বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫৫

।। পঞ্চান্ন।।

চিফ মিনিস্টারের অফিসে নমিতা আগে কখনো যায় নি, কিন্তু আজ এতটুকু নার্ভাস বোধ করছে না। নমিতার সঙ্গে বিদ্যাদি। ভিসি জয়ন্তদা বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। তিনজনে ভিতরে ঢুকল। বিশাল ঘর, বড় বড় জানলায় সাদা পর্দা, চিফ মিনিস্টারের চেয়ারের পিছনের দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথ আর সুভাষচন্দ্র বোসের ফটো। চিফ মিনিস্টার কিন্তু ওঁর ডেস্কে বসে নেই। উনি সোফায় বসে, পাশের সোফায় বসে শিক্ষামন্ত্রী।

চিফ মিনিস্টার আপ্যায়ন করে বসতে বললেন। নমিতা আর বিদ্যাদি জয়ন্তদার পাশে বসল। সিএম সোজাসুজি পয়েন্টে চলে এলেন—’

‘দেখুন, শাক্যদা আমাকে ব্রিফ করেছেন। আপনি শুরু করুন ড. স্যান্যাল। বলুন কী অ্যালিগেশন আছে ড. পৃথুযশ ভৌমিকের বিরুদ্ধে।’

নমিতা বলল, ‘ইনি হলেন বিদ্যাধরী দাস। ড. পৃথুযশ ভৌমিকের ব্যাচমেট। ইনি বিএ এবং এমএ দুটো পরীক্ষাতেই ফার্স্ট হয়েছিলেন। মিস দাসের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলারশিপের ডিসার্টেশন আর ড. পৃথুযশ ভৌমিকের পিএইচডির থিসিস আমি রিট্রিভ করে মিলিয়েছি। প্রথম দু’পাতা হুবহু এক। তারপর যা যা খনার বচনের উল্লেখ উনি করেছেন সেগুলো সব মিস দাসের থেকে নেওয়া। টেকনিক্যালি ওঁর পিএইচডি ডিগ্রীটা বাতিল করাই ইউনিভার্সিটির উচিত।’

চিফ মিনিস্টার প্রশান্ত মুখে বললেন, ‘আপনি যে অভিযোগগুলি এনেছেন, ধরে নিলাম সে অভিযোগগুলি সত্য। কিন্তু একটা কথা আমায় বলুন তো, ড. ভৌমিক যেরকম ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলেন শুনেছি তাতে ওঁর পিএইচডি ডিগ্রী পাবার জন্য কি অন্য কারোর পিএইচডি থিসিস থেকে টোকার দরকার পড়ে? আপনি তো ওনাদের কাছাকাছি সময়কার স্টুডেন্ট। আপনি বলুন দরকার পড়ে?’

‘না, দরকার পড়ে না। কিন্তু উনি এর ব্যাকগ্রাউন্ড আমাকে বলেছেন। তবে জানি না উনি কেন ওঁর পিএইচডি গাইডের এই জঘন্য প্রোপোজালে সম্মতি দিয়েছিলেন।

‘ড. স্যান্যাল, আপনি তো জানেন কিছু পিএইচডি গাইডদের ইগো এত বেশি থাকে যে ছাত্র-ছাত্রীরা ভয় পায় যে গাইডের কথা না মানলে তাদের কেরিয়ার শেষ। ড. ভৌমিকের গাইড ড. বক্সী ওঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পিএইচডি গাইডকে ড. ভৌমিক অমান্য করতে পারেন নি। কিন্তু ড. ভৌমিক জানতেন না যে এটা মিস দাসের ডিসার্টেশন থেকে টোকা। মিস দাসের সঙ্গে যা হয়েছে সেটা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। বিলিভ মি, আমি যদি পারতাম তে টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে গিয়ে সেই অন্যায়ের সংশোধন করে আসতাম। ড. বক্সীও আজ এই দুনিয়াতে নেই যে ওনার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেব। কিন্তু আই প্রমিস, আমরা যতটা সম্ভব ড্যামেজ কন্ট্রোল করব। ড. ভৌমিককে যেদিন ডি-লিট দেওয়া হবে সেদিন একসঙ্গে, মিস দাস, আপনার রাস্টিকেশন তুলে আপনাকে আবার পিএইচডি-তে এনরোল করার পারমিশন দেওয়া হবে। এগ্রিড?’

‘আর এতগুলো বছর যে উনি হারালেন তার কী হবে? আপনার বিচার একটা অন্যায়কে শাস্তি দিল না, স্যার।’ নমিতা বলল।

‘ড. স্যান্যাল, এ রাজ্যের জনগণ এটা জানে যে আমি সোজা-সাপ্টা কথা বলা পছন্দ করি। আমি যা প্রমিস করি আমি তা রাখি। আমার কাছে এই পরিস্থিতিতে এর চেয়ে আর ভালো কোনো সলিউশন নেই। আপনি হয়তো আমাকে বলতে পারেন যে আমি কেন ড. ভৌমিকের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় তার চেষ্টা

করছি? তার দুটো কারণ নাম্বার ওয়ান ব্যাপারটা জানাজানি হলে ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটি ইমিডিয়েটলি ওঁকে বের করে দেবে। প্লেজারিজমের ব্যাপারে ওদের জিরো টলারেন্স। আমাদের দেশের কেচ্ছাগুলোকে ওদের নিউজ এজেন্সিগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখায়। এরপর কোনো বাঙালির পক্ষে বিদেশি ইউনিভার্সিটিগুলোতে বড় আসন পাওয়া যথেষ্ট কঠিন এমন কী অলমোস্ট ইম্পসিবল হয়ে যাবে। আর দ্বিতীয় কারণটার সঙ্গে আমাদের বাংলার অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। আমেরিকান কোম্পানি অ্যামফার্মা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমাদের এখানে দুর্গাপুরে ওরা একটা বড় ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট বানাবে। এই গন্ধনাকুলীর ওষুধ এই বাংলাতে ওদের লাইসেন্সে বানাতে দেবে।’

‘সেটাও আরেকটা ফ্ৰড,’ নমিতা মন্তব্য করল।

চিফ মিনিস্টার বললেন, ‘ওকে, অল রাইট। ওয়ান স্টেপ অ্যাট এ টাইম। স্টেপ ওয়ান, আমরা মিস দাসকে পিএইচডিতে এনরোল করব আর অফিসিয়ালি ওঁর থেকে ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে ক্ষমা চাইব। স্টেপ টু, আমি এই পেটেন্ট যুদ্ধে মাথা গলাতে চাই না। আমার আরো হাজারটা সমস্যা মাথায় ঝুলছে। আপনারা আপনাদের মতো করে কোর্টে লড়ুন।’ চিফ মিনিস্টার ঘড়ি দেখলেন। ‘এ’বছর বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডি-লিট প্রোপজাল যাতে গভর্নর অ্যাপ্রুভ না করেন সেজন্য আমি গভর্নরের সঙ্গে কথা বলে নেব। আমি কোনো স্ক্যাম চাইব না। আর এই আপনার রেজিগনেশনের চিঠিটা, ড. স্যান্যাল। ভিসিকে আমিই বলেছি এটা অ্যাকসেপ্ট না করতে। আপনিই বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন। প্লিজ, আপনি তাড়াহুড়ো করে ড. ভৌমিকের বিরুদ্ধে কোনো এনকোয়ারি করবেন না। একটু সময় দিন ওঁকে, ড্যামেজ কন্ট্রোল করার একটা প্রোপোজাল উনি আনুন।’

‘ধন্যবাদ, স্যার,’ নমিতা চিঠিটা খামে ঢোকাল। ‘তবে আমি এই ডিসিশন বিদ্যাদির ওপর ছেড়ে দেব।’

‘ম্যাডাম,’ চিফ মিনিস্টার এবার বিদ্যাদির দিকে তাকালেন। ‘বলুন আপনার প্রতি যে এই অন্যায় হয়েছে, তার প্রতিকার হিসেবে কী হলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন?’

‘প্রতিকার,’ বিদ্যাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বিদ্যাদি বলল, ‘দিল্লিতে পার্লামেন্ট হাউসের আউটার সার্কুলার করিডরের দেওয়ালে বরাহমিহিরের পেইন্টিং শোভা পাচ্ছে। আমাদের বিধানসভা ভবনের দেওয়ালে কি আমরা খনার একটা ছবি রাখতে পারি না?’

‘খনার ছবি!’ চিফ মিনিস্টার বিস্ময়ে চোখ গোলগোল করে তাকালেন। ‘আপনি কী ধাতু দিয়ে তৈরি ম্যাডাম? আপনার ওপর যে অন্যায় হয়েছে তাতে আপনার গোটা জীবনের সম্মান, সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য সব শেষ করে দিয়েছে। কোথায় আপনি তার প্রতিকার চাইবেন, তা না আপনি চাইছেন খনার ছবি টাঙানো হোক বিধানসভায়?’

‘বাঙালি বিদুষী খনার ওপর যা অত্যাচার হয়েছে, সে তুলনায় স্যার, আমার ওপর করা অন্যায় খুবই ইনসিগনিফিকেন্ট। তাঁর ওপর অত্যাচারের জন্য অন্তত কেউ তো প্রতিবাদ করুক। বিধানসভায় ঢোকার সময় খনার পেইন্টিং সব সময় দেশনেতা বা দেশনেত্রীদের মনে করিয়ে দেবে যে যদি একজন বাঙালি নারীর উপর অত্যাচার করা হয় তবে সেই অত্যাচারকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাঙালি ভোলে না। বিদুষী নারীদের ওপর যুগে যুগে বিদ্বান পুরুষ যে অত্যাচার করে আসছে এ সেই অত্যাচারের এক সিম্বলিক ফলক। এটা কি কম?’

‘মোটেই কম না। আমরা সকল বাঙালিই খনার জন্য গর্বিত। মন্দ বলেননি কথাটা,’ চিফ মিনিস্টার কিছু ভাবতে ভাবতে একটু নড়ে চড়ে বসলেন। চিফ মিনিস্টারের মস্তিষ্ক কাজ করে চলেছে। ‘কিন্তু, খনাকে দেখতে কেমন ছিল তা তো আমরা জানি না—তাহলে তাঁর ছবি আঁকা হবে কীভাবে?’

‘বরাহমিহির কেমন দেখতে ছিল কেউ কি জানে? না। তাহলে? অদেখা বরাহমিহিরের পেইন্টিং পার্লামেন্ট হাউসে লাগিয়ে দিতে পারলে একই ভাবে খনার ছবি কেন লাগানো যেতে পারে না? ওটা তো সিম্বলিক

‘আমি নিশ্চয়ই ভেবে দেখব,’ চিফ মিনিস্টার বললেন। ‘বিদ্যাধরী দেবী, আপনার এই উচ্চ চিন্তা আমি অ্যাপ্রিশিয়েট করছি। আপনার এই সময়েও আপনি নিজের জন্য কিছু না চেয়ে অত্যাচারিত সমগ্র বাঙালি বিদুষীদের জন্য একটা ফলক লাগাবার কথা বলছেন। আজ আমার হাতে আর সময় নেই। পরে এ বিষয়ে নিশ্চয়ই কথা হবে।’ চিফ মিনিস্টার উঠে দাঁড়ালেন।

চিফ মিনিস্টারের অফিস থেকে বেরিয়ে হলওয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নমিতা বলল, ‘বিদ্যাদি, জানি না আমাদের সরকার তোমার এই অনুরোধ রাখবে কিনা। কিন্তু, আমি আমার ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টির অফিসে খনার একটা প্রতীকী ছবি অবশ্যই রাখব। আমার অফিসে খুব একটা কম মানুষ আসে না। তাদের অন্তত মনে করিয়ে দেবে যে গুপ্তযুগে আর্যদের যখন অত রমরমা তখন খনাই প্রথম বাঙালি বিদুষী যিনি বরাহমিহিরের মতো বিদ্বানের থেকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছিলেন।’ একটানা কথাগুলো বলে নমিতা থামল। নমিতার কথাগুলো একজন ডিপার্টমেন্টের ডিনের জিভ থেকে বেরোয় নি, বেরিয়েছে এক পুরোনো ছাত্রনেত্রীর বুক থেকে। সেই ব্যর্থ ছাত্রনেত্রী যার মনের ভাব মুখের রেখায় প্রকাশ পায়। কথাগুলো বলে নমিতার খুব হালকা লাগছে। নমিতা ভাবল কেন এত হালকা লাগছে? তাহলে কি খনার ওপর অত্যাচারের কাহিনি এতগুলো বছর তারও বুকের ভিতর কোনো এক গোপন স্থানে এক ক্ষত তৈরি করে রেখেছিল? তা সে নিজেই জানত না?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *