চাড়ু-শিল্প
সাধ
মেয়ে দেখা হইল।
খাসা মেয়ে। বেশ আঁটসাট গড়ন; সমস্ত শরীরটাতে স্বাস্থ্যের শ্রী ফুটিয়া বাহির হইতেছে। মাথায় একটু দীর্ঘ, গায়ে মেদের বাহুল্য নাই তবে হাড়কাঠ সাধারণ মেয়ের চেয়ে মোটা, তাহাতে শরীরটি একটু ভারী দেখায় –’সখী ধর ধর’ গোছের একেবারেই নয়। হ্যাঁ ঠিক, এই ধরনের মেয়ে এখন দরকার বাংলার ঘরে ঘরে।…মাখনাটার…কপাল ভালো।
পাশের ঘরে জলযোগের ব্যবস্থা—
ঠিক জলযোগ বলিলে ভুল হইবে– লুচি, ছোলার দাল, দই-মাছ, মাংসের কোর্মা, চপ; ওদিকে রাবড়ি, মিষ্টান্ন, দই। বলিলাম, “করেচেন কি!—আপনাদের জামাই আবার ভয়ানক মিতাহারী—সব তো পড়েই থাকবে।”
“মিতাহারী”— মাখনার গালাগাল, তবু এ মিথ্যাটুকু বলিলাম মাখনাকে একটা ইঙ্গিত করিবার জন্য। জানি তো বোধ হয় গ্রাহ্য করিবে না; তবু, একেবারে পাতে পিঁপড়া না কাঁদিয়া যায় …অন্তত কোনো জিনিস চাহিয়া না বসে বেহায়ার মতো।
মেয়ের কাকা বলিলেন, “এর মধ্যে রুনুর রান্নার হাতও টের পাবেন। কোর্মা আর মাছটা ওকে দিয়েই রাঁধানো হয়েছে।…আপনি মশাই মোটেই খাচ্ছেন না যে!—ওকি!” আমার অত বেশি ভদ্রতা করা অভ্যাস নয় আর রান্নাও সত্যই চমৎকার হইয়াছে, তবে এক্ষেত্রে মাখনের চোখের সামনেই একটা দৃষ্টান্ত ধরিয়া রাখিবার জন্য আমি সত্যই নিতান্ত খুঁটিয়া খুঁটিয়া আহার করিতেছিলাম। কিন্তু হতভাগাকে শেখানো কি এত সহজ?—আমার দিকে হঠাৎ মুখটা বাড়াইয়া আনিল, এবং আমি কানটা আগাইয়া নিলে নিম্নস্বরে বলিল, “একবার মাংসটা…তুই নিজের জন্যে চা না… তাহলেই…”
মেয়ের মেজভাই, কাকা দুইজনে তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করিল, “কি, কি; কিছু চাই নাকি? বলো, এতে আর লজ্জা কি?
লজ্জায় রাগে আমার কর্ণমূল উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল, কোনোরকমে সামলাইয়া লইয়া হাসিয়া বলিলাম, “আজ্ঞে না চাইবে কি? ও বলচে…থাক সে কথা…না, সত্যিই চমৎকার হাত রান্নায়…”
কাকা, মেজভাইয়ের সঙ্গে আরো দুই-একজন উৎসুক হইয়া উঠিল, “কি, কি বলচেন উনি?”
হাসিরা বাললাম, ‘দুষ্টুমি আর কি, এখন থেকেই। বলচে মাংসটা আলুনি হয়েচে। শোনেন কেন; সম্পূর্ণ মিছে কথা। এমন চমৎকার রান্না, আর বলে কিনা আলুনি!”
“না, না, শিগগির নুন নিয়ে এসো যাও; হতে পারে আলুনি, ছেলেমানুষ তো…”
বলিলাম, “ও একটু খায় নুন বেশি।”
এক ছোকরা নুন লইয়া আসিল। মাখনকে বলিলাম, “নে, মিশিয়ে নে।”
খানিকটা নুন তুলিয়া লইয়া নিরুপায় ভাবে মিলাইতে মিলাইতে আমার পানে আড়চোখে এমন একটা কটাক্ষ হানিল যে যুগের দোষ না থাকিলে তখনই একপিণ্ড অঙ্গারে পরিণত হইয়া যাইতাম।
যাহোক, সে ফাঁড়াটা কিন্তু ওই করিয়া কাটিল। কোনোরকমে মান বাঁচিল।
বাহিরে আসিয়া সকলে বসিলাম। এ-সব ব্যাপারে যেমন হইয়া থাকে—মেয়ের গুণগানই চলিতে লাগিল। পাড়ার বর্ষীয়ান আরো কয়েকজন আসিয়া যোগদান করিলেন।—স্বাস্থ্যে, কর্মিষ্ঠতায় চরিত্রের মাধুর্যে এমন মেয়ে এ তল্লাটে নাই। ওই তো ছেলেমানুষ মেয়ে, গ্রামে কোনো একটা কাজকর্ম যাগযজ্ঞ হইলে সমস্ত হিড়িকটা একলাই সামলাইবার ক্ষমতা রাখে—সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা—যখন শ্বশুরগৃহে যাইবে, গ্রামখানিকে একেবারে অন্ধকার করিয়া যাইবে…।
আমি কিন্তু এদিকে গলদঘর্ম হইতেছিলাম।—মাখন মাঝে মাঝে আমার পাঁজরার নীচে আঙুল দিয়া এক-একবার খোঁচা দিতেছে, এখনই অসামাজিক কিছু একটা করিয়া বসিবে কি বেফাঁস কোনো একটা কথা বলিয়া বাসবে। প্রথমটা অগ্রাহ্য করিলাম, কিন্তু চুপ করিয়া থাকা আর নিরাপদ নয় দেখিয়া অবশেষে তাহার দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিলাম, “কিছু বলবি নাকি?”–এবং যাহা বলিবে তাহা একেবারে প্রকাশ্যে না বলিয়া বসে এইজন্য কানটা বাড়াইয়া দিলাম। মাখন মুখটা আগাইয়া আনিয়া ফিস ফিস করিয়া বলিল, “সেই যে তোকে বলেছিলাম—গান, বোনাটোন….”
হতভাগার উপর বেজায় রাগ হইল। এ মেয়ে কি গান আর উলবোনা লইয়া থাকিবার মেয়ে। এ রত্ন কি ধাতে গড়া বুঝিবার ক্ষমতা নাই, মিছামিছি বুজরুকি করিতে যাইতেছে। চাপা গলায় বলিলাম, “চুপ কর।”
সকলে আগ্রহান্বিত হইয়া উঠিল—বর বলে কি?…”উনি কোনো কথা বলতে চান কি?—তা বলুন, লজ্জা কি?” লজ্জা যে ওর নাই সেটা কি ওরা এখনো টের পাইল না?
আমি তাড়াতাড়ি হাসিয়া বলিলাম—“না, ও উঠতে চাইছে, জিজ্ঞেস করছে— গাড়ির দেরি কত?”
মাখন আর এবারে চক্ষে অগ্নিবর্ষণ করিবার চেষ্টা না করিয়া সোজাসুজিই বলিয়া উঠিল, “না, আমি বলছিলাম…’
“হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো; লজ্জা কি?”
“কোনোরকম শিল্পটিল্প…”
গলার আওয়াজে রাগটা যাহাতে প্রকাশ পাইয়া না পড়ে সেরূপ চেষ্টা করিলাম বটে, কিন্তু বোধ হয় সক্ষম হইলাম না। মুখটা একটু নীচু করিয়া বলিলাম, “ও! ফিস ফিস করে বুঝি তাই বলছিলি? আমি মনে করি…তা অমন হাতের রান্না—ওর চেয়ে বড় শিল্প… ‘
মাখনা বলিল, “না, আমি চাড়ু শিল্পের কথা বলছি।”
গা আমার পুড়িয়া খাক হইয়া যাইতেছিল। চাড়ু শিল্প!—কথাটা জোগাড় করিল কোথা হইতে? ওর মুখে তো এই প্রথম শুনিলাম।
দেখিলাম সকলেই চুপচাপ। শঙ্কিত হইয়া উঠিয়াছে—কুলের কাছে আসিয়া তরী বুঝি ডুবিল। আমিও বিশেষ উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলাম, জানি তো–ও ছোঁড়ার মাথায় একটা খেয়াল বসিয়া গেলে আর সহজে মেটানো যায় না। খানিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া বসিয়া রহিলাম, তাহার পর হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি আসিল। মুখটা তুলিয়া বলিলাম, “ও! আপনারা বুঝি ধরতেই পারেননি কথাটা? তাই চুপ করে রয়েছেন? ও বলছে—এই বোনাটোনা ছবি আঁকা, রুমালে ফুলপাতা তোলা এই সব আর কি। শহরে আজকাল এ খুব চলেছে কিনা। তা এসবে যে মেয়ের হাত কিরকম পাকা সে তো আমি ওর আঙুলের গড়ন দেখেই বুঝেছি…”
মেয়ের দাদার দিকে চাহিয়া বলিলাম, “যান তো নিয়ে আসুন তো নমুনা সব; আর, হ্যাঁ- শুনুন।”
মাখনের কানে কানে বলিলাম, “দাঁড়া, এই সঙ্গে তোর শিল্পের সেরা শিল্পও আনিয়ে দিচ্ছি।”—বলিয়া একটু টিপিয়া দিলাম।
উঠিয়া গিয়া কনের দাদাকে একপ্রান্তে ডাকিয়া বলিলাম, “ও মেয়ের ওসব বাজে কাজের সময় কোথায় মশাই? আমি তো বুঝি। পরে ও হতভাগাও বুঝবে কদর। আপাতত আপনি এক কাজ করুন। —বাড়িতে উলের কাজ, কি রুমালে নাম তোলা—এসব আছে কিছু?”
ছোকরা একটু কুণ্ঠিতভাবে বলিল—“রুনুর নিজের হাতের নেই, শিখতেই চায় না; সেজ কাকির—
আমি তাহার কাঁধে দুইটা লঘু আঘাত করিয়া বলিলাম, “সেজ কাকি, কি বড় জেঠাইমার হাতের যা কিছু পান নিয়ে আসুন।” তাহার পর তাহার কুণ্ঠার কারণটা বুঝিতে পারিয়া তাহার পরিহিত খদ্দরের পানে একবার চাহিয়া লইয়া বলিলাম, “আর দোহাই আপনার—সত্যি কথাটা বলে যেন ভেস্তে দেবেন না। এর পরে খদ্দরের ওপর না হয় একটু গঙ্গাজল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেবেন। হ্যাঁ, আর এক কথা- একটি কাগজে রুনুদেবীর নিজের হাতে লেখা তাঁর নামটি দয়া করে নিয়ে আসবেন, নইলে ভাববে ওকে ঠকাবার উপায় বাতলাতেই আপনাকে ডেকে নিয়ে এসেছি। এনে দিন—বিয়ে পাকা—এ আমি আপনাকে বলে দিচ্চি।”
বছর দেড়েকের পরের কথা বলিতেছি।
.
পরিণাম
আমি মাখনের বিয়ের সময়টায় ছিলাম, তাহার পরই কিন্তু ঘটনাক্রমে আমাদের এই দেড় বছরের ছাড়াছাড়ি। এতদিন পরে আবার হঠাৎ দেখা।
দুপুরবেলা কাঠ-ফাটা রোদ, রাস্তায় এক পা চলে কাহার সাধ্য। জায়গায় জায়গায় পীচ গলিয়া উপরকার স্তর ঠেলিয়া বাহির হইয়া আসিয়াছে। মাঝে মাঝে হাওয়া দিতেছে—যেন আগুনের অদৃশ্য শিখা।
দেখিলাম রাস্তা দিয়া আমাদের মাখনের মতো কে যেন হনহন করিয়া চলিয়া আসিতেছে। আরো কাছে আসিলে বুঝিলাম মাখনই! কিন্তু এত বদলাইয়াছে মাখনা!—ভালো করিয়া যেন চেনা যায় না! রোগা হইয়া গিয়াছে, চুলগুলা উস্কখুস্ক, মুখে কেমন একটা অন্যমনস্ক ভাব। বাঁ কাঁখে প্রকাণ্ড ছবির ফ্রেমের মতো কি একটা কাগজে মোড়া। অবশ্য বেশ সুসংস্কৃত মার্জিত চেহারা মাখনার কখনই ছিল না, কিন্তু অনবদ্য স্বাস্থ্য আর নিশ্চিন্ত সন্তোষের একটা দীপ্তি ওর চেহারায় চিরকালই দেখিয়া আসিয়াছি। এই কি সে মাখন!
ও জানিত না যে আমি আসিয়াছি, তাই হন হন করিয়া চলিয়া যাইতেছিল। আমি ডাক দিতেই থমকিয়া দাঁড়াইয়া ফ্যাল ফ্যাল করিয়া একটু চাহিয়া রহিল, তাহার পর ধীরে ধীরে বলিল, “শৈলেন যে! কবে এলি?”
বলিলাম, “আজই। আয় বোস।—তারপর? এই রোদে, ঠিক দুপুরে চলেছিস কোথায়? আর শরীর তোর এমন কেন? কিছু অসুখ-বিসুখ—”
“নাঃ” বলিয়া মাখন কথাটাকে যেন একেবারেই উড়াইয়া দিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু তাহার চেহারা যে ইহাতে সায় দিতেছে না সেটা ভালোভাবেই জানে বলিয়া, অস্বীকার করার পর যেন আরো নিষ্প্রভ হইয়া গেল। কোথাও কিছু একটা গলদ আছে বুঝিতে পারিয়া আমি আর ও প্রসঙ্গটা চালাইলাম না; জিজ্ঞাসা করিলাম, “তোর হাতে ওটা কি মাখন?”
মাখন যেন এতে আরো একটু জড়সড় হইয়া উঠিল; মোড়কটা বাঁ হাত দিয়া চাপিয়া বলিল, “ও কিছু নয়।—তারপর ছিলি কেমন?”
হাসিয়া বলিলাম,—“আমাদের থাকা আর না থাকা! তোর নিজের কথা বল। গিন্নি কিরকম হল?—ঠিক কথা ভুলেই যাচ্ছিলাম—কেমন কোর্মা কালিয়া খাচ্ছিস? না, তোর বউকে দেখতে গিয়ে যা চপ খেয়েছিলাম মাখন, এখনো যেন মুখে লেগে রয়েছে। এখন হাত নিশ্চয় আরো পেকেছে, একদিন খাওয়ানো চাই, কবে আসব বল দিকিন?”
উত্তরে মাখন লজ্জিতভাবে একটু ম্লান হাসিল’ মাত্ৰ।
বলিলাম, “হেসে উড়িয়ে দিলে চলবে না। না নেমন্তন্ন করিস এমনি গিয়ে জবরদস্তি খেয়ে আসব একদিন। কেন, বিয়ে না হয় তুই-ই করেছিস, কিন্তু আমাদের কি কোনো হক্ নেই? যোগাযোগটা ঘটাল কে?”
মাখন একটু থামিয়া বলিল, “আজ রাত্তিরেই আয় না শৈল, অনেকদিন একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করিনি দুজনে। ও কিন্তু আর একেবারেই সময় পায় না রাঁধবার ভাই। যখন রাঁধত তখন তুই রইলিনি—”
আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, “সময় পায় না?”
“এখন মনটা অন্যদিকে গেছে কিনা।”
“অন্য দিকে?—কোন্ দিকে?”
“আজকাল বোনা, রেশমের ফুল তোলা এইসব নিয়েই থাকে যে; হেঁসেলের দিকে আর যাবার ফুরসতই পায় না।”
আমার ধাঁ করিয়া মনে পড়িয়া গেল, “চাড়ু শিল্প।”
বলিলাম, “তাহলে তো খাসা আছিস। হাত কেমন হয়েচে বউয়ের?”
মাখন আবার একটু হাসিল;–একটা অপ্রতিভ হাসি, যেন কি একটা বলিতে কি করিতে চাহিতেছে, অথচ মনস্থির করিয়া উঠিতে পারিতেছে না।
বলিলাম, “চপ কোর্মাও উড়িয়ে আসব আর তোর বউয়ের হাতের কাজও দেখে আসব সেই সঙ্গে, বলে রাখবি গিয়ে। আজ আর নয়,–বড় তাড়াতাড়ি হয়ে পড়বে। এক হপ্তা সময় দিলাম। এক আধখানা নমুনা আমায়ও দিতে হবে কিন্তু, ঘরে টাঙিয়ে রাখব।”
মাখন কোনো কথা না বলিয়া ফ্রেমের মতো সেই জিনিসটির কাগজের মোড়কটা ধীরে ধীরে খুলিয়া সেটা আমার দিকে ঠেলিয়া দিল।
কালো নীল আর বেগুনে রঙের উলে বোনা প্রায় তিন ফুট আড়াই ফুট মাপের কি একটা জিনিস—কোনো একটা জানোয়ার বলিয়া মনে করা মুশকিল, কেননা মুখ, চোখ, কান বাহির করা শক্ত; কোনো ঝাঁকড়া একটা ফুলের গাছ মনে করায় বিপদ আছে, কেননা কোথায় যেন তিনটি পায়ের আভাস পাওয়া যায়; এক-একবার মনে হয় একটা মানুষ যেন হাতে মাথা টিপিয়া উবুড় হইয়া পড়িয়া আছে, তাহাই বা হয় কেমন করিয়া? পিছনে একটা ল্যাজের মতো কি একটা রহিয়াছে যে!—গাছ নয়, মানুষ নয়, জন্তুজানোয়ার নয়; আসবাব পত্রের সঙ্গেও কিছু সাদৃশ্য পাওয়া যাইতেছে না। ব্যাপারটা তাহা হইলে কি? ওদিকে মাখনা নিশ্চয় একটা প্রশংসার উচ্ছ্বাস আশা করিতেছে; কিন্তু কিসের প্রশংসা করিতেছি না বুঝিয়া কি প্রশংসা করিব?
মাখন বলিল, “শনিবার টাউনহলে একজিবিশান কিনা…আরো গড়চে বৌ-অষ্টপ্রহর খেটে।”
আর চুপ করিয়া থাকা নিষ্ঠুরতা, আমি অগ্রপশ্চাৎ না ভাবিয়া বলিয়া ফেলিলাম, ‘হয়েচেও চমৎকার!—বা!”
মাখন লজ্জিতভাবে বলিল, “যাঃ, ঠাট্টা করচিস।”
“ঠাট্টা!” আশ্চর্য হইয়া মাখনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম।
মাখন স্থির সপ্রশংস দৃষ্টিতে জিনিসটার দিকে চাহিয়া রহিল, তাহার পর আমার মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল, “পাবে প্রাইজ মনে করিস? আমার তো আশা হয় না।”
বলিলাম, “মারে কে? এরকম জিনিস কটাই বা আসবে একজিবিশানে শুনি?”
মাখন হাসিয়া ফেলিল; বুঝিলাম তাহার সব সন্দেহ কাটিয়া গিয়াছে। বলিল, “দেড় টাকার উল আছে এতে শৈলেন, আর কটা দোকান ঘুরে রং মিশিয়ে কিনতে কি কম খাটুনিটা হয়েচে!”
“অথচ তুই বলচিস প্রাইজ পাবে না! — নগদ দেড়টা টাকার উল কি একটা হাসি-ঠাট্টা নাকি? হুঁ।”
ঠাট্টাটা বুঝিল না মাখনা, নিজের গড়া স্বর্গলোকে বেশ আছে। তবুও কিন্তু কষ্ট হইল ওর দশা দেখিয়া। মাখনা নিশ্চয় ভালো করিয়া খাইতে পায় না, বরাবরই একটু ভালো রান্নার, ভালো জিনিসের পক্ষপাতী ছিল বেচারা। তাহার পর এই অযথা প্রাণান্ত মেহনত—রোদ নাই বৃষ্টি নাই, উল মিলাইয়া বেড়ানো—টাকার অপব্যয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম।
রীতিমতো রোগা হইয়া গিয়াছে। মাখনা হইল রোগা—তাও অমন গৃহিণী পাইয়া–রান্নায় যে সাক্ষাৎ দ্রৌপদী! কি কোর্মাই না রাঁধিয়াছিল সেদিন! আর সেই রুইয়ের পেটি দিয়া দই-মাছ! ব্যক্তিগতভাবে নিজেও যেন একটা বঞ্চনার সন্তাপ অনুভব করিতেছি। এই দেড় বৎসরের মধ্যে যখনই মাখনার কথা মনে পড়িয়াছে—দেখিয়াছি ওই সেই হৃষ্টপুষ্ট সেবাপরায়ণা কর্মিষ্ঠা বৌ ষোড়শোপচারে অন্নব্যঞ্জন রাঁধিয়া দিতেছে, আর পরিতোষের আহারে মাখনলালের চেহারা আরো রক্তাভ হইয়া উঠিয়াছে। ফিরিয়া গিয়া মাঝে মাঝে ভাগ বসানো যাইবে।…হায় রে বরাত, অমন কোর্মার জায়গায় এই উলের পিণ্ড! খাল কাটিয়া কুমির ঢোকাইল ঘরে মাখনা!
বলিলাম, “মাখন, বউয়ের রান্নার দিকেও একটু খেয়াল রাখিস তোকে দেখলেই মনে হয় ঠাকুরের বকেয়া ডাল-চচ্চরি ছাড়া আর দেড় বছর তোর পেটে কিছু পড়েনি….”
কাকেই বা বলা?
মাখনা তাহার চাড়ু শিল্পটা আবার সযত্নে কাগজে মুড়িতেছিল, স্মিতহাস্যের সহিত আবার আমার দিকে চাহিয়া বলিল, “সত্যিই প্রাইজ পাবে বলে তোর মনে হয় শৈলেন?”
বলিলাম, “অনিবার্য; কিন্তু আমি বলছিলাম—অমন রান্নার হাত—আজকালকার দিনে- পুরুষদের এই পোড়াকপালের যুগে—লাখে একটি মেলে না…”
মাখন ফ্রেমটা কাঁকালে লইয়া হঠাৎ উঠিয়া পড়িল।
আমি আশ্চর্য হইয়া বলিলাম, “উঠলি যে! বোস, আমি সরবতের কথা বলে দিলাম। আর রোদটা একটু পড়ুক—রোদের দিকে যে চাওয়া যায় না,—চোখ ঠিকরে পড়ে!”
মাখন ততক্ষণে দোরের দিকে পা বাড়াইয়াছে, ঘুরিয়া বলিল, “আজ থাক ভাই, অন্য একদিন খাব’খন। এখনই পেনোর দোকানে না দিয়ে এলে পরশু শনিবার পর্যন্ত বেঁধে দিতে পারবে না কিনা। বৌ ওদিকে আরো তিনখানা প্রায় শেষ করে এনেচে।—সত্যি বলচিস তো পাবে প্রাইজ?”
আবার সেই আগুনের হলকার মধ্যে নামিয়া পড়িল।
