মদনগোপালের বিরহ – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

মদনগোপালের বিরহ

সৌভাগ্য দেখা দিল ব্যঙ্গের আকারে। একেই বলে—কপাল।

এতদিন অত চেষ্টা করিয়াও চাকরির দেখাসাক্ষাৎ নেই, যেই এদিকে শ্বশুরের সঙ্গে কাকার মন কষাকষিটা মিটিল, দিব্যি ডাগোর-ডোগোরটি হইয়া রাজু ঘরে আসিয়া উঠিল, ওদিক হইতে দাদার চিঠি আসিল—“বাবুকে বলে-কয়ে মদনার একটা কাজের জোগাড় করেচি, শিগগির তাকে পাঠিয়ে দেবে।”

তিনটি দিনও হয়নি রাজুর আসার। কাকা রাম পণ্ডিতের নিকট গিয়াছিল, কালই যাওয়ার স্থির হইয়াছে। মদনের মনটা বড় খারাপ হইয়া আছে সমস্ত দিন। সন্ধ্যার সময় হালের বলদ জোড়া কোনোরকমে ঠেলিয়া ঠুলিয়া আনিয়া গোয়ালে তুলিল। এর পরে অন্যদিন একটু বেশ করিয়া তামাক খাইয়া ধামি করিয়া মুড়ি, চিঁড়া যা হয় একটা কিছু লইয়া বসে; ডবকা ছেলে, খাওয়ার দিকে একটু ঝোঁক বেশি। আজ কিন্তু সে সব কিছু করিল না; ভাজের সন্ধানে ঘরগুলোতে একবার করিয়া উঁকি মারিল, দেখিতে না পাইয়া দোলনায় কোলের ভাইপোটিকে ঘাঁটিয়া ঘুঁটিয়া কাঁদাইয়া দিল, এবং তাহাতেও ভাজ উপস্থিত না হওয়ায় খিড়কির আমবাগান দিয়া পুকুরের দিকে অগ্রসর হইল।

বেশি দূর যাইতে হইল না। দুই জায়ে পুকুরে গা ধুইয়া খোকার গলার আওয়াজে একটু ত্রস্ত পদেই চলিয়া আসিতেছিল। মাঝপথে দেখা হইল। মদন একটু গরম হইয়া প্রশ্ন করিল, “কোথায় থাকো, বড়বৌ? সেই থেকে তোমায় খুঁজে খুঁজে নাজেহাল হচ্ছি!…’

দুই দিককার আগাছার মধ্যে, একজনের যোগ্য এক ফালি রাস্তা; দুইজনেই দাঁড়াইয়া পড়িল। দুইজনেরই ভিজা কাপড়, বড়বৌয়ের কাঁকালে একটা পিতলের ঘড়া। বড়বৌয়ের আড়ালে থাকিলেও রাজু স্বামীকে দেখিয়া পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইয়া মাথায় ভিজা কাপড়ের ঘোমটা তুলিয়া দিল।

বড়বৌ হাসিয়া বলিল, “নাজেহাল হচ্ছ! বলি আমায় খুঁজে খুঁজে, না আর একজনাকে গো কত্তা? “ পিছনের মূর্তিটি একটু দুলিয়া আরো ঝুঁকিয়া পড়িল। মদন গভীর হইয়া বলিল, “তামাশা রাখো, সবসময় তামাশা ভালো লাগে না। তোমাদের ফূর্তি, এদিকে আমার যে সমস্ত দিন কেমনভাবে কাটছে…”

ভাজ মুখটা দুলাইয়া ভ্রূ দুইটা উঁচু করিয়া বলিল, “ওমা, তাই নাকি! তা দুটি বোনে একত্তর হয়েচি, হবেনি একটু ফূর্তি গা?…নাও, এখন পথ ছাড় দিকিন মদনমোহন ঠাকুর, রাই বেচারি যে…

মদন সেইরূপ স্বরেই বলিল, “ও যাক না, ওকে কে আটকাচ্চে? তোমার সঙ্গে দরকার, আর এই জায়গাই ভালো, একটা শলা পরামর্শের কথা আছে।…নাও, ওকে যেতে বলো”—বলিয়া বন ঘেঁষিয়া একটু সরিয়া দাঁড়াইল

রাজু কিন্তু নড়িল না। আরো একটু ঝুঁকিয়া পড়িয়া গুটি গুটি সরিয়া সেইখানেই স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া রহিল। বড়বৌ একবার ঘাড় বাঁকাইয়া তাহার অবস্থাটা দেখিয়া লইল, তাহার পর আবার দেবরের পানে চাহিয়া বলিল, “তাই কি পারে গা—বরের ঘাড়ের ওপর দিয়ে একা চলে যেতে?…কি শলা পরামর্শ? বাড়ি গিয়ে হয় না?”

“বলছিলাম—কলকাতায় আমি যেতে লারব।”

ভাজ বিস্মিতভাবে ক্ষণমাত্র মুখের দিকে একবার চাহিল, তাহার পর খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল; পিছনের মানুষটির অবস্থা বর্ণনাতীত।

মদন একটু অপ্রতিভ হইয়া পড়িল, তাহার পর রাগিয়া উঠিয়া বলিল, “হাসি! জানো না তো কলকাতা কেমনধারা জায়গা—লোকের স্বভাব-চরিত্তির ঠিক রাখা কত শক্ত!”

বড়বৌ চিবুকের একপাশে তর্জনী স্পর্শ করিয়া চক্ষু পাকাইয়া চিন্তিতভাবে বলিল, “ওমা, সত্যিই তো! এতগুলিন লোক বাড়িতে, এ কথা কি কেউ ভেবে দেখেছে একবারটি? ভাগ্যিস ঠাকুরপো কইলে! আর দাদারই বা কি আক্কেল—নিজে গেছেন গোল্লার দোরে, এখন ছোট ভাইটিকে দ―লে…”

আর গাম্ভীর্য রক্ষা করা অসম্ভব হইয়া পড়িল, কথাটা সম্পূর্ণ করাও। বড়বৌ উচ্চহাস্যে যেন ভাঙিয়া পড়িল, একেবারে; রাজুও আরো কুঁকড়াইয়া গেল, কিন্তু তাহারই মধ্যে চাপা হাসিতে ব্ৰীড়ানত শরীরটাকে যেন ঠেলিয়া তুলিতে লাগিল।

তবুও মেয়েছেলের মন তো? তায় সম্বন্ধে ভাজ, তার উপর রাজু কিন্তু না বলিলেও, তাহার মুখের দিকেও চাহিতে হয় একটু; বড়বৌ কথাটা পাড়িল খুড়শাশুড়ির কাছে। অবশ্য কলিকাতার বদনাম দিয়া নয়, অন্যভাবে।

খুড়শাশুড়ির মনটাও খুঁতখুঁত করিতেছিল,—তবে নাকি নেহাত রোজগারের কথা—এত দিনে ঠাকুর-দেবতার ধর্না দিয়া জুটিয়াছে একটা কাজ, তাই দোমনা হইয়াছিল। মানুষটি এ সব বিষয়ে একটু কড়াও, কিন্তু তবুও মেয়েছেলেই তো? বড়বৌ কথাটা অন্যভাবে পাড়িলেও তাহার আড়ালে ছেলের মনের সন্ধান পাইতে তাহার দেরি হইল না, এদিকে তাহাদের কথাবার্তার সময় বারান্দায়, দুয়ারের আড়ালেও যে একটি মানুষ উৎকর্ণ হইয়া আছে সে আভাসও পাওয়া গেল। বুড়ি কথাটা পাড়িল কর্তার কাছে। অবশ্য বড়বৌয়ের যুক্তি অবলম্বন করিয়া নয়। বলিল, “কুটুমের সাথে বিবাদটা মিটল, এতদিনে বউ পাঠালে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকে সরিয়ে দিলে কিন্তু কথাটা অন্যভাবে দাঁড়াবেনি?—একে তো ওই মানুষ সব—ছল ধরবার জন্যে ওত পেতেই রয়েচে অষ্টপহর।”…বুড়া ঝানু, এই সব মেয়েছেলে লইয়াই তো তাহাকে ঘর করিতে হইয়াছে? হুঁকার টানের সঙ্গে সঙ্গে চোখ পিট পিট করিয়া প্রশ্ন করিল, “কুটুমের ভাবনা,—না?…হুঁ…বলি মদনা বেঁকে বসেছে কি না বলো দিকিন? আর তো নড়তে চাইবেনি সে। আর অ্যাদ্দিন যে তার টিকি দেখা যেত না বাড়িতে, তার কি? তাকে বলে দিয়ো কিন্তু আর আবদার চলবেনি। বড় রস হয়েছে, না?…কোথায় গেল সে ছোঁড়া?”

মদনা ঢেঁকশালের অন্ধকারে হুঁকা হাতে, তামাক টানা বন্ধ করিয়া কথাগুলা শুনিতেছিল; “বেয়াক্কেলে বুড়ো—বাহাত্তরে…” বলিতে বলিতে পা টিপিয়া বাহিরে চলিয়া গেল।

.

সব কটাই সমান। বড়বৌয়ের সব কথায় ঠাট্টা, সময় নাই অসময় নাই ঠাট্টা করিয়া বসিলেই হইল। কলিকাতা যে বদ জায়গা—এ কি নূতন কথা? গোড়ায় গোড়ায় দাদার কথা মনে নাই? আজ না হয় দাদা সাধু হইয়াছে—মাসে মাসে টাকা পাঠাইতেছে, কিন্তু আগেকার সে সব দিনের কথা কি ভুলিয়া গিয়াছে?…করুক ঠাট্টা—একবার গা-জুরি করিয়া পাঠাক সবাই মদনকে কলিকাতায়–ভালো করিয়া সবাইকে বুঝাইয়া দিবে কলিকাতায় স্বভাবচরিত্র বজায় রাখা দুষ্কর কিনা,—সে-ও দাদার ভাই!

আর তুই বুড়ি—জানিস বুড়োর মেজাজ, শ্বশুরবাড়ির কথা তুলিয়া ওর চোখে ধুলো দিতে চাস? তার মানে আর কিছু নয়—এদিকে লোক-দেখানি বলাকে বলাই হইল, অথচ দিব্যি যাতায়াত বন্ধ হইল। উপরে উপরেই মায়া, পেটের মধ্যে জিলিপির প্যাঁচ।

সবচেয়ে রাগ হইল খুড়োর উপর—মদনা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিল– পাঠাক কলিকাতায় তাহাকে, ইহার পর একবারটি মাত্র সে বাড়ি আসিবে,—সুদ্ধ একবারটি,—বুড়ার শ্রাদ্ধের সময়। আর কলিকাতায় গিয়া কালীঘাটে শুধু এই মানতই করিবে—যেন সে দিনটা শীঘ্র শীঘ্র আসে। এইসব ছ্যাবলা ষড়যন্ত্রী আর একগুঁয়েদের মধ্যে শুধু একটি মানুষের মতো মানুষ পাওয়া গেল।—ছোট বৌ রাজু। কী বুদ্ধি! কথার কী বাঁধুনি! শলা পরামর্শ করিতে হয় তো ওইরকম মানুষের সঙ্গে, একটা যে কথা বলিবে তা বেশ ওজন করিয়া—লাখ টাকা দাম সে কথার। একবারও কি মনে হয় যে একটা চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছোট মেয়ের মুখের কথা?

রাত্রে রাজু বলিল, “বাপের রাগ করবার কথা যে বললেন খুড়িমা, এতে তানাদের রাগ করবার কি আছে? নিজেদের বৌ নিয়ে এসেছেন, তাকে ভালো রাখুন মন্দ রাখুন, আর বাপ মায়ের কি? তারা তো এনাদের হাতে সঁপে দিয়ে খালাস-এখন এনারা রাজরানী সোয়ামী-সোহাগী করে রাখুন ভালো, বনবাসে দিন, সেও ভালো।…বনবাস বইকি—তুমিই যদি বাইরে রইলে তো বাড়ি কি আমার বনবাস হলনি? আমিই না হয় চাষাভুষোর মেয়ে, কিন্তু মা জানকী কেন রাজপাট ছেড়ে রামচন্দ্রের সঙ্গে বনে গেছলেন? সোয়ামী বিহনে অযোধ্যাই তাঁর বনবাস হবে বলে তো? তুমিই যদি কলকাতার রইলে তো সোনার-গাঁ কি আমার বনবাস হলনি! কও কি না?”

বৌয়ের বুদ্ধির দৌড় দেখিয়া মদনের তাক লাগিয়া গেল। ওইটুকু মেয়ে তাহার বিবেচনা দেখো, শাস্ত্রের জ্ঞান দেখো। যা বলিল তাহার এক বর্ণও কাটুক দেখি কেহ। মদনের মুখে কথা সরিতেছিল না, তবুও সাধ্যমতো বুঝাইল; বলিল, “কি করবে বলো রাজু, সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। কিছুদিন বুক বেঁধে থাকো তুমি। আমি এমন মতলব ঠাউরেছি যে চৌদ্দ বছর দূরে থাক, চৌদ্দ দিনও যাবে না, —ফিরে আসব।”

রাজু সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাহিতে বলিল, “সে এখন বলব না, দেখতেই পাবে; এইরকম করে তোমার কাছাছাড়া করা বেরিয়ে যাবে বুড়োর।

রাজু অভিমানভরে বলিল, “চৌদ্দ দিন! আমি ততদিন বেঁচে থাকব কিনা…ওনাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।”

মদন বেচারি ভয় পাইল, এবং মনের কথাটা গোপন করিতে না পারিয়া প্রশ্ন করিয়া ফেলিল, “বিষ খাবে নাকি!”

রাজু বলিল, “বিষ খেতে হবে কেন? আর পাবই বা কোথায়! কে আমার এমন বন্ধু আছে যে দয়া করে এনে দেবে! আমি বলছিনু—যে যাকে ভালোবাসে তাকে না দেখতে পেলে একদিনও বাঁচতে পারে কখনো? তুমি বাস না আমায় ভালো, তাই চোদ্দ দিন কেন গোটা চোদ্দ বছরও দিব্যি হেসেখেলে বেঁচে থাকতে পারো, তার ওপর কলকাতায় আবার কত মনের মানুষ পাবে’খন…তবুও শ্বশুরঠাকুর বলবেন…”

হঠাৎ একটু চুপ করিয়া গেল, একটু ভাবিল, তাহার পর কতকটা আক্রোশের স্বরে বলিল, “আচ্ছা, শ্বশুর ঠাকুরের কি ও-কথাটা বলা ঠিক হল?”

মদন প্রশ্ন করিল, “কোন্ কথা?”

রাজু মদনের মুখ থেকে দৃষ্টিটা সরাইয়া লইল, বলিল, “এই শুনি এত গণ্যি-মান্যি লোক,—গাঁয়ের মোড়ল, ভাইপোকে কি বলা ঠিক হল যে রস হয়েছে?”

মদন অভিমত দিল, “ভীমরতি হয়েছে, আর বেশিদিন নয়।”

রাজু নিশ্চয় উৎসাহ পাইল। চকিতে একবার স্বামীর মুখের পানে চাহিয়া আবার দৃষ্টি ফিরাইয়া নিন্দে বলিল, “কে জানে বাপু, আমাদের বাপ-খুড়োর মুখে সাজম্মে ওরকম কথা বেরুতনি। গুরুজন, করতে পারি না, কিন্তু কথাটা ইতরের মতো হয়েছে—হেলো চাষির মুখেই মানায়। কথাটা খাঁটি বলছি, অবশ্য গুরুজন বলেই কোনো অসম্মানের কথা মুখে আনতে পারি না—মাথায় থাকুন তিনি…”—বলিয়া গুরুভক্তিতে মাথায় যুক্তকর ঠেকাইল।

মদনও অনুরূপ ভক্তির সহিত কাকার আদ্যশ্রাদ্ধ করিয়া মনটা হালকা করিল, তাহার পর সমস্ত রাত জাগিয়া দুইজনের পরামর্শ হইল–আপাতত যাওয়াটা স্থগিত করা যায় কি করিয়া। কালকের ফাঁড়াটা তো কাটানো যাক, তাহার পর আবার দিন দেখা, আবার তোড়জোড় করা। রাজু বলিল, “ত্যাতদিন চাকরির ফাঁড়াটাও কেটে যেতে পারে। চাকরি, না আমার পাপ সতীন জুটেছে।….দুটো পেট তো? চলে যাবে একরকম করে!”

রাজুই শলা দিল, “অসুখের ভান করে পড়ে থেকো। অন্য অসুখ নয়—পেটে ফিক ব্যথা। শ্বশুর তো শ্বশুর, বদ্যিরও বাবার সাদ্যি নেই ধরে। দেখেছ মরণ! পোড়া মুখে সোয়ামীর অসুখের নাম করলুম!” বলিয়া ডান হাতে দুইটা আঙুল ঠোটে ঠেকাইয়া তিনবার কপাল স্পর্শ করিল।

“কিন্তু খাওয়া বন্ধ হবে না তাতে?”

সে মুশকিলের আসানও রাজুরই করতলগত; বলিল, “সে ব্যবস্থা আমার হাতে; তোমার খাওয়া না হলে আমিই কি খেতে পারি? বুদ্ধিসুদ্ধি তোমাদের সবারই একটু কম বাপু—দু-একজনেরও যাও বা একটু আছে, শুধু ফিচলেমি।”

এমন লাগসই পরামর্শটাও কিন্তু বুড়ার কাছে টিকিল না। সে বধূবর্ণিত ইতর হেলো চাষি ভাষায় বরং আরো একটু শান চড়াইয়া বলিল, “ফিক ব্যথা না ওর গুষ্টির মাথা, ও যৈবনের রস-ঢের দেখলাম…রোজগার না থাকলে রস কটা দিন টেঁকবে জিগোও দিকিন ওকে। ওকে যেতে হবে, ওসব আবদার খাটবে নাকো।”

যাহোক মেয়েদের কান্নাকাটিতে সে দিনটা স্থগিত হইল যাওয়াটা। ওরা দুজনে ভাবিল শুভ দিনের ফাঁড়াটা কাটিল, একটু নিশ্চিন্তি হইয়া এবার একটা পাকারকম মতলব খাড়া করিবে।

ঘাগি বুড়া কিন্তু কখন রাম পণ্ডিতের নিকট গিয়া পরের দিন রাত তিনটের সময় এক মাহেন্দ্রক্ষণের সন্ধান লইয়া আসিল। রাম পণ্ডিত বলিয়া দিয়াছে, মদনাকে রাত তেপরে উঠাইয়া গোয়ালঘরে যাত্রা করাইয়া রাখিতে হইবে; আর বাড়ি না ঢুকিয়া সেখান হইতেই পরে রওনা হইবে। ভগবতীর ঘর, আর কোনো দোষের ভয় থাকিবে না।

এতর পরেও যদি রসের কিছু অবশিষ্ট থাকা সম্ভব ছিল তো সেটুকু গোয়াল ঘরের মশার পেটে দিয়া মদনা তৃতীয় দিন সকালে আহারাদি করিয়া খুড়ার সঙ্গে কলিকাতা রওনা হইল।

.

কলিকাতায় আসিয়া শুনিল, যে কাজটা পাইবার আশা ছিল তিন-চার দিন দেরি হইয়া যাওয়ায় সেটা বিলি হইয়া গেছে। মদনার দাদা রতন স্ট্র্যান্ড রোডের জেটিতে পিয়নের কাজ করে, গম্ভীরভাবে বলিল, “এ কি তোমার সোনার-গাঁ কাকা? এ কলকাতার জেটি, বিলেতের, অ্যামেরিকার জাহাজ যাতায়াত করছে এখান থেকে, একটা ঘণ্টার এদিক ওদিকে সব ওলট-পালট হয়ে যায়—তোমরা দু-দুটো দিনের বিলম্ব করে দিলে—আর কি কাজ পড়ে থাকে?

কাকা একবার মদনার দিকে চাহিল। প্রাণ খুলিয়া রসাধিক্যের কথাটা একবার সোনার-গাঁর ভাষায় সালঙ্কারে বলিবার জন্য জিভটা সড়-সড় করিতেছিল কিন্তু রতনের ভাষায় কলিকাতার মার্জিত রুচির আঁচ পাইয়া নিরাশ হইয়া থামিয়া গেল।

গোয়ালের যাত্রা যে মাঠে মারা গিয়াছে ইহাতে মদনা মনে মনে খুশি হইল!

বাবু আবার একটা আশা দিয়া রাখিয়াছেন; ঠিক হইল মদনা থাকিয়া যাইবে। বুড়া পরের দিন চলিয়া গেল।

পুল পার হইয়া সালকিয়ার একটি বস্তিতে রতনের বাসা। মাটি দিয়া লেপা ছ্যাঁচাবেড়ার পাশাপাশি দুইটি ছোট কুটুরি; মাথায় টিনের ছাদ। হাত চারেকের একটি উঠান, তার অপরদিকে একটি ছোট রান্না ঘর। উঠানের একদিকে সাহেববাড়ি থেকে চারা আনিয়া রতন একটি সূর্যমুখীর গাছ করিয়াছে, –ছোট মুখে ফাঁদাল নখের মতো তাতে একটা প্রকাণ্ড বেমানান ফুল ফুটিয়া আছে।

সকালবেলাটা একরকম কাটিয়া যায়। দুই ভাইয়ে মিলিয়া বাজার করিয়া আনে, কুটনা কুটিয়া বাটনা বাটিয়া, পাথুরে কয়লার উনান জ্বালিয়া খানিকটা গোছ এবং বেশিরভাগ অগোছের মধ্যে রান্নাটা সারিয়া লয়; কোথা দিয়া যে সময়টা বহিয়া যায় টেরই পাওয়া যায় না; রতন স্নানাহার সারিয়া ঠিক সাড়ে নয়টার সময় উর্দির বোতাম আঁটিতে আঁটিতে বাহির হইয়া যায়।

সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটাতে রাজু আসিয়া উপস্থিত হয়, — মদনার মনের খিড়কি দিয়া।

রাজু অমনি আসে না, সোনার-গাঁ-কে সঙ্গে করিয়া আনে। কি করিয়া যে কি হয়, টিনের খেলনার মতো এই ছোট্ট ছটাকখানেকের বাড়ির মধ্যে আসিয়া জোটে সোনার গাঁয়ের পুরু মাটির দেয়ালের চারখানা ঘর,—রাজুর ঘোমটার মতো নীচু গোল পাতার ছাউনি তাহাতে; গোয়াল, ঢেঁকশাল, আমবাগানের ঘন ছাওয়ার নীচে আগাছার জঙ্গল—তাহার মধ্য দিয়া খিড়কির পুকুরের সরু রাস্তা… বড়বৌ আর রাজু দাঁড়াইয়া আছে—বড়বৌয়ের কাঁখে পিতলের কলস, হাসিমাখা চটুল ঠোঁটের উপর দিয়া নথের সোনার তারটা বাঁকিয়া গিয়াছে, সোনায় আর হাসিতে ঝিকমিক করিতেছে মুখটা, তাহার পিছনে পিছন ফিরিয়া ভিজা খয়ের রঙের ডুরে পরিয়া রাজু। পাশেই ঘোষেদের বাড়ি যাইবে মদন। ঘরের পিছনে, করমচা ঝোপের আড়ালে রাজু আর ঘোষেদের মেয়ে বাতাসী; রাজু পালাইবে, বাতাসী আঁচল চাপিয়া আটকাইয়া ধরিল,—ডাকিল, “মদনদা!”…রাত্রে রাজু অভিমান করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইয়া আছে—কিসের অভিমান এত? মদনা আন্দাজ করিতে করিতে হয়রান হইয়া উঠিতেছে—পায়জোড় চাই? বাপের বাড়ির জন্য মন কেমন করিতেছে? খুড়ি আজ সকালে সেই যে কড়া কথা বলিয়াছিল? মদন তো সেজন্য খুড়ির সঙ্গে বেশ একচোট বচসা করিল সন্ধ্যার সময় মাঠ থেকে আসিয়া; অবশ্য অন্য ছুতা করিয়া করিল বচসাটা, কিন্তু রাজু কি বুঝিতে পারে নাই?…রাজুর চাপা স্বরে হঠাৎ খিল খিল করিয়া হাসি, —অভিমান নয়, দুষ্টামি।…আসিবার দিন কাকাতে মদনাতে বাড়ির হাতা ছাড়াইয়া কই-পুকুরের ধারে আসিয়া পড়িয়াছে—একবার ঘুরিয়া দেখিল খুড়ি আর বড়বৌ তখনো সদরে দাঁড়াইয়া—কেমন করিয়া যেন দৃষ্টিটা ঘরের জানালায় গিয়া পড়িল, রাজু কোমরের উপর থেকে সমস্ত শরীরটা জানলার গরাদে চাপিয়া রহিয়াছে, মুখে আঁচল চাপিয়া কাঁদিতেছে রাজু…সব ব্যাপারটাই হয় এই টিনের বাড়ির সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে—মাঝে মাঝে শুধু সূর্যমুখী ফুলটা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়া ও-গুলা মিটাইয়া দেয়…

একদিন রতন চিঠি ডেলিভারি করিতে বাহির হইয়া গোটা তিনেকের সময় একবার বাড়িতে আসিয়া দেখিল মদনা শানের উপর উবুড় হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়া আছে। রান্নাঘরের দুয়ার খোলা, বেড়ালে ভাত, ডাল, তরকারি, মাছের কাঁটা ঘরময় ছড়াইয়া একশা করিয়া রাখিয়াছে।…মদনার কি কোনো অসুখ-বিসুখ হইল নাকি?…দারুণ উদ্বেগে ছোট ভাইকে তাড়াতাড়ি তুলিতে যাইবে, হঠাৎ চোখে পড়িল মদনার ঠিক বুকের নীচে সাদাপানা কি একটা ঝিকঝিক করিতেছে। আঙুল দিয়া খানিকটা টানিয়াই “শ্রীবিষ্ট!” বলিয়া তাড়াতাড়ি হাতটা সরাইয়া লইয়া উঠিয়া একটু গঙ্গার জল মাথায় ছিটাইল। জিনিসটা ভ্রাতৃবধূর হাতের রূপার চুড়ি।

রতন সমস্ত দিনটা গুম হইয়া রহিল।

পরের দিন রান্না হইয়া গেলে রতন বলিল, “তুইও নেয়ে দুটি খেয়ে নে মদনা, আমার সঙ্গে অফিস চল—কতকটা অন্যমনস্কও থাকবি, কখনো কখনো আমার সঙ্গে গেলি,—জায়গা-টায়গাগুলো দেখাশুনো হয়ে থাকবে…আর এলি এতদিন কলকাতা শহরটাও দেখ একটু, অত মনমনরা হয়ে কদ্দিন কাটাবি? বড়বৌ, খুড়িমা আর সবাই কি চিরদিন তোর কাছে কাছে থাকবে?

কলিকাতা শহরটা নামিয়া অবধিই মদনার পছন্দ হয় নাই। এ যেন ধারণার অতীত এক ব্যাপার, জানা-অজানা কিছুর সঙ্গেই মেলে না—কোনো দিক দিয়াই কূলকিনারা পাওয়া যায় না। এমন কি সমস্ত রাস্তা রাগে অভিমানে যে অত করিয়া সংকল্প করিতে করিতে আসিল যে আর কিছু না পারুক অন্তত স্বভাবচরিত্র হারাইয়াও সবার উপর আক্রোশ মিটাইবে, এ জনারণ্যে তাহারও কোনো সুযোগ দেখিতে পাইতেছে না।

তবুও দাদার কথামতো স্নানাহার সারিয়া বাহির হইল।

কয়টা দিন গেল। মদন দাদার সঙ্গে প্রত্যহই বাহির হয়। দাদা যতক্ষণ ভিতরে কাজ করিতে থাকে, মদন বাহিরে আসিয়া রেলিঙের ধারে সিঁড়ির একপাশটিতে বসিয়া স্ট্র্যান্ডে রোডের উপর দিয়া কলিকাতার যে বিচিত্র ধারাটা বহিতে থাকে তাহার পানে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকে। এ প্রবাহের গায়েও এক-একবার সোনার গাঁ ভাসিয়া ওঠে, রাজুতে রাজুতে ভরা সোনার-গাঁ—চোখে জল ভরিয়া ওঠে; কিন্তু এত চপল স্রোতে টেকে না ছবিটা বেশিক্ষণ।

রতন যখন জরুরি কাজে কিংবা অধিক দূরত্বের জন্য ট্রামে কিংবা বাসে করিয়া বাহির হয়, মদনকে লইয়া যাইতে পারে না, নচেৎ সঙ্গে লয়। ক্রমে ক্রমে পরিচয় হইতে লাগিল কলিকাতার সঙ্গে—রাজুর মতোই কলিকাতা ধীরে ধীরে অবগুণ্ঠন খুলিতেছে—সৌন্দর্যের আবরণ অপসারিত করিতেছে—

—মন্দ নয়…হ্যাঁ—কলিকাতাও যে ভালো এ চিন্তার সঙ্গে একটা কথা মনে পড়িয়া গেল—রাজু বলিয়াছিল—কলিকাতা তাহার ‘সতীন’। …যা অপছন্দ, যার উপর রাগ সে-সবকেই ‘সতীন’ বলিয়া বসা রাজুর একটা রোগ। চাকরি সতীন, কলিকাতা সতীন, মদনের কাছে একটু আদর পায় তাই বলদ জোড়াও সতীন, একদিন কাকার উপর রাগিয়া হঠাৎ বলিয়া বসিল, “বুড়ো যেন আমার সতীন।”

অবশ্য তখনই জিভ কাটিয়া, মাথায় যুক্তকর ঠেকাইয়া গুরুজনকে সম্বন্ধবিরুদ্ধ কথা বলার দোষটা খণ্ডাইয়া লইয়াছিল।

ক্রমে এমন হইতে লাগিল যে রতন কাজে লাগিয়া থাকিলে কিংবা কার্যসম্পর্কে দূরে চলে গেলে মদন একা-একাই বাহির হইয়া পড়িতে লাগিল। অনির্দিষ্টভাবে এ রাস্তা সে রাস্তা, গঙ্গার ধার, ইডেন গার্ডেন, কোন্ দিন বা চৌরঙ্গীর খানিকটা বা এদিকে ডালহৌসি স্কোয়ার বা আরো খানিকটা আগাইয়া যায়। রাজুর সতীনের সঙ্গে পরিচয়টা ঘনিষ্ঠতর হইয়া উঠিতে লাগিল।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সতীনের সঙ্গে সঙ্গে মনটা ক্রমাগত আরো বেশি করিয়াই যেন রাজুর জন্য লালায়িত হইয়া উঠিতে লাগিল। হইতে পারে ট্রাম, বাস, পার্ক ভিড়, চিনাবাদাম, সরবত সব একঘেয়ে হইয়া আসিয়াছে, কিংবা হইতে পারে সময়ের দিক দিয়া ব্যবধানটা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তরে টান পড়িতেছে বেশি,—মোট কথা দিন-দিনই রাজুকে না দেখিতে পাওয়াটা যেন অসহ্য হইয়া উঠিতে লাগিল মদনার কাছে। ভিতর থেকে এমন একটা মুখ, ব্যাকুল ক্ষুধা জাগিয়া উঠিতে লাগিল যাহাকে শুধু কল্পনার প্রবঞ্জনা দিয়া আর ঠেকানো যায় না। এই চক্ষু দিয়া দেখা যায়, এই হাত দিয়া স্পর্শ করা যায় এমন স্পষ্ট, সন্দেহলেশহীন রাজুর জন্য মনটা যেন উদ্‌ভ্রান্ত হইয়া উঠিল।

একবার মনে করিল বাড়ি পলাইবে।

কিন্তু ভাবিয়া দেখিল তাহাতে তিনটি বড় বড় অন্তরায় আছে। প্রথমত পয়সার অভাব। আনা সাতেক পয়সা তাহার কাছে আছে, তাহাতে ফোড়নও হইবে না।

দ্বিতীয়ত পহুঁছিলেও কাকার প্রহারের ভয় আছে। রাজু আসিয়া অবধি কাকা অনেকটা সংযত বটে, তবু অমন রগচটা লোককে একেবারে অতটা চটাইতে সাহস হয় না। তৃতীয় অন্তরায়টা আরো গুরুতর মদনা আসিবার সময় রাজুকে স্তোক দিয়া আসিয়াছে যে প্রথম চাকরি করিয়া সে তাহার জন্য গহনা লইয়া আসিবে। রাজুর কাছ থেকে খিল দেওয়া চারগাছা রূপার চুড়ি আনিয়াছে, দুইটা মাথার কণ্ঠী আনিয়াছে, হালফ্যাশান মতো সব সোনার পাতে মুড়িয়া লইয়া যাইবে। এমন কি, শুধু মদনার ফরমাশে রাত্রে যে কেমিকেল সোনার নখটা পরিত রাজু—ছেলেপিলে হইলে যেটা প্রকাশ্যে পরিবে বলিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়াছে, সেটি পর্যন্ত লইয়া আসিয়াছে,—বামনদের বউ বলিয়াছে কলিকাতায় মোটা করিয়া সোনার জল দেয়, যাইবার সময় মদনা ঠিক করিয়া লইয়া যাইবে। এসব না ব্যবস্থা করিয়া কিভাবে যায় সে?

এই পাঁচরকম চিন্তা-আকাঙ্ক্ষার পাশে পাশে নানারকম প্রতিবন্ধকে মনটা বড় অস্থির হইয়া আছে, কিছু ভালো লাগিতেছে না।

.

সেদিন দাদার সঙ্গে অফিসে গিয়া মদনা খানিকটা উসখুস করিয়া কাটাইল, তাহার পর রতনকে কিছু না বলিয়াই বাহির হইয়া পড়িল। বিশেষ কোনো গন্তব্য স্থির নাই। রাজু আর তাহার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র চলিতেছে, তাহার মধ্যে দাদার খুব বেশিরকম হাত; বাড়ি যাইতে না পারুক, কিন্তু এতে যে দাদাকে বেশ খানিকটা উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িতে হইবে এর মধ্যে প্রতিশোধের খানিকটা আস্বাদ পাইল মদনা। শুধু ওইটুকুই নয়,–এর পর যখন অনুতপ্ত হইয়া দাদা, কাকা বাড়ি যাইবার জন্য জেদাজেদি করিবে, খুড়িমা, বড়বৌ কান্নাকাটি জুড়িয়া দিবে, সে কলিকাতা ছাড়িয়া এক পা-ও নড়িবে না।…ওরা সব মদনাকে ভাবে কি?

কথাগুলা যতই বিনাইয়া বিনাইয়া ভাবিতে লাগিল, মনের কোনো এক জায়গায় রাজুর মুখখানা ততই যেন স্পষ্ট হইয়া উঠিতে লাগিল।

এ-গলি সে-গলি, এ-রাস্তা সে-রাস্তা, এ-পার্ক সে-পার্ক করিয়া সারা দিনমান কোথায় কোথায় সে ঘুরিল শেষ পর্যন্ত কোনো হিসাবই রহিল না। ক্লান্তি অপনোদনের জন্য পানে-সরবতে গোটা নয়েক পয়সা খরচ হইয়া গেল। বিকালের দিকে আসিয়া মদনা গোলদিঘিতে পঁহুছিল।

এখানে আসিয়া মদনার একটা জিনিস চোখে পড়িল যাহাতে কলিকাতার একঘেয়েমিটা অনেকদিন পরে কাটিল খানিকটা–পার্কের লোহার বেড়ার গায়ে গায়ে এক ধার থেকে অন্য ধার পর্যন্ত রাশীকৃত ছবি টাঙানো, বিচিত্র রঙের জলুসে সমস্ত জায়গাটা যেন আলো করিয়া আছে। কিছু ঠাকুরদেবতার ছবি আছে কিন্তু অধিকাংশই নানা বেশে, নানা ভঙ্গিতে নানা রকম মেয়ের ছবি; দু’একটা চেনাও, দাদার সঙ্গে একদিন বায়স্কোপে গিয়া দেখিয়াছিল যেন

ছবিগুলা রাজুর কথা মনে করাইয়া দিতে লাগিল, কি রাজুর কথা ভুলাইয়া দিতেই লাগিল বলিতে পারা যায় না, তবে মদনা চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া খুব গভীর তৃপ্তির সহিত ছবিগুলা দেখিয়া যাইতে লাগিল এবং অবশেষে একটা ছবির সামনে আসিয়া হঠাৎ বিস্মিতভাবে দাঁড়াইয়া পড়িল।

ছবিটা অন্যান্য ছবিগুলার চেয়ে ঢের বড়, শুধু একটি মেয়েই আছে; পুকুর, গাছপালা কি টেবিল-চেয়ারে জায়গা ভরিয়া দেয় নাই। মেয়েটি ভিজা কাপড় পরা কাঁধে একটা গামছা ফেলিয়া ঈষৎ নতমুখে দাঁড়াইয়া আছে। ব্যাপারটা এমন কিছুই মারাত্মক নয়, তবে কথা হইতেছে মুখে, গড়নে মেয়েটার রাজুর সঙ্গে কোথায় যেন একটা মিল আছে। সেদিন খিড়কির পুকুরের রাস্তায় রাজু ফিরিয়া না দাঁড়াইয়া যদি সোজাসুজিই দাঁড়াইত তো কতকটা ঠিক এইরকম দেখিতে হইত নিশ্চয়।..মদনা অতৃপ্ত নয়নে দেখিতে লাগিল। একবার সামনে খানিকটা আগাইয়া গেল, আবার সরিয়া আসিল, দাঁতে বুড়া আঙুলের নখ খুঁটিতে খুঁটিতে একটু পায়চারি করিল, তাহার পর উৎসুক কুণ্ঠার সহিত আসিয়া ছবির বিক্রেতাকে প্রশ্ন করিল, “কততে হবে এটা?”

“ছ’ আনা।”

মদন পকেট দুইটা হাতে উজাড় করিয়া পয়সা আনি যা ছিল সব বাহির করিল, গুনিয়া নিরাশভাবে দোকানীর মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, “তিনটে পয়সা কমচে যে—”

“আচ্ছা, হবে, দে”–বলিয়া দোকানী পয়সাটা লইয়া ছবিটা গুটাইয়া হাতে দিয়া দিল। ক্রেতার বেশভূষার সঙ্গে তাহার শখের অমিলটা লক্ষ করিয়া একবার আড়চোখে চাহিয়াও লইল।

তাহার পরদিন মদনা আর দাদার সঙ্গে আফিসে বাহির হইল না, একটা ছুতা করিয়া বাড়ি থাকিয়া গেল।

কয়েকদিন হইতে ভাইয়ের আচরণ যেন কেমন কেমন বোধ হইতেছে। আজ বাড়ি থাকিয়া যাইবার জন্য ছুতাটাও যে করিল সেটা তেমন সন্তোষজনক নয়। কি মতলব আঁটিতেছে মদনা? পলাইবে না তো? কিংবা অন্য আরো কিছু মতলব নাই তো ভিতরে ভিতরে…আচ্ছা মুশকিল!–সম্বন্ধবিরুদ্ধ হয়, খুলিয়া কিছু বলাও যায় না, কিন্তু বিবাহ কি কেহ করে না, এক মদনাই করিয়াছে?… দারুণ দুশ্চিন্তায় রতনের মনটা অস্থির হইয়া রহিল। কোনোমতেই মনটাকে বাড়ি থেকে সরাইতে পারিতেছে না- এ মানুষের অদৃষ্টে শেষ পর্যন্ত কি লেখা আছে?…যাহার জন্য এত, তাহাকে একদিন উপার্জন করিয়া খাওয়াইতে হইবে তো? অত করিয়া রোজ বুঝাইতেছে; ছোট ভাইকে আর এ সম্বন্ধে কত স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারে লোকে?

প্রায় দুইটার সময় চিঠি বিলি করিতে বাহির হইয়া রতন বাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল। দুয়ারটা খোলাই ছিল, কতকটা ভয়ে, কতকটা কৌতূহলে বাড়িতে প্রবেশ করিল। তাহার পর ব্যাপার দেখিয়া তাহার বুদ্ধিসুদ্ধি যেন লোপ পাইল একেবারে!—উঠানের দিকে পিছন ফিরিয়া কাত হইয়া শুইয়া মদন দেয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে অনিমেষ নয়নে চাহিয়া আছে! রতন দেয়ালের আড়াল হইয়া বিস্মিত কৌতূহলে উঁকি মারিয়া দেখিতে লাগিল।—

ছবিটার কাগজ ফুঁড়িয়া হাতে চারগাছা রূপার চুড়ি পরানো, চুলে দুইটা কাঁটা, গলায় একটি রূপার কণ্ঠী, নাকে একটি প্রকাণ্ড নথ। এদিকে মদনার নিজের বাঁ হাতে সূর্যমুখী ফুলের পাপড়ি দিয়া গাঁথা একছড়া মালা। ছবিটা মন্দ নয়, কিন্তু তিন-চারগুণ বড় ফাঁদের গয়নাতে গয়নাতে যেন বীভৎস হইয়া উঠিয়াছে। কার গয়না এসব? কী-ই বা এত দেখিতেছে মদনা? ছেঁড়ার কি চরিত্র বিগড়াইল দুইদিন কলিকাতায় আসিয়াই, না বৌকে দেখিতে না পাইয়া একেবারে মাথাই বিগড়াইয়া গেল?

রতন তেমনি পা টিপিয়া টিপিয়া ফিরিয়া গেল। তাহার পর রাস্তা হইতে একবার সাড়া দিল, “মদনা আচিস তো ভেতরে?”

সালঙ্কারা চিত্রটিকে সামলাইয়া লইবার মতো একটু সময় দিয়া প্রবেশ করিল, বলিল, “আবার কোণ নিয়ে পড়ে থাকতে লেগেচিস তো? কাকা, বড়বৌ এদের জন্যে যদি মনটা এতই খারাপ হয়ে থাকে তো না হয় ঘুরে আয় বাপু তুই একবার। বড়বৌও লিখেছে, বড্ড করে…যাঃ, চিঠিটা ফেলে এলাম আবার আপিসে ভুলে—তাহলে কালই যাবি?”

মদনা একেবারে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। মনের আবেগটা সাধ্যমতো চাপা দেওয়ার চেষ্টা করিয়া বলিল, “একবার গেলে হত দাদা; মানে, আর কিছু না—কাল রেতে কাকার স্বপ্ন দেখে মনটা এত্তো খারাপ হয়ে আছে যে…চাকরির জোগাড় হলেই কিন্তু তুমি সঙ্গে সঙ্গে খবর দিয়ো…কাকার দিন দেখানোর বাইরে এবারেও না হাতছাড়া হয়ে যায়; চাকরি তো আর গাছে ফলবে না যে…

দাদা একটা শ্লেষ এবং দুঃখের হাসিকে অতি কষ্টে নিরোধ করিল। মনে মনে বলিল, “আর চাকরি, যে চাকরির পাল্লায় এখন…”

সম্বন্ধ-বিরুদ্ধ কথাটা আর শেষ করিল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *