হানা বাড়ীতে গোপাল ভাঁড়

হানা বাড়ীতে গোপাল ভাঁড়

তার পরদিন দাদু এসে বৈঠকখানায় বসতেই পেঁকো, লাল্টু বল্টু, পল্টু আর মিনি, বিনি এসে দাদুকে ঘিরে বসলে, তারপর সবাই বললে—দাদু, একটা গল্প বল।

দাদু— বলেলে— তাহলে আজও তোদের গোপাল ভাঁড়ের গল্প বলব।

—শোন তাহলে। দাদু গল্প বলতে শুরু করলে।

চৈত্র মাসের শেষাশেষি গোপালের মেয়ের বাড়ী থেকে একখানি চিঠি এলো।

চিঠিখানা পড়ে তো গোপালের চক্ষুস্থির! বেয়াই মশায়ের খুব অসুখ, গোপালকে যেতে লিখেছে।

গোপালের গিন্নী বললে— একবার যাও না বাপু! বুড়ো মানুষ, ; কখন কি হয় বলা যায় না। যদি মরে টরে যায় তাহলে আর দেখা হবে না। কুটুম বাড়ী। সবাই নিন্দা করবে।

গিন্নীর আগ্ৰহ দেখে গোপাল অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়ের বাড়ী যাবার জন্য তৈরী হলো।

যখনকার কথা বলছি, তখন রেলগাড়ী ছিল না। কোথাও যেতে হলে পায়ে হেঁটে, কিংবা গরুর গাড়ীতে অথবা নৌকায় যেতে হতো।

গোপাল হেঁটে যাবার জন্য প্ৰস্তুত হলো।

পরের দিন সকাল সকাল স্নান করে ভাত খেয়ে গোপাল বেরিয়ে পড়লো মেয়ের বাড়ীর উদ্দেশ্যে।

মেয়ের বাড়ী ছিল বারো ক্রোশ দূরে। এতখানি পথ হেঁটে যাওয়া মুখের কথা নয়।

একে তো গোপাল ছিল নাদুস-নুদুস ভুঁড়ি ওলা বেঁটে মানুষ। তার উপর গিন্নী মেয়ের জন্য নানা জিনিস জোগাড় করে পুটুলী বেঁধে দিয়েছে। সেই পুটুলী নিয়ে পথ চলতে গোপালের বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু কি করবে। আস্তে আস্তে হাঁটছিল।

কিছুদূর হাঁটে আর কোন গাছতলা দেখলেই তার তলায় বসে বিশ্রাম নেয়। এই ভাবে ক্রোশ চারেক পথ পার হতেই তার দুপুর গড়িয়ে গেল।

কোনক্রমে আরও ক্রোশ তিনেক পথ পার হতে গোপাল গলদঘর্ম হয়ে পড়লো। সামনে ছিল একটা বিরাট বটগাছ। গোপাল ক্লান্ত হয়ে তার তলায় গিয়ে বসলো।

গাছে হেলান দিয়ে বসতেই বটগাছের ঠাণ্ডা বাতাসে তার শরীর যেন জুড়িয়ে গেল। শ্ৰান্তিতে দু’চোখ জুড়িয়ে এলো তার। ঘুমিয়ে পড়লো গোপাল।

কতক্ষণ সে ঘুমিয়েছিল তার হুস নেই, হঠাৎ একটা দমকা বাতাসে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে বসে দেখলে, সূৰ্য্যদেব পাটে বসেছে। গোপাল তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলো।

এমন সময় পশ্চিম আকাশে একটুকরো কালো মেঘ দেখা গেল। দেখতে দেখতে সারা আকাশ ছেয়ে গেল মেঘে। তখন চারিদিকে সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নেমেছে। আজ আর বুঝি রক্ষা নেই। কালবৈশাখীর ঝড়ে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলবে কে জানে। আবার মাথায় বাজ পড়তেও পারে।

এই রকম সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গোপাল একরকম ছুটতে ছুটতেই পথ চলতে লাগলো একটা আশ্রয়ের আশায়।

প্ৰাণের ভয়ে এলোমেলো ভাবে হাঁটতে হাঁটতে গোপাল এসে হাজির হলো একটা নদীর ধারে।

সামনে বা পিছনে কোনও লোকালয় দেখতে না পেয়ে গোপাল নদীর ধার দিয়ে হন হন করে হাঁটতে লাগলো।

তখন বাতাস জোরে বইতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে কড় কড় করে বাজ পড়ছে।

গোপাল নিরূপায় হয়ে একটা আশ্রয়ের সন্ধানে অসহায়ভাবে চারিদিকে দেখতে লাগলো।

অন্ধকার রাত্ৰি।

হঠাৎ দূরে একটা গাছের মাথায় ভীষণ শব্দে বাজ পড়লো। সেই শব্দে চমকে উঠলে গোপাল।

বিদ্যুতের আলোয় হঠাৎ দেখা গেল নদীর ধারে একটা দোতলা পাকাবাড়ী।

বাড়ীখানা দেখে গোপালের যেন প্ৰাণ ফিরে এলো। সে অন্ধকারে প্ৰাণপণে সেই বাড়ীটার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল।

তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে।

গোপাল কোনমতে এসে হাজির হলো বাড়ীর সামনে।

বাড়ীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলে গোপাল। কোনও সাড়াশব্দ নেই, চারদিক নিস্তব্ধ নিঝুম। লোকজনের চিহ্ন মাত্র দেখা যাচ্ছে না কোথাও।

গোপাল একটু ইতস্ততঃ করে দরজায় একটু ঠেলা দিতেই সেটা খুলে গেল।

তখন খুব জোরে ঝড়ো বাতাস বইছে, আর সেই সঙ্গে বৃষ্টিও পড়ছে মুষলধারে। ঘন ঘন বজ্ৰপাতও হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুঝি বা প্ৰলয় হয়ে যাবে।

দরজা খুলে যেতেই ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে গোপাল দেখল, একখানা তক্তাপোেষ পাতা আছে, আর তার উপর একটা ময়লা চাদর বিছানো।

গোপাল তখন জয় মা কালী বলে ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে।

একটু বিশ্রীম নিয়ে পকেট থেকে দেশলাই বার করে জ্বেলে গোপাল দেখল, বাড়ীটা পুরাতন হলেও বেশ মজবুত আছে। ঘরখানার মধ্যে চারদিকে ধূলা-ময়লা জমে আছে। বোধহয় বহুদিন ঘরটা পরিষ্কার করেনি। তক্তপোষের উপর যে চাদরখানা পাতা ছিল তাতেও একরাশ ধুলো পড়েছিল।

গোপাল চাদরখানি তুলে একটু ঝেড়ে-ঝুড়ে পরিষ্কার করে আরাম করে বসল। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে সে চিন্তা করছে কখন সকাল হবে। ক্ষিধেও তার পেয়েছিল খুব। একে তো গোপাল পেটুক মানুষ। তার উপর কখন সেই সাত সকালে খেয়ে বেরিয়েছে, সেকি আর পেটে আছে। পথশ্রমে সব হজম হয়ে গেছে। ক্ষিধের জ্বালায় সে ছটফট করতে লাগলো। কিন্তু কোনও উপায় নেই। তাই চুপচাপ বসে রইলো।

কিছুক্ষণ পরে সিঁড়িতে বাড়ীর ভেতর দিকে যেন কিসের শব্দ হলো।

গোপাল কানখাড়া করে শুনতে লাগলো। এবার সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা গেল। মনে হলো কে যেন সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। গোপাল ভেতরের দরজার দিকে চেয়ে রইলো।

হঠাৎ খুলে গেল ভেতরের দিকের দরজা। দরজায় দেখা গেল। একজন বয়স্ক লোক। সাদা কাপড়ে সারা দেহটা ঢাকা। গোপাল অবাক হয়ে চেয়ে রইল তার দিকে। তখন সেই লোকটি খনখনে গলায় বললে— আপনি কে? কোথা থেকে আসছেন?

গোপাল প্ৰথমটা ভয় পেলেও সাহস করে বললে— মশায়, আমার বাড়ী কৃষ্ণনগর। নাম গোপাল। গোপাল বললে হয়ত চিনতে পারবেন না। গোপাল বাঁড় বলেই সকলে জানে। আমি মেয়ের বাড়ী যাচ্ছিলাম, পথের মাঝে ঝড়-জল দুৰ্যোগে পড়ে প্ৰাণের ভয়ে আপনার আশ্রয়ে এসেছি।

বুড়ো আবার খনখনে গলায় বললে—তাতে কি হয়েছে অনেকেরই এরকম অবস্থা হয়ে থাকে। তা বাড়ী থেকে কখন রওনা হয়েছেন?

—তা ধরুন বেলা দশটা এগারোটা হবে।

—বলেন কি? সারাদিন হাঁটছেন?

—কি আর করি বলুন? মোটা মানুষ বেশী জোরে তো হাঁটতে পারি না।

গোপালের কথায় লোকটা হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে চারদিক যেন কেঁপে উঠল। গোপালও ভয় পেয়ে গেল।

লোকটা আবার জিজ্ঞাসা করলে—মেয়ের বাড়ী কোথায়?

—আজ্ঞে হরিনগর।

—ওরে বাবা। সে তো এখান থেকে প্ৰায় সাত ক্রোশ। আপনি ভুল পথে এসেছেন। তা আপনার বুঝি খাওয়া হয়নি?

খাবার কথা শুনে গোপালের বেশী করে ক্ষিধে বেড়ে গেল। কিন্তু সে তার প্রকাশ না করে বললে—আজ্ঞে সেই সকালে বাড়ী থেকে যা খেয়ে বেরিয়েছি। তা থাক, আপনাকে আর এতরাত্রে কিছু ব্যবস্থা করতে হবে না।

—সেকি কথা মশাই? আপনি হলেন আমার অতিথি। গৃহস্থের বাড়ীতে অতিথি উপোস থাকলে যে অমঙ্গল হবে। আপনি কি জাত?

—আজ্ঞে আমি পরামানিক অর্থাৎ নাপিত।

—বেশ—বেশ। তাহলে চিন্তার কারণ নেই। আমি খাবার যোগাড় করছি। এই কথা বলে লোকটা চলে গেল।

গোপাল স্পষ্ট দেখলে লোকটা সিঁড়ি দিয়ে না উঠে, লম্বা তালগাছের মত একটা ঠ্যাং বাড়িয়ে দোতলায় উঠে গেল।

ব্যাপার দেখে গোপাল ভয়ে কাঠ। কিন্তু এই দুর্যোগের রাতে পালাবে কি করে। তাই সে বসে বসে রাম নাম জপ করতে লাগলো।

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। হঠাৎ পাশের ঘরে কে যেন আৰ্তনাদ করে উঠল। তারপর আবার চুপচাপ।

কিছুক্ষণ পরে গোপাল ছাদের দিকে তাকাতেই তার বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে এলো। গোপাল দেখলে দুটো জ্বলন্ত চোখ একদৃষ্টি তাকিয়ে আছে তার দিকে। কি সাংঘাতিক সেই চোখ দুটো। যেন আগুনের গোলা।

গোপাল ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াতেই একটা কালপ্যাঁচা ঝটপট করতে করতে উড়ে গেল দরজা দিয়ে।

গোপাল হাফ ছেড়ে বাঁচল। ওটা তাহলে প্যাঁচার চোখ। আবার সে বসলো তক্তাপোষের উপর।

আবার বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে নানারকম শব্দ হতে লাগল। মনে হলো যেন পাশের ঘরে একটা খণ্ডযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেছে। দুম-দাম -দুম-দাম শব্দে বাড়ীটা যেন সরগরম হয়ে গেল।

এইভাবে চললো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর মনে হলো যেন হুড়মুড় করে দোতলার বারান্দা ভেঙ্গে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে নারী কণ্ঠের তীব্ৰ আর্তনাদ আর তার সঙ্গে পৈশাচিক হাসির শব্দে গোটা বাড়ীখানা কেঁপে উঠলো।

গোপালের তখন অবস্থা কাহিল। তার বুক ধড়ফড় করছে। ঘামে ভিজে গেছে সারা দেহ। কি করবে, কেমন করে সে এই হানাবাড়ী থেকে পালাবে এই চিন্তা করছে, এমন সময় দরজার কাছে দেখা গোল একটি নারীমূর্তি, সারা দেহ তার কাপড়ে ঢাকা। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। সে খনখনে গলায় বললে—

—তুমি এখনি পালাও এখান থেকে। এটা হলো ভূতের বাড়ী। এ তল্লাটের লোক একে বলে হানাবাড়ী।

গোপাল এই কথা শুনি লাফিয়ে উঠে বেরোতে যাবে, এমন সময় আবার সেই স্ত্রীলোকটি নাকি সুরে বললে—তুমি আমার সঙ্গে এসো। আমি রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি। আর দেৱী কোর না। একটু পরেই কর্তারা এসে তোমার ঘােড় মটকে রক্ত চুষে খাবে। এই বলে সেই নারীমূৰ্ত্তিটি আগে চললো, গোপাল তার পিছনে যেতে লাগল।

কিছুটা এগিয়ে নারীমূৰ্ত্তিটি বললে—ওই নদীর ধার দিয়ে পূর্বদিকে এগিয়ে গেলেই গ্রাম দেখতে পাবে।

এই কথা বলে সেই নারীমূৰ্ত্তি যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। গোপাল পিছন দিকে চেয়ে দেখলে, কিন্তু কাউকে দেখতে পাওয়া গলে না।

দূর থেকে শুধু বহুকণ্ঠে পৈশাচিক অট্টহাসি শোনা গেল।

গোপাল প্ৰাণভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে নদীর ধারে এক জায়গায় আছাড় খেয়ে জ্ঞান হারালো।

তখন ঝড় বৃষ্টি কমে গেছে। পূর্বদিক ফর্সা হয়েছে। জেলেরা ডিঙি নৌকায় চড়ে নদীতে মাছ ধরছিল। একজন লোককে নদীর ধারে পড়ে থাকতে দেখে, তারা গোপালকে নৌকায় তুলে সেবা শুশ্রূষা করতে লাগলো।

অল্প সময়ের মধ্যেই গোপালের জ্ঞান ফিরে এলো। জেলেদের মধ্যে একজন গোপালকে চিনত। সে জিজ্ঞাসা করলে— আপনি এখানে কোথায় এসেছিলেন?

গোপাল তখন সমস্ত ঘটনা বলতে, জেলেরা বললে—সর্বনাশ! ওটা তো হানাবাড়ী। ওখানে যে যায়, সে আর জ্যান্ত ফিরে আসে না। ভাগ্যের জোরে আপনি বেঁচে গেছেন। সন্ধ্যা হলে ও রাস্তায় লোকজন কেউ যায় না ভূতের ভয়ে।

গোপাল বললে— আচ্ছা, বাড়ীটার কি ব্যাপার বলতে পার?

জেলেরা বললে—ওই বাড়ীটা ছিল জমিদারের। জমিদারবাবু খুব রাগী ছিলেন। একদিন কি হয়েছিল বলতে পারব না। জমিদার নিজের হাতে সবাইকে খুন করে নিজে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। শেষ অবধি তাদের মৃতদেহেরও সৎকার করা হয়নি। শেয়াল-কুকুরে খেয়েছে। সেই থেকে ওই বাড়ীটা হয়েছে ভূতের অস্তানা। দিনের বেলাতেও ওখানে কেউ যেতে সাহস পায় না।

গোপালের কাহিল অবস্থা দেখে জেলেরা নৌকা করে তাকে মেয়ের বাড়ীতে পৌছে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *