ব্রহ্মপদার্থ – ১১

(১১)

সিনহা দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলে একটি গাছের গায়ে হেলান দিয়ে। ফোর্সও তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে। ঠাকুরদা ছাড়া ওই পক্ষে আর কেউ নেই।

ঠাকুরদা চেয়ারে বসে আছেন।

রামানুজকে দেখে সিনহা দৌড়ে এলেন।

“স্যার!”

রামানুজ গুহামুখ থেকে বেরিয়ে এল। পেছনে বাকিরা। রামানুজ সিনহাকে জিজ্ঞেস করল, “বাকিরা কোথায়?”

“স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

“কী হয়েছে বলো।”

“স্যার আপনাদের আসতে মোট পাঁচ মিনিট দেরি হয়েছে। ওরা এইমাত্র সময়-যাত্রার জন্য বেরিয়ে গেল। আড়াই ঘণ্টা কেটে যাবার পর ওরা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে রাজি হয়নি। ওরা ধরেই নিয়েছিল আপনি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। আমি ওদের অনেক অনুরোধ করেছিলাম অপেক্ষা করার জন্য। কিন্তু ওরা শোনেনি।”

“কারা গেছে ভেতরে?”

সিনহা একে একে যা বলে তাতে রামানুজের কান গরম হয়ে গেল। মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল, “কৈটভ, মিথ সংঘের সদস্যরা। আর কৈটভের মৃত কৈটভ সঞ্জাত কৈটভ বাহিনী।

গুরুদেব কথাটা শুনে বসে পড়লেন মাটিতে। দাসবাবু এগিয়ে এসে রামানুজকে বলল, “আপনি একবার ঠাকুরদার সঙ্গে কথা বলুন না।”

রামানুজ জানে যে সে ঠাকুরদার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এই অবস্থায় কারও সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলা মুশকিল।

তবু সে আমতা আমতা করে এগিয়ে গেল। ঠাকুরদা এখনও মিটি মিটি হাসছেন।

“রামানুজ এসেছ? ব্রহ্মপদার্থ কই?”

ঠাকুরদা বেশ ঠেস দিয়েই কথাটা জিজ্ঞেস করলেন। রামানুজ শুধু তাকিয়ে রইল।

“গুরুদেব, ও গুরুদেব। কর্কট না হয় কালো, গুরুদেব তো শুভ্রতার প্রতীক। কোথায় গেল সেই শুভ্রতা? কথার দাম রাখতে পারলে না। বলেই হাসলেন ঠাকুরদা।

“ব্রহ্মপদার্থ কৈটভের হাতে দিলে সে সব কিছু ধ্বংস করে দেবে।” রামানুজ দাঁত খিঁচিয়ে বলল। ঠাকুরদা তার কথা পাত্তাও দিলেন না।

উলটে বললেন, “আমি জানতাম তোমরা ব্রহ্মপদার্থ লুকিয়ে ফেলবে। তবুও তোমাদের জন্য আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। নিজেকেও আয়নায় মুখ দেখাতে হয়। আমি এতটুকু অন্তত বলতে পারব তোমাদের সুযোগ দিয়েছিলাম আর সততার সঙ্গে দিয়েছিলাম। কৈটভকেও ততক্ষণ আটকে রেখেছিলাম। এবার আর আমার হাতে কিছুই করার নেই। বোতলের জিন বেরিয়ে গেছে। এবার জিনের সঙ্গে গিয়ে বুঝে নাও।”

রামানুজ শেষ চেষ্টা করল, “ব্রহ্মপদার্থ কৈটভ কোনোদিন খুঁজেও পাবে না।”

ঠাকুরদা হাত তুলে তাকে থামালেন।

“আমি টাইম ট্র্যাকার বানিয়েছি। তোমরা কোথায় কোথায় গেছো সব আমার যন্ত্র ট্র্যাক করে নেবে। নিশ্চিন্ত থাক। কৈটভ সব পেয়ে যাবে।”

এত কিছু করার পর এভাবে হারতে হচ্ছে জানলে একটা তীব্র শোক নেমে আসে। সেরকমই এক শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন গুরুদেব। বসে পড়লেন মাটিতে। ইতিমধ্যে তিনি অনেক কিছু হারিয়েছেন, সাধের গ্রামটাও আর নেই। এখন আরও ভয়ানক এক পৃথিবীর দিকে এগোতে হচ্ছে জেনে ভেঙে পড়লেন। দুর্গা তাকে সামলাবার চেষ্টা করল।

রামানুজ হতোদ্যম হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কৈটভ ব্রহ্মপদার্থ দিয়ে কী করবে?”

ঠাকুরদা বললেন, “আমি ভেবেছিলাম তুমি এতক্ষণে বুঝে গেছো। আচ্ছা শোনো বলি। কৈটভ গন্দবেরুন্দা দেবতাকে জাগাবে। ব্রহ্মপদার্থ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। পৃথিবীতে শক্তির উৎপত্তি বা ধ্বংস কোনোটাই সম্ভব নয়। অথচ বিজ্ঞানের উলটো রাস্তার হদিশ দেয় এই ব্রহ্মপদার্থ। নিজেই শক্তি উৎপন্ন করতে পারে আবার প্রয়োজনে ধ্বংসও করতে পারে। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৈটভ গন্দবেরুন্দা দেবতাকে জাগিয়ে তুলবে। তারপর তার বিশ্বজয় শুরু হবে।”

রামানুজ-সহ সকলে ভয় পেয়ে গেল এই কথা শুনে। রামানুজের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, “তাহলে সে অপেক্ষা করল না কেন দেবতার জেগে উঠার জন্য।”

ঠাকুরদা স্পষ্ট বললেন, “এত ধৈর্য তার মধ্যে আর নেই। আর তাছাড়া সে শুধু দেবতার জাগরণ চাইছে না। সে চাইছে দেবতার উপর আধিপত্য। আরাধ্যের উপর আধিপত্য। তারপর সে আরাধ্যকেই বানাতে চাইছে শয়তান। জয় করতে চাইছে ব্রহ্মাণ্ড। বুঝলে খোকা? তুমি আর এসবে বাধা দিতে পারবে না হে। যাও যাও, ফিরে যাও। এই গুহামুখ থেকে যে বেরিয়ে আসবে তাকে কিছু করার মতো শক্তি তোমার হাতে নেই।”

রামানুজের কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। ঠাকুরদা যা বলছে তা যদি সত্যি হয় তবে এই পৃথিবীতে অনর্থ ঘটে যাবে। সমস্ত জীবকুলের অস্তিত্বই সংকটে চলে আসবে। বিপুল এই শক্তিকে কৈটভ নিশ্চয়ই জনহিতকর কোনো কাজে লাগাবে না। আর গন্দবেরুন্দার খোলসকে যদি শয়তানের আকার দেওয়া হয় তবে তাকে রুখবেই-বা কোন শক্তি?

রামানুজের মাথা ঘুরতে লাগল। আর ঠিক তখনই শব্দটা হল। ঠাকুরদা চিৎকার করে উঠলেন।

“কেউ ফিরছে? অতীত থেকে বর্তমানে কেউ ফিরে আসছে।”

সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে যে কে ফিরে আসছে এত তাড়াতাড়ি।

“নিশ্চয়ই কৈটভ ফিরছে। সোজা চলে গেছে যেখানে লুকিয়ে রেখে এসেছ ব্রহ্মপদার্থ সেখানে। তারপর সেখান থেকে ব্রহ্মপদার্থ নিয়ে সোজা বর্তমানে। সময় নষ্ট করেনি সে।”

ঠাকুরদা উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছেন।

যে ফিরে এল তাকে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফিরে এল ঠাকুরদার এক নাতি। তার অবস্থা তথৈবচ। তাকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিয়ে অন্তর্ধান হল যন্ত্র।

ঠাকুরদা দৌড়ে গেলেন তার কাছে। সে মাটিতে পড়ে আছে। তার দেহের কাপড় শতচ্ছিন্ন। গায়ে আঁচড়ের দাগ। রক্তাক্ত অবস্থায় সে মাটিতে পড়ে আছে।

“ছোঁবেন না আমায়। দূরে থাকুন।”

ঠাকুরদার দলের লোকটা চিৎকার করে উঠল।

“কৈটভ আমাদের সবাইকে বোকা বানিয়েছে।”

ঠাকুরদা জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে খুলে বলো।”

নাতি বলল, “কৈটভ আমাদের সবাইকে বিভ্রান্ত করেছে। সে আদৌ ব্রহ্মপদার্থ নিতে যায়নি। সে এখান থেকে সোজা চলে গেছে আমাদের মিথ সংঘের পরীক্ষাগারে।”

“কী?” ঠাকুরদা চশমা খুলে ফেললেন।

“কী বলছ তুমি এসব?”

লোকটার কথা বলতে অসুবিধে হচ্ছিল। সে কোনোক্রমে বলে, “শুধু তাই নয়, সে মাত্র তিন ঘণ্টা পেছনে অতীতে গেছে। ওই সময় সে জানত আমরা সবাই এখানে। মিথ সংঘের পাহারা তুলনায় দুর্বল। সে আমাদের পরীক্ষাগারের যাবতীয় কিছু দখল নিতে গেছে। তার পরিকল্পনা অনেক বড়ো ঠাকুরদা। সে সঙ্গে নিয়ে গেছে তার কৈটভ বাহিনী। আমরা যখন বুঝতে পারি কৈটভের মূল অভিসন্ধি কী, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সে আমাদের আক্রমণ করতে থাকে। আপনি আমাকে সুরক্ষার খাতিরে নীল তরল আলাদা করে না দিয়ে রাখলে আমি এখানে পৌঁছে আপনাকে জানাতেও পারতাম না। মিথ সংঘের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ সে

ছিন্ন করেছে। আপনি ফোন করে দেখুন, কোনো লাভ নেই। আপনি তাড়াতাড়ি সেখানে যান ঠাকুরদা। নাহলে আমাদের সমস্ত ফর্মুলা, সমস্ত কিছু কৈটভ হাতিয়ে নেবে। সব ধ্বংস হয়ে যাবে।”

ঠাকুরদা ক্রোধে পাগল হয়ে গেলেন। আর ঠিক তখনই গুরুদেব বললেন, “দেখলি কর্কট, সাপ কারও বন্ধু হয় না। সুযোগ পেলে কৈটভের মতো সাপেরা সবাইকে ছোবল দেবেই। এবার চল, তোর পরীক্ষাগারে। আমরা তোর সঙ্গে আছি। প্রয়োজনে কৈটভকে রুখতে তোর হয়েও লড়ব।”

কর্কট ওরফে ঠাকুরদা গুরুদেবের এই কথায় অবাক হলেন। তার নিজের সিদ্ধান্তের উপর বিশ্বাসটা নড়ে গেল।

আর তখনই রামানুজ বলল, “কর্কট চলুন। দেরি করে লাভ নেই। কীভাবে সবচেয়ে সহজ উপায়ে সেখানে যাওয়া যাবে?”

ঠাকুরদার গলা শুকিয়ে গেছে। এক মুহূর্তের মধ্যে তাঁর বন্ধু আর শত্রুর সংজ্ঞাটাই পালটে গেছে।

কোনোক্রমে তিনি বললেন, “কৈটভ আছে তিন ঘণ্টা অতীতে। বর্তমানে ওখানে পৌঁছে আমরা ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছুই হয়তো দেখব না। তার চেয়ে আমরা আবার না হয় অতীতেই যাই।”

গুরুদেব বললেন, “শোকে তোর মাথা কাজ করছে না। তাহলে তো এটা একটা লুপে পরিণত হবে। আমরা এখন বর্তমানেই যাই। গিয়ে দেখি প্যারাডক্সের কারণে ওখানে এখন কী অবস্থা। আমরা সাধারণভাবে অতীতে গেলে কৈটভ আবার অতীতে যাবে, আমরা আবার যাব এটা একটা চক্রাকারে চলতেই থাকবে। তার চেয়ে বরং বর্তমানে গিয়ে দেখি ওখানে সব কী অবস্থায় আছে।”

“বেশ। তাই হোক। এখান থেকে সরাসরি আমরা যেতে পারব। সবাই এক জায়গায় এসো। সবাই আমাকে ছুঁয়ে থাকো বা আমাকে ছুঁয়ে আছে এরকম কাউকে ছুঁয়ে থাকো।”

দুর্গা এতক্ষণে কথা বলল, “তার আগে একটা কাজ করে যেতে হবে।”

ঠাকুরদা বললেন, “কী কাজ।”

দুর্গা তাকাল ঠাকুরদার রক্তাক্ত নাতির দিকে। সবাই বুঝল কী কাজ করতে হবে।

কিছুক্ষণ পর ঠাকুরদা তার বেল্টে লাগানো ট্রাভেলরের মাধ্যমে সকলকে নিয়ে সেখান থেকে অদৃশ্য হলেন।

মাটিতে শুধু আলাদা হয়ে একদিকে পড়ে থাকল নাতির কাটা মাথা, অন্যদিকে পড়ে রইল কাটা ধড়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *