আগের দিন সন্ধের মুখে একটা প্রচণ্ড ঝড় হয়েছিল।
সঙ্গে আধঘণ্টাটাক জোর বৃষ্টি। এবারের গ্রীষ্মে এটাই প্রথম কালবৈশাখী। টানা গুমোট আর গরমের পর বৃষ্টি হওয়াতে সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। রাতেই অবশ্য মেঘ কেটে আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছিল। সকালে ফের ঝলমলে রোদ্দুর। বারান্দায় চা খেতে বসে দিগন্ত দেখল, আগেরদিনের ঝড়ের চিহ্ন চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
ইস, কাকের বাসাটা কাল ঝড়ে ভেঙে গেছে।
অঞ্জলির কথা শুনে হাতের কাপটা নামিয়ে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াল দিগন্ত। তাদের বাড়ির সামনেই একটা মস্ত নিমগাছ। বারান্দার প্রায় সোজাসুজি তারই একটা ডালে একজোড়া কাক বাসা বেঁধেছে।
আহা রে, বেচারাদের বোধহয় ডিম পাড়ার সময় হয়ে এসেছিল। অঞ্জলির কথায় ঘাড় নেড়ে দিগন্ত বলল, সেরকমই মনে হচ্ছে। দেখছ না, সকাল থেকে দুজনে ভারি ব্যস্ত হয়ে আবার নতুন করে বাসা বানাচ্ছে।
উত্তরে অঞ্জলি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই চায়ের টেবিলে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। অঞ্জলি ফোনটা ধরে দু-একটা কথা বলে, দিগন্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, বাচ্চুদা, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।
বাচ্চুদা অর্থাৎ সন্দীপন মিত্র, অঞ্জলির পিসতুতো দাদা।
বয়সে অঞ্জলি এবং দিগন্তের থেকে বেশ খানিকটা বড় হলেও বেশ জমাটি সম্পর্ক। এমনিতে পণ্ডিত মানুষ। মাইক্রোবায়োলজিতে ডক্টরেট। এখন একটা বেশ নামকরা ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ উইংয়ের ডিরেক্টর। তবে এত পাণ্ডিত্য কিংবা উঁচুপদ সত্ত্বেও মানুষটি মোটেই গুরুগম্ভীর গোছের নন। বাংলা বই পড়েন প্রচুর। দিগন্ত নিজে বাংলার অধ্যাপক বলে বুঝতে পারে বাচ্চুদার বাংলা সাহিত্যের জ্ঞান যথেষ্ট গভীর। গান ভালোবাসেন। দিগন্তর মতোই রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত। তা ছাড়া আরও একটা ব্যাপারে দুজনের মিল আছে। দুজনেই ভীষণ ফুটবল পাগল। বিশ্বকাপ চলার সময় প্রায়ই এ-ওর বাড়ি গিয়ে রাত জেগে আড্ডা আর খেলা দেখা হয়। অঞ্জলি আর তার বউদির অবশ্য খেলায় মোটে কোনও আগ্রহ নেই। তাদের আড্ডা জমে অন্যরকম। তাই বাচ্চুদার ফোন শুনে দিগন্ত রীতিমতো উৎসাহী হয়ে ফোনটা ধরে বলল, হ্যাঁ, বাচ্চুদা বলো।
ওধারে বাচ্চুদার গলাটা কিন্তু অন্যদিনের মতো ঝলমলে শোনাল না। বরং বেশ কিছুটা গম্ভীর এবং উদ্বিগ্ন, দিগন্ত শোন, একটা খুব বিপদে পড়েছি। তোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তুই আজ একবার আমার অফিসে আসতে পারবি?
আমার তো কলেজ আছে। চারটেয় ছুটি। তার মানে তোমার অফিসে পৌঁছোতে প্রায় পাঁচটা।
কোনও অসুবিধা নেই। তুই চলে আয়।
কী ব্যাপার বলো তো বাচ্চুদা? কী হয়েছে?
এভাবে বলা যাবে না। ডিটেলে বলতে হবে। তুই আয়।
বাচ্চুদার অফিসটা বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। মেট্রোয় গিয়ে বিশেষ সুবিধা হবে না। বাসে গেলে অনেকটা সময় লাগবে। কলেজ থেকে বেরিয়ে তাই একটা ট্যাক্সি নেয় দিগন্ত।
বালিগঞ্জ ফাঁড়ি দিয়ে ঢুকলে সায়েন্স কলেজ পেরিয়ে আর একটু এগোলেই বাঁ-হাতে একটা রাস্তা। সেখানে কয়েকটা বাড়ি পরেই নিউ লাইফ কোম্পানির অফিস। বড় ক্যাম্পাস। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। গেটে কড়া পাহারা। পাঁচটা বাজার মিনিট দশেক আগে ট্যাক্সি থেকে অফিসের সামনে নামে দিগন্ত। ভাড়া মিটিয়ে, গেটের সামনে গিয়ে সিকিউরিটিকে বলতে গেট খুলে যায়। দিগন্ত দেব যে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, সেকথা সিকিউরিটিকে আগেই বলে রেখেছিলেন ডিরেক্টর।
মেইন গেট পেরিয়ে আর একটু এগিয়ে বিল্ডিংয়ে ঢোকার মুখে আর একটা ছোট ঘর। সেখানে একজন মহিলা এবং একজন পুরুষ বসে আছেন মেশিনপত্র নিয়ে। লোকটি উঠে এসে আপাদমস্তক পরীক্ষা করে দিগন্তর। তারপর বলে, মোবাইলটা জমা রাখতে হবে স্যার।
মোবাইল জমা রাখতে হবে? কেন?
সেরকমই ইনস্ট্রাকসন আছে। মোবাইল নিয়ে কাউকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বেরোবেন যখন ফেরত পাবেন।
বাধ্য হয়েই পকেট থেকে মোবাইল বার করে দিয়ে দেয় দিগন্ত। লোকটা এবার একটা ভিজিটারস কার্ড এগিয়ে দেয়। সেটা গলায় ঝুলিয়ে ভিতরে ঢোকে। বাচ্চুদার অফিসে সে আগেও এসেছে। কিন্তু এবার চেকিংয়ের এরকম বাড়াবাড়ি দেখে একটু আশ্চর্যই হয়।
অফিস বললেও এটা আসলে নিউ লাইফের রিসার্চ উইং। অনেকটা ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো একটা দোতলা বাড়ি। ইউ-এর দুটো বাহুর মাঝের জায়গাটা লন। তাতে নানারকম ফুল গাছের কেয়ারি রয়েছে। একতলায় মূলত অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজকর্ম হয়। পর পর ছোট-বড় ঘর। দোতলায় ল্যাবরেটরি আর রিসার্চের কাজে যাঁরা যুক্ত তাঁদের চেম্বার। ডিরেক্টরের অফিসও দোতলায়। মূল বাড়িটায় ঢুকে সামনে সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠলে ডানহাতে দ্বিতীয় ঘরটা বাচ্চুদার। নানা কেমিক্যাল নিয়ে কাজকর্ম হয় বলে পুরো বাড়িটাতেই কেমন একটা ওষুধ ওষুধ গন্ধ।
বাচ্চুদার ঘরের সামনে একজন দারোয়ান বসে থাকে। তাকে নাম বলাতে, সে ভিতরে গিয়ে কথা বলে তক্ষুনি ফিরে এসে বলল, আপনি ভিতরে যান। সাহেব অপেক্ষা করছেন।
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দিগন্ত দেখল, বাচ্চুদা নিজের চেয়ারে বসে আছে। চোখে-মুখে গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ। ঘরে আর কেউ নেই।
কী ব্যাপার বাচ্চুদা, তোমাদের অফিসে হঠাৎ এরকম চেকিংয়ের কড়াকড়ি। মোবাইল পর্যন্ত নিয়ে ঢুকতে দিচ্ছে না। ব্যাপারটা কী?
সেটা বলব বলেই তো তোকে ডেকে পাঠিয়েছি। চা খাবি তো?
বাচ্চুদার প্রশ্নের উত্তরে দিগন্ত ঘাড় নাড়তেই, বাচ্চুদা টেবিলের পাশে রাখা একটা বেল টিপলেন। অমনি দরজা ঠেলে বাইরে বসে থাকা লোকটি ঘরে ঢুকল।
নকুড়কে বলে দাও, দু-কাপ চা দিতে। দুধ-চিনি আলাদা।
লোকটি ঘাড় নেড়ে চলে যাওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একজন ট্রে-তে কাপ, টি-ব্যাগ, ফ্লাস্কে গরম জল, চিনি আর দুধের পাউচ নিয়ে এল। ডিরেক্টরের চেম্বারটা মস্ত বড়। বাচ্চুদার বড় টেবিলটা ছাড়াও একপাশে একটা সোফা সেট আর সেন্টার টেবিল রাখা। বড় বড় দুটো এসি চলছে। তাই গোটা ঘরটাই বেশ কনকনে ঠান্ডা। বাচ্চুদা লোকটিকে বলল, তুমি যাওয়ার সময় লক্ষ্মণকে বলে যেও যে আমি এখন একটা জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকব। কেউ দেখা করতে এলে যেন বলে দেয় পরে আসতে। আর তেমন জরুরি কিছু হলে যেন প্রতীকের সঙ্গে কথা বলে নেয়।
হ্যাঁ, এবার বলো কী হয়েছে?
নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটু সময় চুপ করে থাকে বাচ্চুদা। তারপর বলে, আসল ঘটনাটা বলার আগে, তোকে একটু ব্যাকগ্রাউন্ডটা বলি। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। তুই তো জানিস যে আমাদের এই নিউ লাইফ হচ্ছে একটা ওষুধ তৈরির সংস্থা। প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো কোম্পানি। দেশি যেসব সংস্থা ওষুধ তৈরি করে, তাদের মধ্যে নিউ লাইফের বেশ নামডাকও রয়েছে। আমরা হচ্ছি এদের রিসার্চ উইং। আমাদের এখানে ওষুধ নিয়ে নানারকম গবেষণা হয়। তার মধ্যে নতুন ওষুধ তৈরি করার ব্যাপার যেমন থাকে, তেমনি আবার পুরোনো ওষুধ নিয়েও কাজকর্ম হয়। যেমন ধর, একটা ট্যাবলেট দিনে তিনবার খেলে তবে ঠিকঠাক কাজ করে। কিন্তু আজকের দিনে লোকে এত ব্যস্ত যে দিনে তিনবার কোনও ওষুধ খাওয়াটা অসুবিধাজনক। তখন চেষ্টা হয় যাতে ট্যাবলেটটা এমনভাবে ফর্মূলেট করার যাতে দুবার খেলেই কাজ হয়। তবে নতুন ওষুধ তৈরি করাটা আমাদের কাছে খুবই ইম্পরট্যান্ট। কারণ আমাদের কোম্পানি গবেষণা করে বার করেছে এরকম অন্তত চার-পাঁচটা ওষুধ বাজারে বেশ জনপ্রিয়। নিউ লাইফ সবসময়ই রিসার্চকে খুব গুরুত্ব দেয়। এখন এই রিসার্চ উইংয়ের পুরো দায়িত্বই আমার। আমার আন্ডারে দশজন ফার্মাসিস্ট আর তিনজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এখানে কাজ করেন।
বাচ্চুদা একটু থেমে চায়ের কাপে একটা চুমুক দেন। সেই সুযোগে দিগন্ত জিজ্ঞাসা করে, তোমরা ওষুধটা তৈরি করার পরই কি সেটা ড্রাগ কন্ট্রোলে যায়?
না, না। সেসব অনেক ব্যাপার। আমরা যেটা করি, সেটাকে বলে ফর্মূলেশন। মানে সোজা বাংলায় ওষুধের ফর্মূলা তৈরি করা। কোন জিনিস, কতটা পরিমাণে থাকবে তার বৈজ্ঞানিক হিসেব-নিকেশ। তারপর সেটা যায় স্টেবিলিটি কন্ট্রোলে। মানে আমাদের দেওয়া ফর্মূলা অনুযায়ী যে ওষুধটা তৈরি হল, সেটাকে এবার বিভিন্ন তাপমাত্রায় রেখে পরীক্ষা করা হয় যে তার গুণগত মানের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। কারণ ওষুধ একবার তৈরি হয়ে গেলে তো সেটা পৃথিবীর যে-কোনও জায়গায়, যে-কোনও সময় নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তখন যদি তার গুণাগুণ পালটে যায়, তাহলে ভয়ানক বিপদ। তাই আগেই এগুলো পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয়। এইসব নানারকম পরীক্ষার পর যায় ক্লিনিক্যাল টেস্টে। এই স্টেজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে জন্তুদের ওপর পরীক্ষা হয়। তাতে যদি সব ঠিকঠাক থাকে, তাহলে তখন মানুষের ওপর পরীক্ষা করতে হয়।
এই মানুষের ওপর পরীক্ষার ব্যাপারটা আমার অনেকদিন ধরে জানার ইচ্ছে। কীভাবে হয় এটা? কেউ কি নিজের ওপর এভাবে ওষুধ পরীক্ষা করতে দেয়? তাতে তো তার ক্ষতিও হতে পারে।
সেরকম সম্ভাবনা থাকেই। আগে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আমাদের মতো গরিব দেশের মানুষের ওপর আকছার এরকম পরীক্ষা করত। এখন অবশ্য আইনের অনেক কড়াকড়ি হয়েছে। সবকিছু খোলাখুলিভাবে জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে হয়। তারপর যদি কেউ রাজি হয়ে নিজে থেকে আসে তখন তার ওপর পরীক্ষা করা হয়। ওষুধের কোনও সাইড এফেক্ট আছে কিনা সেটা বোঝার জন্য মানুষের ওপর পরীক্ষা করাটা খুব জরুরি। যাই হোক, এই ক্লিনিক্যাল টেস্টে পাস করলে তারপর ড্রাগ কন্ট্রোলে যাওয়ার প্রশ্ন। আমার সঙ্গে অবশ্য এই কোয়ালিটি কন্ট্রোল কিংবা তার পরে যেসব কাজকর্ম হয় তার কোনও সম্পর্ক নেই। তুই যাতে পুরো বিষয়টা বুঝতে পারিস সেজন্যই এতটা ডিটেলে বললাম। এইবার আসল কথায় আসছি।
পরপর দু-চুমুক চা খেয়ে আবার শুরু করে বাচ্চুদা, তোকে তো আগেই বলেছি, আমাদের এখানে নানারকম নতুন ওষুধ তৈরি হয়। সেরকমই একটা ওষুধ তৈরির জন্য গবেষণা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। ডায়াবেটিসের ওষুধ। নয়নতারা নামে একধরনের ফুলের গাছ আছে চিনিস? সাধারণত হালকা বেগুনি রঙের ফুল হয়। লোকের বাগানে আকছার দেখা যায়। হিন্দিতে এই ফুলগুলোকে বলে সদাবাহার। একটা বেশ গালভরা সায়েন্টিফিক নেমও আছে, ক্যাথারানথাস রোসেয়াস।
গাছ, ফুল, পাতা এসব বিষয়ে দিগন্তের জ্ঞানের পরিধি খুব একটা বেশি নয়। তাই সে অনিশ্চিতভাবেই ঘাড় নাড়ে। বাচ্চুদাও ব্যাপারটা বুঝে একটু হেসে বলে, ঠিক আছে, আমি তোকে দেখিয়ে দেব। আমাদের ক্যাম্পাসের ভিতরেই নয়নতারার ঝাড় রয়েছে। তবে সেটা বেগুনি নয়, সাদা নয়নতারা। কারণ আমাদের গবেষণার জন্য সাদা নয়নতারা ফুলই জরুরি।
যখন মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে হায়ার স্টাডিজ করছি, তখন আমার মেডিসিনাল প্ল্যান্ট যাকে বাংলায় বলে ভেষজ, তাই নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। সেই সময় পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখি, ও বাবা, এই নয়নতারা তো বেশ গেরামভারী গোছের মেডিসিনাল প্ল্যান্ট। আমাদের দেশের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে তো বটেই, দক্ষিণ আফ্রিকা আর চিনের যে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন, সেখানেও নয়নতারার ভালো কদর। তখনই জানতে পারলাম এই ফুলের জন্মস্থান মাদাগাস্কার। সেখান থেকে অবশ্য প্রায় সারা পৃথিবীতেই এখন নয়নতারা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই গাছটা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে আমি জানতে পারি, শুধু ডায়াবেটিস নয়, আরও নানারকম অসুখ সারানোর গুণ এর মধ্যে আছে। এমনকী যদি কাউকে মৌমাছি বা বোলতায় হুল ফুটিয়ে দেয়, তাহলে নয়নতারার পাতার রস সেখানে লাগিয়ে দিলে, তক্ষুনি জ্বালা কমে যায়। আসলে এই গাছে তিনধরনের অ্যালকালয়েড আছে। অ্যালকালয়েড কী তুই জানিস?
দিগন্ত খুব মন দিয়ে বাচ্চুদার কথা শুনছিল। এমনিতে হাসিখুশি, আড্ডাবাজ, বাচ্চুদা যে নিজের কাজের ব্যাপারে কতখানি সিরিয়াস সেটাও বুঝতে তার অসুবিধা হচ্ছিল না। দিগন্তর মনে হচ্ছিল সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষের সঙ্গে আজ তার পরিচয় হচ্ছে। বাচ্চুদা প্রশ্নটা করে চায়ের কাপগুলো গুছিয়ে ট্রে-তে তুলে রাখলেন। তারপর দিগন্তকে মাথা নাড়তে দেখে বললেন, স্বাভাবিক। তোর জানার কথাও নয়। খুব সহজ ভাষায় যদি বলি, তাহলে অ্যালকালয়েড হল একধরনের অরগ্যানিক কম্পাউন্ড যেগুলো সাধারণত, ফলে বীজ থাকে এমন গাছে পাওয়া যায়। ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে এই অ্যালকালয়েডই কাজে লাগে।
তবে নয়নতারা গাছের নানারকম গুণ থাকলেও আমার কিন্তু মূল ইন্টারেস্টটা ছিল ডায়াবেটিস। কাগজে নিশ্চয় পড়েছিস, আমাদের দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা হু-হু করে বাড়ছে। আর কয়েকবছরের মধ্যেই এটা প্রায় মহামারীর আকার ধারণ করবে। ডায়াবেটিস রোগটা কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মোটেই মারাত্মক কিছু নয়। একটা সিম্পল মেটাবলিক ডিজঅর্ডার মানে আমরা খাবার খেয়ে যে হজম করি তাতে একটা ছোটখাটো গণ্ডগোল। এই যে তুই ভাত, রুটি, আলু, মিষ্টি এসব খাচ্ছিস, এতে তো কার্বোহাইড্রেট, স্টার্চ, সুগার এইসব আছে। হজম হওয়ার সময় প্রথমে এগুলো সব ভেঙে গ্লুকোজ হয়ে যায়। তারপর সেই গ্লুকোজটা রক্তের সঙ্গে মিশে শরীরের সর্বত্র পৌঁছে যায়। শরীরের কোষ সেই গ্লুকোজ থেকেই এনার্জি তৈরি করে, যার জন্য আমরা কাজকর্ম, চলাফেরা করতে পারি। এখন এই গ্লুকোজ থেকে এনার্জি মানে শক্তি তৈরি করতে ইনসুলিন নামের একটা হরমোন লাগে। প্যানক্রিয়াস থেকে এই হরমোনটা বেরোয়। এবার কোনও কারণে যদি ইনসুলিন কম বেরোয় কিংবা ঠিকঠাক কাজ না করে, তাহলে তো রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা গ্লুকোজ এনার্জিতে বদলে যাবে না। তখন সেটা রক্তেই থেকে যাবে। তাতে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যাবে। এটাই হল ডায়াবেটিস।
নয়নতারা গাছ নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল, এরমধ্যে যে তিনটে অ্যালকালয়েড আছে, তার মধ্যে একটা শরীরে ইনসুলিন তৈরি করতে সাহায্য করে। তাই বছর চারেক আগে, আমাদের কোম্পানির একটা মিটিংয়ে যখন বলা হল, এমন একটা ওষুধ তৈরির চেষ্টা করতে, যেটা বহু মানুষের কাজে লাগবে আর দামও বেশি হবে না, তখন এই নয়নতারা গাছের কথাটা আমার মনে হয়েছিল। গাছটা তৈরি করা কোনও ব্যাপারই নয়। ছাগল-গরুতে পর্যন্ত এগাছের পাতা খায় না। আর ডায়াবেটিসের ওষুধ বের হলে বহু মানুষের উপকার হবে। তাই প্রপোজালটা যখন কোম্পানি মেনে নিল, তখন চারজনের একটা টিম তৈরি করে নিজেই খুব উৎসাহের সঙ্গে কাজে লেগে পড়লাম।
কাজটা কি তোমাদের এখানকার ল্যাবরেটরিতেই হচ্ছিল?
হ্যাঁ, এখানেই। আমাদের ল্যাবটা এমনিতেই যথেষ্ট উন্নত মানের। তা ছাড়া যা যা দরকার হয়, কোম্পানিকে বললে, প্রয়োজনে বিদেশ থেকেও আনিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। গবেষণার জন্য আলাদা ফান্ড আছে। কোম্পানি কোনওরকম কার্পণ্য করে না। কাজটা করছিলাম আমরা চারজন। আমি, শঙ্কর নাগ, প্রদীপ বসু আর সুব্রত রায়। এরমধ্যে শঙ্কর আর প্রদীপ হল ফার্মাসিস্ট আর সুব্রত আমার মতোই মাইক্রোবায়োলজিস্ট। আমার লিডারশিপেই কাজটা হচ্ছিল। তবে বাকি তিনজনও খুবই অভিজ্ঞ এবং যথেষ্ট পরিশ্রমীও। পুরো কাজটাকে তিনটে ভাগ করে করা হচ্ছিল। ওরা তিনজন তিনটে বিষয় নিয়ে কাজ করছিল আর আমার দায়িত্ব ছিল পুরোটা কো-অর্ডিনেট করা।
প্রায় চারবছর যথেষ্ট খাটা-খাটনির পর দিনকুড়ি আগে আমরা নিশ্চিত হই যে শেষপর্যন্ত কাজটা করা গেছে, মানে নয়নতারা গাছকে ডায়াবেটিস আটকানোর কাজে লাগানোর জন্য একটা ফর্মূলেশন আমরা বার করতে পেরেছি। আমাদের রিজিওনাল ডিরেক্টর হচ্ছেন মিঃ নৌশাদ আলম। আমি তাঁকেই খবরটা জানাই। তিনি তো ভারি খুশি। তখনই মিঃ আলম আমাকে বলেন যে, ২৬ এপ্রিল একটা বোর্ড অফ ডিরেক্টরস-এর মিটিং আছে। সেখানেই এই খবরটা অ্যানাউন্স করবেন তিনি। তারপর বোর্ডের অনুমতি নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ের কাজ শুরু করা হবে। মিটিংয়ে আমাকেও থাকতে হবে। কারণ কারুর যদি কোনও প্রশ্ন থাকে, তাহলে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে আমাকেই। পুরো বিষয়টা ব্যাখ্যা করার জন্য একটা পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরিরও কথা হয়। আমাকে মিঃ আলম বললেন কাজটা ঠিক কী হয়েছে, তার সারসংক্ষেপ তৈরি করে কোম্পানির নিয়মমাফিক একটা হার্ড কপি অন্তত দিন পনেরো আগে যেন ওনাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উনি সেটা বোর্ড মেম্বারদের পাঠিয়ে দেবেন, যাতে তাঁরাও খানিকটা জেনে-বুঝে তৈরি হয়ে আসতে পারেন।
আমার পরপর কয়েকদিন কয়েকটা জরুরি মিটিং ছিল। তাই মিঃ আলমের কথা শুনে আমি শঙ্করকে ডেকে বলি, হার্ড কপির জন্য ম্যাটারটা তৈরি করতে। কাল সন্ধেবেলা, ছ’টা নাগাদ আমি গেছিলাম আমাদের হেড অ্যাকাউনটেন্টের ঘরে। কিছু সইসাবুদ করার ছিল। সেই সময় শঙ্কর আমাকে ফোন করে জানায় যে রিপোর্টটা তৈরি হয়ে গেছে। ও প্রিন্ট আউটটা নিয়ে আমার ঘরে আসছে। কিন্তু আমার তখনও অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের কাজ শেষ হয়নি। এদিকে শঙ্করেরও বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল একটু। তাই আমি ওকে বলি যে রিপোর্টের প্রিন্ট আউটটা আমার টেবিলে রেখে যেতে। আমি একবার চোখ বুলিয়ে মিঃ আলমকে পাঠিয়ে দেব। একটু পরে শঙ্কর ফোন করে জানায় যে সে রিপোর্টটা একটা ব্রাউন খামে ভরে আমার টেবিলে রেখে এসেছে। কিন্তু অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট থেকে কাজ সেরে আরও মিনিট কুড়ি পরে ঘরে ফিরে আমি দেখি, টেবিলের ওপর খামটা নেই।
খামটা নেই?
এতক্ষণ সোফায় হেলান দিয়ে বসে বাচ্চুদার কথা শুনছিল দিগন্ত। এবার শিরদাঁড়া সোজা করে উঠে বসে।
না নেই। তারপর আমি গোটা ঘর ভালো করে খুঁজি। কিন্তু খামটা কোথাও পাওয়া যায় না। শঙ্করকে ফোন করি। শঙ্কর রীতিমতো জোর দিয়ে আমাকে বলে যে সে খামটা টেবিলের ওপরেই রেখে এসেছিল। আমার বেয়ারা লক্ষ্মণও আমাকে জানায় যে শঙ্কর একটা খাম হাতে নিয়ে আমার ঘরে ঢুকেছিল এবং খামটা ঘরেই রেখে গেছে।
সেটা লক্ষ্মণ জানল কী করে? লক্ষ্মণ কি ওনার সঙ্গে ঘরে ঢুকেছিল?
একটু চিন্তা করে বাচ্চুদা বলে, না, তা নিশ্চয় ঢোকেনি। অচেনা লোক হলে সঙ্গে ঢুকত। শঙ্করের ক্ষেত্রে প্রশ্নই ওঠে না। সম্ভবত শঙ্কর যখন বেরিয়ে যায়, তখন হাতে খামটা নেই দেখেই কথাটা বলেছে।
আচ্ছা, ঠিক আছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। কিন্তু তুমি আমাকে বলো, হার্ড কপিটা খুঁজে না পেয়ে তুমি এত উদ্বিগ্ন হচ্ছ কেন? প্রিন্ট আউট তো আর একটা বার করে নেওয়াই যায়। তোমার কেন মনে হচ্ছে যে এটা কেউ চুরি করে নিয়েছে?
আমার মনে হচ্ছে নয়, এখন আমি মোটামুটি নিশ্চিত। আর এই চুরি যাওয়াটা আমার পক্ষে খুবই বিপজ্জনক।
দিগন্ত দু-এক মুহূর্ত একটু ভেবে নিয়ে বলে, তোমার কি ধারণা, তোমাদের কোনও বিজনেস রাইভ্যাল কাজটা করেছে?
এক্স্যাক্টলি সো। তুই একদম ঠিক ধরেছিস। এই জন্যই আমি এত উদ্বিগ্ন।
ব্যাপারটা আমাকে একটু খুলে বলো তো।
বলছি শোন। কলকাতায় বা বলতে পারিস, পূর্ব ভারতে, নিউ লাইফ তো আর একমাত্র ওষুধের কোম্পানি নয়। আরও বেশ কয়েকটা আছে। তার মধ্যে আমাদের মূল কম্পিটিটর হল ড্রাগ ওয়ার্ল্ড আর সেভ লাইফ। এদের দুজনেরই ব্যবসা যথেষ্ট ভালো। নিজস্ব রিসার্চ উইং আছে। নতুন ওষুধ তৈরি করার জন্য এরা সারাক্ষণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
সাধারণত প্রত্যেকেই তাদের ল্যাবরেটরিতে কী গবেষণা হচ্ছে, সেটা গোপন রাখারই চেষ্টা করে। কিন্তু তবু নানাভাবে খবর ঠিকই বেরিয়ে যায়। ওরা খবর পেয়ে যায়, আমরা কী কাজ করছি। আমরাও জানতে পারি ওরা কী ধরনের ওষুধ বার করার চেষ্টা করছে। যেমন ধর, ড্রাগ ওয়ার্ল্ড স্কিনে যে ফাংগাস ইনফেকশন হয়, তার একটা নতুন ধরনের ওষুধ বার করার চেষ্টা করছে। সেভ লাইফ হাঁপানির ওষুধ নিয়ে কাজ করছে। এবার আমরা যেরকম ওদেরটা জানি, সেরকম ওরাও নিশ্চয় এতদিনে আমরা কী কাজ করছি সেটা জেনে গেছে। এখন আমাদের ফর্মূলেশন ওরা যদি কোনওভাবে হাতাতে পারে, তাহলে ওরাও তো ওষুধটা বার করে ফেলবে। হয়তো আমাদের আগেই বার করে ফেলবে। তা হলে আমাদের এতদিনের পরিশ্রমের কোনও মূল্যই থাকবে না। তা ছাড়া আমিই যেহেতু এই প্রোজেক্টের লিডার, তাই কোম্পানির কাছে আমারও যথেষ্ট সম্মানহানি হবে। সুতরাং বুঝতেই পারছিস, আমার কাছে সিচুয়েশনটা খুবই উদ্বেগজনক।
একটা কথা বলো তো বাচ্চুদা, তুমি কি এটা অনুমানের ওপর নির্ভর করে বলছ নাকি, এরকম ঘটনা আগে কখনও ঘটেছে?
দিগন্তর কথা শুনে বাচ্চুদা প্রথমে একটু সময় চুপ করে থাকে। তারপর সামান্য অপ্রস্তুতভাবে বলে, না রে, এটা আমার অনুমান নয়। এরকম চেষ্টা যে হয় সেটা আমরা জানি। তোর কাছে বলতে অসুবিধা নেই, আমাদের নিজের কোম্পানিও যে এ ব্যাপারে একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা, তাও নয়। অন্যরা কী নিয়ে গবেষণা করছে, তার খবর বার করা কিংবা ফর্মূলেশন হাতানোর চেষ্টায় তাদেরও কোনও ত্রুটি নেই। এরজন্য টাকাপয়সা তো বটেই অন্যান্য নানা ধরনের লোভও দেখানো হয়।
একটা কথা আমাকে খোলাখুলি বলো বাচ্চুদা, এবারের প্রোজেক্টটা নিয়ে তোমাকে কেউ অ্যাপ্রোচ করেছিল? বা তোমাদের গ্রুপের কাউকে?
গ্রুপের কাউকে করেছিল কিনা বলতে পারব না। কারণ এসব কথা তো আর কেউ খোলাখুলি বলবে না। তবে আমাকে অ্যাপ্রোচ করা হয়েছিল।
তাই নাকি। ইন্টারেস্টিং। একটু খুলে বলো তো।
প্রস্তাবটা এসেছিল কাজটা শুরু করার মোটামুটি মাস ছয়েক পরে। অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে বলা হয়েছিল, রিসার্চের প্রোগ্রেস ধাপে ধাপে জানিয়ে যদি ফাইনাল ফর্মূলেশনটা বলে দিই, তাহলে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে।
তার মানে যারা লোভ দেখাচ্ছে, তারা তখনই জেনে গেছিল যে তোমরা কী নিয়ে কাজ করছ?
না, তা হয়তো নয়। ইনফ্যাক্ট যে আমাকে ফোন করেছিল, তার সঙ্গে আমি খানিকক্ষণ কথা বলেছিলাম। আমরা ঠিক কী কাজ করছি, সেটা সম্ভবত ওরা জানতে পারেনি। তবে একটা ইম্পর্টান্ট কাজ হচ্ছে এবং সেটা সাকসেসফুল হলে কোম্পানির যথেষ্ট লাভ হবে, এটুকু খবর নিশ্চিত পেয়েছিল। আমাদের তরফেও খবরটা যাতে বাইরে না বেরোয়, সেজন্য খুবই কড়াকড়ি করা হয়েছিল। ইনফ্যাক্ট কাজটা যে কী হচ্ছে, সেটা এখনও পর্যন্ত আমরা চারজন আর আমাদের রিজিওনাল ডিরেক্টর ছাড়া পুরোপুরি কেউই জানে না।
মিঃ আলমকে আমি আপাতত বাদ রাখছি। কিন্তু তোমার সঙ্গে যে তিনজন আছেন, তাঁরা সকলেই সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য?
একশো শতাংশ তো বলা যায় না। লোভ বড় সাংঘাতিক জিনিস। তবে এদের সবাইকেই আমি বহুদিন ধরে চিনি। আত্মসম্মানী। নিজেদের কাজ নিয়ে কনফিডেন্ট লোক। আমার মনে হয় না এদের কেউ…।
কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই চুপ করে যায় বাচ্চুদা। টেবিলে ফোনটা বাজছে। উঠে গিয়ে ফোনটা ধরে।
হ্যাঁ-হ্যাঁ, ঠিক আছে। তুমি বেরিয়ে যাও। আজ আর কোনও দরকার নেই। বলে ফোনটা রেখে দেয়।
অঞ্জলিকে একটা ফোন করে জানিয়ে দাও, আমি তোমার অফিসে এসেছি। মোবাইলে না পেলে আবার চিন্তা করবে। দিগন্ত বলে।
দিগন্তর কথায় ঘাড় নেড়ে অঞ্জলিকে ফোনে ধরে বাচ্চুদা। খবরটা দিয়ে ফোন রেখে আবার সোফায় এসে বসলে দিগন্ত বলে, ব্যাকগ্রাউন্ডটা আমার কাছে মোটামুটি ক্লিয়ার হয়ে গেছে বাচ্চুদা। এবার তুমি সেদিন ঠিক কী হয়েছে সেটা ডিটেলে বলো।
বলছি, তার আগে আর এক কাপ চা খা। ফ্লাস্কে এখনও অনেকটা গরম জল রয়েছে।
কাপে টি-ব্যাগ দিয়ে আরও দু-কাপ চা বানায় বাচ্চুদা। তারপর গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, তোকে তো বললাম, শঙ্কর যখন কপিটা আমার ঘরে রেখে গেছে, তখন আমি নীচে অ্যাকাউনটেন্টের ঘরে ছিলাম। আমাদের বিভিন্ন প্রোজেক্টের জন্য যেসব টাকাপয়সা আসে, সেগুলো কাজে লাগানোর জন্য আমার সই দরকার হয়। সেটা করার জন্যই আমি নীচে সুবলবাবুর ঘরে গেছিলাম।
তুমি ক’টার সময় ঘর থেকে বেরিয়েছিলে তোমার মনে আছে?
একদম পরিষ্কার মনে আছে, ৫.৩৫। মনে আছে কারণ আমি বেরোনোর ঠিক আগে ঘড়িটা দেখেছিলাম।
আচ্ছা, একটা জিনিস বলো, তোমাকে সই করার জন্য কেন ওনার কাছে যেতে হবে? সাধারণ নিয়ম তো কাগজপত্র নিয়ে আসবে। তুমি সই করে দেবে।
আমাদেরও তাই নিয়ম। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা সমস্যা ছিল। আগের কয়েকটা প্রোজেক্টের হিসেব দেখে সই করার ব্যাপার ছিল। সুবলবাবু বলেছিলেন কাগজপত্রগুলো নিয়ে আসবেন। কিন্তু অনেকগুলো ফাইল আনতে হবে বলে আমিই বারণ করেছিলাম।
দিগন্ত একটা ছোট নোটবুকে কয়েকটা জরুরি তথ্য লিখে নিয়ে সেটা বন্ধ করে ব্যাগে ভরে।
আচ্ছা। এবার বলো, তারপর কী হল?
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা সুবলবাবুর ঘরে গেলাম।
দাঁড়াও, দাঁড়াও। তুমি যে ঘর থেকে বেরোলে, তখন তোমার দরজায় যে বেয়ারা থাকে, মানে লক্ষ্মণ, তাকে কী বলে গেছিলে যে তুমি কোথায় যাচ্ছ?
হ্যাঁ, তা বলে গেছিলাম। কারণ যদি কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, তাহলে তো তাকে বলতে হবে।
কী বলেছিলে এক্স্যাক্টলি মনে আছে?
বাচ্চুদা একটু ভেবে বলল, সাধারণ মামুলি কথা। বললাম, আমি সুবলবাবুর ঘরে যাচ্ছি। মিনিট কুড়ি পরে ফিরব। যদি কেউ আসে অপেক্ষা করতে বলিস। আর যদি বেশি তাড়া থাকে তাহলে যেন প্রতীকের সঙ্গে কথা বলে নেয়।
প্রতীক কে?
প্রতীক হচ্ছে আমার সেক্রেটারি। ঠিক পাশের ঘরটাতেই ও বসে।
প্রতীককেও কী বলেছিলে যে তুমি সুবলবাবুর কাছে যাচ্ছ?
না, তা বলিনি। তবে আমাকে যে সুবলবাবুর কাছে যেতে হবে, সেটা ও জানত। সকালে আমার সঙ্গে ওর কথা হয়েছিল।
আচ্ছা এরপর কী হল বলো।
আমি সিঁড়ি দিয়ে নেমে লন পেরিয়ে সুবলবাবুর ঘরে গেলাম। উনি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। কারণ ততক্ষণে তো ছুটি হয়ে গেছে। ওনার ঘরে বসে আমি যখন আগের রিপোর্টগুলো দেখছি, সেই সময় শঙ্করের ফোনটা এল। আমি প্রথমটায় ওকে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। কিন্তু কাল ওর ভাগ্নীর বিয়ে ছিল। তাই তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে বলায়, আমি রিপোর্টটা টেবিলে রেখে যেতে বললাম।…তারপর সুবলবাবুর ওখানে কাজ শেষ হতে আরও মিনিট কুড়ি-পঁচিশ লাগল। সই করা হয়ে গেলে, ফাইলপত্র তুলে দিয়ে আমরা একসঙ্গেই ঘর থেকে বেরোলাম। ও, বলতে ভুলে গেছি শঙ্কর বেরোনোর আগে আমাকে আর একবার ফোন করে জানিয়েছিল যে, একটা ব্রাউন খামে ভরে রিপোর্টটা আমার টেবিলে রেখে দিয়েছে। তাই ঘরে ফিরেই, টেবিলে কোনও ব্রাউন খাম নেই দেখে আমি সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মণকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম।
তাহলে, শঙ্করবাবু তোমার টেবিলে রিপোর্টটা রেখে যাওয়ার ঠিক কতক্ষণ পরে তুমি ফিরেছিলে?
বাচ্চুদা মোবাইলের কল লিস্টটা চেক করে বলল, শঙ্কর দ্বিতীয় ফোনটা আমাকে করেছিল ৫.৫২ মিনিটে। আর আমি ঘরে ফিরেছি সোয়া ছ’টা নাগাদ।
তার মানে যে খামটা নিয়েছে, সে সেটাকে লুকিয়ে ফেলার বা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য কুড়ি মিনিটেরও বেশি সময় পেয়েছে…
দিগন্তর গলায় খানিকটা উদ্বেগ এবং হতাশার সুর আন্দাজ করে বাচ্চুদা বলে ওঠে, পালিয়ে যায়নি দিগন্ত। পালিয়ে যেতে পারেনি। আমার ধারণা খামটা এখনও আমাদের এই বাড়িতেই আছে। ইনফ্যাক্ট সেজন্যই আমি তোকে ডেকে পাঠিয়েছি। এর আগে পরপর কয়েকটা ঘটনায় তুই যেভাবে কাজ করেছিস, তাতে আমাদের মনে হয়েছে তোর ওপর নির্ভর করা যায়। তুই হয়তো চেষ্টা করলে ওটা উদ্ধার করতে পারবি।
বাচ্চুদার কথা শুনতে শুনতে দু-চোখ তীক্ষ্ন হয়ে ওঠে দিগন্তর, তুমি কী করে এরকম নিশ্চিত হচ্ছ যে খামটা নিয়ে পালিয়ে যেতে পারেনি?
তুই তো দেখেছিস, আমাদের গেটে একটা মেটাল ডিটেক্টর আছে। সিকিউরিটি চেকিংয়ের ব্যবস্থাও আছে। ব্যবস্থাটা খুবই উন্নতমানের। তাই সেদিন খামটা না পেয়ে আমি প্রথমেই যেটা করেছিলাম, সেটা হল গেটের সিকিওরিটিকে ফোন করে বলে দিয়েছিলাম, যারা গেট দিয়ে বেরোবে, তাদের যেন আপাদমস্তক চেক করা হয়। কোনও ধরনের সন্দেহজনক কাগজপত্র পেলেই যেন আমাকে জানায়। এ ছাড়া প্রত্যেকের মোবাইলও যেন পরীক্ষা করা হয়। সবারই মোবাইলের পরীক্ষা করে রেকর্ড করা হয়েছিল। সেগুলো আমি নিজে চেক করেছি। সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। আজকেও সবাইকে ঠিক একইভাবে চেক করা হয়েছে। তাই আমার ধারণা যে রিপোর্টটা চুরি করেছে, সে কাল সেটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেনি বা কাউকে পাঠাতে পারেনি। আর আজ তো সবাইকে মোবাইল সিকিওরিটির কাছে জমা দিয়ে আসতে হয়েছে। সেরকমই নির্দেশ ছিল আমার। বাড়ি যাওয়ার সময় ফেরত দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আজও কোনও সুযোগ পায়নি।
কিন্তু বাচ্চুদা, তুমি তো ব্যাপারটা জেনে তবে সিকিওরিটিকে অর্ডার দিয়েছ। তার আগেই তো ওটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। কারণ সে তো প্রায় কুড়ি মিনিট সময় পেয়েছে।
না, সেটাও হয়নি। বাচ্চুদার গলায় খানিকটা দৃঢ়তার সুর, কারণ আমি গেটের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করেছি। শঙ্কর আমার ঘরে খামটা রেখে যাওয়ার পর থেকে আমি চেকিংয়ের অর্ডার দেওয়ার মাঝখানে মাত্র দুজন গেট দিয়ে বেরিয়েছে। একজন শঙ্কর নিজে আর একজন সুবলবাবু। কারণটা খুবই সোজা। পাঁচটায় তো অফিস ছুটি হয়ে গেছে। বেশিরভাগ লোকই তখন বেরিয়ে গেছে। দোতলায় আমরা যারা রিসার্চের কাজ করি, তারাই কয়েকজন ছিলাম। ইনফ্যাক্ট সেদিন আমার গ্রুপের তিনজন ছাড়া বাকি সকলেই চলে গেছিল।
আচ্ছা, এবার বলো তো, শঙ্করবাবু খামটা তোমার ঘরে রেখে যাওয়ার পর আর কে কে তোমার ঘরে এসেছিল?
শঙ্কর ছাড়া প্রদীপ আর সুব্রত দুজনেই এসেছিল। প্রদীপ এসেছিল একটা বই নিতে। যেটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল। আমিই লক্ষ্মণকে বলে গেছিলাম যে, প্রদীপ বইটা নিতে আসবে। আর সুব্রত একটা ফাইল দিতে এসেছিল। সেটা আমাকে দেওয়ার কথা ছিল। তবে কখন দিতে আসবে সেরকম কিছু ঠিকই ছিল না।
এ ছাড়া আর কেউ, বেয়ারা…পিয়োন…
বাচ্চুদা একটু ভেবে বলল, সেটা তো আমি ঠিক জানি না, লক্ষ্মণকে জিজ্ঞাসা করলে জানা যাবে। তবে মনে হয় না আর কেউ এসেছিল।
আচ্ছা, আপাতত এই পর্যন্ত থাক। এবার তোমার ঘরটা একবার ভালো করে ঘুরে দেখে নিই। তারপর আরও কিছু জিনিস জানতে হবে। তুমি নিশ্চয় নিজের ঘরটা ভালো করে খুঁজে দেখেছ?
তা দেখেছি। সম্ভব, অসম্ভব সব জায়গাতেই খুঁজেছি। কিন্তু লাভ হয়নি কিছুই।
বাচ্চুদার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে, দিগন্ত তীক্ষ্ন চোখে ঘরটা দেখতে থাকে। আয়তাকৃতি ঘর। যথেষ্ট বড়। কুড়ি বাই পনেরো ফুট তো হবেই। দরজার ঠিক উলটোদিকে কুচকুচে কালো মেহগিনি কাঠের বিশাল সেক্রেটেরিয়েট টেবিল। আধখানা চাঁদের মতো সেই টেবিলের মাঝখানে বাচ্চুদার বসার চেয়ার। উলটোদিকেও অতিথিদের জন্য চারটে পিঠ উঁচু সুন্দর ডিজাইনের মেহগিনির চেয়ার রাখা। একইরকম চেয়ার ঘরের একপাশে আরও কয়েকটা রাখা আছে। অতিথির সংখ্যা বেশি হলে সম্ভবত সেগুলো টেনে আনা হয়। বাচ্চুদার চেয়ারের পিছনে এবং বাঁদিকের দেওয়ালের অর্ধেকটা জুড়ে খোলা বইয়ের তাক। তাতে শুধু বই নয়, নানা ধরনের মেমেন্টো, বাচ্চুদাদের রিসার্চ সেন্টারের পাওয়া প্রাইজ, সার্টিফিকেট, গ্রুপ ফোটো অনেক কিছুই রয়েছে। পিছনের দেওয়ালে, বইয়ের তাকের পাশে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে একটা চিন্তামণি করের আঁকা পেইন্টিং ঝুলছে। তারপর সাদা-কালো জ্যামিতিক প্যাটার্নের ভারি পরদা ঝোলানো একটা দরজা। দরজার পরে দেওয়ালের বাকি অংশে একটা জিগজ্যাগ ডিজাইনের খোলা তাক। সেখানে নিউ লাইফের রিসার্চের কাজে যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলোই মিনিয়েচার ফর্মে বানিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এর পাশের দেওয়ালে, প্রথমে একটা ছোট দরজা। বোঝাই যাচ্ছে যে, সেটা হল বাথরুম। তারপর খানিকটা ফাঁকা জায়গা ছেড়ে একটা রেফ্রিজারেটর রাখা। টেবিলের উলটোদিকের দেওয়াল ঘেঁষে, একসেট সোফা। তার পাশে একটা কালো রঙের মাটির লম্বা ফুলদানিতে নকল কাশফুল রাখা আছে, যেগুলো বেশ আসলের মতোই দেখতে।
তোমার ঘরের যিনি ইন্টিরিয়র করেছেন, তিনি কী পুরোনো বাংলা ছবির ভক্ত?
দিগন্তর কথায় একটু চমকে উঠে, বাচ্চুদা বলল, আমার ঘরের ইন্টিরিয়র… সে তো করেছে সলিল, সলিল রায়। হ্যাঁ, ঠিকই। সলিল ভীষণরকম পুরোনো বাংলা ছবির ভক্ত। কিন্তু তুই জানলি কী করে?
খুব স্বাভাবিক। ঘরের দেওয়ালের রং ক্রিম। আর আসবাব সবই হয় কালো, নয়তো একেবারে কালচে বাদামি। ফলে সাদা-কালোর এই যে একটা দারুণ ইমপ্যাক্ট, এটা আমাদের সত্তর দশকের বাংলা ছবিতে খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার হয়েছে। যিনি সেই আইডিয়াটা কাজে লাগিয়েছেন, তাঁর পক্ষে পুরোনো বাংলা ছবির ভক্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। তা ছাড়া এই ধরো, চিন্তামণি করের ছবি কিংবা টেরাকোটার ফুলদানিতে কাশ ফুল, এসব তো বাঙালিয়ানার ভক্ত না হলে সহজে কারুর মাথায় আসবে না।
দিগন্তর কথা শুনে একটু হেসে বাচ্চুদা বলল, তোর কথা শুনে প্রেডিকসনটা খুব সহজ মনে হল ঠিকই। তবে আমার নিজের কোনওদিন এটা মাথায় আসেনি। যদিও সলিলের সঙ্গে বাংলা ছবি নিয়ে আমার অনেক গল্প হয়েছে।
দিগন্ত এবার উঠে প্রথমে বইয়ের তাকের কাছে গিয়ে সেগুলো খানিকটা উলটেপালটে, বিশেষ করে পিছনে কিছু আছে কিনা দেখে তারপর টেবিলের দিকে এগোয়। টেবিলের একপাশে বাচ্চুদার ল্যাপটপটা রাখা আছে। এ ছাড়া সাদা, সবুজ আর লাল রঙের তিনটে ফোন। কলমদানি, পিনকুশন ইত্যাদি মামুলি জিনিসপত্র। টেবিলের ডান আর বাঁ-পাশে তিনটে করে ড্রয়ার। সেগুলোও টেনে দেখে দিগন্ত। কাগজপত্র ভর্তি। বেশিরভাগই চিঠিপত্র বোঝাই যায়।
তোমার এই তিনটে ফোনের, তিনটেই কি তোমার ডাইরেক্ট লাইন?
না, সবুজটা শুধু ডাইরেক্ট লাইন। ওটাতে আমি দরকারে ইন্টারন্যাশনাল কলও করতে পারি। লাল আর সাদা দুটোই ইন্টারকম। মানে অফিসের ভিতর থেকে যে কেউ আমার এক্সটেনশন নম্বর ৩২৯ ও ৩৩০ ডায়াল করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
এই দুটোর কোনওটার সঙ্গে কি অন্য কোনও ফোনের ডাইরেক্ট লিঙ্ক আছে?
লালটার আছে। ওটা একই সঙ্গে আমার ঘরে আর প্রতীকের ঘরে বাজে। আমি ঘরে না থাকলে যাতে কেউ ফোন করলে প্রতীক ধরতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। ফোনটা তিনবার রিং হওয়ার পরেও যদি আমি না তুলি, তখন ও ধরে।
শঙ্করবাবু যে রিপোর্টটা তোমাকে দিতে আসছেন, সেটা তো উনি তোমাকে মোবাইলে জানিয়েছিলেন। ল্যান্ডফোনে কোনও কথা হয়নি তো?
না, সব কথাই মোবাইলে হয়েছিল।
দিগন্ত এবার বাচ্চুদার চেয়ারের পিছনে রাখা দেওয়াল আলমারিটা খুঁটিয়ে দেখে। তারপর দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজায় গোদরেজ কোম্পানির দামি গা-তালা লাগানো। এই ধরনের লকগুলো ভিতর থেকে বন্ধ-খোলা দুই-ই করা যায়। কিন্তু চাবি না থাকলে বাইরে থেকে খোলা যায় না। দরজাটা দেখতে দেখতে দিগন্তের কপালে ভাঁজ পড়ে।
এটা কীসের দরজা বাচ্চুদা?
পিছন দিকে একটা বারান্দা আছে। তারই দরজা।
এটা তো দেখছি ভিতর থেকে ইয়েল লক লাগানো। চাবি কার কাছে থাকে?
আমার কাছেই থাকে।
ডুপ্লিকেট?
ডুপ্লিকেটও আমার কাছে, বাড়িতে। আসলে আমার বারান্দায় বিশেষ যাওয়া হয় না। যাদের সিগারেট খাওয়া অভ্যাস থাকে, তাদের সাধারণত এই ধরনের বারান্দা কাজে লাগে। আমার তো সে বালাই নেই। কথা বলতে বলতেই, বারান্দার দরজাটা খুলে ফেলেছে দিগন্ত। একটা লম্বাটে সরু ব্যালকনি। এদিকটা অফিসবাড়িটার সামনের দিক। ঢোকার গেটটা দেখা যাচ্ছে। সন্ধে হয়ে গেছে। তাই গেটের মাথায় এখন জোরালো আলো জ্বলছে। বারান্দার ঠিক নীচে বাগান। সবথেকে মজার ব্যাপার হল, বারান্দার একদম পাশেই একটা মস্ত শিরীষ গাছ। তার বিশাল কাণ্ডটাকে বারান্দা থেকে হাত বাড়িয়ে অনায়াসে ছোঁয়া যায়। গাছটার গা বেয়ে আবার একটা মাধবীলতা উঠেছে। গরমকাল। তাই সেটা লাল-সাদা ফুলে ভরা। একটা হালকা মিষ্টি গন্ধও আসছে। শিরীষ গাছের ডালপালা ছড়িয়ে থাকায় বারান্দাটা একটু ঝুপসি মতো।
দাঁড়া, বারান্দার আলোটা জ্বেলে দিই।
ঘরের ভিতর গিয়ে বাচ্চুদা দু-চারবার টেপাটিপি করতে একটা জোরালো টিউব লাইট জ্বলে ওঠে। দিগন্ত দেখে, বারান্দাটা মোটামুটি খালি। শুধু বাচ্চুদার ঘরের দরজাটার বাঁ-পাশে কোণের দিকে কতগুলো কাগজের কার্টেন রাখা। বোঝাই যাচ্ছে বাতিল কার্টেন।
এগুলোও কি তুমি দেখেছ?
দিগন্তর কথায় একটু হকচকিয়ে গিয়ে বাচ্চুদা বলে, এগুলো কেন দেখব? এখানে জিনিসটা আসবে কীভাবে?
ভেরি সিম্পল। তোমার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে, এখানে রেখে আবার ঘরে ঢুকে দরজা টেনে দিতে পারে। পরে নিজের সুবিধামতো বার করে নেবে। তবে আমার ধারণা, যারা এরকম কাজ করেছে, তারা এতটা ঝুঁকি নেবে না।
কথার মাঝখানেই নীচু হয়ে বসে কার্টেনগুলো খুলতে থাকে দিগন্ত। দুটো কার্টেন একেবারেই খালি। তিন নম্বর কার্টেনটাতে কয়েকটা ছোট ছোট প্লাস্টিকের বাটি রয়েছে। দেখা শেষ করে, পকেট থেকে রুমাল বার করে হাতটা ভালো করে মুছে নিয়ে বলে, তুমি বললে, বারান্দাটা ব্যবহার করো না। কিন্তু বেশ পরিষ্কার আছে তো। তার মানে নিয়মিত ঝাড়ামোছা হয়?
সেটা আমার জন্য নয়। প্রতীকের জন্য। ওপাশে যে দরজাটা দেখছিস, সেটা প্রতীকের ঘরের দরজা। ওর ঘর থেকেও বারান্দায় আসা যায়। আর ও নিয়মিত বারান্দায় আসেও।
তোমাদের এই প্রতীকবাবুটি মনে হচ্ছে একজন পক্ষীপ্রেমিক?
ও বাবা, সেটা আবার জানা গেল কী করে? তুই তো মনে হচ্ছে আজকাল হাত গুনতে পারিস।
দিগন্ত একটু মুচকি হেসে বলে, আসলে ওই কার্টেনটাতে কয়েকটা ছোট ছোট প্লাস্টিকের বাটি ছিল। গায়ে জলের দাগ। আজকাল খুব গরমের সময় অনেকে ওইরকম বাটিতে, বারান্দায় বা খোলা জায়গায় জল রেখে দেয়, যাতে পাখিরা এসে খেতে পারে। তার থেকেই আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লাম বলতে পারো।
ঢিল একদম ঠিকঠাক লক্ষ্যে পৌঁছেছে। প্রতীক শুধু পক্ষীপ্রেমিক নয় বলতে পারিস প্রকৃতিপ্রেমিক। গাছপালা, ফুল-পাতা ভালোবাসে। আর পাখি তো ওর প্যাশন। দিনের বেলা হলে দেখতে পেতিস, এই শিরীষ গাছটার ডালে পাখিদের বাসা বানানোর জন্য ছোট ছোট হাঁড়ি টাঙানো আছে। এসবই হল প্রতীকের কীর্তি। অনেক হ্যাপা করে, ফায়ার ব্রিগেডের মই ধার করে এনে ওগুলো টাঙানো হয়েছিল।
তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুমি ছেলেটিকে বেশ পছন্দ করো, তাই না?
তা করি। ভদ্র ছেলে। একটু চুপচাপ, তবে অমিশুক নয়। নিজের কাজ আর এইসব শখ নিয়েই থাকে। অফিসের কূট-কচালিতে মাথা ঘামায় না। আমার পক্ষে এই ধরনের সেক্রেটারিই ভালো।
কতদিন কাজ করছে এখানে?
তা, তিন বছর তো হলই। একটু বেশিও হতে পারে।
দিগন্ত এগিয়ে গিয়ে প্রতীকের ঘরের দরজাটা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে। একইরকম ইয়েল লক লাগানো। চাবি ছাড়া বাইরে থেকে খোলার কোনও উপায় নেই। ভিতরে সম্ভবত কেউ নেই। কারণ আলো দেখা যাচ্ছে না।
প্রতীকবাবু বোধহয় বাড়ি চলে গেছেন, তাই না?
হ্যাঁ। ও সাতটা নাগাদ বেরোয়। আজ একটু আগে বেরোবে বলেছিল। তখন ওই ফোন করেছিল।
ঠিক আছে, চলো। এখন আর এখানে কিছু দেখার নেই। দিনের বেলায় এসে আর একবার ভালো করে দেখতে হবে। আচ্ছা, তোমার যে চাবির গোছাটা, সেটা কি সবসময় তোমার কাছেই থাকে, নাকি ঘরে রেখে যাওয়া অভ্যাস আছে?
একেবারেই না। সারাক্ষণই আমার পকেটে থাকে।
পকেট থেকে একটা কি-রিং বার করে দেখায় বাচ্চুদা। তাতে তিনটে চাবি রয়েছে। এই দুটো আমার ঘরের দুটো দরজার চাবি, আর এটা আমার ড্রয়ারের চাবি। এগুলো আমি সর্বক্ষণ নিজের কাছে রাখি। ঢোকার বড় দরজাটার বাইরে, একটা কোলাপসিবল গেট আছে। সেটা সিকিওরিটি লাগায়। চাবিও সিকিওরিটির কাছেই থাকে। আর ডুপ্লিকেট আমি অফিসে আনি না, বাড়িতে আলমারির লকারে থাকে।
আসলে এই দরজাটা নিয়ে আমার খটকা লাগছে বাচ্চুদা। চাবি থাকলে, প্রতীকবাবুর ঘর দিয়ে যে কেউ এসে দরজা খুলে তোমার ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। প্রতীকবাবুর ঘরের দরজায় তো আর লক্ষ্মণের মতো কেউ বসে থাকে না?
না, তা তো থাকেই না। আমারটা ডিরেক্টরের ঘর বলে নজরদারি। তবে এটা তোকে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, দুটো চাবিই আমার কাছে আছে। হারায়নি, কেউ নেয়নি, আমিও কোথাও রাখিনি। তবে নকল চাবি দিয়ে কেউ যদি খোলে…
না, সেটা সম্ভব নয়। এগুলো গোদরেজ কোম্পানির যথেষ্ট দামি তালা। এই ধরনের তালার চাবি নকল করা যায় না।
দিগন্ত গিয়ে আবার সোফায় বসে। পকেট থেকে ডাইরিটা বার করে উলটেপালটে দেখে বলে, তুমি কী ঠিক করেছ বাচ্চুদা? পুলিশে খবর দেবে?
দেখ, আমি পুরো ঘটনাটাই কাল মিঃ আলমকে জানিয়েছি। ওনার সঙ্গে একটা প্রাথমিক আলোচনার পরই, আমি তোকে ফোন করেছিলাম। মিঃ আলমের শালা কলকাতা গোয়েন্দা পুলিশের একজন সিনিয়র অফিসার। তাঁর সঙ্গে কথা বলে, উনি ঠিক করবেন, পুলিশে কমপ্লেইন করা হবে কিনা, কিংবা কীভাবে হবে।
আমারও মনে হয় পুলিশকে জানানো দরকার। কারণ জিনিসটা খুঁজে বার করার জন্য সেদিন ওই সময় যাঁরা অফিসে ছিলেন, তাঁদের সকলকে জেরা করতে হবে। আমি জেরা করব বললে, কেউ আপত্তি জানাতেই পারেন। পুলিশ থাকলে সেই সমস্যাটা হবে না। তা ছাড়া যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে একটা তল্লাশিও করতে হতে পারে। তুমি যেরকম কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিয়েছ, তাতে আমারও মনে হচ্ছে, জিনিসটা এখনও তোমাদের অফিসের বাইরে যায়নি। সেক্ষেত্রে একটা তল্লাশি করা যেতে পারে আর সেটা পুলিশ করলেই ভালো, কারণ এ ব্যাপারে ওদের এক্সপার্টিজ আছে। যদিও তল্লাশিটা আমার ইচ্ছা নয়। কারণ তাতে প্রথমত লোক জানাজানি বেশি হবে। তা ছাড়া তোমাদের এতবড় ল্যাবরেটরি। নানারকম কেমিক্যাল নিয়ে কারবার। পুলিশ তো আর অত সূক্ষ্মভাবে কিছু করতে পারে না। কিছু একটা ভেঙে গেলে কিংবা নষ্ট হয়ে গেলে অসুবিধায় পড়বে।
তাহলে কি মিঃ আলমকে একবার ফোনে ধরব, কথা বলে নিবি?
রাজি হয়ে ঘাড় নাড়ল দিগন্ত। ফোনে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয় তিনজনের। মিঃ আলম ইতিমধ্যেই তাঁর শালা, শাহজাদ হোসেনের কাছ থেকে দিগন্তর সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনে নিয়েছেন। বিশেষ করে তার মিকিমোটো নেকলেস উদ্ধারের ব্যাপারটা কলকাতার পুলিশ মহলে বেশ প্রশংসিতই হয়েছে। তাই দিগন্ত কাজের দায়িত্ব নিলে মিঃ আলমের কোনও আপত্তি নেই। তবে পুলিশকে যে জানানো দরকার সে বিষয়ে তিনিও একমত। পুলিশের তরফে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলে জানিয়েছেন শাহজাদ। দিগন্তর ছোটবেলার বন্ধু প্রণয় বোস, কলকাতা গোয়েন্দা পুলিশেই কাজ করে। বেশিরভাগ ইনভেস্টিগেশনেই প্রণয়, দিগন্তর সঙ্গে থাকে। তাই দিগন্ত মিঃ আলমকে অনুরোধ করল, যদি তাঁর শালাকে বলে, এক্ষেত্রেও কাজের দায়িত্বটা প্রণয়কে দেওয়া যায়। মিঃ আলমও খুশি হয়েই রাজি হলেন।
সব কথাবার্তা হওয়ার পর মিঃ আলম বললেন, মিঃ দেব, ২৬ এপ্রিল আমাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরস-এর মিটিং। আজ হল ১০ এপ্রিল। আমি যদি সাতদিন আগেও আমার বোর্ড মেম্বারদের হাতে রিপোর্টটা পৌঁছে দিতে পারি, তা হলেও কোনও অসুবিধা নেই। কেউ কিছুই জানবে না। কিন্তু তার বেশি দেরি হলে মুশকিলে পড়ব।
সাতদিন মানে হচ্ছে উনিশ। তার মানে আমি হাতে পাচ্ছি নয় দিন। দিগন্তর গলা গম্ভীর। মিঃ আলম, রিপোর্টটা যদি অফিসের ভিতরেই এখনও থাকে, তাহলে সেটা খুঁজে বার করার জন্য নয় দিন আমার মনে হয় যথেষ্ট সময়।
থ্যাঙ্কিউ মিঃ দেব। মিঃ মিত্র যেরকম বলছেন, তাতে আমারও মনে হচ্ছে রিপোর্টটা এখনও বাইরে যেতে পারেনি। আপনি প্লিজ চেষ্টা করুন যাতে ওটা উদ্ধার করা যায়। আর হ্যাঁ, আপনার রেমুনারেশন নিয়ে ভাববেন না।
তুই কবে থেকে কাজ শুরু করতে চাইছিস? বাচ্চুদা জিগ্যেস করে।
কাল সকাল থেকেই। মিঃ আলম, আপনি আপনার শালার সঙ্গে কথা বলে দেখুন, যদি কাল থেকেই প্রণয়কে দায়িত্ব দেওয়া যায়। তাহলে রাতে আমরা কথা বলে নিয়ে, কাল একসঙ্গেই চলে আসব।
ও.কে., ও.কে.। আই অ্যাম ট্রাইং মাই বেস্ট। উইশ ইউ গুড লাক।
মিঃ আলম লাইনটা কেটে দেওয়ার পর দিগন্ত বলে, বাচ্চুদা এবার কিন্তু আমাকে বেরোতে হবে। আটটা বেজে গেছে। কিন্তু বেরোনোর আগে, তুমি আমাকে একটু মনে করে বলো, কাল যখন ঘটনাটা ঘটল, তখন কারা অফিসে ছিল। অন্তত, তুমি যাদের দেখেছ বা ছিল জানো।
একটু চিন্তা করে বাচ্চুদা বলল, নীচের তলায় প্রায় কেউই ছিল না। কারণ, আমি যখন সুবলবাবুর ঘরে যাচ্ছি, তখনই দেখেছিলাম, সব ঘরে তালা লাগানো হয়ে গেছে। দোতলায় সায়েন্টিস্টদের মধ্যে আমরা চারজন, মানে আমি, শঙ্কর, প্রদীপ আর সুব্রত ছিলাম। আমাদের ছয়জন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে। তার মধ্যে দুজন কাল আসেনি। পরিতোষ আগে বেরিয়ে গেছিল। মহিম আর সুদীপ ছিল। বেয়ারাদের সবারই বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কেউ ছিল কিনা খোঁজ নিয়ে জানতে হবে। এদিকে লক্ষ্মণ ছিল। প্রতীক ছিল। আমাদের যে চা দিল সেই নকুড় ছিল…ও না, না, নকুড় ছিল না। ও ছুটি নিয়েছিল। আর ও হ্যাঁ, কাল আমাদের নানারকম কেমিক্যাল যারা সাপ্লাই করে, তাদের কোম্পানির একটি ছেলে এসেছিল। আগেরবার যে জিনিস দিয়েছিল, সেগুলো আমাদের পছন্দ হয়নি। তাই নতুন স্যাম্পেল নিয়ে এসেছিল।
তোমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল?
হ্যাঁ। আমি যখন ফিরছি, তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মণের সঙ্গে কথা বলছিল। লক্ষ্মণ বলল, স্যাম্পেলগুলো ঘরে টেবিলে রাখা আছে। ছেলেটি অপেক্ষা করছে আমার সঙ্গে কথা বলবে বলে। আমি ওকে দাঁড়াতে বলে ভিতরে ঢুকলাম। কিন্তু তারপর খামটা খুঁজে না পেয়ে এমন অবস্থা হল যে ওর কথা ভুলেই গেছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন আবার লক্ষ্মণ এসে বলল, যে ছেলেটি তখনও বসে আছে, তখন আমি বলে দিলাম, দু-চারদিন পরে এসে কথা বলতে।
তার মানে সুব্রতবাবু আর প্রদীপবাবু ছাড়া ওই লোকটাও তোমার ঘরে ঢুকেছিল?
হ্যাঁ, ঠিকই। তবে এই লোকটা একলা ঢোকেনি। লক্ষ্মণ ওকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকেছিল। সেরকমই নিয়ম। আমি না থাকলে যদি কেউ কিছু দিতে আসে, তাহলে লক্ষ্মণ তাকে সঙ্গে নিয়ে ভিতরে ঢোকে। এই কেমিক্যালগুলো বেশ দামি আর কয়েকটা বিপজ্জনকও। তাই এগুলোকে বাইরে রাখা যায় না।
সুব্রতবাবু কিংবা প্রদীপবাবুর ক্ষেত্রে লক্ষ্মণ সঙ্গে ঢুকবে না?
না, তা তো ঢুকবেই না। ওদের বলতে পারিস আমার ঘরে অবারিত দ্বার। সুতরাং লক্ষ্মণের সঙ্গে আসার প্রশ্নই ওঠে না।
ঠিক আছে, চলো এখন ওঠা যাক। যদি কিছু মনে হয়, রাতে তোমাকে ফোন করব।
জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে দুজনে বেরোয় ঘর থেকে। বাচ্চুদা ঘরে তালা লাগিয়ে, লক্ষ্মণকে বলে সিকিওরিটিকে ডেকে কোলাপসিবল লাগিয়ে দিতে। গেটের কাছে দুজনকেই আপাদমস্তক চেকিং করে মোবাইল ফেরত দেওয়া হয়। বাচ্চুদার গাড়ি আছে। নিজেই ড্রাইভ করেন। থাকেন কেয়াতলায়। পার্কিং স্পেস থেকে গাড়িটা বার করতে করতে বাচ্চুদা বলে, তোকে হাজরা মোড়ে নামিয়ে দিচ্ছি। তাহলে আর অসুবিধা হবে না।
তুমি আবার উলটোদিকে যাবে কেন?
কিছু অসুবিধা নেই, চল না।
অফিসের চওড়া গেটটা খুলে দিয়ে সেলাম করে দারোয়ান। গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে ডানদিকে বাঁক নেয় বাচ্চুদা। ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসেছে দিগন্ত। বাঁ-দিকের সাইড মিরারে চোখ পড়তে দিগন্ত দেখে একটা মোটরসাইকেল আসছে ঠিক পিছনে। চালকের মুখ হেলমেটে ঢাকা। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড থেকে বেরিয়ে রিচি রোড ধরে বাচ্চুদা। তারপর ডানদিকে ঘুরে হাজরা রোডে ওঠে। ইতিমধ্যে দুবার সিগন্যালে দাঁড়াতে হয়েছে। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও প্রচুর। কিন্তু দিগন্ত বুঝতে পারে হেলমেট পরা বাইকচালক তাদের গাড়ি থেকে ঠিক একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে রয়েছে। হাজরা মোড়ে দিগন্তকে নামিয়ে দিয়ে বাঁ-দিকে বেঁকে রাসবিহারীর দিকে চলে যায় বাচ্চুদা। দিগন্তর বাড়ি বসন্ত বোস রোডে। এখান থেকে হেঁটে মিনিট পাঁচ-সাত। গাড়ি থেকে নেমে দিগন্ত একটা দোকানে ঢুকে চা, বিস্কিট, প্যাকেটের কুচো নিমকি কেনে। পয়সা দিয়ে মিনিট দশেক পরে বেরিয়ে দেখে একটু দূরে রাস্তার মুখে বাইকটা দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো দেখতে চায় কোন বাড়িটায় সে ঢোকে।
১৬এ বসন্ত বোস রোডের বাড়িটা দিগন্তর নিজস্ব। আসলে বাড়িটা ছিল তার কাকার। স্কুলের পর, কলকাতায় নিঃসন্তান কাকার কাছে থেকেই পড়াশোনা করেছে দিগন্ত। কাকিমা মারা যান, দিগন্ত যখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তার কয়েক বছর পর কাকারও মৃত্যু হয়। বাড়িটা কাকা দিগন্তকেই লিখে দিয়ে গেছিলেন। দোতলা বাড়ি। নীচের তলায় কয়েকটা দোকানঘর। ওপরে দিগন্তদের থাকার ব্যবস্থা।
দিগন্ত বেল বাজানোয়, অঞ্জলি নেমে এসে দরজা খুলে দিয়ে একটু অবাক হয়ে তাকায়। অঞ্জলির মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বুঝে একটু অপ্রস্তুত হয় দিগন্ত। আসলে ঘরের চাবি তাদের দুজনের কাছেই থাকে। বেল বাজানোর দরকার পড়ে না। আজ ওই অচেনা বাইক আরোহীর দিকে নজর রাখতে গিয়ে চাবির কথাটা ভুলে গেছিল দিগন্ত। অঞ্জলি একটু হেসে বলে, খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। বাচ্চুদার ব্যাপারটা কি খুব সিরিয়াস?
সিরিয়াস তো বটেই, তবে আগে যতটা মনে হচ্ছিল এখন তার থেকেও বেশি মনে হচ্ছে।
হেঁয়ালি কোরো না। ঠিক করে বলো, কী হয়েছে।
বলছি, আগে একটু স্নান করে আসি। বড্ড গরম লাগছে।
স্নানের ঘরে ঢুকে মাথার ওপর ঠান্ডা জলের শাওয়ার খুলে দিয়ে অবশ্য দিগন্ত ঠিক করে ফেলে বাইকের ব্যাপারটা এখনই অঞ্জলি কিংবা বাচ্চুদাকে বলবে না। ওদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই।
স্নান সেরে বাইরে বেরোতে না বেরোতেই প্রণয়ের ফোন।
হোসেনভাই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কীসব গুরুতর ব্যাপার ঘটেছে। আমাকে বললেন তোর সঙ্গে ইমিডিয়েটলি যোগাযোগ করতে। কী হয়েছে রে দিনু? কালও তো কথা হল, কিছু বললি না তো!
তখনও কি জানি, যে বলব। বাচ্চুদাকে তো তুই চিনিস। অঞ্জলির দাদা রে। আমাদের বাড়ির সব অনুষ্ঠানেই আসে…
চিনব না কেন। বেশ হাসিখুশি ভদ্রলোক তো। সাউথের দিকে থাকেন।
হ্যাঁ, সেই বাচ্চুদার অফিসে একটা সিরিয়াস গণ্ডগোল হয়েছে। বাচ্চুদার বস হচ্ছে আবার তোদের হোসেনভাইয়ের ভগ্নিপতি। সেই সূত্রেই ওনার কানে কথাটা গেছে। কিন্তু এভাবে ফোনে সবকিছু বলা যাবে না রে প্রণয়। তুই আজ একবার আসতে পারবি?
আমি আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছাচ্ছি।
খেতে বসে, দিগন্ত বাচ্চুদার কাছে যা শুনেছিল, প্রায় সবটাই প্রণয়কে বলল। অঞ্জলিও খুব মন দিয়ে শুনল সবটাই। খাওয়ার পর দুই বন্ধুতে গিয়ে বসল বারান্দায়। দিগন্ত বলল, খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করতে হবে রে প্রণয়। আমার মনে হয় কালই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দেওয়া দরকার। এমনিতেই হাতে সময় মাত্র নয় দিন।
কীভাবে এগোবি ভাবছিস? প্রণয় জিগ্যেস করে।
প্রথমত সেদিন ওই সময় যারা যারা ওই বাড়িতে ছিল, তাদের সবার সঙ্গে কথা বলব। তারপর সিসিটিভি ফুটেজগুলো খুঁটিয়ে দেখতে হবে। সিকিউরিটির সঙ্গেও কথা বলে নেব। যদি প্রয়োজন মনে হয়, তাহলে একটা সার্চ অপারেশন চালাতে হবে। বিশেষ করে দোতলার ঘরগুলোতে। সেটা কীভাবে করা হবে, সেটা বাচ্চুদার সঙ্গে কথা বলে ঠিক করব।
বেশ, ঠিক আছে। কাল ক’টা নাগাদ যাবি ভাবছিস?
ওদের অফিস শুরু হয় সাড়ে দশটা থেকে। আমরা এগারোটা নাগাদ পৌঁছে যাব। আচ্ছা শোন, বেসিক প্রশ্নগুলো তুই করবি। আমি মাঝে মাঝে ইন্টারভিন করব।
অসুবিধা নেই।
খাওয়ার পর অঞ্জলি নিজের ঘরে বসে কাজকর্ম করছিল। সেদিকটা একবার দেখে নিয়ে একটু নীচু গলায় দিগন্ত বলল, ব্যাপারটা একটু সিরিয়াস মনে হচ্ছে রে। আজ নিউ লাইফের অফিস থেকে বাচ্চুদার সঙ্গে গাড়ি করে ফিরছিলাম। ওদের অফিসের গলি থেকেই একটা লোক বাইক নিয়ে ফলো করছিল। আমি হাজরা মোড়ে নেমে হেঁটে এলাম। লোকটা আমার পিছন পিছন বাড়ি পর্যন্ত এল, তারপর বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল।
সেকি রে। তোর বাড়ির সামনে একটা প্লেন ড্রেস পুলিশ পোস্টিং করিয়ে দেব?
মোটেই করবি না। বরং এটা থেকে আমার বিশ্বাস বাড়ল যে জিনিসটা এখনও যারা চাইছে, তারা হাতে পায়নি। পেয়ে গেলে, নিউ লাইফে কে আসছে না আসছে তা নিয়ে মাথা ঘামাত না। প্রথমে আমি ভাবছিলাম তোকে বলব, ওদের বিল্ডিংটার চারপাশে একটা কড়া পুলিশ পাহারা রাখতে। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম সেটা করাটা ঠিক হবে না। বরং বাচ্চুদাকে বলে দেব, ওদের যে নিজস্ব সিকিউরিটি, তারা যেন যথেষ্ট অ্যালার্ট থাকে।
প্রণয় বেরোল প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ। তারপর, বাচ্চুদাকে একটা ফোন করল দিগন্ত। বাচ্চুদা জেগেই ছিল। একটা রিং হতেই ধরল। দিগন্ত একটু হেসে বলল, খুবই টেনশনে আছ বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু না ঘুমোলে টেনশন বাড়বে বই কমবে না।
না রে, টেনশন আছে ঠিকই, তবে আমি এমনিতেও বারোটার আগে শুতে যাই না। একটু বই-টই পড়ি। গান শুনি। কী জন্য ফোন করেছিস বল?
শোনো, প্রণয় এসেছিল। কথাবার্তা হয়ে গেছে। আমরা কাল এগারোটা নাগাদ তোমার অফিসে যাব। সেদিন তোমার টেবিলে রিপোর্ট রাখার সময় যারা যারা অফিসে ছিল, বিশেষত দোতলায়, তাদের সবার সঙ্গেই কথা বলব। তবে প্রথমে কথা বলব তাদের সঙ্গে যারা ওই সময়ে তোমার ঘরে এসেছিলেন। আমি নামগুলো বলছি, তুমি মিলিয়ে নাও। যদি কাউকে বাদ দিয়ে থাকি, তাহলে বলবে। প্রথম হল শঙ্করবাবু, যিনি রিপোর্ট দিতে এসেছেন। এ ছাড়া প্রদীপবাবু আর সুব্রতবাবু আর ওই স্যাম্পেল দিতে যে ছেলেটি এসেছিল সে। এ ছাড়া অবশ্যই লক্ষ্মণ, কারণ সে আলাদা ভাবে কোনও সময় ওঘরে ঢুকেছে কিনা কারুর জানা নেই।
একদম ঠিক বলেছিস।
এরমধ্যে ওই স্যাম্পেল দিতে যে ছেলেটি এসেছিল, তাকে আমি আপাতত বাদ রাখছি। কারণ খামটা যে তোমার টেবিলে রাখা আছে, সেটা জানার সম্ভাবনা ওর সবথেকে কম। তা ছাড়া ও তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল। সাধারণত লোকে চোরাই মাল নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে সেটা হয়নি। তাই আপাতত ও বাদ থাক, পরে প্রয়োজন মনে হলে ডেকে পাঠানো যাবে। বাকি চারজনের সঙ্গে আমি কথা বলব। প্রত্যেকে যাতে কাল অফিসে আসে, সেটা তুমি বলে রেখো। আর শোনো, তোমার অফিস বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটিকে বলে দাও যেন নজরদারি ঠিকঠাক রাখে। কোনওরকম ট্রেসপাসিংয়ের চেষ্টা হলে মানে কোনও ছিঁচকে চোর ঢোকার চেষ্টা করছে বুঝলে সঙ্গে সঙ্গে যেন তোমাকে খবর দেয়। তাহলে পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। আর একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করব ভাবছিলাম, তুমি যে আমার সঙ্গে কথা বলছ, সেটা মিঃ আলম ছাড়া আর কারুর সঙ্গে আলোচনা করেছিলে?
একেবারেই না। প্রশ্নই ওঠে না।
ঠিক আছে। এখন তাহলে শুয়ে পড়ো, কাল সকালে দেখা হচ্ছে। ও শোনো, তোমাদের সিকিউরিটিকে বলে রেখো যে আমরা পুলিশের লোক। আমাদের যেন মোবাইল নিয়ে ঢুকতে দেয়। না হলে মুশকিলে পড়ব। কথাবার্তা সব রেকর্ড করতে হবে।
প্রণয় আর দিগন্ত যখন নিউ লাইফের অফিসে পৌঁছোল, ঘড়িতে তখন প্রায় সোয়া এগারোটা। সিকিউরিটিকে বলা ছিল। তারা দুজনকেই আপাদমস্তক চেক করল ঠিকই, কিন্তু মোবাইল নিয়ে কোনও আপত্তি তুলল না। বাচ্চুদা নিজের ঘরেই ছিল। দুজনে দোতলায় উঠে, সেই ঘরে পৌঁছোতে, লক্ষ্মণ শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে, তাদের ভিতরে যেতে বলল। বোঝাই গেল বাচ্চুদা বলে রেখেছে। নকুড়কেও বলা ছিল। সে-ও চা দিয়ে গেল তিন কাপ। বাচ্চুদা বলল, আমি চারজনকেই বলে রেখেছি। তোরা শুরু করতে পারিস।
কিন্তু এই ঘরে কথা বললে তো তোমার অসুবিধা হবে?
এখানে কথা বলা যাবে না। আমার কাছে নানারকম লোকজন আসে। তা ছাড়া ফোন আসবে। তোদের অসুবিধা হবে। ওপাশে আমাদের একটা কনফারেন্স রুম আছে। সেখানে বসে কথা বলবি। যেরকম বলবি, সেইরকমভাবে একজন একজন করে যাবে।
বাচ্চুদা আপনি আমাদের কী পরিচয় দিয়েছেন? প্রণয় জানতে চায়।
পুলিশই বলেছি। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার।
কী জন্য এসেছি, সেটাও ওঁরা জানেন তো?
শঙ্কর, প্রদীপ আর সুব্রত সবটাই জানে। লক্ষ্মণ শুধু জানে, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাগজ চুরি হয়েছে। অফিসের অন্য স্টাফরাও সেটাই জানে। ও হ্যাঁ, দিগন্তর সঙ্গে যে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আছে সেটা আমি কাউকে বলিনি।
কনফারেন্স রুমটা একটু লম্বাটে ধরনের। মাঝখানে একটা মস্ত আয়তাকার টেবিল। তার একেক পাশে গোটা দশেক করে চেয়ার রাখা। নীল পর্দা ঝোলানো জানলা বন্ধ। এয়ারকন্ডিশন মেশিন চলছে। ফলে গোটা ঘরে একটা হালকা শীতল ভাব। প্রথমে শঙ্করবাবুকে পাঠাতে হবে জেনে নিয়ে, বাচ্চুদা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর দিগন্ত বলল, এক কাজ করা যাক, এপাশের দুটো চেয়ারে আমরা বসি। চওড়ার দিকে একটা চেয়ার রেখে দিচ্ছি, সেখানে শঙ্করবাবু বসবেন। টেবিলের উলটোদিকে বসলে ভালো করে কথাও শুনতে পাব না, মুখের এক্সপ্রেশনও দেখতে পাব না। অসুবিধা হবে।
সেইমতো টেবিল-চেয়ার সাজিয়ে-গুছিয়ে বসে, মোবাইলের টেপ রেকর্ডার অন করার পরই শঙ্করবাবু এসে পড়লেন। শঙ্কর নাগের বয়স বাচ্চুদারই কাছাকাছি। চেহারায় বৈজ্ঞানিকসুলভ কোনও আলুথালু ভাব নেই মোটেই। বরং বেশ শক্তপোক্ত কাঠামো। লম্বায় খুব বেশি না হলেও চওড়া কাঁধ। হাতের কবজি এবং পাঞ্জাও যথেষ্ট চওড়া। চোখে-মুখে বুদ্ধির ছাপ রয়েছে। মাথার চুল কাঁচা-পাকায় মেশানো। সুতির সাধারণ শার্ট-ট্রাউজারস পরেছেন। পরিচ্ছন্ন। তবে শৌখিনতার কোনও ছাপ নেই। ভদ্রলোক যে দুশ্চিন্তায় আছেন, সেটা বোঝা যাচ্ছে।
প্রণয় তার স্বাভাবিক ভারী গলায় বলে, বসুন মিঃ নাগ। আপনি নিশ্চয় সবটাই শুনেছেন, মানে আমরা কেন এসেছি সেটা জানেন। যেহেতু আপনিই রিপোর্টটা মিঃ মিত্রর টেবিলে রেখে এসেছিলেন, তাই আমরা আপনার সঙ্গেই প্রথমে কথা বলব ঠিক করলাম। আমরা যা প্রশ্ন করব, আপনি একটু ভেবে সঠিক উত্তর দেবেন, তাহলে আমাদের কাজটা এগিয়ে নিয়ে যেতে সুবিধা হবে।
শঙ্কর নাগ একটু নার্ভাসভাবে ঘাড় নাড়লেন। তারপর ঠোঁট চেটে চেয়ারে বসে বললেন, দেখুন, আমার তো কিছু করার নেই। আমি সেদিন রিপোর্টটা টেবিলে রেখেই বেরিয়ে গেছিলাম। তারপরে কী ঘটেছে সেটা আমার জানারও কথা নয়।
ঠিকই বলেছেন, কিন্তু তবু নিয়মমাফিক আপনার সঙ্গে কথা বলতেই হবে। আচ্ছা, মিঃ নাগ এই রিসার্চ ওয়ার্কটা তো আপনারা চারজনে মিলে করছেন। আপনি কি প্রথম থেকেই এটার সঙ্গে যুক্ত?
শঙ্কর নাগ ঘাড় নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, আমাদের চারজনকে নিয়েই একটা টিম তৈরি করা হয়েছিল। সন্দীপনদার লিডারশিপে আমরা কাজটা করছিলাম।
তার মানে, কাজের খুঁটিনাটি, কাজটা কীভাবে এগোচ্ছে, কতটা প্রোগ্রেস হল, এটা আপনারা চারজনই জানতেন, তাই তো?
শঙ্কর নাগকে ইতিবাচক ঘাড় নাড়তে দেখে, প্রণয় জিজ্ঞাসা করে, আচ্ছা মিঃ নাগ ভালো করে ভেবে বলুন তো, আর কারুর পক্ষে কি এটা জানা সম্ভব?
মিঃ আলম জানতেন। ওনাকে আমাদের প্রতি ছয়মাস অন্তর একটা রিপোর্ট পাঠাতে হয়। কিন্তু আর কারুর পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এখন দেখুন, নয়নতারা গাছ নিয়ে যে কাজ হচ্ছে, সেটা হয়তো এখানে যারা কাজ করে তাদের মধ্যে কারুর কারুর পক্ষে আন্দাজ করা সম্ভব। কিন্তু কী কাজ হচ্ছে সেটা জানা সম্ভব নয়। এমনিতেই এখানে যখন কোনও রিসার্চ হয়, তখন খবরটা গোপন রাখাই নিয়ম। আর এই কাজটা হচ্ছিল একটা আলাদা ল্যাবে। সেখানে আমরা চারজন আর দুজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাড়া কারুর ঢোকারই নিয়ম নেই। রিসার্চ উইংয়ে আরও কয়েকজন কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গেও আমরা কখনও এটা নিয়ে আলোচনা করতাম না। সেরকমই নির্দেশ ছিল।
আচ্ছা মিঃ নাগ, সেদিন আপনি যে রিপোর্টটা মিঃ মিত্রের টেবিলে রেখে এলেন, তার আগে-পরে কী হয়েছিল সেটা বলুন তো। খুঁটিনাটি কিছু বাদ দেবেন না।
শঙ্কর নাগ একটু ভেবে নিয়ে বললেন, দেখুন রিপোর্টটা যে আমি সেদিনই দেব সেটা আগে থেকেই মোটামুটি ঠিক ছিল। সন্দীপনদার সঙ্গে আমার সেরকমই কথাবার্তা হয়েছিল। কারণ আমি রিপোর্ট দিলে, তারপর উনি সেটা একবার চোখ বুলিয়ে মিঃ আলমের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। রিপোর্টের কপি রেডি করে বোর্ড মেম্বারদের কাছে পাঠাতে হবে। সেজন্য সময় লাগবে। ঠিকঠাক সব কিছু হতে গেলে সেদিনই রিপোর্টটা সন্দীপনদার কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল। অসুবিধাও কিছু ছিল না। কারণ কাজটা আমি করে ফেলেছিলাম। মামুলি দু-একটা কারেকশন বাকি ছিল। সেগুলোর প্রিন্ট আউট বার করে আমি সন্দীপনদাকে ফোন করেছিলাম।
মোবাইলেই ফোন করেছিলেন তো?
হ্যাঁ। মোবাইলেই ফোন করেছিলাম। সন্দীপনদা বললেন যে উনি অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে আছেন। ফিরতে একটু সময় লাগবে। তাই আমাকে বললেন রিপোর্টটা খামে ভরে টেবিলে রেখে যেতে।
আচ্ছা এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আপনি টেবিলে রেখে চলে যাওয়ার কথা ভাবলেন কেন? যতদূর আমি জানি, মিঃ মিত্রের তো অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে খুব বেশিক্ষণ থাকার কথা ছিল না।
প্রণয়ের প্রশ্ন শুনে শঙ্কর নাগ একটু সময় চুপ করে রইলেন। তারপর সামান্য ইতস্তত করে বললেন, আসলে সেদিন আমার ভাগ্নীর বিয়ে ছিল। তাই বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল। তবে কী জানেন, সেটাও হয়তো ঠিক কারণ নয়। সন্দীপনদার জন্য মিনিট পনেরো-কুড়ি অপেক্ষা করলে যে খুব দেরি হয়ে যেত তা নয়। আসলে এরকমটা যে হতে পারে সেটাই আমরা ভাবিনি। অফিসের ভিতর, ওনার ঘরে একটা খাম রেখে যাব। সেই খামে কী আছে কেউ জানে না। ঘরের সামনে সারাক্ষণ লক্ষ্মণ বসে আছে। অচেনা কারুর পক্ষে ঢোকাই সম্ভব নয়। সেখানে যে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে আমার মাথাতেই আসেনি। আমার মনে হয় সন্দীপনদাও ভাবেননি। তাহলে উনি নিজেই আমাকে বলতেন অপেক্ষা করতে।
কিন্তু মিঃ নাগ, যেদিন এই ঘটনাটা ঘটল মানে গত পরশু তো কোনও বিয়ের ডেট ছিল না। আপনার ভাগ্নীর কি হিন্দুমতে বিয়ে হয়নি?
দিগন্তর প্রশ্নটা ছিল প্রায় বন্দুকের গুলির মতো। শঙ্কর নাগ স্পষ্টতই হতচকিত হয়ে গেলেন। তবে তিনি যে যথেষ্ট ঠান্ডা মাথার মানুষ, তার প্রমাণ পাওয়া গেল তখনই। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, আসলে আমার বলতে একটু ভুল হয়ে গেছে। বিয়ে ঠিক নয়। রিসেপশন। বিয়ে মানে রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে আগেই। ঘরোয়া অনুষ্ঠানও হয়েছে। বর-কনে দু-পক্ষ মিলে একটা রিসেপশনের আয়োজন করেছিল। সেজন্যই দিন-টিন নিয়ে অতটা মাথা ঘামানো হয়নি।
একটু থেমে শঙ্করবাবু বললেন, আপনারা যদি চান, আমি আমার ভাগ্নীর বিয়ের কার্ডও দেখাতে পারি।
প্রণয় একটু হেসে বলল, ঠিক আছে। প্রয়োজন মনে হলে দেখব নিশ্চয়। এখন আপনি প্লিজ কনটিনিউ করুন।
হ্যাঁ। সন্দীপনদার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর আমি খামটা নিয়ে ওনার ঘরে আসি। লক্ষ্মণ দরজায় বসেছিল। আমি ভিতরে ঢুকে খামটা ওনার টেবিলে রেখে বেরিয়ে এসে লক্ষ্মণকে বলি, সাহেব আসলে বোলো, আমি খামটা রেখে গেছি। তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে যাই।
আপনি যখন খামটা নিয়ে আসছিলে, তখন করিডরে আপনার সঙ্গে কারুর দেখা হয়েছিল?
একটু ভেবে শঙ্কর নাগ বললেন, না, কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে হ্যাঁ ফেরার সময় দেখা হয়েছিল।
ফেরার সময় মানে, কোথায় ফেরার সময়?
প্রণয়ের গলার স্বরে সামান্য বিরক্তি। শঙ্কর নাগ কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বললেন, আমার ঘরে ফেরার সময়।
তার মানে আপনি খামটা রেখে সরাসরি নীচে নেমে যাননি? দিগন্তর গলার স্বর তীক্ষ্ন।
না, না। আমি নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ নিয়ে তারপর বেরিয়েছি।
আপনাদের দোতলা থেকে নামার সিঁড়ি কি একটাই?
না, দুটো সিঁড়ি আছে। আমাদের ল্যাবের পাশে আর একটা সিঁড়ি আছে। ওই সিঁড়ি দিয়েই সেদিন আমি নেমেছিলাম।
করিডরে আপনার সঙ্গে কার দেখা হয়েছিল শঙ্করবাবু?
প্রতীকের সঙ্গে। প্রতীক বাথরুম থেকে আসছিল।
কী করে বুঝলেন যে উনি বাথরুমেই ছিলেন?
না বোঝার তো কিছু নেই। আমাদের এই উইংটা যেখানে টার্ন নিয়েছে সেখানে একটা টয়লেট আছে। প্রতীক সেখান থেকেই বেরোল। আমার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হল। আমি হাসলাম, ও হাসল। তারপর চলে গেলাম।
আপনি নিজের ঘরে ফেরার পর কারুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
না, ঘরে কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে প্রদীপ আর সুব্রত দুজনেই তখনও ল্যাবে ছিল। তাই আমি বেরোনোর সময় ওদের বলে বেরিয়েছিলাম। ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টদের মধ্যে দুজন তখনও ছিল। তবে তাদের সঙ্গে আমার কোনও কথা হয়নি।
প্রদীপবাবু আর সুব্রতবাবু দুজনের সঙ্গেই দেখা হয়েছিল তখন?
আবার একটু ভেবে নিয়ে শঙ্করবাবু বললেন, না, সুব্রতর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। প্রদীপকে দেখতে পাইনি। আমি ভেবেছিলাম যে ও ভিতরের ঘরে আছে। কারণ ও যে বাড়ি চলে যায়নি, সেটা আমি জানতাম।
ওঁদের কারুর সঙ্গে আপনার রিপোর্ট নিয়ে কোনও কথা হয়নি?
না। কথা বলার সময়ও ছিল না। ইনফ্যাক্ট রিপোর্টটা যে আমি তৈরি করছি, সেটা ওরা জানত। কিন্তু সেদিনই যে রিপোর্টটা সন্দীপনদাকে দেব, সেটা ওদের কারুরই জানা ছিল না।
কেন বলুন তো?
কোনও কারণ ছিল না। প্রয়োজন হয়নি, তাই জানাইনি।
আচ্ছা, এই ঘটনায় আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?
দিগন্তর প্রশ্ন শুনে শঙ্করবাবু একটু চুপ করে থেকে, শান্তভাবে বললেন, দেখুন সন্দেহ করতে হলে, আমাদের চারজনকেই তো সন্দেহ করা উচিত। কারণ আমরা ছাড়া ঠিক কী কাজ হচ্ছে এবং সেটা কোন স্টেজে রয়েছে, জানা সম্ভব নয়। রিপোর্টটা যে রেডি হয়েছে, সেটাও আমরাই জানতাম। সুতরাং সন্দেহের তালিকায় আমরাই প্রথমে। তবে সকলেই উচ্চশিক্ষিত, গবেষক মানুষ। তাই এই ধরনের কথা ভাবাও কঠিন। যদিও লোভ বড় সাংঘাতিক জিনিস। এ ধরনের ঘটনা যে ঘটে না তা তো নয়। আমাদের অরগানাইজেশনে হয়তো হয়নি। কিন্তু অনেক জায়গাতেই হয়। আমাদের মতো লোকেরাই করে। তাই কী বলব বলুন? নিজের দিক থেকে শুধু এটুকুই বলতে পারি, আপনাদের তদন্তে আমি সবরকম সহযোগিতা করব।
আপনার তিন সহকর্মীর পারিবারিক পরিস্থিতি বা অবস্থা নিয়ে কিছু তথ্য দিতে পারেন? আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আপনি যা বলবেন সবই গোপন থাকবে।
যতটুকু জানি, সেটা তো বলতেই পারি। একসঙ্গে কাজ করলে কিছু কথাবার্তা তো হয়ই। প্রথমত ধরুন আমাদের ডিরেক্টর মানে সন্দীপন মিত্র। ওনার তো আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো। কেয়াতলায় নিজের ফ্ল্যাট। এ ছাড়া শান্তিনিকেতনে বছরখানেক আগে একটা বাংলো কিনেছেন। ছেলে বিদেশে পড়াশোনা করছে। স্ত্রী অধ্যাপনা করেন। তবে সম্প্রতি শেয়ারবাজারে সন্দীপনদার বেশ কয়েক লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। সেজন্য কয়েকদিন মনমরাও ছিলেন। কারণ আমাদের এখানে যেহেতু পেনশন নেই, তাই অবসর নেওয়ার পর যাতে আর্থিক সংগতি ঠিকঠাক থাকে সেজন্য আমরা চেষ্টা করে থাকি। সন্দীপনদাও সেই উদ্দেশেই শেয়ারে টাকা ঢেলেছিলেন, কিন্তু বাজার হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় ভালো ক্ষতি হয়েছে।
বেশ, এবার প্রদীপ বসু।
প্রদীপ একেবারেই মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে। উত্তর কলকাতায় পৈতৃক বাড়িতে থাকে। তবে সেই বাড়ির আরও বহু শরিক আছে। ও কলেজে পড়ার সময় বাবা ক্যানসারে মারা যান। চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছিল। তবে প্রদীপ ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। নিজের রেজাল্টের জোরেই মাস্টার্স করে চাকরি পেয়েছে, দুই বোনের বিয়ে দিয়েছে। প্রদীপের মা ওর সঙ্গেই থাকেন। প্রদীপের রোজগারেই সংসার চলে। তবে ওর স্ত্রী-ও একটা স্কুলে পড়ান।
শঙ্কর নাগকে থেমে যেতে দেখে দিগন্ত বলে, বাকি থাকলেন সুব্রত রায়?
সামান্য ইতস্তত করে শঙ্কর নাগ বললেন, দেখুন সুব্রত এমনিতে খুব ভালো ছেলে। হাসি-খুশি, ফুর্তিবাজ। ভালো ছাত্র ছিল। কাজকর্মে কোনও গাফিলতি নেই। যথেষ্ট পরোপকারী। কিন্তু ওর একটা মারাত্মক দোষ আছে, সেটা হল টাকা ধার করা। নিউ লাইফ আমাদের ভালো মাইনে দেয়। সুব্রতর বাবার নিজস্ব বড় ফ্ল্যাট আছে যাদবপুরে। সেখানেই ওরা স্বামী-স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে থাকে। বাবা-মা দুজনেই কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ছিলেন। মোটা পেনশন পান। সুব্রতকে শুধু মেয়ের পড়াশোনার খরচ ছাড়া সংসারে কিছু দিতে হয় না। স্ত্রী-ও একটা এনজিও-তে চাকরি করে। কিন্তু তবু প্রতি মাসে পনেরো-কুড়ি তারিখের পর থেকেই ওর ধার করা শুরু হয়ে যায়। অফিসের বেয়ারা-পিয়োন থেকে কেউ বাদ নেই, যার কাছে ও টাকা ধার করেছে। এমনিতে শৌখিন মানুষ ঠিকই। কিন্তু বিশেষ কোনও বদগুণ আছে বলেও কোনওদিন বুঝতে পারিনি। তাই টাকা যে ও কীভাবে খরচ করে তার হদিস দিতে পারব না।
সামান্য হেসে কথা শেষ করলেন শঙ্কর নাগ। তাঁর অপ্রস্তুত অবস্থাটা বুঝতে পেরে দিগন্ত আর প্রণয়ও মাথা নাড়ল। তারপর প্রণয় বলল, ঠিক আছে মিঃ নাগ, আপনি এখন যেতে পারেন। মিনিট পাঁচেক পরে প্রদীপবাবুকে পাঠিয়ে দেবেন। শঙ্কর নাগ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, প্রণয় দিগন্তকে জিজ্ঞাসা করল, বাচ্চুদা যে শেয়ারে লস করেছেন, সেটা তুই জানতিস?
বাচ্চুদা যে শেয়ারে ইনভেস্ট করে, তাই-ই তো জানতাম না। যদিও ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে বাচ্চুদার সঙ্গে আমার কখনও কোনও আলোচনা যে হয়নি, তাও নয়।
এই শঙ্কর নাগ ভদ্রলোককে তোর কেমন লাগল?
পারফেক্ট জেন্টলম্যান। তবে ভদ্রলোক যথেষ্ট বুদ্ধি ধরেন আর মাথাও ঠান্ডা।
দরজায় টোকা দেওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল, তার পরেই ঘরে ঢুকলেন প্রদীপ বসু। মাঝারি হাইট। ছিপছিপে গড়ন। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চেহারার মধ্যে একটা পড়ুয়া ভাব আছে। নেভি ব্লু পিন স্ট্রাইপ শার্ট আর ডিপ ব্লু ট্রাউজারস পরা।
নমস্কার, আমি প্রণয় বোস আর ও দিগন্ত দেব। আপনি প্লিজ এই চেয়ারটায় বসুন। উত্তরে নমস্কার জানিয়ে চেয়ারটা টেনে নেন প্রদীপবাবু। প্রণয় হাতের কাগজটা গুছিয়ে নিচ্ছে এমন সময় দিগন্ত হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে, প্রদীপবাবু, আপনার কি লেখালিখি করা অভ্যাস আছে?
দিগন্তর কথায় প্রথমটায় একটু চমকে ওঠেন প্রদীপ বসু তারপর রীতিমতো অপ্রস্তুতভাবে বলেন, হ্যাঁ, মানে ওই আর কী। অল্পবিস্তর। কিন্তু…কিন্তু…আপনি জানলেন কীভাবে? আমি তো লেখালিখি যেটুকু করি, তাও নিজের নামে নয়…তাহলে…
আসলে আপনার পকেট থেকে দুখানা ফাউন্টেন পেনের ক্যাপ মাথা উঁচিয়ে আছে। কিন্তু নিউ লাইফের গবেষণার ডাটা লিখতে তো আর পেন লাগে না। তবু যে অভ্যাসটা এখনও বজায় আছে, তার মানে পেনটা অন্য কোনও কাজে লাগে। ইঙ্গিত করছে লেখালিখির দিকে। আসলে আমার দু-চারজন লেখক বন্ধু আছে বুঝলেন তো। তাদের কাছে শুনেছি, লেখক কিংবা কবিরা নাকি এখনও বেশির ভাগই খাতা-কলমে লিখতেই ভালোবাসেন। কম্পিউটারে লেখালিখি তাঁদের পছন্দ নয়। কিন্তু আপনার ছদ্মনামটি কী জানতে পারি।
অশনি সংকেত।
অশনি…সংকেত…দাঁড়ান দাঁড়ান আপনার কি সম্প্রতি সৃষ্টিসুখ পত্রিকায় কোনও কবিতা বেরিয়েছে?
হ্যাঁ বেরিয়েছে। ফুলছাপ আলখাল্লা।
ঠিক ঠিক। আপনি তো মশাই দারুণ কবিতা লেখেন। আমি পড়ে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম।
আমিও রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি।
প্রদীপ বসুর কথা শুনে সামান্য ঘাবড়ে গিয়ে দিগন্ত বলে, কেন বলুন তো?
না, মানে আমি আগে কোনও দিন লিটল ম্যাগাজিনের কবিতা পড়া গোয়েন্দা পুলিশ দেখিনি।
প্রদীপবাবুর কথায় হো হো করে হেসে ওঠে প্রণয়, দিগন্ত দুজনেই। প্রদীপ বসু অবশ্য এবার একটু বিষণ্ণ স্বরেই বলেন, কবিতা লেখাটা আসলে আমার প্যাশন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে ভালো রেজাল্ট করে একটা ভদ্রস্থ চাকরি জোগাড় করা ছাড়া অন্য কোনও দিকে তাকানোর মতো সময়ই ছিল না। যেটুকু সময় পেতাম টিউশন করতাম। এখন পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তাই আবার শখটাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
কিছু কিছু শখকে প্রশ্রয় দেওয়াই উচিত। আপনার সঙ্গে পরে একদিন কবিতা নিয়ে বসা যাবে। আপাতত প্রণয় আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবে…
হ্যাঁ, প্রদীপবাবু আপনি তো পুরো বিষয়টাই নিশ্চয় জানেন। আপনাদের ফর্মূলেশনের রিপোর্টটা মিঃ নাগ সন্দীপনবাবুর টেবিলে রেখে গেছিলেন। তার পরে কি আপনি আপনাদের ডিরেক্টরের ঘরে গেছিলেন?
হ্যাঁ, গেছিলাম। স্যারের কাছে আমার একটা বই নেওয়ার ছিল। সকালে যখন ল্যাবে এসেছিলেন, তখনই বলেছিলেন যে বইটা টেবিলে রাখা আছে। যে-কোনও সময় গিয়ে নিয়ে আসতে। সেজন্যই বইটা নিতে গেছিলাম।
কিন্তু প্রদীপবাবু, আপনি কী করে বুঝলেন যে তার আগেই মিঃ নাগ রিপোর্টটা ডিরেক্টরের টেবিলে রেখে এসেছেন?
তখন বুঝিনি তো। পরে বুঝলাম। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গলায় বললেন প্রদীপ বসু, শঙ্করদা যে স্যারের ঘরে গেছেন, সেটা আমি জানতাম না।
রিপোর্ট যে তৈরি হয়েছে সেটা জানতেন?
রিপোর্ট যে শঙ্করদা লিখছেন, সেটা নিশ্চয় জানতাম। কিন্তু কখন শেষ হল এবং কখন উনি সেটা স্যারকে দেবেন ঠিক হয়েছে, সেটা আমার জানা ছিল না।
তাহলে আপনি কী করে বুঝলেন যে উনি রিপোর্টটা রেখে আসার পর আপনি ওঘরে গেছিলেন? প্রণয়ের গলার স্বর ঈষৎ কঠিন।
প্রদীপ বসু কিন্তু সম্পূর্ণ শান্তভাবে বললেন, আমি আপনাকে বুঝিয়ে বলছি। সেদিন আসলে আমার এক বন্ধু এসেছিল। তার সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পর আমি ওকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেছিলাম। যখন ফিরে লনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, তখন দেখলাম দোতলায় শঙ্করদা স্যারের ঘরের দিক থেকে আসছেন। ইনফ্যাক্ট ওনাকে দেখেই আমার মনে পড়ল যে বইটা আনতে যেতে হবে। তারপর অবশ্য আমি ওপরে এসে টয়লেটে গেছিলাম। মাঝখানে একটা ফোনও এসেছিল। মোটামুটি আরও মিনিট দশেক পরে আমি স্যারের ঘরে গেছিলাম বইটা আনতে। পরে সব কথা শুনে বুঝলাম যে শঙ্করদা রিপোর্টটা দিতেই গেছিলেন।
বইটা পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, টেবিলের ওপরেই রাখা ছিল। আমি নিয়ে তখনই বেরিয়ে চলে এসেছি।
রিপোর্টের খামটা কি তখন টেবিলে ছিল?
দেখুন ডিরেক্টরের টেবিলে অজস্র কাগজপত্র, খাম থাকে। কোনটা কীসের খাম বোঝা সম্ভব নয়।
আচ্ছা প্রদীপবাবু, মিঃ মিত্রের ঘরে ঢোকার সময় আপনার সঙ্গে লক্ষ্মণের কোনও কথা হয়েছিল?
হ্যাঁ, হয়েছিল তো। আমার সঙ্গে এমনিতেই বেয়ারা-পিয়োনদের সম্পর্ক খুব ভালো। নিজে গরিব ঘরের ছেলে তো, তাই বোধহয় ওদের কথাবার্তা শুনতে ভালো লাগে। লক্ষ্মণের একটি মেয়ে আছে। সে এবার মাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। তার ভর্তি নিয়েই কথা হচ্ছিল।
কতক্ষণ কথা বলেছিলেন মনে আছে?
তা, মিনিট দশেক তো হবেই। আসলে আমি যখন স্যারের ঘরের দিকে আসছিলাম, তখন লক্ষ্মণ ওর চেয়ারে ছিল না। আমি দরজা খুলে ঢুকতে যাচ্ছি, তখন দেখি লক্ষ্মণ আমাকে দেখে সিঁড়ির ওপাশ থেকে তাড়াহুড়ো করে আসছে। আমিও দাঁড়ালাম। ওর সঙ্গে কথাবার্তা হল। তারপর বইটা নিয়ে চলে এলাম।
আচ্ছা আপনি যখন ঘরে ঢুকলেন, তখন অস্বাভাবিক কোনও কিছু আপনার মনে হয়েছিল কিংবা চোখে পড়েছিল?
প্রদীপ বসু একটু চিন্তা করে বললেন, না, অস্বাভাবিক কিছু তো চোখে পড়েনি। তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপার একটু অন্যরকম লেগেছিল…আসলে আমাদের স্যারের একটু গরম বাতিক আছে। সেজন্য সারাক্ষণ জোরে এসি চলে। আমাদের তো ঘরে ঢুকলে রীতিমতো ঠান্ডা লাগে। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল, ঘরটা যেন তুলনায় একটু গরম। কনকনে ভাবটা তেমন নেই।
আপনি কি ঘরের দরজা খুলে লক্ষ্মণের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
না, না। আমি দরজাটা খুলেছিলাম ঠিকই। কিন্তু লক্ষ্মণ এসে পড়ায়, দরজা টেনে দিয়েই ওর সঙ্গে কথা বলছিলাম। কথা শেষ হলে আবার ভিতরে ঢুকি।
মিঃ মিত্র তো তখন ঘরে ছিলেন না, উনি এসি বন্ধ করে যাননি তো?
না, এসি চলছিল। সেজন্যই একটু অদ্ভুত লেগেছিল।
বই নিয়ে যখন বেরোলেন, তখন কারুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
প্রদীপ বসু একটু চিন্তা করে বললেন, একটি ছেলে আমাদের নানারকম কেমিক্যাল সাপ্লাই করে। সেই ছেলেটি তখন লক্ষ্মণের সঙ্গে কথা বলছিল। যতদূর মনে পড়ছে, ও স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চাইছিল। লক্ষ্মণ ওকে বলছিল, অপেক্ষা করতে হবে, স্যার অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে গেছেন, ফিরলে কথা বলতে পারবে। ওদের কথার মাঝখানেই আমি বেরিয়ে এসেছিলাম। করিডরে আর কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। ল্যাবে ফিরে সুব্রতর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। শঙ্করদা তখন বেরিয়ে গেছেন। আমাদের দুই ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট মহিম আর সুদীপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
রিপোর্টটা যে মিসিং, সেই খবরটা আপনি কখন জানতে পারলেন?
বেশ খানিকক্ষণ পরে। সেদিন আসলে কয়েকটা কাজ আমার শেষ করে যাওয়ার কথা ছিল। তাই ল্যাবে ঢুকে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। সুব্রতও নিজের টেবিলে বসে কাজ করছিল। এমন সময় মহিম, মানে আমাদের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোন করে জানাল যে ওদের নাকি বেরোনোর সময় সাংঘাতিক কড়া চেকিং হয়েছে। মোবাইলের মেসেজ বক্স, গ্যালারি, অ্যাপস সব চেক করা হয়েছে। সেটা শুনে আমি বেশ একটু আশ্চর্য হয়ে সুব্রতকে কথাটা বলি। কিন্তু সুব্রতও কিছু জানত না। তাই ব্যাপারটা স্যারকে জানানোর জন্য ফোন করেছিলাম। তখন উনি আমাদের বললেন যে, কী ঘটেছে।
ফোন কি মোবাইলে করেছিলেন?
না, ল্যান্ডলাইনে করেছিলাম। ওনার এক্সটেনশন নম্বরে।
অফিসে থাকলে আপনারা কি ওনাকে ল্যান্ডলাইনেই ফোন করেন?
সাধারণত। বিশেষ করে উনি ঘরে আছেন জানলে, তাই-ই করি।
বেশ, তারপর?
তারপর আমরা দুজনেই ওনার ঘরে এলাম। বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা হল। কিন্তু কোনও ক্লু-ই পাওয়া গেল না। এরমধ্যে শঙ্করদার সঙ্গেও স্যারের ফোনে কথা হল। তারপর প্রায় আটটা নাগাদ আমরা দুজন বেরোলাম। বেরোনোর আগে অবশ্য একবার নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম।
এতক্ষণ সব প্রশ্নই প্রণয় করছিল। দিগন্ত খুব মন দিয়ে শুধু শুনছিল। এবার সে একটু নড়েচড়ে বসে বলল, আমার দুটো জিনিস জানার আছে প্রদীপবাবু। প্রথমত আপনি তো বললেন বইটা টেবিলে রাখা ছিল। বইটা টেবিলের ঠিক কোথায় রাখা ছিল, আপনার মনে আছে?
হ্যাঁ। ডানদিকে। মানে আপনি যখন ঘরে ঢুকলেন, তখন আপনার কাছে টেবিলের যেটা ডানদিক সেখানে। তবে একেবারে সামনেই রাখা ছিল। স্যার মনে হয়, আমি নিতে যাব বলে সামনেই রেখেছিলেন।
ও.কে.। দ্বিতীয়ত, আপনি ঘরে ফিরে যাওয়ার পর সুব্রতবাবু আর আপনি কি সারাক্ষণ একসঙ্গে ছিলেন?
হ্যাঁ, তা তো ছিলাম…না, না, সুব্রত মাঝখানে একবার নিজের ঘরে গেছিল। মিনিট দশেক পরে ফিরে এল।
উনি কি তাহলে সেই সময়েই ডিরেক্টরের ঘরে গেছিলেন?
সুব্রত স্যারের ঘরে গেছিল নাকি? জানি না তো! প্রদীপবাবুর গলায় সত্যিকারের বিস্ময়, পরে তো অনেক রকম কথা হল। একবারও বলেনি তো!
আপনাকে কেন বলেননি জানি না। তবে যে সময়টা মিঃ মিত্র অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে ছিলেন, সেই সময়ের মধ্যে আপনারা তিনজন ওনার ঘরে গেছিলেন। আপনি, শঙ্করবাবু আর সুব্রতবাবু। আর বাইরের লোকের মধ্যে ওই কেমিক্যাল সাপ্লাই দেওয়ার যে ছেলেটির কথা আপনি বলছেন। তবে সে একা ঢোকেনি। লক্ষ্মণ ওর সঙ্গে ছিল।
প্রদীপবাবু চুপ করে রইলেন। তবে তাঁর মুখচোখে একটা অস্বস্তির চিহ্ন ফুটে উঠল। তাঁকে সামলাতে একটু সময় দিয়ে দিগন্ত বলল, আচ্ছা এই সুব্রতবাবু লোকটি কেমন বলুন তো?
এমনিতে খারাপ নয়। তবে একটু বাবুয়ানি আছে। ভালো থাকতে, ভালো খেতে-পরতে ভালোবাসে।
আপনাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
আমার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। আসলে আমি নিজে হয়তো পেরে উঠি না, কিন্তু কেউ যদি অন্যের ক্ষতি না করে বিলাসিতা করতে ভালোবাসে, তাহলে আমার খারাপ লাগে না। তবে শঙ্করদা বেশ মিতব্যয়ী মানুষ। ওঁর সঙ্গে সুব্রতর মাঝেমধ্যেই টুকটাক লাগে। যদিও সম্পর্ক খারাপ বলব না। শঙ্করদা সুব্রতর ভালোর জন্যই বলেন। তা ছাড়া সুব্রত পরিশ্রমী ছেলে। নিজের কাজটা খুব ভালো বোঝে। ডেডিকেশনও আছে। ওকে অন্য কোম্পানি থেকে বেশি মাইনে দিয়ে ডেকেছিল, সুব্রত যেতে রাজি হয়নি।
দিগন্ত এবার টেপরেকর্ডারের সুইচটা অফ করে বলে, ঠিক আছে। আপাতত এই পর্যন্তই থাক। আপনি গিয়ে মিনিট পাঁচেক পরে সুব্রতবাবুকে পাঠিয়ে দিন।
প্রদীপবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর, প্রণয় বলে, এই সুব্রত রায় লোকটা ইন্টারেস্টিং হবে মনে হচ্ছে। যেরকম শোনা যাচ্ছে, তাতে এর টাকার দরকার বেশি।
দামি আফটার শেভের সুগন্ধ নাকে আসতে, কথা থামিয়ে দেয় প্রণয়। ভিতরে ঢুকে নমস্কার করে চেয়ারে বসেন সুব্রত রায়। বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়। অফ হোয়াইট রঙের লিনেনের শার্ট। সঙ্গে ব্রাউন রঙের ম্যাচিং ট্রাউজারস। মানানসই জুতো। টকটকে ফর্সা রং। লম্বায় প্রায় ছয় ফিটের কাছাকাছি। সুব্রত রায় এককথায় রীতিমতো হ্যান্ডসাম পুরুষ। তিনি যে বেশ শৌখিন মানুষ, সেটাও তাঁকে দেখলে বোঝা যায়। তবে দেখতে সুন্দর হলেও সুব্রত রায়ের ঠোঁটের ভাঁজে, তাকানোর ভঙ্গিতে একটা প্রচ্ছন্ন অহমিকা আছে।
প্রাথমিক আলাপের পর প্রশ্ন করতে শুরু করে প্রণয়, আচ্ছা সুব্রতবাবু, এই চুরির ঘটনায় আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?
হ্যাঁ, তা তো হয়ই। আমার ধারণা, চুরিটা ওই ব্যাটা লক্ষ্মণ করেছে।
সুব্রত রায়ের কথা শুনে ভুরু কুঁচকে যায় দিগন্তর। প্রণয়ও ঈষৎ কঠিন সুরেই বলে, আপনার এরকম মনে হওয়ার পিছনে কি কোনও কারণ আছে, নাকি সবটাই শুধুমাত্র অনুমান?
অনুমান তো নিশ্চয়। কিন্তু আমরা তো বৈজ্ঞানিক। আমাদের অনুমানের পিছনে নির্দিষ্ট কারণ থাকে।
কারণগুলো জানতে পারি কি?
হ্যাঁ, নিশ্চয়। কারণগুলো খুবই স্পষ্ট। একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন, শঙ্করদা টেবিলে খামটা রেখে যাওয়ার পর, সেটা নিয়ে নেওয়ার সুযোগ ওর সবথেকে বেশি। কারণ ও সারাক্ষণ দরজার সামনে বসে আছে। আমরা যে কেউ ভিতরে গেলে ও দেখতে পাবে। কিন্তু ওকে দেখার কেউ নেই। সট করে ভিতরে ঢুকে জিনিসটা হাতিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলে কেউ জানতেও পারবে না। তারপর যথাযোগ্য জায়গায় সেটিকে পৌঁছে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে।
আচ্ছা, দ্বিতীয় কোনও কারণ?
আছে বই কী। ওর মেয়ে নাকি এবার মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করেছে। আর তাতেই ওর মাথাটি গেছে ঘুরে। এখন ও মেয়েকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার করানোর জন্য খেপে উঠেছে। তাতে তো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লাগবে। বেয়ারার চাকরি করে অত টাকা লক্ষ্মণ জোগাড় করবে কোথা থেকে?
কিন্তু মিঃ রায়, ওই খামটার ভিতরেই যে রিপোর্টটা রয়েছে, সেটা লক্ষ্মণ জানবে কীভাবে? দিগন্তর গলায় ঈষৎ ব্যাঙ্গের সুর, আপনারা নিশ্চয় গবেষণা নিয়ে ওর সঙ্গে আলোচনা করেন না?
আমি করি না। আমার ওসব লোক দেখানো ভড়ং আসে না। কিন্তু অনেকেরই তো ওদের প্রতি দরদ উথলে ওঠে। তাদের সঙ্গে হাঁড়ির খবর নিয়ে আলোচনা হয়। সেখান থেকেই জানতে পেরেছে নিশ্চয়।
কিন্তু আমি যদি বলি, লক্ষ্মণের থেকে আপনারা যাঁরা সরাসরি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে সন্দেহটা অনেক বেশি। কারণ আপনাদের পক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব যে ওই খামে কী আছে। সেটা কোথায় দিলে কী মূল্য পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও আপনাদের ধারণা, লক্ষ্মণের থেকে অনেক বেশি স্পষ্ট।
দেখুন মশাই, আমরা করলে রিপোর্ট তৈরি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব কেন? যেরকম যেরকম কাজ এগোবে, সেরকমই তো পাচার করে দিতে পারি। তাহলে কেউ জানতেও পারবে না। বুঝতেও পারবে না।
না, সেটা করা মুশকিল। কারণ আমি সন্দীপন মিত্রের কাছে শুনেছি, আপনারা সকলে আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে কাজ করছিলেন। সবটা হওয়ার পর কমপাইলেশন করে যেটা দাঁড়াবে সেটা শুধুমাত্র মিঃ মিত্র জানতেন। রিপোর্টটা তৈরি করার সময় সেটা মিঃ নাগকে জানানো হয়। সুতরাং আপনাদের কারুর পক্ষেই আগে কোনও কিছু করা সম্ভব ছিল না। আর মিঃ রায়, কেউ বেয়ারার কাজ করে বলে, তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে উচ্চাশা থাকতে পারে না, এরকম ভাবাটা বোধহয় ঠিক নয়। তা ছাড়া এখনও আমাদের দেশে পড়াশোনার জন্য সবসময় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লাগে না।
দিগন্তর কথায় সুব্রত রায়ের মুখের ওপর একটা কালো ছায়া খেলে যায়। তবে তিনি যথাসম্ভব স্বাভাবিকভাবেই বলেন, আপনারা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমার যা মনে হয় সেটাই বলেছি। তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ তো আমার কাজ নয়। আপনাদের আমার কাছে আর কী জানার আছে সেটা যদি বলেন।
হ্যাঁ নিশ্চয়। আচ্ছা মিঃ রায়, আপনি সেদিন যখন ডিরেক্টরের ঘরে এলেন, তখন করিডরে আপনার সঙ্গে কারুর দেখা হয়েছিল?
না, দেখা হয়নি।
ভালো করে ভেবে বলছেন তো?
ভাবার প্রয়োজন নেই। আমার স্মৃতিশক্তি যথেষ্ট ভালো। আমার মনে আছে, করিডরে কারুর সঙ্গে দেখা হয়নি। ঘরে ঢোকার আগে লক্ষ্মণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
আপনি যে ডিরেক্টরের ঘরে আসছেন সেটা কাউকে বলেছিলেন?
না। স্যার জানতেন যে আমি ফাইলটা দিতে যাব। আর কাউকে বলার প্রয়োজন বলে মনে করিনি।
আচ্ছা আপনি কি ফাইলটা রাখতে এসেছিলেন, শঙ্করবাবু খামটা রেখে যাওয়ার পরে।
হ্যাঁ।
তার মানে আপনি জানতেন যে শঙ্করবাবু খামটা মিঃ মিত্রের টেবিলে রেখে গেছেন।
না, তা জানব কী করে? জানতাম না।
তাহলে কী করে বুঝলেন যে আপনি শঙ্করবাবুর পরে এসেছিলেন?
দিগন্তর প্রশ্নে এবার একটু থতমত খেয়ে সুব্রত রায় বললেন, পরে যখন সব ঘটনাটা শুনলাম, তখন সময়টা আন্দাজ করে মনে হয়েছিল।
আপনি কি প্রদীপবাবুর পরে এসেছিলেন না আগে?
এবার রীতিমতো বিরক্ত হয়ে সুব্রতবাবু বলে ওঠেন, প্রদীপ কখন এসেছিল আমি জানি না, আসলে আপনারা একটা কথা বুঝতে পারছেন না। এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে তাই। না হলে আমরা দিনের মধ্যে বহুবার স্যারের ঘরে যাই। কখন যাই তার কোনও হিসেবও থাকে না।
আচ্ছা বেশ। একটা কথা বলুন তো, সেদিন যখন ঘরে ফাইলটা রাখতে এলেন, তখন অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছিল? যেমন ধরুন ঘরে আলোটা একটু বেশি কিংবা ঠান্ডাটা একটু কম, এরকম কিছু?
একটু ভেবে সুব্রত রায় বললেন, না সেরকম কিছু মনে হয়নি। তবে একটা ব্যাপার ছিল, স্যারের একটা পেন কার্পেটে পড়ে ছিল।
পেন পড়েছিল?
হ্যাঁ। আসলে স্যার তো পেন বিশেষ ব্যবহার করেন না। যে দু-একটা ব্যবহার করেন সেগুলোও পেন স্ট্যান্ডে না রেখে টেবিলেই ফেলে রাখেন। আমার মনে হয় টেবিল থেকেই একটা পেন গড়িয়ে কোনওভাবে মাটিতে পড়ে গেছিল।
আপনি কি পেনটা তুলে রেখেছিলেন?
ন্যাচারলি। পেনটা টেবিলে তুলে রেখে চলে এসেছিলাম।
কোনখানে পড়েছিল পেনটা।
টেবিলের বাঁ-পাশে। আমি ফাইলটা রাখতে ওদিকটায় গেছিলাম বলেই চোখে পড়েছিল।
আপনি ঘর থেকে বেরোনোর সময় লক্ষ্মণের সঙ্গে কোনও কথা বলেছিলেন?
না, বলার কোনও প্রয়োজনও ছিল না।
ওখান থেকে কি সোজা নিজের ঘরে ফিরে এসেছিলেন?
ঘরে নয়, ল্যাবে ফিরেছিলাম। প্রদীপ তখন ল্যাবে কাজ করছিল। আমারও কিছু কাজ বাকি ছিল।
এরকম যে একটা ঘটনা ঘটেছে, সেটা জানতে পারলেন কখন?
আমাকে প্রদীপ বলল। আমাদের একজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ওকে ফোন করে গেটে চেকিংয়ের ব্যাপারটা জানিয়েছিল। ও সেটা আমাকে বলে। তারপর আমরা কিছুক্ষণ আলোচনা করে ঠিক করি স্যারকে কথাটা জানানো দরকার। প্রদীপই স্যারকে ফোন করে। তখনই ব্যাপারটা জানা যায়।
আচ্ছা, ঠিক আছে। আপনি এখন যেতে পারেন। পরে প্রয়োজন হলে আবার ডাকব।
বেশ খানিকটা কঠিন মুখে আড়ষ্টভাবে, তাদের নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান সুব্রত রায়।
উন্নাসিক লোক। মন্তব্য করে প্রণয়।
মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার বদ অভ্যাসও আছে। আর জামা-কাপড়ের যেরকম বাহার, তাতে যে প্রতিমাসে টাকা ধার করতে হবে, এতে আর আশ্চর্য কী।
দিগন্তর কথা শুনে, একটু হেসে প্রণয় বলে, এবার কি তাহলে দুজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকে পাঠাব?
না, ওদের সঙ্গে পরে কথা বলব। আগে লক্ষ্মণের সঙ্গে কথা বলা দরকার। লক্ষ্মণের সঙ্গে কথা বলে আমি একবার এই দোতলাটা পুরো ঘুরে দেখব। পুরো ফ্লোরে কোথায় কী আছে সেটা জানা জরুরি।
ঠিক আছে। কিন্তু দিনু, তুই যে বিল্ডিং সার্চ করার একটা কথা বলছিলি—সেটা কবে করতে চাস?
আমার মনে হয় প্রণয়, তুই কালকে সার্চ অপারেশনটা শুরু কর। ল্যাবরেটরিটা করার দরকার নেই। কারণ ওটা অনেকটাই ওপেন স্পেস। আমার মনে হয় না, ওখানে কেউ কিছু রাখবে। তুই প্রথমে ইনডিভিজুয়াল ঘরগুলো সার্চ কর। কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ যেই নিয়ে থাকুক সে নিজের ঘরে রাখার মতো বোকামি করবে না। তবু সার্চটা করা দরকার। এবার বাচ্চুদাকে ফোন করে বল, লক্ষ্মণকে পাঠিয়ে দিতে।
বাচ্চুদাকে ফোনে জানাতে, একটু পরেই দরজায় টোকা দিল লক্ষ্মণ নস্কর। বেঁটে-খাটো, শক্তপোক্ত চেহারা। বয়স চল্লিশের ঘরে। মাথার চুল কাঁচা-পাকা। পাতলা হয়ে এসেছে। কিন্তু গোঁফজোড়া বেশ চাড়া দেওয়া এবং কুচকুচে কালো। দেখলেই বোঝা যায়, গোঁফের ব্যাপারে লক্ষ্মণ বেশ যত্নবান। চোখ দেখলে বোঝা যায় ধূর্ত না হলেও সতর্ক মানুষ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে যথেষ্ট ভয় পেয়েছে, সেটা বুঝতেও অসুবিধা হয় না। লক্ষ্মণ ঘরে ঢুকেই হাতজোড় করে বলে উঠল, আমি কিছু করিনি বাবু। আমার কোনও দোষ নেই। আজ কুড়ি বছর হয়ে গেল, এখানে চাকরি করছি, কোনওদিন কেউ বলবে না লক্ষ্মণ নস্কর একটা আলপিন এধার-ওধার করেছে। এর আগে সেন সাহেব ছিলেন, ঘটক সাহেব ছিলেন, রিটায়ার করে চলে গেছেন। এখনও ফোন করলে কত কথা বলেন। বাড়ির সবার খবর নেন। কেউ আমার নামে একটা মন্দ কথা বলতে পারবে না বাবু। দেশে আমার জমিজমা আছে। ছেলেপুলে নিয়ে সংসার। চুরি করা আমার…
লক্ষ্মণের কথার তোড়ের মাঝখানেই বাধা দিয়ে প্রণয় বলে ওঠে, আহা, তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন। আমরা তো তোমাকে কিছু বলিনি। আমরা যা জিজ্ঞাসা করব, তার ঠিকঠাক উত্তর দাও, কোনও কিছু চেপে যেও না, তা হলেই কোনও ভয় নেই। দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। চেয়ারটায় বসো।
লক্ষ্মণ ভয়ে ভয়ে চেয়ারে বসলে, দিগন্ত ওর কাছে, সেদিন বাচ্চুদা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কে কে এসেছিল, কখন এসেছিল আর লক্ষ্মণের সঙ্গে তাদের কী কথা হয়েছিল সেটা জানতে চায়। লক্ষ্মণ যা বলে, দিগন্ত বুঝতে পারে, তার সঙ্গে অন্যদের বক্তব্যের তেমন কোনও পার্থক্য নেই। একটাই নতুন তথ্য শুধু লক্ষ্মণের কাছে জানা যায়, সেটা হল শঙ্কর নাগ ডিরেক্টরের ঘরে ঢোকার বেশ খানিকক্ষণ আগে প্রতীকবাবু নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে টয়লেটে গেছিলেন। শঙ্করবাবু যখন ফিরে যাচ্ছেন, তখন প্রতীকবাবুও ফিরে এসে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েন। মিঃ মিত্র ঘরে ফিরে তাঁকে ডেকে না পাঠানো পর্যন্ত প্রতীকবাবু আর ঘর থেকে বেরোননি।
আচ্ছা লক্ষ্মণ, একটা কথা বলো তো, এই চারজন মানে তোমাদের ডিরেক্টর সাহেব আর ওনার সঙ্গে যে তিনজন কাজ করেন, তাঁরা কেমন মানুষ? যা মনে হয়, যা জানো, খোলাখুলি বলো। তোমার কোনও চিন্তা নেই। একটা কথাও সাহেবরা জানতে পারবে না।
লক্ষ্মণ একটু অপ্রস্তুতভাবে হাত কচলে বলে, ডিরেক্টর সাহেব তো মাটির মানুষ। সাদা মনে কাদা নেই। একটু ভুলো মনেরও। দু-একবার তো ম্যানিব্যাগ টেবিলে ফেলে রেখেও চলে গেছেন। আমিই দেখতে পেয়ে তুলে রেখেছি। তারজন্য আবার বকশিশও দিয়েছেন।
চাবি ফেলে রেখে গেছেন কখনও?
লক্ষ্মণ একটু ভেবে বলে, না, চাবি কখনও ফেলে রেখে যাননি। চাবি ওনার পকেটে থাকে। রোজ অফিস থেকে বেরোনোর সময় পিছনের দরজা টেনে দেখে নেন, তারপর সামনের দরজায় চাবি লাগান।
আচ্ছা বেশ, এবার বাকিদের সম্বন্ধে কী জানো বলো।
শঙ্কর সাহেব এমনিতে ভালো লোক। তবে বড্ড কিপটে। এত বছর ধরে দেখছি, প্রতি শীতে একই সোয়েটার গায়ে দিয়ে আসেন। শার্ট-প্যান্টও সব পুরোনো। তবে দেখে বুঝবেন না। ঝকঝকে পরিষ্কার-ইস্ত্রি করা। শঙ্করবাবু কোথাও গেলে কোনও ড্রাইভার ওনার সঙ্গে যেতে চায় না। রাস্তায় নাকি নিজেও কিছু কিনে খায় না, ড্রাইভারকেও খেতে দেয় না। পয়সার খাঁইও খুব। কাজে বেরিয়ে দশ টাকার কিছু কিনলেও বিল জমা দেয়। আমার সাহেব তো পাওনা টাকাও নিতে ভুলে যায়। প্রদীপবাবুও হিসেবি মানুষ। কিন্তু শঙ্করবাবুর মতো পিঁপড়ের পেট টিপে খান না। প্রদীপবাবু গরিব ঘরের ছেলে। টাকার মূল্য বোঝেন। তাই নয়ছয় করেন না। আর মানুষটি বড় ভালো। দয়ার শরীর। অফিসের সব বেয়ারা, দারোয়ান, ড্রাইভার সবার বিপদে-আপদে প্রদীপবাবু পাশে আছেন। আমাদের প্রতীকবাবুও দয়ালু মানুষ। তবে ওনার পাখ-পাখালির ওপর দয়াই বেশি। ভাবুক লোক। আপন ঘোরে থাকেন।
আর সুব্রত রায় কেমন লোক?
লক্ষ্মণ চুপ করে যায়। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। তারপর বলে একটুও ভালো লোক নয় বাবু। পয়সার গুমোরে ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। তবু যদি না অফিস সুদ্ধ লোকের কাছে ধার করে বেড়াত। ধারের টাকায় ফুটুনি। আমাদের মতো লোককে মানুষ বলে গণ্যি করেন না। কথায় কথায় ইংরাজি গালি দেয়। আমার মেয়েটা অত ভালো রেজাল্ট করল, আনন্দ করে বলতে গেলাম, তো বলে কিনা, মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে কী হবে, উঁচু কেলাসে পড়ার খরচ তো আর টানতে পারবি না!
লক্ষ্মণের গলা ধরে এসেছে। সে একবার হাতের উলটো পিঠটা চোখের ওপর বুলিয়ে নেয়। লক্ষ্মণকে সামলে নিতে একটু সময় দিয়ে দিগন্ত বলে, আচ্ছা লক্ষ্মণ, ডিরেক্টরের ঘরটা দেখে মনে হল, কিছুদিন আগেই ওটা বেশ সুন্দর করে সাজানো-গোছানো, রং করা হয়েছে। সেটা কবে হল তোমার মনে আছে?
হ্যাঁ বাবু। এই তো গত বছর পুজোর আগে। তখন তো আমার ওপরই ঘর ছেড়ে দিয়েছিলেন সাহেব। আমি আর প্রতীকবাবু মিলেই তো সব করলাম। অত কাগজপত্র, বই, অফিসের ফাইল সব আলাদা আলাদা প্যাকেটে ভরে প্রতীকবাবুর ঘরে রাখা হল। ঘর রং করা হল। দরজা সারানো হল। তারপর আবার সব গুছিয়ে দিলুম। কিচ্ছু হারায়নি বাবু। একটা কাগজও সাহেবের খোয়া যায়নি। আর এখন কোথাও কিছু নেই, ফাইল চুরি হয়ে গেল।
আচ্ছা যে খামে রিপোর্টটা ছিল সেটা কত বড় তোমার মনে আছে?
খুব মন দিয়ে তো দেখিনি বাবু, তবে যদ্দুর মনে পড়ছে এ-ফোর পাতার সাইজের খাম।
তার মানে তো বেশ বড়। হাতে করে কেউ নিয়ে বেরোলে তোমার চোখে পড়ত।
নিশ্চয় পড়ত। হাতে নিয়ে কেউ বেরোয়নি। তবে খামটা খুব মোটা ছিল না। জামার মধ্যে নিয়ে বেরোলে কিন্তু আমি বুঝতে পারব না বাবু।
লক্ষ্মণের সঙ্গে আরও দু-একটা কথার পর তাকে চলে যেতে বলল প্রণয়। লক্ষ্মণ বেরিয়ে যেতেই বাচ্চুদা ঘরে ঢুকে বলল, এখন কি কিছু খাওয়া-দাওয়া করে নিবি নাকি আরও দু-একজনের সঙ্গে কথা বলবি?
না, খেয়ে নিই চলো। পেটের ভিতর ছুঁচোয় ডন-বৈঠক দিচ্ছে।
চল, তাহলে আমার ঘরে গিয়ে বসবি। ক্যান্টিনে ভালো মোগলাই পরোটা বানায়। তাই তিন প্লেট দিতে বলছি।
তুমি বলে দাও। কিন্তু প্রণয় আর কে কে বাকি রইল?
হাতের কাগজটা দেখে প্রণয় বলল, সেদিন সন্ধেবেলা এই ফ্লোরে যারা ছিল, তাদের মধ্যে দুজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট আর বাচ্চুদার সেক্রেটারি প্রতীকবাবু।
বেশ খেয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে। কিন্তু বাচ্চুদা, তার আগে আমি এই ফ্লোরটা পুরোটা একবার ঘুরে দেখে নেব। কয়েকটা বিষয়ে আমার একটু খটকা লাগছে, সেটা পরিষ্কার করা দরকার।
তিনজনে মিলে ঘর থেকে বেরোলে বাচ্চুদা প্রথমেই নকুড়কে ডেকে তিন প্লেট মোগলাই তার ঘরে দিতে বলল। তারপর সোজা হেঁটে গিয়ে পৌঁছোল, ইউ আকৃতির বারান্দাটার বাঁ-দিকে বাহুর একদম শেষ মাথায়। সেখানে একটা সরু মতো জায়গা। তাতে মিনারেল ওয়াটারের কুড়ি লিটারের বড় বড় জার সার দিয়ে রাখা হয়েছে। তার গায়ের দুটো ঘরে তালা লাগানো। বাচ্চুদা বলল যে সেগুলো হল স্টোর রুম। মূলত ল্যাবরেটরিতে যেসব জিনিস লাগে, সেগুলো এই দুটো ঘরে রাখা থাকে। চাবি থাকে সিকিউরিটির কাছে। তারপর একটা ছোট প্যানট্রি মতো। নকুড় সেখানে চা-কফির একটা ব্যবস্থা রাখে। বাচ্চুদার কাছে জানা গেল, ঘটনাটা যখন ঘটে, তখন নকুড় দেশে গেছিল বলে সেদিন প্যান্ট্রি বন্ধ ছিল। তারপর টয়লেট। টয়লেটের পর সিঁড়ি। সিঁড়ির পর প্রথমে প্রতীকের ঘর। তারপর ডিরেক্টরের অফিস। তারপর মস্ত কনফারেন্স রুম। কনফারেন্স রুমটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই বারান্দাটা ঘুরে গেছে।
পরের উইংটাতে প্রথমেই একটা টয়লেট। তারপর দুটো ল্যাবরেটরি। সেগুলো ভিতরে দরজা দিয়ে জোড়া। ল্যাবরেটরির অন্যপ্রান্তে শঙ্কর নাগের ঘর। তার পাশে অন্য সায়েন্টিস্টদের ঘর। তারপর নীচে নামার সিঁড়ি। সিঁড়ির ওপাশে একটা ঘরে প্রদীপ বসু আর সুব্রত রায় বসেন। তারপর ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টদের ঘর। এদিকের বারান্দার শেষ মাথাতেও একইভাবে মিনারেল ওয়াটারের জার রাখা।
পুরোটা দেখে বাচ্চুদার ঘরে এসে বসতেই নকুড় মোগলাই পরোটার প্লেট দিয়ে গেল। সঙ্গে কষা আলুর দম।
দিগন্ত চোখ বুজে একটু সময় মোগলাই চিবোল। তারপর চোখ খুলে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গিয়ে বলল, তোমার আলমারির পাশে ঝোলানো ছবিটা বেঁকে গেছে বাচ্চুদা। দাঁড়াও সোজা করে দিই।
চিন্তমণি করের ছবিটা তো? ওটা প্রায়ই বেঁকে যায়। কীভাবে বাঁকে জানি না। প্রতীক ঠিক করে। আমার মনে হয় ছবিটা যেভাবে ঝোলানো হয়েছে, তাতে ব্যালান্সের গণ্ডগোল আছে।
দিগন্ত উঠে গিয়ে ছবিটা ঠিক করে। ফ্রেমের পিছনে হাত দিয়ে দেওয়ালের পেরেকটা বাঁকা কিনা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর ফিরে এসে বলে, গণ্ডগোল আছে বলে তো মনে হল না। ঠিকঠাকই আছে।
তা জানি না। তবে ছবিটা নিজে থেকেই বেঁকে যায়। আমার আবার এসব চোখে পড়ে না। প্রতীক ঠিক লক্ষ করে। ছবি বেঁকে গেছে দেখলে সোজা করে দেয়।
তোমার ঘরের ইন্টিরিয়র যিনি করেছেন, তাঁর ফোন নম্বরটা দিও তো।
কেন রে, ছবি বেঁকে যায় কেন জিজ্ঞাসা করবি?
দুর, অঞ্জলি ঘরের ইন্টিরিয়র চেঞ্জ করবে বলছিল। এই ভদ্রলোকের কাজটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। বেশ একটা থিম ধরে কাজ করেন। তাই বলছিলাম…
দিগন্তর ঘর সাজানো নিয়ে কোনও ইন্টারেস্ট আছে বলে প্রণয়ের জানা ছিল না। তাই এহেন কথাবার্তায়, সে একটু আশ্চর্য হয়ে তাকায়। দিগন্ত অবশ্য প্রণয়ের বিস্ময়কে মোটেই পাত্তা না দিয়ে আরও বেশ খানিকক্ষণ বাচ্চুদার সঙ্গে কথা বলে ঘরের ইন্টিরিয়র যিনি করেছেন তার ফোন নম্বরটা নেয়। তারপর বলে, আমরা তাহলে আবার ওঘরে গিয়ে বসি। তুমি প্রথমে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টদের, তারপর প্রতীকবাবুকে পাঠিয়ে দিও। আর শোনো, আর একটা কাজ করো বাচ্চুদা, যাদের সঙ্গে আমরা কথা বললাম, তাদের বাড়ির ঠিকানাগুলো আমাকে দিও। তোমাদের অফিসে নিশ্চয় রেকর্ড আছে?
দিগন্তর কথায় সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে বাচ্চুদা। মোগলাই শেষ করে আবার কনফারেন্স রুমে গিয়ে বসে দিগন্ত আর প্রণয়। প্রথমেই পরপর দুজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট মহিম আর সুদীপের সঙ্গে কথা হয়। বিশেষ কোনও নতুন তথ্য অবশ্য তাদের থেকে পাওয়া যায় না। এরপর প্রতীক গড়াই ঘরে ঢোকে। তাকে দেখে প্রথমেই একটা বেশ চমক লাগে দুজনেরই। আসলে প্রতীকের চেহারাটা বেশ অদ্ভুত। লম্বায় প্রায় সাড়ে ছয় ফুট। কিন্তু রীতিমতো রোগা। দেখে মনে হয় যেন দৈর্ঘ্যের ভারে নুয়ে পড়া বাঁশ গাছ। ঢালু কাঁধ। হাত এবং আঙুল দুই-ই এত লম্বা যে সোজা হয়ে দাঁড়ালে মনে হয় হাঁটু ছুঁয়ে যাবে। বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। মুখে একটা আলগা ভালোমানুষির ছাপ আছে। জামাকাপড় পরিচ্ছন্ন। নমস্কার করে উলটোদিকের চেয়ারে বসে প্রতীক। প্রশ্ন করতে শুরু করে প্রণয়। প্রতীক জানায়, সেদিন শঙ্কর নাগ খামটা টেবিলে রেখে আসার পর প্রতীক সেই ঘরে যায়নি। নিজের ঘরেই ছিল। বেশ খানিকক্ষণ পরে স্যার তাকে ডেকে পাঠান। তখন সে জানতে পারে যে একটা খাম পাওয়া যাচ্ছে না। শঙ্কর নাগ সেই খামটা স্যারের টেবিলে রেখে গেছিলেন।
খামের ভিতরে কি আছে আপনি জানতেন?
না, তবে নিশ্চয় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু, সেটা আন্দাজ করেছিলাম।
আচ্ছা আপনি তো শুনলাম বছর তিনেক এখানে চাকরি করছেন। এর আগে কোথাও কাজ করেছেন?
দিগন্তর প্রশ্ন শুনে প্রতীক মাথা নেড়ে বলে, না, এটাই প্রথম চাকরি। গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট বেরোনোর পরেই জয়েন করেছিলাম। আচ্ছা, কিছু মনে করবেন না, আপনিই তো দিগন্ত দেব।
প্রতীকের কথায় দিগন্ত ভিতরে ভিতরে একটু চমকে উঠলেও, মুখে সেটা প্রকাশ না করে স্মিত হেসে বলে, হ্যাঁ, কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার আগে পরিচয় হয়েছে বলে তো মনে হয় না।
না, না, পরিচয় হয়নি। আমাকে তুমি করে বলতে পারেন। আসলে আমি কাগজে মিকিমোটো নেকলেসের ঘটনাটা পড়েছিলাম। ওখানে তো আপনার ছবি ছিল। সেদিন ভিজিটার্স বুকে আপনার নামও দেখলাম। তাই আপনাকে দেখেই চিনতে পেরেছি। আমার কিন্তু পুরো ঘটনাটা পড়ে খুবই থ্রিলিং মনে হয়েছিল।
থ্যাঙ্কিউ। কিন্তু তুমি যে আমাকে চিনতে পেরেছ সেটা সবার সঙ্গে আলোচনা না করাই ভালো। কারণ এই কেসটা তো আসলে কলকাতা গোয়েন্দা পুলিশ ডিল করছে। আমি জাস্ট ওদের সঙ্গে আছি।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি নিশ্চয় আর কাউকে বলব না। তবে আপনার সঙ্গে যে আলাপ হল, সেটা আমার কাছে খুব আনন্দের…।
প্রতীকের উচ্ছ্বাসে বাধা দিয়ে প্রশ্নে ফিরে আসে প্রণয়, আচ্ছা প্রতীক, সেদিন ওই ঘটনার সময় যাঁরা ঘরে গেছিলেন মানে, প্রদীপবাবু, শঙ্কর নাগ আর সুব্রতবাবু, এঁদের সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা?
দেখুন মানুষ হিসাবে যদি বলি, তাহলে বলতে হবে শঙ্কর নাগ মিতব্যয়ী। প্রদীপবাবু ভালোমানুষ তবে আমার মনে হয় ওনার জীবনে কিছু গোপনীয় ব্যাপার আছে, যার জন্য উনি সর্বদা সতর্ক থাকেন। সুব্রত রায় অত্যন্ত উন্নাসিক, টাকার জন্য অনেক কিছুই করতে পারেন। তবে কাজের দিক থেকে আমার মনে হয় এঁরা সকলেই খুবই সিনসিয়ার এবং পরিশ্রমী। আর আমাদের স্যার যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি পরিশ্রমী আর মানুষও খুবই ভালো।
এই কাজটা করেছে বলে আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?
প্রতীক একটু চিন্তা করে মাথা নেড়ে বলে, না, সন্দেহ নির্দিষ্টভাবে কাউকে হয় না। যদিও ভেবে দেখলে মনে হয়, তিনজনেরই সমান সুযোগ ছিল।
এবার দিগন্ত বলে, তুমি তো পক্ষী প্রেমিক। মিঃ মিত্র বলছিলেন, তোমার নাকি গাছপালা, পাখি এসব নিয়ে ভারি আগ্রহ। তোমার উৎসাহেই গাছে পাখিদের বাসা বানানোর জন্য হাঁড়ি ঝোলানো হয়েছে?
হ্যাঁ, তা হয়েছে। স্যার আমার পাগলামিকে খানিকটা প্রশ্রয়ই দেন। আসলে আমার বটানি অনার্স ছিল। তাই গাছপালা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই খানিকটা আগ্রহ আছে। এখানে গাছপালা নিয়ে নানা রকম কাজকর্মও হয়। আমার যদিও তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, তবু জানতে ইচ্ছে করে, ভালো লাগে। আর পাখির ব্যাপারটা বলতে পারেন মজ্জাগত। গ্রামের ছেলে তো। তাই পাখ-পাখালির সঙ্গে কেমন যেন একটা আত্মীয়তা বোধ হয়।
তাই নাকি, তোমার বাড়ি কোথায়?
হাওড়ায়। উনসানি বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে।
ওখান থেকে যাতায়াত করো?
না, না। আমি কলকাতাতেই মানুষ। আশুতোষে পড়তাম। তবে দেশের বাড়িতে যাতায়াতটা ছিল। চাকরিতে ঢোকার পর অবশ্য কমে গেছে।
আচ্ছা প্রতীক, একটা জিনিস বলো তো, সেদিন যে মিঃ মিত্র সুবলবাবুর ঘরে যাবেন, সেটা তুমি জানতে?
যাবেন জানতাম। কারণ সকালে স্যার আমাকে বলেছিলেন যে ওনাকে সুবলবাবুর কাছে যেতে হবে। কিন্তু কখন যাবেন সেটা জানতাম না।
তার মানে, শঙ্কর নাগ যখন খামটা মিঃ মিত্রের ঘরে রেখে গেলেন, তখন যে মিঃ মিত্র ঘরে নেই সেটা তুমি জানতে না?
জানতাম নাই ধরে নিতে পারেন।
মানে, ঠিক বুঝলাম না।
আসলে শঙ্করবাবু আসার আগে ল্যান্ড লাইনে স্যারকে ফোন করেছিলেন। স্যার ঘরে না থাকায়, তিনবারের পর আমার ঘরে রিং বেজেছিল। আমি শঙ্করদাকে বললাম, স্যার ঘরে নেই। মনে হয় সুবলবাবুর ঘরে গেছেন, আপনি মোবাইলে ফোন করে নিন। এরপর স্যারের সঙ্গে শঙ্করদার কী কথা হয়েছে, স্যার ওনাকে কখন আসতে বলেছেন, এর মধ্যে স্যার ঘরে ফিরে এসেছেন কিনা, এসব কিছুই তো আর আমার জানার কথা নয়। আমি জানতেও পারিনি।
আরও দু-চারটে কথার পর প্রতীক উঠে গেলে প্রণয় বলল, ছেলেটাকে তো ভালোই মনে হল।
হ্যাঁ, ভালোই। তবে তীক্ষ্ন বুদ্ধি আর নার্ভও খুব স্ট্রং। পুলিশের সঙ্গে এতক্ষণ ঠান্ডা মাথায় এরকম ভাবে কথা বলা সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলের পক্ষে কঠিন। তবে জামাকাপড় দেখে যেমন মনে হয়, আর্থিক অবস্থা বোধ হয় তার থেকে ভালো। হাতে যে ঘড়িটা পরেছিল, সেটা কিন্তু সিম্পল দেখতে হলেও, বিদেশি আর বেশ দামি।
কেউ হয়তো গিফট করেছে। আত্মীয়স্বজন বিদেশে থাকতে পারে।
হ্যাঁ, সেটার সম্ভাবনাই বেশি।
তাহলে আজকের মতো পাট গুটোনো যাক নাকি?
হ্যাঁ চলো, বাচ্চুদাকে বলে বেরোই। যাওয়ার সময় এদের বাড়ির ঠিকানাগুলো নিয়ে নেব। তুই এলাকায় লোক লাগিয়ে ডিটেল খোঁজ নিবি। ও হ্যাঁ, আর একটা কাজ করতে হবে। নিউ লাইফের যে দুটো রাইভ্যাল কোম্পানি, ড্রাগ ওয়ার্ল্ড আর সেভ লাইফ, এই দুটো কোম্পানি সম্পর্কে ডিটেল ইনফরমেশন আমার চাই। কতদিনের কোম্পানি, কোথায় অফিস, কারা মালিক, কী ধরনের কাজ হয় সবকিছু। বেসিক ইনফরমেশন গুগলে পাব। কিন্তু পুলিশের ইনফরমেশন চাই।
ও.কে. বস, তাই হবে, বলে ঠাট্টা করে দিগন্তকে স্যালুট ঠোকে প্রণয়।
বাড়ি ফিরতে দিগন্তর প্রায় সাতটা বাজল। প্রণয়ের গাড়িতেই ফিরল দুজনে। অঞ্জলিও ততক্ষণে ফিরেছে। চা খেতে খেতে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে প্রণয় চলে যাওয়ার পর দিগন্ত নিজের ঘরে টেবিলে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে প্রত্যেকের কথাবার্তা খুব মন দিয়ে আবার শুনল। মাঝে মাঝে নোটও নিল। প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ, অঞ্জলি যখন রাতের খাবার দিয়ে ডাকতে এল, দিগন্ত তখন তার ভারি পছন্দের রকিং চেয়ারে বসে আছে। চোখ বোজা। কপালে ভ্রুকুটি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খুব গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করছে।
এই কেসটা কি তোমার খুব জটিল মনে হচ্ছে?
অঞ্জলির কথা শুনে দিগন্ত চোখ খুলে একটু ফিকে হেসে বলল, জটিল তো নিশ্চয়। কিন্তু সব থেকে বড় সমস্যা হচ্ছে সময়। বড্ড বেশি সময়ের বাঁধাবাঁধির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। হাতে আর বড়জোর দুদিন। তার মধ্যেই হিট করতে হবে।
রাতের খাওয়া সেরে অঞ্জলি শুয়ে পড়ল। দিগন্ত তখন নিজের ঘরে। কখনও পায়চারি করছে, কখনও চেয়ারে বসছে। ল্যাপটপ খুলে দেখছে। প্রায় রাত দুটো নাগাদ একবার ঘুম ভেঙে অঞ্জলি দেখল তখনও দিগন্তর ঘরে আলো জ্বলছে। দিগন্ত কখন ঘুমিয়েছে অঞ্জলি বুঝতে পারেনি। কিন্তু ভোরবেলা অঞ্জলির ঘুম ভাঙল বারান্দায় কাগজ পড়ার শব্দে। প্রতিদিন সকালে দোতলার বারান্দায় কাগজ ছুড়ে দিয়ে যায় হকার। রোজই সেই শব্দে ঘুম ভাঙে অঞ্জলির। অভ্যাসমতো বালিশের তলা থেকে মোবাইলটা বার করে সময় দেখতে গিয়ে একটু আশ্চর্যই হল। সবে সাড়ে পাঁচটা। সাধারণত কাগজ আসে আরও একঘণ্টা পরে। দিগন্ত তখনও গভীর ঘুমে। অঞ্জলি আরও একটু ঘুমিয়ে নিতে পাশ ফিরল। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না, আবার বারান্দায় কাগজের শব্দ। এবার ভারি বিরক্ত হয়ে উঠে বসল অঞ্জলি। ব্যাপারটা কী! এতবার কাগজ দিয়ে যাচ্ছে কে? বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় গিয়ে অঞ্জলি দেখে দুখানা গোল করে পাকানো কাগজ পড়ে আছে মেঝেতে।
অঞ্জলির ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসল দিগন্ত। খাটের পাশেই উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অঞ্জলি।
কী ব্যাপার, কী হয়েছে? ঠেলে ওঠালে কেন?
এই দ্যাখো…অঞ্জলি একটা কাগজের টুকরো বাড়িয়ে দেয় দিগন্তর দিকে, এটা পুরোনো খবরের কাগজের সঙ্গে রোল করে ছুড়ে দিয়েছে।
দিগন্ত কাগজটা হাতে নেয়। সাদা কাগজে টাইপ করা আছে কয়েকটা লাইন—
এখনও সময় আছে সরে যাওয়ার। বেশি বাড়াবাড়ি করলে একদম নিকেশ করে দেব। কলেজ মাস্টারের টিকটিকিগিরি ঘুচিয়ে দেব।
এসব আবার কী! অঞ্জলি রীতিমতো হতবাক।
প্রফেশনাল হ্যাজার্ড বলতে পারো। গোয়েন্দাগিরি করতে গেলে এরকম একটু-আধটু হুমকি তো আসতেই পারে। তবে এর থেকে তিনটে বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হল।
এরমধ্যে হুমকি দেওয়া ছাড়া আর কী তুমি স্পষ্টভাবে দেখতে পেলে শুনি?
প্রথমত, যারা রিপোর্টটা চুরি করতে চাইছে, তারা এখনও সেটা হাতে পায়নি। পেয়ে গেলে আমাকে হুমকি দেওয়ার দরকার হত না। দ্বিতীয়, কাজটা যারা করছে, তাদের পিছনে একটা শক্তিশালী চক্র আছে। তারা আমার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে, আমার সম্বন্ধে যাবতীয় খোঁজখবরও নিয়েছে। আর তৃতীয় এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল, আমার নিউ লাইফের অফিসে যাতায়াত বন্ধ করার জন্যই হুমকি। তার মানে রিপোর্টটা এখনও ওই বাড়িতেই আছে। নাঃ, লড়াইটা কিন্তু বেশ জমে উঠেছে অঞ্জলি। তুমি চা-টা বানাও, আমি একবার ফোন করে প্রণয়কে ঘটনাটা জানিয়ে রাখি।
শুধু প্রণয়ের সঙ্গে নয়, চা খেতে খেতে বাচ্চুদার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলল দিগন্ত। সেদিন তার অফ ডে। তাই কলেজ যাওয়ার ঝামেলা নেই। অঞ্জলি বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই, একটা ব্যাগে নিজের ক্যামেরাটা ভরে নিয়ে নিউ লাইফের অফিসে এসে হাজির হল দিগন্ত। কালো টুপি আর সানগ্লাস পরা একটা ছেলে তার পিছন পিছন আসছে বুঝেও পাত্তা দিল না একটুও। বাচ্চুদাকে বলা ছিল আগেই। নিউ লাইফের অফিসবাড়িটার কয়েকটা ছবি তুলবে। এমনিতে ছবি তোলার নিয়ম নেই। তাই অনুমতিপত্র বাচ্চুদা তৈরি করে রেখেছিল। সিকিউরিটি গার্ডদের মধ্যে একজনকে ডেকে, বাচ্চুদা তার হাতে অনুমতিপত্রটা দিয়ে বলে দিল দিগন্তর সঙ্গে থাকতে।
সিকিউরিটি গার্ডটির নাম পরমেশ। সাধারণত এই ধরনের লোকেরা যেরকম হাঁড়িমুখো হয়, সেরকম নয় মোটেই। হাসিখুশি। দিগন্ত তার সঙ্গে বেরিয়ে প্রথমেই সামনের দিক আর বাগান থেকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে বাড়িটার কয়েকটা ছবি তুলল। তারপর লনের পাশের একটা সুরকি বিছানো রাস্তা ধরে যাওয়া হল বাড়ির পিছন দিকে। সেদিকটায় গিয়ে দিগন্ত দেখে একটা লোহার ঘোরানো সিঁড়ি গিয়ে উঠেছে একটা ছোট ব্যালকনিতে। সিঁড়িটা যেখানে, তার উলটোদিকের বাউন্ডারি ওয়ালে একটা ছোট লোহার গেটও আছে। তবে সেটা তালা দেওয়া।
এই সিঁড়িটা কীসের বলুন তো?
দিগন্তর প্রশ্ন শুনে পরমেশ একগাল হেসে বলল, আজ্ঞে এটা তো এমারজেন্সি এক্সিট। আগে এটা ছিল না। কিন্তু দমকলের লোকেরা এসে বলে গেল একটা এমারজেন্সি রাস্তা নাকি রাখতে হবে। তখনই এটা বানানো হল।
ওপরের ওই বারান্দাটা কোন ঘরের?
ওটা তো কনফারেন্স ঘর। ওখানেই তো বড় সায়েবরা এলে মিটিং হয়।
বাঁকানো সিঁড়ি আর তার চারপাশের আরও কিছু ছবি তুলে দিগন্ত বলল, আচ্ছা পরমেশবাবু, পাশে ওই যে তিনতলা বাড়িটা, ওটাও কি আপনাদের প্রপার্টি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ওটা আমাদের স্টাফ কোয়ার্টার। ফোর্থ ক্লাস স্টাফরা ওখানে থাকে।
ওই বাড়িটার দোতলায়, এদিকের যে বারান্দাটা আছে, সেখানে আমাকে নিয়ে যেতে পারবেন?
দিগন্তর প্রস্তাবে পরমেশবাবু বেশ অবাক হলেও স্বাভাবিক ভাবেই বললেন, হ্যাঁ নিশ্চয়। চলুন নিয়ে যাচ্ছি।
নিউ লাইফের মেইন বিল্ডিংটা থেকে বেরিয়ে পাশের বাড়িটাতে ঢোকা হল। এই বাড়িটা অনেকটা ব্যারাকের মতো। লম্বা বারান্দার গায়ে সার সার ঘর। পরমেশবাবুর সঙ্গে দোতলার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে এসে দাঁড়াল দিগন্ত। এর ঠিক উলটো দিকেই নিউ লাইফের মূল বাড়িতে বাচ্চুদার ঘর। পিছনের বারান্দা, প্রতীকের ঘরের দরজা সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ক্যামেরার লেন্সে চোখ লাগিয়ে পরপর অনেকগুলো ছবি তুলল দিগন্ত। তারপর ক্যামেরা বন্ধ করে ফিরে এল দুজনে। বাচ্চুদা নিজের ঘরে অপেক্ষা করছিল। আজ সকাল থেকেই পুলিশের লোকেরা ঘরগুলো সার্চ করা শুরু করেছে। দিগন্তকে দেখে বাচ্চুদা বলল, কী রে তোর ছবি তোলা হল?
হ্যাঁ, আপাতত কাজ শেষ।
কী মনে হচ্ছে রে, রিপোর্টটা পাওয়া যাবে? বাচ্চুদার গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।
আশা করছি। তবে বেশ কয়েকটা জায়গায় খটকা আছে। আজ বিকেলে প্রণয় কিছু ইনফরমেশন দেবে। সেটা পেলে ব্যাপারটা আরও একটু পরিষ্কার হতে পারে। সেক্ষেত্রে কাল হয়তো তোমাকে পজিটিভ কিছু জানাতে পারব।
তুই কি আজ আর কারুর সঙ্গে কথা বলবি?
না। এখন বাড়ি ফিরব। তবে আমাকে একটা জিনিস বলো, আমাদের সঙ্গে কথা বলার পর কারুর মধ্যে বিশেষ কোনও প্রতিক্রিয়া কি লক্ষ করেছ?
হ্যাঁ, তা হয়েছে। সুব্রত খুবই বিরক্ত। ওর নাকি এমনই মানসিক চাপ বেড়েছে যে কয়েকদিনের জন্য ছুটি নিয়ে বেড়াতে যেতে চাইছিল। আমি দিইনি। বলেছি, ব্যাপারটা মিটে না যাওয়া পর্যন্ত কাউকে ছুটি দেওয়া হবে না। শঙ্কর মুখে কিছু না বললেও গম্ভীর হয়ে আছে। সেটা অবশ্য খানিকটা উদ্বেগেও হতে পারে। হয়তো ভাবছে, ওকে যদি কোম্পানি দায়ী করে। প্রদীপ অবশ্য স্বাভাবিক। আর প্রতীক যেমন আপন খেয়ালে থাকে তেমনই আছে।
তুমি এসময় কাউকে ছুটি দিও না কিন্তু। কেসটা সলভ না হওয়া পর্যন্ত যেন কলকাতার বাইরে না যায়।
নিউ লাইফের অফিস থেকে বেরিয়ে দিগন্ত একটা ট্যাক্সি ধরে লেক মার্কেটে আসে। পুরোনো লেক মার্কেট ভেঙে এখন বিশাল শপিং মল হয়েছে। সেখানে একটা গোদরেজ কোম্পানির ডোর লকের দোকানও আছে। দোকানটা খুঁজে বার করে, একটু দামি, মজবুত ডোর লক দেখাতে বলে দিগন্ত। দোকানের সেলসম্যান একটা ক্যাটালগ বার করে দিলে সেটা দেখে বাচ্চুদার অফিসের দরজায় যে ধরনের লক লাগানো আছে, সেটাই দেখতে চাওয়ায় একটা বেশ ভারিসারি প্যাকেট বার করে ছেলেটি বলে, এগুলোর দাম একটু বেশি। কিন্তু ভীষণ কাজের স্যার। এই তালা ভাঙা দুঃসাধ্য। আর এগুলোর হচ্ছে টোটালি কম্পিউটারাইজড লকিং সিস্টেম। মানে চাবির নকল কেউ বানাতে পারবে না।
দিগন্ত ভালো করে তালাটা নেড়েচেড়ে দেখে। তারপর সেটা আবার প্যাকেটের মধ্যে ঢোকাতে গিয়ে বোঝে ঢুকছে না। ছেলেটি একটু হেসে বলে, চাবির পাউচটা ভিতরে আছে তো। সেজন্য ঢুকছে না। দিন আমি ঢুকিয়ে দিচ্ছি।
দিগন্ত একটু অপ্রস্তুত হেসে চাবির পাউচটা আঙুল দিয়ে টেনে বার করেই কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখে একটা পাতলা হাসি ফুটে ওঠে।
ঠিক আছে ভাই। আমার দু-এক সপ্তাহ পরে দরকার হবে। তখন এসে নিয়ে যাব। আপনি রেখে দিন।
লেক মার্কেট থেকে বেরিয়ে ফুটপাথের দোকান থেকে এক ভাঁড় চা কিনে তাতে চুমুক দেয় দিগন্ত। সে বুঝতে পারছে, তার মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যাওয়া সুতোগুলো একটু একটু করে খুলছে। চা শেষ করে সম্পূর্ণ অন্যমনস্কভাবে একটা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফিরে আসে। অঞ্জলি অফিসে। ফাঁকা বাড়িতে বসে, আবার কানে হেডফোন লাগিয়ে কয়েকজনের কথোপকথন শোনে। তারপর বাচ্চুদার অফিসের ইন্টিরিয়র ডিজাইনার সলিল রায়কে ফোন করে। ভদ্রলোকের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা হয়। ঘটনার কিছুটা আভাস দিয়ে দিগন্ত তাঁকে বলে, বুঝতেই পারছেন, সিচুয়েশনটা খুব সুবিধার নয়। তাই আমি আশা করব, আপনার সঙ্গে যে কথাবার্তা হল, সেটা আপনি কারুর কাছে ডিসক্লোজ করবেন না।
সলিলবাবু আশ্বস্ত করায়, তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোনটা ছাড়তে না ছাড়তেই রিং বাজে। প্রণয় ফোন করছে। গলায় ভালোরকম উত্তেজনা, দিনু ইনফরমেশনগুলো এসে গেছে। কয়েকটা তো রীতিমতো ইন্টারেস্টিং।
সেরকমই আন্দাজ করেছিলাম। আমাকে পাঠা তাড়াতাড়ি।
শোন, পুরোটা আমি নোট তৈরি করে নিয়েছি। আমার পক্ষে এখন বেরোনো মুশকিল। আমাদের দেবব্রত ওইদিকে একটা কাজে যাচ্ছে। ওকে বলছি, তোর বাড়িতে ড্রপ করে দিতে। আর হ্যাঁ, আমাদের সার্চিং পার্টি ফিরে এসেছে। কারুর ঘরেই কিছু পাওয়া যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজও চেক করা হয়েছে। সেখানেও কোনও গণ্ডগোল চোখে পড়েনি।
অঞ্জলি যখন বাড়ি ফিরল, তখন রাত প্রায় ন’টা। দিগন্ত তখনও তার ঘরে হেডফোন, ডাইরি, ল্যাপটপ নিয়ে মগ্ন। তবে তার কপালে কোঁচকানো ভাবটা আর নেই। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ন আর মুখে একটা আলগা হাসির আভাস।
কী ব্যাপার, কাজ অনেকটা এগিয়েছে মনে হচ্ছে? অঞ্জলি বলে।
মাছটাকে মনে হচ্ছে চিনে ফেলেছি। কিন্তু কোন চারে মাছ টোপ গিলবে, সেটা এখনও বুঝতে পারছি না।
তোমার হেঁয়ালি বুঝছি না বাপু। বাচ্চুদার জিনিসটা উদ্ধার হবে কিনা সেটা বলো।
সেটাই এখন কনফিউসন, রিপোর্টটা উদ্ধার করব নাকি মাছ ধরব।
ফের হেঁয়ালি শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে অঞ্জলি বলে, ঠিক আছে। তুমি মাছ, হাঙর, কুমির যা খুশি ধরো। তবে কাল যদি কলেজ যাও, তাহলে দয়া করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসো।
কেন বলো তো?
ঘূর্ণিঝড় আসছে। তুমি তো ঘরেই বসে আছ, তাই বুঝতে পারোনি। মেঘ জমতে শুরু করেছে। বৃষ্টি শুরু হবে মাঝরাত থেকেই। কাল রাত আটটা নাগাদ বলছে ঝড় এ-রাজ্যে ঢুকবে। ওয়েদার খুবই খারাপ হতে শুরু করবে।
ঠিক আছে, পরে সব শুনছি আগে কয়েকটা জরুরি ফোন করে নিই।
অঞ্জলি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দিগন্ত প্রথমেই বাচ্চুদার নম্বরটা ডায়াল করল। বার দুয়েক রিং বাজতেই বাচ্চুদা ধরলে দিগন্ত বলল, শোনো আমি কতগুলো কথা বলছি, সেগুলো ভালো করে মন দিয়ে শুনে নাও। তোমার ড্রাইভার আছে তো?
হ্যাঁ, তা তো আছেই।
তা হলে কাল তুমি নিজে ড্রাইভ করে অফিসে আসবে না। ড্রাইভারকে নিয়ে আসবে আর কাল সকালে অফিসে গিয়ে তোমার সবথেকে বিশ্বস্ত যে সিকিউরিটি গার্ড তাকে বলবে, এমারজেন্সি এক্সিটের গেট আর সিঁড়ির দরজার তালাটা যেন খুলে রাখে। এটা হল এক নম্বর। এবার শোনো, কাল কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আসছে। ওয়েদার অফিসের রিপোর্ট সব টেলিভিশন চ্যানেলে দেখাচ্ছে। তুমি মোটামুটি সাড়ে চারটে-পাঁচটা থেকেই তোমার স্টাফদের, বাড়ি চলে যেতে বলবে। তুমি নিজেও যে একটু পরেই বেরিয়ে যাবে সেটাও জানিয়ে দেবে। আমি আর প্রণয় এরই মধ্যে এমারজেন্সি এক্সিট দিয়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকে বসে থাকব। দোতলা মোটামুটি ফাঁকা হয়ে গেলে, বিশেষ করে লক্ষ্মণ চলে গেলে, তুমি গার্ডকে বলবে কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে আমাদের তোমার ঘরে ঢুকিয়ে দিতে। তবে খুব সাবধানে। কেউ যেন দেখতে না পায়।
ও বাবা! এ তো রীতিমতো হরর স্টোরি মনে হচ্ছে রে।
হরর নয় থ্রিলার স্টোরি। যা বললাম সব কিছু ঠিকঠাক করবে কিন্তু। আর একটা কথাও যেন তৃতীয় ব্যক্তি জানতে না পারে। তা হলেই সব গণ্ডগোল হয়ে যাবে।
তুই চিন্তা করিস না। আমি পরমেশকেই দায়িত্ব দেব। ওর চাকরি আমি দিয়েছি। আমি নির্দেশ দিলে একচুল এধার-ওধার হবে না।
বাচ্চুদার ফোন ছেড়ে, প্রণয়ের সঙ্গেও ফোনে বেশ খানিকক্ষণ কথা বলে দিগন্ত।
ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গের দিকে। সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে এলোমেলো হাওয়া বইছে। টেলিভিশন, রেডিয়োতে বারবার সতর্কবার্তা ঘোষণার ফলে রাস্তায় এমনিতেই লোক কম। পুলিশের গাড়িটা নামিয়ে দিয়েছিল বেশ খানিকটা দূরে। সেখান থেকে হেঁটে এসে এমারজেন্সি এক্সিট দিয়ে যখন প্রণয় আর দিগন্ত বেড়াল পায়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকল, তখন ঘড়িতে মাত্র সাড়ে চারটে হলেও সূর্যের আলো মরে এসেছে অনেকটাই। আকাশের রং সিসের মতো। হাওয়ার জোর বাড়ছে একটু একটু করে। পাঁচটা নাগাদ প্রায় নিঃশব্দে কনফারেন্স রুমের দরজা খুললেন পরমেশ। বাইরে তখন প্রায় অন্ধকার। খুব সতর্কভাবে চারিদিক দেখে নিয়ে দুজনে দ্রুত বেরিয়ে ঢুকে পড়ল বাচ্চুদার ঘরে। দিগন্ত ফিসফিস করে পরমেশকে বলল, চাবি নিয়ে নিন। দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে, কোলাপসিবলে তালা লাগিয়ে দেবেন। তারপর নীচে গিয়ে অপেক্ষা করবেন। যদি কেউ ফোন করে জানতে চায়, ডিরেক্টর সাহেব বেরিয়ে গেছেন কিনা, তাহলে বলবেন যে বেরিয়ে গেছেন। তারপর তক্ষুনি কে ফোন করেছিল, সেটা আমাদের জানাবেন।
ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে যায় পরমেশ। বাইরে থেকে কোলাপসিবল টানার, তারপর তালা লাগানোর শব্দ হয়। দিগন্ত আবার ফিসফিস করে বাচ্চুদাকে বলে, তোমার ড্রাইভারকে বলো, গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে। ড্রাইভারকে ফোন করে দেওয়ার পর তিনজন অন্ধকার ঘরে নিঃশব্দে বসে থাকে। টিকটিক টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে ঘড়ির কাঁটা। প্রায় আধঘণ্টা পরে, বাচ্চুদার মোবাইলে আলো জ্বলে ওঠে। ফোনটা কানে চেপে কথা বলে নিয়ে বাচ্চুদা ফিসফিস করে দিগন্তকে বলে, ফোন এসেছিল। পরমেশ জানাল।
কার ফোন?
বাচ্চুদা দিগন্তর কানের কাছে মুখটা নিয়ে নামটা বলে। দিগন্ত মাথা নাড়ে, সেরকমই আন্দাজ করেছিলাম। এবার এসো।
প্রায় নিঃশব্দে সোফা থেকে উঠে, সন্তর্পণে বারান্দার দিকে দরজাটার গায়ে প্রায় কান ঠেকিয়ে দাঁড়ায় দিগন্ত। পাশে প্রণয়। দিগন্ত বাচ্চুদাকে বলে, তুমি সুইচ বোর্ডের পাশে থাকো। আমি ইশারা করলেই বারান্দার আলোটা জ্বেলে দেবে…
কথা বলতে বলতেই ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ইশারা করে দিগন্ত। বারান্দায় একটা মৃদু খসখস শব্দ। কুড়ি সেকেন্ড মতো অপেক্ষা করে দিগন্ত। তার পরেই বাচ্চুদাকে ইশারা করে, একঝটকায় দরজার ল্যাচটা টেনে খুলে ফেলে। ততক্ষণে বারান্দার আলো জ্বলে গেছে। সিএফএল বালবের উজ্জ্বল আলোয় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতীক গড়াই। হাতে একটা ময়লাটে বাদামি রঙের প্লাস্টিকের প্যাকেট। প্রতীককে সতর্ক হওয়ার কোনও সুযোগ না দিয়েই এক ঝটকায় প্যাকেটটা কেড়ে নেয় দিগন্ত। ততক্ষণে পজিশন নিয়ে নিয়েছে প্রণয়। কোমরের খাপে গোঁজা রিভলভারটা চলে এসেছে হাতে। ঠান্ডা গলায় বলে, কোনওরকম গণ্ডগোলের চেষ্টা করবেন না প্রতীকবাবু। বাইরে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। পালাবার চেষ্টা করে লাভ হবে না।
প্রতীকের আপাত ভালোমানুষ চোখদুটো কয়েকে সেকেন্ডের জন্য জ্বলে উঠে আবার স্তিমিত হয়ে যায়। কাঁধদুটো ঝুলে পড়ে।
দিগন্ত প্যাকেটটা বাচ্চুদার হাতে দিয়ে বলে, এই নাও তোমার রিপোর্ট। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটাকে মিঃ আলমের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করো।
বাচ্চুদা হাত বাড়িয়ে দিগন্তর কাছ থেকে প্যাকেটটা নেয় ঠিকই, কিন্তু মুখ দেখেই বোঝা যায়, চোখের সামনে যা ঘটল, সেটা আদৌ তার হৃদয়ঙ্গম হয়নি।
ঘূর্ণিঝড়টা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে আসেনি। ঘুরে গেছিল বাংলাদেশের দিকে। পরদিন সকাল থেকেই তাই মেঘ কাটতে শুরু করল। বিকেলে আকাশ পরিষ্কার। তবে ঝড়-বৃষ্টির দৌলতে বাতাসে বেশ একটা ঠান্ডা আমেজ। দিগন্তর দোতলার বারান্দায় আড্ডা জমেছে। দিগন্ত, প্রণয় আর অঞ্জলি তো আছেই। সস্ত্রীক বাচ্চুদাও এসেছে। মাছের চপ খাওয়া শেষ করে সুগন্ধী দার্জিলিং চা-এ চুমুক দিয়ে বাচ্চুদা বলল, দিগন্ত, এবার ভালো করে গুছিয়ে বল দেখি, ঠিক কী হল। চোখের সামনেই সব ঘটল, অথচ কিছুই বুঝতে পারলাম না।
বুঝতে পারার কথাও নয় বাচ্চুদা। কারণ পুরোটাই এত প্ল্যানমাফিক হয়েছে, এমন পাকা মাথার কাজ যে আসল সুতোটা যে কোথায় বুঝতে আমারও বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল। তবে এটাও ঠিক, প্রথমদিন তোমার অফিসে গিয়ে, যখন আমি বারান্দায় গেলাম, তখন প্রতীকের ওপর আমার একটা হালকা সন্দেহ হয়েছিল। সন্দেহটা জোর পায়নি প্রধানত দুটো কারণে। প্রথমত তুমি খুব জোরের সঙ্গে বলেছিলে যে ঘরের দরজা আর ড্রয়ারের এক সেট চাবি সবসময় তোমার কাছে থাকে। ডুপ্লিকেট গোছাটা থাকে বাড়িতে। চাবি যে তুমি কখনও টেবিলে ফেলে চলে যাও না আর ঘর থেকে বেরোনোর সময় দুটো দরজাই নিজে চেক করো, সেটা লক্ষ্মণও বলেছিল। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়াল যে বারান্দার দরজার চাবি খুলে ওঘরে ঢোকার কোনও সম্ভাবনা প্রতীকের নেই। আর ঘটনার দিন যে সময়টা তুমি ঘরে ছিলে না, তার মধ্যে প্রতীক ওই ঘরে ঢোকেনি। শুধু যে ঢোকেনি তাই নয়, সে যে নিজের ঘরেই ছিল তার প্রমাণও আছে। লক্ষ্মণ আর শঙ্করবাবু দুজনেই তাকে বাথরুমে যেতে অথবা আসতে দেখেছে। তার মনে লক্ষ্যবস্তু যেটা, সেখানে যে প্রতীকের অ্যাকসেস ছিল না এটা পরিষ্কার।
দ্বিতীয় কারণটা হল কাজের সুযোগ আর মোটিভ। এই দুটো একসঙ্গে বললাম, তার কারণ একটা পরস্পরের সঙ্গে রিলেটেড। একটু ভেবে দ্যাখো বাচ্চুদা, প্রতীককে এই কাজটা করার জন্য অ্যাপ্রোচ করতে পারে কারা? নিশ্চিত নিউ লাইফের রাইভ্যাল কোনও কোম্পানি। এখন কাজটা করার জন্য প্রতীক নিশ্চয় একটা মোটা অঙ্কের টাকা চাইবে। কারণ কোনও কারণে ধরা পড়ে গেলে তার তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার। প্রতীককে দেখলে বুদ্ধিমান ছেলে বলেই মনে হয়। যথেষ্ট প্রলোভন না থাকলে সে এই পথে পা বাড়াবে না। কিন্তু আবার প্রতীক যে পোস্টে কাজ করে, তার পক্ষে ফর্মূলাটা বার করা খুবই কঠিন ব্যাপার। সে এই গবেষণার ব্যাপারেও পুরোপুরি অনভিজ্ঞ। কাজটা হচ্ছে রীতিমতো গোপনীয়তা বজায় রেখে। বেশিরভাগ তথ্যের আদান-প্রদানই কম্পিউটারের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে টাকার লোভটা ওকে না দেখিয়ে, তোমাদের চারজনের কিংবা কোনও ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টকে দেখালে কাজ হাসিল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই সব ভেবেই আমার সন্দেহের তালিকায় প্রতীকের নামটা বেশ খানিকটা নীচে নেমে গেছিল। বরং প্রদীপবাবু এবং বিশেষ করে সুব্রত রায়কে নিয়ে বেশি চিন্তা-ভাবনা করছিলাম। শঙ্কর নাগও মোটেই সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, উনি খামটা আদৌ ঘরে রেখেছিলেন কি না, তারও তো কোনও প্রমাণ নেই।
প্রতীকের ওপর আমার সন্দেহটা শুরু হয়, যখন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রদীপবাবু বললেন, যে উনি যখন বইটা রাখতে গেছিলেন, তখন বাচ্চুদার ঘরটা নাকি সাধারণভাবে যতটা ঠান্ডা থাকে, তার থেকে কম ঠান্ডা ছিল। তাহলে কি ঘরের কোনও দরজা বা জানলা খোলা ছিল? প্রদীপবাবুর কথা মতো, তিনি যখন দরজার ল্যাচ খুলছিলেন, সেই সময় লক্ষ্মণ তাঁকে ডাকে। তিনি ল্যাচটা টেনে দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই লক্ষ্মণের সঙ্গে প্রায় মিনিট দশেক কথাবার্তা বলেন। তাহলে কি প্রদীপবাবু যখন ঘরে ঢুকতে যাচ্ছেন তখন ভিতরে কেউ ছিল যে তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে যায় এবং আওয়াজ হওয়ার ভরে পিছনের দরজা টেনে বন্ধ করে না? দরজাটা প্রায় মিনিট দশেক খোলা ছিল বলেই ঘরের টেম্পারেচার বেড়ে গেছিল? দরজায় ভারী পর্দা লাগানো। তাই খোলা থাকলেও প্রদীপবাবু হয়তো সেটা বুঝতে পারেননি।
সুব্রতবাবু যখন বললেন যে কার্পেটের ওপর একটা পেন পড়েছিল, তখন আমার সন্দেহটা আরও একটু ঘনীভূত হল। কিন্তু ঘরে যে এসেছিল, সে ঘরে ঢুকল কীভাবে? সামনের দরজা দিয়ে তো সম্ভব নয়, তার মানে নিশ্চয় পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছে। কিন্তু পিছনের দরজায় যেতে হলে প্রতীকের ঘরের ভিতর দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ঘরে তো প্রতীক ছাড়া আর কেউ ছিল না। তার মানে প্রতীকই আসলে বাচ্চুদার ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু সে চাবি পেল কোথায়?
প্রতীকের ওপর সন্দেহ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখনও কিন্তু আমি কিছুতেই এই প্রশ্নটার সমাধান করতে পারছিলাম না। উত্তর পেলাম লেক মার্কেটে গোদরেজ লকের দোকানে গিয়ে। বাচ্চুদা তোমার পিছনের দরজায় যে তালাটা লাগানো আছে, সেটার সঙ্গে দুটো নয়, তিনটে চাবি দেওয়া হয়। তোমার ইন্টিরিয়র ডিজাইনার সলিলবাবুকে ফোন করতে জানা গেল, দরজায় তালা বসানোর পর তিনি চাবি প্রতীকের হাতে দিয়েছিলেন। প্রতীক তখনই দুটো চাবি বাচ্চুদাকে দিয়ে একটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল। যেহেতু যে-কোনও তালার সঙ্গে সাধারণত দুটো চাবিই দেয়, তাই বাচ্চুদারও কোনও সন্দেহ হয়নি। এটা জানার পরই, প্রতীকই যে রিপোর্টটা সরিয়েছে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত হয়ে যাই। তবে তার আগে থেকেই ওর ওপর আমার সন্দেহ কেন বাড়ছিল সেটা বলি।
তোর নিশ্চয় মনে আছে প্রণয়, সেদিন প্রথম পর্বের জেরা শেষ করে আমি একবার পুরো ফ্লোরটা ঘুরে দেখেছিলাম। তখনও আমার একটা বিষয়ে খটকা লাগে। প্রতীকের ঘরের বাঁ-দিকে সিঁড়ি। তার পরেই বাথরুম। সাধারণভাবে প্রতীকের পক্ষে ওই টয়লেটটাই ব্যবহার করা সুবিধাজনক। কিন্তু সেদিন ও পুরো বারান্দা বরাবর হেঁটে, কনফারেন্স রুম পেরিয়ে উলটোদিকের টয়লেটে এসেছিল। আমার ধারণা, সেদিন শঙ্কর নাগ যে রিপোর্টটা বাচ্চুদার টেবিলে রেখে ফিরে গেলেন সেটা নিশ্চিত করার জন্যই প্রতীক ওই টয়লেটে গেছিল। কারণ ওই টয়লেটের ভিতর থেকে বাচ্চুদার ঘরে কে ঢুকছে-বেরোচ্ছে তার ওপর নজর রাখা যায়।
কিন্তু শঙ্কর যে আমার ঘরে যাবে সেটা প্রতীক জানল কী করে?
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিগন্ত বলল, এর উত্তর খুব সহজ। তুমি নিশ্চয় জানো, তোমার সহকর্মীদের অভ্যাস হল প্রথমেই এক্সটেনশন লাইনে ফোন করা। যদি তাতে তোমায় না পাওয়া যায়, তখন মোবাইলে ফোন করে। শঙ্করবাবুও সেদিন তাই করেছিলেন। তুমি ঘরে না থাকায় প্রতীক ফোন ধরে। ও জানত যে তুমি অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে গেছ। সেখানে তোমার বেশ খানিকটা সময় লাগবে। শঙ্কর নাগের যে সেদিন ভাগ্নীর বিয়ে সেটাও স্বাভাবিকভাবেই জানত। এখন বছর তিনেক তোমার সঙ্গে কাজ করার ফলে ও তোমার অভ্যাসগুলোর সঙ্গে পরিচিত। তাই বুঝতেই পেরেছিল যে শঙ্কর নাগ যদি তোমাকে বলে যে রিপোর্টটা তৈরি এবং ওনার বাড়ি যাওয়ার তাড়া আছে, তাহলে তুমি নির্ঘাত বলবে টেবিলে রিপোর্টটা রেখে যেতে। তবু ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ও বাথরুমে অপেক্ষা করছিল।
কিন্তু পুরো কাজটাই যদি যথেষ্ট গোপনীয়তার বজায় রেখে করা হয়ে থাকে, তাহলে শঙ্কর নাগ যে সেদিন ওই রিপোর্টটাই দিতে আসবেন সেটা প্রতীক জানল কী করে?
অঞ্জলির প্রশ্নে একটু হেসে এক টুকরো মাছের চপ চিবোতে চিবোতে দিগন্ত বলে, দ্যাট ইজ দ্য কোয়েশ্চন। প্রতীক জানল কী করে? এখানেই কাজটা যে ভীষণরকম প্ল্যানমাফিক হচ্ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তোমার মনে আছে বাচ্চুদা, তুমি বলেছিলে যে চিন্তামণি করের যে ছবিটা তোমার ঘরে টাঙানো আছে, সেটা প্রায়ই বেঁকে যায় আর প্রতীক সেটা সোজা করে?
হ্যাঁ, বলেছিলাম তো।
সেদিন তোমার কথা শুনে আমি ছবিটা যে পেরেকের ওপর ঝোলানো সেটা বাঁকা কিনা দেখতে গেছিলাম। তখন পেরেকের ওপর হাত দিয়ে দেখলাম একটা ছোট্ট, হাফ ইঞ্চি মতো চওড়া ভেলক্রো ধরনের জিনিস পেরেকটার ওপর জড়ানো আছে। পুলিশ যখন প্রতীককে জেরা করবে, তখন নিশ্চিত জানা যাবে, তবে আমার ধারণা ইদানীং বিভিন্ন স্টিং অপারেশনে যেরকম খুব ছোট্ট, কিন্তু শক্তিশালী টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করা হয়, সেই জিনিস প্রতীকের কাছে ছিল। ছবি ঠিক করার বাহানায় সে ওটা পেরেকের ওপর ভেলক্রোতে আটকে দিত। ফলে বাচ্চুদার ঘরে যা কথাবার্তা হচ্ছে সব রেকর্ড হত। প্রতীক সুযোগমতো সেটা খুলে নিয়ে শুনত, আবার লাগিয়ে রেখে দিত। তার মানে ফর্মূলা হাতে না পেলেও, কাজটা কতদূর এগিয়েছে, সেটা সম্বন্ধে ধারণা ওর ছিল। আর রিপোর্ট যে তৈরি হয়েছে এবং সেটা যে শঙ্করবাবু বাচ্চুদাকে দেবেন সেটাও আমার মনে হয় ওভাবেই জানতে পেরেছিল।
একদমই ঠিক আন্দাজ করেছিস দিগন্ত। কারণ তার আগের দিন সন্ধেবেলা শঙ্কর আমার ঘরে এসেছিল। তখনই আমরা রিপোর্টে কী কী কারেকশন হবে তাই নিয়ে ডিটেল আলোচনা করেছিলাম। আর শঙ্করও তখনই বলেছিল যে পরদিন বিকেলের মধ্যে ও রিপোর্টটা আমাকে দিয়ে দেবে। এখন আমার মনে পড়ছে সেদিন সকালেও আমার ঘরে এসে প্রতীক ছবিটা ঠিক করেছিল।
বাচ্চুদা রীতিমতো উত্তেজিত। দিগন্ত একটু হেসে বলে, তাহলে তো এখানে দুয়ে দুয়ে চার হয়েই গেল। প্রতীক রিপোর্টটা চুরি করার সময়, টেপরেকর্ডারটাও খুলে নিয়েছিল। কিন্তু মনে হয় তাড়াহুড়োতে ভেলক্রোটা খুলতে পারেনি। কারণ ও জানত পুলিশে খবর দিলে ঘর সার্চ হতে পারে। যদিও ওর ঘর সার্চ করে কিন্তু টেপরেকর্ডার পাওয়া যায়নি। আমার ধারণা, ওটা ও কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে দিয়েছে।
তবে প্রতীকের সঙ্গে কথা বলার সময় কিন্তু আমার ওর ওপর সন্দেহটা জোরালো হয়। কারণ ও দুটো বোকামি করেছিল। প্রথমত ও যে আমাকে চিনতে পেরেছে সেটা প্রকাশ করে ফেলেছিল। প্রতীক আমাকে বলে যে ভিজিটার্স বুকে আমার নাম দেখেছে। কিন্তু সাধারণভাবে তো ভিজিটার্স বুক ওর দেখার কথা নয়। তার মানে বাচ্চুদার কাছে কে কে আসছে, সেটার ওপর ও নজর রাখছিল। এ ছাড়া বলেছিল মিকি মোটো নেকলেস উদ্ধারের যে খবর কাগজে বেরিয়েছিল, সেটা দেখে নাকি আমাকে চিনতে পেরেছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে খবরে নাম থাকলেও যে ছবিটা বেরিয়েছিল, তাতে অনেকের ভিড়ে সহজে আমাকে আলাদা করে চেনা মুশকিল।
আসলে আমি যখন সেদিন বিকেলে এসে দীর্ঘক্ষণ বাচ্চুদার সঙ্গে বন্ধ ঘরে কথাবার্তা বলি, তখনই ওর সন্দেহ হয়। ভিজিটার্স বুকে আমার নামটা দেখে ও নিশ্চয় যথাযোগ্য জায়গায় জানিয়েছিল। তার ফলে সেদিন যখন আমরা বাড়ি ফিরছি, তখনই একজন মোটরবাইক নিয়ে আমাদের ফলো করে। আমার পরিচয় জানার পর উড়ো চিঠিতে হুমকি দিয়ে ভয় দেখানোরও চেষ্টা হয়।
দ্বিতীয় ভুল যেটা প্রতীক সেদিন করেছিল, সেটা হল নিজেকে গ্রামের ছেলে বলে ফেলা। যে ছোটবেলা থেকে কলকাতা শহরে বড় হয়েছে, তার দেশের বাড়ি গ্রামে হলেও সে নিজেকে গ্রামের ছেলে বলবে না। ফলে ওর কথা শুনে আমার খটকা লাগে। আচ্ছা বাচ্চুদা হাওড়ার উনসানির কাছে ক্ষীরপুরা গ্রামে যে ওর বাড়ি সেটা কি তুমি জানতে?
বাচ্চুদা খুব মন দিয়ে দিগন্তর কথা শুনছিল। হঠাৎ এহেন প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে গিয়ে ঘাড় নেড়ে বলল, না, তা তো জানতাম না। হাওড়ায় পৈতৃক বাড়ি এরকম দু-একবার শুনেছি। এমনিতে তো সন্তোষপুরে থাকে।
হ্যাঁ। ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে। তবে সেটা চাকরি পাওয়ার পর। কলেজে পড়ার সময় ও ক্ষীরপুরা থেকেই যাতায়াত করত।
কিন্তু প্রতীকের উনসানির বাড়ির সঙ্গে এই ঘটনার কী সম্পর্ক?
সম্পর্ক আছে। খুব নিগূঢ় সম্পর্ক। প্রতীক গড়াইয়ের বাবার নাম হল হারাধন গড়াই। আর এই হারাধন গড়াইয়ের জ্যাঠতুতো দাদা হলেন নীলমণি গড়াই। নীলমণি গড়াই কে তুমি নিশ্চয় জানো?
বাচ্চুদার চোখ বিস্ফারিত, নীলমণি গড়াই। কী বলছিস রে। সে তো সেভ লাইফের মালিক।
এগজ্যাক্টলি। নীলমণি গড়াই তোমাদের অন্যতম কম্পিটিটর সেভ লাইফের মালিক। আর তাঁরই দূরসম্পর্কের ভাইপো হল প্রতীক গড়াই। ক্ষীরপুরা গ্রামে ওদের পাশাপাশি বাড়ি। সন্তোষপুরে যে ফ্ল্যাটে প্রতীক থাকে, সেটার আসল মালিক নীলমণি গড়াইয়ের স্ত্রী রূপা গড়াই। এবার তুমি পরপর মিলিয়ে নাও। তোমাদের এই নতুন রিসার্চ ওয়ার্কের কাজটা শুরু হওয়ার একবছরের মধ্যে প্রতীক এখানে জয়েন করেছে। তার মানে ততদিনে তোমরা যে একটা বেশ অন্য ধরনের কাজের জন্য গবেষণা করছ, সেই খবরটা বাজারে ছড়িয়েছে। তাই তোমাদের ওপর নজর রাখা দরকার ছিল। আমার ধারণা প্রতীককে যাতে এই পোস্টটাতে নেওয়া হয় সেজন্য স্ট্রং রেকমেন্ডেসন ছিল, যেটা নীলমণি গড়াই কলকাঠি নেড়ে করেছিলেন। বাচ্চুদা যেভাবে মাথা নাড়লেন, তাতে বোঝা গেল দিগন্তর অনুমান পুরোপুরি ঠিক।
প্রতীক নিজে বটানি অনার্স পড়েছে। তা ছাড়া পারিবারিক ব্যবসার সূত্রে এই ধরনের রিসার্চ ওয়ার্ক সম্পর্কে ওর একটা ধারণাও নিশ্চিত আছে। তাই তোমাদের কথাবার্তা শুনে এবং তোমার ঘরে যেসব ফাইলপত্র আসে, সেগুলো সুযোগ-সুবিধামতো পড়ে, কাজ কীভাবে এগোচ্ছে তার একটা ফিডব্যাক ও নীলমণি গড়াইকে নিয়মিত দিত। পাশাপাশি তোমার বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জনেরও চেষ্টা করত। কারণ ও বুঝে গেছিল যে তুমি সিধে লোক। তোমার বিশ্বাস যদি অর্জন করতে পারে, তাহলে ওর পক্ষে ইনফরমেশন জোগাড় করা অনেক সহজ হবে।
হয়েওছিল তাই। লক্ষ্মণের কাছে আমরা জেনেছি, তোমার ঘরের যখন ইন্টিরিয়রের কাজ হচ্ছিল, তখন অনেক ফাইলই ওর ঘরে রাখা হয়েছিল। সেই সব ফাইলপত্র থেকে ও আন্দাজ করতে পারে যে গবেষণা প্রায় শেষের পথে। আমার ধারণা এর পরেই ও ঘরে মাইক্রোফোন লাগানোর ব্যবস্থা করে। তবে মিঃ আলম বোর্ড মিটিংয়ের জন্য হার্ড কপি চাওয়াতে, নিশ্চিত ওর অনেকটা সুবিধা হয়ে গেছিল। না হলে হয়তো তোমার ল্যাপটপ থেকে ডাটা পাচারের চেষ্টা করত। আমার মনে হয় তুমি ঘরে না থাকলে সেরকম চেষ্টাও হয়তো করেছে।
সেটা কঠিন। কারণ আমি ঘর থেকে বেরোলে সব সময় ল্যাপটপ লক করে যাই।
বাচ্চুদার উত্তর শুনে একটু চুপ করে থেকে আর এক চুমুক চা খেল দিগন্ত। তারপর বলল, সেজন্যই শঙ্কর নাগ সেদিন হার্ড কপিটা দেবেন শুনে প্রতীক ওটাকে চুরি করবে ঠিক করে ফেলে। ওর বোধহয় ইচ্ছে ছিল, কপিটা নিয়ে ঘরে এসে হোয়াটস অ্যাপে ছবি তুলে ওটাকে আবার তোমার টেবিলে রেখে আসবে। সেটা করতে পারলে কিছুই ধরা যেত না। কিন্তু প্রদীপবাবু এবং সুব্রতবাবু পরপর ঘরে ঢোকায় ওর একটু অসুবিধা হয়ে যায়। কারণ দরজাটা বন্ধ না করে ও ঘরে ফিরতে পারছিল না। ইতিমধ্যে বাচ্চুদা ফিরে আসে। সিকিউরিটিকে চেকিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। অবস্থা দেখে প্রতীক ঠিক করে, আপাতত এটা লুকিয়ে ফেলা যাক। পরে সুবিধামতো ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু মাঝখানে আমি ঢুকে পড়ায় সবটাই একটু গোলমাল হয়ে যায়।
কিন্তু খামটা লুকিয়েছিল কোথায়? ওর ঘর সার্চ করে তো কিছু পাওয়া যায়নি। সেদিন বিকেলে ওটা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসেছিলই বা কেন?
এতক্ষণ পরে প্রণয়কে মুখ খুলতে দেখে একটু ফিচেল হেসে দিগন্ত বলে, ওটা কোথায় রেখেছিল, পুলিশি বুদ্ধিতে সেটা বোঝা একটু কঠিন। প্রতীকই যে কালপ্রিট সেটা বোঝার পরও আমি খামটা ও কোথায় লুকিয়েছে সেটা বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু নিজের ঘরে যে রাখেনি সেটা নিশ্চিত ছিলাম। কারণ এই ধরনের ক্ষেত্রে অপরাধীর প্রবণতাই হয়, এমন জায়গায় জিনিসটা রাখা, যাতে যদি কেউ খুঁজে বার করে ফেলে, তাহলে সরাসরি তাকে দায়ী করা যাবে না।
প্রতীকের যেহেতু বাগান, গাছপালা এসবে আগ্রহ আছে, তাই সেদিন ছবি তোলার অজুহাতে আমি প্রায় পুরো বাগানটাই খুব ভালো করে ঘুরে দেখেছিলাম। তা ছাড়া প্রতীকের পক্ষীপ্রেমও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে পাখির বাসার জন্য গাছে টাঙানো হাঁড়িগুলো। কিন্তু যে হাঁড়ি টাঙাতে ফায়ার ব্রিগেনের মই আনতে হয়েছে, তাতে কিছু রাখতে হলেও তো মই লাগবে। যদি না প্রতীক নিজে গাছে চড়ে। তবে সেরকম ঘটনা তো আর লোকচক্ষুর আড়ালে ঘটানো যায় না। সুতরাং সেটা বাদ দেওয়াই উচিত। তবু আমার মন খুঁতখুঁত করছিল বলে আমি পরমেশবাবুর সঙ্গে পাশের স্টাফ কোয়ার্টারের বারান্দায় গেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ক্যামেরা জুম করে পাখির বাসাগুলোর কয়েকটা ছবি তোলা। আর সেই কাজ করতে গিয়েই চিচিং ফাঁক।
কীরকম কীরকম? উত্তেজনায় অঞ্জলির প্রায় গলা বন্ধ হয়ে এসেছে।
মুখে বললে হবে না, দেখাচ্ছি দাঁড়াও।
দিগন্ত ঘর থেকে নিজের ল্যাপটপটা নিয়ে এসে খুলে একটা ছবি বার করে, এই দ্যাখো এটা হল স্টাফ কোয়ার্টার থেকে তোলা বাচ্চুদার ঘরের বারান্দার ছবি। এই শিরীষ গাছের মোটা কাণ্ডটা বারান্দার একেবারে গা ঘেঁষে উঠেছে। তাকে জড়িয়ে রয়েছে মাধবীলতার ঝাড়। এবার দ্যাখো, ছবিটা আমি জুম করছি। বাচ্চুদা দ্যাখো। প্রণয় দেখতে পাচ্ছিস কিছু?
গাছের গায়ে একটা কোটর। অস্ফুট স্বরে বলে প্রণয়।
তার মধ্যে একটা কিছু রয়েছে তাই না?
অঞ্জলির কথায় ঘাড় নাড়ে দিগন্ত, ঠিক বলেছ। ওটাই হল রিপোর্টের এনভেলপটা। একটা বাদামি রঙের প্যাকেটে ভরে ওখানে গুঁজে দিয়েছিল প্রতীক। কোটরটা এমন জায়গায় যে বারান্দা থেকে ওটা দেখা যায় না। মাধবীলতার ঝাড়ের জন্য নীচ থেকেও দেখা অসম্ভব। প্যাকেটটার মুখে একটা হলুদ রঙের স্ট্রাইপ আছে বলে ছবিতে ওটা আইডেন্টিফাই করতে পেরেছি আমি। না হলে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল। আমার ধারণা প্রতীকের গাছপালা-পাখপাখালিতে ইন্টারেস্ট বলে ওই কোটরটার অস্তিত্ব ওর জানা ছিল। আর প্রয়োজনে ওখানে রিপোর্টটা লুকোবে বলে বাদামি রঙের প্যাকেটটা সঙ্গে রেখেছিল। তবে শিরীষ গাছের গুঁড়িটা কিন্তু যথেষ্ট মোটা। প্রতীকের হাতগুলো অস্বাভাবিক লম্বা বলেই ও কাজটা অত দ্রুত আর ঠিকঠাক করতে পেরেছিল। সাধারণ লোকের পক্ষে ওখানে হাত পাওয়াটা কঠিন।
ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিগন্ত বলে, ছবিটা দেখেই আমি বুঝেছিলাম যে রিপোর্টটা ওখানে আছে। কিন্তু প্রতীককে ফাঁসাতে হলে হাতেনাতে ধরতে হবে। না হলে ওই যে অপরাধী সেটা প্রমাণ করা কঠিন। তাই প্রথমেই প্রণয়কে বলেছিলাম স্টাফ কোয়ার্টারের বারান্দায় একটা পাহারা বসাতে। যাতে ও যদি প্যাকেটটা বার করে তাহলে যেন সঙ্গে সঙ্গে আমরা খবর পাই। তবে এক্ষেত্রে নিশ্চিত আমাকে সবথেকে বেশি সাহায্য করেছে ঘূর্ণিঝড়। অঞ্জলির কাছে ঘূর্ণিঝড় আসছে শুনেই আমি বুঝেছিলাম প্রতীক যেমন করে হোক ঝড় আসার আগেই প্যাকেটটা ওখান থেকে বার করবে। কারণ ঝড়ের ধাক্কায় গাছ ভেঙে যেতে পারে, প্যাকেটটা উড়ে যেতে পারে। সেরকম ঝুঁকি ও কখনও নেবে না। প্যাকেটটা এনে হয়তো নিজের ঘরেই রাখত, কারণ ঘর তো একবার সার্চ করা হয়ে গেছে। তাই ওর আর চিন্তা ছিল না। এটা আন্দাজ করেই আমি বাচ্চুদাকে বলে ফাঁদ পেতেছিলাম। বুঝতেই পারছিলাম, বাচ্চুদা যে বাড়ি চলে গেছে এটা নিশ্চিত হলে তবে ও বারান্দায় যাবে প্যাকেট আনতে। পরমেশবাবুকে বলা ছিল। বাচ্চুদার ড্রাইভারকেও বলা হয়েছিল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে। সুতরাং প্রতীক নিশ্চিন্তে বারান্দায় এসে কোটর থেকে প্যাকেট বার করে নিয়েছিল। বাঘের ঘরে ঘোগের মতো আমরা যে লুকিয়ে বসে আছি ভাবতেই পারেনি। অতএব ক্যাচ কট কট।
ওরে বাবা। এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার। প্রতীককে দেখে তো কখনও এরকম মনেই হয়নি।
প্রতীকের যে ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং অত্যন্ত স্ট্রং নার্ভ, সেটা কথা বলার সময়ই আমি টের পেয়েছিলাম। তবে এটাও ঠিক বাচ্চুদা, অন্য কেউ টাকার লোভে এই ধরনের কাজ করলে, তার যে ধরা পড়লে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার ভয়টা থাকে সেটা ওর ছিল না। ও জানে জেঠাই ওকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাবে, পারিবারিক ব্যবসাতেই ভবিষ্যতে কাজ করবে। তবে বুদ্ধি যে সাংঘাতিক সেটা স্বীকার করতেই হবে।
বাচ্চুদার মোবাইলটা বাজছিল। মিঃ আলমের ফোন। কথা বলে নিয়ে বাচ্চুদা বলল, মিঃ আলম আসছেন। দিগন্তর সঙ্গে কথা বলতে চান। বাড়ির ডিরেকশনটা দিয়ে দিলাম। কিছু প্রাপ্তিযোগ আছে মনে হচ্ছে।
আধঘণ্টার মধ্যেই এসে পড়লেন মিঃ আলম। আর এক প্রস্থ চা ততক্ষণে তৈরি। দিগন্তকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে মিঃ আলম বললেন, আপনি আমাদের যে কী উপকার করেছেন তা বলে বোঝাতে পারব না। তাই কোম্পানির তরফ থেকে আপনাকে একটা সামান্য পঁচিশ হাজার টাকার সাম্মানিক আমরা দিতে চাই…
তাঁর কথার মাঝখানেই বাধা দিয়ে দিগন্ত বলল, না, মিঃ আলম টাকাটা আমি নেব না…
কেন বলুন তো মিঃ দেব, আমাদের তরফে কোনও…
না, না একেবারেই সেরকম কিছু না। আমি চাই এই টাকাটা আপনি আমার হয়ে বাচ্চুদার ঘরের যে পাহারাদার সেই লক্ষ্মণ নস্করকে দিন। ওর মেয়েটি এবার মাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। কিন্তু লক্ষ্মণের দুশ্চিন্তা যে ও হয়তো টাকার অভাবে মেয়েকে ঠিকমতো পড়াতে পারবে না।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন মিঃ আলম। তারপর গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বললেন, চেকটা আপনি নিন মিঃ দেব। আমি আপনাকে কথা দিয়ে যাচ্ছি, লক্ষ্মণ নস্করের মেয়ের পড়াশোনা এবং হায়ার স্টাডিজের জন্য যা খরচ লাগবে, নিউ লাইফ কোম্পানি দেবে। আমি নিজে বোর্ড মিটিংয়ে পাস করাব।
অঞ্জলি এবার সদ্য ভেজে আনা মাছের চপের প্লেটটা মিঃ আলমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, চপ নিন মিঃ আলম। নিউ লাইফের আবিষ্কৃত ডায়াবেটিসের নতুন ওষুধ আর দিনু টিকটিকির সাফল্যের অনারে ভাজা, গরম মাছের চপ। বানানোর ফর্মূলা সম্পূর্ণ গোপনীয়।
