তেইশ জুন, বৃহস্পতিবার
সকাল এগারোটার দিকে দরজার তল দিয়ে দুটো পত্রিকা আর একটি থালা চলে এল। থালায় দুটি রুটি আর একটি ডিমভাজা। বুঝি যে ঝ বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের নাস্তার অবশিষ্ট আমাকে দিতে পেরেছেন কিন্তু এ ঘরে ঢোকার সুযোগ করতে পারেননি। কিন্তু ঝ র তো আপিসে যাওয়ার কথা, তিনি কি আপিসে যাননি! আমার জানা হয় না কিছু। রুটি ডিম খেতে খেতে পত্রিকা পড়ি। আজও সেই একই খবর। হরতাল সফল আর প্রতিরোধ করার আহবান। হরতাল সফল করার জন্য সভা সমাবেশ আর মিছিল হচ্ছে। হরতালের বিপক্ষে কেবল বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। হরতাল প্রতিরোধের আহবান জানিয়ে ১০৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিবৃতি দিয়েছেন। ধর্মের নামে লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের ওপর মৌলবাদী চক্র যাতে আর কোনও ফ্যাসিবাদী হামলা চালাতে না পারে, সেজন্য দেশের সচেতন মানুষকে গ্রাম শহর পাড়া মহল্লাসহ সর্বস্তরে প্রতিরোধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানানো হচ্ছে। সই করেছেন সমাজের মান্যগণ্য লোকেরা, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদ, ডঃ হায়াৎ মামুদ, মুনতাসির মামুন, মোহাম্মদ রফিক, অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস, মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, হরিপদ ভট্টাচার্য, আবুল হাসানাত, ডঃ দুর্গাদাস ভট্টাচার্য, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এরকম অনেকে। একটি বিবৃতি অন্যরকম। এটি মৌলবীদের দেওয়া বিবৃতি, বিবৃতিটি মৌলবাদীদের বিপক্ষে। এর হোতার সঙ্গে আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ আছে। সে কথা পরে বলছি। খবরটি এরকম, ৩০ জুনের হরতালের সঙ্গে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কোনও সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ গতকাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি এবং দৈনিক জনকণ্ঠ নিষিদ্ধের দাবিতে আগামী ৩০ জুনের হরতালের সঙ্গে ক্ষুধা ও দারিদ্রে নিষ্পেষিত ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কোনও সম্পর্ক নেই। ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের মহাসচিব হাফেজ জিয়াউল হাসান বলেন, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোরান ও ইসলামী শিক্ষাকে অপমান করলে নিঃসন্দেহে সে আল্লাহর কাছে অপরাধী। কিন্তু এই অপরাধের জন্য শাস্তি দেয়া বা ক্ষমা করার অধিকার কিংবা দায়িত্ব আল্লাহ কোনও মানুষকে দেননি। কারণ এ অপরাধ এতই বিরাট ও জঘন্য যে মানুষ এর প্রতিকার করার ক্ষমতা রাখে না। তাই আল্লাহ এ কাজটি নিজের দায়িত্বে নিয়েছেন। ইসলাম যুক্তি ও সৌহার্দের ধর্ম, উত্তম চরিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করার ধর্ম। কোরানের বিধান অনুসারে সঠিক যুক্তি ও উত্তর প্রদান না করে কথায় কথায় হত্যা ও ফাঁসির ফতোয়া ছড়ানো ন্যায়সঙ্গত নয়। তাছাড়া হুমকি দিয়ে সস্তা আন্দোলনের নেতা হওয়া যায়, কিন্তু ইসলামের খাঁটি সেবক হওয়া যায় না। প্রকৃত আলেমের দায়িত্ব হচ্ছে দেশবাসীর সামনে কোরানের সুন্দর শিক্ষাকে ভালভাবে তুলে ধরা। কিন্তু তা না করে কেউ কেউ ইসলামের নামে অনৈসলামিক ফাঁসির ফতোয়া দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। ইসলামের জন্য মায়াকান্নাকারী এসব লোক ৭১ সালে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে হত্যা ও দুই লাখ মা বোনের ইজ্জত লুণ্ঠনকারী মওদুদীবাদী জামাত শিবির চক্রের ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে। বরং এরা বর্তমানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমকে রক্ষা করার জন্য তসলিমার ফাঁসি ও জনকণ্ঠ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছে। এই আন্দোলনে এমন অনেক নেতা আছেন তাঁরা যে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল সেখানে আমাদের জাতীয় পতাকা ওঠানো হয় না, জাতীয় সঙ্গীতও পাঠ করা হয় না, যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার নামান্তর। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের অবমাননাকারী এবং অনৈসলামিক ফতোয়া দিয়ে দেশের শান্তি শৃঙ্খলা নষ্টকারী ফতোয়াবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
জিয়াউল হাসান বলেছেন। জিয়াউল হাসানের সঙ্গে আমার আলাপ না থাকলে ধরে নিতাম মৌলবী সেজে এটি হয়ত অমৌলবী, অমৌলবাদী কারও কাজ; এ সময় দেশকে বাঁচাতে যে কেউ যে কোনও কিছুই সাজতে পারে। নাস্তিকদেরই যদি বলতে হয়, আমরা কোরআনের পক্ষ শক্তি, তখন আধা নাস্তিকরাই মৌলবী হয়ে মৌলবাদীদের যুক্তি খণ্ডন করতে নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু ঘটনা তা নয়। জিয়াউল হাসান লোকটি আসলেই জোব্বা পরা, টুপি দাড়িঅলা, আপাদমস্তক মৌলবী। তাণ্ডবের সময়ে লোকটি আমার সঙ্গে বহু চেষ্টা করেছেন দেখা করতে। আমি রাজি হইনি। কিন্তু আহমদ শরীফের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত জিয়াউল হাসানকে ঘরে ঢুকতে দিই, বসতে দিই, কথা বলতে দিই। যথা সম্ভব দূরত্ব রেখে বসেছিলাম। মিলনকে, মোতালেবকে, কায়সারকে পাশে বসিয়ে তবে বসেছিলাম। জিয়াউল হাসান যা বলতে চান তা শোনাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। লোকটি আমার চেয়েও কম বয়সী, এর মধ্যে কোরানের হাফেজ হয়েছেন, কোরান পুরোটাই মুখস্ত বলতে পারেন। আমার ঘরে বসে এই হাফেজ মৌলবী দম নিয়ে নিয়ে বলে গেলেন যে তিনি মৌলবাদী নন। মৌলবাদীদের সঙ্গে তাঁর মতের মিল নেই। কারও মাথার মূল্য ঘোষণা করা ইসলামে নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি মুক্তিযুদ্ধে, দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর তিনি আবদার করলেন, আমি যদি তাঁকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করি তবে তিনি আমার পক্ষে লিফলেট ছাপবেন। আমি সোজা না বলে দিই। নিজের পক্ষে টাকা দিয়ে আমি লিফলেট ছাপাবো না এই আমার বক্তব্য। জিয়াউল হাসান যদি সত্যিই মনে করেন যে আমার পক্ষে তিনি কথা বলবেন তবে তিনি সে আয়োজন নিজেই করে নিতে পারেন। মন খারাপ করে হাফেজ মৌলনা চলে গেলেন। আমি আমার আদর্শে স্থির থেকেছি। আসলে সত্যি কথা, জিয়াউল হাসান অনেক ভাল ভাল কথা বললেও তাঁকে আমার বিশ্বাস হয়নি যে সত্যি তিনি কোনও প্রগতিশীল মানুষ। কোনও মৌলবী প্রগতিশীল হতে পারে বলে আমার কখনও বিশ্বাস হয় না। তিনি বলেছেন যে ইসলাম কোনও অবিশ্বাসীকে হত্যা করার কথা বলে না। না, এ কথা আমি মানি না, কারণ আমি জানি যে কোরানেই ইসলামে অবিশ্বাসী লোকদের হত্যা করার পরামর্শ দেওয়া আছে।
আজ জিয়াউল হাসান সাংবাদিক সম্মেলন করে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে মৌলবাদীদের বিপক্ষে কথা বলছেন। স্পীকারের কাছে লেখা আমার চিঠিটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর জিয়াউল হাসানের দল একটি বিবৃতি দিয়েছিল, সেটিও মৌলবাদীদের কবল থেকে আমাকে বাঁচানোর উদ্দেশে। ৩১ জন আলেমের দেওয়া বিবৃতিটি এরকম ছিল, তসলিমার নমনীয় মনোভাব শুভ লক্ষণ।মাননীয় স্পীকারের কাছে লেখা চিঠিতে তসলিমা যে নমনীয়তা ও ক্ষমা প্রার্থনাসুলভ বক্তব্য রেখেছেন তার জন্য লেখিকাকে আমরা সাধুবাদ জানাচ্ছি। আমি কখনও পবিত্র কোরান শরীফ পরিবর্তনের কথা লিখি নি বলে তিনি যে স্বীকারোক্তি করেছেন, তা শুভ লক্ষণ। তবে, তার এই বক্তব্য নতুন কোনও চালাকি কি না, আমরা তা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। কোরান শরীফ নিয়ে কোনও অবান্তর কথাবার্তা ও চালাকির সুযোগ নেই। এর রক্ষক স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। তিনি দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তসলিমা নাসরিন যদি কায়মনোবাক্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হন এবং ইসলামের নিয়ম নীতি ও শরিয়া অনুসরণ করে জীবন যাপন করেন, তবে আল্লাহ অবশ্যই এই নাদান লেখিকাকে ক্ষমা করবেন।
নাদান লেখিকাকে আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করছেন না। নাদান লেখিকা বসে আছে একটি আলো বাতাসহীন বন্ধ ঘরে। নাদান লেখিকার পেচ্ছ!ব পেয়েছে, পেচ্ছ!ব কি করে নিঃশব্দে করা যায়, নাদান লেখিকা তার চেষ্টা করছে প্রাণপণ। পেচ্ছ!ব পায়খানার পর ফ্লাশ করলে শব্দ হয় বলে ফ্লাশ তিনি করছেন না, যদি শব্দ চলে যায় নিচে। নাদান লেখিকা নিজের শ্বাসের শব্দটিকেও ভয় পায়। এ শব্দও যদি কেউ শুনে ফেলে! ছোট্ট ঘরটিতে শ্বাস মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে আসে নাদান লেখিকার। কিন্তু বন্ধ হয়েও পুরোপুরি বন্ধ হয় না। পুরোপুরি বন্ধ হয় না বলে নাদান লেখিকা বেঁচে থাকে। ঝ এলেন বিকেল বেলা। শব্দে আমি চকিতে উঠে বসি। ঝ ঘরে এলেন মানে একঝলক আলো এল ঘরে, প্রাণ এল ঘরে। নিজেকে মৃত বলে মনে হয়, কিন্তু ঝ এলে বুঝি যে বেঁচে আছি। ঝ র আপাদমস্তকের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার চোখ থেকে ঝরতে থাকে কৃতজ্ঞতা। ঝ একটি ক্যানভাস এনেছেন, একটি ইজেল আর একটি গান বাজানোর যন্ত্র। কোনও কথা না বলে তিনি গান ছেড়ে দিলেন জোরে। বেরিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ পরই এক থালা ভাত তরকারি নিয়ে এলেন। গান বাজতে থাকলে অত গলা চেপে কথা না বললেও চলে। গানের শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে যায় কথা বলার শব্দ। ঝ বললেন, তিনি আজ আপিসে যাননি। এভাবে আমাকে এঘরে রেখে আপিসে যাওয়া খুব নিরাপদ নয়। যে কোনও মুহূর্তে বাড়ির যে কেউ জেনে যেতে পারে যে এ ঘরে কোনও প্রাণী বাস করছে, এই আশংকায় তিনি আজ আপিস কামাই দিয়েছেন কিন্তু এভাবে বেশিদিন কামাই দেওয়া চলবে না। এ ঘরে তিনি এখন ইজেল আর ক্যানভাস নিয়ে এসেছেন, এগুলো আনার মানে হল তিনি যদি এ ঘরে আসেন, বাড়ির লোকেরা জানবে যে এঘরে তিনি ছবি আঁকায় ব্যস্ত। কাজের লোকদের বলে দিয়েছেন যে তিনি এখন মন দিয়ে ছবি আঁকবেন। কেউ যেন তাঁর ছবি আঁকার কাজে বিরক্ত না করে। আজও ঝর ভাগের থেকে ভাত খেতে হয় আমাকে। আধপেট খেয়েও আমার কোনও অতৃপ্তি হয় না। যখন জীবন একটি সরু সুতোয় আটকে থাকে, সুতো ছিঁড়লেই নিচে আগুনের গর্তে পড়ে যাবে শখের জীবনটি, তখন আধপেট কি সিকিপেট খাবার জোটা তো ভাগ্যের ব্যাপার, না জুটলেই বা কী!
ঝ খেয়ে দেয়ে হাঁফাচ্ছিলেন গরমে। একটি সিগারেট ধরিয়ে সেটি না শেষ করেই আবার নিচে চলে গেলেন, একটি টেবিল ল্যাম্প আর একটি টেবিল ফ্যান নিয়ে ফিরে এলেন। বগলের তলে জামার মোড়ক। ঝর এক আত্মীয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর মালিক গোছের কিছু, তাঁর কল্যাণে ঘরে পরার লম্বা লম্বা জামা পেয়েছেন তিনি। দুটো আমার জন্য এনেছেন। একটি সাবান,একটি টুথপেস্ট, একটি দাঁতের মাজন জামার ভেতর থেকে বেরোলো। না চাহিতে দয়াময় দিয়াছে সকল, ক্ষুধায় আহার আর পিপাসায় জল — মনে মনে আওড়াতে থাকি। ঝকে দেখে বুঝিনি তিনি যে লক্ষ করেছেন আমার জামা নেই, দাঁত মাজার কিছু নেই, আমি যে গরমে কষ্ট পাচ্ছি, টেবিল ল্যা−ম্পর ছোট একটি আলো রাতে যখন জেগে থাকি, আমার যে প্রয়োজন হতে পারে। কাগজ কলমও দিলেন তিনি। বললেন, শুধু বসে থাকবে কেন, লিখবে।ঝঞ্চর এই ভালবাসা আমার বুকের মধ্যে ঝরনা ঝরায়।
দেশের খবর নিয়ে যখন কথা হয়, ঝ বললেন, দেখেছো, মৌলবাদ-বিরোধী দল কি করে হেরে গেল!
–হেরে গেল? কি করে?
হরতাল বন্ধ করতে পারবে না তা বুঝে গেছে। এখন তাই নিজেরাই হরতালের ডাক দিয়েছে। মৌলবাদীরা সারা দেশে অর্ধদিবস হরতালের কথা বলছে। আর দেখ আমাদের ছেলেরা কী বলছে, ঝ তাঁর হাতের ভাঁজ করা কাগজ খুলে খবরের শিরোনামটি পড়লেন, গোলাম আযমসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ৩০ জুন সকাল সন্ধ্যা হরতাল।
আমি সত্যি সত্যি মাথায় হাত দিই। বেদনার্ত কণ্ঠে বলি–কী বলছেন? এরকম তো হওয়ার কথা না। হরতাল প্রতিরোধের কথা তো অনেকদিন থেকেই বলা হচ্ছে। এত দল মিলে এই একটা হরতাল প্রতিরোধ করতে পারবে না! এ কোনও কথা হল।
ঝ আমার দিকে ফেরেন, তসলিমা তুমি বুঝতে পারছো না কেন, হরতাল যদি হয়েই যায়, তবে প্রতিরোধঅলারা মুখ দেখাবে কি করে! তাই নিজেদের সম্মান রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
ঝ পত্রিকাটি চোখের সামনে তুলে ধরে বলতে থাকেন, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজ ও মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র কমাণ্ড গোলাম আযমসহ সকল যুদ্ধাপরাধী ধর্মের অপব্যবহারকারী, ফতোয়াবাজ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার অবমাননাকারী, সংবাদপষেনর ওপর হামলাকারীদের বিচার ও ফাঁসির দাবিতে এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আগামী ৩০ জুন সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। গতকাল সকাল ১১টায় আইবিএ ভবনে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী ছাত্র সমাজের এক জরুরি বৈঠকে হরতালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৩০ জুনের হরতালকে সফল করার জন্য ২৪ জুন সকাল ১০টায় মধুর ক্যান্টিনে একটা প্রতিনিধি সম্মেলন হবে। ওতে মহানগর কমিটির সকল সদস্য, সকল থানা, কলেজ, ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকরা থাকবে। ২৫ জুন সারাদেশে সভা সমাবেশ, ২৬ জুন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সমাবেশে যোগদান, ২৮ জুন জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমাবেশে যোগদান, ২৯ জুন সন্ধ্যায় মশাল মিছিল।
–আপনার কি মনে হয় সকাল সন্ধ্যা হরতাল হবে?
–হবে। কিন্তু এই হরতাল সফল হলে মূলত জয় হবে মৌলবাদীদের।
–কিন্তু ওরা তো সকাল সন্ধ্যা হরতাল ডাকেনি।
–না ডাকুক। কিন্তু হরতালের কথা তো ওরাই বলেছে আগে।
–দুপুরের পর তো অনেকেই গাড়ি বের করতে পারে।
–ভয়ে বের করবে না। অর্ধদিবস হরতাল হলেও অনেকে গাড়ি টাড়ি বের করতে চায় না রাস্তায়।
ঝর চোখ পত্রিকায়। বললেন, নারী প্রগতিবিরোধীদের প্রতিরোধের আহবান।
–কে আহবান জানালো?
–তাসমিমা হোসেন।
–ও।
–চেন তাসমিমাকে?
–চিনি। অনন্যা পত্রিকার সম্পাদক। ওখানে আমি কলাম লিখতাম।
–অনন্যা পত্রিকা অফিসে আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে, বলেছে নারী প্রগতির বিপক্ষ শক্তির ক্রম উত্থান সমাজে এক নৈরাশ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সালমা খান বলেছেন, দেশে নারীরা বৈষম্যের শিকার, প্রচলিত আইনে নারীদের সমস্যার সমাধান না করা গেলে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা উচিত।
এটুকু পড়ে হেসে ওঠেন ঝ, বলেন, ওরা সালমা খানের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেবে না? তুমি যা বলেছো, সালমা খান তো তাই বললেন।
–সালমা খান ধর্ম শব্দটি ব্যবহার করেননি।
–ধর্ম শব্দটি উচ্চারণ না করেও কিন্তু ধর্মের পাছায় বাঁশ ঢোকানো যায়। গাধা মোল্লাগুলো তো তা জানে না।
ঝর চোখ আবার পত্রিকায়, হঠাৎ বললেন, দেখ দেখ দেশের যত পীর আছে, সব নেমে পড়েছে এই আন্দোলনে। চরমোনাইয়ের পীর বলছে কুখ্যাত তসলিমাকে হত্যা করার দাবিতে হরতাল হবেই হবে। এই পীরের শিষ্য সংখ্যা তুমি কি আন্দাজ করতে পারো? লাখ লাখ। যে কোনও বড় পলিটিক্যাল লিডারের চেয়ে পীরদের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। চরমোনাইয়ের পীর, শর্ষিনার পীর সব নেমেছে রাস্তায়।
ঝর কথা মন দিয়ে শুনি আমি। তাঁর কপাল কুঁচকে আছে দুশ্চিন্তায়। আমি ইনকিলাবটি খুলে হাতে দিই ঝর। প্রথম পাতায় বড় বড় শিরোনাম খবরের।
৩০ জুনের হরতাল সফল করতে দেশব্যাপী গণজোয়ার সৃষ্টি। ব্যাপক সভা সমাবেশ ও বিক্ষোভ অব্যাহত। মোর্চার নেতারা ঢাকার বাইরে গিয়ে গিয়ে বিশাল বিশাল জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র সেনা আজ বায়তুল মোকাররমে সমাবেশ করেছে, মিছিল বের করেছে। বাংলাদেশ হকার সংগ্রাম পরিষদ(বিএইচএস) এবং দেশীয় চিকিৎসক ও ক্যানভাসার কল্যাণ সমিতিও তসলিমার ফাঁসির দাবিতে ৩০ জুনের হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছে। নেজামে ইসলামি পার্টি করেছে আছর নামাজের পর। কাল ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে বাদ আছর লাঠি মিছিল বের করবে। ইসলাম ও রাষ্ট্রদ্রোহী প্রতিরোধ মোর্চা কালও সারাদেশে বিক্ষোভ দিবস পালন করবে। আজ তারা ঢাকার মোহাম্মুদপুর টাউনহল প্রাঙ্গণে জনসভা করছে। মোর্চার কিছু নেতা ঝটিকা সফরে দেশের অন্যান্য জায়গায় জনসভায় বক্তৃতা করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্মরণকালের বৃহত্তম সভা হয়েছে কাল, সভায় ৩৪ টি ইশকুল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন, পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। মুফতী আমিনী ওখানে বলেছেন যে সরকার যদি ৩০ তারিখের হরতালের পর দাবি না মানে, তবে তারা বাহাত্তর ঘণ্টার হরতালে যাবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কুমিল্লার পথে থেমে থেমে বিভিন্ন সভায় মুফতি আমিনী বক্তৃতা করেন। সে কি জনপ্রিয়তা এখন মোর্চার নেতাদের! সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এক সভা থেকে আরেক সভায় দৌড়োচ্ছেন। বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি মসজিদে মসজিদে গভীর রাত পর্যন্ত জরুরি সভা করছে। দেশের প্রতিটি মাদ্রাসায় সভা হচ্ছে, প্রতিটি মাদ্রাসা থেকে মিছিল বের হচ্ছে। ইয়ং মুসলিম সোসাইটি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ৩০ তারিখে সমাবেশ করবে, সারাদেশেও তাদের সমর্থকদের বলা হয়েছে প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করার জন্য।
ঝ চুপ করে বসেছিলেন অনেকক্ষণ। আমি বললাম, কাল তো সংসদেও দুজন সদস্য আমাকে গ্রেফতারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বলেছে।
ঝ বললেন যে তিনি পড়েছেন এই খবর।
মাওলানা আতাউর রহমান খান আর গোলাম রব্বানী সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধি অনুসারে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয় হিসেবে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশ দিয়ে যখন কথা বলার সুযোগ পান, আইন মন্ত্রী আর প্রধান মন্ত্রীকে বলেন যে তসলিমার ফাঁসি এবং ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন করতে যেন কোনও দেরি না হয়। ঝ বললেন, আইন মন্ত্রী আর প্রধানমন্ত্রী তখন কী করছিলেন? নিশ্চয়ই মাথা নেড়ে সায় দিয়েছেন যে তাঁরা মোটেও এতে দেরি করবেন না!
আমি ম্লান হাসি।
ঝ বললেন, ইনকিলাবের বাচ্চারা এখন কি করছে দেখেছো? ভয়েস অব আমেরিকা নাকি বলেছে অষ্ট্রেলিয়ার এক রেডিও সাক্ষাৎকারে তুমি বলেছো যে ইসলাম ধর্ম মেয়েদের কোনও মানবিক মর্যাদা দেয়নি। ইসলাম ধর্মে মেয়েদের সাথে ক্রীতদাসীর আচরণ করা হয়, এই খবরটি ফলাও করে ছেপেছে। এসব ছাপার এখন উদ্দেশ্যটি হল, যেন জনগণ যেন তোমার ওপর আরও ক্ষেপে যায়।
ঝ মেঝেতে দু পা সামনের দিকে ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। আমি আমার মাথার বালিশটি ঝর দিকে বাড়িয়ে দিই, যেন তিনি বালিশে হেলান দিতে পারেন। ঝ লুফে নেন বালিশটি। বালিশে কনুইএর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে বললেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর খবরটা পড়েছিলে? বিদেশের পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে তোমার ফাঁসি চাওয়া হচ্ছে, এসব মানবাধিকার লঙ্ঘন, সরকার কিছু করছে না, তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদেশে এসব খবর ছাপা হওয়ায়। বলেছেন, এদেশের আইনে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণ নিশ্চিত করার বিধান আছে। কিন্তু কেউ পলাতক অবস্থায় আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে আইনগত নিরপত্তার দাবি করতে পারে না।
আমি বলি, ভাবটা এমন যে আমি নিরাপত্তা চাইলে তারা এখন আমাকে নিরাপত্তা দেবেন।
ঝ হেসে বলেন, তাই বোধহয় তারা চাইছে। তুমি নিরাপত্তা চাইবে। সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে গ্রেফতার করে জেলে ভরবে তারপর ফাঁসি দেবে। বিদেশের পত্রিকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা লেখা হলে বলে দেবে আমরা গণতান্ত্রিক সরকার, দেশের মেজরিটি জনগণ যা দাবি করেছে, আমরা তা মিটিয়েছি। এর ওপরে তো আর কথা নেই। জনগণের দাবি পূরণ করাই তো গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য।
ঝ আরেকটি সিগারেট ধরালেন। সিগারেটে টান দিয়ে −ধাঁয়া ছেড়ে বললেন, তুমি ভয় পেও না। তোমাকে কেউই এবাড়ি থেকে ধরতে পারবে না। খুব ওয়েল প্রটেকটেড বাড়ি। দারোয়ান আছে গেইটে। কাজের মানুষগুলো থাকে নিচতলায়, নিচতলায় ড্রইংরুম, রান্নাঘর, খাবার ঘর। দোতলায় আমার শোবার ঘর। দোতলায় উঠে ঘর দোর পরিষ্কার করে তারা নিচে চলে যায়। আড়াইতলায় বা তিন তলায় দরকার না হলে ওঠে না। কিন্তু আমি বাড়িতে না থাকলে ওরা কতদূর পর্যন্ত ওঠে, তা আমার জানা নেই। সেজন্যই একটা ভয় থাকে। আমি তো এভাবে বেশিদিন আপিস কামাই দিতে পারব না। কাল তো ছুটি। পরশু থেকে আপিসে যেতেই হবে। আর শোনো, যদি এমন হয় যে বিপদের আশঙ্কা আছে, কিছু একটা হয়ে গেলে, এসেই গেল মোল্লারা এবাড়িতে, খোঁজ পেয়েই গেল, তখন কি ভেবেছি আমি, জানো?
–কি? উৎসুক তাকাই। বুকে কাঁপুনি।
ঘরটির লাগায়ো গোসলখানার ওপর একটি ছোট খোপ আছে, হাবিজাবি বা বাড়তি জিনিসপত্র রাখার খোপ, খোপটি বন্ধ একটি কাঠের পাল্লা দিয়ে। খোপটি দেখিয়ে ঝ বললেন, তোমাকে সোজা ওখানে তুলে দেব। সারা বাড়ি খুঁজেও তোমাকে কেউ পাবে না। যদি অবস্থা খারাপের দিকে যায়, ওই ব্যবস্থাটি রইল, কি বল!
ওপরের কবুতরের খোপের মত খোপটির দিকে তাকিয়ে আমি বলি, আমি কি ঢুকবো ওখানে?
–শোনো বিপদ এলে এক ফুট জায়গাতেই পাঁচ ফুটের শরীর ঢোকানো যায়। ঢোকাতে হবে। এটাই এ বাড়ির সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
খোপে বাস করতে হবে শুনে মানুষ মুর্ছা যায় হয়ত, কিন্তু আমার হয় স্বস্তি। ঝ যদি এখন বলেন যে যদি দেখি মোল্লারা খবর পেয়ে গেছে যে তুমি এখানে, ধেয়ে আসছে এ বাড়ির দিকে, তখন মাটিতে একটি গর্ত করে তোমাকে আমি পুঁতে রাখব, এতেও বোধহয় স্বস্তি হবে আমার। মাটিতে পোঁতা থাকলেও বাঁচার সম্ভাবনা আছে, মোল্লাদের হাতে পড়লে নেই।
ঝ উঠে গেলেন গানের যন্ত্রটির কাছে। বোতাম টিপে টিপে রেডিওতে বিবিসি ধরলেন। বিবিসিতে বাংলা খবর চলছে। জামাতে ইসলামীর উদ্দেশ্য বিধেয় খানিকটা উল্লেখ করে বলা হল, লেখিকা তসলিমা নাসরিন এবং যেসব খবরের কাগজ তাঁর লেখা প্রকাশ করেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে জামাতের সমর্থকরা সহিংস আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবরের মধ্যে কিরকিরি শব্দ হতে শুরু হল। ধুত্তুরি বলে ঝ রেডিও বন্ধ করে দেন। ওঠেন তিনি যাবার জন্য, বলেন ভেতর থেকে যেন দরজা বন্ধ করে রাখি। দরজার তালা খুলে তিনি যদি ছোট্ট একটি মৃদু টোকা দেন, তাহলে বুঝতে হবে এটি ঝ, আমি তখন ভেতরে থেকে সিটকিনি খুলে দেব।
ঝ চলে গেলে বড় খালি খালি আগে। আবার আমি একা গোলাম আযমের মুখোমুখি। মনে হতে থাকে এই জিভ বেরিয়ে আসা কাঠের গোলামটিও বুঝি আমাকে দেখে হাসছে, আমার মৃত্যু হবে শীঘ্র, এই খুশি চিকচিক করছে চোখ দুটোতে। আমি মুখ ফিরিয়ে নিই, দুহাঁটুর মাঝখানে মাথাটি রেখে ভাবতে থাকি মৃত্যু কেমন দেখতে, মৃত্যু যখন হতে থাকে, তখন কেমন লাগে শরীরে, মনে! তখন কি আমি বুঝতে থাকবো যে আমি মরে যাচ্ছি! আমি কি বুঝতে পারব যে এই পৃথিবী থেকে চিরকালের মত আমি চলে যাচ্ছি, আর কোনওদিন আমি ফিরবো না, আর কোনওদিন কারও সঙ্গে আমার দেখা হবে না, আমি বলে কেউ কোথাও আর থাকবো না! চিনচিন একটি কষ্ট আমার বুক থেকে উঠে আসে ওপরের দিকে। ওপর থেকে আবার নিচে, কষ্ট আমার সারা শরীরে মহানন্দে ভ্রমণ করে।
মধ্যরাতে আমি জেগেই ছিলাম। ঝ এলেন, এমনি এলেন। দেখতে এলেন। বাড়িতে একটি নিষিদ্ধ জিনিস থাকলে এই হয়, বার বার দেখতে ইচ্ছে হয় জিনিসটি ঠিক আছে কি না। জিনিসটি নিয়ে দুশ্চিন্তা কখনও দূর হয় না।
ঝকে বসার জন্য অনুরোধ করলাম। কাতর অনুরোধ। একা এই ছোট্ট ঘরটিতে শিরশিরে মৃত্যুভয় নিয়ে কেবল নিজের নিঃশ্বাসের শব্দের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে জেগে থাকা ঠিক কী রকম বেঁচে থাকা তা আমি বোঝাতে পারি না তাঁকে। ঝ বললেন, বসে কেবল একটি সিগারেট খেতে পারেন। ঝ বসেন, একটি সিগারেটের জায়গায় দুটি খান। তাঁর চলে যাওয়ার পরও আমি চোখ বুজে ঝর অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করি। যেন ঝ কোথাও চলে যাননি, আছেন এঘরে, বসে আছেন আমার পাশে। কথা বলছেন না কিন্তু আছেন। আমি একা নই, কোনও ভূতুড়ে অন্ধকারে আমি একা বসে নেই, কিছু ঘটলে আজ রাতে, ঝ আমাকে ওই খোপে তুলে দেবেন। চোখ বুজে বসে থাকি এই অনুভবটি নিয়ে। চোখ খুললে যদি দেখি যে আমি একা, এই আশঙ্কায় চোখ খুলি না।
