বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬৮

।। আটষট্টি।।

সকাল দশটা বাজতে পাঁচ। দ্বিতীয় দিনের ট্রায়াল একটু পরেই শুরু হবে। বিচারপতি এখনও আসন গ্রহণ করেননি। নমিতা দেখছে মিস বসাক বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছেন—বিদ্যাদি পৌঁছালে দময়ন্তী জানিয়ে যাবে। তার মানে এখনও এসে পৌঁছায় নি। আহুজা মিস বসাকের টেনশন বুঝতে পেরে গেছে। সাক্ষী এখনও আসেনি। আহুজার মুখে চাপা হাসি।

বিচারপতি এবার কোর্টরুমে ঢুকে আসন গ্রহণ করলেন। নিজের ডেস্কে কয়েকটা কাগজ দেখে তিনি মাথা তুলে তাকালেন। এমন সময় নমিতা মিস বসাকের চোখে খুশির আলো দেখল। নমিতা পিছন ফিরে দেখল দময়ন্তী কোর্টরুমের দরজায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। বাড়িতে খুব অসুস্থ শয্যাশায়ী রোগী যখন দেখে ডাক্তারবাবু তার চিকিৎসার জন্য তার ঘরে এসেছেন তখন রোগীর মনের যা অবস্থা হয়, নমিতার এখন মনের অবস্থা তাই। বিদ্যাদি এসে গেছে!

জাজ পরবর্তী সাক্ষীকে আনার জন্য মিস বসাককে অনুমতি দিলেন। বিদ্যাদি কোর্টরুমে ঢুকল। মাধবী বসাক হাত তুলে বিদ্যাদিকে ইশারা করলেন। বিদ্যাদি এবার সোজা সাক্ষীর আসনের দিকে এগিয়ে গেল। বিদ্যাদির কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ। বিদ্যাদি খুব শান্ত। যেন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা হলে ঢুকছে। সেদিনের সেই ডিবেটের মতো দৃপ্ত পদক্ষেপ তার নেই, তবু নমিতা জানে এই লড়াকু মহিলা বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী ছাড়বে না। এ দাঁতে দাঁত চেপে লড়বে। অ্যামফার্মার টিমে আজ পৃথুযশ আসেনি। তথাগতের সাক্ষ্য শেষ তাই ও বসে আছে ড. জোনসের পাশে। কোর্টের বিচারকার্য শুরু হল। বিদ্যাদি সত্যকথনের শপথ নিল। তারপর বিদ্যাদি সাক্ষীর আসনে বসে একবার তথাগতের চোখের দিকে তাকাল। তথাগত চোখ নামিয়ে নিল। বিদ্যাদি অভ্যাসবশত শাড়ির আঁচল দিয়ে চিবুকে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে একটা বড় শ্বাস নিয়ে প্রস্তুত হল প্রশ্নোত্তরের লড়াই এর জন্য।

মাধবী বসাক শুরু করলেন, ‘আপনার নাম?’

‘বিদ্যাধরী দাস।’

‘মিস দাস, ‘বেহুলার খনা’ বইটার ম্যানুস্ক্রিপ্ট কি গগন হকারকে আপনি দিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওটার ম্যানুস্ক্রিপ্ট কি আপনি লিখেছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ওই কাহিনির সম্বন্ধে কোনো পুঁথি আছে কি?’

‘আমি দেখিনি।’

‘তাহলে আপনি এই গল্প কোথা থেকে পেলেন?’

‘এগুলো গ্রাম বাংলার উপকথা। আমার মা এই গল্পটা আমাদের রোজ রাত্তিরে শুতে যাওয়ার সময় বলতেন।’

‘এই ম্যানুস্ক্রিপ্টে যে খনাবাক্য আছে সে খনাবাক্য আপনি কবে প্রথম লিখেছিলেন?’

‘বত্রিশ বছর আগে।

‘তার কি কোনো এভিডেন্স আছে?’

‘হ্যাঁ আমার এই প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলারশিপের ডিসার্টেশনে সব লেখা আছে।’ বিদ্যাদি ঝোলা থেকে ডিসার্টেশনের ফাইলটা বের করল।

‘আমার কাছে কপি আছে এর,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘ইয়োর অনার, এই ডিসার্টেশনের দুটো পৃষ্ঠা আমি একজিবিট এইট হিসেবে সাবমিট করার অনুমতি চাইছি। যদি আমার অপোজিং কাউন্সিলের আপত্তি না থাকে।’ মিস বসাক দুটো পৃষ্ঠা আহুজার কাছে এগিয়ে এসে আহুজাকে দিলেন। ‘প্রথম পৃষ্ঠাতে বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রারের সই এবং বত্রিশ বছর আগেকার তারিখের স্ট্যাম্প আছে। আর দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় খনার বচনের ‘বড় চাঁদা ছোট চাঁদা’র উল্লেখ আছে।’

আহুজা কাগজ দুটো ভালোভাবে দেখে বলল, ‘নো অবজেকশন।’

‘একজিবিট এইট ইজ অ্যাডমিটেড,’ জাজ বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মিস বসাক ডিসার্টেশনের কপি কোর্ট ক্লার্কের কাছে জমা দিল। তারপর মিস বসাক বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, মিস দাস, এটা কি সত্যি আপনাদের বাড়িতে আপনাদের পূর্বপুরুষদের অনেক আয়ুর্বেদের তথ্য ছিল যা আপনার দাদা ধন্বন্তরি কবিরাজ আপনাকে এবং ওঁর পুত্র ড. তথাগত দাসকে শিখিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ একথা সত্যি।’

‘কী ধরনের তথ্য একটু প্লিজ ব্যাখ্যা করবেন?’

‘আয়ুর্বেদের দ্রব্যগুণ ও চিকিৎসাবিধি উনি শিখিয়েছিলেন। রাজভট্টের অষ্টাঙ্গহৃদয় সংহিতা, চক্রদত্ত-সংগ্রহ, শাঙ্গধর-সংগ্রহ, ভাবমিশ্রের ভাবপ্রকাশ, মদনপালের রাজনিঘন্টু, মাধবকরের নিদান, অথর্ববেদ, চরক সংহিতা, সুশ্ৰুত সংহিতা, অষ্টাঙ্গহৃদয় আরো কত কী।’

‘তার মধ্যে কি সর্পগন্ধা গন্ধনাকুলীর জ্ঞান ছিল?’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল।

‘ওভাররুলড।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘মিস দাস, আপনার দাদা আপনাকে এবং ওঁর ছেলে তথাগত দাসকে যা শিখিয়েছিলেন তার মধ্যে কি সর্পগন্ধা গন্ধনাকুলীর জ্ঞান ছিল?’

‘হ্যাঁ ছিল।’

‘আপনার দাদা ধন্বন্তরি কবিরাজ কাল কোর্টে একটা সংস্কৃত শ্লোক বলছিলেন সর্পগন্ধা গন্ধনাকুলী প্ল্যান্টের সম্বন্ধে। উনি বলেছিলেন এটা উনি আপনাদের শিখিয়েছেন। আপনার কি মনে আছে গন্ধনাকুলীর শ্লোকটা?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি কি এটা কোর্টে একবার বলবেন?’

‘হ্যাঁ, বিদ্যাদি একটা শ্বাস নিল, তারপর ধীরে ধীরে বলল

‘নাকুলী সুরসা নাগসুগন্ধা গন্ধনাকুলী
নকুলেষ্ঠা ভুজঙ্গাক্ষী সম্পাক্ষী বিষনাশিনী।
নাকুলী তুবরা তিক্তা কটুকোষ্ণা বিনাশয়েত।
ভোগিলূতাবৃশ্চিকাখুবিষজ্বরকৃমিব্রণান্।’

‘এটা কী কোথাও লেখা আছে?’

‘হ্যাঁ, শ্রীভাবমিশ্রের ষোলশো সালে লেখা ভাবপ্রকাশ নিঘন্টুর শ্লোক এটা।’

‘এই শ্লোকের অর্থ কী?’

‘সর্পগন্ধার অন্য নাম হল নাকুলী, সুরসা, নাগসুগন্ধা, গন্ধনাকুলী, নকুলেষ্ঠা, ভুজঙ্গাক্ষী, সর্পাক্ষী এবং বিষনাশিনী। ইহা তিক্ত, কটু, কষায় এবং ইহা সৰ্প, মাকড়সা, বিছা, কৃমি ইত্যাদির বিষহরণ করে।

‘অনেক প্রাচীন কাল থেকেই তাহলে এই জ্ঞান আমাদের দেশে আছে?’

‘আমাদের দেশে প্রাচীন কালে চরক নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন, তিনি সর্পগন্ধা সম্বন্ধে অনেক কিছু লিখেছিলেন। এসব দাদা আমাকে আর বাবলুকে মানে তথাগতকে অনেক কাল আগেই শিখিয়েছেন।’

‘ধন্যবাদ, মিস দাস, মিস বসাক বললেন। ‘আমি আপনাকে আর কোনো প্রশ্ন করব না।’

জাজ এবার আহুজাকে বললেন, ‘মিস্টার আহুজা, আপনি উইটনেসকে ক্রশ কোয়েশ্চেন করতে চান?’

‘ইয়েস ইয়োর অনার,’ সমীর আহুজা টাই একটু টাইট করে উঠে দাঁড়িয়ে শুরু করল, ‘মিস দাস, আপনাকে খনার এক্সপার্ট হিসেবে এখানে আনা হয়েছে। আপনার কি পিএইচডি ডিগ্রী আছে?’

‘না।’

‘শুনলাম আপনি বিএ এবং এমএ তে প্রথম হয়েছিলেন, তাহলে আপনি পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য চেষ্টা করেননি কেন?’

‘অবজেকশন, ইয়োর অনার। পার্সোনাল প্রশ্ন,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘অবজেকশন সাসটেইন্ড।’

‘অল রাইট, ‘বেহুলার খনা’ নামে বইটা যাতে এই কন্ট্রোভার্সিয়াল খনার বচনটা আছে যা ট্রেনের হকার গগন ঢালির বইতে পাওয়া গেছে সেটা কি আপনি ওকে লিখে দিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি বলছেন ‘বেহুলার খনা’ পুঁথিটা কোথায় আছে আপনি জানেন না?’

‘আমি জানি না।’

‘আপনি জানেন না, তাহলে আপনি কাহিনিটা জানলেন কীভাবে?’

‘আমার ছোটবেলায় মা এই কাহিনিটা বলেছিল। এটা একটা পারিবারিক উপকথা। আমার মাকে তাঁর মা বলেছিলেন, তাঁর মাকে তাঁর মা—’

‘বেহুলার পুঁথিতে খনার বচন লেখা ছিল?’

‘হ্যাঁ।’

‘শুধু এই একটা?’

‘না আরো অনেক বচন লেখা ছিল।’

‘কীভাবে বুঝছেন ওগুলো খনার বচন?’

‘ঠিক বুঝলাম না।’

‘বেহুলার পুঁথিতে লেখা ছিল যে এগুলো খনার বচন, তার মানেই আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে ওগুলো খনার বচন?’

‘তার মানে?’

‘বেহুলা তো অনেক কিছু আজগুবি জিনিস লিখে গেছেন। ওনার সাইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স নিয়েই আমার সন্দেহ আছে—’

‘মানে?’

‘আপনার কি মনে হয় না যে বেহুলা সাইকোলজিক্যালি আনব্যালান্সড ছিলেন?’

‘না, একদমই মনে হয় না।’

‘কীভাবে আপনি এত জোর দিয়ে বলছেন? আপনি কি সাইকোলজিস্ট?’

‘না।’

‘আপনার নিজের অতীতে কি সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট নিতে হয়েছিল?’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক এবার গর্জে উঠলেন ‘ম্যালিশিয়াস ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন অ্যাটেম্পট।’

‘অবজেকশন সাসটেইন্ড।’

আহুজা এবার কুটিল হাসি হাসল। তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, ‘অল রাইট, আমি প্রমাণ করে দিচ্ছি যে বেহুলা সাইকোলজিক্যালি আনব্যালান্সড ছিল। বেহুলা বলেছে ডিঙাডুবি বা ডিঙিবাদল গ্রামে ডিঙির বৃষ্টি হয়েছিল। ডিঙির বৃষ্টি মানে রেইন অব বোটস। এটা কি আপনি মানতে পারেন, মিস দাস?’

বিদ্যাদি চুপ।

‘এটা মানলে কাউ জাম্পস ওভার দ্য মুন ও সত্যি বলে মানতে হয়। তাই না মিস দাস?’

বিদ্যাদি নিরুত্তর। শাড়ির আঁচল দিয়ে চিবুক মুছল। নমিতা দেখেছে আজকাল বিদ্যাদি নার্ভাস হলে এটা তার প্রথম লক্ষণ। নমিতা জানে মাধবী বসাক এই ভয়টাই পেয়েছিল। আহুজা জানে কেসের পেইন পয়েন্টটা কোথায়। বক্সার বক্সিং করতে গিয়ে যখন দেখে প্রতিদ্বন্দ্বীর নাক ভেঙে রক্ত ঝরছে তখন সে বারবার সেই ব্যথার জায়গাতেই নির্মম ভাবে আঘাত করে। আহুজাও নির্মম, বিদ্যাদির সাইকোলজিকাল ব্যালেন্স নিয়ে টানাটানি করছে। ও এবার বারবার ওখানে আঘাত করবে।

‘তাহলে আপনার মতে আকাশ থেকে ডিঙির বৃষ্টি হওয়া সম্ভব?’

‘শুধু সম্ভব কেন? ডিঙির বৃষ্টি হয়েছিল।’

‘রিয়্যালি?’ আহুজার চোখে কৌতুক। ‘আমাদের একটু বলবেন কবে কীভাবে কোথায় হয়েছিল?’

নমিতা বুঝল আহুজা এবার বুলি করা শুরু করেছে, ধীরে ধীরে চরম হেনস্থা করবে বিদ্যাদিকে, আর কেসটার ছড়ানো সুতো গুটিয়ে গুটিয়ে কেসটাকে ধীরে ধীরে হাতের মুঠোয় নিয়ে যাবে।

অ্যাডভোকেট মাধবী বসাকও বোধহয় একই কথা বুঝলেন। তাই বলল, ‘অবজেকশন ইয়োর ‘ওভাররুলড।’

‘থ্যাঙ্ক ইয়ু, ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল। তারপর বিদ্যাদির দিকে শ্লেষের স্বরে বলল, ‘মিস দাস, আপনি কখনো ডিঙি বৃষ্টি দেখেছেন?’

‘না।’

‘বেহুলার খনা’ বই বাদ দিয়ে আর কোনো বইতে ডিঙিবৃষ্টি কথাটা লেখা দেখেছেন?’

‘না।’

‘আচ্ছা ‘বেহুলার খনা’ বইতে যে ডিঙিবৃষ্টির কথা লেখা, সেই ডিঙিবৃষ্টি কবে হয়েছিল বলুন তো?’

নমিতা মিস বসাকের দিকে তাকাল। মিস বসাকের চোখ সামনের ডেস্কে রাখা হলুদ লিগ্যাল প্যাডে। নমিতা বেশ বুঝতে পারছে যে মিস বসাক একদম বেকায়দায়। তাঁর আর কিছুই করার নেই। আহুজার হাতের তালু এখন বিদ্যাদির কণ্ঠনালী স্পর্শ করেছে। এবার আহুজা ধীরে ধীরে সাঁড়াশির চাপ বাড়াবে।

বিদ্যাদি নিরুত্তর। নমিতা দু’চোখ বন্ধ করে ফেলল।

‘মিস দাস, আপনি বোধহয় আমার প্রশ্ন শুনতে পাননি,’ আহুজা বলল। ‘বে হুলার খনা’ অনুযায়ী ডিঙিবৃষ্টি কবে হয়েছিল?’ আহুজার মুখে কুটিল হাসি।

নমিতা অসহায় বোধ করতে লাগল। নমিতা হতাশায় চোখ বুজল। ‘সেভেনটিন থার্টি সেভেনে।’

মিস বসাক আর নমিতা চমকে গেল। আহুজার দৃষ্টিতে বিস্ময়।

‘রিয়্যালি?’ আহুজা নিজেকে সামলে শ্লেষের স্বরে বলল। ‘আর ইউ শিওর?’

‘ইয়েস স্যার।’

‘কোথায় সেটা লেখা আছে?’

‘বেহুলার খনা’ বইতে লেখা আছে বুধন যে বছর মোগল দারোগা সিরাজ- উদ-দীন মোহাম্মদের তাঁতখানা থেকে পালিয়ে এসেছিল, সে বছরে ডিঙিবৃষ্টি হয়েছিল।’

‘বুধন কত সালে পালিয়েছিল তা কি লেখা আছে?’

‘একটা ঘটনার সম্বন্ধে লেখা একটা ডকুমেন্ট আমি দেখাচ্ছি।’ বিদ্যাদি এবার ওঁর শান্তিনিকেতনী ঝোলা থেকে একটা ফোল্ডার আর একটা বই বের করল। বই এর মার্ক করা একটা পৃষ্ঠা দেখাল ‘এটা কিন্তু ইতিহাস বই। এখানে লেখা আছে –’ বিদ্যাদি পড়ল। ‘ তাঁতখানার দারোগা হিসেবে তাঁরা বিদেশি বণিক কোম্পানি ও অন্যান্য বড় বড় ব্যবসায়ীর নিকট থেকে সালামি বা নজর আদায় করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা তাঁতখানার দারোগা সিরাজ-উদ-দীন মোহাম্মদকে মোট ৭২৬.২৫ মূল্যের মূল্যবান দ্রব্যাদি উপহার দেন।’ তারপর বিদ্যাদি বলল, ‘তার মানে সালটা সেভেন্টিন থার্টি সেভেন।’

‘তার মানে সেভেন্টিন থার্টি সেভেনে ডিঙিবৃষ্টি হয়েছিল?’ আহুজার কণ্ঠে এখনও শেষ।

‘হ্যাঁ।’

‘আকাশ থেকে অজস্র ডিঙি বৃষ্টির মতো নেমে আসছে এটা কি মানা সম্ভব?’

‘তিতলি ঘূর্ণিঝড়ে যেমন নদী থেকে নৌকা উড়ে উড়ে ডাঙায় এসে আছড়ে পড়েছিল, তার চেয়েও অনেক গুণ ভয়াবহ ছিল এই সাইক্লোন। অতীতে বেহুলার সময় বাংলায় আছড়ে পড়েছিল। সেই সাইক্লোনে বিদ্যাধরী নদী থেকে অনেক নৌকা উড়ে এসে আছড়ে পড়েছিল ডিঙাডুবি গ্রামে। অনেক লোক মরে গেছিল। সেটাই ডিঙিবৃষ্টি।’

‘ওরে বাবা। আপনি সেটা কীভাবে দেখলেন? স্বপ্নে?’

বিদ্যাদি সিরিয়াস। আহুজার একটা শ্লেষও গায়ে মাখছে না। ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘সেভেনটিন থার্টি সেভেনে এক ডিভাস্টেটিং সাইক্লোন কলকাতার ওপর দিয়ে উড়ে গেছিল।’

‘কতটা ডিভাস্টেশন যে ডিঙিবৃষ্টি হতে পারে?’

‘এটা বাংলার ওপর দিয়ে আজ পর্যন্ত যত সাইক্লোন গেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক। সেই ঘূর্ণিঝড় হুগলি নদী থেকে অনেক নৌকাকে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে এদিক ওদিক আছড়ে ফেলেছিল। অন্তত দুটো ভারি পাঁচশ’ টনের জাহাজকে হুগলি নদীর থেকে পুব দিকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।’

‘অতবড় জাহাজকে হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যায়!’ আহুজার মুখে চাপা হাসি।

‘হ্যাঁ, উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কাছাকাছি একটা গ্রামে আছড়ে ফেলে। জাহাজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং প্রায় তিরিশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল—ঘর-বাড়ি সব ভেঙে চুরমার। সেই ঝড়ে এত বৃষ্টি হয়েছিল যে হুগলি নদীর জল তিরিশ থেকে চল্লিশ ফুট বেড়ে গিয়ে বন্যায় শহর ভাসিয়ে দিয়েছিল। এটাই সেই ডিঙিবৃষ্টি।’

মাধবী বসাক এবার নড়েচড়ে বসলেন।

‘রিয়্যালি? এসব আপনাকে কে বলল? বেহুলা?’ আহুজার প্রশ্নে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ।

বিদ্যাদি শান্ত, স্থির। ব্যাগ থেকে বের করা ফোল্ডার থেকে আর একটা কাগজ বের করে বলল, ‘এই আর্টিকেলটার নাম A Contemporary Account of the Great Storm at Calcutta in 1737. By C. R. WILSON, M.A., Indian Education Department’

‘ওখানে ডিঙিবৃষ্টি লেখা আছে?’ আহুজার কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস।

‘আমি পড়ছি,’ বিদ্যাদি বলল। ‘এখানে লিখেছে যে ১৭৩৭ সালের ১১ই অক্টোবর রাতে, গঙ্গার মুখে একটি প্রচণ্ড হারিকেন আছড়ে পড়ে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল। আর একই সময়ে একটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প হয়েছিল, যা কলকাতার প্রায় দুশো বাড়ি আর ইংরেজদের বন্দর ভেঙে ফেলেছিল। ইংরেজদের সেন্ট অ্যান চার্চের উঁচু ও বিশাল খাড়া চূড়া মাটিতে ভেঙ্গে পড়ে। গণনা করা হয়েছে যে বিশ হাজার জাহাজ, বার্ক, স্লপ, নৌকা, ক্যানো ইত্যাদি ধ্বংস হয়ে গেছিল। তখন নয়টি ইংরেজ জাহাজ গঙ্গায় ছিল যার আটটি নিখোঁজ হয়ে গেছিল এবং জাহাজের বেশিরভাগ নাবিকের সলিলসমাধি ঘটে। ষাট টন ওজনের বার্জ ছয় মাইল উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে আছড়ে ফেলে। প্রায় তিন লাখ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়। নদীতে চারটি ডাচ জাহাজের মধ্যে তিনটি তাদের লোক ও কার্গোসহ হারিয়ে গেছে। এই ঝড় তার যাত্রাপথে আশেপাশের নদী থেকে অজস্র নৌকা আকশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কাছাকাছি গ্রামগুলিতে বৃষ্টিপাতের মতো আছড়ে ফেলে। গঙ্গায় স্বাভাবিকের চেয়ে চল্লিশ ফুট জল বেড়ে গেছিল। প্রচুর পরিমাণে গবাদি পশু ডুবে গেছিল; এমনকী ঝড়ের কবলে পড়ে অসংখ্য পাখি নদীতে পড়ে গেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই ডকুমেন্টে আরো লেখা আছে যে ১১ই অক্টোবরের সেই সাইক্লোন দুশো মাইল স্থলভাগের অভ্যন্তরে ঢুকে যাত্রা পথে অজস্র ক্ষয়ক্ষতি করে, নদীতে প্রচুর নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে গেছে। এটাই বেহুলার লেখা সেই ডিঙিবৃষ্টি।’

‘কিন্তু তাহলে এই সো কলড ডিঙিবৃষ্টি হয়েছিল এক্সাক্টলি কোথায়?’

‘এই সাইক্লোন তার যাত্রাপথে অনেক জায়গাতেই এই ডিঙিবৃষ্টি ঘটিয়ে যায়। সব জায়গার কথা ডকুমেন্ট করা নেই। পুরোনো কলকাতার একটা আনুমানিক ম্যাপ আছে,’ বিদ্যাদি এবার ফাইল থেকে একটা ম্যাপ বের করল। ‘এই যে এই ম্যাপের মাঝামাঝি একটা ক্রীক দেখা যাচ্ছে। এখানে ডিঙিবৃষ্টি হয়েছিল।’ বিদ্যাদি ম্যাপটা দু’হাতে ধরে উঁচু করে দেখাল।

‘এটা ১৬৮০ সালের কলকাতার আনুমানিক ম্যাপ। এই যে হুগলি নদীর পুব পাড়ে উত্তরে সুতানুটী, মাঝে কলকাতা আর দক্ষিণে গোবিন্দপুর গ্রাম। গোবিন্দপুরের পর আদিগঙ্গা কালীঘাট হয়ে সমুদ্রের দিকে চলে গেছে। আর এই যে একটা ক্রীক হুগলি থেকে বেরিয়ে পুবে চলে গেছে। এটা কিন্তু খাল না। এটা হল হুগলি বা ভাগীরথীর শাখানদী বা খাঁড়ি বা খাত। সেদিনের সেই বিধ্বংসী ঝড়ে অনেক ‘ডিঙা’ উড়ে উড়ে এসে এই ক্রীকের দু’পাড়ে আছড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছিল। আর তাই এই ক্রীকের এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল ডিঙাভাঙা। আজকের কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ার বা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের পূর্ব দিক থেকে সার্কুলার রোড বা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্ৰ স্ট্রিট পর্যন্ত চলে যাওয়া এই রাস্তাটির আশপাশের অঞ্চলটাই ছিল সেকালের ডিঙাভাঙা। ধীরে ধীরে এই শাখানদীটা মজে হেজে গেল। সেই মজা নদীর বুকের উপর দিয়ে তৈরি হল চলাচলের পথ। ইংরেজরা সেই পথের ইতিহাসকে স্মরণ করে ‘ডিঙাভাঙা’র সেই রাস্তার নাম রাখল ক্রীক রো। তাই ডিঙাভাঙা অঞ্চলটাই হারিয়ে গেল ইতিহাসের অতল তলে। অবশ্য এখনো যদি আপনি যেতে চান, আপনি ওখানে ডিঙাভাঙা লেন পাবেন।’

নমিতার চোখ-মুখে খুশির রঙমশাল। নমিতা মনে মনে বলল ‘দিদি! তোমার পায়ের ধুলো মাথায় রেখে দিই।’

‘কিন্তু এই ক্রীকটা বেমালুম হারিয়ে গেল? তাই কখনো হয়?’

‘এই ক্রীকের উপরটা হারিয়ে গেল, কিন্তু নীচটা ভূগর্ভে রয়ে গেল।’

‘মানে?’

‘রিসেন্টলি শুনছি যে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর একটা টানেল-বোরিং মেশিন কয়েকটি ভূগর্ভস্থ জলস্তরে আঘাত করেছে। উপরের লেয়ারে রাস্তা হলেও নীচের জলস্তর এখনো ক্রীকের ইতিহাস বহন করে চলেছে। ইভান কটনের ‘ক্যালকাটা, ওল্ড অ্যান্ড নিউ; আ হিস্টোরিকাল অ্যান্ড ডেস্ক্রিপটিভ হ্যান্ডবুক টু দ্য সিটি’ নাড়াচাড়া করলে আপনি এই ক্রীকের ইতিহাস জানতে পারবেন।

আহুজার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ও ভুল করে সজারুর বাচ্চা গিলে ফেলেছে। ও মনস্তাপ করছে যে বিদ্যাদিকে ঘাঁটানো একদম উচিত হয়নি। কিন্তু আহুজা পাকা উকিল তাই সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, ‘আচ্ছা ধরা যাক আমি মেনে নিলাম যে কলকাতার ক্রীকে সেই সাইক্লোন সো-কলড ডিঙির বৃষ্টি ঘটিয়েছিল। কিন্তু ডিঙিবাদল গ্রাম সেই ক্রীক না। বেহুলা বলেছে যে ডিঙিবাদল থেকে কলকাতা নদীপথে আসতে হতো। কলকাতার সাইক্লোন কীভাবে ডিঙিবাদল গ্রামে গিয়ে ডিঙির বৃষ্টি ঘটাবে?’

‘সেই সাইক্লোন ডিঙিবাদল গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছিল। সাইক্লোনের পথ অনুসন্ধান করলে সেটা বোঝা যাবে। ১৭৩৭ সালে বয়ে যাওয়া সেই সাইক্লোনের পথ আমি স্টর্ম ট্র্যাকার দিয়ে বের করেছি।’ বিদ্যাদি আরেকটা কাগজ বের করল ফোল্ডার থেকে। ‘এই হল সেই সাইক্লোনের পথ—

সেই সাইক্লোন কলকাতা হয়ে উত্তর পূর্ব দিকে ঢাকা হয়ে গৌহাটির দিকে চলে গেছে। তার মানে ডিঙিবাদল গ্রামটা কলকাতার কাছাকাছি, মানে কলকাতার উত্তর পূর্বে কলকাতা ঢাকা যাওয়ার পথে হওয়া উচিত। গুগল ম্যাপ থেকে কলকাতা ঢাকার লিঙ্ক খুঁজলে আমরা এটা পাই,’ বিদ্যাদি ফাইল থেকে প্রিন্ট করা গুগল ম্যাপ বের করল। ‘ডাইরেকশন দুটো কম্পেয়ার করলে মনে হয় দেগঙ্গা-বেড়াচাঁপার উপর দিয়ে বয়ে গেছিল সাইক্লোন। আর এই দেগঙ্গা— বেড়াচাঁপাতেই আছে খনা মিহিরের ঢিপি। যার নীচে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সক্যাভেশনে আবিষ্কৃত হয়েছে একটা বিশাল মন্দির।’

বিদ্যাদি মাধবী বসাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি চারটে করে কপি এনেছি। আপনি চাইলে আদালতে জমা করতে পারেন।

নমিতা ভাষাহীন। এভাবেও রিসার্চ হয়?

বিদ্যাদি বলল, ‘এই দেগঙ্গাতেই আছে খনার মন্দির যেখানে দেবতা পাওয়া যায়নি। দেগঙ্গা তখন বিদ্যাধরী নদীর পাশে ছিল। তখনকার বিদ্যাধরীতে প্রচুর ছোট-বড় নৌকা চলাচল করত। কলকাতা থেকে মাত্র ঊনচল্লিশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। সাইক্লোনের দাপটে বিদ্যাধরীর ডিঙিগুলোও দেগঙ্গায় আশেপাশে বৃষ্টির মতো উড়ে এসে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। তাই না?’

নমিতার আনন্দে কান্না পাচ্ছে। আমাদের বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ছাত্রীর কী মেধা! এর কাছে ক্যালিফোর্নিয়া তুচ্ছ!

‘কিন্তু বাকিটা?’ আহুজা বলল।

‘বেহুলার পুঁথিতে লেখা আছে যে অনেক গ্রামবাসীকে নাকি বেহুলা জিভকাটির মন্দিরে আশ্রয় দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। সমীকরণগুলো আমার চোখের সামনে খুবই সহজ হয়ে আসছে। আমার মনে হয় বেহুলা গ্রামবাসীদের খনার মন্দিরের ভিতর ঢুকিয়ে নিয়ে ওদের প্রবল সাইক্লোনে ডিঙির বর্ষণের থেকে বাঁচিয়েছিল।’

আহুজা বলল, ‘কিন্তু আমি ‘বেহুলার খনা’ বইটার আসল পুঁথিটা দেখতে চাই। কোথায় আছে সেই পুঁথি? কী প্রমাণ আছে যে ওই পুঁথি বেহুলা লিখেছিল? কী প্রমাণ আছে ওই পুঁথি আপনি লেখেননি? এখন নাটকীয়ভাবে লোকেশন জাস্টিফাই করছেন?’ তারপর জাজের দিকে তাকিয়ে আহুজা বলল, ‘ইয়োর অনার, এক সময় মিস দাস মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁকে অনেক সাইকিয়াট্রিস্ট ট্রিটমেন্ট করাতে হয়েছিল, অনেক ওষুধ খেতে হয়েছিল। সে সময় ডিপ্রেসনের থেকে বাঁচাবার জন্য ওঁর দাদা কবিরাজ ধন্বন্তরি দাস ওঁকে পরামর্শ দেন কিছু পড়ালেখার মধ্যে ডুবে থাকতে। সেসময় মিস দাস এই ‘বেহুলার খনা’ লিখেছিলেন। তিনি নিজেকে একজন ভিক্টিম ভাবতেন, তাই এক নারী ভিক্টিমকে তিনি তাঁর কাহিনিতে বারবার বাঁচিয়েছিলেন।’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ এবার মাধবী বসাক দাপটের সঙ্গে বললেন। ‘এবার অপোজিং কাউন্সিল আমার উইটনেসের মানসিক অবস্থা নিয়ে আন্দাজে নিজের মনগড়া কথা বলে চলেছেন। প্রথমে কাউন্সিলের আরগুমেন্ট ছিল যে ডিঙিবৃষ্টি সম্ভব না, ওটা বেহুলার নিছক মনগড়া গল্প। মিস বিদ্যাধরী দাস প্রমাণ করে দিয়েছেন ডিঙিবৃষ্টি ইজ পজিবল। এটাই কী এই কেসের জন্য যথেষ্ট নয়? কার ডিপ্রেসনে কে ভিক্টিম এসব তথ্য কি এই কেসের আলোচনায় আসে?’

‘অবজেকশন সাস্টেইন্ড,’ জাজ বললেন। ‘মিস্টার আহুজা আপনার আর কী জিজ্ঞাস্য আছে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন।’

সমীর আহুজা চোখ থেকে চশমা নামিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘আমার আর কোনো প্রশ্ন করার নেই ইয়োর অনার।’

‘এনি রিডাইরেক্ট কোয়েশ্চেন, মিস বসাক?’ জাজ বললেন।

মাধবী বসাক এবার বললেন, ‘ইয়োর অনার, অপোজিং কাউন্সিলের অবজেকশন না থাকলে আমি মিস দাসের এই দুটো ঝড়ের সম্বন্ধে তথ্য একজিবিট নাইন হিসেবে জমা করতে চাই।’

‘নো অবজেকশন,’ আহুজা বলল।

‘একজিবিট নাইন অ্যাডমিটেড টু দ্য কোর্ট, জাজ বললেন।

একজন আর্দালি বিদ্যাদির কাগজগুলো নিয়ে কোর্ট ক্লার্কের হাতে দিল।

এবার মাধবী বসাক বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মিস দাস, আপনি কী বলতে পারবেন এই ফর্মুলা আপনার ভাইপো ড. তথাগত দাস কীভাবে পেলেন?’

‘ইয়েস ম্যাম। এই ফর্মুলা আমাদের পূর্ব-পুরুষের একটা পুঁথি থেকে আমার দাদু নীলকণ্ঠ কবিরাজ তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন। সেই ফর্মুলা আমার দাদা ধন্বন্তরী কবিরাজ সুশ্রুতের মালিক শমীক মিশ্রকে দশ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। আমার ধারণা তথাগত সুশ্রুতে কাজ করার সময় সেই ফর্মুলা পায়।’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল।

‘সাসটেইন্ড।’

‘কিন্তু সে ফর্মুলা ড. তথাগত দাসকে কেন সুশ্রুত থেকে পেতে হবে? ওর বাবা ধন্বন্তরি কবিরাজের থেকেও তো তথাগত দাস সেই ফর্মুলা পেতে পারতেন?’ মিস বসাক বললেন।

‘তথাগত ওর বাবার থেকে সেই ফর্মুলা লেখা ডায়েরি চেয়েছিল। কিন্তু ওর বাবা ধন্বন্তরি কবিরাজ তথাগতকে সেই ফর্মুলা দেন নি,’ বিদ্যাদি বলল।

‘আপনি কি প্রমাণ করতে পারেন যে সাপের প্রতিষেধকের ফর্মুলা আপনার পূর্বপুরুষের ডায়েরিতে অনেক কাল ধরে লেখা ছিল?’

‘ইয়েস ম্যাম।’

‘আপনি কি আদালতকে কোনো এভিডেন্স দেখাতে পারেন?’

‘হ্যাঁ,’ বিদ্যাদি বলল। তারপর বিদ্যাদি ওর শান্তিনিকেতনী ঝোলা থেকে একটা অতীব পুরোনো কীটদষ্ট ডায়েরি বের করল। একটা পাতায় মার্কার দেওয়া ছিল। বিদ্যাদি সেই পাতা খুলে বলল, ‘এই ডায়েরির এই পাতায় লেখা আছে সেই সাপের বিষের ওষুধের ফর্মুলা। এই যে লেখা ‘বিষহরি’।’

মাধবী বসাকের মুখ-চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, ‘ইয়োর অনার, আপনি যদি পারমিশন দ্যান, তবে এটাই আমার লাস্ট একজিবিট, একজিবিট নাম্বার টেন।’

জাজ বললেন, ‘একজিবিট টেন অ্যাকসেপ্টেড।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ ইয়োর অনার,’ মিস বসাক বললেন। ‘আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।’

‘মিস দাস, ইউ আর এক্সকিউজড, জাজ বললেন। ‘মিস বসাক, আপনার আর কোনো উইটনেস আছে?’

‘না ইয়োর অনার। থ্যাঙ্ক ইউ।’

‘ওয়েল, এবার বিচারক বললেন। ‘আমি সমস্ত এক্সপার্ট ও সাক্ষীদের বয়ান ও মতামত শুনলাম। আমরা এবার দু’পক্ষের ক্লোজিং আর্গুমেন্টস শুনব। তার আগে এই ডকুমেন্টগুলো দেখার জন্য আমি একটা ব্রেক নেব। কোর্ট ইজ ইন রিসেস আনটিল টু থার্টি পি এম।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *