বোম্বাইয়ের বোম্বেটে – ৭

‘আপনাকে একটু জেরা করলে আপনার আপত্তি হবে না আশা করি।’

কথাটা বলল ফেলুদা, লালমোহনবাবুকে উদ্দেশ করে। মিনিট দশেক হল শিবাজী কাস্‌ল থেকে ফিরেছি—রিসেপশনে খবর পেয়েছি যে এই আধ ঘণ্টা আগে—তার মানে যখন আমরা শিবাজী কাস্‌লের সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম তখন—লালমোহনবাবুর একটা ফোন এসেছিল; কে করেছিল তা জানা নেই।

‘আসলে পুলকই বারবার করছে’, বললেন লালমোহনবাবু। ‘পুলক ছাড়া আর কেউ হতে পারে না।’

এখন আমাদের ঘরে বসে ফেলুদার প্রশ্নটা শুনে লালমোহনবাবু বললেন, ‘পুলিশের জেরাতেই যখন ফ্লাইং কালারসে বেরিয়ে এলুম, তখন আর আপনার জেরায় কী আপত্তি থাকতে পারে?’

‘আচ্ছা, মিঃ সান্যালের প্রথম নামটা তো আপনার জানা নেই।’

‘না মশাই, ওটা জিজ্ঞেস করা হয়নি।’

‘লোকটার একটা পরিষ্কার বর্ণনা দিন তো। আপনার বইয়ে যে রকম আধাখেঁচড়া বর্ণনা থাকে, সে রকম নয়।’

লালমোহনবাবু গলা খাঁকরিয়ে ভুরু কুঁচকোলেন।

‘হাইট…এই ধরুন গিয়ে—’

‘আপনি কি একটা মানুষের হাইটটাই প্রথম দেখেন?’

‘তা তেমন তেমন লম্বা বা বেঁটে হলে—’

‘ইনি কি খুব লম্বা?’

‘তা অবিশ্যি না।’

‘খুব বেঁটে?’

‘না, তাও অবিশ্যি না।’

‘তা হলে হাইট পরে। আগে মুখ বলুন।’

‘সন্ধ্যাবেলায় দেখেছি; আমার বাইরের ঘরের বাল্‌বটা আবার চল্লিশ পাওয়ারের।’

‘তাও বলুন।’

‘চওড়া মুখ। চোখ, আপনার—ইয়ে, চোখে চশমা; দাড়ি আছে, চাপ দাড়ি, গোঁফ আছে—দাড়ির সঙ্গে জোড়া—’

‘ফ্রেঞ্চকাট?’

‘এই সেরেছে। না, তা বোধহয় না। ঝুলপির সঙ্গেও জোড়া।’

‘তারপর?’

‘কাঁচাপাকা মেশানো চুল। ডান দিকে—না না, বাঁ দিকে সিঁথি।’

‘দাঁত?’

‘পরিষ্কার। ফল্‌স-টিথ বলে তো মনে হল না।’

‘গলার স্বর?’

‘মাঝারি। মানে, মোটাও না সরুও না।’

‘হাইট?’

‘মাঝারি।’

‘ভদ্রলোক আপনাকে একটা ঠিকানা দিয়েছিলেন না? বম্বের? বলেছিলেন অসুবিধা হলে একে ফোন করবেন—বেশ হেল্‌পফুল?’

‘দেখেছেন! বেমালুম ভুলে গেসলুম! আজ যখন পুলিশ জেরা করল, তখনও বলতে ভুলে গেলুম।’

‘আমাকে বললেই চলবে।’

‘দাঁড়ান, দেখি।’

লালমোহনবাবু মানিব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ-করা নীল কাগজ বার করে ফেলুদাকে দিলেন। ফেলুদা সেটা খুব মন দিয়ে দেখল, কারণ লেখাটা মিঃ সান্যালের নিজের। তার পর কাগজটা আবার ভাঁজ করে নিজের ব্যাগের মধ্যে রেখে দিয়ে বলল:

‘তোপসে, নম্বরটা চা তো—টু ফাইভ থ্রি ফোর ওয়ান এইট।’

আমি অপারেটরকে নম্বর দিয়ে দিলাম। ফেলুদা ইংরাজিতেই কথা বলল।

‘হ্যালো, মিস্টার দেশাই আছেন?’

আচ্ছা ফ্যাসাদ। এই নম্বরে মিঃ দেশাই বলে কেউ নাকি থাকেই না। যিনি থাকেন, তাঁর পদবি পারেখ, আর গত দশ বছর তিনি এই নম্বরেই আছেন।

‘লালমোহনবাবু’, ফেলুদা ফোনটা রেখে বলল, ‘সান্যালকে আপনার নেকস্‌ট গল্প বিক্রি করার আশা ছাড়ুন। লোকটি অত্যন্ত গোলমেলে এবং আমার বিশ্বাস আপনি যে প্যাকেটটি বয়ে আনলেন, সেটিও অত্যন্ত গোলমেলে।’

লালমোহনবাবু মাথা চুলকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সত্যি বলতে কী মশাই, লোকটিকে আমারও কেন জানি বিশেষ সুবিধের বলে মনে হয়নি।’

ফেলুদা হুমকি দিয়ে উঠল।

‘আপনার ওই “কেন জানি” কথাটা আমার মোটেই ভাল লাগে না। কেন সেটা জানতে হবে, বলতে হবে। চেষ্টা করে দেখুন তো পারেন কি না।’

লালমোহনবাবুর অবিশ্যি ফেলুদার কাছে ধমক খাওয়ার অভ্যেস আছে। এটাও জানি যে উনি সেটা মাইন্ড করেন না, কারণ ধমক খেয়ে খেয়ে ওঁর লেখা যে অনেক ইমপ্রুভ করে গেছে, সেটা উনি নিজেই স্বীকার করেন।

লালমোহনবাবু সোজা হয়ে বসলেন। ‘এক নম্বর, লোকটা সোজাসুজি মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। দুই নম্বর, সব কথা অত গলা নামিয়ে বলার কী দরকার তাও জানি না। যেন কোনও গোপন পরামর্শ করতে এসেছেন। তিন নম্বর…’

দুঃখের বিষয়, তিন নম্বরটা যে কী, সেটা লালমোহনবাবু অনেক ভেবেও মনে করতে পারলেন না।

সাড়ে ছটায় লোটাসে ইভনিং শো, তাই আমরা ছটা নাগাদ উঠে পড়লাম। আমরা মানে আমি আর লালমোহনবাবু। ফেলুদা বলল যাবে না, কাজ আছে। ব্যাগের ভিতর থেকে ওর সবুজ নোটবইটা বেরিয়ে এসেছে, তাই কাজটা যে কী সেটা বুঝতে বাকি রইল না।

ওয়রলিতে ফিরে যেতে হল আমাদের, কেননা সেখানেই লোটাস সিনেমা। লালমোহনবাবুর বেশ নাভার্স অবস্থা; পুলকবাবু কেমন পরিচালক, সেটা ‘তীরন্দাজ’ ছবি দেখেই মালুম হবে। বললেন, ‘তিনটে ছবি যখন পর পর হিট করেছে, তখন একেবারে কি আর ওয়্যাক-থু হবে? কী বলো, তপেশ?’

আমি আর কী বলব? আমি নিজেও তো ঠিক ওই কথাটা ভেবেই মনে জোর আনছি।

পুলকবাবু ম্যানেজারকে বলতে ভোলেননি; রয়েল সার্কলে তিনটে সিট আমাদের জন্য রাখা ছিল। এটা ছবির রিপিট শো, তাই হলে এমনিতেই অনেক সিট খালি ছিল।

ইন্টারভ্যালের আগেই বুঝতে পারলাম যে ‘তীরন্দাজ’ হচ্ছে একেবারে সেন্ট পার্সেন্ট কোডোপাইরিন-মার্কা ছবি। এর মধ্যেই অন্ধকারে বেশ কয়েকবার আমরা দুজনে পরস্পরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছি। হাসি পাচ্ছিল, আবার সেই সঙ্গে জেট বাহাদুরের কী অবস্থা হবে আর তার ফলে জটায়ুর কী অবস্থা হবে, সেটা ভেবে কষ্টও হচ্ছিল। ইন্টারভ্যালে বাতি জ্বললে পর লালমোহনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘গড়পারের ছেলে—তুই অ্যাদ্দিন এই করে চুল পাকালি?’ তারপর একটা গ্যাপ দিয়ে আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘ফি পুজোয় পাড়ায় একটা করে থিয়েটার করত; যদ্দূর মনে পড়ছে বি কম ফেল;—তার কাছ থেকে আর কী আশা করা যায়, বলো তো?’

ইন্টারভ্যালের শেষে বাতি নেভার সঙ্গে সঙ্গে আমরা হল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। ভয় ছিল, পুলকবাবু বা তার দলের কেউ যদি বাইরে থাকে; কিন্তু সে রকম কাউকে দেখলাম না।

‘যদি জিজ্ঞেস করে তো বলে দেব ফার্স্ট ক্লাস। পকেটে করকরে নোটগুলো না থাকলে মনটা সত্যিই ভেঙে যেত তপেশ।’

গাড়িটা হাউসের সামনেই উলটোদিকের ফুটপাতে পার্ক করা ছিল। লালমোহনবাবু সে দিকে না গিয়ে একটা দোকানে ঢুকে এক ঠোঙা ডালমুট, দু প্যাকেট মাংঘারামের বিস্কুট, ছটা কমলালেবু আর এক প্যাকেট প্যারির লজঞ্চুস কিনে নিলেন। বললেন, হোটেলের ঘরে বসে বসে হঠাৎ হঠাৎ খিদে পায়, তখন এগুলো কাজে দেবে।

দুজনে দুহাত বোঝাই প্যাকেট নিয়ে গাড়িতে উঠলাম, আর উঠেই বাঁই করে মাথাটা ঘুরে গেল।

গাড়ির ভিতরে গুলবাহার সেন্টের গন্ধ।

আসার সময় ছিল না; এই দেড় ঘণ্টার মধ্যে হয়েছে।

‘মাথা ঝিম ঝিম করছে, তপেশ’, বললেন লালমোহনবাবু। ‘এ ভূতের উপদ্রব ছাড়া আর কিছুই না। সান্যাল খুন হয়েছে, আর তার সেন্ট-মাখা ভূত আমাদের ঘাড়ে চেপেছে।’

আমার মনে হল—ঘাড়ে নয়, গাড়িতে চেপেছে; কিন্তু সেটা আর বললাম না।

ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল, সে বেশির ভাগ সময় গাড়িতেই ছিল, কেবল মিনিট পাঁচেকের জন্য কাছেই একটা রেডিয়ো-টেলিভিশনের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ‘ফুল খিলে হ্যয় গুলশন গুলশন’ দেখেছে। হ্যাঁ, গন্ধ সেও পাচ্ছে বইকী, কিন্তু গাড়ির ভিতরে কী করে এমন গন্ধ হয়, সেটা কিছুতেই তার মগজে ঢুকছে না। ব্যাপারটা তার কাছেও একেবারেই আজব।

হোটেলে ফিরে এসে কথাটা ফেলুদাকে বলতে ও বলল, ‘রহস্য যখন জাল বিস্তার করে, তখন এইভাবেই করে, লালমোহনবাবু। এ না হলে জাত-রহস্য হয় না, আর তা না হলে ফেলু মিত্তিরের মস্তিষ্কপুষ্টি হয় না।’

‘কিন্তু—’

‘আমি জানি আপনি কী প্রশ্ন করবেন, লালমোহনবাবু। না, কিনারা এখনও হয়নি। এখন শুধু জালের ক্যারেকটারটা বোঝার চেষ্টা করছি।’

‘তুমি বেরিয়েছিলে বলে মনে হচ্ছে?’—আমি ধাঁ করে একটা গোয়েন্দা-মার্কা প্রশ্ন করে বসলাম।

‘সাবাস তোপ্‌সে। তবে হোটেল থেকে বেরোইনি। এটা নীচে রিসেপশনেই দিল।’

ফেলুদার পাশে একটা ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসের টাইমটেবল ছিল, সেটা দেখেই আমি প্রশ্নটা করেছিলাম।

‘দেখছিলাম কাঠমাণ্ডু থেকে কটা ফ্লাইট কলকাতায় আসে, আর কখন আসে।’

কাঠমাণ্ডু বলতেই একটা জিনিস ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করার কথা মনে পড়ে গেল।

‘আচ্ছা, ইনস্পেক্টর পটবর্ধন যে নানাসাহেবের কথা বলেছিলেন, সেটা কোন নানাসাহেব?’

‘ভারতবর্ষের ইতিহাসে একজন নানাসাহেবই বিখ্যাত।’

‘যিনি সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়েছিলেন?’

‘লড়েওছিলেন, আবার তাদের কাছ থেকে আত্মরক্ষার জন্য দেশ ছেড়ে পালিয়েও ছিলেন। হাজির হয়েছিলেন গিয়ে একেবারে কাঠমাণ্ডু। সঙ্গে ছিল মহামূল্য ধনরত্ন—ইনক্লুডিং হিরে আর মুক্তোয় গাঁথা একটি হার—যার নাম নওলাখা। সেই হার শেষ পর্যন্ত চলে যায় নেপালের জং বাহাদুরের কাছে। তার পরিবর্তে জং বাহাদুর দুটি গ্রাম দিয়েছিলেন নানাসাহেবের স্ত্রী কাশীবাঈকে।’

‘এই হার কি নেপাল থেকে চুরি হয়ে গেছে নাকি?’

‘পটবর্ধনের কথা শুনে তো তাই মনে হয়।’

‘আমি কি ওই হারই পাচার করে বসলুম নাকি মশাই?’ লালমোহনবাবু তারস্বরে চেঁচিয়ে প্রশ্নটা করলেন। ফেলুদা বলল, ‘ভেবে দেখুন। ইতিহাসে হিরের অক্ষরে লেখা থাকবে আপনার নাম।’

‘কিন্তু…কিন্তু… সে তো তা হলে যথাস্থানে পৌঁছে গেছে। সে জিনিস দেশ থেকে বাইরে যায় কি না যায় সে তো দেখবে পুলিশ। আপনি কী নিয়ে এত ভাবছেন? আপনি নিজেই কি এই স্মাগলারদের—’

ঠিক এই সময়ই টেলিফোনটা বেজে উঠল। আর লালমোহনবাবুর দিকেই ওটা ছিল বলে উনি তুলে নিলেন।

‘হ্যালো—হ্যাঁ, মানে ইয়েস—স্পিকিং।’

লালমোহনবাবুরই ফোন। বোধ হয় পুলকবাবু। না, পুলকবাবু না। পুলকবাবু এমন কিছু বলতে পারেন না যাতে লালমোহনবাবুর মুখ অতটা হাঁ হয়ে যাবে, আর টেলিফোনটা কাঁপতে কাঁপতে কান থেকে পিছিয়ে আসবে।

ফেলুদা ভদ্রলোকের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে একবার কানে দিয়ে বোধহয় কিছু না শুনতে পেয়েই সেটাকে যথাস্থানে রেখে দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘সান্যাল কি?’

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেও যেন কষ্ট হল ভদ্রলোকের। বুঝলাম মাস্‌লগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে না।

‘কী বলল?’ আবার ফেলুদা।

‘বলল—’ লালমোহনবাবু গা-ঝাড়া দিয়ে মনে সাহস আনার চেষ্টা করলেন। ‘বলল—মু-মুখ খুললে পেপ্‌-পেট ফাঁক করে দেবে।’

‘যাক— ভাল কথা।’

‘অ্যাঁ!’—বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে ফেলুদার দিকে চাইলেন লালমোহনবাবু। আমার কাছেও এই অবস্থায় ফেলুদার হাঁপ ছাড়াটা বেয়াড়া বলে মনে হচ্ছিল। ফেলুদা বলল, ‘শুধু গুলবাহারের গন্ধে হচ্ছিল না। ক্লু হিসেবে ওটা বড্ড পল্‌কা। এমনকী লোকটা সত্যি করে বম্বে এসেছে না অন্য কেউ সেন্টটা ব্যবহার করছে, সেটাও বোঝা যাচ্ছিল না। এখন অন্তত শিওর হওয়া গেল।’

‘কিন্তু আমার পেছনে লাগা কেন?’

মরিয়া হয়ে প্রশ্নটা করলেন লালমোহনবাবু।

‘সেটা জানলে তো বাজিমাত হয়ে যেত লালমোহনবাবু। সেটা জানার জন্য একটু ধৈর্য ধরতে হবে।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *