ালটা। এতক্ষণে জারিজুরি শেষ। কেটে গেছে। এবার কাজ বলতে ঘুড়িটাকে ধরা। ওই তো, পড়েছে! ঘুড়িটা তুলে সামনে তাকাতেই হাত-পা অসাড় হয়ে গেল অশোকের। আরে, ওটা কী?

দুটো পা। ভরদুপুরে বেরিয়ে আছে বহু পুরনো কবরের ভিতর থেকে। গাছপালা-ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে ঠিকরে পড়েছে দুপুররোদ। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পরনের জিন্‌সের একঝলক। ঘুড়ি-লাটাই ওখানেই ফেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল অশোক। থামল গিয়ে সোজা অফিসঘরের কাছে।

‘লছমনচাচা, ও লছমনচাচা!’

দুপুর তিনটে তখন। এই সময়টায় ঘণ্টাখানেক ভাতঘুমের অভ্যেস আছে মধ্যপঞ্চাশের লছমনের। অশোকের চিলচিৎকারে কাঁচাঘুমের দফারফা। চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এলেন। ধমক দেবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন অশোকের চোখমুখ দেখে। হাসিখুশি ছেলেটা ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে যেন। লছমন এগিয়ে গিয়ে হাতটা ধরলেন অশোকের, ‘আরে ক্যায়া হুয়া?’

অশোক নিরুত্তর। হাত-পা কাঁপছে ছেলেটার। হাঁফাচ্ছে। চোখমুখ ফ্যাকাশে। লছমন একটু ঘাবড়েই গেলেন এবার। অশোকের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিলেন, ‘বাতা তো সহি, হুয়া ক্যায়া?’

.

কাহিনি সিকি শতক আগের, ১৯৯৪-এর ফেব্রুয়ারির।

সূত্রপাত, ১৮৪, এজেসি বোস রোডে। মল্লিকবাজারের কাছে খ্রিস্টান কবরস্থানে। প্রায় একশো বিঘে জমির বিস্তারে যার অবস্থান, বহু স্মৃতির ধারক ও বাহক হয়ে। চারদিকে উঁচু দেওয়াল। যার কিছু অংশ ইতিউতি ভাঙা। ভিতরে বড় বড় আম-পাইন-মহুয়া-বট-অশ্বত্থের ছায়ায় শায়িত বহু কবরস্থ শরীর, অনন্ত শান্তিতে। পুরনো সেই দিনের কথায় আগ্রহীরা তো বটেই, এমনিও রোজই এখানে ঘুরতে আসেন দেশি-বিদেশি ট্যুরিস্টরা। এমন জায়গা আর ক’টাই বা আছে কলকাতা শহরে, যার প্রতিটি ইঞ্চি-সেন্টিমিটার-মিলিমিটারে ইতিহাস তার পায়ের ছাপ রেখে গেছে আলগোছে?

প্রবেশদ্বারের পাশেই খ্রিস্টান বেরিয়াল বোর্ডের সেক্রেটারির অফিস। পূর্বদিকে ক্রিমেটোরিয়াল স্ট্রিট, আর তার পাশেই জনবহুল জাননগর বস্তি। সেক্রেটারি সাহেবের অফিসের কাছেপিঠে মালি আর কবরখননকারীদের ছোট ছোট কোয়ার্টার। তাঁদের পরিবারের ছেলেপুলেদের কাছে কবরস্থানের বিস্তৃত প্রাঙ্গণই এক পৃথিবী খুশি। এক কবর থেকে অন্য কবরের আড়ালে লুকোচুরি, আগডুম-বাগডুম, ঘুড়ি ওড়ানো, ভোকাট্টা।

ওই ভোকাট্টা থেকেই শুরু।

শীতের এক বিকেল-ছুঁইছুঁই দুপুরে ঘুড়ি ধরতে গিয়েই কবরস্থানের দীর্ঘদিনের এক কর্মীর কিশোর পুত্র অশোকের চোখে পড়ল ওই অদ্ভুতুড়ে দৃশ্যটা। কবর থেকে বেরিয়ে থাকা দুটো পা। আতঙ্কিত অশোক ছুটে এসে ঘুম ভাঙাল তার ‘লছমনচাচার’। লছমন সিং, যিনি এই কবরস্থানের কর্মী হিসেবে কাজ করছেন প্রায় বছর তিরিশ হয়ে গেল। পড়িমরি করে দৌড়লেন লছমন এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ চোখ পলকের দেখায় বুঝে নিল, বড়সড় গণ্ডগোল আছে কোনও। এখানে কবর দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে সে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর হবে। তা ছাড়া কবরের মৃতদেহ রাখা হয় মাটির অনেক গভীরে, যাতে কুকুর-শিয়াল নাগাল না পায় আর দেহপচনের দুর্গন্ধও বাইরে না আসে। এ দেহ কবরের নয়। হতেই পারে না! এখনই সেক্রেটারি সাহেবকে খবর দেওয়া দরকার।

‘খ্রিস্টান বেরিয়াল গ্রাউন্ড’-এর সেক্রেটারি টেরেন্স স্ট্যানলি আর্নল্ড অফিসেই ছিলেন। লছমনের মুখে সব শুনলেন। ঘটনাস্থলে এসে দেখলেন এবং কালবিলম্ব না করে দ্রুত অফিসে ফিরেই ডায়াল করলেন বেনিয়াপুকুর থানায়। ওসি-র জিপ মল্লিকবাজারের কবরখানার সামনে এসে ব্রেক কষল আর্নল্ড সাহেবের ফোন পাওয়ার মিনিট পনেরোর মধ্যেই।

দেশ বা বিদেশের যে-কোনও পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যখন তদন্ত-পদ্ধতি বিষয়ে পড়ানো হয়, একটা চ্যাপ্টার তুলনায় বেশি গুরুত্ব পায়। ঘটনাস্থলের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ। পুলিশি পরিভাষায়, ‘একজামিনেশন অফ দ্য পি.ও’। পি.ও, অর্থাৎ ‘প্লেস অফ অকারেন্স’।

ওসি ‘পি.ও’ দেখলেন অনেকটা সময় নিয়ে। কবরখানার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের দেওয়াল থেকে সত্তর-আশি মিটার দূরে জায়গাটা। নির্জন, শুনশান। একেবারে প্রান্তসীমায়। চট করে নজরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যে বা যারাই ঘটনাটা ঘটিয়েছে, স্থান নির্বাচনে বুদ্ধি খরচ করেছে যথেষ্ট।

একজোড়া পা যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে, তার থেকে বেশ কিছু ফুট দূরে জংলা ঘাসজমির উপর ছোপ ছোপ শুকনো লালচে-কালো দাগ। ফরেনসিক পরীক্ষা করলে তবেই বৈজ্ঞানিক শিলমোহর পড়বে, তবে ওই দাগ যে শুকিয়ে আসা রক্তেরই, তাতে প্রাথমিকভাবে কোনও সংশয় ছিল না একাধিক খুনের মামলার তদন্তের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ওসি-র। একটু দূরেই পড়ে আছে একজোড়া কালো বুটজুতো। তার পাশে একটা মাঝারি সাইজ়ের সিমেন্টের স্ল্যাব। তাতেও শুকিয়ে রয়েছে লালচে-কালো দাগ। এটাও রক্ত না হয়ে যায় না। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে হবে স্রেফ নিয়মরক্ষার জন্যই।

ওসি মোবাইলে ধরলেন ডিসি ইএসডি (ইস্টার্ন সাবার্বান ডিভিশন)-কে, ‘স্যার, মল্লিকবাজারের কবরখানায় একটা বডি পাওয়া গেছে। পি.ও দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ক্লিয়ার কেস অফ মার্ডার। মেরে পুঁতে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু গর্তটা খুবই শ্যালো খুঁড়েছিল। পা বেরিয়ে এসেছে। হোমিসাইডকে এখনই খবর দেওয়া দরকার।’

নিজে ঘটনাস্থলে রওনা দেওয়ার আগে ডিসি ডিডি (ডেপুটি কমিশনার, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট, কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান)-কে ফোনেই ব্রিফ করলেন ডিসি ইএসডি, ‘আমি স্পটে যাচ্ছি স্যার। ওসি হোমিসাইডকে একটু বলে দিন। ফোটোগ্রাফার, ফরেনসিকস…।’

লালবাজার থেকে ওসি হোমিসাইড সদলবলে স্পটে চলে এলেন দ্রুতই। ফোটোগ্রাফার ছবি তুললেন নানান অ্যাঙ্গল থেকে। মাটি খুঁড়ে মৃতদেহ তোলা হল উপরে। জল দিয়ে ভাল করে ধোয়ামোছার পর স্পষ্ট হল দেহের অবয়ব। বছর কুড়ি-বাইশের এক যুবক। গলায় গভীর ক্ষতচিহ্ন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে যেমন হয়। হাতের তালুতেও ক্ষতচিহ্ন একাধিক। মুখের ডানদিকটা থেঁতলে গিয়েছে অনেকটা। ওই সিমেন্টের স্ল্যাব দিয়ে মুখে আঘাত করে চেহারাটা বিকৃত করে দিতে চেয়েছিল খুনি বা খুনিরা। পোশাক বলতে জিন্‌স আর ফুলহাতা সোয়েটার। তার নীচে স্যান্ডো গেঞ্জি।

তৈরি হল ‘সিজ়ার লিস্ট’। যাতে থাকল খোঁড়া জায়গাটার কাছেই পড়ে থাকা বুটজুতো, লাল-কালো ছোপ লাগা মাটির কিছু অংশ। এবং তার সংলগ্ন ছোপবিহীন মাটির নমুনা কিছু (ফরেনসিক পরিভাষায় যাকে বলে ‘control earth’, যার সঙ্গে দাগ-লাগা অংশের তুলনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা, দুটি নমুনাই একই জমির কি না। এই প্রমাণ জরুরি বিচারপর্বে)। বাজেয়াপ্ত হল সিমেন্টের স্ল্যাবটাও।

ইতিমধ্যে এসে গিয়েছেন ডিসি ডিডি স্বয়ং। নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করেছেন পুরো প্রক্রিয়ার। সব শেষ করে যখন দেহ তোলা হচ্ছে গোয়েন্দাবিভাগের সিডি (কর্পস ডিসপোজাল) ভ্যানে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে। সাড়ে ছ’টা বাজে প্রায়। রাতে আর ময়নাতদন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। পরের দিন দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবেই।

থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেন আর্নল্ড সাহেব। তদন্তের বল গড়াতে শুরু করল। থানার সঙ্গে যৌথভাবে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখার অফিসারদের সমন্বয়ে।

বেনিয়াপুকুর থানা। কেস নম্বর ৩২। তারিখ ১০/২/৯৪। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/২০১ ধারায় মামলা। খুন এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ।

খুন অনেকই হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কৌতূহল আর আগ্রহের নিরিখে এই খুনটা ছিল একেবারে অন্যরকম। ভরদুপুরে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কবরখানা থেকে খুন হওয়া যুবকের দেহ উদ্ধার। যে সময়ের কথা লিখছি, তখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সর্বময় উপস্থিতি ছিল না সমাজজীবনে। কিন্তু খবরের কাগজ তো ছিলই। যাতে ফলাও করে প্রচারিত হতে থাকল খুনের বিবরণ এবং পুলিশি তদন্তের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি। কাজ বাড়ল ক্রাইম রিপোর্টারদের। দ্রুত কিনারা করার চাপও যথানিয়মে বাড়ল পুলিশের উপর।

প্রথম কাজ দেহ শনাক্ত করা। শিকারের পরিচয় পেলে তবেই না শিকারির খোঁজ। কে খুন হলেন জানা গেলে তবেই না ‘কেন-কীভাবে’-র দিকে এগনো। দেহ অজ্ঞাতপরিচয়ের হলে যা প্রচলিত প্রথা, শহরের সমস্ত থানায় বার্তা পাঠানো হল রাত্রেই, কলকাতা এবং তার আশেপাশে কোনও যুবক কি নিরুদ্দেশ হয়েছেন গত কয়েকদিনের মধ্যে? মিসিং ডায়েরি হয়েছে কোনও? উত্তর নেতিবাচক।

ইতিবাচক দিশা মিলল ঘটনার পরের দিন দুপুরে। পার্ক সার্কাস ময়দানে মালির কাজ করতেন এক ভদ্রলোক। তাঁর দুই ছেলে, জ্যোতি রায় এবং রাম রায় বেনিয়াপুকুর থানায় এসে জানালেন, তাঁদের ছোটভাই গোপাল রায় একটি কুরিয়ার সার্ভিস সংস্থায় ডেলিভারির কাজ করে। গত ৬ তারিখ বেরিয়েছিল কাজে। ফেরেনি এখনও। শহরের বাইরে যেতে হয় মাঝেমধ্যে গোপালকে। দু’-তিনদিনের মধ্যেই ফিরে আসে সচরাচর। এবার পাঁচদিন হয়ে গেল, ফেরেনি। কোনও আপদবিপদ হয়নি তো, এই আশঙ্কায় থানায় মিসিং ডায়েরি করতে আসা।

ওসি শুনলেন, এবং ছবি দেখালেন আগের দিন কবরখানা থেকে উদ্ধার হওয়া দেহের। যা একঝলক দেখেই দুই ভাইয়ের কান্না জানিয়ে দিল, খুন হওয়া ব্যক্তি গোপালই। শনাক্তকরণ-পর্ব সম্পন্ন।

সেদিনই বিকেলে নীলরতন সরকার হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শুরু হল গোপালের দেহের। উপস্থিত বেনিয়াপুকুর থানার সাব-ইনস্পেকটর শাহ্‌জামল মণ্ডল। সরকারিভাবে ডাক্তারবাবুর সই হয়ে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পুলিশের হাতে আসতে সময় লাগে কিছুটা। তাই জটিল মামলায় ময়নাতদন্তের সময় তদন্তকারী অফিসারদের হাজির থাকাটাই রীতি। রিপোর্ট যখন আসার, আসুক। কিন্তু পোস্টমর্টেমের পরেই ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিক জেনে নিতে হয়, কী থাকতে চলেছে রিপোর্টে। তদন্তের গতিপথ নির্ধারণে সুবিধে হয় অনেক।

পোস্টমর্টেম করার কথা হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান, প্রথিতযশা চিকিৎসক ড. রবীন বসুর। যাঁর কাছে মূলত দুটো জিনিস জানার ছিল শাহ্‌জামলের। এক, খুনের সম্ভাব্য দিন আর সময়। দুই, দেহের আঘাতের সমস্ত খুঁটিনাটি দেখে কী মনে হচ্ছে? খুনি এক, না একাধিক? একজনের পক্ষে সম্ভব বছর পঁচিশের শক্তসমর্থ যুবককে মেরে, মুখ থেঁতলে দিয়ে, মাটি খুঁড়ে এভাবে পুঁতে দেওয়া? থিয়োরিটিক্যালি অসম্ভব নয়। কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি?

কাজ শুরুর আগে প্রথামাফিক ড. বসু বললেন শাহ্‌জামলকে, ‘বডির জামাকাপড় ভাল করে দেখে নিয়েছেন তো?’ উদ্ধারের পর দেহ যদি প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাতপরিচয় থাকে, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে হয় মৃতের পোশাক-আশাক। বিশেষ করে ‘tailoring mark’। রেডিমেড কেনা পোশাক হলে আলাদা কথা, কিন্তু পোশাক যদি বানানো হয় মাপজোক দিয়ে কোনও টেলর-এর দোকান থেকে, পরিধেয়র কোনও একটা জায়গায় সেই দোকানের নাম সেলাই করা থাকে সাধারণত। সেই চিহ্ন দেখে সংশ্লিষ্ট দোকানে গিয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর করে মৃত অজ্ঞাতপরিচয়ের পরিচয় জানা যায় হামেশাই। এক্ষেত্রেও দেখা হয়েছিল দেহ উদ্ধারের পর। পাওয়া যায়নি কোনও ‘টেলরিং মার্ক’। পকেটেও পাওয়া যায়নি কিছু। তা ছাড়া, ময়নাতদন্ত শুরু হচ্ছে যখন, ততক্ষণে থানা মারফত মৃতের পরিচয় জেনে গিয়েছেন শাহ্‌জামল।

তবু কী মনে হল শাহ্‌জামলের, বললেন, ‘দেখা হয়েছে, স্যার, আরেকবার দেখে নিচ্ছি না হয়…।’

প্রাক্-পোস্টমর্টেম মৃতদেহকে খুঁটিয়ে দেখায় একটা বড় ভূমিকা থাকে সরকারি হাসপাতালের ডোমেদের। যাঁদের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া কোনও ময়নাতদন্তই হওয়ার নয়। অস্বাভাবিক মৃত্যুর কতশত দেহ আসে সরকারি হাসপাতালে। সেই দেহগুলি ডাক্তারবাবুর টেবিলে কাটাছেঁড়ার জন্য পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত ডোমেদের কাজ থাকে বহুবিধ। ফের গোপালের পোশাক নেড়েচেড়ে দেখার সময় এমনই একজন ডোমের নজরে এসেছিল ব্যাপারটা, শাহ্‌জামলকে বলেছিলেন দেহকে বিবস্ত্র করার সময়, ‘স্যার, প্যান্টের এই জায়গাটা একটু কেমন যেন ফোলা লাগছে।’

কোন জায়গাটা? এমনিতে সাদা চোখে জিন্‌সের পকেটে কিছু নেই। কিন্তু ভাল করে হাতড়ে দেখলে একটা জায়গা সত্যিই একটু ফোলা লাগছে। শাহ্‌জামল দেখলেন মন দিয়ে এবং দ্রুত আবিষ্কার করলেন পকেটের ভিতর আলগাভাবে সেলাই করা আরেকটা ছোট পকেট। সেলাইটা ছিঁড়ে গেল হাতের আলতো টানেই। পকেটের ভিতরের পকেট থেকে বেরল ছোট্ট লাইটার একটা।

আরে, প্রথমবারের চেকিংয়ে কীভাবে মিস হয়ে গেল এটা? শাহ্‌জামল হামলে পড়লেন লাইটারটার উপর। যাতে দেখা যাচ্ছে সোনার জলে লেখা একটা অক্ষর। উঠে গেছে কিছুটা। কিন্তু পড়া যাচ্ছে। ‘মা’।

এই বয়সের যুবকের জিন্‌সের পকেটে আলাদা সেলাই করে লুকিয়ে রাখা লাইটারে ‘মা’? লাইটারটা আরও মন দিয়ে দেখলেন শাহ্‌জামল, দেখালেন ড. বসুকেও। সাদা চোখেই দিব্যি বোঝা যাচ্ছে আরও দুটো অস্পষ্ট অক্ষরের ছাপ। অপটু হাতের সোনার জলের কাজ। মোট তিনটে অক্ষর লেখা ছিল লাইটারে। প্রথম দুটো অক্ষর উঠে গেছে। পড়ে আছে ‘মা’।

ময়নাতদন্তের পর ড. বসু জানালেন, মৃতের হাতের তালুর ক্ষতচিহ্নগুলি ‘defensive wounds’, আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে পাওয়া আঘাত। প্রাথমিকভাবে যা আন্দাজ করেছিল পুলিশ, ডাক্তারবাবু সহমত হলেন তাতে। ‘আততায়ী’ নয়, সম্ভবত ‘আততায়ীরা’। গোপাল-হত্যার নেপথ্যে এক নয়, আছে একাধিক। খুন হওয়ার সম্ভাব্য সময়? খুব সম্ভবত দিন চার-পাঁচ আগে। মানে ৬ বা ৭ ফেব্রুয়ারি।

ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের উপর এই মামলার তদন্তভার ন্যস্ত হওয়ারই ছিল। দেহ উদ্ধারের দিনদুয়েকের মধ্যেই ডিডি-কে দায়িত্ব দিলেন নগরপাল। গোয়েন্দাবিভাগের হোমিসাইড শাখার তরুণ সাব-ইনস্পেকটর সুশান্ত ধর (বর্তমানে গোয়েন্দাবিভাগেরই অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার) নিযুক্ত হলেন তদন্তকারী অফিসার হিসেবে।

কে খুন হয়েছেন, জানা আছে। আর আছে খুন হওয়া ব্যক্তির পকেটে পাওয়া একটা লাইটার, যাতে তিন অক্ষরের একটা নাম লেখা ছিল সোনার জলে। শেষ অক্ষর, ‘মা’। ওই তিন অক্ষরের নামটা যে মৃত গোপালের প্রেমিকার, সেটা আঁচ করতে আইনস্টাইনের মেধার দরকার হয় না। দিদি বা বোনস্থানীয় কারও দেওয়া উপহার হলে ওভাবে লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন হত না।

লাইটারটা প্রেমিকা উপহার দিয়েছিলেন, নাকি নিজেই কিনে নাম লিখিয়েছিলেন গোপাল, সেটা পরের কথা। জরুরি কথা হল, এই প্রেমের কথা বাড়ির লোককে গোপাল কোনওমতেই জানতে দিতে চাননি বলেই জিন্‌সের মধ্যে অত সন্তর্পণে সেলাই করে লুকিয়ে রাখা।

বাড়ির লোক সত্যিই জানতেনও না। গোপালের পরিবারের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করা হল বিস্তারিত, কোনও বান্ধবী, কোনও প্রেমিকার কথা জানতেন? টের পেয়েছিলেন কোনওভাবে কিছু? একই উত্তর এল মা-বাবা-দাদাদের কাছ থেকে, ‘না, তেমন কিছু তো শুনিনি! কিছু যদি থেকেও থাকে, আমরা জানতাম না।’

যে কুরিয়ার সংস্থায় কাজ করতেন গোপাল, তার কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হল। পাড়ায় যে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে মাঝেমাঝে সময় কাটাতেন বলে জানা গেল, তাঁদের সঙ্গেও কথা বললেন সুশান্ত-শাহ্‌জামল। নিটফল শূন্য। ওঁরাও কিছু জানেন না।

পরিবার-পরিজন বা বন্ধুবান্ধব, কেউ কিছু জানতেন না বলে তো আর লাইটারটা মিথ্যে হয়ে যায় না। ‘ক্লু’ বলতে ওই লাইটার ছাড়া আর আছেটা কী? সুশান্ত ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলেন। শেষ অক্ষর ‘মা’, এই দিয়ে তিন অক্ষরের কী কী নাম হতে পারে মেয়েদের? তনিমা, প্রতিমা, চন্দ্রিমা, অণিমা, পরমা, সরমা…. ভাবতে বসলে এমন অজস্র-অগুনতি। একপ্রকার তো খড়ের গাদায় সূচ খোঁজাই। হয় নাকি ওভাবে?

টিভি-র ‘সিআইডি’-জাতীয় জনপ্রিয় ক্রাইম সিরিজ় হলে হয়তো দেখা যেত, ‘মা’ দিয়ে শেষ হচ্ছে, এমন তিন অক্ষরের নামের যত তরুণী আছেন শহরে, তার তালিকা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৈরি করে ফেলছেন তদন্তকারীরা। এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দ্রুত চিহ্নিত করে ফেলছেন মৃতের প্রেমিকাকে। কিন্তু কল্পনা কল্পনায় থাকে। বাস্তব বাস্তবেই। ওভাবে ‘রিল লাইফে’ হয়। ‘রিয়েল লাইফে’ নয়।

ডাক পড়ল স্থানীয় সোর্সদের। গোপালের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে খুঁটিনাটি খবর চাই। আর খবর! ঘটনার আটচল্লিশ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও সোর্সরা জানাতে পারল সেটুকুই, যেটুকু হয় জানাই ছিল, বা আন্দাজ করা যাচ্ছিল। একুশ বছরের গোপালের পড়াশুনো বেশিদূর হয়নি। কুরিয়ার সার্ভিসের ‘ডেলিভারি বয়’-এর সামান্য চাকরি। রোজগারও সামান্যই। মধ্যবিত্ত পরিবার গোপালদের। দুই দাদা, তাদের পরিবার, আর মা-বাবা। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর সুযোগ ছিল না গোপালের। নেহাতই ছাপোষা দিনযাপন। কোনও বান্ধবীর সন্ধান? জানা যাচ্ছে না এখনও।

সুশান্ত একটু হতাশই হয়ে পড়ছিলেন। তদন্ত কতটা এগোল, ডিসি ডিডি ঘণ্টায় ঘণ্টায় ‘মনিটর’ করছেন, খোদ নগরপাল খোঁজ নিচ্ছেন দৈনিক। অথচ ওই লাইটারেই এখনও আটকে আছে যা কিছু। আটকে যে থাকবে না বেশিদিন আর, তদন্তের গাড়ি হঠাৎই যে চলতে শুরু করবে গড়গড়িয়ে, দেহ উদ্ধারের তিনদিন পরে সকালে লালবাজারে ঢোকার সময়ও ভাবতে পারেননি সুশান্ত।

ডিডি বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখেই দেখা ওসি ওয়াচ-এর সঙ্গে। গোয়েন্দা বিভাগের অভিজ্ঞ অফিসার। দারুণ চালান ‘ওয়াচ সেকশনটা’, যার কাজ মূলত শহরের পকেটমারদের উপর নজরদারি এবং গ্রেফতার। সুশান্তকে খুবই পছন্দ করেন ভদ্রলোক। চোখাচোখি হতেই পিঠে হাত রাখলেন, ‘কী রে, কী খবর?’

সুশান্ত ম্লান হাসেন, ‘চলছে স্যার।’

ওসি ওয়াচ একটু থমকান। তাকান সুশান্তর মুখের দিকে, ‘চলছে মানে? তোর বয়সে তো দৌড়নোর কথা। ওই কবরখানার কেসটা নিয়ে চাপে আছিস বুঝি? কিছু হল ওটার?’

সুশান্ত মাথা নাড়েন।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে প্রবীণ ফের পিঠে হাত রাখেন নবীনের, ‘আরে, হবে হবে। অত তাড়াতাড়ি ধৈর্য হারালে চলে? এই দ্যাখ না, একটা পিকপকেট গ্যাং মাথা খারাপ করে দিয়েছিল গত দেড় মাস ধরে। রোজ ঝাড় খাচ্ছিলাম ডিসি-র কাছে। অপারেট করছিল শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে। প্রতি সপ্তাহে অ্যাট লিস্ট দুটো করে পিকপকেটের কেস। নতুন গ্যাং। হদিশই পাচ্ছিলাম না। গতকাল বিকেলে ফাইনালি ধরা পড়েছে।’

সুশান্ত পকেটমার ধরার বৃত্তান্তে উৎসাহ পাচ্ছিলেন না তেমন। এমনিতেই মনটা দমে আছে। তবু কৃত্রিম কৌতূহল দেখাতেই হল, ‘দারুণ খবর স্যার। নতুন গ্যাং?’

‘আর বলিস না! নতুন গ্যাং-ই। দুটো মেয়ে। মহিলাদের চট করে কেউ পকেটমার বলে সন্দেহ করে না। সেটার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছিল। গীতা নস্কর আর উইলমা ফার্নান্ডেজ। বাড়িতে সার্চ করে অনেক রিকভারি হয়েছে। পিক আওয়ার্সে শিয়ালদা স্টেশন থেকে বেরনোর ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে কাজ সারত।’

সুশান্তকে বলতেই হয়, ‘কনগ্র্যাচুলেশনস স্যার।’

ওসি ওয়াচ ঢুকে পড়েন নিজের ঘরে। আর সুশান্ত হাঁটা দেন নিজের অফিসের দিকে। একটু পরেই ডাক পড়বে ওসি হোমিসাইড-এর ঘরে। জানতে চাওয়া হবে মামলার অগ্রগতি। কী বলবেন? এই তো শুনলেন, একটা পকেটমার গ্যাং ডিটেক্ট করতেই দেড় মাস লেগে গেল ‘ওয়াচ সেকশন’-এর। আর খুনটা তো হয়েছে এই সেদিন। সময় লাগবে না একটু?

আত্মপক্ষ সমর্থনে সাজানো যুক্তিগুলো সুশান্তের নিজেরই নড়বড়ে লাগছিল। অপরাধের গুরুত্ব বিচারে পকেটমারির সঙ্গে এই ধরনের সাড়া ফেলে দেওয়া খুনের কোনও তুলনা হয়? পিকপকেটের তুলনায় খুন নিয়ে কর্তারা বেশি মাথা ঘামাবেন, স্বাভাবিক। চাপ তো আসবেই দ্রুত সমাধানের। হইচই তো কম হচ্ছে না।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ নড়েচড়ে বসলেন সুশান্ত। নামদুটো কী যেন বললেন ওসি ওয়াচ? গীতা আর উইলমা। উইলমা? নামটা চার অক্ষরের অবশ্য, কিন্তু ‘মা’ দিয়ে শেষ। খ্রিস্টান নাম। লাইটার উদ্ধারের পর ‘প্রতিমা-সুরমা-তনিমা’ ইত্যাদিই মাথায় এসেছিল। কিন্তু এমন তো হতেই পারে, গোপালের সঙ্গে ভিন্ন ধর্মের কোনও তরুণীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বেনিয়াপুকুর-তপসিয়া এলাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরই সংখ্যাধিক্য। এই অ্যাঙ্গলে ফের একবার খোঁজখবর করলে হয় না? আলোর রেখা যখন দূরবিন দিয়েও দেখা যাচ্ছে না, অন্ধকারে ঢিল ছুড়তে ক্ষতি কী আর?

সুশান্ত আলোচনা করলেন ওসি হোমিসাইডের সঙ্গে। তিনি আইডিয়াটা শুনে বললেন, ‘দেখা যেতেই পারে খোঁজ নিয়ে। তবে একটা কথা বলি। তুমি আগে থেকে ধরেই নিচ্ছ, গোপালের বান্ধবী ওর থেকে ছোট হবে বয়সে বা সমবয়সি। বা দু’-এক বছর বড়। এমনও তো হতে পারে, উনি গোপালের থেকে দশ-বারো বছরের বড়। এবং কে বলতে পারে, হয়তো বিবাহিতাও। হয়তো স্থানীয় নন। হয়তো থাকেন গোপালের বাড়ি থেকে বহু দূরে। হয়তো কলকাতার বাইরে। অসম্ভব বা খুব অস্বাভাবিক কিছু কি?’

সুশান্তকে হতোদ্যম দেখায়, ওভাবে ভাবলে তো খোঁজার কোনও শেষ নেই স্যার। সেই খড়ের গাদায় সূচ খোঁজাই তো হল!’

ওসি হোমিসাইড থামিয়ে দেন সুশান্তকে, ‘আরে আমি একবারও বলছি না, তোমার আইডিয়াটা খারাপ। আমি শুধু পসিবিলিটিজ়গুলোর কথা বলছি। আগে থেকে কিছু প্রিজ়িউম না করতে বলছি। তবে আই এগ্রি উইথ ইউ, ডেফিনিট লিড যখন পাওয়া যাচ্ছে না, ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথডে যাওয়া যেতেই পারে। লাগল তো লাগল, না লাগল তো না লাগল। ফোকাসটা ন্যারো করে এনেই চেষ্টা করো। স্থানীয় তরুণী এবং আনম্যারেড—টার্গেট বেস এটাই রাখো আপাতত। সার্কলটা এর থেকে বড় করা মানে ওই যেমন বললে, খড়ের গাদায় সূচ…। লাভ নেই।’

স্থানীয় সোর্স যারা আছে, তাদের দিয়ে এখনও পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয়নি। অশ্বডিম্বই প্রসব করেছে। এমন একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হল, যে একসময় পুলিশের সবচেয়ে দাপুটে সোর্স ছিল মধ্য এবং পূর্ব কলকাতায়, বহু মামলার সমাধানে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল যার। এই প্রাক্তন সোর্স বেশ কয়েক বছর হল নিজের ছোটখাটো স্টেশনারির ব্যবসা শুরু করেছে ট্যাংরায়। পুলিশের সঙ্গে খবর আদানপ্রদানে নিষ্ক্রিয় অনেকদিন হল, কিন্তু লালবাজারের অনুরোধ বলে কথা। সক্রিয় হল আরেকবার।

সোর্সের আসল নাম উহ্য থাক। নাম ধরা যাক আমজাদ। কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হল আমজাদকে। খবর চাই, ‘মা’ দিয়ে শেষ হচ্ছে তিন অক্ষরের নাম, এমন অবিবাহিতা তরুণী কে কে আছেন গোপালের বাড়ির কাছাকাছি, তপসিয়া-বেনিয়াপুকুর এলাকায়, সে যে ধর্মেরই হন না কেন, যে সম্প্রদায়েরই হন না কেন।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, ‘ফর্ম ইজ় টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ় পার্মানেন্ট’। সব পেশার ক্ষেত্রেই সারসত্যি এটা। অন্য সোর্সরা খাবি খাচ্ছিল, কিন্তু আমজাদ খবর আনল চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই।

কী খবর? নাম এমন অনেকই আছে। অসংখ্য। সেলিমা, আসমা, আলিমা, রহিমা …। কিন্তু বয়সের হিসেব মিলছে শুধু তিনজনের সঙ্গে। কুড়ি-একুশের অবিবাহিতা তরুণী বলতে পাওয়া যাচ্ছে তিনটে নাম। সালমা হায়দার, ফতিমা জাভেদ আর রেশমা আলি।

সে না হয় হল। কিন্তু স্রেফ একটা আন্দাজের উপর কি আর ওভাবে দুম করে বাড়ি চলে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় কোনও তরুণীকে? আরও খবর চাই ওঁদের ব্যাপারে। বাড়িতে কে কে আছে, কে কী করেন, পাড়ায় কার কী ধারণা ওদের ব্যাপারে, কারও বিষয়ে প্রেমঘটিত কিছু জানা যাচ্ছে কি না, এইসব।

হোমওয়ার্ক করেই এসেছিল আমজাদ। জানাল, সালমার বিয়ে আগামী এপ্রিলে। সম্বন্ধ করে। প্রস্তুতি শুরু হয়েছে পাত্র-পাত্রী উভয় পক্ষের পরিবারেরই। কোনও জটিলতার খবর নেই। ফতিমা যথেষ্ট উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কলকাতার অভিজাত কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রেমঘটিত কিছু জানা যাচ্ছে না।

—আর রেশমা?

—এই রেশমার কিন্তু গল্প আছে স্যার। নাদির বলে ট্যাংরায় একটা ছেলে আছে। এই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স হবে। একটা গ্যারেজে মেকানিকের কাজ করে। খুচরো মস্তানির জন্য বছরখানেক আগে তপসিয়া থানা অ্যারেস্ট করেছিল। ‘কষ’ আছে চেহারায়। হেবি লম্বা-চওড়া।

সুশান্ত শুনতে থাকেন নিশ্চুপ। বলতে দেন আমজাদকে। গড়পড়তা সোর্সদের স্বভাব জেনে গিয়েছেন এতদিনে। আসল খবরে আসতে সময় নেয় ইচ্ছে করে। সুতো ছাড়ে ধীরে ধীরে। কিন্তু এই আমজাদ অন্য গোত্রের। ধান ভানতে শিবের গীতের গল্প করে না। পয়েন্টে আসে চট করে।

পয়েন্টে এল। এবং শুনে সুশান্ত উত্তেজনার ওম টের পেলেন শরীরে। আমজাদ বলল, ‘এই নাদির সাত তারিখ বিকেল থেকে মহল্লায় নেই স্যার। কোথায় কেটে গেছে বাড়ির লোকও বলতে পারছে না। বাড়িতে শুধু বলে গেছে, নতুন চাকরির খোঁজে কলকাতার বাইরে যেতে হবে। যে গ্যারেজে কাজ করে, তার মালিকও কিছু জানে না। এই নাদিরের সঙ্গে রেশমা বলে মেয়েটার হেব্বি বাওয়াল হয়েছিল হপ্তাদুয়েক আগে। চার নম্বর ব্রিজের কাছে।’

—রেশমার বাড়িতে কে কে আছে?

—আব্বু-আম্মা আর ছোট ভাই। আব্বুর জুতোর দোকান আছে একটা ছোট। রেশমা কলেজে পড়ে। ওর ভাই স্কুলে।

সুশান্ত খবরটা দ্রুত সাজিয়ে নিলেন মাথায়। ময়নাতদন্ত বলছে, খুনটা হয়েছে ৬ বা ৭ তারিখ। ৭ তারিখ বিকেল থেকে নাদির এলাকা থেকে বেপাত্তা। কেন? এই নাদিরের সঙ্গে কিছুদিন আগে রেশমা বলে স্থানীয় তরুণীর ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। কী নিয়ে ঝগড়া? জানতে হবে। মৃত গোপালের জিন্‌সের পকেট থেকে পাওয়া লাইটারের শেষ অক্ষর ‘মা’। প্রথম দুটো অক্ষর কি তা হলে ‘রেশ?’ পুরো কথাটা ‘রেশমা’? গোপালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এই রেশমার? সেটা নিয়েই ঝগড়া নাদির-রেশমার? প্রণয়ঘটিত ঈর্ষার চেনা বাস, চেনা রুট?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ খোলেন সুশান্ত।

—নাদিরের খোঁজ লাগা। কোথায় যেতে পারে মনে হয়?

—লোকাল সেয়ানা স্যার। লোকালিটি থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়? জাননগরে বাড়ি। পাড়ায় ফিরতেই হবে। আমি লেগে আছি স্যার। পেয়ে যাব।

—হুঁ, রেশমার বাড়িটা একজ়্যাক্টলি কোথায়?

.

তপসিয়া রোড সংলগ্ন একটা গলির মুখে একতলা বাড়ি। বাইরের সাদামাটা রংচটা দেওয়ালে চোখ বুলোলেই বোঝা যায়, এবাড়ির বাসিন্দারা মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। সুশান্ত যখন একজন এএসআই এবং এক মহিলা কনস্টেবলকে নিয়ে সাদা পোশাকে পৌঁছলেন রেশমাদের বাড়ির সামনে, সন্ধে প্রায় সাড়ে সাতটা।

‘লালবাজার থেকে আসছি, একটু দরকার ছিল’ —শুনেই ঘাবড়ে গেলেন মাঝবয়সি গৃহকর্তা। সুশান্ত আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন যথাসাধ্য, ‘চিন্তার কিছু নেই। রেশমা কি আপনার মেয়ে?’ এবার চূড়ান্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখায় ভদ্রলোককে, ‘হ্যাঁ, কেন? কী ব্যাপার?’ সুশান্ত বললেন, ‘ব্যাপার সামান্যই। আপনার মেয়ের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’

রেশমা বেরিয়ে এলেন। বসার ঘরের সোফায় কুঁকড়ে বসলেন মা-বাবার সঙ্গে। দৃশ্যতই অস্বস্তিতে। সুশান্ত কোনওরকম ভনিতা না করেই শুরু করলেন।

—দেখুন, একটা কথা শুরুতেই বলে নিই। আপনাদের ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমি শুধু কয়েকটা জিনিস জানতে এসেছি। রেশমা যতটুকু জানেন, বললে আমাদের সুবিধে হয় একটা কেসের ব্যাপারে।

রেশমা মুখ তুলছেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেয়ের হয়ে বাবাই উত্তর দিলেন, ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন না!’

সুশান্ত এবার সোজা তাকান রেশমার দিকে।

—আপনি গোপাল রায় বলে কাউকে চেনেন?

নামটা উচ্চারণ করা মাত্র শরীরী ভাষা বদলে যায় বছর কুড়ির রেশমার। ফোঁপাতে শুরু করেন। তরুণীর মা-বাবা ততক্ষণে ঘাবড়ে গেছেন মেয়ের রকমসকম দেখে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখাচ্ছে ওঁদের। সুশান্ত একটা চাপা শ্বাস ফেলেন স্বস্তির। ঠিক জায়গাতেই এসেছেন, নিশ্চিত।

কান্নার বেগ ক্রমে বেড়ে চলেছে রেশমার। সুশান্ত বোঝেন, মেয়েটিকে শান্ত করা প্রয়োজন সবার আগে। তাকান সঙ্গে আসা মহিলা কনস্টেবলের দিকে। যিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যান, কী করণীয় এখন। এগিয়ে গিয়ে পিঠে হাত রাখেন রেশমার। সুশান্ত মুখ খোলেন ফের।

—রেশমা, আপনি প্লিজ় শুনুন একটু মন দিয়ে। আমরা শুধু জানতে চাইছি, আপনি গোপাল রায় নামের কাউকে চিনতেন কিনা। শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বললেই হবে। আমি কথা দিচ্ছি, এই মামলায় কোনওভাবে আপনার নাম জড়াবে না। কোর্টকাছারির কোনও ঝামেলা থাকবে না। শুধু সত্যিটা বলুন।

রেশমা নিরুত্তর। মা-বাবা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছেন মেয়ের মুখের দিকে। দমবন্ধ অবস্থা ঘরে। সুশান্তই ফের কথা শুরু করেন।

—গোপাল যে খুন হয়েছে, বডি পাওয়া গেছে কবরখানা থেকে, শুনেছেন নিশ্চয়ই?

ফের কান্নার দমক। এবার আর থামানোর চেষ্টা করলেন না সুশান্ত। পকেট থেকে লাইটারটা বের করে ধরলেন রেশমার সামনে।

—এই লাইটারটা গোপালের পকেট থেকে পাওয়া গেছে। এর উপর সোনার জলে একটা নাম…।

কথা শেষ করতে পারেন না সুশান্ত। লাইটারটা দেখেই মুখ ঢেকে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন রেশমা। সুশান্ত পরমুহূর্তেই উঠে দাঁড়ান, রেশমার মা-বাবাকে বলেন, ‘আপনারা মেয়েকে একটু ভিতরে নিয়ে যান, একটু শান্ত করুন। তারপর ওর সঙ্গে কথা বলব। আমরা অপেক্ষা করছি। একটা কথা প্লিজ় মনে রাখুন, আমার প্রশ্নগুলোর জবাব দিলেই হবে । আবার বলছি, সরকারিভাবে কোনও ঝামেলায় জড়াতে হবে না আপনাদের মেয়েকে। আপনাদের পরিবারকে। শুধু সত্যিটা বললেই হবে।’

কিছুটা ধাতস্থ হয়ে রেশমা ফের সুশান্তের মুখোমুখি হলেন প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে। রেশমার চোখমুখ ফুলে গেছে এরই মধ্যে। বোঝা যাচ্ছে, গত আধঘণ্টা অঝোরে কেঁদেছেন। রেশমার মা-বাবার অবস্থা দেখেও খারাপ লাগে সুশান্তর। দু’জনকেই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। দেখানোরই কথা। কারও সাতে-পাঁচে না-থাকা ছাপোষা পরিবার এঁদের। সেখানে বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎই এক সন্ধেয় বাড়িতে পুলিশ আসছে। আর মা-বাবা আবিষ্কার করছেন, তরুণী মেয়ের সঙ্গে গোপন প্রেম ছিল এক স্থানীয় যুবকের। যে কিনা খুন হয়ে গেছে কয়েকদিন আগে।

রেশমার বাবা কোনওমতে আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আপনার যা জিজ্ঞেস করার আছে, করুন। যা জানে বলবে ও। আমরা জানতাম না এই গোপাল বলে ছেলেটির কথা। এখন জিজ্ঞেস করে মালুম হল।’

রেশমা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই বললেন, যতটুকু জানতেন। সুশান্ত যেমনটা আন্দাজ করেছিলেন আমজাদের থেকে খবর পাওয়ার পর, ঘটনাক্রম মোটামুটি তেমনই। রেশমা এবং গোপাল প্রেমে পড়েছিলেন পরস্পরের। প্রেমপর্বের দেখাসাক্ষাৎ হত অত্যন্ত গোপনে এবং কদাচিৎ। দুই পরিবারের কেউই জানতে পারেননি। পাড়াপ্রতিবেশীরাও নয়। রেশমার প্রবল প্রণয়প্রার্থী ছিল নাদিরও। রেশমাকে ‘প্রেমপ্রস্তাব’ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল একাধিকবার। রেশমা সাড়া দেননি। নাদির অবশ্য হাল ছাড়েনি। নানান ছুতোনাতায় মরিয়া চেষ্টা করেই যেত রেশমার মনোযোগ পাওয়ার।

এই নাদির কিছুদিন আগে সন্ধের দিকে এন্টালির ‘জেম’ সিনেমার কাছে একসঙ্গে দেখে ফেলে রেশমা-গোপালকে। পরের সন্ধেতেই টিউশন থেকে ফেরার পথে রেশমার পথ আটকায় নাদির। গোপালের সঙ্গে কিসের এত ভাব ? সরাসরি জবাবদিহি দাবি করে রেশমার কাছে। উত্তেজিত বাক্যবিনিময় হয়।

লাইটারটা গোপালকে উপহার দিয়েছিলেন রেশমাই। তবে তার উপর সোনার জলে ‘রেশমা’ লেখার ব্যাপারটা জানতেন না। মানে, নামটা গোপালই লিখিয়েছিলেন। এবং সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন প্রেমের স্মারক হিসেবে।

রেশমাদের বাড়ি থাকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় মেজাজটা ফুরফুরে লাগে সুশান্তের। যাক, কেসটা এখন ‘ডিটেকশন’-এর দোরগোড়ায়। খুনের সম্ভাব্য মোটিভ পাওয়া গেছে। নাদিরকে ধরতে পারলে দুইয়ে দুইয়ে চার হওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

অপেক্ষা স্বল্পস্থায়ীই হল। আমজাদ ঠিকই বলেছিল, ‘লোকাল সেয়ানা’। ‘লোকালিটি’ ছেড়ে পালিয়ে আর কতদিন? ১৭ ফেব্রুয়ারি, দেহ উদ্ধার হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ধরা পড়ল নাদির। আমজাদ পাকা খবর দিয়েছিল। সন্ধেবেলায় পার্ক সার্কাস স্টেশনে লোক রাখতে বলেছিল সুশান্তকে। ট্রেন থেকে নামতেই চিনিয়ে দিয়েছিল পঁচিশ বছরের নাদিরকে।

স্টেশন থেকে সোজা লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জেরা শুরু হয়েছিল নাদিরের। যার বাঁ হাতের তর্জনীতে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। এটা কী করে হল? শিশুর সারল্য নিয়ে নাদির বলল, এন্টালিতে গাড়ি সারাইয়ের যে গ্যারেজে কাজ করে, সেখানে কিছুদিন আগে টিনের পাতে লেগে কেটে গিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, ডাহা মিথ্যে। তবু নিয়ে যাওয়া হল গ্যারেজে। মিথ্যে ধরা পড়ল। এরপর গুছিয়ে একটা থাপ্পড়, এবং যাবতীয় প্রতিরোধ শেষ।

খুনটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল, আদ্যোপান্ত খুলে বলল নাদির। প্রকাশ্যে এল গোপাল-হত্যার নেপথ্যকাহিনি।

—আমি রেশমাকে পাগলের মতো ভালবাসতাম স্যার। মনে হত, ও চাইলে জানও দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু ও আমাকে পাত্তাই দিত না। যে-দিন সন্ধের দিকে এন্টালিতে ওদের দু’জনকে হাত-ধরাধরি করে দেখলাম, দিমাক খারাপ হয়ে গেল। গোপালকে চিনি আমি। এলাকার ছেলে। মুখচেনা, তবে আলাপ ছিল না তেমন। রেশমার সঙ্গে গোপালকে দেখে রাগে অন্ধ হয়ে গেলাম আমি। গোপালের মধ্যে কী দেখল মেয়েটা?

রেশমাকে ধরলাম পরের দিন সন্ধেবেলা। পার্ক সার্কাসে চার নম্বর ব্রিজের কাছে। জানতাম, ওই সময় কোচিং ক্লাস থেকে বাড়ি ফেরে। আমি স্ট্রেট বললাম, ‘তোমাকে গোপালের সঙ্গে দেখলাম কাল বিকেলে। ওর সঙ্গে মিশছ কেন?’ রেশমা ভীষণ রেগে গেল। বলল, ‘তাতে তোমার কী? ওকে ভাল লাগে, তাই মিশছি। বেশ করছি।’

—তারপর?

—শুনে মাথা দপদপ করছিল। রেশমার সঙ্গেই আমার নিকাহ হবে, এই খোয়াব দেখতাম। সারারাত ঘুমতে পারলাম না স্যার। মনে হচ্ছিল, রাতেই গোপালের বাড়ি চলে যাই। মেরে মুখ ফাটিয়ে দিই।

আমার দুই কাছের বন্ধু রাজ আর আজাদকে সব খুলে বললাম পরের দিন। রাজ বলল, মাথা গরম করিস না। এই গোপাল মালটাকে রাস্তায় ধরে একটু চমকে দিই চল। আজাদ সায় দিল, বলল, দরকার হলে সলিড কয়েক ঘা দিয়ে দেব। রেশমার দিকে আর কখনও চোখ তুলে তাকানোর সাহস হবে না। আমিও ভাবলাম, ঠিকই বলছে। থ্রেট দিলেই কাজ হয়ে যাবে।

—হুঁ…

—রাজ বুদ্ধি দিল, পাড়াতে এসব করতে গেলে হল্লা হয়ে যাবে। নির্জন কোনও জায়গায় গোপালকে নিয়ে যেতে হবে। আজাদও বলল, হ্যাঁ, এমন কোথাও, যেখানে কেউ আশেপাশে থাকবে না। আমি বললাম, কিন্তু গোপাল আমাদের সঙ্গে যেতে রাজি হবে কেন? রাজ হাসল, ‘আরে, ওটা কোনও প্রবলেমই না। আমার সঙ্গেও ওর মুখচেনা আছে। আমি কায়দা করে নিয়ে আসব। আগে জায়গাটা ঠিক কর তোরা।’

আজাদ বলল, জাননগরের কবরখানায় নিয়ে গেলে কেমন হয়? আজাদের কথাটা মনে ধরল আমার। ফাঁকা জায়গা, সন্ধের পর একটা লোকও থাকে না। অফিসঘরটার কাছে ছাড়া ভিতরে কোথাও জোরালো লাইটও নেই। পাঁচিল ভাঙা অনেক জায়গায়। ঢুকতে অসুবিধে হবে না।

—বুঝলাম…

—আমরা প্ল্যান বানালাম। ঠিক হল, আমি একটা ক্ষুর জোগাড় করে আনব ভয় দেখানোর জন্য। মারার কোনও প্ল্যান ছিল না স্যার, বিশ্বাস করুন। গোপাল রাত করে বাড়ি ফেরে, মল্লিকবাজার দিয়ে। রাজ ওকে রাস্তায় ধরে বলবে, ওর কোনও আত্মীয়ের অসুখ। হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য লাগবে। এই বলে ও কবরখানার পিছনের রাস্তায় নিয়ে আসবে। আমরা ওখানে অপেক্ষা করে থাকব।

—বেশ …

—প্ল্যানমাফিকই হল সব। রাজ কবরখানার পিছনের রাস্তায় নিয়ে এল গোপালকে। আমাকে আর আজাদকে দেখে চমকে গেল গোপাল। রাজ ওকে বলল, ‘রেশমার সঙ্গে তোর নাকি ইশক চলছে শুনলাম।’ গোপাল রেগে গেল, ‘তাতে তোর কী? তুই আমাকে মিথ্যে কথা বলে এখানে আনলি কেন?’ আমি পকেট থেকে ক্ষুরটা বার করে সোজা গলায় ঠেকিয়ে দিলাম, ‘ভিতরে চল, বলছি। না হলে এটা স্ট্রেট চালিয়ে দেব, মা কসম!’

গোপাল হকচকিয়ে গেল। পাঁচিলের ভাঙা জায়গার কোনখান দিয়ে ঢুকব, কোথায় বসব, আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। গোপালকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে রাজ আর আজাদ চমকে-ধমকে বোঝানোর চেষ্টা করল অনেক। গোপাল কিছু বলছিল না। মুখ গোঁজ করে বসেছিল। আমি শেষে বললাম, ‘দ্যাখ গোপাল, আমি রেশমাকে অনেকদিন ধরে ভালবাসি। তুই এর মধ্যে ঢুকিস না। আর যদি কখনও রেশমার সঙ্গে তোকে দেখি, হাওয়া করে দেব একেবারে।’

আমি এটা বলামাত্রই খেপে গেল গোপাল। চিৎকার করতে শুরু করল, ‘কী ভেবেছিস তোরা? মিথ্যে বলে ডেকে এনে ভয় দেখাবি, আর আমি রেশমাকে ভুলে যাব? তোকে রেশমা কেন পছন্দ করে না জানিস? তোর এই মাস্তানি স্বভাবের জন্য। রেশমা কার সঙ্গে মিশবে, আমি কার সঙ্গে মিশব, তুই ঠিক করে দেওয়ার কে রে? হাওয়া করে দিবি মানে? আমি কালই থানায় কমপ্লেন করছি দাঁড়া।’

আমার যে কী হয়ে গেল স্যার… গোপালের মেজাজ দেখে আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না। ঝাঁপিয়ে পড়লাম ওর উপর । ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম মাটিতে। গোপাল পড়ে যেতেই আমি ওর গলায় ক্ষুর চালিয়ে দিলাম রাগের মাথায়। পড়ে যাওয়ার পর গোপালও হাত-পা চালানোর চেষ্টা করেছিল। রাজ আর আজাদ তখন চেপে বসেছিল ওর বুকের উপর। প্রচুর রক্ত বেরচ্ছিল গোপালের গলা দিয়ে। একটু পরে ও স্থির হয়ে গেল। আমরা নাকের কাছে হাত দিয়ে বুঝলাম, নিশ্বাস পড়ছে না, মরে গেছে। খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম আমরা। মারতে চাইনি স্যার, হঠাৎ করে কী যে হয়ে গেল……

—কী চেয়েছিলিস না চেয়েছিলিস সেটা আমরা বুঝব। বাকিটা বল।

—বলছি স্যার। আমরা ভাবলাম, বডিটা না সরিয়ে ফেললে তো সব জানাজানি হয়ে যাবে। থানা-পুলিশ হবে। ধরা পড়লে লাইফ বরবাদ। জেল যেতে হবে। কিন্তু সরাব কোথায়? রাজই বলল, এই কবরখানাতেই পুঁতে দিই চল। লাশ না পেলে কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না। আজাদ বলল, পেলেও কেউ চিনতে পারবে না এমন ব্যবস্থা করতে হবে। কাছেই একটা ভারী সিমেন্টের টুকরো পড়ে ছিল। সেটা নিয়ে এসে গোপালের মুখের উপর আছড়ে ফেললাম।

—পুঁতলি কীভাবে বডিটা?

—ওখানে পুরনোদিনের অনেক মূর্তি আছে স্যার। দামি মার্বেল পাথরের। চোরেরা এসে পাথর ভেঙে নিয়ে যায়। মূর্তির মাথাও কেটে নিয়ে যায়। ভাঙা পাথরের বড় বড় টুকরো অনেক থাকে ওখানে। একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়। আমরা তিনজন ভারী কয়েকটা পাথরের টুকরো খুঁজে আনলাম। সেই দিয়ে মাটির কিছুটা তাড়াতাড়ি খুঁড়ে গোপালের বডি পুঁতে দিলাম।

—তোর বাঁ হাতের কাটা দাগটা? ক্ষুর থেকেই তো?

—হ্যাঁ স্যার। ক্ষুর চালানোর সময় গোপাল হাত চালিয়েছিল। আমার হাতেও ক্ষুর লেগেছিল। অনেকটা রক্ত ছিটকে এসে আমার পাজামাতে লেগেছিল। পাজামা আর ক্ষুর, দুটোই কবরখানাতেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিয়েছিলাম। গোপালের ঘড়ি আর মানিব্যাগটা আজাদ নিয়েছিল।

সে রাতে বেরনোর সময়ই আমরা ঠিক করলাম, হপ্তাখানেক এলাকায় থাকব না। সব ঠান্ডা হয়ে গেলে ফিরে আসব। ব্যান্ডেলে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে লুকিয়েছিলাম। টাকা ফুরিয়ে আসছিল। বেশিদিন কামাই করলে গ্যারাজের চাকরিটাও চলে যেত।

—রাজ আর আজাদকে কোথায় পাওয়া যাবে?

—সেটা বলতে পারব না স্যার।

আজাদকে ধরতে বেগ পেতে হল না বিশেষ। সোর্স মারফত খবর এল দিন পনেরোর মধ্যেই। এদিক-ওদিক পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। নাদিরের মতো আজাদকেও ফিরতে হতই জাননগরের বাড়িতে। চালু ছিল নিশ্ছিদ্র নজরদারি। এলাকায় পা রাখার ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যেই ধরা পড়ল জালে।

বেনিয়াপুকুরের বাসিন্দা রাজ বরং বিস্তর ভোগাল পুলিশকে। ধরা পড়ল প্রায় এক বছর পরে। পালিয়ে গিয়েছিল বিহারে। রাজকে ফেরার দেখিয়েই যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ সংবলিত চার্জশিট দ্রুত জমা দিয়েছিলেন সুশান্ত।

এই মামলার তদন্ত এবং চার্জশিট ছিল পুরোটাই পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (circumstantial evidence) নির্ভর। এবং সেজন্যই তদন্তে তিল মাত্রও ফাঁকফোকর রাখার উপায় ছিল না সুশান্তের। যে খুনের ঘটনায় কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই, সেই মামলায় পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা অতি দুরূহ কাজ।

কেন দুরূহ? সুপ্রিম কোর্ট ১৯৫২ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়ে পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিষয়ে যা বলেছিল, তার অংশবিশেষ তুলে দিলাম নীচে।

‘It is well to remember that in case where the evidence is of a circumstantial nature, the circumstances from which the conclusion of guilt is to be drawn should be in the first instance be fully established and all the facts so established should be consistent only with the hypothesis of the guilt of the accused. Again, the circumstances should be of a conclusive nature and tendency and they should be such as to exclude every hypothesis but the one proposed to be proved. In other words, there must be a chain of evidence so far complete as not to leave any reasonable ground for a conclusion consistent with the innocence of the accused and it must be such as to show that within all human probability the act must have been done by the accused.’

সারাংশ? পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার শর্তাবলি খুব পরিষ্কার। যে ঘটনাগুলিকে পরিপার্শ্ব বা অবস্থানগত প্রমাণ হিসেবে দাবি করছেন তদন্তকারী, তা শুধু সংশয়াতীত ভাবে প্রমাণ করাটাই যথেষ্ট নয়। ঘটনাগুলি যে অভিযুক্তের অপরাধী হওয়ার তত্ত্বকেই শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত করছে, তা নিয়ে যেন ন্যূনতম দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকে বিচারকের মনে। সর্বোপরি, ঘটনা এবং প্রমাণের বাঁধুনি হতে হবে এতটাই সুশৃঙ্খল, যে সন্দেহের কণামাত্র অবকাশও থাকবে না অভিযুক্তের অপরাধ নিয়ে।

শর্ত মেনেই খুঁতহীন চার্জশিট তৈরি করেছিলেন সুশান্ত। নাদিরের বয়ান অনুযায়ী কবরখানা থেকে উদ্ধার হয়েছিল পুঁতে রাখা ক্ষুর এবং লুঙ্গি। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা রক্ত যে মানবদেহের এবং গোপালের জামাকাপড় আর নাদিরের ক্ষুর ও লুঙ্গিতে লেগে থাকা রক্ত যে একই গ্রুপের, সেটা ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছিল। আজাদের বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল মানিব্যাগ আর ঘড়ি, যা গোপালের বলেই আদালতে চিহ্নিত করেছিলেন ওঁর দাদারা। ক্রিমেটোরিয়াম স্ট্রিটে সে রাতে যখন গোপালের মুখোমুখি রাজ-আজাদ-নাদির, বাড়ি ফিরছিলেন এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হানিফ। যিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছিলেন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘last seen together’-এর জরুরি প্রমাণ। এবং ছিল ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে বিচারকের কাছে নাদির-আজাদের গোপন জবানবন্দি। জাল কেটে বেরনোর রাস্তা কোথায় আর?

আলিপুর জেলা ও দায়রা আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে নাদির, রাজ ও আজাদকে। রায়ে সপ্রশংস উল্লেখ ছিল শাহ্‌জামল এবং সুশান্তের ভূমিকার।

নাদির এবং আজাদ শাস্তি মকুবের আবেদন করে হাইকোর্টে। সওয়াল-জবাবের পালা সাঙ্গ হলে নিম্ন আদালতের রায়ের সঙ্গেই সহমত হয় হাইকোর্ট। সাজাপ্রাপ্তদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল সুপ্রিম কোর্ট, শাস্তির মেয়াদ কমানোর আর্জি নিয়ে। সর্বোচ্চ আদালত সেই আর্জি খারিজ করে দেয় পত্রপাঠ।

সাজার মেয়াদ সম্পূর্ণ হয়েছে নাদির-আজাদের। রাজ এখনও সংশোধনাগারে।

কী লিখি শেষে?

ফেলুদার গল্পেই হোক বা বাস্তবে, গোরস্থানে সাবধান!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *