ভূতের পাল্লায় গোপাল ভাঁড়

ভূতের পাল্লায় গোপাল ভাঁড়

ছোট দাদু সেদিন সকাল সকাল এসে বৈঠকখানা ঘরে বসতেই, নাতি নাতনীরা সবাই এসে জড়ো হলো তার কাছে। তারপর সকলে চীৎকার করতে লাগলো—দাদু! একটা গল্প বল—দাদু একটা গল্প বল।

ছোট দাদু বললেন—এ সময় গল্প শুনিবি কিরে? তোদের পড়াশোনা নেই?

পেঁকো-অৰ্থাৎ পঙ্কজ বললে—না, আজ আর পড়াশোনার ঝামেলা নেই। ইস্কুল তো চারদিন বন্ধ।

ছোটদাদু বললে— ইস্কুল বন্ধ তো হয়েছে কি? তাই বলে পড়াশোনা করতে হবে না।

ছোট বোন বিনি বললে—সে হবেখ’ন দাদু! আজ একটা গল্প বল।

এই কথা বলে আবার সবাই চেঁচাতে আরম্ভ করলো।

দাদু তখন আরাম করে বসে বললে—আচ্ছা! সবাই চুপ কর। একটা বেশ ভাল গল্প তোদের বলছি।

দাদুর কথা শুনে সবাই চুপচাপ গিয়ে তার কাছে বসলো। দাদু গল্প বলতে শুরু করলেন।

দাদু জিজ্ঞাসা করলেন—তোরা গোপাল ভাঁড়ের নাম শুনেছিস?

সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলো—হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনেছি। —শুনেছি।

কেউ বললে—আমি গোপাল ভাঁড়ের গল্পের বই পড়েছি। কেউ বললে—সিনেমায় দেখেছি।

দাদু বললে—তাহলে তো ভালই হলো। নতুন করে আর গোপাল ভাঁড়ের পরিচয় দিতে হবে না।

বিনি বলল— না না, তুমি গল্প বল।

দাদু বললে—তাহলে শোন।

একদিন গোপাল ভাঁড় রাজসভা থেকে ফিরে আসতে তার স্ত্রী বললে—একবার বাজারে যাও তো?

গোপাল বললে— কেন?

গোপালের স্ত্রী বললে— বাজার থেকে একটা ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে এসো। আজ ইলিশ মাছ খেতে খুব ইচ্ছে হয়েছে।

গোপালের হাতে সেদিন টাকা পয়সা ছিল না। স্ত্রীর বায়না শুনে সে মুখ কাঁচু মাচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

তাই দেখে গোপালের স্ত্রী বললে—কি গো! চুপ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? বাজারে যাও।

গোপাল আস্তে আস্তে বললে— আজ আমার কাছে টাকা পয়সা নেই। ইলিশ মাছ বরং অন্যদিন খেও।

গোপালের বউ এই কথায় রেগে গিয়ে বললে— যার বউকে খেতে দেবার মুরোদ নেই, সখ-সাধ মেটাবার মুরোদ নেই, তার আবার বিয়ে করা কেন? বিয়ে করলে যে বউয়ের সাধ আহ্লাদ মেটাতে হয় জান না।

গোপাল একটু হেসে বললে—দেখ, বিয়ে করা বউ হলো স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী। তার সুখ-দুঃখের ভাগীদার।

বউ মুখ নাড়া দিয়ে বললে—থামো থামো, আর ন্যাকামো করো না। কথায় আছে না।—ভাত দেবার কেউ নয়, কিলমারবার গোঁসাই। আমায় ধম্মকথা বলে ভোলাচ্ছেন।

গোপাল বললে—ধৰ্ম্মকথা নয়। বউ, এটা হোলো শাস্ত্রের কথা।

বউ বললে—তোমার অমন শাস্ত্রের মুখে ঝ্যাঁটা মারি, আর তোমার মুখেও ঝ্যাঁটা মারি।

এই কথা শুনে গোপাল খুব দুঃখিত হলো মনে মনে। সে ভাবলে কি! এত অহঙ্কার। সামান্য অর্থের জন্য নিজের স্ত্রী হয়ে এত অপমান। আর বাড়ীতে থাকব না, যেদিকে দু’চোখ যায়, সেদিকেই চলে যাব।

মনে মনে এই রকম চিন্তা করে গোপাল তখনকার মত চুপ করে রইলো।

দুপুর বেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে। গোপাল তখন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো।

গোপাল চলেছে তো চলেছেই, কোন দিকে তার খেয়াল নেই।

এইভাবে অনেকদূর এসে পড়ল গোপাল। যখন তার হুঁস হলো তখন সূৰ্য্যদেব অস্ত গেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে চারদিকে।

হঠাৎ তার পায়ে একটা ঠোক্কর লাগলো। নিচুদিকে তাকিয়েই গোপাল দেখল, তার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা পোড়া কাঠ। সে তখন চারিদিকে তাকিয়ে দেখলে সেটা একটা শ্মশান।

চারদিকে ধুধু করছে মাঠ। কোথাও লোকজনের বাড়ী ঘরের চিহ্নমাত্র নেই। চারদিকে মড়ার মাথা, পোড়া কাঠ আর হাড়গোড় ছাড়ানো রয়েছে। তার সামনে একটু দূরেই একটা চিতা থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে। মনে হচ্ছে কারা যেন সদ্য মড়া পুড়িয়ে গেছে।

এই সব দৃশ্য দেখে গোপাল ভয় পেয়ে গেল। সে তখন তাড়াতাড়ি ফিরে যাবার জন্য হাঁটতে লাগলো।

কিন্তু তখন চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত। তার উপর আবার আকাশে মেঘ জমেছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

চলতে চলতে গোপাল বার বার হোঁচট খেতে লাগল।

এমন সময় একসঙ্গে কতকগুলো শেয়াল ডেকে উঠল। গোপাল চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, সে সেই শ্মশানের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে পথ হারিয়ে।

গোপাল কিছুক্ষণ এক জায়গায় স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে চারিদিকে পথের সন্ধান করতে লাগলো। কিন্তু কিছুই দেখা গেল না অন্ধকারে।

আকাশ তখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। কিছুই দেখা যাচ্ছেন চোখে, এমন সময় তার চোখে পড়ল একটা মস্ত বড় বটগাছ।

গোপাল আস্তে আস্তে সেই বটগাছের কাছে গিয়ে, কোন রকমে তার মােটা সোটা দেহটা নিয়ে গাছের উপর উঠে বসল।

এদিকে সারারাত ধরে মড়ার মাথা আর হাড়গোর নিয়ে কুকুর শেয়ালে খণ্ডযুদ্ধ চলতে লাগলো।

রাত যখন গভীর এমন সময় একটা ভূত এসে সেই বটগাছের তলায় বসলো।

তার চেহারা দেখে গোপালের বুক দুরু দুরু করতে লাগলো। সারা গায়ে ঘাম ছুটতে লাগলো। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো এবার যদি প্ৰাণে বঁচি, আর কখনও গিন্নীর সঙ্গে ঝগড়া করবো না। হে মা কালী! এবারের মত বাঁচিয়ে দাও মা।

গোপালের যখন এই অবস্থা। তখন আরও চারটি ভূত এসে বসলে সেই বটগাছের তলায়। এবার তাদের মধ্যে নাকি সুরে কথাবর্তা হতে লাগলো।

গোপাল প্রথমটা ভয় পেলেও, সে ছিল খুব চতুর আর বুদ্ধিমান, তাই সে কান পেতে তাদের কথাবার্তা শুনতে লাগলো।

প্ৰথম ভূতটা বললে—এ্যাই। তোদের এত দেরী হলো কেন?

দ্বিতীয় ভূত বললে— কর্তা, আমরা চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে এলুম, তাই দেরী হয়ে গেল।

প্ৰথম ভূত বললে—ঘুরে ঘুরে কি দেখলি?

তৃতীয় ভূত বললে—কামার পাড়ায় একজন মরেছে।

চতুৰ্থ বললে— কুমোর পাড়াতেও একজন মরেছে।

পঞ্চম বললে—ঘোষ পাড়ায় একজন মরেছে।

দ্বিতীয় বললে— বাঃ—ভারী মজা তো, কলু পাড়াতেও একজন মরেছে দেখে এলুম।

প্ৰথম ভূত বললে—তাহলে মোট চারজন মরেছে আজ?

পঞ্চম ভূত বললে—হ্যাঁ কর্তা।

দ্বিতীয় ভূত বললে—আচ্ছা কর্তা। ওই মড়া চারটিকে তুলে নিলে কেমন হয়?

সকলে বললে—ভালই হবে—ভালই হবে।

প্ৰথম ভূত তখন গম্ভীরভাবে বললে—হুঁ, তোদের যখন ইচ্ছে হয়েছে, তখন তাই কর, চারটে মড়াই তুলে নে।

গোপাল তখন মনে মনে বললে— চারটে নয়রে শালারা আমাকে নিয়ে পাঁচটা হবে। তবে মরার আগে একবার তোদের একটা খেল দেখিয়ে যাব। আমার নাম গোপাল ভাঁড়।

এমন সময় প্ৰথম ভূতটা একজন ভূতকে বললে—‘ওরে হামদে, আমার পা-টা একটু টিপে দে।

দিচ্ছি কর্তা। বলে যেই হামদো এগিয়েছে। অমনি গাছের উপর থেকে হেঁড়ে গলায় গোপাল বললে—এই ব্যাটা হামদো। এদিকে আয়।

গাছের উপর গলার আওয়াজ পেয়ে, ভূতগুলো চমকে গাছের উপর চেয়ে দেখলে একটা নাদুস-নুদুস ভুঁড়িওলা বেঁটে মানুষ!

ভূতগুলো অবাক হয়ে গোপালকে দেখতে লাগলো।

গোপাল তখন চোখ পাকিয়ে আরও গম্ভীরভাবে ডাকলে—‘এ্যাই বেটা হারামজাদা। কথা কানে যাচ্ছে না বুঝি! এখনি তোর শ্ৰাদ্ধ করবো। তোর চোদ্দ পুরুষ আমার বাড়ীতে চাকরী করেছে। তুই ব্যাটা মস্তান হয়েছিস? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।

গোপালের কথায় হামদো ভয় পেয়ে বললে—অজ্ঞে আমার দোষ কি?

ভূতগুলো ভয় পেয়েছে দেখে, গোপাল সাহস করে গাছ থেকে নামল। তারপর হামদোর দিকে চেয়ে বললে—ব্যাটা, খুব যে লায়েক হয়েছিস। তোর বাপ-ঠাকুর্দা আমার বাড়ীতে চাকর ছিল।

প্ৰথম ভূত বললে— ওর চৌদ্দপুরুষ যে তোমার বাড়ীতে চাকরী করেছে তার প্রমাণ দিতে পারবে?

গোপাল বলল—বলিস কিরে, জলজ্যান্ত প্রমাণ করে দেবো।

হামদো বললে—আমার বাবার নাম কি বল দেখি?

গোপাল বললে- তুই একটা আস্ত ভূত। তাই তোর বুদ্ধি-শুদ্ধিও নেই। আমাদের বাড়ীতে কি একটা চাকর। তোর বাবার মত কত ব্যাটা চাকর রয়েছে। সকলের নাম কি আর মনে আছে? সব খাতায় লেখা আছে। চল আমার সঙ্গে চাকরী করবি চল এখন আমার বাড়ীতে তিরিশটা ভূত দিনরাত খাটছে। তুইও খাটবি চল।

প্ৰথম ভূতটা তখন বললে—দেখ, তুমি যদি ওর বাপ ঠাকুর্দার নাম বলতে পার, তাহলে হামদো তোমার সঙ্গে যাবে।

ভূতগুলোর সঙ্গে গোপালের কথাবার্তা হচ্ছে, এমন সময় দূরে হরিবোল শব্দ শোনা গেল।

শব্দ শুনেই ভূতগুলো ছটফট করতে লাগলো। কর্তা ভূত বললে— আমাদের কিছুক্ষণের জন্যে ছেড়ে দাও, একঘণ্টা পরে ফিরে আসব।

গোপাল বললে— তাকি হয়? তোরা যদি আর ফিরে না আসিস?

কর্তা ভূত বললে—নিশ্চয়ই আসব। এটাই তো আমাদের অস্তানা।

গোপাল বললে— তোরা কোথায় যাবি?

হামদো বললে— এখনও আমরা কিছু খাইনি, তাই খাবার যোগাড় করতে যাচ্ছি।

গোপাল তাদের কাকুতি মিনতি দেখে বললে—আচ্ছা যা, কিন্তু একঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসবি। তা না হলে ব্ৰহ্মদত্যি আর মামদোকে -পাঠিয়ে ঘাড়ে ধরে আনবো।

ব্ৰহ্মদত্যি আর মামদোর কথায় কর্তা ভূতটারও ভয় হলো। কারণ ব্ৰহ্মাদিত্য হলো বামুন ভূত আর মামদো হলো মুসলমান। এরা দুজনেই বেশ শক্তিশালী। ভূত মহলে এদের সবাই ভয় করে। তাই সকলে হাত যোড় করে গোপালকে বললে আমরা এক ঘণ্টার মধ্যেই আসবো।

এই কথা বলে গোপালের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চোখের নিমেষে উধাও হয়ে গেল।

ওদিকে বল হরি হরিবোল বলতে বলতে কতগুলো লোক একটা মড়া নিয়ে আসছিল শ্মশানে।

এমন সময় ভূতগুলো হাঃ-হাঃ-হিঃ-হিঃ করতে করতে লম্বা লম্বা। হাত পা বাড়িয়ে সেদিকে এগিয়ে যেতেই, লোকগুলো মড়া ফেলেই যে যেদিকে পারলে ছুটে পালালো।

ভূতগুলো তখন এসে মনের আনন্দে মড়াটাকে খেতে লাগলো। কড়কড় মড়মড় করে হাড় চিবোতে চিবোতে চিবোতে কর্তাভূত বললে—এ্যাই, সব তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। একঘণ্টার মধ্যে ফিরে না গেলে লোকটা আবার ব্ৰহ্মদত্যি আর মামদোকে পাঠাবে।

সবাই তখন তাড়াতাড়ি খেতে লাগলো। প্ৰায় আধন্টার মধ্যে গোটা মড়াটাকে শেষ করে হাড় চিবোতে চিবোতে আবার পাঁচজনে এসে হাজির হলো।

ওদিকে দূর থেকে ভূতগুলোকে আসতে দেখে, গোপাল বটগাছে হেলান দিয়ে বসে জোরে জোরে নাক ডাকাতে লাগলো।

ভূতগুলো গাছতলায় ফিরে এসে দেখলে লোকটা ঘুমুচ্ছে। আর নাক ডাকছে।

কর্তাভূত তখন ফিসফিসিয়ে বললে— এই চল, আমরা গাছের পিছন দিকে গিয়ে বসি। ওকে জাগাসনি ঘুমুতে দে, সকাল হলেই আমরা কেটে পড়বো।

সকলে বললে—সেই ভালো। এই বলে সকলে সেই বটগাছের পিছনে বসলো।

গাছে হেলান দিয়ে বসে কর্তা ভূতটা হামদোকে চুপি চুপি বললে —হ্যাঁরে হামদো। লোকটা যদি সত্যি সত্যিই তোর বাপ-ঠাকুর্দার নাম বলে দেয়। তাহলে কি হবে?

দ্বিতীয় ভূতটা বললে—ত পারবে না কর্তা। ও কি করে নাম জানবে?

আর একজন বললে—ঠিক বলেছিস। ও কি করে নাম জানবে? হামদোই হয়ত সব নাম জানেনা।

হামদো এই কথায় রেগে গিয়ে বললে—কেন জানবো না, আমার বাপ-ঠাকুর্দার নাম আমি জানবো না তো কে জানবে?

দ্বিতীয় ভূত বললে—বেশ বলতে দেখি নামগুলো?

হামদো বললে—আমার নাম হামদো, বাবার নাম—আমদো, ঠাকুর্দার নাম-লামদো, তার বাবার নাম—জামদো। ‘

কর্তা বললে— ব্যাস-ব্যস, ঐ হলেই হবে। এই রকম বললেই হল।

এদিকে গোপাল ঘুমের ভাণ করে পড়ে থেকে সব শুনে নিল এবং মুখস্থ করে ফেললে। তারপর ধড়মড় করে উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠলো—কইরে। কোথায় গেলি তোরা সব। এদিকে আয়।

গোপাল ডাকতেই ভূতগুলো এসে হাজির হলো গোপালের কাছে।

গোপাল তাদের বললে—এই, তোরা সব হামদোর বাপ ঠাকুর্দার নাম জানতে চেয়েছিলি না, নামগুলো সব মনে পড়েছে।

তখন কর্তা ভূতটা বললে—বেশ বল নামগুলো।

গোপাল তখন ঠিক যেমন শুনেছিল, তেমনিভাবে নামগুলো বললে।

কর্তা ভূত সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর বললে—হামদো, ইনি যখন তোর বাপ ঠাকুর্দার নাম বলেছে, তখন তুই ওর বাড়ীতে যা।

হামদো তখন কঁচুমাচু হয়ে বললে—হ্যাঁ, তাতো যেতেই হবে। তবে আমার একটা কথা আছে।

—বেশ, কি কথা আছে বল?

—চল, রাস্তায় যেতে যেতেই বলব।

—বেশ তাই হবে। কিন্তু আমি তো হেঁটে যেতে পারবো না। আমায় কাঁধে করে বাড়ী নিয়ে চল। হামদো আর কি করে, গোপালকে কাঁধে নিয়ে ঝড়ের বেগে বাড়ীর দিকে রওনা হলো। পথে যেতে যেতে হামদো গোপালকে বললে—দেখ কর্তা। আমি তোমার কাজকর্ম করবো বটে, কিন্তুদিনের বেলায় আমাকে দেখতে পাবে না। রাত্রি বেলা এসে তোমার সব কাজকর্ম করে যাব।

—বেশ তাই হবে।

—আরও একটা সর্ত আছে।

—বল কি সর্ত?

—রোজ আমাকে কাজ দিতে হবে। বসে থাকতে পারব না। বসে থাকলেই আমাকে ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে আমি তোমার ঘাড় মটকাবো।

—বেশ, তাই হবে। এইভাবে কথা বলতে বলতে হামদো গোপালকে নিয়ে বাড়ীর কাছে এসে কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে বললে —কর্তা, তুমি বাড়ীর মধ্যে যাও, এখন আমি চললাম। সকাল হতে আর দেরী নেই, আর আমার থাকা চলবে না। কেউ দেখে ফেলবে। কাল আবার রাত্রে আসবো। আমার কাজ-কর্ম ঠিক করে রেখো।

এই কথা বলে হামদো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

গোপাল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর দরজার কড়া নাড়া দিলে।

গোপালের স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে—কি গো! তুমি সারাদিন সারারাত কোথায় গেছলে? গোপাল তখন একে একে বাড়ী থেকে গিয়ে অবধি যা যা ঘটেছিল, সবই বললে। সব শুনে গোপালের বউ একগাল হেসে বললে—দেখলে তো আমার ঝগড়া করার গুণ। আমি ঝগড়া না করলে তুমিও বাড়ী থেকে যেতে না। আর এসব ঘটনাও ঘটতো না।

গোপাল বললে—দ্যাখ গিন্নী, আর বকবক করে লাভ নেই। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। সকাল হয়ে গেছে। তুমি কাজকর্ম সেরে দু’টো যাহােক কিছু রান্না-বান্নার যোগাড় কর।

দেখতে দেখতে সারাদিন কেটে গেল। গোপাল সারাদিনটা ঘুমিয়ে কাটালে।

রাত্রিবেলা বাড়ীর সকলে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। গোপাল কিন্তু জেগে বসে রইলো।

রাত্রি যখন বারোটা, এমন সময় হামদো এসে হাজির।

এসেই সে গোপালকে বললে-বল, কি কাজ করতে হবে?

গোপাল বললে-আমার বাগানটা জঙ্গল হ’য়ে পড়ে আছে। ওটাকে ভাল ক’রে পরিষ্কার করে দে।

সঙ্গে সঙ্গে হামদো চলে গেল বাগান পরিষ্কার করতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বাগান পরিষ্কার করে ফিরে এসে গোপালের কাছে বিদায় নিয়ে ফিরে গেল।

এইভাবে রোজই হামদো এসে গোপালের কাজ ক’রে যেতে লাগলো।

গোপালের দিন দিন উন্নতি দেখে পাড়ার লোকের হিংসা হলো। তারা ভাবতে লাগলো, গোপাল এত পয়সা পাচ্ছে কোথায় যে, বাড়ীঘর মেরামত করছে। বাগান পরিষ্কার করছে, পুকুর কাটছে। এই সব ভেবে পাড়ার লোক জ্বলে মরতে লাগলো। শেষ একদিন তারা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্ৰকে সব কথা জানালে।

পরদিন গোপাল রাজসভায় আসতে মহারাজা জিজ্ঞাসা করলেন —আচ্ছা গোপাল! তুমি যে বাড়ী, বাগান পরিষ্কার করছ। পুকুর কাটাচ্ছে এতে টাকা-পয়সা খরচ হচ্ছে। এসব কে দিচ্ছে?

গোপাল হাতযোড় করে বললে—মহারাজ! আমি কিছুই বলতে পারবো না। রাত্রে ঘুমিয়ে থাকি, আর সকালে উঠে দেখি সব কাজকর্ম কে ক’রে গেছে।

গোপালের কথা শুনে মহারাজ হেসে উঠলেন। তারপর বললেন — আচ্ছা, তুমি বাড়ি যাও, আমি সন্ধান নিচ্ছি।

সেইদিন সন্ধ্যাবেলা রাজা গোপালের প্রতিবেশীকে ডেকে বললেন আজ তোমরা সারারাত্রি জেগে গোপালের বাড়ী পাহারা দেবে। তাহলে বোঝা যাবে কে গোপালের কাজ করে দেয়।

গোগাল তখন ওই সব লোকগুলোকে জব্দ করবার জন্য মনে মনে বুদ্ধি এঁটে হামদো আসতেই তাকে বললে—হামদো, তুই তোর আর একজন বন্ধুকে নিয়ে রাজকর্মচারী সেজে আয়।

হামদো সঙ্গে সঙ্গে তার একবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে রাজকর্মচারী সেজে গোপালের কাছে হাজির হলো।

গোপাল বললে—যাও তোমরা, আজ তোমাদের কোনও কাজ করতে হবে না।

হামদো বললে—তাহলে আমরা কি করবো? গোপাল বললে-আমার বাড়ীর চারপাশে জনকতক লোক পাহারা দিচ্ছে। তোমরা তাদের রাজার হুকুম জানিয়ে সারারাত ধরে আমার নতুন পুকুরের মাটি কাটাবে।

হুকুম পাবার সঙ্গে সঙ্গে হামদো তার বন্ধুকে নিয়ে চলে গেল। তারপর তারা দেখলে সত্যি কয়েকজন লোক গোপালের বাড়ীর চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

হামদো তাদের কাছে গিয়ে বললে—শোন তোমার, রাজামশায় হুকুম দিয়েছেন। আজ সারারাত ধরে তোমাদের গোপালের নতুন পুকুরে মাটি কাটতে হবে।

হামদোর কথা শুনে সকলে ভয় পেয়ে গেল।

তাদের চুপকরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হামদো বললে—শিগগীর মাটি কাটতে শুরু কর। নইলে চাবুক মারতে মারতে মাটি কাটাব। এই কথা বলে কোদাল আর ঝুড়ি ফেলে দিল তাদের সামনে।

লোকগুলো আর কি করে সারারাত ধরে গোপালের পুকুরে মাটি কাটতে লাগলো।

সারারাত ধরে মাটি কেটে লোকগুলোর অবস্থা খুব কাহিল হ’য়ে পড়লো। কিন্তু কি করবে, রাজার হুকুম, অমান্য করলে বিপদ। তাই তারা সকাল হবার অপেক্ষায় রইলো।

পূবদিক ফর্সা হবার সঙ্গে সঙ্গে হামদো আর তার বন্ধু চলে গেল। লোকগুলো তখন আধমরা অবস্থায় হাঁপাতে হাঁপাতে যে যার বাড়ী ফিরে গেল।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দরাবার বসেছে!

সভাসদ, পরিষদ যে যার জায়গায় বসে আছে। গোপালও গম্ভীর মুখে বসে আছে তার আসনে, প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছে। চারদিকে লোক-লস্কর দাঁড়িয়ে। সভাগৃহ জমজমাট।

এমন সময় কতকগুলি লোক হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললে— মহারাজ! আমাদের রক্ষা করুন।

গোপাল মনে মনে বললে—কেমন। আর পরের হিংসা করবে? এরপর মুখে বললে— আচ্ছা যাও’ পরের হিংসা ত্যাগ কর। তাহলে আর শাস্তি পেতে হবে না।

লোকগুলো তখন আস্তে আস্তে যে যার বাড়ী গেল। রাজসভা থেকে ফিরে গোপাল তার স্ত্রীকে বললে— দেখ গিন্নী। হামদোকে দিয়ে অনেক কাজ করলাম। আর তো হাতে তেমন কাজ-কর্ম নাই। তাছাড়া মহারাজ ও সন্দেহ করছেন। এবার হয়ত তিনি নিজেই খোঁজ খবর নিতে শুরু করবেন।

গিন্নী বললে— তাহলে উপায়?

গোপাল বললে— মাথায় কিছু আসছে না, তুমি একটা বুদ্ধি দাও।

গিন্নী বললে— এক কাজ কর, আজ হামদো এলে, তার কাছে কিছু টাকা কড়ি নিয়ে বিদায় করে দাও। ও সব ভূত-প্ৰেত নিয়ে আস করা ঠিক নয়। কখন কি বিপদ হবে বলা যায় না।

গোপাল বললে— ঠিক।

সেদিন আবার এসে হাজির হলো হামদো। এসেই বললে— কর্তা, আজ কি কাজ দাও।

গোপাল বললে— দাঁড়াও, একটু ভেবে দেখি।

হামদো বললে— কর্তা, আমি বরং তোমাকে কিছু টাকা আর গহণা দিচ্ছি, নিয়ে আমাকে ছেড়ে দাও।

গোপালও তাই চায়। সে একগাল হেসে বললে— বেশ, তোর যখন ইচ্ছে হয়েছে তাই কর।

সঙ্গে সঙ্গে হাওয়ায় মিশে গেল হামদো। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যে টাকা আর গয়না ভৰ্তি একটা বাকসো এনে গোপালের হাতে দিয়ে বিদায় নিয়ে চিরদিনের মত চলে গেল।

গোপাল বাক্সভর্তি গয়না আর টাকা পেয়ে মনের আনন্দে এক রকম লাফাতে লাফাতে বাড়ীর মধ্যে গিয়ে গিন্নীর হাতে দিল।

গিন্নীতো টাকা আর গয়নার বাক্স পেয়ে হেসে লুটোপুটি। গোপালও একগাল হেসে বললে— বুঝলে গিন্নী আমার নাম গোপাল ভাঁড়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *