মরণোত্তম – ৮

কবি আসাদের অদ্ভুত একটা অসুখ করেছে। সেই অসুখের নাম ‘আজিজ মাস্টার অসুখ’। সে আজিজ মাস্টারকে না দেখলে কবিতা লিখতে পারে না। আজিজ মাস্টারকে বাস্তবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাঁকে দেখতে হয় স্বপ্নে। স্বপ্নে তিনি আসাদকে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। সেইসব কথাই কেমন কেমন করে যেন আসাদের কলমে কবিতা হয়ে যায়। সমস্যা হচ্ছে, ইচ্ছে করলেই যখন তখন আজিজ মাস্টারকে স্বপ্ন দেখতে পারে না আসাদ। আজিজ মাস্টারকে স্বপ্ন দেখতে হলে তাকে আজিজ মাস্টারের গ্রামে যেতে হয়। গিয়ে তাঁর কবরের কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তা আসাদ যায়ও। প্রায়ই সে আজিজ মাস্টারের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর কবরের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁর সঙ্গে মনে মনে কথা বলে। খুবই আশ্চর্য ঘটনা, সেই রাতেই সে আজিজ মাস্টারকে স্বপ্ন দেখে। আর তার পরদিন খাতা ভরে কবিতা লিখতে থাকে সে।

মাঝেমধ্যে আসাদের সঙ্গে রফিকুলের কথা হয়। রফিকুল আজিজ মাস্টারের মেজ মেয়ে রুমুকে বিয়ে করেছে। দবির খাঁ মেমোরিয়াল হাই স্কুলের বাংলার শিক্ষক হিসেবে তার সুনামও হয়েছে। শোনা যাচ্ছে আজিজ মাস্টারের নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলে রফিকুল সেখানে বাংলার প্রভাষক হিসেবে চাকরিও পেয়ে যাবে।

আসাদ এলে রফিকুল প্রায়ই আসাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এটা সেটা জিজ্ঞেস করে। আজও এল। অনেকক্ষণ আজিজ মাস্টারের কবরের পাশে আসাদের সঙ্গে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে শেষে বলল, ‘একটা ঘটনা শুনেছেন আসাদ ভাই ?’

‘কী ঘটনা ?’

‘স্যারকে নাকি পুরস্কার দেওয়া হবে ?’

‘কোন স্যারকে ?’

‘যার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।’

‘ওহ, আচ্ছা।’ আসাদ আগ্রহ দেখায় না।

রফিকুল আবার বলে, ‘কথা সত্যি। আমাকে সেদিন আমাদের লোকাল এমপি সাহেব জানালেন। তিনি বড় মন্ত্রী-আমলাদের কাছে এই নিয়ে তদবিরও করেছেন। বিষয়টিকে সবাই পজেটিভলি নিয়েছে।’

‘হুম।’

‘আরে বুঝলেন না! এটার একটা পলিটিক্যাল ভিউও তো আছে!’

‘কী রকম ?’

‘স্যার তো এখন একভাবে জাতীয় আইকন। উনাকে একটা পুরস্কার দেওয়ার মানে তো সরকারেরই লাভ। পাবলিক সিম্প্যাথিও পেল। বুঝলেন না ?’

‘হুম।’

‘তবে যেই সেই পুরস্কার না কিন্তু, দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কার।’

‘পুরস্কার উনাকে কীভাবে দিবে ?’

‘কীভাবে দিবে মানে ?’

‘না মানে উনার লাশ কবর থেকে তুলে পুরস্কার প্রদানের মঞ্চে নিয়ে যাবে ? নাকি উনারা কবরের কাছে এসে লাশের গলায় পরিয়ে দিয়ে যাবেন ?’

‘মানে! কী যা তা বলছেন আপনি ?’ রফিকুল যেন খানিক বিরক্ত হলো।

আসাদ অবশ্য জবাব দিল না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে মেঘ। যে-কোনো সময় তুমুল বৃষ্টি শুরু হবে। রফিকুল বলল, ‘স্যারের এত বড় প্রাপ্তিতে আপনি খুশি হন নি ?’

‘খুশি হব না কেন ? হয়েছি।’

‘তাহলে ?’

‘তাহলে কী ?’

‘এমন নির্বিকারভাবে জবাব দিচ্ছেন কেন ?’

‘কী করব তাহলে ?’

‘একটু খুশি হবেন। মুখ ভার করে থাকবেন না।’

‘আপনার কী মনে হয়, আপনার স্যার এই খবর পেলে তিনি কীভাবে জবাব দিতেন ?’

‘উনি খুবই খুশি হতেন।’

‘কী কী কারণে খুশি হতেন ?’

‘এই যে কোহিনুরের ঘটনার বিচার হলো, নুরুল মোল্লার যথাযথ বিচার হলো। উনার স্কুল এমপিওভুক্ত হলো। কলেজ হলো। উনি এত বড় পুরস্কার পেলেন।’

‘আচ্ছা।’

‘আচ্ছা মানে ?’

আসাদ একদলা থুথু ফেলে বলল, ‘আচ্ছা মানে আচ্ছা।’

সে পেছন ফিরে হাঁটা দিল। রফিকুল তার পিছু পিছু আসতে লাগল। আসাদ আচমকা রফিকুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার স্যার কেমন লোক ছিলেন ?’

‘তাঁর মতো ভালো লোক আমি আর এই জীবনে দেখি নাই।’

‘তাহলে আপনার স্যারকে যদি বলা হতো, এই দেশে একটা ধর্ষণের বিচার পাওয়ার বিনিময়ে, একজন জঘন্য অপরাধীর অপরাধের শাস্তি পাওয়ার বিনিময়ে একজন নিরপরাধ মানুষকে প্রকাশ্যে জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরতে হবে, তাহলে আপনার স্যার খুশি হতেন ?’

রফিকুল চোখ তুলে তাকাল। আসাদ বলল, ‘সব শর্ত পূরণ করার পরও, যোগ্য হওয়ার পরও কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে কেউ একজন সেই স্কুলটা বন্ধ করে রাখবে দিনের পর দিন। আর সেই স্কুলের এমপিওভুক্তির জন্য সেই স্কুলেরই একজন শিক্ষককে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরতে হবে, এটা শুনলে আপনার স্যার খুশি হতেন ?’

রফিকুল জবাব দিল না। আসাদ বলল, ‘তিনি আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করার পর তাঁর সেই মৃত্যুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের কাজে ব্যবহার করার জন্য কেউ তাঁকে এত বড় একটা পুরস্কার দিবেন, এটি শুনলে তিনি খুশি হতেন ?’

রফিকুল এবারও জবাব দিল না। আসাদ বলল, ‘ওই পুরস্কারের গায়ে এটা লেখা থাকবে না যে “আজিজুর রহমান, মরণোত্তর” ?’

‘জি, তা তো থাকবেই। মৃত্যুর পরে পেলে তো মরণোত্তরই লেখা থাকবে। সেটাই তো স্বাভাবিক।’

‘ওটা কেটে একটা শব্দ লিখে দিতে বলতে পারবেন ?’

‘কী শব্দ ?’

‘মরণোত্তম।’

‘মরণোত্তম ?’

‘হুম।’

‘কেন ? মরণোত্তম মানে কী ?’

‘মরণোত্তমের কোনো মানে নেই। কিংবা আছে।’

‘কী মানে ?’

‘যেখানে জীবনের চেয়ে মৃত্যু উত্তম। মরণই উত্তম। জীবিত মানুষটির চেয়ে মৃত মানুষটি যেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে মরণই তো উত্তম। কি, উত্তম না ?’

রফিকুল জবাব দিল না। তবে আসাদ আবারও থুথু ফেলল। একদলা থকথকে থুথু। থুথুটুকু পড়েছে ঘাসের ওপর। থকথকে গা-ঘিনঘিনে একদলা থুথু। ততক্ষণে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। তারা দুজনই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই গা-ঘিনঘিনে থুথুটুকুর দিকে। এই বুঝি বৃষ্টিতে ওই গা-ঘিনঘিনে থকথকে থুথুটুকু ধুয়ে যায়!

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *