মরণোত্তম – ৭

আজিজ মাস্টারের লাশ রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। তিনি মারা গেছেন গতকাল রাতে। খবর পেয়ে গ্রাম থেকে রফিকুল এসেছে। রফিকুলের সঙ্গে এসেছে আজিজ মাস্টারের স্ত্রী এবং সন্তানরাও। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তারা কেউই এখনো লাশ দেখতে পারেন নি। এমনকি হাসপাতাল থেকে লাশ বেরও করা যায় নি। না করার পেছনে সঙ্গত কারণও রয়েছে। হাসপাতালের বাইরে অসংখ্য মানুষ ভিড় করেছে। মানুষের ভিড়ে গিজগিজ করছে চারপাশ। হাজার হাজার মানুষ। আজিজ মাস্টারের মৃত্যুর ঘটনা এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ভিডিও ও ছবিসহ এই সংবাদ প্রচার হয়েছে।

গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় আজিজ মাস্টারকে নিয়ে অসংখ্য পোস্ট গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। টুইটার, ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ সকল মাধ্যমে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্পেশাল বুলেটিন প্রচার করেছে তাঁকে নিয়ে। দেশের বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা একের পর এক টকশোতে কথা বলেছেন তাঁর প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে। মুহুর্মুহু শ্লোগান উঠেছে রাজপথে।

সংবাদপত্রগুলো তাদের খবরের প্রধান শিরোনাম করেছে আজিজ মাস্টারের ছবি ও আত্মহত্যার খবর দিয়ে। ফেসবুকে হাজার হাজার প্রতিবাদী ইভেন্ট খোলা হয়েছে। সেই ইভেন্টে সাড়া দিয়ে ঢাকা শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রীর ধর্ষণের বিচার না পেয়ে প্রতিবাদ হিসেবে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে, এরচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা আর কী হতে পারে!

মানুষের মুখে মুখে একই প্রশ্ন, ‘কোন বিচারহীনতার দেশে আমরা বাস করছি ? এ কোন দেশ, যেখানে ধর্ষকমাত্রই শক্তিশালী হয়ে ওঠে ? আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়! অপরাধীমাত্রই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে ? আরও শক্তিশালী হয়ে আরও অপরাধ করার ম্যান্ডেট পেয়ে যায়!’

আজিজ মাস্টার জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার সময়ও বোঝা যায় নি ঘটনার প্রভাব এত তীব্র হতে পারে! পুলিশ ভেবেছিল, আর দশটা অপঘাতে মৃত্যুর মতোই আজিজ মাস্টারের মৃত্যুও খানিক আফসোসের হবে, খানিক হাহাকার, আক্ষেপ আর প্রতিবাদের হবে। তারপর সব শান্ত হয়ে যাবে। ঠিকঠাক হয়ে যাবে। কিন্তু আজিজ মাস্টারের মৃত্যুর তৃতীয় দিন সকাল নাগাদ বোঝা গেল এই ঘটনা আর আট-দশটা ঘটনার মতো নয়। রাতভর ঢাকা মেডিকেল থেকে শহিদ মিনার, টিএসসি থেকে শাহবাগ। বুয়েট থেকে পলাশী, ইডেন, নিউমার্কেট হাজার হাজার মানুষ জেগে রইল রাজপথে। তাদের মিছিলে-শ্লোগানে প্রকম্পিত হতে লাগল শহর। অবরুদ্ধ হয়ে রইল রাজপথ। কিন্তু তা নিয়ে মানুষের কোনো অভিযোগ নেই। বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মানুষ অংশ নিতে থাকল এই জন জমায়েতে।

আজিজ মাস্টার যেন মুহূর্তেই হয়ে উঠলেন সমগ্র বাংলাদেশের সকল মানুষের প্রতিবাদের এক ও অদ্বিতীয় প্রতিনিধি।

পুলিশ কমিশনার জরুরি সভা ডাকলেন। কিন্তু সেই সভায় এই সমস্যার কোনো সমাধান মিলল না। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হলো। পরপর দুদিন শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট বন্ধ থাকার কারণে যানজটে স্থবির হয়ে গেল শহর। সকল অফিস-আদলত বন্ধের উপক্রম হলো। রাষ্ট্রীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও সম্পাদিত হতে পারল না। অফিস-আদালত অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগন্তি বাড়ল অনেক মানুষের।

পুলিশ প্রথম দিকে চেষ্টা করেছিল লাঠিচার্জ, টিয়ারশেলের মতো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রাস্তা থেকে মানুষকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু এটি হিতে-বিপরীত হলো। মানুষ আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে লাগল। শুরু হলো গগনবিদারি শ্লোগান। সেই শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠতে লাগল শহরের রাজপথ, গলিমুখ, বিষণ্ণ আকাশ। মিছিলে আজিজ মাস্টারের বড় বড় ছবি দেখা গেল। সেই ছবির নিচে কবিতার দুটো লাইন খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল।

‘সেই সে মিছিলে, তুমিও কি ছিলে, নাকি ছিল শুধু একা কেউ ?

 জেনে রেখো আজ, একা এ আওয়াজ, হবে শত সহস্র ঢেউ!’

কবিতাটা লিখেছে কবি আসাদ। সেদিন আজিজ মাস্টারের ঘটনা টিভিতে শোনার পর সে পাগলের মতো ছুটে এসেছিল প্রেসক্লাবে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। আজিজ মাস্টারকে সরাসরি একপলক দেখতেও পারে নি সে। তবে ততক্ষণে ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিভিশনসহ সবখানে অসংখ্য ছবি ছড়িয়ে পড়েছে আজিজ মাস্টারের। ফেসবুকের ভায়োলেন্স সংক্রান্ত পলিসির কারণে তাঁর আগুনে পোড়া বেশির ভাগ ছবিই মুছে ফেলেছে তারা। তবে গায়ে কেরোসিন ঢেলে এক হাতে মশাল আর গলায় ‘আমিই কোহিনুরের বাবা। কোহিনুর আমার কন্যা। আমি তার ধর্ষণ ও হত্যার বিচার চাই’ লেখা ব্যাকবোর্ড ঝোলানো আজিজ মাস্টারের ছবিটি আসাদ দেখেছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো সেই ছবি দেখে বহুকাল পরে তার মাথায় কবিতা চলে এল। সে ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করে তার নিচে সে সেই দুই লাইন কবিতা লিখে দিল—

‘সেই সে মিছিলে, তুমিও কি ছিলে, নাকি ছিল শুধু একা কেউ ?

জেনে রেখো আজ, একা এ আওয়াজ, হবে শত সহস্র ঢেউ!’

সত্যি সত্যি নিঃসঙ্গ এক আজিজ মাস্টারের একা মিছিলের নিঃশব্দ আওয়াজ যেন ক্রমশই শত সহস্র মানুষের কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদের ঢেউ হয়ে উঠতে লাগল।

ঘটনার তৃতীয় দিন রাতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ডাকলেন। দীর্ঘ মিটিং শেষে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে থমথমে মুখে বের হয়ে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেইদিন রাতেই কোহিনুর ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ চেয়ারম্যান নুরুল মোল্লা। সঙ্গে গ্রেপ্তার হলো তার ছেলে রাকিব ও তার সাঙ্গপাঙ্গরাও। অভিযুক্তের মামলা না নেওয়া ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা হলো স্থানীয় ওসিকেও।

সপ্তাহখানেকের মাথায় দবির খাঁ মেমোরিয়াল হাই স্কুল এমপিওভুক্ত করল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতকিছুর পরও অবশ্য আজিজ মাস্টারের ঘটনা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ স্তিমিত হলো না। তাঁকে নিয়ে ক্রমাগত লেখা হতে লাগল পত্রিকায়। টেলিভিশন টক শোর অবধারিত টপিক হয়ে উঠলেন মৃত আজিজ মাস্টার। তাঁর সাহস, সততা, প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে গল্প, কবিতা, গান, নাটক, বই প্রকাশিত হতে লাগল। ঘটনার মাস দুয়েক পর সরকার থেকে ঘোষণা দেওয়া হলো দবির খাঁ মেমোরিয়াল হাই স্কুলের পাশেই আজিজ মাস্টার মেমোরিয়াল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। কারণ এই অঞ্চলে বহুদিন ধরেই একটি কলেজের খুব প্রয়োজন ছিল। যত দ্রুত সম্ভব সেই প্রয়োজন মেটানো হবে। কলেজের সামনে আজিজ মাস্টারের একটি আবক্ষ ভাস্কর্যও স্থাপন করা হবে। দেশসেরা একজন ভাস্কর সেই ভাস্কর্য তৈরি করবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *