গোপালের পাল্লায় মামদো

গোপালের পাল্লায় মামদো

সেদিন সকাল সকাল বেড়িয়ে এসে দাদু বৈঠখানায় বসতেই রোজকার মতো নাতি-নাতনীরা এসে হাজির হলো বৈঠকখানায়।

দাদু তাদের দেখে বললে—কিরে, সব এসে গেছিস? বস সবাই, গল্প বলছি।

দাদুর চারপাশে বসে পড়ল সবাই। দাদু তখন একটু নড়েচড়ে বসে, একটু গলাঝাড়া দিয়ে শুরু করলে।

আগেই তোমাদের বলেছি, গোপাল শুধু রসিক লোকই ছিল না! অত্যন্ত তীক্ষ্মবুদ্ধি সম্পন্ন ছিল। গোপাল লেখাপড়া বিশেষ জানত না, যেটুকু জানত, তাকে মূর্খ বলাই ভাল।

কিন্তু মূর্খ হয়েও গোপাল নিজের তীক্ষ্মবুদ্ধির দ্বারা সমাজে প্ৰতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

এবার যে গল্পটা তোমাদের বলবো, সেটা শুনলেই বুঝতে পারবে গোপালের বুদ্ধি কত তীক্ষ্ন ছিল।

গোপাল ভাঁড় যে গ্রামে বাস করত, সেই গ্রামখানি ছিল বেশ বর্দ্ধিষ্ণু। বামুন, কায়েত, কামার, কুমোর, মুচি, মুসলমান সব জাতেরই বাস ছিল গ্রামটিতে।

সে সময়কার মানুষের মনে এত হিংসা ছিল না। হিন্দু মুসলমান পাশাপাশি বাস করত খুশী মনে। বামুনপাড়ার ছেলেরা আনন্দে খেলা করতে যেত মুসলমান পাড়ায়। আবার মুসলমান পাড়ার ছেলেরা আসতে বামুন পাড়ায়। বামুন কায়েতের অল্প বয়সী ছেলেরা বয়স্ক মুসলমানকে দাদা বা চাচা বলে সম্বোধন করত, তাদের সামনে বিড়ি সিগারেট খেত না। এইভাবে আনন্দেই কাটতো তখনকার মানুষের দিনগুলো।

একদিন দুপুরবেলা গোপাল ঘরের দাওয়ায় বসে আহারাদি সেরে তামাক টানছে, এমন সময় গফুর মিঞা এসে বসলো তার কাছে গোপাল তার দিকে কলকেটা বাড়িয়ে দিতে গফুর বেশ কয়েকটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে কলকেটা গোপালের হাতে ফেরৎ দিলে।

গোপাল বললে—কি খবর গফুর ভাই? এই দুপুরবেলা কোথায় যাচ্ছ?

—কোথাও যাইনি ভাই। তোমার কাছেই এলাম।

—কি ব্যাপার বল দেখি ভায়া?

—একটা বিপদে পড়ে তোমার কাছে এলাম।

—কেন, কি আবার বিপদ হলো?

—ব্যাপারটা খুব রহস্যজনক। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। অথচ কাণ্ড-কারখানা দেখে, দিন দিন আমি ভয় পেয়ে যাচ্ছি। রাত্তির বেলা ছেলেমেয়েরা তো ভয়ে ঘুমাতেই পারে না। আমাকেও সারারাত জেগে বসে থাকতে হয়।

—ব্যাপারটা কি বল দেখি?

—প্ৰত্যেকদিন রাত্রিবারোটার পর, আমাদের বাড়ীতে ভূত আসে।

এই কথা শুনে গোপাল হো-হো করে হেসে বললে—দূর পাগল! ভূত কি কখনও ঘরে আসতে পারে? তেনারা হল গিয়ে অপদেবতা। শ্মশানে-মশানে, বনে-জঙ্গলে, পোড়ো বাড়ীতে, গাছপালায় থাকে। মানুষের বাস করা জায়গায় তেনারা থাকে না।

গফুর বললেমামদে আমিও তাই জানতুম, কিন্তু এখন দেখছি বাড়ীতেও ভূত থাকে।

গোপাল বললে—কি করে বুঝলে?

গফুর তখন গোপালের কলকেটা নিয়ে বার কতক বেশ জোরে টান দিয়ে বলতে শুরু করলে।

প্ৰায় একমাস আগের ঘটনা।

একদিন রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, গোটা পাড়াটাই নিস্তব্ধ। কারও কোনও সাড়া শব্দ নেই, মাঝে মাঝে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠছে। গভীর রাত, সারাদিন পরিশ্রমের পর খুব ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ কিসের একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। স্পষ্ট ঘরের মধ্যে একটা খসখস শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর আবার সব চুপচাপ। কোনও সাড়া-শব্দ নেই। মনে ভাবলাম, ঘরের মধ্যে বোধহয় গেছে। ইঁদুর ঢুকেছে। এইবার ধানের বস্তা, কাপড় চোপড় সব কেটে নষ্ট করবে। তাই তাড়াতাড়ি উঠে আলো জ্বালালাম। কিন্তু ঘরের মধ্যে কোথাও কিছু দেখা গেল না, তখন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

একটু তন্দ্ৰামত এসেছে, আবার একটা শব্দ হলো। এবার আর বিছানা থেকে উঠলাম না, কিন্তু ঘুমাতেও পারলাম না সারারাত শব্দের জন্যে।

এইভাবে রোজই ঘরের মধ্যে নানারকম শব্দ হতে লাগলো। এই ঘটনার কয়েকদিন পরে এক দিন সকালে উঠে দেখি সারা উঠোনে মুরগীর পালক ছড়ানো। সন্ধান করে জানলাম, আমাদের বড় মুরগীটাকে কাল রাত্রে কিসে খেয়ে গেছে। তার অর্ধেক অংশ মুরগীর ঘরের সামনে পড়ে আছে।

চার-পাঁচদিন বেশ ভালভাবেই কেটে গেল। কিন্তু চার-পাঁচ দিন পরে সকাল বেলা গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখি একটা বকরী মরে পড়ে আছে। তার দেহ থেকে কে যেন মাংস খুবলে খুবলে খেয়েছে। ব্যাপার দেখে বেশ ভয় হলো।

গোপাল বললে—আমার মনে হচ্ছে। এ সব শেয়ালের কীর্তি। তুমি একটু সাবধান সতর্ক থাকলেই বুঝতে পারবে।

গফুর দাড়ি নাড়াতে নাড়াতে প্ৰতিবাদের সুরে বললে—না ভায়া! এটা শেয়ালের কীর্তি নয়।

গোপাল জিজ্ঞাসা কয়লে—কি করে বুঝলে?

গফুর বললে—আমিও তোমার মত শেয়ালের কীর্তি বলে মনে করেছিলুম। কিন্তু তিনদিন আগে ঘরে শুয়ে আছি। রাত্রি তখন প্ৰায় দু’টো, এমন সময় দরজাটা খট্‌ করে নড়ে উঠল। সেই শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। অন্ধকারেই দরজার দিকে চেয়ে রইলাম, কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। কিছুক্ষণ পরে মনে হলো বোধহয় ঘরে কেউ ঢুকেছে। উঠে বসে রইলাম বিছানার উপর। আর কিছুই দেখা গেল না বা শোনা গেল না। সকালে উঠে নিজের কাজে গেলাম। কাকেও কিছু বললাম না। মনে ভাবলাম, বাড়ীতে এই কথা বললে সকলে ভয় পেয়ে যাবে। তাই চুপ করে। গেলাম। আমি কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম, কাকেও সেটা জানালাম না।

গতকাল রাত্রে ঘটে গেল একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড।

গোপাল আশ্চৰ্য্য হয়ে বললে—কাল রাত্রে আবার কি হলো?

গফুর বলতে শুরু করলো।

কাল রাত্রে রোজাকার মত খাওয়া-দাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে ভাবছিলাম, এই ক’দিনের ঘটনাগুলোর কথা।

রাত তখন কত হয়েছে বলতে পারছি না, তবে চারদিক নিস্তব্ধ নিঝুম। বাড়ীর সকলে ঘুমিয়েছে। কারও কোনও সাড়া শব্দ নেই… গোটা পাড়াটাই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

এমন সময়, দরজাটা খটখট করে খুলে গেল সামান্য। আমিও চেয়ে রইলাম সেদিকে। কিন্তু কাকেও দেখা গেল না। আবার আপনি বন্ধ হয়ে গেল দরজা। তখন আমার খুব ভয় হলো, সারা দেহের মধ্যে যেন বয়ে গেল একটা ঠাণ্ডা বাতাস। সারাদেহ, শির শির করতে লাগলো। কপালে ঘাম দেখা দিল।

এমন সময় হঠাৎ খুলে গেল মশারির এক পাশের দড়িটা। আমি ভাবলাম, নিশ্চয় ইঁদুরে দড়ি কেটে দিয়েছে। কি আর করি, উঠে আবার দড়িটা বাঁধলাম। মাত্ৰ ঘণ্টাখানেক চুপচাপ কাটল, তারপরেই মনে হলো, কেউ যেন ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

অন্ধকারে চেয়ে দেখি, ঘরের কোণে খুব লম্বা একটা ছায়ামূৰ্তি দাঁড়িয়ে আছে। তার জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি আমার দিকে।

এই সাংঘাতিক দৃশ্য দেখে আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। ভয়ে সেদিকে চেয়ে থাকতে পারলাম না। চেঁচিয়ে বাড়ীর লোকজনকে ডাকতে গেলাম, কিন্তু মনে হলো, কে যেন আমার গলা টিপে ধরেছে। এমন সময় হি-হি করে অস্বাভাবিক ভাবে হেসে উঠল মূর্তিটা। আমি গোঁ-গোঁ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেলাম। তারপর কি হয়েছে আমি বলতে পারবো না।

জ্ঞান ফিরে আসতে দেখি, আমি দাওয়ায় শুয়ে আছি, আর পাড়ার সকলে এসে জড়ো হয়েছে উঠোনে।

লতিফ মিঞা এগিয়ে এসে আমার গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে কি হয়েছিল রে বেটা, গোঁ-গোঁ করে অজ্ঞান হয়েছিলি কেন? আমি তখন আগাগোড়া সব কথা তাকে বললাম। বুড়ো সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বললে—বপজান। তুমি একবার গোপালের কাছে যাও, সে খুব বুদ্ধিমান। তাকে গিয়ে সব ঘটনা বল, তারপর সে যা বলবে তাই হবে। তাই আমি তোমার কাছে এসেছি ভাই। এর একটা যা হোক বিহিত কর। নইলে ছেলেপুলে নিয়ে মারা যাব।

গোপাল বেশ কিছুক্ষণ ধরে চিন্তা করে বলল—দেখ গফুর ভাই, আমি তো আর রোজা নাই যে ভূত ছাড়াব। তবে তুমি যখন বলছ একবার তোমার বাড়ী গিয়ে দেখতে পারি।

এই কথা বলে গফুরকে বিদায় দিয়ে গোপাল ভালভাবে একটা ঘুম দিয়ে নিলে।

ঘুম থেকে উঠে গোপাল সন্ধ্যার সময় খাওয়া-দাওয়া সেরে গফুর মিঞার বাড়ীতে গিয়ে হাজির হলো।

ক্ৰমে ক্রমে রাত্রি হতে লাগলো। গোপালের জন্য গফুর ভাল করে বিছানা-পত্র করে রেখেছিল, গোপাল আরাম করে তাতে শুয়ে পড়লো। গফুরও সেই ঘরেই রইলো। তারপর গল্প করতে লাগলো দু’জনে।

রাত যখন প্ৰায় দুটো, এমন সময় ঘরের চালের উপর একটা শব্দ হলো, মনে হলো যেন কেউ একটা মস্ত বড় বস্তা চালের উপর ফেলে দিলে।

পরক্ষণেই দরজা খোলার শব্দ হলো। ওরা দুজনেই চেয়ে দেখলো কিন্তু কিছুই দেখা গেল না।

রাত্রি ভোর হতে আর অল্প বাকি। গোপাল বিছানার উপর বসলো। তারপর গফুরকে বললে— গফুর। ভূত-প্ৰেত কিছু নয়। সব তোমার মনের ভ্ৰম। এই বলে সে উঠে পড়লো।

গফুরের বাড়ীর পিছন দিকে ছিল একটা কথবেলের গাছ। জায়গাটা বেশ পরিষ্কার। পাড়ার ছেলেমেয়েরা সেই গাছের তলায় সারাদিন খেলা করত। গোপাল সেইদিকে যেতে লাগল। কিছু এগিয়ে সে দেখতে পেলে, সাদা কাপড়ে সর্বাঙ্গে ঢাকা একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। গোপাল সাহস করে চেয়ে দেখলে। তার মনে হলো ছায়ামূৰ্তিটার দাড়ি আছে। আর বিরাট লম্বা সেই ছায়ামূর্তির চোখ দুটো যেন আগুনের গোলার মত জ্বলছে। গোপাল বুঝতে পারলে সেটা মুসলমান ভুত।

এর আগে দু’ একবার ভূতের পাল্লায় পড়ে গোপালের সাহস হয়েছিল। তাই সে ভয় না পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো ভূতটাকে। আর মনে মনে বললে—দাঁড়া ব্যাটা মামদো। আজ রাত্রে তোর দফা রফা করবো।

দেখতে দেখতে সকাল হয়ে গেল। মুরগীগুলো আর গাছপালার পাখীগুলো ডেকে উঠলো। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেই ছায়ামূৰ্তিটার মিলিয়ে গেল। গোপাল তখন নিশ্চিন্ত মনে মুখ হাত ধুয়ে ফিরে এলো গফুরের কাছে।

গফুর তখন বিছানায় উঠে বসেছে। গোপাল তাকে এক ছিলিম তামাক সেজে আনতে বললে। তারপর তামাক খেতে খেতে গম্ভীর ভাবে বললে—দেখ গফুর ভাই। তোমার বাড়ীতে একটা মামদো ভূত আসা যাওয়া করছে। সেই ব্যাটাই তোমার ঘরে রোজ রাত্রে এত উপদ্রব করে।

এই কথা শুনে গফুর খুব ভয় পেয়ে বললে—তাহলে কি হবে ভাই?

গোপাল বললে—আজকেও রাত্রে আমি আসব, তারপর দেখি কি করা যায়। এই বলে বিদায় নিয়ে গোপাল বাড়ী ফিরে গেল।

তার পরদিন সন্ধ্যায় গোপাল আহারাদি সেরে গফুরের বাড়ীর দিকে রওনা হলো। যাবার সময় সঙ্গে নিলে একটা ছেঁড়া কাপড়ের পুটলী, একটা মাটির হাঁড়ি, একটা ক্ষুর, একটা আয়না, গোটা কতক শুকনো লঙ্কা আর সরষে। একটা বাটীতে রান্না করা খাসির মাংস।

দেখতে দেখতে রাত বেড়ে চললো। গফুরের বাড়ীর সবাই যে যার শুতে গেল।

গোপাল আর গফুর আগের দিনের মত একঘরে শুয়ে পড়লো। শোবার আগে গোপাল যে সব জিনিস সঙ্গে এনেছিল, সব হাতের সামনে সাজিয়ে রাখল।

গল্প করতে করতে দু’জনে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কিসের শব্দে তাদের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

হঠাৎ খট্‌ করে দরজাটা একটু ফাঁক হলো। তারা স্পষ্ট দেখল। একটা ছায়ামূৰ্তি সেই দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকলো। কোন সাড়া শব্দ না দিয়ে চুপ করে পড়ে রইলো।

ছায়ামূর্তিটা ঘরের ভিতরে চারপাশে ঘুরে ঘুরে কি যেন খুঁজতে লাগলো। তারপর ঘরের এককোণে গিয়ে দাঁড়াল। গোপাল স্পষ্ট দেখলে সেটা মামদো ভুত।

গোপাল আস্তে আস্তে উঠে সেই হাঁড়িটার মধ্যে মুখ রেখে বললে কে রে ওখানে?

আচমকা এমন গম্ভীর আওয়াজ শুনে মামদোটা বুঝি ঘাবড়ে গেল। সে স্থির হয়ে সেই ঘরের কোণেই দাঁড়িয়ে রইল।

গোপাল আবার সেইভাবে বললে—কিরে কথা কানো যাচ্ছে না বুঝি? উত্তর না দিলে তোকে দর্পণ বাণে বেঁধে লঙ্কার ধোঁয়া দেব।

এই কথায় মামদোটা আরও ঘাবড়ে গিয়েমামদে খনখনে গলায় বললেমামদে দোহাই তোমার, আমাকে দর্পণ বাণ মেরো না। আমি মামদো।

—কি বললি, তুই মামদো? তাহলে তো ভালই হলো। তোর জন্যেই আমি এখানে এসেছি। আমার তিনটে মামদো আছে, আর একটা মামদো হলেই এক গণ্ডা হবে।

গোপালের কথা শুনে মামদোটা হি-হি করে হেসে উঠল। তাই দেখে গোপাল রেগে গিয়ে বললে— হাসি হচ্ছে। দেখবি আমার কাছে ক’টা মামদো আছে।

মামদোটা বললেমামদেকই দেখাও দেখি।

গোপাল তখন আয়নাটা নিয়ে মামদোর মুখের সামনে ধরলে। আয়নায় মুখের ছায়া পড়তেই মামদোটা চমকে উঠে বললে—

তোমায়। আমায় ছেড়ে দাও।

সুযোগ পেয়ে গোপাল বললে—তাকি হয়, অনেকদিন ধরে আমি একটা মামদো খুঁজছিলাম। এতদিন পরে যখন পেয়েছি, তখন কি ছেড়ে দেওয়া যায়।

মামদো তখন খুব অনুনয় বিনয় করতে লাগলো।

গোপাল বললে—না না, তোকে ছাড়া হবে না। এই দ্যাখ, আমার কাছেই একটা মামদোর মাথা রয়েছে। এই বলে অন্ধকারে কাপড়ের পুটলিটা দেখালে। তারপর ক্ষুরটা দেখিয়ে বললে—এটা দিয়ে তোর দাড়ি গোঁফ কামাব। তারপর লঙ্কার ধোঁয়া দোব, আর এই হারামের মাংস খাওয়াব। তবে আমার কাজ শেষ হবে।

হারাম হলো শূয়ার। মুসলমানরা কখনও এই মাংস ছোয় না। তাই হারামের মাংসের কথা শুনে মামদো বললো—তোবা তোবা।

গোপাল বললে—তোবা তোবা করলে কি হবে। তোকে আজ আমি এই মাংস খাইয়ে ছাড়বো। এই বলে মাংসের বাটি নিয়ে গোপাল উঠে দাঁড়াল।

মামদোটা তখন খুব ঘাবড়ে গিয়ে নাকি সুরে বললে—আমায় ছেড়ে দাও বাবা। আর কখনও এমুখো হবে না। দোহাই তোমার, আমাকে ছেড়ে দাও।

গোপাল দেখলে ওষুধ ধরেছে। তার সাহস খুব বেড়ে গেল। সে হেঁড়ে গলায় হাঁড়িতে মুখ রেখে বললে—তুই গফুরের বাড়ীতে অনেকদিন ধরে উৎপাত করছিস, তার মুরগী মেরেছিস, বকরী মেরেছিস। তোকে কি করে ছাড়বো বল?

মামদোটা তখন বললে—আমি তার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি। ছেড়ে দে বাবা।

গোপাল বললে—কি ক্ষতিপূরণ দিবি বল?

মামদো বললে—এই বাড়ীর পিছনে যে কথবেলের গাছটা আছে। তার পাশেই আছে একটা উঁচু ঢিপি। বহুদিন আগে ওখানে ছিল আমার আস্তানা। আমার কাছে ছিল নবাবী আমলের চারখানা মোহর।

গফুরের ঠাকুর্দা আমার কাছে যেত, গাঁজা খেত গল্প করত। একদিন কথায় কথায় তাকে ওই মোহর চারটি আর টাকার কথা বললাম। সে সব শুনে কিছু বললে না।

এর কয়েকদিন পরে এক বাটি গোস্ত এনে আমাকে বললে— ফকির সাহেব। এটা তুমি খাবে। আজ পরবের দিন। বাড়ীতে গোস্ত হয়েছিল, তোমাকে খেতে দিয়ে গেলাম। তাতে ছিল বিষ মেশানো। আমি সরল বিশ্বাসে সেই গোস্ত খেয়ে মারা যাই। তারপর আমাকে কবর দিয়ে গফুরের ঠাকুর্দা মোহর আর টাকা চুরি করে এনে, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এইখানে মাটির নীচে পুঁতে রাখে। এ কথা কিন্তু মরবার সময় সে কাউকে বলে যেতে পারে নি। সেই থেকে আমার মােহর আর টাকাগুলো এখানেই পোঁতা আছে। সেইজন্যে আমি রোজ এখানে আসি।

গোপাল বললে—মামদে ভাল কথা। কিন্তু তুমি ফকীর, তোমার এত লোভ থাকা তো ভাল নয়। এই লোভের জন্যই আমি তোমাকে শাস্তি দেব।

মামদো বললেনা—না বাবা! আর শাস্তি দিতে হবে না। আমার অনেক শাস্তি হয়েছে। এবার আমাকে ছেড়ে দাও। গফুরের ঠাকুরদাকে আমি নিজের হাতে শাস্তি দিয়েছি। গফুরের বাবাকে শাস্তি দিয়েছি।

গোপাল বললে—কি ভাবে শাস্তি দিয়েছ?

মামদো বললে—গফুরের ঠাকুরদা রাত্রে শুয়েছিল, আমি তার গলা টিপে মেরেছি। সকাল বেলা সকলে তার মৃতদেহটা দেখে বলেছিল যে সন্ন্যাস রোগে মারা গেছে।

এতেও আমার রাগ যায়নি। এদের বংশে বাতি দিতে কাউকে রাখব না, এই ছিল আমার উদ্দেশ্য। তাই সুযোগ খুঁজতে লাগলাম।

একদিন দেখি গফুরের আব্বাজান ক্ষেতের কাজকর্ম সেরে বাড়ী ফিরছে, সেই সময় আরম্ভ হলো বৃষ্টি আর ঝড়। সে একটা গাছতলায় গিয়ে দাঁড়াল, আমিও সুযোগ বুঝে গাছের ডাল ভেঙ্গে ফেললাম তার মাথায়, সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল।

মামদো আবার বললে—এরপর ছিল গফুরের পালা। তুমি না এসে পড়লে ওকেও শেষ করে দিতুম। তারপর ওর ব্যাটা দুটো আর বিবিকে শেষ করতুম। কিন্তু তা আর হলো আমি চলে যাচ্ছি এখান থেকে। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে ঘরের মেঝে খুঁড়লে একটা পিতলের ঘট পাবে। তাঁর মধ্যে রয়েছে চারটি মোহর আর পাঁচশ’ টাকা। ওগুলো নিয়ে তোমরা আমার উদ্দেশ্যে মৌলভীদের ডেকে কোরণ পাঠ করাবে। তিনদিন এই কোরণ পাঠ করবে। শেষদিনে মৌলভী আর ফকিরদের ডেকে এনে ভোজ দেবে। তাহলে আমার আত্মার মুক্তি হবে।

এই পর্যন্ত বলে গোপালের কাছে বিদায় নিয়ে, হাওয়ায় মিলিয়ে গেল সেই ছায়ামূর্তি। ঘরের মধ্যে যেন ঝড় বয়ে গেল।

তখন ভাের হয়ে এসেছে। — গফুর আর গোপাল ঘরের মেঝে, খুঁড়ে সেই মোহর আর অর্থ পেল। সেই অর্থ কিছু খরচ করে তারা মামদোর কথামত কোরাণ পাঠ করালে, ভোজ দিলে। তারপর অবশিষ্ট টাকা আর মোহর দু’জনে ভাগ করে নিয়ে মনের আনন্দে যে যার বাড়ীতে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *