আচ্ছা, অর্জুনের তো নাকি দুহাত সমানভাবে চলত, সেজন্যই অর্জুনকে সব্যসাচী বলা হয়?
মহাভারত তো সেরকমই বলে, হাতে ধরা বইটা থেকে মুখ না তুলেই বলল দিগন্ত।
মহাভারতের আর কোন চরিত্রের এরকম বিশেষ গুণ বা বৈশিষ্ট আছে বল তো?
রবিবারের সকাল। পড়ার টেবিলে বসে মন দিয়ে নিজের একটা লেখা লিখছিল অঞ্জলি। লিখতে লিখতেই প্রশ্নটা করেছিল। কোনও উত্তর না পেয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল, খাটের ব্যাক রেস্টে হেলান দিয়ে বইয়ে ডুবে রয়েছে দিগন্ত। কথাটা তার কানেই যায়নি।
কী হল, আমি কিন্তু তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি…
গলাটা একটু তুলে বলায় এবার নড়ে বসল দিগন্ত। হাতের ইশারায় অঞ্জলিকে একটু অপেক্ষা করতে বলে খুব দ্রুত চ্যাপ্টারের শেষ কয়েকটা লাইন পড়ে নিয়ে বইটা মুড়ে বলল, হ্যাঁ শুনেছি, আসলে বইটা এত ইন্টারেস্টিং, যে ছাড়তে পারছিলাম না। তুমি জানতে চাইছিলে মহাভারতের আর কোনও চরিত্রের ওরকম বৈশিষ্ট আছে কিনা। ঠিক ওইরকম না হলেও আছে তো বটেই।
কর্ণের যেমন সূর্যের দেওয়া কবচ-কুণ্ডল ছিল, যতক্ষণ সেটা তার কাছে থাকবে, ততক্ষণ তাকে কেউ আঘাত করতে পারবে না। দুর্যোধনের উরু ছাড়া শরীরের আর কোনও দুর্বল জায়গা ছিল না। সেজন্য তাকে মারার জন্য ভীমকে উরুভঙ্গ করতে হয়েছিল। আসলে এগুলো হল মহাকাব্যের বৈশিষ্ট। পৃথিবীর সব ওরাল এপিক, মানে যে মহাকাব্য মুখে মুখে রচিত হয়েছে, তার চরিত্রদের এই ধরনের বৈশিষ্ট থাকে। অ্যাকিলিসের যেমন হিল মানে গোড়ালি ছিল একমাত্র দুর্বল জায়গা। ছেলে যাতে অমর হয় সেজন্য মা থেটিস শিশু অ্যাকিলিসের গোড়ালি ধরে স্ট্যিক্স নদীতে চুবিয়েছিলেন। গ্রিক পুরাণ মতে শরীরের যেসব অংশ স্ট্যিক্সের জলে ডুববে সেখানে আর কোনও অস্ত্রের আঘাত লাগবে না। কিন্তু ওই যে গোড়ালি ধরে চুবোলেন, তাই গোড়ালিটা তো বাদ রয়ে গেল। ওইটৈই হল অ্যাকিলিসের দুর্বলতার জায়গা। গোড়ালিতে বিষাক্ত তির বিঁধেই শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় অ্যাকিলিসের। সেটা অবশ্য ইলিয়াডে নেই, মানে হোমার লেখেননি। পরবর্তী সময়ের গ্রিক এবং রোমান লেখাপত্র থেকে জানা যায়।
দুর্যোধনের ব্যাপারটাও অনেকটা একইরকম। গান্ধারী দুর্যোধনকে আসতে বলেছিলেন সম্পূর্ণ নিরাবরণ হয়ে। কারণ বর ছিল সেদিন গান্ধারী চোখের আবরণ খুলে যার দিকে তাকাবেন, তাঁর দৃষ্টি শরীরের যেসব জায়গায় পড়বে সেখানে আর কোনও অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা যাবে না। কিন্তু দুর্যোধন লজ্জা ঢাকতে সামান্য একটি কটিবস্ত্র জড়িয়ে নিয়েছিলেন। উরুর ওই যে অংশটুকু গান্ধারী দেখতে পেলেন না, সেটাই হয়ে গেল দুর্যোধনের দুর্বলতা। আসলে এইসব মহাকাব্যে অমরত্ব লাভের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু মানুষ তো আর অমর হতে পারে না। তাই যখনই এরকম কোনও ঘটনা ঘটছে, তখনই তাতে একটা ফাঁক রেখে দেওয়া হয়। আমাদের রামায়ণ-মহাভারতেও দেখ দেবতারা সব সময় একটা শর্ত রেখে অমর বর দিতেন। মজার ব্যাপার হল যাঁকে সবাই ঈশ্বর বলে মানে, সেই কৃষ্ণেরও কিন্তু এরকম দুর্বলতা ছিল। তাই তাঁকেও সামান্য ব্যাধের তীরে মরতে হয়েছিল। তবে সত্যি কথা বলতে কী, অর্জুনের মত সব্যসাচী আর কেউ ছিলেন বলে কিন্তু মনে পড়ছে না।
আধুনিক বিজ্ঞান কি বলছে জান? এটা কি আদৌ সম্ভব, মানে এই রকম দুটো হাত একসঙ্গে সমানভাবে চলা?
খুব অসম্ভব বোধহয় নয়। কারণ যারা ধর ন্যাটা, তাদের তো বাঁ-হাতটা অনায়াসে চলে, অথচ আমাদের চলে না। তার মানে মানুষের শরীর এটা পারে। সেভাবেই দু-হাতও সমানভাবে চলতে পারে, যদি মস্তিষ্ক সেভাবে সাড়া দেয়। ইনফ্যাক্ট আমি যে বইটা পড়ছি, তাতে ন্যাটাদের নিয়ে ইন্টারেস্টিং কিছু তথ্য আছে। যারা ডানহাতে লেখে আর যারা বাঁ হাতে লেখে, সেইসব বাচ্চাদের নাকি ছোটবেলা থেকেই মানসিকতার বেশ পার্থক্য থাকে। অন্তত এই ভদ্রমহিলা, মানে জেনিফার আর স্টেটস ফিশার তাঁর থিসিসে সেরকমই লিখেছেন।
কিন্তু এটা হয় কেন, মানে কেন কিছু মানুষের বাঁ-হাতটা বেশি সচল হয়, তার কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আছে?
এখনও পর্যন্ত নেই। তবে এই প্রবণতাটা যে ভ্রূণ অবস্থা থেকেই তৈরি হয় সেটা অনেকেই বলছেন। যদিও এটা কিন্তু পুরোপুরি জেনেটিক নয়। জেনিফারের মতে ন্যাটাদের মধ্যে নাকি একটা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার প্রবণতা থাকে। সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না। এরকম বেশ কিছু অদ্ভুত তথ্য মহিলা বার করেছেন। সবথেকে যেটা অদ্ভূত ব্যাপার সেটা হল, সারা পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র দশ শতাংশ হল ন্যাটা, অথচ চিরকালই প্রত্যেক দেশের ক্রিকেট টিমে অন্তত তিন থেকে চারজন লেফটহ্যান্ডেড বোলার কিংবা ব্যাটসম্যান থাকে। তার কারণ ওনার মতে, বিশেষ করে এই খেলাটায় বাঁ-হাতি প্লেয়ারদের কতগুলো অ্যাডভান্টেজ থাকে।
বাঁ-হাতিদের নিয়ে আরও কিছু তথ্য হয়তো দিগন্ত অঞ্জলিকে বলে ফেলত, কিন্তু তার আগেই মোবাইলটা বাজল। প্রণয় ফোন করছে। প্রণয়, দিগন্তর ছোটবেলাকার বন্ধু। এখন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করে। দিগন্ত অবশ্য পেশায় বাংলার অধ্যাপক। কিন্তু ইদানীং টুকটাক গোয়েন্দাগিরিতে তার খানিকটা নাম হয়েছে। পুলিশমহলে পরিচিতিও বেড়েছে। প্রণয় অবশ্য চিরকালই কোনও কেস জটিল মনে হলে দিগন্তর সঙ্গে পরামর্শ করে। আবার দিগন্তর যদি কখনও পুলিশের সাহায্য দরকার হয়, তাহলে সে ব্যবস্থাও প্রণয়ই করে। তবে গোয়েন্দাগিরি ছাড়াও দিগন্ত বেশ ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় আর দারুণ ফুটবল খেলে। মোহনবাগানের কট্টর সমর্থক। তার বউ অঞ্জলি অবশ্য গান আর ফুটবল দুটো থেকেই শতহস্ত দূরে। অঞ্জলি একটা বেশ নামকরা দৈনিকের সাংবাদিক। কিন্তু নিজের কাজের বাইরে সে আসলে একজন হদ্দ কুঁড়ে, বইপোকা মানুষ।
দিগন্ত ফোনটা ধরতেই সামান্য টেনসড গলায় প্রণয় বলল, দিনু, তুই কি বাড়িতে আছিস? একবার আসতে পারবি?
কেন কী হয়েছে?
একটা সুইসাইড কেস বুঝলি। একজন ভদ্রলোক, বয়স মোটামুটি ৫৫-৫৬ হবে। ব্যাচেলর। হাতের শিরা কেটে সুইসাইড করেছেন। সুইসাইড নোট অবশ্য কিছু পাওয়া যায়নি। কিন্তু ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। শরীরে অন্য কোনও আঘাতের চিহ্ন আছে বলেও মনে হচ্ছে না।
তাহলে প্রবলেম কী হচ্ছে?
আমার ঠিক ব্যাপারটা কনভিনসিং মনে হচ্ছে না আসলে। ভদ্রলোকের সুইসাইডের কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। একলা মানুষ। সরকারি অফিসের কেরানি। তার মানে একজনের জন্য ভালোই মাইনে-কড়ি। পাটুলির এই ফ্ল্যাটটা নিজস্ব। কোনও বদ নেশা আছে বলেও শোনা যাচ্ছে না। খামোখা সুইসাইড করতে যাবে কেন?
অসুখ-বিসুখ কিছু করেনি তো? দুরারোগ্য কোনও অসুখ…
আমার মনে হয় না। কারণ তাহলে একটা সুইসাইড নোট থাকত। এখনও পর্যন্ত কাগজপত্র যা দেখেছি, তাতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপসন আছে কয়েকটা। তবে বেশিরভাগই মামুলি সর্দি-জ্বর কিংবা পেটখারাপের। অন্য কোনও মেডিকেল রিপোর্টও দেখলাম না। প্রেশারের ওষুধ নিয়মিত খেতেন। সেটা টেবিলেই রাখা আছে। না রে, ব্যাপারটা গণ্ডগোলের মনে হচ্ছে। তুই একবার আয়। বডি নিয়ে যাওয়ার আগে আমার মনে হয় তোর একবার দেখা দরকার।
দিগন্তকে বিছানা থেকে উঠে জামা-কাপড় পরতে দেখে অঞ্জলি বলল,কী হল দিনু টিকটিকির ডাক পড়েছে বুঝি? কে ফোন করেছিল, প্রণয়?
হেসে মাথা নাড়ল দিগন্ত।
ফিরতে দেরি কোরো না। আজ বেগুন দিয়ে ট্যাংরা মাছ রান্না হচ্ছে। প্রণয়কেও নিয়েই চলে এস। চাবিটা নিয়ে নাও। আমি আর নিচে নামব না। এই কপিটা আজ সন্ধের মধ্যে শেষ করে মেইল করতে হবে। এমন চাকরি যে ছুটির দিনেও রেহাই নেই…
অঞ্জলির গজগজটা শুনতে শুনতেই সিঁড়ি দিয়ে নামল দিগন্ত। সারা সপ্তাহ অঞ্জলির যথেষ্ট কাজের চাপ থাকে। তারপরে যদি ছুটির দিনেও কাজ করতে হয়, তাহলে বিরক্তি আসাটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া গোটা দুয়েক নতুন বইও হাতে জমা রয়েছে। সেগুলো পড়ার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। অতএব অঞ্জলির মেজাজ বেশ ভালোই গরম। ছুটির সকালে আরও দুকাপ অন্তত গরম কফি খেলে মনটা হয়তো একটু শরিফ হবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই দরজাটা টেনে দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিল দিগন্ত। যেতে হবে বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি। রবিবারের ফাঁকা রাস্তায় ভবানীপুরে তাদের বসন্ত বোস রোডের বাড়ি থেকে মোটামুটি আধঘন্টার বেশি লাগার কথা নয়।
গড়িয়াহাট থেকে যে রাস্তাটা সোজা গড়িয়ার দিকে চলে গেছে, তার নাম রাজা সুবোধ মল্লিক রোড। সেটা ধরে গেলে, গড়িয়ার খানিকটা আগে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে আর একটা রাস্তা গিয়ে মিশেছে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের সঙ্গে। এই অঞ্চলটারই নাম হল বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি। এলাকাটা একেবারেই নতুন। কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেও জলা-জঙ্গলে ভর্তি ছিল। এখন পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট আর ছোট-বড় ফ্ল্যাটবাড়িতে সাজানো।
প্রণয়ের দেওয়া ঠিকানা মিলিয়ে দিগন্ত একটা ছোট ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। গেটের ওপর নাম লেখা আছে সানরাইজ ভিলা। পূবমুখী বাড়ি বলেই বোধহয় এরকম নাম। নিচের তলায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা। তারপর ছটা তলা। প্রতি তলায় তিনটে করে ফ্ল্যাট। তার মানে আঠারোটি পরিবার বাস করে এখানে। তবে বাড়ির চেহারা আর বাইরে থেকে ফ্ল্যাটের মাপজোকে যা মনে হচ্ছে, তাতে বাসিন্দারা যে নিতান্তই মধ্যবিত্ত, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
গেটে একজন দারোয়ান ছিল। নীরেন সোমের বাড়িতে যাব বলতেই, তার চোখের দৃষ্টি সতর্ক হয়ে উঠেছে দেখে, নিজেকে পুলিশের লোক বলে পরিচয় দিতে বাধ্য হল দিগন্ত। তাতে অবশ্য কাজ হল ম্যাজিকের মতো। দারোয়ান নিজে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল চারতলায়। লিফট থেকে বেরোলে দুদিকে দুটো আর মাঝখানে একটা দরজা। ডানদিকের দরজাটা নীরেন সোমের। দরজার ওপরে একটা পিতলের নেমপ্লেট। ডানদিকে কলিংবেল। তবে আপাতত বেল বাজানোর কোনও দরকার নেই। কারণ দরজাটা খোলা।
দিগন্তকে ঘরে ঢুকতে দেখে প্রণয় এগিয়ে এসে বলল, আমাদের কাজ মোটামুটি হয়ে গেছে। তুই ভালো করে দেখে নে, তারপর বডি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব।
এই ধরনের ফ্ল্যাটের নকশা মোটামুটি একই রকম হয়। ঢুকেই একটা লম্বাটে ঘর। তার একদিকে বসার জায়গা। একদিকে একসেট বেতের সোফা রাখা আছে। পাতলা গদি আর তার সঙ্গে মানানসই কুশন দেওয়া। অন্যদিকের দেওয়ালে লাগানো কাঠের ক্যাবিনেটে টিভি রাখার জায়গা। দু-চারটে টুকটাক শৌখিন জিনিস। সেন্টার টেবিলের ওপর খবরের কাগজ, ছাইদান, টিভির রিমোট, একটা চালু ভ্রমণের পত্রিকা। আয়তাকৃতি ঘরের আরেক পাশে চারজনের বসার মত খাবার টেবিল। একটা ফুলফুল ছাপ প্লাস্টিকের সস্তা টেবিল ক্লথ পাতা রয়েছে টেবিলে। আর সেখানেই টেবিলের পাশে চেয়ারে বসা অবস্থায় রয়েছে নীরেন সোমের দেহ। বাঁ-হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছেন ভদ্রলোক। হাত থেকে রক্ত পড়ে মেঝেতে একটা ছোটখাটো পুকুর তৈরি হয়েছে। নীরেন সোম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন। টেবিলের ওপর তাঁর ডান হাতের পাশে একটা নতুন চকচকে ব্লেড পড়ে রয়েছে।
রাইগর মর্টিস সেট করে গেছে অনেকক্ষণ। আমার ধারণা কাল রাত আটটা-নটা নাগাদই মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না।
প্রণয়ের কথা শুনে একটু অন্যমনস্কভাবে ঘাড় নাড়ে দিগন্ত। তারপর মৃতদেহটাকে চারপাশ থেকে ঘুরে ঘুরে ভালো করে দেখে, নিজের মোবাইলে কয়েকটা ছবি তোলে। আপাতভাবে কোনও আঘাতের চিহ্ন চোখে পড়ে না। ঘরের চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে বসার জায়গাটার দিকে এগিয়ে যায়। সেন্টার টেবিলের ওপর একটা পোড়ামাটির ছাইদানি। তাতে একটা সিগারেটের স্টাব গোঁজা রয়েছে। দিগন্ত স্টাবটা তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে।
নীরেন সোমের কি সিগারেট খাওয়া অভ্যাস ছিল?
মনে তো হয় না। ঘরের আর কোথাও সিগারেট কিংবা দেশলাই বা লাইটার তো চোখে পড়ল না। ডাস্টবিনেও খালি সিগারেটের প্যাকেট নেই।
তার মানে এই সিগারেটটা যিনি খেয়েছেন, তিনি বাইরের কেউ…বিড়বিড় করে দিগন্ত।
টেবিলের ওপর একটা ছোট রাইটিং প্যাড পড়েছিল। সেটার ওপর হিজিবিজি কাটা। দিগন্ত প্যাডটা তুলে নিয়ে ভালো করে দেখে, প্রথম পাতাটা ছিঁড়ে পকেটে পুরে নেয়।
এখানে আর কিছু দেখার নেই। অন্য ঘরগুলো দেখি চল।
বডি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে দিগন্তর সঙ্গে পাশের ঘরটায় ঢোকে প্রণয়। টু-বেডরুম ফ্ল্যাট। নীরেন সোম ব্যাচেলর মানুষ ছিলেন। এই ঘরটা বোঝাই যাচ্ছে বাড়তি ঘর। একটা সিঙ্গল ডিভান। একপাশে একটা ছোট বুককেস আর আলনা। এছাড়া আর কোনও আসবাব নেই ঘরে। তবে অপরিচ্ছন্নতা কিংবা অগোছালোভাবও কিন্ত নেই। সবই বেশ পরিপাটি করে সাজানো। আলনায় জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখা। বুককেসের ওপর একটা পিতলের মোমদান। সেটা ঝকঝকে মাজা। তার পাশে কতগুলো সিডি রাখা আছে। দিগন্ত উল্টে-পাল্টে দেখল, সবগুলোই ভ্রমণের সিডি। তার মধ্যে ইউরোপ ট্যুরের দুটো সিডি একদম নতুন। প্লাস্টিকের মোড়ক খোলা হয়নি।
ভদ্রলোকের মনে হচ্ছে বেড়াতে যাওয়ার অভ্যাস ছিল…
দিগন্তর কথটা শুনে অনিশ্চিতভাবে ঘাড় নাড়ে প্রণয়। তীক্ষ্ন চোখে ঘরের চারপাশটা আর একবার ভালো করে দেখে নিয়ে পাশের ঘরটায় গিয়ে ঢোকে দুজনে। এটা মাস্টার বেডরুম। তুলনায় একটু বড়। একদিকের দেওয়াল ঘেঁষে মাঝারি মাপের একটা খাট। বেডকভার পাতা বিছানা। খাটের পায়ের দিকে স্টিলের আলমারি। একটা ছোট টেবিল আর চেয়ার। মাথার দিকে একটা সাধারণ সস্তার ড্রেসিং টেবিল। দেওয়ালে আটকানো একটা ব্র্যাকেট। তাতে কয়েকটা হ্যাঙ্গারে জামা-কাপড় ঝুলছে। দিগন্ত এগিয়ে গিয়ে হ্যাঙ্গার থেকে জামাগুলো নামায়। ভালো করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্র্যান্ডনেমগুলো দ্যাখে। একটা ট্রাউজারসের পকেট থেকে কিছু খুচরো কাগজ বেরোয়। কয়েকটা কেনা-কাটার রসিদ, এটিএম-এর স্লিপ। সেগুলোও উল্টেপাল্টে মনোযোগ দিয়ে দেখে রেখে দেয়।
তারপর ড্রেসিং টেবিলটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ সস্তা কাঠের ড্রেসিং টেবিল। সামনে একটা ট্রে-তে চিরুণি, নেল-কাটার, শীতের দিনে মুখে মাখার ক্রিম আর একটা বেশ দামী আফটার শেভের বোতল। সেটা সম্ভবত নতুন কেনা, কারণ বোতলের প্রায় পুরোটাই ভর্তি। কোথাও কোনও ধুলো-ময়লা নেই। সবই পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি ভাবে সাজানো। দিগন্ত আফটার শেভের বোতলটা একটু নেড়েচেড়ে দেখে রেখে দিয়ে খাটের পাশে এসে দাঁড়ায়।
জয়পুরী একটা বেডকভার দিয়ে বিছানাটা ঢাকা। খাটের পাশে একটা ছোট পা-মোছার পাপোশ। বিছানার একদিকে বালিশ-মশারি ইত্যাদি রাখা আছে। ফলে সেদিকটা একটু বেশি উঁচু। দিগন্ত খুব মনোযোগ দিয়ে বিছানাটা দেখে, তারপর মাথার কাছের বেডকভারটা ওল্টায়। প্রথমে দুটো মাথার বালিশ একটার ওপর একটা রাখা। তারপর একটা মশারি। একদম শেষে, দেওয়াল ঘেঁষে রাখা আছে ভাঁজ করা কম্বল। বেশ কিছুক্ষণ সেগুলোকে ভালো করে দেখে দিগন্ত আবার বেডকভারটা ঠিক করে টেনে দেয়। প্রণয় বুঝতে পারে দিগন্তর চোখ ক্রমশ তীক্ষ্ন হয়ে উঠছে।
খাটের পায়ের দিকে আলমারির পাশে আছে ছোট টেবিলটা। কিছু কাগজপত্র, ডাইরি, একটা রাইটিং প্যাড গুছিয়ে রাখা। পোড়ামাটির একটা কলমদানি রয়েছে একপাশে। তাতে কয়েকটা পেন্সিল, কলম, কাগজ-কাটা ছুরি রাখা। টেবিলের একপাশে একটা কলম পড়ে রয়েছে। দিগন্ত প্রথমে কাগজ পত্রগুলো উল্টেপাল্টে ভালো করে দ্যাখে। তারপর কলমটা তুলতেই ঢাকনাটা খুলে মাটিতে পড়ে যায়। চমকে উঠে মাটি থেকে ঢাকনাটা তুলে নেয়।
নীরেন সোম ফাউন্টেন পেনে লিখতেন! ভারি আশ্চর্য ব্যাপার তো।
কথাটা বলতে বলতেই টেবিলের একপাশে রাইটিং প্যাডটা টেনে নিয়ে তাতে কলমটা দিয়ে লিখতে শুরু করে দিগন্ত আর সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণরকম ভুরু কুঁচকে যায় তার। কলমটা তুলে ধরে নিবটা ভালো করে দ্যাখে। তারপর কলমের ঢাকনা বন্ধ করে খাওয়ার ঘরে গিয়ে নীরেন সোমের মৃতদেহের দিকে কিছুক্ষণ স্থিরভাবে তাকিয়ে থেকে প্রণয়কে বলে, তুই ঠিকই আন্দাজ করেছিলি। নীরেন সোম আত্মহত্যা করেননি। ওনাকে খুন করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী কেস স্টার্ট কর।
দিগন্তর কথা শুনে প্রথমে প্রণয় নিজের বসের সঙ্গে ফোনে কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নেয়। তারপর কনস্টেবলদের দু-চার কথায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে নিয়ে করে, তোর কি কাজ শেষ হয়েছে, নাকি আরও কিছু দেখবি?
প্রথমত দেখব আলমারিটা। চাবিটা কি পাওয়া গেছে?
হ্যাঁ। পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে আছে। দেখতে পারিস।
আলমারির হাতল আর ব্লেডের ওপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়েছে?
প্রণয় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ায়, ড্রয়ার থেকে চাবিটা নিয়ে আলমারিটা খোলে দিগন্ত। সামনের তাকে ইস্ত্রি করা জামা-কাপড় গুছিয়ে রাখা। একদম ওপরে দামি ব্র্যান্ডেড শার্ট-প্যান্টের কয়েকটা প্যাকেট। বাকী জামা-কাপড়গুলো তুলনায় অনেকটাই মামুলি। ওপরের তাকে গরমজামা। হালকা ন্যাপথলিনের গন্ধ। আলমারির ভিতরে একটা ছোট লকারও রয়েছে। রিং থেকে চাবিটা নিয়ে সেটা খুলতেই সামনে একটা হালকা সবুজ রঙের প্লাস্টিকের ফাইল চোখে পড়ে দিগন্তর। দরকারি ডকুমেন্টের ফাইল। এলআইসি-র প্রিমিয়ামের রসিদ, এনএসসি সার্টিফিকেট, বাড়ির দলিল, মিউটেশনের কাগজ, সব পরপর সাজিয়ে রাখা আছে যত্ন করে। ফাইলটার নিচে একটা ব্রাউন পেপারের চওড়া খাম। নীরেন সোমের মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে আরও অনেক কাগজ-পত্র রয়েছে সেখানে। দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ে ফাইলের পাশে একটা পুরোনো চিঠির টুকরো। চিঠিটা তুলে নিয়ে ভালো করে চোখ বুলোয় দিগন্ত। নিজের মোবাইলে একটা ছবি তোলে। তারপর আবার যথাস্থানে রেখে আলমারি বন্ধ করে দেয়।
এখানে মোটামুটি দেখা হয়ে গেছে। এবার বেরোই চল। যাওয়ার সময় ওই গেটের দারোয়ানের সঙ্গে একটু কথা বলে যেতে হবে।
সানরাইজ ভিলার দারোয়ানের নাম উত্তম মহান্তি। ওড়িশার লোক। চালাক-চতুর, শক্তপোক্ত চেহারা। একতলায় একটা ঘর নিয়ে সে একলাই থাকে। গেট পাহারা দেওয়া, পাম্প চালানো, এসবই হল তার কাজ। তবে উত্তম স্বীকারই করে নিল যে, ফ্ল্যাটের বাবুদের অনুমতি নিয়ে সে বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত ভাড়ায় অটো চালাতে যায়। কারণ শুধুমাত্র দারোয়ানের চাকরি করে দেশে সংসার চালানোর মতো টাকা পাঠানো কঠিন। ওই সময়টায় যেহেতু বাড়ির বাসিন্দারা অধিকাংশই উপস্থিত থাকেন, তাই উত্তম না থাকলেও বিশেষ কোনও অসুবিধা হয় না।
তার মানে ওই চার ঘন্টায় এই ফ্ল্যাটে কারা আসছে সেটা তুমি জানতে পারবে না, তাইতো?
হ্যাঁ বাবু। তবে ওই সময় খুব বেশি কেউ আসে না। ফেরিওলা, ক্যুরিয়র, পোস্টাপিসের লোক সবাই দুপুরের দিকে আসে। তাছাড়া এই পাড়াটা এমনিতে খুব শান্ত। গণ্ডগোল হয় না। থানাও কাছে। তাই, ভয় নেই কোনও।
আচ্ছা, তোমাদের ফ্ল্যাটের গেটে তো সিসিটিভির ক্যামেরা বসানো আছে, তাই না?
হ্যাঁ বাবু, আছে।
ক্যামেরাটা কাজ করে তো?
হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম ঠিকঠাক কাজ করে। ঝকঝকে ছবি।
ডেথ-এর প্রবাবেল টাইমিং তোর মতে, কাল রাত আটটা থেকে নটা তো?
দিগন্তর প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় নাড়ে প্রণয়।
ঠিক আছে। উত্তম আপনি ফ্ল্যাটের সবাইকে বলে দেবেন, আমি আজ সন্ধেবেলায় সাতটা নাগাদ আবার আসব। গতকাল সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে নটার মধ্যে আপনাদের সিসিটিভি-র যে ফুটেজ সেটা দেখতে হবে। কোথায় বসে দেখা যেতে পারে সেটা ঠিক করে রাখবেন। তবে আমি কিন্তু একলা ফুটেজটা দেখব না। সেই সময় প্রত্যেক ফ্ল্যাট থেকে একজন করে সেখানে উপস্থিত থাকবেন। আমরা সবাই মিলে বসে ফুটেজটা দেখব।
কিন্তু নীরেনবাবু তো আত্মহত্যা করেছেন। তার সঙ্গে সেই সময় সানরাইজ ভিলায় কে এসেছে না এসেছে তার সম্পর্ক কীসের?
অচেনা গলায় প্রশ্নটা শুনে পিছন ফিরে তাকায় দিগন্ত। ভদ্রলোকের বয়স নিশ্চিত চল্লিশের নিচেই। চেহারায় একটা হাসিখুশি খোলামেলা ভাব আছে। কিন্তু আপাতত তার ওপর একটা দুশ্চিন্তার আস্তরণ।
দিগন্ত, ইনি সুদীপ রায়। নীরেন সোমের পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। অনেক ডাকাডাকিতেও নীরেনবাবু দরজা খুলছেন না দেখে ইনিই পুলিশে খবর দেন। আর ইনি হলেন দিগন্ত দেব, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। আমার সঙ্গে এই কেসটায় কাজ করছেন।
নমস্কার। আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হল। কয়েকটা জিনিস আপনার কাছে জানতে হবে। তবে তার আগে আপনি যেটা জানতে চাইছিলেন সেটা বলি। আপাতভাবে আত্মহত্যা মনে হলেও নীরেন সোমকে আসলে খুন করা হয়েছে। আমি মোটামুটি নিশ্চিতই বলতে পারেন। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে আশা করি ব্যাপারটা আরও একটু পরিষ্কার হবে। এবার বলুন তো, আপনি ঘটনাটা জানতে পারলেন কীভাবে?
নীরেনবাবুর ঠিক পাশের ফ্ল্যাটটাই তো আমার। আজ সকালে ওনার বাড়িতে যে মহিলা ঠিকের কাজ করে, সে এসে অনেকক্ষণ বেল বাজানোর পরেও নীরেনবাবু দরজা খোলেননি। তখন সেই মহিলা আমাদের ডাকে। এই ফ্ল্যাটের দরজাগুলো নিশ্চয় দেখেছেন, ইয়েল লক লাগানো। মানে টেনে দিলে বন্ধ হয়ে যায়। চাবি না থাকলে বাইরে থেকে খোলা যায় না। কোনওভাবে চাবি ভিতরে রেখে দরজা টেনে দিলে ভারি বিপদে পড়তে হয় বলে, আমরা সাধারণত ডুপ্লিকেট চাবিটা পাশাপাশি ফ্ল্যাটে রেখে দিই। নীরেনবাবুর চাবিটাও আমার কাছেই থাকে। মালতীর মা-এর কথা শুনে আমি প্রথমটায় ভেবেছিলাম হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একলা মানুষ থাকেন… তারপর তো দরজা খুলে ওই বীভৎস দৃশ্য…।
নীরেন সোম কীরকম মানুষ ছিলেন মনে হয়?
মানুষ কীরকম ছিলেন বলা কঠিন। আমরা তো নিশ্চিত ওনার সবথেকে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। কিন্তু আজকাল তো পাশাপাশি ঘরে থাকলেও লোককে চেনা যায় না। তাছাড়া উনি চিরকালই একটু অমিশুক, চুপচাপ ধরণের মানুষ। ফ্ল্যাটে কোনও অনুষ্ঠান হলে আসতেন না সাধারণত। চাঁদাও সহজে দিতে চাইতেন না। যথেষ্ট মিতব্যয়ী ছিলেন। আমার ধারণা, নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এটা করতেন। সরকারি চাকরি। মাইনে এমন কিছু আহামরি নয়। ওঁর যা কাজ, তাতে উপরিরও কোনো সুযোগ নেই। ব্যাচেলর মানুষ। ছেলেপুলে নেই। নিজের ভবিষ্যতের সংস্থান তো নিজেকেই করে রাখতে হবে। শখ-শৌখিনতা তাই একেবারেই ছিল না। অন্তত আমি কোনও দিন সেরকম কিছু দেখিনি।
আচ্ছা নীরেনবাবুর কি বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট ছিল, মানে হাঁটা-চলা-কথাবার্তায়। এমন কিছু যেটা অন্যদের থেকে আলাদা। চট করে চোখে পড়ে এমন কিছু।
একটু ভেবে সুদীপ রায় বললেন, নাঃ, সেরকম কিছু তো মনে পড়ছে না। আর পাঁচটা মানুষের মতোই। তবে এ ব্যাপারে পুগুল, মানে আমার ছেলে আপনাকে আরও ভালোভাবে বলতে পারবে। গোটা আবাসনে একমাত্র পুগুলের সঙ্গেই ওনার দোস্তি ছিল। নীরেনজ্যেঠুর বাড়িতে ও যখন-তখন হানা দিত। অনেকখানি সময় একসঙ্গে কাটাতও। আর কেউ ওনার ফ্ল্যাটে যেত না। উনিও সচরাচর কারুর বাড়ির চৌকাঠ মাড়াতেন না।
তাহলে আজ সন্ধেবেলা যখন আসব, তখন আপনার ছেলের সঙ্গেও একটু কথা বলে যাব।
প্রণয় আর অফিসে ফেরেনি। সানরাইজ থেকে বেরিয়ে দুজনে একসঙ্গেই এল ভবানীপুরে। মধ্যাহ্নভোজটা প্রণয় সেরে নিল দিগন্তর বাড়িতেই। অঞ্জলি সেটা অনুমান করে তৈরিই ছিল। ট্যাংরা মাছ আবার প্রণয়ের তেমন পছন্দ নয়। তাই তার জন্য কমলাদিকে বলে আলাদা করে দুপিস কাটাপোনা ভাজিয়েও নিয়েছিল। খেতে বসে মটরশুঁটি দেওয়া মুগের ডালে গন্ধরাজ লেবুটা চিপে নিয়ে দিগন্ত বলল, নীরেন সোমের হাতে সম্প্রতি বেশ ভালোরকম টাকা এসেছিল।
কী করে বুঝলি?
ভদ্রলোক যে মিতব্যয়ী ছিলেন সেটা তো সুদীপ রায়ই বললেন। অথচ ওনার শোবার ঘরে যে ব্র্যাকেটটা রয়েছে তাতে গোটা দুয়েক ব্র্যান্ডেড জামা ঝুলছিল। আলমারিতেও নতুন জামা-প্যান্টের দুটো প্যাকেট ছিল। ড্রেসিং টেবিলে রাখা আফটার শেভটা রীতিমত দামি আর প্রায় নতুন। ভদ্রলোক মনে মনে শৌখিন ছিলেন। সামান্য জিনিসপত্রও গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখতেন। কিন্তু শখ মেটানোর পয়সা ছিল না। হঠাৎ হাতে পয়সা আসায় মনের সাধ মিটিয়েছেন।
অফিসে বোনাস পেতে পারেন তো?
সরকারি চাকরিতে বোনাস আর কতটুকু দেয়। তাছাড়া সেটা একটা রুটিন ব্যাপার। বোনাসের টাকাটা কীভাবে খরচা করা হবে তার প্ল্যান করা থাকে। এটা সেরকম নয়। আমার ধারণা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবেই টাকাটা পেয়েছিলেন নীরেনবাবু। সেজন্যই এমন বেমক্কা খরচ করতে পেরেছেন।
কিন্তু টাকাটা পেলেন কোত্থেকে?
সেটাই তো প্রশ্ন। কে টাকাটা দিল ওনাকে? টাকা লোকে এমনি এমনি দেয় না। নীরেনবাবু কি তাহলে কোনও গোপন কথা জেনে ফেলে কাউকে ব্ল্যাকমেল করছিলেন? শেষ পর্যন্ত তার হাতেই খুন হতে হয়েছে ওনাকে? কিন্তু ভদ্রলোকের প্রোফাইলটাই এমন, এতটা নিরীহ এবং নিরাপদ গোছের যে ওনাকে ব্ল্যাকমেলার হিসাবে কল্পনা করাই কঠিন। তবে সুদীপবাবু যতই বলুন যে উনি কারুর সঙ্গে মেলামেশা করতেন না বা ওনার বাড়িতে কেউ আসত না, সেটা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। সেদিন সন্ধের সময় অন্তত ওনার বাড়িতে যে কেউ এসেছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত। এখন সেটা এক না একাধিক ব্যক্তি সেটা জানতে হবে। তুই খেয়াল করেছিলি, আমি নীরেন সোমের বসার ঘরে সেন্টার টেবিলে রাখা প্যাড থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়েছিলাম?
হ্যাঁ, দেখলাম তো।
তাতে নানারকম হিজিবিজি কাটা ছিল। অনেকের অভ্যাস থাকে তো, হাতে কাগজ-কলম পেলে নিজের নাম লিখে হিজিবিজি করা, এটাও সেরকমই। সবটা বোঝা যাচ্ছে না, তবে নামের আদ্যাক্ষর যে ‘এ’ সেটা বোঝা যাচ্ছে।
আচ্ছা দিনু, নীরেন সোম যে খুন হয়েছেন, সে ব্যাপারে তুই এতটা নিশ্চিত হলি কী করে?
একশ শতাংশ নিশ্চিত এখনও বলতে পারব না। সেটা খানিকটা হওয়া যাবে পুগুলের সঙ্গে কথা বললে। আর ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তো বোঝাই যাবে। কিন্তু তার আগে তুই একটা জরুরি কথা বল, নীরেন সোমের আত্মীয়-স্বজন কে আছেন, কিছু জানতে পেরেছিস? তাঁদের কি খবর দেওয়া হয়েছে?
আত্মীয়-স্বজন তেমন কেউ নেই। ওঁরা দুই ভাই। বড় ভাইয়ের নাম ধীরেন সোম। সুদীপবাবুর কাছে নামটা জানতে পেরেছিলাম। নীরেন সোম মোবাইল ব্যবহার করতেন না। ওনার বসার ঘরে টেবিলের ওপর একটা ফোনবুক ছিল। তাতে নম্বরটা পেয়ে ফোন করেছিলাম। ধীরেন সোম সল্টলেকে থাকেন। ব্যাঙ্কের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। স্ত্রী মারা গেছেন। একটি ছেলে আছে। সে একটা ওযুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে হয়। এখন গেছে শিলিগুড়ি। আজ রাতে ফেরার কথা। সে ফিরলেই সৎকারের ব্যবস্থা হবে। কারণ ধীরেনবাবু আর্থারাইটিসের রুগী। নড়াচড়া করার প্রায় ক্ষমতাই নেই।
তার মানে নীরেনবাবুর টাকা-পয়সা, সম্পত্তি সবই এই ভাইপোরই প্রাপ্য?
হিসেবে তো সেরকমই দাঁড়ায়।
ভাইপোর নাম কী রে?
পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে দেখে নিয়ে প্রণয় বলে, কিংশুক সোম। কাজ করে মেড-ইন্ডিয়া কোম্পানিতে। এটাই প্রথম চাকরি। নর্থ সিটি কলেজের ছাত্র ছিল। বিকম পাস করে বছর পাঁচেক হল এখানে ঢুকেছে। ডিটেলটা ওর বাবার কাছ থেকেই নিয়েছি।
আমাদের মিলনী সংঘের ফুটবল টিমে ব্যাকে খেলত প্রত্যুষকে মনে আছে তোর?
হাতি-কানের কথা বলছিস তো? দিব্যি মনে আছে।
খেতে খেতে এতক্ষণ খুব মন দিয়ে দুই বন্ধুর কথা শুনছিল অঞ্জলি। এবার জিজ্ঞাসা করে, হাতি-কান ব্যাপারটা কী?
আরে প্রত্যুষের কানদুটো খুব বড় বড় ছিল বলে আমরা ওকে হাতি-কান বলে ডাকতাম। রেগে গেলে সেদুটো আবার টকটকে লাল হয়ে উঠত। কিন্তু প্রত্যুষের কথা হঠাৎ তোর মনে পড়ল কেন?
যতদূর আমার মনে পড়ছে প্রত্যুষ মেড-ইন্ডিয়াতে আছে। এতদিনে নিশ্চয় বেশ খানিকটা সিনিয়রও হয়েছে। ওকে ফোন করে এই কিংশুক ছোকরার সম্বন্ধে একটু খোঁজ নিতে হবে।
.
দিগন্ত আর প্রণয় যখন সন্ধেবেলা সানরাইজ ভিলায় গিয়ে পৌঁছল, ঘড়িতে তখন প্রায় সাতটা। আবাসনের কমিটির সেক্রেটারি মুকুল সেন-এর ফ্ল্যাটে বসে সিসিটিভি-র ফুটেজ দেখা হবে ঠিক হয়েছে। কেয়ারটেকার উত্তমের কাছেই সেকথা জানা গেল। উত্তমই তাদের দুজনকে দোতলায় মুকুলবাবুর ফ্ল্যাটে নিয়ে এল। ততক্ষণে সেখানে অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও এসে গেছেন। নীরেন সোমের তুলনায় মুকুলবাবুর ফ্ল্যাটটি কিছুটা বড়। তিনি আসলে পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট কিনে সেটিকে ভিতরে কিছু রদ-বদল করে জুড়ে নিয়েছেন। তাঁর ‘এল’ শেপের বসার ঘর এবং খাওয়ার ঘরেই টুল, মোড়া, চেয়ার পেতে বসেছিলেন সবাই। তাদের দুজনের জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে দিগন্ত বলল, দেখুন নীরেন সোমের মৃত্যুটাকে পুলিশ আত্মহত্যা বলছে না। তাই তদন্তের সুবিধার জন্য আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখব।
আসলে মৃতদেহ দেখে আমাদের আন্দাজ নীরেনবাবু মোটামুটি সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে নটার মধ্যে মারা গেছেন। এর কাছাকাছি সময়ে কারা সানরাইজ ভিলায় এসেছিল সেটা আমাদের জানা দরকার। আপনাদের আমরা আসতে বলেছি, কারণ যারা এই সময় গেট দিয়ে ঢুকছে, তারা কার বাড়িতে গেছে সেটা জানাটা জরুরি।
সব কিছু রেডি করাই ছিল। ফুটেজ দেখা শুরু হল। ভালো করে বার দুই-তিনবার রিওয়াইন্ড করে দেখে বোঝা গেল মোটামুটি জনা বারো লোক ওই সময়ের মধ্যে সানরাইজ ভিলায় ঢুকেছে। তাদের মধ্যে চারজন ফ্ল্যাটেরই বাসিন্দা। তিনজন কাজের লোক। তাদের মধ্যে দুজন ওই সময়ের মধ্যে বেরিয়েও গেছে। একজন ফ্ল্যাটের একটি বাচ্চাকে পড়াতে এসেছেন। একজন মুকুলবাবুর অফিসের সহকর্মী। তাঁর বাড়িতেই এসেছিলেন। আর একজন চারতলার অনিমেষ বাবুর শালা। কিন্তু দুজন এমন রয়েছেন যাদের কেউই চিনতে পারল না। তাদের মধ্যে একজন ঢোকার মিনিট পনেরো পরেই বেরিয়ে গেছেন। দোতলার সুপ্রিয় ধর জানালেন, সেদিন সন্ধেবেলায় তাঁর বাড়িতে ল্যাপটপ সারাতে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। কিন্তু তাঁরা স্বামী-স্ত্রী কেউই তখনও অফিস থেকে ফেরেননি। কাজের মেয়েটিকে বলা ছিল না যে এরকম কেউ আসবে। তাই সে আইহোল দিয়ে অচেনা লোক দেখে দরজা খোলেনি। এই ল্যাপটপ সারানোর মেকানিককে তিনি চেনেন না। আর দ্বিতীয় একজন ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওলা ব্যক্তিকেও কেউ চিনতে পারল না। যদিও উত্তম বলল যে তার ভদ্রলোককে চেনা চেনা লাগছে। এই লোকটি সম্ভবত এর আগে দু-একবার নীরেন সোমের বাড়িতে এসেছেন। কিন্তু তখন তার দাড়ি ছিল না। এই ভদ্রলোক কিন্তু ফ্ল্যাটে ঢোকার প্রায় ঘন্টাখানেক পরে বেরিয়েছেন।
মুকুলবাবু অবশ্য বললেন, তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার হয় মিঃ দেব, ইদানীং তো ক্যুরিয়র সার্ভিসের লোক, খাবারের দোকানের ডেলিভারি ম্যান, এসব তো হামেশাই আসে। তাদের মুখ কী আমরা মনে রাখি? এই ভদ্রলোক সেরকম কেউও তো হতে পারে?
হতে তো পারেই মুকুলবাবু। কিন্তু তারা তো কাজ সেরেই বেরিয়ে যাবে। এতক্ষণ থাকাটা একটু সন্দেহজনক। ভদ্রলোকের প্রোফাইলটা অন্তত ছবিতে দেখে সেরকম মনেও হচ্ছে না। তাছাড়া মুশকিলটা কী বলুন তো, নীরেন সোমের মৃত্যুটাকে আমরা খুন বলেই ধরে নিচ্ছি। সেক্ষেত্রে বাইরের কেউ যদি কাজটা না করে থাকে, তাহলে তো ধরে নিতে হবে ফ্ল্যাটের ভিতরের কেউই এর জন্য দায়ী।
দিগন্তের কথাটা শুনে ঘরের মানুষদের গলা থেকে প্রথমে একটা অস্ফুট বিস্ময় এবং ভীতির আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। তারপরই একটা ভয়ানক নৈঃশব্দ।
অবস্থাটা বুঝতে পেরে প্রণয় একটু হেসে বলে, আপনারা ভয় পাচ্ছেন কেন? আমাদের এখনও ধারণা বাইরের কেউই এই ঘটনাটা ঘটিয়েছে। অকারণে আপনাদের টানা-হ্যাঁচড়ার কোনও প্রশ্নই নেই। পুলিশে ছুঁলে একুশ ঘা কথাটা এখন আর সত্যি নয়। তবে আমরা আশা করব যে আপনারা তদন্তের ব্যাপারে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। আমরা যা প্রশ্ন করব, সে সম্বন্ধে যা জানেন, তার সবটাই ঠিকঠাক বলবেন।
প্রণয়ের কথা শুনে খানিকটা কলের পুতুলের মতোই ঘাড় নাড়ে সবাই। যদিও তাদের মুখ দেখে মনে হয় না কথাটা তারা পুরোপুরি বিশ্বাস করেছে।
আচ্ছা একটা কথা বলুন তো, সেদিন সারাদিনে আপনারা কেউ কি নীরেন সোমের ফ্ল্যাটে গেছিলেন বা কাউকে যেতে দেখেছিলেন?
সবাই চুপ করে আছে দেখে মুকুলবাবু ফের বলেন, দেখুন, নীরেন সোম ছিলেন ভারী অমিশুক এবং একটু খিটখিটে ধরণের লোক। সব সময়ই যেন বিরক্ত হয়ে আছেন, এমন একটা মুখের ভাব। তাই ওনার সঙ্গে কারুরই তেমন মেলা-মেশা ছিল না। আমি তো শেষ কবে ওনার ফ্ল্যাটে গেছি মনেই করতে পারব না। আমার মনে হয় এ-ব্যাপারে আমার সঙ্গে প্রায় সকলেই একমত হবেন।
একটা ট্রে-তে চায়ের কাপ বসিয়ে সবাইকে চা দিচ্ছিলেন মুকুলবাবুর স্ত্রী। তিনি হঠাৎ ট্রে-টা নামিয়ে রেখে বললেন, সেদিন সন্ধেবেলা নীরেনবাবুর বাড়িতে মনে হয় কেউ এসেছিল।
কেন বলুন তো? আপনি দেখেছিলেন কাউকে?
না দেখিনি। আসলে ওনার ওপরে মৃদুলবাবুর ফ্ল্যাটে যাচ্ছিলাম। আমি লিফটে উঠতে পছন্দ করি না। তাই সিঁড়ি দিয়ে যাই। যাওয়ার সময় নীরেন সোমের ঘরের ভিতর থেকে কথার আওয়াজ পেয়েছিলাম। আসলে ওনার বাড়িতে সচরাচর তো কেউ যেত না। তাই ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলাম।
কথা কি বেশ জোরে জোরে হচ্ছিল, মানে উত্তেজিত কথাবার্তা?
না না, সেরকম নয় মোটেই। সম্ভবত ওরা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলছিলেন। তাই শুনতে পেয়েছিলাম। আর আর… হ্যাঁ, একজোড়া চটিও মনে হচ্ছে যেন বাইরে খোলা ছিল।
কী বিষয়ে কথা হচ্ছিল কিছু শুনেছিলেন?
না, সেরকম কিছু তো মনে পড়ছে না। মানে আমি তো দাঁড়াইনি, হেঁটে চলে গেছিলাম। তাই…
চা খেয়ে, মকুলবাবুর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দিগন্ত সুদীপ রায়কে বলল, অসুবিধা না হলে আপনার ছেলের সঙ্গে একটু কথা বলে যাই।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়। আমি বলে রেখেছি। নীরেনবাবুর মৃত্যুটা ওর কাছে খুবই শকিং হয়েছে। একদম চুপচাপ রয়েছে দুদিন ধরে।
সুদীপ রায়ের ফ্ল্যাটের ডিজাইনটা একেবারেই নীরেন সোমের মতো। বসার ঘরে আজকাল শপিং মলে সস্তা কিন্তু আধুনিক ডিজাইনের যে ধরণের সোফা পাওয়া যায়, সেরকম একটা সেট পাতা। জানলার পর্দা, সেন্টার টেবিল, দেওয়ালের রঙ, সব মিলিয়ে একটা পরিচ্ছন্ন রুচির ছাপ আছে। দিগন্তরা বসার পর পুগুলকে নিয়ে এলেন তার মা। পুগুল ওরফে শ্রীমন্ত রায়ের বয়স দশ। ক্লাস ফাইভে পড়ে। মুখের গড়নে সুদীপবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে যথেষ্ট মিল আছে। বেশ উজ্জ্বল চোখ। তবে চেহারায় এখন একটা বিষণ্ণতা এবং আশঙ্কার ছাপ স্পষ্ট।
পুগুলকে সোফায় নিজের পাশে বসিয়ে, তার চুলগুলো আলতো করে ঘেঁটে দিয়ে দিগন্ত বলল, পুগুল, আমি জানি যে তোমার খুব মন খারাপ। তোমার নীরেনজ্যেঠুকে কোনও একটা দুষ্টু লোক মেরে ফেলেছে। আমরা সেই দুষ্টু লোকটাকে ধরতে চাইছি। সেজন্য তোমাকেও একটু সাহায্য করতে হবে।
তুমি বুঝি ফেলুদা?
না, আমি ফেলুদা নই। আমি হলাম দিনু টিকটিকি। তুমি আমাকে শুধু টিকটিকিও বলতে পার।
ধুর, টিকটিকি তো দেওয়ালে থাকে। মা খুব টিকটিকি ভয় পায়।
ঠিক বলেছ। টিকটিকি তো দেওয়ালে বসে সবদিকে নজর রাখে। আর মাঝে মাঝে অদ্ভূত কিছু দেখলেই টিকটিক করে ডেকে সবাইকে সতর্ক করে দেয়। গোয়েন্দাদেরও সেরকম দুষ্টু লোক দেখলেই মাথার মধ্যে ওরকম টিকটিক করে ওঠে।
তোমার মগজাস্ত্র আছে?
উঁহু, আমার আছে ইনটেনাইল।
সেটা আবার কী?
পুগুলের চোখ গোল গোল। প্রণয়েরও।
এটা হল ইন্টালিজেন্ট মিসাইল। মিসাইল জানো তো? অনেক দূর থেকে ছুড়লেও একেবারে ঠিকঠাক টার্গেটে গিয়ে হিট করে। কিন্তু তার জন্য মিসাইলের নানারকম ডাটা লাগে। আমার ইনেটনাইলকে ডাটা দেওয়ার জন্য পাঁচটা রাডারও আছে। সেগুলো হল আমার চোখ, নাক, কান, জিভ আর ত্বক। এই পাঁচটা রাডার ফিড পাঠায়। আর সেই ফিড থেকে মিসাইল লক্ষ্যস্থির করে টার্গেটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
দারুণ দারুণ, হাততালি দিয়ে ওঠে পুগুল। তুমি তোমার ইনটেনাইলটা আমাকে দেখাবে?
দেখাব কেন! আমি তোমার জন্য একটা আলাদা ইনটেনাইল বানিয়েই দেব। কিন্তু তার আগে আমি যা জিজ্ঞাসা করব, তোমাকে ভেবে-চিন্তে ঠিকঠাক উত্তর দিতে হবে।
দিগন্তর কথায় ঘাড় নেড়ে সোফার ওপর জুত করে বসে পুগুল।
আচ্ছা, তোমার নীরেনজ্যেঠুর সঙ্গে তুমি কী গল্প করতে বলত?
অনেক গল্প। জ্যেঠু আমাকে অনেক জায়গার গল্প বলত। পাহাড়, জঙ্গলের গল্প। আফ্রিকার সিংহের গল্প। আইফেল টাওয়ারের গল্প, অনেক কিছু।
জ্যেঠু বুঝি সেইসব জায়গায় বেড়াতে গেছিল?
না যায়নি। বই পড়ে বলত। ছবি দেখে বলত। জ্যেঠু টিভিতে সারাক্ষণ নানা দেশে বেড়াতে যাওয়ার চ্যানেল দেখত। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখত।
কেন বলত? জ্যেঠুর কি খুব বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করত?
খুব ইচ্ছে করত। কিন্তু জ্যেঠুর তো পয়সা ছিল না। সেইজন্যই তো জেঠু লটারির প্রাইজ পেয়ে অত খুশি হয়েছিল।
জেঠু লটারিতে প্রাইজ পেয়েছিল?
হ্যাঁ তো। জ্যেঠু তো সারাক্ষণ বলত, আমি যদি কোনওদিন লটারির প্রাইজ পাই, তাহলে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াব। তারপর তো সত্যিই পেয়ে গেল প্রাইজ। সেদিন তো জ্যেঠু কী খুশি..। আমার জন্য একটা বড় চকোলেট নিয়ে এসেছিল। নিজের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনেছিল। আমাকে বলল, জানো তো পুগুলবাবু আমি এবার ইউরোপ বেড়াতে যাব। আইফেল টাওয়ার দেখব, মোনালিসা দেখব, পিকাডেলি সার্কাস দেখব…আমার কতদিনের স্বপ্ন। জ্যেঠুকে আমি কখনও অত খুশিখুশি দেখিনি। তাই আমারও খুব আনন্দ হল। আমি বললাম, তাহলে তুমি লটারি পেয়ে গেছ?
জ্যেঠু কী বলল?
জ্যেঠু আমার মাথাটা নেড়ে দিয়ে বলল, হ্যাঁ গো পুগুলবাবু আমি লটারি পেয়েছি, মস্ত লটারি।
এটা কতদিন আগে বলেছিল তোমার মনে আছে?
আমার তখন এক্সাম চলছিল স্কুলে। তার পরের দিন ম্যাথসের এক্সাম ছিল। তাই মা ডাকল একটু পরেই…
সুদীপ রায়ের স্ত্রী দিগন্তর দিকে তাকিয়ে বললেন, তার মানে দিন পনেরো আগের কথা। ওর পরীক্ষা শেষ হয়েছে দুসপ্তাহ হল।
আচ্ছা পুগুল, কাল কি তুমি জ্যেঠুর বাড়ি গেছিলে?
না, কাল যাইনি। তবে কাল একবার জ্যেঠুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।
কখন?
আমি নিচের দোকান থেকে ইরেজার কিনতে গেছিলাম। যখন ফিরছি, তখন জ্যেঠুর দরজা খোলা ছিল। তাই ভাবলাম একবার হাই করে আসি।
দরজা খোলা ছিল কেন? কেউ এসেছিল বাড়িতে?
হ্যাঁ, অনিমেষকাকু এসেছিল।
তুমি অনিমেষকাকুকে দেখেছিলে?
পিছন থেকে দেখেছিলাম। অনিমেষকাকু সোফায় বসেছিল। তারপরেই তো জ্যেঠু আমাকে হাত নেড়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
পুগুল তুমি সিওর যে তুমি অনিমেষকাকুকেই দেখেছিলে? উনি কি দরজার দিকে মুখ করেই বসেছিলেন?
দিগন্তর কথায় এবার একটু চিন্তায় পড়ে পুগুল। চোখ বন্ধ করে সামান্য ভেবে বলে, না, মুখ আমি দেখতে পাইনি। সোফায় বসেছিল পিছন ফিরে। মাথার পিছনটা দেখা যাচ্ছিল। অনিমেষকাকুর তো মাথার পিছনে টাক আছে। সেরকমই ছিল। তাই আমি ভেবেছি অনিমেষকাকু এসেছে।
অনিমেষকাকু কি মাঝে-মধ্যে তোমার জেঠুর কাছে যেতেন?
না তো। আমি কখনও যেতে দেখিনি।
তুমি ওনাকে পিছন থেকে দেখেছিলে। তার মানে উনিও তোমাকে দেখতে পাননি, তাইতো?
দিগন্তর কথায় এবার বড় করে ঘাড় নাড়ে পুগুল।
দিগন্ত এবার সুদীপ রায়ের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করে, পুগুল কটা নাগাদ ইরেজার কিনতে গেছিল আপনার মনে আছে?
মা কিছু বলার আগেই পুগুল ফের বলে উঠল, তখনও সাতটা বাজেনি। সাতটায় তো টিভি-তে টাপুর-টুপুর দেখায়। মা রোজ ওই সিরিয়ালটা দেখে। মা তো আমাকে দুধ-বিস্কিট দিয়ে সিরিয়াল দেখতে বসল।
আচ্ছা আজ আমরা যখন মুকুলবাবুর ঘরে কথা বলছিলাম তখন কি সেখানে অনিমেষবাবু ছিলেন?
দিগন্তর কথায় একটু অপ্রস্তুতভাবে মাথা নেড়ে সুদীপ রায় বললেন, হ্যাঁ, ছিলেন তো। কিন্তু উনি তো…
আচ্ছা পুগুল, তোমার নীরেন জ্যেঠু কি ন্যাটা ছিলেন?
ন্যাটা মানে কি?
ন্যাটা মানে যিনি বাঁ-হাতে সব কাজ করেন।
না, নীরেন জ্যেঠু সব্যসাচী ছিল।
তাই নাকি? সব্যসাচী মানে তুমি জানো?
জানি। জ্যেঠুই তো বলেছে। সব্যসাচী মানে যে ডান-বাঁ দু-হাতেই কাজ করতে পারে। জ্যেঠু আসলে বাঁ-হাতেই সব কাজ করত। শুধু খাবার খেত ডান হাত দিয়ে। ছোটবেলায় নাকি জ্যেঠুর ঠাকুমা খুব জোর করে ডান হাতে খাওয়া অভ্যাস করিয়েছিল। জ্যেঠু তাই বলত, ঠাকুমার জন্যই আমি সব্যসাচী হয়ে গেছি, বুঝলি।
থ্যাঙ্কিউ, পুগুলবাবু। তুমি আমাকে অনেক হেল্প করেছ। এর পরের দিন যেদিন আসব, সেদিন ইনটেনাইল কেমন করে তৈরি করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে কেমন। ততদিন তুমি তোমার রাডারগুলো কতটা ভালো কাজ করতে পারে সেটা বরং দেখে নিও, কেমন?
দিগন্ত আর প্রণয়ের সঙ্গে সুদীপ রায়ও নিচে নেমে এলেন। তিনজনে একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে পৌঁছলে, সুদীপবাবু বললেন, আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই! নীরেনবাবু যে ন্যাটা, সেটা আমরা এতদিন পাশাপাশি বাস করেও বুঝতে পারিনি। অথচ আপনি তো…
একটু হেসে দিগন্ত বলল, আন্দাজ করেছিলাম। আসলে নীরেনবাবু লেখার জন্য ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতেন। সাধারণত আমরা যারা ডানহাতে লিখি তাদের পেনের নিব যেদিকে ক্ষয়ে যায়, বাঁ-হাতে লিখলে সেটা তার উল্টোদিকে হয়। ওনার পেনটা দিয়ে লিখতে গিয়েই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তাই পুগুলের কাছে কনফার্ম করলাম। আচ্ছা একটা কথা, অনিমেষবাবুর কাল নীরেন সোমের ঘরে যাওয়ার কথাটা যে আমরা জানতে পেরেছি, সেটা এখনই কাউকে বলবেন না।
প্রশ্নই নেই। কিন্তু ভদ্রলোক কথাটা চেপে গেলেন কেন বুঝতে পারছি না।
দুটো কারণ হতে পারে। প্রথমটা খুব সিম্পল। ভয় পেয়েছেন। নীরেন সোমের খুনটা উনি যে সময় গেছিলেন তার কাছাকাছি সময় হয়েছে শুনে ভয় পেয়েছেন। নীরেন সোমের বাড়িতে যেতে ওনাকে কেউ দেখেনি বুঝে কথাটা চেপে যাওয়াই শ্রেয় মনে করেছেন।
আর দ্বিতীয়টা?
দ্বিতীয়টা তো খুবই মারাত্মক, বুঝতেই পারছেন। এই অনিমেষবাবু লোকটি এমনিতে কেমন?
অনিমেষ মাইতি? ঘোড়েল লোক। নানা বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন। চাকরি একটা করেন ঠিকই, তবে অনেক রকম ধান্দাবাজিও আছে। চতুর এবং মিথ্যেবাদী। লোকের মাথায় হাত বুলিয়ে টাকা আদায় করে নিতে ওস্তাদ।
কালারফুল ক্যারেক্টার তার মানে। কাল-পরশুর মধ্যেই এসে ওনার সঙ্গে আলাপ করে যাব। ততক্ষণ মুখটি বন্ধ রাখুন। আর সম্ভব হলে খেয়াল রাখবেন এই অনিমেষ মাইতির কাছে সন্দেহজনক কেউ আসছে কিনা। আমার মোবাইল নম্বরটা নিয়ে রাখুন। তেমন বুঝলে খবর দেবেন।
ঘাড় নেড়ে সুদীপবাবু বললেন, আর একটা কথা আমার মনে হয় আপনাকে বলে রাখা ভালো। আমাদের এই কেয়ারটেকার উত্তম মহান্তির সঙ্গে কিন্তু নীরেনবাবুর সম্পর্ক একেবারেই ভালো ছিল না। আপনি তো শুনেইছেন নীরেন সোম অত্যন্ত মিতব্যয়ী লোক ছিলেন। প্রতিবার উত্তমকে পুজোর বোনাস আর বকশিস দেওয়া নিয়ে ওনার সঙ্গে ঝামেলা হত। উত্তমও সেকথা জানত। তাই ও একেবারেই নীরেনবাবুকে পছন্দ করত না। দু-চারবার ভালো রকম ঝামেলা হয়েছে। নীরেনবাবু তো একবার রেগেমেগে মারতেই গেছিলেন। আমরা সবাই মিলে মাঝে পড়ে ব্যাপারটা সামলাই।
রাতের খাবারটা ছিল একেবারে বিদেশি কায়দার। হালকা রসুনের গন্ধওলা চিকেন-লেন্টিল স্যুপ। সঙ্গে ব্রেড রোল, চিকেন স্ট্রোগানাফ আর অনেকটা নানারকম সবজি সেদ্ধ মাখন আর পার্সলি দিয়ে সাঁতলানো। ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে অঞ্জলি জিজ্ঞাসা করল, নীরেন সোম যে ন্যাটা ছিলেন এটা জানতে পেরে কি তোমার তদন্তে কোনও বিশেষ সুবিধা হয়েছে?
নীরেন সোম ন্যাটা ছিলেন এটা অনুমান করেই আমি বলেছিলাম যে ঘটনাটা আসলে আত্মহত্যা নয়, খুন।
কীভাবে?
দিগন্ত এক চামচ স্যুপ খেয়ে নিজের মোবাইল খুলে বলল,
খুব সহজ। এই ছবিটা দ্যাখ তাহলে বুঝতে পারবে। এটা নীরেন সোম যে অবস্থায় চেয়ারে বসেছিলেন তার ছবি। ওনার বাঁ-হাতের শিরা কাটা। ডান হাতটা টেবিলে রাখা। ডান হাতের পাশে ব্লেডটা পড়ে রয়েছে। তুমি এবার দৃশ্যটা কল্পনা কর। নীরেন সোম ব্লেডটা ডানহাতে নিয়ে বাঁ-হাতের শিরাটা কাটলেন, তারপর ব্লেডটা পাশে রেখে টেবিলের ওপর ডানহাত রেখে গুছিয়ে বসলেন। ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত না? আত্মহত্যা তো মানুষ ইমপালসে করে। যিনি আত্মহত্যা করছেন, তাঁর পক্ষে কি এত গুছিয়ে কাজ করা সম্ভব?
শিরাটা কাটার পর ব্লেডটা ওখানেই নীচে পড়ে থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। এখানেই আমার প্রথম খটকাটা লাগে। তারপর যখন বুঝলাম নীরেনবাবু ন্যাটা ছিলেন, তখন একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেলাম। কারণ সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক ছিল যে উনি বাঁ-হাত দিয়ে নিজের ডান হাতের শিরা কাটবেন।
তার মানে নীরেনবাবু নিজের হাতে শিরা কাটেননি।
এক্স্যাক্টলি। কেউ ওনাকে খুন করে কিংবা অজ্ঞান করে ওনার হাতের শিরা কেটে দিয়েছে। কিন্তু নীরেনবাবু যে ন্যাটা এই কথাটা তার মাথায় ছিল না অথবা সে জানত না।
চিকেন স্ট্রোগানাফের একটা বড় টুকরো কাঁটায় গেঁথে মুখে তুলতে তুলতে অঞ্জলি বলল, তাহলে তোমার সাসপেক্টের তালিকায় কজন রইল?
আপাতত চারজন। সিসিটিভি-তে দেখা অচেনা ভদ্রলোক, নীরেনবাবুর ভাইপো, অনিমেষবাবু আর উত্তম মহান্তি।
ও বাবা। মহান্তিকেও তুমি সন্দেহ করছ?
না করার কোনও কারণ নেই। খুন করার সুযোগ ওর সবথেকে বেশি ছিল। নীরেনবাবু ওকে অপমান করেছেন, মারতে গেছেন। প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছে থাকতেই পারে। যদিও তার সঙ্গে নীরেনবাবুর এই হঠাৎ টাকা-পয়সা পাওয়ার ব্যাপারটা মেলানো একটু কঠিন। সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে উত্তমের রাগটা ছিলই। সেটাকে কাজে লাগিয়ে অন্য কেউ ওকে দিয়ে খুনটা করিয়ে নিয়েছে।
পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট আসতে দেখা গেল দিগন্তের অনুমান পুরোপুরি সঠিক। নীরেন সোমের খুনের কারণ স্মদারিং। মানে মুখে বালিশ বা অন্য কিছু চাপা দিয়ে খুন করা হয়েছে। হাতে যে শিরাটা কাটা হয়েছে, সেটা হল পোস্ট মর্টেম ইনজুরি। মানে সেই ক্ষত মৃত্যুর কারণ নয়। নীরেন সোম আগে মারা গেছেন। তারপর তাঁর হাতের শিরা কেটে দেওয়া হয়েছে।
.
ধীরেন সোম আর তাঁর ছেলের সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে বুঝলি। কিন্তু তার আগে প্রত্যুষের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া দরকার।
কফিটা চমৎকার বানিয়েছিস দিনু।
আরাম করে একটা চুমুক দিয়ে প্রণয় বলল, ফোন করবি, নাকি সরাসরি অফিসে গিয়ে উপস্থিত হব।
ফোনেই কথা বলে নিই। তারপর যদি সন্দেহজনক কিছু মনে হয়, তাহলে অফিসে গিয়ে কথা বলা যাবে।
মোবাইলটা বার করে প্রত্যুষের নম্বরটা ডায়াল করে দিগন্ত। বেশ খানিকক্ষণ কথাবার্তা হয় দুজনে। কথা শেষ হয় দুই বন্ধুর অভ্যস্ত হাসি-ঠাট্টায়। ফোন বন্ধ করে দিগন্ত বলে, কিংশুক সোম বছর খানেক হল জয়েন করেছে। খাটিয়ে ছেলে, কাজের ছেলে। তবে একটু ওপরচালাক আর দেখনদারিও আছে। মানে যা ক্ষমতা তার থেকে বেশি বেশি দেখাতে বা বলতে ভালোবাসে। স্বাভাবিকভাবেই এই বলাটা বেশিরভাগ সময় মিথ্যে হয়। মানে ছেলেটির মিথ্যে কথা বলারও অভ্যাস আছে।
ও যে বলেছে সেই সময় নর্থ বেঙ্গলে গেছিল অফিসের কাজে, সেটা কি ঠিক?
পুরোটা ঠিক বলা যাবে না। অফিস ওকে নর্থ বেঙ্গল পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেটা চারদিনের জন্য। তারপর ও দুদিন ছুটি নিয়েছিল দার্জিলিং ঘুরে আসবে বলে। তার মানে নীরেন সোম যেদিন মারা গেছেন, সেদিন ওর দার্জিলিং-এ থাকার কথা। সেদিন ও আর অফিস ডিউটিতে ছিল না।
তার মানে ও সেদিন আদৌ দার্জিলিং-এ ছিল কিনা সেটা মোটেই নিশ্চিত নয়।
খুব ধীরে ধীরে কফিতে একটা চুমুক দিয়ে দিগন্ত বলে, ব্যাপারটা তাই দাঁড়াচ্ছে আসলে। ও যদি দার্জিলিং না গিয়ে সেদিন সকালে কলকাতায় ফিরে এসে থাকে, তাহলে সেটাও কারও জানার কথা নয়। কাকা মারা গেলে তার সব সম্পত্তি, যত সামান্যই হোক না কেন ও পাবে। যার দেখনদারি আছে, ফুটানি করা যার স্বভাব, তার পক্ষে এটা খুবই ভালো ব্যাপার।
কিন্তু সবটাই আটকে যাচ্ছে টাকার প্রসঙ্গে এসে। কিংশুক সোম কাকাকে টাকা দিতে যাবে কেন? টাকা ও পাবেই বা কোথায়? তুই ধীরেন সোমকে ফোন করে বল, আজ সন্ধেবেলায় আমরা ওর বাড়িতে যাব। ছেলেও যেন বাড়িতে থাকে। আমি ততক্ষণ সুদীপবাবুকে একটা ফোন করি।
প্রণয় উঠে যায় ধীরেনবাবুকে ফোন করতে। দিগন্ত সুদীপ রায়কে ডায়াল করে। দু-চারবার রিং বাজার পরই সুদীপবাবু ফোনটা ধরেন।
মিঃ রায়, আপনাকে একটা জরুরি কাজ করতে হবে। আপনি আপনার আবাসনের সবাইকে বলে দিন, যেদিন নীরেন সোম খুন হয়েছিলেন সেদিন সন্ধেবেলা সাতটার পর থেকে যাঁরা বাড়িতে ছিলেন তাঁদের সকলে কে কী করছিলেন, আমাকে যেন এসএমএস করে জানান। আজ রাতের মধ্যেই জানাবেন। আমার ফোন নম্বরটা দিয়ে দেবেন। বাড়িতে না থাকলে, কোথায় ছিলেন সেটাও জানাতে হবে। আর হ্যাঁ, খুব বয়স্ক এবং মহিলাদের বাদ দিতে পারেন।…হ্যাঁ হ্যাঁ, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছে। মৃত্যুর কারণ স্মদারিং, মানে শ্বাসরোধ করে খুন। সেইজন্যই বয়স্ক আর মহিলাদের বাদ দিলাম। নীরেন সোমের খুব একটা রোগা-ভোগা চেহারা তো নয়। তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করতে হলে গায়ে খানিকটা জোর দরকার। আর…ও হ্যাঁ, মুকুলবাবুর বাড়ির নম্বরটা একটু দেবেন প্লিজ।
সুদীপবাবু নম্বরটা বললে দিগন্ত সেটা টুকে নেয়। ততক্ষণে প্রণয়ের ফোনে কথাবার্তা শেষ।
ধীরেনবাবুর অসুবিধা নেই। আজ যেতে পারি আমরা। ছেলেও থাকবে বললেন। মুকুলবাবুর বাড়িতে আবার তোর কী দরকার?
জুতোর আমি, জুতোর তুমি, জুতো দিয়ে যায় চেনা…
হেঁয়ালি করিস না দিনু…
হেঁয়ালি নয়, সত্যি কথাই তো বলছি। মুকুলবাবুর স্ত্রী সেদিন বলেছিলেন না, নীরেন সোমের দরজার বাইরে একজোড়া চটি দেখেছিলেন, সেটা কী ধরণের চটি যদি কিছু মনে করতে পারেন।
সুদীপবাবু ফোন নম্বর পাঠানোর পর মুকুলবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সেদিন যে চটিজোড়া তিনি দেখেছিলেন সেগুলো সম্ভবত কাবলি স্যান্ডাল। ডিপ ব্রাউন রঙের।
ধীরেন সোমের বাড়িটা সল্টলেকের বিডি ব্লকে। ছিমছাম দোতলা বাড়ি। একতলায় বসার ঘর, খাওয়ার ঘর, রান্নাঘর। দোতলায় শোয়ার ব্যবস্থা। তবে ধীরেনবাবু ওঠা-নামা মোটেই করতে পারেন না। তাঁর শোয়া-বসা সবই দোতলায়। ছেলের শোবার ঘরও দোতলায়। ধীরেনবাবুর এক বয়স্ক বিধবা দিদি ওঁদের সঙ্গেই থাকেন। তাঁরও শোয়ার ঘর এবং পুজোর ঘর দোতলাতেই। নিজের ঘরে খাটের পাশের সোফায় বসেছিলেন ধীরেনবাবু। অন্য তিনটি চেয়ারে প্রণয়, দিগন্ত এবং কিংশুক। বাবার সঙ্গে চেহারার বেশ মিল আছে কিংশুকের। দোহারা গড়ন। চোখা নাক, পাতলা ঠোঁট হওয়ায় মুখে লাবণ্যের ভাগ কম। বরং একটা চাপা নিষ্ঠুরতা আছে। ধীরেনবাবুর মুখও একই ধরণের। কিন্তু বয়সের সঙ্গে চামড়া ঝুলে গিয়ে একটা শ্লথ ভাব আসায় সেই নিষ্ঠুরতাটা প্রকট নয়। সেলস কিংবা মার্কেটিংয়ে যারা কাজ করে তাদের চেহারা এবং উপস্থিতিতে একটা চটপটে, সপ্রতিভতা থাকে। কিংশুকেরও সেটা আছে। জামা-কাপড় পরিপাটি, আফটার শেভের গন্ধে সুরভিত।
কাজের লোক চা দিয়ে গেছিল। সঙ্গে চিকেন পকোড়া। চা খেতে খেতে ধীরেনবাবুর সঙ্গে কথা হল দিগন্তর। ভদ্রলোক ভায়ের মৃত্যুতে, বিশেষ করে এরকম মৃত্যুতে বেশ খানিকটা শকড।
আমরা তো প্রথমে জেনেছিলাম নীরেন আত্মহত্যা করেছে। বুঝতেই পারছেন একমাত্র ভাই, আমরা দুটিই ভাই, মা-বাবা দুজনেই গত হয়েছেন। নীরেন আমার থেকে বেশ খানিকটা ছোট। ওর কী এমন মনোকষ্ট হল যে নিজেকে শেষ করে দিতে হল সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের চিরকালই ভালো যোগাযোগ আছে। ইদানীং আমি আর যেতে পারতাম না। তবে ও আসত। বাবাই মানে আমার ছেলেও মাঝে-মধ্যে যেত। তবে ওর পড়াশোনা, নতুন চাকরি সব মিলিয়ে অনেকদিন যাওয়া হয়নি সেটাও ঠিক। কিন্তু ও কোনও বিপদে পড়লে দাদা যে ওর পাশে আছে সেটা নীরেন জানত।
আচ্ছা কাকাকে যে খুন করা হয়েছে সেটা আপনারা বুঝলেন কী করে? ওনার তো হাতের শিরা কাটা ছিল।
কিংশুকের কথার উত্তর দেয় প্রণয়, হাতের শিরা কাটায় ওনার মৃত্যু হয়নি। তার আগেই ওনাকে খুন করা হয়েছিল। পোস্টমর্টে রিপোর্টে সেটা স্পষ্ট।
কিন্তু কাকাকে খুন করে কার কী লাভ থাকতে পারে?
কিংশুকের কথার কোনও উত্তর প্রণয় দেওয়ার আগেই দিগন্ত হঠাৎ দেওয়ালে ঝোলানো একটা ফটোগ্রাফের দিকে আঙুল তুলে বলল, ওটা কি আপনাদের পারিবারিক ছবি?
ঘাড় ঘুরিয়ে ছবিটা দেখে ধীরেনবাবু বললেন, হ্যাঁ, ওটা আমার মা-বাবার ছবি।
আপনার সঙ্গে আপনার বাবার চেহারার বেশ মিল ছিল বোধহয়, তাই না?
হ্যাঁ, আমি আমার বাবার মতো দেখতে। নীরেন ছিল মায়ের মত।
আচ্ছা কিংশুক, আপনার কাকা যেদিন মারা যান সেদিন তো আপনি অফিসের কাজে শিলিগুড়িতে ছিলেন, তাই না?
দিগন্তর কথায় ঘাড় নাড়ে কিংশুক।
কী কাজে গেছিলেন আপনি?
মূলত মার্কেট সার্ভে। আমাদের দু-তিনটে নতুন প্রোডাক্ট বাজারে লঞ্চ করার কথা হচ্ছে। সেগুলোর ডিমান্ড কীরকম হতে পারে, মানুষের মধ্যে কতটা চাহিদা আছে, সেটা বোঝার একটা বেসিক চেষ্টা করা…
পুরো সময়টাই এই কাজেই ব্যস্ত ছিলেন?
হ্যাঁ, নিশ্চয়। অফিসের কাজে গেছি। অফিস পয়সা খরচ করে পাঠিয়েছে। অন্য কিছু করার তো প্রশ্নই নেই।
কিন্তু আপনার অফিসের কাজ তো চারদিনেই শেষ হয়ে গেছিল। তার পরের দুদিন আপনি কোথায় গেছিলেন কিংশুক?
মুহূর্তের মধ্যে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায় কিংশুকের। ধীরেনবাবুও বিস্মিত। বোঝাই যায় ব্যাপারটা তিনি জানতেন না।
আমি না মানে আমি…
কোথায় গেছিলেন, দার্জিলিং?
হ্যাঁ…
কোন হোটেলে ছিলেন, নামটা বলুন।
কোনওরকমে নিজেকে সামলে নেয় কিংশুক। তারপর ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলে, না আসলে আমি দার্জিলিং যাইনি। আমি লামাহাটার কাছে একটা ছোট গ্রামে গেছিলাম। শিলিগুড়িতে কাজ করতে গিয়ে একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তার বাড়ি লামাহাটার কাছে গ্রামে। ওরা হোম স্টে ভাড়া দেয়। সেখানে গিয়ে দুদিন ছিলাম। আমি সত্যি কথা বলছি স্যার। যাওয়ার কোনও ঠিকও ছিল না। বাবাকে বলিনি, বাবা বড্ড চিন্তা করে তাই…আসলে…
আসল কারণটা আমি খানিকটা অনুমানই করতে পারছি। আপনি যার বাড়িতে ছিলেন, তার নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর সব লিখে প্রণয়ের হাতে দিন। একটা কথা খেয়াল রাখবেন, ফোন করে কাউকে সাবধান করার চেষ্টা করলে নিজেও বিপদে পড়বেন, অন্যকেও বিপদে ফেলবেন।
কিংশুক স্বন্ত্রস্তভাবে উঠে চলে যায়। দিগন্ত এবার ধীরেনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে, আচ্ছা, সুগতা কে?
কথাটা শুনেই ভয়ানক চমকে ওঠেন ধীরেনবাবু, তার মানে! আপনি ও নাম জানলেন কী করে?
কী করে জানলাম পরে বলছি। কিন্তু তার আগে আপনি বলুন সুগতা আপনার কে হন?
মুখ নিচু করে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকেন ধীরেনবাবু। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, সুগতা আমার দিদি। মানে সহোদরা নয়। বাবার প্রথম পক্ষের মেয়ে। আমার বাবা মাধব সোম বিয়ে করেছিলেন সুগতার মা গীতালিকে। কিন্তু দুজনের মধ্যে বনিবনা হয়নি। কেন হয়নি আমি বলতে পারব না। সুগতার যখন তিনবছর বয়স তখন ওঁদের ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। তার বছর দুয়েক পরে আমার জন্ম। তার মানে সুগতা আমার থেকে বছর ছয়েকের বড়।
সুগতার মায়ের সঙ্গে আপনার বাবার যোগাযোগ ছিল?
মনে হয় না। কারণ আমার মায়ের সঙ্গে এনিয়ে বাবার কোনও কথাবার্তা কিংবা অশান্তি হতে কখনও দেখিনি। যোগাযোগ থাকলে সেটা নিয়ে নিশ্চয় আলোচনা হত। তবে বাবা ওদের খোঁজ রাখতেন, সেটা আমি জানি। কারণ বাবার ক্যানসার হয়েছিল। তিনি যখন মৃত্যুশয্যায় তখন আমাকে একান্তে বলেছিলেন মারা গেলে, খবরটা যেন ওদের জানিয়ে দিই। ঠিকানাটাও দিয়েছিলেন।
আপনি খবর দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ। একটা চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছিলাম। আমার ঠিকানাও দিয়েছিলাম। তবে কোনও উত্তর আসেনি।
গীতালিদেবী আবার বিবাহ করেছিলেন?
যতদূর জানি করেননি। নিজেই মেয়েকে মানুষ করেছেন। আত্মীয়স্বজনদের কাছে শুনেছি কলেজে পড়াতেন। অহংকারী, নাক-উঁচু মহিলা ছিলেন। অবশ্য এগুলো হল আমার বাড়ির লোকজনের ইন্টারপ্রিটেশন। যে বউ ডিভোর্স নিয়ে চলে গেছে, তার সম্বন্ধে তো ভালো ধারণা থাকার কথা নয়। আমার নিজের পরে মনে হয়েছে মহিলা বোধহয় একটু বেশি আত্মনির্ভরশীল ছিলেন। সেটা আমার বাবার স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। ডিভোর্সটাও হয়তো সেই কারণেই হয়েছিল।
আপনার কাছে সেই ঠিকানা আর ওনাদের কোনও ছবি আছে?
একটু মনে করে ধীরেনবাবু বললেন, হ্যাঁ আছে। কোনও কিছু ফেলে দেওয়া আমার স্বভাব নয়। তবে সেটা সুগতার খুব ছোটবেলার ছবি। মানে আমাদের বাড়িতে যখন ছিলেন তখন তোলা। আমি বাবাইকে ডাকছি। ও ছবিটা আলমারি থেকে বার করে দেবে। কিন্তু তার আগে আপনি বলুন সুগতার নাম আপনি জানলেন কী করে?
আপনার ভাইয়ের আলমারিতে একটা পুরোনো চিঠির অর্ধেকটা আমি পেয়েছি। চিঠির শেষের অংশটা। তাতে উনি নীরেনবাবুকে কোনও একটা জিনিস সুগতার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা বলছেন। আমি আপনাকে চিঠিটা দেখাচ্ছি…
দিগন্ত হোয়াটস অ্যাপ খুলে চিঠিটা দেখায় ধীরেনবাবুকে। বেশ মন দিয়ে চিঠিটা পড়ে ধীরেনবাবু বলেন, এটা আমার বাবারই হাতের লেখা। কিন্তু এটা পড়ে তো কোনও সম্পত্তির কথা বলছেন মনে হচ্ছে…
আমারও তাই মনে হয়েছে। আপনার বাবার সম্পত্তির ওয়ারিশন তো আপনারা দুজনেই?
এতকাল তো তাই জানতাম। সল্টলেকের এই বাড়িটা বাবার তৈরি। বাবা আমাকে বাড়িটা দিয়েছিলেন। জমানো টাকা নীরেন পেয়েছে। ওই টাকা দিয়েই ফ্ল্যাটটা কিনেছিল নীরেন। আর্থিক মূল্যের দিক দিয়ে আমার ভাগটা হয়তো একটু বেশি। কিন্তু যেহেতু আমি বিবাহিত, ছেলেপুলে আছে, তাই বাবা নিজের বিবেচনাতেই আমাকে বাড়িটা দেন। তবে তাই নিয়ে নীরেনের কোনওদিনই কোনও ক্ষোভ ছিল না। কিংশুককে ও নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসে। তাছাড়া দরকারও তো ছিল না। কিন্তু এটা কোন সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে তা তো বুঝতে পারছি না।
কিংশুক ঘরে ঢুকে নাম-ঠিকানা লেখা কাগজটা প্রণয়ের হাতে দেয়। তারপর বাবার নির্দেশমতো আলমারি খুলে একটা ফাইল বার করে। গোছানো ফাইল থেকে ঠিকানা লেখা কাগজ আর একটা সাদা-কালো ছবি বার করে দিগন্তর হাতে দেন ধীরেনবাবু।
আপনার সবকিছু গুছিয়ে ফাইলিং করে রাখা অভ্যাস, তাই না?
হ্যাঁ, আমাদের দুই ভাইয়েরই এরকম অভ্যাস। তবে আমারটা নিজের থেকে হয়েছে। আর নীরেনকে বাবা রীতিমতো বকাঝকা করে অভ্যাস করিয়েছিলেন। আসলে নীরেন ছোটবেলা থেকেই ভয়ানক ভুলো স্বভাবের। রোজকার কাজের মধ্যে যা নেই, তা ও মনে রাখতে পারে না। দরকারি কাগজপত্র যাতে হারিয়ে না ফেলে, সেজন্য বাবা ফাইল করে রাখতে বলতেন। এতটাই ভুলো যে আমার তো মাঝে মাঝে ভয় হত, বয়স হলে না অ্যালঝাইমার্স হয়। আসলে ও ন্যাটা ছিল তো। ছোটবেলা থেকেই সেজন্য ওর বোধহয় একটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স কাজ করত। গুটিয়ে থাকা স্বভাব ছিল। কোনও কিছুতেই আগ্রহ দেখাত না।
নীরেনবাবু যে ন্যাটা ছিলেন সেটা নিশ্চয় আপনার ছেলে কিংশুকও জানে।
জানবে না কেন! ছোটবেলা থেকে দেখছে তো …
সাদা-কালো ফটোগ্রাফটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখে দিগন্ত। নিতান্তই বাচ্চা মেয়ে। তবে তার মুখের সঙ্গে ধীরেনবাবুর বাবা, মানে মাধব সোমের মুখের যে একটা মিল আছে সেটা বোঝা যায়। ফটোগ্রাফের একটা ছবি তুলে নেয় দিগন্ত। ঠিকানাটা টুকে নিয়ে ধীরেনবাবু আর কিংশুকেরও একটা করে ছবি তোলে।
সুগতাকে কি আপনার সন্দেহ হচ্ছে ? আমি কিন্তু যতদূর জানি নীরেনের সঙ্গে ওর কোনও পরিচয়ই ছিল না।
সন্দেহ নয়, বলতে পারেন একটা আলগা কৌতূহল…
আর কিংশুক?
সত্যি কথা না বললে তার প্রতি সন্দেহ বাড়বে ধীরেনবাবু। তবে এই ঘটনার সঙ্গে যোগ থাকুক বা না থাকুক, ছেলের সম্বন্ধে একটু সতর্ক থাকবেন আপনি।
যাওয়ার পথে কোনও বাজারে একটু দাঁড়াস তো। অঞ্জলি বলেছে বাজার করে নিয়ে যেতে হবে। একটু দূরে দাঁড়াস। পুলিশের গাড়ি থেকে নামছি বুঝলে দোকানদার আবার পয়সা নিতে চাইবে না।
ইয়ার্কি মারিস না দিনু। গাড়ির গায়ে কোথাও পুলিশ লেখা নেই। নিশ্চিন্তে নামিস তুই। কিন্তু তার আগে বল তো, এই কিংশুক ছেলেটার ব্যাপারটা কী?
আমার মনে হয় ছেলেটা কোনও একটা নেশাভাঙের খপ্পরে পড়েছে। এমনিতে স্মার্ট চেহারা। কিন্তু চোখের তলাটা ফোলা, শুকনো ঠোঁট এসব দেখেই সন্দেহ হচ্ছিল। পাহাড়ের এই গ্রামগুলোয় নানারকম নেশার জিনিসের কারবার চলে। তুই যে নাম-ঠিকানা ও দিল, সেটায় খোঁজ নিস, তাহলেই আশা করি জানতে পারবি।
ঠিক আছে। আমি আজই লোক লাগাচ্ছি। কিন্তু তোর এসএমএস-এর কী খবর? সানরাইজ ভিলার বাসিন্দারা কিছু জানাল?
অনেকেই জানিয়েছে। বাড়ি ফিরে একসঙ্গে দেখব।
ও তোকে বলা হয়নি দিনু, ফিঙ্গার প্রিন্টের রিপোর্ট কিন্তু এসেছে।
তাই নাকি। বলবি তো। এটা খুব ইমপর্টান্ট।
ব্লেডের ওপর নীরেন সোমের আঙুলের কোনও ছাপ নেই। একটা অজানা আঙুলের ছাপ রয়েছে। সেই একই ছাপ পাওয়া গেছে চেয়ারের ব্যাক রেস্টে আর আলমারির হাতলে।
আমি ঠিক এরকমটাই সন্দেহ করেছিলাম। প্রণয় তুই কালই সানরাইজ ভিলার সবার আঙুলের ছাপ নেওয়ার ব্যবস্থা কর। কারুর সঙ্গে ওটা মিলছে কিনা দেখতে হবে।
ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস দিয়ে আসছিল গাড়ি। রুবির মোড় থেকে ডানদিকে বাঁক নেয় প্রণয়। তারপর বিজন সেতু পেরিয়ে গাড়ি দাঁড় করায়। এখানে রাস্তার দুধারে সন্ধেবেলা সবজির বাজার বসে। চাষীরা দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে আসে বেচতে। দিগন্ত নেমে অঞ্জলির ফরমাস মতো ফুলকপি, বেগুন, শিম আরও দু-চারটে জিনিস কিনে গাড়িতে ফিরতেই প্রণয় বলে, ওই দারোয়ানটাকে মনে হচ্ছে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে, বুঝলি।
কেন বল তো?
ও তো অটো চালায় বলেছিল। সেদিন সন্ধেবেলাতেও নাকি অটো নিয়ে বেরিয়েছিল। নম্বরটা লোক্যাল থানায় দিয়ে খোঁজ নিতে বলেছিলাম। এক্ষুনি ওরা ফোন করেছিল। এমনিতে পাবলিক খুব সুবিধার নয়। মদ-গাঁজা সবই চলে। তবে ক্রিমিনাল কোনও রেকর্ড নেই। আর সেদিন ওই সময়টায় থানাতেই ছিল। কোন একটা গাড়ির পিছনে নাকি ভিড়িয়ে দিয়েছিল। তাই নিয়ে গণ্ডগোল। পুলিশ ধরে এনেছিল। দু-চার টাকা নিয়ে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
সুদীপবাবু বললেও উত্তম মহান্তিকে আমার খুব একটা সন্দেহ হয়নি রে। এই ধরনের লোকেরা রাস্তায় গণ্ডগোল করতে পারে, কিন্তু প্ল্যানমাফিক খুন করতে হলে পাকা মাথা চাই। নীরেন সোমের খুনটা যথেষ্ট ঠান্ডা মাথায়, ভেবে-চিন্তে করা। আমার সন্দেহ হচ্ছিল, কেউ উত্তমকে টাকার লোভ দেখিয়ে কাজটা করিয়ে নিয়েছে কিনা। তবে তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে সেই অপশনটা বাদ রাখাই ভালো।
বাড়ি ফিরে মোবাইল নিয়ে বসে দুজনে। অঞ্জলি তখনও ফেরেনি। তাই দিগন্তই চা বানায়। চিঁড়ে ভাজার কৌটো, খুদি খুদি চিজ বিস্কিট আর চা। সানরাইজের সব ফ্ল্যাট থেকেই এসএমএস এসেছে। অধিকাংশই লিখেছেন তাঁরা বাড়িতে ছিলেন। অফিস থেকে ফিরে বিশ্রাম করছিলেন বা টেলিভিশন দেখছিলেন। কয়েকজন ফেরেননি। তাঁরা সেকথা জানিয়েছেন। কোথায় ছিলেন তাও জানিয়েছেন। অনিমেষ মাইতি জানিয়েছেন, তাঁর ছেলের পরের দিন অঙ্ক পরীক্ষা ছিল। তাই তিনি ছেলেকে পড়াতে বসেছিলেন। এসএমএস-টা মন দিয়ে পড়ে দিগন্ত। প্রণয়ের চা ততক্ষণে শেষ।
আমি আজ উঠি রে। আমাকে একবার অফিস হয়ে যেতে হবে।
বন্ধুর কথাগুলো শুনে একটু অন্যমনস্কভাবে ঘাড় নাড়ে দিগন্ত। দিনু ক্রমশ চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে বুঝে প্রণয়ও আর কথা বাড়ায় না। নিচের দরজাটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। পট থেকে আর এককাপ চা ঢেলে খায় দিগন্ত। তারপর সুদীপ রায়কে একটা ফোন করে, অনিমেষ মাইতির ছেলে কোন স্কুলে, কোন ক্লাসে পড়ে বলতে পারবেন?
আমি পারব না। তবে আমার স্ত্রী নিশ্চয় জানেন। ওর কাছে জেনে নিয়ে আপনাকে ফোন করছি।
একটু পরে সুদীপ ফোন করে জানায়, অনিমেষ মাইতির ছেলে এজি হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। স্কুলটা ইংলিশ মিডিয়াম। টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনের কাছে।
ফোনটা সেরে নিজের ল্যাপটপটা খুলে বসে দিগন্ত। প্রথমে গভীর মনোযোগ দিয়ে সানরাইজ ভিলার সিসিটিভি-র ফুটেজটা দেখে। যে ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওলা লোকটিকে আইডেন্টিফাই করা যায়নি, তার ছবিটাকে আলাদাভাবে এডিট করে। তারপর সেদিন সন্ধেবেলা ধীরেন সোমের বাড়িতে যে ছবিগুলো তোলা হয়েছিল সেগুলোও মন দিয়ে দেখে, ল্যাপটপের পেইন্ট-এর পাতাটা খুলে বসে। কিংশুক সোমের ছবিটা নিয়ে তার মুখটাতে পেইন্ট-ব্রাশের সাহায্যে ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি বসায়।
ইতিমধ্যে অঞ্জলি ফিরেছে। দিগন্ত কাজে মগ্ন বলে তাকে ডাকেনি। পোশাক বদলে, স্নান সেরে অঞ্জলি ঘরে ঢুকতেই দিগন্ত বলে ওঠে, এদিকে একবার শোন তো। আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় এই দুটো ছবি একই লোকের?
দিগন্তর আঁকা ছবি আর কিংশুক সোমের ফটোগ্রাফ মিলিয়ে দেখে সায় দেয় আঞ্জলি, আামার তো একই লোক মনে হচ্ছে। কিন্তু এগুলো কার ছবি?
প্রথম ছবিটা পাওয়া গেছে সানরাইজ ভিলার সিসিটিভি ফুটেজে। দ্বিতীয় ছবিটা কিংশুক সোম মানে নীরেন সোমের ভাইপোর। তবে তার মুখে দাড়ি ছিল না। সেটা আমি বসিয়েছি। উত্তম মহান্তি যে বলেছিল লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে সেটা মনে হচ্ছে ঠিকই।
তার মানে ওই ভাইপোই কাকাকে খুন করেছে?
ভাইপো যদি মিথ্যে কথা বলে, নকল ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি লাগিয়ে কাকার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তাহলে তো এরকম ধরে নেওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে একটা খটকা আমার রয়ে যাচ্ছে।
কীরকম খটকা?
সিসিটিভি ফুটেজে মানুষের হাইট খুব ভালো বোঝা যায় না। কিংশুক সোম লম্বা নয় মোটেই। বরং বেঁটের দিকেই বলা চলে। ছবির এই লোকটাকে তুলনায় লম্বা মনে হচ্ছে। তাছাড়া আর একটা সমস্যা তো আছেই। ওই টাকা বা ব্ল্যাকমেলের ব্যাপারটার কিছুতেই সমাধান করা যাচ্ছে না।
ব্ল্যাকমেল যে হচ্ছিল সেটা তুমি নিশ্চিত?
একশ শতাংশ। কাঁচা টাকা হাতে না পেলে নীরেনবাবুর মত মিতব্যয়ী মানুষ কখনও ওভাবে খরচা করবে না। ধীরেন সোমের কাছে শুনে যা বোঝা গেল, ভদ্রলোক উদ্যোগী ছিল না তেমন। নিজের রুটিনে চলতেন। কিন্তু তাঁর নানারকম শৌখিনতা ছিল। তাই হাতে টাকা পেলে তিনি নেবেন না, এমনটা হবে না সহজে। যাক গে তুমি আমাকে এখন একটা হেল্প কর দেখি। তোমাদের অফিসে এডুকেশন বিটের যে রিপোর্টার আছে তাকে জিজ্ঞাসা কর যে, টালিগঞ্জের কাছে এজি স্কুলের টার্মিনাল পরীক্ষাটা ঠিক কবে শুরু হয়েছে আর কবে শেষ হবে, সেটা একটু খোঁজ নিয়ে তোমাকে জানাতে।
অনিমেষ মাইতিকে দিগন্ত তার বাড়িতে আসতে বলেছিল পরদিন সন্ধে ছ’টা নাগাদ। প্রথমে খানিকটা গাঁইগুঁই করলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যায় অনিমেষ। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরতে পাঁচটা বেজে গেছিল দিগন্তর। অনিমেষবাবু এলেন প্রায় সোওয়া ছ’টায়। ঘরের দরজাটা খুলে দিগন্ত বলল, আপনি চটিটা ভিতরেই খুলুন অনিমেষবাবু।
কাবলি স্যান্ডাল জোড়া খুলে রেখে সোফায় এসে বসলেন অনিমেষ মাইতি। মধ্যবয়স্ক লোক। মাথার পিছনের টাক ক্রমশ তার সীমানা বাড়াচ্ছে। চোখে ধূর্তামির ছাপ স্পষ্ট। দিগন্ত লক্ষ্য করল, অনিমেষ মাইতির চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
আপনি হঠাৎ আমাকে ডেকে পাঠালেন কেন? আপনার প্রশ্নের উত্তর তো আমি দিয়েছি।
শুধু আপনাকে কেন, আরও অনেককেই আমি ডেকে পাঠাব। তদন্তের স্বার্থে অনেকের সঙ্গেই আমাদের কথা বলতে হবে। আপনি খামোখাই চটছেন। আচ্ছা, আপনি তো বলেছেন যে সেদিন আপনি ছেলেকে অঙ্ক করাচ্ছিলেন। কী নাম আপনার ছেলের?
প্রীতম, প্রীতম মাইতি। বাড়িতে বিল্টু বলে ডাকি।
কোথায় পড়ে?
এজি হাইস্কুল। ক্লাস সিক্স।
কিন্তু এজি হাইস্কুলে তো কোনও পরীক্ষা চলছে না অনিমেষবাবু। ওদের পরীক্ষা তো দশ তারিখে শেষ হয়ে গেছে। আপনি ছেলেকে কোন পরীক্ষার জন্য পড়াচ্ছিলেন?
চমকে উঠে সাদা হয়ে যান অনিমেষ মাইতি। মুখ দিয়ে কথা বেরোয় না।
আপনার কি এই একটাই কাবলি স্যান্ডাল, মানে যেটা পরে আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন?
প্রশ্নের অভিনবত্বে এবার আরও ঘাবড়ে গিয়ে ঘাড় নাড়েন অনিমেষ মাইতি।
এটা পরেই তো সেদিন সন্ধেবেলা নীরেন সোমের বাড়ি গেছিলেন, তাই না?
অনিমেষবাবু অস্ফুটভাবে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু দিগন্ত ফের ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে, মিথ্যে কথা বলার চেষ্টা করবেন না। আপনার স্যান্ডাল বাইরে খোলা ছিল। মুকুলবাবুর স্ত্রী দেখেছেন। আর পুগুল আপনাকে ঘরের ভিতর বসে থাকতে দেখেছে। আরও জানতে চান? আপনার পকেট থেকে যে ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট উঁকি দিচ্ছে, সেই সিগারেটের স্টাব নীরেন সোমের অ্যাশট্রেতে ছিল। ছাইদানের গায়ে আপনার হাতের ছাপও পাওয়া গেছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আপনি যে সেদিন সন্ধেবেলা নীরেন সোমের ফ্ল্যাটে গেছিলেন, তা নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু কেন গেছিলেন সেটা আমি জানতে চাই।
অনিমেষ মাইতি যথেষ্ট ঘোড়েল লোক। দিগন্তের প্রশ্নের প্রাথমিক ধাক্কায় খানিকটা ঘাবড়ে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলেও নেন তিনি। তারপর গলায় খানিকটা চেষ্টাকৃত বিরক্তির সুর এনে বলেন, বারবার গেছিলেন গেছিলেন বলছেন কেন মশাই। আমি তো আর যেচে যাইনি। নীরেন সোম আমাকে ডেকেছিল, তাই গেছিলাম।
নীরেন সোম আপনাকে ওনার ঘরে ডেকেছিলেন! কিন্তু আমি যতদূর জানি, নীরেন সোম সানরাইজ ভিলার কারুর সঙ্গেই বিশেষ মেলামেশা করতেন না। কারুর ফ্ল্যাটেই ওনার যাতায়াত ছিল না।
ঠিকই জানেন। ওই মিটমিটে সুদীপ আপনাকে সব খবর দিচ্ছে সেটা আমিও জানি। পাশের ফ্ল্যাটে একটা জলজ্যান্ত লোক খুন হয়ে গেল, অথচ ওরা কিছু টের পেল না কেন সেটাও কেউ বুঝতে পারছে না। অথচ ওর ছেলে তো অনবরতই সোমের ফ্ল্যাটে যেত। যাই হোক, লোকের কথায় কাজ নেই, এটা ঠিক যে ওই খিটখিটে বুড়োর বাড়িতে আমিও আগে কখনও যাইনি। কিন্তু সেদিন ডেকে পাঠিয়েছিল তাই গেছিলাম।
কেন ডেকে পাঠিয়েছিলেন আপনাকে? খোশগল্পের জন্য, নাকি বিশেষ কোনও দরকার ছিল?
সেটা আমি আপনাকে বলতে বাধ্য নই। দরকার হলে পুলিশকে বলব।
বেশ, ঠিক আছে। সেক্ষেত্রে আপনি যে সেদিন সন্ধেবেলা ওই ফ্ল্যাটে গেছিলেন এবং তার যে নির্দিষ্ট প্রমাণ আমার কাছে আছে, সেটা আমিও পুলিশকে জানিয়ে দেব। একটা কথা মনে রাখবেন আপনি যখন ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়েছেন, তখনও নীরেনবাবু জীবিত ছিলেন কিনা, সেটা কিন্তু এখনও কেউ জানে না। সিসিটিভি ফুটেজে যে অচেনা লোকটিকে দেখা গেছে, সে আদৌ নীরেনবাবুর ফ্ল্যাটে গেছিল কিনা তার কোনও প্রমাণও কিন্তু পুলিশের হাতে নেই। তার মানে এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটা এরকমই দাঁড়াচ্ছে, যে আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেদিন সন্ধেবেলা বন্ধ দরজার আড়ালে নিহত নীরেন সোমের সঙ্গে ছিলেন। পুলিশের ভূমিকাটা এরপর কী হতে পারে সেটা নিশ্চয় আপনাকে বলে দিতে হবে না।
সামান্য শুকিয়ে আসা ঠোঁটদুটো চেটে নিয়ে অনিমেষ মাইতি বললেন,
নীরেনবাবু জমি কেনার ব্যাপারে কথা বলার জন্য আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
জমি! কীসের জমি?
দেখুন, কথাগুলো আপনাকে আমি বলছি, আশা করি পাঁচ কান হবে না। সরকারি চাকরি করি। অসুবিধায় পড়ে যাব। আমি একটু-আধটু জমির দালালি করি। তা, নীরেনবাবু সেদিন আমাকে ডেকে বললেন যে উনি সোনারপুরের দিকে জমি কিনতে চান।
বাড়ি বানানোর জমি?
বাড়ি বানানোর জন্যই হবে নিশ্চয়। আসলে উনি ঠিক কী কারণে কিনতে চান বলেননি। উনি আমাকে সোনারপুর এলাকার জমির দাম জিজ্ঞাসা করছিলেন। তার থেকে আমি আন্দাজ করলাম যে উনি কিনবেন। আমার চেনাশোনা প্রমোটার আছে। আমি ওনাকে বললাম জমি কিনে বাড়ি বানাতে চাইলে সে ব্যবস্থাও আমি করে দেব।
তাতে নীরেন সোম রাজি হয়েছিলেন?
হ্যাঁ, না কিছুই বলেননি। আমার ধারণা উনি আরও দু-এক জায়গায় খোঁজ নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন। তবে সে সুযোগ তো আর পাওয়া গেল না। আমি কিন্তু ওনাকে ঠকাতাম না মশাই। আমার একটা কমিশন থাকে। তা সে তো থাকবেই। কিন্তু ওনাকে ভালো জমিই দিতাম। অন্যদের থেকে সস্তাতেই দিতাম। যতই হোক, উনি আমার প্রতিবেশী। এত বছর পাশাপাশি আছি।
কিন্তু জমি কেনা বা বাড়ি করার জন্য তো টাকার দরকার। সেই টাকার সংস্থান কী করে হবে, সেটা কিছু বলেছিলেন?
না, তা বলেননি। আমিও জিজ্ঞাসা করিনি। কেনই বা জিজ্ঞাসা করব। উনি তো আর ছেলেমানুষ নন, যে টাকার সংস্থান না করেই জমি-বাড়ি কিনতে নেমে পড়বেন। তবে এটা ঠিক ওনার সঙ্গে কথা বলে আমি সেদিন এটুকু বুঝেছিলাম এখন জমির দরদাম কিরকম চলছে সে সম্বন্ধে ওনার কোনওরকম ধারণাই নেই। সোনারপুরের জমি যে আসলে এখন সোনার টুকরো, সেটা তো উনি জানতেনই না।
আসলে আমাদের এই সানরাইজ ভিলা হল বৈষ্ণবঘাটা পাটুলির একদম শুরুর দিকের ফ্ল্যাট। তখন এই জায়গাগুলোও খানা-ডোবায় ভর্তি ছিল। কিন্তু তারপরে তো আস্তে আস্তে চেহারা পাল্টে গেছে। কলকাতা শহরটা গত কুড়ি বছরে দক্ষিণদিকে আরও অনেকটা এগিয়ে গেছে। নীরেনবাবু এসবের কোনও খোঁজখবরই রাখতেন না। আপিস থেকে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের দরজাটি বন্ধ করে বসে থাকতেন, ব্যাস। তবে কেন হঠাৎ ওনার মাথায় জমির পোকা নড়ে উঠেছিল, সে আমি বলতে পারব না। সেদিন তো আমি ওনার ফ্ল্যাটে গেছিলাম। হপ্তা দুয়েক আগে উনি কিন্তু আমাকে একদিন রাস্তায় ধরেও কিছু খোঁজখবর নিয়েছিলেন। তখন অবশ্য সত্যি কথা বলতে আমি ঠিক বুঝিনি যে উনি জমি কেনার কথা ভাবছেন, তাই তেমন গুরুত্ব দিইনি।
এতক্ষণ মন দিয়ে অনিমেষ মাইতির কথা শুনছিল দিগন্ত। এবার শুকনো গলায় বলল, ঠিক আছে। আপনি যা বললেন শুনলাম। সবটা বিশ্বাস করেছি বলতে পারব না। কথার সত্যি-মিথ্যে ভেরিফাই করার আমার একটা আলাদা পদ্ধতি আছে, সেটা নিশ্চয় আপনি বুঝতে পেরেছেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়। আপনি ভেরিফাই করুন। আমি যেটুকু জানি, সেটুকু বলেছি। ফালতু ঝামেলা এড়ানোর জন্য ছেলে পড়ানোর কথাটা বলেছিলাম। আমি কি এখন তাহলে আসতে পারি? গরীব মানুষ। সন্ধেবেলা এদিক-ওদিক টুকটাক গেলে দু-পয়সা আসে। সেটা আজকে মার গেল আর কী।
ঘোড়েল লোক, বুঝলি। সহজে মচকায় না। পুলিশের নাম শুনেও খুব যে ঘাবড়েছে, তা বলব না। তবে মিথ্যে ধরা পড়ে গেছে তো। তাই এবার হয়তো সত্যি কথা বলতেও পারে। ইনফ্যাক্ট ওনার কথাতেও নীরেন সোমের হাতে যে টাকা এসেছিল সেটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। যদিও টাকাটা কোথায় গেল, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। ওনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তো চেক করা হয়েছে, তাই না?
হ্যাঁ, পুলিশের লোক ব্যাঙ্কে গেছিল। মধ্যবিত্ত মানুষ যেভাবে টাকা-পয়সা জমায় সেভাবেই জমিয়েছেন। হিসাব বহির্ভূত কিছু পাওয়া যায়নি।
এখানেই হিসেবটা মিলছে না রে প্রণয়। টাকার হিসেবটা কিছুতেই মিলছে না। আচ্ছা শোন, সেদিন ধীরেনবাবু যে ঠিকানাটা দিয়েছিলেন সেখানে খোঁজ নিয়েছিস?
হ্যাঁ নিয়েছি। অনেকটাই ইনফরমেশন পাওয়া গেছে…
কিন্তু প্রণয়ের কথার মাঝখানেই ফোন বাজল দিগন্তর। ফোনটা ধরে কিছুক্ষণ কথা বলার পর অফ করে দিগন্ত বলল, ধীরেনবাবু ফোন করেছিলেন। বললেন ওনার ভাইকে যে খুন করেছে, তার উনি শাস্তি চান। সেটা যদি ওনার নিজের ছেলে হয়, তবে তারও। পুলিশ যা করছে করুক। কিন্তু আমি যে প্রাইভেট ডিটেকটিভ সেটা উনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন। তাই আমি যেন কাজ চালিয়ে যাই। অপরাধী ধরা পড়লে আমার পারিশ্রমিক উনি দেবেন।
তাহলে তো ভালোই। তোর রোজগারের ব্যবস্থা পাকা।
সে কথা আলাদা। কিন্তু ভদ্রলোক যে এতটা ঋজু চরিত্রের সেটা কিন্তু বুঝতে পারিনি। যাক গে কী খবর পেলি বল।
হ্যাঁ শোন। গীতালি সোম ছিলেন দমদমের কাছে নিরুপমা গার্লস কলেজের প্রফেসার। চাকরি করার সময়েই বারাসতে জমি কিনে বাড়ি করেন। ধীরেনবাবু যে ঠিকানাটা দিয়েছেন সেটা ওই বাড়ির। গীতালি সোম প্রায় বছর দশেক হল মারা গেছেন। ওনার মেয়ে সুগতার বিয়ে হয়েছিল হিমাদ্রি সরকার নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। হিমাদ্রি আর সুগতা দুজনেই বারাসতের সরকারি স্কুলে পড়াতেন। হিমাদ্রি সরকারও বছর পাঁচ-ছয় হল মারা গেছেন। আর সুগতা সরকার মারা গেছেন বছর খানেক হল। সবগুলি মৃত্যুই স্বাভাবিক। কোথাও কোনও গণ্ডগোল নেই। স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবার। স্বামী-স্ত্রীর কোনও দুর্নামও কিছু ছিল না। এখন ওই বাড়িতে ওদের ছেলে তিলক সরকার আর তার বউ থাকে। ছেলে একটা বেসরকারি সংস্থায় খুবই সাধারণ চাকরি করে। বউ কিছু করে না। ছেলেপুলে এখনও নেই।
বাঃ, এতো একেবারে ডিটেল জোগাড় করে ফেলেছিস দেখছি। অবশ্য পুলিশ তো চাইলে সবই পারে। ইনফরমেশন শুনে কোনও গণ্ডগোল আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে একবার সরেজমিনে দেখে নিতে পারলে ভালো হত। কাল রবিবার আছে, চল সকাল সকাল দুজনে বেরিয়ে পড়ি।
কোনও অসুবিধা নেই। আমি লোক্যাল পিএস থেকে ডিরেকশনটা জেনে নিচ্ছি। ওখানে চৈতন্য বলে একটা ছেলে আছে আমাদের। তাকেও বলে রাখব।
খুব বেশি পাঁচ-কান যেন না হয়। একেবারে আন্দাজে ঢিল তো। কোনওরকম দুর্নাম রটে গেলে ভদ্রলোক অসুবিধায় পড়বেন।
না রে, সেরকম কোনও চান্স নেই। আর শোন, কিংশুক যার ঠিকানা ফোন-নম্বর দিয়েছিল, সেই ফোন টানা সুইচড অফ। বাড়িতেও কেউ নেই। তালাবন্ধ। ও বাড়িতে কস্মিনকালেও কোনও হোম স্টে-র ব্যবস্থা ছিল না।
প্রণয়ের কথাটা শুনেই চোয়াল শক্ত হয়ে যায় দিগন্তের, তার মানে আমরা বারণ করা সত্ত্বেও কিংশুক ছেলেটাকে সাবধান করে দিয়েছে। কিংশুককে চোখে চোখে রাখার ব্যবস্থা কর প্রণয়। ছেলেটা সুবিধার নয়। নেশা যারা করে তাদের সারাক্ষণই টাকার দরকার হয়। আর তখন টাকার জন্য সবকিছুই করতে পারে।
লোক্যাল ট্রেনে চেপে বেলা দশটা নাগাদ বারাসত পৌঁছে গেল দিগন্ত আর প্রণয়। দুজনেরই পোশাক-পরিচ্ছদ একটু বেশিরকম মামুলি ধরনের, মফসসল ঘেঁষা। তিলক সরকারের বাড়িটা যে স্টেশন থেকে খুব দূরে নয়, সেটা জানা ছিল। বাড়ির একদম কাছেই হ্যাপি হেলথ নামে একটা নার্সিংহোম আছে। দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই রাস্তা জানা গেল। নার্সিংহোমের ঠিক তিনটে বাড়ি আগে তিলক সরকারের দোতলা বাড়ি। উল্টোদিকে একটা চায়ের দোকান। বেলা প্রায় সাড়ে দশটা। সকালের ভিড়টা কেটে গিয়ে দোকান এখন মোটামুটি ফাঁকা। মাঝবয়সি দোকানি অ্যালুমিনিয়ামের সসপ্যানে দুধ জ্বাল দিচ্ছে। দোকানের ভিতর নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসে দুটো চা দিতে বলল দিগন্ত।
গ্লাস দুটো কিন্তু গরম জল দিয়ে ধুয়ে নেবেন দাদা।
দিগন্তর কথা শুনে হাসল দোকানদার, চিন্তা করবেন না, আমি গত পনেরো বচ্ছর ধরে এই দোকানে চা বিক্রি করছি। এলাকার সব লোক হারাধনের চা-এর দোকান বললে একডাকে চেনে। কোনওদিন কেউ দুর্নাম করেনি।
তাহলে তো আপনি অনেককাল এখানে আছেন?
আমার তো জম্মকম্ম এখানেই। গোটা বারাসতের আমি অলিগলি চিনি। যে কোনও বাড়ি জিজ্ঞাসা করেন বলে দেব। যে কোনও লোকের শুধু নামটা বলেন তাহলেই বাড়ি দেখিয়ে দেব।
কথা বলতে বলতেই দু-গ্লাস গরম চা হাতে ধরিয়ে দেয় হারাধন। চা-এ আরাম করে একটা চুমুক দিয়ে দিগন্ত বলে, দুখানা প্রজাপতি বিস্কুটও দিন। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালোই হল। আমার আসলে একখানা বাড়ি কেনা দরকার। এই আশপাশের এলাকাতেই খোঁজখবর করছি। তা শুনলাম নাকি এই আপনার উল্টোদিকের বাড়িখানা বিক্রি আছে। তাই আজ এসেছিলাম, যদি একটু কথাবার্তা বলা যায়। আপনি শুনেছেন নাকি কিছু?
তিলক বাড়ি বিক্রি করবে! এখনও তো কিছু শুনিনি মশাই…ওকে তো ছোটবেলা থেকে চিনি। ওর মা-বাবাকেও চিনতাম। এই বাড়িখানা ওর দিদিমার ছিল…
কথাগুলো বলে হারাধন কী যেন ভাবে একটু। তারপর ফের বলে, হতে পারে জানেন তো। ইদানীং তিলকের পয়সা হয়েছে। ফুটুনি বেড়েছে। বাড়ি-ঘর-দোর রঙ করাল। একখান নতুন বাইক কিনেছে। সেদিন একখানা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে এসেছিল তারই দাম বোধহয় হাজার কুড়ি টাকা…
পয়সা হল কেন, সম্পত্তি পেয়েছে বুঝি? নাকি লটারি জিতেছে।
লটারি জিতলে তো জানতে পারতাম। আর সম্পত্তি পাবে কোথা থেকে মশাই ! সম্পত্তি বলতে তো ওই বাড়িখানা। বাবা ছিল গরীব ঘরের ছেলে, ঘরজামাই। স্বামী-স্ত্রী দুজনে স্কুলে পড়িয়ে যা রোজগার। ওসব কিছু নয়, তিলক আজকাল প্রমোটিং করছে। সোনারপুরের ওদিকে নাকি কার সঙ্গে ফ্ল্যাট বানাচ্ছে। কথা সবই কানে আসে। বাড়ি বেচে ওখানেই চলে যাবে ভাবছে হয়তো…তা যান না মশাই, গিয়ে কথাবার্তা বলে আসুন।
চা-এর দাম মিটিয়ে উঠে পড়ে দুজনে। দোকানের বাইরে বেরিয়ে প্রণয় জিজ্ঞাসা করে, কী করবি এখন?
তিলক সরকারের সঙ্গে দেখা করব।
সে কী রে! কী বলবি?
চল না তুই। দেখা যাক, টোপ দিয়ে কাজ হয় কিনা।
বেল বাজাতেই একজন ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের যুবক দরজা খোলে। ক্লিন শেভেন। খাড়া নাক। চাপা ঠোঁট। মুখে একটা রুক্ষ ভাব। বেশ লম্বা-দোহারা চেহারা।
কাকে চাই?
তিলক সরকারের সঙ্গে দেখা করতাম।
আমিই তিলক সরকার। বলুন?
আজ্ঞে আমরা কলকাতা থেকে আসছি। আমি দিবানাথ বসু আর উনি নির্মল হাজরা। আমরা দুজনেই হলাম গিয়ে হরিশ চৌধুরী, নাম শুনেছেন নিশ্চয়, বিখ্যাত উকিল, তাঁর সহকারী।
তিলক সরকারের মুখে একটু বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে ওঠে, না, আমি শুনিনি। আমার সঙ্গে কী দরকার?
দরকার একটু আছে। কিন্তু বসে কথা বলতে হবে।
নিতান্ত অনিচ্ছা সহকারে দুজনকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসায় তিলক।
সস্তার সোফায় গুছিয়ে বসে দিগন্ত বলে, দেখুন, আপনি আশা করি জানেন আপনার মায়ের দুজন বৈমাত্রেয় ভাই আছেন ধীরেন সোম এবং নীরেন সোম।
দিগন্ত লক্ষ্য করে কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চোখের দৃষ্টি সতর্ক হয়ে ওঠে তিলকের, মুখে একটা আলগোছে অজ্ঞানতার ভাব ঝুলিয়ে নেয় যেন। তিলককে একটু সময় দিয়ে দিগন্ত ফের শুরু করে, তা ওঁদের যিনি ছোট ভাই, মানে নীরেন সোম কয়েকদিন আগে মারা গেছেন। মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয়, মানে আত্মহত্যা করেছেন। এখন নীরেন সোম ছিলেন ব্যাচেলার মানুষ। ছেলেপুলে নেই। ধীরেন সোমের অবশ্য একটি ছেলে আছে। আইন অনুসারে নীরেন সোমের সম্পত্তির ওয়ারিশন হচ্ছেন আপনি আর ধীরেনবাবুর ছেলে কিংশুক সোম…
ওসব ব্যাঙের আধুলির সম্পত্তির আমার দরকার নেই। ওদের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পক্ক নেই। আপনারা এখন আসতে পারেন…
তিলক সরকারের রুক্ষ ব্যবহারেও কিন্তু ঘাবড়ায় না দিগন্ত। একটু হেসে বলে, আহা চটছেন কেন। আমরা কোনও পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে আসিনি। এই নীরেন সোম ছিলেন হরিশবাবুর ক্লায়েন্ট। মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে উনি একটা উইল করে গেছেন। সেখানে ওনার জমানো টাকা-কড়ি সবই উনি কিংশুক সোমকে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আপনার মায়ের সঙ্গে ওনার বোধহয় একটা জয়েন্ট প্রপার্টি ছিল। সেটা উনি ওনার অংশটা আপনার নামে লিখে দিয়ে গেছেন। এখন আপনি যদি আমাদের অফিসে একবার কাগজ-পত্রগুলো নিয়ে আসেন।
দিগন্তের কথায় তিলক সরকার যে বেশ খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, সেটা তার মুখ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যায়। টেবিলের ওপর একটা কাচের কাগজচাপা ছিল, সেটা হাতে নিয়ে খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে বলে, আমার ঠিকানা আপনি পেলেন কোথা থেকে?
ধীরেনবাবু দিয়েছেন। আসলে উনি আপনার মায়ের ঠিকানা দিয়েছিলেন। আপনার মায়ের সঙ্গেও আমরা কথা বলতে পারি।
মা গত বছর মারা গেছেন। কীসের কাগজপত্র নিয়ে যেতে বলছিলেন?
আজ্ঞে যে সম্পত্তি ওনাদের দুজনের নামে ছিল, তার একটা কপি হরিশবাবুর কাছে আছে। অরিজিনালটা নীরেন সোম নিজের কাছেই রেখেছিলেন। কিন্তু আপনার মায়ের যে কপিটি সেটা তো লাগবে। সেটা দেখে তারপর উইল অনুসারে আপনার অংশটি আপনি পাবেন।
কোথায় যেতে হবে?
হরিশবাবুর ভবানীপুরের অফিসেই আসুন। আমি ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। একটা ফোন করে আসবেন।
পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে নিজের ঠিকানা লিখে দেয় দিগন্ত। কাগজটা তিলকের হাতে দিতে সে সেটায় চোখ বুলিয়ে পকেটে পোরে।
আচ্ছা আমরা তাহলে এবার আসি। একগ্লাস জল খাওয়াবেন আজ্ঞে, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।
জল আনতে তিলক সরকার ঘরের ভিতরে যেতেই দিগন্ত বিদ্যুৎ গতিতে পকেট থেকে রুমাল বার করে কাচের কাগজচাপাটা রুমালে মুড়ে পকেটে ভরে নেয়। তারপর জল খেয়ে বেরিয়ে পড়ে দুজনে। প্রণয় আগে থেকেই বলে রেখেছিল। বারাসত স্টেশনের কাছে গাড়ি অপেক্ষা করছিল। গাড়িতে উঠে প্রণয় জিজ্ঞাসা করে, ব্যাপারটা কী রে?
কথার উত্তর না দিয়ে পকেট থেকে সাবধানে কাগজচাপাটা বার করে প্রণয়ের হাতে দেয় দিগন্ত। তারপর বলে, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টকে দিয়ে আঙুলের ছাপটা পরীক্ষা করা। আমার ধারণা নীরেন সোমের আলমারির হাতলে, চেয়ারের পিছনে আর ব্লেডে যে অজানা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছিল, তার সঙ্গে মিলে যাবে। পরে বাড়িতে সার্চ করলে সোনারপুরের জমির দলিল আর একটা চিঠির আধখানাও পাওয়া যেতে পারে। যদি না সেগুলো ইতিমধ্যে নষ্ট করে ফেলে।
রাত্তিরে ভুনি খিচুড়ি রান্না হয়েছে। প্রণয়ও আজ খেয়ে যাবে। পুরো গল্পটা যে খেতে বসে শুনবে সেকথা আগে থেকেই বলে রেখেছিল অঞ্জলি। ডাইনিং টেবিলে সব খাবার-দাবার সাজিয়ে তিনজনে বসার পর তাই দিগন্ত শুরু করল।
তিলক সরকারকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে আর সে জেরায় নীরেন সোমকে খুন করার কথা স্বীকার করেছে, এটা তো তুমি জানো। আসলে নীরেন সোম যে আত্মহত্যা করেননি, এই সন্দেহটা প্রণয়ের প্রথমেই হয়েছিল। সুইসাইড নোট ছিল না। আর আত্মহত্যার কোনও কারণও আপাতভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। নীরেন সোম যে ন্যাটা ছিলেন এটা বুঝেই আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে তিনি আত্মহত্যা করেননি। তাঁকে খুন করা হয়েছে। সেদিন ওনার ঘরের জিনিসপত্র দেখে এবং পুগুলের সঙ্গে কথা বলে এটাও নিশ্চিত হয়েছিলাম যে কোনওভাবে বেশ কিছু নগদ টাকা তাঁর হাতে এসেছিল। যদিও ওনার আলমারিতে কোনও ক্যাশ টাকা পাওয়া যায়নি। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও অতিরিক্ত কিছু ছিল না।
নীরেন সোমের ঘর দেখলেই বোঝা যায় যে, ব্যাচেলর হলেও উনি খুব গোছালো ধরনের লোক ছিলেন। জিনিসপত্র কোনও কিছু এলোমেলোভাবে রাখা নয়। সেইজন্যই দুটো ব্যাপারে আমার খটকা লেগেছিল। প্রথমত, ওনার আলমারির ভিতরে ফাইলগুলো একটু অগোছালো ভাবে রাখা ছিল। ফাইলের পাশে আলগা একটা চিঠির আধখানা পড়েও ছিল। যে চিঠিতে আমি সুগতা সরকারের নামটা পাই। দ্বিতীয় যেটা সেটা হল, বিছানার মাথার কাছে বালিশগুলো সমানভাবে রাখা ছিল না।
প্রণয় জানে তিলক সরকার স্বীকার করেছে যে সে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে নীরেন সোমকে খুন করেছিল। তারপর তাকে চেয়ারে বসিয়ে বাঁ-হাতের শিরা কেটে দেয়। পরিকল্পনামাফিক সে একটা নতুন ব্লেড সঙ্গে এনেছিল। তারপর আলমারি খুলে দলিলের ফাইলটা বার করে নেয়। নীরেনবাবুকে এই সম্পত্তির কথাটা জানিয়ে তাঁর বাবা যে চিঠি লিখেছিলেন সেটা এই ফাইলের সঙ্গেই ছিল। তাড়াহুড়োতে আধখানা চিঠি চলে যায় ফাইলের সঙ্গে। বাকিটা পড়ে থাকে আলমারিতে। এই চিঠিটা পাওয়া না গেলে আমার মনে হয় তিলক সরকারের অস্তিত্বই আমরা জানতে পারতাম না। ইনফ্যাক্ট ও নিজেও তাই ভেবেছিল। সেজন্য যতটা সাবধান হওয়া দরকার ততটা হয়নি। এরকমও হতে পারে যে তিলক একটা দানপত্র বা ওই ধরনের কিছু নিজে তৈরি করে এনেছিল। তারপর চেষ্টা করেছিল জোর করে নীরেন সোমকে ওটাতে সই করানোর। সেজন্যই ফাউন্টেন পেনটা টেবিলে খোলা অবস্থায় ছিল। কিন্তু নীরেন সোম রাজি না হওয়ায় ওকে খুন করে পুরো দলিলটাই হাপিস করে দেবে ঠিক করে।
তদন্ত শুরু হওয়ার পর প্রথমে আমার সন্দেহের তালিকায় ছিল চারজন। কেয়ারটেকার উত্তম, অনিমেষ মাইতি, কিংশুক সোম আর সিসিটিভি-র ফুটেজে দেখা অজানা ব্যক্তি। একটা কথা প্রণয়ের মনে আছে নিশ্চয়, সিসিটিভি-র ছবিটা দেখে উত্তম বলেছিল যে সে লোকটাকে তার চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন লোকটার আগে দাড়ি ছিল না। কথাটা নিয়ে প্রথমে আমি তেমন মাথা ঘামাইনি। কিন্তু পরে কিংশুক সোমের ছবিতে দাড়ি বসিয়ে যখন চেহারাটা অনেকটা মিলে গেল, তখন ওর ওপর সন্দেহটা বেড়ে গেছিল। তিলক সরকারকেও প্রথম দেখেই আমার সন্দেহটা বাডে, কারণ তার মুখের গড়নের সঙ্গে কিংশুকের মুখের খুব মিল। আসলে কিংশুক এবং তিলক দুজনেই ধীরেন সোমের বাবা মাধব সোমের মত দেখতে। আমরা যখন তিলককে দেখি, তখন তার দাড়ি ছিল না। আমার ধারণা সানরাইজ ভিলার কেউ যদি তাকে দেখেও থাকে, তাহলে যাতে পরে চিনতে না পারে, সেজন্য সে দাড়িটা কামিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু ওদের ঘরের দেওয়ালে তিলক সরকারের একটা পুরোনো ছবি ঝুলছিল। সেখানে তার মুখে ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। সেটা দেখেই আমি মোটামুটি নিশ্চিত হই যে সিসিটিভি ফুটেজের অজানা ব্যক্তি এবং তিলক সরকার একই লোক।
তাছাড়া আরও একটা বেফাঁস কথা তিলক বলেছিল। নীরেন সোম তাঁর সম্পত্তি ওকে দিয়ে গেছেন শুনে তিলক বলে, ওই ব্যাঙের আধুলির তাঁর দরকার নেই। কিন্তু নীরেন সোমকে তো তার চেনারই কথা নয়। কোনওদিনই তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। তাহলে তার কী সম্পত্তি আছে তাও জানার কথা নয়। এরপরই আমি ঠিক করে ফেলি যেমন করে হোক ওর ফিঙ্গার প্রিন্ট যোগাড় করতে হবে। সেটা যদি মিলে যায়, তাহলেই তো কেল্লা ফতে। কাগজচাপাটা ও হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করছিল বলে সুবিধা হয়েছিল, নইলে অন্য কিছু ভাবতে হত।
খিচুড়ির সঙ্গে ফুলকপির বড়াও বানানো হয়েছে। তারই একটা মুখে পুরে অঞ্জলি বলল, কিন্তু তিলক সরকার খুনটা করতে গেল কেন?
আমার ধারণা প্রথমে খুন করার কথা ভাবেনি। আসলে মাধব সোম বড় ছেলের তুলনায় ছোট ছেলেকে অনেকটাই কম সম্পত্তি দিয়ে সম্ভবত একটু অপরাধবোধে ভুগতেন। তাই তিনি মারা যাওয়ার আগে সোনারপুরের কুড়ি কাঠা জমি ছোট ছেলেকে দিয়ে যাবেন ঠিক করেন। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু সোনারপুর নিতান্তই গ্রাম। জমির দাম মোটেই বেশি নয়। কিন্তু জমিটা তিনি ইচ্ছে করেই শুধু নীরেন সোমের নামে লিখে দেননি। সুগতাও তাঁর সন্তান। সে পিতৃসম্পত্তি কিছুই পায়নি। তাই এই জমির সমান অংশীদার তাকেও করেছিলেন। হয়তো তাঁর আশা ছিল, তাঁদের মৃত্যুর পর ভাই-বোনের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠতেও পারে। তবে এই কথাটা তিনি তাঁর বড় ছেলে মানে ধীরেন সোমকে জানাননি। সুগতা সরকার তাঁর মায়ের মতোই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন বলেই মনে হয়। তিনি বাবার সম্পত্তি পেলেও সেটা কাজে লাগাননি। দলিল তাঁর আলমারিতে তোলা ছিল।
বাবা-মা দুজনের পরপর মৃত্যুতে তিলক খানিকটা অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পড়েছিল। সেই সময় সম্ভবত কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে সে দলিলটার সন্ধান পায়। অনিমেষ মাইতির কথামতই বলা যায়, সোনারপুরের জমি এখন সোনার টুকরো। তাই তিলক ঠিক করে ফেলে যে জমিটা সে প্রোমোটিংয়ে দেবে। কিন্তু দশ কাঠার বদলে পুরো কুড়ি কাঠাই যদি পাওয়া যায়, তাহলে একটা বেশ বড়সড় আবাসন হয়। লাভও অনেক বেশি। তাই তিলক প্রথমে ঠিক করে নীরেন সোমের সঙ্গে সে জয়েন্ট ভেঞ্চারে নামবে।
কিন্তু পরে নিজের বৈমাত্রেয় মামার সম্বন্ধে খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারে যে নীরেন সোম ব্যাচেলর এবং একেবারেই সাধারণ, ভিতু মানুষ তখন সে প্ল্যান বদলায়। সম্ভবত তার প্রোমোটার বন্ধু-বান্ধবরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিল যে নীরেন সোমকে নগদ কিছু টাকা দিয়ে পুরো জমিটাই তার নামে লিখিয়ে নিতে। সেই অনুযায়ী, সে নীরেন সোমের অফিসে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলে।
নীরেন সোম আমার ধারণা দলিলটার কথা ভুলেই গেছিলেন। তাছাড়া জমি-জায়গার দাম-টাম সম্বন্ধে তাঁর কোনও ধারণাও ছিল না। তাই প্রথমে তিলকের অফারটাতে তিনি রাজি হয়ে যান। তিলক ওনাকে বেশ কিছু নগদ টাকাও অ্যাডভান্স করেছিল নিশ্চয়। সেই টাকাতেই তিনি জামা-কাপড় কেনেন। বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছিলেন। যেটা আমরা পুগুলের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।
কিন্তু ব্যাপারটাতে আরও একটু ধাতস্থ হওয়ার পর নীরেন সোমের মনে হয় যে তিলক তাঁকে ঠকাচ্ছে। তাই তিনি ঠিক করেন অনিমেষ মাইতির সঙ্গে কথা বলবেন। কারণ অনিমেষ মাইতি যে জমির দালালি করেন সেটা নীরেন সোম জানতেন। এক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা-ভাবনা বোঝাই যাচ্ছে একদম ঠিকঠাক ছিল। তাই অনিমেষবাবুর কাছে জমির দাম সম্বন্ধে একটা আন্দাজ পাওয়ার পর নীরেন সোম মত বদলে তিলকের কাছে আরও মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।
এদিকে নীরেন সোমকে কব্জা করে ফেলেছে মনে করে তিলক ততদিনে জমির কাজ এগোতে শুরু করেছে। ফলে তার পক্ষে পিছিয়ে আসা কঠিন। শেষপর্যন্ত আমার ধারণা কোনও একটা ফয়সালা দুজনের মধ্যে হয়েছিল। তাই নীরেন সোম তিলককে বাড়িতে আসতে বলেছিলেন। ঠিক ছিল নীরেন সোম দলিল আর দানপত্র হ্যান্ডওভার করবেন। বিনিময়ে তিলক টাকার বান্ডিল দিয়ে যাবে।
কিন্তু নীরেনবাবুকে দেখে যতটাই সাধাসিধে মনে হোক, তিনি আসলে মিটমিটে লোক। তাই দানপত্রটি তিনি তৈরি করেননি। আমার ধারণা অনিমেষ মাইতির সঙ্গে কথা বলে এবং অন্যান্য জায়গা থেকে খোঁজখবর নিয়ে তিনি ততদিনে যথেষ্ট পোক্ত হয়ে উঠেছেন এবং এবার তিনি তিলক সরকারের কাছে সরাসরি ফ্ল্যাটের দামের ভাগ চেয়ে বসেন। অনিমেষবাবু ভেবেছিলেন নীরেন সোম বাড়ি করার জন্য জমি কিনতে চাইছেন। কিন্তু আসলে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একেবারে অন্য।
এদিকে তিলক সরকারও ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছিল। সেদিন সে একটা হেস্তনেস্ত করবে ঠিক করেই এসেছিল এবং নীরেন সোম কোনও বেগড়বাঁই করলে তাকে প্রয়োজনে খুন করবে, এমনটাও তার মাথাতে ছিল। ঘটনাটা ঘটলও তাই। নীরেনবাবু দানপত্র তো দিলেনই না। বরং আরও অনেক বেশি টাকা দাবি করলেন। তিলক সরকার তখন ঠান্ডা মাথায় মুখে বালিশ চাপা দিয়ে তাকে খুন করল। তারপর আলমারি খুলে জমির দলিলটি বার করে নিল।
ততদিনে সে সম্ভবত জেনে গেছিল যে, এই জমি এবং তার দলিলের ব্যাপারটা নীরেন সোম ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই দলিলটা যে নেই সেটা যে কেউ বুঝতে পারবে না সেটা তিলক জানত। কিন্তু ঘটনাটা খুন প্রমাণিত হলে হইচই হবে। তাই সেটাকে আত্মহত্যা বলে সাজানোর জন্য নীরেন সোমের দেহটা চেয়ারে বসিয়ে তার হাতের শিরা কেটে দেয় সে। কিন্তু নীরেন সোম যে ন্যাটা সেটা তার জানা ছিল না। তাই সে উল্টো হাতের শিরা কেটেছিল।
কিংশুককে সন্দেহ করলেও আমার মনটা খচখচ করছিল এই কারণেই, যে সে তো ছোট থেকেই জানে যে তার কাকা ন্যাটা। এরকম ভুল তার সহজে হবে না। অবশ্য পোস্টমর্টেম করলে যে মৃত্যুর আসল কারণ নিশ্চিত বোঝা যাবে, সেটা যে কোনও সাধারণ মানুষের মতোই তিলক সরকারেরও জানা ছিল না।
আলমারিতে আমার মনে হয় তিলক আগে যে টাকা নীরেনবাবুকে দিয়েছিল, তারও একটা অংশ ছিল। দলিলের সঙ্গে সেটাও সে পকেটস্থ করে। আর এইসব করতে গিয়েই ফাইলগুলো এলোমেলো হয়ে যায় আর চিঠির একটা পাতা খুলে পড়ে যায়। আলমারি বন্ধ করে, চাবি ঠিক জায়গায় রেখে, বালিশ চাদরের নিচে ঢুকিয়ে দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে যায় তিলক। সে এর আগে কোনওদিন সানরাইজ ভিলায় আসেনি। ফলে তাকে কেউ চেনে না। সুতরাং সেদিক দিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত ছিল সে।
খুনের তদন্ত শুরু হওয়ার পর নীরেন সোমের হাতের পাশে পড়ে থাকা ব্লেডে আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়, যেটা নীরেন সোমের নয়। আলমারির হাতলে, চেয়ারের পিছনেও সেই একই আঙুলের ছাপ ছিল। প্রণয় সানরাইজ ভিলার সবার আঙুলের ছাপ নিয়েছিল। কিন্তু কারুর সঙ্গেই সেটা মেলেনি। অনিমেষ মাইতি যে খুন করেননি, এটা তখনই আমি নিশ্চিত হই। তাহলে এই অজানা ফিঙ্গারপ্রিন্টটা কার, সেটা জানা দরকার।
চা-এর দোকানে হারাধনের কাছে তিলক সোনারপুরে ফ্ল্যাট বানাচ্ছে শুনেই আমার সন্দেহ জোরাল হয়। কারণ অনিমেষ মাইতির কাছে নীরেন সোমও সোনারপুরের জমির দামই জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আর মাধব সোমের চিঠি থেকে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কোনও একটা সম্পত্তি সুগতা সরকার আর নীরেন সোমকে যৌথভাবে দেওয়া হয়েছে। তাই দুয়ে-দুয়ে চার করতে অসুবিধা হয়নি। তখন আমার শুধু দরকার ছিল তিলক সরকারের আঙুলের ছাপ। কিন্তু ওর ঘরে ঢুকতে না পারলে তো সেটা পাওয়া কঠিন। তাই আমি নীরেন সোমের উইলের টোপটা দিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে হয়েছিল, উকিলের কথাটা শুনলে তিলক ভাববে যে, তার সঙ্গে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে আসা হবে ধরে নিয়েই হয়তো নীরেন সোম উইলটা করে রেখেছিলেন। এখন সেটা যদি তার হাতে এসে যায়, তাহলে সে নির্ঝঞ্ঝাটে পুরো সম্পত্তিটার মালিক হয়ে যেতে পারবে। তিলক এখনও হয়তো সব কথা বলেনি, কিন্তু জেরায় যখন পুরোটা স্বীকার করবে, তখন এর অনেকটাই মিলে যাবে বলেই মনে হয়।
তার মানে তুই বলতে চাইছিস তিলক সরকার যথেষ্ট আটঘাট বেঁধে এগোলেও নীরেন সোম যে ন্যাটা, এটা না জানাতেই ব্যাপারটা কেঁচে গেল?
হ্যাঁ, তা বলতে পারিস। তিলক সরকারের নিশ্চিত বিধি বাম। যদিও আমার কিন্তু বিধি ডান।
তার মানে?
ধীরেন সোম জানিয়েছেন, তাঁর ভাইয়ের খুনিকে ধরতে পুলিশকে সাহায্য করার জন্য তিনি আমাকে একটি পঁচিশ হাজার টাকা মূল্যের চেক পাঠাচ্ছেন। এই বাজারে খারাপ নয়, বল?
খারাপ তো নয়ই। অঞ্জলি তোর ছুটি-ছাটা কীরকম আছে দেখে নে। দিনু টিকটিকির ঘাড় ভেঙে এবার একেবারে ডি-লা গ্র্যান্ডি—মেফিস্টোফিলিস…
অঞ্জলি আর দিগন্ত একসঙ্গেই বলে ওঠে…ইয়াক ইয়াক…

যত কান্ড কাঠমান্ডু তে গল্পের বাটরা ওরফে জগদীশ এর কথা মনে পড়ছে। সেখানেও ফাউন্টেন পেন আর বাঁ হাতি মানুষের প্লট। লেখিকা কি সেই গল্পে অনুপ্রাণিত?