২১-২৫. ভিন্ন গ্রাম হইলেও

একবিংশ পরিচ্ছেদ

ভিন্ন গ্রাম হইলেও নিকটেই সুকুমারের বাড়ি। তাদের অবস্থা আগে খুব ভালো ছিল। পুরোনো দালানখানি তার সাক্ষী। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া সুকুমার যখন অভাবে পড়া ছাড়িয়া দিতে চাহিয়াছিল,তখন রায়হান তাহার মাকে বলিয়াছিলেন–“খরচ আমি দিব।”

সুকুমার রায়হানকে শ্রদ্ধা করে। তার অন্তরের এই পূজা অর্থের জন্য কিছুতেই নয়।

পরের দিন সন্ধ্যাবেলা রায়হান সুকুমারদের বড়ি যাইয়া উপস্থিত হইলেন। ছোট পরিবার–তার মা আর একটা ছোট বোন, নাম সুষমা। সবে তার বিবাহের সূচনা হইয়াছে। সে বুদ্ধিমতি এবং বই পড়িতে পারে।সুষমা নত হইয়া রায়হানকে প্রণাম করিল। রায়হান কহিলেন, “মানুষ হইয়া মানুষের কাছে মাথা অবনত করতে নাই।” ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে অধিক শ্রদ্ধা দেখান ভালো দেখায় না।”

সুষমা জিভ কাটিয়া বলিল–“আপনাকে শ্রদ্ধা দেখান ভালো দেখায় না!”

রায়হান বলিলেন–“অধিকাংশ স্থলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর এই শ্রদ্ধা গোপন অসম্মানের সহিত গৃহীত হয়ে থাকে।”

“আচ্ছা, আপনাকে বাইরে শ্রদ্ধা জানাব না। অন্তরে আপনার চরণে নুয়ে পড়তে বাধা নাই।”

“বেশ”–একটু থামিয়া রায়হান জিজ্ঞাসা করিলেন–“আচ্ছা, যে কথা বলেছিলাম, তার কী হল”?

সুষমা বলিল–“কী কথা?”

“সেই বোন-পাতানোর কথা।”

“খুব রাজি–সত্যই করিমা আমার বোন। আমি তার সঙ্গে একেবারে এ হতে পারি–আহারে-আরে সব বিষয়ে।”

“সেরূপ বোন-পাতানোর কথা বলছি না।”

“তবে কিরূপ?”

“তুমি হিন্দু-হিন্দুই থাকবে। করিমা মুসলমান-মুসলমানই থাকবে। শুধু মনের মিল, আর কিছু নয়।”

“আপনার ভাই কে হবেন?”

“সুকুমারকে ভাই করিলাম।”

সুষমা। খুব ভালোই হবে।কিন্তু সব হিন্দু-মুসলমান কি আপনার কথা শুনবে? আপনি তো প্রত্যেক হিন্দু-মুসলমান পরিবারে, এই হিন্দু-মুসলমান প্রথাকে একটি অপরিহার্য সামাজিক সংস্কার করতে চান।”

“কেউ মানবে না তা জানি! বরং পাগল বলে উপহাসিত হবো। এটা আমার মনের গোপন ভাব এবং তা আমি সর্বসাধারণের কাছে প্রচার করতে যাচ্ছি না। আমি,করিমা, তুমি ও সুকুমার–এই চারজনের সঙ্গে এই প্রথার সম্বন্ধ।”

 “যদিও আমি বুঝি এবং আপনার কাছে কিছু কিছু শুনেছি তবুও আপনার এই প্রথা সম্বন্ধে নূতন করে বলুন।”

রায়হান বলিলেন–“দেখ সুষমা, কারো কাছে আমি আমার মত প্রচার করে বেড়াচ্ছি না। যে চিন্তা সহজভাবে খেলার মতো আমার মাথায় আসে তাই বলতে যাচ্ছি।” একটু নিস্তব্ধ থাকিয়া রায়হান হাসিয়া কহিলেন–“সুষমা, চিন্তার কথা শুনতে তোমার খুব উৎসাহ তা জানি!”

“দেখ, আমাদের দুই জাতির ভিতরে সদ্ভাব স্থাপনের পথ এইভাবে তৈরি করলে মন্দ হয় না। হিন্দু বা মুসলমান পরিবারে সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর নামকরণের সময় তার জন্য একটা ধর্ম-ভাই বা ধর্ম-বোন ঠিক করতে হবে। উচ্চ-স্তরের দশজনের চেষ্টায় এটাকে সকলে সামজিক রীতি বলে গ্রহণ করতে পারে। হিন্দু বালিকা মুসলমান ধর্ম-বোন গ্রহণ করবে,মুসলমান বালিকা হিন্দু ধর্ম-বোন গ্রহণ করবে। পুরুষদের সম্বন্ধেও একই কথা। তারাও ভিন্ন সমাজ হতে ভাই গ্রহণ করবে। কেউ কারো সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব সম্বন্ধ স্থাপন করে মৃত্যু পর্যন্ত এই বন্ধনকে সম্মানের চোখে দেখবে। দুই বিরুদ্ধ জাতির মধ্যে সখ্য স্থাপন অসম্ভব। বিবাহপ্রথা ছাড়া কোনো কালে বিভিন্ন সমাজের মধ্যে প্রণয় হয় নাই–অথচ হিন্দু মুসলমানের প্রণয় না হলে চলবে না। উভয়ের বাঁচবার পথ এই।

ঘরের ভিতর হইতে সুকুমারের মা বলিলেন–“তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গল্প করবে?”

রায়হান বারান্দায় যাইয়া উপবেশন করিলেন। সুষমা কহিল–“মা, আমার ইচ্ছে রায়হান ভাইকে খাওয়াই।”

সুষমার মা বলিলেন–“রায়হান যে খায় না?”

রায়হান কুণ্ঠায় কহিলেন–“দেখুন খুড়ি, আমি খাই না বলে আপনারা বোধহয় কষ্ট পান। যদি বুঝতেন মুসলমান হিন্দু বাড়িতে খেলে তার অসম্মান হয়, তাহলে আপনারা কিছু মনে করতেন না।”

সুষমা কহিল–“নগেনের উকিল সাহেবের ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল, সে সপ্তাহে একবার করে তাদের বাড়ি যেয়ে খেতো, আমি জানি, আপনি খাবেন না তাই বলুন।”

“নগেনের কথা বাদ দাও। অনেক হিন্দু অনেক কিছু করে। আমি তা ভালবাসি না। সে যা সে তাই থাক। হিন্দু সে হিন্দুর মতো থাকবে। অনেক হিন্দু কলকাতায় অবৈধ জিনিস কিনে খায়, সে কি ভালো?”

কিছুক্ষণ পরে সুকুমারের মা সুষমাকে সোজাসুজি দূরে যাইতে না বলিয়া বলিলেন–“মা, তোমার দাদার ঘরে যেয়ে একটু পড়ে এসো। এক্ষুনি আবার রান্না করতে যেতে হবে।”

সুষমা উঠিয়া দাঁড়াইয়া রায়হানকে কহিল–“রায়হান ভাই, যাবার সময় না বলে যাবেন না।”

সুষমা চলিয়া গেল তার মা রায়হানকে বলিলেন–“বাবা রায়হান, সুষমার বিয়ে তোমাকেই ঠিক করতে হবে। এই জন্যই তোমাকে ডেকেছি। সুকুমার বিদেশে থাকে। তার কাকারা মেয়ের বিয়ে সম্বন্ধে একেবারে উদাসীন।”

রায়হান–“সুষুমাকে তো বিয়ে দেওয়াই দরকার।”

“যদু বাবুর ছেলে তো বি-এ পাশ করেছে!”

“নিশি!–সে ছেলে মন্দ নয়! তবে তার মাথায় কতকগুলি পাগলামি ঢুকেছে। সে কোনো গুরুর মন্ত্র নিয়েছে। মাছ-মাংস খায় না। বিয়ে করে তার স্ত্রীকে নাকি ব্রহ্মচারিণী রবে।”

রায়হান হাসিয়া বলিলেন–“পাছে পিপীলিকার ঘাড়ে পা লাগে এই ভয়ে সে গাছের ডালে এক ঘর বেঁধে সেখানেই বাস করে। তার আর এক উদ্দেশ্যে পাখির সরলতা অনুকরণ করা। সে বলে–সংসারের সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ নাই। সমস্ত বিশ্বের মানুষ অন্ধকারে পড়ে আছে–সে সকলকে তার আলোকে টেনে তুলবে! সারাদিন সে চোখ বুজে বসে থাকে–পাপ পৃথিবীর পানে সে তাকায় না। দুঃখেই ভগবানকে নাকি পাওয়া যায়, এই জন্য সে সেই উচ্চস্থান থেকে মাটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে।

বিস্ময়ে সুষমার মা বলিলেন–“নিশির এই অবস্থা হয়েছে? থাক দরকার নাই। আমার ইচ্ছা তুমিই পছন্দ করে সুষমাকে বিয়ে দাও।”

সুষমার বিবাহ ব্যাপার, জমাজমি সংক্রান্ত কতকগুলি পরামর্শ, সুকুমারের ভবিষ্যৎ জীবন সম্বন্ধে কথা কহিয়া রায়হান বাড়ির দিকে চলিলেন।

.

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

রায়হানের বাড়ি হইতে বেশি দূরে নয়, ওমেদপুরের উত্তর পাড়ায় দুঃখিনী মসুর মা বাস করে। চোখ খোলা থাকিলেও সে কিছু দেখিতে পায় না। শুধু অভ্যাসের জোরে গ্রামের পথ দিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়।

মসুর মা এককালে যুবতী বধু ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল তমিজ। ত্রিশ বৎসর বয়সের সময় দুইটি পুত্র ও একটি কন্যা রাখিয়া সে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর মসুর মা তার দুই বিধবা বোনকে নিজের বাড়িতে লইয়া আসিয়াছিল। তিন বোনের মধ্যে মসুর মা ই বড়। কুড়োনের মাও ছুটু ছিল মেজো এবং সেজো। বাড়িতে পুরুষ মানুষ না থাকায় সাহায্য ও সাংসারিক ভরসার আশায় বড় বোনের অনুরোধে ছটুকে এক নয়–দুই নয়–পাঁচ পাঁচটা বিবাহ করিতে হইয়াছিল; কিন্তু একটা স্বামীও টিকিল না।

।কুড়োনের মাও স্বামী গ্রহণ করিয়াছিল কিন্তু সকলগুলিই বিবাহের যথাক্রমে ১ মাস, ৩ মাস এবং এক বৎসর পরে কোথায় গিয়াছিল, তা কেউ বলিতে পারিত না।

মসুর মা পুনরায় আর বিবাহ করে নাই। দুটি ছেলের মুখেই সে তার স্বামীর ছবি দেখিত।

খাবারের অভাব তো তাদের ছিল না। যা দুই বিঘা জমি ছিল তাতেই তাদের চলিত। বাড়িতে দুইটি গাভী ছিল। আমগাছের আম আর বাড়ির গরুর দুধ তাহারা তৃপ্তির সহিত পেট ভরিয়া খাইত।

তাহার পর একদিন দুই দিন করিয়া অনেক বছর কাটিয়া গিয়াছিল। হঠাৎ একদিন কলেরায় দুটি বোন এবং সেয়ানা মেয়েটি মরিয়া গেল। রহিল মসুর মা আর তার দুইটি জোয়ান ছেলে।

শেষ বয়সে একদিন মসুর মা বুছিল সংসারে সে একা। নিঃসহায় দুঃখময় তার জীবন। বুক তার ভাঙ্গিয়া গেল। মসু চরিত্রহীন হইয়া, মায়ের কথা একটুও না ভাবিয়া কোথায় চলিয়া গেল। এক এক বছর পরে ছোট ছেলেটিও দুই দিনের জ্বরে তার বোনদের মত অন্তঃশয্যা গ্রহণ করিল।

বৃদ্ধ বয়সে বেদনা শোকে ক্ৰমে মসুর মার শরীর ভাঙ্গিয়া পড়িল। সে একা–নিঃসঙ্গ। তার জীবন বড় বেদনাভরা হইয়া উঠিল।

ঘরের পার্শ্বে আমগাছতলায় তার অতি প্রিয়তম ছোট ছেলে এবং মেয়ের কবর দুটি পাশাপাশি হইয়া পড়িয়াছিল।

সন্ধ্যা যখন বিশ্বে নামিয়া আসিত, মৃদু অন্ধকারে গ্রামের পথে পথে যখন মশকদল বেদনার গান গাহিত, যখন বাড়ি গোয়ালঘরের সম্মুখে কত বছরের বেদনা-স্মৃতি লইয়া সাজালগুলি জ্বলিয়া উঠিত, দারিদ্র গ্রাম্য লোকগুলি উঠানে বসিয়া কত সুখ-দুঃখের গল্প করিত, তখন মসুর মা অন্ধকারে সেই আমগাছতলায় বসিয়া আর্তক্রন্দনে সন্ধ্যা-গগন মুখরিত করিয়া তুলিত। তখন গ্রামের পথগুলি তার করুণ শোকগাথায় মূৰ্ছিত হইয়া পড়িত।

মসুর মার বাড়ির পার্শ্বে এক ঘর মুসলমান সুদখোর মহাজন পরিবারের বাস। তাহাদের অনেক জমাজমি ছিল। জনহিতকর কার্যে তাহাদের কোনো সহানুভূতি ছিল না। মসুর মা তাহাদের প্রজা।

একদিন তাহাদের বড় মিঞা মসুর মাকে ডাকিয়া লইয়া বলিলেন, “দেখ মসুর মা, তুই এখন একা, এত বড় বাড়িখানি দিয়ে এখন আর কী করবি। আমার প্রাচীরটা একটু বাড়ান দরকার। তোর ভিতরের বন্দোবস্ত জমিগুলিও ছেড়ে দে। একা মানুষ, করিম মোল্লার বাড়িতে যেয়ে থাক, ঘর বাঁধবার যা খরচ লাগে তা আমি দেবো”।

মসুর মা আর কী বলিবে?–সে ভবিয়াছিল জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলি আম গাছের তলার দিকে চাহিয়া চাহিয়া কাটাইয়া দেয়, গত জীবনের হাজার স্মৃতি তার বাড়িখানিকে আঁকড়িয়া ধরিয়া আঁখিজলের সহিত সে বেচিয়া খাইবে।

সে দেখিল আঁখিজলের ভিতরেও এতটুকু খোঁজবার অধিকার তার মতো ছোটলোকের নাই। পরের অনুগ্রহে পালিত হওয়াই হবে এখন তার সব দুঃখের প্রতিদান।

বৃদ্ধা আস্তে আস্তে কহিল–“আমার কোনো আপত্তি নাই!” সে কথা বলা ছাড়া তার আর উপায় ছিল না। মসুর মা কয়েকদিনের মধ্যেই করিম মোল্লার বড় ঘরের পাশে একখানা কুঁড়েঘর তুলিয়া লইল। তাহার পর আরও কয়েক বছর কাটিয়া গেল। ক্রমে চোখ দুটি তার নষ্ট হইয়া গেল। বাড়িতে বাড়িতে লাঠি লইয়া ছায়াময় দৃষ্টির সাহায্যে দুইটি অন্নের জন্য সে ঘুড়িয়া বেড়াইত। সাবেক মুনিব বড়মিঞার বাড়িতে সে অনেক সময় যাইত। বড়মিঞার পুত্রবধূ বুড়ির দুঃখ সাধ্যমত দূর করিতে চেষ্টা করিত। পুরোনো কাপড়, মাথার তেল, কখনও পেটে খিদে নাই বলে চুপে চুপে ভাত-তরকারি মসুর মা কানিকে দিত। মাঝে মাঝে মসুর মা মুনিব বাড়ির ইন্দারায় তার কাঁধা ভাঙ্গা মেটে কলসিটা কাকে নিয়ে জল আনিতে যাইত। চঞ্চল হাসিমুখ বৌটি বুড়ির অজ্ঞাতসারে তার কলসিটি নিয়া লুকাইয়া রাখিয়া দিত। অন্ধ বুড়ি উপুড় হইয়া যখন এখানে ওখানে কলস হাতড়াইত, তখন বালিকা হাসিয়া খুন হইত। পাড়ার বৌ-ঝিদের ভুক্তবিশেষ, পোড়া-পচা পান্তা ভাত মসুর মা আগ্রহের সহিত গ্রহণ করিত।

আমকালে যখন তার আম খাইবার সাধ হইত, তখন সে কোনো ভদ্রগৃহে যাইয়া তাহাদের ফেলিয়া দেওয়া ছোবড়াগুলি চুপে চুপে, কুড়াইয়া লইয়া চুষিয়া খাইত। কেউ যদি কোনোদিন পিঠে প্রস্তুত করিত, মসুর মা কোনো রকমে জানিতে পারিলে, সে সেদিন বিনা আহ্বানে তাহাদের পানি তুলিয়া এটা-ওটা করিয়া দিতে চেষ্টা করিত। দয়া করে তারা তার হাতে একখানা পিঠে দেবে, এই আশায় সেদিন তার কোনো জায়গায় আহার হইত না। সেদিন সে সাঁঝের বেলা তার বন্ধু সেই বালিকা-বধূর কাছে যাইয়া দাঁড়াইত। সাঝের মৃদু অন্ধকারে সকলের অগোচরে কানাবুড়ি কি যেন সুদখোর মহাজনের বাড়ি হইতে আঁচলে ঢাকিয়া লইয়া যাইত।

একদিন বর্ষাকালে তার বন্ধু সেই বৌটি তাকে না বলেই বাপের বাড়ি চলিয়া গেল। বুড়ি তার আশায় মাসের পর মাস কাটাইয়া দিয়াছিল কিন্তু আর সে আসিল না।

সুকুমারদের নিকট হইতে রায়হান বাড়িতে আসিয়া সকলের শেষে ভাত খাইতেছিলেন। তাঁর চাচি পার্শ্বে বসিয়া খাওয়াইতেছিলেন। চাচি খাবার মাঝে কহিলেন–“বাবা রায়হান, তোর মা ছোটকালেই মরে গেছেন। মা হলেও আমি, চাচি হলেও আমি। একটা কথা–“।

রায়হান কহিলেন–“কী কথা মা?”

“তোমার ফুপুর মেয়ে সেয়ানা হয়েছে। তার তো বিয়ে না দিলে চলছে না।”

“তা তো ঠিক! সেয়ানা মেয়েকে বিয়ে না দেওয়া ভালো নয়।”

“তোমার ফুপো–মেয়ে ছোট থাকতেই মারা গেছেন। কিছু সম্পত্তি ছিল তাই রক্ষা। ওকে কোথায় বিয়ে দেই? তাদের মুরব্বি তো আমি এবং তোমার বাবা। তোমার বাবা সেখানে গতকাল বেড়াতে গিয়েছিলেন। তোমার ফুপু অনেক কাকুতি-মিনতি করে একটা কথা বলে দিয়েছেন। তার ইচ্ছে হাসিনাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেন।”

কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া রায়হান কহিলেন–“সে ভালো কথা। তারা যদি এতে ভাবনার মধ্যে পড়ে থাকেন তা হলে আগে বল্লেই তো হতো। অনেক আগেই আমি বিয়ে কত্তাম।”

“বাবা মেয়ে সেয়ানা–অর্থ নাই–গুণ নাই–বিদ্যা নাই, একটা কথাও জিজ্ঞাসা না করে তুমি রাজি হয়ে গেলে। এটা কি তোমার ঠিক কথা, না উপহাস?”

“একটুও উপহাস নয়–মুসলমান ছাড়া অন্য জাতি নয় তো। অশিক্ষিতা মেয়েমানুষের সঙ্গে বাস করা কঠিন হলেও আমার পক্ষে কোনো অসুবিধা হবে না। বয়সকালে মেয়েদের মন কোমল থাকে, সহ্য করে উন্নতি করতে চেষ্টা করলে অতি সহজেই তারা উন্নত হয়। ধৈর্য না থাকলে এবং অসদ্ব্যবহারে, ভালো স্ত্রীলোকও খারাপ হয়ে যায়। নিজের স্ত্রী যে হবে তাকে শিক্ষিতা ও বড় করতে বেশি দিন লাগে না।”

“বড় ঘর নয় বলে তোমার বাবা রাজি হতে নাও পারেন।”

“ঐটা ভয়ানক অন্যায় কথা–মানুষ বড় হবে জ্ঞানে। বিয়ে করে বড় হতে চেষ্টা খেলো মানুষের কাজ। কোনো বড়লোকের সঙ্গে আত্মীয়তা করে নিজের হীনতাকে স্পষ্ট করে তোলা কি ভালো?”

রায়হানের চাচি সন্তুষ্ট হইলেন।

অনেকক্ষণ পরে চাচি বলিলেন–“আজ কদিন মসুর মা আসে না। শুনলাম তার ব্যামো হয়েছে। বেচারা কী খায়! করিমের মা নাকি তাকে খুব জিল্লতি করে।”

রায়হান কথা কহিল না। রাত্রি হইয়া গিয়াছিল বলিয়া সে খাইয়াই তাড়াতাড়ি দোকানঘরে চলিয়া গেল।

দোকানে যাইয়া প্রদীপটা জ্বালিয়া রায়হান একখানি মাসিক লইয়া বসিলেন। থাকিয়া থাকিয়া মনটা যেন বই ছাড়িয়া বাজে চিন্তায় ভরিয়া উঠিতেছিল। বাতি নিভাইয়া রায়হান শুইয়া পড়িলেন। সহজে নিদ্রা না আসাতে জানালা খুলিয়া অন্তহীন মাঠের দিকে তিনি চাহিয়া রহিলেন। কী গম্ভীর নৈশ আকাশ-প্রকৃতির ছায়াময় মূর্তি। রায়হান ভাবিতেছিলেন–আহা, মানুষের কী দুঃখ!

প্রায় দেড় ঘণ্টা হইয়া গেল তবুও রায়হানের ঘুম হইল না। ক্রমাগত এপাশ ওপাশ করিতেছিলেন। তাহার পর সহসা বিছানা হইতে উঠিয়া পড়িলেন। খাটের নিচে একটা। টুকরি ছিল। কতকগুলি চাল, আধসের ডাল, কিছু লবণ, খানিকটা হলুদ, ছোট একটা। শিশিতে খানিক তেল লইয়া হারিকেন হাতে করিয়া রায়হান বাহির হইয়া পড়িলেন।

রায়হান কয়েক মিনিটের ভিতর একটা ছোট কুটিরের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। মৃত্যুর কাল রেখা কুটিরখানির চারিদিকে ঘিরিয়া ছিল।

রায়হার বাহির হইতে ধীরে ধীরে ডাকিলেন–“মসুর মা?”

ভিতর হইতে একটা অনশনক্লিষ্ট দুর্বল স্বর উত্তর দিল।

রায়হান কহিলেন ”দরজা খোল।”

কষ্টে দরজা খুলিয়া মসুর মা বাতির আলোকে অস্পষ্টভাবে দেখিল–রায়হান।

সে জিজ্ঞাসা করিল–“বাবা রায়হান, এত রাত্রে কী মনে করে? আমার তো ঘুম নাই। বাপ। অনেক দিন হল, মিঞাদের ইন্দারায় পানি আনতে গিয়েছিলাম। পাখানা ভেঙ্গে গিয়েছিল। বড় লেগেছিল”।

তাহার পর ব্যস্ত হইয়া আস্তে আস্তে ময়লা কথাখানা পাতিয়া দিয়ে কহিল–“বসো, বাবা, বসো।”

চালের টুকরি মাটির উপর রাখিয়া রায়হান কহিল–“মসুর মা! কিছু চাল এনেছি, এগুলি তুমি নেও”।

“কেন বাবা–কেন বাবা–চালের দরকার কী?” বলিয়া বুড়ি রায়হানের হাতখানি বুকের কাছে টানিয়া লইয়া কাঁদিয়া ফেলিল।

.

এয়োবিংশ পরিচ্ছেদ

প্রাতঃকালে পিয়ন কাগজ ও অন্যান্য চিঠির সহিত একখানা রেজেষ্ট্রি দিয়া গেল। আগ্রহের সহিত সেখানা খুলিয়া রায়হান পড়িয়া দেখিলেন তাহাতে লেখা আছে–

১৫/৭ সার্কুলার রোড, কলিকাতা।
প্রিয়তম ভ্রাত,
জীবনের গভীর দুঃখের কথা তোমাকে বলতে আমার এতদিন সাহস হয় নাই। চিরকালই ভিতরে ভিতরে একটা বিশ্বাস পোষণ করিয়া আসিয়াছি, তুমি বড় নীরস–আত্মা তোমার স্থবির–শুষ্ক, কঠিন এবং মরুময়। তবুও তোমায় আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখি।

বিশ্বাস ও আশা ছাড়া মানুষ বাঁচে না। জীবনে এমন কোন ঘটনা ঘটিতে পারে, যাহাতে মানুষের মন ছিন্নভিন্ন হইয়া যায়। বাহিরে লোকের কাছে তাহা উপহাসের জিনিস। তুমি উপহাস ও তাচ্ছিল্যের ভাবে গ্রহণ করিবে না–এই বিশ্বাসে আমি বলিতেছি, আমার জীবনে এরূপ কোনো ঘটনা ঘটিয়াছে।

সত্যই কি তুমি নীরস? আত্মা তোমার মরুময়? লক্ষ মানুষের প্রচলিত জীবন ধারা, লক্ষ আত্মার পুণ্য মধুকল্পনা ও স্বপ্নকে কি তুমি ঘৃণার চোখে দেখ? তাহা হইলেও আমি আজ তাহা ভুলিয়া যাইব। আজ মানিয়া লইব আমার মতো অনন্ত দুর্বল মানুষের বন্ধু তুমি, ভাই তুমি।

কণ্ঠ আমার শব্দহীন হইয়া উঠিতেছে–লেখনী যেন অবশ হইয়া আসিতেছে, তবুও বলিয়া পারিতেছি না।

আমি কি তা জানি না–ভালো কি মন্দ তাহাও বুঝি না। পড়াশুনা আমার সব মাটি হইয়া যাইতেছে। চতুর্থ বৎসরের বড় বড় বইগুলি লইয়া কলেজে আসা-যাওয়া করি মাত্র। অধ্যাপক যখন বক্তৃতা দেন, তখন তার মুখের পানে শুধু চাহিয়া থাকি।

স্কুলের জীবনে কখনও ভাবি নাই, এমন কিছু সম্ভব। যখন স্কুলের জীবন শেষ হইয়া আসিল তখন জীবনের সম্মুখে এক নূতন পথ খুলিয়া গেল। প্রথমে উপেক্ষা করিয়াছিলাম, এখন দেখিতেছি এই পথ অতি ভয়ানক। সেই পথের শেষ প্রান্তে দেখিয়াছিলাম এক বালিকা মূর্তি–সে আমেনা।

সেই মিলাদ শরিফের দিন জোছনার আলোক অভিনব বেশে দেখিয়াছিলাম সেই বালিকাকে। আমরা শিরায় শিরায় যেন একটা তড়িৎ প্রবাহ ছুটিয়াছিল। আমার শক্তি ও মনের অবহেলা উপেক্ষা করিয়া সে শত ভাবে আমার সম্মুখে দাঁড়াইয়াছিল। তবুও তাহার সম্মুখে তখন আমি শক্তিহীন হইয়া পড়ি নাই মনে করিয়াছিলাম তাহাকে বিবাহ করিব, কিন্তু যে কারণেই হউক তাহা হয় নাই। আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত ছিলাম। মা ছাড়া কাহারও কাছে জীবনের এই কথা ভালো করিয়া ব্যক্ত করিতে সাহস পাই নাই!

ধীরে ধীরে বালিকা-রানী এই দীর্ঘ চারি বৎসরের চেষ্টায় আমাকে একেবারে মুহ্যমান করিয়া তুলিয়াছে। দেহমন সব শক্তিহীন হইয়া পড়িয়াছে। কোনো আশা নাই–তবুও অহর্নিশি আত্মা আমার অবুঝ শিশুর মতো সেই ছোট বালিকাটির কথাই ভাবে।

মনে মনে তর্ক করিয়াছি–এ সবই ভুল–দেহকে ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছু নয়। অনেকবার মনকে বিদ্রোহ করিয়া তুলিতে চেষ্টা করিয়াছি। কিন্তু সকল মীমাংসা মুহূর্তের মধ্যে চূর্ণ হইয়া গিয়াছে।

একটা মানুষ আমাকে এমন করিয়া শক্তিহীন করিতে পারে, একথা ভাবিতেও আমি মাঝে মাঝে লজ্জিত হই। কারণ খুঁজিয়া পাই না–তবুও ভাবি এটা কী? খোদা জানেন।

নির্জনে যখন থাকি তখন ভাবি–তারই কথা। বাতাসের মাঝে তারই অস্তিত্ব অনুভব করি। জোছনামাখা আকাশের পানে তাকাইয়া ভাবি মিথ্যা আমার জীবন সংসারের আলো-বাতাস আমার কাছে নিরর্থক। বিশ্বের সম্পদ একটা বিরাট আবর্জনাস্তূপ। আমি নিঃসহায়!–শুষ্ক বেদনা লইয়া এই দীর্ঘ জীবনটাকে টানিতে হইবে! সে কতদিন–কত বছর। দুঃখভরা দারুণ ব্যর্থতা।

যদি মানব সমাজ ছাড়িয়া তাহাকে লইয়া সমুদ্রগর্ভে থাকিতে হইত তাহাতেও আমি খুশি হইতাম।

এই জ্বালা কীসে নিবৃত্ত হইবে জানিতে চাই। সংসারের সকল আসক্তি নিবিয়া গিয়াছে। কী বিস্ময়–সেই বালিকাকে তো আর পাইবার আশা নাই, তবুও এ দুঃখ কেন! যে দুঃখের শেষফল শুধু হাহাকার ও বেদনা, সে দুঃখের এত অত্যাচার কেন?

তার রূপ শত গরিমায় মনের পটে ভাসিয়া উঠে। চোখের সম্মুখে সে সদা খেলিয়া বেড়ায়। তার হাসি কী ভয়ানক ও জ্বালাময়!

কয়েকদিন আগে ইচ্ছা হইয়াছিল বর্ধমানে যাইয়া তাহাকে দেখিয়া আসি। কিন্তু কী উপলক্ষ্য করিয়া তাহার সহিত দেখা করিব? আমি তো আর কেউ নই। তার স্বামীর সঙ্গেও আমার দেখাশুনা নাই।

একটা বড় আশ্চর্য কথা–বিবাহের পর আমেনা তো একবারও বাড়িতে আসিল না।

আমেনা–মহারানী আমেনা-দেবী, গরিমাময়ী–যাহার চরণস্পর্শ করিয়া মাটি ধন্য হয়–যাহাকে বিবাহ করিয়া সারা জীবন ভিখারির বেশে দ্বারে দ্বারে ঘুরিলেও ক্ষতি হয় না,–সে কোথায়?

প্রিয়তম ভাই–শক্তি ও সান্ত্বনা চাই–আমাকে পথ দেখাও–তোমার পত্রের জন্য উদগ্রীব হইয়া রইলাম।

.

চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ

রায়হান চিঠি পড়িয়া একেবারে স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। তাহার ললাট স্বেদসিক্ত হইয়া উঠিল। ধমনীতে উষ্ণ রক্তস্রোত আরও উষ্ণ হইয়া উঠিল।

পত্রখানি বাম হস্তে তুলিয়া লইয়া রায়হান দক্ষিণ হস্ত দিয়া তাহা দুই ভাগ করিয়া ফেলিলেন। তাহার পর ডেস্ক হইতে চিঠির কাগজ বাহির করিয়া লিখিলেন।

১৭/৭
ওমেদপুর

প্রিয় হামিদ! তোমার পত্র পাইয়াছি। জীবনে যে এমন পত্র পড়িতে হইবে ইহা কখনও ভাবি নাই। পরস্ত্রীর রূপ লইয়া ঢলাঢলি করিতে কে তোমাকে শিক্ষা দিয়েছে? তস্করের ন্যায় পর রমণীর কথা ভাবিতে একটুও লজ্জা বোধ হয় না? বস্তুত তোমার পত্রে আমি যারপরনাই দুঃখ পাইয়াছি। ক্রোধ ও ঘৃণা যুগপৎ আমাকে বেড়িয়া ধরিয়াছে। হীন প্রকৃতির লোক ছাড়া এমন গোপন ব্যভিচার করিতে কেউ সাহস পায় না। তুমি আমাকে অত্যন্ত বেদনা দিয়াছ। বিধাতার বিধানের বিরুদ্ধে দাঁড়ান কী প্রকার মনুষ্যত্ব বুঝিতে ইচ্ছা করে না।

০ ০ ০ ০

ডাকঘরে পত্র দিয়া রায়হান যখন ফিরিয়া আসিলেন তখন দুপুর। তখনও তাহার খাওয়া হয় নাই। চিত্তা তাহার বড় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিল, বুকের ভিতর রক্তপ্রবাহ বিক্ষুব্ধ। তরঙ্গের মতো আছাড় খাইয়া পড়িয়াছিল। তীব্র উজ্জ্বল সূর্যকিরণমাথা আকাশের পানে রায়হান চাহিয়া দেখিলেন–আঃ!

পথ ধরিয়া একখানা পাল্কি আসিতেছিল। রায়হান বিস্ময়ে দেখিলেন সঙ্গে কেউ নাই। বাহকদিগকে রায়হান জিজ্ঞাসা করিলেন–“পাল্কি আসছে কোথা হতে?”

”জে আজ্ঞে–এই স্টেশন থেকে।”

“সঙ্গে কেউ নাই?”

“জে না!”

“কোথায় যাচ্ছ?”

“খোরশেদ মিঞার বাড়ি–তার ভগ্নি বর্ধমান থেকে এলেন। আমরা তো আর পর নই–দোষ কী, কেউ না থাকলে”?

রায়হান বজ্রাহতের ন্যায় সেখানেই দাঁড়াইয়া রহিলেন! পাল্কি চলিয়া গেল।

দোকানে না যাইয়া রাস্তা হতেই বুকের ভিতর একটা দারুণ আশঙ্কা লইয়া রায়হান খোরশেদের বাড়ির দিকে ছুটিলেন।

খানিক পথ চলিয়া শুনিলেন কে যেন আর্তস্বরে কাঁদিতেছে!

বাহকেরা বাহির-বাড়িতে টাকার জন্য অপেক্ষা করিতেছিল। রায়হান পকেট হইতে তাড়াতাড়ি দেড়টি টাকা দিয়া তাহাদিগকে বিদায় করিয়া দিলেন। তাহার পর একেবারে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করিলেন।

সম্মুখে আমেনা–মূর্তিমতী করুণা–রায়হানকে দেখিয়াই সে মূৰ্ছিতা হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল।

.

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ

বিপুল লাঞ্ছনা ও অসম্মানের স্বামী কর্তৃক বর্জিতা জন্মের মতো আমেনাকে ফিরিয়া আসিতে হইয়াছে। তার হীন ও অর্থলোভী শ্বশুর পুত্রবধূকে একাকী বিধবার বেশে পথে তুলিয়া দিয়াছিল। খোরশেদের দুর্ব্যবহারের প্রতিশোধ বধূকে লাঞ্ছিতা করিলেই সিদ্ধ হইবে এইরূপ নজির মিঞা ভাবিয়াছিল।

এনায়েত বধূর অপমানে সন্তুষ্টই হইয়াছিল। পিতা পুত্রকে অনেক টাকা ব্যয় করিয়া নূতন এক রূপবতী কন্যার সহিত বিবাহ দিবেন, ইহাও সে শুনিয়াছিল।

আমেনা ইদানিং কথা বলি না। হৃদয়ের সীমাহীন দুঃখ সে সযতে বুকের ভিতর লুকাইয়া রাখিত। যেদিন তাহাকে চরিত্রহীনা বলা হয় সেদিন হইতে সে মৌন হইয়া গিয়াছিল।

বিবাহ জিনিসটাকে স্ত্রীলোকের স্বভাব অনুযায়ী সে বাল্যকলে অনেকখানি রং লাগাইয়া ভাবিত। যখন সংসারে প্রবেশ করিয়া অপরের বধু হইয়া আনন্দ খুঁজিতে সে একটা ব্যাকুল হইয়াছিল, তখন ভাগ্য তাহাকে দিয়াছিল অমৃতের পরিবর্তে বিষ-সুখের পরিবর্তে জ্বালাময় কন্টক এবং সীমাহীন সঙ্কীর্ণতা।

বাড়ি আসিয়া কয়েকদিন অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। খোরশেদ বাড়িতে টাকা পাঠায়, বাড়িতেও আসে না। সে তার ভগ্নির অপমানের কথা শুনিয়া মায়ের কাছে উত্তর লিখিয়াছে–স্বভাবদোষে আমেনা বর্ধমানে টিকিতে পারে নাই।

অতি আপনার জনের মতো সেদিন রায়হান আসিয়া আমেনাকে বলিয়া গিয়াছে–খোদার বিধানকে মাথায় পাতিয়া লইতে হইবে, উহাতেই জীবন ও আত্মার মঙ্গল। উহাকে দুঃখ প্রকাশ করা ভুল।

আমেনা তাহার গুরুর কথায় শান্তিলাভ করিয়াছে। কিন্তু একদিন অতীত জীবনের করুণ চিন্তা আসিয়া তাহাকে ব্যথিত করিয়া তুলিয়াছিল। তাহার আঁখিপল্লব সিক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। যদি তাহার বর্ধমানে বিবাহ না হইত, তাহার জীবনধারা যদি অন্যভাবে বহিত!

রায়হান তার গুরু। কয়েক বছর আগে সে যখন রায়হানের প্রতিভা-মণ্ডিত উজ্জ্বল চক্ষুর সম্মুখে বসিয়া বক্তৃতা শুনিত, তখন তার বালিকা-চিত্ত একটা কথা ভাবিত–যা সে কাহারও কাছে বলিতে সাহস পাইত না।

মায়ের অসীম স্নেহ-রায়হানের গভীর অকৃত্রিম সহানুভূতি তাহাকে আবার হাস্যময়ী করিয়া তুলিয়াছে। সে তার গত অপমানের কথা ভুলিতে পারিয়াছে।

রায়হান যখন তার মাকে সালাম করিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করে–কেমন আছ? আমেনার তখন ইচ্ছা করে রায়হান ভায়ের পায়ের কাছে নত হইয়া বলে আপনার আশীর্বাদে ভালো আছি। তার গুরু রায়হান ছাড়া অমন করিয়া এতকাল পর্যন্ত কেউ জিজ্ঞাসা করে নাই, সে কেমন আছে। এমন সরলতা, এমন সহানুভূতি সে কোথায়ও দেখে নাই। তার গুরুর উপর তার ভক্তি বেশি করিয়া বাড়িয়া উঠে।

একদিন বৈকাল বেলা নাফিসা রায়হানকে ডাকিয়া কহিলেন, বাবা, তোমার। বোনকে একটু কোরান পড়াতে পার? শুধু মতন পড়তে পারলেই হবে না। ব্যাখ্যা ও ভাবসহ কোরানের বাণীগুলি আলোচনা করবে। তার মনের উন্নতি হোক, খোদার উপর সে বেশি করে নির্ভর করতে শিখুক।

রায়হান কহিলেন–আপনার প্রস্তাবে আমি খুশি হলাম। তার মনের উন্নতি যথেষ্ট হয়েছে, আরও হবে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে একটা সেলাইয়ের কল কিনে দিতে চাই। ভদ্রঘরের মেয়েদের জন্য অনেক বিষয় চিন্তা করতে হবে। আর কিছু না হোক উপার্জিত অর্থ দিয়ে দীন-দুঃখীর দুঃখ দূর করা তো যাবে।

“একটা যন্ত্রের দাম দেড়শ টাকার কম নয়। খোরশেদ এক পয়সা দেয় না। ষাট টাকার ধান বিক্রি হয়েছিল, তাই দিয়ে বাজার চলছে।”

‘টাকার কথা আপনাকে ভাবতে হবে না। শুধু অনুমতি চাই।”

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *