(৭)
কৈটভ প্রাত্যহিক শরীরচর্চা করছিল। তখনই ঠাকুরদার এক নাতি এসে বলল,
“আপনাকে ঠাকুরদা ডাকছেন।”
কৈটভ ওর দিকে না তাকিয়ে বলল, “বলুন শরীরচর্চা শেষ করে আধ ঘণ্টার মধ্যে আসছি।”
নাতি ক্ষুব্ধ হল এই উত্তরে।
“ঠাকুরদা কারও জন্য অপেক্ষা করে না।”
কৈটভ নম্রভাবে আবার জানাল, “কিন্তু আপনি তো দেখছেন আমি যোগাসন করছি। এই মুহূর্তে আমার পক্ষেও যাওয়া সম্ভব নয়।”
দশাসই চেহারার লোকটা সপাট গড়নের কৈটভের দিকে এগিয়ে গেল। “আপনাকে তুলে নিয়ে যাব। ঠাকুরদা ডেকেছেন এক্ষুনি যেতে হবে।”
লোকটা যেই তার দিকে আক্রমণ করতে এগোল কৈটভ তার জুডোর প্যাঁচে মুহূর্তের মধ্যে তাকে ধরাশায়ী করল। লোকটা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল।
“আপনি ফিরে যান। আমি আসছি। আর এসব বোকামি করবেন না।”
লোকটা কোমরে হাত দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল।
আধ ঘণ্টার পর কৈটভ ঠাকুরদার ঘরে এসে হাজির হল।
“এসো এসো। সকাল সকাল ভালোই কসরত করছিলে শুনলাম।”
কৈটভ দেখল একটু আগে যাকে আছাড় দিয়েছিল সে এখন এই অফিসেই দাঁড়িয়ে আছে।
কৈটভ তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ঠাকুরদার উলটোদিকে গিয়ে বসল।
“কসরতের সময়টায় আমি ফাঁকি দিতে চাই না।”
কৈটভের উত্তরে ঠাকুরদা হাসলেন। বললেন,
“এটাই তো উচিত। তবে এর ফলে আমার প্রাতরাশ আধ ঘণ্টা পিছিয়ে গেল। নতুন খাবার আসছে আবার।
কৈটভ এতটুকু অপ্রস্তুত না হয়ে বলল, “আপনি গতকাল রাতে আমাকে বলে রাখলে আমি সেভাবেই আজ সকালে প্রস্তুত থাকতাম। আমি অত্যন্ত দুঃখিত!”
ঠাকুরদা হাতের ইশারায় বলল, “ধুর বেটা, এখন নিজেদের দুঃখিত হবার সময় নয়। অন্যকে দুঃখ দেবার সময়।”
বলেই হো হো করে হাসলেন। দুজন বেয়ারা এসে সুসজ্জিত থালায় খাবার পরিবেশন করে গেল। ঠাকুরদা নাতিদের বেরিয়ে যেতে বললেন।
সবাই চলে গেলে ঠাকুরদা বললেন, “গুরুদেব রাজি হয়ে গেছেন। আশা করছি আগামীকাল আমরা সফল হব।”
“আমাকে সম্পূর্ণ প্ল্যান অব অ্যাকশনটা বলুন।”
কৈটভ উৎসুক হয়ে আছে শোনার জন্য।
“আমাদের সময় যাত্রা করতে হবে। টাইম ট্রাভেল।”
ঠাকুরদার কথা শুনে কৈটভ থমকে গেল। চামচে তোলা খাবারটা মুখ অবধি পৌঁছালো না।
“টাইম ট্রাভেল?”
ঠাকুরদা খাওয়া থামালেন না। পুষ্টিকর খাদ্যগুলো খেতে খেতে বলতে থাকলেন, “হ্যাঁ টাইম ট্রাভেল। সে ব্যবস্থা বহু বহু বছর আগে করে রেখেছি। কীভাবে কী বৃত্তান্ত তা নিজের চোখেই দেখতে পাবে। তাই অযথা এসব নিয়ে বলে লাভ নেই। আমাদের সমস্যা একটাই ছিল। এই কাজে গুরুদেবকে রাজি করানো।”
“গুরুদেব আমাদের এই কাজে সাহায্য করবেন কেন?”
“তিনি সাহায্য করবেন না ভেবেই তো এগিয়েছিলাম। তাই এত কিছু করে তাকেই রাজি করালাম সবার আগে।”
“কিন্তু গুরুদেবের সাহায্য লাগবেই-বা কেন?”
“কারণ গুরুদেবও টাইম ট্রাভেলে সক্ষম আবার আমিও সক্ষম। কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়া এটা করতে পারব না। আমি অতীতে যেতে পারি, আর গুরুদেব পারেন ভবিষ্যতে যেতে। তাই বর্তমানে ফিরে আসতে হলে একে অপরের সাহায্যের প্রয়োজন। আমাদের সৌভাগ্য এটাই যে গুরুদেব রাজি হয়েছেন।”
“বেশ। তাহলে কাজটা করব কীভাবে আমরা?”
“খুবই সহজ। ২০২৩ সালে জগন্নাথের শ্রীবিগ্রহ পরিবর্তন হয়েছে। তাই বর্তমানে ওই শ্রীবিগ্রহের ভেতর থেকে চুরি প্রায় অসম্ভব। পরবর্তীকালে ২০৩৫ সালে আবার শ্রীবিগ্রহ পরিবর্তন করা হবে। তাই ওরা আমাদের হয়ে ২০৩৫ সালে চলে যাবে এবং ব্রহ্মপদার্থ চুরি করবে। আমাদের অতীতে ফেরার প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে ওরা অতীতে ফিরে আসবে এবং আমাদের সেই ব্রহ্মপদার্থ দিয়ে দেবে। তারপর বাকি কাজ তোমার।”
ঠাকুরদা প্ল্যান অব অ্যকশন বলার পর প্রশংসা শোনার জন্য কৈটভের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কৈটভের মুখে একটা আশঙ্কার মেঘ উড়ছিল।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল? প্ল্যান ভালো লাগল না?”
“খুবই সুন্দর নিটোল প্ল্যান। কিন্তু এত সহজে কি আমরা এটা করতে পারব? গুরুদেবকে ছেড়েই দিলাম, রামানুজ সম্পর্কেও আমার যতটুকু ধারণা সে এত সহজে ব্রহ্মপদার্থ আমাদের হাতে তুলে দেবে কি?”
“না দিলে ছিনিয়ে নেব। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। মৃত কৈটভ কতটা এগোল? এবার প্রচুর পরিমাণে চাই কিন্তু।”
ঠাকুরদা নিজের প্রাতরাশ শেষ করার দিকে মন দিলেন।
“মৃত কৈটভ যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি হবে। সেটা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।”
“আচ্ছা কৈটভ, তুমি যে এই ব্রহ্মাণ্ডের উপর আধিপত্য কায়েম করতে চাও, তুমি আদৌ জানো এই ব্রহ্মাণ্ড কত বিশাল?” ঠাকুরদা প্রাতরাশ শেষ করে একটা আপেল নিলেন। সেটাকে ছুরি দিয়ে কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করলেন এই প্রশ্ন।
কৈটভ এত খাবার খেতে অভ্যস্ত নয়। যতটা পারল সে খেয়ে মুখ মুছে বলল, “এ নিয়ে আমিও সন্দিহান ছিলাম। বাকি সব ঠিক থাকলেও আয়ু এখানে একটা বড়ো বাধা ছিল। আপনার এজিলেসের সঙ্গ পেলে আশাকরি এই বাধাটাও পার করতে পারব।”
“এজিলেস তোমাকে সাহায্য করবে ঠিকই, কিন্তু তারপরেও তুমি ভেবে দেখো একটা বিষয়। উদাহরণ দিয়ে বলছি। ধরো, আমরা পৃথিবীবাসীরা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির অন্তর্ভুক্ত। আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্যালাক্সি হল এন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সি। আমাদের থেকে এর দূরত্ব ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। আমাদের কাছে বর্তমানে যে উচ্চগতিসম্পন্ন যান আছে তার গতি ঘণ্টায় আঠাশ হাজার কিলোমিটার। এই গতিতে আমাদের শুধু এন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে ৯৪.৫ বিলিয়ন বছর। আচ্ছা তোমার সুবিধের জন্য ধরে নিচ্ছি আমরা আলোর গতিবেগের সমান গতিবেগের একটি জেট তৈরি করলাম, তাও আমাদের সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগবে ২.৫ মিলিয়ন বছর। বাস্তবিকভাবে ইম্পসিবল!”
কৈটভ জোরে জোরে হাসল এই ব্যাখ্যা শুনে।
“আপনি বড্ড পুরোনো বিজ্ঞান মডেলের কথা বলছেন। আমি আশ্চর্য হচ্ছি, যে লোকটা একটু আগে আমায় জানাল যে তিনি বহু বহু বছর আগে টাইম ট্রাভেল করার যন্ত্র বানিয়েছিলেন, তিনি বাস্তবিকভাবে কী সম্ভব আর কী অসম্ভব তা নিয়ে ভাবছেন। আর শুনুন, তাহলে বলি আপনার উত্তর আপনার প্রশ্নেই আছে। টেকনোলজিতে এত উন্নত করতে হবে যেখানে আমরা আলোর গতিবেগের চেয়েও বেশি গতিবেগ সম্পন্ন যান বানাতে পারি। তাহলেই সম্ভব।”
ঠাকুরদা এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল কৈটভের দিকে। একটা আপাদমস্তক শয়তান ছাড়া এ কিছুই নয়। ব্রহ্মাণ্ডের উপর দখল পেলে এ কী করবে নিজেও জানে না।
ওদিকে সকালবেলায় ত্রিবেদী স্যারের সঙ্গে কথা বলল রামানুজ।
“আচ্ছা স্যার, আমাকে বলুন, আগামী দশ বছরে আপনার লেভেলে কাজ করতে পারে এরকম কে আছে?”
“প্ল্যানটা কী সেটা তো বলবে।”
“দেখুন স্যার, এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ প্ল্যান আমি ভাবিনি। আমি ধীরে ধীরে সুতোয় গেঁথে একটা প্ল্যান ছকছি। আপনি এটা ভেবে আমাকে জানান।”
“তোমরা কবে নাগাদ টাইম ট্রাভেলের পরিকল্পনা করছ? উফ্ বলতে গিয়েও কীরকম আড়ষ্ট লাগে। টাইম ট্রাভেল নাকি!”
“আমারও প্রথম প্রথম তা-ই লাগত। এখন অনেকটাই ধাতস্থ। দুর্গাকে আটকে রেখেছে তো। তাই বেশি দেরি করতে চাই না। সম্ভব হলে আগামীকালকেই করতে চাই।”
“ঠিক আছে। আমাকে আপডেট করো সমস্ত কিছু। যেহেতু ভবিষ্যত আর অতীতের ব্যাপার বর্তমানে আমার কিছুই করার নেই। রাখছি।”
রামানুজ ফোন কেটে দিল। রাধামাধব টেবিলে লাঞ্চ সাজিয়ে দিল। রামানুজ খেয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একটু মুক্ত হাওয়া চাই। মাথাটা কাজ করছে না। দাসবাবু সঙ্গে রইলেন।
“শহরটা এই এক বছরেও খানিক পালটেছে, কী বলেন দাসবাবু?”
“পাল্লা দিয়ে নতুন বিল্ডিং উঠছে। বাইরের কিছু ব্র্যান্ড এখানে আসছে। এই তো পরিবর্তন। এর বাইরে আর কী হচ্ছে স্যার! মানুষও এতেই খুশি।”
অজিতবাবু সিটি সেন্টারের সামনে এসে গাড়ি দাঁড় করালেন।
“এখানে একটা ভালো চা পাওয়া যায়। চলুন খাবেন।”
রামানুজ নামল। ছিমছাম শহর। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই সিটি সেন্টার।
প্যারাডাইজ চৌমুহনীতে অবস্থিত। লাইন দিয়ে ভেতরে চা-কফির দোকান। সামনে বসার জন্য সিমেন্ট দিয়ে উঁচু করে বাঁধানো স্থান। স্থান কাল পাত্র ভেদে সকলে এখানেই বসে চা-কফি পান করে। ছেলে মেয়েরা আড্ডা দেয়। তবে মেট্রো শহরের মতো ঝাঁ চকচকে না হলেও বেশ প্রাণবন্ত।
“চা-টা সত্যিই খাসা।” রামানুজ বলল।
“তবে আপনাদের কলকাতার ভাঁড়ের চা-কে টেক্কা দিতে কেউ পারবে না।”
ড্রাইভার অজিতের কথায় সে হাসল।
“এবারে অশোকায় আবার মোঘলাই খাবেন নাকি?”
দাসবাবু উসকে দিল। রামানুজ মাথা নেড়ে বলল, “নাহ। আচ্ছা এখানে একটা ধারে-কাছেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন আছে শুনলাম। একবার যাওয়া যায়?”
অজিত বলল, “একেবারেই কাছে। কল্যাণীতে। চলুন।”
যেমনি কথা তেমনি কাজ। চা খেয়ে সকলে গাড়িতে বসে এক ছুটে রামকৃষ্ণ মিশন।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হলেও একেবারে শান্ত স্নিগ্ধ এলাকা। সামনে বিস্তীর্ণ উদ্যান, ফলের বাগান। তার মাঝে শোভা পাচ্ছে মিশন।
“ওদিকটায় দুর্গাপূজা হয়।”
দাসবাবু হাত দিয়ে দেখালেন। রামানুজ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে সোজা শ্রীরামকৃষ্ণের বিগ্রহের সামনে গিয়ে বসল। পাশেই শ্রীমা আর বিবেকানন্দের বিগ্রহ।
রামানুজ ঘণ্টাখানেক সেখানে বসেই রইল। অজিত আর দাসবাবুও পেছনে বসে রইল।
মন শান্ত হলে পর রামানুজ প্রণাম করে বেরিয়ে এল। মন এবার যথাযথ শান্ত। এবার লক্ষ্য পুরী ধাম রক্ষা করা।
