বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৫২

।। বাহান্ন।।

পৃথুযশ বেরিয়ে যাওয়ার পনেরো মিনিটও পার হয়নি, এবার ভিসির সেক্রেটারি শ্যামলীর ফোন–‘নমিতাদি, স্যার ফোন করেছিলেন। বললেন ইমিডিয়েটলি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে।’

‘আসছি এক্ষুনি,’ নমিতা অবাক এত জরুরী দরকার কী হল।

‘স্যার অফিসে নেই। তোমাকে নবান্নে যেতে বলেছেন।’

‘নবান্নে! এই রাত্তিরে! সব ঠিক আছে তো রে শ্যামলী?’

‘জানি না নমিতাদি। স্যার পড়িমরি করে ছুটলেন। রাস্তা থেকে ফোন করলেন। তোমাকে ইমিডিয়েটলি আসতে বললেন।’

‘কার অফিসে যাব নবান্নে?’

‘ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টারের অফিসে।’

‘ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্টার! ঠিক শুনেছিস? এডুকেশন মিনিস্টার না তো?’

‘না তরুবর সেনের নাম করে বললেন স্যার।’

নমিতা ক্ষিপ্রহস্তে পার্স গুছিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল। নবান্ন যাওয়ার পথে ওর সিক্সথ সেন্স বলতে লাগল যে পৃথুযশ কিছু একটা বড়সড় ঝামেলা পাকিয়েছে।

নমিতা নবান্নে অনেকবার এসেছে, কিন্তু সে সব এডুকেশন ডিপার্টমেন্টে। ইন্ডাস্ট্রি মিনিস্ট্রিতে এই প্রথমবার। মিনিস্টারের অফিসের বাইরে ওয়েটিং এরিয়ায় সোফায় উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছেন ভিসি। নমিতা পাশে গিয়ে বসল। নীচু গলায় বলল, ‘কী হয়েছে জয়ন্তদা?’

‘জানি না। আমাকে ফোনে অলরেডি প্রচুর ঝাড় দিয়েছে। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেছে। মিনিস্টার খুব রাগী লোক। চুপচাপ শুনে যেও। যা বলার আমিই বলব।’

পাঁচ মিনিটও অপেক্ষা করতে হল না, মন্ত্রীর পিএ কামরার বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, ‘আপনারা ভিতরে যেতে পারেন।’

নমিতা দুরুদুরু বুকে ঢুকল। মন্ত্রী গম্ভীর। একটা ফাইলে চোখ রেখে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বসতে বলল। তারপর মন্ত্রী পাঁচ মিনিট ফাইল থেকে চোখ সরালো না। ছাত্রজীবনে যখন রাজনীতি করত তখন নমিতা এরকম নাটক অনেক দেখেছে। তাই খুব একটা চমকাল না। ওর মনে ঘুরছে শুধু পৃথুযশের এত বড় হাত?

মন্ত্রী এবার গলা খাঁকারি দিয়ে মুখ তুলে বলল, ‘আপনাদের মধ্যে কে রিজাইন করবেন?’

ভিসি একটু বিব্রতমুখে মুখের হাসি বজায় রেখে বললেন, ‘আমাদের কি কোনো ভুল হয়েছে স্যার?’

‘আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। আরেকবার প্রশ্নটা করতে হবে? ঠিক আছে, করছি, আপনাদের মধ্যে কে রিজাইন করবেন?’

‘কোন গ্রাউন্ডে রেজিগনেশন সেটা যদি কাইন্ডলি বুঝিয়ে বলেন স্যার—’

‘ওয়েস্ট বেঙ্গলে বাইরে থেকে শিল্প আসে না কেন জানেন?’

‘আজ্ঞে ইনভেস্টররা এখানে পয়সা লাগাতে চায় না।’

‘কেন?’

‘ভয় পায় কথাটা বলা উচিত হবে না, তবে ব্যাপারটা তাই।’

‘আর এই পরিস্থিতিতে একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি যারা কিনা পঞ্চাশ কোটি টাকার একটা কেমিক্যাল প্ল্যান্ট দুর্গাপুরে লাগাবার জন্য মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং সই করতে কালকে সিএম এর অফিসে আসছিল, তারা এখন শুধু আপনাদের জন্য ব্যাক আউট করে সেই মৌ সাইন করতে চাইছে না। শুধু এই অপরাধে আপনাদের রিজাইন করার অনুরোধ করা কি অন্যায়?’

‘কেন চাইছে না স্যার?’

‘সেটা ইনি ভাল জানেন।’ এবার মন্ত্রী কড়া চোখে তাকাল নমিতার দিকে—‘আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন হয়ে সাপের পাঁচ পা দেখেছেন?’ তারপর একটা রাইটিং প্যাড নমিতার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘সাপের ফনা কিন্তু এখনো দেখেননি। এক্ষুনি আপনি রিজাইন করুন। নতুবা আপনাকে ঘাড় ধাক্কা মেরে বের করে দেব ইউনিভার্সিটি থেকে। আর আপনি, মিস্টার ভাইস চ্যান্সেলার,’ এবার ভিসির দিকে কড়া চোখে তাকালো মন্ত্রী—‘আপনি এই মুহূর্তে রেজিগনেশন অ্যাক্সেপ্ট করে নতুন ডিন অ্যাপয়েন্ট করুন। আর তা যদি না চান, তাহলে আপনি রিজাইন করুন।’

নমিতার মাথার ভিতর একটা ভূমিকম্প হয়ে গেল। এই অসভ্যতায় রাগে মাথার তালু জ্বলতে লাগল। তবু নম্র গলায় সে বলল, ‘ঠিক আছে, এর মধ্যে স্যারের কোনো দোষ নেই। স্যারকে ইনভলভ করা সমীচীন নয়। আমি কাল সকালে রেজিগনেশন লেটার টাইপ করে পাঠিয়ে দেব,’ নমিতা উঠে দাঁড়াল।

‘নাউ!’ মন্ত্ৰী চেঁচিয়ে উঠল। ‘সিট ডাউন!’ তারপর মন্ত্রী টেবিলের ঘন্টায় জোরে তালু ঠুকল। দরজায় নক করে মন্ত্রীর পিএ এসে একটা চিঠি দিয়ে গেল।

মন্ত্রী চিঠিটা তাচ্ছিল্য ভরে নমিতার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘সাইন! আর মিস্টার ভাইস চ্যান্সেলর, আপনি নেক্সট থ্রি মান্থস কোনো এনকোয়ারি ইনিশিয়েট করবেন না। যদি করেন মন্ত্রী কথাটা উহ্য রাখলেন।

নমিতা চিঠিটা পড়ল। শারীরিক অসুস্থতার জন্য নমিতা বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির চাকরি থেকে রিজাইন করার দরখাস্ত দিচ্ছে এবং অনুরোধ জানাচ্ছে তার দরখাস্ত অ্যাকসেপ্ট করা হোক। নমিতা দু’চোখ বুজলো। কত বছরের সাধনা, উদ্যোগ, ঘাম, অধ্যবসায় এই চাকরির পিছনে আছে। কী অন্যায় করা হচ্ছে ওর সঙ্গে! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যাদির মুখটা মনে পড়ল। বিদ্যাদির সঙ্গে যা অন্যায় করা হয়েছে তার কাছে এই অন্যায় কিছুই না। নমিতা চিঠির নীচে খসখস করে সই করে দিল।

মন্ত্রী কাগজটা ভালোভাবে দেখে ব্যঙ্গের সুরে বলল, ‘কনগ্র্যাচুলেশনস! ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’র আগের দিন আপনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হয়ে গেলেন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য ফেভার। খুব উপকার করলেন আমার। ইন রিটার্ন আপনার জন্য একটা চাকরি আমি জোগাড় করে দেব। ভিজিটিং প্রফেসর- শোভাবাজার- আহিরীটোলা স্টেশনে। হেড অব দ্য বেগার ডিপার্টমেন্ট।’

নমিতার রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলছিল। তবু হেসে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর অ্যাডভাইস, স্যার। আমি তাই-ই করব। ওই প্ল্যাটফর্মে আছেন একজন আহত বেজি, যিনি সর্পগন্ধার শিকড় তিরিশ বছর ধরে গায়ে লাগিয়ে রেখেছেন। অ্যামফার্মার সাপের ছোবলে তাঁর আর কোনো ক্ষতি হবে না। সেই বেজির সঙ্গে আমি হাত মিলিয়ে আমরা একসঙ্গে আপনার অ্যামফার্মাকে সাপ-বেজির লড়াইতে হারাব। জীবনটা বড্ড সাদামাটা হয়ে গেছিল স্যার। আপনি ঘুমিয়ে থাকা ছাত্র জীবনের লড়াকু নেত্রী নমিতা স্যান্যালকে আবার জাগিয়ে দিলেন। নমিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে মন্ত্রীর অফিস ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *