বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৭০

।। সত্তর।।

২২ আগস্ট, ২০১৯

নমিতার দিন শুরু হলো খুব ব্যস্ততার সঙ্গে। সকাল সকাল ইউনিভার্সিটিতে ছুটল নমিতা। ভাইস চ্যান্সেলার জয়ন্তদা দশটার সময় এয়ারপোর্টে বেরিয়ে যাবেন, তাড়াতাড়ি আসতে বলেছেন।

‘গুড মর্নিং, স্যার,’ নমিতা দরজা থেকে বলল। ‘আসতে পারি?’

‘এসো এসো,’ ভাইস চ্যান্সেলর ড. জয়ন্ত শিকদার হাসিমুখে বললেন। ‘বোসো, বোসো। তুমি তো আমায় লজ্জায় ফেলে দিয়েছ, নমিতা!’

‘কেন জয়ন্তদা,’ নমিতা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল। ‘কোনো প্রবলেম?’

‘এতো নম্বর কোনো মানুষ পেতে পারে আমার ধারণাই ছিল না। এটা দ্যাখো।’

ডেস্কে একটা মার্কশিট, কন্ট্রোলার অব একজামিনেশনস্-এর সই করা। উপরে ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্প মারা। নাম বিদ্যাধরী দাস। আর তার পাশে দুটো সার্টিফিকেট, সেগুলোতেও ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্প মারা। বিদ্যাধরী দাসের বিএ আর এমএর সার্টিফিকেট। তাতে জয়ন্ত শিকদার, ভাইস চ্যান্সেলরের সই। নমিতা মার্কশিট দুটো দেখল। মুখে হাসি। নমিতা বলল, ‘আমার থেকে ঠিক পঁচাত্তর নম্বর বেশি পেয়েছিল বিদ্যাদি।’

‘আমার মার্কশিটটা লকারে লুকিয়ে রাখব,’ জয়ন্তদা হেসে বললেন। ‘বিদ্যার চোখে যাতে কোনোদিন না পড়ে।’

নমিতা হেসে বলল, ‘আমার হয়েছে টুনটুনির অবস্থা। একটা টাকা পেয়ে টুনটুনি গর্ব করে বলেছিল রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে। বিদ্যাদিও গ্র্যাজুয়েট, আমিও গ্র্যাজুয়েট।’ তারপর নমিতা বলল, ‘চিঠিটা হয়েছে, জয়ন্তদা?’

‘হ্যাঁ,’ ভাইস চ্যান্সেলরের খামে জয়ন্ত শিকদার একটা চিঠি নমিতার হাতে দিলেন। ‘আমি নিজের হাতে দিতে পারলে খুব আনন্দ পেতাম। কিন্তু আমাকে দিল্লি যেতে হচ্ছে, আর তোমারও তাড়া আছে। আমার হয়ে বিদ্যাকে বোলো।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ জয়ন্তদা। আজ বিদ্যাদিকে এটা দিতেই হবে। ওঁর জন্মদিনের উপহার। আপনাকে আর আটকাব না, আমি চলি।’ নমিতা ওর ব্যাগে কাগজগুলো সাবধানে ঢুকিয়ে বেরিয়ে এল।

* * *

আজ মিস বসাক দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছেন। আর বিদ্যাদির বাড়িই নমিতার কাছে দক্ষিণেশ্বর। পাপস্খালন করে পুণ্য অর্জন করতে ছুটেছে নমিতা। বিদ্যাদি আজ নমিতার জন্য রান্না করবে। নমিতা জানে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত আর কিছুক্ষণ পরেই আসতে চলেছে।

অভ্যাসবশত বিদ্যাদির কলিং বেলে আঙুল রেখে ফেলেছিল নমিতা। চমকে উঠল যখন কলিং বেল টুং করে বেজে উঠল। বিদ্যাদি দরজা খুলল। নমিতা হেসে বলল, ‘বাপরে! তোমার দরজার ঘন্টি আজ স্বাগত জানালো!’

বিদ্যাদি হাসল ‘বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডিন বাড়িতে আসছে, তাই ঠিক করিয়ে রাখলাম।’ তারপর বলল, ‘গগন এসে কখন তার-টার জুড়ে এটা চালিয়ে দিয়ে গেছে। আয়, ভিতরে আয়।’

ভিতরে ঢুকে নমিতা বলল, ‘দাদা নেই বাড়িতে?’

‘দাদা বাজারে গেছিল, আজকাল সব ভুলে যায়। তোর জন্য মিষ্টি আনতে আবার বাজারে গেছে। এক্ষুনি এসে পড়বে। এসব কী এনেছিস?’ বিদ্যাদি নমিতার ব্যাগটা দেখাল।

নমিতা ব্যাগ থেকে দুটো ব্রাউন এনভেলপ বের করে বলল, ‘হ্যাপি বার্থ ডে বিদ্যাদি।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ,’ বিদ্যাদি হাসল। তারপর বলল, ‘কিন্তু কী আছে এতে?’

‘খুলেই দেখ না,’ নমিতা বলল।

বিদ্যাদি খামটা খুলল। ভিতরের ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট, মার্কশিট দেখে বিদ্যাদির মুখ-চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বিদ্যাদি খুশিতে নমিতার দিকে তাকাল। তারপর আনন্দে বিদ্যাদি নমিতাকে জড়িয়ে ধরল।

‘দাঁড়াও দাঁড়াও, নমিতা বলল। ‘আরেকটা গিফট আছে। কিন্তু ওটার জন্য একটু অনুষ্ঠান করতে হবে।’

‘অনুষ্ঠান!’ বিদ্যাদির চোখে যুগপৎ কৌতুক আর কৌতূহল।

‘তুমি এই চেয়ারে বস, নমিতা বিদ্যাদিকে ধরে ওদের রং-চটা চেয়ারে বসাল। ‘মনে কর এটা আমাদের দ্বারভাঙা হলের স্টেজ। তুমি স্টেজে বসে আছো। আর আমি দূরে ওখানে পোডিয়ামে।’ নমিতা ঘরের কোণে গিয়ে দাঁড়ালো। ‘আমি এখন তোমার নমিতা না। আমি ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি ড. নমিতা স্যান্যাল। সামনে দর্শকের আসন সব ক’টা ভর্তি। আমি দর্শকদের সম্বোধন করছি। ওকে? নাটক শুরু।’ নমিতা কৃত্রিম একটা মাইক্রোফোন ধরার মতো ডান হাত মুঠো করে মুখের সামনে এনে বলল ‘মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর, প্রফেসরগণ, ছাত্র-ছাত্রীগণ, এবং দর্শকমণ্ডলী, বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে আজ এক ঐতিহাসিক দিন।’ নমিতা এক নজর বিদ্যাদির মুখের দিকে তাকাল। বিদ্যাদির মুখ দেখে মনে হলো বেশ উপভোগ করছে সে। নমিতা গম্ভীর গলায় বলল, ‘তিন দশক আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় একটি ঐতিহাসিক ভুল করেছিল। আজ আমরা সেই ভুল শোধরাবার প্রয়াস করছি। মঞ্চে আমার সঙ্গে আসনে উপবিষ্টা ম্যাডাম বিদ্যাধরী দাস, যিনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ এবং এমএ তে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। আমরা প্রায় সমসাময়িক, তাই আমি জানি এঁর বিদ্যায় চমৎকৃত হয়ে প্রফেসররা এঁকে সুকুমারী বলে ডাকতেন।’ নমিতা বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দর্শক হাততালি দিচ্ছে। তাই আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে সেই করতালির শব্দ উপভোগ করছি।’

‘তোর মাথা খারাপ আছে,’ বিদ্যাদি স্নেহের গলায় বলল।

নমিতা আবার হাত মুঠো করে মাইক বানিয়ে বলল, ‘ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে একটি ঘোষণা আছে। আজ থেকে একত্রিশ বছর আগে বেঙ্গল  ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ ম্যাডাম বিদ্যাধরী দাসকে অন্যায়ভাবে বিতাড়িত করেছিল। আমি আজ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে সেই অন্যায়ের জন্য অফিসিয়ালি ক্ষমা চাইছি।’ নমিতা এবার বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, আমরা আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলার ড. জয়ন্ত শিকদার আপনার অফিসিয়াল রাস্টিকেশন রিভোক লেটার সই করেছেন এবং চিঠিতে অফিসিয়ালি ক্ষমা চেয়েছেন। এটা আপনি প্লিজ গ্রহণ করুন।

বিদ্যাদির চোখের দৃষ্টিতে অপার বিস্ময়। এবার নমিতা অন্য খাম থেকে চিঠিটা বের করে বিদ্যাদির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপে ওর বুকের ভিতরে জমা অশ্রুর হিমবাহ গলে বুক হালকা হচ্ছে। প্রতি পদক্ষেপে ওর পাপের ভার কমছে। নমিতা বিদ্যাদিকে চিঠিটা দিল। বিদ্যাদির চোখে অবিশ্বাস। চিঠিটা পড়তে পড়তে বিদ্যাদির হাত কেঁপে উঠল। নমিতা বিদ্যাদির সামনে হাত জোড় করে বলল, ‘আর ম্যাম, আমাকে প্লিজ ক্ষমা করুন। একত্রিশ বছর আগে একজন ছাত্রীনেত্রী হয়েও আপনাকে রক্ষা করতে আমার অপারগতা আমাকে চিরকাল লজ্জা দিক।’ শেষের দিকের শব্দগুলো নমিতার গলার ভিতর পাকিয়ে হারিয়ে গেল। চোখের জল আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, নমিতা ঈশ্বরকে প্রণাম করার মতো দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালো। নমিতার বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে। বিদ্যাদি উঠে দাঁড়িয়ে নমিতাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। নমিতা চোখের জল মুছে বলল, ‘বিদ্যাদি, বত্রিশ বছর আগে তুমি যে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশন প্রপোজাল সাবমিট করেছিলে, আমার সৌভাগ্য যে আমি সেই থিসিস পড়েছি। আমি ড. নমিতা বিশ্বাস, বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি হিসেবে বলছি যে গত বত্রিশ বছরে এত পাওয়ারফুল গবেষণা আমি দেখিনি। তোমার গবেষণাকে আমাদের পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য এনরোল করে আমরা ঋদ্ধ। তোমার এই বরাহমিহির আর খনার তথ্য ভবিষ্যতের গবেষকদের অনেক কাজে আসবে।’ নমিতা চোখ মুছল। নমিতার খুব হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে বুক থেকে কয়েক হাজার মণ বোঝা কমে গেল। নমিতা অবাক হল—আশ্চর্য! সে এতগুলো বছর এত ভারি বোঝা বুকে নিয়ে কাটিয়েছে এটা সে নিজেই জানত না!

বাইরে টুং করে কলিং বেল বাজল। ধন্বন্তরি কবিরাজ বাজার থেকে মিষ্টি নিয়ে ফিরেছেন। এত বড় ঘটনায় তো মিষ্টিমুখ অবশ্যই হওয়া উচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *