মরণোত্তম – ৩

আজিজ মাস্টারের জ্বর সারতে সময় লাগল দিন তিনেক। এই তিন দিন তিনি পুরোটা সময় চুপ করে রইলেন। আসাদের শতসহস্র প্রশ্নের জবাবেও কোনো কথা বললেন না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন কেবল। আর মাঝে মাঝে নিঃশব্দে কাঁদলেন। সেই কান্নার জল যেন তিনি কাউকে দেখাতে চাইলেন না। বুকের অব্যক্ত যন্ত্রণা, হতাশা আর অসহায়ত্বের মতো সেই কান্নাও আড়াল করে রাখতে চাইলেন।

পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও সময় লাগল তাঁর। এক বিকেলে তাঁকে নিয়ে খোলা হাওয়ায় হাঁটতে বের হলো আসাদ। সে চেষ্টা করছে আজিজ মাস্টারের সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা বলার। এতে যদি কোনোভাবে তাঁর সঙ্গে সহজ হওয়া যায়। তাঁর ভেতরে লুকিয়ে রাখা একান্ত গোপন কিন্তু তীব্র যন্ত্রণাময় সেই ঘটনাটা জানা যায়। কিন্তু আজিজ মাস্টার কথা বলছেন খুব কম। সেদিনের ঘটনার পর থেকে ভেতরে ভেতরে অনেকটাই গুটিয়ে গেছেন তিনি। এক প্রশ্ন দুবার তিনবার করলেও উত্তর দেন না। নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকেন কেবল।

আসাদ তার সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করছে তাঁকে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। শেষে সরাসরিই কোহিনুরের প্রসঙ্গটা তুলল সে, ‘কোহিনুর কে স্যার ?’

এই প্রশ্নে আজিজ মাস্টার যেন চমকে গেলেন। তিনি ঝট করে মুখ ফিরিয়ে তাকালেন। তারপর তাকিয়ে রইলেন একদৃষ্টিতে। তবে কোনো কথা বললেন না। আসাদ প্রশ্নটা আবারও করল, ‘কোহিনুর কে স্যার ? কী হয়েছিল তার ?’

আজিজ মাস্টার যেন নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘কোন কোহিনুর ?’

‘যেই কোহিনুরের জন্য আপনি ঢাকায় এসেছেন।’

‘আমি কেন কোহিনুরের জন্য ঢাকায় আসব ?’

‘সেটা আপনিই ভালো জানেন স্যার।’

‘নাহ, আমি কিছু জানি না।’

‘তাহলে আপনি ঢাকায় এসেছেন কেন ?’

‘কেন আবার! আমি ঢাকায় আসছি আমার স্কুলের জন্য।’

আসাদ হাসল, ‘আমার কাছে কিছু লুকিয়ে লাভ নেই স্যার। এই তিন দিন আপনি জ্বরের ঘোরে ঘুমের মধ্যে অনেক এলোমেলো কথা বলেছেন। তা ছাড়া আপনার ব্যাগের ভেতর একটা ব্যানারও আছে।’

‘ব্যানার ?’

‘হু। হলুদ একটা ব্যানার। সেটার উপর কালো কালিতে বড় বড় অক্ষরে কিছু কথা লেখা। আপনি মূলত ওই ব্যানারটা টানিয়ে, ওই ব্যানারের দাবি আদায়ের জন্যই অনশন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে সেটি করতে পারেন নি।’

আজিজ মাস্টার কথা বললেন না। চুপচাপ বসে রইলেন। তিনি বুঝতে পারছেন যে ধরা পড়ে গেছেন। এখন আর বিষয়টি লুকানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। তারপরও তিনি নানাভাবে চেষ্টা করলেন বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার, নানান ব্যাখ্যা দেওয়ার। কিন্তু তাতে লাভ বিশেষ হলো না। কিছুতেই সন্তুষ্ট হলো না আসাদ। বরং আজিজ মাস্টারের কাঁধে হাত রেখে সে নরম গলায় বলল, ‘আপনি আমাকে এখনো অবিশ্বাস করেন ?’

আজিজ মাস্টার ম্লান কণ্ঠে বললেন, ‘অবিশ্বাস করব কেন ?’

‘আমি স্যার মানুষের চেহারা দেখলেই অনেক কিছু বুঝতে পারি। প্রথম যেদিন আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম, আপনি খুব ভয় পাচ্ছিলেন আমাকে। কথা সত্য না ?’

আজিজ মাস্টার জবাব দিলেন না। আসাদ বললেন, ‘এতে অবশ্য আপনার দোষও নেই। ওই পরিস্থিতিতে ওভাবে কেউ নিজ থেকে গিয়ে ওরকম ভাবভঙ্গি করলে যে-কেউই ঘাবড়ে যাবে। আমি হলেও যেতাম। সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু স্যার, এখন তো আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। পারেন না ?’

আজিজ মাস্টার কথা না বললেও আসাদের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। তাঁর সেই চোখে আসাদের প্রতি একধরনের কৃতজ্ঞতা। আসাদ বলল, ‘আমি জানি আপনি আমাকে এখন আর অবিশ্বাস করেন না। কিন্তু তারপরও একটা দ্বিধা কাজ করছে। আমি জোর করব না আপনাকে। আপনার যদি নিজ থেকে মনে হয় যে কথাটা আপনি আমাকে বলতে চান, তাহলে বলতে পারেন। কোনো জোর নেই।’

আজিজ মাস্টার তবুও কথা বললেন না। আসাদ হঠাৎ আজিজ মাস্টারকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘আমি মানুষ চিনতে ভুল করি নি স্যার। আপনি খাঁটি মানুষ। ভেতরে ভেতরে একটা ভয়ংকর যন্ত্রণা আপনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। এই যন্ত্রণা থেকে আপনার মুক্তি দরকার। আর শুধু এ কারণেই ঘটনাটা আপনার কাউকে বলা দরকার। এমন না যে সেই ঘটনা আপনার কেবল আমার কাছেই বলতে হবে। আপনি যে-কারও কাছেই বলতে পারেন। আমার কাছেই বলতে হবে এমন কোনো কথা নেই।’

আজিজ মাস্টারের হঠাৎ কী হলো! তিনি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। আসাদ অবশ্য তাকে বাধা দিল না। কাঁদতে দিল। কাঁদার পরে নিজেকে সামলে নেওয়ারও সময় দিল। দীর্ঘসময় পর আজিজ মাস্টার ভেজা গলায় বললেন, ‘ওই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তো আমি এইভাবে ঢাকা শহরে আসছিলাম আসাদ সাব। গত কয়টা মাস আমি ঘুমাইতে পারি না, খাইতে পারি না। সারাক্ষণ মাথার ভেতর চিনচিন করে ব্যথা হয়। অসহ্য যন্ত্রণা। কিন্তু এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় তো আমার জানা নাই।’

আসাদ আলতো হাতে আজিজ মাস্টারের কম্পমান হাতখানা ধরল। তারপর আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, ‘কী হয়েছে আমাকে খুলে বলেন ?’

আজিজ মাস্টার সঙ্গে সঙ্গেই কথা বললেন না। চুপ করে বসে রইলেন। তারপর ধীরেসুস্থে বললেন, ‘বাসায় ফিরে রাতে বলি ?’

আসাদ আজিজ মাস্টারের হাত ধরে দাঁড়া করাল। তারপর নরম গলায় বলল, ‘আচ্ছা।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *