মনোরমা – পঞ্চম খণ্ড – হত্যা-উৎসব

পঞ্চম খণ্ড – হত্যা-উৎসব

Gulomer. Those devotions I am to pay,
Are written in my heart not in this book.
Enter Rutilio.
I am pursued,-all the ports are stopped too,
Not any hope to escape-behind, before me
On eitherside, I am beset,
Beaumont and Fietcher-‘The Custome of the country.’

প্রথম পরিচ্ছেদ – পিশাচীর উৎসব

যখন জুমেলিয়া সোপানাতিক্রম করিয়া দ্বিতলে উঠিল, তখনও সে আপনমনে মৃদুগুঞ্জনে গাইতে লাগিল

“বিদেশী সেইঞা দিয়া বহুত গিয়াভি।”

সহসা সে তাহার গান বন্ধ করিল; চকিত হইয়া সভয়ে চারিদিকে ভাল করিয়া চাহিয়া দেখিল। তাহার মনে একটা ভয় হইল, বোধ হইল, যেন তাহার প্রেমাকাঙক্ষী—তাহারই হাতের প্রথম শিকার নবীন ডাক্তার তাহার আশে পাশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।

“আরে ছিঃ! জুমেলা, তুই ভয় পাচ্ছিস?” বলিয়া জুমেলিয়া নবোৎসাহে পুনগ্রসর হইল। তখনও সে আপন মনে গুন গুন রবে গাইতে লাগিল;—

“বিদেশী সেইঞা দিয়া বহুত গিয়াভি।”

যদি সে তখন আর এক পল পূর্ব্বে পশ্চাদ্দিকে ফিরিয়া চাহিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিয়া ফেলিত; কিন্তু তা’ সে করে নাই। যখন জুমেলিয়া পশ্চাদ্ভাগে মুখ ফিরাইল, তৎক্ষণাৎ দেবেন্দ্রবিজয় তাঁহার চিরসহায়-সৌভাগ্যবশতঃ একটা পর্দ্দার অন্তরালে নিজেকে প্রচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল।

জুমেলিয়া ক্রমে দ্বিতলের দক্ষিণ সীমান্তে উপস্থিত হইল। দেবেন্দ্রবিজয় তাহার পশ্চাদনুসরণ করিতে লাগিলেন। শচীন্দ্র ও শ্রীশ দেবেন্দ্রবিজয়ের পশ্চাতে কিছুদূরে থাকিয়া অনুসরণ করিতে লাগিল। দেবেন্দ্রবিজয় ইতঃপূর্ব্বে তদুভয়কে তাঁহার অনুসরণ করিতে অনুজ্ঞা করিয়াছিলেন।

জুমেলিয়া দ্বিতলের একটি প্রকোষ্ঠের রুদ্ধদ্বার-সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। ক্ষিপ্রহস্তে একখানা রুমাল বাহির করিয়া তাহাতে নিজের নাসারন্ধ্র ও মুখবিবর বিশেষরূপে আবৃত করিয়া বাঁধিল। তাহার পর সে দ্বারোন্মুক্ত করিল। নাসিকা ও মুখবিবরের উপরিভাগস্থ রুমালখণ্ড জুমেলিয়া বামহস্তে সজোরে চাপিয়া ধরিল; যাহাতে সেই কক্ষাভ্যন্তরস্থ বিষাক্ত বায়ু দেহমধ্যে প্রবেশ করিতে না পারে, সেজন্য জুমেলিয়া এইরূপ উপায়াবলম্বন করিল।

.

দ্বিতলের উত্তরাংশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। যে অংশে জুমেলিয়া এক্ষণে উপস্থিত, সে অংশটি পূর্ব্বদিককার বারান্দার একটি অনুজ্জ্বল দীপালোকে ঈষদালোকিত; তদ্ধেতু দেবেন্দ্রবিজয় এক্ষণে জুমেলিয়ার নিকটস্থ হইতে পারিলেন না; কিন্তু যখন জুমেলিয়া সেই প্রকোষ্ঠ-মধ্যে প্রবিষ্ট হইল, তখন দেবেন্দ্রবিজয় তাহার অধিক দূরবর্তী নহেন।

জুমেলিয়া ধীরে ধীরে সেই কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল, তথায় এক পার্শ্বে একটি মোমের বাতি ছিল, জ্বালাইয়া দিল।

তখনই সেই সাংঘাতিক-বাষ্পপূর্ণ তমসাচ্ছন্ন কক্ষটি আলোকিত হইয়া উঠিল। এতক্ষণ কক্ষটি দারুণ অন্ধকারে পূর্ণ ছিল, সহসা প্রজ্বলিত দীপালোকে কক্ষটি শুধু আলোকিত হইল না– সুসজ্জিত কক্ষ সমুজ্জ্বলও হইল।

এইটিই কুমুদিনীর শয়নকক্ষ। কক্ষতলে সোপান-সম্মুখে কুমুদিনী পড়িয়া আছে; তাহার দেহ এক্ষণে প্রাণশূন্য। হঠাৎ মৃত্যুমুখগ্রস্ত নবীন ডাক্তার যেমন ভাবে পড়িয়াছিল, তেমনি ভাবে কুমুদিনীও পড়িয়া রহিয়াছে, কিন্তু তাহার মুখে মৃত্যুবিকৃতি নাই।

“দুই” জুমেলিয়া সাহ্লাদে বলিল। সেই দ্বিবর্ণযুক্ত শব্দটি পিশাচী জুমেলিয়ার মুখে আজ কেমন যেন অতিশয় কর্কশ—অতিশয় শ্রুতিকটু—সেই পৈশাচিকহাস্যবিমিশ্রিত। তখনই জুমেলিয়া সেই কক্ষস্থিত সমস্ত গবাক্ষ ও দ্বার উত্তমরূপে উন্মুক্ত করিয়া দিল; কিয়ৎক্ষণ পরে কক্ষমধ্যস্থ দূষিত বায়ু বাহির হইয়া গেলে সেই রুমালখানা টানিয়া মুখ হইতে খুলিয়া ফেলিল। কুমুদিনীর জীবন- বিচ্যুত দেহের প্রতি ক্ষণেক চাহিয়া বলিল, “কুমুদ, সুন্দরী তুমি! কিন্তু এখন তোমার সুন্দর দেহ প্রাণহীন—তুমি মৃত্যুমুখে পতিত। তোমার সকল সৌন্দৰ্য্য আজ ঘুচিল। একদিন আমিও তোমার অনুসরণ করিব। মনোরমা, তুমি, আমি—আমাদের এ তিনজনের এমন অদ্ভুত সাদৃশ্য কেন? তোমার আর তোমার দিদি মনোরমার এ সাদৃশ্য কেন, তা’ আমি এক-রকম মানে বুঝতে পারি; কিন্তু তোমাদের দু’জনের সঙ্গে আমার এ প্রকার সাদৃশ্য থাকা বড়ই আশ্চর্য্য ব্যাপার!”

জুমেলিয়া নীরবে ক্ষণেক কি চিন্তা করিল; তাহার পর পার্শ্বের সোপান বাহিয়া তাড়াতাড়ি উপরে উঠিয়া গেল। কিছুদূর উঠিয়া আবার একবার ফিরিয়া দাঁড়াইল। মনে একবার সন্দেহ হইল, কুমুদিনী মরিয়াছে কি না, তখন জুমেলিয়া কটির বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে সেই শাণিত কিরীচখানি বাহির করিয়া, অতি দ্রুতপদে তড়বড় করিয়া আবার নামিয়া আসিল। নীচে আসিয়া সেই শাণিত কিরীচ মৃতা কুমুদিনীর বক্ষে আমূল রোপণ করিল।

তাহার পর দীপ নিবিল। জুমেলিয়া নাই—চতুর্দিক অন্ধকার—নিস্তব্ধ; কে জানে সেই ঘনীভূত নিবিড় অন্ধকারে জুমেলিয়া কোথায় মিশিয়া গেল। তখন দেবেন্দ্রবিজয় কুমুদিনীর দেহে হস্তার্পণ করিয়া দেখিলেন, সে দেহ তখন যতদূর কঠিন হইতে হয়—যতদূর শীতল হইতে হয়, হইয়াছে। বহুক্ষণ পূৰ্ব্বেই সে দেহত্যাগে প্রাণবায়ু অনন্ত বায়ু-সমুদ্রে মিশিয়াছে।

.

দেবেন্দ্রবিজয় নিঃশব্দে অথচ সত্বর পদক্ষেপে যথায় শচীন্দ্র ও শ্রীশ অপেক্ষা করিতেছিল, তথায় আসিলেন। তাঁহার মনে মনে তখন সেই বিপদুদ্ধারের যে কল্পনা উঠিয়াছিল, তৎসম্বন্ধে তাহাদিগকে এখন কি করিতে হইবে, তাহা জ্ঞাত করাইতে তিনি তদ্ভাগিনেয় ও শ্রীশচন্দ্রের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন।

শচীন্দ্র দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিবামাত্র জিজ্ঞাসিল, “মামাবাবু, ব্যাপার কি?“

দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “ব্যাপার সহজ নয়—শক্ত। তোমার মামীমা আর মনোরমা কোথায় অবরুদ্ধ আছে, তা’ তুমি এখন সহজে সন্ধান নিতে পার কি?”

শচীন্দ্র। পারি।

দে। তবে আমি যা’ বলি, বিশেষ মনোযোগ দিয়ে শোন।

শ। বলুন।

দে। কুমুদিনীর মৃত্যু হয়েছে।

শ। কোথায়—কোথায় এখন সে?

দে। তারই শয়ন-গৃহে

শ। কখন তার মৃত্যু হয়?

দে। তার শয়ন-গৃহে সে যখন প্রবেশ করে, তখনই। আমি এখন তোমাকে সেই ঘরেই যেতে বলছি। তুমি এখনই সেই ঘর থেকে কুমুদিনীর মৃতদেহটা নিয়ে, যে ঘরে মনোরমা আর তোমার মামী অবরুদ্ধ আছে, সেই ঘরে নিয়ে যাও।

শ। বেশ—তারপর?

দে। তারপর তুমি সেই ঘরে বিছানার উপরে কুমুদিনীর মৃতদেহটা এমনভাবে রাখবে—যেন সহসা দেখলে নিদ্রিত বলেই বোধ হয়। সে ঘরে যদি আলো থাকে—আলোটা কমজোর ক’রে দিয়ো। তারপর তোমার মামী আর মনোরমাকে কুমুদিনীর শয়ন-গৃহে নিয়ে আসবে, সেইখানে তাদের অপেক্ষা করতে বলবে। বুঝেছ, এখনই একাজগুলি শেষ করা চাই। যাও, বিলম্ব ক’রো না—এখন জুমেলিয়া এদিকে আসবে।

শ। যদি জুমেলিয়ার সঙ্গে এখানে তাদের হঠাৎ দেখা হ’য়ে যায়?

দে। তা’ হবে না।

শ। না হবার কারণ?

দে। তা’ হ’তে দেব না, সে ভার আমার রইল, তুমি যাও।

তখনই জুমেলিয়া সেইদিকে টলিতে টলিতে আসিল। দেবেন্দ্রবিজয় ও তাঁহার সাহচর্য্যকারিদ্বয় যতক্ষণ না জুমেলিয়া তাঁহাদিগকে অতিক্রম করিয়া সোপান-সান্নিধ্যে পুনরাগত হইল, ততক্ষণ সন্নিহিত স্তম্ভত্রয়ের পার্শ্বে লুকাইয়া রহিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় তৎপরে শচীন্দ্রকে স্বকার্য্যেদ্দেশে গমন করিতে ইঙ্গিত করিলেন। শচীন্দ্র তখনই তাঁহার অনুজ্ঞামতে অগ্রসর হইল। দেবেন্দ্রবিজয় শ্ৰীশকে শচীন্দ্রের সঙ্গে যাইতে বলিয়া নিজে জুমেলিয়ার পুনরনুসরণ করিলেন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ – পিশাচী? বরং পিশাচী ভাল

জুমেলিয়া এক্ষণে কোন্ কার্য্যে অগ্রসর হইতেছে, তাহা দেবেন্দ্রবিজয় পূৰ্ব্বেই অনুমানে একরকম বুঝিয়া লইয়াছিলেন।

জুমেলিয়া সোপানসন্নিহিত গৃহের দ্বারদেশে আসিয়া থামিল। পুনরায় সেই রুমাল দিয়া নিজ নাসারন্ধ্র ও মুখবিবর পূর্ব্ববৎ আবৃত করিয়া বাঁধিল; গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হইল। গৃহমধ্যে একখানি ক্ষুদ্র টেবিল, তদুপরে একটি মৃণ্ময় প্রদীপ অতি নিস্তেজভাবে জ্বলিতেছে: জুমেলিয়া সর্ব্বাগ্রে সেই প্রদীপ নিবাইল; টেবিলের উপর একটা মোমের বাতি ছিল, সেটি জ্বালাইয়া পূর্ব্বের ন্যায় ক্ষিপ্র করে গৃহস্থিত সকল বাতায়ন ভাল করিয়া উন্মুক্ত করিয়া দিল।

কক্ষতলে দুইটি শব বিলুণ্ঠিত। একটি তুলসীদাসের, অপরটি গোবিন্দপ্রসাদের। সেইরূপভাবে তাহারই কৌশলে, দক্ষতায় দুইটি পুরুষদেহ পতিত দেখিয়া, জুমেলিয়া হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল; বলিল, “সকলেই মরবে—সকলেরই এই দশা হবে; যে আমার গন্তব্যপথের সম্মুখে একটু বিঘ্ন হ’য়ে দাঁড়াবে, তারই এই দশা হবে, কেউ তাকে রক্ষা করতে পারবে না।”

ক্ষণেক নিষ্পলকনেত্রে জুমেলিয়া তাহার শিকার দুটির প্রতি চাহিয়া কি ভাবিতে লাগিল।

দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, এই পিশাচী এবার মনোরমা ও রেবতীর কক্ষাভিমুখে যাইবে। তখন তাঁহাকে কি করিতে হইবে, প্রত্যুৎপন্নমতি দেবেন্দ্রবিজয় অতি শীঘ্রই তাহা স্থির করিয়া লইলেন। যখন জুমেলিয়া অবনতমস্তকে সেই মৃতদেহ দুটির দিকে চাহিয়া আছে, তখন দেবেন্দ্রবিজয় সুযোগ বুঝিয়া অতি ক্ষিপ্রহস্তে সেই কক্ষেরই দ্বার টানিয়া সশব্দে বন্ধ করিলেন। সেই ভীষণ শব্দ সেই বৃহদ্বারটির সকল স্থান হইতেই অতি সুস্পষ্ট শ্রুত হইতে পারে। দেবেন্দ্রবিজয় দ্বার বন্ধ করিয়া নির্ব্বিঘ্নে সোপানাবতরণ করিলেন। সেই দ্বার-সম্মুখ দিয়া যাইতে হইলে পাছে জুমেলিয়া তাঁহাকে দেখিতে পায়, সেইজন্য তিনি এই কৌশলে সেই বাধা ঘুচাইয়া অভিপ্রেত স্থানে চলিয়া গেলেন। সেই শব্দে জুমেলিয়ার হৃদয় স্তম্ভিত হইল। নেশার ঘোর বেশ ছিল, নেশার ঘোরে তখনই সাহসে ভর করিয়া লাফাইয়া একেবারে বাহিরে আসিল। বলিল, “বাঃ! আমি কি এতই দুৰ্ব্বল হয়ে পড়েছি যে, সামান্য শব্দে ভয় হবে। কিছু না, একটা দমকা বাতাসে কবাটজোড়া প’ড়ে থাকবে।

এক মুহূৰ্ত্ত জুমেলিয়া ইতস্তত করিল।

দেবেন্দ্রবিজয় এতক্ষণে কি উপায়ে জুমেলিয়ার কাজে বিলম্ব ঘটাইবেন, যাহাতে এখন জুমেলিয়া, রেবতী ও মনোরমা যে গৃহে অবরুদ্ধ আছে, সেই গৃহাভিমুখে যাইতে না পারে, তাহাই ভাবিতেছিলেন। যখন শচীন্দ্র, রেবতী ও মনোরমাকে সঙ্গে লইয়া ফিরিবে, তখন জুমেলিয়ার সহিত যাহাতে তাহাদিগের সাক্ষাৎ না ঘটিয়া যায়, এমন একটা উপায় উদ্ভাবন করা দেবেন্দ্রবিজয়ের এখনই অত্যাবশ্যক হইতেছে।

কিন্তু দেবেন্দ্রবিজয়ের সামান্য কৌশলে সে উপায় ঘটিয়া গে’ল। যখন দেবেন্দ্রবিজয় সজোরে কবাট রুদ্ধ করিয়া সেই ভীষণ শব্দ সমুখিত করিয়াছিলেন, তখন হইতেই সেই নরহন্ত্রী রমণীর হৃদয় কিয়ৎপরিমাণে দুৰ্ব্বল হইয়া আসিতেছিল। সে নিজমুখে স্বীকার পাইল, “ভাল, একটু পরে বাকী কাজ শেষ করব; নেশাটা এখনো ভাল জমেনি, নইলে জুমেলা ভয় পাবে কেন? আরও মদ খাব—আরও এক বোতল চাই।”

* * * *

জুমেলিয়া নিম্নে অবতরণ করিল। যে কক্ষে বসিয়া জুমেলিয়া পূৰ্ব্বে মদ্যপান করিয়াছিল, সেই কক্ষে পুনরপি প্রবেশ করিল। অনুসন্ধানে জানিল, সে যাহা চায়—সেই গৃহে তাহা আর নাই। সেই কক্ষের পার্শ্ববর্তী কক্ষে গমন করিল; তথায় মদপূর্ণ বোতলের অভাব ছিল না। একটা তুলিয়া সেই প্রকোষ্ঠমধ্যে বসিয়া মদ্যপানে প্রবৃত্ত হইল। তথায় একটা তৈলহীন প্রদীপ মিট্‌মিট করিয়া জ্বলিতেছিল। সেই দীপশিখা অতি অস্পষ্ট আলোক বিকীর্ণ করিতেছিল।

যে কক্ষে নবীনের দেহ ধূল্যবলুণ্ঠিত রহিয়াছে সেই কক্ষমধ্যে দেবেন্দ্রবিজয় সুযোগ বুঝিয়া এক্ষণে প্রবিষ্ট হইলেন। আপনা আপনি বলিলেন, “এই রমণী সহজ নয়; দেবেন্দ্র, তুমি অল্প আয়াসে একে পরাস্ত করতে পারবে না। ইতোমধ্যে আর একটা উপায় ঠিক করা চাই। কৌশলে এখন পাপিষ্ঠার কার্য্যে যত বিলম্ব ঘটাতে পার, ততই মঙ্গল। দেবেন্দ্র, যদি তোমার জীবনে কখনও কোন কার্য্য অতি সত্বর সমাধা করবার থাকে, এক্ষণে সেই সময় উপস্থিত; একটু বিলম্বে তোমার সকল কৌশল ব্যর্থ হ’তে পারে।” ভাবিয়া দেবেন্দ্রবিজয় নবীনের মৃতদেহ হইতে পদাখানি তুলিয়া লইলেন। সেই মৃতদেহ হইতে নবীনের প্যান্টালুন কোট খুলিয়া লইয়া নিজে পরিধান করিলেন। নবীনের জামার পকেটে চশমা ছিল, তাহা নিজের নাসিকায় বসাইলেন। তাহার পর মুখময় এক প্রকার কৃষ্ণবর্ণের পাউডার মাখিয়া এক বিকট আকৃতি ধারণ করিলেন। সে আকৃতি নির্ভীকেরও বুকে অতিশয় ভয়ের সঞ্চার করিয়া দেয়। জুমেলিয়া নিজের পিস্তলটা ভুলিয়া টেবিলের উপরে ফেলিয়া গিয়াছিল। দেবেন্দ্রবিজয় সেটি তুলিয়া লইয়া দেখিলেন, পিস্তলটার ছয়টা ঘরেই গুলি ঠাসা রহিয়াছে; তিনি তখনই সেই পিস্তল হইতে গুলি কয়টি বাহির করিয়া লইলেন এবং নিজের কাছে কয়েকটি ফাঁকা আওয়াজের টোটা ছিল, তিনি তাহাই জুমেলিয়ার পিস্তলে বসাইয়া দিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ – একি মূৰ্ত্তি—প্রেতযোনি

জুমেলিয়া তখনও পাত্রের পর পাত্র পূর্ণ করিয়া সেই তীব্র সুরা উদরস্থ করিতেছিল। দেবেন্দ্রবিজয় যখন ছদ্মবেশ ধারণে ব্যস্ত, তখন সেই কক্ষমধ্যে শ্রীশ প্রবেশ করিল। দেবেন্দ্রবিজয় তাহাকে ডাকিয়া বাহিরে আনিলেন। চুপি চুপি জিজ্ঞাসিলেন, “যা যা’ বলেছিলাম, সমস্তই সুসম্পন্ন হয়েছে ত?”

শ্রীশচন্দ্র ঘাড় নাড়িয়া স্বীকার পাইল।

দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “এখন এক কাজ কর, এই মড়াটা (নবীনের মৃতদেহ নিৰ্দ্দেশে) নিয়ে এস আমরা উপরতলে যাই; বারান্দার পশ্চিমদিকের এক কোণে লুকিয়ে রাখতে হবে।”

শ্রীশচন্দ্র দেবেন্দ্রবিজয়ের আজ্ঞা পালন করিল।

যে ঘরে এতক্ষণ নবীনের মৃতদেহ পড়িয়াছিল, সেই ঘরে জুমেলিয়া আসিল। দেবেন্দ্রবিজয় তখন তাহার পার্শ্ববর্তী কক্ষে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।

জুমেলিয়া আপনা-আপনি বলিল, “ সব শেষ—কাজ প্রায় সব শেষ হ’য়েই এসেছে বাকী আছে সামান্য—তাও এক নিমেষে শেষ করব। এখন আমি একাকীই এই সকল ধনরত্নের অধিকারী। অংশীদার ক’রে কাজ গুছিয়েছি, শেষে অংশীদারকে-অংশীদার সব নিকেশ করেছি। ফুলসাহেব বড় শক্ত লোক ছিলেন বটে; কিন্তু আমি স্ত্রীলোক, তিনি শক্ত লোক হ’য়ে যে সকল কাজ ঠিকমত হাসিল করতে পেরে ওঠেন নি, আমি এখন সে সকল কাজ কেমন সহজে একটার পর একটা শেষ ক’রে ফেলছি। আমিই ঠিক তাঁর উপযুক্ত ছাত্রী।”

তাহা সত্য বটে।

যেখানে নবীনের মৃতদেহ পড়িয়া ছিল, সেইদিকে সহসা তাহার দৃষ্টি পড়িল। দেখিল নবীন নাই। ভগ্ন ও কম্পিতস্বরে বলিল, “অ্যাঁ কোথায় গেল? (সভয়ে ইতস্তত দৃষ্টিনিক্ষেপ) মরেছে – আমি বেশ জানি, সে মরেছে; তবে কি হ’ল? ব্যাপার কি! সম্ভব, আমি তাকে হয়ত তখন ঠিক ভাবে হত্যা করতে পারি নি। আরে ছ্যা! তাই কি হয় কখনও? সে মরেছে—মরেছে—নিশ্চয় মরেছে!”

জুমেলিয়া ক্ষণপরে অস্ফুটস্বরে অন্যমনে ডাকিল, “ডাক্তার!”

তাহার পশ্চাদ্ভাগ হইতে কে তখন বলিল, “কেন, প্রিয়তমে?”

বিদ্যুদ্বিকাশের ন্যায় চকিতে জুমেলিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইল। একি মূৰ্ত্তি!

সেই মূৰ্ত্তি দেখিয়াই—আর কোন কথা না কহিয়া জুমেলিয়া টেবিল হইতে তাড়াতাড়ি সেই পিস্তলটা তুলিয়া লইয়া সেই মুৰ্ত্তি-লক্ষ্যে শব্দ করিল।

সেই মূৰ্ত্তি অক্ষত অবস্থায় পূর্ব্বের ন্যায় তখনও স্থিরভাবে তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান। পিস্তল ছোড়ার পর সেই মূৰ্ত্তি মৃদু হাসিল। হাসিতে হাসিতে বলিল, “বৃথা চেষ্টা, প্রাণাধিকা! আমি এখন এ সকল অস্ত্রের অবধ্য।” স্বর নবীনের অনুকরণে অথচ বড় গম্ভীর—যে’ন এ পৃথিবীর নহে—কেমন যে’ন একটা শিহরণ প্রত্যেক শব্দটিতে কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে!

জুমেলিয়া তাহার মুখের দিকে বিস্ময়বিস্ফারিতনেত্রে চাহিয়া স্থিরকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “অবধ্য? তুমি?”

“হাঁ, অবধ্য; আমি এখন জীবন্ত মনুষ্য নই।”

“অ্যাঁ! মাইরি নাকি? “

“পাষাণি, তুমি কি আমাকে নিতান্ত নিষ্ঠুরের ন্যায় হত্যা কর নি?”

“তোমাকে? হত্যা?”

“হাঁ, আমাকে তুমি হত্যা করেছ—নরঘাতিনী তুমি।”

“তাই যদি হবে, তবে তুমি কেমন ক’রে এখন এখানে এলে?”

“আমার অপমৃত্যু ঘটায় আমি প্রেতযোনি প্রাপ্ত হয়েছি।”

“প্রেতযোনি!”

“বিশ্বাস যদি না হয়—জুমেলা, তোমার হাতে পিস্তল ত আছে—বেশ, আরও একবার, দুইবার কি তিনবার, পার যদি শত-সহস্রবার গুলি ক’রে—প্রেতাত্মা মিথ্যাকথা কয় কি না, সে পরীক্ষা নিতে পার। নিশ্চয় জেন, মড়া আবার মরে না।”

জুমেলিয়া নিজ অন্তরস্থ শঙ্কার সহিত এখনও অতীব সাহসভরে যুঝিতে ছিল। যদিও সে তখন অত্যন্ত ভীত হইয়াছিল; কিন্তু তখন সে মরিয়া। চিৎকার করিয়া জুমেলিয়া আবার সেই মূর্ত্তির বক্ষোলক্ষ্যে পিস্তল তুলিয়া বলিল, “তুমি প্রেত হও, আর ভূত হও—যে হও বা না হও, আবার আমি তোমায় এখনই হত্যা করব।”

মূর্ত্তি নড়িল না–স্থির, নীরব, নিস্পন্দ–মৃদু হাসিল মাত্র।

জুমেলিয়া গুলি (?) করিল। সেই শব্দ প্রকোষ্ঠের খিলানে খিলানে প্রতিধ্বনিত হইল। মূৰ্ত্তি বলিল, “জুমেলিয়া, থামলে কেন, আবার চেষ্টা কর—আবার।”

অত্যুচ্চস্বরে জুমেলিয়া বলিয়া উঠিল, “অধঃপাতে যাও তুমি! চুলোয় যাও তুমি! তুমি ভূত, এ কথা আমি কখনও বিশ্বাস করতে পারি না—করব না—করতে চাইও না।”

“তুমি বিশ্বাস না করলেও—প্রেত আমি।”

“কে’ন তুমি এখানে এসেছ? কি জন্য? কী কাজ তোমার?”

“প্রতিহিংসা।”

“প্রতিহিংসা! বাঃ! প্রেতাত্মা তুমি— তোমার দ্বারা মানুষের কিছু ক্ষতি হতে পারে না।”

“তুমি কি আমায় ভয় কর না?”

“না।”

“যাতে তুমি তাই কর—তাই আমি এখন করব।”

“তা’ তুমি পার না।”

“নিশ্চয় পারব।”

“বেশ—পার, কর।”

“আমি এখনই তোমার বুকের রক্ত পান করব।”

“বুকের রক্ত! আরে, রক্ত কোথায় পাবে? তুমি আমার গায়ে একটা আঁচড়ও দিতে পারবে না।”

“তুমি পিশাচী।”

“হাঁ, আমি পিশাচী—পিশাচী ভূত-প্রেতকে ভয় করে না।”

“জুমেলা, সাবধান!”

“আমাকে আর সাবধান করতে হবে না—তুমি নিজে বরং সাবধান হও; আমি আবার তোমাকে গুলি করব। ভূত হও, প্রেত হও, মানব হও, দানব হও—জুমেলার হাতে আজ তোমার পরিত্রাণ নাই—পরিত্রাণ পাবে না। এইবার তোমার ঐ বুক লক্ষ্য করে আমি গুলি করব।”

চতুর্থ পরিচ্ছেদ – অভিনয় আরম্ভ

দেবেন্দ্রবিজয় অনেক স্থানে অনেক ঘটনা দেখিয়াছেন—বহু ব্যক্তির বহুবিধ চরিত্র তিনি আজীবন পর্যবেক্ষণ করিয়া আসিতেছেন; যদি তিনি কখন জীবনের মধ্যে কোন অলৌকিক- শক্তিমতী রমণী দেখিয়া থাকেন—সে আজ এই জুমেলিয়া। জুমেলিয়ার ন্যায় সাহসী-পরাক্রান্তা রমণী তিনি আর কখনও দেখেন নাই।

সত্যই যেন জুমেলিয়া এক্ষণে একটা অপদেবতার সম্মুখে অবস্থান করিতেছে, এমনই এক অবর্ণনীয় শঙ্কা তাহার মুখমণ্ডলে স্পষ্টরূপে প্রকটিত হইয়া উঠিয়াছে; তথাপি সে অতুল সাহসে সেই শঙ্কার সহিত যুঝিতেছিল; তথাপি সে এখনও তেমনি সাহসভরে সেই মূর্ত্তি-সম্মুখে পিস্তলহস্তে দণ্ডায়মানা।

আবার সে সেই সম্মুখস্থ প্রেতাত্মার (?) বক্ষঃ লক্ষ্য করিয়া পিস্তল ছুড়িল। এবারও গুলি ব্যর্থ হইল। গুলি ব্যর্থ হইল বলিয়া জুমেলিয়া নিরস্ত হইল না; এবার ললাট-লক্ষ্যে পিস্তল তুলিল; বলিল, “যেখানে আছ, ঠিক থাক—এক চুল ন’ড়ো না। যদি তুমি সত্যই ভূত হও—” কথাগুলি অতি ভীতিব্যঞ্জক—তেমনি তীব্রকর্কশ, “—যদি তুমি সত্যই মনুষ্য না হও; তা’ হ’লে এবারও আমার গুলি পূর্ব্বের ন্যায় ব্যর্থ হবে। যদি মনুষ্য হও, এই গুলি তোমাকে সত্যসত্যই এবার প্রেতযোনি প্রাপ্ত করাবে—নিশ্চয় তুমি মরবে।”

মূৰ্ত্তি বলিল, “আজ যেমন অপর কয়েক জনের মৃত্যু ঘটেছে, তেমনি ভাবে কি, জুমেলা?” জুমেলিয়া হো হো শব্দে উন্মাদের হাসি হাসিয়া বলিল, “না—ঠিক তেমনভাবে নয়; তারা মরবার আগে তাদের মৃত্যু যে আসন্ন, তা’ তখন বুঝতে পারে নি। তুমি এখন তা’ বুঝতে পারছ— শুধু বুঝতে পারছ কেন, তোমার মৃত্যু যে আমার পিস্তল-মুখে মূর্তিমান অধিষ্ঠিত রয়েছে, তা’ তুমি দেখতেই পাচ্ছ।”

মূৰ্ত্তি বলিল, “জুমেলা, একটু অপেক্ষা কর।”

জুমেলিয়া বলিল, “কেন? কি জন্য?

মূর্তি। আমার ইচ্ছা, তুমি এবার লক্ষ্যটা ভাল ক’রেই কর।

জুমে। সে চিন্তা আর তোমাকে কষ্ট ক’রে করতে হবে না। সে শিক্ষা—সে উপদেশ আমি তোমার কাছে শুনতে চাই না।

মূ। না চাও-তোমার লক্ষ্য যাতে ঠিক হয়—ব্যর্থ না হয়, তা’ আমি করব।

জু। কে’ন গো? এত সহৃদয়তা কেন? গুলির আঘাতে কি তোমার আনন্দ হয়?

মূ। হয়, জুমেলা—হয়। তুমি আমার আত্মাকে বিষের জ্বালায় জ্বালিয়েছ; এখন এই পিস্তলের গুলির যন্ত্রণা, এ-ও আমার আত্মা ভোগ করছে। জুমেলা, একদিন তুমিও মরবে—তখন এরূপ জ্বালা-যন্ত্রণা তোমার আত্মাকেও ভোগ করতে হবে।

জু। বাঃ! তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ যে! (হাস্য)

মূ। তোমাকে ভয় দেখাই, এমন ইচ্ছা আমার নাই।

জু। তুমি যে প্রেতাত্মা, এখনও এ কথা বজায় রাখতে চেষ্টা করছ?

মূ। হাঁ।

জু। ভাল, এবার যদি আমার গুলি ব্যর্থ যায়, তা’ হ’লে তোমাকে আমি প্রেতাত্মা বলেই মনে

করব।

মূ। জুমেলা, তা’ হলে এবার প্রস্তুত হও। হয়েছ কি?

জু। হাঁ।

মূ। আমি যে নবীন ডাক্তার, এ কথা তুমি বিশ্বাস কর না?

জু। না।

মূ। কে তবে আমি?

জু। জানি না।

মূ। জুমেলা, এখন এখানে কে এমনভাবে আসতে পারে? কে তোমার সকল কাৰ্য্য প্রত্যক্ষ করতে পারে? তুমি যখন কুমুদিনীর মৃতদেহ নির্নিমেষ চোখে দেখছিলে, যখন আবার সেই মৃতদেহের বুকে কিরীচ বিদ্ধ কর, তখন কে তোমার অলক্ষ্যে তোমাকে দেখে থাকতে পারে? যখন তুমি তুলসীদাস আর গোবিন্দপ্রসাদের মৃতদেহ দেখতে দেখতে আনন্দের হাসি হাসছিলে, সে হাসি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে কে তা’ তখন শুনতে পেতে পারে? এ সকল কে পারে, জুমেলা, জান কি? আমি। এখন আমি মৃত, আমার অগম্য কোন স্থানই নাই। জুমেলা, এখন কি তুমি বিশ্বাস কর?

জু। না

মূ। কে তবে আমি?

জু। এ জগতের মধ্যে একজন লোক আছে, যাকে আমি কিছু কিছু ভয় করি।

মূ। কে সে?

জু। দেবেন্দ্রবিজয়।

দেবেন্দ্রবিজয় হাসিলেন; হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “আমাকে কি তাই ব’লে বিশ্বাস হয়?”

“তুমি সেই লোক হ’লেও হ’তে পার।”

“হাঁ, আমি জানি—আজ তুমি তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা-ব্রতে ব্রতী। আমাকে সেই দেবেন্দ্রবিজয় ব’লে তোমার বোধ হয় কি?”

“না।”

“দেবেন্দ্রও না, প্রেতাত্মাও না? বেশ—গুলি কর। বেশ ভাল করে লক্ষ্য করে গুলি কর— তাড়াতাড়ি ক’রো না, ব্যস্ত হয়ো না। আমার কপালে গুলি মারতে চাও—বেশ ভাল ক’রে লক্ষ্য কর আগে; আমি তিন গণিবামাত্র তুমি গুলি কর, ধীরভাবে কাজ করলে নিষ্ফল না হ’তে পার।”

“এক।

(জুমেলিয়া হস্তস্থিত পিস্তল দেবেন্দ্রবিজয়ের ললাট-লক্ষ্যে তুলিয়া ধরিল।)

দুই।

(জুমেলিয়া ওষ্ঠাধর দৃঢ়রূপে সংযত করিলে দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, এবার স্থিরনেত্রে সে তাঁহার ললাট লক্ষ্য করিতেছে।

তিন।”

সেই মুহূর্ত্তেই জুমেলিয়ার হস্তস্থিত পিস্তল ‘ধ্রম’ শব্দ করিল।

জুমেলিয়ার নয়ন-সম্মুখে এখনও সেই মূর্ত্তির সেই নির্নিমেষ—তীব্র—নিশ্চয় দৃষ্টি সেই মূর্ত্তির সেই উপহাসের মৃদুহাসি যেন তাহার হত্যা-কল্পনাকে ব্যঙ্গ করিতেছে।

.

এক মুহূর্ত্তের জন্য জুমেলিয়া বিস্ময়-বিস্ফারিতলোচনে সম্মুখস্থিত মূর্ত্তির মুখের দিকে চাহিল। তখন তাহার ললাটে স্বেদস্তুতি হইতে লাগিল।

নিঃশব্দে—নিরাত্তনাদে—কোন শঙ্কাব্যঞ্জক বাক্য ফুটিল না—জুমেলিয়া মূৰ্চ্ছিত হইয়া মৃতের ন্যায় কক্ষতলে পড়িয়া গেল।

“এইবার পাপীয়সীর শাস্তি আরম্ভ হ’ল, যাক—এখন আমাকে আর এক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।” এই বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় যেমন কক্ষ হইতে বাহির হইলেন, দেখিলেন, দ্বারদেশে শ্রীশ দাঁড়াইয়া। তখনই তিনি তাহাকে সঙ্গে লইয়া যেখানে নবীন ডাক্তারের মৃতদেহ পড়িয়াছিল, সেখানে উপস্থিত হইলেন। যত শীঘ্র পারিলেন, নবীন ডাক্তারের পরিচ্ছদ খুলিয়া ফেলিয়া পুনশ্চ সেই মৃতদেহে পরাইলেন। নিজে তখন একরূপ সামান্য ছদ্মবেশে রহিলেন মাত্ৰ। পরে, পূর্ব্বে যে ভাবে যে স্থানে নবীন ডাক্তারের সেই মৃতদেহ পড়িয়াছিল, ঠিক সেইভাবে তথা মৃতদেহটা রাখিয়া জানালার সেই পদাটা লইয়া তাহা পুনরাচ্ছাদিত করিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ – সংজ্ঞালাভে

অল্পক্ষণ পরে জুমেলিয়ার মূৰ্চ্ছাগত দেহে সংজ্ঞা-প্রাপ্তির লক্ষণ দেখা গে’ল। পাপীয়সী চক্ষু মেলিয়া সভয়ে ও সবিস্ময়ে গৃহের চতুর্দিকে চাহিতে লাগিল। সেই মৃতদেহাচ্ছাদিত পদাখানি তখনই তাহার দৃষ্টিপথে পড়িল। তদ্দৃষ্টে সে চমকিত ও তাহার সর্ব্বাঙ্গ শিহরিত হইল। সাহসে বুক বাঁধিয়া জুমেলিয়া উঠিল, এবং অতি সাহসে বুক বাঁধিয়া সে বিনাবিলম্বে সেই মৃতদেহ হইতে পদাখানি টানিয়া দূরে ফেলিয়া দিল।

সবিস্ময়ে জুমেলিয়া বলিল, “ওঃ হরি! আমি কি পাগল হ’য়ে যেতে বসেছি নাকি? আমার জ্ঞান-বুদ্ধি সব কি আজ লোপ পেতে বসেছে না কি?”

মৃতদেহের উপরে অবনত হইয়া বিশেষ মনোযোগে জুমেলিয়া তাহা দেখিতে লাগিল। দুইটি অঙ্গুলি দ্বারা তাহা একবার স্পর্শ করিল, লাফাইয়া দুই পদ পশ্চাতে হটিয়া আসিল। সে মৃতদেহ তখন বরফের ন্যায় অতি শীতল। চিৎকার করিয়া বলিল, “মরেছে! একেবারে মরেছে! তবে— তবুও এই কতক্ষণ—এক মুহূৰ্ত্ত পূর্ব্বে—একেই আমি আমার সমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।” মৃদুগুঞ্জনে বলিল, “সত্যই কি ভূত হয়েছে!” সাতঙ্কে চারিদিকে চাহিতে চাহিতে বলিল, “আমাকে পেয়ে বসেছে!” তখনই তাহার আতঙ্ক দূর হইল। চিৎকার করিয়া বলিল, “কই আমার গায়ে একটি আঁচড়ও দিতে পারে নি; বরং জীবজন্তুকে আমার ভয় হয়, মৃত যে তাকে—তাকে আমি এক তিলও ভয় করি না।”

তাহার পর জুমেলিয়া গৰ্ব্বভরে অত্যুচ্চস্বরে একবার হাসিয়া উঠিল। সে হাসি তত বড় অট্টালিকার প্রতি প্রকোষ্ঠে প্রতিধ্বনিত হইল। জুমেলিয়া আপনা-আপনি বলিতে লাগিল, “এখনই এখান থেকে স’রে পড়া ভাল; প্রায় সকলকে নিকেশ করেছি। তবে সেই মুসলমান ছোঁড়াটা করিমকে সাবাড় করতে পারলে বেশ হত; যাক আপাতত সে বেঁচে গে’ল। সে—

সহসা সেই কক্ষের দ্বারদেশে জুমেলিয়ার নজর পড়িল; দেখিল, যাহার কথা সে বলিতেছে, সেই লোক তথায় দাঁড়াইয়া।

.

দ্বারদেশে করিমবক্স দণ্ডায়মান।

অবিলম্বে জুমেলিয়া, যে পিস্তল প্রেতাত্মাকে (?) গুলি করিতে অকর্ম্মণ্য হইয়াছিল, তাহাই লইয়া করিমবক্সের প্রতি লক্ষ্য করিল—লক্ষ্য পূর্ব্ববৎ ব্যর্থ হইল। পিস্তল ভূমিতলে নিক্ষেপ করিল। একখানা কিরীচ বাহির করিল। দক্ষিণ হস্তে দৃঢ়রূপে তাহা মুষ্টিবদ্ধ করিয়া সতর্কে অগ্রসর হইল।

করিমবক্স তথায় তখন স্থিরভাবে দণ্ডায়মান। (পাঠকগণ অবগত আছেন, কমিবক্স সেই শচীন্দ্রনাথ—ডিটেকটিভ দেবেন্দ্রবিজয়ের ভাগিনেয়—কার্য্যে সাহচর্য্যকারী। তাহার ভাবভঙ্গিতে কিছুমাত্র আশঙ্কাব্যঞ্জক চিহ্ন নাই।)

তদ্দৃষ্টে জুমেলিয়া কিছু ইতস্তত করিল; সরোষে জিজ্ঞাসিল, “কোথা থেকে এলি, তুই?”

“আস্তাবল থেকে।“

“এখানে কি ক’রে এলি? কেমন ক’রে এলি?”

“ওদিককার সিঁড়ী দিয়ে উঠে—পাশের সিঁড়ী দিয়ে নেমে এসেছি।”

“কখন?”

“তোমার হত্যা-উৎসবের প্রারম্ভে।”

“ওঃ—তুমি জাতে মুসলমান নও! তোমার কথার ভাবে এখন তা’ বেশ বুঝতে পারছি।”

“না।”

“তুমি কি গোয়েন্দা?”

“হাঁ।”

“ছদ্মবেশে দেবেন্দ্রবিজয়?”

“না।”

“নির্ব্বোধ! তুমি জান না—এখানে তুমি মৃতদেহের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে এসে পড়েছ? তুমি আজ কখনই এখান থেকে জীবিত থাকতে ফিরে যেতে পারবে না।”

শচীন্দ্র হাসিল। হাসিয়া বলিল, “তাই যদি তোমার মনস্থ, তবে কেন আমায় খুন করছ না? এ অভ্যাস ত তোমার চিরচমৎকার।”

“হাঁ, আপাতত আমাকে কিছুক্ষণ ধৈর্য্য ধরে থাকতে হচ্ছে।”

“ঐ কিরীচখানি ছাড়া আপাতত তুমি ত নিরস্ত্র?”

“তাই কি তুমি মনে ঠিক দিয়েছ? যখন ঠিক সময় আসবে, তখন দেবেন্দ্রবিজয় আর তুমি নিশ্চয়ই আমার হাতে ঠিক মরবে; আমি ঠিক এমনি ভাবে থেকেই, এক পা না অগ্রসর হ’য়েই তোমাকে যমালয়ে প্রেরণ করব। “

“আমি তোমাকে পূৰ্ব্বেই বলেছি—আমি দেবেন্দ্রবিজয় নই।”

“বাঃ!”

“আমি দেবেন্দ্রবিজয়,” বলিয়া স্বয়ং দেবেন্দ্রবিজয় তখন তথায় প্রবেশ করিলেন।

জুমে। (সবিস্ময়ে শিহরিয়া) অ্যাঁ! (প্রকৃতিস্থ হইয়া) বেশ। ক্ষতি কি? হয়েছে কি তা’?

দে। তুমি আপাতত আমার বন্দী।

জু। আমি! কে বললে?

দে। হাঁ, তুমি। আমি বলছি।

জু। না, দেবেন, এটা তোমার মিথ্যাকথা—আপাতত কখনই নয়।

দে। তুমি কখনই আমার হাত থেকে পালাতে পারবে না।

জু। কে বললে তোমায় যে, পারব না আমি? খুব পারব—তাইই করব।

দে। আজ রাত্রে কখনই পারবে না, জুমেলা।

জু। আজ রাত্রেই,—এখনই আমি পালাব—দেবেন্দ্র। এমন কোন গোয়েন্দা দেখি না, যে জুমেলিয়াকে বন্দী করে; এমন কোন কারাগার এ পর্য্যন্ত দেখি নি, যাতে জুমেলাকে কয়েদ রাখে।

দে। জুমেলা, তুমি শিবুর কি করলে?

জু। কে শিবু?

দে। তাকে তুমি বেশ জান।

জু। আমার স্মরণশক্তি আপাতত বড়ই খারাপ হয়ে গে’ছে।

দে। তাকেও কি তুমি খুন করেছ?

জু। আমি যদি উত্তর করি—এ কথার ঠিক উত্তর দিই, তুমি কি তা বিশ্বাস করবে?

দে। হাঁ।

জু। সে মরে নি।

দে। কোথায় সে?

জু। কোথায়? আমি যদি তাকে মুক্তি না দিই—তা’ হ’লে সে যেখানে আছে— সেখানে সে না খেতে পেয়ে বহুদিনব্যাপী মৃত্যু-যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে অনাহারে মারা পড়বে।

দে। আমি তাকে খুঁজে বার করব।

জু। তুমি? পারবে না, নিশ্চয় জেনো।

দে। আমি সে বিষয়ে চেষ্টা করে দেখব

জু। অকৃতকাৰ্য্য হবে।

দে। দেবেন্দ্রবিজয় কখনও কোন কাৰ্যে অকৃতকাৰ্য্য হয় নাই।

জু। তুমি যে বড় তোমার স্ত্রীর কথা ভুলেও একবার জিজ্ঞাসা করছ না?

দে। আবশ্যক নাই।

জু। তুমি তাকে পেয়েছ বুঝি?

দে। হাঁ।

জু। মাইরি সখা! ব্যাপারটা তাহ’লে তুমি আচ্ছা রকম বুঝে নিয়েছ?

দে। কেনই বা না লইব?

জু। তোমার স্ত্রী মরেছে।

দে। জুমেলা, এটা তোমার একটা মস্ত ভুল।

জু। আমি বলছি—সে মরেছে।

দে। আমি বলছি—সে বেঁচে আছে।

জু। তুমি মিথ্যাকথা বলছ।

দেবেন্দ্রবিজয় সে কথার কোন উত্তর না দিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া উচ্চকণ্ঠে ডাকিলেন, “রেবতি!”

তখনই রেবতী সেই গৃহের দ্বারদেশে উপস্থিত হইল। সম্মুখস্থিত দৃশ্য দেখিয়া জুমেলিয়ার সর্ব্বাঙ্গ শিহরিল—দুইপদ পশ্চাতে হটিয়া দাঁড়াইল।

* * * * *

জুমেলিয়ার মুখে তখন আর কথা সরিল না। ক্ষণপরে কিছু প্রকৃতিস্থ হইয়া বলিল, “দেবেন্দ্রবিজয়, আশ্চর্য্য ক্ষমতা তোমার! অবশ্যই তুমি মৃতকে জীবিত করবার কোন সঞ্জীবনী মন্ত্ৰ জান।”

দেবেন্দ্রবিজয় তদুত্তরে কহিলেন, “হাঁ, আপাতত এই ব্যাপারে।”

“এ লোকটা কি বেঁচে আছে?” জুমেলিয়া নবীন ডাক্তারের মৃতদেহ নিৰ্দ্দেশ করিয়া দেখাইল। দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “না, মরেছে!”

.

জুমেলা বলিল, “আঃ! বাঁচলেম! তোমার কথা শুনে আপাতত অনেকটা আশ্বস্ত হ’লেম। সত্যই যে তোমার পত্নীকে জীবিত দেখছি। কিন্তু মনোরমা? মনোরমাও কি জীবিত আছে?”

দেবে। তুমি যে এখন বড় স্বীকার করছ, তার নাম মনোরমা?

জুমে। এখন আর অস্বীকার ক’রে লাভ কি?

দে। তা সত্য।

জু। সে মনোরমা কি বেঁচে আছে?

দে। হাঁ।

জু। কুমুদিনী

দে। মরেছে।

জু। তুলসীদাস আর গোবিন্দপ্রসাদ?

দে। মরেছে।

জু। বটে, যেগুলিকে তোমার বাঁচিয়ে রাখা দরকার, সেগুলিকে তুমি বাঁচিয়েছ—অন্য সকলকে বাঁচাতে তোমার ইচ্ছা ছিল না।

দেবেন্দ্রবিজয় নিরুত্তরে রহিলেন।

জু। তুমি এখন মনে করেছ, আমাকে এই সকল খুনের দায়ে ফেলবে; কে’মন কি না? দে। নিশ্চয়ই।

জু। কেমন ক’রে?

দে। আমি স্বচক্ষে দেখেছি—তুমি (নবীনের মৃতদেহ নিৰ্দ্দেশ) এই লোকটাকে হত্যা করেছ; তুমি যে উকিল তুলসীদাসকে আর গোবিন্দপ্রসাদকে হত্যা করেছ, তা সপ্রমাণ করতে আমার অনেক প্রমাণ আছে।

জু। দেবেন্দ্র, তুমি নিতান্ত নির্ব্বোধ।

দে। আমার ত তা’ বোধ হয় না।

জু। কি প্রমাণে, বল?

দে। প্রমাণ আমার চক্ষু। এই চোখ দুটা তোমার সকল পৈশাচিক কাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছে।

জু। আমি তা অস্বীকার করব।

দে। আমার প্রত্যক্ষ প্রমাণ তোমার অস্বীকার করবার উপায় দূর করবে।

জু। কখনই না।

দে। নিশ্চয়ই।

জু। তোমার প্রত্যক্ষ প্রমাণ কোন কাজেই আসবে না। বিষের কোন চিহ্নই তুমি পাবে না। আঘাতের কোন ক্ষতচিহ্নও—কুমুদিনীর ছাড়া আর কোন মৃতদেহে নাই; তবে এতগুলো লোকের এক রোগে এক বাড়িতে, এক রাত্রের মধ্যে যে মৃত্যু ঘটেছে, এ এক দৈবঘটনা দাঁড়াবে মাত্র।

দে। রোগটা কি?

জু। মৃগী।

দে। হাঁ, এ রোগটার চাল তুমি অনেকদিন থেকে চেলে আসছ বটে; তবে দিন-কতক মৃগবাটীতে অর্থাৎ হরিণবাড়ি জেলে অবস্থান করলে, এ মৃগীরোগ সহজে ধরা পড়বে।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – পাতাল-প্রবেশ

জুমেলিয়া এতক্ষণ ঠিক গৃহমধ্যস্থলে অটলভাবে দণ্ডায়মান। তখন সে যে স্থান পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিল—এখনও ঠিক সেই স্থানে দণ্ডায়মান; এতক্ষণে, এত কথায়, কি ভ্রমক্রমে সে আর এক পদ অগ্রসর হয় নাই—কি পশ্চাদগমন করে নাই।

তখন জুমেলিয়ার ভাবভঙ্গিতে কোন আতঙ্কব্যঞ্জক চিহ্ন ছিল না; তাহার সম্মুখস্থিত ব্যক্তিদ্বয়কে দেখিয়া যেন তাহার কিছুমাত্র শঙ্কা হইতেছিল না; সে তখন যে’ন কত নিশ্চিন্তহৃদয়ে অবস্থান করিতেছিল।

দেবেন্দ্রবিজয় তাহার সেই ভাব দেখিয়া অন্যরূপ বুঝিলেন যে, জুমেলিয়া তাহার “জীবনের শেষ-মুহূৰ্ত্ত পৰ্য্যন্ত তাঁহাদিগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাচরণ করিবে; অবশেষে অন্যবিধ উপায় না পাইলে, নিজের বিষের সাহায্যে আত্মহত্যা করিবে; কিন্তু জুমেলিয়ার এই প্রকার নির্ভীকতায় আর এক রহস্য প্রচ্ছন্ন আছে—তাহা শীঘ্র প্রকাশ পাইবে; আমরা জানি, দেবেন্দ্রবিজয় তখন সেটি ঠিক বুঝিতে পারেন নাই। বুঝিতে পারিলে অনতিবিলম্বে যাহা ঘটিল, তাহা কখনই ঘটিতে পারিত না। আমাদিগের এই আখ্যায়িকার এইখানেই “সমাপ্ত” শব্দটি লিখিয়া একরকম শেষ করিয়া দিতে পারিতাম—কিন্তু—

জুমেলিয়া মৃদুহাস্যে বলিল, “আমাদের অনেকক্ষণ ধরে অনেক বাজে কথা চলছে কেবল; কেমন না?”

দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “হাঁ, তা তো বটেই।”

“দেবেন্, তুমি কি আমাকে এখন বন্দী করবে?”

“হাঁ, সেই সুযোগ উপস্থিত।”

“তুমি কি আমার হাতে হাতকড়ি লাগাবে, দেবেন্?”

“হাঁ, তোমাকে একজোড়া অয়স্কঙ্কণ উপহার দিতে আমার একান্ত ইচ্ছে হচ্ছে।”

“অয়স্কঙ্কণ! হাতকড়ি? স্ত্রীলোকের হাতে হাতকড়ি পরাবে!”

“না, পিশাচিনীর হাতে পরাবো।”

“বেশ—পার যদি তোমার ঐ হাতকড়ি লাগাও।”

তাহার কথাগুলির ঠিক শেষেই এক বড় আশ্চর্য্য ব্যাপার সংঘটিত হইল—জুমেলিয়া আর তথায় নাই। তাহার শেষ কথাটির সঙ্গে সঙ্গেই সে-ও অন্তর্হিত হইল—গৃহতলে চক্ষের নিমেষে সে যেন লীন হইয়া গে’ল।

সপ্তম পরিচ্ছেদ – পাতাল-প্রবেশ

জুমেলিয়ার অন্তর্দ্ধানের সময় দুইবার ‘ঘ্রং’ ‘ঘ্রং’ করিয়া শব্দ হইয়াছিল; দেবেন্দ্রবিজয় তাহা সুস্পষ্ট শুনিয়াছিলেন। তখনই তিনি যেখানে জুমেলা দাঁড়াইয়াছিল, সেখানে জানু পাতিয়া বসিয়া পড়িলেন। অনুসন্ধানে গৃহতলে একটা একহস্ত পরিমিত চতুষ্কোণ গুপ্তদ্বার দেখিতে পাইলেন। পার্শ্বে একটা স্প্রীং ছিল—–দুই-তিনবার ঘুরাইয়া সেটিতে একটু চাপ দিতে গৃহতলে একটা ক্ষুদ্র দ্বার উন্মুক্ত হইল। ভিতরে চাহিয়া দেখিলেন, কেবল অন্ধকার—অবতরণের সোপানাদি কিছুই নাই।

দেবেন্দ্রবিজয় তখন শ্রীশকে নিকটে ডাকিলেন। শ্রীশ নিকটে আসিলে তিনি তাহাকে বলিলেন, “খিদিরপুরের যে ঘাটে নৌকায় উঠি, তা’ তুমি জান, সেখানে এখনই যাও—ছুটে যাও। যদি তুমি সেখানে সেই ডাকিনীকে দেখতে পাও, তাকে তখনই তার নিজের অস্ত্র পরিত্যাগ করতে বলবে; এখন তার সঙ্গে কেবল একখানা কিরীচ আছে মাত্র। যদি সে তোমার কথা না শোনে, তখনই তাকে গুলি করবে; যদি তোমার কথা শোনে, তবে যে পর্য্যন্ত আমি না যাই; সে পৰ্য্যন্ত তাকে সেইখানে অপেক্ষায় রাখবে।”

শ্রী। যে আজ্ঞা।

দে। যাও, শীঘ্র যাও—ছুটে যাও।

শ্ৰীশ দ্রুতপদে তথা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল।

দে। শচীন্দ্ৰ!

শ। এই যে এখানে আছি।

দে। তুমি এখনই তোমার মামী-মা আর মনোরমার কাছে যাও, যে পর্য্যন্ত না আমি ফিরে আসি, কোথাও যেয়ো না যেন।

এই বলিয়া আর কোন কথা না কহিয়া, না একটু ভাবিয়া উন্মত্তের মত দেবেন্দ্রবিজয় সেই গুপ্ত সুড়ঙ্গ-পথে লাফাইয়া পড়িয়া জুমেলিয়ার ন্যায় অন্তর্হিত হইয়া গেলেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ – অন্ধকূপ

দেবেন্দ্রবিজয় প্রায় আট হাত নিম্নে সশব্দে পড়িলেন। পায়ে কিছুমাত্র আঘাত পাইলেন না। যেখানে তিনি পড়িলেন, তথায় একটা তুলার সুকোমল গদি বিস্তৃত ছিল।

তখন দেবেন্দ্রবিজয়ের মনে স্বতই অনুভূত হইল, তিনি পাতালে প্রবেশ করিয়াছেন। শুধু অন্ধকার—চতুৰ্দ্দিকে গাঢ় অন্ধকার—একটুকু আলোকের সমাবেশ নাই; তিনি নিজেকে নিজেই দেখিতে পাইতেছেন না। দুর্ভেদ্য ঘনীভূত অন্ধকারে তিনি বহির্গমনের পথ অনুসন্ধানার্থ পকেট হইতে গুপ্তলণ্ঠন বাহির করিলেন; সেই লণ্ঠনের আবরণ উন্মোচন করিলে অত্যুজ্জ্বল আলোক চতুৰ্দ্দিকে বিকীর্ণ হইল। তিনি দেখিলেন, তথা হইতে বহির্গমনের কোন উপায় নাই-চারিদিকে গবাক্ষহীন, দ্বারহীন, নীরন্ধ্র মৃণ্ময় প্রাচীর।

জুমেলিয়া তথায় নাই। সে তবে গেল কোথায়? সে যদি এখান হইতে পলাইয়া থাকে, অবশ্যই কোন দিক দিয়া অন্ধকূপ হইতে বহির্গমনের কোন একটা পথ নিশ্চয়ই আছে।

দেবেন্দ্রবিজয় সেই অন্ধকূপের ঠিক মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া তাঁহার হস্তস্থিত লণ্ঠনের আলোকরশ্মি একবার এদিকে, একবার ওদিকে ধরিতে লাগিলেন। দ্বার, গবাক্ষ দূরে থাক, তিনি ভিত্তিগাত্রে একটা ক্ষুদ্র ছিদ্রও দেখিতে পাইলেন না।

এইরূপে কিয়ৎকাল অতিবাহিত হইলে দেবেন্দ্রবিজয় দেখিষলন, গৃহের এক কোণে একটা কাঠের নাতিক্ষুদ্র, নাতিবৃহৎসিন্ধুক পড়িয়া রহিয়াছে। তিনি তখনই সেটা উল্টাইয়া ফেলিতে চেষ্টা করিলেন; পারিলেন না—অত্যন্ত ভারি বলিয়া বোধ হইল। তিনি আপনা-আপনি “পথে এস, আর যাবে কোথা,” বলিয়া সিন্ধুকের উপরে বারংবার সজোরে পদাঘাত করিতে লাগিলেন। উপরের ডালাখানার কব্জা ভাঙ্গিয়া গে’ল। দেবেন্দ্রবিজয় দেখিলেন, সেই সিন্ধুকমধ্যে জুমেলিয়া নাই। তন্মধ্যে প্রবেশ করিয়া আলো ধরিয়া দেখিলেন, তথা হইতে একটা কাঠের সিঁড়ী উপরে উঠিয়াছে, তিনি সেই সোপান দিয়া সরাসর উপরে উঠিতে লাগিলেন। উর্দ্ধদিকে চাহিয়া দেখিলেন, সুনিৰ্ম্মল নৈশাকাশে অনেকগুলি তারা জ্বলিতেছে। রজনী গভীরা, একান্ত শব্দমাত্রবিহীনা।

সত্বর আরও সত্বর—দেবেন্দ্রবিজয় বুঝিলেন, ঠিক পথই ধরিয়াছেন। সোপান অতিক্রম করিয়া তিনি একেবারে গৃহ-প্রাঙ্গণে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দুই-এক পল মাত্র তথায় তিনি স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া একবার ভাবিয়া লইলেন যে, জুমেলিয়া কোন্ পথে পলাইয়াছে। সে চিন্তার তখনই মীমাংসা হইয়া গে’ল। তিনি অতি দ্রুত গঙ্গাভিমুখে ছুটিলেন।

যদি শ্রীশচন্দ্র সেই ডাকিনীকে আর দুই-চারি মুহূর্ত কোন কৌশলে ধরিয়া রাখিতে পারে, তাহা হইলে আমি ঠিক সময়ে তথায় উপস্থিত হইতে পারিব। এইরূপ স্থির করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় গঙ্গাভিমুখে সাধ্যানুসারে ছুটিতে লাগিলেন।

নবম পরিচ্ছেদ – গঙ্গাবক্ষে

দেবেন্দ্রবিজয়ের খিদিরপুরে আগমনাবধি নৈশাকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। এক্ষণে তাহা নির্মেঘ, নিৰ্ম্মল, পরিষ্কার। নক্ষত্রালোকে যাবতীয় পদার্থ সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত হইতেছে। শ্যামাঙ্গী নিশাসুন্দরীর সৌন্দৰ্য্য এক্ষণে অতি মনোমদ। গগনের পশ্চিমপ্রান্তে, দূরে—অতিদূরে কৃষ্ণ সপ্তমীর ম্রিয়মাণ চন্দ্র ডুবিয়া যাইতেছে।

দেবেন্দ্রবিজয় গঙ্গাতটে উপস্থিত হইলেন। কই? সেখানে একখানিও নৌকা নাই। দূরে বামদিকে ঝপ্ ঝপ্ করিয়া কি-একটা শব্দ হইতেছে।

দেবেন্দ্রবিজয় সুস্পষ্টরূপে তাহা শুনিতে পাইলেন। যেদিক হইতে শব্দ আসিতেছিল, সেইদিকে ছুটিলেন। কিয়দ্দূর গিয়াছেন মাত্র, শুনিতে পাইলেন, “রক্ষা কর—কে আছ, শীঘ্র এস—শীঘ্র — শীঘ্র—”

এ যে শ্রীশের কণ্ঠস্বর! একি! আবার কে হাসিয়া উঠিল? এ হাসি যে দেবেন্দ্রবিজয়ের পরিচিত। এ যে জুমেলিয়ার সেই তরঙ্গায়িত অমঙ্গলজনক ভীষণ হাসি! কী ভয়ানক!

ব্যাপার যেরূপ ঘটিয়াছে, দেবেন্দ্রবিজয় অনুভবে এক রকম বুঝিলেন। মনে মনে বলিলেন, “ডাকিনী—ডাকিনী! শ্রীশ বালক, ডাকিনী তাকে আপন কায়দায় সহজে ফেলেছে; আহা! যদি শ্রীশের পরিবর্তে শচীন্দ্রকে এখানে পাঠাতাম! কি সৰ্ব্বনাশ হ’লো।”

দেবেন্দ্রবিজয় তখন প্রাণপণে দৌড়িতেছেন। কিছুদূর এইরূপে ছুটিয়া একখানি নৌকা দেখিতে পাইলেন। সে নৌকা তখন তটভূমি হইতে দূরে, ক্রমে ক্রমে অগ্রসর হইতেছে।

দেবেন্দ্রবিজয় চিৎকার করিয়া বলিলেন, “ব্যস্! নৌকা নিয়ে এখনও কিনারায় এস; ফিরে এস, নতুবা এখনি আমি গুলি করব।”

দেবেন্দ্রবিজয় উত্তরে একটা উচ্চ হাস্যধ্বনি শুনিতে পাইলেন মাত্র। পকেট হইতে পিস্তল বাহির করিয়া জুমেলিয়াকে লক্ষ্য করিয়া উত্তোলন করিলেন।

জুমেলিয়ার সকল কার্য্যেই বিশেষ নৈপুণ্য আছে; সে দেবেন্দ্রবিজয়ের গুলির বিরুদ্ধে যে ঢাল উত্তোলন করিল, তাহা অতি চমৎকার—অতি বুদ্ধির পরিচায়ক। দেবেন্দ্রবিজয়ের লক্ষ্যানুসারে হস্তপদবদ্ধ শ্রীশচন্দ্রকে সে নিজের সম্মুখে দুই হস্তে তুলিয়া ধরিল। শ্রীশচন্দ্র জীবিত আছে, আপনাকে মুক্ত করিবার অভিপ্রায়ে বারংবার চেষ্টা পাইতেছে। আপাতত সে সত্যসত্যই জুমেলিয়ার ঢালের কার্য্য করিল।

দিবালোকে হইলে দেবেন্দ্রবিজয় এতক্ষণ গুলি করিতে পারিতেন; কিন্তু এই অস্পষ্ট অন্ধকারে—যত শিক্ষাই তাঁহার থাক না কেন—পাছে লক্ষ্যচ্যুত হইয়া গুলি শ্রীশচন্দ্রেরই দেহ বিদ্ধ করে, এই ভয়ে তিনি গুলি করিতে সাহস করিলেন না।

দেবেন্দ্রবিজয় আপনা-আপনি বলিলেন, “জুমেলিয়া বড় সহজ মেয়ে নয়! ডাকিনীদের হৃদয়ে যে শক্তি থাকা সম্ভব, সে শক্তি জুমেলিয়ার বিলক্ষণ আছে। দেখিতেছি, যতই আমি চেষ্টা করি না কেন, ও আমার সকল চেষ্টা ব্যর্থ ক’রে নিশ্চয়ই এখনই পালাবে।”

শ্রীশচন্দ্র বলিল, “গুলি করুন-গুলি করুন।”

তখনই জুমেলিয়া শ্রীশকে আরও কিছু উর্দ্ধে তুলিয়া ধরিল; দুই হস্তে তাহাকে ঘুরাইয়া নৌকা হইতে তিনহাত দূরে গঙ্গার তরঙ্গায়িত প্রবাহের উপর নিক্ষেপ করিল। নিজে চকিতে নৌকার মধ্যে লুক্কায়িত হইল। স্রোতোমুখে নৌকা চলিতে লাগিল।

দেবেন্দ্রবিজয় তখনই জুমেলিয়ার পলায়নের ব্যাঘাত ঘটাইবার জন্য আর কোন সদুপায় না পাইয়া হতাশচিত্তে শ্রীশের উদ্ধারার্থ গঙ্গাবক্ষে ঝাঁপাইয়া পড়িলেন।

দশম পরিচ্ছেদ – গঙ্গাতটে

অতি কষ্টে দেবেন্দ্রবিজয় শ্রীশচন্দ্রকে কূলে তুলিলেন।

ইতোমধ্যে সেই নৌকা দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া গিয়াছে।

এখন কোন একটা প্রকাণ্ড জন্তুর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দের ন্যায় সেই নৌকার দাঁড়া নিক্ষেপের শব্দ শ্রুতিগোচর হইতেছে মাত্র।

যাহাই হউক, আপাতত জুমেলিয়া পলাইল। দেবেন্দ্রবিজয় শ্রীশচন্দ্রকে কূলে তুলিয়া দেখিলেন, সে জ্ঞানশূন্য। বিহিত যত্নে ও শুশ্রূষায় তাহার চৈতন্য সম্পাদন করিলেন। জিজ্ঞাসিলেন, “ব্যাপার কি?”

শ্রীশ প্রত্যুত্তরে বলিল, “আমি এদিক-ওদিক চাহিতে চাহিতে—ঐ যে ঝোপটা দেখছেন— যেমন পার হ’য়ে এসেছি, জুমেলিয়া ঐ ঝোপের ভিতরে ছিল, একটু এগিয়ে যেতেই সে চুপিসারে পিছনে পিছনে এসে আমার মাথায় দারুণ আঘাত করে; তাতেই আমি একেবারে কাবু হ’য়ে পড়ি। তারপর সে আমার হাত-পা বেঁধে নৌকায় এনে ফেলে। মাগীটা বড় সহজ নয়, মশাই!”

দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “সত্য, শ্রীশ, এ বড়ই শক্ত পাল্লা; তুমি ত বালক, জুমেলিয়া আমাকেই নাস্তানুবুদ ক’রে তুলেছে; এরূপ স্ত্রীলোক আমি কখনও দেখি নি; স্ত্রীলোকের যে এতদূর বুদ্ধি ও শক্তি থাকতে পারে, তা’ আমি কখন কল্পনাও করি নি।”

******

নিরাশহৃদয়ে দেবেন্দ্রবিজয় শ্রীশকে সঙ্গে লইয়া আনন্দ-কুটীরে ফিরিয়া আসিলেন। সেখানে তাঁহার আদেশমতে শচীন্দ্র রেবতী ও মনোরমাকে লইয়া অপেক্ষা করিতেছিল।

এই প্রাচীন অট্টালিকা সম্বন্ধে বিবিধ গুপ্তরহস্য জুমেলিয়া অপেক্ষা মনোরমা অধিকতর অবগত ছিল। জুমেলিয়া যে গুপ্তদ্বার দিয়া অন্তর্হিত হয়, সে গুপ্তদ্বার মনোরমার অপরিচিত নহে। সে ইহার তথ্য বিশেষরূপে জ্ঞাত ছিল; আনন্দ-কুটীরবাসী অনেকেই এ গুপ্তদ্বারের কথা জানিত; কিন্তু কি জন্য ইহা নিৰ্ম্মিত হয়, সে সংবাদ কেহ জানিত না—মনোরমাও না।

অব্যবহার্য্যবোধে মনোরমা এই গুপ্তদ্বার লৌহকীলকে বদ্ধ করিয়া দিয়াছিল; কিন্তু ইহা সময়ে বিশেষ কাজে আসিবে ভাবিয়া, জুমেলিয়া মুক্ত করিয়া রাখিয়াছিল। এই কতক্ষণ আগে পাঠক মহাশয়, সে প্রমাণ পাইয়াছেন।

মনোরমার সাহায্যে দেবেন্দ্রবিজয় ভৃত্য শিবুকে গুপ্তগৃহ হইতে উদ্ধার করিয়া আনিলেন। অনাহারে শিবু মৃতপ্রায়, তাহার দেহ জীর্ণ, শীর্ণ, মুখ কালিমাময়।

দেবেন্দ্রবিজয়ের কাজ এখনও শেষ হয় নাই। জুমেলিয়া মনোরমার যথেষ্ট অর্থাদি লইয়া পলায়ন করিয়াছে; তাহাকে গ্রেপ্তার করা এক্ষণে অত্যাবশ্যক।

******

দেবেন্দ্রবিজয় প্রত্যুষে সকলকে সঙ্গে লইয়া নিজের বাড়িতে ফিরিয়া আসিলেন। আসিবার সময়ে আম্মারীর ভিতর হইতে “১৭–ক” চিহ্নিত পুলিন্দাটি সঙ্গে লইয়াছিলেন। তৎসম্বন্ধে কোন কথা কাহারও নিকটে প্রকাশ করিলেন না।

একাদশ পরিচ্ছেদ – ভীষণ প্রতিজ্ঞা

পরদিন প্রাতঃকালে একাকী দেবেন্দ্রবিজয় বহিৰ্ব্বাটীতে চিন্তিত মনে বসিয়া আছেন। অন্যমনে মস্তকের কেশাগ্রভাগ ধরিয়া বারংবার টানিতেছেন, এমন সময়ে শচীন্দ্র তথায় আসিয়া উপস্থিত হইল।

“শচীন্দ্র, সেই ডাকিনী আমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাচরণ করতে প্রবৃত্ত হয়েছে।”

এই বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় বামচক্ষু কুঞ্চিত করিয়া শচীন্দ্রের মুখপানে চাহিলেন।

শচীন্দ্র বলিল, “কি হয়েছে আবার?”

“এই দে’খ,” বলিয়া শচীন্দ্রের সম্মুখে দেবেন্দ্রবিজয় একখানি পত্র নিক্ষেপ করিলেন। পত্রের উপরিভাগে প্রথমেই বড় বড় অক্ষরে লেখা;–

“অ-জুমেলিয়া বা অ-দেবেন্দ্র হইবে অবনী”

তৎপরে—

“দেবেন্দ্রবিজয়!

‘অ-জুমেলিয়া’ লিখিলাম বটে; কিন্তু ও কথা কোন কাজেরই নয়, গ্রাহ্যই করি না,— শেষের কথাটাই ঠিক, নিশ্চয় পৃথিবী অ-দেবেন্দ্র হইবে—আমি তোমায় খুন করিব।

তোমায় খুন করিব বটে, কিন্তু শীঘ্র নয়। সেজন্য অন্য হত্যাকাণ্ডগুলি আমাকে আগে শেষ করিতে হইবে। তুমি যাদের ভালবাস, আমি আগে তাহাদিগকে নিকেশ করিব; তবে ত তোমার বুকে বজ্রাঘাত হইবে—তবে ত আমার মনের আশা, প্রাণের সাধ মিটিবে। আমি আগে তোমার স্ত্রীকে আক্রমণ করিব, স্থির করিয়াছি।

বুঝিয়াছ?

না বুঝিতে পারিয়া থাক—অতি শীঘ্রই বুঝিবে

আমি তোমাকে মিথ্যা ভয় দেখাইতেছি না; তেমন আমাকে জানিয়ো না; তুমি জান— জুমেলিয়া কেমন করিয়া তাহার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে!

আমাকে এখন থেকে জানিয়া রাখ, আমি তোমাকে সহজে ছাড়িব না! তোমাকে সাংঘাতিক যন্ত্রণা ভোগ করাইব—তবে ছাড়িব। তোমার মত গোয়েন্দাকে আমি শতবার এক হাটে বিক্রয় করিয়া আবার শতবার অন্য হাটে কিনিতে পারি—সে ক্ষমতা আমার বেশ আছে। মোট কথা, তোমাকে আমি গ্রাহ্যই করি না। জুমেলিয়া বড় সহজ মেয়ে নয়, তোমাকে সে সাত সাগরের জলে হাবুডুবু খাওয়াইতে পারে।

তুমি আমাকে অতুল সম্পত্তি হ’তে বঞ্চিত করেছ। কেবল কতকগুলি নগদ টাকা— থাক, সেগুলিতে তোমার আর তোমার স্ত্রীর সৎকার মহাসমারোহে সমাধা হইবে। তুমি মনোরমাকে আমার সিংহাসনে বসাইয়াছ—বসাও—ফল কি তাহা দেখিবে।

আমি তোমার তিনজন শত্রুকে যখন হত্যা করি, তখন তুমি কোন বাধা দাও নাই। আজ আমি যে ব্রতে ব্রতী, সেই ব্রত উদ্‌্যাপনে তাহারা সহায়তা করিবে বলিয়াই তুমি তাহা কর নাই—চতুর বটে তুমি! কি ব্রত জান? মহাব্রত—তোমার হত্যাব্রত— দেবেন্দ্রবধ-ব্রত।

আগে আমি তোমাকে ঘৃণা করতাম; এখন তোমার এই সকল কাজে আমি তোমাকে তখনকার চেয়ে বেশি বেশি ঘৃণা করি।

তখন আমি অর্থোপার্জ্জনে প্রাণপণ করিয়াছিলাম; এখন আমি কয়েকটা চিতা পূর্ণ করিতে প্রাণপণ করিলাম।

পণ? কার পণ জান? জুমেলিয়ার! বিফল হইবার নয়, কখনও হয় নাই।

চিতা? কয়েকটা চিতা! কা’র কা’র জান কি? একটা তোমার ভালবাসার স্ত্রী; আর একটা তোমার ভাগিনেয় সহকারীর—যার নাম শচীন্দ্র। আর একটা তোমার নিজের। সাবধান—খুব সাবধান। কারণ আমি প্রতিজ্ঞা করিয়াছি—কখন লঙ্ঘন হবে না।

আমার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হইবার অনেক উপায় আছে।

আমার অনুসন্ধানে ব্যস্ত হইয়ো না। কেন বাপু, মিথ্যা খুঁজিয়া মরিবে, আমাকে পাইবে না। যদি আমার পশ্চাদনুসরণ কর—আমার কাছে তাহা অপ্রকাশ থাকিবে না। এ সকলকার চেয়ে ভাল চাও, এখন থেকে তোমার স্ত্রীর উপরে পাহারা দিতে থাক; সে-ই এবার আমার মানব-মৃগয়ার প্রথম শিকার জানিবে।

যখন আমি তোমাকে আমার কবলে আনিয়া ফেলিব, তখন আমায় কি করিতে হইবে জান? সহসা তোমাকে হত্যা করিব না; আগে অশেষবিধ জ্বালা-যন্ত্রণা দিব, শীঘ্র শীঘ্র তোমার চোখদুটা উৎপাটন করিয়া ফেলিব, কানদুটা ভাল করিয়া কাটিয়া দিব; তাহার পর লোহার শিক পুড়াইয়া তোমার সর্ব্বাঙ্গে প্রহার করিব—মোট কথা যমযন্ত্রণা দিব। এই রকমে ক্রমে ক্রমে তুমি মরিবে; তবে না আমার মনের আশা মিটিবে, তবে না আমি সুখী হইব, তবে না আমার নাম শ্ৰীমতি জুমেলিয়া!

কী মজার কথা! এ সকল কথা যতই ভাবি, ততই যেন প্রাণ মাতিয়া উঠে—ততই যেন হৃদয় আনন্দে নাচিয়া উঠে। কেমন কল্পনা করিয়াছি বল দেখি, ভাল নয় কি? ভালই হউক, মন্দই হউক, ইহা মিথ্যা কবির কল্পনা নহে—জুমেলিয়ার।

সাবধান!    আমি—জুমেলা!”

পত্রপাঠ সমাপ্ত হইলে শচীন্দ্র সাশ্চর্য্যে বলিল, “তাই ত!”

দেবেন্দ্রবিজয় জিজ্ঞাসিলেন, “প’ড়ে কি বুঝলে? “

“বড় ভাল বোধ হচ্ছে না।”

“আমার ত ভাল ব’লে বোধ হচ্ছে। শচীন্দ্র, এবার আমি তাকে গ্রেপ্তার করব।”

“করার চেয়ে বলা সহজ।”

“এবার সে নিশ্চয় ধরা পড়বে।”

“এ কথা শুনে এখন ত আমার হাসি পায়।”

“জুমেলিয়া বড়ই চতুর—তার বুদ্ধি চমৎকার। সে আমাদের সকল চেষ্টা বিফল করতে বিশেষ চেষ্টা পাবে। হয়ত এবার এমন কোন উপায় স্থির করেছে, যাতে সে সহজে কার্য্যসিদ্ধি করবে।”

“সম্ভব।”

“এ পত্রপাঠে তুমি আর কিছু অনুমান করতে পেরেছ কি?”

“না, কিছুই না।”

“আমার মনে একটা সন্দেহ আছে।”

“কি, বলুন?”

“সে এখন আমাদের নিকটেই কোনখানে আছে—এই গ্রামের মধ্যেই।”

“এমন সন্দেহ করেন আপনি?”

“হাঁ, আমার মনে এরূপ একটা ধারণা হচ্ছে।”

“এখন কি করবেন? “

“অনুসন্ধান।”

“এখনই আমি প্রস্তুত আছি।”

“তুমি একদিকে ছদ্মবেশে বাহির হও; আমিও একদিকে যাই। শুধু ঘুরলে হবে না, সে এখন নিশ্চয় ছদ্মবেশে আছে; হয় বৃদ্ধা সেজেছে, কি— “

“বৃদ্ধ সেজেছে, কেমন?”

“হাঁ, শচীন্দ্র, ঠিক বলেছ, সে এখন পুরুষ-বেশ ধারণও ক’রে থাকতে পারে; এ আর আশ্চৰ্য্য কি? বেশ ক’রে চারিদিকে চোখ রাখবে। যাও, তুমি ইচ্ছামত একটা ছদ্মবেশে সেজে বা’র হও। তুমি বালিগঞ্জের দিকে যাও; আমি বকুল রাগান বেলতলা অঞ্চলে সন্ধান লইগে।”

শচীন্দ্র আর কোন কথা না বলিয়া সজ্জাগৃহে প্রবেশ করিল। প্রায় বিশ মিনিটের পর বেশ একটি ইয়ার ছোকরার বেশে বাহির হইল। মস্তকে এলবার্টটেড়ী, হাতে সৌখীন ছড়ী, মুখে সুরভিত চুরুট, পরিধানে ফরাসডাঙ্গার কালাপাড় ধুতি, ভাল কামিজ; কামিজের বোতামে সোনার ঘড়ি চেইন, অঙ্গুলীতে দুই তিনটা অঙ্গুরীয়, সর্ব্বাঙ্গে আতরের সৌরভ। আর কি চাই?

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

শচীন্দ্র চলিয়া গেলে দেবেন্দ্রবিজয় পল্লীগ্রামবাসী ইতর ব্যক্তির ছদ্মবেশে বাহিরিলেন। প্রথমে বরাবর বকুল বাগানে যাইলেন, তথা হইতে বেলতলায়—তথায় সন্ধানসুযোগ ঘটিয়া উঠিল না। যখন তিনি বেলতলার পথ ছাড়িয়া দক্ষিণ দিককার একটা রাস্তার মোড় ধরিলেন; দেখিতে পাইলেন একখানা ভাড়াটীয়া গাড়ি হাজরার পথে প্রবেশ করিল। দেবেন্দ্রবিজয় সেই গাড়ির পশ্চাদ্ভাগে উঠিয়া বসিলেন। তখন তাঁহার ইতরবেশ, ইতর কার্য্যে লজ্জিত হইলেন না।

গাড়ি হাজরার পথ প্রায় অতিক্রম করিয়া বেগ মন্দীভূত করিল। দেবেন্দ্রবিজয় তাহাতে বুঝিতে পারিলেন, এইবার গাড়িখানা নির্দ্দিষ্ট স্থানের সন্নিকটস্থ হইয়াছে। অবতরণ করিলেন। গাড়ি তখন ধীরে ধীরে যাইতেছিল। ক্রমে একটা বাগানের ফটকে গিয়া থামিল। একজন আরোহী যুবক, তাহার বেশভূষার পারিপাট্য যথেষ্ট—পাড়ি হইতে অবতরণ করিয়া দুই-একবার এদিক-ওদিক চাহিয়া উদ্যানমধ্যে প্রবেশিল। সেই যুবকের বেশভূষা ভদ্রসন্তানের ন্যায় অতি পরিপাটি। বয়স বেশি নয়—বেশি করিয়া ধরিতে হইলে পঁচিশ বৎসর।

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ – মুদির দোকানে

দেবেন্দ্রবিজয় আর তখন সেদিকে না যাইয়া ফিরিলেন। সেই পথেই একটা মুদির দোকানে গিয়া উঠিলেন। মুদি তখন একখানি রামায়ণের প্রতি ঝুঁকিয়া, সুর করিয়া দুলিয়া দুলিয়া পড়িতেছিল —

“পুত্রহীন মহারাজ মনে বড় দুঃখ।
সাতশত পঞ্চাশ বিভা করিল কৌতুক।।
সাতশত পঞ্চাশের প্রধান তিন গণি।
কৌশল্যা কেকয়ী আর সুমাত্রা ঠাকুরাণী।।”

দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিয়া মুদি জিজ্ঞাসিল, “কি চাও, বাপু?”

ছদ্মবেশী দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “এক পয়সার মুড়ি-মুড়কী। বড় জলপিপাসা পেয়েছে।”

মুদি উঠিয়া একটা শালপাতার ঠোঙা করিয়া দেবেন্দ্রবিজয়কে তাঁহার প্রার্থিত সামগ্রী সরবরাহ করিল।

দেবেন্দ্রবিজয় দোকান-ঘরের চৌকিতে গিয়া বসিলেন। মুদি চিৎকার করিয়া তাহার পুত্র ভজহরিকে ডাকিয়া, “ভজা, এক ঘটি জল দিয়ে যা রে।”.

নেপথ্য হইতে স্ত্রীকণ্ঠে উত্তর করিল, “ভজহরি পাঠশালে গেছে।”

কি করিবে? তখন মুদি মহাশয় স্বয়ংই পানীয় আনয়ন করিলেন। দেবেন্দ্রবিজয় কিয়ৎপরে মুদিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখানে বোসেদের বাগান কোথায় জান? “

মুদি ভূযুগ ললাটে তুলিয়া বলিল, “বোসেদের? না, এখানে বোসেদের বাগান? কৈ—নাই ত।” যে উদ্যানে সেই যুবককে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছিলেন, সেই বাগানটি অঙ্গুলী-নিৰ্দ্দেশে দেখাইয়া দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “ও বাগানটি কাদের?”

মু। ওটা মিঞার বাগান

দে। মালিকের নাম কি জান?

মু। না, কেন?

দে। আমরা বাপু, মালীর ব্যবসা করি—ফলফুলের গাছগাছড়া বেচাই আমাদের কাজ। একজন বাবু এইখানে তেনার সঙ্গে তেনার বাগানে দেখা করতে বলেছিলেন। তেনার গোটাকতক ভাল ভাল ফুলের গাছ চাই; তাই খবর নিতে এসেছিলেম। তিনি বাগানটার যেমন বরণোন্‌টা করেছিলেন, তাতে আমার বোধ হয় ঐ বাগানটাই ঠিক। তিনি ঐ রকম ফটকের কথা বলেছিলেন। বাগানের মালিককে তুমি দেখেছ কি?

মু। দেখেছি, নাম জানি না। জাতে মুসলমান, পোষাকে ঠিক বাঙ্গালী; চেহারাও বেশ চমৎকার, রং ফর্সা, ছোকরা বয়েস।

দে। ঠিক বটে, তবে ঠিক হয়েছে, তিনিই বটেন। তিনি কি এখানে থাকেন?

মু। না, মাঝে মাঝে আসে; যেদিন আসে, সেদিন মহাঘটা প’ড়ে যায়। দুই-তিনটে ইহুদী বাইজী নিয়ে এসে আমোদ করে; দুই-চারি-জন ইয়ার বস্কীও আসে, গান বাজনা করে, তারপর রাতারাতি সকলে সরে যায়। বিলাতী মদের যে সব ভাল ভাল সাদা বোতল প’ড়ে থাকে, সেগুলা সদুর মা আমাকে দু-চার পয়সায় বিক্রী ক’রে যায়।

দে। সদুর মা কে?

মু। ঐ বাগানের ঝি, বাগানে থাকে; বাগানের ঘর-দোরের ভার তার উপরে। মাগীটার বাড়ি আমাদের দেশেই।

দে। নাম সদুর মা? সে মাগীটার মেয়ের নাম বুঝি সুধা?

মু। সৌদামিনী।

দে। মেয়ে থাকে কোথায়?

মু। দেশে থাকে।

দে। কোন্ দেশ?

মু। মেদিনীপুর।

দে। বটে!

দেবেন্দ্রবিজয় মুড়ী মুড়কীর পয়সা মুদিকে দিয়া, তথা হইতে বহির্গত হইয়া সেই উদ্যানাভিমুখে চলিলেন।

চতুৰ্দ্দশ পরিচ্ছেদ – পরাণ মণ্ডল

উদ্যানের ফটক অতিক্রম করিয়া দেবেন্দ্রবিজয় বামদিকে একখানি খোলার ঘর দেখিতে পাইলেন।

সে ঘরে সদুর মা রন্ধন করিতেছিল।

ছদ্মবেশী দেবেন্দ্রবিজয় একবারে রন্ধন-গৃহের দ্বারস্থ হইয়া বলিলেন, “কি গো সদুর’ মা, কি হচ্ছে গো?”

সবিস্ময়ে সদুর মা দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখপানে চাহিয়া চাহিয়া বলিল, “কে গা তুমি, কে গা তুমি?”

“আমি পরাণ মণ্ডল।”

“পরাণ মণ্ডল! হবে। পরাণ মণ্ডল তুমি?”

“চিনতে পারছ না? “

“কৈ, পরাণ মণ্ডল ব’লৈ ত আমি কাকেও জানি না। কৈ মনে ত পড়ে না?”

“তা’ পড়বে কেন? দেশ ছেড়ে চ’লে এসেছ, দেশের কথা মনে পড়ে কি আর? আচ্ছা, বেশ ক’রে আমাকে ঠাউরে দেখ দেখি।”

(সবিরক্তি) “না গো না, আমি পরাণ মণ্ডল ব’লে কাকেও জানি না।”

“আঃ, পোড়া কপাল আমার! সদুর মা, তুমি এখানে এসে দেশের কথা একেবারে সব ভুলে ব’সেছ? মেীপুরের কথা বুঝি আর মনে নাই? এখন সহরে এসে পড়েছ, সম্বরে হয়েছ, কাজেই ভুলে গেছ। সৌদামিনীর কথা মনে আছে কি?”

“ওঃ! আমার মেয়ের কথা বলছ? মা হয়ে কি কেউ আপনার পেটের বাছাকে ভুলতে পারে গা?“

“কি জানি তোমার যেমন ভোলা মন, আশ্চর্য্য কি বল। আমাকে তুমি যে একেবারে ভুলে গেছ। আচ্ছা, তুমি দেশের ওই যে কি মণ্ডল ভাল—

“নকুড় মণ্ডল?”

“হাঁ, নকুড় মণ্ডল, আমার মামাত ভাই হয়।”

“ওঃ! ওরে চিনেছি, আর বলতে হবে না; ব’স বাবা, উঠে ব’স।”

“এ বাগান কার সদুর মা? বেশ বাগান—চমৎকার বাগান—চাদ্দিকে কি তর-বেতর ফুলট ফুটেছে! সদুর মা, বাগানের মাঝে যে বাড়িটা, ওটায় কি হয়?”

“ওটায় বাবুরা এসে ইয়ারকী দেয়।”

“বেশ বাড়িখানি ত, যেন রাজার বাড়ি! একবার দেখে আসি।”

এই বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় তখনই উঠিয়া উদ্যানমধ্যস্থিত সেই দ্বিতল অট্টালিকাভিমুখে অগ্রসর হইলেন। দ্বার উন্মুক্ত ছিল, নির্ব্বিঘ্নে প্রবেশ লাভ করিলেন। নিম্নতলস্থিত সকল কক্ষে ফিরিলেন, কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না। উপরে উঠিলেন; উপরের সকল ঘরই চাবিবন্ধ; কেবল দক্ষিণ পার্শ্বস্থিত একটি ঘর চাবি বন্ধ ছিল না। দেবেন্দ্রবিজয় সেই ঘরের কবাট খুলিয়া ভিতরে এক ব্যক্তিকে বসিয়া থাকিতে দেখিলেন। যাহাকে দেখিলেন, সে তাঁহার পরম শত্রু, পুরুষবেশে জুমেলিয়া—সেই শকটারোহী যুবা।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ – শেষ কথা

জুমেলিয়া গৃহমধ্যস্থিত পর্য্যঙ্কের উপর বসিয়া পাখা লইয়া নিজের স্বেদসিক্ত শরীরের বায়ু সঞ্চালন করিতেছিল। দেবেন্দ্রবিজয়কে দেখিয়া চকিত হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বস্ত্রাভ্যন্তর হইতে এক টুকরা শিকড় লইয়া নিজের মুখমধ্যে নিক্ষেপ করিল।

ছদ্মবেশী দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “ভাল আছ, জুমেলা? যা’ হ’ক, ঈশ্বরেচ্ছায় আবার আমাদের অতি শীঘ্রই দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে।”

জুমেলিয়া সেই শিকড় টুকরাটি দাঁতে চাপিয়া ধরিয়া, খিল খিল করিয়া কেবল হাসিয়া উঠিল মাত্র। দেবেন্দ্রবিজয় সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। পিশাচী জুমেলিয়ার সঙ্কুচিতভাব কিছুই দেখিতে পাইলেন না। জিজ্ঞাসিলেন, “জুমেলা, তোমার মুখে ও কি?”

“বিষ!” সেই শিকড় খণ্ড সেইরূপ ভাবেই মুক্তোজ্জ্বলদন্তে চাপিয়া অথচ স্পষ্টবাক্যে জুমেলিয়া উত্তর করিল, “যদি তুমি আর এক পা অগ্রসর হও, দেখবে, এ শিকড় জুমেলিয়া উদরস্থ করেছে।”

দেবেন্দ্রবিজয় বলিলেন, “তাই হোক—ক্ষতি কি? আমি তোমার সঙ্গে আমাদের বিগ্রহের সন্ধি-স্থাপনা করিতে আসি নাই; আমি তোমার জীবন্ত দেহই হোক, আর মৃত দেহই হোক, আমি এখান হইতে লইয়া বাহির হইব।”

“তবে আমার মৃতদেহই পাবে, তুমি।”

“তথাস্তু।”

এই বলিয়া দেবেন্দ্রবিজয় পকেট হইতে হাতকড়ি বাহির করিয়া যেমন এক পদ অগ্রসর হইয়াছেন, জুমেলিয়া শিকড়ের প্রায় অর্দ্ধাংশ উদরস্থ করিয়াছে; তখনই টলিতে টলিতে গৃহতলে নিপতিত হইল; সর্ব্বশরীর নিস্পন্দ—মুখে কথা নাই—নাসারন্ধ্রে শ্বাস-প্রশ্বাস নাই।

কিয়ৎপরে জুমেলিয়া চক্ষুরুন্মীলন করিল; ধীরে ধীরে উঠিয়া সোজা হইয়া দাঁড়াইল। তাহার পর সেই হাসি—দেবেন্দ্রবিজয়ের নিকটে যথেষ্ট পরিচিত—সেই গালভরা অথচ অতি তীব্র হাসি হাসিয়া উঠিল। দেবেন্দ্রবিজয় কহিলেন, “কই জুমেলা, বিষে কোন বিশেষ কাজ হ’ল কই?”

জু। হবে।

দেবে। কখন?

জু। পাঁচ মিনিটের মধ্যে।

দে। পাঁচ মিনিট?

জু। হাঁ। দেবেন, তোমার মত লোকের হাতে মরা জুমেলিয়ার পক্ষে বড়ই কলঙ্কের কথা—সে কলঙ্ক দুরপনেয়। জুমেলিয়া অপরকে মারিতে জানে—নিজেও মরিতে জানে; এর প্রমাণ অন্য দিন পেয়েছ, আজ আবার অন্য প্রমাণ দেখ।

দে। মৃত্যুর পূর্ব্বে তোমার কিছু বলবার আছে?

জু। আছে, আমি ফুলসাহেবের বিবাহিতা পত্নী। ফুলসাহেব যবন, সুতরাং আমিও যবনী; আমাকে যেন কবর দেওয়া হয়; তা’ হলে তুমি শত্রু হ’য়ে একটা পরম মিত্রের কাজ করবে।

দে। তাহাই হইবে। জুমেলিয়া, তোমার জন্মস্থান কোথায়?

জু। কামরূপ। কামরূপের উত্তরপূর্ব্বদিকে যে কাচিমরাজ্য আছে, সেই কাচিমরাজ্যে আমার জন্ম; আমরা জাতিতে মিমী। মিমী জাতির রমণীর ন্যায় সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী আর জগতে কোথায়ও নাই।

দে। হাঁ, জানি, শুনেছি বটে। জুমেলিয়া, তোমার বয়স কত?

জু। তোমার যত।

দে। আমার বয়স ছত্রিশ বৎসর।

জু। আমারও ঠিক তাই।

দে। ছত্রিশ! বল কি?

জু। কেন! আশ্চৰ্য্য হ’লে যে?

দে। এ কথা বিশ্বাস হয় না; তোমাকে দেখে ত তোমার বয়স বেশিমাত্রায় অনুমান করিতে হইলেও ঝুড়ি বৎসরের অধিক নয়ই। তুমি ত এখনও পূর্ণযৌবনা।

জু। দেবেন্, তোমাদের এ দেশের মেয়েদের মত আমাদের দেশের মেয়েরা কুড়িতে বুড়ি হয় না; তারা জানে, কেমন ক’রে যৌবনকে বেঁধে রাখতে হয়; যৌবনকে কিরূপ তোয়াজ করলে সে চিরবশ্যতাপন্ন থাকে। তোমার ওস্তাদ—যার কাছে তুমি গোয়েন্দাগিরি শিক্ষা কর—সেই অরিন্দম যখন ফুলসাহেবের অনুসন্ধানে নিযুক্ত হয়, সে আজ সাত বৎসরের কথা, তখন সে আমাকে যেমন দেখেছিল, আবার আজ এসে যদি আমাকে দেখে, ঠিক তেমনটিই দেখিবে। এই দীর্ঘ সাত- সাতটা বৎসর আমার অঙ্গের দিকে নজর না ক’রে, কেমন কত ভালমানুষটির মত চ’লে গেছে বুঝতে পারবে। আজ তুমি আমাকে দেখছ, আবার যদি দশ বৎসর পরে আমার দিকে চেয়ে দেখ, ঠিক এমনই দেখবে; কিছুমাত্র পার্থক্য দেখতে পাবে না; এইরূপ কচি তালসাঁসের মত কাঁচা মুখখানি—এইরূপ নয়নের সচঞ্চল বক্রদৃষ্টি—এইরূপ অতি মিষ্টমধুর কণ্ঠস্বর—এইরূপ রাঙা টুকটুকে ঠোঁট দু’খানিতে মিষ্ট অথচ অনিষ্টময় হাসি—(হাস্য) এই শরীরের এইরূপ তপ্তকাঞ্চনবর্ণ—সব ঠিক থাকবে।

দে। তুমি এ সকল নানাপ্রকার ঔষধ কোথা হতে সংগ্রহ করেছ?

জু। কিছু জানতেম আমি; তারপর ফুলসাহেবের কাছে অনেক দ্রব্যগুণ জেনে নিই।

দে। তুমি স্বদেশ ছেড়ে এখানে এসেছ কেন?

জু। কেন? সাধে কি এসেছি—একান্তই প্রেমে মুগ্ধ হ’য়ে। যখন আমি ষোড়শী যুবতী, তখন ফুলসাহেব আমাদের দেশে যায়—কেবল ঔষধ-সংগ্রহের চেষ্টায় তার যাওয়া। আরবদেশে অনেক সংগ্রহ করেছিল, তারপর আমাদের দেশে গিয়ে আবশ্যকমত অনেক মন্ত্র ও দ্রব্যগুণ শিক্ষা করে। আগে ফুলসাহেব, ডাক্তার ফুলসাহেব ছিল না—ফকীর ফুলসাহেব। ফকীরের বেশেই আমাদের দেশে যায়; তারপর এখানে এসে ডাক্তার হয়। সকল ডাক্তারের চেয়ে সহজেই ফুলসাহেবের বেশি পশার হ’য়ে উঠে; যে সকল রোগ অন্য ডাক্তার ছয় মাস সময় নিয়ে-এমন কি একেবারে ‘আরোগ্য হবে না’ ব’লে জবাব দিয়ে বসে, ফুলসাহেব তাহা তিনদিনেই ভাল ক’রে দিত। ফুলসাহেব যখন আমাদের দেশে যায়, তখন আমি পূর্ণযুবতী—সে কথা আমি তোমাকে আগেই বলেছি। তখন যদি একবার তোমার দৃষ্টি, দেবেন, আমার দিকে পড়ত—তা’ হ’লে আমি স্পষ্ট ক’রে বলতে পারি, তোমার মত লোকের চক্ষু নিশ্চয়ই ঝলসিয়া যাইত। তা’ হ’লে তুমি কখনও আমার প্রতি শত্রুতাচরণ করতে পারতে না; নিশ্চয়ই তখন তোমাকে আমার দুটি পায়ে ধরে সবিনয়ে বলতে হ’ত—

(সুর করিয়া) “স্মরগরলখণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনং
দেহি পদপল্লবমুদারম্।”

ফুলসাহেব তখন আমার নজরে পড়ে—শুধু নজরে পড়ে না, নজরে ধরে। ফুলসাহেবেরও যে আমাকে নজরে ধরবে, তার আর ভুল কি আছে? অন্য পুরুষ হলে তাকে ভেঁড়া ক’রে খাটিয়ার পায়ায় বেঁধে রাখতেম; কিন্তু ফুলসাহেব বাহাদুর পুরুষ! তাকে কায়দা করা দূরে থাক—সে আমাকেই কায়দা করে নিয়ে নিজের দেশে চ’লে এল। এ বাহাদুরী বড় সহজ নয়, দেবেন্। আমাদের হাতে প’ড়ে আবার ফিরে আসা বড় সহজ নয়-সে কথা হয় ত তুমি লোকের মুখে কিছু কিছু শুনে থাকবে। আমার আগে নাম ছিল, ‘পানমতিয়া’; ফুলসাহেবের সঙ্গে বিবাহ হ’য়ে গেলে ফুলসাহেব কখন কখন আদর ক’রে ‘ফুলবিবি’ কখন—বেশিরভাগ ‘জুমেলিয়া’ বলেই ডাকত।

দে। ফুলসাহেবের মৃত্যুর পর তুমি আর বিবাহ করেছ?

জু। না, আর বিবাহ করি নাই; তবে আমার কৃপা তারপর অনেক লোক পেয়েছে—আবার অনেক লোক সেজন্য চিরলালায়িত রয়েছে—একবিন্দুও পায় নাই; অনেকে এই রূপাগ্নিতে পতঙ্গের মত পুড়ে মরেছে; কয়েকটাকে তুমি জান—সেই গোবিন্দপ্রসাদ—তুলসীদাস—নবীন ডাক্তার—মনে আছে? আরও অনেক মরেছে—অনেকে মুমূর্ষু আছে।

এই বলিয়া জুমেলিয়া নীরবে রহিল।

দে। মৃত্যুর পূর্ব্বে আর কিছু তোমার বলবার আছে, জুমেলা?

জু। না, আমার আর কিছুই বলবার নাই।

দে। আর কিছুই না?

জু’। হাঁ, আছে—অনেক কথা আছে।

দে। কি, বল।

জু। আমি ত এখনই মরিব।

দে। হাঁ, এ কথা ত তোমার মুখে অনেকক্ষণ শুনেছি।

জু। জীবিত অবস্থায় তোমাকে আমি—শুধু তোমাকে না— তোমাদের সকলকেই আন্তরিক ঘৃণা ক’রে আসছি।

দে। তার আর সন্দেহ কি আছে?

জু। ম’রে কি করব জান? তোমার পিছু লইব।

দে। সত্য না কি?

জু। সত্য।

দে। জুমেলা, ভূত-প্রেতের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বিশ্বাস করতে আমি তোমাকে শিখিয়েছি।

জু। তুমি! সে কি রকম?

দে। আমি নবীন ডাক্তারের প্রেতাত্মা।

জু। তুমি?

দে। আমি।

জু। দেবেন্, একি সত্য?

দে। হাঁ, সত্য।

জু। তবে আমি যা’ দেখেছি, তা নবীনের প্রেতাত্মা নয়?

দে। না, তুমি আমাকে নবীনের প্রেতাত্মার বেশে দেখেছ।

জু। কি ক’রে তা’ হবে, তবে আমার পিস্তলের গুলি বারংবার ব্যর্থ হয়েছিল কেন?

দেবেন্দ্রবিজয় তখন সে সকল বৃত্তান্ত জুমেলিয়ার নিকটে প্রকাশ করিলেন। শুনিয়া জুমেলিয়া বলিল, “তুমি আমার প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ করিলে।”

দে। কি প্রকারে?

জু। আমি মনে ভেবেছিলাম, সত্যই বুঝি নবীনের প্রেতাত্মা।

দে। তুমি প্রবঞ্চিত হয়েছিলে।

জু। আমি হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি হবে না, আমি ম’রেও নিশ্চয় তোমার সঙ্গ গ্রহণ করব।

দে। পার যদি করো।

জু। পারব, নিশ্চয় আমি তোমার সঙ্গ গ্রহণ করব।

দে। চেষ্টা রেখ।

জু। শোন, আর একটা কথা।

দে। বল, শুনছি।

জু। বাঁচলে আমি তোমাকে চিতার বুকে তুলে দিতে পারতেম।

দে। বেশ—স্বীকার করলেম, পারতে তুমি; কি হয়েছে তা’?

জু। আমার পত্রে যে সব কথা লেখা ছিল, এক-এক ক’রে সকলগুলিই সমাধা করে ফেলতে পারতেম ত?

দে। হয় ত পারতে।

জু। ম’রেও আমি আমার সেই শেষ পত্রের সকল প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করব—আমার নাম জুমেলিয়া।*

দে। বেশ পূর্ণ করতে পার—ভাল।

জু। পারব আমি—নিশ্চয় আমি আমার প্রত্যেক প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করব—জুমেলিয়ার প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন হয় না!

দে। বেশ—আমিও তোমার প্রেতাত্মার সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সর্ব্বদা প্রস্তুত থাকব।

জু। তুমি শীঘ্রই আমার প্রেতাত্মা দেখতে পাবে।

দে। কই, জুমেলা, (ঘড়ি দেখিয়া) প্রায় চারি মিনিট কেটে গেল, আমি তোমার অলৌকিক মৃত্যু দেখবার জন্য অপেক্ষায় আছি।

জু। আর এক মিনিট—এক মিনিট পরেই মরিব। তোমাকে যে কথাগুলি বললেম, স্মরণ রেখ।

দে। স্মরণ থাকবে।

দেখিতে দেখিতে জুমেলিয়ার মুখ একবার ক্ষণেকের জন্য গাঢ় রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল; পরক্ষণেই পাণ্ডুর হইয়া পড়িল, বৃহল্লোচনদ্বয় নিমিলিত হইল; কিয়ৎপরে জুমেলিয়া সেই নিমীলিত নয়নদ্বয় উন্মীলন করিয়া, ম্লানদৃষ্টিতে দেবেন্দ্রবিজয়ের মুখপানে চাহিয়া উচ্চশব্দে একবার হাসিয়া উঠিল। হাসিতে হাসিতে টলিতে টলিতে ভূতলে পড়িয়া গেল।

জুমেলিয়ার সর্ব্বশরীর তখনই নিস্পন্দ ও প্রস্তরবৎ কঠিন—বরফের ন্যায় শীতল হইল। নাসিকায় শ্বাস-প্রশ্বাস নাই। নয়নযুগল ঈষদুন্মীলিত আছে বটে; কিন্তু তাহাতে তখন দৃষ্টিশক্তি কোথায়?

ফুলসাহেব সংক্রান্ত ঘটনা দেবেন্দ্রবিজয় ভুলেন নাই; সুতরাং জুমেলিয়ার এরূপ অলৌকিক মৃত্যু তিনি বিশ্বাস করিতে পারিলেন না।

তাহার পর যাবৎ না জুমেলিয়ার দেহ কবরস্থ করিয়া মৃত্তিকা দ্বারা কবর পূর্ণ করা হইল, তাবৎ দেবেন্দ্রবিজয় জুমেলিয়ার দেহের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখিয়াছিলেন।

জুমেলিয়ার দেহ প্রোথিত হইয়া গেলে তিনি নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন।

“১৭–ক” চিহ্নিত পুলিন্দায় মনোরমার স্থাবরাস্থাবর বিষয়-সম্বন্ধে অনেক প্রমাণ পাওয়া গেল। তাহাতে পারিবারিক গুপ্ত ঘটনাদির সম্যক্ বিবরণাদিও লিপিবদ্ধ ছিল।

কুমুদিনী প্রথমে মনোরমার বিপক্ষে ষড়যন্ত্র করে; তাহার পর দৈবাৎ জুমেলিয়ার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। উভয়ে একজুটি হইয়া এক ষড়যন্ত্রে হস্তক্ষেপ করে। কুমুদিনী অপেক্ষা জুমেলিয়া বুদ্ধিমতী ও চতুরা। সে প্রথমে নিজের অভীষ্ট-সিদ্ধার্থ কুমুদিনীর মৃত্যু ঘটিয়াছে বলিয়া, মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে। পরে সুবিধামত তাহাকে হত্যা করে। প্রিয় পাঠক পাঠিকাগণ, সে সকল বিষয় অবগত আছেন; পুনরুল্লেখ বাহুল্য।

.

দেবেন্দ্রবিজয় মনোরমার বিষয়-সম্পত্তি এবং সেই দৈব অঙ্গুরীয় পুনরুদ্ধার করিয়া তাহার অধিকারে দিলেন।

মনোরমা প্রথম সুযোগেই আনন্দ-কুটীর বিক্রয় করিয়া ফেলিল। আনন্দ-কুটীরের নাম শুনিলে শঙ্কায় তাহার সর্ব্বাঙ্গ শিহরিত ও কম্পিত হইত।

.

সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাগণ, আপাতত বিদায়।

সমাপ্ত।

[* জুমেলিয়ার অলৌকিক পুনর্জীবনলাভ এবং তদ্ধেতু দেবেন্দ্রবিজয়কে সপরিবারে আরও কতবার জুমেলিয়ার ষড়যন্ত্রে সঙ্কটমুখে পড়িতে হইয়াছিল, তদ্বৃত্তান্ত “মায়াবিনী” নামক পুস্তকে লিখিত হইল। –গ্রন্থকার।]

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *