লুকোনো ট্রাঙ্ক

লুকোনো ট্রাঙ্ক

আমাকে আজ শান্তনু ফোন করেছিল?

দোতলার বারান্দায় বসে খুব মন দিয়ে শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়ছিল দিগন্ত। প্রতিটি গল্পই বহুবার পড়া। কিন্তু লেখার এমন টান যে একবার শুরু করলে ছাড়া যায় না। অঞ্জলির কথাটা প্রথমে তার কানেই ঢোকেনি। তবে একটু পরে অঞ্জলি যখন আবার দু-কাপ কফি নিয়ে এসে একটু জোর গলায় বলল, তখন সম্ভবত গরম কফির গন্ধেই কান ফিরল দিগন্তর। কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বইয়ের পাতায় আলতো চোখ বোলাতে বোলাতেই বলল, কোন শান্তনু?

শান্তনু মিত্র, তোমার ক্লাসমেট।

ও ছোটা! হঠাৎ শান্তনু বলছ যে!

আহা, অমন সুন্দর একটা নাম আছে ছেলেটার, সেটা মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতে হবে না!

অঞ্জলি যে ইচ্ছে করেই তার পিছনে লাগছে, সেটা বুঝে দিগন্ত এবার হেসে বলে, বুঝেছি, কিন্তু কেন ফোন করেছিল, বলল কিছু?

না, বলেনি। মোবাইল ফোন বদলাতে গিয়ে নাকি অনেক নম্বর উড়ে গেছে। ল্যান্ডলাইনটা বোধহয় ছিল, ফোন করে তোমার সেল নম্বর নিল। নিজেই ফোন করবে নিশ্চয়। তুমিও করে দেখতে পার। কী দরকার বলেনি, তবে গলা শুনে সামান্য টেনসড মনে হল।

ছোটা ওরফে শান্তনু মিত্র দিগন্তর স্কুলের বন্ধু। দুজনে এক ক্লাসে পড়ত। তবে দিগন্ত ছিল পড়াশোনায় ভালো। আর ছোটা একেবারে ব্যাক বেঞ্চার না হলেও, পিছনের সারির। কিন্তু তবু দুজনের মধ্যে ভাব ছিল খুব। তার একটাই কারণ, ফুটবল। স্কুল টিমে ক্যাপ্টেন ছিল ছোটা। আর দিগন্ত স্ট্রাইকার। ক্যাপ্টেনের একেবারে ডানহাত। খেলা হয়ে যাওয়ার পর বহুক্ষণ মাঠে বসে গল্প করত দুজনে। দিগন্তর বই-খাতা-নোটস সবকিছুর ওপরেই ছোটার ছিল অবাধ অধিকার। স্কুল পাস করার এতদিন পরেও অভ্যাস এবং বন্ধুত্ব কোনওটাই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়নি। বাংলার অধ্যাপক দিগন্ত এখনও সময় পেলেই মাঠে নেমে পড়ে।

ছোটা অবশ্য চাকরি করে না। তারা তিন ভাই। বড় দুই দাদা ছোটার থেকে বেশ অনেকটা বড়। দুজনেই খুব ভালো ছাত্র ছিল। এখন আমেরিকায় সেটলড। ওদের বাবার একটা ছোটখাটো হার্ডওয়্যারের দোকান ছিল। চাকরির চেষ্টা না করে ছোটা সেটাকেই নিজের চেষ্টায় বড় করে এখন জমিয়ে বিক্রি-বাট্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সকাল থেকে রাত দোকানে যতই ব্যস্ত থাকুক, ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকলে শান্তনু মিত্র মাঠে যাবে না, এমনটা সচরাচর ঘটে না। ফুটবলের ওয়ার্ল্ড কাপ চলার সময় দুই বন্ধুর প্রতিদিন মোটামুটি ঘন্টাখানেকের একটা উত্তেজিত ফোনালাপ বাঁধা। অঞ্জলি চেঁচামেচি করে হাল ছেড়ে দিয়েছে।

এহেন ছোটা ফোন করেছিল এবং তার গলা শুনে টেনসড মনে হয়েছে জেনে ঐতিহাসিক উপন্যাসে আর মন বসাতে পারল না দিগন্ত। মোবাইলে নম্বরটা ডায়াল করতেই ছোটা বলল, শোন দিনু, তোর সঙ্গে জরুরি দরকার আছে। তুই সন্ধেবেলা বাড়ি আছিস তো? আমি সাতটা নাগাদ যাব।

সাতটায় আসতে পারবি! তোর দোকান আজ বন্ধ নাকি?

না না, দোকান খোলা আছে। নগেনকে বলে রেখেছি। ও দোকান বন্ধ করে চাবি বাড়িতে দিয়ে দেবে। তুই কিন্তু বাড়িতে থাকিস। অঞ্জলিকেও বলিস। নীলুর দোকানের ফুলকপির সিঙাড়া নিয়ে যাব অঞ্জলির জন্য।

ফোনটা রেখে হেসে ফেলল দিগন্ত। ছোটাটা চিরকালই এরকম। হাসিখুশি, খোলামেলা, বন্ধুবৎসল। অঞ্জলি কী ভালোবাসে, সেটাও ও ঠিক খেয়াল রাখে।

শান্তনু অবশ্য সাতটায় আসতে পারল না। দিগন্তর ভবানীপুরের বাড়ির সামনে যখন ওর বাইকটা এসে দাঁড়াল, তখন ঘড়িতে ঠিক সাড়ে সাতটা। ডিসেম্বর মাস। ঠান্ডাটাও কদিনে বেশ জব্বর পড়েছে। টি-কোজিতে পটটা ঢেকে গরম চা রেডি করে রেখেছিল অঞ্জলি। সিঙাড়ার ঠোঙাটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে শান্তনু আরাম করে এসে বসল সোফায়। শীতের দিনে ওর পছন্দের ঘরোয়া পোশাক, পাঞ্জাবির ওপর শাল জড়িয়ে দিগন্ত আবার শরদিন্দুতে ডুবে গেছিল। বন্ধুকে দেখে বইটা নামিয়ে একটু উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার রে? সিরিয়াস কিছু হয়েছে নাকি?

সিরিয়াস কিনা জানি না। তবে অদ্ভুত নিশ্চিত। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। সেজন্যই তোর কাছে তাড়াহুড়ো করে আসা।

ব্যাপারটা কী, খুলে বল তো।

বলছি। দাঁড়া আগে একটু চা খাই। বড্ড ঠান্ডা আজ। বাইক চালিয়ে আসতে গিয়ে হাত-পা যেন জমে গেছে।

টি-পট থেকে ছোটার কাপে গরম চা ঢেলে দেয় দিগন্ত। সঙ্গে ছোট প্লেটে কুচো নিমকি। নিজের জন্যও এক পেয়ালা নেয়। ততক্ষণে অঞ্জলি একটা বড় চিনামাটির প্লেটে সিঙাড়াগুলো নিয়ে এসেছে। দু-চুমুক চা আর তার সঙ্গে খানিকটা কুচো নিমকি মুখে ফেলে শান্তনু বলে, তুই তো জানিস দিনু আমাদের পুরোনো বাড়িটা আমরা প্রোমোটারকে দিয়ে দিয়েছি। মেনটেইন করার অসুবিধা হচ্ছিল। তাছাড়া এখন তো আর সংসারে বেশি লোকজন নেই। ফ্ল্যাটে থাকাই সুবিধাজনক। মা প্রথমটায় গাঁইগুঁই করলেও রাজি হয়ে গেল। এখন যতদিন বাড়িটা ভেঙে নতুন করে তৈরি হবে, ততদিন আমাদের থাকার জন্য কাছেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। শনিবার আমার দোকান বন্ধ থাকে বলে সেদিনিই শিফট করলাম। জিনিসপত্র বেশিরভাগ সেদিনই চলে গেছে। কিন্তু কী হয় বলতো, অনেকদিনের পুরোনো সংসার, আবোল-তাবোল জিনিসও অনেক জমে।

নতুন বাড়িতে জায়গাও কম। তাই কিছু পুরোনো ট্রাঙ্ক, তোরঙ্গ এবাড়িতে রাখা ছিল। ঠিক করেছিলাম, ওগুলো একবার দেখে নেব। যদি জরুরি কিছু থাকে, বার করে নিয়ে বাতিল করব। কিন্তু রবিবার সকালে গিয়ে দেখি, একটা ট্রাঙ্ক বাড়ির পিছনদিকে সন্ধ্যামালতীর ঝোপের পাশে পড়ে আছে। তার মানে রাতে চোর এসেছিল। ট্রাঙ্কটা বার করে নিয়ে গেছে। কিন্তু চোর ঘরে ঢুকল কী করে? চাবি তো আমাদের বাড়িতে ছিল?

কথা থামিয়ে আবার এক চুমুক চা খায় শান্তনু। ফুলকপির সিঙাড়া থেকে ভেঙে একটা টুকরো মুখে পোরে। তারপর বলে, দ্যাখ দিনু, পুরোনো ট্রাঙ্ক। তাতে কিছু পুরোনো জামা-কাপড় ভরা ছিল। তাই ও নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যাথা নেই। কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে, তালা দেওয়া ঘরে চোর ঢুকল কী করে? তাহলে কি আমার তালার চাবি কেউ নকল করেছে? শুধু একটাই চাবি করেছে, নাকি অন্য চাবিরও ডুপ্লিকেট তৈরি হয়েছে? এবাড়ি না হয় ফাঁকা ছিল, কিন্তু নকল চাবি যদি চোরের হাতে থাকে, তাহলে তো যে কোনও সময় অন্য বিপদও হতে পারে। এইসব ভেবে আমার বেশ দুশ্চিন্তা হল বুঝলি। তখনই মনে হল তোকে ব্যাপারটা জানাই। তুই তো আজকাল টুকটাক গোয়েন্দাগিরি করছিস মাঝেমধ্যে। দ্যাখ, যদি এই ট্রাঙ্ক রহস্যের কোনও সমাধান করতে পারিস।

সোফার সামনে রাখা বেঁটে স্টুলটার ওপর পা-দুটো রেখে গভীর মন দিয়ে ছোটার কথা শুনছিল দিগন্ত। সিঙাড়াটা হাতে ধরা থাকলেও খাওয়া হয়নি। ছোটার কথা শেষ হতে সিঙাড়ায় একটা কামড় দিয়ে বলল, একটা কথা বল তো, বাড়িতে তো অন্য টুকটাক জিনিস ছিল নিশ্চয়, আর কিছু চুরি হয়েছে?

মনে তো হয় না। আমি বেশ ভালো করে দেখেছি। ইনফ্যাক্ট, মায়ের একটা খুচরো পয়সা ভরা লক্ষ্মীর ভাঁড় ছিল। আমি সেদিন নিয়ে যাব ভেবে ভুলে গেছিলাম। সেটাও যথাস্থানেই আছে।

তার মানে চোর এসেছিল ওই ট্রাঙ্কটাই নিতে। ট্রাঙ্কের ভিতরে কী ছিল কিছু জানা গেছে।

আমি তো দেখিনি, তবে মীনাক্ষী বলল ট্রাঙ্কের ভিতরে কিছু পুরোনো কাপড়-চোপড় ছাড়া আর কিছু ছিল না।

সেই পুরোনো কাপড়-চোপড়গুলো কি আছে?

হ্যাঁ, সেসব আছে। গোটা দুয়েক পুরোনো পাজামা, একটা সুতির শার্ট, তিন-চারটে গেঞ্জি, একটা হলদে হয়ে যাওয়া বিছানার চাদর…তোয়ালেও আছে বোধহয় একটা।

সবই পুরুষদের জামা-কাপড়?

হ্যাঁ, মেয়েদের পোশাক তো কিছু দেখলাম না। আমার মনে হয় বাবার বাতিল জামা-কাপড় মা ওটাতে ভরে রেখেছিল। অনেক সময় পুরোনো কাপড় দিয়ে বাসন-টাসন কেনে তো, সেজন্যই হয়তো। তারপর ভুলে গেছে। জিনিসগুলো বেশ পুরোনোই। বাবা তো মারাই গেছে দশ বছরের বেশি হয়ে গেল।

মাসিমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলি?

না রে। আসলে এই বাড়ি বদলানোর ঝামেলায় যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য মা-কে পিসির বাড়িতে রেখে এসেছি। মায়ের তো আবার ডাস্ট অ্যালার্জি আছে। সামনের সপ্তাহে নিয়ে আসব।

শান্তনুর কথা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ গভীরভাবে চিন্তা করে দিগন্ত। তারপর একটু হেসে বলে, এখনও পর্যন্ত তো খুব গভীর কোনও দুশ্চিন্তার কারণ আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে ট্রাঙ্কের ভিতর আর কিছু ছিল কিনা জানা দরকার। সেটা যদি জানা যায়, তবেই ট্রাঙ্ক চুরির উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হবে। ট্রাঙ্কটা তুই তুলে রেখেছিস তো?

হ্যাঁ, তা তো রেখেছি।

তাহলে আমি কাল কলেজ ছুটির পর একবার তোর ওখান থেকে ঘুরে আসব।

আমি দোকানে থাকব। তুই যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে নিস।

ছোটা চলে গেল সাড়ে নটা নাগাদ। সাড়ে দশটায় খাবার দিয়ে ডাকতে এসে অঞ্জলি দেখল শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসটা হাতে নিয়ে দিগন্ত অনেকটা ধ্যানমগ্নের মতো বসে আছে।

কী ব্যাপার বল তো? শান্তনুর কাছে শুনে তো ব্যাপারটা একটা মামুলি চুরি ছাড়া আর কিছুই মনে হল না। তুমি এত চিন্তায় পড়ে গেলে যে?

সেটাই তো বুঝতে পারছি না। চুরি হয়েছে একটা পুরোনো ট্রাঙ্ক। তার ভিতরে আছে পুরোনো জামা-কাপড়। খুবই মামুলি ব্যাপার। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খটকা লাগছে। সেটাকে কিছুতেই এড়াতে পারছি না।

.

পরদিন দিগন্ত যখন ছোটার দোকান মিত্র হার্ডওয়্যারে এসে পৌঁছল, ঘড়িতে তখন তিনটে। মোবাইলে কথা হয়েছিল আগেই। তাই ছোটা তৈরি ছিল। দিগন্ত আসতেই বেরিয়ে পড়ল দুজনে।

সোজা তোর বাড়ি চল। যেখানে ট্রাঙ্কটা পড়েছিল, সেই জায়গাটা আমি একবার দেখব। আলো পড়ে গেলে অসুবিধা হবে। প্রোমোটার এখনও বাড়ি ভাঙা শুরু করেনি তো?

না এখনও করেনি। এই ব্যাপারটা হওয়াতে আমিই বলেছি একটু অপেক্ষা করতে।

শান্তনুদের বাড়িটা কলোনি এলাকায়। স্বাধীনতার পর পূর্ববাংলা থেকে যেসব উদ্বাস্তু মানুষরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই বাসা বেঁধেছিলেন এইসব জায়গায়। এই অঞ্চলগুলো তখন ছিল হয় জলাজমি, নয়তো চাষের ক্ষেত। দেশভাগে সর্বস্ব খোয়ানো মানুষরা জোর করে দখল করে নিয়েছিলেন এই এলাকাগুলিকে। পরে অবশ্য সরকার থেকে তাঁদের বসবাসের অধিকার দেওয়া হয়। ওপার বাংলায় এঁরা থাকতেন খোলামেলা পরিবেশে। সেই স্বভাব অনুসারেই এখানেও বাড়ির লাগোয়া একটুকরো জমি প্রায় সকলেরই ছিল। ছিটেবেড়ার বাড়িতে বাস করলেও চারপাশে বাগান করে, আম-জাম-নারকেলের গাছ লাগিয়ে খানিকটা নিজেদের পরিচিত পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

শান্তনুদের বাড়িটাও অনেকটা একই ধরণের। তবে একতলা পাকা বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকলে প্রথমে কিছুটা খোলা জমি। তারপর দু’ধাপ সিঁড়ি উঠে গ্রিল দেওয়া বারান্দা। সেই বারান্দাটা অনেকটা উল্টো ইংরাজি ‘এল’ অক্ষরের মত। সামনে থেকে একেবারে পিছন অবধি চলে গেছে। পিছনে গিয়ে আবার দুধাপ সিঁড়ি নেমে একটুকরো বাঁধানো চত্বর। একসময় সেখানে একটা টিউবওয়েল ছিল। তারপাশেই একটা ছড়ানো সন্ধ্যামালতীর ঝোপ। ছোটা বলল সেই ঝোপের ভিতরেই পড়ে ছিল ট্রাঙ্কটা। ঝোপটার গা ঘেঁষে একটা পায়ে চলা রাস্তা বাগানের ভিতর দিয়ে সামনে চলে এসেছে।

সেই রাস্তাটার পাশে পরপর তিনটে নারকোল গাছ আর বাগানের পিছন দিকে দুটো ঝুঁঝকো সবেদা আর জামরুল গাছ। ছোটবেলায় এই গাছ থেকে ফল পেড়ে খেয়েছে দিগন্তও। গাছপালায় মিলিয়ে জায়গাটা একটু ঝুপসি মতো।

চারপাশটা ভালো করে চোখ বুলিয়ে দিগন্ত বুঝতে পারল, এখানে ট্রাঙ্কটা পড়ে থাকলে সহজে কারুর চোখে পড়া কঠিন। ছোটাও কথাটা স্বীকার করে নিল। বারান্দার শেষপ্রান্তে দেওয়ালে ঝোলানো তাকে তার ছেলে পাপাইয়ের লাটাই রাখা থাকত। কিন্তু ভুল করে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয়নি। সেটা নিতে গিয়েই ট্রাঙ্কটা চোখে পড়ে শান্তনুর।

সত্যি কথা বলতে কী দিনু, ট্রাঙ্কটা ওখানে পড়ে থাকতে না দেখলে আমি হয়তো বুঝতেই পারতাম না, যে ওটা চুরি হয়েছে।

ছোটার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সন্ধ্যামালতীর ঝোপটার চারপাশে চোখ বোলাচ্ছিল দিনু। হঠাৎ কী একটা চোখে পড়ায় নিচু হয়ে ঝোপের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে বার করে আনল একটা তুলি।

তোদের বাড়িতে ছবি আঁকে কে রে?

ছবি! কেউ আঁকে না তো…না না আমার ছেলে আঁকে। আমাদের পাশের পাড়ার বাদলের কাছে আঁকা শেখে…তবে তুলির কোনও ব্যাপার নেই। সবে তো ক্লাস থ্রি। মোম পেন্সিল ঘষে রঙ করে।

দিগন্ত তুলিটাকে নিয়ে ভাল করে ঘুরিয়ে-ফিরয়ে দেখে পকেটে রেখে দেয়। তারপর বাগানের পায়ে চলা পথ আর বারান্দাটা খুব ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে ছোটাকে বলে, চল এবার ঘরে যাই। ট্রাঙ্কটা দেখব।

বারান্দার গ্রিলের গেটের ল্যাচটা টানা ছিল। ছোটা আগেই বলেছিল, বাড়িতে জিনিসপত্র বিশেষ কিছু ছিল না বলে গ্রিলের গেটে সেদিন আর তালা লাগানো হয়নি। ঘরে ঢোকার দরজাটাতেই শুধু তালা লাগানো ছিল। তবে এই ঘটনার পর আগের তালাটা বদলে দরজায় নতুন তালা লাগানো হয়েছে। সেটা খুলে ভিতরে ঢুকল দুজনে। শীতের বিকেলের আলো ততক্ষণে মরে এসেছে। টিউবলাইটটা জ্বেলে দিয়ে কোনায় রাখা ট্রাঙ্কটা নিয়ে এল ছোটা। একেবারেই মামুলি ধরনের ট্রাঙ্ক। কালো রঙ করা। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে দিগন্তর চোখে পড়ল একপাশে সাদা রঙ দিয়ে ছোট্ট করে ইংরাজি এ আর এম অক্ষর দুটো লেখা আছে।

ট্রাঙ্কটা কি তোর মেজদার ছিল নাকি রে?

তা তো জানি না। কেন বলতো?

তোর বড়দার নাম তো বিতনু আর মেজদা অতনু তাই না?

সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে ছোটা।

ট্রাঙ্কটার গায়ে এ এম লেখা আছে, তার মানে অতনু মিত্র। সেইজন্যই মনে হল…

হতে পারে, তবে মা ঠিকঠাক বলতে পারবে।

দিগন্ত এবার মাটিতে বসে পড়ে ট্রাঙ্কের ডালাটা খুলে ফেলে। ভিতরে, ছোটা যেরকম বলেছিল সেরকমই কতগুলো শার্ট, গেঞ্জি, পাজামা রাখা আছে। জামার মাপ দেখে মনে হয়, যার জামা তিনি বেশ রোগাসোগা মানুষ। জামাগুলো বেশ পুরোনো, এবং কোনওটাই ব্র্যান্ডেড নয়। তবে দর্জির দোকানে বানানো বোঝা যাচ্ছে। তোয়ালেটাও পুরোনো হয়ে হলদে দাগ ধরে গেছে।

তুই যখন দেখলি, তখন কি জামা-কাপড়গুলো ট্রাঙ্কের বাইরে পড়ে ছিল?

না না। বাইরে কিছু ছিল না। ইনফ্যাক্ট ট্রাঙ্কের ডালাটাও লাগানো ছিল।

দিগন্ত সবগুলো কাপড়-জামা বাইরে বার করে আনে। ট্রাঙ্কের নিচে একটা খবরের কাগজ পাতা। সেটা তুলতেই চোখে পড়ে একটা ছোট্ট খাম। খামের ভিতর এক যুবকের পাসপোর্ট সাইজ সাদা-কালো ছবি।

এটা কার ছবি রে?

ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে উল্টেপাল্টে দেখে ছোটা বলে চিনতে পারছি না তো!

সে কী রে, তোদের বাড়ির কারুর ছবি নয়?

মনে তো হচ্ছে না। আমাদের তিন ভাইয়ের তো নয়ই, তুতো ভাই-দাদাদের কারুর ছবি বলেও তো মনে হচ্ছে না।

বেশ পুরোনো ছবি কিন্তু। চেহারা বদলে গেছে বলে হয়তো চিনতে পারছিস না।

না রে। আমার বাবার ছবি তোলার শখ ছিল। তাই প্রায় সব আত্মীয়স্বজনের ছবি আমাদের বাড়ির অ্যালবামে রাখা আছে। আর মায়ের অভ্যাস হল মাঝেমাঝেই সেগুলো বার করে দেখা। আমার ছেলেকেও দেখায়। সেজন্য পুরোনো ছবিতে কাকে কেমন দেখতে ছিল সেটা আমার জানা। এই ছেলেটাকে তো একেবারেই চিনতে পারছি না। তাও যদি মনে করিস, তাহলে মা-কে একবার দেখাতে পারি…

মাসিমা তো বললি পিসির বাড়িতে আছেন।

তাতে অসুবিধা নেই। পিসির বাড়ি তো কাছেই। এখানে কাজ সেরে নে, তারপর নিয়ে যাচ্ছি।

ট্রাঙ্কটা আর একবার ভালো করে দেখে নিয়ে উঠে পড়ে দিগন্ত। ছোটার বাইকে চেপে পিসির বাড়িতে পৌঁছতে মিনিট পাঁচেক লাগে। চুরির ঘটনাটা ইতিমধ্যে মাসিমা শুনেছেন। দিনুকে তিনি ছোটবেলা থেকেই চেনেন। তাই দিনু ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে জেনে খুশি হয়েছিলেন। যদিও ছবিটা হাতে নিয়ে বললেন, নাঃ, একে তো চিনি না। কোনওদিন দেখেছি বলেও মনে হচ্ছে না।

ভালো করে একটু মনে করার চেষ্টা করুন তো মাসিমা। এই ছবিটা ট্রাঙ্কের তলায় কাগজের নীচে ছিল। আমার মনে হচ্ছে ট্রাঙ্কটা মেজদার। তার মানে ট্রাঙ্কটাতে তার নিজের জিনিসপত্র থাকত। দাদার কোনও বন্ধুর ছবি হতে পারে কি?

মনে তো হচ্ছে না। এমনিতেই ছোটার যেমন অনেক বন্ধু-বান্ধব, ওদের মোটেই সেরকম ছিল না। অন্তু তো আবার একটু বেশিই চুপচাপ ছিল। অল্প যে কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব আসত, তাদের সবাইকেই আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে।

অন্য কেউ…আত্মীয়-স্বজন…কেউ এসেছিল বাড়িতে…

চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে বেশ গভীরভাবে চিন্তুা করেন মাসিমা, তারপর হঠাৎ একটু উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠেন, দাঁড়া দাঁড়া, মনে পড়েছে… ওর নাম ছিল…অভীক…হ্যাঁ, অভীকই তো মনে হচ্ছে। তোর মেসোমশাই অভি বলে ডাকতেন। ওনার থেকে ছোটই ছিল বেশ কয়েক বছরের। সে তো অনেকদিনের কথা রে, বিট্টু, মানে বিতনুই তখন খুব ছোট। অন্তু হয়নি।

ছেলেটি কি আপনাদের কোনও আত্মীয়?

না, আত্মীয় নয়। আমার শ্বশুরমশাইয়ের এক বন্ধুর ছেলে। ও আমাদের বাড়িতে এসে প্রায় মাস তিনেক ছিল। আসলে তখন তো নকশাল আমল, চারিদিকে গণ্ডগোল চলছে। অভীকের বাবা ছিলেন ছোটার দাদুর কলেজের বন্ধু। ছেলেটা বোধহয় কোনও গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়েছিল। কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকার দরকার ছিল। পুলিশ পিছনে লেগেছিল। তখনই ওর বাবা অভীককে আমাদের বাড়িতে দিয়ে যান। ওর ঘর থেকে বেরোনো মানা ছিল। আমরাও বাইরের কেউ আসলে ঘরের দরজাটা বন্ধ রাখতাম। বেশ ভয়ে ভয়েই থাকতে হত। তারপর একদিন আবার ওর বাবা মাঝরাতে এসে চুপিচুপি ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন। পরে তোর মেসোমশাইয়ের কাছে শুনেছিলাম অভীককে নাকি বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ওঁরা কি কলকাতারই লোক ছিলেন?

মাসিমা একটু ভেবে বললেন, বোধহয় না। কলকাতার বাইরের লোক। কিন্তু কোথায় থাকতেন সেটা এখন আর আমার মনে নেই। তবে শুনেছিলাম খুবই অবস্থাপন্ন। জমিদারি ছিল বোধহয়।

পরে ছেলেটি আর কোনওদিন আসেনি?

না রে। আসলে ওর সম্বন্ধে কথাবার্তা-আলোচনা করতে ছোটার দাদু বারণ করে দিয়েছিলেন। কারণ তাহলে অভীকের বিপদের আশঙ্কা ছিল। তাই আলোচনা করতাম না। তারপর আস্তে আস্তে ভুলেই গেলাম। আজ কত বছর বাদে ছবিটা দেখে আবার অভীকের কথা মনে পড়ল। ভালো ছেলে ছিল। ময়লা রঙ, কিন্তু বড় বড় উজ্জ্বল চোখ। ছিপছিপে ছিল। আর হাতের আঙুলগুলো ছিল ভারি সুন্দর, লম্বাটে, সরু সরু…

আর কিছু মনে পড়ছে মাসিমা?

না রে। আর বিশেষ কিছু মনে নেই…ও হ্যাঁ, অভির বাবার নামটা মনে আছে, মণিভূষণ। আসলে আমার শ্বশুরের নামও তো মণিভূষণ। তাই কলেজে নাকি দুই বন্ধুকে জোড়া বলদ বলে ক্ষ্যাপাত। বাবার মুখে কথাটা শুনেছিলাম বলে মনে আছে। তবে ওরা বামুন ছিল, পদবি বোধহয় মুখার্জি।

পিসির বাড়িতে চা আর মালপোয়া খেয়ে বেরিয়ে দিগন্ত ছোটাকে বলল, ট্রাঙ্কটা ওই অভীক মুখার্জিরই বোঝা যাচ্ছে। সেইজন্যই পাশে এ এম লেখা ছিল। মাঝরাতে এক-কাপড়ে চলে গেছিল বলে নিয়ে যায়নি। হয়তো বলেছিল পরে এসে নিয়ে যাবে। তাই বাড়ির লোকে যত্ন করে রেখে দিয়ে একসময় ওটার কথা ভুলে গেছে। কিন্তু ট্রাঙ্কটার ভিতরে এমনকী থাকতে পারে যাতে ওটা চুরি করার দরকার হল? না রে ছোটা, ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। আমি একটু খোঁজ-খবর করে দেখি। তুই প্রোমোটারকে বল, আরও কয়েকটা দিন পরে বাড়ি ভাঙা শুরু করতে। আর হ্যাঁ, একটা কথা বলতো, সেদিন তোরা ওই বাড়ি থেকে জিনিসপত্র নিয়ে তালা লাগিয়ে চলে আসার পর আর কেউ কি ওখানে গেছিল? মানে আমি বলতে চাইছি, তোর কাছ থেকে চাবি নিয়ে কেউ গেছিল কিনা।

হ্যাঁ, গেছিল তো। বাবানকে নিয়ে ওর স্যার গেছিল। আসলে ফ্ল্যাটে তো তখনও কিছু গোছানো হয়নি, সব এলোমেলো হয়ে আছে। তাই সন্ধেবেলা যখন স্যার পড়াতে এল, তখন বাবানের মা চাবিটা দিয়ে দুজনকে ওই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

তার মানে বাবানের পড়া হয়ে যাওয়ার পর ওর স্যার আবার চাবিটা তোদের কাছে ফেরত দিয়ে গেছিলেন।

হ্যাঁ। আর একজনও চাবিটা নিয়েছিল বুঝলি। আমাদের প্রোমোটার। বিকেল নাগাদ এসে আমার কাছ থেকে চাবিটা চেয়ে নিয়ে গেল।

কী জন্য চাইছে, বলেছিল কিছু?

না সেরকম স্পেসিফিক কিছু বলেনি। আসলে প্রোমোটার তো আমার চেনা। বড়দার সঙ্গে পড়ত, এখন নিজের ফার্ম খুলে ব্যবসা করে। বলল, চাবিটা দে, কয়েকটা জিনিস দেখতে হবে, আমিও দিয়ে দিলাম। তাছাড়া দামি জিনিসপত্র তো আর কিছু নেই…

.

রাতে বেশ একটা কন্টিনেন্টাল ডিনারের আয়োজন করেছিল অঞ্জলি। ল্যাম্ব স্টেক, সেদ্ধ সবজি আর ব্রেড রোল। সঙ্গে ক্যারামেল পুডিং। আসলে উপলক্ষও একটা ছিল। কয়েকদিন আগেই প্রণয়ের জন্মদিন গেছে। প্রণয়, দিগন্তর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার। ওর সঙ্গে পরিচয়ের জন্যই নিজের কোনও প্রয়োজনে পুলিশের সাহায্য দরকার হলে সেটা পেতে দিগন্তর অসুবিধা হয় না। আবার কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দারাও দু-একটা ক্ষেত্রে আটকে গিয়ে যখন দিনু টিকটিকির সঙ্গে পরামর্শ করেন, তখনও মাধ্যম থাকে প্রণয়ই।

অফিসের কাজেই প্রণয়কে কয়েকদিনের জন্য বাইরে যেতে হয়েছিল। জন্মদিন সেলিব্রেট করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। তাই আজ প্রণয়কে খেতে বলেছিল অঞ্জলি। খেতে বসে ছোটাদের ট্রাঙ্ক চুরির ঘটনাটা প্রণয়কে বলল দিগন্ত।

সবটা শুনে প্রণয় একটু অবাকই, তোর মনে হচ্ছে না দিনু, যে এটা খানিকটা বুনো হাঁসের পিছনে ছোটা হচ্ছে? ট্রাঙ্কটা প্রায় চল্লিশ বছর ব্যবহার হয়নি। তার ভিতরে পুরোনো জামা-কাপড় ছাড়া আর কিছু ছিল কিনা কেউ জানে না। অথচ সেটা কে চুরি করল সেই চোরকে ধরতে হবে। এ যেন শূন্য থেকে খামচা মেরে রসগোল্লা পাড়া। আমার তো মনে হচ্ছে কাজটা গোয়েন্দার নয়, ম্যাজিশিয়ানের।

ইয়ার্কি নয় প্রণয়। প্রথমটায় আমারও তাই মনে হয়েছিল। ঘরের দরজার তালাটা যদি ভাঙা থাকত আমি ধরে নিতাম ওটা কোনো ছিঁচকে চোরের কাজ। কিন্তু তালা ঠিকঠাক বন্ধ আছে মানেই যারা চাবির দখল পেতে পারে, তাদেরই কেউ কাজটা করেছে। কিন্তু কেন? পরিচিত কেউ ট্রাঙ্কটা চাইলে আমার তো মনে হয় না ছোটা কিংবা তার বউয়ের কোনও আপত্তি হত। তাছাড়া ট্রাঙ্কটা তো নিয়ে যায়নি। ফেলে রেখে গেছে, বলা ভালো খানিকটা লুকিয়েই রেখে গেছে। সেদিন ওই ঘুড়ির লাটাই বার করতে গিয়ে বাই চান্স ছোটা ওটা দেখতে পায়। না হলে তো দু-একদিনের মধ্যে বাড়ি ভাঙা শুরু হয়ে যেত আর মিস্ত্রিরা ওটা হাপিস করে দিত। আমার মনে হয়, যে এই কাজটা করেছে তারও এরকমই ধারণা ছিল। ট্রাঙ্কটা যে চোখে পড়ে যাবে সেটা ভাবেনি।

তাহলে তুমি এখন কী করতে চাইছ?

অঞ্জলির কথা শুনে পুডিংয়ের বাটিতে চামচ ডোবায় দিগন্ত। তারপর টুকরোটা খুব আলতোভাবে জিভের ওপর রেখে তার স্বাদ নিতে নিতে বলে,আমার জানা দরকার ট্রাঙ্কটার ভিতরে কী ছিল। সেজন্য আমাকে ওই অভীক মুখার্জি লোকটিকে খুঁজে বার করতে হবে।

কী করে খুঁজে বার করবি? তার তো হোয়্যার-অ্যাবাউটস কিছুই জানিস না…

একটা ক্ষীণ সূত্র আছে…

দিগন্তর খাওয়া হয়ে গেছিল। হাত ধুয়ে চটপট টেবিলটা পরিষ্কার করে নেয় সে। প্রণয়ও সঙ্গে হাত লাগায়। বাড়তি খাবার তুলে দেয় ফ্রিজে। অঞ্জলি কফি বানাতে গেছিল। তিনকাপ গরম কফি নিয়ে সে ফিরে আসতে সোফায় আরাম করে বসে টেবিল থেকে একটা ছোট্ট খাম তুলে নেয় দিগন্ত।

এই খামটার ভিতরে ছবিটা ছিল। ফটোগ্রাফির দোকানে পাসপোর্ট সাইজ ছবির জন্য যে ছোট্ট খাম দেয় সেই জিনিস। ওপরে চার লেখা আছে। তার মানে ছবিটা চার কপি নেওয়া হয়েছিল। খামটার ভিতরে আমি প্রথমে শুধু ছবিটাই আছে ভেবেছিলাম। কিন্তু তারপর দেখলাম একটা ছোট্ট রসিদ রয়েছে। তাতে ঠিকানা লেখা রয়েছে, ১৮ নম্বর ডি এল রায় রোড, কৃষ্ণনগর। তারিখ ১০.০৩.৭২।

তার মানে বাহাত্তর সালের মার্চ মাসে, কৃষ্ণনগরের কোনও স্টুডিওতে ছবিটা তোলানো হয়েছিল।

অ্যাবসোলিউটলি। তার মানে প্রণয় বুঝতে পারছিস, মাসিমার কথা এবং ছবির তারিখ মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে ওই অভীক মুখার্জির বাড়ি সম্ভবত ছিল কৃষ্ণনগর বা তার আশপাশে। আমি যদি ধরে নিই ওই বাহাত্তর সাল নাগাদ তাঁর বয়স ছিল বছর কুড়ি। তাহলে এখন হবে ৬৬-৬৭ মতো। বেঁচে থাকাটাই খুব স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ট্রাঙ্কের ভিতরে কী ছিল তার একটা হদিস পাওয়া যেতে পারে।

আমি কিন্তু কৃষ্ণনগর গেছি দিগন্ত। বেশ বড় শহর। সেখানে শুধু নাম বলে একজন লোককে কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব?

তুমি ভুলে যাচ্ছ অঞ্জলি, আমার কাছে খুঁজে বার করার আরও দুটো সূত্র আছে। অভীক মুখার্জির বাবার নামটা আমরা জানি। আর ওনারা যে জমিদার ছিলেন, সেটাও জানি। আমার মনে হয় এই দুটো সূত্র থাকলে মফস্সল শহরে ঠিকানা খুঁজে বার করতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। তাছাড়া তোমাদের নদিয়ার যিনি করেসপনডেন্ট আছেন, তিনিও নিশ্চয় খানিকটা সাহায্য করতে পারবেন…

অঞ্জলি পেশায় সাংবাদিক। পশ্চিমবঙ্গের সব জেলাতেই তাদের কাগজের একাধিক প্রতিনিধি আছেন। দিগন্তর কথায় তাই সায় দেয় সে, হ্যাঁ সেটা অসুবিধা হবে না। কৃষ্ণনগর শহর আর আশপাশের খবর দেয় মানস। ওকে বলতে পারি ডিটেলে খোঁজ নিতে।

না না, ডিটেলে নয়। তুমি শুধু বাবার নামটা বলে তাঁদের কোনও ফ্যামিলি আছে কিনা, থাকলে বাড়িটা কোথায়, এটুকু জেনে নিও। কী কারণে জানতে চাইছ সেটা বোলো না। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে যে অভীক মুখার্জি ছিলেন নকশাল। পুলিশের খাতায় তাঁর নাম ছিল। এই অতীত নিয়ে নাড়া-ঘাঁটা তিনি পছন্দ নাও করতে পারেন। তাই একটু সাবধানে এগোতে হবে।

শিয়ালদা স্টেশন থেকে লালগোলা প্যাসেঞ্জার ছাড়ল ঠিক সাড়ে সাতটায়। একে শীতকাল, তায় রবিবার। ট্রেন বেশ ফাঁকাই। মুখোমুখি সিটে জানলার ধারে বসেছে দিগন্ত আর অঞ্জলি। দিগন্তের পাশে প্রণয়।

কৃষ্ণনগরের করেসপনডেন্ট, মানসের সঙ্গে অঞ্জলি কথা বলেছিল সোমবারেই। দিন দুয়েক পরে মানস জানায় যে মুখার্জি পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে তাদের বাড়িটা ঠিক কৃষ্ণনগর শহরে নয়। ঘূর্ণি, মানে যেখানকার মাটির পুতুল বিখ্যাত, সেখানে। বগুলার দিকে ওদের জমিদারি ছিল। এখনও আছে কিনা কিংবা বাড়িতে এখন কারা থাকেন সে বিষয়ে অবশ্য মানস কিছু জানে না। তবে দরকার হলে খোঁজ নিতে পারে।

মানসের যে আর কোনও খোঁজ নেওয়ার দরকার নেই সেটা জানিয়ে দিতে বলে, দিগন্ত সেদিনই ঠিক করে ফেলে পরের রবিবার কৃষ্ণনগর যাবে। সকালের ট্রেনে গিয়ে বিকেলে ফেরা। জানতে পেরেই অঞ্জলি আর প্রণয়ও ঝুলে পড়ল। শীতের দিন এমন একটা আউটিং, কেই-বা মিস করতে চায়? অতএব, সকাল সকাল ট্রেনে উঠে পড়েছে থ্রি মাসকেটিয়ার্স।

ট্রেন ছাড়ার একটু পরেই দুধারে মফস্সলের গন্ধমাখা শহরের আড়মোড়া ভেঙে দিন শুরুর ছবি, বন্ধ কিংবা খোলা কারখানার পাঁচিল, এলোমেলো রাস্তা, হুশ করে পেরিয়ে যাওয়া সিনেমা হল। নদিয়ায় ট্রেন ঢুকতে অবশ্য ছবিটা বদলে গেল অনেকটাই। ধান উঠে গেছে। তবে তিন ফসলি মাটিতে চাষীরা ইতিমধ্যেই বুনে দিয়েছে আলু আর সরষে। হলুদ ফুলের বন্যার মাঝে মাঝে তিল-তিসির নীল-সাদা টুকরো।

লাল শালুতে ঢাকা ঝুড়ি থেকে গরম সিঙাড়া আর মাটির ভাঁড়ে চা খাওয়া হয়ে গেছে। নোনতা বাদামের প্যাকেটগুলো শেষ হতে হতেই রানাঘাট এসে পড়ল।

আর মিনিট কুড়ি লাগবে, বুঝলি।

দিগন্তর কথা শুনে প্রণয় উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পাগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, কীভাবে শুরু করবি কিছু ভেবেছিস?

খুব বেশি কিছু তো করার নেই। ঘূর্ণিতে গিয়ে প্রথমে বাড়িটা খুঁজে বার করব। অভীক মুখার্জি যদি এখানে থাকেন, তাহলে তো সবথেকে ভালো। যাঁরা বিপদের সময় ওনাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য এরকম একটা সামান্য সাহায্য করতে উনি নিশ্চয় আপত্তি করবেন না। আর যদি উনি না থাকেন, তাহলে ওনার ঠিকানা নিয়ে, বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে চলে আসব।

মফস্সলের লোকেরা কিন্তু একটু সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত হয়।

জানি তো। সেজন্যই অঞ্জলি আসবে বলায় আমি ওরকম এককথায় রাজি হলাম। সঙ্গে বউ থাকলে লোকে একটু সমীহের চোখে দেখে, চ্যাংড়া ছোঁড়া ভাবে না। নাহলে তো একলাই আসার প্ল্যান ছিল।

কেন আমি সঙ্গে থাকলে তোমার কী অসুবিধা হয় শুনি?

না, অসুবিধা কিছু নেই। তবে তুমি আবার একটু ভোজনরসিক তো। বুঝলি প্রণয়, মানসের কাছ থেকে এরমধ্যেই জেনে নিয়েছে হাইস্ট্রিটে নাকি সুপ্রিয়া বলে একটা হোটেল আছে, সেখানকার সরষে বাটা দিয়ে পার্শে মাছ আর বোয়ালের ঝাল বিখ্যাত। তাই দুপুরের খাবারটা সেখানেই খেতে হবে। তাছাড়া কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া আর সরভাজার বেজায় নাম-ডাক। তাই ওটা শুধু খেলে হবে না, নিয়েও আসতে হবে…ট্রেনে তো দেখলিই, সিঙাড়া, বাদাম, ঝালছোলা আরও কী কী সব যেন এরমধ্যেই খাওয়া হয়ে গেছে।

বেশ হয়েছে। এবার তিলকূট খাব। একটু আগে একটা লোক নিয়ে যাচ্ছিল, দেখে রেখেছি। এদিকে আবার এলেই ডাকব…

অঞ্জলির কথা শুনে হো হো করে হেসে ওঠে প্রণয়।

কৃষ্ণনগরে ট্রেন পৌঁছাল সকাল দশটায়। স্টেশন থেকেই একটা টোটো ভাড়া করে তিনজন রওনা দিল ঘূর্ণির দিকে। পুরোনো শহর। রাস্তাঘাট সরু। দুপাশে দোকান-ঘর। মাঝে মাঝেই ছোট-খাটো মন্দির। ছুটির দিনে আলোয়ান গায়ে দিয়ে রোদে দাঁড়িয়ে গল্প করছে লোকজন। জীবন চলছে আলস্যের আমেজ গায়ে মেখে ঢিমে তালে।

ঘূর্ণিতে পৌঁছে মুখার্জি বাড়িতে যাবে শুনে টোটোওলা জিজ্ঞাসা করল, মুখার্জি ভিলা কি?

হ্যাঁ, তাই মনে হয়…

একটু ইতস্তত করে জবাব দেয় দিগন্ত।

আমি চিনি। চলুন নিয়ে যাচ্ছি। দাদারা কি আজই ফিরবেন নাকি?

হ্যাঁ, সেরকমই ঠিক করেছি।

তাহলে কোন ট্রেনে ফিরবেন বলে দিলে আমি চলে আসব। আর যদি মনে করেন শহর ঘুরে দেখবেন, তাও নিয়ে যেতে পারি। ঘূর্ণির পুতুলপট্টি, খড়ে নদী, পুরোনো চার্চ, রাজবাড়ি সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব।

না ভাই, আমাদের একটা কাজ আছে। সেটা আগে সারতে হবে।

ঠিক আছে, আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে দিচ্ছি। দরকার হলে ডেকে নেবেন।

মুখার্জি ভিলার সামনে তাদের তিনজনকে নামিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেল টোটোওলা। বেশ বড় বাড়ি। দোতলায় টানা ঝুলবারান্দা। তার ওপাশে গোটা তিনেক ঘর এপাশ থেকেই দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি ঘরের জানলাতেই এসি মেশিন লাগানো। একতলার ডানদিকের একটা ঘর থেকেও এসি মেশিনের নাক বেরিয়ে আছে। কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর অবস্থান বলে কৃষ্ণনগরে ঠান্ডা এবং গরম দুটোই খুব জোরদার। কিন্তু তবু একটা বাড়িতে এতগুলো এসি মেশিন দেখে একটু অবাকই লাগছিল দিগন্তর। আরও একটু অবাক লাগল দোতলার বারান্দা থেকে একটা বড় লাল সাইনবোর্ডে মুখার্জি ভিলা লেখা ঝোলানো দেখে।

গেট পেরোলে, বেশ অনেকটা বাগান। নানারকম গাছ আছে। তার মধ্যে আম, জাম, আমলকি, বকুল এগুলো চেনা। একটা মাধবীলতার ঝাড় উঠেছে গা বেয়ে। নুড়ি বেছানো রাস্তা ধরে খানিকটা এগোলে পোর্টিকো। তারপর দুধাপ সিঁড়ি উঠে ঘরে ঢোকার দরজা। সেটা খোলাই ছিল। ভিতরে ঢুকে দিগন্ত দেখল একটা ছড়ানো বসার জায়গা। পুরোনো আমলের সোফা সেট দিয়ে সাজানো। বড় সোফার পিছনে একটা মস্ত অয়েল পেন্টিং। সম্ভবত, এই বাড়িটারই একটা ছবি। একপাশে অনেকটা রিসেপশন ডেস্কের মতো একটা টেবিল। তার পিছনে একজন ভদ্রলোক বসে মন দিয়ে কাগজ পড়ছিলেন। তাদের ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি হাতের কাগজটা রেখে অতি বিনয়ের সঙ্গে হাতজোড় করে বললেন, নমস্কার, নমস্কার, ভিতরে আসুন…

দিগন্তরা ভিতরে ঢুকে চারপাশটা দেখছে, ভদ্রলোক তাড়াতাড়ি নিজের ডেস্ক থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ঘর খালি আছে। যদি রাতে থাকতে চান অসুবিধা নেই। আর যদি খাওয়া-দাওয়া করে, শহর দেখে ফিরে যাবেন ভাবেন, তাহলেও হাফ প্রাইসে করে দেব।

এটা কি কোনও হোটেল, মানে রিসর্ট জাতীয় কিছু?

দিগন্তর কথা শুনে প্রথমটায় ভদ্রলোকের চোয়াল ঝুলে পড়ল। তারপরেই অবশ্য অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ। মানে আমি অন্তত সেরকমই জানি। আপনারা কি অন্য কিছু ভেবেছিলেন?

আপনিই এটার মালিক?

এবার ভদ্রলোকের চোখে সন্দেহ ঘনিয়ে এল।

কেন বলুন তো?

প্রণয় আর অঞ্জলি একটু অস্বস্তি বোধ করছে বুঝে দিগন্ত আর কোনও ধোঁয়াশার মধ্যে না গিয়ে সরাসরি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, নমস্কার, আমার নাম দিগন্ত দেব। কলকাতার কলেজে বাংলার অধ্যাপক। আমি একটা ব্যক্তিগত দরকারে মুখার্জি পরিবার, মানে মণিভূষণ মুখার্জির পরিবার সম্পর্কে কিছু খোঁজখবর নিতে এসেছিলাম। আপনি কি তাঁদের সম্পর্কিত কেউ?

এবার ভদ্রলোকের মুখে খানিকটা স্বস্তির ভাব ফোটে, আজ্ঞে না। আমি সমর বিশ্বাস। এই বাড়িটা কিনেছি। কিন্তু আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন। একটু চা দিতে বলি?

না না, তার কোনও দরকার নেই…

দিগন্তর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে ভদ্রলোক হেসে বললেন, আরে চা-ই তো খাওয়াব বলেছি। কৃষ্ণনাগরিক আমরা। সৌজন্য ছাড়া দেওয়ার কিছুই নেই। হারু, এঘরে তিন কাপ চা দে। শোন আমাকেও একটু দিস।

উল্টোদিকে সোফায় গুছিয়ে বসে বিশ্বাসমশাই বললেন, দেখুন আমি মুখার্জি বাড়ির কেউ নই ঠিকই, তবে কৃষ্ণনগরেরই ছেলে। পাল পাড়ায় বাড়ি। এই রাস্তা দিয়েই আমাকে স্কুলে যেতে হত। তাই বাড়িটা আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। মণিভূষণ মুখুজ্যেকেও দেখেছি। উনি ছিলেন জমিদার। আমাদের মতো আমজনতার সঙ্গে কোনও ওঠাবসা ছিল না। তবে ওর ছেলে অবশ্য ঠিক বাপের মতো নয়। মাটিতে পা রাখা মানুষ। তো মণিভূষণবাবু মারা যাওয়ার পর বাড়িটা ফাঁকাই পড়ে ছিল।

কেন অভীক মুখার্জি এখানে থাকতেন না?

না না। উনি তো বহুকাল বিদেশে, মানে ফ্রান্সে। যতদূর জানি উনি নকশালদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। খুন-খারাপি কিছু করেছিলেন কিনা জানি না, তবে পুলিশের খাতায় নাম উঠে গেছিল। অল্পবয়স, রক্তগরম হলে যা হয় আর কী। বাপ টের পেয়ে এদিক-ওদিক টাকা খাইয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। তারপর আর ফেরেনি। ওখানেই বিয়ে-থা করে সেটল করেছিলেন।

বাড়িটা কি আপনি অভীক মুখার্জির কাছ থেকেই কিনেছিলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ। উনিই তো একমাত্র উত্তরাধিকারী। মণিভূষণ মুখুজ্যের আর কোনও ছেলেপুলে ছিল না। আসলে কৃষ্ণনগর ক্রমশ ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে ডেভেলপ করছে। আমার এমনিতে একটা ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা আছে। মনে হচ্ছিল এই সময় এখানে যদি একটা রিসর্ট মতো করতে পারি তাহলে ফিউচারে ভালো রোজগার হবে। তাই বাপ মারা যাওয়ার বছর দু-তিন পরে যখন শুনলাম ছেলে বাড়িটা বিক্রি করে দেবে, তখন ঠিকানা নিয়ে যোগাযোগ করলাম। চিঠিতেই সব কথাবার্তা হয়ে গেছিল। অভীক মুখার্জি এক সপ্তাহের জন্য এসে, সই-সাবুদ করে পাট চুকিয়ে চলে গেলেন। আমি বাড়ির সঙ্গে আসবাবপত্রও বেশ কিছু কিনেছিলাম। আসলে জমিদার বাড়ির অ্যামবিয়েন্সটা রাখতে চেয়েছি, বুঝলেন তো। সঙ্গে আধুনিক ফেসিলিটি। এটাই আজকাল ট্যুরিস্টরা চায়। এই তো দেখবেন বড়দিনের সময় জায়গা দিতে পারব না এমন ভিড় হবে…

চা খাওয়া হয়ে গেছিল। কাপটা নামিয়ে রেখে দিগন্ত বলল, ওনার ফ্রান্সের ঠিকানাটা আমায় দিতে পারবেন?

কেন পারব না? তবে তাতে কোনও লাভ নেই মশাই। অভীক মুখার্জি বছর দুয়েক হল মারা গেছেন। ওনাদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় আমাদের পাড়ায় থাকে। তার কাছ থেকেই খবরটা শুনেছিলাম। বিয়ে তো এক ফরাসি মহিলাকে করেছিলেন। তিনি এখনও ওই ঠিকানায় থাকেন কিনা বলতে পারব না। একটা ফোন নম্বরও আছে। সেটাও দিয়ে দেব।

সমরবাবুর কাছ থেকে অভীক মুখার্জির ঠিকানা আর ফোন নম্বর নেওয়া হল। নিজের ফোন নম্বরটাও উনি দিয়ে দিলেন, যদি কোনও দরকার হয়। তারপর টোটোয় চেপে ঘূর্ণির পুতুল পট্টি, রাজবাড়ি, খালের ধারের বিশাল চার্চ, খড়ে নদী দেখে খেতে যাওয়া হল সুপ্রিয়া হোটেলে। রান্না সত্যিই ভালো। সেখান থেকেই ঠিকানা জেনে নেদের পাড়ার বিখ্যাত অধরের দোকান থেকে সরপুরিয়া আর সরভাজা কিনে ফিরতি ট্রেন ধরতে আসার সময় প্রণয় জিজ্ঞাসা করল, দিনু, তুই তখন থেকে ওরকম ভুরু কুঁচকে আছিস কেন বলতো?

হ্যাঁ, আমিও লক্ষ্য করেছি। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম কৃষ্ণনগরে ক্রিশ্চান মিশনারীদের এই বাড়বাড়ন্তটা মোটামুটি কতদিনের, তার কোনও উত্তরই দিল না। অথচ এসব ব্যাপারে তো ওর সাংঘাতিক আগ্রহ।

তোর কি মনে হচ্ছে অভীক মুখার্জি যেহেতু মারা গেছেন, তাই ওই ট্রাঙ্কে কী ছিল সেটা আর কোনওভাবেই জানা সম্ভব নয়?

না তা নয়, মাথা নাড়ে দিগন্ত।

আমার কেবলই মনে হচ্ছে একটা কিছু যেন আমি মিস করে গেলাম। কিন্তু সেটা যে কী কিছুতেই বুঝতে পারছি না। আসলে এরকম নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি করে মনটাও খানিকটা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। ট্রেনে যদি বসার ঠিকঠাক জায়গা পাই তাহলে চুপ করে বসে ভাবতে হবে।

প্রথমে বেশ খানিকটা ভিড় থাকলেও রানাঘাটে কম্পার্টমেন্টটা মোটামুটি খালি হয়ে গেল। জানলার ধারের সিটটা দিগন্তকে ছেড়ে দিল অঞ্জলি। তারপর তিন প্যাকেট লোক্যাল চিপস কিনে খেতে খেতে গল্প করতে লাগল প্রণয়ের সঙ্গে। সারাটা রাস্তা চিন্তিত মুখে চুপ করে বসে রইল দিগন্ত। ট্রেন যখন দমদমে দাঁড়িয়ে আছে, তখন হঠাৎ অঞ্জলি লক্ষ্য করল দিগন্ত, সোজা হয়ে বসে জানলার বাইরে খুব মন দিয়ে কী যেন দেখছে। যেদিকে দিগন্ত তাকিয়ে আছে, সেখানে প্ল্যাটফর্মের ওপর একটা লোক মাটিতে বসে ছবি বিক্রি করছে। তার পিছনের দেওয়ালে নানারকম সস্তা সিন-সিনারির ছবি টাঙানো।

শিয়ালদায় ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে দিগন্ত, তোরা একটু দাঁড়া তো, বলে একপাশে একটু ফাঁকা জায়গায় সরে গিয়ে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলে যখন ফিরল, তখন প্রণয় আর অঞ্জলি দুজনেই বুঝল তার ঝিমিয়ে পড়া ভাবটা বেশ খানিকটা কেটে গেছে। যদিও কী সমস্যা হচ্ছিল এবং সেটার কোনও সমাধান হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে দিগন্ত মুখ খুলল না।

শিয়ালদা থেকে প্রণয় নিজের বাড়ি চলে গেল। দিগন্ত আর অঞ্জলি যখন ভবানীপুর পৌঁছল তখন আটটা বেজে গেছে। কাজের মাসি রান্নাবান্না করে রেখে গেছে। সারাদিন টো টো করে ক্লান্ত অঞ্জলি জামা বদলে একটু বিশ্রাম নেবে ঠিক করল। দিগন্ত কিন্তু বাড়ি ফিরে জুতোটা ছেড়েই বসে গেছে ইন্টারনেট নিয়ে। একটু পরেই তার প্রবল ডাকাডাকিতে বিছানা থেকে উঠে এল অঞ্জলি।

এই দ্যাখ, গুগল খুঁজে বার করলাম। অভীক এম, মানে অভীক মুখার্জি ফ্রান্সের একজন বিখ্যাত আর্টিস্ট। ভদ্রলোক কায়দা করে নামের বানানটা একটু বদলে এ-র বদলে ও করে নিয়েছেন। আর মুখার্জি না লিখে শুধু এম লেখেন। তবে বাকি সব মিলে যাচ্ছে। চেহারাটাও সাংঘাতিক কিছু বদলায়নি। ছবিটার সঙ্গে মেলাতে অসুবিধা হয় না…

কী ব্যাপারটা বলতো? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

বলছি। ভালো করে শোন। কৃষ্ণনগরের ওই মুখার্জি ভিলায়, সোফার পিছনে একটা মস্ত অয়েল পেন্টিং ছিল মনে আছে। ওই বাড়িটারই একটা ছবি…বেশ পাকা আর্টিস্টের আঁকা দেখলেই বোঝা যায়। আমি সেটা দেখেছিলাম। যদিও তখন কিছু মনে হয়নি, তাই ভুলেও গেছিলাম। সেজন্যই ফেরার সময় বারবার মনে হচ্ছিল কী যেন মিস করে যাচ্ছি। দমদম স্টেশনে একটা লোককে ছবি বিক্রি করতে দেখে কথাটা মনে পড়ল। শিয়ালদায় নেমেই তাই সমরবাবুকে ফোন করেছিলাম। উনি বললেন যে ছবিটা অভীক মুখার্জির নিজের আঁকা। ছবির নিচে নাকি ওএম সই করাও আছে। কিন্তু ছবির নিচের দিকটা সোফায় ঢেকে গেছে বলে চোখে পড়েনি। সমরবাবু এটাও বললেন যে উনি শুনেছেন, অভীক মুখার্জি নাকি ফ্রান্সে ছবি আঁকার কাজই করতেন। কথাটা শুনেই আমার সন্দেহ হল। তারপর ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দেখি ওভীক এম ফ্রান্সের একজন রীতিমত খ্যাতনামা আর্টিস্ট। ভারতীয় টাকায় তাঁর এক একটা ছবির দাম বেশ কয়েক লক্ষ টাকা।

কিন্তু তার সঙ্গে ওই ট্রাঙ্কের…

বোঝার চেষ্টা কর অঞ্জলি। ছেলেটি আত্মগোপন করে ছিল। একলা ঘরে সারাদিন থাকত। খুব স্বাভাবিক যে, সময় কাটানোর জন্য ছবি আঁকত। সেই ছবিগুলো ট্রাঙ্কে রাখা ছিল। কিন্তু হঠাৎ মধ্যরাতে বাবা নিয়ে চলে যাওয়ায় সেগুলো সঙ্গে নিতে পারেনি। নিশ্চয় ভেবেছিল পরে এসে নিয়ে যাবে। বাড়ির লোকেরাও ট্রাঙ্কটা খোলেনি। ছবিগুলো ভিতরেই থেকে গেছে। কিন্তু এখন যদি অভীক মুখার্জির অরিজিনাল পেইন্টিং কেউ বাজারে আনতে পারে তাহলে তার কত দাম হবে আন্দাজ করতে পারছ?

এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার! তোমার কি মনে হচ্ছে, ওইজন্যই ট্রাঙ্কটা চুরি হয়েছিল? কিন্তু ছবিগুলো যে ওখানে আছে সেটা ছোটার বাড়ির লোক ছাড়া অন্য কেউ জানবে কী করে? ছোটারাও তো জানত বলে মনে হচ্ছে না।

অঞ্জলি আমি নিশ্চিত যে ছবিগুলোর জন্যই ট্রাঙ্কটা চুরি হয়েছে। ট্রাঙ্কটার পাশে আমি একটা তুলি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। গড়িয়াহাটে কুমারস কনসার্ন বলে একটা দোকান আছে, তারা ছবি আঁকার জিনিসপত্র বিক্রি করে। সেখানে গিয়ে তুলিটা দেখাতে ওরা বলল যে সেটা বেশ দামি বিদেশি তুলি। আর্টিস্টরা ব্যবহার করে। তবে জিনিসটা পুরোনো। ইদানীং ওই কোম্পানির তুলি আর ব্যবহার হয় না। ট্রাঙ্কে হয়তো রঙের কৌটোও ছিল। চোর সেগুলোও বগলদাবা করেছে। একটা জিনিস নিশ্চিত অঞ্জলি, চুরিটা যে করেছে, সে ছবি চেনে। সব জেনে-বুঝেই চুরিটা করেছে।

এখন তাহলে ছোটাকে সবকিছু বলবে তো?

একটু চুপ করে থেকে দিগন্ত বলে, না এখনই বলব না। তুমি যে কথাটা বললে সেটা তো ঠিকই। ছবিগুলো যে ওখানে আছে সেটা জানার সম্ভাবনা আর চুরি করার সুযোগ দুটোই ছোটা আর ছোটার বউয়েরই সব থেকে বেশি। ছবিগুলোর কথা যে ওরা আদৌ জানত না সেটা ওদের মুখের কথা। কোনও প্রমাণ তো নেই।

কিন্তু খামোখা নিজের জিনিস নিজে চুরি করে চোর ধরার জন্য তোমাকে ডেকে নিয়ে যাবে কেন?

খুব সহজ। ছবিগুলো যদি ওদের পারিবারিক সম্পত্তি বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে ছবি বিক্রির টাকার ভাগ তো ছোটার দাদারা এবং মাসিমাও পাবেন। সেক্ষেত্রে চুরি হয়েছে বলে রটিয়ে দিয়ে পরে লুকিয়ে বিক্রি করলে পুরোটাই ছোটার লাভ। আমাকে ডাকলে, পরবর্তী সময় যদি কোনওভাবে কথাটা জানাজানি হয়, তাহলে চুরি যে সত্যিই হয়েছিল তার একেবারে অকাট্য প্রমাণও থাকবে।

দিগন্তর কথাটা শুনে মুখটা একটু গোমড়া মতো করে অঞ্জলিকে চুপ করে থাকতে দেখে দিগন্ত বলল, কথাটা তোমার পছন্দ হচ্ছে না বুঝতে পারছি। কারণ ছোটা আমাদের বন্ধু। কিন্তু গোয়েন্দাগিরি করার সময় আমাকে তো সব অপশন খোলা রাখতে হবে। যদিও আমার নিজের ধারণা এক্ষেত্রে ছোটার পক্ষে কাজটা করা কঠিন। আমি তো ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি। ছবি সম্বন্ধে স্কুলের ড্রইং ক্লাস ছাড়া আর বিশেষ কোনও ধারণাই ওর নেই। কিন্তু তবু আটঘাট বেঁধে এগনই ভালো।

.

মীনাক্ষী দিব্যি মুচমুচে পনির পকোড়া বানিয়েছে। পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা আর ধনে পাতা দেওয়া। সঙ্গে গরম কফি। কিন্তু মাথার ভিতরটা নানারকম চিন্তায় এমন ঠাস বুনোট হয়ে আছে যে কোনও কিছুতেই যেন তেমন স্বাদ পাচ্ছিল না দিগন্ত। তবে মুখ দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। সোফায় আরাম করে বসে কফির কাপে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে নিজের নোটবুকটা খুলে দিগন্ত বলল, ছোটা খুব ভালো করে ভেবে বল তো, সেদিন তোরা ওই বাড়িতে তালা লাগিয়ে চলে আসার পর, মানে ট্রাঙ্কটা ঠিক জায়গাতে আছে শেষবার দেখার পর, আর কে কে ওখানে গেছিল?

ভিতরে ঢুকতে হলে চাবি লাগবে। নকল চাবি যদি নেই ধরে নিই, তাহলে আসল চাবিটাই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাই কে কে চাবি নিয়ে ও বাড়িতে ঢুকেছিল, সেটা প্রথমে জানা দরকার।

বেশ, এক এক করে বলছি। জিনিসপত্র গুছিয়ে আমি আর বাদল বেরিয়েছি একদম শেষে। বাদল আবার মোবাইলটা ফেলে এসেছিল, সেটা নিল…

বাদল কে?

আমাদের পাড়ারই ছেলে পাশের গলিতে থাকে। বাড়ি বদলানোর হ্যাপা সামলানোর জন্য ওকে ডেকে নিয়েছিলাম।

দরজায় তালা কে লাগিয়েছিল?

আমিই তালা লাগিয়েছিলাম। চাবিও আমার কাছেই ছিল। বাদল বাইকের পিছনে উঠল, আমি চালিয়ে নিয়ে এলাম।

আচ্ছা বেশ। তারপর…

তারপর তো চাবি আমি বাড়িতে রেখে দিয়েছিলাম। বিকেলে, ওই ধর সাড়ে চারটে হবে, সুব্রতদা মানে আমাদের প্রোমোটার এল। আমরা তখন চা খাচ্ছিলাম। বলল, চাবিটা দে মিস্ত্রিকে কয়েকটা জিনিস দেখাতে হবে। মীনাক্ষী চা খেয়ে যেতে বলল, কিন্তু বসল না। বলল মিস্ত্রি বাইকে বসে আছে। তাই চাবিটা নিয়ে চলে গেল।

কতক্ষণ পরে চাবিটা ফেরত দিয়ে গেল?

পঁয়তাল্লিশ মিনিট হবে…আমি পাম্প চালাতে নীচে গেছিলাম, আমার হাতেই চাবিটা দিল।

মিস্ত্রি কি তখনও সঙ্গে ছিল?

ছোটা একটু ভেবে বলল, না, মিস্ত্রি ছিল না। সুব্রতদা চাবিটা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি দেখলাম গেটটা খোলা রয়েছে। তাই লাগাতে গেছিলাম। বাইকটা তখন বেরিয়ে যাচ্ছে…সুব্রতদা একাই ছিল…কিন্তু তুই এতসব জানতে চাইছিস কেন বলতো দিনু?

পরে বলব, আগে নিজে আরও একটু নিশ্চিত হয়ে নিই। প্রোমোটারের পর আর কে চাবি নিয়েছিল?

বাবানের স্যার এসেছিলেন ছ’টা নাগাদ। মীনাক্ষী ওঁর হাতে চাবি দিয়ে দুজনকে ওবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

তারমানে স্যার যতক্ষণ ওবাড়িতে ছিলেন, বাবানও ততক্ষণ ওনার সঙ্গে ছিল?

হ্যাঁ, তা তো ছিলই।

ছোটা, বাবানকে একবার জিজ্ঞাসা কর তো, পড়ানোর ফাঁকে স্যার ট্রাঙ্ক নিয়ে কিছু করছিলেন কিনা।

জিজ্ঞাসা করেছিলাম রে। তুই সেদিন যখন আমার কাছে জানতে চাইলি ও বাড়িতে আর কে কে গেছিল, তখনই বাড়ি ফিরে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ও বলল যে স্যার ট্রাঙ্কে হাত দেয়নি।

স্যার কি ওকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সময় চাবিটাও ফেরত দিয়ে গেছিলেন?

কথা-বার্তার মধ্যে মীনাক্ষীও এককাপ কফি নিয়ে এসে বসেছে। ছোটা কিছু বলার আগেই সে বলল, না দিনুদা। স্যার মানে অনুপম সেদিন বাবানকে সিঁড়ির মুখে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছিল। ওর মায়ের ব্লাড রিপোর্ট নিতে হবে, ল্যাব বন্ধ হয়ে যাবে বলে তাড়া ছিল। আধঘণ্টা পরে এসে চাবিটা ফেরত দিয়ে গেল।

কথাটা শুনেই চোখের দৃষ্টি সতর্ক হয়ে গেল দিগন্তর।

ব্লাড রিপোর্ট কোথা থেকে আনতে গেছিল জান?

তা তো বলতে পারব না, তবে মনে হয় নির্ণয় থেকেই হবে। এই অঞ্চলের ওটাই সবথেকে ভালো ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

বাবানের হাতে ও চাবিটা দেয়নি?

না, সেটা আমিই বারণ করেছিলাম। যা ছটফটে ছেলে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চাবি কোথায় ফেলে দেবে তার কোনও ঠিক নেই।

অনুপম বাবানকে নামিয়ে দিয়ে গেল কখন, তোমার মনে আছে?

তা আছে। তখন ঠিক সাড়ে সাতটা। মিষ্টি-মৌরি সিরিয়ালটা শেষ হয়েছিল বলে আমি চা করতে উঠেছিলাম।

অনুপমের ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু বলতো ছোটা।

ব্যাকগ্রাউন্ড তেমন কিছু না। দীনেশনগরে থাকে। এবছর এমএ পরীক্ষা দেবে, ইংলিশ অনার্স। পড়াশোনায় ভালোই। একবছর হল বাবানকে পড়াচ্ছে। ভালো পড়ায়। তাছাড়া ছেলেটি খুবই ভদ্র। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছিল। কখনও খারাপ কিছু মনে হয়নি।

অনুপমের পর আর কেউ সেদিন রাতে ওবাড়িতে যায়নি?

ছোটা মাথা নাড়ে। কিন্তু মীনাক্ষী বলে ওঠে, আরও দুজন গেছিল। প্রথমজনের কথা ও জানে না। সে হল আমার বোন তিতলি। আমার বাপের বাড়ি তো জানই, দুটো গলি পরে। তিতলি সন্ধেবেলায় আমার কাছে এসেছিল। ওর আবার খুব গাছপালার শখ। দুটো গাছের চারা ওর জন্য আনা হয়েছিল। সেগুলো আর এখানে নিয়ে আসিনি। সামনের ঘরে রাখা ছিল। সেদুটো নেওয়ার জন্য গেছিল।

চারা নিয়ে তোমাকে চাবিটা দিয়ে গেছিল?

হ্যাঁ তো। একটু পরেই দিয়ে গেল। তবে আর ওপরে ওঠেনি। নিচ থেকে ডাকল, ঠিকে কাজের মেয়েটা ছিল, ও গিয়ে নিয়ে এল।

চারাগুলো নিয়ে গেল কীভাবে?

একটা বড় বিগ শপার এনেছিল নিয়ে যাওয়ার জন্য।

একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি মীনাক্ষী, কিছু মনে কোরো না। তিতলি যখন চাবি নেওয়ার জন্য ডাকল, তখন তুমি নিশ্চয় বারান্দায় গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলেছিলে?

মাথা নাড়ে মীনাক্ষী।

ওর হাতে বিগ শপার ছাড়া আর কিছু ছিল কি?

একটুক্ষণ চিন্তা করে মাথা নাড়ে মীনাক্ষী, না, আর কিছু ছিল না। তবে ব্যাগের ভিতরে গোল করে পাকানো একটা কিছু ছিল। ড্রইং সিট রোল করে রাখলে যেমন হয়, তেমন। কিন্তু কেন বলুন তো দিনুদা, এত কথা জানতে চাইছেন কেন?

মীনাক্ষীর প্রশ্নটাকে গুরুত্ব না দিয়ে দিগন্ত ফের জিজ্ঞাসা করে, তোমার বোন কি পড়াশোনা করছে?

না না। এম এ টা তো করল না। বিএ পাস করে এখন দৈনিক বার্তায় চাকরি করছে। সেও হয়ে গেল বছর খানেক।

আচ্ছা, আর দ্বিতীয়জনটি কে শুনি?

আপনার বন্ধু নিজে!

আমি, আমি আবার কখন গেলাম?

খাওয়া-দাওয়া পর তুমি একবার চাবিটা নিয়ে বেরোলে না? বললে আলোগুলো সব নেভানো হয়েছে কিনা একবার দেখে আসি…

হ্যাঁ, কিন্তু আমি তো আর বাড়িতে ঢুকিনি। বাইরে থেকে দেখলাম অন্ধকার, তখন ঘুরে চলে এলাম। আসলে এতো বছরের স্মৃতি তো, বড্ড মনখারাপ লাগছিল।

কফির কাপে চুমুক দিয়ে, খাতায় দু-একটা জিনিস নোট করে নেয় দিগন্ত। তারপর বলে, ছোটা, তোর সুব্রতদা আর অনুপমের সঙ্গে কিন্তু আমি আলাদা করে কথা বলব। সম্ভব হলে বাড়িতে গিয়ে। আর মীনাক্ষী, প্রয়োজনে হলে তোমার বোনের সঙ্গেও। বাই দ্য ওয়ে, তোমার বোনের পুরো নামটা কী?

এণাক্ষী দত্ত।

.

দৈনিক বার্তায় তোমার বন্ধু পারমিতা আছে না?

খাটে বসে একমনে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল অঞ্জলি। দিগন্তর কথায় একটু অবাক হয়ে বলে, হ্যাঁ, করে তো…

ওকে একটু জিজ্ঞাসা কর তো, ওদের ওখানে এণাক্ষী দত্ত বলে কেউ কাজ করে কিনা? যদি করে, তাহলে কী কাজ, কীরকম মেয়ে, মানে খানিকটা ডিটেল আর কী।

একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে মোবাইলের বোতাম টেপে অঞ্জলি। মিনিট পাঁচেক পারমিতার সঙ্গে কথা-বার্তার পর ফোন অফ করে বলে, এণাক্ষী দত্ত প্রায় বছর খানেক দৈনিক বার্তায় কাজ করছে। কাজের মেয়ে, যদিও একটু নাকি ওপর-চালাক ধরনের। সব কিছুতে আগ বাড়িয়ে কথা বলা অভ্যাস। তবে পিআর মানে পাবলিক রিলেশন খুব ভালো, তাই দ্রুত উন্নতি করেছে।

ওর কাজটা কী? রিপোর্টিং নাকি ডেস্ক জব?

দুটোই বলতে পার। পারমিতা বলল, ও আর্টের পাতায় কাজ করে। মানে নানারকম কালচারাল প্রোগ্রাম দেখে এসে তার রিভিউ লেখে, ছবির এক্সিবিশন কভার করে…

দাঁড়াও দাঁড়াও, ছবি মানে পেইন্টিং এক্সিবিশন?

হ্যাঁ, কলকাতায় বিভিন্ন গ্যালারিগুলোতে যেসব পেইন্টিং এক্সিবিশন হয় সেগুলো ও কভার করে। পারমিতা বলছিল ওর নাকি ছবির সেন্স যথেষ্ট ভালো…কিন্তু কী ব্যাপার বল তো, তুমি হঠাৎ এণাক্ষী সম্বন্ধে এতকিছু জানতে চাইছ?

দিগন্ত ততক্ষণে দ্রুত নিজের স্মার্ট ফোনে দৈনিক বার্তার ওয়েব পেজ খুলে আর্টের পাতায় চলে গেছে। গোল্ড গ্যালারির একটা প্রদার্শনী নিয়ে এণাক্ষী দত্তের লেখা বেরিয়েছে। বেশ ডিটেল লেখা। বোঝাই যায় লেখিকার পেইন্টিং নিয়ে পড়াশোনা আছে। লেখাটায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে অঞ্জলির দিকে তাকায় দিগন্ত।

এই এণাক্ষী দত্ত হল ছোটার শালী, মানে মীনাক্ষীর ছোট বোন। ওদের পাড়াতেই থাকে। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় দিদির বাড়িতে তার যথেষ্ট যাতায়াত আছে। ট্রাঙ্কের ভিতরের ছবিগুলো যদি ও দেখে থাকে, তাহলে সেগুলিকে ওভীক এম-এর ছবি বলে চেনা ওর পক্ষে খুব কঠিন নয়। ছবির দামটাও ও খুব সহজেই আন্দাজ করতে পারবে।

কিন্তু ও যদি ট্রাঙ্ক থেকে ছবিগুলো বার করতে যায়, তাহলে তো অন্যরা দেখে ফেলবে?

তার কোনও সম্ভাবনা নেই। কারণ ও সন্ধেবেলা দিদির কাছ থেকে চাবি নিয়ে একলাই ওই বাড়িতে গেছিল। সেই সময় ছবিগুলো ট্রাঙ্ক থেকে বের করে নেওয়া কোনও ব্যাপারই নয়।

তাহলে কি এণাক্ষীই ছবিগুলো নিয়েছে?

দুটো খটকা আছে অঞ্জলি। প্রথমত, ও ছবিগুলো বার করে নিয়ে ট্রাঙ্কটাকে বাইরে ফেলে রেখে গেল কেন? ট্রাঙ্কটা যদি ঠিক জায়গায় থাকত তাহলে তো কারুর কোনও সন্দেহই হত না। দ্বিতীয়ত, ছবিগুলো ও দেখল কীভাবে? ওই ট্রাঙ্কটা যে বহুদিন খোলা হয়নি সেটা ছোটার মা আর বউ দুজনেই বলছে। সেক্ষেত্রে যে ওই বাড়িতে থাকে না, তার পক্ষে ট্রাঙ্ক খুলে তার ভিতরে কী আছে দেখাটা বেশ অস্বাভাবিক। একটা পুরোনো, লঝঝড়ে ট্রাঙ্ক খুলে দেখতে যাবেই বা কেন? এইখানটাতে তাই একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে।

.

ছোটার প্রোমোটার সুব্রত সরখেলের বাড়ি মুকুন্দপুরে। বেশ বড় তিনতলা বাড়ি। সঙ্গে অনেকখানি বাগান। উঁচু গ্রিলের গেটে তালা লাগানো। তবে গেটের বাইরের দেওয়ালে কলিংবেল লাগানো আছে।

ও বাবা, তোর প্রোমোটার তো মনে হচ্ছে রীতিমতো বড়লোক মানুষ!

দিগন্তর কথায় হেসে ফেলে ছোটা।

তা বলতে পারিস। যাদবপুর থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর প্রথম কিছুদিন চাকরি করেছিল। তারপর নিজের ব্যবসা শুরু করেছে। সুনাম আছে। বাড়ির ডিজাইন ভালো। বিল্ডিং মেটিরিয়ালে জালিয়াতি করে না। তাই ডিমান্ডও সাংঘাতিক। আমাদের এলাকায় তো প্রায় সব ফ্ল্যাটই সুব্রতদার করা। তাই বুঝতেই পারছিস, নিজের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সও চড়চড়িয়ে বেড়েছে…

কথা বলতে বলতেই কলিংবেলে হাত ছুঁইয়েছিল ছোটা। ভিতরে বেলটা বাজার শব্দ হতে গলা একটু নামিয়ে বলল, আমি মোটামুটি ব্যাপারটা সুব্রতদাকে বলে রেখেছি। তবে তুই একটু বুঝে-শুনে কথা বলিস। লোকটার খানিকটা গেরামভারি ব্যাপার আছে। এখন বিগড়ে গেলে আমি আবার বিপদে পড়ে যাব।

একজন মাঝবয়সি লোক দুজনকে নিয়ে গিয়ে দোতলার ড্রইংরুমে বসাল। বোঝাই যাচ্ছে বাড়ির একতলাটা ভদ্রলোকের অফিস। সেখানেও একটা বসার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ছোটা যেহেতু বন্ধুর ভাই তাই তার জন্য দোতলায় বসার ব্যবস্থা। বসার পর একজন কাজের মহিলা এসে দুটো কাচের গ্লাসে জল দিয়ে, চা খাবে কিনা জিজ্ঞাসাও করে গেল।

ভারী, নরম সোফায় বসে ঘরটাকে ভালো করে দেখছিল দিগন্ত। ভদ্রলোকের পয়সা আছে নিশ্চিত কিন্তু সঙ্গে রুচিও আছে। ঘরটা সুন্দর করে সাজানো। সোফার কভার, দেওয়াল আর পর্দার রঙে একটা চমৎকার সাযুজ্য আছে। দেওয়ালের ছবি, কাচের তাকে ছোটখাটো শো-পিস, কোনায় টবে পাতাবাহার, সব মিলিয়ে বাহুল্য নেই। কিন্তু বেশ একটা আকর্ষণীয় আরামদায়ক পরিবেশ। একপাশে রাখা একটা লম্বা স্ট্যান্ড ল্যাম্পের আলো সেই আকর্ষণে একটা বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।

দিগন্ত গ্লাসের জলটা একচুমুকে শেষ করে টেবিলে রেখে সবে হাতঘড়িটা দেখতে যাচ্ছে এমন সময় সুব্রত সরখেল ঘরে ঢুকলেন। লম্বা পেটানো চেহারা। হাতের কব্জি চওড়া। একসময় চুল ঘন থাকলেও এখন উঠে কপাল বেশ খানিকটা চওড়া হয়ে গেছে। চওড়া কপাল, খাড়া নাক আর চাপা ঠোঁটের জন্য মুখে একটা উন্নাসিক ভাব এসেছে। পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে গায়ে শাল জড়ানো।

স্যরি, আমার একটু দেরি হয়ে গেল। ছোটা, তোদের চা-এর কথা বলেছে তো…

ছোটা ঘাড় নাড়ে।

আপনি কি শীতের দিনেও এরকম সন্ধের পরে স্নান করেন?

হ্যাঁ, আসলে সাইট থেকে ফিরে একবার স্নান না করলে আমার চলে না, তাই…

সুব্রত সরখেল কথার মাঝখানেই থেমে একটু অবাক হয়ে দিগন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু আমি স্নান করে এলাম সেটা আপনি জানলেন কী করে?

প্রথমত বাথ সল্টের একটা হালকা সুগন্ধ আপনি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছি। তাছাড়া চপ্পলটা এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি বলে ঘরে ঢোকার সময় একটু স্লিপ করে গেছিল। আপনি অবশ্য দরজাটা ধরে সামলে নিলেন, কিন্তু একটু সাবধান হবেন। এই পোর্সেলিন টাইলসগুলো জল পড়লে মারাত্মক।

বাব্বা, আপনার তো দেখছি সাংঘাতিক চোখ!

সুব্রতদা, এই হচ্ছে আমার বন্ধু দিগন্ত দেব। এর কথাই তোমাকে বলেছিলাম, আমার ট্রাঙ্ক চুরির ঘটনাটা নিয়ে আসলে ও-ই একটু খোঁজখবর করছে।

ও ইনিই হচ্ছেন সেই গোয়েন্দা! তা সত্যাণ্বেষী ব্যোমকেশের মত শুধু গোয়েন্দাগিরিতেই পেট ভরে, নাকি অন্য কিছু করা হয়?

আমি কলেজে পড়াই। গোয়েন্দাগিরিটা নেহাতই শখ বলতে পারেন।

সে যাই হোক। আপনার শখ না পেশা তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। আশা করি এর মধ্যে পুলিশ-টুলিশের ব্যাপার নেই। তাহলে কিন্তু আমি নিজে কথা বলব না, আমার উকিল কথা বলবে।

না না, এর মধ্যে পুলিশের কোনও ব্যাপারই নেই। আমি শুধু আপনাকে দু-একটা কথা জিজ্ঞাসা করব…

সে আপনি করতেই পারেন। যদিও কেন করবেন জানি না। ছোটার ট্রাঙ্ক চুরি গেছে। তা আমি কী করতে পারি। আমি তো আর লোহা-লক্কড়ের ব্যবসা করি না যে পুরোনো ট্রাঙ্ক চুরি করে বেচে দেব। তাছাড়া সামান্য একটা ট্রাঙ্ক নিয়ে এত মাথাব্যাথাই বা কেন, তাও তো বুঝি না। তার মধ্যে কি কোনও গুপ্তধন ছিল নাকি?

দিগন্ত সামান্য হেসে বলল, গুপ্তধনের সন্ধান এখনও পাইনি। তবে সামান্য—দু-একটা খটকা লাগছে, সেটা একটু পরিষ্কার করে নিতে চাই।

বেশ, ঠিক আছে, কী জানতে চান বলুন। যতটা জানি নিশ্চয় আপনাকে বলব।

আপনি সেদিন বিকেল নাগাদ ছোটাদের ফ্ল্যাট থেকে চাবিটা নিয়ে পুরোনো বাড়িতে গেছিলেন। কেন?

ভেরি সিম্পল রিজন। তখন ওই প্রজেক্টের যে হেড মিস্ত্রি, সুলেমান এসেছিল। ওকে নিয়ে গেছিলাম বাড়িটা একবার দেখাতে। কাজ শুরুর আগে এটা দরকার হয়। তাছাড়া শান্তনুদের বাড়ির দুটো দরজা আর জানলার পাল্লাগুলো সেগুন কাঠে তৈরি। সেগুলোকে আলাদাভাবে রাখা হবে ঠিক হয়েছিল। এইসব খুঁটিনাটি দেখে নিতেই গেছিলাম।

কতক্ষণ ছিলেন ওখানে?

স্টপ ওয়াচ সঙ্গে ছিল না। তবে মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় আধঘণ্টা।

আপনি আর সুলেমান কি একসঙ্গে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?

সুব্রত সরখেল সামান্য একটু ইতস্তত করে বললেন, হ্যাঁ, একসঙ্গেই ছিলাম…

কিন্তু আপনি যখন চাবি দিতে ছোটার ফ্ল্যাটে গেছিলেন, তখন তো সুলেমান আপনার সঙ্গে ছিল না?

দিগন্তর প্রশ্নটা এল প্রায় বন্দুকের গুলির মত। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সুব্রত সরখেলের মতো পোড়খাওয়া লোকও সামান্য টলে গেলেন। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিতেই ব্যঙ্গের হাসি ফুটল ঠোঁটের কোণায়, আসলে তখন তো বুঝিনি চুরির দায়ে ধরা পড়তে হবে, তাই সুলেমানের সঙ্গে জোড় বেঁধে ছিলাম কিনা মনে রাখারও প্রয়োজন মনে করিনি। আপনার কথা শুনে মনে পড়ল, সুলেমান আগেই বেরিয়ে গেছিল। আমি মিনিট দশেক পরে তালা লাগিয়ে বেরিয়েছিলাম।

কারণটা জানতে পারি?

নিশ্চয়, আমার তো গোপন করার মত কিছু নেই। একটা জরুরি ফোন এসেছিল। কথা বলছিলাম। তাই দেরি হয়েছিল।

সেই সময় ট্রাঙ্কটা কি যথাস্থানে ছিল?

ট্রাঙ্কের ভিতর সাত রাজার ধন আছে তখন তো জানা ছিল না। তাই খেয়াল করিনি…আর কিছু আপনার জিজ্ঞাস্য আছে?

কাজের মহিলা ইতিমধ্যে বেশ পাতলা চিনেমাটির কাপে দু-কাপ চা সামনের সেন্টার টেবিলে রেখে গেছেন। দিগন্ত কাপটা তুলে নিয়ে একটা আলতো চুমুক দিয়ে বলে, নাঃ, জিজ্ঞাস্য কিছু নেই। তবে দুটো কথা বলার আছে। প্রথমত, আপনার চা-টি ভারি ভালো। এত চমৎকার সুগন্ধি দার্জিলিং টি সচরাচর পাওয়া যায় না। আর দ্বিতীয়ত, আপনার এই ঘরের অন্দরসজ্জাটি খুব সুন্দর। এটা দেখলে আপনার রুচির প্রশংসা না করে পারা যায় না।

দিগন্তর এরকম ভোলবদলে আবারও একটু থতমত খেলেন সরখেল মশাই। এবার সামলাতে সামান্য সময় লাগল। উঁচু নাক একটু নামিয়ে ঠোঁটের কোণে প্রায় অদৃশ্য ভাঁজ ফেলে বললেন, চা আমার ভালো না হলে চলে না। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটের একটা বিশেষ দোকান থেকে আনাই। তবে ঘর সাজানোয় আমার কোনও কৃতিত্ব নেই। ওটা যিনি ইন্টিরিয়র ডেকরেশন করেছেন, তাঁর আর আমার গিন্নির হাতযশ। আমার মিস্ত্রি-মজুর খাটানো অভ্যাস, ওসব সূক্ষ্ম জিনিস বুঝি না। আচ্ছা, আজ আমার একটু ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বেরোনর কথা আছে…

স্পষ্ট ইঙ্গিত। এরপর আর বসার প্রশ্নই নেই। দিগন্ত সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়, আমরাও তাহলে এখন আসি। নমস্কার। প্রয়োজন হলে আরও দু-একবার হয়তো বিরক্ত করতে পারি..।

ছোটা এগিয়ে গেছিল। দিগন্ত দরজা পর্যন্ত গিয়েও হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে উল্টো দিকের দেওয়ালে ঝোলানো একটা ছবির দিকে আঙুল তুলে বললে,আচ্ছা, এই ছবিটা যেন কার…মানে…

ওটা ভ্যান গঁঘের স্টারি নাইটের প্রিন্ট।

ঠিক ঠিক…মনে পড়ছিল না…

সুব্রত সরখেলের কথায় মাথা নাড়ে দিগন্ত। গাড়িতে ওঠার পর ছোটা জিজ্ঞাসা করে,

কীরকম বুঝলি?

ইন্টারেস্টিং লোক। সেলফমেড মনে হয়, তাই একটা বেশ উন্নাসিক, অহঙ্কারী ভাব আছে। কিন্তু আবার নিজস্ব পছন্দ কিংবা ভালোলাগাগুলো গোপন রাখতে চায়। মিস্ত্রি-মজুর খাটানো লোক অত সহজে ভ্যান গঁঘের ছবির নাম বলতে পারে না রে। ঘরটা ও নিজের পছন্দেই সাজিয়েছে। কিন্তু সেটা আমার মত অচেনা লোককে বলবে না।

তোর কি মনে হয়, সুব্রতদা ট্রাঙ্কটা সরিয়েছে?

আচ্ছা, তোর কী মনে হয় ছোটা, ট্রাঙ্কের ভিতর কী থাকলে সুব্রতদা সেটা সরাতে পারেন?

তা জানি না বাপু। আমার কিছু মনেও হয় না। এতকাল ধরে ট্রাঙ্কটা ঘরে পড়েছিল, কারুর কিছু মনেই হয়নি। সেদিনও তো মীনাক্ষীরা বাক্স-প্যাঁটরা সব খুলে-টুলে দেখেছিল। তখনও কিছু পাওয়া যায়নি। হঠাৎ ট্রাঙ্কের ভিতর এমন কী এসে ঢুকল যে ট্রাঙ্কটা চুরি করতে হল, সেটাই আমার মাথায় ঢুকছে না।

আমিও তো সেটাই খুঁজছি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারিনি। আচ্ছা, সেদিন রাতে তুই যখন আবার ওবাড়িতে গেলি, তখন আশপাশে চেনা কাউকে দেখিসনি তো?

নাঃ, সেরকম কাউকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। আমি অবশ্য বেশিক্ষণ দাঁড়াইনি। বাইরে থেকে দেখেই চলে এসেছিলাম। আসলে ওই বাড়িতে ছোট থেকে বড় হয়েছি। দাদাদের সঙ্গে খেলেছি, বাগানে বাবা সাইকেল চালাতে শিখিয়েছিল। সেসব মনে পড়ে যাচ্ছিল আর কী…

কতক্ষণ ছিলি ওখানে?

ওই তো, টেলিভিশনে নটার নিউজ যখন শুরু হল, তখন বাড়ি থেকে বেরোলাম। ফিরছি যখন, তখন খবর শেষ হয়ে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে।

ও বাবা, তার মানে তো প্রায় আধঘণ্টা। অতক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলি!

দূর, আমি কি পাগল নাকি! মিনিট পাঁচেক ওখানে ছিলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে মোড়ের মাথায় এলাম। কানাইয়ের দোকান থেকে মিঠাপাতা পান কিনলাম। দু-চারটি কথাও হল, তারপর আবার ফিরতি পথ ধরলাম।

কানাইয়ের দোকানটা আবার কোথায় রে?

ওই তো আমাদের মোড়ের মাথায়, ডান দিকে। হেব্বি মিঠাপাতা পান বানায়, এলাচ, মৌরি আর চমনবাহার দিয়ে। মুখে দিলে মনটা ভালো হয়ে যায়। তোকেও একদিন খাওয়াব দিনু।

.

ছোটা মনে হচ্ছে না এটার সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত।

বসার ঘরের সোফায় বসে টেলিভিশনে একটা পুরোনো ইংরাজি ছবি দেখছিল অঞ্জলি। দিগন্তর কথা শুনে ভল্যুমটা কমিয়ে ঘুরে বসল, কী করে বুঝলে?

ওর সঙ্গে কথা বলে। ছোটাও ওই বাড়িতে যাবে বলে চাবি নিয়ে একাই বেরিয়েছিল সেদিন রাতে। যদিও ছোটার বক্তব্য সে ভিতরে যায়নি, বাইরে থেকে ঘুরে চলে এসেছিল। আমাকে ছোটা বলল, সেদিন বাড়ির সামনে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থেকে ও কানাইয়ের দোকানে পান কিনতে যায়। প্রণয়ের সঙ্গে কথা বলে, কানাইকে জেরা করেছি। ছোটার বক্তব্যের সঙ্গে ওর কথার কোনও গরমিল নেই। কানাই এটাও বলেছে যে ছোটা দোকানে এসেছিল খালি হাতে। তার মানে নিশ্চয় ছবিগুলো তখন তার কাছে ছিল না। তবে যদি বাড়ি ফেরার সময় ছবিগুলো নিয়ে যায় তাহলে…

দিগন্তর ভাব দেখে অঞ্জলি স্পষ্ট বুঝতে পারে সে আবার চিন্তার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।

.

দীনেশনগরে অনুপমদের বাড়িটা বড়রাস্তা থেকে একটু ভিতরে ঢুকে। ছিমছাম দোতলা বাড়ি। একতলার বাগান থেকে একটা হালকা বেগুনি রঙের ফুলে ভরা লতা উঠেছে দোতলার বারান্দা পর্যন্ত। ছোটা কথা বলে রেখেছিল। অনুপম বাড়িতেই ছিল। নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল দুজনকে। ভালো করে চারপাশটা লক্ষ্য করছিল দিগন্ত। পাইনকাঠের আসবাব। শান্তিনিকেতনী চাদরে ঢাকা নিচু খাট। টেবিলে বই-পত্র। সব মিলিয়ে একজন পরিচ্ছন্ন রুচির ছাত্রের ঘর। অনুপমের চেহারাতেও একটা বেশ শান্ত, পড়ুয়া পড়ুয়া ভাব আছে।

শান্তনুদা আমাকে বলেছেন যে, আপনারা আসবেন। কিন্তু কী ব্যাপারে সেটা জানি না।

অনুপমের প্রশ্নের উত্তরে সামান্য হেসে দিগন্ত বলে, তোমাকে তুমিই বলছি। আসলে কলেজে পড়াই তো। তোমার বয়সি ছেলেদের সঙ্গেই সারাক্ষণ ওঠা-বসা। তাই বদ অভ্যাস হয়ে গেছে। ছোটা, মানে শান্তনু তোমাকে কিছু বলেনি, কারণ আমি বারণ করেছিলাম।

আসলে বাড়ি বদলানোর দিন ছোটাদের বাড়ি থেকে একটা ট্রাঙ্ক চুরি যায়। ট্রাঙ্কটা পাওয়া গেছে কিন্তু সম্ভবত ভিতরের কিছু জিনিস মিসিং। সম্ভবত বলছি এই কারণে যে ভিতরে কী ছিল, সেটা আমি এখনও নিশ্চিত নই। তবে ট্রাঙ্কটা যে তালা বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে বাইরে আনা হয়েছিল সেটা স্পষ্ট। ঘরের তালা কিন্তু ভাঙা হয়নি। তাহলে ট্রাঙ্কটা বাইরে এল কীভাবে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে যারা সেদিন ওই বাড়িতে চাবি নিয়ে গেছিল, তাদের সবার সঙ্গেই আমি কথা বলছি। তাদের মধ্যে তুমিও আছ।

আপনি কি গোয়েন্দা?

বলতে পার। শখের গোয়েন্দা। তবে এখনও পর্যন্ত বেশ কয়েকটা জটিল কেস সলভ করেছি। ছোটার কেসটাও ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। তুমি তো সেদিন বাবানকে পড়াতে ওই বাড়িতে গেছিলে।

হ্যাঁ, গেছিলাম। ওখানে বসেই পড়িয়েছি। কিন্তু ট্রাঙ্কের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। ইনফ্যাক্ট ট্রাঙ্ক যে ছিল সেটাই আমি মনে করতে পারছি না।

সেদিন তো ওখানে আসবাবপত্র কিছু ছিল না। বাবানকে কোথায় বসে পড়ালে?

বৌদি বলে দিয়েছিলেন, একটা মাদুর রাখা আছে। সেটাই পেতে বসেছিলাম। পড়ানো হয়ে গেলে চাবি বন্ধ করে চলে এসেছিলাম।

বাবানকে যখন বাড়ি পৌঁছে দিলে তখন চাবিটাও ফেরত দিয়েছিলে?

জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁটটা চেটে সামান্য নার্ভাস গলায় অনুপম বলে, না, তখন ওপরে উঠিনি। আসলে মায়ের একটা ব্লাড রিপোর্ট আনার ছিল। ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ হয়ে যাবে, তাই রিপোর্টটা নিতে গেছিলাম।

মায়ের কি শরীর খারাপ?

মায়ের সুগার আছে। মাঝে মাঝেই ব্লাড টেস্ট করতে হয়।

কোথায় টেস্ট করাও?

আমাদের এখানে নির্ণয় বলে একটা প্যাথলজিক্যাল ল্যাব আছে, ওখানেই…

রিপোর্ট নিয়েছিলে?

হ্যাঁ, নিয়ে তারপর চাবিটা বৌদিকে দিয়ে এসেছিলাম।

রিপোর্টটা আমাকে দেখানো যাবে?

অনুপম ঘাড় নেড়ে উঠে পাশের ঘরে চলে যায়। একটু পরে একটা খাম হাতে নিয়ে এসে দিগন্তকে দেয়। দিগন্ত খামটা একটু উল্টেপাল্টে রিপোর্টটা বার করে দেখে। মামুলি ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট। খামটা অনুপমের হাতে ফেরত দিয়ে বলে, কিন্তু অনুপম নির্ণয় তো সাড়ে সাতটার সময় বন্ধ হয়ে যায়। তুমি সেদিন রিপোর্ট নিলে কী করে?

না না আমি তো…

অনুপম, তুমি সেদিন বাবানকে যখন বাড়িতে নামিয়েছ, তখনই সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। শান্তনুর বাড়ি থেকে সাইকেলে নির্ণয় যেতে তোমার অন্তত আরও মিনিট দশেক লাগার কথা। তার মানে তুমি পৌনে আটটার আগে নির্ণয়ে পৌঁছাতে পারনি। কিন্তু আমি যতদূর খবর নিয়েছি, নির্ণয় ঠিক কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটায় গেট বন্ধ করে দেয়। সেদিনও দিয়েছিল। তাহলে তুমি সেদিন রিপোর্টটা পেলে কী করে?

অনুপমের মুখ লাল হয়ে গেছে। দিগন্ত তার দিকে তাকিয়ে আবার ভারি শান্ত গলায় বলে, সত্যি কথা বল অনুপম, তুমি কি সেদিন রিপোর্ট আনতে গেছিলে?

অনুপম কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকে।

তুমি কি ছবি আঁকো নাকি অনুপম?

দিগন্তর প্রশ্নটার আকস্মিকতায় খানিকটা ঘাবড়ে যায় অনুপম। তারপর একটু ভেঙে যাওয়া গলায় বলে, না, আমি ছবি আঁকতে পারি না।

আসলে কোণের বাস্কেটে যে রোল করা কাগজগুলো রাখা আছে, সেগুলো সাধারণত…

ওগুলো আমার বোনের। বোন আর্ট কলেজে পড়ে। আমার বাবাও একসময় ভালো ছবি আঁকতেন। ছবির এক্সিবিশনও হয়েছে। এখন অবশ্য আর…

তার মানে তোমাদের বাড়িতে ছবি আঁকার একটা চর্চা আছে?

তা বলতে পারেন। তবে আমি খানিকটা ব্যতিক্রম। আমার আঁকা একেবারেই আসে না।

কিন্তু ছবি দেখতে ভালোবাস নিশ্চয়?

না, তাও খুব একটা নয়…

অনুপমের কথার মধ্যে কেমন যেন একটা উসখুসে ভাব। বুঝতে অসুবিধা হয় না দিগন্তর। ছোটাকে চোখের ইশারা করে বলে, ঠিক আছে। আমার আপাতত আর কিছু জানার নেই। প্রয়োজন মনে হলে আবার আসব। তবে তুমি সেদিন কোথায় গেছিলে সেই উত্তরটা দিলে ভালো করতে। পরে যদি মনে কর জানাবে, তাহলে আমাকে ফোন করতে পার।

নিজের একটা কার্ড অনুপমের হাতে দিয়ে বেরিয়ে আসে দুজনে।

অনুপমকে কি তোর সন্দেহ হচ্ছে নাকি রে? ছেলেটা কিন্তু ভারি ভালো। আমি অনেকদিন ধরে চিনি…

ভালো-মন্দের ব্যাপার নয় ছোটা। তদন্ত করতে হলে যারা সেদিন ওই বাড়িতে গেছিল তাদের সবাইকে আমায় সন্দেহ করতে হবে। ইনক্লুডিং তুই। তোর অ্যালিবাইও কিন্তু আমি ক্রশ চেক করে দেখেছি। বন্ধু বলে মুখের কথায় বিশ্বাস করিনি। কিন্তু অনুপম ছেলেটা মিথ্যে কথা কেন বলছে বুঝতে পারলাম না। ও সেদিন রিপোর্টটা আনতে যায়নি। কোথায় গেছিল সেটা জানা দরকার।

.

তোমার তদন্ত কতদূর এগোল?

নিজের ল্যাপটপে ফেসবুক ঘাঁটতে ঘাঁটতে প্রশ্নটা করল অঞ্জলি। রাত প্রায় দশটা। খাটের ওপর কম্বলমুড়ি দিয়ে বসে ডাইরিতে আঁকিবুঁকি কাটছিল দিগন্ত। অঞ্জলির প্রশ্ন শুনে ফিকে হেসে বলল, অদ্ভূত একটা জালে আটকে গেছি বুঝলে। ট্রাঙ্কটা চুরি করা হয়েছিল অভীক মুখার্জির ছবিগুলো হাতাতে, সে বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু যে কাজটা করেছে, তার নিশ্চিত পেইন্টিং সম্বন্ধে মোটামুটি ভালো ধারণা আছে। নাহলে সে ছবিগুলোর মূল্য বুঝবে না। কিন্তু মজার ব্যাপার দ্যাখ, একমাত্র ছোটা বাদ দিয়ে যে তিনজন সেদিন ওই বাড়িতে গেছিল, এণাক্ষী, সুব্রত সরখেল কিংবা অনুপম এই তিনজনেরই ছবি সম্বন্ধে ভালো রকম ধারণা আছে…

কথার মাঝখানেই মোবাইল ফোনটা বাজল দিগন্তর। অচেনা নম্বর। ফোন ধরে কথা বলতে বলতে অঞ্জলি লক্ষ্য করল প্রথমটায় দিগন্তর মুখের ওপর একটা হালকা হাসির আভাস খেলে গেলেও, পরে আবার ভুরুর ভাঁজ গভীর হল। কথা শেষ করে অবশ্য পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরে গেল দিগন্ত।

তার মানে তিনজনেরই চুরির উদ্দেশ্য এবং সুযোগ একইরকম। কারুর কোনও অ্যালিবাই নেই। আবার একইভাবে তিনজনের ক্ষেত্রেই জিনিসটা যে ওখানে আছে সেটা জানতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম। সেজন্যই মনে হচ্ছে কেমন যেন একটা গোলকধাঁধায় আটকে গেছি…

তুমি নিশ্চিত যে আর কেউ ওখানে যায়নি? এমন কেউ যার উপস্থিতিটা আপাতভাবে চোখেই পড়ছে না। কিংবা গুরুত্বহীন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না?

নাঃ, সেরকম কেউ তো নেই। অন্তত ছোটা বা মীনাক্ষী যা বলছে তাতে মনে হচ্ছে না। আমাকে বাড়িটা আর একবার দেখতে হবে, ওদের সঙ্গেও আর একটু কথা বলতে হবে। বেশি দেরি করা যাবে না। দিন দশেক অলরেডি হয়ে গেছে। সুব্রত সরখেল এখনও কিছু বলেনি। কিন্তু এবার যদি কাজ শুরু করতে না দিই, তাহলে ছোটাকে ঝামেলায় ফেলবে।

দিগন্তর অনুমানই সঠিক। সপ্তাহের মাঝামাঝি ফোন করল ছোটা।

দিনু, সুব্রতদা কিন্তু কাজ শুরু করতে চাইছেন। ওঁর তো অনেকগুলো প্রজেক্টে কাজ চলে। রুটিন ব্রেক করলে অসুবিধা হয়। তুই কী বলিস, ভাঙার কাজটা কি শুরু করবে?

অঞ্জলি লক্ষ্য করেছে, গত কয়েকদিন ধরেই বেশ একটা ছটফটে অবস্থার মধ্যে রয়েছে দিগন্ত। অনেক রাত পর্যন্ত বসে ল্যাপটপে খুটখাট করেছে। বেশ কয়েকটা সাইট ঘুরে ওভীক এম-এর নতুন ছবির দাম কীরকম হতে পারে তারও একটা আন্দাজ যে পাওয়া গেছে এবং সেটা যে যথেষ্ট বেশি সেকথাও অঞ্জলিকে বলেছে দিনু। কিন্তু ছবিগুলো কীভাবে হাপিস হল, তার কোনও হদিশ এখনও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বাড়ির কাজটা অনর্থক আটকে রাখার মানে হয় না। তাই ছোটাকে দিগন্ত বলে দিল, পরেরদিন বিকেলে সে আর একবার বাড়িটা দেখে নেবে। তারপর সুব্রত সরখেল ভাঙার কাজ শুরু করে দিতে পারেন।

কলেজে শেষের দিকে ক্লাস ছিল না। তাই একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছিল দিগন্ত। ছোটাকে নিয়ে যখন বাড়িটার সামনে পৌঁছল তখনও বিকেলের আলো ঝকঝক করছে। শীতের নির্জন চিল ওড়া দুপুরে কেমন যেন বিষণ্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে ফাঁকা বাড়িটা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখছিল দিগন্ত। ঢাকা বারান্দায় গ্রিল লাগানো। গ্রিল বেয়ে উঠেছে মানিপ্ল্যান্ট। বারান্দার ঠিক সামনেই আবার দুটো ঝুঁঝকো কামিনীর গাছ। সাদা ফুলে ছেয়ে আছে। ঝরা ফুলের পাপড়িতে নিচটা ঢাকা। গাছপালার মায়াময় পর্দায় একটুও বেআব্রু হওয়ার সুযোগ পায়নি বারান্দাটা। বাইরে থেকে ভিতরটা প্রায় কিছুই দেখা যায় না। বাড়ির কাজ শুরু হলে এই কামিনী কিংবা মানিপ্ল্যান্ট কারুরই কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। কথাটা ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে গেল দিগন্তর।

ঠিক দরজার উল্টো দিকের দেওয়ালে একটা হালকা ঘষটানোর দাগ। ভারি কিছুর ধাক্কা লাগলে যেমন হয়, অনেকটা সেরকম। বারান্দার রঙটা পুরোনো হয়ে গেছে। তাই সহজে চোখে পড়ে না। দাগটা আগের দিন ছিল কিনা মনে করতে পারল না দিগন্ত। ছোটাও বলল যে সে দাগটা আগে লক্ষ্য করেনি। বাড়ি, বাগান ঘুরে আর কোনও নতুন সূত্র অবশ্য পাওয়া গেল না। দুজনে মিলে তাই চলে এল ছোটার ফ্ল্যাটে।

সুব্রতদাকে তাহলে বলে দিই কাজ শুরু করতে।

ঘাড় নেড়ে সেন্টার টেবিল থেকে খবরের কাগজটা তুলে নিল দিগন্ত। সামনের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে ছোটা। লাফাতে লাফাতে বাবান ঢুকল ঘরে, বাবা, বাবা, ড্রইং স্যার এটা তোমাকে দিতে বলেছে…

বাবানের হাতে একটা অফ হোয়াইট রঙের ভারি খাম। কোণায় টুকটুকে লাল রঙের একটা ছোট্ট শিমূল ফুলের ছবি। চমৎকার দেখতে খামটা।

এটা আবার কী রে?

বাবান দিয়ে গেল তোর জন্য। বলল ড্রইং স্যার দিয়েছে…

কার্ডটা হাতে নিয়ে খুলে ভুরু কুঁচকে গেল ছোটার, বিভাস সেনগুপ্ত…সে আবার কে…ও আচ্ছা আচ্ছা…বাব্বাঃ, এক্সিবিশন করছে…দারুণ তো..

ব্যাপারটা কী রে?

আরে বাবানকে যে আঁকা শেখায়, আমাদের পুরোনো বাড়ির পাশের গলিতেই থাকে, বাদল বলে ডাকি তো, ভালো নাম যে বিভাস ভুলেই গেছিলাম। ট্যালেন্ট আছে ছেলেটার জানিস তো। গভর্মেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল। ফার্স্ট হয়েছিল। কিন্তু হয়ে কী হবে, বাপের তো পয়সা নেই। স্কুলে একটা চাকরি পেয়েছে, আর এদিক ওদিক আঁকা শেখায়। অনেকদিন ধরে একটা এক্সিবিশন করার ইচ্ছে। পয়সার অভাবে করতে পারছিল না। মনে হচ্ছে শেষপর্যন্ত স্পনসর যোগাড় করতে পেরেছে…

মীনাক্ষী কী জন্য জানি ভিতরে ডাকছে। ছোটা উঠে যেতেই চট করে কার্ডটা তুলে নেয় দিনু। কলকাতার অন্যতম বিখ্যাত গোল্ড লাইট গ্যালারিতে শিল্পী বিভাস সেনগুপ্তের একক ছবির এক্সিবিশন।

প্রণয়কে নিয়ে দিগন্ত যখন গোল্ড লাইট গ্যালারিতে পৌঁছল তখন সাতটা বেজে গেছে। গ্যালারির মালিক মিঃ হিঙ্গানিয়া ভিতরে নিজের অফিসঘরে ছিলেন। বেয়ারার হাতে দিয়ে প্রণয় নিজের কার্ডটা পাঠাতেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন, কী ব্যাপার স্যার, হোয়াট হ্যাপেনড…আপনি হঠাৎ?

নমস্কার, মিস্টার হিঙ্গানিয়া। দরকারটা আসলে আমার নয়, আমার এই বন্ধু দিগন্ত দেবের। উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। তবে আলোচনাটা একটু গোপনীয়।

হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়। আপনারা আমার ঘরে আসুন।

গ্যালারির অফিসঘরের পাশেই হিঙ্গানিয়ার নিজস্ব চেম্বার। প্রণয় আর দিগন্ত সেখানে ঢুকতেই একজন বেয়ারা এসে তিন কাপ কফি দিয়ে গেল। হিঙ্গানিয়া তাকে নির্দেশ দিলেন দরজাটা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য।

হ্যাঁ স্যার, বলুন এবার কি উপকারে লাগতে পারি আপনাদের…

মিঃ হিঙ্গানিয়া আপনার গ্যালারিতে আগামী ৯ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিভাস সেনগুপ্তের একক ছবির একটা এক্সিবিশন আছে?

শিল্পীর নামটা শুনেই হিঙ্গানিয়ার ফর্সা মুখের ওপর দিয়ে দু-তিনরকম ভাব খেলে গেল বুঝতে অসুবিধা হল না দিগন্তর।

হ্যাঁ স্যার, আছে।

কিন্তু বিভাস সেনগুপ্ত তো মাত্র অল্প কয়েকদিন আগে আপনার কাছে গ্যালারি বুকিংয়ের জন্য এসেছিলেন। এত তাড়াতাড়ি ডেট পাওয়া গেল কী করে?

আসলে স্যার হয়েছে কী, ওই ডেটটা যাঁর বুক করা ছিল, আর্টিস্ট প্রতিমা নাগ, ওনার বাড়িতে একটা মিসহ্যাপ হয়ে গেছে। ওনার হাজবেন্ডের ক্যানসার ধরা পড়েছে। চিকিৎসা করার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। তো উনি বুকিং ক্যানসেল করলেন। ডেটটা খালি হল, আমি ওখানে বিভাসকে দিয়ে দিলাম।

বিভাস ছাড়া আর কেউ আপনার ওয়েটিং লিস্টে ছিল না তার মানে?

না, তা ঠিক নয়, আসলে বিভাস এত প্লিড করছিল আর ইয়াং ছেলে…আমি আবার ইয়াং আর্টিস্টদের একটু প্রেফারেন্স দেওয়া পছন্দ করি…

মিঃ হিঙ্গানিয়া আপনার স্টুডিওতে পাঁচদিনের একটা এক্সিবিশন করতে কত খরচ পড়ে?

তা ধরতে পারেন সব মিলিয়ে দুই থেকে ঢাই লাখ…

তার মানে ওভীক এম-এর যে ছবিটা আপনাকে বিভাস বিক্রি করেছে সেটার দাম তার থেকে অনেকটাই বেশি। ইন্টারনেটও অবশ্য তাই বলছে…

মানে, কী বলতে চাইছেন আপনি…

দেখুন মিঃ হিঙ্গানিয়া, বিভাস সেনগুপ্ত যে আপনাকে ওভীক এম-এর নতুন ছবি বিক্রি করেছে সেটা আমি জানি। আপনি ছবির ব্যবসায়ী। ছবি কিনতেই পারেন। কিন্তু ছবি কিনে যখন অন্যকে বিক্রি করতে যাবেন, তখন বিপদে পড়বেন কিনা সেটাও তো আপনার ভাবা দরকার।

কেন কেন স্যার, ছবিটা কি জাল?

তার মানে ছবিটা আপনি কিনেছেন। না মিঃ হিঙ্গানিয়া। ছবিটা জাল নয়। কিন্তু ছবিটা যেভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, সেটা ঠিক নয়। আপনাকে বিভাস সেনগুপ্ত কী বলেছেন জানতে পারি কী?

শীতের মধ্যেও হিঙ্গানিয়ার টাকে ঘাম জমে গেছিল। পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে মাথাটা মুছে নিয়ে সামান্য বসে যাওয়া গলায় বললেন, বিভাস আমাকে বলেছে, ওভীক এম ওদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রে ছবিটা ওদের গিফট করেছিলেন। ছবিটা ও বিক্রি করতে চায়, কারণ এক্সিবিশন করার জন্য টাকার দরকার।

ছবিটা যে ওরিজিনাল সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। ওভীক এম-এর অল্পবয়সের আঁকা। ওনার যে ক্যাটালগ আছে, তাতে এই পর্যায়ের ছবি একটাও নেই। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, এরকম একটা ছবি বাজারে আনতে পারলে, তার দাম কীরকম হবে। বিভাস আমাকে বলেছিল, ছবিটা যে ওর কাছ থেকে কিনেছি সেটা যেন কাউকে না বলি। তাতে আমার সন্দেহ হয় যে ব্যাপারটার মধ্যে গণ্ডগোল আছে। কিন্তু লোভ সামলাতে পারিনি।

বিভাস কি আপনাকে একটা ছবিই বিক্রি করেছে?

হ্যাঁ, একটাই। তবে ওর কথাবার্তায় আমার মনে হয়েছে ওর কাছে আরও ছবি আছে…বাট অবভিয়াসলি আই অ্যাম নট সিওর…

আমাদেরও সেরকমই সন্দেহ মিঃ হিঙ্গানিয়া। আপনি কি ছবিটা আমাকে দেখাতে পারেন একবার?

হ্যাঁ নিশ্চয়…

হিঙ্গানিয়া উঠে তার চেয়ারের ডানপাশে দেওয়ালের সঙ্গে গাঁথা ভল্টের ভিতর থেকে একটা বড় কার্ডবোর্ডের বাক্স বার করে আনলেন। তারপর বাক্সটা খুলে খুব সাবধানে ছবিটা রাখলেন টেবিলের ওপর।

হ্যান্ডমেড পেপারের ওপর জলরঙে আঁকা একটি মেয়ের পাশ ফেরানো মুখ। চুল এসে পড়েছে মুখের ওপর। সেই চুলের অর্ধেকটা যেন ফণা তোলা সাপ। আর বাকি অর্ধেক মুখের পাশ থেকে বেঁকে গিয়ে সূর্যের রশ্মি হয়ে গেছে। অদ্ভূত সুন্দর ছবি। দিগন্ত আর প্রণয় দুজনেই কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। দিগন্ত নিজের মোবাইলে একটা ছবি তুলে নেওয়ার পর মিঃ হিঙ্গানিয়া ছবিটা আবার সাবধানে তুলে রেখে চেয়ারে এসে বসেন।

মিঃ দেব, একটা কথা আমার মনে হয় বলা দরকার। আমি ছবি ব্যবসায়ী ঠিকই। কিন্তু আমি ছবি ভালোবাসি। নিজে একসময় ছবি আঁকতাম। তবে আমার শিল্পী হওয়ার মতো ট্যালেন্ট নেই আমি জানি। সেজন্য ছবির সঙ্গে যাতে যুক্ত থাকতে পারি, তাই এই ব্যবসায় এসেছি। এমনিতে আমাদের তিন পুরুষের ইলেকট্রিক্যাল আর ইলেকট্রনিক গুডসের ব্যবসা। তো আমি আপনাদের একটা কথা বলব, বিভাসের কিন্তু ট্যালেন্ট আছে। এক্সপোজার পেলে ও একজন বড় মাপের শিল্পী হিসাবে নাম করতে পারবে। আমি বুঝতে পারছি যে বিভাস অন্যায়ভাবে ওভীক এম-এর ছবিটা বিক্রি করেছে। কিন্তু ওর সম্বন্ধে ডিসিশন নেওয়ার আগে আপনারা যদি এই কথাটা মাথায় রাখতে পারেন ভালো হয়।

আপনার কথা আমরা নিশ্চয় মনে রাখার চেষ্টা করব, মিঃ হিঙ্গানিয়া।

প্রণয়ের কথার ধরনে একেবারে পুলিশ সুলভ কাঠিন্য।

কিন্তু আশা করব আপনিও আমাদের সঙ্গে এই কথোপকথনের ব্যাপারে ওকে আগাম সতর্ক করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। তাহলে কিন্তু আমাদের পক্ষে ওকে বাঁচানো মুশকিল হবে।

.

ছোটাদের পুরোনো বাড়িটা ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে একটা চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করতেই কাজল-বাদলদের বাড়িটা দেখিয়ে দিল একটা ছোকরা ছেলে। গলির মোড়ে গাড়িটা রেখে হেঁটেই ভিতরে এল দিগন্ত আর প্রণয়। সামনে একটুখানি বাগান। তারপর ছোট্ট একতলা বাড়ি। একটা ঘর কংক্রিটের। বাকিগুলো দরমার। মাথায় অ্যাসবেসটাসের ছাউনি। বাড়ির চেহারায় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। একজন বয়স্ক মহিলা বাগানে ফুল তুলছিলেন। বাদলের নাম করতে গলা তুলে বললেন, বাদল, তর সনে দেখা করতে আইসে…

গলা শুনে পর্দা সরিয়ে একটি শ্যামলা রঙের ছেলে বেরিয়ে এল। বয়স তিরিশের ভিতরেই। ছিপছিপে চেহারা। মুখে সারল্যের ছাপ থাকলেও তার সঙ্গে বেশ বেমানান জেদি, শক্ত চোয়াল।

আসুন, ভিতরে আসুন…

সিমেন্টের মেঝে। একটা সাধারণ তক্তাপোষের ওপর বিছানা পাতা। ঘরের চারিদিকে ছড়ানো ছবি আঁকার সরঞ্জাম। একপাশে দুটো পাতলা তুলোর গদি দেওয়া বেতের চেয়ার। সেদুটোতে দুজনকে বসতে বলে নিজে খাটেই বসে বাদল।

আপনারা…

আমি দিগন্ত দেব। ছোটা, মানে শান্তনুর বন্ধু।

প্রণয় কোনও কথা বলে না। শুধু নিজের কার্ডটা বাড়িয়ে দেয়। কার্ডটা দেখামাত্রই মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায় বাদলের, না, মানে আমি ঠিক…আপনারা কেন?

বিভাস, আপনি ওভীক এম-এর একটা ছবি মিঃ হিঙ্গানিয়াকে বিক্রি করেছেন আমি জানি। বাকিগুলোর বিক্রি-বাট্টার ব্যবস্থাও কি ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন?

আপনারা কী বলছেন আমি ঠিক…

বুঝতে পারছেন না তো? আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। শুনে যান, কোথাও ভুল থাকলে সংশোধন করে দেবেন। পাড়ার ছেলে বলে শান্তনু আপনাকে বাড়ি বদলানোর জন্য ডেকে নিয়ে গেছিল। জিনিসপত্র গোছানোর সময় নিশ্চয় ঠিক হয় আজেবাজে জিনিস কিছু ফেলে দেওয়া হবে। আপনি আর মীণাক্ষী সম্ভবত সেই কাজটা করছিলেন। সেসময় পুরোনো ট্রাঙ্কের ভিতর ছবিগুলো দেখতে পান। আপনার জহুরির চোখ। এছবি যে ফ্যালনা নয়, সেটা বুঝতে এক মুহূর্তও সময় লাগেনি। তখনই আপনি পরিকল্পনা স্থির করে নেন। ট্রাঙ্কের ওপরের দিকে পুরোনো জামাকাপড় যেমন ছিল রেখে সেটাকে বাতিলের দলে সরিয়ে রাখেন।

প্রথমে হয়তো ভেবেছিলেন পরে কোনও অজুহাত দিয়ে পুরোনো ট্রাঙ্কটা চেয়ে নেবেন। কিন্তু পরে ঠিক করেন সেই ঝুঁকি নেবেন না। কাজ শেষ করে ছোটা আর আপনি সবশেষে ঘর থেকে বেরোন। আপনি ইচ্ছে করেই নিজের মোবাইল ঘরে রেখে গেছিলেন। গেটের বাইরে গিয়ে, মোবাইলটা ভুলে ফেলে রেখে এসেছেন বলে ছোটার কাছ থেকে চাবি নিয়ে আবার ভিতরে ঢোকেন। গেট থেকে বারান্দার ভিতরটা যে দেখা যায় না, সেটা আপনি জানতেন। তাই বেরোনর সময় ট্রাঙ্কটা তুলে নিয়ে বারান্দায় রেখে দেন। তাড়াহুড়োতে ট্রাঙ্কের সঙ্গে দেওয়ালের গায়ে ঘষা লাগার দাগ দেখে মনে হয় আপনি ঠিক দরজার উল্টোদিকেই ট্রাঙ্কটা রেখেছিলেন। জিনিসপত্র ছোটার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে একটু পরেই আবার ওই বাড়িতে ফিরে আসেন। ওখানে আপনাকে ঢুকতে দেখলে কারুর কোনও সন্দেহ হওয়ার প্রশ্নই নেই। তাই এবার নিশ্চিন্তে ছবিগুলো বার করে নেন। ছবির অস্তিত্ব যাতে কোনওভাবেই জানা না যায়, সেজন্য খুব বুদ্ধিমানের মত, ট্রাঙ্কের ভিতর রঙ-তুলি যা ছিল সেগুলোও বার করে নিয়েছিলেন। ট্রাঙ্কটা সন্ধ্যামালতীর ঝোপের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে যান। তবে সেই কাজটা করার সময় একটা তুলি যে কোনওভাবে হাত থেকে পড়ে গেছিল সেটা সম্ভবত খেয়াল করেননি। আপনার আশা ছিল ঝোপের ভিতর ট্রাঙ্কটা কারুর চোখে পড়বে না। আর একবার বাড়ি ভাঙা শুরু হয়ে গেলে ওটা মিস্ত্রিদের দখলে চলে যাবে। কিন্তু আপনার দুর্ভাগ্য ছেলের লাটাই পাড়তে গিয়ে ছোটার ওটা চোখে পড়ে যায়। কিছু ভুল বললাম কি?

খুব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে বিভাস।

কিন্তু ওগুলো যে ওভীক এম-এর ছবি সেটা আপনি বুঝলেন কখন?

বিভাসের মাথা প্রায় বুকের কাছে ঝুলে পড়েছে। গলার স্বরও চাপা আর নীচু, ছবিগুলো দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। বাড়িতে ফিরে ইন্টারনেটে ওনার ছবির সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হলাম। এটাও বুঝলাম যে ওনার ক্যাটালগে ছবিগুলো নেই। তার মানে ছবিগুলো অরিজিনাল শুধু নয় এখনও পর্যন্ত এগুলোর কথা কেউ জানে না।

ট্রাঙ্কে কটা ছবি ছিল?

ছ’টা। দুটো ওয়াটার কালার আর চারটে অয়েল পেইন্টিং। তবে ছবিগুলো যে কীভাবে ছোটাদাদের বাড়িতে এল সেটা আমি জানি না।

আমি জানি। ওভীক এম-এর আসল নাম অভীক মুখার্জি। নকশাল আন্দোলনের সময় তিনি কিছুদিন ছোটাদের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। সেই সময়ই সম্ভবত ছবিগুলো আঁকেন। তারপর হঠাৎ একরাতে তাঁকে চলে যেতে হয়। ছবিগুলো হয়তো পরে নিয়ে যাবেন ভেবেছিলেন কিন্তু আর আসা হয়নি। অভীক মুখার্জির বাবা ওনাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। তারপরের গল্প তো আপনার জানা।

ছোটাদারা কিন্তু ছবিগুলোর কথা জানত বলে আমার মনে হয় না।

না, জানত না। ইনফ্যাক্ট এখনও জানে না। জানি শুধু আমি, প্রণয় আর আমার স্ত্রী, অঞ্জলি।

আমার অনেকদিন ধরে একটা এক্সিবিশন করার ইচ্ছা ছিল জানেন…খুব কষ্ট করে আর্ট কলেজে পড়েছি। ফার্স্ট হয়েছিলাম। কিন্তু পয়সা নেই তো। বাবার ক্যানসার ধরা পড়ল। যেটুকু সঞ্চয় ছিল তাতেই চলে গেল। ছোট বোনটা পড়ছে। আমার স্কুলের চাকরিটুকুই ভরসা। তাই লোভ সামলাতে পারলাম না…

বাকি ছবিগুলো আমায় দিয়ে দিন বিভাস। হিঙ্গানিয়ার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। ওভীক এম—এর ছবির দাম বিদেশের বাজারে এখন প্রায় নয় লক্ষ টাকা। উনি এক্সিবিশনের জন্য এক লাখ রেখে বাকিটা আপনাকে দেবেন। ছবিগুলো আমি ছোটাকে দিয়ে দেব। তবে ছবি কিংবা ট্রাঙ্ক কে নিয়েছিল সে বিষয়ে কোনও কিছু ও জানতে পারবে না।

দিগন্তের মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্তম্ভিতের মত তাকিয়ে থেকে চোখের কোলটা মুছে নেয় বিভাস। তারপর ঘরের কোণ থেকে একটা বড় কার্ডবোর্ডের বাক্স এনে হাতে দেয়। বাক্সের ভিতর অভীক মুখার্জির সই করা পাঁচটা ছবি পরপর সাজানো।

.

ছোটা ছবিগুলো দেখে কী বলল?

ছোটা কী বলতে পারে তুমিই বল। খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বলল, এগুলো তো ছবি রে, এরজন্য ট্রাঙ্ক চুরি হয়েছিল! পরে অবশ্য ছবির দাম জেনে চোখ কপালে উঠে গেল।

ট্রাঙ্কটা কে নিয়েছিল জানতে চায়নি?

সে তো চাইলই। তবে আমি খুব স্পষ্ট করেই বললাম, সে খোঁজে তোর দরকার নেই। তোর জিনিস তুই পেয়ে গেছিস। ও নিয়ে আর মাথা ঘামাস না। অনেকদিনের বন্ধু তো, ও জানে, আমি যখন বলতে চাইছি না, তখন জানতে পারবে না। তাই আর ঘ্যানঘ্যান করেনি।

বিকেলের চায়ের সঙ্গে মটরশুঁটির কচুরি খেতে খেতে কথা হচ্ছে। প্রণয় গরম কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলল, কিন্তু ওই অনুপম ছেলেটা সেদিন মিথ্যে কথা বলেছিল কেন সেটি কি শেষপর্যন্ত জানা গেল?

হো হো করে হেসে উঠে দিগন্ত বলল, আরে সে ভারি মজার ব্যাপার। ওই অনুপম আসলে এণাক্ষীর বন্ধু। সেদিন ওর সঙ্গেই কী একটা কাজে দেখা করতে গেছিল। কিন্তু এণাক্ষীর বাড়ির লোকজন অনুপমের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বটা মোটেই পছন্দ করে না। এবার এণাক্ষীর জামাইবাবু, মানে ছোটা তো আমার সঙ্গে রয়েছে। তাই অনুপম সেদিন মুখ খুলতে চায়নি। পরে ফোন করেছিল। যদিও তখন আমি কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করিনি। বরং এণাক্ষী আর অনুপম দুজনে মিলে কোনওভাবে ছবিগুলো চুরি করেছে কিনা সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছিলাম।

কিন্তু বাদলকে তোমার সন্দেহ হল কীভাবে?

বাদলকে আমার সন্দেহ হয়নি। ইনফ্যাক্ট তুমি ঠিকই বলেছিলে। বাড়িতে যারা গেছিল, তাদের মধ্যে যে বাদলও আছে সেটা আমার মাথায় ছিল না। ওর উপস্থিতিটা অদৃশ্য থেকে গেছে। অথচ প্রথমদিনেই কিন্তু ছোটা ওর কথা বলেছিল। ছোটার ছেলেকে যে বাদল আঁকা শেখায়, সেটাও বলেছিল। ও যে মোবাইল ফেলে এসেছিল, সেটাও বলেছিল। কিন্তু এমনভাবে বলেছিল যে আমি সবটা রিলেট করতে পারিনি। আমার সন্দেহ হল কার্ডটা দেখার পর ছোটা যখন বলল যে ওর অনেকদিন ধরে এক্সিবিশন করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু টাকার অভাবে করতে পারছিল না। তাহলে হঠাৎ ওরকম একটা গ্যালারিতে সোলো এক্সিবিশন করার মত পয়সা ছেলেটা পেল কোথা থেকে? তখনই মনে পড়ল বাড়ি বদলানোর দিনে ও ছোটার সঙ্গে ছিল। ওর মোবাইল ফেলে আসার কথাটাও তখন মনে পড়ায় সন্দেহটা গাঢ় হল। তারপর সেদিন ছোটাদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে ওদের পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যখন বুঝলাম গেট থেকে বারান্দার ভিতরটা কিছুই দেখা যায় না, তখনই পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল।

তবে, এবারে তোর গোয়েন্দাগিরিটা নেহাতই উপোসে গেল রে! ছোটার কাছে তো আর চোর ধরার ফিজ চাওয়া যাবে না। তার ওপর আবার চোরের নামও বলিসনি। একখানা ছবি যে হাওয়া হয়ে গেছে সেকথা ভাগ্যিস জানে না। তাই প্রতিবার দিনু টিকটিকির সাফল্যের অনারে যেরকম আশ মিটিয়ে তার ঘাড় ভেঙে খাওয়া হয়, সেটা এবার…

প্রণয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই দিগন্তর মোবাইলটা বেজে উঠল,

ছোটা ফোন করছে…

মোবাইলে কথা বলা শেষ করে সেটা টেবিলের ওপর রাখল দিগন্ত। তারপর অতিরিক্ত গম্ভীর গলায় বলল, আশাহত হোয়ো না বন্ধু! এবারের পাওনা সবাইকে ছাপিয়ে গেছে… নয় লক্ষ…

মানে, ট্রাঙ্ক উদ্ধার করার জন্য ছোটা তোমাকে ন’ লক্ষ টাকা দেবে?

না। ছোটা, ওর দাদা আর মাসিমা মিলে ঠিক করেছে ওভীক এম-এর একটা ছবি আমাকে দেবে। উপহার। মিঃ হিঙ্গানিয়ার মতে যে ছবির দাম নয় লক্ষ টাকা…অতএব বুঝতেই পারছ…

প্রণয় আর অঞ্জলি কিছুক্ষণ চুপ। তারপরেই হাউমাউ করে ওঠে অঞ্জলি, তোমরা দুজন যা খেতে চাও আমি খাইয়ে দেব। কিন্তু ও ছবি আমি বেচতে দেব না। নয় লক্ষ না হয়ে নয় কোটি হলেও নয়। আমাদের বাড়ির দেওয়ালে একখানা অরিজিনাল ওভীক এম ঝুলবে…উফ, আমি ভাবতেই পারছি না…

2 Comments

টিনটোরেটোর যীশু গল্পের কথা মনে পড়ছে। সেখানেও বাঙালির বিদেশে গিয়ে চিত্রশিল্পী হয়ে যাওয়া আর দেশে তাঁর একটি অনাদরে পড়ে থাকা চিত্রশিল্পের চুরি যাওয়ার গল্প, যা কেউই প্রথমে খেয়াল করে না। গোয়েন্দা আসে মামুলি কারণে, সেখানে বয়স্ক ফক্স টেরিয়ার কুকুরের মৃত্যু আর এখানে ঘরের ট্রাঙ্ক বাইরে পড়ে থাকার আপাত নিরীহ রহস্য।
লেখিকা একজন একনিষ্ঠ সত্যজিৎ পাঠিকা।

বেশ ইন্টারেস্টিং

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *